ক্রোড়পত্র- নোবেল ২০২৫-নোবেল পুরস্কারের গোড়ার কথা-অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়- শীত ২০২৫

১৮৯৬ সালে মারা গেলেন ডায়নামাইটের আবিষ্কর্তা আলফ্রেড নোবেল। ইনি একাধারে ছিলেন বিজ্ঞানী, উদ্যোগপতি এবং একজন ঝানু ব্যবসায়ীও। মারা যাবার কয়েক মাস আগে প্যারিসে বসে তিনি একটি অসাধারণ উইল করে যান। তাঁর বিপুল সম্পত্তিকে তিনি পাঁচ ভাগে ভাগ করেন। প্রতিটি ভাগ নির্ধারিত করা হয় এক-একটি বিশেষ পুরস্কারের জন্য। মানবজাতির উন্নতিকল্পে যাঁরা পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, শারীরবিদ্যা বা ওষুধ, সাহিত্য এবং শান্তির জন্য উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন, তাঁদের জন্য প্রতিবছর এই পাঁচটি বিভাগে পুরস্কার দেবার অঙ্গীকার করেন আলফ্রেড নোবেল।

আলফ্রেড নোবেল মারা যাবার বাহাত্তর বছর পর, ১৯৬৮ সালে আরও একটি বিভাগে নোবেল পুরস্কার প্রদান করার কথা ঘোষণা করে সুইডেনের একটি ব্যাংক। ১৯৬৯ সালে সুইডেনের সেন্ট্রাল ব্যাংকের ছিল ৩০০ বছর পূর্তি। তাই আগের বছরই ব্যাংকের উদ্যোগে বিশেষ নোবেল পুরস্কার দেবার কথা ঘোষণা করা হয় অর্থনীতি বিভাগে। এই পুরস্কারের উল্লেখ আলফ্রেডের উইলে উল্লিখিত ছিল না, কিন্তু আইনি পরামর্শদাতারা উইল যাচাই করে দেখেন, আলফ্রেডের অভিনব উদ্দেশ্য লঙ্ঘিত হচ্ছে না এই পুরস্কার দিলে।

কেন পাঁচটি পুরস্কার দেবার ব্যবস্থা আলফ্রেড নোবেল উইল করে বলে দিয়ে যান, সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে দেখে নেওয়া যাক আলফ্রেডের উইলে কী লেখা ছিল।

আলফ্রেড উইলে লিখে যান: তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দ্বারা নিযুক্ত দুই অছি (Executor) আলফ্রেডের সমস্ত জমা অর্থ শেয়ার বাজারে খাটাবেন এবং প্রাপ্ত সুদের থেকে পুরস্কারের অর্থ জোগানো হবে। পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে নোবেল পুরস্কারের প্রার্থী নির্বাচন করবে সুইডিশ অ্যাকাদেমি অফ সায়েন্স, শারীরবিদ্যা বা ওষুধের জন্য পুরস্কার প্রার্থী নির্বাচন করবে কারোলিনিস্কা ইন্সটিটিউট, স্টকহোম। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেবার দায়িত্বে থাকবে অ্যাকাদেমি অফ স্টকহোম। শান্তির জন্য সুইডেনের পার্লামেন্ট গঠিত পাঁচজনের একটি সমিতি পুরস্কার দেবার জন্য প্রার্থী নির্বাচন করবে। পৃথিবীর যে-কোনো দেশ থেকে মনোনীত প্রার্থীর মধ্য থেকে বেছে নেওয়া হবে মানব কল্যাণে কাজে আসে এমন কোনও কাজের জন্য পুরস্কার প্রাপক।

আলফ্রেড নোবেল অকৃতদার ছিলেন। মৃত্যুর পর, যেহেতু তাঁর নিজস্ব পরিবার ছিল না এবং তিনি সমস্ত জমা অর্থ শুধুমাত্র মানবকল্যাণে নিয়োজিত কাজের স্বীকৃতি হিসাবে পুরস্কারের জন্য ব্যয় করার কথা বলে যান, এটা নোবেলের অন্যান্য আত্মীয়রা মেনে নিলেন না। ফলে আলফ্রেড মারা যাবার পর শুরু হল মামলা। অনেক আইনি বাধা পেরিয়ে আলফ্রেডের নিযুক্ত দুই অছি, যাঁরা আলফ্রেডের জীবিতকালে তাঁর সহায়ক এবং নিত্যসঙ্গী ছিলেন, তাঁরা নিখুঁতভাবে উইলের শর্ত যথাযথ পালন করেন। ফলে ১৯০১ সালে খুলে যায় নোবেল ফাউন্ডেশন এবং সেই বছর থেকে শুরু হয় নোবেল পুরস্কার দেওয়া।

প্রতিবছর অক্টোবর মাসে ঘোষিত হয় নোবেল পুরস্কার এবং ১০ ডিসেম্বর, আলফ্রেডের মৃত্যুদিনে আনুষ্ঠানিকভাবে নোবেল পুরস্কার প্রাপকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। শুধু শান্তি ও সাহিত্য পুরস্কার ছাড়া আর সব বিষয়েই সর্বাধিক তিনজন ব্যক্তি নোবেল প্রাপক হতে পারেন আলফ্রেডের উইল অনুযায়ী।

১৮৩৩ সালের ২১ অক্টোবর আলফ্রেড নোবেলের জন্ম হয় সুইডেনের স্টকহোম শহরে। নোবেল পরিবার ছিল অভিজাত। আলফ্রেডের বাবা ইম্যানুয়েল নোবেল ছিলেন একজন প্রযুক্তিবিদ এবং ব্যবসায়ী। প্রথমে তিনি স্টকহোম শহরে বাড়ি এবং সেতু বানাবার ইজারা নিতেন। সুইডেনে এই কাজ করার প্রধান অসুবিধা ছিল পাথর ফাটিয়ে বা পাহাড় খুঁড়ে পথ বার করা। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি বিস্ফোরক পদার্থ ব্যবহার করতে থাকেন এবং নানা বিস্ফোরক পদার্থ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে থাকায় বহু অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান সঞ্চয় করেন।

যে-বছর আলফ্রেডের জন্ম হয়, সেই বছর বিশেষ কোনও কারণে ডুবে যায় ইম্যানুয়েলের ব্যাবসা। কঠিন পরিস্থিতিতে ইম্যানুয়েল নোবেল তাঁর পরিবার নিয়ে ভাগ্য ফেরানোর আশায় চলে যান রাশিয়ায়। এখানে একটি যন্ত্রাংশ বানাবার ছোট্ট ওয়ার্কশপ খুলে ফেলেন তিনি। কিছুটা ভাগ্য ফিরলে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে অস্ত্র বা যন্ত্রাংশ সরবরাহ করতে থাকেন ইম্যানুয়েল। এই সময়েই রাজপরিবারের সংস্পর্শে এসে রাশিয়ার নৌবাহিনীতে তিনি নিজের হাতে বানানো মাইন বানিয়ে তুলে দেন, যা ব্যবহার করে পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের বহু ডুবোজাহাজ ধ্বংস করে দেয় রাশিয়ার সৈন্যবাহিনী। ভাগ্য ফিরে যায় নোবেল পরিবারের।

আলফ্রেড ও তাঁর ভাইবোনদের জন্য বাবা ইম্যানুয়েল একজন রাশিয়ান গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেন যিনি পদার্থবিদ্যা, অঙ্ক এবং রসায়ন পড়াতে থাকেন। একই সঙ্গে সব ভাইবোনদের রাশিয়ান, ইংরেজি, ফরাসি ও জার্মান ভাষা শিখতে হয় ঘরে বসেই। আলফ্রেডের অপর দুই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলেও বড়ো হয়ে আলফ্রেড কিন্তু রসায়নকেই তাঁর পছন্দের বিষয় হিসাবে বেছে নেন। বিস্ফোরক রাসায়নিক নাইট্রো-গ্লিসারিনের বিষয়ে তাঁর আগ্রহ জাগে।

অল্প বয়সে বিভিন্ন ভাষায় বুৎপত্তি থাকায় আলফ্রেড কাব্যসাহিত্যে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, নিজেও কবিতা লেখা শুরু করেন। বাবা ইম্যানুয়েল ছিলেন ভয়ংকর বাস্তববাদী, তাই ছেলের কাব্যপ্রতিভা দেখে উৎসাহিত না হয়ে তিনি বিরক্ত হলেন। অবশ্য আলফ্রেড যথেষ্ট জেদি হওয়ায় কবিতা এবং রসায়ন দুটো বিষয়েই তিনি মেতে থাকলেন কৈশোর ও যৌবনে।

আলফ্রেডের পড়াশুনো শুরু হল একেবারে প্রথা ভেঙে, কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরতি হবার আগ্রহ তাঁর মধ্যে দেখা গেল না। নিজের চেষ্টায় এবং ব্যক্তিগত শিক্ষকদের সাহায্যে পাঠ চলতে থাকল। কয়েক বছর পর বাবা ইম্যানুয়েলের ইচ্ছেয় আলফ্রেড অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফ্রান্সে চলে গেলেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। সেখানে তাঁর তালিম চলল নাইট্রো-গ্লিসারিনের জনক ইতালিয় প্রফেসর আস্কানিও সোব্রেরোর কাছে। নাইট্রিক অ্যাসিডের সঙ্গে গ্লিসারিন মিশিয়ে প্রবল বিস্ফোরক পদার্থ নাইট্রো-গ্লিসারিন আবিষ্কার করার জন্য প্রফেসর সোব্রেরোর তখন পৃথিবীজোড়া নামডাক। কিন্তু বিস্ফোরক পদার্থ নাইট্রো-গ্লিসারিন ব্যবহার করার মস্ত বড়ো অসুবিধা ছিল তার সংরক্ষণ। তরল গ্লিসারিনের সঙ্গে নাইট্রিক অ্যাসিড মিশিয়ে দিলে পাওয়া যায় মোমের মতো নরম নাইট্রো-গ্লিসারিন। ইউরোপের মতো ঠান্ডা দেশে সেটা আয়তনে বেড়ে যায়, কাঠের পিপেতে ভরে রাখলেও দেওয়াল ফাটিয়ে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। বেশি বাধা পেলে বিস্ফোরণ হয়ে জঘন্য দুর্ঘটনা ঘটে, মানুষ মারা যায় বা হাত-পা হারিয়ে বিকলাঙ্গ হয়ে যায়।

আলফ্রেড যখন প্যারিসে আসেন, তখনও নাইট্রো-গ্লিসারিনকে সাবধানে ব্যবহার করার কোনও উপায় আবিষ্কার করা যায়নি। কিন্তু পাথর ফাটিয়ে রাস্তাঘাট তৈরি করাই হোক, খনিতে ব্যবহারই হোক বা শত্রুপক্ষকে আঘাত করতে, নাইট্রো-গ্লিসারিন হয়ে উঠেছিল এক অপরিহার্য বস্তু। কিন্তু একটু চাপ বা তাপ বাড়লেই নাইট্রো-গ্লিসারিন ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিত। তবে আলফ্রেডের বাবা ইম্যানুয়েল বারুদের সঙ্গে নাইট্রো-গ্লিসারিন মিশিয়ে সামরিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে চেষ্টা করে তেমন সাফল্য পাননি।

ক্রিমিয়ার যুদ্ধে রাশিয়া শোচনীয়ভাবে হেরে যায় ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এবং অটোমান সাম্রাজ্যের সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধের পর বদলে যায় নোবেল পরিবারের ব্যাবসা-বাণিজ্য। রাশিয়ার সম্রাট জার নিকোলাই মারা যান এবং ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয় নতুন সরকারের হাতে। জারের সময়ে ইম্যানুয়েল নোবেলের সঙ্গে রাশিয়া যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করে সামরিক বাহিনীতে জোগান দেবার জন্য যে চুক্তি করে, নতুন সরকার তা অস্বীকার করে। ফলে ইম্যানুয়েল পারিবারিক ব্যাবসা চাঙ্গা করার জন্য আলফ্রেডকে বিদেশে পাঠান। আলফ্রেড লন্ডন আর প্যারিসে ঘুরেও বিফল হন পারিবারিক ব্যাবসার মোড় ঘুরিয়ে দিতে।

রাশিয়ার সেন্ট পিটারসবার্গে ফিরে এসে আলফ্রেড তিনটি সফল বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করে পেটেন্ট করে ফেলেন। গ্যাস ও তরল পরিমাপ যন্ত্র এবং বায়ুমণ্ডলের চাপ নির্ণয় করার উন্নত ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন তিনি। এরপর আলফ্রেড নোবেল নাইট্রো-গ্লিসারিনের উপর নানা পরীক্ষা করে অভিনব উপায়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য একটি ব্যবস্থা আবিষ্কার করে ফেলেন। নাইট্রো-গ্লিসারিন কাচের টিউবে ভরে সেই টিউব সিল করে দেওয়া হয়, তারপর টিউবটিকে ভরে দেওয়া হয় একটি জিংকের তৈরি বারুদভরা আলাদা টিউবে। গোটা ব্যবস্থা জলের তলায় নিয়ে গিয়ে একটি ফিউজের সাহায্যে বারুদ জ্বালিয়ে দিতেই প্রবল বিস্ফোরণ ঘটে যায়।

পেটেন্ট থেকে প্রাপ্ত অর্থে সেন্ট পিটার্সবার্গে তিন নোবেল ভাই মিলে একটি তেলের কোম্পানি খুলে ফেলেন। কিন্তু বাবা-মায়ের সঙ্গে আলফ্রেড ফিরে যান সুইডেনের স্টকহোম শহরে।

১৮৭৭ সালে রাশিয়া সরকার আলফ্রেডের নব আবিষ্কৃত বিস্ফোরক সামরিক বাহিনীর কাজে লাগানোর জন্য দশ বছরের পেটেন্ট দেয়। এই কাজ ছিল তরল বিস্ফোরক কঠিন পদার্থে পরিবর্তন করে বিস্ফোরকের নতুন চেহারা দেওয়া।

ডায়নামাইট

গ্লাইসেরলের সঙ্গে নাইট্রিক অ্যাসিড এবং সালফিউরিক অ্যাসিড মিশিয়ে প্রফেসর সোব্রেরো নাইট্রো-গ্লিসারিন আবিষ্কার করেন ১৮৪৬ সালে। এই বস্তুটি জলে দ্রবীভূত হয় না। আলফ্রেড নোবেল এই বস্তুটিকে কীভাবে শিল্প স্তরে নিয়ে যাওয়া যায়, সে নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। প্রথমে আলফ্রেড একটা টিউবের মধ্যে নাইট্রো-গ্লিসারিন রেখে তার ভিতরে কাঠের ফিউজ লাগিয়ে দেন। কাঠের তৈরি ফিউজের গর্তে বারুদ ভরতি করে সলতে লাগিয়ে দিলেন আলফ্রেড। তারপর সলতেতে আগুন দিতেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ফেটে গেল নাইট্রো-গ্লিসারিন ভরতি টিউব।

এরপর আলফ্রেড আরও পরীক্ষানিরীক্ষা করতে লাগলেন। নাইট্রো-গ্লিসারিনের সঙ্গে কাঠের গুঁড়ো, কয়লা বা সিমেন্ট মিশিয়ে কোনও ফল পেলেন না তিনি। এমনি করেই একদিন তরল নাইট্রো-গ্লিসারিনের সঙ্গে সিলিকাযুক্ত পাথরের সাদা গুঁড়ো  মিশিয়ে দিয়ে আলফ্রেড পেয়ে গেলেন নাইট্রো-গ্লিসারিনের পেস্ট। খুব সহজে সাধারণ পরিস্থিতিতে অত মারত্মক বিস্ফোরণ আর হল না। আলফ্রেড পেলেন তাঁর বহু আকাঙ্ক্ষিত বিস্ফোরক যা মোমের মতো নরম হওয়ায় সহজেই রডের আকার দেওয়া যায়। পাথরের গায়ে ফুটো করে গর্ত বানিয়ে এই রড ঢুকিয়ে তাতে ফিউজের সাহায্যে আগুন দিলেই পাথর ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আলফ্রেড এই নব আবিষ্কৃত বস্তুর নাম দিলেন ডায়নামাইট। যে সিলিকা যুক্ত মাটি নাইট্রো-গ্লিসারিনের সঙ্গে মেশানো হয়, তার বৈজ্ঞানিক নাম হল ‘ডাই-অ্যাটোমেসাস আর্থ’। এই কারণেই নব আবিষ্কৃত বিস্ফোরকের নাম হল ডায়নামাইট। আলফ্রেড ডায়নামাইট ব্যবহার করতে সেফটি ক্যাপও আবিষ্কার করে ভালো ফল পেলেন।

পাহাড় কেটে রাস্তা বানাতে মানুষের যে শ্রম লাগত, ডায়নামাইট আবিষ্কারের পর তার আর প্রয়োজন রইল না। আবার ডায়নামাইট পরিবহণ নিরাপদে করাও সম্ভব হল। কাজেই আলফ্রেড নোবেলের আবিষ্কারের জনপ্রিয়তা পেতে সময় লাগল না। তিনি সুইডেন ও ইংল্যান্ডে ডায়নামাইটের পেটেন্ট করলেন এবং পেটেন্ট বেচার টাকা লাগিয়ে দিলেন রাশিয়ার নোবেল ব্রাদার্সের কোম্পানিতে। সঙ্গত কারণেই রাশিয়ার সরকারকে তিনি ডায়নামাইটের পেটেন্ট বেচলেন না। পেটেন্টের টাকা লগ্নি করলেন ডায়নামাইট বানানোর কারখানা তৈরি করার জন্য।

নোবেল পুরস্কারের ১২৫ বছর

আলফ্রেড নোবেলের উইল অনুযায়ী প্রতিবছর তাঁর মৃত্যুদিনে (১০ ডিসেম্বর) নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে। যদিও মাঝে দুই-এক বছর নোবেল কমিটিকে কিছু সমস্যার কারণে পুরস্কার প্রদান বন্ধ রাখতে হয়। ১২৫ বছরের এই সুদীর্ঘ যাত্রায় আজ পর্যন্ত ৯৯০ জন ব্যক্তি এবং ২৮টি সংস্থা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। দুইবার নোবেল পুরস্কার পাবার ঘটনাও ঘটেছে, যেমন পদার্থবিদ মেরি কিউরি, রসায়নবিদ লুইস পাওলিং, পদার্থবিদ জন বার্ডিন, রসায়নবিদ ফ্রেড্রিক সাঙ্গার এবং ব্যারি শার্প্লেস।

১৯ জন নারী বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কারের সম্মান লাভ করেছেন ২০১৮ সাল পর্যন্ত। কিছু নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন একই পরিবারের অনেকে। যেমন মেরি ও পিয়ের কিউরি দম্পতি। যুগ্মভাবে মেরি ও পিয়ের ১৯০৩ সালের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে নোবেল পুরস্কার পান তাঁদের তেজস্ক্রিয় বিকিরণের উপর গবেষণার অনন্যসাধারণ গবেষণার জন্য। ১৯১৩ সালে মেরি আবার রসায়ন বিভাগে একই পুরস্কার পান রেডিয়াম ও পোলনিয়াম আবিষ্কারের জন্য। অল্প বয়সে পিয়ের মারা যাবার পর মেরি তাঁর দুই কন্যাকে অত্যন্ত প্রতিবন্ধকতার মধ্যে মানুষ করে সুশিক্ষিত করে তোলেন। ফলস্বরূপ মেরির প্রথম কন্যা আইরিন তাঁর স্বামী ফ্রেড্রিক জোলিয়টের সঙ্গে যুগ্ম নোবেল পুরস্কার পান রসায়ন বিভাগে।

আণবিক গঠনের আবিষ্কর্তা পদার্থবিদ নিলস বোর ১৯২২ সালে নোবেল পান। তাঁর পুত্র এজ বোর সেই বছরই জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালে এজ বোর নোবেল জিতে পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করার অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

অস্ট্রীয় হাঙ্গেরির দুই প্রতিভাবান বিজ্ঞানী স্বামী-স্ত্রী গার্টি কোরি এবং কার্ল কোরি শারীরবিদ্যায় নোবেল পান ১৯৪৭ সালে।

সুইডেনের বিজ্ঞানী সুনে বার্জস্ট্রম শারীরবিদ্যায় নোবেল পান ১৯৮২ সালে। তাঁর যোগ্য উত্তরাধিকারী ভান্তে পাবো পিতার পুরস্কার পাবার চল্লিশ বছর পর নোবেল পুরস্কার পান এই বিভাগেই।

২০১৪ সালে নরওয়ের বিজ্ঞানী দম্পতি মে-ব্রিট মোজার এবং এডওয়ার্ড মোজার মানুষের মস্তিষ্কে জিপিএস সিস্টেম চালানোর পিছনে যে কোশ আছে, তা আবিষ্কার করার জন্য নোবেল পুরস্কার পান শারীরবিদ্যা বিভাগে।

২০১৯ সালে ভারতীয় বংশোদ্ভূত অর্থনীতির অধ্যাপক অভিজিৎ ব্যানার্জি ও তাঁর পত্নী এস্থার দুফলোঁ অর্থনীতি বিভাগে নোবেল পুরস্কার পান তাঁদের সাথী মাইকেল ক্রেমারের সঙ্গে।

নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে সর্ব কনিষ্ঠ ব্যক্তি পদার্থবিদ লরেন্স ব্র্যাগ মাত্র ২৫ বছর বয়সে নোবেল পুরস্কার জিতে নেন। এই নোবেল পুরস্কার তিনি নিজের পিতা উইলিয়াম ব্র্যাগের সঙ্গে যুগ্মভাবে জেতেন। ক্রিস্টালের গঠন কীভাবে এক্স-রের সাহায্যে বোঝা যায়, তা নিয়ে গবেষণা করে পিতা-পুত্র সঠিক পথ বার করেছিলেন।

আজ পর্যন্ত মাত্র একটি ভ্রাতৃদ্বয় নোবেল পুরস্কার পাবার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। তাঁরা হলেন, নেদারল্যান্ডসের বিজ্ঞানী টিনবার্জেন ভাইয়েরা। তবে বড়ো ভাই জান টিনবার্জেন নোবেল পুরস্কার পান অর্থনীতি বিভাগে এবং এর চার বছর পর ছোটো ভাই নিকোলাস টিনবার্জেন নোবেল পান শারীরবিদ্যা বিভাগে।

নোবেল পুরস্কার মনোনয়ন

প্রতিবছর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংস্থায় কর্মরত অসংখ্য বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ, পূর্ববর্তী নোবেল বিজয়ী এবং সাংসদের কাছে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন চাওয়া হয়। লক্ষ রাখা হয়, যাতে পৃথিবীর সব দেশজুড়ে কৃতী ব্যক্তিরা মনোনয়ন করবার সুযোগ পান।

নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনীত তালিকা থেকে পাঁচজনের নাম নির্বাচন করে সুইডিশ অ্যাকাদেমির ১৮ জন সভ্যের এক সমিতি। এরপর অ্যাকাদেমির চার-পাঁচজনের একটি বিশেষ সমিতি নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা করে।

সুইডিশ অ্যাকাদেমি অফ সায়েন্স বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের বিজ্ঞানী ও নামকরা অধ্যাপকদের কাছ থেকে প্রতিবছর পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন চেয়ে পাঠায়। সুইডিশ অ্যাকাদেমি গঠিত পদার্থবিদদের বিশেষ সমিতিতে সভ্যরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন মনোনীত বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয় নিয়ে। অন্যান্য সংস্থার বিশেষজ্ঞদের কাছে পরামর্শ নেওয়া হয়ে থাকে। সব তথ্য একত্রিত করে একটি বিশেষ রিপোর্ট তৈরি করা হয়। বড়ো তালিকা থেকে চার বা পাঁচজন প্রার্থীকে বেছে নিয়ে তাঁদের কাজ নিয়ে আলোচনা হয় বিশেষ ক্লাসরুমে। শেষ ধাপে সমিতির সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে নোবেল বিজয়ীকে বেছে নেওয়া হয়।

রসায়ন, অর্থনীতি এবং শারীরবিদ্যা বা ঔষধ বিভাগেও উপরের পদ্ধতিতেই নোবেল বিজয়ী স্থির করা হয়। প্রতিটি বিভাগের জন্য সুইডিশ অ্যাকাদেমি আলাদা আলাদা সমিতি গঠন করে।

কোনও এক বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মনোনীত ব্যক্তিদের তালিকা চেয়ে নেওয়া হয় বিভিন্ন সংস্থা থেকে। তার পরের বছর অক্টোবর মাসে নোবেল জয়ীর নাম ঘোষিত হয়। কাদের নাম মনোনীত হয়েছিল, তা আগামী ৫০ বছর পর্যন্ত প্রকাশ করা হয় না, গোপন থাকে।

নোবেল শান্তি পুরস্কার

পৃথিবীর সবাচাইতে বিতর্কিত পুরস্কার হল নোবেল শান্তি পুরস্কার। কীভাবে বা কেন এই শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়, তার পদ্ধতি জেনে নেবার আগে দেখা যাক আলফ্রেড নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রস্তাব কেন তাঁর উইলে লিখে গিয়েছিলেন।

আলফ্রেড নোবেল ইউরোপে বিভিন্ন দেশের মধ্যে যুদ্ধ ঘটতে দেখেছিলেন, যুদ্ধের ভয়াবহতাও প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাই নিজের হাতে আবিষ্কৃত হওয়া ডায়নামাইট যে ভবিষ্যতে যুদ্ধবাজদের হাতে এক মারাত্মক হাতিয়ার হয়ে উঠবে, তা তিনি ভালোই জানতেন। হয়তো-বা এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব লাভ করার পর মানুষের অকল্যাণের আশঙ্কায় তিনি ভীত হয়ে পড়েছিলেন। তাই বিশ্বশান্তির উদ্দেশ্যে নিজের লাভের একাংশ নিয়োজিত করে তিনি উইলে লেখেন: ‘এই পুরস্কার জাতিসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধের জন্য, স্থায়ী সেনাবাহিনীর বিলুপ্তি বা হ্রাসের জন্য এবং শান্তি কংগ্রেসের আয়োজন ও প্রচারের জন্য, যে বা যাঁরা সর্বাধিক বা সর্বোত্তম কাজ করেছেন’ তাঁদেরই প্রদান করা হবে।

১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হলে সেই বছর যুগ্মভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় ফরাসি অর্থনীতিবিদ ফ্রেড্রিক পাসি এবং সুইডেনের সমাজকর্মী হেনরি দুনান্তকে। পাসি ইউরোপের দেশগুলির মধ্যে যুদ্ধ থামানোর ব্যাপারে দৃষ্টান্তমূলক কাজ করেন এবং দুনান্ত রেডক্রস সোসাইটি স্থাপন করেন, যারা যুদ্ধে আহতদের চিকিৎসার ভার তুলে নেয় পরবর্তীকালে। এখনও পর্যন্ত ১০৫ বার নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়, যার মধ্যে আছেন ৯২ জন পুরুষ, ১৯ জন নারী এবং ২৮টি সংস্থা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত বিশ্বশান্তির জন্য যাঁরাই উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন, তাঁরাই নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নোবেল মনোনয়ন কমিটির উপর নানা রাজনৈতিক চাপ আসতে থাকে শান্তি পুরস্কারের প্রার্থী নির্বাচন করবার জন্য এবং কমিটি বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে বিতর্কেও জড়িয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নিরস্ত্রীকরণ এবং যুদ্ধবিরতির দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হতে থাকে, কারণ আণবিক বোমায় জাপানের ভয়াবহ ক্ষতি পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছিল।

নোবেল শান্তি পুরস্কারে যে ১৮ ক্যারাট সোনার মেডেল দেওয়া হয়, তাতে একদিকে আলফ্রেড নোবেলের ছবি থাকে, আর অপরদিকে সুইডিশ ভাষায় উৎকীর্ণ থাকে – ‘pro pace et fraternitate gentiums’, অর্থাৎ, ‘বিশ্বশান্তি ও ভ্রাতৃত্বের জন্য’। মেডেলটি ১৯৬ গ্রাম ওজনের, যার ব্যাস হল ৬.৬ সেমি। একটি শংসাপত্রও দেওয়া হয় প্রাপককে। বর্তমানে শান্তি পুরস্কারের মোট অর্থমূল্য হল ১.১ কোটি সুইস ক্রাউন।

নোবেল পুরস্কার সমারোহ

প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসের ৯ তারিখ থেকে নোবেল পুরস্কার দেবার জন্য অনুষ্ঠান করা হয় সুইডেনের অসলো শহরের সিটি হলে। এই দিনে নোবেল বিজয়ীরা তাঁদের কাজের আলোচনা করার জন্য একটি বিশেষ সাংবাদিক সম্মেলনে যোগ দেন। আলফ্রেডের মৃত্যুদিন ১০ ডিসেম্বরে সবক’টি নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় বিজয়ীদের। নোবেল বিজয়ীদের জন্য বিশাল এক নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। তিনদিন ব্যাপী এই উৎসবে প্রায় ১০০০ জন গণ্যমান্য ব্যক্তি আমন্ত্রণ পান সভায় যোগ দেবার জন্য। নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপকদের সম্মানে অসলোর গ্র্যান্ড হোটেলে নৈশভোজ রাখা হয়। এর আগে শহরে বর্ণাঢ্য মশাল মিছিল বেরোয় এবং বিশ্বশান্তির জন্য মানুষ পথে নেমে সংগীতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রার্থনা করে। ১১ ডিসেম্বর বিশিষ্ট বক্তারা নোবেল শান্তি পুরস্কার এবং পৃথিবীর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন তাঁদের বক্তৃতার মাধ্যমে।

(অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করেছেন দিল্লি আই.আই.টি থেকে। পেশাজীবনে ভারত সরকারের বিজ্ঞান মন্ত্রকের উচ্চপদস্থ আধিকারিক। পপুলার সায়েন্স নিয়ে বাংলাভাষায় এই মুহূর্তে যাঁরা লিখছেন, তাঁদের মধ্যে তাঁর নামটি অন্যতম। পাশাপাশি ইতিহাসচর্চায়, বিশেষত দিল্লির ইতিহাসচর্চায় তাঁর একাধিক গ্রন্থ ইতিমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছে। )

জয়ঢাকের  বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

 

Leave a Reply