ধারাবাহিক উপন্যাস-সিন্ধু নদীর তীরে -পর্ব ১৯- পিটার বিশ্বাস-শীত ২০২৫

সিন্ধুনদীর তীরে –প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্বচতুর্থ পর্বপঞ্চম পর্বষষ্ঠ পর্ব , সপ্তম পর্ব, অষ্টম পর্ব, নবম পর্ব , দশম পর্ব, একাদশ পর্বদ্বাদশ পর্ব, ত্রয়োদশ পর্ব, চতুর্দশ পর্ব, পঞ্চদশ পর্ব, ষোড়শ পর্ব, সপ্তদশ পর্ব, অষ্টাদশ পর্ব,  ঊনবিংশতি পর্ব

IMG-20210913-WA0004

কয়েক মুহূর্ত বাদে, হাসি থামাতে ফের নির্জনতা ঘিরে এলো তাকে। নির্জনতা, এবং অন্ধকার।  নিঃশব্দ পদসঞ্চারে সেই জনহীন অন্ধকারে মিশে গেল মাণ্ডুপ। এইখানে কোনো মনরাক্ষসের প্রভাব নেই। দুর্ধর্ষ মন্দিরযোদ্ধারাও এই নির্জন এলাকাগুলোতে পা রাখতে দুবার ভাবে। এবারে এই পথ বেয়ে নিজের গন্তব্যের দিকে নিঃশব্দ দৌড় চলবে তার…দিন ও রাত মিলিয়ে প্রত্যহ সাত প্রহর হাঁটতে ও দৌড়োতে পারলে সাতদিনের মাথায় ঘেরাউনের তৃণভূমির নাগাল পাবে সে। সেখানে, ঘেরাউনের আশ্রয় সে পাবে। মানুষটা তাকে তো বলেই রেখেছিল, কখনও যদি প্রয়োজন হয়…

…তারপর অপেক্ষা। বিপুল এই দুনিয়ায় আর মাত্র একজন মানুষই অবশিষ্ট আছে, যাকে সে আপনজন বলে ভাবতে পারে। সে ইস্কা। তাকে খবর পাঠিয়ে দিয়েছে সে। সে আসবেই। মাণ্ডুপ জানে। আসতেই হবে তাকে মাণ্ডুপের কাছে। 

শুধু…

হঠাৎ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মাণ্ডুপ। মাথাটা একটু টলে উঠেছে তার। হঠাৎ করেই কেমন যেন অবসন্ন লাগছে শরীর। পেটের ভেতর আবছা মোচড় লাগে। বমি আসছে যেন! আজ বেশ কিছুকাল হল, এই উপসর্গগুলো ঘুরেফিরে আসছে তার শরীরে… 

একটা গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে মাটিতে বসে পড়ল মাণ্ডুপ। তারপর অন্যমনস্কভাবে মাথার চুলে হাত দিয়ে দেখল।কয়েকটা চুল খসে উঠে এসেছে তার হাতে। এ উপসর্গটাও সবে কিছুদিন হল দেখা দিয়েছে তার। কোনো অচেনা অসুখ কি? কে জানে! বৈদ্যকে দেখাবার অবসর কোথায় পেল সে গত কিছুদিন ধরে! 

কোমরের কাছে হালকা উষ্ণতার অনুভূতি আসছিল। সেখানে হাত দিয়ে দেখল একবার মাণ্ডুপ। জাদুপ্রস্তর! গোলকদেবতার চোখে অদৃশ্য থাকবার জন্য এ পাথরকে খোলা অবস্থায় কোমরেই বেঁধে রাখছিল সে ইদানিং। তাকে সীসার আবরণে ঢেকে রাখবার সুযোগ পায়নি মোটে। জায়গাটাতে চামড়ায় বিশ্রী একটা পোড়া ঘা হয়ে গিয়েছে। বড়ো জ্বালা করে সেখানে আজকাল। বনজ লতাপাতার নানান গুণ মান্ডুপের জানা। কিন্তু সেসব প্রয়োগ করেও ফল হয়নি কোনো। 

আজকাল তার মনে হয়, এই সবই ওই অরক্ষিত জাদুপ্রস্তরের বিষক্রিয়া। ম্‌হিরি নগরীতে জ্যোতিগৃহে অধিষ্ঠিত জাদুপ্রস্তরের সেই বিরাট খণ্ডের সামনে নগ্নমস্তকে নিয়ে যাওয়া বন্দিদের দুর্দশার কথা মনে পড়ে তার। 

কিন্তু… এছাড়া তার আর উপায়ই বা কী ছিল! 

সাবধানে পাথরের টুকরোটাকে কোমর থেকে বের করে আনল সে। অন্ধকারে সেটার শরীর থেকে হরিতাভ আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। কী অপূর্ব সেই রঙ! উষ্ণ, মধুর।  এবারে, পিঠে বেঁধে রাখা পুঁটুলিটার থেকে সীসার পাতটাকে বের করে আনল সে। তারপর সাবধানে সেই পাতে পাথরটাকে জড়িয়ে পুঁটুলির ভেতরে রেখে দিল। উপস্থিত কিছুদিন আর এ সাবধানতার প্রয়োজন হবে না। কারণ, যে পথে এখন সে চলেছে, সে পথ ওই মনরাক্ষসের জাদুদৃষ্টির বাইরে।

সামনে অন্ধকার রাত্রি আর দীর্ঘ পথ। একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে, নিজের শারীরিক দুর্বলতাকে তুড়িতে উড়িয়ে দিয়ে সে ছুট শুরু করল। 

অন্ধকার প্রান্তর বেয়ে ছুটে যায় সেই বলিষ্ঠ তরুণ। আর, ঠিক সেই সময়টিতেই তার অজ্ঞাতে তার শরীরে এসে বাসা বাঁধা কালব্যধি তাকে কুরে কুরে খেয়ে চলে।  দূর ভবিষ্যতে এ রোগের নাম মানুষ রাখবে কর্কটব্যাধি। এই মহারোগের উপশম বের করতে আরো পাঁচটি সহস্রাব্দ কেটে যাবে তার। ইফ্রাত নদীকূলের থেকে আসা  ওই বিষপাথর দীর্ঘ কয়েক দিন ধরে  অরক্ষিতভাবে তার শরীরকে ছুঁয়ে থেকে সে রোগের সূচনা ঘটিয়ে দিয়েছে সেখানে। সে পাথরকে সীসার আবরণে রাখায় এবারে হয়তো রোগের বিস্তারের গতি কমবে, হয়তো কিছুদিনের জন্য খানিক সুস্থবোধ করবে সে, কমে আসবে তার আশু লক্ষণগুলোর তীব্রতাও, কিন্তু ধীরগামী নিয়তির মতোই সে রোগ এবারে ধীরে ধীরে খেয়ে চলবে তার শিকারকে। তারপর একদিন…

ষোড়শ অধ্যায়- ইস্কা ও মাণ্ডুপ

উত্তরে পর্বতমালা আদি-অন্তহীন
পশ্চিমে  সাগরে সূর্য প্রত্যহ বিলীন
তার মাঝে পথ বেয়ে ত্রিদিবস যায়
তীর্থযাত্রী সুপবিত্র তৃণভূমি পায়
ভক্ত ঘেরাউন তথা যথা পশুপতি
পশুপাল লয়ে ঘোরে মহা ধর্মমতি
ত্বরা করে তথা যাও  ভিন্ন রূপ লয়ে
মিলিবে পরম সখা তাহার আলয়ে।
আদেশ পালনে ত্রুটি হলে এক কণা
ঈশ্বরের অভিশাপে নিঃসীম বেদনা”

কাঁপা কাঁপা গলায় ফের একবার গোটা কবিতাটা আবৃত্তি করল ইস্কা। শোনবার পর থেকে এই নিয়ে বেশ কয়েকবার হল। পাছে তার একটা অক্ষরও ভুলে যায়, তাই বারংবার মন্ত্রের মতো তা জপ করে চলেছে সে। 

বুকের ভেতর একটা তোলপাড় চলছে ইস্কার। তার মুখে হাসি। চোখে জল। গতকাল বৈক্লন্যের নিষ্ঠুর মৃত্যুদণ্ড দেখবার পর, মাণ্ডুপের আশা একরকম ছেড়ে দিয়েছিল সে। কিন্তু আজ সকালে ওই ভিনদেশি এসে এ কোন খবর দিয়ে গেল তাকে! 

ভিনদেশির দিয়ে যাওয়া পেটিকাটা তার সামনে খোলা পড়ে আছে। তা থেকে বের হয়ে ছড়িয়ে যাওয়া লাল নীল পাথরগুলো ইস্কার অপরিচিত নয়। তার দেয়া পুঁতি বিক্রির দাম! হাঃ! মহামূল্যবান এই পাথরদের দিয়ে আমহিরি নগরীর অর্ধেকটা কিনে নেয়া যায়! 

বাজারের মধ্যে তার এই পুঁতির কারখানার একপাশেই এখন ইস্কার ঘরসংসার। গত গ্রীষ্মে মা চলে গেল। বাড়িটাতে আর মন টিকল না তাই। সেটা ছেড়ে দিয়ে এখন এই দোকানেই এসে উঠেছে সে। সারাটা দিন পুঁতি গড়বার কাজ। বিকিকিনি। রাতে সামান্য রান্নাখাওয়া সেরে দোকানেরই একটেরেতেই ঘুমিয়ে থাকা। একলা মানুষ। এর বেশি আর কী-ই বা দরকার তার! 

তা, আগের দিন রাতটা প্রায় জেগেই কাটাবার পর ভোররাতের দিকে যখন চোখদুটো একটু লেগে এসেছে ঠিক তখন তার কারখানার দোরে টোকা পড়ল। ইস্কা একটু অবাক হয়েই দরজা খুলেছিল এসে। এই শেষরাত্রে তো কোনো খরিদ্দারের আসবার কথা নয়! 

দরজা খুলতে সেখানে এসে দাঁড়ানো লোকটা বেশ খানিকক্ষণ তাকে মনোযোগ দিয়ে দেখল। তারপর বলল, “আ… আপনি ইস্কা?”

ইস্কা সংশয়াকূল চোখে দেখেছিল মানুষটাকে। আগের দিন আমহিরি শহরে যা ঘটে গিয়েছে তার পর রাতের অন্ধকারে কোনো অচেনা মানুষ এসে যদি দরজায় কড়া নাড়ে, ও তার নাম ধরে সম্বোধন করে তবে তাতে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। একলা মেয়ে সে। বিপদ-আপদ হলে পাশে দাঁড়াবে এমন কেউ তো নেই। যে ছিল সে-ও তো…

লোকটা অধৈর্যভাবে তার মুখের দিকে দেখেছিল খানিকক্ষণ। তারপর ফের প্রশ্ন করেছিল, “আপনি কি ইস্কা? জবাব দিন।”

এইবার মাথা নেড়েছিল ইস্কা। তারপর দ্বিধাজড়ানো গলায় প্রশ্ন করেছিল, “তুমি আমার নাম…”

তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মানুষটা সতর্ক চোখে চারপাশে তাকিয়ে দেখে নিয়েছিল একবার। তারপর নীচুগলায় প্রশ্ন করেছিল, “ঘরে দ্বিতীয় কোনো মানুষ নেই তো? এইখানে আমরা অন্য মানুষের দৃষ্টি বা শ্রুতির বাইরে তো?”

প্রশ্নটা শুনে ভয় পেয়েছিল ইস্কা। সে মুহূর্তে সত্যিই সে একা। ত্রিসীমানায় দ্বিতীয় কোনো মানুষছিল না তার। তবে ভয়টা মুখে প্রকাশ না করে সে বলেছিল, “না কেউ নেই। তবে জেনে রেখো আমি আত্মরক্ষায় সক্ষম। তাছাড়া তুমি কোনো অসদাচরণ করলে একটিমাত্র চিৎকারে নদীতীরের নৌকাদের মাঝিমাল্লারা জেগে উঠবে,” বলতে বলতে সে সামনে খানিক দূরে কুয়াশাচ্ছন্ন ইন্দাতীরের দিকে দেখিয়ে দিয়েছিল। সেখানে কুয়াশার ভেতরে ইতিউতি দুলন্ত আলোগুলো ঘাটে বাঁধা জলযানদের উপস্থিতির ইশারা দিচ্ছিল। 

মানুষটা জবাবে ভীত গলায় বলল, “আমার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই মাননীয়া ইস্কা। মহান গোলকদেবতার আদেশে একটি বার্তা ও কিছু উপহার আপনাকে পৌঁছে দিতে এসেছি আমি।  আমার ওপর নির্দেশ ছিল, আপনার কাছে আমার আসবার তৃতীয় কোনো সাক্ষি যেন না থাকে। তাই এই সাবধানতা। আমার নৌকা এইমাত্র আমহিরির ঘাটে নোঙর করেছে। তারপর তিলমাত্র বিলম্ব না করে আমি আপনার কাছে এসে উপস্থিত হয়েছি।  কর্তব্য সমাধা করে আমি আমহিরি ছেড়ে চলে যাব।” 

কথাটা শুনে অজানা আশা ও আশঙ্কায় বুক দুরদুর করে উঠেছিল ইস্কার। গোলকদেবতার বার্তা… তার জন্য…কিন্তু পরক্ষণেই নিজের উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রণে এনে শান্ত গলায় সে বলেছিল, “তাঁর বার্তাটি বলুন ভদ্র।”

জবাবে মানুষটা গড়গড় করে ওই কবিতাটা পাঠ করে চলল। গোটা ব্যাপারটা এতই অদ্ভুত যে খানিকটা কিংকর্তব্যংবিমূঢ় হয়েই  চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল ইস্কা। আর তার পরেই, কবিতা শেষ করে মানুষটা যা করল, তাতে, যেন আকাশের বিদ্যুৎ নেমে এসে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল তাকে! আলখাল্লার ভেতর থেকে ছোটো একটা পেটিকা বের করে তার হাতে ধরিয়ে দিল সে। তারপর বলল, “আপনার পাঠানো পুঁতি বিক্রয় করে যা আয় হয়েছে তা, হিরআম নগরীর  সৈনিক পদুন্মা আমার হাতে পাঠিয়েছেন।”

হিরআম নগরীর পদুন্মা… শব্দ তিনটে মুহূর্তে একটা তোলপাড় ঘটিয়ে দিয়ে গিয়েছিল ইস্কার মাথায়। সহজ ধাঁধা। যে জানবে তার কাছে জলের মতো সরল। গোলকদেবতা নয়। এই বার্তা ও  উপহার তাকে পাঠিয়েছে আমহিরি নগরীর মান্ডুপ… কিন্তু অন্যের কাছে একেবারেই অপরিচিত থাকবে এর কূট অর্থ… 

হাতের পেটিকাটা শক্ত করে চেপে ধরেছিল সে। মান্ডুপ! পলাতক মাণ্ডুপ… তাকে কিছু একটা গোপন সংবাদ পাঠাচ্ছে সে এই বিদেশীর মাধ্যমে… 

***

অথচ গত পরশু অবধি তার জীবনটা কত অন্যরকমই না ছিল! সে জানত ঈশ্বর দোরাদাবুর সেবায় নিয়োজিত রয়েছে মাণ্ডুপ। ম্‌হিরিবিজয়ী বীর মাণ্ডুপ। সে জানত, উপযুক্ত সময় হলেই সে ফিরে আসবে আমহিরি শহরে, ফিরে আসবে তার কাছে। তেমন কথাই তো দিয়ে গিয়েছিল সে তার দীর্ঘ যাত্রায় বের হবার আগে… “আমি ফিরে আসবই। দেখে নিস।” দুখিনী ইস্কা সেই কথাগুলোকে বুকের ভেতর মূল্যবান রত্নের মতোই জমিয়ে রেখেছে আজও।  আর তারপর… গতকাল…

দুপুরবেলায় বাজার তখন জমজমাট। নদীর ঘাটে ব্যাপারীদের দূরগামী বহিত্র, যাত্রীবাহী নৌকা আর জেলেদের পানসির ভিড়। ঘাট পেরিয়ে আমহিরির বাজারে হাজারো জিনিসের লেনদেন চলছে। এরই মধ্যে বাজিকররা খেলা দেখাচ্ছে কোথাও, কোথাও বা জমে উঠেছে ভ্রাম্যমাণ নর্তকদলের গানবাজনার আসর। ঠিক এমন সময় হঠাৎ বাতাসে ঢাকের শব্দ বেজে উঠেছিল… ডুম… ডুম… ডুম…

মন্দিরসেনার কুচ-এর আওয়াজ! সেই শব্দ পেয়ে হঠাৎ করেই নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিল আমহিরির বাজার। তারপর সশঙ্ক চোখে তারা দেখেছিল, মন্দিরদুর্গ থেকে মন্দিরসেনার একটা ছোটো দল কুচ করতে করতে এগিয়ে আসছে বাজারের দিকে। তারপর, বাজার পেরিয়ে সৈনিকের দলটা এগিয়ে চলে গিয়েছিল শহরের বসতি এলাকার দিকে। 

সেদিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে মাথা নেড়েছিল বাজারে আসা মানুষজন। মন্দিরসেনারা যখন এভাবে কুচ করে বসতির দিকে যায়, তখন সেখানে কারো ওপরে গোলকদেবতার কোপদৃষ্টি পড়েছে তা ধরে নেয়া যায়। মাথা নেড়েছিল ইস্কাও। একদিন তার বাড়িতেও তো এইভাবেই কুচ করে হাজির হয়েছিল মন্দিরসেনারা! বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে, তার বাবাকে…

এবং এযাত্রাও তার অন্যথা হল না। খানিক পরেই শহরের মধ্যে থেকে আকাশের দিকে লাফিয়ে উঠেছিল লেলিহান আগুনের শিখা। আর তারপর ফের শব্দ উঠেছিল ডুম…ডুম…ডুম…

খানিক বাদে বাজারের লোকজন সভয়ে দেখেছিল, কুচ করতে করতে ফিরে আসা মন্দিরসেনারা ব্রোঞ্জের মোটা শেকলে বেঁধে হিঁচড়ে টেনে আনছে স্বয়ং বৈক্লন্যকে… 

দৃশ্যটা বিস্ময় আর ভয়ের একটা শিহরণ ছড়িয়ে দিয়েছিল গোটা বাজার জুড়ে। সেনাপতি বৈক্লন্য! দোরাদাবুর সেবক, মঞ্জাদাহিরের বিখ্যাত সেনাপতি। অবসরজীবনেও আমহিরির মন্দিরদুর্গের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি সম্মানিত অতিথি হিসেবে নিমন্ত্রিত হন। অথচ তাঁকে…

কোন অপরাধে তাঁর এহেন দুর্দশা সে খবর অবশ্য সামান্য বাদেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল সকলের কাছে। পরিষ্কার করে দিয়েছিল সেনাবাহিনীর আগে আগে হেঁটে চলা ঘোষকের কথাগুলোই…

“নগরবাসীদের অবগতির জন্য জানানো হচ্ছে, ঈশ্বরবিরোধী দানব মাণ্ডুপ স্বয়ং দোরাদাবুর অর্থভাণ্ডার থেকে চুরির মতো ঘৃণিত পাপে দোষী। পলাতক এই মহাপাপীর অনুসন্ধান চলছে। শীঘ্রই সে ধরা পড়ে তার পাপের শাস্তি পাবে স্বয়ং দোরাদাবুর কাছে। ইতিমধ্যে, বণিক সৌগম ও এক বন্যনারীর সন্তান এই দানব মাণ্ডুপকে পালন করবার পাপের উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হল বৈক্লন্যর পরিবারকে। তার বাসগৃহকে পরিবারসহ অগ্নিশুদ্ধ করার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। 

“বৈক্লন্যের অপরাধ আরও গুরুতর। কেবল এই দানবকে আশ্রয় দেয়া ও পুত্রবত পালনই নয়, সেইসঙ্গে মাণ্ডুপের সঙ্গে একত্রে ঈশ্বর দোরাদাবুর সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র লিপ্ত ছিল এই পাপী। তার প্রত্যক্ষ, লিখিত প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। আমহিরির শাসক সন্তানগোলক তাই স্বয়ং বৈক্লন্যের শাস্তির ভার গ্রহণ করেছেন। আজ সূর্যাস্তের পর তিনি এই পাপীকে তার শাস্তিপ্রদান করবেন। সেই মহতি অনুষ্ঠানে আমহিরির প্রত্যেক নাগরিকের উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক।” 

তারপর, সূর্যাস্ত হলে সারি সারি মশালের আলোয় সাজানো হয়েছিল সন্তানগোলকের গর্ভগৃহ ও তার চারপাশ। পুরোহিতদের মন্ত্রধ্বনির মধ্যে ঘাসে বোনা শক্ত দড়িতে বাঁধা বৈক্লন্যকে সন্তানগোলকের সুরক্ষাবলয়ের একেবারে সামনে এনে দাঁড় করানো হয়েছিল। বড়ো অসহায় ও করুণ দেখাচ্ছিল বৈক্লন্যকে। শিকারীর সামনে অসহায় বন্যপশুর মতো দৃষ্টিতে সে চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখছিল। সেখানে জমা হওয়া জনতার গলায় তখন ক্রুদ্ধ গর্জন উঠেছে। ঈশ্বরের শত্রুর শাস্তি চায় তারা। 

মন্দিরসেনারা পাহারায় ছিল। উপস্থিত ছিলেন আমহিরির প্রধান পুরোহিত মিসারা তাগান নিজেও। বৈক্লন্যের ঘনিষ্ট বন্ধু তিনি। কিন্তু সেই মুহূর্তে তাঁর পাথর কঠিন মুখে দয়ার কোনো চিহ্ন ছিল না। ঈশ্বরের শত্রুকে দয়া করে কে আর নিজেকে বিপন্ন করতে চায়! 

সৈন্যরা অস্ত্র তোলেনি। তারা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিল, সমবেত জনতার হাত থেকে উড়ে আসা ইট কাঠ পাথরের টুকরোর আঘাতে রক্তাক্ত হতে হতে একসময় সন্তানগোলকের সুরক্ষাবলয়ের ভেতরে বৈক্লন্যের আছড়ে পড়া। তারপর হঠাৎ করেই হতভাগ্য বৃদ্ধের গলা থেকে উঠে আসা রক্ত জল করা চিৎকারটা বুঝিয়ে দিয়েছিল, সন্তানগোলকের মানসিক আক্রমণ তার মস্তিষ্ককে প্রথম আঘাতটা করেছে। এ আঘাত শারীরিক যন্ত্রণা দেয় না। কেবল, এক অস্বাভাবিক, অপার্থিব আতঙ্কের অনুভূতি তৈরি করে মনে। অহেতুক, অসহনীয় সেই ভয়ের আঘাত সহস্র চাবুকের আঘাতের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। প্রয়োজনে এর তীব্রতা বাড়িয়ে মুহূর্তে অপরাধীর প্রাণ নিতে পারেন দোরাদাবু বা তাঁর যেকোনো সন্তানগোলক। কিন্তু কাল সন্তানগোলকের সে উদ্দেশ্য ছিল না। এরপর প্রায় এক প্রহর সময় ধরে আঘাতের পর আঘাতে বৈক্লন্যের মনকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে অবশেষে যখন চরম আঘাত হানলেন তিনি, ততক্ষণে বৈক্লন্যের মধ্যে মানবিক চেতনার সামান্যতম চিহ্নও আর অবশিষ্ট ছিল না। মনহীন, চৈতন্যহীন একটা পশুর মতই সন্তানগোলকের সামনে ইটের মেঝেতে আছাড়িপিছাড়ি খেতে খেতে হঠাৎ একটা দীর্ঘ মর্মভেদী চিৎকার করে থেমে গিয়েছিল শরীরটা…

বৈক্লন্যের পরিবার সৌভাগ্যবান। অগ্নিদেব তাঁদের খেয়েছেন। বৈক্লন্যের অবশ্য সে সৌভাগ্য হয়নি। তার মৃতদেহকে এনে একটা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে বাজারের মাঝখানে। তীব্র বিকারে ও খিঁচুনিতে বিকৃত হয়ে যাওয়া মুখ, ঠেলে বের হয়ে আসা চোখ ও  ঝুলে পড়া জিভ নিয়ে তার বিকৃত হয়ে ওঠা অষ্টাবক্র শরীর, ঈশ্বরের বিরুদ্ধাচরণের শাস্তির মূর্তিমান উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আজ সূর্যোদয়ের পর তাকে ঘিরে মৃতভোজী শকুনদের ভিড় জমবে। ধারালো ঠোঁটে তারা ছিঁড়ে আনবে তার চোখ, মেদমজ্জা, অন্ত্র। এ ভোজ তাদের বেশ কয়েকদিন ধরে চলবে…

মৃত্যু উৎসবের শেষে ঘরে ফিরে এসে কাল দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি ইস্কা। না। বৈক্লন্য বা তার পরিবারের শাস্তির ভয়াবহতা তাকে কাতর করেনি। জ্ঞান হয়ে ইস্তক কতবারই তো সন্তানগোলকের এহেন শাস্তিদানের সাক্ষি থেকেছে সে; থেকেছে এ-শহরের সব বাসিন্দাই। সেটাই আইন। কিন্তু, ঘুম আসেনি তার মাণ্ডুপের কথা ভেবে। সেও কি ধরা পড়বে? অথবা… ইতিমধ্যেই হয়তো আজকের এই রাত্রিবেলাতেই… মঞ্জাদাহির, কিংবা জুর্জাদাহির, বা কট্টাদিজা অথবা উত্তরপশ্চিমের এমনই অন্য কোনো শহরে… ব্রোঞ্জের শেকলে বাঁধা মাণ্ডুপ… তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মঞ্জাদাহিরের মন্দিরদুর্গে… সেখানে স্বয়ং দোরাদাবুর গর্ভগৃহের সামনে… আজ… কিংবা হয়তো আগামীকাল…কিংবা তার পরদিন…

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে জাগ্রত অবস্থাতেই যেন দুঃস্বপ্ন দেখে বারংবার উঠে বসেছে সে। কখনও বা দরজা খুলে বাইরে পা দিয়েই সেখানে খঁটিতে ঝুলন্ত বৈক্লন্যের বিকৃত শরীর থেকে ঠেলে বের হয়ে আসা চোখদুটোর দিকে নজর পড়তে শিউরে উঠে ফের ঢুকে এসেছে তার ঘরটির ভেতরে…

আর তারপর, রাত শেষ হবার আগেই ভিনদেশি এই পথিক এসে…

বার বার বড়ো বড়ো শ্বাস টেনে সে তার বুকের কাঁপুনিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। মাণ্ডুপ বেঁচে আছে… গোলকদেবতার ভয়ানক ক্রোধ, ইন্দাতীরের প্রতিটি নগরীতে তার জন্য মন্দিরসেনাদের চূড়ান্ত সতর্কতা  এই সবকিছু সত্ত্বেও সে গোপনে তাকে বার্তা পাঠিয়েছে… সাঙ্কেতিক ভাষায়… 

কবিতাটাকে ফের একবার মনে মনে উচ্চারণ করল ইস্কা। এইবার… ধীরে ধীরে তার ইঙ্গিতগুলো পরিষ্কার হয়ে আসছে তার কাছে। একমাত্র আমহিরি নগরীতে দাঁড়িয়ে, এ নগরের ভূগোল যে জানে তেমন কোনো মানুষ এর অর্থভেদ করতে পারবে। উত্তর ও পশ্চিমের মাঝখানে দিয়ে… তার মানে আমহিরি নগরীর উত্তর-পশ্চিমের পথ ধরে… যে পথে সুম্ভের পণ্যবাহিনীর সঙ্গে মাণ্ডুপ রওনা হয়েছিল আমহিরি ছেড়ে, সেই উত্তরপশ্চিমের বাণিজ্যপথের কথা বলছে মাণ্ডুপ। সেই পথ ধরে তিন দিনের যাত্রা… 

বেনের মেয়ে ইস্কা। নিজে কখনও না গেলেও এই বাণিজ্যপথের কথা তার অজানা নয়। এ পথে তিন দিন যাত্রার পর এক গভীর অরণ্য ও বিশাল তৃণভূমি পড়ে। সেই বুনো  এলাকায় তাকে যেতে বলছে মাণ্ডুপ। সে এলাকায় পশুপালকদের বাস। সেইখানে ঘেরাউন নামে কোনো মানুষের আশ্রয়ে তাকে চলে যাবার কথা বলেছে সে। 

বলেছে, সেখানে গিয়ে পৌঁছোতে পারলে পরম সখা মিলবে। পরম সখা… এ-ও এক কূট সঙ্কেত বইকি। একমাত্র ইস্কার কানে এলে তবেই ‘পরম সখা’র সঠিক অর্থভেদ হতে পারবে। ইস্কা-র পরম সখা… মাণ্ডুপ? কিন্তু ওই বুনো এলাকায়… 

হঠাৎ মুখে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল ইস্কার। হিসেবটা মিলে যাচ্ছে। কারণ, ইস্কা শুনেছে, ওই পশুচারকেরা হিংস্র, আদিম, শুনেছে মহান দোরাদাবুর শাসন তাদের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েনি কখনও। ঈশ্বরের আশীর্বাদে বঞ্চিত থাকবার ফলে এখনও আদিম,বন্য জীবনে রয়ে গেছে তারা তাই। আসলে ইন্দাতীরের শহরগুলোর বাইরে বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও সেই আদিম রয়ে গিয়েছে। এখনো সেসব অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকার বন্য বাসিন্দারা দোরাদাবুর কৃপায় বঞ্চিত। তাঁর ক্রোধ যে অর্জন করেছে তেমন মানুষের পক্ষে এইরকম কোনো এলাকায় আত্মগোপন করাই তো যুক্তিযুক্ত কাজ!

এবং, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। একা। ছদ্মবেশে। নির্দেশ পালনে সামান্যতম ত্রুটি হলে অসীম দুঃখ আছে ভাগ্যে… এই সাবধানবাণীও রয়েছে ওই বার্তায়। ইস্কা গা ঝাড়া দিয়ে উঠল।  দূরদর্শী মাণ্ডুপ। সঠিক সাবধানবাণীই দিয়েছে সে। মাণ্ডুপের সঙ্গে ইস্কার ঘনিষ্টতা ছিল। কালকের পর তার ঘনিষ্ট কোনো মানুষ আর একমুহূর্তের জন্যও নিরাপদ নয় ইন্দাতীরের কোনো শহরে। 

তবে, সামান্য প্রস্তুতি নিতে হবে বইকি। ঘরে ঢুকে উনুনে কাঠ দিল সে। পাশে সাজিয়ে রাখল চকমকি ও নারকেলের আঁশ।  তারপর দ্রুতহাতে কিছু সবজি কুটে উনুনের সামনে থালায় সাজিয়ে রাখল। পাথরের পাত্রে গোধুমচূর্ণ মেখে পিণ্ডাকারে রেখে একটা মাটির পাত্র চাপা দিয়ে রাখল তার ওপরে। তেল নুন ও মশলার মৃৎপাত্রগুলোকে সযত্নে সাজিয়ে রাখল যাতে দেখলে মনে হবে এখুনি রান্না শুরু হবে। তারপর বড়োমুখ মাটির একটা কলসিতে কয়েকটা জামাকাপড়, কিছু শুকনো পিঠে ও মাণ্ডুপের পাঠানো রত্নগুলো ঢেলে নিয়ে, একটা মোটা চাদর গায়ে দিয়ে কলসিটি মাথায় নিয়ে নেমে এল পথে। পুব আকাশে তখন সবে প্রথম আলোর ছোঁয়া লেগেছে। 

***

সেদিন সূর্যোদয়ের পর ইস্কার সখী মিল্লো এসে উঁকি দিয়েছিল ইস্কার ঘরে। দেখেছিল, সেখানে রান্নার উপকরণ সাজিয়ে রাখা রয়েছে। জলের কলসিটি কেবল যথাস্থানে নেই দেখে সে বুঝেছিল তার সখী ইন্দায় স্নানে গিয়েছে। স্নানান্তে নদী থেকে পানীয় জল ও ঘাটে এসে পৌঁছানো জেলেদের থেকে একটি মাছ হয়তো সংগ্রহ করে নিয়ে ফিরবে সে। কাজেই নিশ্চিন্ত হয়ে ফিরে গিয়েছিল মিল্লো। তারপর এক প্রহর বেলায় স্নান ও শৃঙ্গার সেরে নিজের দোকান খুলতে এসে ফের ইস্কার ঘরে উঁকি দিয়ে তাকে না দেখে একটু উদ্বিগ্ন হয়েছিল সে। কিন্তু মনকে প্রবোধ দিয়েছিল এই বলে যে সখী হয়তো অন্যত্র কোনো কাজে গিয়েছে। ফিরবে যথাসময়ে। 

অবশেষে সন্ধ্যাবেলা ফের ইস্কার দোকানে এসে যখন সে দেখেছিল সে ফেরেনি, দেখেছিল, কাটা সবজি শুকিয়ে উঠেছে, গোধুমচূর্ণের থালায় রাস্তার কুকুর মুখ দিয়ে গিয়েছে তখন সে চিন্তিত হয়ে কথটা অন্যদের জানিয়েছিল, কিন্তু কেউ তাতে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। কেউ কেউ বলেছিল, আগের রাতে তারা নদীতীর থেকে একজন পুরুষকে বাজারের ভেতরে ঢুকে আসতে দেখেছিল। আবার দু’একজন এ-ও বলেছিল যে, এরপর খুব ভোরে তারা ইস্কাকে ঘর ছেড়ে বের হয়ে নদীর দিকে চলে যেতে দেখেছে। এইসব কথা শুনে অনেকেই বলেছিল, যুবতী মেয়ে, একলা একলা আর কতকাল থাকবে? হয়তো সে কোনো ভিনদেশী নাবিকের সঙ্গে ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছে। অনেক মেয়েই তো এভাবে চলে যায়। 

মিল্লো শুনে একটু কেঁদেছিল। সে কান্না যতটা না ইস্কার চলে যাবার দুঃখে তার চেয়ে অনেক বেশি এই ভেবে যে তার সখী কেমন তাকে না জানিয়ে ভিনদেশী কোনো নাবিকের সঙ্গে ঘর বাঁধতে চলে গেল! এতে যেকোনো মেয়ের হিংসা হওয়া স্বাভাবিক।

আর, তাদের অজান্তে তখন আমহিরির থেকে বের হয়ে উত্তর-পশ্চিমদিকে এগিয়ে যাওয়া পথ ধরে দ্রুতপায়ে এগিয়ে চলেছে সেই পলাতক তরুণী। শহরের চৌহদ্দি থেকে বের হয়ে সে রাস্তা ছেড়ে তার পাশে ইন্দা-র ঢালের মধ্যে নেমে গিয়েছিল। এখানে জঙ্গলের আড়াল আছে। একপাশে ইন্দা ও অন্যপাশে বাণিজ্যপথ থাকায় পথ ভুল হবারও সম্ভাবনা নেই কোনো। 

জঙ্গলে ঢুকে সে কলসিটা আছাড় মেরে ভেঙেছিল প্রথমে। তারপর তার ভেতর থেকে রত্নগুলো কোমরে বেঁধে নিয়েছিল। গোটাদুয়েক শুকনো পিঠে খেয়ে ইন্দার ধারে নেমে পেট ভরে জল খেয়েছিল। তারপর ঢালের জঙ্গলের আড়ালে ফিরে গিয়ে  খাবার ও পোশাকগুলো চাদরে মুড়ে একটা পুঁটুলি বেঁধে, একটা লম্বা ডালের মাথায় তা ঝুলিয়ে, ডালটা কাঁধে নিয়ে লম্বা লম্বা পায়ে রওনা দিয়েছিল উত্তর-পশ্চিম মুখে…

***

বসন্তের শুরু। এখানে দিগন্তবিস্তৃত ঘাসবনে হলুদের ছোঁয়া লেগেছে। নির্জন দুপুরে তার বুকে ঢেউ তুলে শনশন করে উত্তরের হাওয়া বয়ে যায়। অনতিদূর দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদীটির জলে তা পোশাকের ভাঁজের মতো নকশা গড়ে তোলে। নদীর নাম লোনা। বিস্তীর্ণ এই তৃণভূমি ও অরণ্যের কোনো ঝিল থেকে তার জন্ম। এ জায়গার পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে গিয়ে সে হারিয়ে গিয়েছে দখিণে ঘাসবনের ভেতরে। মাণ্ডুপ শুনেছে সে নাকি আমহিরি নগরীর খানিক দক্ষিণে  ইন্দায় গিয়ে মেশে। এই তৃণভূমির বুক দিয়ে শিরা উপশিরার মত বয়ে যাওয়া ছোটো ছোটো এমন অনেক নদীই রয়েছে। তাদের সবারই শেষ গন্তব্য ও নদীসাম্রাজ্ঞি ইন্দা। হাওয়ার শনশন শব্দের সঙ্গে মিশে যায় লোনার মৃদু ছলছল শব্দ, পালিত পশুদের ডাক, মিশে যায় তাদের গলায় বাঁধা ঘণ্টার মিঠে টুংটাং। শুকিয়ে ওঠা ঘাসের সুঘ্রাণ মিশে যায় বুনো ফুলের গন্ধের সঙ্গে…

বড়ো ভালো লাগে মাণ্ডুপের। বিরাট পলাশ গাছটার নীচে শুয়ে এই দৃশ্য, শব্দ বর্ণ আর গন্ধকে যেন সর্বাঙ্গ দিয়ে শুষে নেই সে। এইখানে পুরু ঘাসের একটা শয্যা বানিয়ে দেয়া হয়েছে তার জন্য।  বনজ জড়িবুটির ঔষধ তাকে অনেকই দিচ্ছেন মাতা দিবিয়া। তার কোনোটি পেয়, কোনোটি বা ঘায়ে লাগাবার প্রলেপ, কিছু কিছু আবার অগ্নিদগ্ধ করে তার ধোঁয়া টেনে নিতে হয় বুক ভরে।  কিন্তু দিবিয়া বলেন, তার রোগের  আসল ঔষধ এই বিশ্রাম। এতেই সে সুস্থ হয়ে উঠবে। আজকাল সে কথায় বিশ্বাস করবার ইচ্ছে যায় মাণ্ডুপের। সত্যিসত্যিই অনেকটা সেরে উঠেছে সে গত কয়েক দিনে। কোমরের ঘায়ের যন্ত্রণা একটু কম। যদিও তা শুকোবার লক্ষণ নেই এখনো। তবে সামান্য টান ধরেছে বইকি তাতে! 

ক’দিন আগে যখন সে এসে পৌঁছেছিল এখানে, তখন একরকম মৃত্যুর দরজায় ছিল মাণ্ডুপ। এখান অবধি পৌঁছোতে যে পেরেছিল সে, তা নিতান্তই ভাগ্যের কৃপায়। ভাগ্য, এবং নিস্ত্রা।  মাণ্ডুপ বড়ো কৃতজ্ঞ, ওই নিস্ত্রা নামের ছোট্ট মেয়ের কাছে। সে নইলে…

…এই ঘন সবুজ তৃণভূমি আস্তে আস্তে ফ্যাকাশে হতে হতে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে নিষ্প্রাণ আধামরু এলাকার সঙ্গে গিয়ে মিশেছে। কিছু দুঃসাহসী উটপালক যাযাবর পরিবার ছাড়া সে এলাকায় এখানকার আর কোনো পশুচারক যেতে সাহস করে না। তেমনই একটি পরিবার দিনকয়েক আগে উত্তরে ব্রিসখাম নামে এক শুকনো নদীখাতের পাশে মাণ্ডুপকে খুঁজে পায়। তখন তার শরীর কংকালসার। কোমরের কাছে একটা কুৎসিত ঘা। তাতে পচন ধরেছে।  ফুটিফাটা মাটির বুকে গজিয়ে ওঠা একটা কাঁটাঝোপের পাশে উপুড় হয়ে পড়েছিল সে। যেন নিষ্প্রাণ, রোদপোড়া জমির বুকে ওই একমাত্র দ্বিতীয় প্রাণটার সঙ্গটুকু চাইছিল সে মরবার আগে। 

প্রথমে তাকে মৃতদেহই মনে করেছিল পরিবারটা। এতে উৎসাহিত হয়েছিল তারা। যে গেছে সে তো আর ফিরবে না! কিন্তু তার সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র জীবিতদের কাজে আসবে। তৃণভূমির উত্তরে আধামরুসংলগ্ন এই বুনো এলাকায় সেটাই রীতি। কাজেই, মৃতদেহ থেকে তার পোশাক-আসাক আর অস্ত্রশস্ত্রগুলো সরিয়ে আনবার জন্য তার কাছে এসে বসেছিল পরিবারের মহিলাটি ও তাঁর শিশু সন্তান। এই সময়, নিস্ত্রা নামের এই ছোট্ট মেয়েটাই প্রথম বলে, মানুষটা সম্ভবত মরেনি। জীবনের উপস্থিতি বয়স্কদের তুলনায় শিশুরা অনেক তীক্ষ্ণভাবে টের পায়। 

কথাটা তার মা প্রথমে বিশ্বাস করেননি। করেননি পরিবারের কর্তাও। কিন্তু এরপর শিশুটির জেদ-এ একান্ত বাধ্য হয়েই তিনি মানুষটার নাকের কাছে তাঁর ভল্লের চকচকে ফলাটা বাড়িয়ে ধরেছিলেন ও আশ্চর্য হয়ে দেখেছিলেন তাতে সামান্য বাষ্প জমেছে। 

এরপর এই পরিবারটির যত্নেই মাণ্ডুপের জ্ঞান ফিরেছিল। চোখ খুলে, দুর্বল গলায় সে, তাকে ঘিরে থাকা মানুষগুলোকে ঘেরাউন-এর নাম বলেছিল। বলেছিল, যত দ্রুত সম্ভব ঘেরাউনের কাছে তার পৌঁছানো প্রয়োজন। 

পরিবারটা ঘেরাউনকে চিনত। তৃণভূমিতে কোনো রাজা নেই। সে অর্থে কোনো শাসক নেই এখানকার পশুপালক যাযাবরদের। এখানে প্রতিটি পরিবারই তাদের পশুদল নিয়ে স্বাধীন। কিন্তু তবু, তাদের মধ্যে ঘেরাউন এক সমীহ উদ্রেককারী নাম ছিল। তার অধীন পশুদল তৃণভূমিতে সবচেয়ে বড়ো। অন্যের বিপদে-আপদে সে সর্বদাই এগিয়ে আসে এবং যাযাবর সমাজে কেউ তার কাছে কোনো অবিচারের অভিযোগ নিয়ে এলে সে কঠোরভাবে তার প্রতিকারও করে। অতএব এরপর তারা আর দেরি করেনি। প্রাথমিক শুশ্রূষার পর মাণ্ডুপ খানিক সুস্থ হতে তাকে উটের পিঠে চাপিয়ে পরিবারের পুরুষটি দক্ষিণদিকে রওয়ানা হয়ে যায়। স্ত্রীলোকটিকে তার শিশুকন্যা ও  পশুদের নিয়ে সেখানেই থেকে গিয়েছিল। 

এখানে এসে পৌঁছোবার পর তার চিকিৎসার ভার নিয়েছিলেন ঘেরাউনের মা দিবিয়া। অতিবৃদ্ধা এই মহিলা একজন ভিষগ। তৃণভূমির প্রতিটি বৃক্ষলতা, বীরুত ও ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ তাঁর চেনা। এদের প্রতিটির ঔষধি গুণাগুণ তিনি জানেন। এরই পাশাপাশি মানুষ ও পশুর বিভিন্ন রোগ ও তার নিরাময়ের প্রক্রিয়াও তাঁর অধিগত। সে নিরাময়ে ভেষজ ঔষদের পাশাপাশি অন্যান্য কৌশলেও তিনি সিদ্ধসস্ত…যথা ক্ষিপ্ত অপদেবতাদের ক্রোধ শান্ত করে কিংবা রোগীর দেহকে অধিকার করে বসা কোনো প্রেতাত্মাকে দূর করে রোগের উপশম করা। মাণ্ডুপকে পরীক্ষা করে তিনি ঘেরাউনকে আড়ালে ডেকে বলেছিলেন, এই যুবক কেবল পথশ্রমে অসুস্থ নয়। এর দেহের গভীরে কোনো অজানা অসুখ বাসা বেধেছে। তা শারীরিক হতে পারে, আবার কোনো দেবতার রোষের ফলও হতে পারে। এযাত্রা তিনি হয়তো একে সুস্থ করে তুলবেন, তাঁর ওষুধে এর স্বাস্থ্যও ফিরে আসবে, কিন্তু  যে অজানা রোগ এর তন্ত্রীতে বাসা বেধেছে তার প্রতিকার করা তাঁর জ্ঞানের বাইরে। 

কথাগুলো ঘেরাউন মাণ্ডুপের কাছ থেকে লুকোয়নি।  এসে পৌঁছোবার দিনদুয়েক বাদে মাণ্ডুপ খানিক সুস্থ হয়ে উঠতে ঘেরাউন তাকে দিবিয়ার কথাগুলো বলতে সে মৃদু হেসে বলেছিল, দেবতা নয়, তবে মনরাক্ষসের রোষ তাকে এইখানে এনে ফেলেছে। এরপর সমস্ত কথাই ঘেরাউনকে খুলে বলেছিল মাণ্ডুপ। তার মনে হয়েছিল,  এখানে আশ্রয় পেতে চাইলে এই শক্তিমান, সৎ ও সরল মানুষটার কাছে কোনো কথা গোপন করা চলবে না।  তার ভেতরে যে অসুস্থতার সন্ধান দিবিয়া অনুমান করেছেন সে অসুখের সম্ভাব্য কারণও জানিয়েছিল মাণ্ডুপ। সীসার পাতে মোড়ানো ইফ্রাত নদীকূলের সেই পাথরের টুকরোকে নিয়ে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিল ঘেরাউন। বিষাক্ত এই পাথরের আর কোনো প্রয়োজন হবে না এইখানে। 

এবং ইস্কা। আগের বার যখন ঘেরাউনের এলাকায় পা দিয়েছিল কিশোর যোদ্ধা মাণ্ডুপ, তখন সে সদ্য ইস্কাকে ছেড়ে এসেছে। আগুনের ধারে তাদের সান্ধ্য আসরে বসে সে তখন ইস্কার কথা বলেছিল ঘেরাউন ও তার স্ত্রী মাস্তালকে।  এযাত্রা ঘেরাউনকে তার বিপদের বিবরণ দেবার পর সে ইস্কার কথাও বলেছে। বলেছে কীভাবে তাকে বার্তা পাঠিয়ে আমহিরি নগরী থেকে এইখানে ডেকে পাঠিয়েছে সে।

সব শুনে, মাণ্ডুপের খবর পাঠানো, সে খবর আমহিরিতে পৌঁছানো, মাণ্ডুপের তৃণভূমিতে পৌঁছাতে ব্যয় হওয়া সময়, এই সবকিছুর হিসাব কষে মাণ্ডুপ ও ঘেরাউন সিদ্ধান্তে পৌছেছিল, পরিকল্পনামাফিক কাজ যদি ইস্কা করে থাকে তবে তৃণভূমিতে পৌঁছোতে তার দেরি নেই আর। আজ দিন দুয়েক হল মাণ্ডুপ তাই সামান্য উদ্বিগ্ন আছে। এখনও তো এসে পৌছোলো না সে! একলা মানুষ! এই বুনো, অজানা  এলাকায়… আর তার চাইতেও বড়ো ভয়, যদি বুনো এলাকার নিরাপত্তায় পৌঁছোবার আগেই আমহিরির সন্তানগোলক তাকে কবজা করে…

আগের দিন রাত্রেই সে ঘেরাউনের কাছে দাবি জানিয়েছিল, এইবার তার শরীরে শক্তি ফিরে এসেছে। এইবার সে নিজে ইস্কাকে খুঁজতে পথে নামতে চায়। প্রয়োজনে আমহিরি অবধিও যাবে সে।  তাতে দিবিয়া মাথা নেড়েছিলেন। বলেছিলেন, সুস্থ হয়ে উঠতে থাকলেও, এখনও তার শরীর সে ধকল নেবার জন্য তৈরি নয়। এ অবস্থায় পথে নামলে, যে উদ্দেশ্যে সে পথে নামছে তার ব্যর্থ হবে, কারণ অন্যকে বাঁচানো দূরস্থান নিজেকেও ব্যাধির প্রকোপের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না সে। 

এরপর ঘেরাউন তাকে জানিয়েছিল, আমহিরির দিকে যত পশুপালক পরিবার ছড়িয়ে রয়েছে, তাঁদের সকলের কাছেই সংবাদ পাঠিয়েছে সে ইস্কার বিবরণ জানিয়ে। কাজেই তৃণভূমিতে সে ঢুকে থাকলে সর্বোচ্চ একদিনের মধ্যেই তার কোনো না কোনো খবর তার কাছে এসে পৌঁছাবে। এছাড়া, ঘেরাউনের নির্দেশে ইস্কাকে দেখা গেলে, তৃণভূমির চৌহদ্দির মধ্যে যেকোনো বিপদের হাত থেকে তাকে রক্ষা করবার নির্দেশও দেয়া হয়েছে। অতএব এ অবস্থায় এখনও দুর্বল ও অসুস্থ মাণ্ডুপের  পথে বের হবার কোনো অর্থ নেই। 

এ কথার যৌক্তিকতা অস্বীকার করেনি মাণ্ডুপ। কিন্তু তবু… মন মানে কই?

বেলা বয়ে যায়… পথ চেয়ে থাকে সে… কেউ আসে না। একসময় নদী ও বাতাসের মিলিত নিদুলি গান তার চোখে ঘুম আনল। শুকনো ঘাসের সুগন্ধী শয্যায় ঘুমায় সে ঘুমায়। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, তার অগোচরে দক্ষিণ পূর্বে দিগন্তের গায়ে জেগে ওঠে একটা দ্রুতগামী ফোঁটা। তিরবেগে ধেয়ে আসছিল তা, লোনা নদীর কূলে গেরাউনের তাঁবুগুলিকে লক্ষ্য করে। মাটির বুকে খুরের শব্দ তুলে সেখানে ধেয়ে আসছিল কালান্তক চেহারার একটি মহিষ। তার পিঠে বসে থাকা যুবতীর  তার ডানকাঁধ ঢেকে হাঁটু পর্যন্ত ছড়িয়ে যাওয়া বস্ত্রখণ্ডে আঁকা পুষ্পবনে ঢেউ ওঠে পশুটির দৌড়ের তালে তালে। দীর্ঘাঙ্গী, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা সেই মেয়ের মাথার কুঞ্চিত কেশদাম হাওয়ায় লকলক করে ওড়ে। তার বামগণ্ডের বাদামি তিলটি উত্তেজনায় রক্তবর্ণ ধরেছে। একহাতে তার একটা পুঁটুলি শক্ত করে ধরা। অন্যহাতে সে মাঝেমাঝেই তার আহত বাঁ কাঁধটিকে চেপে ধরছে। খোলা সেই কাঁধে শক্ত করে বাঁধা শুকনো ঘাসের পটি তাজা রক্তে রাঙা হয়ে উঠছিল…

“আর কত দূর?” ঘাসের সমুদ্রের ওপারে  দিগন্তের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে কিছু খুঁজতে খুঁজতেই সে বলে ওঠে বারে বারে … “তারপর মুখ ঘুরিয়ে পেছনে বসে থাকা যুবকটিকে জিজ্ঞাসা করে, “তোমার এই ভগিনীকে সত্য করে বলো ভাই আমার, ঠিক কী বার্তা পাঠিয়েছেন তোমাদের ঘেরাউন? সে বেঁচে আছে তো?” জবাবে তার সঙ্গে ছুটন্ত যুবকটি মাথা নাড়ে, “ঘেরাউনের আশ্রিত মাণ্ডুপ ভালো আছেন ভদ্রে। আপনি শান্ত হোন। পশুটিকে ধীরগতিতে চালান  আপনি আহত…”

আহত! কথাটা শুনে ছুটতে ছুটতেই মাথা নাড়ল ইস্কা। আহত যে, সেটা তার সৌভাগ্য। কারণ এতক্ষণে তার শ্বাপদের খাদ্য হয়ে যাবার কথা ছিল। যদি না পুল্লা নামের এই পশুপালক যুবক ঘাসের গভীরে তোলপাড়টা দূর থেকে লক্ষ্য করে, ঠিক কীঘটছে সেখানে সেটা আন্দাজ করত!  

একেবারেই হঠাৎ করে তার ওপর আক্রমণ শানিয়েছিল ক্ষুধার্ত চিতা। তৃণভূমিতে ঢুকে আসবার পর সন্ধ্যাবেলা ক্লান্ত হয়ে ঘাসের বিছানাতেই গা এলিয়ে দিয়েছিল ইস্কা গত রাত্রে। তারপর, গভীর ঘুমের মধ্যে কখন যে ক্ষুধার্ত জীবটা ঘাসবনের আড়াল থেকে বের হয়ে এসেছে তা সে টের পায়নি। তারপর, জেগে উঠেছিল সে বাঘের গর্জনে ও বাঁ কাঁধের তীব্র যন্ত্রণায়। সেখানে কামড়ে ধরে তাকে সরিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টায় ছিল পশুটা…

সাধারণত এ ধরনের কোনো আক্রমণের দৃশ্য দেখলে অন্য মানুষ সাবধানে দূরে সরে যায়। ক্ষুধার্ত শ্বাপদের মুখে কে আর নিজেকে এগিয়ে দিতে চায়। কিন্তু এই তৃণভূমির পশুচারকরা সে ধাতুতে গড়া নয়। পরে পুল্লা তাকে বলেছে, দূর থেকে ঝোপের মধ্যে তোলপাড়  দেখে সে বিষয়টা আন্দাজ করেছিল, এবং তারপর খানিক কাছে আসতে বাঘের গর্জন ও মানুষের গলার শব্দ পেয়ে সে তার কর্তব্য স্থির করে নেয়। তার পশুপাল তৃণভূমির এই শিকারীদের গন্ধে অভ্যস্ত। নিজেদের শাবকদের বাঁচাবার জন্য এদের সঙ্গে লড়াইতে তারা কখনোই সঙ্কুচিত হয় না। অতএব পুল্লা খুব সহজেই এর প্রতিকার করেছিল। সে তার পশুপালের সেরা মহিষটিতে সওয়ার হয়ে ঘটনাস্থলের দিকে ধেয়ে আসে। প্রাণীটা খাড়াইতে প্রায় দেড় মানুষ। তার মাথার পাকানো শিংদুটিকে এই তৃণভূমির প্রতিটি শ্বাপদ শ্রদ্ধাভক্তি করে এড়িয়ে চলে। 

তবে আজ ক্ষুধার্ত শ্বাপদ সহজে তার সুস্বাদু শিকারকে ছাড়তে চায়নি। মানুষের রক্তের স্বাদ একবার পেয়ে তাকে ছেড়ে দেয়া তার পক্ষে কঠিনই ছিল। ফলে পুল্লার মহিষকে তার শিঙের ব্যবহার করতে হয়েছে। এ কাজে সে যথেষ্ট নিপুণ। তাই, আহত ইস্কাকে বাঁচিয়ে শিঙের প্রবল আক্রমণে বেচারা চিতাকে ছিটকে ফেলতে তার সমস্যা হয়নি কোনো। 

কৃতজ্ঞ চোখে একবার পুল্লার দিকে তাকিয়ে দেখল ইস্কা। তার চেয়ে বয়সে খানিক ছোটো হবে। শরীরটি তার পেশল ও হৃষ্টপুষ্ট হলেও মুখখানিতে কী অসীম সারল্য মাখানো! বাঘ তাড়িয়ে, যেন কিছুই হয়নি এমন একটি ভঙ্গী করে মোষ থেকে নেমে এসে সে বলেছিল “ভগিনী, তুমি কি ইস্কা? আমি হলাম পুল্লা।” তারপর তার আহত কাঁধের দিকে চোখ পড়তে তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে জায়গাটা পরীক্ষা করে নিয়ে, একতাড়া ঘাস ছিঁড়ে এনে , তাই চিবিয়ে সে মন্ডটা সেখানে চেপে লাগিয়ে দিয়েছিল। তারপর শুকনো ঘাস দিয়ে একটা পটি বাঁধতে বাঁধতে সে খানিক আশ্বাসও দিয়েছিল ইস্কাকে, “ও কিছু না। ঘাস চিবিয়ে বেঁধে দিলাম, সেরে যাবে। আমার মা আমাকে কত অমন দিয়েছে! তুমি দেখো, কালকেই শুকিয়ে যাবে কেমন!”

তার হাতের ছোঁয়ায় কোনো অস্বস্তি হয়নি ইস্কার। একেকজন মানুষ থাকে যাদের প্রথম দেখাতেই আত্মীয় বলে চিনে নেয় মন। পুল্লাকে দেখেও ইস্কার মনে হয়েছিল এ তার তার হারিয়ে যাওয়া সহোদর যেন বা।  বাঁধাছাদা শেষ হলে তাকে সে প্রশ্ন করেছিল, “তুমি আমার নাম জানলে কেমন করে ভাই পুল্লা?”

জবাবে পুল্লা তাকে ঘেরাউনের বার্তা জানিয়েছিল। বলেছিল, মোষের পিঠে একবেলার দূরত্বে লোনা নদীর তীরে ঘেরাউনের শিবির। সেইখানেই রয়েছে তার মাণ্ডুপ। আহত মাণ্ডুপ…

তারপর আর এক মুহূর্ত দেরি করেনি ইস্কা।

***

স্বপ্ন দেখছিল মাণ্ডুপ। একটা অন্ধকার ঘর। বিশাল।  তার ভেতরে একটা লাল বৃত্ত। বৃত্তের পরিধির কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে… না না সে নয়! আর কেউ… মাণ্ডুপ যেন এক দেহহীন অস্তিত্ব, ঘরটার  দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখছে ভেতরের দিকে। সেখানে  যে দাঁড়িয়ে, সে একজন যোদ্ধা। মাথায় পরে থাকা শিরস্ত্রাণের জন্য তার মুখটি দেখতে পাওয়া যায় না!

অথচ সে মাণ্ডুপের খুবই চেনা। তার আবছায়া অবয়বের দিকে দৃষ্টি ধরে বুকের ভেতর একটা আশ্চর্য উষ্ণতার ছোঁয়া পায় সে। কে ও? 

লাল বৃত্তটার ভেতরে একটা বেদি। তার ওপরে…

সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ ভয়ে বুকট কুঁকড়ে উঠল মাণ্ডুপের। সেখানে… 

স্বপ্নের মধ্যেই বুকফাটা আর্তনাদ করে ওঠে মাণ্ডুপ। “যাস না… যাস না তুই ওর কাছে বাবা… ও যে মনরাক্ষস! তোকে ও খেলে তোর বাপ-মা… ” 

তার দেহহীন অস্তিত্বের সে আর্তনাদ শব্দ হয়ে ফুটে ওঠে না। কিন্তু কী করে যেন সেই যোদ্ধা তার কথা শুনতে পায়। এগিয়ে যেতে যেতেই হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়েছে সে। তারপর মাথা ও মুখ ঢাকা শিরস্ত্রাণের আড়াল থেকেই ভেসে এল তার গলার স্বর… “আমার মা ইস্কার আদেশে এই রাক্ষসের অস্তিত্বকে আজ আমি মুছে দিতে এসেছি। ভয় পাবেন না। আমার কোনো ক্ষতি করবার সাধ্য হবে না এর…”

তার দেহহীন অস্তিত্বের গোড়া ধরে যেন টান দিল ছেলেটার কথাগুলো… তুমি… তোমার মা… ইস্কা…ইস্কা?…”

“এই তো ঘুম ভাঙছে ওর… কী অকৃতজ্ঞ ছেলে দেখো! সেবা করে প্রাণ ফিরিয়ে দিলাম আমি, আর ঘুমের মধ্যে কেবল তোমার নামটিই জপ করে চলেছে প্রতিদিন…ইস্কা ইস্কা ইস্কা…”

বয়স্ক গলাটা কারো সঙ্গে কথা বলে চলেছে। এ গলা মাণ্ডুপ চেনে। মাতা দিবিয়া! এই ক’দিনে তাকেও ছেলের মতোই ভালোবেসে ফেলেছেন তিনি। আস্তে আস্তে চোখ খুলল সে। আজ পূর্ণিমা। আকাশে পূর্ণচাঁদের আলো। পলাশের পত্রমুকুটের ফাঁক দিয়ে ভল্লের মতো অজস্র আলোর শলাকা এসে পড়েছে তাকে ঘিরে। সেই আলোকভল্লদের একখানি তার ওপরে ঝুঁকে থাকা একখানা উদ্বিগ্ন মুখকে আলোকিত করেছিল।

সেদিকে তাকিয়ে  দেখে ধড়মড় করে উঠে বসতে গিয়ছিল মাণ্ডুপ। কিন্তু দুজোড়া কোমল হাত তাকে জড়িয়ে ধরে শুইয়ে দিল ফের। একটা পরিচিত, তরুণ ও প্রিয় গলা তার কানের কাছে বলে উঠল, “আমি এসেছি। এখন ঘুমোও তুমি। সেরে ওঠো। আমার জন্য সেরে ওঠো তুমি…”

***

গাছের তলায় শুয়ে মাণ্ডুপ পরম শান্তিতে ঘুমায়। তার থেকে কিছু দূরে তিনজন মহিলা বসে কথা বলে চলে। দিবিয়া ইস্কার কাঁধের ক্ষত পরীক্ষা করে তাতে ওষুধ লাগায়। ঘেরাউনের স্ত্রী, দিবিয়ার পুত্রবধূ মাস্তাল, ইস্কাকে মাণ্ডুপের আসবার গল্প বলে। মাণ্ডুপ আর কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেই ইস্কার সঙ্গে তার বিবাহ দেবে সে। মাণ্ডুপকে সে নিজের ভাই বলে মেনেছে। কাজেই এ বিবাহের আয়োজনের দায়িত্ব তার। উপস্থিত কিছুদিন ঘেরাউনের শিবিরেই থাকবে তারা। তারপর নবদম্পতিকে একটি তাঁবু ও কিছু পশু দিয়ে তাদের নিজস্ব জীবন শুরু করতে সাহায্য করবে ঘেরাউন। এখানে কোনো মনরাক্ষস তাদের স্পর্শ করতে পারবে না। বিস্তীর্ণ এই তৃণভূমি তাদের অন্নবস্ত্রেরও অভাব রাখবে না কোনো…

আর, এইভাবে যখন তিনজন মহিলা বসে একটা নতুন সংসারেররূপরেখা তৈরি করছিল মাণ্ডুপ ও ইস্কাকে ঘিরে, ঠিক তখন তাদের অগোচরে নিয়তি নতুন এক কাহিনির সূত্রপাত করছিলেন সেই একই দুজন মানুষকে ঘিরে… যে কাহিনি হয়তো দূর ভবিষ্যতে কোনোদিন ধ্বংস করবে ইন্দাতীরের মনরাক্ষসকে… সেখানকার মানুষকে স্বাধীন জীবনে বেড়ে ওঠবার পথ গড়ে দেবে… তবে সে আরো অনেক কাল পরের কথা। 

(প্রথম খণ্ড সমাপ্ত)

সময় হয়েছে। শিরস্ত্রাণ মাথায় পরল জিভাক। এর সামনে চোখের জায়গায় ছোটো দুটো স্ফটিকের পাতলা খণ্ড আটকানো। ফলে দৃষ্টি আটকায় না এতে। কিন্তু আসলে এ শিরস্ত্রাণের যা আটকাবার কথা সে কাজে এ কতখানি সফল তা আর খানিক বাদেই বোঝা যাবে। তারপর… হয় জয়, নয় নিষ্ঠুর মৃত্যু…

কথাটা মনে হতে মুখে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল তার। দু বছর হল বাড়ি ছেড়েছে সে। বাড়ি মানে… তাঁবু অবশ্য। তৃণভূমির পশুচারকের জীবনে স্থায়ী বাড়ি বলে কিছু হয় না। তবু… যেখানে মা, সেইখানেই তো বাড়ি! আসবার সময়  মা কিন্তু কাঁদেনি। অবশ্য কখনোই মা কাঁদে না। গোটা তৃণভূমিতেই তো মা’কে সবাই পাথুরে ইস্কা বলে ডাকে! শুধু আসবার আগে দুচোখে আগুন নিয়ে বলেছিল, “তুই আমার একমাত্র অস্ত্র। কথা দে, যার জন্য তোর বাপকে সব ছেড়ে এই নির্বাসনে আসতে হল, তোর মাকে অকাল বৈধব্যের জ্বালা সইতে হল, যার জন্য ইন্দাতীরের লাখো মানুষ স্বাধীন মানুষের মতো বাঁচতে শিখল না কখনও, কথা দে তুই সেই মনরাক্ষসকে ধ্বংস করবার পথ খুঁজে বের করবি। কথা দে , সেই পথে এগিয়ে ওই রাক্ষসকে শেষ করে আসবি তুই…অথবা সে চেষ্টায় নিজের প্রাণ উৎসর্গ করবি…”

অবশেষে আজ দীর্ঘ দু’বছর বাদে মায়ের সেই আদেশ পালন করতে এইখানে এসে দাঁড়িয়েছে সে। অথচ এখনও সে জানে না, এ কাজে কতটা সফল সে হবে। কতটা রক্ষা করতে পারবে তাকে উর নগরীর বিজ্ঞানবিদ উকালানের আবিষ্কৃত এই শিরস্ত্রাণ! সবটাই উকালানের তত্ত্ব। বাস্তবে তো আর এর প্রয়োগ হয়নি কখনো! 

সামনে, দোরাদাবুর গর্ভগৃহের দেয়াল চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছিল। একনজর সেদিকে তাকিয়ে দেখল জিভাক। তখন, নিঃশব্দে একটা একটা করে তার দিকে এগিয়ে আসছিল কিছু শক্তিমান মহিষ। তাদের একটির গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিভাক পেছনদিকে  তাকিয়ে দেখে নিল একবার।  ওদিকেই কোথাও পুল্লা আত্মগোপন করে রয়েছে। একেবারে সঠিক সময়ে এসেছে সে। এবং সঠিক পশুগুলোকেই বেছে এনেছে এ কাজের জন্য। 

নিজের কাজটা  নিখুঁত করেই পালন করছেন  মাতুল পুল্লা। 

আর দেরি নয়। শক্তিমান পশুগুলোর একটার পিঠে উঠে বসে তীক্ষ্ণ শিস দিয়ে উঠল  জিভাক। 

রাতের  নিস্তব্ধতাকে ফালা ফালা করে  দিয়ে যাওয়া সে শিস রক্ষিদের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছে। অসহায় চোখে তারা দেখছিল, দোরাদাবুর গর্ভগৃহ লক্ষ্য করে দৌড় শুরু করেছে অর্ধশত দানবিক মহিষ…তাদের সবার সামনে ছুটতে থাকা  দানবিক জন্তুটার পিঠে… কে ও? বিচিত্র একটা শিরস্ত্রাণ  ওর মাথায়! তা থেকে, ওর বাহন মহিষটার মতোই  বের হয়ে এসেছে দুটো প্রকাণ্ড  বাঁকানো শিং! কে ওই দুঃসাহসী। মানুষ ও নয় তা নিশ্চিত।  কোনো মানুষ ঈশ্বর দোরাদাবুর গর্ভগৃহকে আক্রমণ করবার সাহস দেখাবে না। তবে কি…

তারপর, হঠাৎ করেই সৈনিকদের মধ্যে কেউ একজন হাঁক দিয়ে উঠল… “পশুপতি… স্বয়ং পশুজগতের ইশ্বর আসছেন দোরাদাবুর মুখোমুখি হতে…

পশুপতি… পশুপতি… পশুপতি… মিলিত গলার গম্ভীর সেই শব্দ উথছিল তখন রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে। তারা জানত না ইন্দাতীরের হাজারো নগরের  ভাগ্য রেখা আমূল বদলে যেতে চলেছে… আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যে…

 (পরের সংখ্যা থেকে শুরু হচ্ছে… সিন্ধু নদীর তীরে- দ্বিতীয় খণ্ড)

ক্রমশ 

 জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক

Leave a Reply