সম্পূর্ণ উপন্যাস-হরিপুরে হরবোলা- সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়-শরৎ ২০২৩

এই লেখকের আগের গল্প- প্যানগমে প্যানিক, অভিমানিনী

UPONYASHARIPUREHARBOLA

যতদূর চোখ যায় চারপাশে একটাই রঙ চোখে পড়ছে। সবুজ। ঠিক গাঢ় নয়, হালকা কচি কলাপাতার মতো সবুজ ধানগাছগুলো সকালের রোদে হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে। আর সারা মাঠে সবুজের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। এরকম ছবি শুধু ক্যালেন্ডারেই দেখেছে বাবুই। তবে অনুভব করেনি কখনও। চোখের সামনে দেখার আনন্দই আলাদা। ভাগ্যিস দাদুর সঙ্গ ধরে এই চমৎকার বাস-ভ্রমণে এসেছে ও।

কোন ভোরে উঠে আসা। বাসে উঠেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। দাদুর ডাকে ওর ঘুম ভাঙল।—”ও বাবুই, ওঠ, উঠে পড়। সারাটা রাস্তা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে গেলে কিছুই তো দেখা হবে না।”

দাদুর ডাকে চোখ খুলে, জল খেয়ে, জুত হয়ে বসেছে ও। সত্যি-সত্যিই কত কিছুই ঘুমোতে ঘুমোতে হারিয়ে ফেলছিল। বাস-ভরতি লোক। অনেকেই রড ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বেলা বেড়েছে। জানালা দিয়ে রোদ্দুরের সঙ্গে আসছে হু হু হাওয়া। চারপাশের সবুজ মাঠঘাট বাসের উলটোদিকে দৌড়চ্ছে। এত কিছুর মধ্যে ও বোকার মতো ঘুমোচ্ছে। ভাগ্যিস দাদু ডেকে দিলেন।

বাবুইর পোশাকি নাম অরিন্দম। কিন্তু স্কুলে ছাড়া কেউ ওকে ওই নামে ডাকে না। একমাত্র দাদু মাঝে মাঝে ওই নামে ডাকাডাকি করেন। আজ দাদুও সঙ্গে আছেন। আসলে দাদুর গ্রামের মামাবাড়িতে পুজো দেখতে যাওয়া হচ্ছে। গ্রামের নাম হরিপুর। হাওড়ার ডোমজুড় ছাড়িয়েও বেশ খানিকটা রাস্তা যেতে হয়।

ডোমজুড় অনেক পুরোনো জায়গা। ওই ডোমজুড়ের নাম ও আগেই শুনেছে। ওদের টালিগঞ্জের বাড়ি থেকে ডোমজুড়ের দূরত্ব অনেকখানি। তবে এখন আগের থেকে পথঘাট অনেক উন্নত হয়েছে। ওরা নামবে ডোমজুড় ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা রাস্তা এগিয়ে হরিপুরে। বাবাই বলেছিলেন, “বাড়ির গাড়িতেই যাও। আমরা না-হয় ট্যাক্সিতে এয়ারপোর্ট চলে যাব।”

দাদু বললেন, “না। বাসে যাওয়ার আলাদা মজা। জানালা দিয়ে সরে যাওয়া গাছগাছালি, ঘরবাড়ি, কত লোকের কথাবার্তা, গায়ের গন্ধ, ঠেলাঠেলি—তা নয়, এসির কালো কাচের আড়ালে ‘আপনি আর কোপনি।’ আমরা বাপু বাসেই যাব। কী বাবুই, তোর কী মত?”

ক্লাস নাইনে পড়লে কী হবে, বাড়িতে দাদু ছাড়া আর কেউ ওর মত জানতে চায় না। তাই মতামত দিতে একটুও দেরি করেনি বাবুই। বলেছিল, “হ্যাঁ, আমরা বাসেই যাব।”

সেই মোক্ষম বাসযাত্রাটি শুরু হয়েছে আজ পঞ্চমীর ভোরে। বাবা, মা যাবেন বেঙ্গালুরু। ওখানে বীণামাসির বাড়ি পুজোর ক’দিন কাটিয়ে একটা সায়েন্স সেমিনারে যোগ দেবেন তাঁরা। বাড়িতে থাকবেন ঠাকুমা আর তাঁর দেখভাল করার লোক চায়নাপিসি। পিপি মানে ওর নিজের পিসি অবশ্য তাঁর হাতিবাগানের বাড়ি থেকে রোজই একবার ঠাকুমাকে দেখে যাবেন।

মা ওর এই হরিপুরে আসার ব্যাপারে একেবারেই খুশি ছিলেন না। বলেছিলেন, “বাবা, হরিপুর যাচ্ছেন যান। বাবুই আমাদের সঙ্গে ব্যাঙ্গালোরেই চলুক। যে-ক’দিন আমাদের সেমিনার থাকবে সে-ক’দিন না-হয় বীণাদির কাছেই ওকে রেখে দেব।”

মা সবসময়ই এমন বলেন। ওকে একদম বাচ্চা ভাবেন। পারলে সঙ্গে নিয়েই কলেজ যান। তা বলে পুজোর ক’দিন মায়ের কাছে বিদেশে বাবুই মোটে থাকতে চায় না। দাদুর সঙ্গে ওর আলাদা বন্ধুত্ব আছে। পুজোয় কলকাতার সব বন্ধুদের ছেড়ে যেতে হচ্ছে। সেখানে ব্যাঙ্গালোর কোনও বিকল্প হতে পারে না। ‘হরিপুর প্লাস দাদু’ তবু চলতে পারে।

ডোমজুড় আসতেই দাদু জানালা দিয়ে বাদামের প্যাকেট আর লেবু লজেন্স কিনলেন। বাসের জানালা দিয়ে চারপাশের খোলা ধানক্ষেত, বাঁশঝাড়, স্কুল-বাড়ির ফাঁকা উঠোন, ঘরবাড়ি দেখতে দেখতে চলেছিল ও। এত সবুজ চারপাশে যে ঘোর লেগে যায়। মাঝে-মাঝে বড়ো বড়ো দিঘিতে ছেলেমেয়েদের সাঁতারের হাত-পা ছোড়া নজরে আসছিল। দাদু পাশ থেকে ওকে বাদাম, লেবু লজেন্স হাতে তুলে দিচ্ছেন।

বাসে ওঠার পর থেকেই উনি একটু টেনশনে আছেন। দুজনের দুটো জামাকাপড় বোঝাই কিট ব্যাগ ছাড়াও সঙ্গে আছে আরও দুটো ব্যাগ। একটাতে পুজো-বাড়ির জন্য ঠাকুমার করে দেওয়া নারকেল আর তিলের নাড়ু, বাড়ির বাগানের বাতাবি লেবু, নারকেল। অন্যটাতে ঠাকুরকে দেবার শাড়ি, আলতা, সিঁদুরের প্যাকেট। দাদুর মামাতো ভাইদের ধুতি, বউয়ের নতুন শাড়ি, ভাইপোর জামা-প্যান্ট। আসার সময় হাওড়া বাস-স্ট্যান্ড অবধি গাড়ি নিয়ে এসে বাদলকাকু সব গুছিয়ে বাসে তুলে দিয়েছেন। নামাবার সময় কন্ডাক্টর দাদা আর বাবুই ভরসা। দাদুর কাঁধের ব্যাগে জলের বোতল, কিছু শুকনো খাবার, খবরের কাগজ ছিল। এখন একটু হালকা হলেও মালপত্র দাদুকে মোটে বইতে দেওয়া যাবে না। সেই নিয়েই আলোচনা চলছিল দাদুর সঙ্গে।

দাদু বলছিলেন, “এতদিন তো আমি একাই সবকিছু নিয়ে যাতায়াত করতাম। আজ অমনি আমাকে বাতিল করে দিচ্ছিস!”

বাবুই হাসে।—”বাহ্‌! এখন আমি তোমার গার্জেন না? যা বলব তাই শুনবে।”

দাদু মাঝে-মাঝে বাড়িতে ওকে ‘এই যে আমার লোকাল গার্জেন, আপনি কী বলেন?’ বলে ঠাট্টা করে থাকেন। সেটা এরকম বুমেরাং হয়ে যাবে ভাবতে পারেননি। তাই গোমড়া মুখে চুপ করে বসে আছেন। হঠাৎ জোরে ব্রেক কষে বাস দাঁড়িয়ে যেতেই সকলেই নড়েচড়ে বসল।

গোলমাল বেশ বড়োরকমের। বাসের সামনে একটা মারুতি ভ্যান আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তাই বাস ব্রেক কষেছে। শুধু তাই নয়, ওই গাড়ি থেকে রোগা, লম্বা, মস্তান মার্কা গোটাকতক ছেলে এসে উঠেছে ওদের বাসে। কন্ডাক্টর আর ড্রাইভারের জামার কলার চেপে ধরে ঘুসি মারছে ওরা। তারই সঙ্গে চলছে চিৎকার করে অকথ্য গালিগালাজ।—”তোরা ভেবেছিস কী, এতবার হর্ন দিলাম সাইড দিলি না? আগে যাবি, আগে? আগে যাওয়া ঘোচাচ্ছি তোদের।”

বাবুই উঠতে গেলে দাদু ওর জামা চেপে ধরে বসিয়ে দেন।—”তুমি ওদের সঙ্গে পারবে না। একটা কিছু ব্যবস্থা ঠিক হবে।”

বাসের অন্য লোকেরা গিয়ে, “দাদা ছাড়ুন, আর হবে না। এত মারলে মরে যাবে যে।” বলে ছাড়িয়ে দিল ওদের। তাও পায়ে ধরে ড্রাইভার, কন্ডাক্টরকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করল ওরা। রাগে বাবুইর হাত-পা নিশপিশ করছে। দু-একটা ক্যারাটের ডোজ দিতে পারল না বলে আপসোস হচ্ছে খুব। তবে দাদুর বারণ, মালপত্রের বোঝা, ওকে এগোতে দিল না একেবারেই। মুখগুলো চিনে নিল ভালো করে। ‘এক মাঘে শীত পালায় না’—কথাটা তো মিথ্যে হতে পারে না।

এরপরেও ধুঁকতে ধুঁকতে বাস চালালেন ড্রাইভারকাকু। কন্ডাক্টর কাকুও ফিরে গিয়ে ধরলেন দরজার হ্যান্ডেল। ইতিমধ্যে কয়েকজন উৎসাহী মানুষ বাসের ফার্স্ট এইড বক্স বার করে, চোখ-মুখের রক্ত ধুইয়ে, ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছেন ওঁদের। তখন বাবুই সঙ্গে ছিল। দাদু আপত্তি করেননি।

দু-পাশের সবুজ মাঠ, গাছপালার মধ্যে দিয়ে ছুটতে ছুটতে বাবুই ভাবছিল সেই কবিতার লাইনগুলো।—

‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,/ তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ? তুমি কি বেসেছ ভালো?’

কবিগুরুকে এইসব কষ্ট অনেক পেতে হয়েছে বোধহয়। মনে হচ্ছে এ ছটফটানি বাবুইর একার নয়।

***

সরু রাস্তা দিয়ে চলেছে ভ্যান গাড়ি। মালপত্র নিয়ে ও, দাদু আর টুবলু বসেছে গাড়িতে। নাম শুনলেও এরকম গাড়িতে এর আগে চাপেনি বাবুই। রাস্তা সরু নয়, তবে খুব উঁচুনীচু। ভালোই ঝাঁকাচ্ছে ভ্যানটা। নিজে বসার পর গাড়ির ধারটা খামচে ধরেছে ও। ভয় হচ্ছে পড়ে না যায়। দাদুকেও অন্যহাতে ধরতে গিয়েছিল। দাদু হেসে বলেছেন, “আমি দিব্য আছি।”

ওদের ওঠার আগেই টুবলু সটান উঠে গেল গাড়ির মাঝখানে। তারপর জাপটে ধরল সব ব্যাগগুলো। তাই ব্যাগ পড়ে যাওয়ার চিন্তা ওদের রইল না।

টুবলু দাদুর মামাতো ভাই অলকদাদুর ছেলে। পড়ে ক্লাস এইটে, এখানকার হরিপুর হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে। প্রায় সমবয়সি। তবে বাবুই এক ক্লাস উঁচুতে পড়ে বলে খুব খুশি হয়েই ‘বাবুইদাদা’ বলে ডাকছে ও। টুবলু নিজেই বলল, “আর একটা রাস্তা আছে। সেটা দিয়ে বড়ো গাড়ি যায়। আমি শর্টকাটে হবে বলে এ-রাস্তা দিয়ে নিয়ে এলাম।”

বাস থেকে মালপত্র নামানোয় কোনও ঝামেলাই হয়নি। আশেপাশের লোকেরাই হাতাহাতি করে সব নামিয়ে দিয়েছে। কন্ডাক্টরকাকু দাদুর হাত ধরে নামিয়ে দেবার পর যখন দাদু ধন্যবাদ জানালেন, তখন বাবুই পেছন ফিরে দেখেছিল কন্ডাক্টরকাকুর ঘামে ভেজা মুখটা কেমন চাপা খুশিতে ভরে গিয়েছে।

হরিপুরে পৌঁছনোর পর থেকেই দাদু একটু বেশি বকবক করছেন। ভ্যান গাড়ির লোকটার কাছে চড়কের মেলার খবর নিলেন। হাট এখনও প্রতি রবিবার বসে কি না জানতে চাইলেন। এমনকি চাষবাসের খবর, সবজি আনাজের দর, আমের ফলন—সব দাদুর কল্যাণে জানা হয়ে গেল বাবুইর।

টুবলু গাড়িতে বসে বাবুইর দিকে তাকিয়ে অকারণে ফিকফিক করে হাসছিল। ওর জামায় এসে একবার একটা প্রজাপতি বসায় দু-হাত জোড়া থাকার জন্য ধরতে না পেরে হেসে কুটিপাটি হল। বাবুইর বেশ ভালো লাগছিল। বাসের ঘটনাটা ছাড়লে সবকিছুই ওর মনের মতো হয়েছে। মানে যেমন আশা করেছিল তার থেকেও বেশি।

বাস-স্ট্যান্ডে ওরা নামার পর সেই মারুতি গাড়িটাকে পাশ দিয়ে হুস করে চলে যেতে দেখেছে ওরা। মাঝে কোথাও দাঁড়িয়েছিল বোধহয়। ওই ছেলেগুলোও নিশ্চয়ই গাড়িতে আছে। টুবলু বলল “এই গাড়ির লোকেদের আমি চিনি। এরা তো সার্কাস করে।”

দাদু অমনি রাশিয়ান সার্কাসের গল্প শুরু করলেন। দাদুর সঙ্গে বাবুইও সার্কাস দেখেছে। নতুন করে বলার কিছু ছিল না। আসল ব্যাপারটা হল দাদু চান না ও টুবলুকে ছেলেগুলোকে নিয়ে সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনাটার কথা বলে। ওর ভাবনাটা যে একেবারেই ঠিক তার প্রমাণ পেল ও। বাড়ির একদম কাছাকাছি এসে টুবলু যখন ‘আমরা এসে গেছি’ বলে বাড়িতে জানাতে ছুটল, দাদু ওকে বললেন, “রাস্তায় যা ঘটেছে এখানে বলার দরকার নেই, বুঝলে?”

বাবুই জানত দাদু এমন একটা কথা বলবেন। না-হলে টুবলু বা ভ্যান চালককে অত কথা বললেও এই বিষয়টা এড়িয়ে গেলেন তো! ওর মাথায় একটা কথাই ঘুরছিল—ওই মারকুটে লোকগুলো সার্কাস দেখায়? তাহলে গ্রামের বাসে উঠে অমন খারাপ আচরণ করল কেন?

এসব নিয়ে ভাবার বেশি সময় পেল না ও। ওদের ভ্যান-গাড়ি বেশ বড়ো একটা হলুদ রঙের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছে তখন। বাড়ির সামনে অনেকটা এলাকা নিয়ে বাগান। একপাশে ফুল ফুটেছে, আর অন্য পাশে সবজি চাষ করা হয়েছে। গোলাপফুল, দোপাটিদের সাইজ বেশ বড়ো বড়ো। বেগুনের ঝোপ থেকে বেরিয়ে এল একজন। তার হাতের ঝুড়িতে অনেক সবজি। বাড়ির গাছের ফলন যে দেখলেই বোঝা যায়। এতক্ষণে বাবুই দেখে বাগানটা বাড়ির পেছনদিকেও চলে গিয়েছে।

বেরিয়ে আসা মানুষটি এগিয়ে এসে দাদুকে ঢিপ করে একটি পেন্নাম সারতেই দাদু তার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “ভালো আছ নকুল? কতদিন বাদে দেখা হল।”

নকুলদা বাবুইর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে, “আপনার নাতি বুঝি? বাব্বা! কী সোন্দর দেখতে!”

বাবুই দেখে দু-হাতে দুটো ভারী ব্যাগ নিয়ে ভেতর বাড়ির দিকে যেতে যেতে টুবলু নিজের মনে ফিকফিক করে হাসছে। ওর একটু লজ্জা করে। নকুলদা আনাজের ঝুড়ি বাগানে বসিয়ে ওর হাত থেকে দুটো কিট ব্যাগই নিয়ে নিয়েছে। দাদুর পেছন পেছন বাড়ির ভেতরে যাবার জন্য পা বাড়িয়ে বাবুইর আবার মনে হয়, যা মনে হচ্ছে পুজো ভালোই কাটবে। শুধু বাসের ঘটনাতেই মন কেমন খিঁচড়ে গিয়েছে।

দাদু আর ও বাড়ির হাট করে খোলা সদর দরজা দিয়ে ঢুকে দূর থেকেই ঝলমলে প্রতিমার দর্শন পেল। উঠোন পেরোলে সামনেই পুজো দালান। সেখানে লাল সাটিনের বেনারসি পরা মা দুর্গা তাঁর চার ছেলেমেয়ে আর অসুরের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন। সরস্বতী পরেছেন বাসন্তী রঙের সাদা জরির ফুলতোলা শাড়ি। লক্ষ্মীর শাড়িও একইরকম, শুধু রঙটা নীল। কার্তিকের চুলের আর বাহন ময়ূরের বাহার চোখ টানে। গণেশের পাশেই পুঁচকে ইঁদুর। ঘোমটা দেওয়া কলাবউ আসবেন সপ্তমীর দিন। পেছনের টানা আধখানা চাঁদের মতো চালচিত্রে মা দুর্গার মাথার কাছে শিব ঠাকুরের ছবি। বাবুইর সবচেয়ে ভালো লাগল প্রতিমার আর অন্য দেবদেবীর মুখ। দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক, গণেশ—সবার মুখই যেন এক ছাঁচে গড়া। পানপাতার মতো মুখে ওপর দিকে টানাটানা চোখ, ঠোঁটের ফাঁকে হাসি ঝড়ে পড়ছে।

uponyasharipureharbola (2)

দাদু বললেন, “আমার মামার বাড়িতে বরাবর এরকম ঠাকুর হয়। এই যে টানা চালচিত্র দেখছ, একে বলে একচালার ঠাকুর।”

পুজো দালানের মাটিতে বসে বাড়ির মেয়েরা একটা চন্দন কাঠের বড়ো বাক্স খুলে কীসব ঘাঁটাঘাঁটি করে  টুলে দাঁড়ানো ধুতি-গেঞ্জি পরা একজনের হাতে তুলে দিচ্ছেন। দালানে উঠতেই বোঝা গেল, মাকে সোনা-রুপোর অলংকার পরানো হচ্ছে।

টুলে দাঁড়ানো মানুষটি দাদুকে বললেন, “সমীরদা, এসে গেছ? এখন বুঝছ তো কেন বাস স্টপেজে তোমাদের আনতে যেতে পারিনি? একা হাতে সব করতে হচ্ছে। তাই টুবলুকে পাঠালাম। কোনও অসুবিধা হয়নি তো? দেখো না, পুলক আসবে সেই বিকেলে। কোনও কাজেই ওকে পাওয়া যাবে না।”

দাদুর কাছে এর আগেই শুনেছে বাবুই, দাদুর মামার দুই ছেলে—অলক আর পুলক। অলকদাদু ব্যাংকের ম্যানেজার আর পুলকদাদু কলকাতার হাইকোর্টে ওকালতি প্র্যাকটিস করেন। পুলকদাদুর এখনও বিয়ে হয়নি। ওঁদের বাবা আর দাদুর মা ছিলেন একদম নিজের ভাইবোন। এখন দুজনেই মারা গেছেন।

অলকদাদু বললেন, “যাও, তোমরা ভেতর বাড়িতে গিয়ে পোশাক পালটে বিশ্রাম নাও। আমি হাতের কাজটা সেরেই আসছি।”

ঠিক টুবলুর মতো দেখতে এক মহিলা ঠাকুরদালান থেকে উঠে এসে দাদুকে প্রণাম করলেন। ইনি নিশ্চয়ই টুবলুর মা। বয়স বেশি না হলেও উনি সম্পর্কে ওর দিদা হন। ঢিপ করে একটা প্রণাম করে বাবুই। উনি বাবুইর হাত ধরে ওকে উঠিয়ে দিয়ে বলেন, “চলো, ভেতরে চলো। আমাকে নতুনদিদা বলে ডেকো, কেমন?”

ভেতরের টানা বারান্দার কোলে ঘরগুলো পরপর সাজানো। শরবত আর মিষ্টি খেয়ে বাবুই ঘুরে ঘুরে দেখছিল বাড়িটা। কলকাতায় বড়ো বাড়ি মানেই মাথায় বড়ো। এরকম বাগান, পুকুরওলা বড়ো বাড়িতে সাধারণ সচ্ছল মানুষ থাকেন না। একতলার সদর দরজা দিয়ে ঢুকলেই চার চৌকো উঠোন। তার সামনে ঠাকুরদালান আর তিন পাশে সারি দেওয়া ঘর। ওপরেও চার চৌকো উঠোনের ফাঁক রেখে তিন পাশে ঘর আর একপাশে হলঘর রেখে সাজানো হয়েছে। নীচে গেস্ট রুম, খাওয়ার ঘর, ভাঁড়ার ঘর, রান্নাঘর ছাড়াও আছে অনেক বইয়ের আলমারি সমেত একটি চমৎকার লাইব্রেরি। এছাড়াও বাড়ির কাজের লোকেদের থাকার জন্য দুটি ঘর আছে। বাড়তি আরও দু-একখানা ঘরে চাবি-তালা লাগানো। লোকজন বাড়লে খুলে দেওয়া হয় বোধহয়। ওপরের ঘরগুলোতেই বাড়ির লোকজনদের শোবার ব্যবস্থা। ওদের থাকার ব্যবস্থা ওপরেই হয়েছে। ওর আর দাদুর জন্য একটি ঘর সাজিয়ে দিয়েছেন ওঁরা।

দাদু বাথরুমে। বাবুই ওর কিট ব্যাগ থেকে ক্যামেরাটা বার করে নেয়। ওদের ঘরের পেছন দিকের দরজা খুলতেই টানা বারান্দা। সেখান থেকে বড়ো বাগান, দিঘি সব নজরে আসে। দিঘিটিতে বসার জায়গা সমেত বাঁধানো ঘাট আছে। দিঘির জলে চরে বেড়ানো হাঁস আর ছোটো বাচ্চাদের হুটোপাটি ভালোই লাগছিল দেখতে। খোলা বারান্দা থেকে দিঘির পাশ বরাবর পাঁচিলের গায়ে লাগানো খেজুর আর নারকেল গাছের সারির ছবি তুলবে বলে ক্যামেরায় চোখ লাগিয়ে দেখছিল ও। দৃশ্যটি ভারি শান্ত, ভারি মনোরম লাগছিল সব মিলিয়ে। হঠাৎ ওর ক্যামেরার চোখে ধরা পড়ল একটি বেমানান ঘটনা।

দূর থেকে ফটো তোলার কথা, তাই ক্যামেরা জুম করে দেখছিল ও। প্রায় স্পষ্ট দেখল পাঁচিলের ও-পারে টিনের ছাদওলা ছোটোখাটো বাড়িটার সামনে এক সাদা কাপড় পরা বয়স্ক মহিলাকে আঙুল তুলে শাসাচ্ছে একটি তেঢ্যাঙা লোক। মহিলা দরজার চৌকাঠেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তারপর এগিয়ে এসে খুঁটিতে পোঁতা গোরুটাকে নিয়ে তিনি পাশের চালা ঘরটির মধ্যে ঢুকে গেলেন। সম্ভবত ওটি ওঁর গোয়াল। ছবি না তুলে ঘরে ঢুকে আসে ও। দাদু তখনও বাথরুমে।

পরের দিন ষষ্ঠী। পুজো শুরু হয়ে যাবে। তাই বিকেলেই টুবলুর সঙ্গে বাবুই গিয়েছিল গ্রাম দেখতে। সন্ধে হয়ে এল। এখন আর আগের মতো অন্ধকার গ্রাম দেখতে পাওয়া যায় না। বিদ্যুতের খুঁটি পুঁতে অনেক গ্রামকেই আলোকিত করা হয়েছে। দাদুর কাছে ও গল্প শুনেছে—দাদুরা নিজেদের ছেলেবেলায় সন্ধের পর দিদিমার কাছে জড়োসড়ো হয়ে বসে গল্প শুনতেন যখন, হ্যারিকেনের আলোয় চারপাশে গল্পের ছায়ামূর্তিদের ঘনিয়ে আসা টের পেতেন।

বিকেলে গেট দিয়ে বেরোবার সময়েই সেই সাদা কাপড় পরা মহিলা, হাতে একটা দুধের ঢাকা দেওয়া ক্যান নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন। ও কিছু জানতে চাওয়ার আগেই টুবলু বলল, “উনি কমলাদি। ওঁর দুধের ব্যাবসা আছে। আমাদের পেছনের বাগানের দিঘির ও-পারের, ঠিক সামনের বাড়িতেই উনি থাকেন। খুব ভালো চন্দ্রপুলি বানান। পুজোর প্রসাদে রোজ ওঁর চন্দ্রপুলি, নারকেল ছাপা থাকবে। মা হাঁড়ি করে কিনে রেখেছেন। আমি নিজে দেখেছি।”

বাবুই কিছুই বলে না। টুবলুর সঙ্গে তেমন না মিশে ও কিছুতেই ওর সঙ্গে সবকিছু নিয়ে আলোচনা করবে না। ওর কাছে শুনে টুবলু কোথাও কিছু বলে বসলে ওকেই জবাবদিহি করতে হবে তো।

প্রথমে ওরা হরিপুরের বিখ্যাত কালীবাড়িতে গেল নতুন দিদার পাঠানো পুজো দিতে। এটা দাদুর মামাবাড়ির নিয়ম। বাড়িতে পুজোয় বসার আগে কালী মাকে জানানো হয়। ভারি সুন্দর মন্দির। ঘুরে ঘুরে একটু দেখে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ফিরতে ফিরতে সেই রাত হয়ে গেল।

বাবুই ভেবেই এসেছিল ফেরার পথে সার্কাসের তাঁবুর সামনে একটা চক্কর মেরে আসবে। গিয়ে দেখে তাঁবুর বাইরে টিকিট কাউন্টারে বেশ কিছু লোক ভিড় করেছে। টুবলু ওকে বলল, “আজ নয়। বাড়িতে বলে আসিনি। সার্কাস দেখে দেরি করে ফিরলে নির্ঘাত বকুনি খাব।”

কিন্তু বাবুইর ইচ্ছের কাছে ও হার মানল।

সার্কাস ঠিক নয়। কিছুটা ম্যাজিক আর বাকিটা জিমন্যাস্টিক। হাতসাফাইয়ের খেলা, জাগলিংয়ের খেলা বেশ ভালোই হল। বন্দুকের লক্ষ্যভেদ খেলায় বেলুন ফাটানো ছিল। এখানে গ্রামের সার্কাসে এর থেকে বেশি কিছু আশা করা যায় না। সাজগোজ করা মেয়েরা ট্রাপিজের খেলাও দেখাল। কিন্তু সার্কাসের মূল আকর্ষণ জন্তুজানোয়ার। এদের তেমন জন্তুজানোয়ার নেই। দুটো কথা-বলা কাকাতুয়া, দুটো ঘোড়া, তিনটে বাঁদর নিয়ে কি আর সার্কাস জমে?

কাকাতুয়া অন্য লোকের কথা শুনে তক্ষুনি তক্ষুনি নকল করল। চলন্ত ঘোড়ায় মেয়েরা হাত ধরাধরি করে পিরামিড বানাল। আর বাঁদর, মানুষের নকল করে দেখাল। সার্কাসের পয়সাকড়ি তেমন নেই যে সেটা পোশাক আর খেলা দেখলেই আন্দাজ করা যায়। একেবারে প্রথম থেকেই রণপা নিয়ে লম্বা জোকাররা বেঁটে জোকারদের সঙ্গে নানারকম হাসিঠাট্টা করছিল। ও বার বার টুবলুর কাছে জানতে চাইছিল—”সেদিন গাড়ি করে যারা গেল, তারা কই? তুই যে বললি ওরা সার্কাসের লোক!”

টুবলু বলল, “আমি দেখেছি ওই গাড়িটাকে সার্কাসের তাঁবুতে ঢুকতে। ওটা সার্কাসের ওখানেই থাকে। কিন্তু লোকগুলোকে আমি খেলার সময় দেখতে পাইনি। তবে খুব বেশি ওদের দেখিনি তো। ভুল হতেই পারে।”

তারপরেই টুবলু খুব আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল—”কী বাবুইদা, সার্কাস কেমন লাগল?”

ও টুবলুর মন রাখতে বলল, “খুব ভালো!”

তাছাড়া উপায় কী?

তখন ওর চোখে ভাসছিল রাশিয়ান সার্কাসের বাঘ-সিংহের খেলা। বেচারি টুবলুর খুশিটাকে তো আর সেইসব গল্প করে নষ্ট করা যায় না।

***

ষষ্ঠীর সকালেই মা ফোন করেছিলেন বাবুই আর বাবুইর দাদুকে। বাবুইকে একটা কথা পরিষ্কার বলেছেন, “শুনলাম ওখানে একটা দিঘি আছে। কোনোভাবেই তুমি কিন্তু দিঘিতে নেমো না।”

কথাবার্তায় মনে হল মায়ের মন খুব খারাপ। ব্যাঙ্গালোরে মাসির বাড়িতে যদিও খুবই আনন্দ করছেন। তবে বাবুই থাকলে কোনও সন্দেহ নেই যে সেটা আরও বেশি জমত। ফোনে বার বার একই কথা বললেন তিনি।—”পুজোর সময় তোকে ছেড়ে থাকতে একটুও ভালো লাগছে না।”

বাবুই মাকে বলেনি এই হরিপুরে এসে ও নিজে কতটা খুশি হয়েছে। এতটা স্বাধীনতা জীবনে এই প্রথম পেল তো। মায়ের, বাবাইর জন্য একটা মনখারাপ ওর হচ্ছে। কিন্তু কথা বললে সেটা অনেকটাই কেটে যায়। নতুনদিদা বলছিলেন, “তোমার মার তোমার জন্য মনকেমন করছে? সে তো হবেই। আমি তো টুবলুকে ছেড়ে থাকার কথা ভাবতেই পারি না।”

টুবলুর বাবা সামনেই ছিলেন। হেসে বললেন, “তা বললে হবে? ও বাইরে যাবে, পড়াশুনা করবে। তুমি কি ওকে তোমার কাছে আটকে রাখতে পারবে?”

এসব কথা হচ্ছিল নীচের খাওয়ার ঘরে বসে। ঠিক তখনই কমলাদি এল দুধ নিয়ে। কমলাদির মুখ কেমন শুকনো। কমলাদি চলে যাবার পর নকুলদা এসে বলল, “কমলার খুব মনখারাপ। ওর ছাগলটা হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কিছু খাচ্ছে না।”

অল্প বয়সে স্বামী হারিয়ে বাপের বাড়ির এই গ্রামে ফিরে এসেছিল কমলাদি। বাবার দুধের ব্যাবসাটাই করে ও। ছাগলটার নাম কালু। ওর সারাক্ষণের সঙ্গী। এ-বাড়ির গাছ থেকে ওর জন্য কাঁঠালপাতা নিয়ে যায়। ক’দিন হল সে নাকি কিছুই খাচ্ছে না।

কমলাদি নতুনদিদাকে বলেছে, বড়ো দিঘির ধারের বটগাছের নীচে যে সাধুবাবা বসেন, তিনি নাকি বলেছেন, “তোর ছাগলের কুদৃষ্টি লেগেছে। ওকে সামলে রাখিস। না-হলে ওকে হারাবি।”

খেতে দিতে দিতে কমলাদির কথা বলছিলেন নতুনদিদা। সেই শুনে দাদু হো হো করে হেসে উঠলেন। তারপর নতুনদিদাকে বললেন, “তোমাদের গ্রামে বুজরুকের আবির্ভাব হয়েছে। খুব সাবধান! তুমি যেন ওর কাছে নিদান নিতে যেও না।”

পুজোর শুরু সপ্তমীতে। দূরের গাঁ থেকে ঢাকিবুড়ো আর তাঁর নাতি অমল এসেছে। ঢাকিবুড়ো এ-বাড়ির পুরোনো বাজনদার। তাঁর ঢাকের আওয়াজ অনেক দূর থেকে শোনা যায়। সঙ্গে এখন কাঁসি বাজাচ্ছে তাঁর নাতি অমল। সেও পড়াশুনা করে। নিজেই বলল, “আমাদের গ্রামের ইস্কুলটা হাইস্কুল। টেন অবধি ওখানে পড়ে পাশ দিলে বাবা বলেছে ডোমজুড়ের হায়ার সেকেন্ডারিতে ভরতি করে দেবে।”

ক্লাস সেভেন, তাই টুবলুকে দাদা বলছে সে। টুবলু মহাখুশি!

ষষ্ঠীর সকালে ফল, নাড়ু, নারকেল তক্তি খাচ্ছিল ওরা সবাই। খবরটা তখনই এল। ডোমজুড়ের ব্যাংকে নাকি ডাকাত পড়েছিল কাল। ম্যানেজারকে বেঁধে রেখে ত্রিশ লাখ টাকা ক্যাশ নিয়ে গিয়েছে। সন্ধে ঠিক ছ’টার সময় হয়েছে ডাকাতিটা। ব্যাংক-কর্মী তেমন কেউ ছিলেন না। ম্যানেজার, ক্যাশিয়ার, দু-একজন অফিসার একসঙ্গে বসে চা খাচ্ছিলেন। পেছনের দরজার গার্ডকে বন্দুক দেখিয়ে ঢুকেছিল ডাকাতরা।

প্রথমে খবর এনেছিল নকুল। কী কাজে হাটে গিয়ে খবর আনে সে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুজো-বাড়িতে ডাকাতির গল্প বেশ জমে উঠল। এমনকি ডাকাতদের না দেখেও তাদের দাড়ি-গোঁফের, পোশাকের বর্ণনা দিচ্ছিল সবাই।

খেতে বসে দাদু বললেন, “বুঝলে অলক, খাবারদাবার একটু বাড়তি রেখো। বেলাতে ডাকাতের দল আসতেই পারে। গল্পের গোরু তো গাছে উঠেছে। ওরা না এলে এসব গাঁজা গল্প থামবে না।”

ষষ্ঠীর বিকেলে এসে পৌঁছেছেন পুলকদাদু। সঙ্গে এক বিশাল বোঁচকা। নিজের গাড়িতে টানা এসেছেন। পুজোর জন্য মাটির যাবতীয় বাসন, মালা, ফল, শুকনো সন্দেশ ছাড়াও বাড়ির সবার জন্য পুজোর বাজার করে এনেছেন তিনি। তাঁর আনা জামা-ধুতি পরে ঢাকিদাদুর ঢাকের জোর বেড়ে গেল। গঞ্জের বাজারে নিয়ে গিয়ে বাবুইকে ধুতি আর পাঞ্জাবি কিনে দিলেন তিনি। অমলের জন্যও কেনা হল শার্ট-প্যান্ট। পুলকদাদু বললেন, “আমাদের এখানে বিজয়ার দিন সবাই ধুতি-পাঞ্জাবি পরে। তুমি নিশ্চয়ই ধুতি আনোনি? তাই ধুতি দিলাম। চিন্তা কোরো না, তোমাকে আমি ধুতি পরিয়ে দেব।”

বাবুই হেসে বলল, “তার দরকার হবে না। দাদুর কাছে আমি ধুতি পরা শিখেছি। সরস্বতী পুজোয় প্রতিবার ধুতি পরেই অঞ্জলি দিই।”

উনি খুব খুশি হয়ে বললেন, “আমারই ভুল। সমীরদার মতো একজন পাক্কা বাঙালি নাতিকে ধুতি পরতে শেখাবে না, তাই কখনও হয়?”

***

পঞ্চমীর রাত শেষ হলে কলকাতায় কত লোক যে ঠাকুর দেখতে বের হয়, ষষ্ঠীর ভোরে ঘুরে ঘুরে কীভাবে ঠাকুর দেখা হয়—সে-কথাই টুবলুকে বলছিল বাবুই।

টুবলু অবাক হয়ে বলে, “এমা! রাতেই তো আলো দেখার সুবিধে। ভোরে ঠাকুর দেখা হয় কেন?”

“আর কোনও উপায় নেই তাই। রাতে এত ভিড় হয়, ঠাকুর দেখাই যায় না। কলকাতার আশেপাশের সব অঞ্চল থেকেই লোকে ঠাকুর দেখতে আসে তো।”

বেচারি টুবলুর কলকাতার পুজো সম্বন্ধে কোনও ধারণাই নেই। হাঁ করে শুনছিল, আর খুব বেশি অবাক হবার দরুন ওর হাসি একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওরা বসে ছিল ঠাকুরদালানের সামনের খোলা বেঞ্চিতে। কখন গুটিগুটি পায়ে অমল এসে বেঞ্চের একধারে বসে গল্প শুনছে, ওরা কেউ খেয়াল করেনি। হঠাৎ ওদের চমকে দিয়ে রিনরিনে গলায় অমল কথা বলে উঠল।—”আমি একটু একটু কলকাতার পুজোর ব্যাপারটা জানি। ওখানে তো খুব ভালো ভালো প্যান্ডেল হয়। অনেক লাইট দিয়ে সাজানো হয়, তাই না?”

“তুই কী করে জানলি?”

টুবলুর গলায় প্রশ্নটা শুনে হাসি পেল বাবুইর। টুবলুর এই প্রশ্ন করার কারণ একটাই, যেটা ও একেবারে জানে না, সেটা এই অমল জানল কী করে। তার ওপর টুবলু এক ক্লাস উঁচুতে এইটে পড়ে—অমল তো সেভেনে।

অমল বলে, “জানব না? আমাদের গ্রামে তো ঘর ঘর বাজনদার। বায়না হলে তারাই তো যায় কলকাতায় ঢাক বাজাতে। আমার অনেক বন্ধুর বাবা, কাকারা প্রতি পুজোয় কলকাতায় ঢাক বাজিয়ে আসে। ওদের কাছেই কলকাতার পুজোর অনেক গল্প শুনেছি। আমারও ইচ্ছে আছে, একবার আমাদের বাড়ির কেউ গেলে আমিও সঙ্গে যাব। ঢাকের সঙ্গে না-হয় আমার কাঁসিটা বাজাব।”

ষষ্ঠীর দিনে পুজোর তেমন ঝামেলা নেই। কিন্তু কাল সকাল থেকেই আসল পুজো শুরু হয়ে যাচ্ছে। সারা সকাল জুড়ে মেয়েরা ঠাকুর দালানে, উঠোনে আলপনা দিয়েছে। নকুলদার সঙ্গে হাত লাগিয়ে বাবুই আর টুবলু  দোতলার দালান থেকে রঙিন কাগজের শিকলি ঝুলিয়েছে। নীচ থেকে সবটা সমান হচ্ছে কি না তার তদারকি করেছে অমল। ছেলেটাকে বাবুইর বেশ মনে ধরেছে। প্রশ্ন করে দেখেছে, ওর ক্লাস অনুযায়ী ও ভালোই পড়াশুনা করে। গ্রামের স্কুলে ওর ক্লাসে ও-ই নাকি ফার্স্ট হয়।

এতদিন বাবুই দুর্গাপুজোয় শুধু ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখেছে। বাড়ির এই পুজো না দেখলে দুর্গাপুজোর ব্যাপারে ওর কোনও ধারণাই তৈরি হত না। পুজো মানে যে এত বড়ো যজ্ঞ, তা কে জানত? ও অবাক হয়ে দেখছিল, ভাঁড়ারের গোছগাছও কম নয়। গ্রামের লোকেরা যে যা পারছে তাদের বাগানের সবজি, ফলপাকুড় মা দুর্গার পুজোয় দিয়ে যাচ্ছে। কত নারকেল, বাতাবি লেবু, পেয়ারা, শসা ভাঁড়ারে জমা হয়েছে। তার ওপর টুবলুর কাকাই মানে পুলকদাদু একগাদা পুজোর বাজার এনে জড়ো করেছেন। ফল, সবজি, চাল, ডাল, ঘি, মশলা ছাড়াও গামছা, নতুন কাপড়, সিঁদুর কৌটো, আলতা—সুগন্ধীতে ঠাকুরের ভাঁড়ার ঘর বোঝাই। পা ফেলার জায়গা নেই। অলকদাদু আর দিদার এক মুহূর্ত বিশ্রাম হচ্ছে না। সেসব গোছানো, তোলা, পাড়া করা নিয়ে খুবই ব্যস্ত। পাড়ার মেয়েরাও এসে ওঁদের সাহায্য করছেন। কাল থেকেই জোরকদমে পুজো শুরু হয়ে যাবে। আর সময় কই?

সন্ধেবেলা গরম গরম ফুলুরি আর হালুয়া খেয়ে ঠাকুরের সামনের বেঞ্চে বসেছে বাবুই, টুবলু আর অমল। ওদের গল্প জমে উঠেছে।

এই হরিপুরে আরও কয়েকটা পুজো হয়। তবে সবই বারোয়ারি। বাড়ির পুজো এই একটাই। সপ্তমীর দিন দুপুরে আবার গ্রামের লোকেদের পেটভরে খিচুড়ি ভোগ খাওয়ানো হয়। তার জোগাড় করা আছে। দিদা-দাদুদের কাউকেই কাছেপিঠে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।

অমল বলল, “তিনজনে মিলে একটু ঠাকুর দেখে এলে হয়। কাল থেকে তো আমি ছুটিই পাব না। যাবে নাকি?”

টুবলু বলল, “মাকে জিজ্ঞেস করলে কক্ষনও যেতে দেবেন না। এখন ওঁরা পুজোর কাজে ব্যস্ত। এই ফাঁকে চলো ঘুরে আসা যাক।”

বাবুই জানে, দাদু বাইরে বেরোলে তেমন রাগ করবেন না। কলকাতায় তো ও একা-একাই রাত আটটায় টিউশন সেরে ফেরে।

অমল বলে, “দাদু সেই যে শুয়েছেন, খাওয়ার ডাক না পড়লে উঠবেন না। চলো আমরা ঘুরেই আসি।”

ওরা তিনজনে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। তিন-চারটে প্যান্ডেল ঘুরতে আর কত সময় লাগবে? বড়োরা খোঁজ করার আগেই ওরা ফিরে আসবে ঠিক।

রাস্তায় আলো তেমন জোরালো নয়। তাছাড়া ঠিক পরপর আলো লাগানো হয়নি। বাবুইর একটু অসুবিধা হচ্ছিল। একবার ইটে ঠোক্কর খেতেই অমল এসে ওর হাত ধরল। টুবলু চলেছে পথ দেখিয়ে। বাবুইর বেশ লাগছিল। শার্টের সবগুলো বোতাম এঁটে নিল ও। কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা একটা হাওয়া বইছে। অন্ধকার চোখে সয়ে এসেছে এখন। আকাশের আলোয় পথ খানিকটা খানিকটা দেখা যাচ্ছে।

টুবলু বলল, “এখন আমরা যে প্যান্ডেলে যাব সেটা হল বোসপাড়া সর্বজনীন। ওখানকার সিংহের চোখে বাল্ব ফিট করা থাকে। অটোম্যাটিক ব্যবস্থা। দেখবে, আলো জ্বলছে নিভছে। জ্বলছে নিভছে।”

ওর বলার ধরণে বাবুই, অমল হেসে উঠতেই টুবলু একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।

পরপর অনেকগুলো ঠাকুর দেখা হল ওদের। মালাপাড়া সর্বজনীনে আবার আলোর খেলা দেখানো হয়। মাইকে চণ্ডী স্তোত্র পাঠ চলে, আর দেবীর হাত থেকে লাইটের বর্শা গিয়ে অসুরের বুকে গেঁথে যায়। ওদের সামনেই একবার ওইভাবে অসুরবধ হল। তারপরে লোকের ভিড় না থাকায় শো বন্ধ করে সাধারণ আলো জ্বেলে দিল ওরা। আর দুটো বারোয়ারিতে নতুন কিছু চোখে পড়ল না।

ফেরার পথে ওরা আসছিল পেছনের রাস্তা ধরে। ওটাই শর্টকার্ট। পেছনে বাড়ির পাঁচিলের কাছাকাছি আসতেই একটা তর্জন-গর্জনের আওয়াজ ভেসে এল। তার সঙ্গে-সঙ্গেই কারোর ভয় পেয়ে কেঁদে কেঁদে মিনতি করার মতো কথাবার্তার আওয়াজও কানে পৌঁছল ওদের। কথাগুলো ঠিক স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। তবে পুরুষের গলাটি রীতিমতো তর্জন করে কাউকে কিছু করতে বলছে। আর মহিলা কণ্ঠটি সে-কথায় কিছুতেই রাজি হচ্ছে না। আপত্তি জানাচ্ছে। তবে কোনও গলাই স্পষ্ট নয়।

পেছনের রাস্তা দিয়ে টুবলুদের বাড়ি ঢুকতে হলে পাঁচিল ডিঙোতে হয়। না-হলে ঘুরে সামনে দিয়েই আসতে হবে। ওই পথের ওপরেই একটা টিনের চালের সাধারণ বাড়ি থেকেই আওয়াজ আসছে। টুবলু বলল, “ওটা তো কমলাদির বাড়ি আর গোয়াল। কমলাদি তো একাই থাকে। তাহলে কে চেঁচাচ্ছে?”

অমল বলল, “দেখবে, একটা মজা করব? যারা ভেতরে আছে ঠিক বেরিয়ে আসবে।”

ওদের হাত ধরে অমল পাশের অন্ধকার ঝোপের দিকে নিয়ে গেল। তারপর গলা বাড়িয়ে মুখে হাত দিয়ে শব্দ করতে লাগল। এরকম আওয়াজ করতে আগে কাউকে কখনও দেখেনি বাবুই। কুকুরের ঘেউ ঘেউ আওয়াজ, তার সঙ্গে মিশে গিয়েছে গোরুর হাম্বা রব। যেন কুকুরেরা গোরুদের তাড়া করেছে, আর তারা ভয় পেয়ে চেঁচাচ্ছে। অমল তার মানে হরবোলা।

ওই আওয়াজ শুনে একটা সিড়িঙ্গে লম্বা লোক বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসে কুকুরটাকে খুঁজতে লাগল। আর তার পেছন পেছন কাপড়ের আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল কমলাদি। লোকটা কমলাদিকে বলল, “কুকুরের আর গোরুর আওয়াজ স্পষ্ট শুনলাম। অথচ কিছু দেখতে পেলাম না। তাজ্জব বাত! ঠিক আছে, আজ আমি আসছি। এর পরে যেদিন আসব সেদিন আমি তোমার কোন ‘না’ শুনতে চাই না। বুঝেছ?”

লোকটা ওদের ঝোপের পাশ দিয়ে গটমট করে চলে গেল। ওরা প্রায় নিশ্বাস বন্ধ করে বসে। কমলাদি একটু দাঁড়িয়ে থেকে বোধহয় গোরুদের দেখতে গোয়ালে ঢুকল। আর দেরি না করে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল ওরা।

পথে অমল বলল, “তোমাদের কী মনে হচ্ছে? ব্যাপার কিন্তু একেবারেই সুবিধের নয়।”

বাবুই প্রথমদিনের ছবি তুলতে যাওয়ার সময়ের অভিজ্ঞতার কথা ভাবছিল। এদিকে তাকিয়ে সেদিন ও যা বুঝেছিল, আজকের ঘটনা তারই পুনরাবৃত্তি তো। যতদূর মনে হচ্ছে এই লোকটাই সেদিনও ছিল। আর ব্যাপারটা লুকিয়ে রেখে কোনও লাভ নেই। ফেরার পথে সেদিনের সব ঘটনাটাই ও বলল টুবলুদের।

বাড়ি ফিরতেই বড়োরা একজোট হয়ে তেড়ে এলেন। নতুনদিদা টুবলুকে একনাগাড়ে একই কথা বলে চললেন, “বাবুই তো এখানকার কিছুই চেনে না। ওকে নিয়ে অচেনা জায়গায় রাতের অন্ধকারে ঘুরতে যাওয়ার মানেটা কী? কিছু একটা বিপদ ঘটে গেলে কে সামলাত তোদের?”

টুবলুর মুখটা ঘাবড়ে গিয়ে দেখবার মতো হয়েছে। সেটা বকুনি খেয়ে, নাকি একটু আগেই ঘটে যাওয়া ঘটনার জের—কে জানে?

অমলের দাদুর ঘুম বোধহয় দিদার হাঁকডাকেই ভেঙেছে। তিনি এসে বসেছেন বেঞ্চিতে। ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া চাহনি দেখে মনে হচ্ছে, এত বকুনির কারণ তাঁর একেবারে মাথায় ঢুকছে না।

বাবুই পোশাক পালটাতে নিজেদের ঘরের দিকে যেতে যেতে চিন্তা করল, একটু আগের ঘটনাটা খুব স্বাভাবিক নয়। বার বার ঘটছে যখন, খোঁজখবর করে দেখতেই হবে।

***

সপ্তমীর দিন সকালে দাদু কাছে ডেকে বললেন, “মা-বাবাকে, তোমার ঠাকুমাকে একটা করে ফোন করো। ওরা তোমার কথা খুবই ভাবছে। একটা ফোন পেলে খুশি হবে।”

ওর মনে হল, ঠিকই তো। এই প্রথম ও বাবা-মাকে ছেড়ে থাকছে। এ-বছর ঠাকুমার শরীর ভালো নেই। না-হলে পুজো শুরু হতে না হতেই ঠাকুমা ওর জন্য খাবার বানানো শুরু করেন। একটা ফোন পেলে খুব খুশি  হবেন। আজ সবাইকে ও ফোন করেই নেবে।

নীচে নামতেই টুবলু ওর কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “দু-দুটো নিউজ আছে। এক, কমলাদির ছাগল কালু এখন একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠছে। যাতে আজেবাজে কিছু খেয়ে ওর আবার শরীর খারাপ না হয়, ওকে মায়ের নির্দেশে এ-বাড়িতেই বেঁধে রাখা হয়েছে। সারপ্রাইজ নিউজটা ক্রমশ প্রকাশ্য।”

কমলাদির ওই কালু নামের ছাগলের ওপর এ-বাড়ির বিশেষ দুর্বলতা আছে। টুবলুর জন্মের কিছুদিন পরেই নতুনদিদা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন স্থানীয় ডাক্তারের কথায় ছাগলের দুধ জল মিশিয়ে টুবলুকে খাওয়ানো হয়। কালুর মায়ের দুধই অনেকদিন অবধি খেয়েছিল টুবলু। তাই মাঝে-মাঝে পুলকদাদু ওকে বলেন, “তোর একেবারে ছাগলের মতো বুদ্ধি! হবে না? হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে তো।”

টুবলুই মনের দুঃখে এই বৃত্তান্ত বাবুইর কাছে ফাঁস করেছে। বড়োদের এরকম ভুলভাল খোঁটা তো সব ছোটোদেরই সইতে হয়। এ আর নতুন কী? তবে ওই দুধ খাওয়ার কাহিনি শুনে বাবুইর একটা চিন্তা মাথায় এসেছে। টুবলুর ওই অস্বস্তিকর হাসিটাও কি ওই কারণেই? হতেই পারে। ছাগলরাও হয়তো মানুষের কাণ্ড দেখে সারাক্ষণই হাসে। সে হাসি তো আর বোঝা যায় না।

কালুর মা আর বেঁচে নেই। তাই নতুনদিদা কালুকে একটু বিশেষ চোখেই দেখেন। অসুস্থ কালুর এ-বাড়িতে আসার খবর পেয়ে টুবলুর সঙ্গে বাবুই ওকেই দেখতে যাচ্ছিল। হঠাৎ ওর সামনে দিয়ে কালো মুশকো কিছু লোক হাতা-খুন্তি হাতে ভেতর বাড়ির দিকে চলে গেল।

টুবলু বাবুইকে আশ্বস্ত করে বলল, “ওরা রান্নার লোক। প্রতিবছরই ডাক দিলে ওরা রাঁধতে আসে। ওদের নিয়ে ভাবার কিছু নেই।”

চমকে দেওয়ার মতো খবরটা দিলেন দাদু।—”খবর শুনেছ?”

সবে একগাদা খিচুড়ি, নারকেল, আলু ভাজা, বাঁধাকপির তরকারি, টমাটোর চাটনি, পায়েস আর বাড়ির ভিয়েনের বোঁদে যত ইচ্ছে খেয়ে ঠাকুরদালানের বেঞ্চে এসে বসেছে ও আর অমল। এর মধ্যে আবার দাদু খবর নিয়ে হাজির। খাওয়াদাওয়ার কোনও খবর হলে ও একেবারেই নাচার। পেটে এক ফোঁটা জায়গা নেই। তাহলে কি সেই সারপ্রাইজ নিউজ? বাবুই ঘুরে বসে দাদুর দিকে।

টুবলু গিয়েছে মায়ের কাছে ওদের তিনজনের জন্য পান চাইতে। দাদু গুটিগুটি এসে বসলেন ওদের বেঞ্চে। ভেতরের লম্বা বারান্দায় বেঞ্চ পেতে খাওয়ানো চলছে। তাই তিনদিক থেকেই ভেসে আসছে হইচই। তার মধ্যে দাদুর গলা প্রায় শোনাই যাচ্ছে না। ও একটু এগিয়ে গিয়ে দাদুর মুখের কাছে কান এগিয়ে বলল, “কী খবর?”

“তুমি কিছু জানো না? বোসপাড়া সর্বজনীনের মাঠে তো আজ যাত্রা হবে। নিউ অপেরার ‘সোনাই দিঘি’। আহা, সেই কবে কলেজে পড়তে এই মামাবাড়িতে এসেই শেষবারের মতো যাত্রা দেখেছিলুম। আবার এতদিন বাদে। আমি তো যাবই। তুমি কী করবে? সারারাত জেগে যাত্রা দেখতে পারবে কি? তুমি যা কুম্ভকর্ণ!”

টুবলু পান নিয়ে ফিরে এসেছে। দাদু ওর কাছে চেয়ে নিলেন একটা পান। তারপর পান চিবোতে চিবোতে দিব্যি হাসিমুখে তাকিয়ে রইলেন ওর দিকে।

খুব রাগ হল ওর। এ তো রীতিমতো লেগ-পুলিং। এদিকে কুম্ভকর্ণ শুনে টুবলু আর অমল দুজনেই মিটিমিটি হাসছে। দাদু যেন কী। ওর বাচ্চাদের মতো রাতে না জাগতে পারার কথাটা ওদের সামনে বলার কী ছিল? ও তো ওদের সিনিয়র, নাকি? আসলে ও ঠিকই বুঝেছে। মামাবাড়ির জায়গায় পা রেখেই দাদু আবার আগের মতো ছোটো হয়ে গিয়েছেন। এই দু-দিন রাতে শোওয়া ছাড়া যে ও দাদুর ধারকাছ মাড়ায়নি, অমল আর টুবলুর সঙ্গেই আছে, সেটাতেই হয়তো একটু রাগ হয়েছে। তাই ওইভাবে ওর ঘুমের কথাটা সর্বসমক্ষে ফাঁস করে দিলেন। ঠিক আছে, ও দেখিয়ে দেবে সবাইকে সারারাত জাগা ওর কাছে কিছুই নয়। ও যাত্রা দেখতে যাবে আর পুরোটা দেখেই ফিরবে।

রাতে ঠাকুরের আরতি হয়ে যাবার পর বাড়ির সবাই প্রায় গোল হয়ে বসে ছিল উঠোনের পাতা বেঞ্চে। আজ অমল আরতির সময় ঢাক বাজিয়েছে। বেশ ভালোই বাজাল ছেলেটা। সবাই ওর বাজানোর প্রশংসা করছিল। সে-সময় ওর দাদুর হাতে ছিল কাঁসিটা। আসলে সেদিন রোদ্দুরে বাস-স্ট্যান্ড থেকে হেঁটে হেঁটে এতটা রাস্তা এসে ওর দাদুর শরীরটা একটু খারাপ হয়েছিল। তার জের এখনও চলছে। দুপুরে কাগজি লেবু দিয়ে ঝোল-ভাত খেয়েছেন মানুষটা। অমল তাই অলকদাদুকে বলে আজ ঢাক বাজানোর দায়িত্ব নিয়েছিল। ওর দাদু বলছিলেন অলকদাদুকে, “নাতিটা আমার পড়াশুনা করে মাস্টার হবার স্বপ্ন দেখে। ওই তো জমিজমার অবস্থা। ওর বাবা যা পারে করে। আমার শরীরের জোরও কমে আসছে। কীভাবে ওর ইচ্ছে পূরণ করি বলুন তো?”

দাদু হঠাৎ বলেন কিনা, “ইচ্ছা পূরণ দাদার মতিগতি বোঝা ভার। তিনি যে কখন কোন কথায় তথাস্তু বলে বসবেন, তা তিনিই জানেন।”

বাবুই একটু অবাক হয়েই তাকাল দাদুর দিকে। দাদু আবোলতাবোল কথা বলার লোক নন। হয়তো ওর মতোই অমলকে দাদুরও খুব পছন্দ হয়েছে। তাই অমলের সামনে বললেন কথাটা, যাতে বেচারির উৎসাহ না মরে যায়।

উঠোনের আড্ডাতেই ঠিক হয়েছে দাদু, পুলকদাদু, টুবলু, অমল আর ও নিজে যাবে যাত্রা দেখতে। অলকদাদু আর নতুনদিদার পক্ষে কোনোমতেই যাওয়া সম্ভব নয়। অষ্টমী পুজোর ঝামেলা কম নয়। তার ওপর সন্ধিপুজোর জোগাড় গুছিয়ে রাখতে হবে। নকুলদা খুব বায়না ধরেছিল। তারও যাবার ইচ্ছে। কিন্তু বাড়ি ফাঁকা করে সবাই গেলে কী করে হবে?—বলে বুঝিয়ে, তাকে ঠান্ডা করা হয়েছে।

টুবলুর মুখটা খুশিতে ঝলমল করছে। ও বলছিল, “জানো বাবুইদা, এবারের পুজোটা একদম অন্যরকম লাগছে। এত আনন্দ কোনও বার হয় না। তুমি আর জ্যাঠামশাই কিন্তু প্রতিবার পুজোয় আসবে।”

যাত্রা দেখতে যাবার আগে উঠোনের আড্ডায় দাদু তাঁর ছোটবেলার একটা গল্প বললেন।

তখন দাদুরা খুব ছোটো। মফস্‌সলে একটা ভাড়া বাড়িতে থাকেন বাবা-মা-ভাইবোনেদের সঙ্গে। ওখানে আবার শীতকালে যাত্রা হওয়ার রেওয়াজ ছিল। ভাইবোনেরা সবাই মিলে রামায়ণ যাত্রা দেখতে গিয়েছেন। বিরতির সময় বাইরে বেরিয়ে দেখেন চটের প্যান্ডেলের পেছনে দাঁড়িয়ে সীতা একমনে বিড়ি টানছে। গায়ে জবড়জং গয়না‌, বাহারি শাড়ি, অথচ ওড়নার আড়ালে বিড়ির ধোঁয়া। একেবারে স্বপ্নভঙ্গ! আসলে তখন তো গ্রামে-গঞ্জে মহিলা শিল্পী পাওয়া যেত না। দাড়ি-গোঁফ কামানো ছেলেদের দিয়েই কাজ চালাতে হত।

রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ বাড়ি থেকে ভরপেট খেয়ে, জলের বোতল নিয়ে যাত্রা দেখতে রওনা দেওয়া হল। পথে যেতে যেতে দাদু প্রত্যেকের হাতে একটা করে আলু-চিপসের প্যাকেট দিলেন। মাঝরাতে খিদে পেতেই পারে। হরিপুরে বিজলি বাতি এসে গেলেও আসলে তো একটা গ্রাম। তাই মাঠঘাটের অভাব নেই। পুজো প্যান্ডেলের পাশের একটা মাঠে বড়ো বড়ো চৌকি পেতে যাত্রার স্টেজ বানানো হয়েছে। স্টেজের চারপাশ খোলা, তাই চারদিকেই দর্শকদের চটে বসার ব্যবস্থা। দাদুর সঙ্গে ওরা সবাই গিয়ে স্টেজের একেবারে সামনে বসতেই শুরু হল বাজনা। সে কি জগঝম্প আওয়াজ! কিছুক্ষণ বাজনা বাজার পর একটা কাঁসরের ঘণ্টার আওয়াজ হল।

দাদু চুপিচুপি বললেন, “এরকম আওয়াজ তিনবার হলেই যাত্রা শুরু হবে।”

বাকি দু-বারের আওয়াজ শুনতে পায়নি ও। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিল। দাদুর হাতের এক ধাক্কাতে চোখ খুলে দেখল স্টেজে রাজার পোশাকে একজন দাঁড়িয়ে আছেন। আর একজন গেরুয়া কাপড় পরে তাঁর চারপাশে ঘুরে ঘুরে গান গাইছেন। দাদু বললেন, “ওই গেরুয়াধারী হলেন বিবেক। যাত্রা ছাড়া আর কোথাও তুমি এই চরিত্রের দেখা পাবে না, বুঝলে! এই বিবেকের গানে নানা উপদেশ থাকে।”

পুলকদাদু চুপচাপ বসে ছিলেন দাদুর পাশে। এবার নড়েচড়ে ওঠেন। বলেন, “আপনার কি মনে হয় না সমীরদা, যাত্রার এই বিবেকের ভূমিকাটা সব সিরিয়ালে, নাটকে, সিনেমায় বাধ্যতামূলক করা উচিত?”

“হঠাৎ এরকম আজগুবি প্রস্তাব দেওয়ার মানে?” দাদুর ভ্রূ কুঁচকে যায়।

“মানে খুব সোজা, নাটক দেখা হয় কম। কিন্তু সিরিয়ালে আর সিনেমায় যে কী পরিমাণ হিংসা মানুষের মগজে চালান হচ্ছে তা কোর্টে বসে আমরাই সবচেয়ে বেশি টের পাই। বিবেকের গান কিছুটা ব্যালেন্স করবে।”

দাদু হাসেন।—”কী যে বলো, এত এত মহাপুরুষের বাণী ফেল মেরে গেল, বিবেকের গান সেখানে নস্যি।”

ঘুম-ভাঙা চোখে হাঁ করে দাদুদের কথা গিলছিল বাবুই। তাকিয়ে দেখে দু-পাশে টুবাই, অমল দিব্যি ঘুমোচ্ছে। ওদের জোরে ঠেলা দেয় ও।—”কী রে ওঠ, যাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছে তো।”

চোখ রগড়াতে রগড়াতে উঠে পড়ে ওরা। চোখে জলের ঝাপটা দিয়ে আবার যাত্রার পৃথিবীতে ফিরে আসে দুজনে।

যাত্রা বেশ জমে গিয়েছিল। মাঝে-মাঝেই কোনো-কোনো চরিত্র ‘সোনাই, সোনাই’ করে হাঁক পাড়ছিল এমন, কার সাধ্য ঘুমোয়? তাছাড়া ঘুম পেলেই পটাটো চিপস চিবিয়েছে ওরা। তিনজনের তিনটে প্যাকেট, তাই একটুও কম পড়েনি। পাশে অবশ্য কয়েকজন বুড়ি বালিশ মাথায় চটের বিছানায় ঘুমোচ্ছিল। ডেকে দেব বলে কেউ হয়তো ওদের ঠকিয়েছে।

যাত্রাটায় সবচেয়ে ভালো লেগেছে ওর রাজদরবারে নর্তকীর পাখা হাতে নাচ। রাজা তাকে মাঝে-মাঝে কেন চাবুক মারছিলেন, সেটা একদম বোঝা যায়নি। দুঃখের সিনে তিনজনে ফিসফিস করে গল্প করেছে। তবে বাজে ব্যাপার হয়েছে একটাই। সামনের দিকে বসে গল্প করার সময় একজন অভিনেত্রী ঘোমটার আড়াল থেকেই তাদের বকেছেন—”চুপ, একদম চুপ। আর একটাও কথা বললে বার করে দেব।”

সেই শুনে দাদু কটমট করে তাকিয়েছেন ওদের দিকে।

রাত তিনটেয় ফেরার পর অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিল বাবুই। ঘুম ভাঙল একটা অপরিচিত চিৎকারে।—‘ব্যা, ব্যা।’ ঘরের লাগোয়া বাইরের টানা বারান্দা থেকে উঁকি মারল ও। নীচের পেছন দিককার উঠোনে কে আবার? অচেনা জায়গায় কমলাদিকে দেখতে না পেয়ে ডাকছে কালু। টুবলুর ‘দুধাতো ভাই’। এ-কথাটা তো আর টুবলুকে বলা যাবে না। তাই নিজের মনেই হাসছিল ও।

ঘরে রোদ ঢুকেছে। দাদু নেই। অষ্টমী পুজোর দিন। স্নান সেরে অঞ্জলি দিতে হবে সকাল সকাল। পড়ে পড়ে ঘুমোলে তো আর চলবে না। তাই তখনকার মতো নিজেকে ঝাঁকিয়ে নাড়িয়ে ঠিক করে কলঘরে ঢুকে গেল ও।

***

“বোম ভোলে, বোম বোম ভোলে।”

কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর এই একটাই শব্দ বলছেন সাধু। আর চারপাশে ভিড় করা লোকেরাও বলছে, “বোম ভোলে, বোম বোম ভোলে।”

হরিপুরের বিখ্যাত কালীবাড়ির ঠিক সামনেই ছোটোখাটো শিবমন্দির। মূর্তি তেমন বড়ো না হলেও প্রসিদ্ধি আছে। চড়কের সময় ওই শিবমন্দির ঘিরেই সন্ন্যাসীদের ভিড় হয়। ক’দিন ধরেই হরিপুরের বাতাসে একটা খবর উড়ছে—মন্দিরের চাতালে এক সাধু এসেছেন। তিনি নাকি ত্রিকালজ্ঞ। অর্থাৎ ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান—সব বলতে পারেন। সাধুর কথা লোকের মুখে মুখে। অমল সব শুনে এসে বলেছে ওদের, “একবার সাধুকে দেখে এলে হয় না?”

ক’দিন ধরে সেই সময়টাই বার করা যাচ্ছিল না। অষ্টমীর অঞ্জলি দিয়ে পুজোর প্রসাদ খাওয়া হয়েছে। আরতিও হয়ে গিয়েছে। এখন সন্ধিপুজোর তোড়জোর শুরু হয়েছে। অষ্টমী শেষ হলে যখন নবমী তিথির সূচনা হয় সেই সন্ধিক্ষণে হয় সন্ধিপুজো। এবারে সন্ধিপুজো একটু দেরিতে। প্রায় দুটো বেজে যাবে শুরু হতে হতে। অমলের দাদু এখন মোটামুটি সুস্থ, তাই সকালে তিনিই ঢাক বাজিয়েছেন।

আজ আবার অমলই প্রস্তাব দিল—”এখন বেলায় আমাকে তো আর ঢাক বাজাতে হবে না, দাদু সামলে নেবে বলেছে। সন্ধিপুজোর আগে এলেই হল। বিকেলে আবার আমার কাঁসি বাজানো শুরু হবে। এর মধ্যে চলো না, ঠাকুর দেখার নাম করে আমরা সাধুবাবাকে একটু দেখে আসি।”

সাধুবাবার কথা বাবুই, টুবলু, অমল সবাই শুনেছে। প্রথম খবরটা এনেছিল কমলাদি। কমলাদির কালুর সম্বন্ধে বলা কথাটা দাদু উড়িয়ে দিলেও সেটা তো মিথ্যে হয়নি। নকুলদা বলছিল সাধু নাকি শ্মশানের ডোম নীলুকে বলেছেন, ওর ঘরে যে নাতি আসছে, সে ওদের সবার মুখ উজ্জ্বল করবে।

নীলুর বউমা যে মা হতে চলেছেন সে-কথা কারও জানার কথা নয়। অনেকদিনই সে এখানে নেই। বাপের বাড়িতে বসে আছে। তাছাড়াও কুন্ডুবাড়ির যে বিরাট বৈষয়িক ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, কোনও প্রাণনাশ হবে না—সে-কথাও কুন্ডুগিন্নিকে বলেছিলেন তিনি। ওঁদের মালবোঝাই লরির ব্রিজের রেলিং টপকে দামোদরে পড়ে যাবার খবর তো কাগজেই বেরিয়েছে। অদ্ভুতভাবে আগেই লাফিয়ে পড়ায় ড্রাইভার, ক্লিনারের প্রাণ বেঁচে গিয়েছে।

বাবুই এসবে খুব একটা বিশ্বাসী নয়। তবু ওদের পাল্লায় পড়ে যেতেই হল। রোদ্দুরে অতটা যাওয়া নিয়ে ভাবছিল ওরা। কম দূর নয়। প্রায় এক কিলোমিটার। টুবলু ঝেড়েঝুড়ে বার করল দুটো সাইকেল। একটা ওকে ওর কাকাই দিয়েছিলেন। সেটাতে চেপে ও স্কুলে যায়। অন্যটা অলকদাদুর। উনি তো মোটর সাইকেলে স্টেশন যান। সাইকেলটা না ব্যবহার হয়ে হয়ে একেবারে যা-তা অবস্থা। হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে মনার দোকানে ঠিক করতে হল। ওদের সাইকেলে যাওয়া হবে বলেই বোধহয় পুজোর বাজারেও মনা ঝাঁপ খুলে রেখেছে। খানিকটা সময় লাগলেও একেবারেই ঠিক হয়ে গেল ওটা।

বাবুইর সাইকেলে অমল আর টুবলুর সাইকেলে ও একা—ওভাবেই সাধুর আস্তানায় পৌঁছে গেল ওরা। উনি তখন সামনের দিঘিতে স্নান সারতে গিয়েছেন। স্নান সেরে, শিবপুজো করে তবে ওদের মুখোমুখি হলেন। তার আগেই নিজের মোবাইলে সময় দেখেছে বাবুই। বারোটা বেজে গিয়েছে। একটা ব্যাপারই ভালো হয়েছে, অসময়ে আসা তো, চারপাশে কোনও ভিড় নেই।

সাধুবাবা বাবু হয়ে বসে বাবুইর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এসবে বিশ্বাস নেই তো, আমার কাছে এলি কেন?”

বাবুই আমতা আমতা করে বলে, “এমনি।”

উনি হাসেন।—”তুই ছেলে খাঁটি, তাহলে ভুল কথা বলছিস কেন? আমাকে পরীক্ষা করতে চাস? ঠিক সময়ে  যা বোঝার বুঝে নিস।”

টুবলুর মুখ ভয়ে শুকিয়ে গিয়েছিল বোধহয়। উনি ওর মাথায় হাত রাখলেন। মনে মনে কী যেন বিড়বিড় করে বললেন, “এত ভয় পাস কেন? বিপদ এলে মনে মনে বলবি, ‘একবারই তো মরব, ভয় পাব না’।”

অমলকে দেখতে দেখতে ওঁর দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। গম্ভীর মুখেই তাকালেন ওর দিকে। ফিসফিস করে বললেন, “তিনি আছেন রে। বিশ্বাস রাখিস। হবে। যা চাস হবে।”

ফেরার পথে কথা বলছিল না কেউ। সাধুবাবা ওদের কিছু জিজ্ঞেস করেননি। কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ দেননি। ওই কথাগুলো বলেই উনি উঠে পড়েন। ওরা সাইকেল নিয়ে ফিরতে ফিরতে দেখে উনি জোরে জোরে ‘বোম ভোলে, বোম ভোলে’ বলতে বলতে মা কালীর মন্দিরের সামনের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছেন।

বাবুই ভাবল, কী আশ্চর্য ব্যাপার, উনি ওদের সবাইকে যা বলেছেন, তার মানে একটাই।—‘বিপদ আসছে। ওরা যেন ভয় না পায়।’ ও মনে মনে ভাবছিল জানতে চাইবে—‘কী ভয়, কেন ভয়? ঠিক সময়ের অর্থ কী?’

সাইকেল সিঁড়ির নীচের ঘরে রেখে পুজো দালানে গিয়ে ‘ঝাঁকের কই ঝাঁকে’ মিশে যাবে ভেবেছিল বাবুইরা। সেটি হল না। ঠিক সেই সময়ই স্নান সেরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দাদু দেখে ফেললেন ওদের।—”কী? সাইকেল নিয়ে তিন মক্কেলে গেছিলে কোথায়? বাবুই, বউমা ফোনে তোমাকে পায়নি। আমাকে করে বলল, ‘সুইচড অফ। বাবুই কোথায় গিয়েছে?’ তোমরা কোথায় ঘুরে এলে?”

বাবুইর মুখে কথা নেই। অমল কথাবার্তার ফাঁকেই টুবলুকে নিয়ে হাওয়া হয়ে গিয়েছে। দাদু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে। সত্যি কথা বললে উনি রেগে যাবেন। সাধুতে ওঁর বিশ্বাস নেই। আবার মিথ্যে কথাই-বা ও বলে কী করে? বাঁচিয়ে দিলেন পুলকদাদু।—”তোমরা এখানে? আর আমি সারা বাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছি। পাত পড়ে গিয়েছে, শিগগিরি খাবে চলো। সবাই তোমাদের জন্যই বসে আছে।”

তখনকার মতো বিপদ মিটলেও পরে যে দাদুর জেরার মুখে পড়তে হবেই, সে-কথা বাবুইর থেকে বেশি কেউ জানে না। দুপুরে শুয়ে শুয়ে সেই কথাই ভাবছিল ও। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে। কেউ ডাকেনি। ঘুম ভাঙল যখন, দিনের আলো প্রায় নিভে এসেছে। পর্দা সরিয়ে পেছনের বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই ওর চোখে পড়ল কমলাদির ছাগলের মানে কালুর গলার দড়ি কেউ খোলার চেষ্টা করছে। কালু চেঁচাচ্ছে না। কেননা ওর মুখের সামনে ঘাস বা পাতা কিছু রাখা হয়েছে। আর ও সেটা খেতে ব্যস্ত।

একটাও কথা না বলে দুদ্দাড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে, পেছনের দরজা খুলে দৌড়ে ও কালুর কাছে পৌঁছে যাবার আগেই সে পালাল। দড়ি খুলে হাতে নিয়ে ছেলেটা যেই এগোতে যাবে, বাবুই দূর থেকেই চেঁচিয়ে উঠেছিল—”কে? কে? কী করছ?”

ও কাছাকাছি হবার আগেই দৌড়তে শুরু করেছিল ছেলেটা; আর পেছনের পাঁচিলে উঠে ও-পারে লাফ মেরেছিল। চোরটাকে ধরা গেল না। আর একটু হলেই কালুকে নিয়ে পালাত ও। এদিকে তেমন কেউ আসে না। তাই দিনের আলো থাকাকালীন কালুকে ওখানে বেঁধে রাখা হয়। এবার থেকে আরও সাবধান হতে হবে।

কমলাদি সব শুনে কেমন ঘাবড়ে গেল। কালুকে বেঁধে রাখল উঠোনের এককোণে বাসনমাজার জন্য যেদিকে কল আছে সেখানে। নিজের মনে কী বিড়বিড় করছিল ও।

“তাহলে সত্যিই ওরা…” বাক্যটার বাকিটা ও শুনতে না পেলেও বাক্য পূরণ করে খুব একটা খুশি হতে পারল না। যে-কোনো কারণেই হোক কমলাদি অসুবিধেয় আছে। কিছুটা ঝামেলার হদিস ওরাও পেয়েছে। বাবুইর মনে হল অমল আর টুবলুর সঙ্গে কথা বলা দরকার।

***

পঞ্চমীর দিন আসা হয়েছে। ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী নিয়ে চার-চারটে দিন কোথা দিয়ে যে কেটে গেল। কাল নবমী। তারপরেই দশমীর দিন পুজো শেষ।

অষ্টমীর দিন এদের বাড়িতে ভাত হয় না। দু-বেলাই লুচি খেয়ে রাতে একটু পেট আঁইঢাঁই করছিল ওদের। হাঁটতে হাঁটতে ওরা তিনজন কখন যে পেছন দিকে চলে এসেছে। এদিকেই তো কমলাদির বাড়ি। বাড়িটার দিকে এগোতে যাবে, একটা মোটর বাইকের আওয়াজ শুনে অমল ওদের টেনে নিয়ে গেল আগের দিনের মতো বড়ো ঝোপটার আড়ালে। বাইক এসে থামল কমলাদির বাড়ির সামনে। রোগা রোগা তিনটে ছেলে নামল বাইক থেকে।

অমল ফিসফিস করে বলল, “এই ছেলেগুলো বাইরের। টুবলু কি চেনো এদের?”

টুবলু আরও আস্তে বলল, “দেখেছি।”

“কোথায়?”

“সেই যে মারুতি গাড়িটা, যেটা সার্কাসের ওখানে থাকে, ওটা থেকেই এদের নামতে দেখেছি।”

বাবুই অন্ধকারে মুখগুলো ঠিক দেখতে পাচ্ছিল না। মনে হল যেন একটা ছেলে হুড়মুড়িয়ে জুতো পরেই কমলাদির ঘরে ঢুকে গেল। তারপরেই বেরিয়ে বলল, “আসছে না।”

“বল আমি ডাকছি।”

শেষের লোকটার গলার আওয়াজ পেয়েই বেরিয়ে এল কমলাদি।—”আমাকে ছেড়ে দাও। আমি পারব না। ও আমি পারব না।”

“পারতে তোমাকে হবেই। বিজয়ার দিন নাড়ু-টারু বানিয়ে রেখো, আমরা আসব। সেদিন কোনও না শুনব না। খবর নিয়ে যাব।”

ওরা গাড়ি হাঁকিয়ে বেরিয়ে যেতেই কমলাদি ধপাস করে বসে পড়ল নিজের বাড়ির উঠোনে। কমলাদির পাশে গিয়ে দু-একটা সান্ত্বনার কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল ওদের। সেটা না করেই চোরের মতো ফিরে আসতে হল। পুরো রাস্তাটা না ঘুরে অমলের কথামতো পাঁচিলে উঠে বাগানের মাটিতে ঝাঁপ দিল ওরা। বাড়ির পেছনের দরজা ঠেলে ঢুকে বন্ধ করে দিল।

বাবুইর খুব হাসি পেয়েছিল টুবলুর মুখ দেখে। পাঁচিলে উঠে ঝাঁপ দেওয়ার কথা শুনে ওর মুখ ভয়ে এইটুকু হয়ে যায়। ক্লাস এইটের পড়ুয়া ও, ক্লাস সেভেনের অমলের কাছে মর্যাদা রাখতে না বলতে পারেনি। ওদের দেখে দেখে পাঁচিলে ওঠাটাও শেষ অবধি করে ফেলল।

নবমীর রাতে বরাবরের রেওয়াজমতো এবারেও বাজি ফাটল পুজো বাড়িতে। পায়রা ওড়ানো হল দিনের বেলায়। সব বাজি হাতে বানানো। মেশিনে বানানো নয়। গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে থাকেন গুছাইতরা। বংশপরম্পরায় তাঁদের বাজি বিক্রির ব্যাবসা। বাড়ির ছেলে, মেয়ে, বউ—সবাই বাজি তৈরি করেন। পুলকদাদুর সঙ্গে বাবুই আর টুবলু গাড়ি নিয়ে গিয়েছিল নবমীর সকালে বাজি আনতে। বেচারি অমল হাঁ করে তাকিয়ে ছিল ওদের যাওয়ার দিকে। কিন্তু ওকে নিয়ে যাওয়া গেল না। পুজো শেষ না হলে ও যাবে কী করে? যে-কোনো সময় ঢাক বাজানোর দরকার হবে তো। তবে ওর দাদু বলেছিলেন, “যা ঘুরে আয়। আমি ঠিক সামলে নেব।”

কিন্তু অমল দাদুকে একা ফেলেই হোক বা কর্তব্যে অবহেলা করবে না বলেই হোক, রয়ে গেল।

রীতিমতো বেছেবুছে অনেক টাকার অনেকরকম বাজি কেনা হল। যা বোঝা গেল, পুলকদাদুরা এঁদের বরাবরের খদ্দের। বাড়ির মহিলারা ওদের চমৎকার ঘোল খাওয়ালেন। সবই মনের মতো, শুধু খারাপ লাগছে একটা কারণেই—অমল আসতে পারেনি। ও এলে আরও জমত মজাটা।

আতসবাজিই বেশি কেনা হল। খান পঞ্চাশমতো বোম, রঙবেরঙের দেশলাই, চরকি, ফুলঝুরি, কালিপটকা, লংকা পটকা—সব কেনাকাটির পর সে-সব আবার রোদে দেওয়া। উলটেপালটে তোলা।

ওখান থেকে ফিরে বাজির গোছগাছ করতেই বেলা ফুরিয়ে গেল। তখন অবশ্য অমল ওদের সঙ্গে কাজে হাত লাগিয়েছিল।

সেদিন রাতে বাজি পোড়াতে গিয়ে বাবুইকে অলকদাদু বললেন, “সমীরদা কিন্তু খুব ভালো বাজি বানায়। কখনও দাদুকে তুবড়ি বানাতে দেখেছ?”

বাবুই মাথা নেড়ে বলেছিল, “না।”

ওঁর কাছে কথাটা শুনে ওর খুব মনখারাপ হল। দাদুর সম্বন্ধে সবকিছু তো ওরই আগে জানার কথা। অথচ ও কিছুই জানেই না। ওকে তো দাদু একবার বলতে পারতেন।

সেদিন রাতটা কেটেছিল ভীষণ আনন্দে। রাত আটটার পর পুজো শেষ হলে বাড়ির উঠোনে সবাই জড়ো হল। ঠাকুরের সামনে প্রথমে একটা তুবড়ি জ্বেলে বাজি পোড়ানো শুরু করলেন দাদু। তারপর পেছনের উঠোনে শুরু হল আসল বাজি উৎসব। কতরকমের বাজি যে পোড়ানো হল! একটার পর একটা হাউই ছাড়া হচ্ছে। হুস করে ওপর দিকে উড়ে যাচ্ছে তারা। রঙমশালের আলোয় সব অন্ধকার কেটে যাচ্ছে।

সবচেয়ে ভালো লাগল ওর তারা বাজি। আকাশে দুলতে দুলতে চলেছে এক-একটা তারার মালা। তারপর ওই মালা থেকে খুলে টুপ টুপ করে মাটিতে খসে পড়ছে লকেট। এখানে আকাশ অনেক পরিষ্কার, খোলা—বাড়ি দিয়ে ঢাকা নয়। তাই অনেক দূর অবধি সবটাই খালি চোখে দেখা যায়। বাবুইর মনে হচ্ছিল যেন খসে পড়া তারায় পেছন বাড়ির উঠোন, দিঘি—সব ভরে যাচ্ছে। তুবড়িতে আগুন দিয়ে পেছনে দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছিলেন নতুনদিদা। একবার পড়ে গিয়েই উঠে পড়লেন—সবাই হাসল। তবু বাজি পোড়ানো বন্ধ করলেন না তিনি। ছোটোরা ফুলঝুড়ি, রঙমশাল—যে যা পারছে পোড়াচ্ছে।

আশেপাশের পাড়ার ছেলে, মেয়ে, বউ, বাচ্চা—সবাইকেই বাজি পোড়াতে দেওয়া হয়েছে। অমল এক ফাঁকে এসে বলে গেল, “দাদু এইজন্য আমায় নিয়ে এসেছে জানো। আমাকে বলেছিল, ‘তুই তো তেমন বাজি পোড়াতে পাস না। আমার সঙ্গে চল, বাবুদের বাড়িতে প্রাণভরে বাজি পোড়াবি।’ তা সত্যি! আজ আমি আশ মিটিয়ে সবরকম বাজি পুড়িয়ে নিয়েছি।”

ওর কথা শুনে বাবুইর মনে হল যেন সত্যি সত্যি একটা হাউই ওর বুকের মধ্যে থেকে সোজা অন্ধকার আকাশে উড়ে গিয়ে আলোয় আলো করে দিল।

বাজি পোড়ানোর পরে খাওয়াদাওয়া সেরে আবার গোল হয়ে বসা হল উঠোনে। বাড়ির সব লোকেরা ছাড়াও অমল, ওর দাদু আর নকুলদা যোগ দিল আসরে। রান্নাঘরের ঠাকুররা, বাড়িতে আসা সব আত্মীয়স্বজন, কাজের লোকেরা—সারি বেঁধে উঠোনের চটে বসেছে গল্প শুনতে। দাদু শুরু করলেন এ-বাড়ির পূর্বপুরুষদের কাহিনি। রূপকথার মতো করে বলছিলেন তিনি। এই বাড়ি যিনি তৈরি করেন, মানে দাদুর মামাবাড়ির দাদু তেমন অবস্থাপন্ন ছিলেন না। ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। ব্রাহ্মণ মানুষ, বাড়িতেই কিছু ছেলেমেয়ে পড়াতেন। আর বাকি সময়ে পুজোআর্চা করে সংসার চালাতেন। তাঁর গৃহিণীও ছিলেন সৎ, নির্লোভ। তাঁর ছিল এক ছেলে, এক মেয়ে। একবার সেই অঞ্চলের জমিদার-গিন্নি জগদম্বাদেবী তীর্থ করতে টানা নৌকায় বারানসি যান। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান বিধবা। সে-সময় অবস্থাপন্ন মানুষেরা তীর্থে গেলে অনেক পাড়াপড়শি তাঁদের সঙ্গ ধরতেন। নিখরচায় তাঁদেরও তীর্থদর্শন হত। গঙ্গার বুকে বড়ো নৌকায় লোকলশকর, আত্মীয়স্বজন, আশ্রিতদের নিয়ে তিনি যাত্রা করলেন তীর্থের উদ্দেশ্যে।

ব্রাহ্মণ স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে সংসার চালানোর মতো সবকিছুর জোগাড় করে দিয়ে ওই জমিদার-গিন্নির সঙ্গে তীর্থে গেলেন। তীর্থ থেকে ফেরার সময় পরিকল্পনামাফিক নিঃসন্তান বিধবার সম্পত্তি দখল করার জন্য জ্ঞাতিরা ওই জমিদার-গিন্নিকে রাতের অন্ধকারে নদীতে ঠেলে ফেলে দিল। ব্রাহ্মণ দুর্ভাগ্যবশত সেই দৃশ্যের সাক্ষী হলেন। তিনি নিজের, নিজের পরিবারের কথা না ভেবে জলে ঝাঁপ দিলেন আর জগদম্বাদেবীকে কোনোমতে উদ্ধার করে নৌকায় না ফিরে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলেন। তাঁর গিন্নি সেবাশুশ্রূষা করে তাঁকে সুস্থ করে তুললেন।

জগদম্বাদেবী খুব তেজস্বী আর বুদ্ধিমতী ছিলেন। সুস্থ হয়ে থানায় নালিশ করে তিনি নিজের দুষ্টু আত্মীয়দের শাস্তি দেন। আর প্রাণসংশয় করে তাঁকে বাঁচানোর জন্য ওই ব্রাহ্মণের সঙ্গে, মানে দাদুর দাদুর সঙ্গে তিনি ভাই পাতান। ভাইকে নতুন বাড়ি দান করেন বসবাসের জন্য। সংসার চালানোর জন্য জমিজমা, অর্থ কিছুই দিতে বাকি রাখেননি। যতদিন বেঁচে ছিলেন ভাই, ভাই-বউকে কোনও অভাব বুঝতে দেননি।

গল্প শেষ হলে বাবুই বলে, “এই কি সেই বাড়ি?”

দাদু বলেন, “তা নয় তো কী? তবে তখন লাইট ছিল না। গ্যাসের বাতি জ্বলত অনুষ্ঠানে; অন্যসময় মোমবাতি, হ্যারিকেনের আলো। আর একটা কথা বলি, জমিদার-গিন্নি ওইরকম প্রাণসংকটের পর বেঁচে গিয়ে প্রচুর দানধ্যান করেন। ওই কালীমন্দিরও তাঁর তৈরি। হরিপুরের হাইস্কুল হয়েছে তাঁর বসতবাড়িতে। এছাড়া লাইব্রেরি, অনুষ্ঠান ভবনও তিনি নির্মাণ করে দেন। যোগ্য মাহিনা দিয়ে এইসব কাজের তত্ত্বাবধানের জন্য তিনি আমার দাদুকে নিয়োগ করেন। এমনকি তাঁর মৃত্যুকালে ওই দুটি মানুষ ছাড়া তাঁর পাশে কেউ থাকার অনুমতি পাননি। তাঁরই পরামর্শে আমার দাদু বাড়িতে দুর্গোৎসব শুরু করেন। সেই থেকেই এই পুজো চলছে।”

একটু চুপ করে থেকে দাদু আবার বলেন, “আর একটি দুর্মূল্য জিনিস ওই ভাই-ভাই-বউকে তিনি দিয়ে গেছিলেন। সেটির কথা লোকের মুখে মুখে ফিরত আগে। এখন আর কেউ বলে না। ওটি এই বংশের রক্ষাকবচ। যতদিন এ-বাড়িতে ওটি থাকবে ততদিন এই বংশের কোনও ক্ষতি হবে না। সেটি হল…”

দাদুর কথাটা শেষ হবার আগেই থামিয়ে দিয়ে অলকদাদু বলে ওঠেন, “সমীরদা, আজ এই পর্যন্তই থাক। পরে আবার একদিন বসা যাবে। এগারোটা বাজে। এতদিন ধরে বড্ড ধকল গিয়েছে। চলো এবার সবাই শুতে যাই। কাল আবার দেবী বিসর্জনের তোড়জোড় করতে হবে তো।”

রাতে বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিল বাবুই। ওর জোর কৌতূহল হচ্ছে, দাদুর গল্পের শেষটা অসমাপ্ত থেকে গেল। দুর্মূল্য জিনিসটা কী জানা হল না। দাদু তো এখনও জেগেই আছেন। একবার জিজ্ঞেস করা যেতেই পারে।

দুটো সিঙ্গল খাটে দুজনের শোবার ব্যবস্থা হয়েছে। ও পাশ ফিরল। অন্ধকারেও দেখা যায় দাদুকে। চোখের ওপর হাতচাপা দিয়ে চিত হয়ে শুয়ে আছেন চুপচাপ। বাবুই আস্তে করে ডাকে—”দাদু, তুমি কি জেগে আছ?”

দাদু বলেন, “তোমার প্রশ্নটা আমি বুঝেছি। তবে উত্তর দিতে পারছি না। এ-ব্যাপারে অলকদের আপত্তি আছে বলেই আমার মনে হয়েছে। সময় পালটাচ্ছে। কাজেই আমার বলাটাও ঠিক হবে না। এটুকু বলতে পারি—ওটা যাঁর জিনিস, তিনি চাইলে তুমি ঠিক জানতে পারবে। এবার আমার কথা বুঝেছ আশা করি। এখন ঘুমিয়ে পড়ো।”

বাবুইর বেশ অভিমান হচ্ছিল দাদুর ওপর। বেস্ট ফ্রেন্ড না ছাই! মাঝে মাঝে এমন দূরের মানুষ হয়ে যান—ছোঁয় কার সাধ্যি!

***

দশমীর দিন একটা আলাদা রকমের মনখারাপ হয়। এটা বরাবর দেখে আসছে ও। সকালে উঠেই মনে হয় পুজো শেষ। আবার আসছে বছরের জন্য অপেক্ষা করো।

একা-একাই বাগানের গেট খুলে রাস্তায় সাইকেল নিয়ে ঘুরছিল বাবুই। অন্যমনস্কভাবে কখন যে সাইকেলের মুখ বড়ো দিঘির দিকেই ঘুরিয়েছে, ওদিকেই চলেছে—সে হুঁশ ছিল না। এখানে নদী নেই। তাই ওই দিঘিতেই ঠাকুর বিসর্জন হয়।

দিঘিটা বেশ বড়ো। ও-পাড়টা ভালো করে দেখা যায় না। এক কিলোমিটারের মতো দূরত্ব। কখন যে ও দিঘির ধারে এসে পড়েছে—খেয়াল হল কালীমন্দিরের চুড়ো দেখে। দিঘি থেকে সোজা মুখ করে উঠলেই কালীবাড়ি। আর ডানদিকে একটু হাঁটলেই শিবমন্দির। ও মনে মনে ভেবে নিল, সুযোগ হলে একবার শিবমন্দিরে ওই সাধুবাবার সঙ্গে দেখা করে যাবে। উনি ওদের যে কথাগুলো বলেছেন, তা কেমন ধোঁয়াশার মতো। ওই কথাগুলোর মানে বুঝিয়ে দিতে বলবে ও।

অনেকটা চওড়া বাঁধানো ঘাট। ঘাটে গিয়ে বসতেই নজরে এল দিঘির পাশের মাটিতে কাশফুল ফুটেছে। সারি সারি কাশফুল হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে। কাশফুল দেখে ওর মন অনেকটা ভালো হয়ে গেল। মনে হল, শেষ আবার কী? এর পরেই তো লক্ষ্মীপুজো, তারপরেই কালীপুজো। মজা তো এখনও শেষ হয়ে যায়নি। তবে তার পরেই আবার বার্ষিক পরীক্ষা পুজো এসে যাবে। শেষের পুজোটা অবশ্য মোটেই মজার নয়।

এসব আবোলতাবোল ভাবতে-ভাবতেই ও লক্ষ করল, এই সকালেই অনেকে দিঘিতে স্নানে এসেছে। তারা ফিরে ফিরে দেখছে ওকে। আসলে ওর পোশাক-আশাক, হাবভাবের সঙ্গে এই হরিপুরের মানুষদের অনেক পার্থক্য আছে তো, তাই ওরা কৌতূহলের চোখে দেখে ওকে।

এই দিঘির ঘাট রানিমা বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন। রানিমার নাম মাথায় আসতেই ওর মনে পড়ে গেল দাদুর অসমাপ্ত গল্পের কথা। কাল রাতে রানিমার গল্প বলতে বলতে দাদু থেমে গেলেন। তবে দাদু তো থেমে যাননি, তাঁকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। অলকদাদুর ওই আচরণের অর্থ কী? কারণ একটা ঠিকই আছে। আপাতত যা মনে হচ্ছে, বাইরের লোকেদের উপস্থিতিতে এরকম একটা ব্যাপার নিয়ে আলোচনা হোক চাননি তিনি। তার মানে দাদু ঠিকই বলেছেন—শুধু মানে নয়, দামেও ওটি দুর্মূল্য।

দিঘির ধারে বসে থাকতে-থাকতেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার ওর নজরে এল। যারাই আসছে দিঘিতে, একটা ছোটো বেতের টুকরিতে মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে জলে ভাসিয়ে দিচ্ছে। একজন বুড়ি ঠাকুমা স্নান করে প্রদীপ ভাসিয়ে ওপরে উঠতেই ও কাছে গেল তার।—”আপনি দিনের বেলায় এরকম দিঘির জলে প্রদীপ ভাসালেন কেন বলবেন?”

“নিশ্চয়ই বলব। এ এখানকার প্রাচীন প্রথা বাবা। আসলে এই হরিপুরের প্রধান দেবতা হলেন শ্রীহরি। এখান থেকে এক মাইল গেলে সেই মন্দিরের ধ্বংসস্তূপ দেখতে পাওয়া যায়। শোনা কথা বাবা, কোন ঝড়ে বা কোন বিদেশি সেনার সঙ্গে যুদ্ধু হলে ওই মন্দির ভেঙে পড়ে। কিন্তু দশমীর দিন ওই দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে জলাশয়ে প্রদীপ ভাসানোর প্রথাটি থেকে যায়। আমার শাশুড়ির কাছে শুনে শুনে আমিও শিখেছি। আরও পরের লোকেরা কী করবে জানি না, আমরা পুরোনো লোক বাবা—সবকিছুই মেনে চলি।”

“প্রদীপ ভাসিয়ে কী কোনও মন্ত্র বলেন আপনারা?”

“না বাবা। শুধু বলি ‘শ্রী শ্রী হরি সহায়’। ওতেই যা হবার হয়।”

“আচ্ছা, ওই শ্রীহরি মন্দিরের ধ্বংসস্তূপ দেখতে হলে কীভাবে যাব বলতে পারেন?”

“এই সামনের রাস্তা ধরে সোজা চলে যাও। মাইল খানেক গেলেই দেখবে একটা ভাঙা চুড়ো মাটিতে বসানো। তাতে ফুল-তুলসীপাতা দিয়েছে কেউ। ওটাই ভাঙা মন্দির।”

সাইকেলে যেতে যেতে ওর নজরে এল, শিবমন্দির থেকে কালীবাড়ির দিকে যাচ্ছেন সেদিনের সাধু। বোধহয় শিব পুজো সেরে কালীবাড়িতে পুজো করতে সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন। আজকে ওঁর সঙ্গে কথা বলতে গেলে ভাঙা মন্দির দেখা হবে না। ও সোজা ওইদিকে সাইকেল ঘোরায়।

সাইকেল থামিয়ে ভাঙা মন্দিরের অবস্থা দেখছিল ও। ভাঙা কিছু লাল ইট স্তূপের মতো জড়ো করা আছে। আর কিছুই নেই। প্রাচীন টেরাকোটার কাজ করা মন্দির একটা আছে বাঁশবেড়িয়ায়—হংসেশ্বরী মন্দির। আর একটি আছে আটপুরে। তালিকায় এর নামটাও উঠত যদি এটি আস্ত থাকত। একটুকরো কাজ করা টেরাকোটার ইট তুলে ওর ব্যাগে ঢোকাল ও।

তারপর ইটের স্তূপের ওপর ফুল-তুলসীপাতায় ঢাকা পুজোর স্থানের দিকে প্রণাম করতে এগিয়ে গেল। কাছাকাছি হতে চমকে উঠল। সাধুবাবা ফুল-তুলসী হাতে বিড়বিড় করে মন্ত্র বলে পুজো করছেন। এ কী! উনি কি ভোজবাজি জানেন? এত তাড়াতাড়ি এতখানি পথ কী করে পেরিয়ে এলেন?

অবাক লাগলেও ওখানে আর দাঁড়ায়নি ও। কাউকে কিছু না বলে বেরোনোর জন্য বকুনি তো আছেই, এবার আর দেরি করলে দাদু ভীষণ রেগে যাবেন। তাই সাধুবাবার পেছন ফেরার অপেক্ষা না করেই পালিয়ে এসেছে।

গেটের কাছের রকে বসে ছিল টুবাই। ওকে সাইকেল ঢোকাতে দেখে সাড়াশব্দ না দিয়ে উঠে গেল। গিয়ে দাঁড়াল ভেতর বাড়িতে অমলের পাশে। দুজনের কারও মুখেই কথা নেই। যেন ওকে দেখতেই পাচ্ছে না।

বাবুই ওদের আর তাকিয়ে দেখল না। বেলা হয়েছে। তাড়াতাড়ি স্নান না সারলে অনেক কথা শুনতে হবে। বুঝেছে ও, না বলে ওর একা বেরিয়ে যাবার জন্য টুবাইদের অভিমান হয়েছে। তবে ও নিশ্চিত জানে,  আজকের ভ্রমণ কাহিনির সবটা জানলে ওরা আর ওর ওপর রাগ করে থাকতে পারবে না।

***

বিকেলে ঠাকুর বিসর্জন। তার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ওই দিঘির ধারে নিয়ে যাওয়া হবে ঠাকুরকে। তার জন্য ছোটো একটা লরি এসেছে। লরিতে ঠাকুর ছাড়াও বাড়ির মহিলারা যাবেন। এছাড়া বয়স্ক মানুষও কেউ কেউ হয়তো গাড়িতে উঠবেন।

ঠাকুরের বরণের সময় টুবলু এসে কানে কানে বলল, “একটা গোলমাল হয়েছে। কমলাদির ছাগলটাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”

“সে আবার কী? ছাগলটা তো এখানেই বাঁধা থাকত। উঠোনে, ওই কলতলার ধারে।” বাবুই হাঁ করে তাকিয়ে থাকে।

“আর বোলো না, আজ সকালে পুজোর বাসন সব মাজাঘষা করার সময় ও বার বার এসে সবকিছুতে মুখ দিচ্ছিল। তখন ওকে বাইরে বাঁধা হয়। তারপরে আর কারও খেয়াল নেই। একটু বেলায় কমলাদি ছাগলের জন্য কাঁঠাল পাতা নিয়ে এসে দেখে ছাগলটা নেই। আমি আর কাকাই কত খুঁজলাম, কোথাও পেলাম না।”

“কমলাদি কী করছে?”

“আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে হাল ছেড়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছে। আমি খোঁজ নিতে একবার গেছিলাম, দেখলাম খুব কান্নাকাটি করছে। আমাকে বলল, কালুকে ওরা মেরে ফেলবে। ওকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।”

“ওরা মানে কারা? জানতে চেয়েছিস?”

টুবলু মাথা নাড়ে—”না। আমার কেমন ভয় করল।”

“ভয় পাওয়ার আছেটা কী? সবেতেই ভয়! সাধুবাবার কথা এর মধ্যেই ভুলে গেলি? ঠিক আছে, আমি বলব। এখন বরণের ওখানে যাই। এক্ষুনি দাদু হয়তো খোঁজ করবেন।”

পুজো-দালানে ভালোরকম ভিড় হয়েছে। ও ক্যামেরা নিয়ে ঠেলেঠুলে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বরণ করলেন নতুনদিদা। সঙ্গে পাড়াপ্রতিবেশী আরও ছ’জন মহিলা। মোট সাতজনে মিলে মা দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতীকে সিঁদুর পরিয়ে, কার্তিক, গণেশ সমেত সবার মুখে সন্দেশ, পান গুঁজে দিয়ে আসছে বছর আবার আসার জন্য কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে মিনতি জানালেন।

এত কিছু কবে আর মন দিয়ে দেখেছে ও। বিশেষ করে সিঁদুর খেলার সময় যেভাবে নতুনদিদারা ছোটাছুটি করছিল, খুব মজা লেগেছে ওর। ক্যামেরা নিয়ে ক’দিন ধরেই ছবি তুলছে, তবে ওই সিঁদুর খেলার ছবিই সবচেয়ে ভালো হবে মনে হচ্ছে। তবে সবকিছুর মধ্যে মাঝে-মাঝেই কমলাদির মুখ মনে পড়ছিল। এত লোক এল, ও বেচারি কালুর শোকে নির্ঘাত ঘরে বসে আছে।

অমল ওর দাদুর সঙ্গে ঢাক বাজানো নিয়ে ব্যস্ত। ওর কানে কথাটা যায়নি। কেননা কালুকে মাঝে-মাঝেই ওকে আদর করতে দেখেছে বাবুই। কালুর গলায় ও হাত বুলোচ্ছে আর কালু ব্যা ব্যা করে জানান দিচ্ছে। একদিন জানতেও চেয়েছিল—”কী ব্যাপার, কালুর সঙ্গে কি স্পেশাল ফ্রেন্ডশিপ হল?”

uponyasharipureharbola (4)

“না না।” লজ্জা পেয়ে বলেছিল অমল।—”আসলে আমাদের গ্রামে একজন বুড়ি ঠাকুমা আছেন। তাঁর অনেকগুলো ছাগল আর গোরু। বুড়ির নাতি শহরে গেলে আমাকে সে-ক’দিন ওই গোরু-ছাগলগুলোকে চরিয়ে দিতে হয়।”

“এসব করে তুই স্কুল যাস কখন?” বাবুই বিরক্ত হয়েই বলেছিল।

“ও ঠিক হয়ে যায়। ছাগল, গোরুদের ভাষা আমি বুঝতে পারি জানো?”

“যতসব আজগুবি কথা।” বলে ওকে সেদিন থামিয়ে দিয়েছিল ও। আজ ওর মনে হচ্ছে কালুকে খুঁজে বার করার কাজে অমলের সাহায্য অবশ্যই লাগবে। তবে এক্ষুনি ওই ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামানো যাবে না। খাওয়াদাওয়া করে ঠিক চারটে নাগাদ ঠাকুর বিসর্জন দিতে যেতে হবে।

খাওয়ার সময় সব জানাজানি হয়ে গেল। নতুনদিদা কমলাদির খোঁজ করছিলেন। এই ক’দিন কমলাদি দু-বেলা পুজো-বাড়িতেই খাচ্ছে। খাওয়ার সময় আসেনি দেখে নকুলদাকে বলছিলেন, “নকুল যাও তো, কমলাকে ডেকে আনো। বরণের সময় দেখলাম না। এখন খাওয়ার সময় এল না। শরীর খারাপ হল না তো?”

নকুলদা আমতা আমতা করে বলল, “আপনার মনখারাপ হয়ে যাবে বলে বলিনি, কালুকে আজ সকাল থেকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কমলা খুব কান্নাকাটি করছে।”

শুনে নতুনদিদা খুব রেগে গেলেন।—”ছিঃ ছিঃ, তোমাদের এই বুদ্ধি? আমাকেই বললে না? কালুকে ঠিক পাওয়া যাবে। কমলাকে গিয়ে বলো আমি ডেকেছি, এসে যেন খেয়ে যায়। না এলে আমাকেই ভাতের থালা নিয়ে ওর বাড়ি যেতে হবে। সকাল থেকে কিছুই মুখে দেয়নি হয়তো। পুজো-বাড়িতে একটা লোক এভাবে অভুক্ত থাকলে মা কি আমায় ক্ষমা করবেন?”

শেষ অবধি কমলাদি এল। চোখ-মুখ কেঁদে কেঁদে ফুলে গিয়েছে। নতুনদিদা জোর করে খেতে বসালেন ওঁকে। জোর দিয়ে বললেন, “এখনও ঠাকুর বাড়িতে আছেন। আমি বলছি কালুকে মা ঠিক ফিরিয়ে দেবেন।”

মুখ গোঁজ হয়েছিল আর একজনের। সে অমল। খাওয়ার সময় বাবুই, অমল আর টুবাই পাশাপাশি বসে। অমল কোনোরকমে খেয়ে উঠে গেল। ওর কানেও কালুর নিরুদ্দেশের খবর পৌঁছেছে নির্ঘাত। বিকেলে বিসর্জনে যাওয়া আছে। বাবুই খেয়ে উঠে আর দাঁড়ায়নি। সারা সকাল টো টো করেছে। শরীর টানছে। বেশি বাড়াবাড়ি করলে হয়তো বিসর্জনেই মজা করতে পারবে না। ঘরে এসে ও থমকে গেল। দেখল দাদু মন দিয়ে ফোন করছেন। কী ব্যাপার, কে ফোন করেছে?

বাবুই নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল চুপচাপ। একটু বাদেই ফোন রেখে দাদু ওর বিছানায় এসে বসলেন।—”একটা কাণ্ড হয়েছে। তোমার মেসোর হঠাৎ শরীর খারাপ হওয়ায় তোমার বাবা, মা টিকিট ক্যান্সেল করে আরও এক সপ্তাহ ব্যাঙ্গালোরে থেকে আসছেন।”

শোওয়া থেকে সোজা উঠে বসে ও।—”তাহলে দাদু…”

“হ্যাঁ রে, কথা বলেছি। আমরা আরও এক সপ্তাহ পিছিয়ে বাড়ি ফিরব। কী, খুশি?”

দাদু যে কী করে ওর মনের কথা বুঝতে পারেন! ও তো থাকতেই চাইছিল।

***

এখন অনেক রাত। একটা তো হবেই। বাবুই বিছানায় উঠে বসে মোবাইলে দেখল ঠিক একটা বাজে। দাদুকে দেখে ও বুঝল, দাদু ভালোরকম ঘুমিয়ে পড়েছেন। ঠিক তখনই নীচের দালানের ঘড়িতে ঢং করে একটা বাজল। না, ওই আওয়াজের পরও দাদুর নড়াচড়া নেই। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল ও। টুবাই আর অমল এসে দাঁড়িয়ে আছে।

আসলে বিকেলে ঠাকুর বিসর্জন দিতে গিয়েও ওরা কালুকে কী করে খুঁজে পাবে সেই চিন্তায় মগ্ন হয়ে ছিল। অমলকে বিসর্জনের সময় সারাক্ষণ ওর দাদুর সঙ্গে কাঁসি বাজাতে হয়েছে। ও জলে নামতে পারেনি। বাড়িতে কাঠামো আনা অবধি ঢাক বেজেছে।

ওরা অবশ্য সুযোগ ছাড়েনি। ঠাকুর জলে পড়তেই ওরাও দিঘিতে ঝাঁপ দিয়েছিল। অজুহাত ছিল কাঠামো তুলে আনা। ওই বড়ো দিঘিতে ঝাঁপানোর জন্য আজই বকুনি খেয়েছে দুজনে। আবার রাতে বেরোনোর কথা জানাজানি হলে ডবল বকুনি জুটবে কপালে। কিন্তু কী আর করা যায়—বড়োরা কবে সব ভালো কাজে উৎসাহ দিয়েছে! ওরা না এগোলে কালুকে খুঁজবে কে?

দাদু অবশ্য ওদের বকতে-বকতেই পাশের এক বৃদ্ধ ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে নীচু গলায় বলছিলেন, “এসব কমবয়সে আমরাও করেছি। এরা ভেবেই এসেছে জলে নামবে। যতই বাধা দেওয়া হোক না কেন ওরা জলে নামবেই।”

দিঘির জলে বিকেলে সাঁতার কাটার সময় গা শিরশির করলেও এতটাই ভালো লেগেছিল যে দাদুর বকুনি গায়ে লাগেনি।

দিঘিটা কম দূর নয়। এতটা রাস্তা। মেয়েদের তাই লরিতেই বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দাদু কিছুতেই লরির ছাদে উঠবেন না। হেঁটে যাবেন। পারেন কখনও? শুরুতে ওদের সঙ্গে একটু হেঁটে, শেষে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে চললেন। ওরা ঠাকুরের বিসর্জনের শোভাযাত্রায় যেতে-যেতেও কালুর সন্ধানে এদিক ওদিক দেখেছে। শেষে অমলই বলল, “দুই আর দুইয়ে চারই হয়। আমার মনে হয় গাড়ি থেকে যাদের তোমরা নামতে দেখেছিলে তারা আর যারা মোটরবাইকে করে কমলাদিকে হুমকি দিতে এসেছিল তারা যদি একই দলের হয়, কালুকে সার্কাসের তাঁবুতেই পাওয়া যাবে।”

তাই এই রাতের অভিযান। দিনের বেলা বলে-কয়ে এসব হয় না। সার্কাসের তাঁবু অনেক দূরে। ওরা সাইকেল নিয়েই যাবে। সেইমতো দুপুরেই সাইকেল দুটোর মুখ ব্যবস্থা করে রাস্তার দিকে ঘুরিয়ে রাখা হয়েছে। যাতে সময়মতো ওরা চট করে বেরিয়ে পড়তে পারে।

চড়কের মেলা থেকে আনা কয়েকটা মুখোশ ছিল তিনতলার চিলেকোঠায়। রাম, লক্ষ্মণ আর হনুমানের সেই তিনটে মুখোশ কাজে লেগে গেল। মুখোশ পরে বাবুই সাজবে রাম, টুবলু লক্ষ্মণ আর অমল হবে হনুমান। মাথায় গামছা দিয়ে পাগড়ি বেঁধে তিনজনের জন্য তিন-তিনটে লাঠি নিয়ে ওরা রওনা দিল। মুখোশগুলো গলায় ঝুলছে। ওখানে পৌঁছবার পর পরলেই হবে।

uponyasharipureharbola (3)

এসব ব্যবস্থাপনা টুবলুর। পরিকল্পনায় তিনজনে অংশ নিলেও এরকম সুচারুভাবে ব্যবস্থা ওরা করতে পারত না। অমল তো সারাদিন ঢাকের সঙ্গেই ছিল আর বাবুইর এটা বাড়ি নয়। তবে গামছা দিয়ে পাগড়ি বানিয়েছে অমল। মাথায় আঘাত করলেও কিছুটা মাথা বাঁচবে, আর ছদ্মবেশে মুখোশের সঙ্গে পাগড়ি যাবে ভালো। লাঠি সঙ্গে আছে আত্মরক্ষার জন্য। এই ক’দিনে টুবলুর অনেক উন্নতি হয়েছে। সাহস বেড়েছে। রাতের অভিযানে ওর উৎসাহ ছিল সবচেয়ে বেশি।

অমলের মন তেমন ভালো নেই। দিঘির ঘাটে ঢাক বাজাতে বাজাতে ওর দাদুর পা পেছল সিঁড়িতে স্লিপ করে। তখন সেরকম না হলেও যত সময় যাচ্ছে ফুলছে পা। ব্যথাও বাড়ছে। পুলকদাদু দেখেশুনে যন্ত্রণা কমানোর ওষুধ আর ঘুমের বড়ি দিয়েছিলেন। দাদু এখন ঘুমোচ্ছেন আরাম করে। কাল পুলকদাদুই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন। এমনকি খাওয়ার সময়েও ওর দাদু আসতে পারেননি বলে অমল ওঁর খাবার ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। খেতে বসে অমল বলছিল, “বাবুইদা, খুব ভয় লাগছে। দাদুর পা ভাঙেনি তো? ভাঙা পা নিয়ে দাদু বাড়ি ফিরবে কী করে?”

টুবলু সঙ্গে সঙ্গে বলল, “কাকাই যখন দায়িত্ব নিয়েছে, কোনও কিছু নিয়েই ভেবো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”

রাতে সদর দরজা দিয়ে বের হওয়া খুব চাপের। অনেকগুলো চাবি-তালা খুলতে হয়। তাছাড়া নকুলদার কাশির ঝোঁক উঠলে ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনের দিকে আসে। সোজাসুজি সদরের রাস্তা। ওরা চট করে চোখে পড়ে যাবে। তাই পেছনের খিড়কির দরজায় যাওয়া ভালো। ওদিকের তালার চাবি বারান্দার একটা হুকে ঝোলে। বাড়ি থেকে বেরোবার সময় তালা খুলে, ওই দরজায় বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেবে ওরা। কিছু বোঝা যাবে না।

ক’দিন ধরে যা হুজ্জুতি গিয়েছে, বাড়িসুদ্ধু লোক ক্লান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে। ফাঁকা পুজো-দালানে একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে ছেলেমেয়ে সমেত কৈলাসে ফিরে গিয়েছেন মা দুর্গা। ওরা কোনও আওয়াজ না করে খিড়কি দিয়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে এগিয়ে চলল। একদম ফাঁকা রাস্তা। বেশ কিছুটা দূর অন্তর একটা করে টিমটিমে আলোর পুরোনো আমলের লাইট পোস্ট। তাই অন্ধকার পিছু ছাড়ছে না। একটু এগোতেই পাড়ার কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এল। একটা সাইকেলে অমলকে নিয়ে বাবুই, অন্যটায় টুবলু একা চালাচ্ছে। টুবলু ভয় পেয়ে ওদের কাছে চলে আসতেই অমল মুখে হাতচাপা দিয়ে একটা অদ্ভুত আওয়াজ করল। ঠিক মনে হল একটা বাচ্চা কুকুর তার মার কাছে ‘কেঁউ কেঁউ’ করে আদর কাড়াচ্ছে।

কুকুরগুলো কেমন থতিয়ে গিয়ে পিছু হঠল। তারপর আস্তে আস্তে চলে গেল। টুবলু উত্তেজিত গলায় অমলকে জিজ্ঞেস করল, “বুঝেছি, শুধু হরবোলা নোস, তুই জীবজন্তুরও ভাষা জানিস। তাই না রে?”

অমল চুপচাপ। বাবুই বলল, “এত বড়ো প্রমাণের পর এই প্রশ্নের মানে কী?”

অনেক দূরই যেতে হবে। পথে বড়ো দিঘি পড়ল। নিঝুম হয়ে আছে দিঘির চারপাশ। কে বলবে সন্ধে অবধি ওখানে বিসর্জনের ঢাক বেজেছে; লোকে লোকারণ্য হয়ে তিলধারণের জায়গা ছিল না? ও-পাশে কালী মন্দিরের চুড়ো দেখা যায়। এ-পাশে শিবঠাকুরের মন্দির ঝুপসি অন্ধকারে গা মিশিয়ে, দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। সারা রাস্তা ফাঁকা। কোথাও কোনও আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। গ্রামে এরকমই হয়। শহরের মতো বেশি রাত অবধি জাগা আর সকালে বেলা করে ওঠার অভ্যেস—গ্রামের খুব কম লোকের থাকে। একভাবে যেতে-যেতেই সার্কাসের তাঁবুর চেহারাটা হঠাৎ অন্ধকারে ফুটে উঠল। বিশাল বড়ো না হলেও নেহাত ছোটো নয়।

ওরা সাইকেল দাঁড় করিয়ে মুখোশ পরে নিল। বাবুই মনে মনে বলল, শুরু হল যুদ্ধ। সহজে থামবে বলে মনে হচ্ছে না।

বেশ কিছুক্ষণ ওরা কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল। না, কেউ তাঁবুর চারপাশে পাহারায় নেই। তারপর সাইকেল ঘুরিয়ে তাঁবুর পেছন দিকে চলে গেল। তাঁবুর অন্যদিকটায় জোর না-হলেও মোটামুটি ঠিকঠাক পাওয়ারের একটা আলো কেউ জ্বালিয়ে রেখেছে। সামনের দিকে জ্বলছে সাদা দিনের আলোর মতো একটা বড়ো আলো। সাইকেল দুটো অন্ধকারে গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে রেখে দিল ওরা। তারপর প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে, নিজেদের সাদা আলোর বৃত্তের বাইরে রেখে, তাঁবুর চারপাশের চটের কাপড়ে গা ঘেঁষে, মাথা নামিয়ে চলল। যে-কোনো মুহূর্তে ধরা পড়লে মার খাওয়া কেউ আটকাতে পারবে না। প্রাণসংশয়ও হতে পারে। অমল মাঝে মাঝে মাথা তুলে কীসের যেন গন্ধ শুঁকছে। হঠাৎ এক জায়গায় এসে থামল। তারপর আবার হাত মুখে দিয়ে মিহি একটা আওয়াজ করল। তাঁবুর ভেতর থেকে যেন সেই আওয়াজের প্রতিধ্বনি ভেসে এল। ওদের অপেক্ষা করতে বলে, ওরা কিছু ভাবার আগেই সেই বিশেষ জায়গার তাঁবুর কাপড় তুলে অমল ঢুকে গেল ভেতরে।

এক-একটা সেকেন্ড, মিনিট যেন ঘণ্টার মতো কাটছে। ও ভেতরে ঢুকতে বলেনি বলে ঢোকাও যাচ্ছে না।

অসহ্য অবস্থার অবসান হল। অমল কিছু একটা বুকে জড়িয়ে নিয়ে ফিরে এল বাইরে। তারপর তিনজনে দ্রুত তাঁবু থেকে বেরিয়ে সাইকেলে উঠল। এবারে একটু ধাতস্থ হল ওরা। কালু ছোট্ট ছাগলছানা। তবে চিন্তা একটাই, চোরের ওপর বাটপাড়ি করে অমল কালুকেই এনেছে তো?

অমল কালুকে নিয়ে উঠেছিল বাবুইর সাইকেলে। সারা রাস্তা অমল, টুবলু আর বাবুইর সঙ্গে একটা কথাও বলেনি। ওই কালুর গায়ে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে কীসব বকছিল। স্বরটা আদরের হলেও শব্দগুলো উদ্ধারের আশায় টুবলু আর বাবুই কান পেতে ছিল। ছাগলের ভাষা কি সহজে উদ্ধার করা যায়? টুবলুর মতো যারা ছাগলের দুধ খেয়ে বড়ো হয়েছে, তারাও পারে না।

এমনিতে বলে—‘পাগলে কী না বলে, ছাগলে কী না খায়।’ অমলের সঙ্গে কালুর কথোপকথন চলাকালিন বাবুইর মনে হয়েছিল বিশেষ কায়দায় করা একই জামার দুটো দিক পরার মতো এই প্রবাদটা উলটে দিলেও, মানে ‘ছাগলে কী না বলে, পাগলে কী না খায়’ কথাটাও এবার দিব্যি ব্যবহার করা যাবে।

ওরা আবার পেছনের দরজার তালা খুলে বাড়িতে ঢুকে পড়ল। কেউ কিছু টের পেল না। সবাই অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ফেরার সময় কুকুরগুলো চুপ করে রাস্তায় বসে ছিল। একটুও তেড়ে আসেনি।

অমল কালুকে বাঁধল নিজের ঘরের সামনের দালানে। কাল কেউ ওঠার আগেই যার জিনিস তাকে ফিরিয়ে দিয়ে আসবে ও। শুধু কমলাদিকে বলে দিতে হবে, ওরা যে কালুকে খুঁজে এনেছে, সে-কথা কাউকে যেন না বলে। আর কালু এবার থেকে টুবলুদের বাড়িতেই থাকবে। না-হলে এবার তার সত্যি সত্যি প্রাণসংশয় হবে।

সাইকেল যথাস্থানে রেখে মুখোশ চিলেকোঠার ঘরে লাঠি সমেত গুছিয়ে তুলে, বাবুই হাত-পা ধুয়ে শুতে এল নিজের ঘরে। বালিশে ও মাথা রাখার পর-পরই উঠে বাথরুম গেলেন দাদু। নিজের বিছানায় চুপ করে শুয়ে ছিল বাবুই। আর একটু হলেই ধরা পড়ে যেত ভেবে বুক ঢিবঢিব করছিল ওর।

দাদু বাথরুমের দরজা দিয়ে, জল খেয়ে, বিছানায় শুতে যাবার আগে বললেন, “কাজ হল?”

ঘাবড়ে গিয়ে উত্তর দিতে পারছিল না বাবুই।

দাদু আবার বললেন, “কী হল, তোমাকেই বলছি তো—কাজ হল?”

বাবুই কোনোমতে বলে, “হ্যাঁ।”

দাদু শুতে শুতে নিজের মনেই হাই তুলতে তুলতে বলেন, “উহ্‌, কী দুশ্চিন্তায় ফেলেছিলে! তাছাড়া, বয়স তো কম হল না। এই বয়সে এতক্ষণ জেগে থাকা পোষায়?”

কাকাই সেদিন রাতেই টুবলুকে একটা বিশেষণ উপহার দিয়েছেন। সেটি হল, ‘বীরপুরুষ’। বলেছেন, “ভাবছি বউদিকে বলে তোমাকে সমীরদার বাড়ি কলকাতায় পাঠিয়ে দেব। এই ক’দিনেই তোমার অনেক উন্নতি হয়েছে। সেই আলুভাতে মার্কা ভাবটা একেবারে গিয়েছে।”

আসলে টুবলুর নিজস্ব একটা ঘর আছে। সেখানেই ও পড়ে। রাতে একা শোয়। কিন্তু এবারে বাবুই আর দাদু আসায় কাকাইর ঘর ওদের ছেড়ে দিতে হয়েছে। অন্য ঘর থাকলেও তেমন সাজানো নয় বলে সে-ঘরে ওদের রাখা হয়নি। কাকাই ঘুমিয়ে পড়লে নাক ডাকে। সেদিনও ডাকছিল। ওদের সঙ্গে যাবার জন্য টুবলু তখন মরিয়া। মোবাইলে অ্যালার্ম বাজিয়ে একটার পর নীচে এসেছিল ও। ফিরে দেখল ওর বিছানায় কাকাই জুত করে শুয়ে, ওরই অপেক্ষা করছে।

কাউকে না বলে দেবার শর্তে কাকাইকে অভিযানের সব বিবরণ জানিয়েছিল টুবলু। আর সাফল্যের গল্প শুনিয়ে টুবলুর ওই উপাধি লাভ।

কাকাই অবশ্য বলেছে ওকে, একেবারে কাউকে কিছু না জানিয়ে এরকম অ্যাডভেঞ্চারে যাওয়া ওদের একদম উচিত হয়নি। লোকগুলো যে খারাপ সে তো বোঝাই গিয়েছিল। কোনোভাবে ওদের আটক করে যদি ক্ষতি করে দিত—খুব মুশকিল হত। তাছাড়া বড়ো বড়ো গোয়েন্দারাও শত্রুপক্ষের গুহায় ঢোকার আগে থানায় জানিয়ে রাখে।

দাদুকে কিছুই বলেনি বাবুই। ঘুম থেকে ওঠার পর উনি খালি বলেছিলেন, “তোমাকে আমি বিশ্বাস করি। এমন কিছু কোরো না যাতে তোমার বাবা-মার সামনে আমাকে লজ্জা পেতে হয়।”

***

বিজয়ার দিন সন্ধেবেলা ওরা দুজনে পাঞ্জাবি-ধুতি পরে অমলের ঘরে গিয়েছিল ওকে ডাকতে। কিন্তু অমল চুপ করে বসে ছিল ওর দাদুর বিছানার পাশে। ব্যথার ওষুধ কাকাই দিলেও ব্যথা আছে ভালোমতো। আর তার তাড়সে দাদুর জ্বর এসেছে। মুশকিল একটাই, বিজয়ার দিন ডাক্তাররা চেম্বার বন্ধ রাখেন। তাই ওর দাদুকে ডাক্তার দেখানো সম্ভব হয়নি।

অনেক সাধ্যসাধনাতেও অসুস্থ দাদুকে ফেলে অমল ঘর থেকে বার হল না। শেষে নতুনদিদা নিজে নকুলদার হাত দিয়ে ওদের অনেকগুলো করে নাড়ু আর ঘুগনি, নিমকি পাঠিয়ে দিলেন।

বাবুইর সামনেই দাদুকে পুলকদাদু বলছিলেন, “কাল যুধিষ্ঠিরদাকে ডাক্তার দেখিয়ে ভেবেছি এখানেই সপ্তাখানেক রেখে দেব। একটু রেস্ট হবে।”

দাদু বললেন, “একদম ঠিক ভেবেছ। যা মনে হচ্ছে, বড়ো কিছুই হয়েছে। তাছাড়া পায়ে প্লাস্টার লাগিয়ে তক্ষুনি মুভ করা ঠিক নয়। সে যতই তুমি গাড়িতে নিয়ে যাও।”

যদিও পা ভাঙার জন্য এইসব সিদ্ধান্ত, তবু বাবুইর খুব আনন্দ হয়েছিল কথাটা শুনে। ওদের মতোই অমলও আরও সপ্তাখানেক এখানেই থাকবে ওর দাদুকে নিয়ে। তবে কথাটা ও টুবলুকে বলেনি। যদি যুধিষ্ঠিরদাদু থাকতে না চান, অমল হাজার চাইলেও থাকতে পারবে না। তখন টুবলুর মনখারাপ হয়ে যাবে।

কমলাদির কান্নাকাটি কালু ফিরে আসায় থেমেছে। সকলে কালুর কথা জানতে চাওয়ায় সবাইকে কমলাদি জানিয়েছে—”পেছনের বনে আটকা পড়েছিল কালু। লতাপাতায় আটকে ছিল। গলায় দড়ি ঝুলছিল। হয়তো সকালে দড়ি খুলে কোন দুষ্টু ছেলে ওকে রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছিল। গলার আওয়াজ পেয়ে আমি ওকে ওই বন থেকে উদ্ধার করি। এখন থেকে ও এই বাড়িতেই থাকবে। আমাকে গিন্নিমা বলে দিয়েছেন।”

সব দেখেশুনে নতুনদিদা যখন বলছিলেন, “বলেছিলাম না মা দুর্গা সব ফেরত দেবেন,” দাদু অমনি নিজের মনেই বলে উঠলেন, “তা বটে, মায়ের চ্যালা-চামুণ্ডা তো কম নয়।”

তবে কালুর উদ্ধারের জন্য মা দুর্গা যে কিছু কলকাঠি নাড়ছিলেন, তা প্রথম থেকেই বোঝা গেছিল। বিজয়ার পরে সবাই যখন কোলাকুলি করতে ব্যস্ত, তখনই অমল ঘর থেকে বেরিয়ে ওদের ডেকে বাগানে নিয়ে যায়। বলে, “একটা দিনও দেরি করা যাবে না। সামনে কালীপুজো আসছে। সবাই বলি দেবার জন্য ওরকম ছোট্ট পাঁঠা খোঁজে। তাছাড়া কালুকে লুকানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হল ওকে খেয়ে পেটে চালান করা। তাহলে ওর আর কোনও হদিসই পাওয়া যাবে না।”

কথাটা শুনে টুবলু ভয় পেয়ে ‘ওয়াক’ করে ওঠে। বাবুই ওর দিকে তাকাতেই নিজেকে সামলে নেয়।

ক্লাসের দিক থেকে দেখতে গেলে ছোটো হলে কী হবে, অমলের অভিজ্ঞতা আর বুদ্ধির ধার অনেক বেশি। বয়সে ও যদি টুবলুর মতো হয়ও, বাস্তব বুদ্ধিতে ও টুবলুকে অনায়াসে হারিয়ে দেবে। ওর যুক্তি অগ্রাহ্য করা গেল না। তাই বাবুই তখনই জানতে চায়—”তাহলে কী করব আমরা? কালুকে তো ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না।” অমল বলেছিল, “আমি যা ভাবার ভেবে ফেলেছি। আজ রাতে তোমরা যাও বা না যাও, আমি ওই সার্কাসের তাঁবুতে ঢুঁ মারব। আমার মন বলছে, ওকে ওখানেই পাওয়া যাবে। না-হলেও তাঁবুর ভেতরটা তো দেখে আসা হবে। যে বদ লোকগুলো ওখানে আছে, তারা কিছু না কিছু শয়তানি ওখানে করছেই।”

“আমরা যাব না কেন?” বাবুই অবাক হয়ে বলে।

টুবলুও প্রতিবাদ করে ওঠে—”ওরকম বিপদের মধ্যে একা তোকে ছেড়ে দেব? তুই ভাবলি কী করে?”

অমল হাসে। বড়ো ম্লান সে হাসি।—”তোমাদের বাড়িগুলোর সঙ্গে আমাদের যে অনেক তফাত। আমি দাদুকে না বলেই বের হতে পারি। কিন্তু তোমরা কাউকে না বলে গেলে কত বকুনি খাও। তাই ভাবছিলাম, এ-কাজটা আমি একাই করে নেব। তোমাদের আর টানব না।”

বাবুই হেসে কথাটাকে উড়িয়ে দেয়।—”বোকার মতো ভেবেছিস। গেলে যাব তিনজনেই।”

টুবলু একটু জোর দিয়েই বলে, “এই অভিযানের সব ব্যবস্থা আমি করব। মাথায় অনেক আইডিয়া আসছে।”

টুবলু ওর কথার দাম রেখেছিল। মুখোশ, লাঠি আর পাগড়ির গামছা ও জোগাড় করেছিল তো। যাই হোক, শেষ অবধি কাজটা ভালোভাবেই উতরেছে। কোনোরকম ঝামেলাও হয়নি। বাঘের গুহায় ঢুকে তার মুখের খাবার ছিনিয়ে নেওয়া তো সোজা কাজ নয়।

সবাই বিজয়ার সন্ধ্যায় যখন নাড়ু-ঘুগনি খেয়ে আনন্দ করতে ব্যস্ত, ওরা একমনে পরিকল্পনা করেছে। শেষ অবধি কালুকে কমলাদির হাতে তুলে দিতে পেরে ভীষণ খুশিও হয়েছে। তবে এর পরে ঘটনা কোন দিকে মোড় নেবে বুঝতে পারছে না। এটা তো ঠিক, সার্কাসের দুষ্টু লোকগুলো সবকিছু এত সহজে ছেড়ে দেবে না। দশমীর রাতে হয়তো নেশা করে ঘুমিয়েছিল। তাই ওদের ধরতে পারেনি।

“এই বাটপাড়ি ওরা এত সহজে মেনে নেবে না। বাটপাড়দের খোঁজ হল বলে। তোরা সাবধান থাকিস।” কথাটা কাকাইর।

কথাটা যে ভীষণই সত্যি, তার প্রমাণ খুব তাড়াতাড়ি পাওয়া গেল।

কালু ফিরে আসার পরে বিজয়ার পরদিন দুপুরেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। যুধিষ্ঠিরদাদুকে ডাক্তার দেখিয়ে ফিরে, খাওয়াদাওয়া সেরে অমল, টুবলু আর বাবুইদের সঙ্গে বসে ছিল পুজো-দালানে। অমলদের আরও এক সপ্তাহ এখানে থেকে যাওয়ার ব্যাপারে আর কোনও ধোঁয়াশা নেই। পুলকদাদু কথাটা সবার সামনেই বলে দিয়েছেন। হঠাৎ ওরা দেখল পাগড়ি পরা, গায়ে জোব্বা পোশাক আঁটা একটা লোক মাথায় একটা চ্যাপ্টা গোল ঝুড়ি নিয়ে হনহন করে পুজো-দালানের দিকেই এগিয়ে আসছে। সঙ্গে উলিঝুলি পোশাক পরা একটা বাচ্চা ছেলেও আছে। সঙ্গে সঙ্গে ওরা পুজো-দালানের থামের আড়ালে লুকিয়ে লোকটাকে লক্ষ করতে লাগল। লোকটার চোখ চারদিকে ঘুরছে। হঠাৎ উঠোনে ঝুড়ি নামিয়ে সে ঝোলা থেকে তার বিচিত্রদর্শন বাঁশিটি বার করে বাজাতে শুরু করল। বেশ জোরালো আওয়াজ!

বাবুই লোকটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। বাসের সেই চোখের ওপর কাটা দাগওলা মস্তান লোকটা না? ও আবার কী মতলবে সাপুড়ে সেজে এখানে এসেছে? না, ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে। ততক্ষণে অমল উঠে দৌড়ে গিয়েছে নিজের ঘরের দিকে। কথা বলে কালুর মুখবন্ধ করতে বোধহয়। ও না বাঁশির আওয়াজ শুনে ডেকে ওঠে।

বাঁশির আওয়াজ শুনে হন্তদন্ত হয়ে নেমে এলেন নতুনদিদা। সঙ্গে অলকদাদু।

অলকদাদু এগিয়ে এসে বললেন, “এই ভরদুপুরে তোমরা কার অনুমতি নিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছ? সবাই বিশ্রাম করছে তো। তাছাড়া বাড়ির ভেতরে ঢুকলে কীভাবে?”

লোক দুটো তখন মুখ কাঁচুমাচু করে বলছে, “আমরা গরিব সাপুড়ে। পুজো-বাড়ি শুনে কিছু পাবার আশায় এসেছিলাম। দরজা তো খোলাই ছিল।”

নতুনদিদা বললেন, “দাঁড়াও বাছা, তোমরা সিধে নিয়ে যাও। সুযোগ-সুবিধামতো একবার এসে খেলা দেখিয়ে যেও।”

সাপুড়েরা না যাওয়া অবধি ওরা পুজো-দালানের আড়াল থেকে বেরোয়নি। এবার বেরিয়ে আসতেই নতুনদিদা বললেন, “তোরা এখানেই ছিলিস? তাহলে বেরোলি না কেন? বেচারি একহাত খেলা দেখিয়ে যেত।”

***

পরদিন বিকেলবেলার দিকে অমল বলল, “কমলাদি আমাদের ঘরে কিছু বলবে বলে বসে আছে, তোমরা সবাই এসো।”

অমলের দাদুর পায়ে জুতোর মতো প্লাস্টার লাগিয়েছেন ডাক্তার। কিছুতে ভর দিলে হাঁটা যায়। উনি পা টানতে টানতে বেরিয়ে উঠোনের চেয়ারে বসেছেন। ওরা অমলের ঘরে ঢুকে বেশ অবাক হয়ে গেল। এই ক’দিনেই কমলাদির চেহারার লাবণ্য বেমালুম উধাও। মানুষটার ওপরে যেন ঝড়ের ঝাপটা লেগেছে।

কমলাদি ওদের দেখে হাউমাউ করে কান্না জুড়ল। কান্নার তোড়ে বেশিরভাগ কথাই চাপা পড়ে যাচ্ছে। টুবলু বলল, “কান্না থামাও তুমি। এভাবে বললে বোঝা যাবে না।”

কমলাদি ফোঁপাতে-ফোঁপাতেই নাক-মুখ মুছে নিল কাপড় দিয়ে। তারপর ধীরেসুস্থে নিজের কাহিনি শুরু করল।—”তোমরা তো কালুকে উদ্ধার করে এনে দিলে। আমি জানতাম তখনই, যে ওরা এসে হাজির হবে। ঠিক তাই। গতকাল রাত বারোটা নাগাদ আমার বাড়িতে ওরা এসেছিল।”

“কারা? না বললে আমরা জানব কী করে?”

অমলের কথায় একটু চুপ করে থাকে কমলাদি। তারপর খুব নীচু গলায় বলে, “আমি তো বিধবা হবার পর থেকেই বাপের বাড়িতে থাকি। মাঝে-মাঝে শ্বশুরের ভিটেতে যাই। আমাদের শ্বশুরের বংশে যে একমাত্র কুলাঙ্গার আছে, সে আমার বড়ো ভাশুরের ছেলে পটা। নানান ঝামেলায় বেশ কয়েকবার জেল খেটেছে। এবারে আমি যাবার পর সে হঠাৎ বলল, ‘কাকিমা, তোমার হরিপুরের বাড়িতে আমি কয়েকদিনের মধ্যেই যাচ্ছি। একটু নাড়ু বানিয়ে রেখো।’ সবার সামনে কী বলি? বেশ বুঝলাম এড়াতে চাইলেও ওকে এড়ানো আমার সাধ্যে নেই। বললাম, ‘আসিস।’ একদিন সকালে উঠোন ঝাঁট দিচ্ছি, দেখি একটা মারুতি ভ্যানে বেশ কিছু দলবল সমেত পটা হাজির। কী আর করি, ওদের সবাইকে নাড়ু আর জল দিলাম। সেই শুরু হল। মাঝে-মাঝেই এসে হাজির হয়। তবে কখনও একা আসে না, সঙ্গে দলবল থাকে।”

“এরকমই হয়। প্রথমেই না বললে এতটা বাড়তে পারত না।” বাবুই মন্তব্য করে।

“তারপর কী হল? তারপর?” টুবলু ধৈর্য হারাচ্ছে।

“ওরা আসছিল, কোনও অসুবিধা ছিল না। কিন্তু পরে পরে জ্বালাতন করতে শুরু করল। এখন একটা গোঁ মাথায় চেপেছে। এই জমিদার বাড়িতে একটা মূল্যবান জিনিস আছে, তার হদিস ওদের দিতে হবে।”

“কী জিনিস আছে? আমিই তো জানি না।” টুবলু অবাক হয়ে তাকায়।

বাবুইর মনে পড়ে, দাদু গল্পের শেষে এমন কিছু একটা বলতে গিয়েই অলকদাদুর বাধায় থেমে গিয়েছিলেন। ও বলে, “জিনিসটা কী, কমলাদি?”

কমলাদি থমকায়। তারপর মাথায় হাত ঠেকিয়ে বলে, “আমায় মাপ করো তোমরা, জিনিসটা কী আমি বলতে পারব না। তবে খুব সাধারণ কিছু যে নয়, সেটা জেনে রাখো। আর একটা কথা বলি, আমরা তো গোয়ালা। দুধ বেচে খাই। বংশপরম্পরায় সেই প্রাণের ধনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের গিঁট বাঁধা আছে।”

কিছুক্ষণ ওরা চুপ করে থাকে। কমলাদিকে আর কিছু জানাবার জন্য জোরাজুরি করে না। অমল বলে, “এবার বলুন, আমাদের কাছে কী জন্য এসেছিলেন?”

কমলাদি বলে, “কথাটা বললুম না বলে কিছু মনে কোরো না বাবা। আমার তো তোমরাই ভরসা। ওরা প্রায় এসে আমাকে শাসাচ্ছিল যে আমি যদি এই বাড়ির সেই সম্পদ কী, কোথায় থাকে সেটা ওদের না বলি, ওরা আমার খুব বড়ো ক্ষতি করে দেবে। করলও তাই। কালুকে দিনদুপুরে তুলে নিয়ে গেল। আবার কালু ফেরত আসার পর কারা ওকে নিয়ে এসেছে, তাদের নাম জানতে চাইছে। ওদের তো আর বানানো গল্প বলতে পারছি না। কাল রাতে এসে আমাকে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়েছে।”

“আপনি কী বললেন?” টুবলু জানতে চায়।

“বলেছি আমি কিছু জানি না। মারতে চাইলে ওরা আমাকে মারতেই পারে, কিন্তু নাম বলতে পারব না।”

“কিন্ত আমার অবাক লাগছে ওই মূল্যবান বস্তুর খবর ওরা পেল কী করে?”

“ও-কথা হরিপুরের হাওয়ায় ভাসে। সব মনিষ্যিই জানে। ওরা জানবে না কেন?”

এতক্ষণে অমল কথা বলে।—”কিন্তু তুমি এখনও বলোনি আমাদের কাছে কী জন্য এসেছিলে।”

কমলা চোখের জল কাপড়ে মোছে।—”ওরা আমাকে শাসিয়ে গিয়েছে, যে-কোনো দিন আমাকে মেরে ফেলবে। তোমরা তখন আমার কালুকে দেখো। আর একটা কথা, গিন্নিমাকে বলি বলি করেও বলে উঠতে পারিনি। ওই দামি জিনিসটার ওপর বদ লোকের নজর পড়েছে। গিন্নিমা যেন সাবধানে রাখেন জিনিসটি।”

কমলাদির ভয় যে অমূলক নয়, পরের দিন তার একটু নমুনা পাওয়া গেল। কে বা কারা তার বাড়ির সামনে রাত্তিরে এসেছিল। যাওয়ার সময় একটা জ্বলন্ত মশাল ছুড়ে মেরেছিল ঠিক তার গোয়ালঘরের ছাদের ওপর। কমলাদি শুয়ে ছিল নিজের ঘরে। গোরুদের হাম্বা রবে ঘুম ভাঙতেই ছুটে যায় ওদের বাঁচাতে। সুখের কথা এই যে গোরুরা প্রাণে বেঁচেছে। কমলাদির চিৎকার আর গোরুদের আর্তনাদ শুনে পাড়ার লোকেরা ছুটে এসে জল ঢেলে আগুন নিভিয়েছে। না-হলে নির্ঘাত অবোলা প্রাণীদের অকালে মৃত্যু ঘটত। কমলাদির ঘরদোরও বাঁচত না।

ঘটনার বিবরণ শুনে বাবুই অবশ্য টুবলুদের বলেছে, “এ শুধু ভয় দেখানো। কমলাদি আর গোরুদের মারবে ভাবলে ওরা মশাল না ছুড়ে আরও রাতে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিত। কেউ বাঁচত না।”

অমলও বলল, “বাবুইদা একদম ঠিক বলেছ। এবার আসল বিপদ আসছে।”

এদিকে হাজার বারণ করা সত্ত্বেও কমলাদি নিজের বাড়ি ছেড়ে টুবলুদের বাড়িতে শুতে রাজি হল না। মুখে এক কথা—”রাখে হরি মারে কে? আমি ওই অবোলা প্রাণীগুলোকে ছেড়ে কিছুতেই জমিদারবাড়িতে নিরাপদে থাকতে পারব না।”

শেষ পর্যন্ত নতুনদিদা আর জোরাজুরি করলেন না। বললেন, “মানুষের বিশ্বাসের মূল্য দিতে হয়। ওর বিশ্বাস নিয়ে ওকে থাকতে দাও।”

***

অমলের দাদুর পা এখন অনেকটা ঠিকঠাক। লক্ষ্মীপুজো মিটলেই অমল ওর দাদুকে নিয়ে বাড়ি ফিরবে। বাবুইদের থাকার মেয়াদও ফুরিয়ে এসেছে।

এর মধ্যেই একটা কাণ্ড হল। কমলাদির বাড়ি আগুন লাগার পরদিন স্থানীয় থানার দারোগা তাঁর দলবল নিয়ে তদন্ত করতে এসে টুবলুদের বাড়ি ঘুরে গেলেন। ওঁদের এ-বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন পুলকদাদু। আসলে থানায় উনিই আগুন লাগার ব্যাপারে রিপোর্ট করেছিলেন তো।

দারোগাবাবু মানুষটি বেশ। বাইরের ঘরে বসে গল্প করলেন মিনিট দশেক। প্রথমেই পুলকদাদুকে বললেন, “আমি কিন্তু ডিউটিতে থাকলে কোথাও জল পর্যন্ত খাই না। আপনি রান্নাঘরে গিয়ে বিশেষ করে বারণ করে আসুন। মনে হয় চায়ের তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে।”

কথাটা যে উনি একদম ঠিক বলেছিলেন সেটা ভালোই বোঝা গেল। কেননা নতুনদিদা প্রায় তক্ষুনি ট্রেতে চা সাজিয়ে হাজির হলেন। বললেন, “না বললে শুনব না। শুধু চা দিয়েছি। আর একটু প্রসাদী কাজুবাদাম। চা পানে কোনও দোষ নেই। আমরা তো উপোস করলেও চা খাই।”

দারোগাবাবু একমুঠো কাজু মুখে পুরতে পুরতে, চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই বললেন, “আপনারা সাবধানে থাকবেন মশাই। ডোমজুরের ব্যাংক ডাকাতির অপরাধীরা ধরা পড়েনি। আবার এরই মধ্যে গতকাল এদিকের ভবনগর ব্রাঞ্চে ডাকাতরা হানা দিয়ে দশ লাখের মতো হাতিয়েছে। পুজোর পর সবে ব্রাঞ্চ খুলেছে, তাই বেশি টাকাপয়সা ছিল না। যা মনে হচ্ছে অপরাধীরা কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করছে। ধরা যাচ্ছে না কোনোভাবেই। এভাবে চললে আমাদের চাকরি রাখা দায় হবে।”

দারোগাবাবু ফিরেই যাচ্ছিলেন। যেতে যেতে আবার বললেন, “এই যে আগুন লাগল, এটাই-বা কেন হল? ওই মহিলার তেমন টাকাপয়সা আছে বলে তো মনে হয়নি। দেখুন মশাই, কিছু জানা থাকলে বা জানতে পারলে আমাদের কাছে লুকোবেন না। আমরা যেমন আপনাদের পাশে আছি, আপনারাও তেমন না থাকলে চলবে কেন?”

বৈঠকখানা ঘরে ওঁকে বসানো হয়েছিল। ঘরের মধ্যে দাদু, পুলকদাদু ছাড়াও ওরা তিনজনেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অলকদাদু অফিসে গিয়েছেন। অমলের পাশেই ছিল টুবলু। দারোগা বাবুর কথা শুনে টুবলু উত্তেজিত হয়ে কিছু বলতে যেতেই অমল ওর হাতে একটা চিমটি কাটল। টুবলুর হাঁ বন্ধ হয়ে গেল। ভাগ্যিস দারোগা এসব দেখেননি। না-হলে কী হত বলা শক্ত।

শুধু দাদু দারোগাবাবু চলে যাবার পরেও মিটিমিটি হাসছিলেন। বাবুই ঠিকই বুঝেছে—এইসব তুচ্ছ ঘটনাও দাদুর নজর এড়ায় না।

***

বাবুই আর একটা কথা দাদুর কাছে শুনেছিল। এই হরিপুরে দুর্গাপুজোর পরে দ্বাদশীর দিন কালীবাড়ির সামনের মাঠে একটা মেলা বসে। সেই মেলার বৈশিষ্ট্য হল বিভিন্ন এলাকার মানুষ ওই মেলায় শিব-দুর্গা সেজে নাচতে আসেন। মেলায় ঘুরলে এক-এক জায়গায় এক-একজোড়া শিব-দুর্গার নাচ দেখতে পাওয়া যায়।

কলকাতায় ফেরা হল না যখন, বাবুই ভেবে রেখেছিল দাদুর সঙ্গে ওরা তিনজন মেলায় যাবে। কিন্তু দাদুর হাঁটুতেই হঠাৎ ব্যথা শুরু হয়ে গেল। ক’দিনের অতিরিক্ত পরিশ্রমেই দাদুর হাঁটু জানান দিচ্ছে। তাই নতুনদিদা দাদুর পায়ের জন্য ম্যাসাজের লোককে ডেকেছেন। এ-অবস্থায় দাদুকে তো মেলায় নিয়ে যাওয়া যায় না। তাই ওরা তিনজনই চলেছে মেলায়। মেলায় খরচ করার জন্য প্রত্যেকেই বড়োদের কাছ থেকে কিছু কিছু পয়সা-কড়িও পেয়েছে। কাজেই মেলায় গিয়ে ইচ্ছেমতো খাওয়াদাওয়াও করা যাবে। এবার পুজোয় তো ফুচকাই খাওয়া হয়নি। ওটা মেলায় খেতেই হবে। সারাক্ষণ দাদু পায়ের জন্য মনখারাপ করছে। বাবুই ভেবে রেখেছে, মেলা থেকে দাদুর প্রিয় চিনির রসে ফেলা কটকটি নিয়ে আসবে। এছাড়াও নতুনদিদা বাড়ির সবার জন্য চিনেবাদাম ভাজা আনতে টাকা দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে যাওয়ার আগেই মেলায় কী কী করা হবে সেসব ভাবনা-চিন্তা শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রথমে ঠিক ছিল হেঁটেই যাবে ওরা। কিন্তু অমলের কথায় সাইকেলে যাওয়াই স্থির হল। অমল বলল, “বাবুইদা, তুমি তো ওই হরির মন্দিরের ভাঙা চুড়ো দেখে এসেছ। আমরা দুজনে দেখিনি। সাইকেলে ঘুরে আসব। হয়তো সাধুবাবাজির দর্শনও মিলে যাবে।”

মেলার মাঠের একপাশে ছোটো ছোটো তাঁবু পড়েছে। অনেকেই মেলায় বিকিকিনি করতে এসেছে বাড়ির লোকসমেত। সকালে তারা দিঘির জলে স্নান সেরে রান্নাবান্না, খাওয়াদাওয়া করে। তাই মেলা বসে বিকেল থেকে। মেলার মাঠে একটু বেলাবেলি পৌঁছে গিয়ে ওরা দেখছিল, ওই ছোটো ছোটো তাঁবু থেকে ছোটো ছোটো বাচ্চা, তাদের মা-দিদিমারা মেলার মাঠে বেরিয়ে ঘোরাঘুরি করছে। টুবলু ওই তাঁবুগুলোর দিকে তাকিয়ে নিজের মনে বলছিল, “আমার খুব ইচ্ছে করে ওই তাঁবুতে থাকি, আর মেলায় মেলায় ঘুরে বেড়াই।”

অমল হেসে বলল, “তুমি যেরকম ভাবছ সেরকম সুখের জীবন ওদের নয় কিন্তু। মেলায় জিনিস বিক্রি করতে না পারলে ওদের এই খরচাটুকুও উঠবে না। তখন ওরা কী খাবে বলো তো? বাড়িতেই-বা কী নিয়ে যাবে?”

ওর কথা শুনে টুবলু চুপচাপ হয়ে গেল। বাবুই ভাবছিল অন্য একটা কথা। সবাই খেতে পাবে এরকম একটা ব্যবস্থা পৃথিবীর সব দেশেই হয় না কেন?

মেলায় এতরকমের মজা, এসব ভারী ভারী কথা মনেই থাকে না। ওরা ঘুরতে-ঘুরতেই দেখল মেলার মাঠে জোড়ায় জোড়ায় বিভিন্ন বয়সের, নানারকম চেহারার শিব-দুর্গা ঘুরে ঘুরে নাচছে। নাচের সঙ্গে গান হচ্ছে  হারমোনিয়াম বাজিয়ে। ওদের ঘিরে কত লোকজন নাচ দেখছে। অনেকেই—বিশেষ করে গ্রামের মহিলারা ওদের ঝোলায় পয়সা দিচ্ছে। ওরা অবশ্য দেয়নি। নিজেদের সব পয়সা জড়ো করে রেখেছে ফুচকা আর ঘুগনি খাবে বলে। তাছাড়া নানারকমের রাইড আছে। সেগুলোতেও ভালোই খরচ।

দাদুর কাছে শুনেছে বাবুই, আগে মেলায় হ্যাজাক, গ্যাসের আলো জ্বালানো হত। এখন সবই পালটেছে। বাবুইরা বিকেলেই পৌঁছেছিল। সন্ধে হতে না হতে বড়ো বড়ো আলোয় মেলার মাঠের সব অন্ধকার ঘুচে গেল। অবাক হয়ে দেখল ওরা, সার্কাসের সেই নীল-সাদা ডোরাকাটা তাঁবু মেলার উত্তরদিকে এসে বসেছে। টিকিট কাউন্টারে প্রচুর লোক ভিড় করেছে। একপাশে ইলেকট্রিক নাগরদোলার চাকা ঘুরছে দেখে ওরা সেদিকেই এগিয়ে গেল।

নাগরদোলা অনেক উঁচুতে উঠে আবার নামে। ওপরে উঠে দুলতে দুলতে নামছিল ওরা। চারদিকে চোখ ঘোরাতেই দেখল সার্কাসের তাঁবুর একপাশে মারুতি ভ্যানের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সেই তিনটে ঢ্যাঙা লোক কীসব কথাবার্তা বলছে। টুবলু দেখানোর জন্য হাত তুলতে যেতেই বাবুই ওর হাত চেপে ধরল। মুখে বলল, “দেখেছি। এখানে কে কোথায় ঘাপটি মেরে আছে কে জানে। মুখ বন্ধ রাখতে হবে।”

সার্কাসের দিকে মোটে গেল না ওরা। ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই। কালীমন্দির, শিবের মন্দির ঘুরে তিনজনে রওনা দিল সেই ভাঙা মন্দিরের স্তূপের দিকে। রাস্তায় মাঝে মাঝে টিমটিমে পোস্টের আলো। অন্ধকার এতটুকু কমেনি। বাবুই বার বার বলেছিল, “এভাবে গিয়ে কিছুই তো দেখা যাবে না। শুধু শুধু হয়রানি!”

অমল আর টুবলু যাবেই। অগত্যা যাওয়া। রাস্তার ধার ঘেঁষে যাচ্ছিল ওরা। এই রাস্তায় তেমন কেউ আসে না। যেতে যেতে দূর থেকে আসা গাড়ির আওয়াজ পেয়ে অমল চট করে সাইকেল থামিয়ে ওদের টেনে নিয়ে গেল রাস্তার পাশের একটা বড়ো গাছের আড়ালে। অমলের বিবেচনার তুলনা নেই। কেননা দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই ওদের পাশ দিয়ে সেই মারুতিটা হুস করে বেরিয়ে গেল। সকলেরই গলা শুকিয়ে গিয়েছে। মারুতিটা কি ওদের ফলো করেই এসেছে? কে জানে?

অমলের খুব সাহস! বলল, “সত্যি-মিথ্যে যাচাই করে আসি, চলো। আমাদের সন্ধানে এলে না পেয়ে এখনই ফিরবে। আমরা আবার না-হয় লুকোব তখন। কেমন যেন মনে হচ্ছে ওই ভাঙা মন্দিরের আশেপাশেই আছে দলটা।”

সাইকেল ঝোপের মধ্যে রেখে একটু দূর থেকেই হাঁটা শুরু করল ওরা। টুবলু বাবুইর হাত শক্ত করে ধরে আছে। ভগ্নস্তূপের আগে একটু দূর থেকেই একটা অদ্ভুত আওয়াজ কানে এল। কোদাল বা ধারালো কিছু দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। কাছাকাছি যেতে হল না। ওরা জোরালো টর্চ জ্বালিয়েছে। ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে দূর থেকেই নজরে এল—বেশ নিশ্চিন্ত মনেই মাটি কাটছে দুজন, দাঁড়িয়ে আছে দুজন। আবার অন্যরা হাত লাগাল, বাকি দুজন খাড়া রইল। আয়তনে বেশ চওড়া আর লম্বা, মোটামুটি গভীর একটা গর্ত হতে বেশি সময় লাগল না।

তারপর গাড়ির কাছে এসে দুজনে মিলে একটা স্টিলের ট্রাংক বয়ে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দিল ওই গর্তের মধ্যে। আবার ঝপাঝপ মাটি পড়ছে গর্তে আর বাবুইরা স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝোপের আড়ালে। মশার কামড়, পায়ের ঝিনঝিনানি—কিছুতেই কিছু এসে যাচ্ছে না। ওদের গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ এখন বেরোবে না। ওরা মূর্তি হয়ে গিয়েছে।

কাজ শেষ করে ভালোমতন ঘাসের চাঙড় তুলে চাপা দিল মাটির ওপর। কাছের একটা গাছের থেকে পায়ে পায়ে মেপে নিল জায়গাটা। তারপর চারজনে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই গিয়ে উঠল মারুতিতে। ধোঁয়া উড়িয়ে মারুতি চলে যেতেই সংবিৎ ফিরে পেল ওরা। বাবুই ওদের হাত ধরে নিয়ে গিয়ে শ্রীহরির পুজোর জায়গায় প্রণাম করাল।

অমল বলল, “এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। তার ওপর তেনারা আবার ফেরত আসতে পারেন। এক্ষুনি এখান থেকে চলো।”

ফেরার পথে টুবলু উঠল বাবুইর সাইকেলে। অমল চলল একা একটা সাইকেল চালিয়ে। কেননা টুবলু আগেই বলে দিয়েছে—”আমার হাত-পা কাঁপছে। আমি ভাই সাইকেল চালিয়ে যেতে পারব না। ডাবল ক্যারি তো একদম না। আমি বাবুইদার সাইকেলে উঠব।”

পথে ওরা একটাও কথা বলেনি। শেষে বাড়িতে পৌঁছে সবাই হাঁফ ছাড়ল। বাবুই বলল, “ওই ট্রাংকে কী আছে বোঝা গেল?”

অমল আর টুবলু একসঙ্গে বলে উঠল, “যতদূর মনে হচ্ছে, ব্যাংক ডাকাতির টাকা।”

বাবুই টুবলুর দিকে তাকিয়ে বলল, “একটা অনুরোধ আছে—এ নিয়ে কারোর সঙ্গে আলোচনা করিস না। না, কাকাইর সঙ্গেও না। আরও কিছু বোঝার আছে। হয়তো পুলিশ নিয়ে ওখানে গিয়ে দেখা যাবে ওরা ট্রাংক সরিয়ে ফেলেছে। তার থেকে নিশ্চিন্তে একটা একটা করে ওরা অপরাধ করুক আর ওদের অপরাধের প্রমাণ জড়ো হোক। তারপর যথাসময়ে সব জানাব আমরা। এখন দেখাই যাক না কোথাকার জল কোথায় গড়ায়।”

***

বেলা বাড়ছে। বাড়ির পেছন দিকে দিঘির ধারের সিঁড়িতে বসে আছে ওরা তিনজন। গতরাতে ইটের খোঁচায় টুবলুর পায়ে লেগেছিল। বাড়ি ফিরে ওষুধ দিলেও ব্যথাটা তেমন কমেনি। একটু একটু খোঁড়াচ্ছে ও। কাল মেলায় গেলেও কিছুই কিনে আনতে পারেনি ওরা। না আনার পক্ষে কোনও কারণও দেখানো যাচ্ছে না। তাহলেই মিথ্যে বলতে হয়। নতুনদিদা বাদাম না পেয়ে খুব রেগে গেছেন। দাদুর জন্য বাবুইর মিষ্টিকাঠি কিনে আনা সম্ভব হয়নি। ওর বারে বারে মেলার মাঠে বারকোশের ওপর স্তূপাকৃতি করে রাখা চিনির রসে ভেজানো কুঁচো লাঠি চাকতিগুলোর কথা মনে পড়ছে। আর আগেই কেন কিনে ফেলেনি ভেবে মনখারাপ হয়ে যাচ্ছে।

আসলে ওরা ভেবেছিল শ্রীহরির মন্দিরের ভাঙা দেউল দেখে ফেরার সময় বাদামভাজা আর দু-তিনরকমের চাকতি কিনে আনবে। কিন্তু ওই ট্রাংকের ঘটনাটাই সব গোলমাল করে দিল। তারপরে আবার মেলায় পা দেবার মানসিকতা ওদের ছিল না। বিশেষ করে যখন ওখানেই সার্কাসের তাঁবু, আর সেটাই ওদের প্রধান ঘাঁটি। দিঘির ধারে খানিক মনখারাপ করেই বসে ছিল ওরা। অমল খবর এনেছে, কমলাদির গাইয়ের নতুন বাছুরটা হঠাৎ মারা গিয়েছে।

অমল বলছিল, “কাউকে না বললে একটা খবর দিতে পারি। ওই বাছুরের মৃত্যুর পেছনে একটা রহস্য আছে। ওকে অজান্তে কেউ কিছু খাইয়ে দিয়েছে। আমার যতদূর মনে হয় এই ব্যাপারটা যেভাবেই হোক কমলাদি জেনেছে। কাঁদেনি। কিন্তু পাথরের মতো মুখ করে বসে আছে।”

“তুই কী করে জানলি?”

বাবুইর প্রশ্নে অমল লজ্জা পেল। কিছু বলল না।

ওরা অবাক হয়ে দেখল দিঘির জলে যে হাঁসগুলো চরে বেড়াচ্ছে, তাদের প্যাঁকপ্যাঁক আওয়াজও মন দিয়ে শুনছে অমল। টুবলু ওর গায়ে একটা ঠেলা দিয়ে বলল, “তুই কি ওদের ভাষাও বুঝিস? বলতেও পারিস?”

অমল হাসল টুবলুর দিকে তাকিয়ে। তারপর চারপাশ দেখে নিয়ে দিঘির ধারে একদম জলের কাছে নেমে গেল। ওর গলার মৃদু প্যাঁকপ্যাঁক আওয়াজ ওপরের ধাপিতে বসেও শুনতে পাচ্ছিল ওরা। আর দেখছিল, হাঁসগুলো আওয়াজ করতে করতে ঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে। ওরা নির্ঘাত অমলকে কিছু বলছে যা টুবলু, বাবুই বুঝতে পারছে না।

আসলে অমলই সকালবেলায় হন্তদন্ত হয়ে এসেছে ওদের কাছে। বলেছে, “একটু বাড়ির পেছনের দিকে চলো। কথা আছে।”

বাড়িতে সবসময় এত বাইরের লোক আসাযাওয়া করে, কথা বলার জন্য ওরা তেমন নির্জনতা পায় না। তাছাড়া এত ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ওদের মনেও আর সেই নিশ্চিন্ততা নেই। ওই কালো ট্রাংকে কী আছে জানা যায়নি। ওখানে গিয়ে যে দেখা যাবে তার সম্ভাবনাও কম।

মোটামুটি বোঝা গিয়েছে, ওদের দলে তিনজন লোক আছে। তবে তিনজনে ব্যাংক ডাকাতির মতো এত বড়ো একটা ব্যাপার সামাল দিতে পারবে বলেও মনে হয় না। নিশ্চয়ই আরও লোক আছে যারা অন্য জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। আর সময়মতো ওদের সঙ্গে যোগ দেয়। সার্কাসের তাঁবুতে ঘাঁটি গাড়লেও তাদের সঙ্গে ওদের লেনদেনের সম্পর্কটা ঠিক কেমন বোঝা যাচ্ছে না। এও হতে পারে, সার্কাসের লোকেরা নির্দোষ। ওরা ওদের ভয় দেখিয়ে কব্জা করেছে।

সবচেয়ে বড়ো কথা, ওদের কমলাদির ওপর অত্যাচারের কারণ একটাই। এ-বাড়ি সম্বন্ধে ওরা যা জানতে চায়, কমলাদি তা ওদের বলেনি। তার মানে এ-বাড়ি বা কমলাদির ওপর ওদের নজর জারি আছে। ফট করে বাবুইদের যা-হোক কিছু করে ফেলা উচিত হবে না। তাহলে সবাইকে ভুগতে হবে। এসব কিছু আলোচনার জন্যই অমল এসেছিল ওদের কাছে। তবে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ারও প্রয়োজন আছে। কেননা লক্ষ্মীপুজোর পরে অমল আর বাবুই দুজনকেই বাড়ি ফিরতে হবে। টুবলুর পক্ষে তো আর একা একা সবকিছুর সঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

দিঘির ধার থেকে ফেরার সময় টুবলু বলল, “অমল, তোকে যখনই জিজ্ঞেস করছি, তুই এড়িয়ে যাচ্ছিস। বল না রে, তুই কি সব জীবজন্তু কীটপতঙ্গের ভাষা জানিস?”

“না, টুবলুদা। তবে ওদের ভাষা নকল করতে করতে ওদের ধ্বনির একটা আন্দাজ আমি পেয়েছি। সেটা তোমাদের বোঝাতে পারব না। খারাপ বা ভালো কিছু ঘটার আগেই ওরা টের পায়। আর শব্দ করে। আমি শুনে শুনে তার মানে করতে পারি।”

বাবুই জানতে চাইল—”ওই কমলাদির বাছুরের ব্যাপারটা ওরা কি টের পেয়েছিল?”

“হয়তো। আমি তো তখন এখানে ছিলাম না। তবে আমি এটা টের পেয়েছি, আশেপাশের সব পশুপাখি ওই ঘটনাটায় মুষড়ে আছে। ওরা মানুষকেই দোষারোপ করছে। বাছুরটা এখানেই বড়ো হচ্ছিল তো। এখানেই দৌড়াদৌড়ি করত, খেলাধূলা করত—সবার খুব প্রিয় ছিল। ওর অকালমৃত্যু এরা কেউ মানতে পারেনি।”

কিছুক্ষণ বাদে বাড়িতে ঢোকার আগে অমল বাবুইর দিকে তাকায় একবার। তারপর টুবলুর দিকে তাকিয়ে বলে, “তোমরা ভুলেও আমার এই বিশেষ ক্ষমতার কথাটা কাউকে বোলো না। তাহলেই আমার বিপদ হবে। আমার বাড়ির লোকেদেরও আমি বলিনি।”

ওদের মনে হল অমল সত্যি-সত্যিই খুব বুদ্ধিমান।

একদিন বাদেই বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো। তার জোগাড়যন্ত্র করতে হবে। অলকদাদুর ব্যাংক খুলে গিয়েছে। উনি নিয়মিত অফিস যাচ্ছেন। এদিকে পুলকদাদুর কোর্ট লক্ষ্মীপুজোর পরেই খুলবে। উনি এখন লম্বা ছুটিতে। নতুনদিদার পুজোর কেনাকাটি উনিই করছেন।

দ্বাদশীর পরদিন লক্ষ্মীঠাকুর এসে গেলেন। বাড়িতে এখন মহা উদ্যমে নাড়ুর নারকেল ছাড়ানো শুরু হয়েছে। নারকোলের খোসায় উঠোনের একপাশ ভরতি হয়ে গিয়েছে। নকুলদা মাঝে-মাঝে উঠে নারকেল কাঠির ঝাঁটা দিয়ে উঠোনে ঝাঁট দিয়ে দিচ্ছে। শুধু কমলাদি একবারও পাড়া মাড়ায়নি।

দাদু বলছিলেন, দুর্গাপুজোর পরে লক্ষ্মীপুজো অথবা কালীপুজো করতে হয়। এ-বাড়িতে বরাবর লক্ষ্মীপুজো হয়ে আসছে। এ-পুজোর আগে নাকি শ্রীহরির দেউলে মাথা ঠেকাতে যেতে হয়। বরাবরের রীতি-রেওয়াজ। বাড়ির গাড়িতেই যাওয়া হবে। নতুনদিদা, দাদু, ওরা তিনজন। পুলকদাদু গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাবেন। গাড়িতে পুলকদাদু বললেন, “তোমরা খুবই ভাগ্যবান। না-হলে আজ এই পুজোর সময় উপস্থিত থাকতে পারতে না।”

শ্রীহরির ওখানে যাওয়ার আগেই একটা খুশির খবর পাওয়া গেল। এই গ্রামের প্রতিদিনের দুর্গাপুজোর খবর তো বিশেষভাবে কাগজে বার হয় না। কিন্তু লক্ষ্মীপুজোর খবর নিতে ‘আজকের সকাল’ বিশেষভাবে তাদের প্রতিনিধি পাঠাবে বলে ফোন করেছে। এখন নাকি এ একটা কায়দা হয়েছে। গ্রামের পুরোনো সব বাড়ির পুজোর খবর শহরের লোকেদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। গ্রামের পুজো-বাড়ির মতো নিষ্ঠাভরে পুজো শহরে কমই হয় তো।

পুলকদাদু গাড়ি চালাতে চালাতে বললেন, “তাড়াতাড়ি ফিরে একটু হাত লাগাতে হবে। উঠোনের আলপনা তো প্রায় মুছেই গিয়েছে। শিকলিগুলো হাওয়ায় নষ্ট হয়েছে। হাত চালিয়ে এসব ঠিক না করলে আজকের সকালের মন ভরবে কি?”

নতুনদিদা বললেন, “ও নিয়ে ভাবতে হবে না। আমি বলে এসেছি—পাশের বাড়ির ছবি, ওর মা আবার জিংক অক্সাইড গুলে আলপনা ঠিক করবে। আর কাগজের শিকলি তৈরিতে গতকাল থেকেই সবাই হাত লাগিয়েছে। ও হয়ে যাবে। তারপর তোমরা ভালো করে টাঙিয়ে দিও। এখন চলো এই শ্রীহরি পুজো সাবধানে মেটাই।”

শ্রীহরির স্তূপের কাছে পৌঁছে ওরা অবাক হয়ে দেখল যে শিবের মন্দিরের সেই সাধু ওখানে উপস্থিত। উনি সাজি করে ফুল এনেছেন। আর ওই স্তূপ ফুল দিয়ে চুড়ো করে সাজাচ্ছেন। ওঁকে দেখেই নতুনদিদা এগিয়ে গিয়ে কীসব কথাবার্তা বললেন। জানা গেল প্রতিবছরই এ-সময় ওঁদের সম্প্রদায়ের কেউ না কেউ এই পুজোয় উপস্থিত থাকেন। দুর্গাপুজোর কিছু আগে ওঁরা বেনারস থেকে এখানে আসেন। কালীপুজো হয়ে গেলে আবার ফিরে যান। সাধুর হাবেভাবে এতটুকু বোঝা গেল না যে ওদের সঙ্গে ওঁর আগেই আলাপ হয়েছে। বোঝা গেলে দাদুর সামনে বাবুই একটু অপ্রস্তুত হত। কেননা ওরা যে আগেই ওঁর কাছে এসেছে, সে-কথা দাদুকে বলাই হয়নি।

স্তূপের কাছে গিয়ে সামনের জায়গাটা আগে হাতে করে পরিষ্কার করে একটু মাটি লেপে দিলেন নতুনদিদা। তারপর ওই মাটিতে সঙ্গে আনা পিটুলি গোলা দিয়ে সামান্য আলপনা দিলেন। হাত ধুয়ে, গঙ্গাজল ছিটিয়ে, ধূপ-দীপ দিয়ে নিজের মনে ভাঙা চুড়োর আরতি করলেন। শেষে একটা নতুন পুজোর আসন ওই আলপনার ওপর পেতে; তার সামনে কাঁচা মাটির ডেলায় ধূপ গুঁজলেন। একটা পাথরের রেকাবিতে কিছু কুচো ফল আর মিষ্টি সাজালেন। তারপর মাথা ঠেকিয়ে ওই স্তূপে প্রণাম সারলেন।

চারপাশে দাঁড়িয়ে ছিল ওরা। হঠাৎ নতুনদিদা ইশারা করতেই ঘেঁষাঘেঁষি করে দিদাকে ঘিরে দাঁড়াল সবাই। উনি হাতের ব্যাগ থেকে বার করলেন ভারি সুন্দর এক বিষ্ণু মূর্তি। সোনার তৈরি ছোট্ট মূর্তির গলায় হিরের হার। কানে হিরের দুল।

“এই সেই।” ফিসফিস করে বলে উঠলেন দাদু।

ওরা মুগ্ধ হয়ে দেখছিল আর ভাবছিল, ইনিই সেই শ্রীহরি? সত্যি-সত্যিই দুর্মূল্য! পুজো করলেন সেই সাধু। খুব সংক্ষিপ্ত সেই পুজো। পুজো শেষ করেই বিদায় নিয়ে উনি চলে গেলেন। নতুনদিদা ঠাকুর তুলে কাপড়ে মুড়ে নিজের ব্যাগে ঢোকাতে যাবেন, হঠাৎ কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই অমল হাত থেকে কাপড়ে মোড়া মূর্তি ছিনিয়ে নিয়ে ঝড়ের বেগে দৌড়ে কোথায় যে চলে গেল।

ভাগ্যিস গেল! ওই ঘটনার চমক কাটতে না কাটতেই গাড়ির আওয়াজ হল, আর সেই সিড়িঙ্গে লোকগুলো এসে পুলকদাদুর দিকে বন্দুক তাক করে বলল, “এক্ষুনি মূর্তি বার করুন, নয়তো ভয়ংকর কাণ্ড হবে। আমরা কাউকে ছাড়ব না।”

দাদু ঠান্ডা গলায় বললেন, “এইমাত্র মূর্তি ছিনতাই হয়েছে। আমাদের কাছেই মূর্তি নেই। বিশ্বাস না হলে তোমরা সার্চ করতে পারো। আর আমাদের মারতে চাইলে মারতেও পারো।”

বাবুই টুবলুর হাত শক্ত করে ধরে ছিল। ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল সে। মূর্তি হারিয়ে নতুনদিদা স্তূপের ওখানে সেই যে মাথা গুঁজে বিলাপ করছিলেন, সেই অবস্থাতেই রয়ে গেলেন। বাবুই অবাক হয়ে দেখল, কারা এল গেল সে ব্যাপারে ওঁর কোনও মাথাব্যথা নেই। শ্রীহরির মূর্তি হারিয়ে উনি সেই শোকেই ডুবে আছেন।

***

লোকগুলো খানিকটা হম্বিতম্বি করে, পরে আবার আসার ভয় দেখিয়ে চলে গিয়েছিল। ভাগ্যিস কেউ অমলের নাম করেনি। তবে ওরা কি আর খবর রাখে না? এখানে পুজোর খবর পেয়েছে যখন, অমলের কথাও কেউ ওদের কানে নিশ্চয়ই তুলে দিয়েছে। দাদু অনেক করে বুঝিয়ে নতুনদিদাকে গাড়িতে তুলেছিলেন। বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো আছে। সে-কথা তো ভাবতে হবে। ফেরার পথে নতুনদিদা সারাক্ষণ কেঁদে গেলেন। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, “এতবছর ধরে এই পুজো চলে আসছে, কখনও এমন হয়নি। ওই মূর্তির সঙ্গে এ-বাড়ির মঙ্গল-অমঙ্গল জড়িয়ে আছে।”

সব শুনে মনে হচ্ছিল মূর্তিটি শুধু দামের দিক থেকেই দুর্মূল্য নয়, ওটি ফিরে না এলে এ-বাড়ির দুর্দশা কেউ   আটকাতে পারবে না। পুলকদাদুর নীরবতা নতুনদিদার বক্তব্যকে সমর্থন করছিল।

অবাক কাণ্ড! পুরো চত্বর তন্নতন্ন করে খুঁজে কোথাও অমলকে পাওয়া গেল না। ওইটুকু সময়ের মধ্যে গেল কোথায় ছেলেটা? পুলকদাদু একটাও কথা না বলে সারা রাস্তা গাড়ি চালালেন। শুধু হদ্দ বোকার মতো গাড়িতে বসে ছিল ওরা দুজন।

এটা অমল কী করল? ওর এত লোভ আছে বলে কখনোই মনে হয়নি তো! মূর্তি বাঁচানোর জন্য যদি করে থাকে, ফিরে এল না কেন? তাহলে কি ও বিপদে পড়েছে?—এই চিন্তাটা ওদের মাথা থেকে যাচ্ছিল না। সবচেয়ে বড়ো কথা, এতদিন যা হয়েছে তিনজনে আলোচনা করে হয়েছে। হঠাৎ অমল নিজের ইচ্ছেমতো এরকম একটা গোলমাল পাকিয়ে দিল কেন?

গাড়িতে ফেরার সময় নতুনদিদাকে দাদু বললেন, “তুমি কেঁদো না। মানুষ চিনতে আমি কখনও ভুল করিনি। মনে করো আজ বড়োসড়ো বিপদ হত, অমল তোমাকে বাঁচিয়েছে।”

বাড়িতে ফেরার পর আর কিছু চিন্তাভাবনা করার সময় ছিল না। সাজানো গোছানো শেষ হতে না হতেই এসে পড়ল ‘আজকের সকাল’-এর দলবল। তাঁদের আপ্যায়ন করা, ঠাকুর দেখানো—সব কাজ প্রায় একা হাতে সামলালেন পুলকদাদু। পেছন থেকে নতুনদিদাও আপ্যায়নে সাহায্য করলেন। তবে নতুনদিদার মন খুব খারাপ থাকায় সাড়াশব্দ তেমন করলেন না। ওরা চলে যেতে যেতে সন্ধে ঘনাল। তারপর শুরু হল লক্ষ্মীপুজো।

অমলের দাদুকে সব কথা গুছিয়ে বলার দায়িত্ব নিয়েছিলেন দাদু। তিনি কী বুঝিয়েছেন কে জানে, ওরা দেখল পুজোর সময় যথারীতি ঢাক বাজছে। তবে পায়ের জন্য শুধু আরতির সময়েই ঢাক মাটিতে বসিয়ে বাজিয়েছেন উনি। রাতে অমলের দাদুর খেতে না আসাটা নতুনদিদার নজর এড়ায়নি। পুজো শেষ হতে নিজে গিয়ে ওঁকে একটু ফল প্রসাদ মুখে তুলতে বাধ্য করলেন। ওরা আর অমলের দাদুর মুখোমুখি হয়নি। বুড়ো মানুষটাকে কী বলে সান্ত্বনা দেবে? বড়োদের ওপর ভারটা ছেড়ে দেওয়াই ভালো।

সারা সন্ধে বিশ্রীরকমের মনখারাপ নিয়ে ঘোরাঘুরি করেছে ওরা। নতুনদিদা আর দাদুদের জন্যও খুব মনখারাপ হচ্ছে বাবুইর। ভালো কিছু আর আশা করা যাচ্ছে না। টুবলু একবার বলছিল, “আমার মনে হচ্ছে পশুপাখিদের আওয়াজেই মারুতিওলাদের আসার খবরটা আগাম পেয়েছিল ও। যাতে মূর্তি চিরতরে হারাতে না হয়, চটজলদি ওই কাণ্ড করেছে। কিন্তু না ফেরার কারণ সত্যি বুঝছি না।”

রাতে ঘুম না আসায় বাইরের বারান্দায় পায়চারি করছিল বাবুই। গোল সোনালি কাগজের চাকতির মতো চাঁদ উঠেছে আকাশে। ভারি সুন্দর আলো হয়েছে চারদিকে। কিন্তু সেদিকে তাকানোরও সময় নেই। মাথার মধ্যে ঘুরছে একটাই কথা—অমলের এই অদ্ভুত আচরণের অর্থ কী? লক্ষ্মীপুজোটাই মাটি করে দিয়ে গেল।

দাদু উঠে এলেন বিছানা ছেড়ে।—”তোমাকে একটা কথা বলার আছে। এই বিপদের দিনে এদের ছেড়ে তো আমি যেতে পারব না। তোমাকে যদি বাসে তুলে দিই, তুমি একা একা চলে যেতে পারবে তো?”

ও হাঁ করে তাকিয়ে রইল দাদুর দিকে। তারপর বলল, “তুমি আমাকে পাঠিয়ে দেবার কথা ভাবলে কী করে? অমলের দাদুর পাশেও তো আমাদেরই থাকতে হবে। আমি যাচ্ছি না। পড়াশুনার ক্ষতি আমি ম্যানেজ করতে পারব। তুমি প্লিজ মাকে একটু বুঝিও। অমল না ফিরে আসা অবধি আমাকে এখানেই থাকতে হবে।”

দাদু হাসলেন।—”ভুল কিছু বলোনি। দেখি কী করা যায়। তবে এখন শুতে এসো। খোলা বারান্দায় হিম পড়ছে। ঠান্ডা লেগে যাবে।”

শুয়ে শুয়ে ভাবছিল বাবুই। ছেলেটা গেল কোথায়? মারুতিওলারা কতটা কী বুঝেছে, সেটা ওরাই জানে। অমলকে ধরে ওরা আটকে রাখেনি তো? ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে। সকালে উঠে ও টুবলুর কাছে গেল। আর তখনই নতুনদিদা বললেন, “গতকাল একটা ভুল হয়ে গিয়েছে। আসলে ওই কাণ্ডের পর  মাথা কাজ করছিল না। সাধুবাবা পুজো করলেন, কিন্তু ওঁর সিধে, প্রণামী সঙ্গে নিয়ে গিয়েও দিতে ভুল হয়ে গেল। তোরা একটু নিয়ে যা। উনি শুনেছি শিবের মন্দিরেই আছেন। দিয়ে আয়।”

প্রস্তাবটা বেশ মনের মতো হল ওদের। এই সুযোগে সাধুবাবাকে ঘটনাটার কথা জানিয়ে কিছু উপদেশ নেওয়া যেতে পারে।

কিছুটা বেলা বেড়েছে তখন। হরিপুরের রাস্তায় দুটো সাইকেল শিবমন্দিরের দিকে এগোচ্ছিল। বাবুই একবার বলেছিল, “দুটো সাইকেল কী হবে? তোকে আমিই ডাবল ক্যারি করতে পারব।”

টুবলু বলেছিল, “না বাবুইদা, দুটো সাইকেলই থাক। যদি অমল ফেরে তখন তো একটা সাইকেলে কুলোবে না।”

বাবুইর সাইকেলে ঝোলানো ব্যাগটাতে সাধুবাবার যাবতীয় জিনিস আছে। যেতে যেতে ওরা আর একটা বিষয় নিয়েও আলোচনা করছিল। শ্রীহরি পুজোয় যে বিষ্ণুর ওই দুর্লভ মূর্তিটি পুজো করা হয়, সে-কথা ওই মারুতিওলারা  জানল কী করে? বাড়ির লোক ছাড়া কথাটা তো কারোর জানার নয়। ওরা শুধু জানলই না, সময়মতো ওখানে পৌঁছেও গেল। ঘটনাটার মধ্যে একটা রহস্য নিশ্চয়ই আছে।

গত সন্ধেয় কমলাদি একবার অমলের দাদুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। কীভাবে যেন অমলের না ফেরার ব্যাপারটা তার কানে গিয়েছে। হয়তো নকুলদাই বলেছে। বাবুইদের সঙ্গে দেখা করে কমলাদি বলে গিয়েছে, “এরা আমাকে ক্রমাগত শাসাচ্ছে। আমার বাছুরটাকে মারল। এর পরে আরও কী ধরনের ক্ষতি করবে বুঝতে পারছি না। মারাও যেতে পারি। তবে আমি মরলে একটা জিনিস খেয়াল রেখো, আমার ঘরেদোরে না আমার ওই শয়তান ভাশুরপো ঢোকে, আর তার দলবল দখল নেয়। তাহলে আমি মরেও শান্তি পাব না।”

ওরা চুপ করে ছিল। ঠিক ধরতে পারছিল না এখনও কেন ওরা কমলাদিকে শাসাচ্ছে।

সাধুবাবা মন্দিরের ভেতরেই ছিলেন। ওরা গিয়ে ওঁকে সব জিনিসপত্র দিয়ে অমল সংক্রান্ত ঘটনাটা জানাল। উনি চুপ করে শুনলেন। কোনও মন্তব্য করলেন না। শুধু বাবুই যখন জানতে চাইল এ-ব্যাপারে তাদের করণীয় কী, উনি একটা অদ্ভুত কথা বললেন।—”ধরো একটা ঝড় উঠেছে। ঝড়ের পর পৃথিবী আবার শান্ত হয় তো? তোমরা অপেক্ষা কর। কিছু না কিছু সমাধান তো হবেই।”

বার বার ওরা অমলের কথা বলতে চাইল। উনি একেবারেই পাত্তা দিলেন না।

ওরা একটু মনখারাপ নিয়েই বাড়ি ফিরেছে। সাধুবাবার কাছে যে আশা নিয়ে ওরা গিয়েছিল তা মেটেনি। সকালেও অমল না ফেরায় থানায় ডায়েরি করা হয়েছে। সেই সূত্রে পুলিশ আসায় আর একটা খারাপ খবরও কানে এল ওদের। হরিপুরে নাকি জোর গুজব রটেছে কমলাদি একজন ডাইনি।

সকাল থেকে আশেপাশের কিছু লোক জড়ো হয়েছিল কমলাদির বাড়ির সামনে। তারা গালাগালি দিয়ে বলছিল, কমলাদি নিজের গোরুর বাছুরের রক্ত চুষে খেয়েছে। অমল বলে যে ছেলেটা নিখোঁজ হয়েছে, তার পেছনেও কমলাদির হাত। কমলাদিকে শাস্তি না দিলে এসবের সমাধান হবে না।

বাবুই খুব অবাক হয়েছিল। এখনও এসব আছে নাকি? কিন্তু অলকদাদু আর পুলকদাদু খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এদিককার গ্রামে একবার কাউকে ডাইনি বলে রটিয়ে দিলে ভয়ংকর কাণ্ড হতে পারে। গ্রামের লোকেরা নিজেরাই বিচার করে তাকে শাস্তি দিয়ে দেয়। কখনো-বা তার চুল কেটে মুখে চুনকালি মাখিয়ে তাকে সারা গ্রাম ঘোরায়। আবার অনেক সময় তাকে প্রাণে মেরে দেয়।

নতুনদিদা কমলাদিকে ডেকে পাঠিয়ে কত করে বললেন, “এ-বাড়িতে এসে ক’দিন না-হয় থাক।”

কমলাদি কিছুতেই শুনল না। তার এক কথা—”আপনারা কি সারাজীবন আমাকে পাহারা দিয়ে রাখতে পারবেন? তার থেকে যা হয় হোক, আমার বাড়ি ছেড়ে আমি এক পা নড়ব না।”

আর কোনও উপায় না পেয়ে অলকদাদু আর পুলকদাদু দুজনেই ছুটলেন থানায়। থানার অফিসার কিছুই করে উঠতে পারলেন না। পুজোর সময়, অনেকেই ছুটি নিয়ে বসে আছে। তাছাড়া দু-দুটো ব্যাংকে ডাকাতির পর আশেপাশের গ্রামীণ ব্যাংকেও পাহারা রাখতে হয়েছে। এ অবস্থায় কমলাদির বাড়িতে পাহারা রাখা সম্ভব নয়। তবে কোনও খবর পেলে তারা নির্ঘাত আসবেন।

একে তো বিরাট ক্ষতি হয়েই গেছে, তার ওপর আবার অমলের দাদু পুজো-বাড়িতে বসে—অমল উধাও। কমলাদির ঘটনাটা দাঁড়াল গোদের ওপর বিষফোঁড়া। কোনও সমাধান সূত্রই পাওয়া যাচ্ছে না।

দুপুরে খেতে বসে পুলকদাদু আর অলকদাদু একটা কথাও বলছিলেন না। ওরাও চুপচাপ খেয়ে উঠে পড়ল। শুধু দাদু একবার বললেন, “অনেকগুলো জট পাকিয়েছে। সমাধান সহজ নয়। তবে সব ছেড়ে কমলা আর অমলের ব্যাপার নিয়েই মাথা ঘামাতে হবে। দু-দুটো মানুষের বাঁচা-মরা তো ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না।”

***

কমলাদির যে খুবই দুর্ভাগ্য চলছে, সেটা আর কাউকে বলে দিতে হবে না। সেদিন সংসারের জিনিস ফুরিয়ে যাওয়ায় একা-একাই হাটে গিয়েছিল। কিছু কেনাকাটি করার পর হঠাৎ কেউ কেউ বলতে শুরু করে—”ওই দেখো ডাইনি, ওই যে…”

কথাটা কানে আসার পর কমলাদি ওখানে না দাঁড়িয়ে লুকিয়ে পড়ে। তারপর দেখে বেশ কিছু লোকের মুখে মুখেই ‘ডাইনি’ কথাটা ঘুরছে। কোনোরকমে লুকিয়ে দৌড়তে দৌড়তে এ-বাড়ি চলে আসে। দৌড়ে ফেরার সময় কিছু বাচ্চা ছেলে ‘ডাইনি, ডাইনি’ বলে ঢিল ছুড়তে ছুড়তে পিছু নিয়েছিল। কমলাদি দৌড়তে দৌড়তে এ-বাড়িতে এসে সদর দরজায় খিল দিয়ে মাটিতেই বসে পড়ে। ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। মুখ-চোখ লাল।

সে-সময় নকুলদা ছিল। সে-ই পরে ওদের সব বলল। কমলাদি নাকি নতুনদিদার কাছে কান্নাকাটি করে বলেছে, “আমি কারও সাতে-পাঁচে থাকি না। কেন এরা মিছিমিছি আমার নামে এসব রটাচ্ছে? আমার বাছুরের রক্ত আমিই খেয়েছি—এমন কথা ওদের মাথায় আসে কী করে?”

নতুনদিদা বার বার একই অনুরোধ করছিলেন।—”কমলা, আমার কথা রাখো। তুমি ক’টা দিন এ-বাড়িতে রাত কাটাও। তারপর পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে নিজের বাড়িতে চলে যেয়ো।”

কমলাদির মুখে সেই এক উত্তর।—”আমার পক্ষে কোথাও থাকা সম্ভব নয়। আমাকে রাতে বাড়ি ফিরতেই হবে, তাতে বাঁচি আর মরি। আপনি কিছু মনে করবেন না গিন্নিমা।”

সমস্যা হল কে কাকে সামলাবে? এদিকে মূর্তি হারিয়ে নতুনদিদা গুম হয়ে আছেন। ওদিকে অমল এখনও ফিরল না। আর কমলাদির তো বিপদের ওপর বিপদ লেগেই আছে। কালু ফিরল তো বাছুর গেল। বাড়িতে কে বা কারা মশাল ছুড়ল। আবার এখন ডাইনির অপবাদ দিয়ে লোক খ্যাপানো চলছে। মানসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাই দায় হয়েছে মানুষটার।

ওদিকে বীণামাসির বর অনেকটা সুস্থ হওয়ায় মা আর বাবা ব্যাঙ্গালোরের পাট মিটিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। ফিরেই মা ফোন করতে শুরু করেছেন। বক্তব্য একটাই—”বাবুই, কবে ফিরবে? পড়াশুনার খুব ক্ষতি হচ্ছে। তাছাড়া পুজো শেষ, আর থাকার কী দরকার?”

সকালে বৈঠকখানা ঘরে এসব নিয়েই আলোচনা চলছিল। হঠাৎ অমলের দাদু এসে দাঁড়ালেন। ওঁর পা এখন অনেকটা ভালো। উনি অলকদাদুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাবু, আমার একটি নিবেদন আছে। সেই কবে পুজোর পঞ্চমীতে ঢাক বাজাতে এসেছি। বিপদে পড়ে আটকা আছি। নাতি না ফিরলেও আমার এবার যাওয়া উচিত। ওর বাবা-মা না-হলে দুষবে আমায়। ওরা একটাও খপর পায়নি কিনা। তাছাড়া শুধু শুধু আর কতদিন আপনাদের অন্ন ধ্বংস করব বলতে পারেন?”

অলকদাদু কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন। তাঁকে থামিয়ে দিয়ে দাদু বললেন, “আমরা সবাই বিপদে। এ-সময় আমাদের ছেড়ে যাবার কথা ভাবছ কী করে?”

অমলের দাদু কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই নকুলদা হিড়হিড় করে হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে এল নতুন ড্রাইভারকে। তার মুখ প্রায় কাঁদোকাঁদো। নকুলদা উত্তেজিত হয়ে বলে, “এ বৈঠকখানা ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আড়ি পেতে আপনাদের কথা শুনছিল।”

পুলকদাদু বলেন, “এই তাহলে ওদের চর। পুলিশে ফোন করছি। যা ব্যবস্থা নেবার ওরাই নিক।”

ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে পুলকদাদুর হাতে পায়ে ধরছিল।—”আমাকে পুলিশে দেবেন না। আমি কিছু জানি না। এমনি দাঁড়িয়ে ছিলাম।”

অলকদাদু কথা না বাড়িয়ে পুলিশে জানানোর জন্য ফোন নিয়ে বাইরে গেলেন।

***

তখন সন্ধে হব হব, দিঘির বাঁধানো সিঁড়িতে মনমরা হয়ে বসে ছিল বাবুই আর টুবলু। লক্ষ্মীপুজো হয়েছে দু-দিন আগে। চাঁদের আলো কমছে ক্রমশ। লক্ষ্মীপুজোর দিন থেকেই সব গোলমালের সূত্রপাত। অমলের সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন পারিবারিক মূর্তি উধাও, কমলাদির নানান বিপদ। ওরা আশায় আশায় আছে। কিন্তু এখনও অবধি কোনই সুরাহা হল না।

এদিকে মায়ের তাগাদার চোটে দাদু ঠিক করেছেন সমস্যা না মিটলেও এখানে আর বসে থাকা যাবে না। বাবুইকে নিয়ে তিনি দু-একদিনের মধ্যেই রওনা দেবেন। যাবার আগে বাবুইর সঙ্গে অমলের দেখা হবে না হয়তো। দেখা হলে বাবুই অবশ্যই জানতে চাইত এমন আচরণের অর্থ কী।

হঠাৎ ঝাউগাছের ঘন ঝোপের পেছন থেকে একটা ঘেউ ঘেউ আওয়াজ শোনা যেতেই ওরা চমকে গেল। ওখানে কুকুর আছে নাকি? ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়াতেই নীচু স্বরে ‘আমি গো আমি’ বলতে বলতে বেরিয়ে এল অমল। চোখ-মুখের অবস্থা খারাপ না হলেও সেই এক জামাকাপড়ে ওকে খুব বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। কুকুরের ডাকের থেকেও আরও বেশি চমকাল ওরা।

এগিয়ে আসতে আসতে অমল বলল, “জানি, আমাকে তোমরা সবাই ভুল বুঝেছ। কিন্তু আমার আর কোনও উপায় ছিল না। তবে সে-সব কথা পরে হবে। আজ রাত আটটা বাজলে এখানে একটা কাণ্ড হবে। মূল ভূমিকায় থাকব আমরা তিনজন। তার কিছু গোছগাছ আছে। সেই ব্যাপারটা নিয়ে তোমাদের কিছু জানাতে হবে। শুরু করি?” ওদের কথা বলতে না দিয়েই ও আলোচনা আরম্ভ করে দিল।

মাঝে-মাঝে অমলের বয়স নিয়ে বাবুইর খুব সন্দেহ হয়। ওদের মধ্যে সবচেয়ে নীচু ক্লাসে পড়েও ও—এত বুদ্ধি ধরে কী করে? অমলের কাছে ওরা জেনেছিল, সেভেনে পড়লেও টুবলুর থেকে ও কয়েকমাসের বড়ো। কিন্তু টুবলু বা বাবুইর সঙ্গে ওর প্রতিটি দিন কাটানোর বিস্তর ফারাক। প্রতিদিন ভোরে উঠে ওকে মাঠে যেতে হয়। সেখানে গিয়ে গাছের গোড়ার মাটির ঢেলা ভাঙা, আগাছা পরিষ্কার, বাবাকে ধানগাছ পোঁতায় সাহায্য করা—আরও অনেকরকম মাঠের কাজ করতে হয়। তারপর ছুটি। দৌড়তে দৌড়তে বাড়ি এসে তৈরি হয়ে রোজ মাইল দুয়েক দূরের স্কুলে হেঁটে হেঁটে যেতে হয়। এসব মাঠের কাজের জন্যই গ্রামের ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়তে যেতে চায় না। মাঝে-মাঝেই কামাই করে। ‘স্কুলছুট’ হওয়া, মানে একেবারে ছেড়ে দেওয়া তো প্রায় ঘটে। এখন অবশ্য স্কুলগুলোতে দুপুরে খাওয়ানোর ফলে স্কুলছুটের সংখ্যা অনেক কমেছে। অমল কিন্তু একদিনও স্কুল কামাই করে না। ক্লাসে প্রথমও হয়। ওর বুদ্ধির তারিফ করেন মাস্টারমশাইরা।

অমলের কথামতো ওরা প্রথমে গেল কমলাদির বাড়িতে। সন্ধেবেলা, পথঘাট শুনশান! সবাই যে-যার মতো টিভি চালিয়ে ঘরেই বসে আছে। সেই সুযোগে কমলাদির বাড়িতে এল ওরা। তারপর একটা দুটো গোরু রেখে কমলাদির বাকি গোরু-বাছুরের দলকে হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে টুবলুদের বাড়ির নীচের চাতালে বেঁধে রাখল। পেছন পেছন এল কমলাদি।

অমলকে কমলাদি বার বার বলছিল, “যদি একটু সময় দিতে আমার দরকারি কিছু জিনিস নিয়ে আসতাম।”

অমল একেবারে রাজি হল না। বলল, যেভাবে ভেবেছি তোমার কিছু ক্ষতি হবে না। যদি হয়ও, বেঁচে থাকলে সবকিছুই সামলে নেওয়া যাবে। ওসব নিয়ে ভেবো না। শুধু টাকাপয়সা গয়নাগাটির মতো মূল্যবান জিনিসগুলো নিয়ে বেরিয়ে এসো।”

তখন সাতটা হবে, কমলাদির গোয়ালের খড়ের চালে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে কমলাদি বাড়ির সামনে এসে চিৎকার করে কান্না জুড়ল।—”ও মা গো, আমার ঘর পুড়ে গেল। কে কোথায় আছো, আমাকে বাঁচাও, আমার গোরুদের বাঁচাও।”

কমলাদির চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে গোরুদের আর্ত হাম্বা হাম্বা আওয়াজ শুনে যে যেখানে ছিল ছুটে এসে বাড়ির চালে বালতি, হাঁড়ি করে জল ঢালতে আরম্ভ করল।

কেউ কেউ আবার বলছিল, “ডাইনির বাড়িতে আগুন লেগেছে, বেশ হয়েছে। ওই বুড়ি পুড়ে মরলে আরও ভালো হত। জল ঢালছ কী করতে?”

নকুলদার সঙ্গে টুবলু আর বুবাইও ছুটে এসেছে। ওরাও কমলাদির বাড়ির পাশের ছোটো পুকুর থেকে জল তুলছিল ঢালবে বলে। ঠিক সেই সময় জোরে এসে ব্রেক কষল লাল মারুতি। নেমে এল বাসে দেখা, শ্রীহরির ভাঙা স্তূপে দেখা, কালো ট্রাংক রাখার জন্য মাটি খুঁড়তে দেখা সেই চারজন মানুষ। কোনও কথা না বলে আগুন লাগা সত্ত্বেও তারা ঢুকে গেল গোয়ালঘরে। আর দুজনে দু-দিকে ধরে একটা একটা করে কালো ট্রাংক নিয়ে এল বাইরে। মাটিতে নামিয়ে আবার আরও চারটে কালো ট্রাংক—মোট ছ’টা ট্রাংক এক এক করে বাইরে আনতেই বাঁশি বেজে উঠল হঠাৎ। আর চারজনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়ল জনা দশেক ইউনিফর্ম পরা পুলিশ। তাদের ঠিক মাঝ থেকে বেরিয়ে এলেন সেই পুলিশ অফিসার। হাসিমুখে ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ব্যাংক ডাকাতির টাকাগুলো হজম হল না তো? একেবারে বমাল সমেত গ্রেপ্তার।”

ডাকাতদের মুখগুলো তখন দেখবার মতো! রাগে, দুঃখে, হতাশায়—নাকি আগুনের আভায়, একেবারে লাল টুকটুকে হয়ে গিয়েছে! বাবুইর খুব আপসোস হচ্ছিল ক্যামেরাটা সঙ্গে আনেনি বলে। অফিসার এবার পেছন ফিরে হাঁক দিলেন, “অমল, অমল, বেরিয়ে এসো। দেখো তোমরা, এই বাচ্চা ছেলের বুদ্ধির কাছে গোহারান হেরে গেলে।”

ওরা বাঘের জ্বলন্ত চোখে তখন দেখছে অমলকে। পারলে ছিঁড়ে খেয়ে নেয়। আর অমল মিটিমিটি হাসছে।

আগুন লোকজনেরা নিভিয়ে দিল জল ঢেলে। পুলিশ অফিসার অপরাধীদের নিয়ে চলে যাবার আগে অমলের দিকে এগিয়ে এসে ওর হাত ঝাঁকিয়ে বললেন, “তোমার চমৎকার বুদ্ধি আর সাহসের জন্যই এই ডাকাতগুলো ধরা পড়ল। আমি তোমার নাম রেকমেন্ড করব যাতে তুমি সাহসিকতার জন্য সরকারি পুরস্কার পেতে পারো।”

অফিসার গাড়িতে ডাকাতদের নিয়ে চলে যেতে ভিড় পাতলা হতে শুরু করল। গ্রামের লোকেরা ফিরে যাবার উদ্যোগ নিতেই দাদু এগিয়ে এসে বললেন, “দাঁড়ান আপনারা। কেন কমলাকে ডাইনি বলে প্রচার করা হচ্ছিল, এতদিনে বুঝেছেন আশা করি। ওই চুরি করা ব্যাংকের টাকার ট্রাংকগুলো ওকে ভয় দেখিয়ে ওর বাড়িতেই রেখেছিল ডাকাতরা। কেউ যাতে ওর বাড়ির ধারে-পাশে না ঘেঁষে তাই এই রটনা। কী যা-তা কথাই না রটানো হচ্ছিল—ও নিজের গোরুর বাছুরের রক্ত খেয়েছে, অমলকে ওর জন্যই পাওয়া যাচ্ছে না। এই তো অমল, আপনাদের চোখের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। আর বাকি বাজে কথাটার তো কোনও মানেই হয় না। যাই হোক, আপনারা নিশ্চয়ই এবার সবটা বুঝেছেন?”

দাদুর কথা শেষ হতে ওরা দেখল একপাশে দাঁড়িয়ে যে লোকটা মন দিয়ে দাদুর কথা শুনছিল, সে এগিয়ে এসেছে।—”ঠিকই বলেছেন মেসোমশায়, ভুল আমাদের। তবে আপনারা ভাববেন না। কমলাদিকে আর কেউ কিছু বলবে না। এই হারু ঘোষ সেই দায়িত্ব নিল।”

কমলাদি গোয়ালঘরের কী কী ক্ষতি হল দেখছিল। অমল ওদের এসে বলল, “চলো কমলাদির গোরুগুলো ভেতর বাড়ি থেকে ফেরত আনি।”

গোরু নিয়ে ফেরার পথে টুবলু একবার তাকাল বাবুইর দিকে। তারপর অমলকে এক ঠেলা দিয়ে বলল, “তোরও কিন্তু এই গোরুদের সঙ্গে একরাত্রি গোয়ালে কাটালে ভালো হয়।”

বাবুই সায় দিল।—”হ্যাঁ, হাম্বা হাম্বা ডাকটা আরও নিখুঁত হবে তাহলে। মানে ওরা রাতে কীরকম ডাকে, দিনে কীরকম ডাকে—সবটাই নিখুঁতভাবে শেখা হয়ে যাবে। আজ বিপদ এলে গোরুরা কেমন ডাকে তা তো দেখালি। আনন্দ হলে কেমন ডাকে শোনা হয়নি কিন্তু।”

ওরা কমলাদির বাড়ির সামনে এসে পড়েছে তখন। অমল কোনও কথা না বলে এক হাতে গোরুর দড়ি সামলে আর এক হাত মুখে চাপা দিয়ে এমন হাম্বা করে ডাক ছাড়ল যে, কমলাদি দরজা খুলে গোরু দেখতে চলে এল। গোরুরা চমকে গেল কি না ওরা অবশ্য বোঝেনি। গোরুদের ভাষা তো বোঝা যায় না। তবে অনেকদিন বাদে প্রাণ খুলে হাসছিল ওরা তিনজন।

***

অনেক ঝামেলার পর সেদিন রাতে বেশ কিছুটা সমস্যা মিটেছে বলে খাওয়ার টেবিলে বেশ জমজমাট আসর  বসেছিল। নতুনদিদা পরিবেশন করতে করতে বললেন, “তোমরা তো দেখছি বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়েছ। আমার ঠাকুরের কী হল? তার দেখা তো এখনও পাইনি। কী রে অমল, কিছু বল! আমি যে অস্থির হয়ে আছি!”

যেন কিছু কানে ঢোকেনি এমন নির্লিপ্ত মুখেই রুটি ছিঁড়ে মাংসের ঝোলে ডোবাচ্ছিল অমল। আড়চোখে আড়চোখে সেদিকে তাকিয়ে দেখছিল সবাই।

শুধু দাদু হেসে বললেন, “ও নিয়ে তুমি ভেবো না। অমল এসেছে যখন, মূর্তিও ফিরবে নিশ্চয়ই। কী রে অমল, আর  বোবা হয়ে থাকিস না বাবা।”

সবাইকে অবাক করে এবারও অমল সাড়াশব্দ করে না। পায়েসের বাটিতে চামচ ডুবিয়ে ও পায়েস খেতেই ব্যস্ত। অলকদাদু হাঁ করে ওকে দেখছেন। পুলকদাদু একবার তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। বাবুই দেখে টুবলুও কোনও কথা না বলে আড়চোখে মাঝে-মাঝেই দেখছে অমলের হাবভাব। ওর অসহ্য লাগে। অমল কী ভেবেছে? এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে এভাবে চুপ করে থাকলে চলে কি? ওদেরও কিছু বলল না এখনও অবধি। অমলকে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ‘আসব?’ বলে অনুমতি নিয়ে ঘরে ঢোকেন অমলের দাদু। পায়ের প্লাস্টার কাটা হলেও হাঁটা এখনও স্বাভাবিক হয়নি। হাতে একটা দুধের ক্যান। ওঁকে একটা টুলে বসিয়ে মুখ ধোয় সবাই।

উনি বলেন, “এই দুধের ক্যানটা ধরুন গিন্নিমা। কমলা এর ভেতরের জিনিসটা আমাকে রাখতে দিয়েছিল। বলেছিল সময় আসার জন্য আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। ততদিন যেন জিনিসটা নিরাপদে রাখি। তারপর আপনার হাতে তুলে দিই। কালপরশু তো বাড়িই চলে যাব, আর ডাকাতের দল তো ধরাই পড়েছে। তাই এটা আপনাকে দিতে এলাম।”

নতুনদিদা প্রায় দৌড়ে এসে ক্যানের মধ্যে থেকে বাক্সটা বার করেন। লাল ভেলভেটের চমৎকার বাক্স। মাটিতে গঙ্গাজলের ছিটে দিয়ে বাক্সটা সেখানে রাখেন। নিজে মাথা নীচু করে প্রণাম করেন। তারপর হাতে তুলে নেন ওই বাক্সটা।

উত্তেজনায় কখন যে ওরা বাক্সটার একদম কাছে চলে গিয়েছে। নতুনদিদা ঢাকনা তুলে ধরতেই দেখা দেন তিনি। সেই অপূর্ব শ্রীহরি মূর্তি! তাঁর সোনা-হিরের গয়না ঝকঝক করে ওঠে।

দাদু প্রথম বলে ওঠেন, “জয়, শ্রীহরির জয়।”

ওরাও বলে, “জয়, শ্রীহরির জয়।”

সারা ঘর হরিধ্বনিতে গমগম করে।

অলকদাদুকে নিয়ে নতুনদিদা তাড়াতাড়ি দোতলায় উঠে যান। পারিবারিক গুপ্ত বাসস্থানে শ্রীহরিকে রেখে  তিনি নিজে নীচে খাওয়া সারতে নামবেন।

অমলের দাদু চলে গিয়েছেন। অমল চুপ করে বসে আছে সোফায়। যেন কিছুই ঘটেনি। এবার পুলকদাদু বলেন, “সব সমস্যাই মিটেছে। দাদা আর বৌদি নামলে আমাদের গুছিয়ে বল তো সেদিন ঠিক কী কী ঘটেছিল? তুই-বা এতদিন কোথায় ঘাপটি মেরে ছিলিস?”

নতুনদিদা খাওয়ার টেবিলে বসতেই অমল তার কাহিনি শুরু করে।

“আপনাদের সঙ্গেই তো সেই শ্রীহরির পুজোয় যাচ্ছিলাম। হঠাৎ বুঝলাম কেউ আসছে, যারা মূর্তি উঠিয়ে নিয়ে চলে যাবে।”

“তুই বুঝলি কী করে?”

“সে-কথা বলা যাবে না। তবে সার্কাসের তাঁবুতে একদিন খোঁজ নিয়েছিলাম। একটা ছোটো ছেলে আমায় বলে চারজন লোক কী একটা মূল্যবান জিনিসের খোঁজে হরিপুরে ঘাঁটি গেড়েছে। ওদের ম্যানেজারকে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে তাঁবুতে ওদের জায়গা দিতে বাধ্য করেছে।”

“কিন্তু সেদিন হঠাৎ যে ওরাই আসছে, তুমি জানলে কী করে?” পুলকদাদু চেপে ধরেন অমলকে।

অমল ওদের চোখের ইশারা করে যাতে ওরা না বলে দেয়। তারপর বলে, “সেটা না-হয় নাই বললাম। যাই হোক, আমি তো মূর্তি বুকে নিয়ে দৌড়চ্ছি—কোথায় যাব, কীভাবে শ্রীহরির মূর্তি বাঁচাব কিছুই বুঝতে পারছি না। হঠাৎ আমার হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে ওই মন্দিরের সাধুবাবা জঙ্গলের দিকে আমাকে নিয়ে ছুটলেন। সেখানে একটা জায়গায় গোল কুয়োর মতো গর্তে লাফাতেই একটা সুড়ঙ্গ পথের দেখা পাওয়া গেল। তার মধ্যে আমরা দুজনে সেঁধোলাম আর গোপন পথে কালীমন্দিরের পেছনে পৌঁছলাম। এতদিন সেখানেই আমাকে রেখে দেন সাধুবাবা। সবদিন ভাত জোটেনি। ফলমূল খেয়েই কাটিয়েছি। মাঝে রাতের অন্ধকারে একদিন এসে কমলাদিকে ওই বাক্স দিয়ে ওটার ব্যাপারে কী করতে হবে বলে যাই।”

“ও, তাই কমলাদি তোর দাদুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল? এবার বুঝতে পারছি।” বাবুই বলে ওঠে।

“ডাকাত ধরার প্ল্যান কে করল?” এ-প্রশ্ন পুলকদাদুর।

“আমরা তিনজনে। ওই দিঘির ধারে বসে। কেননা আমি জানতাম আগুন লাগলে ওরা ছুটে আসবেই। অতগুলো টাকা না বাঁচালে হয়? আর পুলিশকাকুকে জানিয়ে আসতে বলি আমিই।”

“কী করে এত শিওর হলি যে ওরা আসবেই?” এবার নতুনদিদা জানতে চান।

আবার একদিন সকালে গা-ঢাকা দিয়ে দেখতে গেছিলাম ওদের মাটিতে পোঁতা টাকার বাক্স। ওরা মাটি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে সে-সব গাড়িতে তুলছিল। তারপর কমলাদিকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি ওই গোয়ালঘরেই টাকার ট্রাংক মাটিতে বিচুলি চাপা দিয়ে রেখেছে। কমলাদি পুলিশে জানালে কমলাদিকে মেরে দেবে বলে ভয়ও দেখিয়েছে। কমলাদির বরের ওই ভাইপো বলেছিল, বেশিদিন নয়, পুলিশের ধরপাকড়, রাস্তায় গাড়ির চেকিং একটু কমলে আমরা ট্রাংকগুলো সরিয়ে দেব।”

অমল হাসে এবার।—”জানো বাবুইদা, তারপর কী করে ওদের ধরা যায় তা নিয়ে আমি একটু মাথা ঘামাই। তবে একটা ভুল করেছি। এভাবে আগুন লাগালে আরও বড়ো ক্ষতি হতে পারত। তারপরের কথা আর বলছি না। সে-সব তো সবার সামনেই ঘটেছে।”

দাদু বলেন, “চমৎকার। এবারে একটা ঘোষণা করি। সামনের বছর স্কুল সেশনের একদম প্রথমেই অমলকে নিয়ে যাব কলকাতায়। আমাদের বাড়িতে থেকে পড়াশুনা করে ওর স্বপ্ন পূরণ করবে ও।”

পাশ থেকে পুলকদাদু ফোড়ন কাটেন, “টুবলুকেও ওখানেই পাঠিয়ে দেব। না-হলে এখনকার ‘বীরপুরুষ’টির আবার ‘ভিতুরাম’ হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে।”

বাবুই আনন্দে লাফিয়ে ওঠে—”সত্যি অমলকে তুমি নিয়ে যাবে দাদু? টুবলুও যাবে? তাহলে তো আমরা থ্রি মাস্কেটিয়ার্স হব! থ্রি চিয়ার্স ফর দাদু, হিপ হিপ হুররে।”

অমল আর টুবলু প্রথমে একটু থতমত খায়। তারপর ওদের বাবুইদার সঙ্গে গলা মেলায়।

uponyasharipureharbola (1)

ছবি মৌসুমী

জয়ঢাকের গল্পঘর

1 thought on “সম্পূর্ণ উপন্যাস-হরিপুরে হরবোলা- সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়-শরৎ ২০২৩

  1. রহস্য রোমাঞ্চ আর ভালোবাসায় মাখামাখি একটি উপন্যাস।

Leave a Reply to DebjaniCancel reply