ধারাবাহিক অভিযান-খোটানের বালুসমাধিতে(এপিসোড ১৩)-অরেলস্টাইন-অনু-অরিন্দম দেবনাথ-শীত ২০২৪

জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- ভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়)  অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

এই ধারাবাহিকের আগের পর্ব- পর্ব ১, পর্ব ২ পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব ৫ পর্ব ৬, পর্ব ৭, পর্ব ৮ পর্ব৯, পর্ব ১০, পর্ব ১১ পর্ব ১২

obhijjaankhotancover

স্যার অরেল স্টাইন ছিলেন একজন ব্রিটিশ পুরাতাত্ত্বিক। ১৮৬২ সালের ২৬ নভেম্বর তাঁর জন্ম হাঙ্গেরিতে। তিনি ব্রিটিশ সময়কালে নানা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি মধ্য এশিয়ায় একাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তিনি শুধু একজন প্রত্নতাত্ত্বিকই ছিলেন না, ছিলেন একজন নৃতাত্ত্বিক, ভূগোলবিদ, ভাষাবিদ এবং জরিপকারী। ডানহুয়াং গুহা থেকে উদ্ধারকরা পুথি এবং পাণ্ডুলিপির সংগ্রহ মধ্য এশিয়ার ইতিহাস এবং বৌদ্ধধর্মের শিল্প ও সাহিত্যের অধ্যয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর অভিযান এবং আবিষ্কারের উপর বেশ কিছু বই লিখেছিলেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাচীন খোটান, সেরিন্ডিয়া এবং আভ্যন্তরীণ এশিয়া বিষয়ক বই। সংস্কৃত থেকে রাজতরঙ্গিণীর ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন তিনি। চিরকুমার অরেল স্টাইন ১৯৪৩ সালের ২৬ অক্টোবর কাবুলে দেহত্যাগ করেছিলেন। এই নিবন্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে চলেছে তাঁর তাকলামাকান মরুভূমির প্রত্নতাত্ত্বিক খোটান অভিযানের কথা।

ত্রয়োদশ পর্ব

গত তিনদিন ধরে খোঁড়াখুঁড়ি থেকে এই অমুল্য বস্তুটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। আজ জীর্ণ হয়ে যাওয়া কাপড়ে মোড়ানো কয়েকটি পুথির দীর্ণ পাতা আমার উৎসাহকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। আমি ধরেই নিয়েছিলাম বালির তলায় চাপা পড়ে থাকলেও পুথির অস্তিত্ব পাওয়া সম্ভব নয়, তা গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে বালির সঙ্গে মিশে গিয়েছে এই চরম আবহাওয়ায়।

অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় বালির তলায় চাপা পড়ে থাকা শেষের দিকের একটি ঘরের ভেতর থেকে পাওয়া গিয়েছিল পুথিটি। পুথির মলাটের সরু কাগজের ফালির ওপরের অংশে তিন লাইন আড়াআড়িভাবে ভারতীয় ব্রাহ্মী লিপিতে কিছু লেখা। আর বাকি অংশ জুড়ে দুই মহিলার এক শিশুকে ধরে থাকা ছবি- ফিকে হয়ে গেলেও বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু কয়েকটি লিপি ছাড়া সেই পচে যাওয়া পুথিতে যে কী লেখা আছে তার আভাস পাওয়া সম্ভব হয়নি। মন্দিরের ফ্রেস্কোর নীচে টানা (cursive) লেখার মতো নয়, গোটা গোটা হস্তাক্ষরে লেখা।  ধরণ দেখে মনে হয় এটি কোনো সুদক্ষ হাতে লেখা সংস্কৃত সাহিত্যকর্ম। 

ছোটো ছোটো মন্দির খনন করে, বালিতে চাপা পড়ে যাওয়া  এই বসতিটি পরিত্যক্ত হবার আগেকার সংস্কৃতি ও শিল্পকলা সম্পর্কে অনেকটাই ধারণা পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু খোঁড়াখুঁড়ি থেকে এখনও পর্যন্ত  পাওয়া নমুনা থেকে এখানকার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়নি। তাই ঠিক করেছিলাম এখানে আরও খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চালিয়ে যাব।

obhijaankhotaan01

২২ ডিসেম্বর আমি আমার লোকজনকে নির্দেশ দিলাম কাছাকাছির মধ্যে বালি ফুঁড়ে বেরিয়ে থাকা বেশ কিছু কাঠের খুঁটি বরাবর খনন করতে। খুঁটির বিন্যাস দেখে মনে হয়েছিল এটি কোন বসতবাড়ি হলেও হতে পারে। মন্দির এলাকা থেকে এটি উত্তর-পশ্চিমে প্রায় কুড়ি গজ দূরে একটি বালিয়াড়ির উত্তর ভাগে অবস্থিত ছিল। বালিয়াড়িটি প্রায় ১৬ ফুট উঁচু। মরে যাওয়া শুকনো গাছের শেকড় বেরিয়ে ছিল বালিয়াড়ির নীচু অংশ থেকে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা শেকড়ের ব্যাপ্তি দেখে বোঝা যায় বাড়িটি গাছ দিয়ে ঘেরা ছিল। এবং যে ভাবে শেকড়গুলো বালির তলা থেকে বেরিয়ে এসেছে তা বলে দেয় এখানে আগে ধন-শিকারিরা খোঁড়াখুঁড়ি করেছে। খনন শুরু হবার অল্প সময়ের মধ্যেই কাঠের ওপর পলেস্তারার প্রলেপ দেওয়া দেওয়ালের অংশ দেখা যেতে শুরু করে। মোটামুটি ভালো অবস্থাতে থাকা বাড়ির দেওয়ালটি এক বসতবাড়ির নীচের অংশ। আয়তকার বাসস্থানের মাপ ছিল ২৩ ফুট লম্বা ২০ ফুট চওড়া উচ্চতায় ১০ ফুট।    

obhijaankhotaan02

দুপুর নাগাদ ফুট দুয়েক গভীর আলগা বালি সরাতে প্রথম বার ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা কাগজের জীর্ণ টুকরো পাওয়া গেল। এই ছোট্ট কাগজের টুকরোটাকে অতীত সন্ধানের এক বড়ো সূত্র হিসেবে দেখেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমি বালি খুঁড়িয়েদের মধ্যে উৎসাহ বাড়ানোর জন্য যে প্রথম আর একটি পুথি খুঁজে পাবে তাকে এক টুকরো রুপো পুরস্কার দেব বলে ঘোষণা করে দিলাম।

বালি সরানোর কাজটা খুব সহজ নয়। একদিক থেকে বালি সরানো হলে অন্যদিক থেকে বালি ঝড়ে পড়ে সেই জায়গা দখল করে। ঘণ্টাখানেক যেতে না যেতেই ধ্বংসস্তূপের উত্তর-পশ্চিম দিকের এক বালি খুঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠেছিল – ‘খত!’

খুব সাবধানে নিজের হাতে বালি সরিয়ে পুথিটা বের করেছিলাম। ১৩ ইঞ্চি লম্বা ৪ ইঞ্চি চওড়া আয়তাকার মাপের ভারতীয় ঘরানার কাগজের পুথিটি খুব ভালো অবস্থাতেই ছিল। পুথিটির বাঁ ধারে ছোটো গোল ছিদ্র, যার ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসা দড়ি পুথিটির অনেকগুলো পাতা ক্রমান্বয়ে একসঙ্গে ধরে রেখেছে। এই গড়নের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি চাইনিজ তুর্কিস্থান থেকে আগেও উদ্ধার হয়েছে। পুথিটির প্রতিটি পাতার দু’পাশে ছ’টি করে লাইন সুন্দর স্পষ্ট হস্তাক্ষরে লেখা। লেখার ধরণ গুপ্তযুগের  মতো ব্রাহ্মী লিপিতে হলেও ভাষা অ-ভারতীয়।

আমার দলের লোকেরা আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে পুথি পরিষ্কার করা দেখছিল। পরিষ্কার করতে করতেই কানে আসছিল পুথি উদ্ধারের আগে আমার ঘোষণা করা পুরস্কার নিয়ে দলের লোকেদের হাস্যকৌতুক। পুথিটি খুঁজে পেয়েছিল তাওয়াক্কেল থেকে দলে যোগ দেওয়া খননকারী দলের একমাত্র পড়তে-লিখতে পারা যুবকটি। ছেলেটির নাম নিয়াজ, ওকে আমরা মোল্লা বলে ডাকতাম। এতে ছেলেটি ভীষণ খুশি ও সম্মানিত বোধ করত। দলের লোকেদের মতে নিয়াজ লেখাপড়া জানে বলে ওই-ই পুথিটি খুঁজে পেয়েছে।

পুরস্কার পেয়ে নিয়াজ তার বালকসুলভ আনন্দ চেপে রাখতে পারেনি। পরবর্তীকালে নিয়াজ সহ অন্যান্যরা এই প্রত্নতত্ত্বের গুরুত্ব বুঝে শুধু যে খোঁড়াখুঁড়ির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা ও যত্ন নিয়েছিল তাই নয়,সংগৃহীত নানা নমুনা আমাকে পাঠানোর ক্ষেত্রে নিয়াজ তার তুর্কি জ্ঞান দিয়ে প্যাকিং বাক্সের ওপর তুর্কিতে নির্দেশ লিখতে যথাসাধ্য সাহায্য করত। 

ওপরে যে পুথিটি নিয়ে বলেছি সেটি পাওয়া গিয়েছিল বাড়িটির ঘরের ভেতরে একটি খুঁটির বাঁ দিক থেকে ৫ ফুট মতো দূরে। এই পুথিটি পাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই আরও বেশ কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছিল ঘরের মধ্যে থেকে। কিছু শুধুমাত্র আলগা কাগজ হিসেবে আবার কিছু বা পুথির আকারে, যদিও অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। প্রায় সব পাণ্ডুলিপিই ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা। কাগজ,লেখার ছাঁচ ও ধরণ সব পুথিরই এক। অধিকাংশ পাণ্ডুলিপিগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে থাকলেও তিনটে পুথি প্রায় সম্পূর্ণ অবস্থায় ছিল। এই তিনটে পুথির ভাষা ছিল সংস্কৃত,যা আমি দ্রুত বুঝে গিয়েছিলাম। পুথিগুলো বৌদ্ধ অনুশাসন বিষয়ক। ঘরের মূল মেঝে থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে আলগা বালির মধ্যে যে ভাবে পুথি ও পাণ্ডুলিপির টুকরোগুলো পাওয়া গিয়েছিল তা বলে দেয় নিঃসন্দেহে ওগুলো ওপর থেকে ওখানে পড়েছিল। শুধু তাই নয় পুথির টুকরোগুলো পাওয়া গিয়েছিল বালির নানা স্তরে। যা থেকে অনুমান করতে অসুবিধা হয় না উড়ে আসা আলগা বালির মধ্যে নানা সময়ে ঘরের কোন ওপর অংশ থেকে এগুলো খসে পড়েছে। আমার ভাবনার তত্ত্বকে সমর্থন করছিল ঘরে জমা হওয়া আলগা বালির নানা স্তরে পাওয়া অন্যান্য সামগ্রী। যেমন পশু চামড়ার কম্বল,চামড়ার আসন,অয়েল কেক – কুঞ্জরা ইত্যাদি। কয়েকটি পুথির পাতার ধারে লেখা পৃষ্ঠা সংখ্যা বোঝা সম্ভব হয়েছিল। একটি আলগা পাতার ধারে পৃষ্ঠাসংখ্যা উল্লেখিত ছিল ১৩২ – পুথিটি সম্পূর্ণভাবে উদ্ধার করা না গেলেও তার বিশালত্ব অনুমান করা যাচ্ছিল।

২৩ ডিসেম্বর খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু হওয়া থেকেই আমি নতুন কিছু পাওয়ার আশায় ছিলাম। কারণ বালি খুঁড়তে খুঁড়তে ঘরের প্রায় আসল মেঝের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল আমার লোকেরা। যতই গভীরে যাওয়া হচ্ছিল বালি খোঁড়ার কাজটা ততই জটিল হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। বালিয়াড়ির দক্ষিণের উঁচু ঢাল থেকে শুকনো বালি গড়িয়ে এসে ভরিয়ে দিচ্ছিল খালি জায়গা। ফলে আবার খুঁড়ে তুলতে হচ্ছিল বালি।

বারবার একই কাজ করে যাচ্ছিল দমে না যাওয়া এই মরুতেই বসবাসকারী লোকেরা। বালি ক্রমাগত পরিষ্কার করার পর প্রথমেই মেঝে জুড়ে পড়ে থাকা পপলার গাছের বিশাল গুঁড়ি বেরিয়ে এল। ১৯ ফুটের মতো লম্বা গুঁড়িটা ফুটখানেক মোটা। কোন সন্দেহ নেই এই লম্বা গুঁড়িটা ঘরের ছাদকে ধরে রাখার কাজ করত। তাকে ঘরের মেঝেতে ঠেকনা দিয়ে রেখেছিল আরও দুটো অষ্টভুজাকার খুঁটি। খুঁটিদুটোর গায়ে ভারতীয় স্থাপত্যের ‘অমলকা’ গোত্রের অলঙ্করণ খোদাই করা ছিল।

খুঁটিগুলোর গা ঘেঁষে বালি পরিষ্কার করার পরপরই পাওয়া গিয়েছিল বোঁচকায় বাঁধা আরও একটি পুথি। প্রায় অক্ষত অবস্থায় ছিল পুথিটি। বালি আরও খুঁড়তে বেরিয়ে এসেছিল প্রায় একই রকম পোটলায় বাঁধা আরও দুটি পুথি। আর্দ্রতার কারণে পুথির পাতাগুলো একটার সঙ্গে আর একটা আটকে ছিল। পুথির পাতা আলাদা করার চেষ্টা সেভাবে করিনি,কারণ কাগজগুলো ভঙ্গুর হয়ে ছিল। যে সুতোর বাঁধুনি দিয়ে পুথিগুলো জড়ানো ছিল, ভাঁজের কাছে সেগুলো অতি জীর্ণ অবস্থায় ছিল। এই পুথিগুলো লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের পাণ্ডুলিপি বিভাগের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হয়েছিল সঠিকভাবে পুনরুদ্ধারের জন্য।

পাণ্ডুলিপির ১৪ ইঞ্চি লম্বা পাতার দুপাশে ছয় লাইন করে গোটাগোটা ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা। লেখার ধরণ তথাকথিত ‘গুপ্ত’ ছাঁদের। ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা হলেও পাণ্ডুলিপির ভাষা সংস্কৃত। পাণ্ডুলিপি মূলত বৌদ্ধ ‘ধর্ম’ বা আনুশাসনিক বিষয় নিয়ে। (আমার উদ্ধার করা এই পাণ্ডুলিপি পাঠোদ্ধার ও শনাক্তকরণের জন্য বিশিষ্ট ভারতবিদ ডঃ এ. এফ. রুডলফ হোর্নেল-এর কাছে গিয়েছে;  এই বই যখন ছাপতে যাচ্ছে তখন তিনি আমায় জানিয়েছেন তিনি অনেকটাই পাঠোদ্ধার করেছেন এবং এটি পুরোটাই হীরক সূত্র বা বজ্রচ্ছেদিকা প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র (বৌদ্ধধর্মের মহাযান পাঠের একটি বিখ্যাত সূত্র।) পাণ্ডুলিপির প্যালিওগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য এখানে বিস্তারিত উল্লেখ করা সম্ভব নয়। এটাও বলা কঠিন এই ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা সব পাণ্ডুলিপির কাল সপ্তম শতাব্দী কিনা। এক-দু শতাব্দী আগে পরেও হতে পারে। 

obhijaankhotaan03 

বৌদ্ধ মন্দিরের উপস্থিতি ও পাণ্ডুলিপির প্রকৃতি দেখে নিঃসন্দেহে বলা যায় এটি ছিল কোনো বৌদ্ধ বিহার ও এই ঘরটি ছিল মন্দির পুরোহিত ও তার সহকারীদের জন্য নির্মিত পাঠাগার তথা অন্য কাজের জায়গা। যে ঘরটিতে এই পুথিগুলো পাওয়া গিয়েছিল সেটির পূর্বদিক রান্নার কাজেও ব্যবহার করা হত। দেওয়াল ঘেঁষা একটা শক্ত প্লাস্টার করা উনুন, যার চিমনিটি উঠে গেছে মেঝে থেকে প্রায় ফুট ছয়েক ওপরে।

উনুনের পাশে একটা চওড়া বেঞ্চ ছিল। বেঞ্চের আশপাশে পরে ছিল বেশ কিছু মাটির পাত্র ও রান্নার বাসনকোশন। এই বেঞ্চটি সম্ভবত বসবার ও রান্নার বাসনপত্র রাখার – দুই কাজেই লাগত। বেঞ্চের পাশেই একটা কাঠের তেপায়া ছিল।  তুর্কিস্থানের সব বাড়িতেই এই তেপায়াগুলো ব্যবহার করা হয় জলের পাত্র রাখার কাজে। তেপায়ার কাছেই একটা শক্ত ডালপালা সহ মোটা গাছের ডাল পোঁতা ছিল। সম্ভবত এই ডালগুলো কেটলি ঝুলিয়ে রাখার কাজে ব্যবহার করা হত। ঘরের মেঝের নানাপ্রান্ত থেকে বালি সরিয়ে পাওয়া প্রাণীর হাড়, অয়েল কেক, কাঠকয়লার স্তূপ আমার রান্নাঘরের তত্ত্বকেই সমর্থন করে।

দুপুর নাগাদ যখন আমি পাণ্ডুলিপি নিয়ে ব্যস্ত তখন নিস্তব্ধ বালি-সমুদ্রের উত্তর দিকে থেকে শোনা গিয়েছিল বন্দুকের গুলির শব্দ। খোঁড়াখুঁড়ির তদারকিতে ব্যস্ত থাকা তুর্দি তার অভিজ্ঞতায় বুঝে গিয়েছিল এটা একটা সঙ্কেত। কেরিয়া দরিয়ার দিক থেকে রাম সিং এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সাব সার্ভেয়ার রাম সিং, যশবন্ত সিং সহ পুরো দল আবার একত্র হলাম আমরা।

রাম সিংকে যে কাজ দিয়েছিলাম সেই টোপোগ্রাফির কাজ চিনা কর্তৃপক্ষ বা স্থানীয় লোকজনের কোনো বাধা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে শুনে খুব স্বস্তি পেয়েছিলাম। আমাদের পুরনো পথ ধরে পিশা উপত্যকায় ফিরে গিয়ে রাম সিং  ইউরুং-কাশের নদী খাতের আশপাশের বিশাল চূড়াগুলির একটি পরিপূরক ত্রিভুজ বানিয়ে ফেলেছিল। তারপর সেখান থেকে কে-৫ অর্থাৎ মুজতাগ পর্বতের উত্তর দিকের হিমবাহের ঢাল ধরে কেরিয়ার পশ্চিমে মরুভূমির ধারের এক ছোটো মরুদ্যানে নেমে আসে। মুজতাগ পর্বতের হিমবাহের ঢাল থেকে অসংখ্য ছোটো ছোটো জলের ধারা নেমে এসে মরুর কিনারায় গড়ে ওঠা মরূদ্যানগুলোকে সমৃদ্ধ করেছে। উঁচু পাহাড় থেকে প্লেন-টেবল ও ত্রিভুজকরণের (triangulation) মাধ্যমে রাম সিং পোলুকে ঘিরে ক্যাপ্টেন ডেইসির করা জরিপের সঙ্গে আমাদের কাজগুলোকে পূর্ব দিকে জুড়তে সফল হয়েছে। কেরিয়াতে পৌঁছে স্থানীয় আম্বানের সহায়তায় নতুন গাইড নিয়ে কেরিয়া নদীর পাশের জংগল ধরে আসার সময় শিকারী কাসিমের নেতৃত্বে পাঠানো দলের সঙ্গে মিলিত হয়। 

রাম সিং এমনিতে খুব কম কথা বলে, কাজেই সে যে বিগত পর্বতযাত্রার বিস্তারিত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেবে না তা ধরেই নিয়েছিলাম। কিন্তু তার পেশাদার শিক্ষার চিহ্ন ফুটে উঠেছিল ‘প্লেন-টেবিল’এর টোপোগ্রাফিক্যাল বিবরণে। শুধু এটুকু জেনেছিলাম প্রচণ্ড ঠান্ডা ও খাবার-দাবারের অভাবে খুব কষ্টের মধ্যে কেটেছিল তাদের দিনগুলো। এই কষ্টের অভিজ্ঞতা আমারও হয়েছে পাহাড়ে তাই বুঝে নিতে আর কিছু প্রশ্ন করতে হয়নি। তবে সে সবচাইতে আশ্চর্য হয়েছিল এখানকার মরুর অদ্ভুত জনশূন্যতা দেখে। জমে বরফ হয়ে যাওয়া নদীর ধার ছেড়ে আসার পর কোনো প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পায়নি, একের পর এক সবুজহীন প্রাণহীন বালির পাহাড়। শুধু এইটুকু মনের ভাবই প্রকাশ করেছিল রাম সিং। নির্জন মরু প্রান্তরে বালি খুঁড়ে পাওয়া ভারতীয় ঘরানার ভাস্কর্য আর পাণ্ডুলিপি রাম সিংএর দুঃসাহসী হিন্দু সঙ্গীদের মধ্যেও যে খানিক ভয়ের সঞ্চার করেছিল তা টের পেয়েছিলাম। একটা জনপদ কী করে মৃত্যু-নির্জন হয়ে গেল যে কথা ভাবিয়ে তুলেছিল ওদের। আমি আমার সাধ্যমত সবাইকে চাঙ্গা করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলাম সঙ্গে থাকা সামান্য চা, হিমায়িত ডিম, কিশমিশ, বাদাম ইত্যাদি খাইয়ে।

রাতের আঁধার নামা শুরু হতে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি তাঁবুতে ঢুকে বিশ্রাম নিয়ে সময় নষ্ট না করে রাম সিং কে নিয়ে বসে গিয়েছিলাম তার প্লেন টেবিলের কাজগুলো একবার দেখে নিয়ে আমার করা জরিপের নকশায় দান্দান-উইলিকের অবস্থান মিলিয়ে নিতে; এতে জরিপের নির্ভুলতা বজায় থাকবে। মরুভূমির চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া চরিত্রের ফলে আমার জরিপের কাজ কতটা অভ্রান্ত হয়েছে জানার জন্য মুখিয়ে ছিলাম। খুব আনন্দ হয়েছিল যখন রাম সিং জানিয়েছিল দান্দান-উইলিকের অবস্থান আমি যা লিপিবদ্ধ করেছি তার পার্থক্য মাত্র দ্রাঘিমাংশে আধা মাইল এবং অক্ষাংশে এক মাইলেরও কম। খোটান ছাড়ার পর থেকে রাম সিং প্রায় পাঁচশো মাইল পথ ধরে জরিপ সম্পন্ন করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১৩০ মাইল পথে এমন কিছু ছিল না যাকে ‘ল্যান্ডমার্ক’  হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। আমি একা প্রায় ১২০ মাইল মরুপথে ধূলিকণা ভরা আবছায়ায় কাজ করেছি – তাই দ্রাঘিমাংশ আর অক্ষাংশের এই পার্থক্য আমাকে একদম হতোদ্যম করেনি।

রাম সিং, যশবন্ত সিং দুজনেই ঊষর মরুর আবহাওয়া বা ভৌতিক পরিবেশ মানিয়ে নিতে না পেরে অসুস্থ  হয়ে পড়েছিল। কুয়ো খুঁড়ে জোগাড় করা নোনতা পানীয় জল গলাধঃকরণ দুঃসহ হয়ে উঠেছিল। নিজেদের অসুস্থতার জন্য খাবার জলকেই দায়ী করেছিল দুজনে। যদিও আমার ধারণা শুধু জল বা অপ্রতুল খাবারই নয়, দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি আর মরুর চরম আবহাওয়া অসুস্থতার অন্যতম কারণ। যশবন্ত সিং অনেকদিন কোনো সবজি না খেতে পেয়ে অস্থির হয়ে উঠেছিল। গিলগিট থেকে সঙ্গে নিয়ে আসা লেবুর রস জমে বরফ হয়ে ছিল, তা গলিয়ে জলে সামান্য মিশিয়ে খাওয়ানোর পর একটু সুস্থ বোধ করেছিল সে।

রাম সিং-এর বাতের ব্যথা শুরু হয়েছিল। তার এই ব্যথা শুরু হয়েছিল ক্যাপ্টেন ডেইসির সঙ্গে অভিযানকালে।

কাজপাগল লোকটাকে ধ্বংসাবশেষ জুড়ে জরিপের কথা বলতেই ওর ব্যথাট্যাথা সব চলে গিল। শীতের মরুতে আমার প্রত্যাশার চাইতেও ভালো কাজ করেছিল রাম সিং। কাজই ওর রোগের প্রতিষেধক। যদিও পরে বাতের ব্যথা ওকে শুইয়ে দিয়েছিল। কাশগর আর ইয়ারকন্দ থেকে দলে যোগ দেওয়া লোকজন শীতের মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত থাকলেও মরুর প্রচণ্ড ঠান্ডায় কাবু হয়ে পড়েছিল। হাত পা ফুলে যাচ্ছিল তাদের; শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। এমনকি কয়েকজনের শরীরে ঠান্ডায় ফোশ্‌কা পর্যন্ত পড়ে গিয়েছিল। 

দলের সব চাইতে বয়স্ক সদস্য তুর্দি শুধু সবচাইতে সুস্থ ছিল। সেই ছোটোবেলা থেকে তাকলামাকানে গুপ্তধনের সন্ধানে আসতে আসতে মরুর আবহাওয়ার সঙ্গে ওর শরীরের পরিচয় থাকায় সেখানকার ঠান্ডা বা গরম তাকে কাবু করে উঠতে পারেনি। আমরা ওকে তাকলামাকানের আকাসাল (দাদা) বলে বলতাম। আমি মাঝে মাঝেই তুর্দির সঙ্গে মজা করে মরুভূমির এই চরম আবহাওয়া তার সুস্থ থাকার রহস্য জানতে চাইলে তার কোঁচকানো মুখের চামড়ায় হাসি খেলে যেত। তারপর যেই বলতাম আমাদের জন্য কিছু কর ওমনি বিষাদের ছায়া ঘনিয়ে আসত মুখে। তুর্দি এত দুরদর্শী যে, যে টাকা আমি ওকে মরুতে আসার আগে অগ্রিম হিসেবে দিয়েছিলাম তা দিয়ে একটি টাট্টু কিনে সেটাকে আমাকে লুকিয়ে নিজের মালপত্র বইবার কাজে লাগিয়েছিল। তার মাথায় ছিল যে, খাবারে টান পড়লেই সে টাট্টু সে আবার আমার কাছেই বিক্রি করবে ওটাকে মেরে দলের শ্রমিকদের খাবার যোগাতে।

নিঃসন্দেহে তুর্দি টাট্টুকে দিয়ে মালপত্র বইয়ে সেটাকে মেরে খাবার হিসেবে বিক্রি করে অনেক টাকাই কামাতে পারত যদি না তাওয়াক্কেল থেকে আসা শ্রমিকরা অন্য কিছু ভেবে থাকত। তাওয়াক্কেল থেকে আসা শ্রমিকরা যথারীতি আমাকে লুকিয়ে একটা বুড়ো গোরু নিয়ে এসেছিল খাওয়ার জন্য। গোরু ও টাট্টুর বিষয়টা আমি জানতে পেরেছিলাম দান্দান-উইলিকে পৌঁছনোর কদিন পর- যখন দেখছিলাম সঙ্গে আনা হিসেবের পশুখাদ্যের ভাঁড়ারে টান পড়ছে। হাড় জিরজিরে টাট্টুটা শ্রমিকরা না খেতে চাওয়াতে সেটাকে না খেয়ে মরার থেকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল তুর্দি। প্রথমে সে চেষ্টা করেছিল কাউকে দিয়ে কোনো এক মরুদ্যানে টাট্টুটাকে পাঠাতে, তাতে ব্যর্থ হয়ে কেরিয়া নদীর ধারে পাঠাবার চেষ্টা করেছিল আধমরা টাট্টুটাকে। তাতে সফল না হওয়াতে সে দলে থাকা তার এক সম্পর্কিত ভাইকে দিয়ে বেশ খানিক দূরের এক শুকনো চারণভূমিতে পাঠাবার চেষ্টা করেছিল যাতে শুকনো কুমুশ আর তামারিস্ক-এর পাতা খেয়ে বাঁচতে পারে সে।

টাট্টুটার এগোনোর ক্ষমতা ছিল না। এসময় তুর্দি আমার তাঁবু থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে শুকনো নদীখাতের ধারে খোঁড়াখুঁড়ির সময় বালির তলায় চাপা পড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক বাড়ির উঠোনের ধারে পশুখাদ্য হতে পারে এরকম কিছু শুকনো খড়ের সন্ধান পায়। ক্ষুধার্ত টাট্টুটার উপস্থিতি এর পরেই আমার নজরে আসে যখন সেই শতাব্দী প্রাচীন শুকনো খড় খাওয়ানোর জন্য সেটাকে নিয়ে আসা হয়েছিল। টাট্টুটা সেই খড় মুখে দিয়েই মুখ ফিরিয়ে নেয়। তুর্দির অনুমানে ভুল হয়েছিল। সেই খড় পশুর খাওয়ার যোগ্য ছিল না। এর একদিন পরেই রাম সিং-এর দলের পুরো মালপত্র নিয়ে উটের দল হাজির হয়েছিল কেরিয়া দরিয়া থেকে। ওরা সঙ্গে করে কিছু কুমুশের শুকনো পাতা নিয়ে এসেছিল। সেখান থেকে কিছু পাতা খেতে দেওয়া হয়েছিল মৃতপ্রায় টাট্টুটাকে।

তুর্দি অনেকভাবে চেষ্টা করেছিল টাট্টুটাকে বিক্রি করার। কিন্তু কোনো ক্রেতা না পাওয়ায় ঠিক হয়েছিল কেরিয়া দরিয়া থেকে আসা কাসিমের দুই লোকের সঙ্গে তাওয়াক্কেল পাঠিয়ে দেওয়া হবে টাট্টুটা। টাট্টুর জন্য নয়, লোকদুটো আমার চিঠিপত্র নিয়ে এমনিতেই তাওয়াক্কেল যেত, সেখান থেকে খোটান পাঠানোর ব্যবস্থা করার জন্য। যদিও আমার সন্দেহ ছিল ষাট মাইল মরুপথ পার হয়ে টাট্টুটা নদীর ধার পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে কিনা। একদিন পর খোটানের আম্বানের কাছ থেকে আমার কাছে আসা দুই বার্তাবাহক জানিয়েছিল দান্দান-উইলিক থেকে একদিন যেতে না যেতেই টাট্টুটা মারা গিয়েছিল। 

এই ধ্বংসস্তূপ ছেড়ে রওয়ানা হবার আগে তুর্দির কথাতে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম এই মরু অঞ্চলের আইন কতটা কঠোর জেনে। সে তাওয়াক্কেলগামী লোকেদের কাছে মোল্লা নিয়াজকে দিয়ে তুর্কিতে একটি আবেদন লিখিয়ে ও মুখে বলে পাঠিয়েছিল যেন ওরা টাট্টুটার চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে তাওয়াক্কেলে বিক্রি করে। টাট্টুটা যে আবার বিক্রি করা হয়নি, এমনি মরে গেছে তা লেখা ছিল ওই আবেদনে আর চামড়া তার প্রমাণ। এটা না করালে স্থানীয় বেগকে অনেক টাকা ট্যাক্স দিতে হবে, যা গরীব তুর্দির কাছে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে যেত। আমি অন্য কথা ভাবছিলাম –এই আবেদন পত্র ও ঘোড়ার চামড়া যদি হাজার-দুহাজার বছর পর কোনো প্রত্নতাত্ত্বিকের হাতে পড়ত, তবে না জানি কী হত!              

ক্রিসমাসের দিনটা কেটেছিল ক্যাম্পের থেকে আধ মাইল মতো উত্তর পূর্বে কতকগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামো পরিষ্কার করে। কাঠামো দেখে সেগুলো যে বর্গাকার মন্দির ও তার সংলগ্ন সন্ন্যাসীদের বাসস্থান তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। এই মন্দির ও আবাসগুলো সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল ভূ-ক্ষয়ের ফলে, কাঠামোগুলো মূল ভূ-স্তর থেকে প্রায় কুড়িফুট মতো বালির গভীরে বসে গিয়েছিল সম্ভবত কোনো ধ্বসের কারণে। জায়গাটার সামান্য উত্তর-পূর্বে বালির সমুদ্রের বুকে অনেক জায়গা জুড়ে বসে যাওয়া বালি বা গর্ত রয়েছে। বসে যাওয়া জমিতে ডুবে থাকা ধ্বংস হয়ে যাওয়া কাঠামোর ওপর দু’থেকে তিন ফুটের বেশি বালির স্তর জমা হয়নি। বালি ফুঁড়ে কাঠামোর কয়েকটা খুঁটি বেরিয়ে ছিল। এই খুঁটিগুলোই একসময় কাঠামোর দেওয়ালকে ধরে রেখেছিল। বেরিয়ে থাকা খুঁটির মাথার অবস্থান দেখে বোঝা যাচ্ছিল আবাসগুলো বেশ কয়েকটা খোপে বিভক্ত ছিল। মাটির ওপর বেরিয়ে থাকা খুঁটিই ‘গুপ্তধন সন্ধানী’দের কাজ সহজ করে দিয়েছিল পুরাতত্ত্বের খোঁজ পেতে। তুর্দি সহ অনেকেই এ-জায়গা খুঁড়ে প্রাচীন মৃৎপাত্র সহ অনেক প্রত্নসামগ্রী নিয়ে গেছে বিক্রির জন্য। বালির ওপরেই ছিটিয়ে পড়ে ঘরের প্লাস্টার, কাঠ, মৃৎপাত্র সহ অনেক ধ্বংসাবশেষ।

ধ্বংসের মাঝ থেকে খুঁজে পাওয়া এই ভাঙা নমুনাগুলোই ছিল আমার ধৈর্যের পুরস্কার। খুব সাবধানে আমরা খননের কাজ করছিলাম। মন্দিরকে ঘিরে চতুর্ভুজাকার পথের পশ্চিম দিকের মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে কাঠের ওপর আঁকা দুটো ছবির প্যানেল প্রায় অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা গিয়েছিল। প্যানেলে আঁকা ছবিগুলো নিঃসন্দেহে কোনো উপাসকের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। দুটো প্যানেলের মধ্যে একটায় ছিল ১৮ বাই ৪ ইঞ্চি মাপের। তাতে আঁকা ছিল ইঁদুরের মাথাওয়ালা আলখাল্লা পরিহিত বসে থাকা এক মানব মুর্তি। মাথায় রত্নখচিত মুকুট। পরে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে আমার বন্ধু মিস্টার এফ এইচ অ্যান্ড্রুজ এই ছবি ঠিক ঠিক মতো পরিষ্কার করে তাকে প্রায় আসল অবস্থায় নিয়ে এসেছিল। আমি ছবিটি আবার ভালোভাবে দেখে ছবির চরিত্রকে চিনতে পেরেছিলাম। এই ছবি হিউয়েন-সাং বর্ণিত কাপ্তার-মাজারে পূজিত উপকথার ইঁদুর রাজার যিনি বর্বরদের আক্রমণ থেকে খোটান মরূদ্যানকে রক্ষা করেছিলেন। মূর্তির মাথা ঘিরে আধা গোলাকার আলোর বলয় ও পাশে লম্বা হাতলওয়ালা পাখা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা পরিচারক বুঝিয়ে দেয় ইঁদুর রাজা গুরুত্ব সহকারে পূজিত হতেন।

মন্দির চত্বরের একটি ঘরে মঝের মধ্যে পড়ে থাকা দুটো পাতলা কাগজের ছেঁড়া টুকরো পাওয়া গিয়েছিল। আমি লেখা দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম জড়ানো লেখায় ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা এ অ-সংস্কৃত ভাযা। ধ্বংসস্তূপের থেকে পাওয়া এই রকম কাগজ ডঃ হোয়ারনেল খোটান থেকে আগে সংগ্রহ করেছিলেন। ঘর থেকে বালি সরাতে আরও বেশ কিছু একইরকম একদিকে লেখা কাগজের টুকরো উদ্ধার হয়েছিল হয় দলা পাকানো নয় ভাঁজ করা অবস্থায়। একইভাবে থাকা কিছু চাইনিজ নথিও আমরা পেয়েছিলাম এই ধ্বংসাবশেষ থেকে। ঠান্ডায় জমে থাকা আঙুল দিয়ে এই পাতলা জড়িয়ে থাকা কাগজ খোলা সহজ কাজ ছিল না, ফলে সব কাগজ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ মিউজিয়ামে বিশেষজ্ঞদের কাছে। এই কাগজ দেখে বুঝতে পেরেছিলাম এগুলো কোনোভাবেই কোনো ‘পুথি’র অংশ নয়, সম্ভবত এগুলো কোনো ধরনের হিসেব লেখা কাগজ বা দলিল।

দান্দান-উইলিকের ধ্বংসাবশেষ থেকে টানা ব্রাহ্মীতে লেখা যে সব নথি এখনও পর্যন্ত পেয়েছি তার সঙ্গে ডঃ হোয়ারনেলের গবেষণালব্ধ গ্রন্থ ১৯০২ সালে প্রকাশিত ‘রিপোর্ট অফ দ্যা ব্রিটিশ কলেকশন অফ আন্টিকুইটি ফ্রম সেন্ট্রাল এশিয়া’ নথির হুবহু মিল আছে। বিশিষ্ট পণ্ডিত ডঃ হোয়ারনেল যে নথির ওপর ভিত্তি করে কাজ করেছিলেন সেগুলো ১৮৯৫ থেকে ৯৭এর মধ্যে মিস্টার ম্যাকার্টনি ও ক্যাপ্টেন গডফ্রে খোটানের আফগান ব্যবসায়ী বদরুদ্দিন খানের কাছ থেকে কিনেছিলেন। আমার নিজে হাতে উদ্ধার করা নথি প্রমাণ করে যে ডঃ হোয়ারনেল যে নথিগুলোর উপর ভিত্তি করে গবেষণা করেছিলেন তা একদম খাঁটি ছিল, শুধু তাই নয় তুর্দি জানিয়েছে আগে এই ধরনের নথি সে দান্দান-উইলিক থেকে তুলে নিয়ে বিক্রি করেছে। ডঃ হোয়ারনেলের এই সব নথি নিয়ে শব্দ বা ভাষাতাত্ত্বিক (philogical facts) বিশ্লেষণ একটি ক্রমমালা প্রতিষ্ঠা করেছে যা শুধু অতন্ত্য আগ্রহের বিষয় নয়, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি অনেকগুলো শব্দের অর্থ নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, যেগুলোকে তিনি নাম, পদ ও সংখ্যা বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ‘নথি বিশ্লেষণ করে বলা যায় এগুলো ইন্দো-ইরানিয়ান উপভাষা, এছাড়া এই ভাষার সঙ্গে ফার্সি ও ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষার মিল রয়েছে। যদিও এই ভাষার নিজের স্বকীয়তা আছে,তথাপি, পামির অঞ্চলের গালচাহ উপভাষার সঙ্গে এর সাদৃশ্য আছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল বেশিরভাগ নথিতেই তারিখ দেওয়া আছে। যদিও এর কালানুগ সজ্জা এখনও করা যায়নি। 

বেশ কিছু নথির নীচে নামের তালিকা ও স্বাক্ষর ছিল। আমি ও ডঃ হোয়ারনেল সহমত হয়েছিলাম যে এগুলো সম্ভবত ঋণপত্র বা চাহিদাপত্র সংক্রান্ত দলিল। আমার সংগ্রহ করা জড়ানো ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা নথি থেকে এগুলোর সময়কাল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছিল। ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ডঃ হোয়ারনেল এগুলো সম্ভাব্য অষ্টম শতকের বলেই ধারণা করেছিলেন। পরে এই আনুমানিক সময়ের ধারণার বাস্তবতাকে সমর্থন করেছে একই স্থানে পাওয়া ৭৮১ থেকে ৭৮৭ সময়কাল চিহ্নিত করে রাখা কিছু চিনা দলিল। আমার অনুমান, জড়ানো ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা ভাষায় এই জনপদ ধ্বংস হয়ে যাবার আগে এখানকার বসবাসকারীরা কথা বলত। তবে, ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা দান্দান-উইলিকএ প্রাপ্য পুথির ভাষা আর এই অঞ্চলে ব্যবহৃত কথ্য ভাযা একই কিনা তা এই বই প্রকাশকাল পর্যন্ত নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা পুথিতে কিছু সংস্কৃত পরিভাষার মিশ্রণ থেকে মনে হয় এই পুথিগুলো বৌদ্ধধর্মীয় সংক্রান্ত। সংস্কৃত থেকে মধ্যএশিয়ার ভাষায় অনুদিত হয়ে যা এই বৌদ্ধ অনুসরণকারী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।

যে ঘরে এই কাগজের নথি বা দলিলগুলো পাওয়া গিয়েছিল তা মূল মেঝে থেকে তিন থেকে চার ফুট ওপরে বালির মাঝে ছিল। শুধু কাগজের টুকরো নয়, ঘরটির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে মেঝের কাছাকাছি থেকে আরও কিছু বস্তু প্রায় অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল।

পাতলা কাঠের আয়তাকার তক্তা পাওয়া গিয়েছিল যা লেখার জন্য কাজে লাগানো হত। এর মাথার ডান দিকে একটা ছোটো গোল গর্ত ছিল সুতো দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখার জন্য। তক্তার মধ্যে একইরকম জড়ানো ব্রাহ্মী লিপিতে কয়েক লাইন লেখা। আরও একটি লেখার জন্য কাঠের হাতল দেওয়া তক্তা পাওয়া গিয়েছিল যা প্রায় চোদ্দ ইঞ্চি লম্বা তিন ইঞ্চি চওড়া, যা সমস্ত ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় পাঠশালায় ব্যবহার করা হয় পাঠ দানের কাজে। ‘তখতা’ নামের এই লেখার সামগ্রী ‘স্লেট’ এর সমতুল। তখতার ওপর কিছু লেখা না থাকলেও তার মধ্যে ফিকে হয়ে যাওয়া আঁকিবুঁকির দাগ থেকে বুঝে নেওয়া যায় যে কোনো না কোনো সময় এটি লেখালেখির কাজে ব্যবহার হত। এই ‘তখতা’ আবিষ্কারের পর থেকেই আমার মন বলছিল লেখার এরকম সামগ্রী আরও পাবার সম্ভবনা প্রবল।

ওই ঘরেরই এক কোনে পাওয়া বার্নিশ করা কাঠের বাটির বাইরের অংশের ফুলের কাজ স্পষ্টতই চিনা ঘরানার। এই ঘরের বাসিন্দারা যে চৈনিক ছিল সেই অনুমান দৃঢ় হয়েছিল কিছু চিনা নথি পাওয়ার পর। তার একটি হল তেঁতুল কাঠের প্রায় ১৪ ইঞ্চি লম্বা এক ইঞ্চি চওড়া চ্যাপ্টা লাঠি যার দুদিকে এক ডজন চিনা প্রতীক উলম্ব রেখায় আঁকা। কালির রেখা আবছা হয়ে যাবার জন্য লেখাগুলোর অর্থ এখনও উদ্ধার সম্ভব হয়নি। মনে হয় লাঠিটি কিছু হিসেবের কাজে ব্যবহার করা হত। আর একটি হল চিনা ভাষায় লেখা পাতলা হালকা দাগটানা কাগজ যা সরু রোলের মতো গোটান ছিল। যা পুনরুদ্ধারের কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

মিঃ ম্যাকার্টনি কাশগর থেকে এই কাগজের লেখার অস্থায়ী অনুবাদ করিয়ে দিয়েছিলেন যা পরে কলেজ ডি ফ্রান্সের অধ্যাপক চ্যাভানেস যাচাই করে নিশ্চিতকরণ করেছিলেন। কাগজটি ছিল সংক্ষেপে এই- ভাড়া দেওয়া একটি গাধা দশ মাস পরেও মালিকের কাছে ফিরিয়ে না দেওয়ায় তা আসল মালিককে উদ্ধার করে দেবার আবেদন।  আবেদনে তারিখ উল্লেখ ছিল তা-লি সময়ের (Ta-li period) ষোড়শ বছরের দ্বিতীয় মাসের ষষ্ঠ দিন যা ৭৮১ খ্রিষ্টাব্দের সঙ্গে মিলে যায়। যে এলাকা থেকে দরখাস্তটি এসেছিল তা লি-সে, লেই-সে বা লি-সা নামের কোনো স্থান। দুটি অক্ষরের ধ্বনিগত পার্থক্যের কারণে সঠিক নাম নির্ধারণে সন্দেহ আছে। শুধু তারিখের জন্যই নয়, এই দলিলের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য দিক হল এটি প্রমাণ করে দান্দান-উইলিকের এই ধ্বংস হয়ে যাওয়া বসতি চিনা প্রশাসনের অন্তর্গত ছিল। মিঃ ম্যাকার্টনি আরও একটি অনুরূপ দলিল ১৮৯৮ সালে বদরুদ্দিনের মাধ্যমে পেয়েছিলেন।   

যে নথির কথা ওপরে উল্লেখ করেছি এবং দান্দান-উইলিক থেকে আমার উদ্ধার করা আরও দলিলের লেখার শৈলী ও চেহারা প্রায় একই ধরনের। সবগুলোই সরকারি বা ব্যাক্তিগত রেকর্ড। মিঃ ম্যাকার্টনি তিনটে অনুবাদ কাশগরে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তার একটি তা-লি সময় কালের (Ta-li period)  তৃতীয় বছরে লেখা অর্থাৎ ৭৬৮ খ্রিষ্টাব্দে। সেটি ছিল স্থানীয় জনগণের আবেদনের ভিত্তিতে লি-শির এক দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকের প্রতিবেদনের খসড়া। সেই খসড়ায় ডাকাতদের হাতে ভয়ংকরভাবে লুণ্ঠিত হবার কারণে স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে বিবিধ কর সংগ্রহ স্থগিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল। আর একটিতে মাস ও দিনের উল্লেখ থাকলেও বছরের উল্লেখ ছিল না। সেটি ছিল লি-শেওহ সামরিক শিবির থেকে বেসামরিক কর্তৃপক্ষকে পাঠানো একটি সামরিক চাহিদা-পত্র। তাতে ঢাক (ড্রাম) ছাইবার জন্য চামড়া ও তিরের পেছনে গোঁজবার জন্য পালক চেয়ে পাঠানো হয়েছিল। তৃতীয়টি চিয়েন-চুং (Chien-Chung period)  সময়কালের সপ্তম বছরে অর্থাৎ ৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে লেখা একটি ঋণপত্র – তাতে লেখা ছিল (গ্রামের নাম সহ অনেকটাই পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি) ১৫০০০ ঋণের বিনিময়ে বাড়ি গচ্ছিত রইল।

আমি নিশ্চিন্ত যে দান্দান-উইলিক থেকে যেসব প্রাচীন চিনা দলিল আমি উদ্ধার করেছি, সে-রকম আরও কাগজ অনান্য জিনিসের সঙ্গে আমার আগেই এই অঞ্চল থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছে গুপ্তধন শিকারিরা। তুর্দি নিজেই বেশ কয়েক বছর আগে এই ধরনের কাগজ এখান থেকে নিয়ে গিয়ে খোটানে বদরুদ্দিনের কাছে বিক্রি করেছিল। এটা খুবই সম্ভব যে, যে ঘর থেকে আমি এই দলিলগুলো পেয়েছি ঠিক সেই ঘর থেকেই তুর্দি ও তার মতো আরও দলবল একই ধরনের কাগজ পেয়েছে আর সেই কাগজই অনেক আগে মিঃ ম্যাকার্টনির হাতে পৌঁছেছিল। এও সম্ভব যে এই ধরনের দলিল অন্য কোনো অজানা ধ্বংসস্তূপ থেকে পেয়েছে গুপ্তধন শিকারিরা। সে যাই হক না কেন আমি যে দলিলগুলো উদ্ধার করেছি তা থেকে এটা পরিষ্কার দান্দান-উইলিক লি-সে, লেই-সে বা লি-সা নামের কোনো উপনিবেশের অংশ ছিল।

কোনো সন্দেহ নেই দান্দান-উইলিক চিনা প্রশাসনিক বিভাগ ‘ছয় শহর’এর (লিউ-চেং) অন্তর্গত ছিল। ‘ছয়টি শহর পরিদর্শনের সুপারিটেনডেন্ট’ নামের একটি নথি প্রথম মিঃ ম্যাকার্টনির সংরক্ষণে আছে। আমার উদ্ধার করা দলিলে উপস্থিত লি-সে যে এই ছয় শহর বা উপনিবেশের একটি তা নিয়ে আমার আর সংশয় ছিল না। মিঃ ম্যাকার্টনির সহকারী, চিনা শিক্ষাবিদ সান-এর দেওয়া ও অন্যান্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ‘ছয় শহর চিনা প্রশাসকদের অধীনস্থ খোটান জেলার পুরনো নাম হিসেবে পরিচিত। সম্ভবত এই নাম হয়েছিল ইলচি বা খোটান, ইউরুং-কাশ, কারা-কাশ, চিরা, কেরিয়া-র থেকে কিন্তু ষষ্ঠ নাম নিয়ে ধন্ধ রয়েছে। এই জায়গাগুলো বর্তমান খোটান ও কেরিয়ার অ্যাম্বানশিপের আগে এক প্রশাসনের অন্তর্গত ছিল বলে মনে করা হয়।   

রাতের তেতো ঠান্ডার পর দিনের উজ্জ্বল আলোর আরমদায়ক গরমে এই আকর্ষণীয় আবিষ্কারগুলো বড়োদিনে আমার মন আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছিল। সারাদিনের একঘেয়ে কাজের পর খনন তথা ক্যাম্প ছেড়ে খানিক হাঁটতে বেরিয়ে পথ হারিয়েছিলাম বালির সমুদ্রে। একটা বালিয়াড়ির গোড়ায় কাই-ইয়ুয়েন যুগের (৭১৩-৭৪১ খ্রিষ্টাব্দ) ছাপমারা চিনা মুদ্রা পেয়ে আমি সেটা নিয়ে মেতে উঠেছিলাম। এদিকে দলের সবাই সাইট ছেড়ে ক্যাম্পে ফিরে গেছে, ক্যাম্প খুব কাছে থাকায় কাউকে যে সঙ্গে রাখা উচিৎ এ কথাটা আমার মাথায় আসেনি। আমি বালির বুকে আরও মুদ্রা খুঁজতে শুরু করেছিলাম। আর তারপর, সূর্যের আলো মরে যেতে চাঁদের আলোয় ক্যাম্পে ফিরতে গিয়ে টের পেলাম ফেরার পথ খুঁজে পাচ্ছি না। মাইলখানেক এদিক-ওদিকে ঘুরেও না কোনো শব্দ, না কোনো নিশানা। এদিকে আমার ‘কম্পাস’টাও ক্যাম্পে ফেলে এসেছি।

অবশেষে, চাঁদের আলোয় বালিয়াড়ির ছায়ার অন্ধকার জাঁকিয়ে বসার আগেই আমার পায়ের ছাপ ধরে ক্যাম্পে ফেরার চেষ্টা শুরু করেছিলাম।  তারপর, এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে বালির মাঝে একটা শক্ত কিছুতে ধাক্কা খেলাম যেন। ভালো করে লক্ষ্ করে দেখি শক্ত বস্তুটি একটি প্রাচীরের অংশ, দিন কয়েক আগে ক্যাম্প থেকে বেশ খানিকটা দূরে দক্ষিণ পশ্চিমে এটি নজরে এসেছিল। 

ক্যাম্পের অবস্থান সম্পর্কে খানিক নিশ্চিত হতে আমি ডান দিকে ঘুরে বালিয়াড়ির ধার ঘেঁষে চিৎকার করতে করতে এগোতে শুরু করলাম। খানিক পরেই আমার লোকেরা চিৎকার করে সাড়া দিতে শুরু করল। আমার অনুপস্থিতিতে অস্থির হয়ে উঠেছিল আমার  টেরিয়ার কুকুর ইওলচি বেগ। গড়বড় হয়েছে বুঝে আমাকে খুঁজতে তুর্দি দুজন করে লোকের দল পাঠিয়েছিল নানা দিকে। টেন্টে ফিরে গরম চা আর ইওলচি বেগের সান্নিধ্যে ঠান্ডা নির্জন মরুর মাঝে বড়োদিনের ডিনারের স্মৃতি আমার চিরসঙ্গী হয়ে থাকবে।                

যে ধ্বংসস্তূপ আমায় ক্যাম্প খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিল সেটায় এর পরদিন খনন শুরু হল। আগে পাওয়া নথিগুলোর সঙ্গে এখানে পাওয়া নথিগুলো একে অন্যের পরিপুরক হয়ে উঠেছিল। ধ্বংসস্তূপটি ছিল এখানকার অন্য মন্দিরশৈলীর মতো একটি ছোটো বৌদ্ধ মন্দির। বর্গাকার কক্ষ, মন্দির ঘেরা পথ, ফ্রেস্কো, মন্দিরের গায়ের প্যানেলে ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা ও আঁকা ছবি। মন্দির সংলগ্ন একটি ১৮ / ১৩ ফুট আবাসিক বাড়ি খননের পর গভীর বালির নীচ থেকে পাওয়া গিয়েছিল কাগজে লেখা বেশ কিছু চিনা নথি। সব নথিগুলোই পাওয়া গিয়েছিল ফায়ারপ্লেসের আশপাশের মেঝে থেকে গোটানো অবস্থায়। এর মধ্যে বেশ কিছু নথি আবার একসঙ্গে পুলিন্দায় রাখা ছিল। কাগজগুলো গড়ে ১১ ইঞ্চি চওড়া।

মাটির কাছাকাছি স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় যে কাগজের রোলগুলো ছিল তার বেশ কয়েকটি পচে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। আর যেগুলো একটু বালির ওপরের দিকে ছিল সেগুলো মোটামুটি ভালো অবস্থাতেই ছিল। এর মধ্যে চারটের অনুবাদ এই বই লেখার সময় পর্যন্ত অধ্যাপক চ্যাভানেস এবং ডগলাস করে উঠতে পেরেছিলেন। যদিও অনুবাদগুলো সম্পূর্ণ নয় কিন্তু এই নথিগুলোর সময়কাল ও চরিত্র নিশ্চিন্ত হবার জন্য যথেষ্ট।

এদের মধ্যে দুটির সময়কাল চিয়েন-চুং সময়কালের তৃতীয় বছর, – অর্থাৎ ৭৮২ খ্রিষ্টাব্দ। এই দুটি ছিল হু-কুও মঠের পুরোহিত চিয়েন-ইং কৃত ঋণ গ্রহণকারীর তামার মুদ্রা বা শস্যের বিনিময়ে সুদ বা ছোটো ঋণ সংক্রান্ত পত্র। ঋণপত্রে, ঋণগ্রহীতার নাম বয়সের পাশাপাশি জামিন হিসেবে নির্দিষ্ট কয়েকজন আত্মীয় যথা মা, বোন, স্ত্রী ও কন্যার নাম জোড়া ছিল। পাশাপাশি বন্ধক হিসেবে ঋণগ্রহীতার গৃহস্থালির অধীনস্ত সমস্ত জিনিসপত্র ও গবাদি পশুর মুল্য উল্লেখ ছিল। 

hu kuo

আরেকটি নথি যা ৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালের বলে ধরে নেওয়া যায় তাতে ঋণদাতার নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও অনুরূপ ঋণদানের চুক্তি ছিল। এই অজানা মহাজন যে হু-কুও মঠের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তা ধরে নেওয়া যেতে পারে। আর একটি নথিতে হু-কুও মঠের দায়িত্বে থাকা পুরোহিত দূরাগত অন্য কয়েকজন তত্ত্বাবধায়ক পুরোহিতকে নির্দেশ দিয়েছিলেন এই পত্র পাবার তিনদিনের মধ্যে তারা যেন দূরের কিছু অঞ্চলের কৃষি ভূসম্পত্তিতে জরুরি ভিত্তিতে শ্রমিক নিযুক্ত করে জমি থেকে ঘাস কাটার ও সেচের ব্যবস্থা করে। 

এ সব নথি থেকে বলা যেতেই পারে এই ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘর হয় হু-কুও মঠের অংশ ছিল অথবা এখানে এমন কেউ থাকতেন যিনি সরাসরি ওই মঠের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মঠের চিনা নাম হু-কুও শব্দের অর্থ ‘দেশ রক্ষাকারী।’ নথির শেষে পুরোহিত হিসেবে চিনা নামের স্বাক্ষর, যা মন্দিরের স্বাক্ষরকারীর নাগরিকত্ব প্রকাশ করে।

তবে এখানকার বাসিন্দাদের সবাই চিনা ছিলেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ঋণদাতা ও জামিন হিসেবে নথিভুক্তকারীদের নামগুলো, ও ফ্রেস্কোর নীচে ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা শিলালিপি তাই ইঙ্গিত করে। ধ্বংসাবশেষের মধ্যে পাওয়া একটি সংস্কৃত পুথির পাণ্ডুলিপির ছোটো অংশ বলে দেয় এই মঠে বসবাসকারী জ্ঞানী সন্ন্যাসীরা সম্ভবত সংস্কৃতেও পারদর্শী ছিলেন।

চিনা ভাষায় লিখিত এই নথির বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন সময়কাল নির্ধারণে এর গুরুত্ব অসীম। নিঃসন্দেহে এই কাগজগুলো লেখা হয়েছিল এই বসতি পরিত্যক্ত হবার আগে। লক্ষণীয়ভাবে, কাগজের তারিখ অনুযায়ী অধিকাংশ নথি ৭৮২ থেকে ৭৮৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে লেখা। চিনা নথির ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে আসা যেতেই পারে যে এই মন্দির ও বসতি পরিত্যক্ত ও ধ্বংস হয়েছিল অষ্টম শতাব্দীর শেষের দিকে। প্রায় সব নথিগুলোই পাওয়া গিয়েছিল মূল মেঝের কাছাকাছি – যা থেকে অনুমান করা কঠিন হয় না যে বসতি পরিত্যক্ত হবার পর পরই মরুর বালি বসতি টেনে নিতে শুরু করে তার গর্ভে।

আমাদের সৌভাগ্য যে ঘরে এই নথিগুলো পাওয়া গিয়েছিল সেই ঘরটিই ছিল সবচাইতে ভালো অবস্থায়। এই ঘরেই পেয়েছিলাম সে সময়কার কিছু আঁকা ছবি। মরুর বালি ক্ষতি করলেও সবকিছু ফিকে করে দেয়নি। কাঠের প্যানেলের ওপর আঁকা ছবিগুলো মেঝের কয়েক ইঞ্চি ওপরে বালির মাঝে ছিল। প্যানেলের পেছনে লাগান আংটার ছাপ থেকে বোঝা যায় এগুলো একসময় দেওয়ালে শোভা পেত। মরুঝড় বালি দিয়ে মঠের ঘর ভরাতে শুরু করলে এগুলো খসে পড়ে দেওয়াল থেকে। মরুর বালি আর শুকনো আবহাওয়া ছবির রঙ আর কাঠকে অনেকটাই সংরক্ষণ দিয়েছিল। এই সব ছবির বর্ণনা মুখে করা অসম্ভব, এই লেখার সময়কালে সেই সব ছবি পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।

দুটি ১৫/৭ ইঞ্চি আয়তাকার প্যানেল যার মাথাটা পিরামিডের মতো তাতে দুই অশ্বারোহীর ছবি, যা দেখেই বোঝা যায় কোনো উচ্চপদস্থ ব্যক্তি হবেন। একটিতে সাদার ওপর কালো দাগের একটি ছুটন্ত ঘোড়ার ওপর বসে আরোহী। সাম্প্রতিক অতীতেও এই ধরণের পিবল্ড ‘ইয়ারকান্দি’ ঘোড়ার মালিক হবার স্বপ্ন দেখতেন উত্তর ভারতের উচ্চবিত্ত লোকেরা। তরুণ ঘোড়সওয়ারির মুখে ভারতীয় আর চিনা বৈশিষ্ট্যের মিলিত ছাপ স্পষ্ট। লম্বা কালো চুল ঝুঁটির মতো করে বাঁধা। মাথা ঘিরে থাকা হলুদ ফিতেতে আটকানো ডিমের আকারের একটি বড়ো রত্ন। লম্বা গোলাপি টিউনিক ও গলায় বাঁধা সরু স্কার্ফ হাওয়ায় পেছনের দিকে উড়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে সওয়ারির গতি। সওয়ারির পায়ে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা বুট রেকাব ধরে রেখেছে। যা আজও চিনা-তুর্কিস্থানে ব্যবহার হয়। বাঁ হাতে রেকাব ধরা আর মেলে ধরা ডান হাতে একটি ঢাল বাড়িয়ে ধরা যার ওপর একটি বড়ো পাখি উড়ে এসে বসতে চলেছে। কোমর থেকে একটি লম্বা তলোয়ার ঝুলছে – ঠিক সেই ধরনের তলোয়ার যা প্রাচীনকালে পারস্য ও প্রাচ্যের মুসলিম দেশে দেখা যেত।  

ঘোড়ার ছবি খুব নিখুঁত করে আঁকা – পা, খুর, রেকাব ও তার নীচের আচ্ছাদন বা  ‘নুমদা’ প্রতিটির গঠন ও অলংকরণ পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে ফুটে আছে ছবির মধ্যে। ঘোড়ার জিন, লাগাম, শিরস্ত্রাণ, নাকের ওপর ও কপালে লাগান রত্ন খচিত ধাতব প্লেট প্রতিটি অতি পারদর্শিতায় আঁকা। ধাতব প্লেটের ওপর শিং-এর  মতো উঁচু হয়ে থাকা একটি ছাঁচ অনেকটা ভারতীয় ত্রিশূলের আকৃতির। অষ্টম শতাব্দীর এই ঘোড়ার সজ্জা তুর্কিস্থানে আজও সমানভাবে প্রচলিত।

অন্য একটি চিত্রেও সমানভাবে দেখান হয়েছে দু-কুঁজ বিশিষ্ট একটি উটকে। আরোহীর মুখের অংশের অধিকাংশটাই নষ্ট হয়ে গেলেও কোঁকড়ান চুলের ওপর ছুঁচলো মাথা ‘সুগারলোফ হ্যাট’ পরিষ্কার বোঝা যায়। টুপিটি ছোপওয়ালা পশম ব্যবহার করে তৈরি হয়েছিল। লম্বাঝুলের ঢিলেঢোলা প্রায় হাঁটু ছুঁয়ে থাকা সবুজ পোশাকের তলা থেকে বেরিয়ে হাঁটু পর্যন্ত উঁচু লাল বুট, যা বর্তমানে পূর্ব তুর্কিস্থানে ‘চারুক’রা বিশেষ করে শীতকালে ব্যবহার করে। আরোহীর বাঁ হাতে উটের নাক বেড় দিয়ে থাকা ‘লাগাম’ আর ডান হাতে ধরে একটি খোলস-ছাপের কাপ। উটের জিন আর রেকাব এত সুন্দরভাবে উটের গায়ে লেপটে রয়েছে যে মনে হয় শুধুমাত্র এই উটের পিঠে বসানোর জন্যই এই বস্তুগুলো তৈরি। যদিও এই ধরনের রেকাব আর জিন এই অঞ্চলে আজকাল আর প্রায় ব্যবহার হয় না। ছবির পেছনের হালকা উঁচুনিচু রেখা পাহাড় বা বালিয়াড়ি – দুটোর যে কোনোটাই হতে পারে।  অশ্বারোহী ও উট-আরোহী দুজনের মাথা ঘিরে থাকা ‘নিম্বাস’ বা জ্যোতিরবলয় ইঙ্গিত দেয় এই দুই আরোহী কোনো পবিত্র চরিত্রের – যদিও এই দুই চরিত্রের কোনো সূত্র হদিশ করে ওঠা যায়নি।

এখানে সব ছবির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয়। একটি প্যানেলের দুপাশেই ছবি আঁকা ছিল যা দেখে মনে হয় এটি হু-কুও মঠের খাবারঘর ছিল। এখানে পাওয়া বুদ্ধ বা বোধিসত্ত্বদের  চিত্রকর্মগুলি বলে দেয় এটি মধ্য এশিয়ার একটি বৌদ্ধ চর্চার কেন্দ্র ছিল। নিখুঁত রচনাধর্মী ‘মহাযান’ গোত্রের বৌদ্ধ উপাসনার ছবিগুলো প্রমাণ করে খোটানের মরুতে ভারতীয় শিল্পকলার প্রভাব বিস্তার হয়েছিল ভালোভাবেই এবং এতে তিব্বতি শৈল্পিক রূপ মিশে আছে। কিন্তু আমাকে আশ্চর্য করেছিল বেশ কিছু ছবিতে পারসিক শিল্পের প্রভাব, বিশেষ করে পোশাক আর মুখের গঠনে। এই ছবিগুলো পরবর্তীতে আমার বৈজ্ঞানিক প্রকাশনায় যথাযথভাবে থাকবে। একটা বিষয় এখানে উল্লেখ করতেই পারি যে সে সময়কালে পাশ্চাত্যের ধ্রুপদী শিল্প বিশেষ করে ইরানি শিল্পের আমদানি এখানে ঘটেছিল।

দান্দান-উইলিকে যে কাঠামোগুলো খনন করা হয়েছে ও যার বিবরণ এখনও পর্যন্ত  দিয়েছি তা এই উপনিবেশের চরিত্র সম্পর্কে খানিক ধারণা পাবার জন্য যথেষ্ট। বালির টিলাগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে থাকা আরও মন্দির ও বাসস্থান খনন ও জরিপের কাজ আমাকে আরও সপ্তাহ খানেক সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত চূড়ান্ত ব্যস্ত রাখে। এই সময়ের মধ্যে মধ্যে মোট চোদ্দটি মন্দির ও বাসস্থান খুঁড়ে বের করে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই খননকাজের পর যা পাওয়া গিয়েছিল তা আমার আগের তথ্যগুলোরই মতো, তাই এখানে তার বিস্তারিত বিবরণ দেবার প্রয়োজন নেই। মন্দির ও বাসস্থানের গড়ন, নির্মাণ ও উপকরণ প্রায় একইরকম। যা থেকে ধরে নেওয়া যেতে পারে উপনিবেশটি তৈরি হয়েছিল প্রায় একলপ্তে ও উপনিবেশ ছেড়ে সবাই চলে গিয়েছিলেন একসঙ্গে ও একইসময়ে। কিন্তু সম্ভবত পরিত্যক্ত উপনিবেশের সব বস্তু একইভাবে বা একই অবস্থায় টিঁকে থাকেনি বাতাসের ক্ষয়কারী ক্রিয়া ও ‘ধন-সন্ধানীদের’ খননের ফলে। ধন-সন্ধানীরা অনেক কাঠামো খুঁড়ে তা ধ্বংস করে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, খোঁড়ার পর কিছু কিছু জায়গায় তা যে আবার বালি চাপা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। 

একটি ছোটো মন্দিরের অষ্টভুজাকার ভিত থেকে প্রধান মূর্তিটি উপড়ে নেওয়া হয়েছিল পেছনের দিক থেকে খুঁড়ে। মূর্তির সামনের দিকে যে ফলকটি ছিল সেটি অক্ষত। এমনকি পোঁটলায় বাঁধা একটি পাণ্ডুলিপিও পড়ে ছিল ভিতের সামনে। কিন্তু খননের ফলে বাতাসের ছোঁয়া পেয়ে সেই পাণ্ডুলিপি ‘ধন-সন্ধানীদের’ কল্যানে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। স্যাঁতসেঁতে কাগজগুলো এমনভাবে একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল যে সেগুলো আর আলাদা করা সম্ভব হয়নি। ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা পুথিটি একটি মণ্ডে পরিণত হয়েছিল এবং মণ্ড আকারেই তাকে তুলে আনা হয়েছিল। পুথির কাঠের পচা ঢাকনাটি আমি আমার নিজস্ব সংগ্রহে প্রাচীন পাণ্ডুলিপির নমুনা হিসেবে রেখে দিয়েছি।

তবে ধ্বংসাবশেষ খননের ফলে পাওয়া পুরাকীর্তি পর্যবেক্ষণের সুযোগ কোনোভাবেই কোনো নির্দিষ্ট দিকে সীমাবদ্ধ ছিল না। জরিপের করতে গিয়ে অনেক কিছু শিখেছিলাম, বিশেষ করে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল মরুর মাঝের এই অঞ্চলে জনবসতি নিয়ে। আমি এই অঞ্চলের বাগান ও রাস্তাঘাট নিয়ে আগেই বলেছি। পপলার গাছের কাণ্ড, ফলের গাছের মোটা শিকড় বেশিরভাগ বাড়ির সামনে বালির তলায় অর্ধেক চাপা পড়ে আছে। চলমান বালির টিলাগুলোর মাঝে মূল ভূমির কিছু অংশে পুরনো সেচ খালের চিহ্ন সহজেই চিনে নেওয়া যায়। বিস্তারিত জরিপ না করলে এগুলো ধরা পড়ত না, কারণ দূর থেকে বালির মাঝে এগুলো নজরে আসত না।                  

ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষের মধ্যে অনেক জায়গায় পুরু হয়ে বিছিয়ে ছিল মাটির পাত্র, ধাতুর টুকরো আর অনুরূপ ভগ্নাবশেষ। এই ধ্বংসাবশেষ পড়ে ছিল এমন কিছু জায়গাতেও যেখানে বাড়ির কাঠামোর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সম্ভবত এখানে এমন কিছু পরিবার বাস করত যাদের কাঠে তৈরি শক্ত পলেস্তারা দেওয়া দেওয়ালের পরিকল্পিত বাসস্থান ছিল না। খোটানের সাধারণ চাষীরা বর্তমানে যেরকম রোদে শুকনো ইট দিয়ে বাড়ি বানায় সেরকম বা কাদার তালের ওপর তাল বিছিয়ে তৈরি বাড়িতে থাকত। কাঠ-পলেস্তারার বাড়ির তুলনায় এসব বাড়ির স্থায়িত্ব অনেক কম। খোটানের শহরে ও গ্রামে এই ধরনের প্রচুর বাড়ি দেখা যায় কারণ কাঠ দিয়ে বাড়ি তৈরি ভীষণ খরচবহুল ও কাঠ আনতে হয় বহু দূর থেকে। বর্তমানে শুধুমাত্র বিশেষ ব্যক্তি, মসজিদ, সরাই আর অনুরূপ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেই কাঠ-পলেস্তারার বাসস্থান বানানোর অনুমতি পাওয়া যায়। এই পর্যবেক্ষন থেকে বলা যেতে পারে দান্দান-উইলিকের জনবসতি বিচ্ছিন্নভাবে বেড়ে চলেছিল।   

হতে পারে, এই জনবসতি হঠাৎ করে জনশূন্য হয়নি, বিপর্যয়ের আঁচ পেয়ে ধীরে ধীরে পরিত্যাগ করা হয়েছে, কোনোভাবেই অকস্মাৎ ধ্বংস হয়ে যায়নি। অন্তত খনন ও জরিপের ফলে সেরকম প্রমাণ উঠে আসেনি। যদিও কিছু ইউরোপীয় পর্যটক তাকলামাকানের মাঝে ‘প্রাচীন-শহরের’ প্রবাদের কথা বিশ্বাস করে যা রাতারাতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পূর্ব তুর্কিস্থানে সদোম এবং গোমোরার কিম্বদন্তীর মতো ‘পুরনো শহরের’ কিংবদন্তী চালু আছে যা নাকি রাতারাতি বালিতে ঢেকে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং তা  দান্দান-উইলিকের থেকেও প্রাচীন। হিউয়েন-সিয়াংও এই ধরনের লোকশ্রুতি শুনেছিলেন। লোক-কাহিনী হিসেবে এই কিংবদন্তীগুলো খুবই আকর্ষণীয়।

দান্দান-উইলিকে করা বিশদ জরিপ, এর ভৌগোলিক অবস্থান ও পুরাকীর্তির নমুনা যা খননের ফলে আবিষ্কৃত হয়েছে তা থেকে বলা যায় খুব সম্ভবত এই অঞ্চলে খাল খুঁড়ে চিরা, ডোমোকো এবং গুলাখমার স্রোতের জল নিয়ে আসা হয়েছিল মরুর মাঝে এই বসতির দক্ষিণে চাষাবাদের জন্য। পরবর্তীতে উজুন-তাতি ধ্বংসাবশেষ খনন করে হিউয়েন-সিয়াং বর্ণিত ‘পি-মো’ (Pi-mo) এবং মার্কো পোলো কথিত ‘পেইন’ (Pein) এর সঙ্গে এই অঞ্চলের মিল পেয়েছিলাম এবং নিঃসন্দেহে ওই সব স্থান দান্দান-উইলিকের থেকেও বহু শতাব্দী প্রাচীন ছিল। ঐতিহাসিক ও অবস্থানগত পর্যালোচনা করে এটা বলা যায় পি-মো ও দান্দান-উইলিক একই কারণে পরিত্যক্ত হয়েছিল – সম্ভবত সেচখালের কার্যকারিতা ও সুবিধা টিঁকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।

কী কারণে এই সেচ ব্যবস্থা টিঁকিয়ে রাখা যায়নি তার সন্ধান করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমার ধারণা রাজনৈতিক কারণ, কমে যাওয়া জনসংখ্যার কারণে রক্ষণাবেক্ষণে খামতি বা মূল নদীর গতিপথ বদল এগুলোর কোনো একটা সেচ ব্যবস্থা ধ্বংসের কারণ হতে পারে। পরবর্তীতে গুলখমা ও ডোমোকো মরূদ্যানের কয়েকটি গ্রাম পরিদর্শন করে জানতে পারি এই গ্রামগুলো সেচ ব্যবস্থা টিঁকিয়ে রাখার প্রয়োজনে মূল অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে ছয় থেকে আট মাইল দক্ষিণে স্থানান্তরিত হয়েছে। পরিত্যক্ত ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ এখনও দেখা যায় যদিও ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একসময়কার চাষের জমি মরুর বালিতে চাপা পড়েছে। শুকিয়ে যাওয়া খাল আর বেড়িবাঁধের চিহ্ন বালিতে ঢাকা পরা চাষজমির পাশে স্পষ্ট। যেন দান্দান-উইলিক কি ভাবে মরুতে মিলিয়ে গিয়েছিল তারই ছবি।

প্রসঙ্গত বলে রাখা যাক প্রাচীনকালে কেরিয়া দরিয়া দান্দান-উইলিকের কাছ দিয়ে প্রবাহিত হত ও পরবর্তীতে তা পূবদিকে প্রায় আটাশ মাইল সরে যায় বলে ডঃ হেডিন যে অনুমান করেছিলেন তার সমর্থনে আমি কোনো প্রমাণ পাইনি। এই বিশিষ্ট অভিযাত্রী যদি এখানকার ধ্বংসাবশেষ ও বালিটিলার গতিবিধি নিজের চোখে দেখতেন তাহলে সম্ভবত এই অনুমান প্রকাশ করতেন না। তিনি এই বসতিগুলো হাজার দুয়েক আগে পরিত্যক্ত হয়েছিল বলে মত প্রকাশ করেছিলেন যদিও তারিখ দেওয়া নথি বলছে অষ্টম শতাব্দীতে এখানে বসত ছিল।   

ক্রমশ

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Leave a Reply