Toyঢাক-সহজ গল্প- পুঁচকে গাছের কথা-সুস্মিতা কুণ্ডু বর্ষা ২০২১

likhibopatabahar

এক ছিল বাগান আর সেই বাগানে ছিল একটা পুঁচকে ফুলগাছ। ফুলের গাছ বললুম বটে তবে সে গাছে আজও একটা ফুল ধরেনি। গাছ বেচারার তাই ভারি মন খারাপ। রোজ সকালে পূব আকাশে লাল রঙ ধরলেই হলে গাছ শুধোয়,  “আলোদিদি! আমার ডালে কবে ফুল ধরবে বলতে পারো?”

আলোদিদি গাছের পাতায় চুমো দিয়ে চুপিচুপি চলে যায় মাটির ওপর বিছানো সবজে ঘাসের গালচেয়। 

গাছ ফোঁস করে দম ছেড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আর করবেটাই বা কি? হেঁটে চলে যাওয়ার তো আর পথ নেই। না পথ তো আছে বটেই, একফালি পাতায় ঢাকা পথ ধরে বনের কোথায় যাবে যাও না, কেউ বাধা দেবেনাকো। মুশকিল হল গাছ তো আর চলে ফিরে বেড়াতে পারে না। তাদের আঁকুনিবাঁকুনি শিকড়গুলো যে মাটির গভীরে চলে যায় জলের খোঁজ করতে। জল ছাড়া কি আর বাঁচা যায়? তোমরা যেমন বাড়িতে গেলাসে জল ধরে ঢকঢকিয়ে খেতে পারে গাছ তো আর অমন করে খেতে পারে না। তাই গাছেরা তাদের শিকড়গুলো দিয়েই পাইপের মত করে চোঁ চোঁ করে জল খায়, ঠিক যেমন তোমরা কাচের বোতলে পাইপ দিয়ে শরবৎ খাও তেমনটি। 

যাই হোক, চলে ফিরে বেড়ানো নিয়ে গাছের বিশেষ মন খারাপ নেইকো। গাছকে তো আর বাজারে চাল ডাল আলু পটল কিনতে যেতে হয় না! এই তো মাটি থেকে জল পেল, আলোদিদি আলো দিল আর বাতাস ভায়া দু’বেলাই এসে এত এত বাতাস দিয়ে যায়। এই তিনটি পেলেই গাছ তার পাতার হেঁশেলে ঝপাঝপ খাবার বানিয়ে গপাগপ খেয়ে ফেলে। ঠিকমত খাওয়াদাওয়া করলে তবে না গাছে ফুল ধরবে, ফল আসবে! 

এদিকে আমাদের পুঁচকে ফুলগাছ সবকিছুই নিয়ম মেনে করে তবুও গাছে ফুল আসে না। গাছের মন খারাপ সারে না তাই। বাতাসভায়া আলতো করে শীতল হাত বুলিয়ে দিয়ে যায় গাছের মাথায়। গাছের গা জুড়ায় তবে মনের দুঃখু তো মনেই থাকে। কবে রঙিন ফুল ধরবে ডালে, ডালে। লাল, গোলাপি, হলুদ, কমলা, নীল, বেগনে, রঙবেরঙের। 

দিন যায়, রাত যায়, গাছ তো আশা ছেড়েই দিয়েছে ফুল ধরার এমন সময় হঠাৎই একদিন গাছের বড় বড় সবজে পাতায় লাল হলুদ ছোপ ছোপ দেখা দিল। পুঁচকে গাছ তো ঘাবড়ে একশা! এ কী আজব কথা! সবুজ পাতায় এমনধারা ছোপ কেন? একবার বুড়ো বটগাছের মুখে শুনেছিল বটে যে দূরদেশে যেখানে বছরে তিনমাস সব বরফে ঢেকে যায় সেখানে নাকি শীত পড়ার আগেই সব গাছের পাতা হলুদ, কমলা তারপর লাল আর সবশেষে শুকিয়ে বাদামী হয়ে নাকি ডাল থেকে খসে পড়ে মাটিতে। তারপর ফাঁকা ডালে বরফ মেখে দাঁড়িয়ে থাকে যতদিন না ফের গরমের মরশুম আসছে। গরম পড়লে বরফ গললে নতুন সবুজ পাতা গজিয়ে আবার ভরে ওঠে গাছ। 

তবে এমনটা তো আমাদের ফুলগাছ যে বনের পাড়ায় বাস করে সেখানে হয় না। এখানে সারা বছরই বলতে গেলে গরম, আর মাঝেমাঝেই আকাশে কালো মেঘ জমে জল ঝরে। তাই বড় ছোট সব গাছের ডাল সবসময়ই সবুজ পাতায় ভরা থাকে। ফুলের সময় ফুল ধরে, ফলের সময় ফল ধরে। শুধু আমাদের পুঁচকে ফুলগাছের কপালেই এমনটি ঘটল। ফুল তো ধরলই না তার বদলে পাতায় আবার এমনতরো দাগছোপ। কোনও অসুখবিসুখ করল না তো ফুলগাছের? ভয়ে থরথর কাঁপে! তবে সেরকম কিছু অসুবিধে তো বোধ করছে না। বরং পাতাগুলো রঙচঙে হয়ে আলোদিদির ছোঁয়ায় বেশ ঝলমল করছে। বাতাসভাইয়ের দোলায় বেশ মাথা নাড়িয়ে খুশি খুশি নাচতে লেগেছে। 

এ তো আজব কথা! পাশের নিমগাছকে শুধোয় পুঁচকে ফুলগাছ। নিমগাছ ডাল নেড়ে বলে,

-“কিজানি বাপু! সেই কোন ছোটো থেকে এত বয়স অব্দি এই বনে রইলুম তোমার মত এমন গাছ এই বনে দেখিনি। ও তোমার কিছু অসুখই করেছে। এমনিতেই তুমি এত পুঁচকে গাছ, না আছে মোটা গুঁড়ি না বড়সড় শরীর। এ তো মোটেই সুবিধের কথা নয়!”

নিমগাছ মুখের কথা বেজায় তেতো। মিঠে করে কিছুই বলতে পারে না। কোথায় পুঁচকে গাছকে একটু সাহস দেবে তা না! 

ওদের আলোচনা শুনে ওপাশের বাবলা গাছ কান বাড়ায়, নাক গলায়। সে তো আবার আরেককাঠি বাড়া। নিমগাছের যেমন তেঁতো কথা কওয়ার রোগ, বাবলার তেমনি খোঁচা মেরে কথা কওয়ার। সে বললে, 

-“আর তুমি বেশি দিন বাঁচবে না পুঁচকে গাছ। ফুলগাছ না কচু! তুমি হলে গিয়ে আগাছা। তুমি থাকার চেয়ে বরং না থাকাই ভালো। আগাছা আবার কোনদিন কার কাজে এসেছে শুনি?”

নিমগাছ আর বাবলাগাছের কথা শুনে তো পুচকে গাছ ঝরঝরিয়ে কাঁদতে শুরু করল। এত সব আওয়াজে বটগাছ ঘুম থেকে আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠে ঝুরি নেড়ে বললে, 

-“কী হলটা কী শুনি? ওই এক পুচকে গাছটাকে তোরা ধেড়ে গাছগুলো অমন করে অকথা কুকথা বলছিল যে বড়? বলি এই বনে কি বড়দের কোনও মান নেই? আমি আশুথ আম জাম আমাদের সামনে তোরা এমন বাজে কাজ করছিস, সাহস তো কম নয়!”

বটের কথায় একটু ভরসা পায় পুঁচকে গাছ। বট নরম সুরে তাকে বলে, 

-“তোমার কোনও ভাবনা নেই পুঁচকে গাছ। তোমার অসুখও হয়নি বিসুখও হয়নি। এই বনে আগে তোমার মত গাছ হয়নি কিনা তাই সকলে তোমায় চেনে না। কোনও পাখি হয়ত দূর কোথা থেকে তোমায় এখানে এনে ফেলেছে। তোমার পাতা যতদিন ছোটো ছোটো ছিল, কচি সবুজ ছিল। এবার যত বড় হবে পাতা তত লাল হলুদ বুটিদার হবে। তুমি কোনও আগাছা নও, তুমি হলে পাতাবাহার বুঝলে? 

আর আগাছা হলেই বা খারাপটা কী? সব গাছই কোনও না কোনও কাজে লাগে।”

বনের সব গাছই মন দিয়ে বুড়ো বটের কথা শুনল এমনকি নিম আর বাবলাও। আর কেউ ভুল করেও পাতাবাহারকে রাগালো না একটুও। ফুল না ফুটুক এমন বুটিদার পাতা আর কোন গাছের আছে বলো দেখি এই বনে? এদিকে পুঁচকে পাতাবাহার তো বেজায় খুশি। গুণগুণিয়ে নামতা পড়ে আর এক দুই তিন চার করে গুণে রাখে কোন পাতায় ক’টা লাল বুটি, হলুদ বুটি হল। 

(শেষ)

খুদে স্রষ্টাদের সমস্ত কাজের লাইব্রেরি

1 thought on “Toyঢাক-সহজ গল্প- পুঁচকে গাছের কথা-সুস্মিতা কুণ্ডু বর্ষা ২০২১

  1. কী অদ্ভুত সুন্দর লিখেছ সুস্মিতা! এত সহজ অথচ এমন গভীর।

Leave a Reply