আফ্রিকা মহাদেশের নামিবিয়ার মরুর মাঝে আছে এক আস্ত পরিত্যক্ত শহর, যা ভূতের শহর নামেও পরিচিত। মরুভূমির চরম পরিস্থিতিতেও এই শহরে বিলাসিতার অভাব ছিল না। একসময় পৃথিবীর অন্যতম ধনী শহর ছিল এটি। রেল লাইন, বিলাস সামগ্রী, বড়ো বড়ো বাড়ির কাঠামো— সব আছে। নেই শুধু শহরের বাসিন্দারা। মরুর মিহি বালিকণা এসে ঢেকে দিয়েছে এক সমৃদ্ধ জনপদ। লিখেছেন অরিন্দম দেবনাথ।

নামিবিয়ায় প্রথম রেলপথের সূচনা হয়েছিল ১৮৯৫ সালে কেপ ক্রসে (cape cross) খনির প্রয়োজনে অল্প দীর্ঘের রেলপথ তৈরির মধ্যে দিয়ে।

আনুমানিক ১৪৮৪ সালে পর্তুগালের রাজা দ্বিতীয় জন, পর্তুগিজ নাবিক তথা অভিযাত্রী দিওগো কাওকে (Diogo Cão) মশলার দেশ ভারতে পৌঁছানোর সহজ সমুদ্রপথ খুঁজে বের করার আদেশ দেন। সম্রাটের হুকুম মেনে তিনি আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ধরে রওনা দেন। যেতে যেতে তিনি নানা নতুন জায়গার সঙ্গে পরিচিত হতে থাকেন এবং এই পথে চলতে চলতে তিনি বেশ কিছু অঞ্চল বেছে নিয়ে সেখান পাদরোয়েস (padroes) বা পাথরের ফলক লাগিয়ে তা পর্তুগিজের রাজার নামে দাবি করেন। প্রথম সমুদ্র যাত্রায় তিনি মন্টে নিগ্রো নামে একটি স্থানে পৌঁছান। বর্তমানে অঞ্চলটি কাবো দে সান্তা মারিয়া নামে পরিচিত যা আজকের অ্যাঙ্গোলার বেংগুয়েলা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত।
এরপর দ্বিতীয় সমুদ্র যাত্রায় তিনি কেপ ক্রসে পৌঁছান। দিওগো কাও ছিলেন এই অঞ্চলে পৌঁছানো প্রথম ইউরোপীয়। এইখানে পৌঁছে তিনি পাদরোয়েস পুঁতে জায়গাটি পর্তুগালের অধীন বলে দাবি করেন। বর্তমানে কেপ ক্রসে যে পাদরোয়েসটি দেখা যায় সেটি আসলের প্রতিলিপি। ১৮৯৩ সালে জার্মান নৌবাহিনীর কমান্ডার কর্ভেট ক্যাপ্টেন গটলিব বেকার পাদরোয়েসটি খুলে বার্লিনে নিয়ে যান। পাদরোয়েসটি এখনও ডয়চেস হিস্টোরিশেস মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে আসল পাদরোয়েসের প্রতিলিপি কেপ ক্রসে প্রোথিত হয় ঐতিহাসিক স্বার্থে। যদিও নামিবিয়াতে পর্তুগিজরা কখনও নিজেদের উপনিবেশ গড়তে চায়নি। কেপ ক্রস বর্তমানে একটি সংরক্ষিত এলাকা ও নামিবিয়া সরকারের অধীনে কেপ ক্রস সিল রিজার্ভ নামে পরিচিত। বিশ্বের সবচাইতে বড়ো ‘কেপ ফার সিল’-দের বাসস্থান।
১৮৮৪ সালে জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে নামিবিয়াকে ‘জার্মান সাউথ ওয়েস্ট আফ্রিকা’ নামে একটি উপনিবেশ হিসেবে দাবি করে যা ছিল ‘স্ক্রাম্বল ফর আফ্রিকা’র অংশ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, বিশেষ করে ১৮৮১ সাল থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় নানা শক্তি বিশেষ করে বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি, দ্য ইউনাটেড কিংডম, ইটালি, পর্তুগাল ও স্পেন আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে দ্রুত দখলদারি শুরু করে উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে আফ্রিকাকে ভাগ করা শুরু করে যা আফ্রিকার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে। এটাই ছিল ‘স্ক্রাম্বল ফর আফ্রিকা’ বা আফ্রিকার ভাগবাটোয়ারা। ১৯১৪ সালের মধ্যে আফ্রিকার ৯০% চলে যায় ইউরোপিয়ান শাসনকর্তাদের হাতে। আফ্রিকায় দখলদারি শুরু হবার আগে মাত্র ১০% আফ্রিকার অংশ ছিল ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের অধীন। শুধুমাত্র তিনটে দেশকে ইউরোপিয়ানরা কব্জা করতে পারেনি— ইথিওপিয়া, লাইবেরিয়া ও সোমালি।
এই উপনিবেশ স্থাপনের হুড়োহুড়ির আগে বেশিরভাগ ইউরোপীয় শক্তি আফ্রিকা নিয়ে উৎসাহী ছিল না। শুধু তাই নয়, আফ্রিকার প্রাচুর্য ও গুরুত্ব নিয়ে তাদের খুব একটা ধারণাও ছিল না। শুধুমাত্র পর্তুগিজরা টের পেয়েছিল আফ্রিকা উপকূলের গুরুত্ব। ১৫ শতক থেকে ‘আবিষ্কারের যুগ’ নামে পরিচিত সময়কালের মধ্যে পর্তুগিজ নাবিকরা নানা জায়গা খুঁজে বের করেছিল আর আফ্রিকার উপকূলের নানা জায়গায় বাণিজ্যিক ঘাঁটি, দুর্গ ও বন্দরসহ নানা পরিকাঠামো তৈরি করেছিল।

জার্মান কলোনিয়াল অথরিটি নামিবিয়াতে প্রথম বড়ো রেলপথ তৈরির কাজ শুরু করে ১৮৯৭ সালে। নামিবিয়ার শহর স্বকোপমুন্ড থেকে সমুদ্রতল থেকে ৫,৬০০ ফুট উঁচু উইন্ডহোক পর্যন্ত ২৬২ কিলোমিটার ৬০০ মিমি গেজের রেলপথ ১৯০২ সালে তৈরি হয়ে, ১৯ জুন চালু হয়ে যায়। চারজন অফিসার, ২৯০ জন সৈনিক আর ৮০০ স্থানীয় শ্রমিক মিলে তৈরি করেছিল এই রেলপথ। এই রেলপথ তৈরির আগে স্বকোপমুন্ড থেকে উইন্ডহোক যেতে কম করে দশদিন সময় লাগত। রেল চালুর সময় প্রথম দিকে এই পথ পার হতে তিনদিন লাগত, তারপর তা কমে দাঁড়ায় দু-দিনে। সে-সময় মরুর মাঝ দিয়ে স্টিম ইঞ্জিনে টানা রেলগাড়ি ছুটত প্রতি ঘণ্টায় ১৪ কিমি পথ।
সরকারের পাশাপাশি ওটাভি মাইনিং অ্যান্ড রেলওয়ে কোম্পানি ‘জার্মান সাউথ ওয়েস্ট আফ্রিকা’তে (বর্তমান নামিবিয়া) রেলপথ তৈরির কাজে হাত দিয়েছিল। মরুর মাঝের বালি আর মাটির তলা থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ খুঁড়ে বের করে তা দ্রুত উপকূলের জাহাজ ঘাঁটিতে নিয়ে আসার জন্য রেল পরিবহন খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। কারণ, বালির মধ্যে দিয়ে পশুতে টানা গাড়িতে খনিজ বয়ে আনা সহজ ছিল না।
এইরকম এক রেলপথ তৈরির সময় আচমকাই পাওয়া গেছিল হিরের খোঁজ। ১৯০৮ সালে সে-সময়কার ‘জার্মান সাউথ ওয়েস্ট আফ্রিকা’ এক নামিবিয়ান রেল শ্রমিক, জাকারিয়াস লেওয়ালা যখন আউস-লুডেরিৎজ রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণে কাজ করেছিলেন, তখন তিনি গ্রাসপ্লাটজে রেলওয়ে স্টেশনের কাছে বেশ কয়েকটি পাথর দেখেন যা দেখে তার মনে হয়েছিল এগুলো হীরা না হয়ে যায় না। হিরে চিনতে ভুল হয়নি লেওয়ালের। কারণ, এর আগে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার কিম্বার্লির হিরের খনিতে শ্রমিকের কাজ করতেন। অশোধিত হীরা শনাক্তকরণে লেওয়াল পারদর্শী ছিলেন। কর্তব্যে কোন খামতি না রেখে তিনি পাথরের টুকরোগুলো তুলে দেন তার সুপারভাইজার জার্মান রেলওয়ে ইন্সপেক্টর আগস্ট স্টাউচকে। ‘দেখুন স্যার, দামি পাথর।’ স্টাউচ পাথরগুলো বিশ্লেষণের জন্য পাঠিয়ে দেন স্বকোপমুন্ডে। রিপোর্ট আসতে দেরি হয়নি, এলাকাটি হিরেতে ভরতি অনুমান করে জার্মান সরকার নামিবিয়ার দক্ষিণ উপকূলের প্রায় পুরো অংশে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে ‘স্পেরজিবিট’ অর্থাৎ ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ বলে ঘোষণা করে। লেওয়ালের নাম হিরের খনির আবিষ্কারক হিসেবে ইতিহাসে লেখা হলেও এর বিনিময়ে তিনি কিছু পাননি। না অর্থ, না সম্মান। বরং তাঁর আবিষ্কারে ভর দিয়ে অন্যরা দ্রুত অর্থ কামিয়ে নিয়েছে।
যেখানে এই শহরটা গড়ে উঠেছিল, তার নাম কোলম্যানস্কপ (Kolmanskop)। কথিত, জনি কোলম্যান নামের এক পরিবহন গাড়িচালক প্রবল মরু ঝড়ের মধ্যে তার গোরুর গাড়ি এক বালি পাহাড়ের ঢালে ফেলে পালিয়ে যায়। ওই গাড়োয়ানের নামে জায়গাটার নাম হয়েছিল কোলম্যানস্কপ। আফ্রিকান ভাযায় যার অর্থ ‘কোলম্যানের চূড়া – কোলম্যান’স পিক’।
হীরা ব্যবসায়ীদের দৌলতে দ্রুত জায়গাটার ভোল বদলে যায়। জার্মান ঘরানার শহর তৈরি হয়। তাতে হাসপাতাল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, স্কুল যেমন ছিল, তেমন মনোরঞ্জনের নানা উপকরণ তৈরি হয়েছিল। বলরুম, স্কিটল-অ্যালি, থিয়েটার, স্পোর্টস হল, ক্যাসিনো, বরফ কারখানা— এইসবের পাশাপাশি শহরের মধ্যে যাতায়াতের জন্য তৈরি হয়েছিল ট্রাম লাইন।

বসেছিল দক্ষিণ গোলার্ধে প্রথম এক্স-রে স্টেশন। শুধু রোগের চিকিৎসার জন্যই নয়, এই মেশিন ব্যবহার করা হত হিরে চোরাচালান ধরতে। এই শহর থেকে উপকূলবর্তী বন্দর তথা খনি অঞ্চল লুডেরিৎজ পর্যন্ত ১.৫ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎচালিত বেসরকারি রেললাইন বসেছিল খনি ব্যাবসার স্বার্থে। ১৯১৩ সালে এই রেলপথ চালু হলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার পর ১৯১৫ সালে ‘সাউথ আফ্রিকান’ দল এই রেলপথ ধ্বংস করে দেয়। দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনিয়ন ছিল বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের পূর্বসূরি। ১৯১০ সালের ৩১ মে কেপ, নাটাল, ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ রিভার উপনিবেশগুলো এক হয়ে এই ইউনিয়ন তৈরি করে। আরও একটি ৭ মাইল লম্বা লাইন তৈরি হয়েছিল শার্লটেন্টাল নামের আর এক খনি শহরকে জুড়তে, যা ১৯২০ সালে চালু হয়েছিল।
মরুতে জলের সমস্যা মেটাতে কেপটাউন থেকে প্রথমে জল আসত লুডেরিৎজ-বেতে। তারপর সেই জল রেলপথে নিয়ে যাওয়া হত কোলম্যানস্কপে। সেখান থেকে খচ্চরের পিঠে জল যেত হীরা উত্তোলন ক্ষেত্রে। হীরার খনির মজুরদের অমানুষিক পরিশ্রম করতে হত। সপ্তাহে ছ’দিন কম করে ন’ঘণ্টা করে কাজ, আর ছুটি মিলত ইস্টার আর ক্রিসমাসে। শহরের সব বাড়িঘর তৈরি হয়েছিল মরুভূমির কঠোর বালিঝড় মোকাবিলা করার মতো করে। ধনী লোকেরা আবার বাড়ি বানিয়েছিলেন পাহাড়ের ওপরে, হঠাৎ করে যেন বালিতে ডুবে না যেতে হয়— এই ভয়ে। শহরের এক বাসিন্দা ম্যারিয়ান যিনি খুব ছোটো থাকতে ১৯২০ সাল নাগাদ এই শহরের বাসিন্দা ছিলেন, তিনি লিখে গেছেন এই শহরের ভরপুর আনন্দের জীবনযাত্রার কথা। শ্যাম্পেন, বিয়ার কোনোকিছুর অভাব হত না। যদিও খাবারের বৈচিত্র্য ছিল না। মূলত শুকনো গোরুর মাংস, টিনজাত মাছ মিলত। তবে মাঝে মাঝে রেলপথের দৌলতে তাজা শাকসবজি জুটত, কিন্তু সেগুলোর দাম ছিল খুব বেশি। ম্যারিয়ানের একটা পোষা উটপাখি ছিল। সেই উটপাখিকে দিয়ে সে বালির মধ্যে স্লেজ টানিয়ে বেড়াত। সেটাই ছিল তার অন্যতম বিনোদন। এই খনি শহরের শ্রমিক ও কর্মচারীরা বিনামূল্যে বাসস্থান, বিদ্যুৎ, আর জ্বালানি পেত। খনি কর্তৃপক্ষ খনি মরুর মাঝে থাকা শ্রমিকদের বিনোদনের জন্য যাত্রাদল (অপেরা) ভাড়া করে নিয়ে আসত ইউরোপ থেকে। লুডেরিৎজ থেকে পর্যন্ত লোকেরা এই যাত্রা দেখতে আসত। এই বিনোদনের সব ব্যবস্থাই কর্তৃপক্ষ করত বিনামূল্যে যাতে শ্রমিকরা একঘেয়ে বালিময় জীবনের স্বাদ বদলাতে পারে। আসল কথা ছিল যাতে শ্রমিকরা তাদের পুরো শক্তিতে কাজ করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হবার পর থেকে এই হীরার খনি শহরের পতন শুরু হয় হিরে নিঃশেষ হওয়ায়। ১৯২০ সাল নাগাদ শুরু হয় এই শহরের অবক্ষয়। ১৯২৮ সালে এই শহর থেকে ২৭০ কিমি দক্ষিণে অরেঞ্জ নদীর কাছে সমুদ্রসৈকতের কাছে ওরাঞ্জেমুন্ডে আর একটি হীরক অঞ্চলের খোঁজ মিলতে শহর থেকে খনি শ্রমিক সব ছেড়েছুড়ে ছুট লাগায় নতুন জায়গায় হিরের খোঁজে। ১৯৫৬ সালে এই শহর পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়। এক সময়কার বিশ্বের অন্যতম ধনী শহর, যা ছিল মরুভূমির চরম পরিস্থিতেও বিলাসিতা আর প্রাচুর্যে ভরা, ধীরে ধীরে বালির তলায় চাপা পড়ে যেতে থাকে।

প্রত্যন্ত নামিব মরুর মাঝে হারিয়ে যায় হিরের শহর আরও অনেক মরু শহরের মতো। সবকিছু বালিচাপা পড়ে গেলেও মরুর শুকনো আবহাওয়া কোনোকিছুই নষ্ট হয়ে যেতে দেয়নি। সংরক্ষণ করে রেখেছিল পরিত্যক্ত ভূতুড়ে শহরটাকে। মরুর ঝোড়ো বাতাস বালিতে ঢেকে যাওয়া বাড়িঘর থেকে খানিক বালি সরিয়ে নিতে চোখের আড়ালে চলে যাওয়া মৃত শহরের সামান্য অংশ আবার জেগে ওঠে বালির বুকে।
১৯৮০ সালে জমির মালিক দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত ব্রিটিশ হীরা কোম্পানি ডি বিয়ার্স এই বাড়িঘরের কয়েকটি বালি থেকে খুঁড়ে বের করে এখানে পর্যটকদের নিয়ে যাওয়া শুরু করে। শুরু হয় ভূতুড়ে শহরে বেড়ানোর আর এক উন্মাদনা। বালির তলায় অর্ধেক চাপা পড়ে থাকা ঘরবাড়ি, থিয়েটার হল, বরফ কল, ক্যাসিনো— পর্যটকদের চোখের সামনে এনে দিল আলাদা এক ভূতুড়ে পর্যটন অনুভূতি। যে-কোনো মুহূর্তে এসে হাজির হতে পারে বাড়ির মালিক অথবা থিয়েটার হলের দর্শক। এই মৃত শহরে শুরু হয়ে একের পর এক সিনেমার শুটিং।
বি.বি.সি-র ‘ওয়ান্ডার্স অফ দ্য ইউনিভার্স’ সিরিজের শুটিং শুরু হয় এখান থেকে। অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট চ্যানেলের ‘অ্যানিম্যাল অপ্রাইজিং’ শিরোনামের সিরিজের ‘মিস্ট্রিজ অফ দ্য অ্যাবান্ডনড’ এই কোলম্যানস্কপকে নিয়ে। ১৯৮৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার টিভি চ্যানেল ‘দ্য মন্টিস প্রজেক্ট’-এর শুটিংয়ের লোকেশন ছিল কোলম্যানস্কপ। ১৯৯০ সালে অ্যাডভেঞ্চার চলচ্চিত্র ‘দ্য স্যান্ডগ্রাস পিপল’-এর চিত্রগ্রহণ হয়েছিল এখানে। ১৯৯৩ সালে ‘ডাস্ট ডেভিল’ সিনেমার অনেকটাই কোলম্যানস্কপে চিত্রায়িত হয়। ২০০০ সালে ‘দ্য কিং ইস অ্যালাইভ,’ ২০১০ সালে ‘লাইফ আফটার ডেথ’ সহ বহু হাড় কাঁপানো ছবি তৈরি হয়েছে এই বালিচাপা পড়া শহরে। এখনও নিয়মিত শুটিং হয় এখানে। অর্থাৎ, কোলম্যানস্কপ ব্যবসায়ীদের পাথর থেকে অর্থ না দিতে পারলেও অন্যভাবে অর্থ দিয়ে চলেছে।
কেমন এই ভূতুড়ে শহরে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা? চলুন শোনা যাক একজন ভ্রমণকারীর কাছ থেকে।
লরেন জুলিফ (ভ্লগার): ভোরের আলো ফুটবার আগে একটা বালিয়াড়ি টপকে পৌঁছেছিলাম নামিবিয়ান মরুভূমির মাঝে ভূতের শহরে। ঘোলাটে অন্ধকারে আমি আর ডেভ ছাড়া ত্রিসীমানায় কেউ নেই। থম মেরে থাকা ভয়ংকর পরিবেশে শুধু তীব্র বাতাস বইবার শব্দ আর মিহি বালির উড়ান।
এই শহর নামিবিয়ার অন্যতম টুরিস্ট ডেসটিনেশন হলেও খুব একটা কেউ এখানে আসে না। নামিবিয়ার রাজধানী উইন্ডহোক থেকে কোলম্যানস্কপ প্রায় ৭০০ কিলোমিটার। গাড়িতে যেতে আট-ন’ঘণ্টা সময় লাগে। সবচাইতে কাছের শহর লুডেরিৎজ থেকে কোলম্যানস্কপ পৌঁছতে গাড়িতে মাত্র আধঘণ্টামতো সময় লাগে। উইন্ডহোক থেকে লুডেরিৎজ প্লেনে যাওয়া যায়। সেখান থেকে নানা পর্যটন সংস্থা কোলম্যানস্কপ নিয়ে যায়। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই ভূতের শহরে থাকতে ও ছবি তুলতে অর্থের বিনিময়ে টিকিট কাটতে হয়। আমরা সূর্যোদয়ের অনেক আগেই গাড়ি চালিয়ে ভূতের শহরের গেটে পৌঁছে দেখি গার্ডের দেখা নেই। সূর্য আকাশে সামান্য উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করলেও গার্ডকে দেখতে না পেয়ে দোনোমনা করে ঢুকে যাই টিকিট না কেটেই। ভাবি, এ তো নয় যে আমরা টিকিট কাটব না, গার্ড এলে টিকিটের টাকা দিয়ে দিলেই হবে। বালির তলায় আধা চাপা পড়ে থাকা মায়াবী লালচে আলোয় ছবি তোলার সুযোগ হারাতে চাইনি।
গার্ডের অফিসের কাছে গাড়ি পার্ক করে দরজা লক করে ক্যামেরা নিয়ে একটা বালিয়াড়িকে বেড় দিয়ে ঢুকে পড়েছিলাম শহরে। সকাল ৫টা ১০। গা শিরশির করে উঠেছিল। ভোরের ফ্যাকাশে আলো যতই তেজি হচ্ছিল, নীরবতা ততই ভয়ংকর হয়ে উঠছিল। ভূতুড়ে শহরের আবছায়ায় ঘরবাড়িগুলো এত অস্বস্তিকর লাগছিল যে, আমি আমার মোবাইলের টর্চটা জ্বেলে দিয়েছিলাম। যখন এই ঘরবাড়িগুলো তৈরি হয়েছিল তখন এর মালিকরা নিশ্চয়ই ভাবতে পারেননি ভবিষ্যতে কী হতে চলেছে। কে-ই-বা পারে?
আমি বাড়ির দরজা দিয়ে ছবি তোলা অর্ধেক বালিতে ডোবা আধখোলা দরজা দিয়ে শুরু করেছিলাম।

ভেবেছিলাম আধখোলা দরজা দিয়ে ঢুকে সবক’টা বাড়ি একইরকম দেখব। কিন্তু একের পর এক বাড়িতে ঢুকে দেখলাম, সবগুলোই একে অন্যের থেকে আলাদা। প্রতিটি বাড়ির ঘরের রঙ আলাদা— নীল, কমলা, হলুদ, হালকা সবুজ… রান্নাঘরের টালিগুলোর রঙগুলোও আলাদা। কিছু ঘরের বালি সরানো হলেও অধিকাংশ ঘর বালিতে ঢাকা। সব বাড়িতে ঢোকা সম্ভব ছিল না, কারণ দরজাগুলো বালি চাপা পড়ে। আবার কয়েকটা বাড়ির জানালার বালি সরিয়ে ঢোকার ব্যবস্থা করে রাখা আছে।
একটা বাড়ির জানালা দিয়ে যখন ঢোকার চেষ্টা করছিলাম তখন হঠাৎ কাছ থেকে চিৎকার কানে এসেছিল। তাড়াতাড়ি বালিতে লাফিয়ে নেমে দেখি গার্ড। আমাদের বিনা টিকিটের গাড়ি দেখতে পেয়ে লোক খুঁজতে শুরু করেছে। ডেভ এগিয়ে গিয়ে গার্ডকে বুঝিয়ে বলে ঝামেলা মেটাতে গার্ডের ঘরের দিকে গেছিল। আমি চাইছিলাম অন্য কোনও টুরিস্ট এসে পড়ার আগেই যতটা সম্ভব ঘুরে নিতে। আরও লোক পৌঁছে গেলে এই অনুভূতি নাও মিলতে পারে। সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়ছিল সাদাটে বালিতে। উড়ন্ত বালিতে ঢেকে ছিল সমস্ত পায়ের চিহ্ন। হাওয়ার শনশন, আমার নিশ্বাসের ফোঁস ফোঁস আর ক্যামেরার শাটারের ক্লিক ক্লিক শব্দ ছাড়া আশেপাশে আর কোনও প্রাণের সাড়া নেই। ডেভ ফিরে আসতে আবার অন্য প্রাণের ছোঁয়া পেয়েছিলাম।
খুব ঠান্ডা ছিল সকালটা, তার ওপরে জুতোতে বালি ঢুকে হাঁটা বিরক্তিকর হয়ে উঠেছিল। কেন যে স্যান্ডেল পরে আসিনি! মরু অঞ্চলের লোকেদের দেখে আগেই বোঝা উচিত ছিল। বালির ঢেউ সারা শহর জুড়ে। বাড়িগুলোতে ঢুকে অবাক হচ্ছিলাম রান্নাঘরে মরচে পড়া কেটলি, বাথরুমের বিশাল বাথটাব আর শোওয়ার ঘরের বিছানা অবিকৃত অবস্থায় দেখে। মনে হচ্ছিল যেন এক্ষুনি বাড়ির মালিক এসে হাজির হবেন। যদিও অধিকাংশ বাড়ির মেঝে নষ্ট হয়ে গেছিল, ঘরের সিলিং ঝুলে পড়েছিল, তবু মনে হচ্ছিল ঘরগুলো যেন কারও অপেক্ষায় আছে। বাড়ির ভেতর দরজাবিহীন এক-এক ঘরের এক-এক রঙ আর বাইরের বালির ফ্যাকাশে হলুদ, চোখের সামনে এক অদ্ভুত কনট্রাস্ট জাগিয়ে তুলছিল।
বিচিত্র দুনিয়া- আরো পর্ব–>
ভালুকের খপ্পরে বড়োদিনের বারবেলা একটি ঈগলের কাহিনী আকাশের ‘ডাক’ পাইথন শিকার অভিযান বল্গাহরিণের খোঁজে চাই গো আমি রাজা হতে বামনের দেশ হীরক জ্বর পোষ্যের অন্তিম যাত্রা খেদাই বাগদির বেঁচে ফেরা তিমির গান চামপ্লিন হ্রদের দানো মই ছাড়া বলদ দৌড় ফ্রাঙ্কলিন সাহেবের ট্রেন কাদার ফাঁদ আটহাজার বছর প্রাচীন পদ্ধতির মধু শিকার কি শেষের পথে ভারতের মিস্টার ভ্যাকসিন কৃষ্ণমূর্তি এল্লা ঘুড়ির টানে সমাধিপুরী আস্তানা হোইয়া-বাকুই নিষিদ্ধ স্নেক আইল্যান্ড ঈশ্বর পর্বতের মৃত্যু হ্রদ চিয়েঙ্গির বোমা ঘেরা গ্রাম ঝাড়ুদারি কারচায় লেক মাকড়শা সাপ লম্বা চুলের দেশ মরুভূমির লেক-এ মাছ ধরা লম্বা গলার গ্রাম জুতা আবিষ্কার ভূতুড়ে রেডিও স্টেশন মোবাইল ফোন বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু রেলপথ, হোলো বান্দর, ডাইনি গ্রাম