কাতুকুতু -এম বি বি এস এম আর সি পি-স্বপ্না লাহিড়ী-জয়ঢাক৪৯-বর্ষা ২০১৫

katukutu4903

সকাল বেলা বাড়ি ফেরার পথে ভাবলাম,আজ একটু অন্যপথে বাড়ি ফেরা যাক। এ পথটা তো এতো চিনি যে এর গাছপালা পাথর মাটি খানা খন্দ সব মুখস্ত হয়ে গেছে। জীবনে নতুন ছন্দ আনার জন্য একটা অন্য পথ ধরি । পথের ধারে বাঁক নিয়ে নতুন রাস্তা ধরে চলতে শুরু করলাম।

বেশ নতুন নতুন গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে, নতুন দৃশ্য দেখতে দেখতে চলছিলাম। একটা জায়গায় রাস্তার ধারে একদম নতুন আনকোরা ঝকঝকে একটা ডাক্তারখানা দেখে থমকে দাঁড়ালাম। নতুন বোর্ডে নাম লেখা ডাঃঅতনু মিশ্র,পাশে অনেকগুলো ডিগ্রি। ভাবলাম অনেকদিন রক্তচাপ পরীক্ষা করানো হয়নি, করিয়েই নিই।কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখলাম, কোনও লোকজন নেই, শুধু ডাক্তারবাবু চেয়ারে বসে সামনের টেবিলে রাখা প্লেট থেকে একটা একটা করে চিনেবাদামের দানা মুখে দিচ্ছেন। চিবুচ্ছেন, কিন্তু গিলছেন কিনা বুঝতে পারলাম না। ‘ডাক্তারবাবু’ বলে ডাকতেই, তিনি একটা চোখ খুলে বললেন, “ক্যামন আছেন?” যেন কতদিনের চেনা।

বললাম, “ভালো।”

তেমনিই চোখ বন্ধ করে রেখে তিনি বললেন, “তা ভালো আছেন তো এখানে কেন?”

বলতে যাচ্ছিলাম, “রক্তচাপটা…”

তার আগেই তিনি সটান সোজা হয়ে বসে বললেন, “শরীরের যন্ত্রপাতিগুলো গন্ডগোল করছে তো? হাত, পা,ঘাড়ের কলকব্জাগুলোও বিকল হয়ে উঠেছে?”

আমি “না না” বলতেই খ্যাঁক করে উঠে বললেন, “ডাক্তার আমি না আপনি?”

ভয়ে ভয়ে বললাম, “আপনি।”

আমাকে আপাদমস্তক দেখে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,”উঠুন, উঠে দাঁড়ান।”

আমি উঠে দাঁড়ালাম। উনি আমার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে একটা দেয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে বললেন, “একটা হাত ওপরে তুলুন।”

আমি বাঁ হাতটা ওপরে তুলতেই বললেন, “ওমনি করেই দাঁড়িয়ে থাকুন।”

একটু পরেই হাতটা টনটন করতে যেই নামিয়েছি ওমনি এক ধমক, “শুনতে পাননি আপনার কাঁধের স্ক্রুগুলো কেমন কটকট করে উঠলো?”

আমি বললাম, “না তো!”

উনি বললেন, “সে কী?  আপনার কানটাও গেছে নাকি?” তারপর একটু এদিকওদিক ঘুরে এসে ফের বললেন,“আচ্ছা এবার আপনি এ হাতটা নামিয়ে অন্য হাতটা তুলুন।” আমি বাঁ হাতটা নামিয়ে ডান হাতটা তুলতেই বললেন,”বাঁ পাটাও হাঁটু থেকে মুড়ে দাঁড়ান।”

আমার হাঁটুতে এমনিতেই খুব ব্যথা। হাঁটু মুড়়ে দাঁড়াব কী করে ভাবতে ভাবতেই বললাম, “ডাক্তারবাবু হাতের সঙ্গে পা-ও?”

উনি আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঘোঁত্ করে একটা শব্দ করে বললেন, “ব্যালান্স কাকে বলে জানেন? যখন হাঁটেন তখন পায়ের সাথে হাতও চলে কি না?”

ভাবলাম, ঠিক। দেওয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে নিজের ব্যালা্ন্সটাকে একটু সামাল দিলাম। একটু পরে ডাক্তারবাবু আমার একেবারে কাছে এসে বললেন, “আপনার হাত পায়ের স্ক্রুগুলো মর্চে খেয়ে ঘষে গেছে মশাই। বয়স কত হল?”

বললাম, “তা সত্তর হবে।”

উনি বললেন, “তা ই।”

বলতে যাচ্ছিলাম, “ওগুলো তো বল অ্যান্ড সকেট….”

বল পর্যন্ত শুনেই চোখ কপালে তুলে বলে উঠলেন, “বল? এই বয়সে বল খেলবেন আপনি? পুরো শরীর বিকল, আর আপনি কিনা– হুঁ হুঁ..”

বলতে বলতে ভেতরে ঢুকে গেলেন । একটু পরেই বেরিয়ে এলেন দুহাত প্রমাণ লম্বা একটা স্ক্রু ড্রাইভার নিয়ে। হয়তো এবার আমার স্ক্রুগুলো টাইট করা হবে! ভয়ে ভয়ে বললাম, “ডাক্তারবাবু একটা কথা জিজ্ঞেস করি? 

আমার ওপর দয়া করে তিনি বললেন, “বলুন।”

বললাম, “হাত পায়ের স্ক্রুগুলো কি আমার ছোট থেকেই আছে?”

উনি বললেন, “নিশ্চয়। সেজন্যেই তো ওগুলোর এই অবস্থা! সত্তর বছর বয়স তো আর চাট্টিখানি কথা নয়!”

শুধোলাম, “তখন থেকেই এত বড় বড়?”

উনি বললেন, “না না তা কেন? তখন ছোটই ছিল। তারপর ওগুলো আপনার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে, এবার ওদের খুলতে হবে।”

বলেই স্ক্রু ড্রাইভারটা বাগিয়ে ধরে এগিয়ে এলেন আমার দিকে। আস্তে আস্তে বললাম, “ডাক্তারবাবু , স্ক্রুগুলোতে সব মর্চে পড়ে গেছে তো! ওগুলোকে একটু তেল খাইয়ে নিলে হয় না? খুলতে গিয়ে আধখানা ভেঙে গিয়ে যদি ভেতরে পড়ে যায়….যতোই হোক ওরিজিনাল পিস তো!”

একটু ভেবে উনি বললেন, “তা ঠিক,” তারপর ভেতর থেকে একটা লম্বা গলা অয়েল ক্যান নিয়ে এলেন। কি বিচ্ছিরি গন্ধ! জিজ্ঞেস করলাম, “এটা কী তেল?”

উত্তর পেলাম একটু শক্ত গলায়, “পুরোন মবিলের সঙ্গে আমার কিছু নিজস্ব লতা পাতা সেদ্ধ করা আছে….”

বলেই হড় হড় করে সেই তেল ঢালতে থাকলেন আমার মাথা থেকে গায়ে। গন্ধে ততক্ষণে অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসছে । আমার গোটা শরীর চপচপে তেলে চুবিয়ে বললেন, “চব্বিশ ঘন্টা এই তেলটা থাকুক, স্ক্রুগুলো ভিজুক। কাল আপনি ঠিক এই সময় আসবেন, ভুলবেন না। না এলে যেখানেই থাকবেন ধরে নিয়ে আসবো। এখন দশটা টাকা দিয়ে যান আমার চিকিৎসা বাবদ।”

কোন রকমে পকেটে হাত ঢুকিয়ে তেল চপচপে একটা দশ টাকার নোট দিয়ে, দৌড়ে বাইরে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

বাড়ি ফিরে, স্নান করে সোজা স্টেশনে। টিকিট কেটে মুম্বই। ছ’মাস আর এ মুখো হই নি।

ছবিঃ মলয়চন্দন সাহা

জয়ঢাকি কাতুকুতু লাইব্রেরি 

Leave a Reply