টাইম মেশিন-নিউগেট ক্যালেন্ডার- ক্যাপ্টেন জেমস হাইন্ড(২য় পর্ব) অনু: দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য শীত ২০২০

নিউগেট ক্যালেন্ডার আগের পর্বগুলো

জেমস হাইন্ড (আগের পর্ব)
টাইম মেশিন-ক্যাপ্টেন জেমস হাইন্ড (২)-ইন্দ্রশেখর

আরেকবারের ঘটনা। সেবার ক্যাপ্টেন হাইন্ডের সঙ্গে কুখ্যাত রাজঘাতক হিউ পিটার্সের* মোলাকাত হল এনফিল্ড চেজ-এ। পিটার্সকে বাগে পেয়ে হাইন্ড বলে, “সঙ্গে যা আছে ভালোয় ভালোয় দিয়ে প্রাণটা বাঁচাবে? নাকি…”

হিউ পিটার্স লোকটা আর যাই হোক ভিতু বলে বদনাম তার কোনোদিন ছিল না। জাতে পাদ্রি হবার দরুণ বাইবেলটাও তার কন্ঠস্থ। সে উলটে হাইন্ডকে লেজে খেলাবার পথ ধরল। ভালোমানুষের মত মুখ করে বলে, “তুমি না খ্রিস্টান!টেন কমান্ডমেন্টের আট নম্বরটা কি ভুলে গেলে হে? ওতে বলেছে না, “পরের দ্রব্য চুরি করিবে না!তাছাড়া রাজা সলোমন তো এ-কথাও বলে গেছেন, ‘ফরিবের ওপর ডাকাতি কোরো না, কারণ সে বেচারা গরিব।’

শুনে জেমস হাইন্ড মনে মনে একটু হাসল। তারপর বলে, “আর তুমি? তুমি  কী করেছ? ঈশ্বরের দূত বলেছিলেন ‘তাহাদের রাজাদের শিকলে বাঁধিবে, তাহাদের রাজসহছরদিগকে লৌহনিগড়ে আবদ্ধ করিবে।’ সে কথা তো তিনি বলেছিলেন ঈশ্বরের শত্রুদের ব্যাপারে। আর তুমি, তোমার রিপাবলিকান বদমাশদের নিয়ে সেই বাইবেলের কথাকে নিজের দেশের রাজার বিরুদ্ধেই কাজে লাগালে। ঐ করে তাঁর প্রাসাদের সামনেই তাঁর মুণ্ডু কেটে ফেললে, তখন তোমার ধম্মো কোথায় ছিল?”

শুনে হিউ পিটার্স বাইবেলের নানান অংশ থেকে উদ্ধৃতি দ্দিয়ে দিয়ে নিজের কোলে ঝোল টানবার চেষ্টা চরিত্র করতে জেমস বলে, “আমার পেশা নিয়ে তোমার পাদ্রিগিরি আর না করলেও চলবে।তোমার সলোমন তো বলেই গেছেন চোরকে ঘৃণা করিও না। তবে সেসব ধর্মকথা রাখো। আমি তোমায় সিধে কাজের কথা বলি। হয় সঙ্গে টাকাপয়সা যা আছে আমায় দাও, আর তা না হলে বলো, বন্দুকের এক গুলিতে তোমায় সটান তোমার পেয়ারের প্রভুর কাছে পাঠিয়ে দিই।”

শুনে পিটার্স বুঝল, বড়ো কঠিন পাল্লায় সে পড়েছে এবারে। কাজেই থলি হাঁটকে তিরিশটা সোনার মোহর বের করে সে পিটার্সের হাতে দিয়ে ঘোড়া ঘুরিয়ে রওনা দিল।

তবে পিটার্স অত সহজে এমন একটা বদমাশকে ছেড়ে দিতে তৈরি নয়। সে ফের হাওয়ার বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে পিটার্সকে গিয়ে ধরেছে। বলে, “ওহে পিটার্স, আজ তোমার এহেন দুর্ভাগ্যটা কেন হল জানো?  কারণ, পাদ্রি হয়ে বাইবেলের কথা অমান্য করেছ হে তুমি। ওতে বলেছে না, পথে বেরোবে নিঃস্ব হয়ে! সঙ্গে সোনারূপো তামা কিচ্ছুটি রাখবে না! তা তুমি দেখছি সেসব কথায় পাত্তা না দিয়ে বেশ টাকাপয়সা নিয়ে রাস্তায় বেরিয়েছিলে।

“না হে। পাদ্রি হয়ে অধর্ম আমি তোমায় করতে দিচ্ছি না। সোনাটোনা তো তোমার থেকে সরিয়ে নিয়ে খানিক পাপ আমি তোমার বাঁচিয়েছি। বাকিটুকুই আর ছাড়ি কেন? দাও দেখি, তোমার ক্লোকটা খুলে দাও। ওতেও তো মনে হচ্ছে সোনার সুতোটুতোর কাজ আছে কিছু।”

পিটার্স হতভম্ব হয়ে যেই না ক্লোকটা খুলে তার হাতে দিয়েছেন অমনি একগাল হেসে জেমস বলে, “এবারে বাইবেলের সন্তদের আরেকটা উপদেশ বলি? ‘কেহ তোমার ক্লোকটি লইলে তাহাকে তোমার কোটটিও দিও।’ দাও দাও, কোটখানা খুলে দাও আমার হাতে। দেরি কোরো না। নইলে এই পিস্তল দেখছ তো?”

গায়ের জামাকাপড়টা অবধি এইভাবে জেমস হাইন্ডের কাছে হারিয়ে হিউ পিটার্স সাংঘাতিক রেগেছিল। পরের রোববার তাই সেখানকার গির্জায় ধর্মোপদেশ দিতে এসে সে চুরিবিদ্যার বিরুদ্ধে গরমাগরম বক্তৃতার শেষে বাইবেলের উদ্ধৃতি দেয়া ধর্মসঙ্গীত ধরল, “হারিয়ে গেছে পোশাকটি মোর কেমনে তারে পাই…”

তা সেখানে এক রাজভক্ত সেপাই হাজির ছিল। সে জেমস হাইন্ডের হাতে পিটার্সের দুর্ভোগের খবরটা জানত। সে ভালোমানুষের মত মুখ করে বলে, “পাদ্রিসাহেব, এ প্রশ্নের জবাব জেমস হাইন্ড এখানে থাকলে দিতে পারত বোধ হয়।”

শুনে লোকজন এমন হাসাহাসি শুরু করে দিল যে সে যাত্রা তার ধর্মোপদেশ বন্ধ করে মুখ কালো করে পালানো ছাড়া আর কোনো রাস্তা রইল না পিটার্সের সামনে।

জেমস হাইন্ড নিজে ডাকাত হলে কী হয়, বেজায় রাজভক্ত ছিল সে। রাজার হত্যাকারীদের সে ক্ষমা করেনি কখনো। আর আর কপালটাও এমন যে মাঝেমধ্যেই চার্লসের হত্যার জন্য দায়ী এমন একজন না একজন ঠিক তার খপ্পরে এসে পড়ত। এমনি একদিন তার পাল্লায় এসে পড়ল জন ব্র্যাডশ। সে ছিল রাজা চার্লসের বিচারের প্রধান বিচারপতি। রাজার মৃত্যুদণ্ডের আদেশটাও তারই দেয়া।

ডরসেস্টশায়ারর সোরবোর্ন আর শ্যাফটসবারির মাঝামাঝি একটা জায়গায় রাস্তার ওপরে তাকে এসে ধরেছিল জেমস হাইন্ড। ব্র্যাডশর গাড়ির পাশে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে দাঁড়িয়ে জেমস বলে, “টাকাপয়সা যা আছে সঙ্গে সেসব বের করে দাও দেখি।”

শুনে ব্র্যাডশ বলে, “আমি কে জানিস? আমি হলাম জন ব্র্যাডশ।”

শুনে হাইন্ড তার মুখের সামনে পিস্তল উঁচিয়ে ধরে বলে, “জানি তো বটেই। তবে রাজাকে খুন করা বজ্জাতদের কাউকে আমি ভয় করি না।একদিন রাজাকে বাগে পেয়েছিলে তুমি। আর আজ আমি ঠিক সেইভাবে তোমায় বাগে পেয়েছি।

“অসহায় পেয়ে তুমি তার যা করেছিলে, আমিও যদি তোমায় এখন তেমনটা করি তাহলে ভগবান বলো আর দেশ বলো দুয়ের প্রতিই একটা কর্তব্য করা হবে। তবে আমি তেমনটা করতে চাই না। জেনে রেখো, একদিন না একদিন দেশ তোমার বিচার করবে। সেদিনের অপেক্ষায় থাকব আমি। এভাবে সবার চোখের আড়ালে নয়, রীতিমত বিচারের পর হাজারো লোকের চোখের সামনে টাইবার্নের ফাঁসিকাঠে মরা তোমার নিয়তি।

“তবে হ্যাঁ, তোমায় মেরে হাত নোংরা করতে না চাইলেও, যা বলছি তা না শুনলে সে কাজটাও করতে হবে আমায়। এখন বলো কী করবে?”

শুনে ব্র্যাডশ-র ভয় হল খুব। যখন চার্লসের বিচার করেছিল সে তখন সেখানে তার বিদ্রোহী দলে অনেক সেপাই ছিল তাদের ঘিরে। এখানে এই নির্জন রাস্তায় সে একা। তাড়াতাড়ি থলেতে হাত ঢুকিয়ে সে চল্লিশটা রুপোর শিলিং বের করে জেমসের হাতে তুলে দিল। দেখে জেমস চোখ পাকিয়ে ফের পিস্তলের নল ব্র্যাডশর দিকে তাক করে বলে, “আর সোনার মোহরটোহর? ভালো কথায় বের করে না দিলে না দিলে বুকের ভেতর একটা সীসের গুলি পুরে দেব।”

ব্র্যাডশ কী আর করে। সঙ্গে লুকিয়ে রাখা এক থলে জ্যাকোবাস** বের করে সে জেমস-এর হাতে তুলে দিল।

টাকাপত্র গুণে নিয়ে জেমস এবার পিস্তলটা উঁচিয়ে বলে, “যতদিন না গোটা দেশ জেগে উঠে তোমাদের না থামায়, ততদিন তুমি আর তোমার শয়তান সাঙ্গোপাঙ্গোর দল তোমাদের রক্তমাখা পথ ধরে দেশটাকে চালিয়ে নিয়ে যাবে সে জানি।কিন্তু আজ আমি আমার সামান্য সাধ্য নিয়ে তোমার আজকের দৌড়টাকে একটু ঢিমে করে দিয়ে যাব।”

এই বলে সে পিস্তল উঁচিয়ে ব্র্যাডশ-র গাড়ির ছ’খানা ঘোড়াকেই মাটিতে শুইয়ে দিয়ে, নিজের ঘোড়া ছুটিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

সাধারণত মেয়েদের কোনো ক্ষতি সে করতে চাইত না। কিন্তু একবার হাইন্ড পরোক্ষে একজন মহিলার মৃত্যুর কারণ হয়। ব্যাপারটা ঘটেছিল এইভাবে। সে-সময়টা খুবই খারাপ যাচ্ছিল হাইন্ডের। দেশজুড়ে তার কুখ্যাতি। সরকারের সেপাইরা হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে। ফলে বাধ্য হয়েই রোজগারপাতির চেষ্টায় রাশ টানতে হয়েছে তখন তাকে। এই অবস্থায় একদিন পিটার্সফিল্ড আর পোর্টসমাউথের মাঝামাঝি একটা নির্জন জায়গায় একটা গাড়ি দেখতে পেল হাইন্ড। কাছাকাছি গিয়ে সে দেখে গাড়িতে একদল মেয়ে ভারী হইচই আর ফূর্তি করতে করতে চলেছে।

তাদের কাছে গিয়ে হাইন্ড বলে, “মহোদয়াগণ, আমার প্রেমিকা বড়োই কঠোরপ্রাণা। তাঁর হৃদয় জয় করবার জন্যই আমি পথে বের হয়েছি সৌভাগ্যের সন্ধানে।তবে আমার দুর্ভাগ্য, আমি এখন কপর্দকহীন। আর তাই আপনাদের কাছে একটু সাহায্য প্রার্থনা করতে এসেছিলাম, যদি কিছু অর্থ দিয়ে আমার অভিযানে আপনারা সাহায্য করেন…”

শুনে তো মেয়ের দল গলে গেল। তারা অনেক বইপত্র পড়েছে। সেখানে এমন সব বীর নাইট আর তাদের বান্ধবীদের নিয়ে অনেক গল্প, বীরগাথা এইসব রয়েছে। কাজেই তারা ধরে নিল, হাইন্ডও তেমন একজন নাইট।

তখন তাদের মধ্যে একজন মুখ বাড়িয়ে বলে, “আহা নাইট, ঈশ্বর করুন তোমার ইচ্ছে পূরণ হোক। কিন্তু আমরা যে তোমায় কোনো টাকাপয়সা দিতে পারব না।” এই বলে সে তার সঙ্গী আর এক মেয়ের দিকে দেখিয়ে বলে, “আমরা চলেছি আমাদের এই বন্ধুর বিয়েতে। সঙ্গে আছে কেবল ওর বিয়ের যৌতুকের টাকাপয়সা। ওর বাবা ছেলের বাবাকে বিয়েতে তিন হাজার পাউন্ড পণ দেবে বলে কথা দিয়েছে। সেই নিয়ে চলেছি আমরা। তার থেকে কেমন করে তোমায় কিছু দিই বলো তো!”

শুনে হাইন্ড বলে, “সৌভাগ্যবান সেই নাইট, যিনি এই সুন্দরীর হৃদয় জয় করেছেন। তাঁকে আমার অভিনন্দন জানাবেন আপনারা। বলবেন, “ক্যাপ্টেন জেমস হাইন্ড তাঁকে নিবেদন করেছেন, তাঁর প্রাপ্য যৌতুক থেকে মাত্রই এক হাজার পাউন্ড ধার নিয়েছেন তিনি, প্রেমে আঘাত পাওয়া মানুষের সেবার জন্য। বলবেন তো?”

জেমস হাইন্ডের নাম শুনেই তো মেয়ের দলের থরহরিকম্প জেগেছে তখন। সে যে তাদের সব টাকা না নিয়ে কেবল এক হাজার পাউন্ড নিয়ে খুশি এতেই তারা তখন ধন্য হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি গাড়ির ভেতর রাখা টাকার পুঁটুলিগুলো থেকে কয়েকটা পুঁটুলি এনে তারা জেমসের হাতে তুলে দিল। জেমসও হবু পাত্রপাত্রীকে অনেক অভিনন্দন-টন জানিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে রওনা হয়ে গেল।

কিন্তু তার হাতে প্রাণে বেঁচে গেলেও পাত্রীর কপালে অন্য দুর্ভোগ অপেক্ষা করছিল। বরের বাড়ি পৌঁছোতে বর টাকার থলে গুনে বলে, “এক হাজার পাউন্ড কম কেন?”

শুনে কনে তাকে সব কথা খুলে বলতে দেখা গেল বর তার প্রেমট্রেম ভুলে গিয়ে রেগে দশখানা হয়ে উঠেছে। পাত্রীকে তার বান্ধবীদের সঙ্গে পত্রপাঠ বিদায় করে দিল সে তার বাড়ি থেকে। তার একটাই কথা, হয় পণের পুরো টাকা জুটিয়ে আনো, আর নাহয় চিরকালের জন্য বিদেয় হও এখান থেকে।

বাপের সারাজীবনের সঞ্চয়টুকু নিয়ে বরের বাড়িতে এসেছিল সেই মেয়ে। এবার ফের নতুন করে এক হাজার পাউন্ড জোগাড় করা তার পরিবারের সাহ্য ছিল না। এর কয়েকদিন পরে লাঞ্ছিত, অপমানিত মেয়েটি আত্মহত্যা করেছিল। জেমস সে খবর পায়নি অবশ্য। সে তখন শহর ছেড়ে গ্রামাঞ্চলে গিয়ে আত্মগোপন করেছে সেপাইদের ভয়ে।

এই গ্রামাঞ্চলে আত্মগোপন করতে গিয়ে বড়ো কষ্টে পড়েছিল জেমস। এখানে চাষাভুষোদের হাতে টাকাপয়সা বলে কোনো বস্তু থাকে না। বড়ো অভাব চারদিকে। ডাকাতি করবে কার ওপরে সে? গ্রামের একটেরেতে একটা ছোটো বাড়ি ভাড়া নিয়ে একলাই থাকত সে। এমনকি কয়েক মাইল দূরে বড়ো রাস্তায়  গিয়ে যে দু-একটা রোজগার করে আসবে তারও উপায় নেই তখন তার। কারণ পেটের জ্বালায় নিজের ঘোড়াটাকেও বেচে দিতে হয়েছে তাকে তদ্দিনে।

শেষে একদিন একটা খবর পেয়ে ফের চাঙ্গা হয়ে উঠল জেমস। গ্রামে এক ডাক্তার থাকেন। ভদ্রলোক অন্য গ্রামের এক জমিদারের কোনো কঠিন অসুখ সারিয়ে দেয়ায় সে-জমিদার খুশি হয়ে তাঁকে মোটা টাকা পুরস্কার দেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন।

খবরটা পেয়েই জেমস তক্কে তক্কে রইল, কখন ডাক্তার টাকাপয়সা নিয়ে ফেরে। তার ভাগ্য ভালো গ্রামের বাইরে থেকে সেখানে আসবার রাস্তাটা তার ভাড়াবাড়ির পাশ দিয়ে গ্রামে গিয়ে ঢোকে।

অপেক্ষা করতে করতে অবশেষে একসময় দেখা গেল ডাক্তার আসছেন। জানালা দিয়ে তাই দেখেই জেমস তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে বেরিয়ে ডাক্তারকে ধরে পড়ল। বলে, “ডাক্তারবাবু, আমার স্ত্রীর বড়ো শরীর খারাপ। দিনদিন শুকিয়ে গিয়ে একদম কাহিল চেহারা হয়েছে। বাঁচে কি না তার ঠিক নেই। একটিবার যদি ভেতরে এসে তাকে দেখেন…”

শুনে ডাক্তারের তো গলে গেছে। বলে, “আহা নিশ্চয় নিশ্চয়। চলো দেখি ভেতরে গিয়ে কী হয়েছে তাঁর।”

ডাক্তারকে ভেতরে এনে সটান দোতলায় নিয়ে গেল জেমস। তারপর তাকে একটা ঘরে ঢুকতে ইশারা করতে ডাক্তার তার দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতেই বলে, “তোমার স্ত্রী কি এইখানেই রয়েছেন?”

ততক্ষণে জেমস ভেতরেঢুকে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছে। তার এক হাতে পিস্তল, আর অন্য হাতে টাকাকড়ি রাখবার থলেটা। তাতে একটা শিলিং-ও নেই তখন।

থলেটা দেখিয়ে সে ডাক্তারকে বলে, “ডাক্তারবাবু, এই আমার স্ত্রী। না খেতে পেয়ে কেমন শুকিয়ে ন্যাকড়ার মত হয়ে গেছে আহা! তা যদ্দূর জানি, আপনার কাছে ওর পেট ভরাবার মত ওষুধ আছে অনেকখানি। যদি দয়া করে আপনার থলে থেকে সেগুলো এইখানে চালান করে দেন… অবশ্য না দিতে চাইলে…”

তার অন্য হাতে ধরা পিস্তলটার দিকে একনজর তাকিয়ে মাথা নাড়লেন ডাক্তার। তারপর নিজের থলে খুলে তার থেকে সদ্য পুরস্কার পাওয়া চল্লিশটা সোনার গিনি তিনি চালান করে দিলেন জেমসের থলেতে।

হৃষ্টপুষ্ট থলেটা কোমরে বেঁধে নিয়ে জেমস বলে, “ধন্যবাদ ডাক্তারবাবু। তা, আমার স্ত্রীকে সুস্থ করে দিলেন, তার দক্ষিণা আপনার প্রাপ্য। আর কিছু আমার নেই, তাই এই বাড়িটাই আপনাকে দিয়ে গেলাম। এই বলে ডাক্তারকে সেই ঘরের মধ্যে আটকে বাইরে থেকে শেকল তুলে দিয়ে টাকাপয়সা নিয়ে জেমস সেই গ্রাম ছেড়ে উধাও হল ফের।

তবে, হ্যাঁ গরিব মানুষের জন্য জেমসের বুকে বেশ খানিক দয়ামায়াও ছিল বইকি। কখনো কোনো গরিবের গায়ে হাত তোলেনি সে। উলটে প্রয়োজনে সাহায্যই করেছে তাদের। 

খরচের হাতিওটা ভারী দরাজ ছিল তার।ফলে মাঝেমধ্যেই হাতের শেষ কড়িটা অবধি খরচ করে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়ত জেমস। সেবারেই একবার তার সেই দশা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হাজারো চেষ্টা করেও কোনো শাঁসালো শিকারের খোঁজ আর মেলে না। শেষমেষ একদিন সে দেখে এক বুড়ো একটা গাধার পিঠে চেপে রাস্তা দিয়ে চলেছে। জেমস তার কাছে ঘোড়া নিয়ে গিয়ে হাজির হয়ে বলে, “চললে কোথা?”

“বাজারের দিকে যাব একটু,“ বুড়ো জবাব দিল, “একটা গরু কিনব ভাবছি। বাচ্চাগুলো তাহলে একটু দুধ পাবে বাড়িতে।”

“কতগুলো ছেলেমেয়ে তোমার?”

“দশটি।”

“আর, একটা গরুর জন্য দাম পড়বে কত?”

“বুড়ো মাথা নেড়ে বলে, “দু’বছর ধরে অনেক কষ্টে চল্লিশটা শিলিং জমিয়েছি কর্তা।দেখি যদি ওতে কুলোয়।”

জেমসের তখন এতটাই দুর্দশা যে বুকটা মুচড়ে উঠলেও তার তখন কিছু করবার নেই। সে বুড়োর কাছে এগিয়ে এসে বলল, “বাবা, আমার নাম জেমস হাইন্ড। তোমার ওই চল্লিশটা শিলিং আমার দরকার। কিন্তু কথা দিচ্ছি তোমার বাচ্চাদের আমি তাদের পাওনা দুধ থেকে বঞ্চিত করব না। আজ থেকে সাতদিনের মাথায় তুমি এইখানে আমার সঙ্গে দেখা করবে।আমি এর দ্বিগুণ টাকা তোমায় ফেরৎ দেব। শুধু একটাই কথা, এর মধ্যে কাউকে তুমি কিছু বলতে পারবে না এই নিয়ে।”

এই বলে বুড়োর চল্লিশ হিলিং নিয়ে জেমস চলে গেল। সাতদিন বাদে থিক সেই জায়গায় ফিরে এসেছিল জেমস। বুড়োর হাতে তুলে দিয়েছিল দুটো দুধেল গরু আর কুড়িটা শিলিং।

পারতে কখনো রক্তপাত করত না সে। তবে প্রয়োজনে কঠোর হতেও দ্বিধা হত না তার।আর এমনই একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় একবার জড়িয়ে পড়েছিল সে। সেবারে রাজহন্তার দলের আরেক চক্রী কর্নেল হ্যারিসনকে বাগে পেয়ে তার চূড়ান্ত হেনস্থা করবার পর জেমস খবর পেল, তাকে ধরবার জন্য দলবল পাকিয়ে হ্যারিসন পথে নেমেছে। খবরটা পেয়ে ভয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে পালাচ্ছে সে, এমন সময় শোনে পেছনে ঘোড়ার খুরের শব্দ। প্রাণপণে ঘোড়া ছোটাল জেমস। কিন্তু তবু পেছনে শব্দটা ক্রমশ বেড়ে উঠছিল। অবশেষে পেছনের ঘোড়াটা কাছাকাছি আসতে কিছু না ভেবেই ঘোড়ার পিঠে ঘুরে বসে গুলি চালালো সে। নিখুঁত লক্ষ্যে মাথাটা ফুটো হয়ে গেল অনুরসণকারীর।

সে জানত না, মানুষটা নিরীহ। তার মালিক খানিক আগেই ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে গেছেন। সে প্রাণপণে ছুটছিল নিজের মালিককে ধরবার জন্য। দুর্ভাগ্য তাকে জেমসের পিছু পিছু টেনে এনেছিল।

খুনটা করে জেমস আর দাঁড়ায়নি সেখানে। পালিয়ে গিয়েছিল সে তার ঘোড়া ছুটিয়ে। তাকে ধরা যায়নি। শুধু জেমসের ভাগ্যদেবতা সেদিন আড়ালে হেসেছিলেন।   

তবে সে আরো পরের কথা। উপস্থিত জেমসের জীবনটা একটা অন্য খাতে রওনা হয়েছিল। প্রথম চার্লস বিদ্রোহীদের হাতে খুন হবার পর তাঁর ছেলে দ্বিতীয় চার্লসকে আশ্রয় দেয় স্কটরা। তাঁকে সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারীর স্বীকৃতি দিয়ে তাঁর সিংহাসনের উত্তরাধিকার ফিরিয়ে দেবার জন্য বিরাট সেনাবাহিনী গড়ে স্কটরা এসে ইংল্যান্ডে ঢুকল।দলবল নিয়ে দ্বিতীয় চার্লসের পতাকাতলে এসে জমা হল দেশের অজস্র জমিদারও। তাদের পণ, প্রাণ দিয়ে হলেও আসল রাজাকে তাঁর সিংহাসন ফিরিয়ে দেবে তারা।জেমস নিজেও রাজভক্ত ছিল। খবরটা শুনে ডাকাতি টাকাতি ছেড়ে এই সৈন্যদলে এসে যোগ দিল সে।

খবর পেয়ে পার্লামেন্ট অলিভার ক্রমওয়েলকে সসৈন্যে পাঠাল রাজার বাহিনীকে আটকাবার জন্য। ওরসেস্টারে দুই দল মুখোমুখি হল এসে। রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধে দ্বিতীয় চার্লস হেরে গেলেন।যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কোনোমতে পালাতে সক্ষম হল জেমস।

পালিয়ে ছদ্মবেশে সে এসে হাজির হল লন্ডনে। সেখানে সেন্ট ডানস্টানের গির্জার উলটোদিকে ডেনজেল নামে এক নাপিতের বাড়িতে ঠাঁই হল তার।

কিন্তু ভাগ্য এবার আর তার সঙ্গ দেয়নি। একদিন পথে এক পুরোনো ঘনিষ্ট বন্ধু হঠাৎ তাকে চিনতে পেরে যায়।জেমস ভাবতে পারেনি, তার এককালের প্রিয় বন্ধুই তাকে ধরিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবে তাই ঘটল।  

ধরা পড়বার পর তাকে নিয়ে যাওয়া হল হাউজ অব কমন্স-এর স্পিকার মহোদয়ের বাড়িতে। সেখানে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর তার জায়গা হল নিউগেট-এর জেল-এ। লোহার ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে সেখানে নির্জন সেল-এ আটকে রাখা হল তাকে। 

১২ ডিসেম্বর ১৬৫১, শুক্রবার ওল্ড বেইলির এক বিচারসভায় বিচার শুরু হল তার। বেশ কিছু অভিযোগ ছিল তার নামে। কিন্তু তাকে ফাঁসিতে চড়াবার মত একটা অভিযোগেরও যথেষ্ট প্রমাণ মিলল না।

কিন্তু দুর্ভাগ্য তার পিছু ছাড়েনি।এবারে তাকে নিয়ে আসা হল বার্কশায়ারের রিডিং কারাগারে। এখানে জর্জ সিম্পসন নামে এক সাধারণ চাকরকে রাস্তায় গুলি চালিয়ে মারবার অভিযোগে তার বিচার হল ফের। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হল জেমস হাইন্ড।

এ-অপরাধের সাজা মৃত্যুদণ্ড।কিন্তু ভাগ্য তাকে নিয়ে ফের একবার তাঁর খেলা খেললেন। বিচারের পরদিন একটা সরকারি আদেশ বের হল। সে আদেশ মোতাবেক, একমাত্র রাষ্ট্রদ্রোহ বাদে আর সব অপরাধের সাজা মুকুব করেছিল সরকার। এরই জোরে ফাঁসির হাত থেকে বেঁচে গেল সে।

নতুন করে বাঁচার আশা জেগে উঠল জেমসের মনে। আর তারপর চূড়ান্ত আঘাত হানল তার নিয়তি। ওরসেস্টারের যুদ্ধে দ্বিতীয় চার্লসের সহযোগী হয়েছিল যে সে, সেই খবরটা প্রকাশ হয়ে গেল। ফলে সরকারের আদেশে ফের তাকে নিয়ে যাওয়া হল ওরসেস্টারের জেলখানায়।

সে বিচারে ফের মৃত্যুদণ্ড পেল জেমস। ১৬৫২র চব্বিশ সেপ্টেম্বর তার ফাঁসি হয়ে গেল।তখন সে পঁয়ত্রিশ বছরের যুবক।

ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে জেমস একটা স্বীকরোক্তি করেছিল। বলেছিল, জীবনে যত ডাকাতি সে করেছে, তার সবকটিই রাজবিরোধী প্রজাতন্ত্রীদের বিরুদ্ধে। বলেছিল, রাজহন্তাদের দলকে সে ঘৃণা করে।বলেছিল, একটাই আক্ষেপ নিয়ে ফাঁসির মঞ্চে উঠছে সে। তা হল তার প্রিয় রাজবংশের প্রত্যাবর্তনের সাক্ষি থাকতে না পারা। বলেছিল, দেশের শাসককে অন্যায়ভাবে খুন করেছে যারা, ফাঁসির মঞ্চ তার চাইতে সেই বিশ্বাসঘাতকদেরই বেশি করে প্রাপ্য।

দেশের প্রজাতন্ত্রী শাসকরা তার এহেন বক্তব্যের প্রতিশোধ নিয়েছিল তার মৃতদেহের ওপরে। ফাঁসির পর তার মাথাটা সেভার্ন নদীর সেতুর ওপর ঝুলিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই গোপনে সেটিকে উদ্ধার করে নিয়ে সমাধি দেন  রাজভক্ত মানুষরা। কিন্তু তার বাকি শরীরটা সেই আদরটুকু পায়নি। খণ্ড খণ্ড হয়ে গোটা শহরের নানান জায়গায় টাঙানো ছিল জেমসের শরীর, রোদবৃষ্টির ধারা একসময় তাদের ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে যায়।

——————-

*হিউ পিটার্স(১৫৯৮-১৬৬০): ব্রৃটিশ যাজক, রাজনৈতিক নেতা ও সৈনিক।১৬৪২ থেকে ১৬৫১ অবধি সেদেশে প্রজাতন্ত্রী বনাম রাজতন্ত্রীদের লড়াই “ইংলিশ সিভিল ওয়ার’-এ তাঁর বড়ো ভূমিকা ছিল। অগ্নিস্রাবী ধর্মোপদেশ ও বাইবেলের উক্তি ব্যবহার তাঁর নিজস্ব স্টাইল ছিল। রাজঘাতক অলিভার ক্রমওয়েলের ঘনিষ্ট পিটার্সই সম্ভবত সম্রাট প্রথম চার্লস-এর বিচার করবার প্রস্তাব তোলেন। চার্লসকে বন্দি করবার পর তাঁকে লণ্ডনে নিয়ে আসা সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই পিটার্স। চার্লসের বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের সপক্ষে তিনি বাইবেলের বিভিন্ন উক্তিকে কাজে লাগিয়েছিলেন। শোনা যায় চার্লসের মুণ্ডচ্ছেদের সময় ঘাতকের প্রধান সহহকারীও হয়েছিলেন তিনি।রাজতন্ত্রের পুনরুত্থানের পর রাজহত্যার দোষে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়।

** জন ব্র্যাডশ (১৬০২-১৬৫৯)পেশায় আইনজীবী। ইংলিশ সিভিল ওয়ারে রাজতন্ত্রের পতনের পর ১৬৪৯ সালে তাঁকে রাজা প্রথম চার্লসের বিচারের জন্য গড়া পার্লামেন্টারি কমিশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়।যদিও আইনজ্ঞ হিসেবে তাঁর দক্ষতা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন ছিল, কিন্তু সে সময়ের বিখ্যাত আইনব্যবসায়ীদের কেউই রাজার বিচারের ভার নিতে সম্মত হননি বলেই ব্র্যাডশ এই সুযোগ পান। বিচারসভায় বসতেন একদল দেহরক্ষি নিয়ে মাথার লোহার লাইনিং দেয়া টুপি ও গায়ের পোশাকের নীচে বর্ম পরে।রাজাকে বিচারে একজন স্বৈরাচারী, বিশ্বাসঘাতক, হত্যাকারী ও গণোশত্রু বলে রায় দিয়ে তিনি তাঁর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন। সাজা শোনাবার পর রাজাকে তাঁর তরফে কোনো বক্তব্য রখতেও অনুমতি দেননি ব্র্যাডশ। ১৬৬০ সালের জানুয়ারির ত্রিশ তারিখে দ্বিতীয় চার্লস সিংহাসনে ফেরবার পর রাজদ্রোহী হিসেবে মরণোত্তর মৃত্যুদণ্ড পান তিনি। ব্র্যাডশ, ক্রমওয়েল ও হেনরি আয়ারটন নামে তিন রাজদ্রোহীর দেহ কবর খুঁড়ে বের করে টাইবার্নে শেকল বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এরপর তাঁদের শবের মুণ্ডচ্ছেদ করা হয়।মাথাগুলো শূলে গেঁথে ওয়েস্টমিনস্টার হলে টাঙিয়ে রাখা হয়েছিল বেশ কয়েকদিন। 

***জ্যাকোবাস: রাজা জেমসের আমলের স্বর্ণমুদ্রা। এক জ্যাকোবাস ছিল পঁচিশ রুপোর শিলিঙ-এর সমমূল্যের।

জয়ঢাকের টাইম মেশিন সব লেখা একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s