ক্রোড়পত্র- নোবেল ২০২৫-রসায়ন-ধাতু-জৈব কাঠামো এবং তাদের স্থপতিগণ-অমিতাভ প্রামাণিক-শীত’২৫

ধাতু-জৈব কাঠামো (Metal-Organic Framework, MOF) বস্তুটাকে পাঠ্য রসায়নের কৌতূহলের সীমানা অতিক্রম করে আধুনিক ব্যাবহারিক বস্তুদের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা জাগ্রত ও জোরদার করার জন্য ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের রসায়নের নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-রসায়নবিদ সুসুমু কিতাগাওয়া, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-রসায়নবিদ রিচার্ড রবসন এবং আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় – বার্কলের অধ্যাপক-রসায়নবিদ ওমর ইয়াঘি।  

ভূমিকা- ‘ধাতু-জৈব কাঠামো’ কী বস্তু?

নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর থেকে মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক (মফ) বা ধাতু-জৈব কাঠামো নিয়ে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি হয়েছে। জয়ঢাকের পাঠক-পাঠিকাদের ‘মফ’ সম্বন্ধে ধারণা দেওয়ার জন্য আমাদের শুরু করতে হবে একটু গোড়ার থেকে।

আমাদের চারপাশে আমরা যে-সমস্ত বস্তুই দেখি, সবই কোনো না কোনো রাসায়নিক পদার্থ, হয় বিশুদ্ধ অবস্থায় আছে, অথবা আছে কোনো মিশ্রণ হিসাবে। এদের বিষয়ে ব্যাপক অনুসন্ধানের সুবিধার জন্য এদের বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যেমন জৈব ও অজৈব রাসায়নিক। জৈব রাসায়নিক মানে কার্বনের যৌগ, যাদের অধিকাংশই কোনো জীবিত প্রাণের অংশ ছিল বলে ধারণা করা হয়েছিল। যেগুলো জৈব নয়, তারা অজৈব। সমস্ত যৌগ বিভিন্ন মৌল দিয়ে তৈরি, যাদের সম্পূর্ণ তালিকার নাম পর্যায় সারণি। পর্যায় সারণির অধিকাংশ সদস্যই ধাতু, তারা সজ্জিত থাকে এই সারণির বাঁ-দিকে আর মদ্যিখানে। ডানদিকেরগুলোর অধিকাংশই অ-ধাতু।

ধাতু হোক বা অধাতু, দুটো বা তার বেশি মৌলিক পদার্থ যুক্ত হয়ে কোনো যৌগিক পদার্থ তৈরি হওয়ার ব্যাপারটাকে বলা হয় যোজ্যতা বা ভ্যালেন্সি। এটা প্রধানত ইলেকট্রনের আদান-প্রদান। হয় একটা পরমাণু থেকে অন্যটায় ইলেকট্রন যাবে (ইলেকট্রোভ্যালেন্সি), অথবা দুজন মিলে একটা একটা করে ইলেকট্রন শেয়ার করবে (কোভ্যালেন্সি), অথবা একটা থেকেই দুটো ইলেকট্রন অন্যটার সঙ্গে শেয়ার করবে (কো-অর্ডিনেট কোভ্যালেন্সি)।

এই সব তত্ত্ব এখন আমরা সবাই অল্পবিস্তর জানি। এ কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি, হয়েছে বহু বছরের বহু পর্যবেক্ষণের ও তত্ত্বতালাশের ফল হিসাবে। খাদ্যলবণ মানে সোডিয়াম ক্লোরাইড, সেটা তৈরি হয় সোডিয়াম ধাতুর পরমাণু একটা ইলেকট্রন ক্লোরিন পরমাণুকে দান করে, এটা ইলেকট্রোভ্যালেন্সির উদাহরণ। তেমনি জলের অণু তৈরি হয় অক্সিজেনের পরমাণু যখন দুখানা হাইড্রোজেনের সঙ্গে দুটো আলাদা কোভ্যালেন্ট বন্ড তৈরি করে। প্রত্যেক বন্ড মানে সাধারণভাবে দুটো ইলেকট্রন, যার একখানা ছিল অক্সিজেন পরমাণুর, অন্যটা হাইড্রোজেনের। শেয়ার হওয়ার ফলে জলের মধ্যে অক্সিজেনের চারদিকে সবচেয়ে বাইরের কক্ষপথে আটখানা ইলেকট্রন হয়ে গেল, হাইড্রোজেনের হয়ে গেল দু’খানা!

     

বুঝতেই পারছ, যোজ্যতা যদি হয় ইলেকট্রনের আদান-প্রদান, তবে সে সম্বন্ধে ধারণা তো এমন সময় তৈরি করা সম্ভব নয়, যখন ইলেকট্রনই আবিষ্কার হয়নি। আর বইতে লেখা আছে, ইলেকট্রন আবিষ্কার করেছিলেন জে জে টমসন, ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে। তার মানে যোজ্যতা আবিষ্কার নিঃসন্দেহে তার অনেকটা পরে।

না। ওপরে যে ছবিগুলো দিলাম, সে সম্বন্ধে ধারণা তৈরি হয়েছে অবশ্যই বিংশ শতকে, কিন্তু তার অনেক আগে থেকেই, বস্তুত ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই, যোজ্যতা বিষয়ে ভাসা-ভাসা ধারণা তৈরি হওয়া শুরু হয়েছিল। এর পেছনে ছিলেন জার্মান কেকুলে, ব্রিটিশ ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড, রাশিয়ান বাটলারভ, স্কটিশ কুপার ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের গুরু ক্রাম ব্রাউন, ওলন্দাজ ভ্যান্ট হফ, ফরাসি লা বেল, প্রমুখ বিজ্ঞানীবৃন্দ।

এবং আরও একজন।

রবীন্দ্রনাথ যে বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন, সেই বছরই যদি তিনি সেই পুরস্কার নেওয়ার জন্য বৎসরান্তে স্টকহোমে উপস্থিত থাকতে পারতেন, তবে পরিচিত হতে পারতেন এক স্থূলদেহী সুইশ রসায়নবিদের সঙ্গে – তিনি সেই বছরের অর্থাৎ ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের রসায়নের নোবেল পুরস্কার-প্রাপক বিজ্ঞানী আলফ্রেড ভার্নার। ভার্নার রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বয়সে বছর পাঁচেকের ছোট। যোজ্যতা এবং রাসায়নিক বন্ধন বিষয়ে তাঁর যুগান্তকারী মতবাদের জন্য এই নোবেল পুরস্কার। তাঁর জন্মের আগেই অগস্ত্‌ কেকুলে বলে দিয়েছেন কার্বনের যোজ্যতা চার। ভার্নারের বয়স যখন আট বছর, তখন উট্রেক্ট ভেটেরিনারি স্কুলের ভ্যান্ট হফ এবং প্যারিসের জোসেফ লা বেল আলাদা আলাদাভাবে মতপ্রকাশ করলেন কার্বনের এই চার যোজ্যতা এমনভাবে বিন্যস্ত থাকে যেন এক টেট্রাহেড্রনের কেন্দ্রে থাকে কার্বন আর তার চার শীর্ষবিন্দুতে কার্বনের সঙ্গে লেগে-থাকা চারটে আলাদা পরমাণু। সে সব বোঝার বয়স তখনও ভার্নারের হয়নি। তিনি তখন স্থানীয় এক টেকনিক্যাল স্কুলে পড়াশুনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তখনকার দিনের নিয়ম অনুযায়ী আঠারো বছর বয়স হলে অন্তত এক বছরের জন্যে সবাইকে আর্মিতে ট্রেনিং নিতে হ’ত। আলফ্রেড ভার্নার সেই ট্রেনিং নিতে গেলেন জার্মানির কার্লসরুহে-তে। সেখানে কিছুদিন পড়াশুনার সুযোগ হয়েছিল আর তাতে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ পেয়ে গেলেন তিনি কেমিস্ট্রিতে। ঠিক করলেন, পরে এটা নিয়েই পড়াশুনা করতে হবে।

মিলিটারি ট্রেনিং শেষ করে আলফ্রেড সোজা চলে গেলেন সুইজারল্যান্ডের জুরিখে। ভর্তি হলেন সুইশ ফেডারাল পলিটেকনিক কলেজে, ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে। এই সেই সময় যখন কেমিক্যাল ইকুইলিব্রিয়াম তত্ত্বের তিন পুরোধা ভ্যান্ট হফ, আরহেনিয়াস এবং অসওয়াল্ড নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে শুরু করতে চলেছেন ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রির নতুন নতুন সব সূত্র। আমাদের জগদীশচন্দ্র তখন লন্ডনে, লর্ড র‍্যালে তাঁর অধ্যাপক; প্রফুল্লচন্দ্র এডিনবরায়, আলেকজান্ডার ক্রাম ব্রাউনের ল্যাবে তৈরি করছেন বিভিন্ন ডাবল-সল্ট। ফ্রান্সে পিয়ের কুরি সিমেট্রির ধ্যানধারণা কাজে লাগিয়ে পিজোইলেকট্রিসিটি নিয়ে কাজকর্ম করছেন, জার্মানিতে হাইনরিখ হার্জ লড়ে যাচ্ছেন স্কটিশ জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল-আবিষ্কৃত ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম তত্ত্ব নিয়ে। 

জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে On the Spatial Arrangement of Atoms in Nitrogen Compounds শীর্ষক থিসিস লিখে পিএইচডি ডিগ্রি পেলেন ভার্নার, তাতে লেখা নাইট্রোজেনের কিছু যৌগে পরমাণুরা শূন্যে কেমনভাবে বিন্যস্ত, তার পর্যালোচনা। এবং এই বিষয় নির্বাচন করেছেন আলফ্রেড নিজেই। 

ডিগ্রি মিলল, সুনামও মিলল কিছু, মিলল না চাকরি। চলে গেলেন প্যারিসে, বেশ কিছু মাস কাজ করলেন মার্সেলিন বার্থেলোর সঙ্গে। সুইজারল্যান্ডে তখন নিয়ম ইউনিভার্সিটি স্তরে অধ্যাপনা করতে আর এক পিস থিসিস লিখতে হবে। বার্থেলোর সঙ্গে যে কাজগুলো করলেন, তা নিয়ে লিখে ফেললেন সেই থিসিস, জমা দিলেন জুরিখে। তার শীর্ষক – A contribution to the constitution of inorganic compounds। সে ডিগ্রিও মিলে গেল, কিন্তু পলিটেকনিক কলেজে পোজিশন যেটা পেলেন, সেটার নাম প্রাইভেট-ডোসেন্ট। ইউনিভার্সিটি বেতন দেবে না। যদি তোমার লেকচার শুনতে স্টুডেন্ট আসে, তবে যারা আসবে, তাদের কাছ থেকে লেকচার শোনার জন্যে যা চাঁদা কালেক্ট করতে পারবে, সেটাই তোমার ইনকাম! 

বছরখানেক সে ভাবেই কাটিয়ে পরের বছর জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসরের পদ পেয়ে গেলেন। তার দু বছর পরে ফুল প্রফেসর। ল্যাবরেটরির কাজের শুরুতে নিজেকে প্রশ্ন করলেন, শুধু কার্বন-নাইট্রোজেনেরই কেন? বাকিদের, মানে ধাতুদের কেন নয়? শুধু চার যোজ্যতা অর্থাৎ একটা পরমাণুকে ঘিরে চারটে পরমাণুই বা থাকবে কেন? দুই-তিন-চার-পাঁচ-ছয়-সাত-আটটা নয় কেন? শুধু টেট্রাহেড্রাল জিওমেট্রি কেন? কেন নয় লিনিয়ার-প্ল্যানার-পিরামিডাল-প্রিজমেটিক-অক্টাহেড্রাল এটসেট্রা? ঐ যে দ্বিতীয় থিসিস তিনি জমা দিলেন, সেখানেই এদের সম্ভাব্য অস্তিত্বের কথা বলেছেন তিনি। এই আইডিয়াটা একটা অনামী জার্নালে পেপার হিসাবে পাবলিশও করেছেন।

কোবাল্ট ধাতুর ক্লোরাইড লবণ এবং অ্যামোনিয়া বিভিন্ন অনুপাতে বিক্রিয়া করিয়ে বিভিন্ন নতুন নতুন যৌগ তৈরি ও তাদের ধর্ম পর্যালোচনা করে ভার্নার রাত জেগে চিন্তা করে নির্মাণ করলেন তাঁর যুগান্তকারী প্রস্তাবনা। তিনি বললেন, এদের মধ্যে যে যোজ্যতা আছে, তা একই ধরনের নয়, দুটো আলাদা আলাদা রকমের। একটার নাম Hauptvalenz বা প্রাইমারি যোজ্যতা। অন্যটার নাম Nebenvalenz বা সেকেন্ডারি যোজ্যতা। এবং কোবাল্ট-অ্যামোনিয়া-ক্লোরাইড যৌগগুলোর সবগুলোতেই এই সেকেন্ডারি যোজ্যতা অক্টাহেড্রাল, কার্বনের মতো টেট্রাহেড্রাল নয়।

যদিও নোবেল লেকচার দিতে এসে তিনি প্রাইমারি আর সেকেন্ডারি যোজ্যতার কারণ বলে যেতে পারেননি, বলেছিলেন দুটোই দুটো আলাদা ধরনের ইলেক্ট্রিকাল আকর্ষণের ফল, তার কারণ যোজ্যতার তেমন কোনো ধারণাই তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি, ভার্নারের এই কো-অর্ডিনেশন থিওরি হয়ে উঠল যোজ্যতার ধারণা নিরূপণে এক যুগান্তকারী মাপকাঠি। ভার্নারের মৃত্যুর পরে আমেরিকান বিজ্ঞানী গিলবার্ট লুইস এবং পরবর্তীতে অন্যান্যরা (ল্যাংমুইর, সিজউইক, পাউলিং, …) প্রতিষ্ঠা করেন সে সবের রীতিনীতি। ভ্যালেন্স বন্ড থিওরি, মলিকুলার অরবাইটাল থিওরি, ভ্যালেন্স শেল ইলেকট্রন পেয়ার রিপালশন থিওরি ইত্যাদি দিয়ে এদের যোজ্যতা ও স্ট্রাকচার ব্যাখ্যা করা হয়। লুইস তাঁর ‘ভ্যালেন্স অ্যান্ড দ্য স্ট্রাকচার অভ অ্যাটমস অ্যান্ড মলিকুলস’ বইতে ভার্নারের কাজসমূহের জন্যে তাঁর ‘ব্যক্তিগত ঋণ’ স্বীকার করে গেছেন। 

অ্যামোনিয়ার মতো আরও হাজার গন্ডা বিভিন্ন ধরনের যৌগ বা আয়ন যাদের ইলেকট্রন দান বা শেয়ার করার ক্ষমতা আছে, তাদের সঙ্গে ধাতব আয়নের সংযোগ ঘটিয়ে নির্মিত হ’ল যে রাসায়নিক বস্তু, তাদের নাম দেওয়া হ’ল কো-অর্ডিনেশন কম্পাউন্ড। তাদের রসায়ন কো-অর্ডিনেশন কেমিস্ট্রি। এই রসায়নে অধিকাংশ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ওই ধাতব আয়ন। তার সঙ্গে যে-সব যৌগ বা মূলক যুক্ত, তাদের বলা হয় লিগ্যান্ড। অধিকাংশ লিগ্যান্ডই জৈব যৌগ। জৈব লিগ্যান্ডের সঙ্গে অজৈব মেটাল আয়নের সমন্বয় সাধন হচ্ছে বলেই এদের নাম কো-অর্ডিনেশন কম্পাউন্ড তথা মেটাল-লিগ্যান্ড কমপ্লেক্স। এই ধরনের যৌগে ধাতব আয়ন ও লিগ্যান্ডের যোজ্যতা ও স্ট্রাকচার ব্যাখ্যা করতে নির্মিত হ’ল ক্রিস্টাল ফিল্ড থিওরি, লিগ্যান্ড ফিল্ড থিওরি-র মতো তত্ত্বসমূহ। এখানে আমরা সে সব তত্ত্বে যাব না, তার কোনো প্রয়োজনও নেই।

লিগ্যান্ড কোনো জৈব যৌগ (organic compound) হলেই কি তবে সেই মেটাল-লিগ্যান্ড কমপ্লেক্সকে MOF বা ধাতু-জৈব কাঠামো বলা যাবে? না! এমনকি তাকে অর্গানোমেটালিক যৌগও (organometallic compound) বলা যাবে না। সমস্ত অর্গানোমেটালিক যৌগ এবং সমস্ত MOF-ই মেটাল-লিগ্যান্ড কমপ্লেক্স তথা কো-অর্ডিনেশন কম্পাউন্ড, কিন্তু উল্টোটা সত্যি নয়। এবং মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক এবং অর্গানোমেটালিক কম্পাউন্ড সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস।  

পার্থক্য তবে কী? ধাতব আয়নের সঙ্গে লিগ্যান্ড যুক্ত থাকলেই সেটা কো-অর্ডিনেশন কম্পাউন্ড তথা মেটাল লিগ্যান্ড কমপ্লেক্স। যদি সেই যৌগে ধাতব আয়নটা সরাসরি যুক্ত থাকে অন্তত একটা জৈব যৌগের কার্বন পরমাণুর সঙ্গে, তবে তাকে বলা হয় অর্গানোমেটালিক যৌগ। M-C বন্ড (M = metal ion) না থাকলে সেটা আর যাই হোক, অর্গানোমেটালিক যৌগ নয়। আর ধাতু-জৈব কাঠামো অর্থাৎ মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কে পরের শব্দ অর্থাৎ ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ বা ‘কাঠামো’ জিনিসটাই প্রধান। এই কাঠামো যেন ফোঁপরা হয়, তাতে যেন নির্দিষ্ট মাপের ছিদ্র থাকে, তবেই তাকে বলা হবে ‘মফ’। মফ প্রায়শ একটা ‘পলিমার’, তার গঠন এমন একটা বাড়ির মতো যা ইটের পাঁজার মতো নিরেট নয়, যার মধ্যে হাওয়া-বাতাস খেলে যাওয়ার মতো নির্দিষ্ট মাপের অসংখ্য ঘর আছে। হাজার হাজার ইঁদুর মাটির নীচে গর্ত খুঁড়ে তাদের বাস্তুতন্ত্র তৈরি করলে সেই জমি যেমন ফোঁপরা হয়ে যায়, সেই রকম চ্যানেল বা ছিদ্র-সমন্বিত কেলাসিত বস্তু যার মধ্যে সুনির্দিষ্ট আকৃতির অসংখ্য ফাঁকা জায়গা আছে, তা যদি কোনো ধাতব আয়ন এবং জৈব লিগ্যান্ড দিয়ে তৈরি করা হয়, তবে সেটাকেই বলা হয় ধাতু-জৈব কাঠামো।    

ধাতু-জৈব কাঠামোর আইডিয়া কীভাবে তৈরি হ’ল?

আলফ্রেড ভার্নারের পথ ধরে কোবাল্ট-অ্যামোনিয়া-ক্লোরাইড জাতীয় কো-অর্ডিনেশন কম্পাউন্ডের ভূরি ভূরি উদাহরণ পাওয়া যেতে লাগল অচিরেই। ফেরাস লবণের সঙ্গে সায়ানাইডের বিক্রিয়ায় পাওয়া ফেরোসায়ানাইড এবং তার পটাশিয়াম লবণের সঙ্গে ফেরাস লবণের বিক্রিয়ায় পাওয়া প্রাশিয়ান ব্লু এই শ্রেণির যৌগের উদাহরণ। প্রকৃতি-জগতেও এর অজস্র উদাহরণ আছে। গাছের পাতার ক্লোরোফিল ও রক্তের হিমোগ্লোবিন বা হিমোসায়ানিন – সবই এই শ্রেণির যৌগেরই উদাহরণ। মানুষের বা সমস্ত প্রাণী ও উদ্ভিদের শরীরে কাজ করে অজস্র এনজাইম, তাদের মধ্যে যেগুলোতে ধাতব আয়ন আছে, তারা সব মেটাল-লিগ্যান্ড কমপ্লেক্স।

ফলে এদের নিয়ে রসায়নবিদদের কৌতূহল বেড়েই চলল। আলফ্রেড ভার্নারের সময় এদের নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার তেমন আধুনিক যন্ত্রপাতি তো ছিল না, তিনি নির্ভর করেছিলেন এই যৌগগুলোতে ধাতু ও অ্যামোনিয়ার নাইট্রোজেনের পরিমাণ মাপা, সিলভার নাইট্রেট দ্রবণ দিয়ে এদের থেকে কতগুলো ক্লোরাইডকে অধঃক্ষিপ্ত করা যায় তা মাপা এবং একটা নির্দিষ্ট কম্পোজিশনের যৌগের কতগুলো আইসোমার হতে পারে তা গোনা – এর ওপরে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক বহুবিধ প্রণালী আবিষ্কৃত হ’ল। হাতে এল নতুন নতুন থিওরিও। ইউভি-ভিজিবল স্পেকট্রোস্কোপি, ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি, রামন স্পেকট্রোস্কোপি, নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স স্পেকট্রোস্কোপি, ইলেকট্রন স্পিন রেজোন্যান্স স্পেকট্রোস্কোপি, বিভিন্ন ধরনের ম্যাগনেটিক, থার্মাল, রিডক্স ও অন্যান্য পরীক্ষানিরীক্ষা দিয়ে একটা যৌগের সুচারু কম্পোজিশন ও ত্রিমাত্রিক গঠন সম্বন্ধে ধারণা করা যেতে লাগল। কিন্তু এদের সবাইকে ছাড়িয়ে গেল যে পদ্ধতি, তা হচ্ছে সিঙ্গল ক্রিস্টাল এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন টেকনিক। বিশুদ্ধ কোনো যৌগের মাত্র একটা বিশুদ্ধ (অর্থাৎ যার মধ্যে কোনো ডিফেক্ট নেই) খুদে ক্রিস্টালের ওপর বিভিন্ন কোণ থেকে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এক্স-রে ফেলে তার বিচ্ছুরিত অংশের তীব্রতার (intensity) পরিমাপ থেকে সেই ক্রিস্টাল যে যৌগ দিয়ে তৈরি তার সুচারু ত্রিমাত্রিক গঠন পাওয়া যায়। প্রথম প্রথম এই পদ্ধতি ছিল শ্রমসাধ্য, কিন্তু ধীরে ধীরে মেশিনের উন্নতি ও তার ডেটা অ্যানালাইজ করার সফটয়্যারের প্রভূত উন্নতি হওয়ায় এই প্রক্রিয়া হয়ে গেল জলভাতের মতো।

মেটাল-লিগ্যান্ড কমপ্লেক্সের অণুগুলো ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্রে কেমনভাবে সজ্জিত থাকে, বিজ্ঞানীরা তার দিকেও নজর দিতে লাগলেন। দেখা গেল, কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটা অণুর কোনো পরমাণু ঠিক তার পাশে যে অণুটা আছে, তার কোনো পরমাণুর সঙ্গে হাইড্রোজেন বন্ড দিয়ে যুক্ত। এটা তো হতেই পারে, যদি তাদের ইলেকট্রোনেগেটিভিটির পার্থক্য উপযুক্ত পরিমাণে হয়। যেহেতু এটা ক্রিস্টাল, তাই সমস্ত পরমাণুগুলো নির্দিষ্ট বিন্যাসে থাকে। তবে একটা অণুতে যদি ঝুলন্ত অক্সিজেন পরমাণুর খুব কাছেই পাশের অণুর একটা হাইড্রোজেন পরমাণু থাকে, তাদের মধ্যে তো হাইড্রোজেন বন্ড তৈরি হবেই। তেমনি দুটো বেঞ্জিন রিং কাছাকাছি চলে এলে তাদের মধ্যে ‘পাই-পাই স্ট্যাকিং’ ধরনের অদৃশ্য বন্ধন তৈরি হওয়া সম্ভব। যদি হাইড্রোজেন বন্ডকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে সাধারণ বন্ডই ভাবি, তবে এই যে পাশাপাশি দুটো অণু এই ধরনের বন্ডের জন্য ‘জুড়ে গেল’ (যে কারণে সাধারণ তাপমাত্রায় তরল জল অণুকে ধরা যেতে পারে হাইড্রোজেন বন্ড দিয়ে জোড়া এক অতিকায় অণু বা ‘পলিমার’), এরা তৈরি করল এক হাইড্রোজেন-বন্ডেড পলিমার।

এর অর্থ গোটা ক্রিস্টালটাই তখন হয়ে পড়ল যেন একখানাই অণু, যার যে-কোনো পরমাণু অন্য এক পরমাণুর সঙ্গে কোনোভাবে মধ্যবর্তী পরমাণুর সঙ্গে বন্ড দিয়ে যুক্ত। স্বাভাবিকভাবেই এদের মধ্য দিয়ে এক্স- ওয়াই- জেড- অক্ষ বরাবর যদি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যায়, দেখা যাবে কোনো কোনো অ্যাঙ্গেলে এরা তৈরি করেছে বিচিত্র সব সুড়ঙ্গ। কোনোটা খুবই সরু, কিন্তু কোনোটা বেশ চওড়া।

সুড়ঙ্গের গুরুত্ব কী? গুরুত্ব হচ্ছে কোনো পদার্থে যদি সুড়ঙ্গ থাকে, তাহলে সেই পথে আমি ‘কাউকে’ ঢুকিয়ে দিতে পারি! কাউকে মানে কোনো এক অণুকে, তাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য, অন্যথায় সে হয়ত বেশিক্ষণ স্থিতিশীল থাকে না। অথবা যদি এমন একটা মিশ্রণে সেই পদার্থটা রাখা যায়, যাতে অনেক রকম অণু আছে, যাদের মধ্যে একটা অণুর সাইজ এমন যে সেই সুড়ঙ্গে ঢুকতে পারে, অন্যরা পারে না। তাহলে সেই মিশ্রণে এই সুড়ঙ্গওলা বস্তুটাকে রাখলে সেই অণুগুলোকে এর সাহায্যে পৃথক করা যেতে পারে। এখানে ওই বস্তুটার কাজ অনেকটা ছাঁকনির মতো। 

এই ধরনের সুড়ঙ্গসমৃদ্ধ বস্তু যে জানা নেই, তা নয়। প্রচুর এমন বস্তু আছে, যারা প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়। এদের বলা হয় ওপেন ফ্রেমওয়ার্ক মেটিরিয়ালস, যেমন জিওলাইট। স্মরণ থাকতে পারে, এমন এক ফোঁপরা পদার্থ ডায়াটমেশিয়াস আর্থের ফোকরের মধ্যেই অনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরক নাইট্রোগ্লিসারিনকে আবদ্ধ করে আলফ্রেড নোবেল নিয়ন্ত্রক বিস্ফোরক ডিনামাইট তৈরি করেছিলেন। তেমন জিওলাইট-৪এ (নীচে ছবি) নামের এক ফোঁপরা বস্তু বিভিন্ন আয়নের মিশ্রণ থেকে ক্যালসিয়াম আয়ন নিজের সুড়ঙ্গে ঢুকিয়ে নিতে পারে বলে খর জলকে মৃদু করার জন্য এর ব্যবহার হয় ডিটারজেন্ট পাউডারে।

কিন্তু এই ধরনের বস্তুগুলোর অধিকাংশই অ্যালুমিনোসিলিকেট এবং তাদের মধ্যে যে মাপের সুড়ঙ্গ তৈরি করা যায়, তার বিস্তৃতি বেশি নয়। তাপমাত্রা ও অ্যাসিড-ক্ষার ইত্যাদির উপস্থিতিতে এই বস্তুগুলোর স্থিতিশীলতাও খুব বেশি বাড়ানো যায় না।

কো-অর্ডিনেশন কম্পাউন্ডে এমন সুড়ঙ্গের হদিশ পেতেই তাই এই চিন্তা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল, হাইড্রোজেন বন্ডের বদলে কি শক্তপোক্ত কোভ্যালেন্ট বন্ড দিয়ে এমন ‘পলিমার’ তৈরি করা সম্ভব? এই চিন্তারই ফল আজকের ধাতু-জৈব কাঠামো!

ধাতু-জৈব কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া

শুধু ভাবলেই তো হ’ল না, একে কাজে রূপান্তরিত করতে হলে চাই উপযুক্ত উপাদান। কো-অর্ডিনেশন কম্পাউন্ড থেকে কো-অর্ডিনেশন পলিমার তৈরি করার প্রথম শর্ত কী? শর্ত হচ্ছে প্রত্যেক লিগ্যান্ড যেন একটা নয়, একাধিক ধাতু-র সঙ্গে বন্ড তৈরি করতে পারে। তাহলেই যে সেটা পলিমার হবে, তা নিশ্চিত না হলেও সেটা একটা প্রাথমিক শর্ত। অর্থাৎ এক্ষেত্রে লিগ্যান্ডটা কাজ করবে দুই বা ততোধিক ধাতুর মধ্যে ‘লিঙ্কার’ হিসাবে।    

যেহেতু অন্তত দুটো ধাতুর সঙ্গে একে যুক্ত হতে হবে, কাজেই এই লিগ্যান্ডে থাকতে হবে অন্তত দুটো এমন সেন্টার বা পরমাণু, যাদের ইলেকট্রন দান করার সামর্থ্য আছে। ভার্নারের যৌগগুলোতে সেগুলো যেমন ছিল অ্যামোনিয়া, যার নাইট্রোজেন পরমাণুর এই সামর্থ্য আছে। কিন্তু অ্যামোনিয়াতে নাইট্রোজেন একখানা, সে তো আর দুটো ধাতুর সঙ্গে বন্ড তৈরি করতে পারবে না। দুটো নাইট্রোজেনওয়ালা লিগ্যান্ড হচ্ছে ইথিলিন ডায়ামিন (H2N-CH2-CH2-NH2), কিন্তু দেখা যায় এই লিগ্যান্ড খুব শক্তিশালী তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু সে দুটো নয়, একটা ধাতুর সঙ্গেই বন্ড তৈরি করে।

এমনকি এই ইথিলিন ডায়ামিনের সঙ্গে চারখানা কার্বক্সিলেট গ্রুপ (যারা লিগ্যান্ড হওয়ার পক্ষে খুবই কার্যকরী) লাগিয়ে দিলেও তারা একাধিক নয়, বরং একটা ধাতুর সঙ্গেই বন্ড তৈরি করে।

কেন? কেননা এই লিগ্যান্ডের পরমাণুগুলো নমনীয় (flexible) সিঙ্গল-বন্ড দিয়ে যুক্ত বলে এরা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে নিজেদের ঠিক এমন পোজিশনে নিয়ে আসতে পারে, যাতে একটা ধাতুকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলতে পারে। লিঙ্কার হিসাবে ব্যবহার করতে গেলে এ রকম নমনীয় সিঙ্গল বন্ড দিয়ে যুক্ত লিগ্যান্ড চলবে না। চাই এমন অণু, যা অনমনীয়, যাকে পেঁচিয়ে ফেলা সম্ভব না। জৈব জগতে এমন বস্তু হচ্ছে কনজুগেটেড ডাবল বন্ড বা অ্যারোমেটিক রিং। বেঞ্জিন রিং ভাঙবে তবু মচকাবে না! কাজেই একাধিক কার্বক্সিলেট লাগিয়ে যদি দুটো ধাতব আয়নের মধ্যে লিঙ্কার তৈরি করতে হয়, তবে ইথিলিন ডায়ামিনের সঙ্গে নয়, বেঞ্জিন বা অন্যান্য অ্যারোমেটিক রিঙের সঙ্গে তা লাগানো বুদ্ধিমানের কাজ।

কেমন হবে তাদের দেখতে? এই রকম –

মফ বিষয়ে আমরা ফেরত আসব আবার পরে। এবার একটু জেনে নেওয়া যাক এ বছরের নোবেল পুরস্কার প্রাপকদের বিষয়ে।

নোবেল প্রাপকদের জীবনের গঠনমূলক বছরগুলো

এমনি এমনি তো কোনো বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার পান না, পান কোনো এক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক অবদানের জন্য। প্রত্যেকটা এমন বৈজ্ঞানিক বিপ্লব শুরু হয় তাঁদের শৈশব বা যৌবনের কৌতূহল থেকেই। বিস্ময়ের প্রাথমিক স্ফুলিঙ্গ বিকশিত হতে হতে আজীবন অনুসন্ধানে পরিণত হয়। ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের রসায়নে নোবেল বিজয়ী তিনজন – সুসুমু কিতাগাওয়া, রিচার্ড রবসন এবং ওমর এম. ইয়াঘি – প্রত্যেকেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাঁদের যাত্রা শুরু করেছিলেন। কিতাগাওয়া কিয়োটোয়, রবসন গ্রামীণ ইয়র্কশায়ারে এবং ইয়াঘি আম্মানের এক জনাকীর্ণ শরণার্থী পরিবারে। তাঁদের জীবনের এই অধ্যায়গুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কীভাবে অধ্যবসায়, কল্পনাশক্তি এবং শিক্ষা এক আপাত-অনাধুনিক বৈজ্ঞানিক শাখার সম্পূর্ণ নতুন সংজ্ঞা তৈরি করতে একত্রিত হতে পারে।

সুসুমু কিতাগাওয়া: কিয়োটোতে প্রাথমিক বছর

সুসুমু কিতাগাওয়া ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই জাপানের কিয়োটোতে জন্মগ্রহণ করেন। জাপানের সাংস্কৃতিক রাজধানী কিয়োটোতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঐতিহ্য ও আধুনিক বিজ্ঞানের সহাবস্থান। মন্দির, ছুতোর মিস্ত্রি এবং অন্যান্য কারিগরদের মধ্যে তাঁর বেড়ে ওঠা। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই কিতাগাওয়ার মন বস্তুর কাঠামোগত সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তাদের জ্যামিতিক নির্ভুলতা এবং সূক্ষ্ম ভারসাম্য পরবর্তীকালে যৌগের আণবিক কাঠামোর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে নিয়ন্ত্রিত করে। শৈশবকাল থেকেই তিনি সূক্ষ্ম মেজাজের অধিকারী, ধৈর্যশীল এবং পর্যবেক্ষণশীল। খেলাধূলার চেয়ে বেশি পছন্দ করতেন ধাঁধা, পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নের সরঞ্জাম।

পদার্থের অদৃশ্য জগতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ শুরু হয় উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে তাঁর শিক্ষকরা তাঁকে পর্যায় সারণির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন যাবতীয় মৌলিক পদার্থের তালিকা হিসেবে নয়, বরং তাদের মধ্যে সম্পর্কের পারস্পরিক মানচিত্র হিসেবে। কিতাগাওয়া প্রায়শই স্মরণ করতেন যে নির্দিষ্ট প্যাটার্ন এবং প্রতিসাম্য দিয়ে রাসায়নিক উপাদানগুলো সাজানো, এই ব্যাপারটা দেখে তিনি খুব মজা পেতেন। প্রাকৃতিক নিসর্গ আর আণবিক জগৎ – সবই তাহলে একই রকম গঠনের প্রকাশ! যে কোনো রকম স্ট্রাকচারের প্রতি তাঁর এই প্রাথমিক সংবেদনশীলতা – বিশ্লেষণাত্মকের চেয়েও যা বেশি নান্দনিক – এটাই পরবর্তীতে হয়ে উঠবে তাঁর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির নিয়ন্ত্রক।

১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন কিতাগাওয়া, তাঁকে সেখানে সমৃদ্ধ করে জাপানের কঠোর এবং শ্রেণিবদ্ধ বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতি। তাঁর অধ্যাপকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক শৃঙ্খলার দিকে তাঁকে উৎসাহিত করেন। জৈব এবং হাইড্রোকার্বন রসায়নের বিশেষজ্ঞদের অধীনে তিনি ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে হাইড্রোকার্বন রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রির কাজ সম্পন্ন করেন। ডক্টরেটের কাজের জন্য তাঁকে সুনির্দিষ্ট কাঠামোসমূহের প্রকৃতি নিরূপণ বিষয়ে প্রশিক্ষিত হ’তে হয়। ধাতব আয়ন ও লিগ্যান্ড দিয়ে তৈরি আণবিক স্থাপত্যের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য শনাক্ত করতে সক্ষম করে এই প্রশিক্ষণ।

জীবনের এই গঠনমূলক বছরগুলোতে কিতাগাওয়ার বিশ্ব-অনুভব দুটো বিশেষ জিনিস দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিল। প্রথমটার নাম কাইজেন, সেটা যুদ্ধোত্তর জাপানিদের ক্রম-উন্নতির নীতি, অর্থাৎ প্রত্যেক বছর যেন আগের বছরের তুলনায় উন্নত হয়, এই মানসিকতা। কাইজেন তাঁর মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিল কিছুতেই হার না মানার দৃঢ় মনোভাব। দ্বিতীয়টা কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার। সেখানে রসায়নশাস্ত্র সেতুবন্ধন করেছিল পদার্থবিদ্যা, পদার্থ এবং দর্শনের মধ্যে এবং তাঁকে শিখিয়েছিল প্রকৃতির কাঠামো-সংক্রান্ত নীতিসমূহকে উপলব্ধি করতে। এই শিক্ষা তাঁর পরবর্তী গবেষণায় ছাপ ফেলেছিল খুবই। তিনি প্রায়শই মফ-গুলোকে কেবল উপকরণ হিসাবে দেখতেন না, ভাবতেন তারাও যেন এক একটা প্রাণী, তারাও যেন শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়, পরিবেশের সঙ্গে বিভিন্নভাবে আদানপ্রদান করে।

রিচার্ড রবসন: ইয়র্কশায়ারের নির্ভুলতা এবং অক্সফোর্ডের কঠোরতার মিশ্রণ

রিচার্ড রবসনের জীবনের কাহিনি গল্প শুরু হয় কিয়োটোর শিক্ষাগত ব্যস্ততা থেকে অনেক দূরে ইংল্যান্ডের পশ্চিম ইয়র্কশায়ারের শিল্প-সমন্বিত মাটিতে। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের চৌঠা জুন স্কিপটনের কাছে একটা ছোট্ট কারখানা শহর গ্লসবার্নে জন্মগ্রহণ করেন রবসন যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের জন্য তৈরি এক সাদামাটা পরিবেশে। তাঁর বাবা ছিলেন সেখানকার স্থানীয় ব্যবসায়ী; মা একজন গৃহিণী। তাঁরা রিচার্ড রবসনের শিক্ষা-দীক্ষা-কৌতূহলকে উৎসাহিত করতেন। তরুণ রিচার্ডের প্রথম দিকের বৈজ্ঞানিক খেলনা ছিল পরিবারের এক ভাঙা ঘড়ি। সেই ভাঙা ঘড়ি পুরোটা ভেঙে আবার জোড়া লাগিয়েছিলেন তিনি, বোঝার চেষ্টা করেছিলেন ঘড়ির অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলো।

ইয়র্কশায়ারের গ্রামাঞ্চল যেন নিজেই একটা শ্রেণীকক্ষ! রবসনের আকর্ষণ শুরু হয়েছিল রসায়নের সঙ্গে নয় বরং প্রকৃতির সঙ্গে। জানালায় তুষারপাতের স্ফটিক, উদ্ভিদের জ্যামিতি এবং স্কুলের ফিল্ড ট্রিপে তিনি যে সমস্ত খনিজ পদার্থ সংগ্রহ করেছিলেন তাদের গঠন-কাঠামো – এই সব জিনিসপত্রের সঙ্গে নিবিড় স্পর্শ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তী সাক্ষাৎকারে রবসন স্মরণ করেছিলেন যে বিজ্ঞান অসংখ্য পারিভাষিক শব্দভাণ্ড সরবরাহ করার অনেক আগে থেকেই কীভাবে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা এবং বস্তুজগতের নিয়মিততায়।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রাসেনোজ কলেজে রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা করেন রবসন। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকে বিএ এবং ডাইসন পেরিনস ল্যাবরেটরিতে জে.এ বার্লট্রপের অধীনে কাজ করে ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে ডি.ফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর ডক্টরেট গবেষণা ছিল জৈব অণুর আলোক-রসায়নের (photochemistry) ওপর। তার সঙ্গে মফের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে অক্সফোর্ডে তাঁর সময়কাল প্রতিসাম্য, জ্যামিতিক যুক্তি এবং আণবিক স্থাপত্যের প্রতি তাঁর আজীবন ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে।

১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করার পর রবসন ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং এখানেই তিনি তাঁর পুরো পেশাগত জীবন কাটিয়ে দেন। কিন্তু ইয়র্কশায়ার থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সেই গঠনমূলক প্রকৌশলগত নির্ভুলতা – যা শ্রমিক শ্রেণির মানুষদের মধ্যেই সাধারণভাবে বিদ্যমান থাকে – তাঁর মধ্যে ছিল পুরোমাত্রায়। মেলবোর্নে প্রাথমিক শিক্ষাদানের বছরগুলিতে স্নাতক ছাত্রদের জন্য তিনি কাঠের গোলক এবং রড ব্যবহার করে তৈরি করেছিলেন  ক্রিস্টালের আণবিক ভৌত মডেল। ক্লাশরুমে নিয়মিত বলতেন – think of atoms as nodes, bonds as rods, and molecules forming architecture!  

১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে একজন কারিগরের ধৈর্যশীল যত্নে জন্ম নেওয়া সেই মডেল-নির্মাণ অনুশীলনই তাঁর সৃজনশীল অন্তর্দৃষ্টির পরিচায়ক হয়ে ওঠে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের পরিমাপ, খনন এবং নির্মাণের সেই শৃঙ্খলা আর নির্মাণ-দক্ষতা অণুর জগতে তৈরি করেছে নতুন বৈজ্ঞানিক ধারণা – জ্যামিতি দিয়ে আণবিক পদার্থের ধর্ম নিয়ন্ত্রণ! ইয়র্কশায়ারের রক্ত আর অক্সফোর্ডের মস্তিষ্ক রবসনকে এই ধারণা প্রতিষ্ঠার অক্সিজেন সরবরাহ করেছে।

ওমর এম. ইয়াঘি: শরণার্থী থেকে বৈজ্ঞানিক স্বপ্নদ্রষ্টা

ওমর মওয়ানেস ইয়াঘির প্রাথমিক জীবন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অধ্যবসায়ের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। তিনি ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের ৯ ফেব্রুয়ারি জর্ডানের আম্মানে একটি ফিলিস্তিনি শরণার্থী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের আরব-ইজ্রায়েলি যুদ্ধের সময় গাজা থেকে পালিয়ে এসেছিল এই পরিবার। তাঁর বাবার ছিল এক মাংস কেটে বিক্রি করার দোকান। গবাদি পশু পালন করে নয় সন্তানের বিশাল পরিবারের মুখে গ্রাস তুলে দেওয়া ছিল তাঁর নিত্য সংগ্রাম। খুব ছোট এক বাড়িতে গাদাগাদি করে বাস করতেন অতজন মানুষ, সেই ঘরেই তাঁদের সঙ্গে থাকত গবাদি পশুরাও। ভোরবেলা জলের কলে জল আসত খুব অল্প সময়ের জন্য। প্রতিটি জলের ফোঁটা পরিবারকে রেশন করে পুনরায় ব্যবহার করতে হ’ত।

ইয়াঘির বাবা-মা মূলত ছিলেন নিরক্ষর, কিন্তু তাঁরা শিক্ষাকে গভীরভাবে সম্মান করতেন, সন্তানদের শিক্ষাদানকে একটা নৈতিক কর্তব্য হিসেবে দেখতেন। ছেলেকে বলতেন, ‘যেখানে জ্ঞান থাকে সেখানেই তা অন্বেষণ করো।’ বাবার পরামর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পনেরো বছর বয়সে, ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে, ইয়াঘি একা নিউ ইয়র্কের ট্রয় শহরে আসেন। সঙ্গে সামর্থ্য বলতে ছিল সীমিত ইংরেজি ভাষা জ্ঞান, কিন্তু ছিল না কোনো আর্থিক সহায়তা। হাডসন ভ্যালি কমিউনিটি কলেজে ভর্তি হন তিনি। খরচা চালানোর জন্য মুদিখানার দোকানে জিনিসপত্র ব্যাগে ভরে দেওয়া এবং দোকানের মেঝে পরিষ্কার করার কাজ গ্রহণ করেন।

তাঁর শিক্ষকরা দ্রুত তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং দৃঢ় সংকল্পের আভাস পেয়ে যান। ফলে ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি আলবানির স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্কে (SUNY) ভর্তি হ’তে পারেন। এখানেই রসায়নের প্রতি তাঁর আগ্রহ বিকশিত হয়। সাক্ষাৎকারে ইয়াঘি স্মরণ করেছেন যে তিনি ‘তত্ত্ব পছন্দ করতেন না; ল্যাব পছন্দ করতেন’! পরীক্ষামূলক বেঞ্চ ছিল তাঁর আরামের জায়গা। একসঙ্গে একাধিক গবেষণা প্রকল্পে কাজ করে তিনি ব্যতিক্রমী হাতে-কলমে দক্ষতা অর্জন করেন। উচ্চ মর্যাদার সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জিত হয় তাঁর। ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবানা-শ্যাম্পেনের ক্যাম্পাস থেকে গবেষণা করে ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডক্টরাল কাজ শুরু করেন।

ইয়াঘির প্রাথমিক জীবন তাঁর ভবিষ্যৎ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। অভাবের মধ্যে বেড়ে ওঠার ফলে তিনি বায়ু, জল এবং শক্তির মতো সম্পদ সম্পর্কে তীব্রভাবে সচেতন হয়ে ওঠেন এবং এগুলিকে সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং পুনঃব্যবহারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে নির্বাচন করেন। মডেল নির্মাণের প্রতি তাঁর যৌবনের আকর্ষণ পরবর্তী উচ্চাকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়। তাঁর স্বপ্ন হয়ে ওঠে এমন কাঠামো তৈরি করা যা অসীম অভ্যন্তরীণ স্থান ধারণ করতে পারে। জীবনের শুরুতে যা ছিল নিতান্ত প্রয়োজন, তাই পরিণতি পায় যৌবনের আবিষ্কারের বিষয় হিসাবে।

ধাতু-জৈব কাঠামোর রসায়নের প্রতি কেন আকর্ষিত হয়েছিল তাঁর মন, এই প্রশ্নের জবাবে ইয়াঘি বলেছিলেন, ‘সুন্দর জিনিস তৈরি করা আমাকে খুশি করে। মানুষের পৃথিবী তো আমাদের সীমাবদ্ধ করে, কিন্তু রসায়ন তার ছাত্রদের নিজস্ব পৃথিবী তৈরি করতে দেয়!’ শৈশবকালীন সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছিল তাঁর আণবিক সৃজনশীলতার বীজতলা।

কিতাগাওয়া, রবসন এবং ইয়াঘির গবেষণা কর্মজীবন:

আণবিক ব্লক থেকে নতুন কাঠামো নির্মাণ

আধুনিক বস্তু-রসায়নে ধাতু-জৈব কাঠামোর উত্থান সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কোলাবরেটিভ গবেষণাগুলোর মধ্যে একটা। এই রূপান্তরের মূলে রয়েছে সুসুমু কিতাগাওয়া, রিচার্ড রবসন, ওমর ইয়াঘির দুঃসাহসিক গবেষণা কর্মজীবন। তিনজন তিন মহাদেশে কয়েক দশক জুড়ে তাঁদের সমান্তরাল অথচ স্বতন্ত্র যাত্রা, সৃজনশীল অধ্যবসায় এবং আন্তঃবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মফ-এর জয়যাত্রা সুনিশ্চিত করেছেন।

সুসুমু কিতাগাওয়া: মফ-এর নমনীয়তা, কার্যকারিতা এবং কাঠামো নির্মাণ

গবেষণা কর্মজীবনে সুসুমু কিতাগাওয়া এমন একজন রসায়নবিদ যিনি বারবার কো-অর্ডিনেশন পলিমারের সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করে নতুন পথ খুঁজে নিয়েছেন। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর কিতাগাওয়া কিন্দাই বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। এখানেই শুরু হয় তাঁর জীবনভর ধাতু-লিগ্যান্ড নেটওয়ার্কের সুপ্রামলিকুলার বৈশিষ্ট্যের (একাধিক অণু বিভিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বড়সড় অণু তৈরি করা) প্রতি আকর্ষণ। ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ে এফ. অ্যালবার্ট কটনের অধীনে পোস্টডক্টোরাল ফেলো হিসেবে গবেষণা করেছিলেন। ‘অ্যাডভান্সড ইনর্গানিক কেমিস্ট্রি’ নামের বিশ্বখ্যাত বইয়ের লেখক কটন কো-অর্ডিনেশন কেমিস্ট্রির জগতে একজন দিকপাল বিজ্ঞানী। এই অভিজ্ঞতা অজৈব এবং জৈব-ধাতব রসায়নে কিতাগাওয়ার দক্ষতাকে আরও গভীর করে তোলে। জাপানে ফিরে এসে কিতাগাওয়া প্রথমে কিন্দাই এবং পরে টোকিও মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টি পদে অধিষ্ঠিত হন, তারপর ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯০-এর দশকে তাঁর গবেষণাগার ‘পোরাস কোঅর্ডিনেশন পলিমার’ (PCPs) তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এটা ছিল স্থায়ী পোরোসিটি এবং নমনীয়তা প্রদর্শনকারী প্রথম মফ। কিতাগাওয়া কেবল পোরোসিটি তৈরি করেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। কীভাবে এটা তৈরি হয়, তার গতিপ্রকৃতি তিনি অন্বেষণ করেন। আবিষ্কার করেন যে মফ-এর কাঠামো ‘শ্বাস নিতে’ পারে এবং তাদের ছিদ্রে অতিথি অণুকে আশ্রয়দান ও তাদের বিতাড়নের মাধ্যমে প্রসারিত এবং সংকুচিত হতে পারে।

এই মফ কাঠামোর শোষণ বৈশিষ্ট্যগুলো পদ্ধতিগতভাবে অধ্যয়ন করে কিতাগাওয়া এই মত পোষণ করেন যে মফ-গুলো কেবল গ্যাস-শোষক বস্তু হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং তাদের কাঠামোকে পরিবর্তিত করে বিভিন্ন কার্যকরী উপকরণ হিসাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। সফট পোরাস ক্রিস্টালের ধারণা দেন তিনি। ফলে শক্ত এবং নরম, অনমনীয় এবং নমনীয় বস্তু হিসাবে আণবিক ছাঁকনি, সেন্সর, সিলেকটিভ শোষক এবং অনুঘটক হিসাবে মফ-এর প্রয়োগের দরজা খুলে যায়। গ্যাস শোষণের জন্য মফের মধ্যে যে খোলা চ্যানেল তৈরি করা দরকার, তার প্রয়োগ করে দেখান তিনি (চিত্র নীচে)।

Institute for Integrated Cell-Material Sciences (iCeMS)-এর প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক হিসেবে কিতাগাওয়া জীববিজ্ঞান, রসায়ন এবং পদার্থবিজ্ঞানকে একীভূত করার জন্য একটি বিশ্ব-নেতৃস্থানীয় আন্তঃবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন।

রিচার্ড রবসন: কোঅর্ডিনেশন পলিমারের জ্যামিতিক স্থপতি

১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু রিচার্ড রবসনের গবেষণা জীবন, যে জীবন অন্তর্দৃষ্টি এবং জ্যামিতিক যুক্তির সমন্বয়ের প্রতীক। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্গানিক ফটোকেমিস্ট্রিতে ডি.ফিল ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল, ক্যালটেক এবং স্ট্যানফোর্ডে গুরুত্বপূর্ণ পোস্টডক্টোরাল গবেষণার সময় রবসন কাঠামোগত এবং অজৈব রসায়নের প্রতি আকৃষ্ট হন।

১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে মেলবোর্নে প্রথম বর্ষের ছাত্রদের বক্তৃতার সুবিধার্থে তিনি নির্মাণ করেন কাঠের জালির মডেল। এ ভাবেই আণবিক প্রতিসাম্য চিহ্নিত করার জন্য বল এবং রড সংযুক্ত করার আইডিয়া পেয়েছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন, যদি বাস্তব অণু এবং তাদের মধ্যে বন্ধনগুলো পারমাণবিক স্কেলে একইভাবে একত্রিত করা যায়, তবে কী হতে পারে? এই অন্তর্দৃষ্টিই তাঁর আজীবন গবেষণার পথ তৈরি করেছিল।

১৯৮০-র দশকের শেষের দিকে রবসন এবং তাঁর সহযোগীরা টেট্রাহেড্রাল কপার(I) এবং পলিটোপিক জৈব লিঙ্কার ব্যবহার করে অসীম, অত্যন্ত সুশৃঙ্খল কোঅর্ডিনেশন পলিমার তৈরি করেছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন ইচ্ছামতো তাদের তৈরি করা যায়। এই জালির মতো ‘আণবিক স্ক্যাফোল্ড’গুলোতে ইচ্ছামতো ফাঁকা জায়গাসহ চেইন, লেয়ার এবং ত্রিমাত্রিক নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেত, পরবর্তীকালে যা ব্যবহার করে কিতাগাওয়া এবং ইয়াঘি মফ-এর ক্রিস্টাল তৈরি করেন। যুক্তিসঙ্গত পুনরাবৃত্তিমূলক স্থাপত্য নির্মাণের জন্য রবসনের এই গবেষণাই ছিল প্রথম শক্তিশালী নকশা। হিরার পারমাণবিক গঠনের নকশা থেকে অনুপ্রাণিত সুড়ঙ্গযুক্ত মফের এক ছবি নীচে দেখানো হ’ল।

রবসনের দলই প্রথম দেখিয়েছিলেন যে ধাতু-জৈব স্থাপত্যগুলো জ্যামিতিক নিয়মের উপর ভিত্তি করে মডুলার এবং অনুমানযোগ্য তৈরি করা সম্ভব। মেলবোর্নে তাঁর নেতৃত্বে কাঠামোগত রসায়ন এবং ক্রিস্টাল ইঞ্জিনিয়ারিঙের এক শক্তিশালী ঐতিহ্য নির্মিত হয়, যা ভবিষ্যৎ গবেষক প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।  

ওমর এম. ইয়াঘি: জালিকা রসায়নের বিশ্বায়ন

ওমর এম. ইয়াঘির গবেষণার পথ নিরলস উচ্চাকাঙ্ক্ষা দিয়ে পারমাণবিক লেগোর স্বপ্নকে বাস্তব ও কার্যকরী উপকরণে রূপান্তরিত করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি এবং পোস্টডক্টরাল কাজের পর ইয়াঘি ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে তার স্বাধীন কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি দ্রুত একটা মডুলার সিন্থেটিক পদ্ধতি আবিষ্কারের মাধ্যমে নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরেছিলেন। এর কেন্দ্রে ছিল ‘সেকেন্ডারি বিল্ডিং ইউনিট’ (SBUs)-এর ধারণা, যেখানে নির্দিষ্ট জ্যামিতি-সহ ধাতব আয়নের গুচ্ছ একটা কাঠামোর মধ্যে নোড হিসাবে কাজ করে।  

১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম যুক্তিসঙ্গতভাবে পরিকল্পিত পদ্ধতিতে ইয়াঘি ধাতুর সঙ্গে জৈব লিঙ্কার লাগান এবং তিনিই এদের নামকরণ করেন ধাতু-জৈব কাঠামো বা মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক। তাঁর সেই পরিকল্পনা দেখায় যে নির্বাচিত জৈব লিঙ্কারের সঙ্গে ধাতব কেন্দ্রগুলো একত্রিত করে স্থায়ী ছিদ্রযুক্ত শক্তিশালী মফ ক্রিস্টাল তৈরি করা সম্ভব। এর ফলে ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কৃত হয় MOF-5 (ছবি নীচে), যার রেকর্ড-উচ্চ সারফেস এরিয়া বিশ্বব্যাপী মফ গবেষণার তরঙ্গকে উৎসাহিত করে। পরবর্তী দু’ দশক ধরে মিশিগান, লস এঞ্জেলস এবং বার্কলেতে ইয়াঘির গবেষণাগার জালিকা-রসায়নের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। 

মফ-এর বাইরেও বিস্তৃত হয়ে, ইয়াঘি ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে নতুন ধরণের কোভ্যালেন্ট অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক (COF) প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে তিনি ধাতব আয়ন ছাড়াই শুধুমাত্র জৈব উপাদান ব্যবহার করে সুবিন্যস্ত বৈশিষ্ট্যযুক্ত ছিদ্রযুক্ত ক্রিস্টাল তৈরি করতে সমর্থ হন। তাঁর গবেষণার ফলাফল শক্তি এবং পরিবেশের ওপর ব্যতিক্রমী প্রভাব ফেলেছে। কার্বন ডাই-অক্সাইড ক্যাপচারের জন্য মফ এবং COF, পরিষ্কার শক্তির জন্য হাইড্রোজেন এবং মিথেন সঞ্চয়, এবং মরুভূমির বাতাস থেকে পানীয় জল টেনে আনতে সক্ষম মফ-ভিত্তিক জল সংগ্রহকারী যন্ত্রের সৃষ্টি – সবই এর ফলে সম্ভব হতে চলেছে। ইয়াঘি জলবায়ু এবং জল-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে মফ প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণের জন্য ২০২০ খ্রিস্টাব্দে অ্যাটোকো নামে এক কোম্পানিও প্রতিষ্ঠা করেন।

তাঁর সমগ্র কর্মজীবন জুড়ে ইয়াঘি ওপেন-অ্যাক্সেস রসায়নের পক্ষে ওকালতি করেছেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য বার্কলে গ্লোবাল সায়েন্স ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং বিভিন্ন পটভূমির বিজ্ঞানীদের একটি নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করতে পরামর্শ দিয়েছেন। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর সহ-লিখিত বই ‘ইন্ট্রোডাকশন টু রেটিকুলার কেমিস্ট্রি’ এক মৌলিক পাঠ্যপুস্তক হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে। 

কিতাগাওয়া, রবসন এবং ইয়াঘির বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো উৎপত্তির দিক থেকে ছিল স্বাধীন, কিন্তু উদ্দেশ্যের দিক থেকে অভিন্ন। প্রত্যেকেই একই ধাঁধাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছিলেন – কিতাগাওয়া গতিশীল কার্যকারিতার (dynamic function) দিক থেকে, রবসন জ্যামিতিক নকশার (geometric design) দিক থেকে এবং ইয়াঘি সংশ্লেষণের দক্ষতার (synthetic aptitude) দিক থেকে। তাঁদের কাজ একত্রিত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের বস্তু ও সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যার বৈশিষ্ট্যগুলো এখন বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার গবেষণা, পেটেন্ট এবং প্রয়োগকে অনুপ্রাণিত করেছে।

মফ-এর অসীম দিগন্ত: প্রয়োগ, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ

২০২৫ খ্রিস্টাব্দের রসায়নে নোবেল পুরস্কার কেবল অতীতে যে-বিদ্যা অর্জন করা হয়েছে, তাকেই শুধু নয়, বরং এমন এক শ্রেণির বস্তুর জন্য দেওয়া হয়েছে, যার ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত ব্যবহার প্রচুর। জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন, শক্তি সঞ্চয়, জলের বিশুদ্ধীকরণ, এমনকি চিকিৎসার বিভিন্ন ক্ষেত্রেও এই ব্যবহার হ’তে পারে। ‘মফ’ এক বহুমুখী রাসায়নিক পদার্থ, যার প্রকৃতি নিহিত আছে তার রাসায়নিক স্থাপত্যে। আগামী দশকগুলিতে বিভিন্ন ধরনের ‘মফ’ পরীক্ষাগারের কৌতূহল ছাপিয়ে সাস্টেনেবল ফিউচার-সংক্রান্ত বহুবিধ প্রকল্পে নিযুক্ত হওয়ার অপেক্ষায়।

এদের কয়েকটার উদাহরণ নীচে দেওয়া হ’ল –

 বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ

মফ-প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে কার্বন ডাই-অক্সাইড ধারণ। পৃথিবীর সমস্ত দেশ যখন নেট-জিরো কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের (net-zero emission) জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হচ্ছে, তখন তা বাস্তবায়িত করার প্রযুক্তি তো চাই! দক্ষতার সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ এবং সংরক্ষণ জলবায়ু কর্মকাণ্ডের (climate action) কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। এর আগে বিভিন্ন তরল অ্যামিন (যা প্রকৃতিতে ক্ষারীয়) দিয়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড (যা অ্যাসিডিক গ্যাস) শোষণ করার কথা ভাবা হয়েছিল, কিন্তু অ্যামিন তৈরিতে শক্তির পিছনে প্রচুর খরচ। পক্ষান্তরে মফ-গুলো তাদের বিশাল পৃষ্ঠতল এলাকা (surface area) এবং ফোঁপরা গঠনের জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণে কম-শক্তির বিকল্প হয়ে উঠছে।

সাম্প্রতিক মফ-প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে CALF-20 এবং MUF-16-এর মতো ধাতু-জৈব কাঠামো তৈরি করা সম্ভবপর হয়েছে, যা আর্দ্র পরিস্থিতিতেও CO2 গ্যাস শোষণ করতে পারে। এই বস্তুগুলো বাস্তব জগতে ব্যবহারের জন্য বড়সড় অগ্রগতি। এই মফ-গুলো পয়েন্ট-সোর্স ক্যাপচার (অর্থাৎ কারখানার চিমনি থেকে CO2 নিষ্কাশন) এবং ডাইরেক্ট এয়ার ক্যাপচার (অর্থাৎ, সরাসরি বাতাস থেকে CO2 নিষ্কাশন) উভয় ক্ষেত্রেই কাজ করে। যেহেতু মফ-গুলোকে ন্যূনতম তাপ প্রয়োগ করেই পুনরুত্পাদন করা যায়, তাই এদের ব্যবহারে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। BASF, Nuada এবং Promethean Particles-এর মতো কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিক প্রয়োগের জন্য এই মফ-প্রযুক্তিগুলো উচ্চ-স্কেলে উৎপাদন করার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ফলিত রসায়ন সরাসরি জলবায়ু অর্থনীতিতে ব্যবহৃত হ’তে চলেছে।

IDTechEx 2025–2035 রিপোর্টে মফ-ভিত্তিক কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তিগুলোকে চল্লিশ শতাংশের বেশি চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পাওয়ার মতো শক্তিশালী বলে দাবি করা হয়েছে।  

 আর্দ্র বাতাস থেকে জল নিষ্কাশন

মফ-এর এ আর এক রূপান্তরমূলক প্রয়োগ এবং বিশেষ করে ইয়াঘির শৈশবকালীন জল-রেশনের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে গভীরভাবে প্রতীকী। পৃথিবীর তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থল হলেও মানুষপ্রতি ব্যবহার্য জলের প্রাপ্যতা দিন দিন নিম্নগামী। জল বিশুদ্ধীকরণের অনেক উপায় পাওয়া গেলেও যেহেতু পৃথিবীর অধিকাংশ স্থানেই জলাশয়, নদীনালা শুকিয়ে যাচ্ছে, তাই জলের নতুন উৎস বের করা অবশ্যম্ভাবী। MOF-801 এবং MOF-303-এর মতো কিছু ধাতু-জৈব কাঠামো দেখা গেছে মরুভূমির বাতাস থেকে জল শোষণ করতে এবং ছেড়ে দিতে পারে, এমনকি আপেক্ষিক আর্দ্রতা ২০%-এর নীচে থাকলেও। প্রতিটি চক্র জল-শোষণ চালানোর জন্য এদের প্রয়োজন হয় কেবলমাত্র সূর্যালোকের এবং  অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে এরা পরিষ্কার জল উৎপাদন করে।

এই মফ-গুলো ব্যবহার করে বেশ কিছু পাইলট ডিভাইস এখন আফ্রিকার সাহারা, আমেরিকার অ্যারিজোনা এবং ভারতের রাজস্থানে পরীক্ষামূলক কাজকর্ম করছে, শুষ্ক বাতাস থেকে প্রতিদিন কয়েক লিটার পানীয় জল সংগ্রহ করা যাচ্ছে এ দিয়ে। প্রচলিত ‘ডিস্যালিনেশন’ বা ‘ডিহিউমিডিফিকেশন’-এর তুলনায়, মফ-ভিত্তিক জল সংগ্রহকারী যন্ত্রগুলোতে শক্তি-খরচ কম, ফলে শুষ্ক অঞ্চলে জল-প্রাপ্যতার স্থায়িত্ব দিতে সক্ষম। ইন্ডাস্ট্রিয়াল হিটিং, ভেন্টিলেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেমগুলো আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ এবং বাতাস থেকে বর্জ্য আর্দ্রতা জল হিসাবে সংগ্রহ করার জন্য মফ ব্যবহার শুরু করছে, যা বিল্ডিঙের শক্তি-ব্যবস্থাপনায় খুবই কার্যকর হতে পারে।

 হাইড্রোজেন, মিথেন এবং শক্তি সঞ্চয়

বিশ্বব্যাপী পরিষ্কার শক্তি (clean energy) ব্যবহার নিশ্চিত করতে হ’লে হাইড্রোজেন এবং মিথেন গ্যাস দক্ষতার সঙ্গে নিরাপদে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন এবং এটা একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। কিছু কিছু মফে ইচ্ছামতো ছিদ্র-নির্মাণ (tunable pore size) এবং উচ্চ আয়তনের গহ্বর ধারণ (high porosity) সম্ভব হওয়ায় তারা কঠিন-অবস্থার গ্যাস সঞ্চয়ের জন্য সম্ভাব্য শীর্ষস্থানীয় প্রার্থী হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে। MOF-177, HKUST-1, এবং NU-100 এর মতো ধাতু-জৈব কাঠামোগুলো হাইড্রোজেন ধারণের এমন ক্ষমতা দেখাচ্ছে যা মার্কিন জ্বালানি-বিভাগ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি।

কিছু মফ ব্যাটারি এবং সুপারক্যাপাসিটরে ইলেকট্রোড এবং ইলেক্ট্রোলাইট হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যেখানে তাদের অভ্যন্তরীণ স্থাপত্য আয়ন পরিবহণ সহজতর করে। মফের ছিদ্রের মধ্যে পরিবাহী পলিমার স্থাপন করে হাইব্রিড সিস্টেম তৈরি করা হচ্ছে যারা উচ্চ-ভোল্টেজসহ এমন ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল ডিভাইস তৈরি করতে পারে যা বহুদিন চলে।  একসময় বস্তুর যে সমস্ত গুণগুলো নিছক শৈল্পিক কৌতূহল হিসেবে কাজ করত, যেমন প্রতিসাম্য, ছিদ্রতা এবং মডুলারিটি, এখন মফ-এর মাধ্যমে তাদের বাড়ানো-কমানো সম্ভব এবং এরাই পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি-প্রযুক্তি নকশার মূলমন্ত্র হয়ে উঠছে। 

 চিকিৎসা এবং জৈবপ্রযুক্তিগত প্রয়োগ

পরিবেশ সংরক্ষণ এবং শক্তি উৎপাদন ছাড়াও মফের ব্যবহার পরীক্ষা করা হচ্ছে নিয়ন্ত্রিত ওষুধ সরবরাহের বাহন এবং জৈব-সংবেদনশীল উপকরণ হিসাবে। তাদের জৈব সামঞ্জস্যতা, ইচ্ছেমতন ছিদ্র নির্মাণকারী পরিবেশ এবং এমন কাঠামো নির্মাণের প্রতিশ্রুতি যা নির্দিষ্ট কোষকলার পরিবেশে ভেঙে গিয়ে ভেতরের ওষুধ বের করে দেবে, এ সবই এনক্যাপসুলেশন এবং কন্ট্রোল্ড রিলিজের জন্য মফকে আদর্শ করে তোলার উপযোগী।

UiO-66(Zr) এবং MIL-101(Cr) এর মতো কাঠামোগুলো এখন নির্দিষ্ট লক্ষ্যযুক্ত ক্যান্সার থেরাপির জন্য পরীক্ষা করা হচ্ছে, যা দিয়ে কেমোথেরাপিউটিক এজেন্টগুলি সরাসরি টিউমার সাইটগুলিতে কম বিষাক্ততার সঙ্গে সরবরাহ করা সম্ভব হয়। অন্যান্য কিছু মফ অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল আবরণ হিসাবে, এনজাইম বাইন্ডিং এবং জৈব সংবেদনের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছে। কম্পিউটেশনাল মডেলিং এবং হাইব্রিড প্রোটিন-মফ কিছু মিশ্রণ এ ধরনের ডিজাইনের তালিকা আরও প্রসারিত করেছে।  যদিও ক্লিনিক্যাল ট্রান্সলেশন এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, এদের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা অপরিসীম।

 পরিবেশগত পরিশোধন এবং রাসায়নিক পৃথকীকরণ

পরিবেশগত পরিশোধন এবং রাসায়নিক পৃথকীকরণের মধ্যে ধাতু-জৈব কাঠামোর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিহিত। বেশ কয়েকটা কাঠামো অ্যামোনিয়া, ক্লোরিন এবং সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো বিপজ্জনক গ্যাসের জন্য অসাধারণ শোষণক্ষমতা প্রদর্শন করে। বর্জ্য জল থেকে পারফ্লুরোঅ্যালকাইল পদার্থ (PFAS) – তথাকথিত ‘ফরএভার কেমিক্যাল’ – আটকাতেও সক্ষম কিছু মফ। পেট্রোলিয়াম পরিশোধন এবং ইলেকট্রনিক্সের মতো শিল্পগুলোতেও মফের ব্যবহারের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। 

শিল্পের জন্য MOF উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ,
অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

শিল্প ব্যবহারের জন্য ধাতু-জৈব কাঠামো উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে রয়েছে:

১। সংশ্লেষণ জটিলতা এবং খরচ: মফের জন্য প্রায়শই সুনির্দিষ্ট বিক্রিয়ার শর্ত বহাল রাখা দরকার হয় – তাপমাত্রা, চাপ, দ্রাবক – সবকিছু। শিল্প স্কেলে এগুলো বজায় রাখা জটিল এবং ব্যয়বহুল হতে পারে। অনেক প্রাথমিক পদ্ধতিতে বিক্রিয়ার সময় অতি দীর্ঘ, থ্রুপুট সীমিত এবং খরচ খুব বেশি।

২। কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং বিশুদ্ধতা: মফ তৈরিতে ব্যবহৃত জৈব লিঙ্কার এবং ধাতব লবণ অবশ্যই উচ্চ বিশুদ্ধতার হতে হবে, কখনও কখনও তা খুবই দুর্মূল্য এবং বৃহৎ স্কেলে অলভ্য।

৩। পুনরুৎপাদনযোগ্যতা এবং মান নিয়ন্ত্রণ: ব্যাচ-টু-ব্যাচ ছিদ্রের আকার, পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল এবং ক্রিস্টালিনিটি সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা খুবই কঠিন চ্যালেঞ্জ। এবং এগুলো সুনির্দিষ্ট না হলে ব্যবহারে এদের নির্ভরযোগ্যতা হ্রাস পায়। গ্যাস পৃথকীকরণ বা নির্দিষ্ট কোষকলায় ওষুধ সরবরাহের মতো সংবেদনশীল অ্যাপ্লিকেশনগুলোতে তখন এদের ব্যবহার করা যায় না।

৪। সংশ্লেষণ কৌশলের স্কেলেবিলিটি: উচ্চ চাপ এবং তাপমাত্রার কারণে হাইড্রোথার্মাল এবং সলভোথার্মাল পদ্ধতিগুলো লার্জ স্কেলে চালু করা কঠিন। মেকানোকেমিক্যাল সিন্থেসিস বা কন্টিনিউয়াস ফ্লো রিয়্যাকটরের মতো বিকল্প পদ্ধতিগুলো আশাব্যঞ্জক, কিন্তু এখনও এগুলো পরীক্ষার স্তরে নিহিত।

৫। মফ তৈরির পরের প্রক্রিয়াকরণ: মফ তৈরির পর তার দ্রাবক ও অশুদ্ধি অপসারণের সময় কাঠামো যেন ভেঙে না পড়ে, সে দিকে খেয়াল রাখা অবশ্যম্ভাবী। এদের শুকানো, দ্রাবক বিনিময় এবং সক্রিয়করণ অবশ্যই দক্ষ এবং সাশ্রয়ী হতে হবে। এগুলোও শিল্প স্কেলে খুব সহজ ব্যাপার নয়।

৬। উপাদানের স্থিতিশীলতা: অনেক মফ আর্দ্রতা, তাপ বা বিভিন্ন রাসায়নিকের ওপর সংবেদনশীল, যার ফলে প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহণ বা প্রয়োগের সময় তাদের কাঠামো পোক্ত থাকে না। কর্মক্ষমতা নষ্ট না করে স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করাটাও এক গবেষণার বিষয়।

৭। পরিবেশগত ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ: মফ তৈরিতে দ্রাবকের ব্যবহার এবং পরিবেশে সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়া পরিবেশগত সমস্যা তৈরি করে। স্থিতিশীল মফ উৎপাদনের জন্য পরিবেশবান্ধব, দ্রাবক-মুক্ত, পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রক্রিয়া অপরিহার্য।

এই সবগুলোই মফের বাণিজ্যিক সাফল্যের পক্ষে চ্যালেঞ্জ। এদের মোকাবিলা করতে পারলে তবেই মফ যে প্রতিশ্রুতি জাগিয়েছে, তার প্রতি সুবিচার করতে পারবে। ধাতু-জৈব কাঠামোর ভবিষ্যৎ কল্পনা দিয়ে সীমাবদ্ধ নয় বরং উৎপাদন স্কেল দিয়ে সীমাবদ্ধ। অতীতে যে সমস্ত মফ তৈরি করা হয়েছে, তাদের প্রস্তুতি-পদ্ধতি জটিল এবং ব্যয়সাধ্য। তবে এখন বিভিন্ন রাসায়নিক বড় বড় কোম্পানিগুলো, যেমন BASF, Promethean Particles, Atomis এবং Numat ক্রমাগত হাইড্রোথার্মাল এবং যান্ত্রিক রাসায়নিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তুলনামূলকভাবে সরল পদ্ধতিতে কম খরচে উৎপাদন সম্প্রসারণ করছে। IDTechEx বাজারের পূর্বাভাস ২০৩৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মফের উৎপাদন ৩০ গুণ বৃদ্ধি পাবে এবং এগুলো মূলত কার্বন ক্যাপচার, জল সংগ্রহ এবং রাসায়নিক পরিশোধনে ব্যবহৃত হবে। 

তথ্যসূত্র:

https://www.nobelprize.org/prizes/chemistry/2025/press-release/
https://www.nature.com/articles/d41586-025-03195-1
https://onlinelibrary.wiley.com/doi/full/10.1002/gch2.202300244
https://pubs.acs.org/doi/10.1021/acsomega.2c05310
https://www.britannica.com/biography/Susumu-Kitagawa
https://en.wikipedia.org/wiki/Richard_Robson_(chemist)
https://www.britannica.com/biography/Omar-M-Yaghi
https://pubs.rsc.org/en/content/articlelanding/2025/nr/d5nr02892b
https://www.idtechex.com/en/research-report/metal-organic-frameworks-2025-2035-markets-technologies-and-forecasts/1086

Leave a Reply