ক্রোড়পত্র- নোবেল ২০২৫ সাহিত্য- লাজলো ক্রাসনাহরকাই-প্রতিরোধের নিঃসঙ্গতা – অনির্বাণ বসু-শীত’২৫

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক বর্ষণ-সন্ধ‍্যায় আমরা দুই বইপাড়ার বন্ধু একটি দোকানের শেডের নীচে অপেক্ষায় ছিলাম বৃষ্টি থামার জন‍্য। কথায় কথায় আমাদের আলোচনায় উঠে এসেছিল সাহিত‍্যের বিভিন্ন পুরস্কার যেমন মান বুকার, পুলিৎজার কিংবা নোবেল ইত‍্যাদি সাহিত‍্য পাঠকে কতটুকু প্রভাবিত করে বা আদৌ করে কি না। আমরা এইটুকুই একমত হয়েছিলাম যে একটা আলো এসে পড়ে, বিশ্বসাহিত্যের সমস্ত লেখককে সবার পড়া হয়ে ওঠে না। তাই এই আলো একটা নিশানা দেয়। এই প্রসঙ্গে বন্ধুই বলে ওঠেন, বছর চারেক আগে মান বুকার পুরস্কার পাওয়া Melancholy of Resistance বইটির কথা এবং সেই সঙ্গে তার লেখক লজলো ক্রাসনাহরকাই-এর সম্পর্কে কিছু প্রশংসাসূচক বিশেষণ যেমন ‘অনবদ্য লেখক’, ‘ক্লাসিক’, সেই সঙ্গে উৎসাহিত করেন পাঠের জন‍্য।

এ-কথা অস্বীকার করব না যে লেখকের নাম ওই একবার শোনার পর সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছিলাম। তবে পুরস্কারপ্রাপ্ত বইটির নাম মনে ছিল।

এরপর ইন্টারনেট ঘেঁটে যেটুকু প্রাথমিকভাবে জানা গেল, তা হল লেখক হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় সাহিত্য রচনা করেন এবং প্রখ্যাত ফিল্মমেকার বেলা তার আটের দশকে একটি সিনেমা তৈরি করেছেন বইটির আখ‍্যানের উপর নির্ভর করে। বস্তুত, ক্রাসনাহরকাই-এর লেখা পড়ার আগে আমি ওঁর গল্পের উপর তৈরি Werckmeister Harmonies সিনেমাটিই আগে দেখেছিলাম। সিনেমার টেকনিক এবং দৃশ্যায়নের অভিনবত্ব মুগ্ধ করেছিল।

পরবর্তীকালে বইটি সংগ্রহ করতে গিয়ে আবিষ্কার করি, বইটির ইংরেজি ট্রান্সলেশন থাকলেও বহুল প্রচলিত নয়। লেখকও সেরকমই। প্রচারবিমুখ, নিজের ইংরেজিতে কথা বলা নিয়ে সংকুচিত। তার বই পাঠক সমাজে সমাদৃত হবে এ তাঁর কাছে একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। বরং তিনি মনে করেন, খুব বেশি হলে তাঁর বইয়ের পাঠক মেরেকেটে দশ জন। তবু এই লেখককেই প্রখ‍্যাত দার্শনিক এবং ফিল্মমেকার সুজান সোনট‍্যাগ যখন অভিহিত করেন ‘The Contemporary Hungarian Master of Apocalypse’ হিসেবে, তখন চমক লাগে।

বিস্ময়ের পর বিস্ময় জাগে যখন জানতে পারি বিশিষ্ট আইরিশ ঔপন্যাসিক Colm Toibin ব‍্যক্তিগত উদ‍্যোগে ক্রাসনাহরকাই-এর লেখার ইংরাজি অনুবাদ প্রকাশ করার অভিপ্রায়ে ২০০৬ সালে স্থাপন করে ফেলেন গোটা একটি প্রেস, কেননা ইংল্যান্ডের প্রতিষ্ঠিত প্রকাশকরা কেউই তাঁর বই ছাপাতে রাজি হননি।

এমনই এক দ্বান্দ্বিক অবস্থানে Toibin স্থাপিত Tusker Rock Press থেকে প্রকাশিত Melancholy of Resistance বইটির মধ‍্য দিয়ে লজলো ক্রাসনাহরকাই-এর সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয়।

এরপর বহুদিন কেটে গেছে। ততদিনে Satantango হয়ে আমার চলা শুরু হয়েছে Seiobo There Below-র সর্পিল পথে।

২০২৫ সালে আবারও সেই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। এবার আমা হেন ফেখককে জয়ঢাক পত্রিকার সম্পাদক বিশিষ্ট লেখক দেবজ‍্যোতি ভট্টাচার্য, আমার পরম প্রিয় দেবজ‍্যোতিদা তাঁর পত্রিকার ওয়েবজিনে ক্রাসনাহরকাই প্রসঙ্গে লেখার প্রস্তাব (নির্দেশ) দিলেন। সারা পৃথিবী তখন জেনে গেছে লজলো ক্রাসনাহরকাইকে ২০২৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁকে নিয়ে লেখার কথা ভাবাই কঠিন। একে তো সারা পৃথিবী জুড়ে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত লেখককে নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়ে গেছে। যাকে স‍্যামুয়েল বেকেট বলেছিলেন ‘Catastrophe’। উপরন্তু আজকের AI, Algorithm, সোশ্যাল মিডিয়ার দাপটে লজলো ক্রাসনাহরকাই এবং তাঁর লেখা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য ইতমধ্যেই নেটিজেনদের করায়ত্ত।

বস্তুত এ-কথাই প্রথমে মনে এসেছে, কী-বা লিখতে পারি। পাঠকই-বা কেন পড়বে?

রিলস, ইনস্টার জগতে গড়পড়তা মানুষ কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ে আট সেকেন্ডের বেশি যেখানে মনঃসংযোগ করছে না, সেখানে ক্রাসনাহরকাই-এর সাহিত‍্য এক অসম্ভব বৈপরীত্য নিয়ে জেগে থাকে। সাহিত‍্যমহল জুড়ে বহু প্রশ্ন বার বার তাঁর দিকে ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে— আপনি লিখছেন কেন? কোন অনুপ্রেরণায়? আপনি আশা করেন পাঠক পড়বে আপনার লেখা? নভেল তো মৃত। ভাষা তার শেষ প্রহর গুনছে। তবে?

স্বভাবে অত্যন্ত বিনয়ী, মৃদুভাষী মানুষটি সংকোচের সঙ্গে উত্তর দিচ্ছেন, ‘আমি লেখক নই, তবে না লিখে থাকতে পারি না।’

মনের মধ্যে ভেসে ওঠে লজলোর সাহিত্যেকে সম্মান জানিয়ে নোবেল পুরস্কার প্রদানের উদ্ধৃতিটুকু— ‘For his compelling and visionary oeuvre that, in the midst of apocalyptic terror, reaffirms the power of art.’

বিনাশের কথাকার তাঁর ভয়াল আখ্যানের প্রান্তরে ছড়িয়ে দিয়েছেন এক শক্তিশালী শিল্পের বীজ। Apocalypse কোনও একটি বিশেষ ঘটনা হিসেবে ক্রাসনাহরকাই-এর সাহিত‍্যে আসে না। বরং আখ্যানের পরতে পরতে মিশে থাকে বিনাশের উপাদান। ক্রাসনাহরকাই বলেন, মানুষ তার জীবনযাপনের মধ‍্যেই মগ্নচৈতন‍্যে বিনাশকে উপলব্ধি করে, তবু স্বীকার করে না। তিনি তাঁর সাহিত্যের অভিনব রচনাশৈলীর আবর্তে সেই বিনাশকে পাঠকের সামনে নিয়ে আসেন।

তাঁর প্রথম উপন‍্যাস Satantango-র শুরু থেকেই ক্রাসনাহরকাই স্পষ্ট করেছেন তাঁর সাহিত‍্য রচনার কারুকৃতি। যতিচিহ্নহীন বাক‍্য, মন্থর, সরীসৃপের মতো অগ্রসরমান হয়ে শেষ হয় না। তাই নতুন বাক‍্য শুরুও হয় না। একটি অধ‍্যায় একটিই বাক‍্য। আবার সবসময় বাক‍্য যে সামনে এগিয়ে চলে তাও নয়, বরং তা ফিরে আসে কখনো-বা। Tango নাচের প্রকরণের মতো। বাক‍্য‍ের চলনের বাঁকে কখনও থাকে ক্ষীণ আশা, যে আশা কোনও মহতী ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হয় না, বরং আখ‍্যানের চরিত্রকে শ্বাস ফেলার মুহূর্তটুকু জোগায় মাত্র।

Satantango শুরু হয় এমনই আশাটুকু নিয়ে। যেখানে Futaki চরিত্রটি ঘুম থেকে উঠে বসে গির্জার ঘণ্টা শুনে। যে-ঘণ্টা বহুদিন বাজেনি। গির্জাটি এখন ধ্বংসস্তূপ। Futaki যেখানে থাকে সেই জায়গা ভগ্ন গির্জাটি এতটাই দূরে যে ঘণ্টার ধ্বনি সেখানে পৌঁছানোর কথা নয়। তবু Futaki-র মনে আশার সঞ্চার হয় হয়তো কোন দমকা বাতাস ঘণ্টার আওয়াজকে এতদূর পৌঁছে দিয়েছে। আসলে Futaki বিশ্বাস করতে চায়, এই ঘণ্টাধ্বনি তার মনের ভুল নয়। বাইরের অবিশ্রান্ত বৃষ্টি, আকাশের বিষণ্ণতায় স্তিমিত আলো নিয়ে জেগে ওঠা ভোর তার সেই আশাকে নির্বাপিত করে যখন ঘুমিয়ে পড়ার নিদান দেয় ঠিক তখনই আবার ঘণ্টা বেজে ওঠে। এভাবেই তাৎক্ষণিক অনুভূতি, অনিশ্চয়তাকে বাক‍্যের বাঁকে রেখে আখ‍্যান এগিয়ে চলে।

ক্রাসনাহরকাই-এর উপন্যাস কোনও সহজ মনস্তত্ত্বকে বিবৃত করে না, চেনা ট্রোপের সঙ্গে তেমন মেলে না তাঁর গল্পের প্লট। সীমানাহীন বাক‍্য প‍্যানিকের হালকা ছোঁয়ায় শুরু হয়ে ভয়ের কাঁপন জাগিয়ে তোলে। আখ‍্যান কখনো-বা এগোয় না, বরং চক্রাকার পথে চালিত হয় সাবধানতার মুহুর্মুহু সংকেত এবং অনিবার্য বিনাশের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে। এই যেন সেই Apocalyptic Terror। ক্রাসনাহরকাই বলেছেন, তিনি বাক‍্যগুলিকে তাঁর মাথার ভিতরে শুনতে পান। লিখতে শুরু করে কোথায় তারা থামবে নিজেই জানেন না। তার সাহিত‍্যে কারুকৃতি এবং কারুবাসনা এক অনবদ‍্য পারম্পর্যে অবস্থান করে। যেখানে কারুকৃতি প্রায়শই কারুবাসনাকে অতিক্রম করে। অথবা কারুবাসনা যেন কারুকৃতের অভ‍্যন্তরে নিজেকে নির্লিপ্ত আত্মগোপনে রাখে। তাঁর লেখা পড়লে এ-কথা স্বভাবতই মনে আসে যুদ্ধ, মানুষের প্রতি মানুষের তীব্র ঘৃণা, হলোকাস্ট, Genocide-এর মধ‍্যে দিয়ে পথ চলা এক ঔপন্যাসিক ভাষাকে তাঁর শক্তির শেষ সামর্থ পর্যন্ত ব্যবহার করে দেখে নিতে চাইছেন জ্ঞান, স্মৃতি এবং তৎসংলগ্ন মানবচৈতন‍্যের পাশাপাশি ধ্বংসের ভয়াবহতা, বীভৎসতা এবং ডিস্টোপিয়ান ভবিষ্যতের অমোঘ সংকেত আখ্যানের সীমাবদ্ধ প্রকাশে শেষ পর্যন্ত কতটুকু ধরে রাখা সম্ভব। বা আদৌ সম্ভব কি না। এই পরীক্ষায় লেখকের মূল উপকরণ যে ভাষা, অনুপম বচনের রীতি, বাক্য—সমস্ত কিছুই তিনি চরমতম অবস্থানে নিয়ে আসেন। ভাঙনের শেষ প্রান্তে তাঁর শিল্প ক্ষয়িষ্ণু, বিবর্ণ, মানবসমাজের বিনাশের এক অবশ‍্যম্ভাবী নিয়তিকে উৎকীর্ণ করেও বার বার রেখে যায়  শিল্পের শক্তির স্বাক্ষর— Power of Art। তবু মহৎ শিল্প তো কোনও না কোনোভাবে সঙ্গে নিয়ে চলে আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞানকে। তাই অনিবার্যভাবে লেখকের সাহিত্যচর্চার অনুষঙ্গে লেখকের জীবন এবং তৎসংলগ্ন ঘটনা প্রবাহ এসেই পড়ে।

লজলো ক্রাসনোহোরকাই-এর জন্ম ১৯৫৪ সালের ৫ জানুয়ারি হাঙ্গেরির প্রত‍্যন্ত একটি শহর গিউলায়। বুদাপেস্টের জন অরণ‍্য থেকে অনেক দূরে অবস্থিত গিউলা শহরটি লজলোর কথা অনুযায়ী একা, কেননা তার কাছেপিঠে সেরকম কোনও জনবসতি নেই। গিউলার শৈশব লজলো ক্রাসনাহরকাই-এর সাহিত্যে বহুবার ফিরে এসেছে।

মজার ঘটনা হল, জন্মসূত্রে ইহুদি হলেও লজলোর আইন বিশেষজ্ঞ পিতা তাঁর এগারো বছর বয়স না হওয়া অবধি ইহুদি পরিচয় লুকিয়ে রাখেন। লজলো ক্রাসনাহরকাই একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে উপাধি উচ্চারণ করতে গিয়ে আমরা শুরু থেকেই হোঁচট খেয়ে আসছি। সেই ক্রাসনাহরকাই উপাধিটি প্রথম ব্যবহার করেন লজলোর দাদু। তাঁদের আদি উপাধি ছিল Korin। ১৯৩১ সালে মধ‍্য ইউরোপ জুড়ে যখন তীব্র ইহুদি-বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, লজলোর দাদু তাঁর বংশধরদের সুরক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার কথা ভেবে ক্রাসনাহরকাই উপাধি গ্রহণ করেন যা হাঙ্গেরিয়ান কালচারের সঙ্গে অনেকটা মিশে যায়। বস্তুত স্লোভেনিয়া এবং হাঙ্গেরির সীমানায় ছোটো ছোটো টিলার মাথায় অবস্থিত ক‍্যাসলগুলিকে Kraszna Horka বলা হয়। তাই একই সঙ্গে ইহুদি পরিচয় মুছে ফেলে ওই অঞ্চলের অভিজাত ঐতিহ্যকে বংশের মধ‍্যে নিয়ে আসার  একটা অভিপ্রায় লজলোর দাদুর মধ‍্যে হয়তো ছিল। যদিও লজলোর মতে, ‘I am living among the servants as a Servant myself.’ অকিঞ্চিৎকর মানুষ হিসেবে নিজের অতিসাধারণ জীবনযাপন বোঝাতেই লজলো ক্রাসনাহরকাই এই উদ্ধৃতিটি করেন।

১৯৭২ সালে ল‍্যাটিন বিষয় নিয়ে গিউলার Erkel Ferenc High School থেকে পাশ করে লজলো ক্রাসনাহরকাই Jozsef Attila University-তে ভরতি হন। পিতার পথ ধরে Law নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। এই সময়ই তাঁর প্রথম গল্প Tebenned Hittem প্রকাশিত হয়। ১৯৭৮-১৯৮৩ সাল অবধি হাঙ্গেরিয়ান ভাষা সাহিত‍্য নিয়ে গবেষণার কাজে নিযুক্ত থাকাকালীন তিনি হাঙ্গেরিয়ান ভাষার নিজস্বতা এবং ইউরোপের অন‍্যান‍্য ভাষার সঙ্গে হাঙ্গেরিয়ান ভাষার বৈসাদৃশ‍্য লক্ষ‍ করেন। লজলোর মতে, হাঙ্গেরিয়ান ভাষা একেবারেই আলাদা, অনেকটা একাকী, নির্দিষ্ট কিছু প্রকাশ করতে অনেকটাই বাক‍্য ব্যবহার করতে হয়।

মিউজিকের প্রতিও লজলোর গভীর অনুরাগ ছিল। পশ্চিমি ধ্রুপদি সংগীতের ছন্দময় বিন্যাস তাঁর সাহিত্যের গঠনশৈলীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তাঁর  আপাত এলোমেলো যতিচিহ্নহীন বাক্যের মধ‍্যেও রয়েছে মিউজিক্যাল প্রতিসাম‍্যের‍ স্পষ্ট অভিজ্ঞান। এহেন ভাষা এবং লেখনীর অনুবাদ যে কতটা কঠিন সেটা বলাই বাহুল‍্য। এখানে কৃতিত্ব দিতেই হয় George Szirtes-কে। ক্রাসনাহরকাই-এর অনুপম গদ‍্যের অন্তর্লীন ছন্দকে তিনি অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন।

ক্রসনাহরকাই-এর প্রথম উপন্যাস Satantango ১৯৮৫ সালে যখন প্রকাশিত হয়, হাঙ্গেরি তখন পুরোপুরি কম‍্যুনিস্ট শাসনের আওতায়। ক্রাসনাহরকাই-এর কথায়, ‘Hungary at that time was Unberable and Crazy country.’ স্বৈরাচারী রাষ্ট্র জনসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাই অস্তিত্ব কায়েম করতে ব্যবহৃত হচ্ছে রাষ্ট্র শক্তি। অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর, শোষণ এবং শাসনে ক্লিষ্ট হাঙ্গেরি যে তিক্ততা এনেছে ক্রাসনাহরকাই-এর ভিতরে, Satantango তারই ফসল।

Satantango-র আখ‍্যানে শয়তানের সঙ্গে কথোপকথন লিপ্ত মানুষ। স্বভাবতই শয়তান মানুষের ভাগ্য এবং যাবতীয় কর্মের নিয়ন্ত্রক। প্রত‍্যন্ত এবং একপ্রকার পরিত‍্যক্ত একটি গ্রাম উপন‍্যাসের পটভূমি। মূল চরিত্র গোটা দশেক, তার মধ্যে একজন ডাক্তার যাঁর বয়ানে লেখক গল্পটি বলছেন। একজন হেডমাস্টার, একজন মেকানিক, দুই মহিলা যৌনকর্মী, তাদের মদ‍্যপ মা, ছোটো বোন, দুই উচ্ছৃঙ্খল ভাই এবং কিছু কৃষক। তাদের বাসস্থান জরাজীর্ণ, পানশালা মাকড়সার জাল এবং একটানা সিগারের ধোঁয়ায় পরিপূর্ণ, বাইরে সারাদিন একঘেয়ে বৃষ্টির মধ‍্যে কর্মব‍্যস্ততাহীন মানুষগুলি যেন নিদারুণভাবে হাস‍্যকর হয়ে জীবন অতিবাহিত করে চলেছে। কিংবা অপেক্ষা করে চলেছে এক অনাগত ভবিষ্যতের। ঠিক এমনই পরিস্থিতিতে ইরিমিয়াস এবং পেত্রিনা দুটি চরিত্র যখন বাইরে থেকে এসে পড়ে, গ্রামবাসী তাদেরই পরিত্রাতা মনে করে। ইরিমিয়াস কোনও এক সময় সমাজকল‍্যাণ-মূলক কিছু কাজের সূত্রে এই গ্রামে এসেছিল। গ্রামবাসী ইরিমিয়াসকে সেই পরিচয়েই চিনত। প্রকৃতপক্ষে ইরিমিয়াস এবং পেত্রিনা দুজনই প্রশাসনের আন্ডারকভার এজেন্ট। উপন‍্যাসের দ্বিতীয় অধ‍্যায়ে এই দুই চরিত্রের প্রবেশের পর থেকেই রাষ্ট্র আখ‍্যানের গতিবিধি এবং চরিত্রেগুলির কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

উপন‍্যাসটি পড়তে গিয়ে প্রায়শই মনে হয়, চরিত্রগুলি Waiting for Godot-এর আখ‍্যান থেকে ছুটি নিয়ে Satantango-র পটভূমিতে এসে পড়েছে।

ক্রাসনাহরকাই-এর আখ‍্যানে ভায়োলেন্স এবং ভয় ভীষণভাবেই বাস্তব এবং সমসাময়িক। তিনি খুব সচেতনভাবেই লেখার পরতে পরতে হিংসা এবং ভয়ের আবহকে বাস্তব সত‍্যের মধ‍্যে ক্রমান্বয়ে গেঁথে দেন। কোনও রূপক বা কল্পিত ফ‍্যান্টাসির আশ্রয় নেয় না। শুধু বদলে দেন পরিচিত প্রেক্ষিত এবং গড়ে তোলেন নিজস্ব পটভূমি। এক্ষেত্রে তিনি বেকেটের তুলনায় অনেকটাই তাঁর প্রিয় লেখক কাফকার অনুসারী। যদিও সীমাহীন বাক‍্যের নিবিড় গ্রন্থনায় এবং অভিমুখের দিক দিয়ে তিনি তাঁর দুই পূর্বসূরির থেকে অনেকটাই আলাদা।

এই উপন্যাস কীভাবে কম‍্যুনিস্ট হাঙ্গেরিতে প্রকাশিত হল সেও এক বিস্ময়। Satantango বিষয়ে ক্রাসনাহরকাই-এর বক্তব্য ছিল, ‘I wrote this book to the end of despair. I thought there could be nothing more to write.’

নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার পর ঔপন্যাসিকের আর কী লেখার থাকে? তবু ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হল Melancholy of Resistance। যে উপন্যাসের কথা লেখার শুরুতেই এসেছে। অনুবাদের ক্রমের দিক থেকে ধরলে লজলো ক্রাসনাহরকাই-এর প্রথম উপন্যাস Melancholy of Resistance। Satantango-র অনেক পরে অনুবাদ হয়েছে।

১৯৮৯ সালে হাঙ্গেরি কম‍্যুনিস্ট শাসন থেকে বেরিয়ে আসে। ক্রাসনাহরকাই বলেছেন, ‘Hungary after 1989 was normal and unbearable.’

গদ‍্য রচনার যে কারুকৃতি ক্রাসনাহরকাই Satantango-র পটভূমি জুড়ে তৈরি করছেন, Melancholy of Resistance-এ সেই ঐতিহ্য পুরোমাত্রায় উপস্থিত। বরং তা আরও শানিত, আরও নিবিড়। উপন্যাসের আখ‍্যান ঘিরে থাকে এক ক্ষয়িষ্ণু গ্রাম। সেখানে হঠাৎ এসে পড়ে এক সার্কাস পার্টি, তাদের নিয়ে আসা বিরাট এক তিমি মাছের মৃতদেহ এবং এক রহস‍্যময় রাজকুমার। সার্কাস পার্টি সেই গ্রামে আসার পরপরই নানারকম গণ্ডগোলের সূত্রপাত হয় যা ক্রমশ বেড়ে উঠে গোটা গ্রামের শাসন ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে শুরু করে। ক্রাসনাহরকাই-এর গদ‍্য এখানে একই সঙ্গে সম্মোহন করে, আবার বিপুল বিস্তারের অভ‍্যন্তরে বুনে চলে ভয়ের এক নিপুণ শিল্প। সার্কাস পার্টি, বিরাট তিমি মাছের মৃতদেহ যখন গ্রামের আভ‍্যন্তরীণ আপাত শৃঙ্খলাকে ওলটপালট করে দেয়, তখন গ্রামের এক তরুণী ভালুস্কা এবং প্রজ্ঞাবান মিসেস এস্টার— দুজনেই তাঁদের নিজস্ব চারিত্রিক অনুসন্ধিৎসাকে কাজে লাগিয়ে এই গণ্ডগোলের স্বরূপ বুঝতে চেষ্টা করেন।

ক্রাসনাহরকাই-এর উপন্যাস আপাত স্বাভাবিক স্থিতিশীল অবস্থাকে ভাঙনের পূর্বাভাস হিসেবে অবধারিতভাবে নির্দেশ করে এবং দেখায় অনিবার্য এই ভাঙনের পরে মানবতাকে গ্রাস করে অন্ধকার যা সমূহ বিনাশের পথে এগিয়ে যায়।

Satantango, Melancholy of Resistance, War & War,  Seiobo There Below এবং একেবারে সম্প্রতি প্রকাশিত Herscht 07769-র আখ্যান তবু ক্ষতচিহ্নে দীর্ণ হয়ে যাওয়া ভঙ্গুর মানবসমাজের বিনাশের কথার পাশাপাশি অবসরের গানের কথাও বলে। যে গান ক্ষণিকের দানের মতো শেষ সম্বল হয়ে মানুষের কাছে আসে। দুর্বার গতিতে ছুটে চলা সমাজের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সাহিত্য যখন শব্দের বাইট, Algorithms-এর চাপে সংকুচিত, ঠিক তখনই ক্রাসনাহরকাই-এর সৃষ্টি সম্পূর্ণ উলটোদিকে দাঁড়িয়ে থাকে চূড়ান্ত মন্থরতাকে আশ্রয় করে। অনিঃশেষ বাক‍্যরাজির মধ‍্যে কমার ক্ষণিক অবকাশে চরিত্রগুলি যেন শ্বাস নেয়। লেখকের কারুকৃতি কখনও নিজেই তার নিবিড় ঘন সন্নিবেশে পাঠককে স্বস্তি দিতে পারে না। ক্রাসনাহরকাই-এর গদ‍্য যেন তেমনই সাক্ষ‍্য বহন করে। এ যেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতারই অনুরণন— ‘ছুটে কে তুলিলে শালবন, ঘনবন্ধন চারিধারে/ বাহুবন্ধন চারিধারে॥’ কোনও মহতী ভবিষ্যতের আশা নয়, ক্রাসনাহরকাই-এর সাহিত‍্য তার শিল্পের সংবর্তে পাঠককে ঘিরে রেখে ভাষা এবং আখ‍্যানের প্রতি বিশ্বাসকে আরও একবার সুদৃঢ় করে।

(অনির্বাণ বসু ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের কর্মী। ইউরোপীয় ও লাতিন আমেরিকান ক্লাসিকাল সাহিত্যের নিবিষ্ট পাঠক ও আলোচক। আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের উপাদান ও অভিমুখ এই দুই বিষয়েই তাঁর বিশেষ দখল রয়েছে।)

Leave a Reply