ক্রোড়পত্র- নোবেল ২০২৫ অর্থনীতি- সৃজনশীল বিনাশ ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার – স্রবন্তী চট্টোপাধ্যায়- শীত’২৫

জোয়েল মোকির, ফিলিপ অ্যাঘিয়ন, পিটার হাউইট

গত দুশো বছর ধরে সারা পৃথিবী জুড়েই এক অভাবনীয় অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার লক্ষ করা গেছে। এই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মূলে রয়েছে পর্যায়ক্রমিকভাবে ক্রমাগত নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন। যখন পুরোনো প্রযুক্তিকে সরিয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার হয়, তখনই উচ্চহারে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি হওয়ার পদ্ধতিটি বেশ মজবুত হয়ে ওঠে। যে পদ্ধতিতে নতুন প্রযুক্তি পুরোনো প্রযুক্তিকে সরিয়ে তার পথ করে নেয়, তা সৃজনশীল বিনাশ (Creative Destruction) বলে সুপরিচিত। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ঠিক কীভাবে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির উচ্চহারের পথ প্রশস্ত করেছে এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির এই উচ্চহার বজায় রাখার জন্য এই ধরনের উদ্ভাবন কেন অত্যাবশ্যক, তা বিশ্লেষণ করেই ২০২৫ সালে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিনজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ অর্থনীতিবিদ। এঁরা হলেন জোয়েল মোকির (Joel Mokyr), ফিলিপ অ্যাঘিয়ন (Phillippe Aghion) এবং পিটার হাউইট (Peter Howitt)।

মানব ইতিহাসের এক বড়ো পর্যায় জুড়ে দেখা যায়, এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে জীবনযাত্রার মান তেমন পরিবর্তিত হয়নি। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন হয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সেগুলি জীবনযাত্রার মানকে কখনো-কখনো নিঃসন্দেহে উন্নত করেছে, কিন্তু কোনোভাবেই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার বাড়াতে সাহায্য করেনি। সাময়িকভাবে কিছু অর্থনৈতিক বৃদ্ধি হয়ে থাকলেও তা কিছুকাল পর স্তিমিত হয়ে গেছে। শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে এই পরিস্থিতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসে। মোটামুটি দুই শতাব্দীর কিছু আগে ইংল্যান্ডে এর সূত্রপাত, আর তার পরবর্তীতে তা অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নতুন নতুন আবিষ্কার এবং উদ্ভাবন আগের মতো ছোটো ছোটো বিচ্ছিন্ন ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে এক পরিব্যাপ্তি লাভ করে, উদ্ভাবন ও উন্নয়নের এক অফুরান চক্রাকার আবর্ত শুরু হয়। এর ফলেই এক স্থায়ী উচ্চহারের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সূচনা।

এই পুরো বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক গবেষণা করেছেন উপরে উল্লিখিত তিনজন অর্থনীতিবিদ। জোয়েল মোকির একজন অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ, তিনি বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন ও তার বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ কীভাবে একে অন্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে এক স্ব-উৎপাদনকারী (self-generating) পদ্ধতির জন্ম দিয়েছে, তা ব্যাখ্যা করার জন্য মোট পুরস্কারের অর্ধেক পেয়েছেন। এই স্ব-উৎপাদনকারী পদ্ধতিটি এক স্থায়ী বৃদ্ধির পথ খুলে দেয়। কিন্তু এই পদ্ধতি যেহেতু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমাজের প্রচলিত স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তাই তিনি এমন এক সমাজ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন যা নতুন ধারণাকে মুক্তমনে গ্রহণ করতে সক্ষম ও পরিবর্তনের ব্যাপারেও মুক্তমনা।

পুরস্কারের বাকি অর্ধেকের প্রাপক ফিলিপ অ্যাঘিয়ন এবং পিটার হাউইট। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত তাঁদের এক যৌথ গবেষণাপত্রে তাঁরা একটি গাণিতিক মডেল উপস্থাপিত করেন, সেটিতে তাঁরা দেখান কীভাবে কোন কোম্পানি উন্নততর উৎপাদন পদ্ধতির জন্য অথবা উচ্চতর গুণমানের নতুন দ্রব্য উৎপাদনের জন্য গবেষণায় বিনিয়োগ করে এবং তাতে ইতোপূর্বে যে কোম্পানিগুলি উৎপাদন ব্যবস্থার পুরোভাগে ছিল, তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এভাবেই সৃজনশীল বিনাশের পথ ধরে চলতে থাকে। তাঁদের গবেষণাপত্রে তাঁরা বিশদে ব্যাখ্যা করেছেন যে এই পদ্ধতিটি অবশ্যই সৃজনশীল, কারণ তা নতুন উদ্ভাবন নিয়ে আসছে। কিন্তু এর পাশাপাশি একই সঙ্গে এতদিন ধরে ব্যবহৃত হওয়া শ্রেষ্ঠ দ্রব্যগুলো অচল বা লুপ্ত হয়ে পড়ছে এবং তাদের বাণিজ্যিক মূল্য হারিয়ে ফেলছে। সেই অর্থে এর এক বিনাশের দিকও আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পদ্ধতি আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে, আর তার জন্য এক বা দুই শতকে প্রায় সবকিছুই রাতারাতি বদলে গেছে।

এখন প্রশ্ন হল এই যে আমরা অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার নিয়ে এত কথা বলি, এই বৃদ্ধি আসলে কীসের বৃদ্ধি? অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বলতে জাতীয় আয়ের বৃদ্ধিকে বোঝানো হয়। জাতীয় আয় পরিমাপের অনেক পদ্ধতি আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত পরিমাপটি হল মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা Gross Domestic Product (GDP)— এরই বার্ষিক বৃদ্ধির হার দেখে বিচার করা হয় কোন দেশ অর্থনৈতিকভাবে কত উন্নতি করছে। যদিও এই পরিমাপটি এক অর্থে অত্যন্ত সংকীর্ণ, কারণ শুধুমাত্র উৎপাদনের পরিমাণ কোনও দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান নিয়ে বলতে গেলে প্রায় কোনও তথ্যই দেয় না। জীবনযাত্রার মান নির্ভর করে অনেকগুলি বিষয়ের ওপর— যেমন উন্নত গুণমানের খাদ্যের সহজলভ্যতা, নিরাপদ পানীয় জল, উচ্চমানের স্বাস্থ্য পরিসেবা, নতুন ও উন্নত ওষুধের লভ্যতা, উচ্চমানের পরিকাঠামো, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি আরও বহু কিছুর ওপর। তবু এ-কথা ঠিক যে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ছাড়া সার্বিকভাবে জীবনযাত্রার মান খুব উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা কম। সুতরাং, বলা যেতে পারে যে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি কোনও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এক প্রয়োজনীয় শর্ত, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।

অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও উন্নয়নের অন্যান্য মাপকাঠিগুলোকে লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই এই ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির একটা বড়ো ভূমিকা আছে। এই উন্নত প্রযুক্তির জন্য আবার প্রয়োজন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন। এমন মনে হতেই পারে, বৃদ্ধির স্বাভাবিক গতিপথ ধরেই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন আসবে, কিন্তু বাস্তবের চিত্রটি  সম্পূর্ণ ভিন্ন। চতুর্দশ শতকের প্রথমদিকে ব্রিটেন এবং সুইডেনে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদ্ভাবন ঘটে, তার জন্য জাতীয় আয়ের ওঠানামাও দেখা যায়, কিন্তু অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার প্রায় নগণ্য ছিল। সুতরাং জাতীয় আয়ের দীর্ঘকালীন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই উদ্ভাবনগুলির বলতে গেলে কোনও প্রভাবই পড়েনি।

কেন এমনটি হল, সে-ব্যাপারে মোকিরের ব্যাখ্যাটি একটু বুঝে নেওয়া যাক। মোকিরের মতে, নতুন চিন্তাধারাগুলির কোনও ক্রমিক বিবর্তন হয়নি অথবা আজকের যুগে কোনও বড়ো বৈজ্ঞানিক বা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হিসেবে উন্নয়ন বা তার নতুনভাবে প্রয়োগের পথ খুলে যাওয়া, যাকে আমরা স্বাভাবিক বলে ধরে নিই, ব্রিটেন বা সুইডেনে তেমনটি মোটেই ঘটেনি। বরং এই দুটি দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখি যে ১৯৩০-এর বিশ্বব্যাপী সেই বিরাট অর্থনৈতিক মন্দা (Great Depression) এবং আরও কিছু অর্থনৈতিক সংকটের সময়গুলো বাদ দিলে অষ্টাদশ শতকের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত অর্থনৈতিক স্থবিরতা (stagnation) নয়, অর্থনৈতিক বৃদ্ধিই ব্রিটেন এবং সুইডেনের স্বাভাবিক পরিস্থিতি। বলা যেতে পারে, এই অবিরাম অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এই দুই দেশেরই নব্য স্বাভাবিক (New Normal)।

আরও অনেকগুলো দেশ যাদের বেশ ভালোরকম শিল্পায়ন ঘটেছে, তাদের ক্ষেত্রেও এই একইরকম অবিচ্ছিন্ন এক বৃদ্ধির হার লক্ষ করা যায়, যার মান বছরে ২ শতাংশ। মনে হতেই পারে যে দুই শতাংশ আর এমন কী। কিন্তু ক্রমিক এবং অবিচ্ছিন্নভাবে বছরের পর বছর এই হারে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি হওয়ার অর্থ হল কোনও এক ব্যক্তির সমগ্র কর্মজীবনে আয়ের পরিমাণ দ্বিগুণিত হওয়া, আর তার জন্য মানুষের জীবনযাত্রার মানের রীতিমতো বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে, যার প্রভাব ছড়িয়েছে সারা পৃথিবী জুড়ে।

তাহলে এবার যে প্রশ্নটি অবশ্যম্ভাবী রূপে উঠে আসে তা হল, পর্যায়ক্রমিক স্থিতিশীল অর্থনৈতিক বৃদ্ধির উৎস কী? ২০২৫ সালের নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা এর উত্তর খুঁজেছেন বিভিন্ন পদ্ধতিতে। একজন অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ হিসেবে জোয়েল মোকির দেখিয়েছেন, এক পর্যায়ক্রমিক প্রয়োজনীয় জ্ঞানের প্রবাহ এই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির জন্য অত্যাবশ্যক। এই প্রয়োজনীয় জ্ঞানের আবার দুটি ভাগ আছে। এদের প্রথমটিকে মোকির নাম দিয়েছেন প্রস্তাবিত জ্ঞান (Propositional Knowledge); এটি হল বিশ্ব প্রকৃতির নিয়মগুলির এক ধারাবাহিক বর্ণনা যা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কেন এবং কীভাবে প্রাকৃতিক নিয়মগুলি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে কাজ করে। দ্বিতীয়টি হল নির্দেশমূলক জ্ঞান (Prescriptive Knowledge) যার মধ্যে রয়েছে ব্যবহারিক নির্দেশাবলি, চিত্র এবং কৌশল, কোনও কাজ করার জন্য যা অত্যাবশ্যক।

ঐতিহাসিক তথ্য ব্যবহার করে মোকির দেখিয়েছেন, শিল্প বিপ্লবের আগে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন মূলত নির্দেশমূলক জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করেই হত। মানুষ জানত যে কিছু একটা কাজ হচ্ছে, কিন্তু তা কীভাবে হচ্ছে তা নিয়ে সঠিক ধারণা ছিল না। অন্যদিকে, প্রস্তাবিত জ্ঞানের বিস্তার ঘটে নির্দেশমূলক জ্ঞানের সাপেক্ষে নিরপেক্ষভাবেই, যেমনটি দেখা যায় গণিত ও প্রাকৃতিক দর্শন চর্চার ক্ষেত্রে, যা প্রচলিত জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে কিছু করাকে কেবল কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব করে তোলে। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রচেষ্টাগুলি বেশিরভাগই ছিল এলোমেলো অথবা এমন কিছু নিয়ে যা যে-কোনো যথার্থ নির্দেশমূলক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রেই বুঝবেন কতটা নিরর্থক। উদাহরণ হিসেবে চিরস্থায়ী গতি (perpetual motion) এবং অপরসায়নের (Alchemy) কথা বলা যেতে পারে।

ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীতে নবজাগরণের হাত ধরে এক বৈজ্ঞানিক বিপ্লব হল। বৈজ্ঞানিকরা সুনির্দিষ্ট পরিমাপ পদ্ধতি, নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষানিরীক্ষা এবং বার বার পুনর্গঠন করা যায় এমন পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের গুরুত্ব আরোপ করলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় প্রস্তাবিত এবং নির্দেশমূলক জ্ঞানের মধ্যে এক সংযোগ স্থাপিত হল। পরিণামস্বরূপ, প্রয়োজনীয় জ্ঞানের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার গড়ে উঠল, যা সামগ্রিক উৎপাদনের ওপর এক বিরাট সদর্থক প্রভাব ফেলল। এর উদাহরণ নানান ক্ষেত্রে আছে— বায়ুমণ্ডলীয় চাপ এবং বায়ুশূন্যতার বিষয়ে উন্নততর জ্ঞানের বিকাশকে ব্যবহার করে স্টিম এঞ্জিনের সমূহ উন্নতি সম্ভব হল, কীভাবে অক্সিজেনের প্রভাবে গলিত লোহায় কার্বনের পরিমাণ কমানো যেতে পারে, তা বোঝার কারণে স্টিলের উৎপাদনে বিরাট উন্নতি সাধিত হল। এই ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক জ্ঞানের পরিমাণ বৃদ্ধিতে নতুন নতুন উদ্ভাবন তো হলই, উপরন্তু যে যে প্রযুক্তি তখন ছিল, তাদের অনেকের সমূহ উন্নতিসাধন এবং নতুন-নতুনভাবে তাদের ব্যবহার সম্ভব হয়ে উঠল।

এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা প্রয়োজন। নতুন জ্ঞান ও নতুন ধারণার সফল ব্যবহারিক প্রয়োগের জন্য ব্যবহারিক, প্রযুক্তিগত এবং অবশ্যই ব্যবসায়িক জ্ঞান খুব জরুরি। এদের বাদ দিলে খুব উচ্চমানের গবেষণাও কেবলমাত্র খাতা-কলমে থেকে যাবে; লিওনার্দো দা ভিঞ্চির হেলিকপ্টারের নকশার ক্ষেত্রে এমনটিই ঘটেছিল। মোকিরের মতে, সুস্থায়ী অর্থনৈতিক বৃদ্ধি প্রথম ব্রিটেনে ঘটার কারণ হল, এই দেশ ছিল বহু দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার ও কারিগরের আবাসভূমি। কীভাবে নকশাকে বাস্তব রূপ দিতে হয়, আর কীভাবে জ্ঞানকে ব্যবসায়িক পণ্য তৈরিতে কাজে লাগানো যায়, তা এঁরা খুব ভালো বুঝতেন আর এটিই ছিল স্থায়ী অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পথ সুগম করার মূল চালিকাশক্তি।

মোকিরের মতে, যে-কোনো অর্থনীতির স্থায়ী অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তার মুক্তমনা আচরণ। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের হাত ধরে আসা অর্থনৈতিক বৃদ্ধি একই সঙ্গে যেমন কিছু মানুষের সাফল্য আনে, আবার তেমনই কিছু মানুষকে ঠেলে দেয় ক্ষতির মুখে। নতুন উদ্ভাবনের ফলে পুরোনো প্রযুক্তি ক্রমাগত পিছু হঠতে থাকে, এবং তার ফলে প্রচলিত অর্থনৈতিক গঠন ও কর্মপদ্ধতি প্রায়শই ধ্বংস হয়ে যায়। তিনি দেখিয়েছেন যে ঠিক এই কারণেই অনেক সময় নতুন প্রযুক্তির বিকাশকে সমাজের একাংশ বাধা দিয়ে থাকে। এদের মধ্যে থাকে নতুন প্রয়োজকটির ফলে ক্ষতির মুখ দেখা বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী। নবজাগরণ জনসাধারণের মধ্যে নতুনকে গ্রহণ করার এক সার্বিক মানসিকতার জন্ম দিয়েছিল। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মতো নতুন প্রতিষ্ঠান যেসব স্বার্থগোষ্ঠী পরিবর্তনের পরিপন্থী তাদের আদৌ সমর্থন করেনি। বরং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে আলোচনার মাধ্যমে এক সর্বতোভাবে উপকারী সিদ্ধান্তে পৌঁছতেন। এইরকম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নতুনকে গ্রহণ করার মানসিকতা স্থায়ী অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পথ থেকে এক বড়ো বাধা দূর করে।

নির্দেশমূলক জ্ঞান অনেক সময় নতুন ধারণার প্রতি গ্রহণযোগ্যতার অভাবের বিষটিকে কমিয়ে আনে। ঊনবিংশ শতকে হাঙ্গেরিয়ান চিকিৎসক আয়ান সেম্মেলওয়েইস বুঝেছিলেন, সাবান দিয়ে হাত ধুলে মাতৃত্বকালীন মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কিন্তু তিনি যদি তখন জানতেন যে এর কারণ হল সাবানে হাত ধোওয়া হাতের বেশ কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে এবং তা প্রমাণ করে দেখাতে পারতেন, তাহলে তাঁর ভাবনার সুপ্রভাব অনেক আগেই পড়তে পারত।

জোয়েল মোকির ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করে স্থায়ী অর্থনৈতিক বৃদ্ধির জন্য অত্যাবশ্যকীয় কারণগুলিকে চিহ্নিত করেন। অন্যদিকে ফিলিপ অ্যাঘিয়ন ও পিটার হাউইট তাঁদের কাজের জন্য বেছে নিয়েছেন সমকালীন তথ্যাবলি। এক গাণিতিক মডেল তৈরি করে তাঁরা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন কীভাবে স্থায়ী অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পথ সুগম করেন তা দেখিয়েছেন। যদিও পদ্ধতিগতভাবে তাঁরা সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ ধরেছেন, কিন্তু তাঁদের গবেষণার মূল প্রশ্নটি জোয়েল মোকিরের থেকে মোটেই আলাদা নয়, তাঁরা সকলেই একই ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করেছেন। আমরা আগেই দেখেছি ব্রিটেন বা সুইডেনের মতো শিল্পায়ন সমৃদ্ধ দেশগুলির বৃদ্ধির হার বেশ স্থিতিশীল। তবে এই আপাত স্থিতিশীলতার নীচে এক অন্য স্তর আছে যা কোনোমতেই স্থিতিশীল নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর দশ শতাংশের বেশি সংখ্যক কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রায় সমপরিমাণ নতুন কোম্পানি আত্মপ্রকাশ করে। টিকে থাকা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রেও এক বিরাট সংখ্যক কর্মসংস্থান এবং প্রায় একই সংখ্যক কর্মহীনতা প্রতিনিয়ত তৈরি হয়ে চলে। সব দেশেই এই ঘটনা একইরকমভাবে লক্ষ করা যায়। এই পদ্ধতিটিকে অর্থনীতির পরিভাষায় বলা হয় সৃজনশীল ধ্বংস বা creative destruction; কিছু কোম্পানি এবং কর্মসংস্থান ক্রমশ ধ্বংস হয়ে চলে আর তাদের জায়গা নেয় নতুন কোম্পানি বা নতুন কর্মসংস্থান। স্থায়ী অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মূলে রয়েছে এই সৃজনশীল ধ্বংস পদ্ধতিটি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, কোন কোম্পানিগুলো টিকে থাকবে? উত্তর হল, সেইসব কোম্পানি যাদের কাছে উন্নততর পণ্য অথবা উন্নততর উৎপাদন পদ্ধতি আছে, যাতে তারা তাদের প্রতিযোগী কোম্পানিদের পিছনে ঠেলে দিয়ে বাজারের নেতৃ-স্থান (market leadership) অর্জন করে। কিন্তু যেই এমনটি ঘটে, অমনি আরও অন্যান্য কোম্পানি উঠেপড়ে লাগে তাদের পণ্য অথবা উৎপাদন পদ্ধতি আরও উন্নত করার জন্য এবং পরবর্তীতে তাদের মধ্যে কেউ আবার বাজারের নেতৃ-স্থানে উঠে আসে।

অ্যাঘিয়ন ও হাউইট এই পুরো পদ্ধতিটি দেখানোর জন্য যে গাণিতিক মডেলটি ব্যবহার করেছেন তা এককথায় যুগান্তকারী। তাঁরা এমন একটা অর্থনীতিকে দেখছেন যাতে বেশ কিছু কোম্পানি আছে, তাদের কাছে খুব উন্নতমানের প্রযুক্তি আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি যাদের হাতে রয়েছে, তারা সেই প্রযুক্তির পেটেন্ট নেয়। কোনও কোম্পানি পেটেন্ট নিলে সেই প্রযুক্তির ওপর তার একাধিপত্য জন্মায় এবং সে একচেটিয়া ব্যাবসার মাধ্যমে বেশি বেশি লাভ করতে থাকে। এভাবে প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোর তুলনায় সে এক সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে যায় এবং শেষে নেতৃ-স্থান অর্জন করে। কিন্তু পেটেন্ট তাকে কোনও বিশেষ পণ্য বা উৎপাদন পদ্ধতির ওপর একচেটিয়া অধিকার দিলেও, তা কোনও কোম্পানিকে অনুরূপ আরও উন্নত পণ্য বা উৎপাদন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা থেকে বিরত করতে পারে না। তাই অন্য কোম্পানিরা আবার নতুন কোনও পেটেন্ট নিতেই পারে। এই নতুন পেটেন্ট করা পণ্য বা উৎপাদন পদ্ধতি যদি খুব উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নততর হয়, তাহলে তা আগের পেটেন্ট নেওয়া কোম্পানিকে সরিয়ে নেতৃ-স্থানে নতুন কোম্পানিকে নিয়ে আসে। এই প্রতিযোগিতা নিরন্তর। এতে সাময়িকভাবে হলেও এক-একটি কোম্পানি এক-একসময় একচেটিয়া ব্যাবসার অধিকার পায়। আর সেই একচেটিয়া কারবারের সুবিধা পাওয়ার জন্য তারা গবেষণায় (R&D) বিনিয়োগ করে। যার নেতৃ-স্থানে থাকার সম্ভাবনা বেশি আছে বলে সে মনে করে, সে আরও তত বেশি করে গবেষণায় বিনিয়োগ করে উন্নততর প্রযুক্তি হাতে পাওয়ার জন্য। এইভাবে বিভিন্ন কোম্পানিগুলোর মধ্যে গবেষণার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। তার জন্য নতুন উদ্ভাবনের হার বাড়তে থাকে আর এক উদ্ভাবন থেকে পরবর্তী উদ্ভাবনের মধ্যের সময়কাল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এই প্রতিযোগিতার পরিমাণ এবং গবেষণায় বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজির লভ্যতার মধ্যে এক বিপরীতমুখী সম্পর্ক আছে যা এই সমগ্র পদ্ধতিটির মধ্যে এক সাম্য নিয়ে আসে। সেই সাম্যের চরিত্র অনুযায়ী কোন অর্থনীতিতে সৃজনশীল ধ্বংসের হার কত হবে এবং সেই অনুযায়ী অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার কত হবে তা নির্ধারিত হয়।

এবার পরবর্তী যে অবধারিত প্রশ্নটি উঠে আসে, তা হল, গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজির উৎস কী? উত্তর হল, সাধারণ মানুষের সঞ্চয়। এই সঞ্চয় আবার নির্ভর করে সুদের হারের ওপর এবং সেই সুদের হার নির্ধারিত হয় সেই অর্থনীতির বৃদ্ধির হারের ওপর। সুতরাং উৎপাদন, গবেষণা, পুঁজির বাজার এবং গৃহস্থের সঞ্চয় সবকিছুর মধ্যে এক অবশ্যম্ভাবী আন্তঃসম্পর্ক আছে। এদের পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন করলে বোঝা যায় না। অর্থনীতির এইরকম আন্তঃসম্পর্কিত বিভিন্ন ভাগের সামগ্রিক সাম্যের আলোচনাকে বলা হয় General Equilibrium Analysis। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে অ্যাঘিয়ন ও হাউইট প্রথম সমষ্টিগত অর্থনীতির এক মডেল উপস্থাপন করেন যা General Equilibrium Analysis-এর পরিসরে সৃজনশীল বিনাশের কথা আলোচনা করে।

এক মুক্ত বাজার অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে, যখন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ তেমন নেই, সেই অবস্থায় নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে গবেষণার এবং সেই জন্য অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হারের কোনও সর্বোত্তম পরিমাণ আছে কি না অ্যাঘিয়ন ও হাউইটের গাণিতিক মডেলের সাহায্যে বিশ্লেষণ করা যায়। আপাতদৃষ্টিতে সরল মনে হলেও এই বিষয়টি আদতে বেশ জটিল। ইতোপূর্বে কোনও মডেল সম্পূর্ণ অর্থনীতিকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেনি, তাই এই বিষয়টি নিয়ে তারা কোনও আলোকপাত করতেও পারেনি। একটু বিশদে বুঝে নেওয়া যাক। এক্ষেত্রে দুটো বিপরীতমুখী শক্তি কাজ করে যারা সমগ্র অর্থনীতিকে এক ভারসাম্যে রাখে। প্রথমটি হল, প্রযুক্তির নিরন্তর প্রতিযোগিতায় পুরোনো যে প্রযুক্তিগুলো ক্রমশ পিছিয়ে পড়ে, কোম্পানিগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকে তারা মূল্যহীন হলেও, সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে কিন্তু তা নয়। কারণ, নতুন প্রযুক্তিগুলোর উদ্ভাবন হচ্ছে পুরোনো প্রযুক্তিগুলোর ওপর ভিত্তি করেই। সুতরাং, সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনও প্রযুক্তি চিরতরে হারিয়ে গেলেও তার গুরুত্ব কখনোই হারায় না এবং যে কোম্পানি সেই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছিল, তার থেকেও সমাজের কাছে সেই প্রযুক্তির মূল্য অনেক বেশি। তাই কোম্পানিগুলো যখন গবেষণায় কত বিনিয়োগ করবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়, তার পরিমাণ অবশ্যই সমাজ যতখানি চায় তার তুলনায় কম হবে। অতএব গবেষণায় সর্বোত্তম বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে কোম্পানিগুলোকে ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন, নতুবা গবেষণায় বিনিয়োগের পরিমাণ সমাজের চাহিদার তুলনায় কম হবে।

এর বিপরীতে আসছে দ্বিতীয়টি, প্রত্যেক কোম্পানি সবসময় চেষ্টা করে চলেছে কী করে সবচেয়ে উপরে থাকা কোম্পানিকে সরিয়ে নেতৃ-স্থান অধিকার করবে। আগের প্রযুক্তির চেয়ে সামান্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেই সে অনেক বেশি মুনাফা পেতে পারে, তাই সে সবসময় সামান্য হলেও আর একটু উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেষ্টায় থাকে। এভাবে সামান্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাজারে নেতৃ-স্থানে থাকা কোম্পানিকে সরিয়ে দিয়ে তার স্থান অধিকার করাকে অর্থনীতির পরিভাষায় বলা হয় ‘ব্যাবসা চুরি’ (Business Stealing)। যদিও আইনের চোখে তা মোটেই চুরি নয়। এই নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেষ্টা প্রতিযোগিতায় থাকা সমস্ত কোম্পানিই করতে থাকে আর তার অবশ্যম্ভাবী ফল হল গবেষণায় অত্যধিক বিনিয়োগ। এর ফলে আবার নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের হার ভীষণভাবে বেড়ে যায় আর তার ফলে অর্থনৈতিক বৃদ্ধিও অত্যধিক হারে হতে থাকে। তাই আর্থ-সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে আবার গবেষণায় ভর্তুকির এক বিরোধী স্বরও উঠে আসে।

এই দুটি পরস্পরবিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে কোনটার প্রভাব বেশি পড়বে তা অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল এবং এই বিষয়গুলো আলাদা আলাদা অর্থনীতির জন্য আলাদা। অ্যাঘিয়ন ও হাউইটের তত্ত্ব কোন ক্ষেত্রে গবেষণায় ভর্তুকির বিষয়ে কী ধরনের নীতি সবচেয়ে উপযোগী সমাধান দেবে, সেই ব্যাপারে এক সার্থক দিকনির্দেশ করে।

অ্যাঘিয়ন ও হাউইটের ১৯৯২ সালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রটি এই বিষয়ে বিভিন্ন দিকে আরও অনেক গবেষণার জন্ম দেয়। তার মধ্যে রয়েছে বাজার কেন্দ্রীকরণের বিষয়টিও যা বাজারে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত কোম্পানিগুলোর সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত। এই গবেষণা অনুযায়ী বাজারের অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ঘটলে, অর্থাৎ কোম্পানির সংখ্যা খুব কম হলেও গবেষণায় বিনিয়োগ কমবে, আবার খুব বেশি সংখ্যক কোম্পানি থাকলেও এমনটি ঘটবে। সাম্প্রতিককালে বহুক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন সত্ত্বেও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার তেমন বেশি নয়। অ্যাঘিয়ন ও হাউইটের তত্ত্ব অনুযায়ী এর কারণ হল, অল্প কিছু সংখ্যক কোম্পানির আধিপত্য। এইসব ক্ষেত্রে এই অল্প সংখ্যক কোম্পানির আধিপত্য কমানোর জন্য কিছু নীতি গ্রহণ করা নেওয়া আবশ্যক।

আর একটি বিষয় এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক, তা হল, যখন কোনও কোম্পানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে শেষে একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়, তখন তার প্রভাব শুধুমাত্র সেই কোম্পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তাতে নিযুক্ত কর্মচারীদের ওপরেও পড়ে। সৃজনশীল বিনাশের পথে কিছু বিজয়ী এবং কিছু পরাজিত কোম্পানির সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু মানুষের কর্মসংস্থানও হারিয়ে যায়, তাই অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের সময় তাদের জীবিকার সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রাখাও খুব প্রয়োজনীয়।

সবশেষে বলা চলে, মোকির, অ্যাঘিয়ন ও হাউইটের গবেষণা আমাদের সমসাময়িক কালের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও বুঝতে সাহায্য করে, অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে যা আবশ্যিক আর তাই এই গবেষণার গুরুত্ব অনেক সুদূরপ্রসারী।

 

জোয়েল মোকির (১৯৪৬ -)

 

জন্ম নেদারল্যান্ডের লেইডেনে, নাজি হলোকস্ট থেকে বেঁচে ফেরা এক ডাচ ইহুদি পরিবারে। তাঁর বাবা সলোমন মক ছিলেন একজন সরকারী কর্মচারী। জোয়েলের  জন্মের এক বছরের মাথায় সলোমন মক  ক্যান্সারে মারা যান। জোয়েলের যখন ন’বছর বয়স তখন তাঁর বিধবা মা গোন্ডা মক তাঁকে নিয়ে ইজরায়েলে চলে যান। এখানেই হাইফা শহরে তাঁর স্কুলশিক্ষা। এরপর জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে অর্থনীতি ও ইতিহাসে স্নাতক হয়ে পাড়ি জমালেন মার্কিন মুলুকে। এরপর আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে ১৯৭২ সালে এমফিল ও তারপর ১৯৭৪ সালে পিএইচডি। অর্থনৈতিক  ইতিহাস তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র। তিনি আমেরিকার Northwestern University তে  Robert H. Strotz Professor of Arts and Sciences এবং তেল আভিভ-এর Eitan Berglas School of Economics- এ senior adjunct professor হিসেবে কর্মরত। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার তাঁর। ইসরায়েলি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শোনেন অবসর সময়ে।

ফিলিপ মারিও অ্যাঘিয়ন (১৯৫৬ -)

একজন ফরাসি অর্থনীতিবিদ, প্যারিসে জন্ম নেওয়া এক ইহুদি পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা রেমন্ড অ্যাঘিয়ন ছিলেন এক আর্ট গ্যালারির মালিক আর মা গ্যাবি অ্যাঘিয়ন ছিলেন একজন ফ্যাশন ডিজাইনার। রেমন্ড ও গ্যাবি দুজনেই আলেকজান্দ্রিয়ার বাসিন্দা ছিলেন, পরবর্তীকালে তাঁরা প্যারিসে আসেন। ফ্রান্সের École normale supérieure de Cachan (now ENS Paris-Saclay, University of Paris-Saclay) থেকে গণিত নিয়ে পড়াশোনার পর Université Paris I Panthéon-Sorbonne থেকে গাণিতিক অর্থনীতিতে (Mathematical Econoimcs) তিনি তৃতীয় স্তরের ডক্টরেট এবং তারপর ১৯৮৭ সালে হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি অর্জন করেন। সেই ১৯৮৭ সালেই তিনি ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি ফ্রান্সে ফিরে যান এবং French National Centre for Scientific Research (CNRS)-এ গবেষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯০ সালে তিনি European Bank for Reconstruction and Development (EBRD)-এর ডেপুটি ডিরেক্টর পদে নিযুক্ত হন। এর পরবর্তীতে তিনি অনেক সম্মাননীয় প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে নিযুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে, যার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হল লন্ডন স্কুল অফ ইকনোমিক্স। বর্তমানে তিনি Collège de France and INSEAD-এ অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। পিটার হাউইটের সঙ্গে সৃজনশীল বিনাশ সংক্রান্ত যৌথ গবেষণা তাঁকে প্রথম সারির অর্থনীতিবিদদের তালিকায় নিয়ে এসেছে।

 

পিটার উইলকিনসন হাউইট (১৯৪৬ -)

জন্ম কানাডার অন্টারিও অঞ্চলে। ১৯৬৮ সালে McGill University থেকে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করার পর ১৯৬৯ সালে  University of Western Ontario থেকে এম.এ ডিগ্রি ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের Northwestern University থেকে ১৯৭৩ সালে পি.এইচ.ডি অর্জন করেন। এরপর তিনি কানাডায় ফিরে গিয়ে ১৯৭২ সালে University of Western Ontario-তে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং ১৯৯৬ সাল অবধি তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়েই অধ্যাপনা চালিয়ে যান। ১৯৯৬ সালে তিনি Ohio State University এবং ২০০০ সালে Brown University-তে যোগদান করেন যেখানে তিনি এখনও কর্মরত। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র endogenous growth theory, এবং এই ক্ষেত্রেই ফিলিপ অ্যাঘিয়নের সঙ্গে যৌথভাবে সৃজনশীল বিনাশ সংক্রান্ত কাজ তাঁকে আন্তর্জাতিক স্তরে খ্যাতি এনে দিয়েছে।

উৎস- The Prize in Economic Sciences 2025 – Popular Science Background

(স্রবন্তী চট্টোপাধ্যায় রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির বিশিষ্ট অধ্যাপক। গেম থিওরির বিশেষজ্ঞ। অর্থনীতির বহু শাখাতেই তাঁর স্বচ্ছন্দ যাতায়াত। সম্প্রতি কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ার অর্থনীতির ওপরে তাঁর ক্ষেত্রসমীক্ষাভিত্তিক স্টাডিটি বাংলার অর্থনৈতিক পরিমণ্ডল বিষয়ক অধ্যয়নে একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্বের সূচনা করেছে। )

Leave a Reply