উপন্যাস-দুর্ধর্ষ চার ডাকাতের গল্প-রাজীব রায় গোস্বামী-শরত ২০২৫

তালগাছের ছায়াটা লম্বা হতে হতে পাকুড় গাছের শরীরে মিলিয়ে গেছে বেশ খানিক আগে। গেরস্ত বাড়ির তুলসীমঞ্চে জ্বলে উঠতে শুরু করেছে সন্ধ্যা-প্রদীপ। কিন্তু, চাঙড়িপোতা রেলের মাঠে যে রুদ্ধশ্বাস লড়াই শুরু হয়েছিল সেই বিকালবেলা, তা এখনও থামেনি। মাহিনগর আর চাঙড়িপোতার মানুষজনের তুমুল হট্টগোলে, ঘরে ফেরা পাখিরাও সহসা গেছে হকচকিয়ে।

চলছে মহারণ। একেবারে সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি যাকে বলে। বিশ্রামের পর খেলা শুরু হতেই একটা গোল দিয়েছিল চাঙড়িপোতা। কিন্তু চাঙড়িপোতার সমর্থকদের হনুমান লম্ফ খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। একটু থিতু হতে না হতেই সেই গোল শোধ করে দিয়েছে মাহিনগর।

চাঙড়িপোতা কৃষক সমিতির ফুটবল দলের নাম চারদিকে চাউর হয়েছে বেশ কিছুদিন আগেই। কিন্তু তাদের একচ্ছত্র আধিপত্যে ইদানীং ভাগ বসাতে শুরু করেছিল মাহিনগর ব্যবসায়ী সমিতি। শোনা যাচ্ছিল খাসমল্লিকপুর, বারুইপুর, গোবিন্দপুর সব দলকেই নাকি তারা বেশ নাকানিচোবানি খাইয়েছে। এইসব দেখে কেউ কেউ এও বলাবলি করতে শুরু করেছিল যে, চাঙড়িপোতার ফুটবল দলও নাকি এঁটে উঠবে না মাহিনগরের সঙ্গে।

যারা খেলা শুরু করেছে মাত্র বছর দুয়েক হল, তাদের এত দাপট কী আর সহ্য করা যায়! কাজেই, সেই দলকে সম্মুখ সমরে আহ্বান করেছিল চাঙড়িপোতা কৃষক সমিতি। কিন্তু যে দেখা যাচ্ছে খাল কেটে কুমির আনা!

গোল্লা-ছুটের এই খেলা শহর ছাড়িয়ে গাঁয়ে গঞ্জে যে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে তা ভাবা যায়নি মোটে। শোভাবাজার দল তৈরির পর থেকেই কলকাতার আনাচে কানাচে ফুটবল খেলা ছড়িয়ে পড়ার খবর আসছিল। মোহনবাগান অ্যাথেলিটিক ক্লাবের পত্তন হবার পর থেকে তো আর কথাই নেই। ছড়াতে শুরু করেছে গাঁয়ে গঞ্জেও। আগে যেখানে কবাডি কিম্বা খোখো ম্যাচ হত এখন সেই জায়গায় ফুটবল। অবশ্য গোরাদের মত হাঁটু অবধি প্যান্টালুন কিম্বা জুতোর বালাই নেই। ধুতিখানা কষে মালকোঁচা মেরে নাও, ব্যাস তারপরই হাওয়া ভরা গোল্লাটিকে নিয়ে খালি পায়ে শুরু করে দাও যতখুশি কায়দাকানুন।

শুরুতে চামড়ার বল ছিল না। বাতাবিলেবু নিয়ে দেদার লাথালাথি শুরু হয়েছিল প্রথমে, তারপর এল কাপড়ের মণ্ড।  অনেকগুলো কাপড় একসঙ্গে গোল্লা পাকিয়ে, দড়িদড়া দিয়ে বেঁধে নিতে পারলেই কেল্লা ফতে।  কিন্তু কদ্দিন আর মিষ্টান্নর স্বাদ মিছরিতে মেটে! এই এলাকার নাম করা মানুষ হলেন বাবু কৃষ্ণমোহন। নানা কাজে মাঝে মধ্যেই শহরের দিকে যান। কয়লার ইঞ্জিনে টানা গাড়িতে নয়,  নিজস্ব ঘোড়ার গাড়িতে চেপে।

শোনা যাচ্ছিল, শোভাবাজার ফুটবল ক্লাবের সঙ্গেও নাকি মানুষটির বেশ দহরম মহরম আছে। আর যান কোথায়, একদিন ছেলেছোকরার দল তাঁকে গিয়ে ধরে পড়লে। চামড়ার বল এনে দিতে হবে কলকাতা থেকে। তা, সেই আবদার উনি রেখেছিলেন। শহর থেকে ঐ ‘জাদু-গোলক’ নিয়ে আসেন বেশ কয়েকটা। এবং শুধু চাঙড়িপোতাই নয়, আশপাশের গ্রামেও বিলিয়ে দেন দু’একখানা করে। ব্যাস, সেই থেকে প্রায় সব গাঁয়েও শুরু হয়ে গেল দেদার মজাদার এই গোল্লাছুটের খেলা।  

যাই হোক যে কথা হচ্ছিল,

সাঁঝের আঁধার ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে। মাঠের একপ্রান্তে বল গেলে অন্য প্রান্ত থেকে এখন আর তা ঠাহর করা যাচ্ছে না। কিন্তু হারানো সম্মান পুনরুদ্ধার করার জন্য চাঙড়িপোতা বদ্ধপরিকর। তারা যতক্ষণ না জিতবে এই খেলা শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না।

তবে বিধি বাম। হঠাৎই বিপদ ঘনায় আবার। মাহিনগরের এক দীর্ঘদেহী খেলোয়াড় বল নিয়ে ঢুকে পড়ে চাঙড়িপোতার বিপজ্জনক অঞ্চলে। জনা তিনেককে কোমরের দোলায় মাটি ধরিয়ে যমদূতের মত এসে দাঁড়ায় একেবারে গোলরক্ষকের সামনে। গোলকিপারের ধুতিখানা বোধহয় কষে মালকোঁচা দেওয়া ছিল না। এদিক ওদিক করতে গিয়ে পায়ে পা জড়িয়ে এক্কেবারে পপাত ধরণীতল। কিন্তু তার আগেই, আগুনের গোলার মত বলটি গলে যায় তেকাঠির মধ্যে দিয়ে।

চাঙড়িপোতা ‘ধুতির’ দোহাই দিতে চাইলেও তাদের সেই কথা ধোপে টেকে না। বরং উপস্থিত সবাই উচ্চস্বরে প্রশংসা করতে থাকে মাহিনগরের দীর্ঘদেহী খেলোয়াড়টির। যার নাম সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে সতু বাঁড়ুজ্জে।  

দুই

ভোরবেলা পুজো-আচ্চা সেরে সবে একটু বাগান পরিচর্যায় মনোনিবেশ করতে যাবেন বাবু কৃষ্ণমোহন, অমনি বিশ্বস্ত ভৃত্য এসে এক ভীষণ খবর দিল।  উত্তরের লিচু বাগান কাল রাতে নাকি ফর্সা করে দিয়ে গেছে চোরে।  আর শুধু তাই নয়, যে তিনজন মুশকো পালোয়ান বাগানে চৌকি দেয়, তাদের মধ্যে দু’জন নাকি বাগানে হামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চম্পট দিয়েছে।  আর যে ছিল, তাকে পিছমোড়া করে বেঁধে, মুখে কাপড় গুঁজে লুট করা হয়েছে লিচুবাগান।

কুড়ি বিঘা জমিতে কম করে গোটা পঞ্চাশেক গাছ। এক রাতে সব সাফা! এই ঘটনাকে তো চুরি না বলে ডাকাতি বললেই ঠিক বলা হয়।  খবরটা পাওয়া মাত্রই লাফ দিয়ে ওঠেন রায়বাহদুর কৃষ্ণমোহন। হন হন করে হাঁটা দেন লিচু বাগানের দিকে।

তিন তিনজন ভোজপুরি পালোয়ান বাগান পাহারা দেয়। যেমন তাদের আকৃতি সেরকম তাদের শক্তি। কোনও হতচ্ছাড়াকে যদি একবার চেপে ধরে তবে দই করে দিতে সময় লাগে না। সেই বাগানেই কিনা এমন দুঃসাহসিক কাজ!

বাগানের একপাশে নিরাপত্তা রক্ষীদের ঘর। দাওয়ায় একটা দড়ির চারপাই পাতা থাকে সবসময়। সেখানে পা ঝুলিয়ে উদাসপানা হয়ে বসেছিল রামাধীন। মনিবকে দেখে কোনোরকমে উঠে দাঁড়ায়। তাগড়া জোয়ান শরীর আজ যেন ফুস করে বুড়িয়ে গেছে। তার অন্য দুই সাগরেদকে আশেপাশে কোথাও দেখা যায় না। কৃষ্ণমোহন হুংকার দেন, “কাল রাতে কী হয়েছিল র‍্যা?”

আজ্ঞে চুরি…”

হতভাগা সে কি আর আমার জানতে বাকি আছে! বলছি তিনজনই কি নাকে সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিলি!”

আজ্ঞে না হুজুর। দুজন তো হামলা হওয়া মাত্রই ভাগলবা। আমি একা আর কী করব হুজুর!”

তাহলে তোদের রেখে আমার লাভটা কী! কারা এসেছিল?”

আজ্ঞে খুব অন্ধকার ছিল তো… দেখতে পাইনি।”

অজুহাত শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন রায় বাহাদুর, “শুক্লপক্ষের দ্বাদশী ছিল কাল। আমি জানি নে ভেবেছিস!  অত সময় ধরে কান্ডকেত্তন চলল আর তোরা কিছু টের পেলি নে! আর তার থেকেও বড়ো কথা, যখন পিছমোড়া করে বাঁধল তোকে তখনও ঠাহর করতে পারলি নে ওরা কারা? দশ ঘাটের মানুষ চড়িয়ে খাই আমি, সেই আমাকেই বোকা বানাচ্ছিস হতভাগা!”

আজ্ঞে মুখোশ পরে এসেছিল।”    

এই, যা বলার ঠিক করে বল। একবার বলছিস অন্ধকার ছিল বলে দেখতে পাসনি, আর একবার বলছিস মুখোশ পরে এসেছিল বলে দেখতে পাসনি!”

এইবার একেবারে ভেঙে পড়ে রামাধীন। থেবড়ে বসে পড়ে কত্তাবাবুর পায়ের কাছে। অনেক দিন ধরেই সে এই পুব মুলুকে আছে। তাও ভয় পেলে তার বাংলা বেশ হড়বড়িয়ে যায়। কোনোরকমে বলে, “আজ্ঞে আমাকে মাফ করিয়ে দিবেন হুজুর। কাজকাম না থাকলে না থাকল। তবুও তো জিন্দা দেশে লউটতে পারল। কিন্তু তেনাদের নাম যদি মুখে আসল তবে আমার ‘রামনাম সত্য’ হইয়ে গেল হুজুর।” 

হতভাগা… তোকে আমি জিন্দা লটাচ্ছি! দাঁড়া..”

মুখে হম্বিতম্বি করলে কী হবে, রামার কথায় চিন্তা আরও বাড়ে বৈকি কৃষ্ণমোহনের। এইরকম বাঘের মত পালোয়ান যাদের  ভয়ে একেবারে কুঁকড়ে যায় তারা কারা! সতু বাঁড়ুজ্যে, মানে যে দস্যিপানা ছেলেটি, যে সেদিন শেষ গোলখানা দিল চাঙড়িপোতাকে, সে এবং তার ষণ্ডামার্কা সাঙ্গোপাঙ্গোদের দলটা নয় তো!

ঠিক আছে তোকে বলতে হবে না। আমিই তাদের খুঁজে বার করব। তুই শুধু আমাকে বল, তারা কজন ছিল?”

আজ্ঞে অনেকে ছিল…”

অনেকে ছিল! কৃষ্ণমোহন মনে মনে একটা হিসাব কষেই প্রশ্নটা করেছিলেন। কিন্তু অনেকে ছিল শুনে সেই হিসেব আবার গুলিয়ে যায়। তাহলে কি শুধু ওরাই আসেনি! গাঁয়ের লোকদেরও ফুসলিয়ে নিয়ে এসেছিল?  আর যদি তাই হয় তবে আরও ভয়ংকর কোনও বিপদ অপেক্ষা করে আছে সামনে। লিচু চাষই না এবার লাটে ওঠে! 

কৃষ্ণমোহন জানেন বোম্বেটে দস্যুর দলকে শায়েস্তা করার একটিই উপায়। ওদের ইশকুলে যেতে হবে। গিয়ে নালিশ করতে হবে প্রধান শিক্ষক উপেন মিত্তিরের কাছে। দেরি করা যাবে না মোটে। কথায় বলে, কচুগাছ কাটতে কাটতে ডাকাত হয়। আর এই বয়েসেই যারা, পুরো লিচু বাগান সাফ করে দিতে পারে একরাত্তিরে, তারা যে কী হবে…! আজ তাঁর ঘরে লুঠ করেছে, কাল প্রবল প্রতাপশালী এই বৃটিশ সিংহের ঘরেও না হানা দিয়ে বসে!

রায়বাহাদুরের ভাবনা না যে অচিরেই সত্যি হবে তা কে জানত!  

তিন

কিছুতেই যেন নিজের কাজে মন বসাতে পারছেন না উপেন্দ্রনাথ মিত্র। কিন্তু এইবেলা হাতের কাজটুকু না সারলেই নয়। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই সরকার বাহাদুরের কাছে বিদ্যালয় সংক্রান্ত কিছু তথ্য পাঠাতে হবে। দরকার হলে স্বয়ং কার্জন সাহেবও নাকি আজকাল  খতিয়ে দেখছেন এইসব তথ্য। 

কোন শ্রেণিতে কত ছাত্র, ছাত্র অনুযায়ী শিক্ষকের অনুপাত যথেষ্ট কিনা, বিদ্যালয়ে পড়াশুনো ঠিকমত হচ্ছে কিনা,  ইত্যাদি। এই পর্যন্ত ঠিকই আছে, কিন্তু, এরপরই যে প্রশ্নটা করা হয়েছে তার জবাব দিতে গিয়েই হয়েছে বিষম মুশকিল। সরাসরি জানতে চাওয়া হয়েছে, বিদ্যালয়ের কোনও ছাত্রের আচরণ সন্দেহজনক কিনা? এই প্রশ্নের সঙ্গে আবার একটা লেজুড় জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, কোনও ছাত্রের আচরণ যদি বিন্দুমাত্র সন্দেহজনক হয়, তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেন দেরি না করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেন।

বড়োলাটের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই উত্তাল হয়ে উঠেছে গোটা বাংলা। আন্দোলনের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে সমস্ত ইশকুল-কলেজে। এই বিদ্যালয়ও তার ব্যতিক্রম নয়। উপেনবাবুই শুধু নন ইশকুল কমিটির সবারই জানা আছে বিষয়টা। তাই, যে সব ছাত্র বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে সরাসরি জড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে, তাদের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলা হয়েছে, বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সব প্রচেষ্টাই বিফলে গেছে।

তাও উপেনবাবু চান না, এখনই তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিশোর মন। ভিতরে বারুদ ঠাসাই থাকে। স্ফুলিঙ্গ থেকে বিস্ফোরণ হতে সময় লাগে না। আরও কয়েকটা দিন দেখতে চান মিত্তির মশাই। আবারও কথা বলতে চান ছেলেগুলোর সঙ্গে। কারণ উনি জানেন তথাকথিত সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মানে হল, তাদের স্কুল থেকে রাস্টিকেট করা। আর একবার যদি তারা কালো তালিকাভুক্ত হয়ে যায় তবে সারাটা জীবনই নষ্ট।

অনেক চিন্তা করে অবশেষে তিনি রিপোর্টে যা লিখলেন তার অর্থ,  বিদ্যালয়ে লেখাপড়া ঠিকঠাকই চলছে এবং কোনও ছাত্রের আচরণই বিন্দুমাত্র সন্দেহজনক নয়। লেখা শেষ করে মাথা তুলতে না তুলতেই দরজায় রায়বাহাদুর কৃষ্ণমোহনকে দেখতে পেলেন তিনি।

কৃষ্ণমোহন মুখোপাধ্যায় ইশকুল কমিটির চেয়ারম্যান। গত বছর ‘বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ পাশ হয়েছে। সেই আইন মোতাবেক প্রতিটি ইশকুলের জন্য একটি পরিচালন কমিটি গঠন করা বাধ্যতামূলক। এই কমিটিতে শিক্ষক ছাড়াও থাকার কথা অঞ্চলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের। কৃষ্ণমোহন বাবু সেইরকমই একজন। উপেনবাবু তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেন, “আসুন ভিতরে আসুন।”

তা… রাজেনবাবুর মুখে শুনলুম আপনি নাকি এখনও ছাত্রদের হয়ে পক্ষপাতিত্ব করছেন!”  ঘরে পা রাখতে রাখতে বললেন কৃষ্ণমোহন। তাঁর গমগমে গলা ঘুরপাক খেতে লাগল চার দেয়ালে।

রাজেন্দ্রকুমার বসু কমিটির সম্পাদক। এমনিতে মানুষটি খারাপ নন কিন্তু বড়ো বেশি অস্থির চিত্ত। কোনও কথাই বেশিক্ষণ পেটে রাখতে পারেন না। উপেনবাবু বলেন, “একজন শিক্ষক হয়ে ছাত্রদের পক্ষ নেওয়ার দায় আমার আছে বৈকি কৃষ্ণবাবু।”

ছাত্রদের পক্ষ নেওয়ার দায় না হয় স্বীকার করে নিলুম। কিন্তু অন্যায়ের পক্ষ নেওয়ার দায়ও কি একজন শিক্ষকের উপর বর্তায় মিত্তির মশাই?”

সকাল থেকে নিজের ভিতরে বেশ টানাপোড়েন চলছে। নাহলে চট করে ধৈর্য হারানোর মানুষ উপেন মিত্তির নন। এখন বেশ কঠিন স্বরেই উত্তর করেন, “কোনটা অন্যায় কৃষ্ণমোহোনবাবু! পরাধীনতার অপমান সহ্য করে বেঁচে থাকা নাকি স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা? আমাদের না হয় বয়েস হয়েছে। রক্তে আর সে তেজ নেই কিন্তু ওদের তো আর তা নয়। ওরা পরাধীনতার এই বাঁধন বরদাস্ত করবে কেন!”

সকালবেলাই লিচু বাগান সাফ দেখে সেই যে মাথায় আগুন ধরেছে সে যেন কিছুতেই নিভতে চাইছে না, বাবু কৃষ্ণমোহনের। এখন হেডস্যারের কথায় সেই জ্বলুনি আরও বাড়ে বৈ কমে না। বদমাশগুলো যা খুশি তাই করছে। লিচুবাগান ডাকাতি থেকে শুরু করে, ইশকুলে বসে সরকারের বিরুদ্ধে অপকম্মো, কোনোকিছুই বাদ যাচ্ছে না। আর তাদের হয়েই কিনা সাফাই গাইছেন মিত্তির মশাই!  

চার

এইবারের সংখ্যাগুলো ভালো করে পড়া হয়নি। তাই আজ ইশকুলে আসার সময় বইয়ের মধ্যে করে নিয়ে এসেছিল নরেন্দ্র। টিফিনবেলায় আঁশফল গাছে চড়ার সময় অন্য বইপত্তরগুলো পাঁজা করে গাছতলায় রেখে দিলেও, পত্রিকাগুলো মুখে করে নিয়ে উঠে পড়ল মগডালে।

এইদিকে, এ-ডালে সে-ডালে বেশ খানিক হুটোপাটির পর একখানা ডালে সবে জুত করে এসে বসল শৈলেশ্বর। একটা আঁশফল দাঁত দিয়ে ছুলতে ছুলতে নরেনকে শুধোল,  “হ্যাঁ রে নরেন… ঐগুলো কী র‍্যা?”

নরেন্দ্র ওরফে নরেন গম্ভীর মুখে বলল, “আই শ্যাল আনসেটল দি সেটলড ফ্যাক্ট। বুঝলি? বুঝলি কিছু? হা হা হা…”

এই কথাটা সুরেন্দ্রনাথ বলেছেন বড়োলাট কার্জনকে উদ্দেশ্য করে। বড়োলাট বাংলাকে ভাগ করে ছাড়বেন, আর বাঁড়ুজ্জে মশাই সেটি কিছুতেই হতে দেবেন না। দিন দুয়েক আগেই এই বিষয়ে বেশ সবিস্তারে আলোচনা করেছে নরেন, তার সাঙ্গোপাঙ্গোদের সঙ্গে। তারপর থেকে, মাঝে মধ্যেই ইংরেজি বাক্যটা আওড়াচ্ছে। সাতকড়ি কারণ জিজ্ঞাসা করাতে বলেছিল, এইটে বললে সে নাকি ভিতর থেকে বেশ একটা জোর পায়।

এখন বাক্যটা বলতে বলতে নরেন্দ্র একটা বেশ পোক্ত ডালে উঠে বসে। ‘সন্ধ্যা’ পত্রিকাটা মেলে ধরে জোরে জোরে পড়তে শুরু করে। যা পাঠ করে তার সারমর্ম হল-নিজের দেশ মানে হল ‘মা’আর তাকে ভাগ করা মানে, মায়ের হাত-পা কেটে বাদ দেওয়া।

নরেন তার বাবার কাছ থেকে শুনেছে এইসব কথা। আরও শুনেছে, এই দেশ সবার। হিন্দু-মুসলমান, সবার। বাবা আরও বলেছেন, “দেশের সবার মধ্যে যে একতা, তাকে বলে ‘জাতীয়তাবাদী ঐক্য’হিন্দু মুসলমানকে ভাগ করে এই একতাটাকেই নাকি ধ্বংস করে দিতে চাইছেন বড়োলাট। তাহলে নাকি তাঁর রাজ্যপাট চালাতে আরও খানিক সুবিধে হয়।”

সন্ধ্যা পত্রিকাটা পড়া হয়ে গেলে শ্রীযুক্ত কৃষ্ণকুমার মিত্রের-সঞ্জীবনী নিয়ে বসে নরেন। এইখানে যা লেখা হয়েছে তার সার কথা হল, অবিলম্বে বিলিতি জিনিসপত্র বর্জন করতে হবে। চিনি, নুন, সাবান, জুতো, মেয়েদের চুড়ি এইসব যা কিছু বিদেশ থেকে আসে, সব। 

কাগজগুলো পড়া শেষ হলে নিজেদের মধ্যে ফের একপ্রস্থ আলোচনা হয়। তাদের ইতিমধ্যেই কানে এসেছে যে সুরেন বাঁড়ুজ্জে রাজপুরে গাঁয়ে আসছেন বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী সভা করতে। ঠিক হয়েছে তারা সেই সভায় যাবে। যত বাধাই আসুক না কেন, যাবে। একবারে সদলবলে মিছিল করে। আলোচনার পর এখন সেই সিদ্ধান্তই শুধু যে বহাল থাকে তাই নয়, আরও জোরালো হয়।  

একটা খোসা ছাড়ানো আঁশফল মুখের মধ্যে ফেলে নরেন বলে, “আমি ভাবছি হেডস্যারের কাছে আজই অনুমতি চাইব।”

সাতকড়ির মধ্যে যেন সাক্ষাত হনুমানের বসবাস। গাছের এক ডালে স্থির হয়ে থাকতে পারে না। যেটায় বসে এতক্ষণ দোল খাচ্ছিল সেটা ছেড়ে পরেরটায় যেতে যেতে বলে, “কীসের অনুমতি?”

আঁশফল গাছের উপরের দিকের ডালগুলো খুব পছন্দের সাতকড়ির। সেখানে বসে পশ্চিমপানে চক্ষু দিলে রাজপথ, রাজপথ পেরিয়ে শিব মন্দির, আদিগঙ্গা সবই চোখে পড়ে। মেঘের ফাঁক দিয়ে সুয্যিমামা এখন বেশ জোরালো রোদ্দুর পাঠাচ্ছে জলের বুকে। চিক চিক করা ছোটো ছোটো ঢেউগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নরেনের উত্তর কানে আসে সতুর, “ভাবছি সুরেন বাবুর সমর্থনে ইশকুলেই একটা মিটিং করব। অন্য ছাত্রদেরও যদি দলে জুটিয়ে নিতে পারি তাহলে দলটা বেশ ভারী হবে। সেটাই বলব স্যারকে…”

নরেনের উদ্ভট প্রস্তাব শুনে শৈল খানিক বাঁকা সুরে বলে, “ইশকুলের মধ্যে ঐসব করতে দেবে বলে মনে হয় তোর! অত সহজ হলে কি আর আমদের এই জঙ্গলে এসে  মিটিং করতে হত!”

হরিকুমার বলে, “ঠিক আছে, নরেন যখন বলছে তখন বলেই দেখুক না একবার। বড়োজোর নিষেধ করবে।”

সে কথা অবশ্য ঠিক…।”

সতু নিজের ধুতিখানা সামলে উপরের ডাল থেকে নেমে আসতে আসতে বলে, “ঠিক আছে তবে শুভস্য শীঘ্রম! নরেন যখন বলছে তখন এখনই যাওয়া যাক স্যারের কাছে।”  

পাঁচ

এইদিকে, উপেনবাবুর ঘরে বসে কথা বলছিলেন রায়বাহাদুর কৃষ্ণমোহন মুখুজ্জে। তিনি মনে করেন উপেনবাবু, ইংরেজ-বিরোধীদের আড়াল করেছেন এবং এর ফলে বৃটিশরাজের কোপে পড়তে পারে এই ইশকুল।

কৃষ্ণবাবু এখন বলেন, “এই বিদ্যালয়, সরকারের অনুদানের উপর নির্ভরশীল। সেটা যদি বন্ধ হয়ে যায় এলাকার ছেলেমেয়েগুলো শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। কিছু বেয়ারা ছাত্রের জন্য সেটা হতে দেওয়া কি ঠিক হবে!”

আলোচনার প্রথমদিকে উপেন্দ্রনাথ খানিক উত্তেজিত হলেও, এতক্ষণে আবার ফিরে গেছেন চিরাচরিত মৃদু হাসিতে। তাঁর আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বর কানে আসে, “হ্যাঁ কৃষ্ণবাবু। আপনার এই কথায় যুক্তি আছে বটে। কিন্তু এক্ষুনি আমি হাল ছাড়তে রাজি নই। ছেলেমানুষ, এত সহজে ওদের আবেগের বাঁধ মানবে না! বোঝাতে হবে। আবারও কথা বলতে হবে ওদের সঙ্গে। আর তাছাড়া…”

উপেনবাবু কেদারার দুই হাতলে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ান ধীরে ধীরে। এগিয়ে যান জানালার দিকে। বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তাটা চলে গেছে সেই চাঙড়িপোতা ইস্টিশন অবধি। পথের একদিকে ইশকুলবাড়ি আর অন্য দিকে মাঠ। মাঠের কোল ঘেঁষে একখানা পুকুর। যার দক্ষিণ ধারে গুটিকয়েক নারকেল গাছ।

গরাদের একদম কাছে এলে দূরে গাছগুলোর মাথায় একটুকরো মিশমিশে মেঘ দেখতে পান উপেনবাবু। আকাশের এক কোণে গুঁড়ি মেরে বসে আছে, প্রকাণ্ড এক বাঘের মত। কিন্তু সেই মেঘের দিকে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকেও ভিতরের জ্বালাটা এতটুকু জুড়োয় না। তিনি কিছুতেই মনে করতে পারেন না, জীবনে কোনোদিন এইরকম সঙ্কটে পড়েছেন কিনা! সবাই যাদের ‘অপরাধী’ ভাবছে, তাদের যে কিছুতেই তিনি ‘অপরাধী’ বলে মানতে পারছেন না!

ভেসে আসে কৃষ্ণমোহন মুখুজ্জের গলা, “মিত্তিরবাবু আপনি কী যেন একটা বলছিলেন…” 

সম্বিৎ ফিরে আসে প্রধান শিক্ষকের। জানালা ছেড়ে ঘুরে দাঁড়ান, “হ্যাঁ…যা বলছিলাম…, দেশদ্রোহিতার অভিযোগ ছেলেগুলোর মাথায় চাপিয়ে যদি বিদ্যালয় থেকে বার করে দেওয়া হয়, তবে ওরা আর কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবার সুযোগ পাবে না। এখনও ওদের সামনে সারাটা জীবন পড়ে আছে।” 

দেখুন গোটা চারেক বেয়াদপ ছাত্রের জন্য একটি গোটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা যায় কি?”

উপেনবাবু এগিয়ে এসে সেগুন কাঠের কেদারায় আলতো একটা চাপড় মারতে মারতে বলেন, “বেয়াদপ শব্দটায় আমার আপত্তি আছে।”

উপেন মিত্তিরের সঙ্গে এই যুক্তিতক্কো আর ভালো লাগছে না কৃষ্ণমোহনের। গলা চড়ে তাঁর, “সরকারি অনুদান এবং পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই বিদ্যালয় অচল। কিছু ছাত্র আগুন নিয়ে খেলছে। আর সেই আগুনে শুধু যে আমাদের পুড়তে হবে তাই নয়, পুড়ে ছাই হবে আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েগুলোর ভবিষ্যৎও। তাও বলছেন ওরা বেয়াদপ নয়! ”

প্রধান শিক্ষক মৃদু হাসেন। খুব ধীরে ধীরে বলেন, “আগুন নিয়ে খেলা অত সহজ নয় কৃষ্ণবাবু। সাহস লাগে। যে খেলছে তারই সবার আগে পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে যে…”

আশাহত চেয়ারম্যানের মুখে যেন আর বাক্য সরে না।

ছয়

গাঁয়ের সাধারণ মানুষজন এদিকে আসে না বলে জঙ্গলের মধ্যে পায়েচলা পথটুকুও নেই। তবে সেইজন্য চারমূর্তির কোনও আফশোশও নেই। তাদের নিজস্ব একটি রাস্তা আছে। ঠিক করা আছে নিশানা। আঁশফল গাছ থেকে নেমে সেই চিহ্ন ধরেই এগোচ্ছিল ওরা। কিন্তু আরও দু’এক পা এগোনোর পরই সতু মুখ দিয়ে মৃদু একটা শব্দ করে। মুহূর্তে দাঁড়িয়ে যায় দলটা।

সতু ছিল সবার সামনে। আসার সময় গাছের একটা শক্ত ডাল ভেঙে নিয়ে এসেছিল। যাতে বনবাদাড় ভেঙে এগিয়ে যাওয়া যায়। সে একবার পিছন ফিরে সতীর্থদের চোখে চোখ রেখে আবার সামনে তাকায়। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সবাই। হাত তিনেক দূরে ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং যমরাজ, ওদের পথ আটকে। চালতা গাছের ফাঁক দিয়ে এক চিলতে রোদ্দুর এসে লুটোপুটি খাচ্ছে তার হিসহিসে শরীরটায়।

সাতকড়িদের পথের একদিকে ডোবা আর অন্যদিকে কাঁটা গাছের ঝোপ। কাজেই চেনা রাস্তা ছাড়া উপায় নেই। হাতে সময় থাকলে, দূর থেকে হুসহাস করা যেত এবং সাপ যতক্ষণ না ঝোপের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়, ততক্ষণ অপেক্ষা করে থাকা যেত। কিন্তু এখন টিফিনের ঘণ্টা পড়ার আগে ইশকুলে না ঢুকলে নয়। ছুটির পর ইদানীং উপেন স্যার নানা সভা সমিতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। আজকেও যে সেরকম কিছু নেই, তাই বা কে জানে! সেইজন্য টিফিন টাইমের মধ্যেই স্যারের সঙ্গে দেখা করাটা জরুরি।

দু’এক মুহূর্ত বাদেই, রোদ্দুরের ফালি ছাড়িয়ে সাপটা হঠাৎ করে এগিয়ে আসে আরও হাত দুয়েক। সামনে থাকা সাতকড়ি চলে আসে ছোবলের নাগালে। তো মহা আপদ যা হোক!

এমন সময়, সবাইকে হতবাক করে বিষধরের মুখোমুখি হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে সাতকড়ি। পিছনের তিনজন বুঝে উঠতে পারে না ঠিক কী করতে চাইছে তাদের সঙ্গীটি? সাহসে এরা কেউ কমতি নয় কিন্তু সতু যেন একেবারে মাত্রাছাড়া। সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখতে থাকে তার কাণ্ডকারখানা।

সর্প মহারাজের মাথাটা এই মুহূর্তে একটুও দুলছে না, শুধু লেজটা সামান্য এদিক ওদিক করছে। সতু জানে এটা ছোবল মারার ঠিক আগের মুহূর্ত। চোখ একটুও না সরিয়ে তাকিয়ে থাকে শত্রুর দিকে। তারপর ধীরে ধীরে ডান হাতটা নাড়তে আরম্ভ করে ফুটখানেক দূরে। তার হাতের ছন্দে দোল খেতে আরম্ভ করে লকলকে দেহটা। এর দু’এক মুহূর্তের মধ্যেই বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে আসে ছোবল। অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় হাতটা সরিয়ে নেয় সতু। ব্যর্থ ফণা আবার ফিরে যায় আগের জায়গায়।

যেন দুই মহারাজার সমানে সমানে টক্কর। দ্বিতীয়বার বেশি সময় না দিয়ে এগিয়ে আসে আক্রমণ। আরও অধিক দ্রুততায় পিছিয়ে আসে সতু। দ্বিতীয়বারও সুবিধা করতে পারেন না ভুজঙ্গ মহারাজ। এরপর, ফণা পিছনে গিয়ে বেশ কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে থাকে।

এই সময়টাই যেন চাইছিল সতু। বিদ্যুৎ গতিতে ডান হাতের মুঠোয় ধরা গাছের ডালটা চালায়, সপাটে। কিন্তু বসে বসে চালানোর জন্য জায়গামত লাগে না এবং আঘাতের জোরও আশানুরূপ হয় না। জাত কেউটে বলে কথা। এলিয়ে পড়লেও আবার ফণা তুলে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গেই সতুর দ্বিতীয় আঘাত। এইবার অব্যর্থ লক্ষ্যে।

মাথায় আঘাত পেয়ে লুটিয়ে পড়ে বিষধর। কিন্তু তার লকলকে দেহটা পাক মেরে মেরে উঠতে থাকে। সাতকড়ি হাতের ডালটাকে মাটির সঙ্গে আড়াআড়ি করে নিয়ে চেপে ধরে সর্প মহারাজের মাথাটা। 

দীর্ঘকায় দেহটায় যে ঢেউ খেলছিল তা কমে আসতে থাকে একটু একটু করে। এক সময় সেই দেহ স্থির হয়ে যায়। কিন্তু আজন্ম বসবাস এই ঝোপ জঙ্গলের দেশে, কাজেই ছেলেগুলো এটা জানে যে, দেহে এখনও প্রাণ আছে। এখনও হাত দিয়ে ধরা যথেষ্ট বিপজ্জনক। কিন্তু আগুন নিয়ে খেলতেই যে বরাবর পছন্দ সাতকড়ির। সে লাঠি ফেলে ডান হাত দিয়ে ধরে সাপের লেজখানা। মাথার উপরে তুলে বাঁই বাঁই করে ঘুরিয়ে ছুঁড়ে মারে দূরে।  ব্যাস এইবার ওদের পথে আর কোনও বাধা নেই। একটা তৃপ্তির হাসি হাসে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে। দলনেতা নরেন এগিয়ে এসে তার যোগ্য শিষ্যের পিঠে একটা আলতো চাপড় মারে, তারিফের ভঙ্গিতে।

সাত

প্রধান শিক্ষকের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে নরেন্দ্রনাথ প্রবেশের অনুমতি চায়। এইদিকে, উপেনবাবুর সঙ্গে বেশ খানিক তর্কবিতর্ক হওয়ার পর, কৃষ্ণমোহন বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছিলেন চেয়ার থেকে। নরেনদের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হয়ে যায় আচমকা।

কৃষ্ণমোহন কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেন না, প্রধান শিক্ষকের ঘরে এর কী প্রয়োজন থাকতে পারে! মনে সন্দেহ ছিলই, যে এরা উপেনবাবুর প্রশ্রয় পাচ্ছে। এখন সেই সন্দেহেই সীলমোহর পড়ে।  জ্বলন্ত দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে বেরিয়ে যান হনহন করে।

কী ব্যাপার! ক্লাস বসে যাওয়ার সময় হল, ক্লাসে না গিয়ে এখানে কেন?”

ঘরের বাইরে দাঁড়িয়েই হেডস্যারের কথার উত্তর করে নরেন, “একটি বিষয়ে অনুমতি নেওয়ার ছিল।”

জলদগম্ভীর স্বরে ভিতর থেকে ভেসে আসে একটাই শব্দ, “এসো।”

নরেন একাই ঢোকে ভিতরে, বাকি তিনজন বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকে। দরজার আড়ালে।

বল…কী বিষয়?”

দু-এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলতে আরম্ভ করে নরেন, “বড়োলাট বঙ্গভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন…”

আমি জানি। তা নিয়ে তোমার থেকে আমার কিছুমাত্র জানবার নেই।”

শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় আসছেন আমাদের রাজপুরে …সভা করতে…”

কথা শেষ করার আগেই উপেনবাবু তাকে থামিয়ে দেন, “সে কথাও আমার জানা নরেন্দ্র। তুমি আসলে যেটা বলতে এসেছ… সেটা বলো।”

এরই মধ্যে টিফিন শেষের ঘণ্টা পড়ে গিয়েছিল। ক্লাসমুখো ছাত্রদের মধ্যে দু-একজন হেড স্যারের ঘরের বাইরে তিন ওস্তাদকে দেখে একটু থমকে দাঁড়ায়। এদের মধ্যে দশম শ্রেণির নরহরি নস্করও ছিল। নরহরি এদের ব্যাপারে একটু বেশিই কৌতূহলপ্রবণ। সবাই পাশ কাটিয়ে চলে গেলেও সে দাঁড়িয়ে থাকে।

সব বিষয়েই ফোড়ন কাটা নরহরির স্বভাব। কিন্তু সে যাই বলুক না কেন,  কোনও ছাত্রই তাকে খুব বেশি  ঘাঁটায় না। কারণ দুটো। এক, ইশকুলের মধ্যে তো বটেই, বাইরেও তার চ্যালাচামুণ্ডার অভাব নেই। দুই, গায়েগতরে বয়েসের তুলনায় সে একটু বেশিই বলশালী। তবে সেটা এমনি হয়নি। সকালে উঠে শ’দেড়েক বুকডন আর একশো বৈঠক তার বাঁধা। এরপর ছোলা, বাদাম ইত্যাদি তো আছেই। যাই হোক, এখন তিনজনের পাশটিতে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে, “এখানে কী ব্যাপার র‍্যা! চারজনায় মিলে নতুন কোনও ফন্দী আঁটছিস বুঝি? ”

শৈল বলে, “সে যাই হোক না কেন তাতে তোর কী র‍্যা?”

নরহরির একটা ব্যাপারে খুব দুঃখ। ইশকুলে তার এত দাপট থাকলে কী হবে, এই চারমূর্তি তাকে শ্রদ্ধা কিম্বা সমীহ কোনোটাই করে না। সে বুঝতেই পারে না, তাকে হেলাচ্ছেদ্দা করার মত এত দুঃসাহস এরা পায় কোত্থেকে! নরহরি আবার ফিসফিসায়, “আমার কী… সে কতা বুঝতেই পারবি ক’দিন বাদে। এমন শায়েস্তা করব যে আর কোথাও মুখ দেখানোর জায়গা পাবি না। ইশকুলের মধ্যে যত্তসব আকাজ কুকাজ করে বেড়াবি আবার বড়ো বড়ো কথা বলবি!

দু’এক মুহূর্ত সময় নিয়ে আবার বলে, “শুনছি নাকি কী সব পত্রিকা-টত্রিকা বগল দাবা করে আজকাল ইশকুলে আসিস। আর একে তাকে আজে বাজে মন্তর দিয়ে বেড়াস!”

শৈলরা অনেক বেশি ব্যস্ত ছিল ঘরের ভিতরকার কথোপকথন নিয়ে। স্যারের শেষ বাক্যটা শোনার পর যখন কথা খুঁজে বেড়াচ্ছে নরেন, তখনই ভ্যানভ্যানে মাছির মত উৎপাত শুরু করেছে এই নরহরি। ‘শায়েস্তা’, শব্দটা শুনে চাপা চোয়াল নিয়ে ফিরে তাকায় তিনজনেই। সতু জুতসই কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু হরিকুমার বাঁধা দেয়। হরি এদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ। বিচারবুদ্ধি বেশ পোক্ত তার। সে ভালো করেই জানে এইসব ছুটকো ঝামেলায় জড়ানোর এখন কোনও মানেই হয় না।

এইদিকে নরেন এতক্ষণে যেন নিজেকে আবার গুছিয়ে নিয়েছে। খুব ধীরে ধীরে স্যারকে বলে,  “আমরা শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্রনাথ মহাশয়কে সমর্থন করি।”

এই কথার মধ্যেও নতুন কিছু নেই। তবে নরেন্দ্রর থেমে থেমে বলা শব্দগুলোর পৃষ্ঠে কিছু না বলে তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকেন হেডস্যার। এই দৃষ্টিতে তাঁর মনের ভাব স্পষ্ট নয়। তিনি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রটির দৃঢ়চেতা মনোভাবের তারিফ করছেন,নাকি তার ঔদ্ধত্যে যারপরনাই বিস্মিত হয়েছেন, বোঝা যায় না। কেটে কেটে বলেন, “নরেন্দ্র তোমার যে কারণে এই মুহূর্তে আগমন, আমি সেই কারণটুকুই শুনতে চাইছি মাত্র।”

এতক্ষণ ধরে যে কথাটা বলার জন্য বুকের ভিতরটা আনচান করছিল,  সেটা এবার বলেই ফেলে নরেন, “স্যার…আমরা ইশকুলে সুরেনবাবুর সমর্থনে একটা সভা করতে চাই।”

সবে এসে নিজের চেয়ারে বসেছিলেন উপেন্দ্রনাথ, ফের ধনুকের ছিলা থেকে বার হওয়া তিরের মত লাফিয়ে ওঠেন, “এত দুঃসাহস!” তারপর, দু’এক মুহূর্ত সময় নিয়ে ফের বলেন, “তুমি জানো, তোমাদের এই হঠকারিতার জন্য গোটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ প্রশ্নের মুখে। পড়াশুনা বাদ দিয়ে দস্যুবৃত্তি করে বেড়াচ্ছ তোমরা, আর… ইশকুল কমিটি থেকে শুরু করে সরকার বাহাদুর, সবার কাছে কৈফিয়ত দিতে হচ্ছে আমাকে!”

স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে বেশ জোরে কথা বলে উঠেছিলেন উপেন মিত্তির। বুকের মধ্যে বাতাস ভরে নেওয়ার জন্য আবার থামতে হয় তাঁকে। ক্ষণিকের নীরবতা ফের টুকরো টুকরো হয়ে যায় পরের কথায়, “আমাকে এই কথা জিজ্ঞাসা করার স্পর্ধা তোমাকে কে দিল! বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রাজনীতি ঢোকাতে চাও তোমরা!”

মাথাটা উঁচু করে এইবার প্রধান শিক্ষকের চোখে চোখ রাখে নরেন্দ্র ওরফে নরেন। যে কথা বলে, সেই কথায় একজন অনুগত ছাত্রের থেকে একজন নেতার সংকল্প স্পষ্ট, “স্যার বিষয়টা রাজনীতির নয়। বিষয়টা ন্যায় অন্যায়ের।”

অকালপক্কতা। কিন্তু উপেনবাবু জানেন নরেনের মত মেধাবী ছাত্রের পক্ষে এই ধরনের কথা বলা অসম্ভব নয়। ছাত্রের কথার পর কোনও কথা খুঁজে পান না চট করে। কিন্তু একজন শিক্ষকের সেই অপ্রস্তুত ভাব বাইরে প্রকাশ হয়ে পড়া দস্তুর নয়। উপায়ন্তর না পেয়ে উপেন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ অন্য প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন, “হাফ ইয়ারলি পরীক্ষায় তোমার ফলাফল আমাকে হতাশ করেছে নরেন্দ্র। বাংলা এবং অঙ্ক, এই দুই বিষয়ে তোমার এত খারাপ অবস্থা আগে কখনও দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না।”

সব ছাত্রের উপর ব্যক্তিগতভাবে নজর রাখা হয় না, কিন্তু যাদের দ্বারা বিদ্যালয়ের গৌরব বৃদ্ধি হবার সম্ভাবনা আছে তাদের বিষয়ে উপেন স্যার নিজে খোঁজ খবর রাখেন বৈকি। নরেন যখন আলটপকা প্রশ্নবাণে থমকে আছে তখনই উপেনবাবু আরও একখানা প্রশ্ন করেন, “ন্যায় অন্যায়ের তুমি কতটুকু জান নরেন্দ্র?”

এর উত্তর যে নরেনের কাছে ছিল না তা নয়। কিন্তু স্যারের মুখে মুখে তর্ক করার ছেলে সে নয়। তাই কিছু না বলে চুপ করে থাকে। বলে যান উপেনবাবু, “এইসব বাদ দিয়ে নিজের পড়াশুনায় মন দাও। তাতেই তোমার মঙ্গল। বিদ্যালয়েরও। যাও পিরিয়ড শুরু হয়ে গেছে। নিজের কাজে যাও।”

কিন্তু, দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করা ছাড়া ওদের সামনে এখন যে আর কোনও কাজ নেই। স্যার যে কাজের কথা বলছেন তার কানাকড়ি যে দাম নেই ওদের কাছে! যাই হোক, মাথা নীচু করে বেরিয়ে আসে নরেন্দ্র।   

আট

ক্লাস ছুটি হয়ে গেছে বেশ খানিক আগে। ঘর ফেরতা ছেলেদের কোলাহল গেছে থেমে। কিন্তু নরহরির আজ বাড়ি যাবার কোনও নাম গন্ধ নেই। জলের মধ্যে হেলে পড়া খেজুর গাছের পেটে চড়ে, সে দিব্যি ছিপ ফেলে বসে আছে ইশকুল-মাঠের পুকুরে।

তবে, নরহরির এখন মাছ ধরার মন নেইকো মোটে। তার কব্জি, হাতের গুলি কিম্বা বুকের ছাতি দেখে যেখানে সবাই তাকে সমীহ করে, সেইখানে সতুরা তাকে গ্রাহ্যের মধ্যেই আনে না! এই অসম্মান আর কাহাতক সহ্য করা যায়! সেই তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের কথা সে যতই ভাবে ততই আনমনা হয়ে যায়। না…এইবারেতে ওদের একটা ব্যবস্থা না করলেই নয়।

জলের মধ্যে ফাতনা ওঠে নামে কিন্তু মোক্ষম সময়ে টানখানা আর পড়ে না। আজ মাঠপুকুরের শোল শালের খুব আনন্দ। ফুড়ুংফাড়ুং আসে আর টকাস করে টোপে ঠোক্কর মেরে হাওয়া হয়ে যায়।

বেশ খানিকক্ষণ ধরে এইরকম চলার পর, একটা বিশাল শোল কিম্বা মাগুর টোপখানা পুরোপুরি গিলে নিয়ে ধাঁ করে ছিপ সমেত পগারপার হওয়ার মতলবে ছিল। আলগা করে ধরে থাকা ছিপ হাত থেকে বেরিয়ে যাবার উপক্রম হলে খেয়াল হয় নরহরির। কিন্তু এইবারেও টান ঠিক হয় না। মাছ তো জলের উপরে ওঠেই না বরং বেগতিক হ্যাঁচকায় ছিপটাই আধখানা হয়ে যায়।

যজ্ঞডুমুর গাছটার গোড়ায় বইপত্তরগুলো রেখে দিয়েছিল। ভাঙা ছিপ আছড়ে ফেলে বইখাতা বগলদাবা করে নরহরি রওয়ানা দেয়  মাহিনগরের দিকে। রাজপথে এসে উঠতেই তার নজরে পড়ে খড় বোঝাই একখানা গরুর গাড়ি, এগিয়ে আসছে চৌহাটির দিক থেকে। যে মেঘ না চাইতেই জল! একবার গাড়োয়ান ভাইকে বলে উঠে বসতে পারলে সময় খানিক বাঁচে। সাঁঝের আঁধার ঘনাবার আগেই তবে পৌঁছানো যায় গন্তব্যে। যে করে হোক এইবার সাতকড়িদের একটা শিক্ষা দিতেই হবে। সেই জন্য আজ সন্ধ্যার আগেই তার পৌঁছানো দরকার জায়গামত। 

আরও কাছে এগিয়ে এসেছে গরুর গাড়ি। জোয়ান মদ্দ গরু দুখানা বেশ। ডাওয়ালি আর বাওয়ালি দুটোই গায়েগতরে একই রকম। পেল্লাই শিং দু’খানা নাড়তে নাড়তে এদিকেই আসছে হলদেটে আলো ভেদ করে। গলায় ঘণ্টা বাঁধা।  টুং টাং মিঠে আওয়াজে ব্যাজার মনটা একটু যেন ভালো হয় নরহরির।

গাড়ি কাছে এলে নরকে কিছু বলতে হয় না। গাড়োয়ান ভাই ছুঁচলো দাড়ি নাড়িয়ে হাসেন। নিজেই নরম গলায় শুধোন, ‘কী গো ছোটো কত্তা বই বগলে দাঁড়িয়ে আছো দেখছি। ছুটির পর বাড়ি যাওয়া হয়নি বুঝি? যাবে নাকি? ” কথা শুনে মনে হয় যেন কত কালের চেনা। কে বলবে, আজই এই ছেলেটির সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ!

নরহরি বলে, “ওঠার তো ইচ্ছে ছিল কিন্তু কোথায় উঠি চাচা! গাড়ি যে তোমার বিচুলিতে একদম বোঝাই গো!”

আরে বাপধন, এই বিচুলির উপরই চেপে পড়তে তোমার আপত্তিটা কী শুনি?”

প্রস্তাব মনঃপুত হয় নরহরির। উঠে বসে কায়দামত। গাড়ি চলতে শুরু করে আবার। ক্যাঁচকোঁচ শব্দ উঠছে মাঝে মাঝে।

তোমার ধুরিতে বোধহয় তেল পড়েনি আসলাম চাচা…।”

গাড়োয়ান ভাইয়ের মৃদু হাসি এইবার আরও একটু জোরালো হয়। “আজ্ঞে আমার নাম যে ‘আসলাম’, এটা তুমি জানলে কেমন করে ছোটো কত্তা!”

নরহরি ছুটির পর বাড়ি যায়নি। খিদে পেয়েছে বেজায়। বাড়ি থেকে ছোলাভাজা নিয়ে এসেছিল আসার সময়। বার করে চিবোতে চিবোতে সেও একগাল হাসে, “এমনি মনে হল আর কী…”

সেকি আর আর বুঝিনি গো কত্তা হে হে! সে যাই হোক গে যাক… নাম আমার লালমিঞা। লালমিঞা তরফদার।  তা তোমার বাড়ি কি এদিক পানেই নাকি গো?”

না। আমার বাড়ি চাঙড়িপোতা গাঁয়ে। এদিকে একটু মালঞ্চর দিকে যাচ্ছি।”

এইবার যা বলে চাচা, তাতে বেশ অবাক হয়ে যায় নরহরি।

মাহিনগরের মালঞ্চ? সে তো আমাদের সাতকড়ি মানে সতু বাপধনের জায়গা গো!”

সাতকড়িকে তুমি চেন নাকি চাচা?”

বিলক্ষণ চিনি। তার বন্ধু নরেনকেও চিনি। দু’জনাই তো আমাদের খাসমল্লিকে গিয়ে হাজির হচ্ছে আজকাল যখন তখন।”

ক্যাচোরকোচোর শব্দ খুব বেড়েছিল হঠাৎ করে। লালমিঞা চাচা গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়েন। বিচুলির আঁটির ভিতর থেকে একটা শিশি বার করে পিছনে যান। একটু ঝুঁকে ধুরিতে খানিক তেল ঢেলে আবার চড়ে বসেন। আওয়াজ দেন… হ্যাররর হ্যাট…হ্যাট…এইদিকে, বিস্ময় কাটলে নরহরি জানতে চায়, “কেন গো চাচা তোমাদের গাঁয়ে সাতকড়িদের আবার কী কাজ!”

লালমিঞা কান খাড়া করে শোনার চেষ্টায় ছিলেন, তেল দেওয়ার পর তার গাড়ির ত্রাহি ত্রাহি রব কিছু কম হল নাকি। সেই দিকে এক কান পেতে রেখেই উত্তর করেন, “কেন আবার! যে হিঁদু আর মোসলমানদের ভাগ করার জন্য উঠে পড়ে লেগিছে বড়োলাট, তা সে খবর তো আমার মত গোমুখ্যিরও জানা আছে, তা তুমি কি জান না কত্তা?”

হ্যাঁ, সেই খবর, সুরেন বাঁড়ুজ্জের রাজপুরে আসার খবর, সবই নরহরি জানে বৈকি। কিন্তু তলিয়ে কিছু জানে না। আলাদা করে ভাবেওনি কোনোদিন। সে মাছধরা,  বলখেলা,  মারদাঙ্গা, এই সব নিয়েই বেশ আছে। এখন তড়িঘড়ি বলে, “হ্যাঁ হ্যাঁ… তা জানব না কেন? কিন্তু তার সঙ্গে মক্কেলদের তোমাদের গাঁয়ে যাবার সম্পর্কটা ঠিক কী!”

না, ধুরিতে তেল দেওয়ায় কাজ হয়েছে। চাকার ঘ্যানঘ্যানানি বন্ধ একদম। বিচুলি বোঝাই গাড়ি এখন যেন পঙ্খীরাজ। হরিতলা পেরিয়ে দিব্যি এগোচ্ছে গড়গড়িয়ে। তৃপ্তির হাসি হেসে এইবার সওয়ারির কথায় পুরোপুরি কান করেন লালমিঞা সাহেব। পথের ধারে একটা বিরাট বেল গাছ। পাতায় পাতায় তার শেষ বিকেলের রং। মিঞা সাহেবের হাসিতে সেই রংয়ের ছোপ ধরেছে। দাড়িতে একবার হাত বুলিয়ে নিয়ে বলেন, “কেন আবার! সুরেন বাঁড়ুজ্জের সভার জন্য লোক যোগাড় কত্তে হবে না!”

অ্যাঁ! চাচা বলে কী! কথা শুনে খড়ের আঁটির উপর থেকে চিৎপাত হবার উপক্রম হয় নরহরির। কোনোরকমে নিজেকে সামলে ঠিক করে বসে আর দাঁতে দাঁত চেপে ভাবে, বটে…! তলায় তলায় এত! শুধু চাঙড়িপোতাই নয়, আরো দূরে দূরে হানা দেওয়া শুরু করেছে হারামজাদাগুলো!

বিড়বিড় করে নিজের মনে বলতে থাকে, “মিছিলের জন্য লোক যোগাড় করা বার কচ্ছি।  দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা। যদি একবার আমার টোপখানা গিলিস তবে আর দেখতে হবে না। দু’ঠ্যাংয়ের উপর আর খাড়া হয়ে দাঁড়াতেই পারবি না। মিছিল তো অনেক দূরের কথা। দেখাচ্ছি বাপধনেরা। রোসো… একটুখানি রোসো…” 

নয়

এইদিকে এখন মাহিনগরে হৈ হৈ করে চলছে, জঙ্গল সাফ করে ফুটবল খেলার মাঠ তৈরির কাজ। সাতকড়িরা যারপরনাই ব্যস্ত সেই কর্মযজ্ঞে।

একখানা পুরনো আকন্দর মূল অনেক দূর অবধি চাড়িয়ে গিয়েছিল। সেটা নিয়ে গলদঘর্ম হতে হচ্ছিল সাতকড়িকে। যে করেই হোক জমিটা তাদের তৈরি করতেই হবে। নিজের গাঁয়ে একখানা মাঠ থাকবে না কেমন কথা! কদ্দিন আর ভিন গাঁয়ে গিয়ে গিয়ে খেলে বেড়ানো যায়!  কুস্তি কিম্বা মুগুর ভাজা একরকম, আর বল খেলার মজা আর একরকম। পায়ের মধ্যে চর্মগোলোকটি আটকে নিয়ে ছোটার যে কী আনন্দ তা বলে বোঝানো মুশকিল! আর তার সঙ্গে যদি যোগ হয় মাঠের পাশে দাঁড়ানো মানুষগুলির হইহই রব, তাহলে তো আর কথাই নেই।

ঘামে ভিজে গিয়েছিল সতুর হাতের চেটো। কোদালের বাটটা পিছলে পিছলে যাচ্ছিল হাত থেকে। ধুতিতে ঘাম মুছে ফের যখন বাগিয়ে ধরেছে যন্তরটা, তখনই কানে আসে কর্কশ বাক্যখানা,   “ওহে সাতকড়ি বন্ধু আমার, আমি কি তোমায় কিছু সাহায্য করতে পারি? তোমার অবস্থা যে বড়োই কাহিল মনে হচ্ছে!”

কুড়াল ফেলে চকিতে ঘুরে দাঁড়ায় সতু। নিমেষে ইস্পাত কঠিন হয়ে যায় তার গলা। কোমরে হাত দিয়ে নরহরিকে শুধোয়, “তুই আবার এইখানে কী মনে করে!”

লালমিঞা চাচার গাড়ি থেকে নামার সময় একটা খড়ের ডাঁটি হাতে নিয়ে নেমেছিল নরহরি। গোড়াটা মুখের মধ্যে নিয়ে দাঁত দিয়ে কাটার চেষ্টা করছিল, অখেয়ালেই। সেই দেখে হাসতে শুরু করে সাতকড়ি। প্রথমে মৃদু, তারপর অট্টহাস্য। নরহরি বলে, “হাসছিস কেন খ্যা খ্যা করে! আমার কি রূপ বেড়েছে নাকি!”

সাতকড়ি এবং অন্য যারা ছিল তারা এই কথায় আরও মজা পায়। সাতকড়ি হাসতে হাসতেই বলে, “রূপ বেড়েছে কী বলছিস! এইবারেতে তোর আসল রূপ খুলেছে…অ্যাদ্দিনে তুই বুঝতে পেরেছিস তোর কী খাওয়া উচিত। হা হা হা…।”

তবে, নরহরিও ওস্তাদ কম নয়। অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝে ফেলে সাতকড়িরা কী বলতে চাইছে। অপ্রস্তুতভাব কাটিয়ে উত্তর করে, “তা যা বলেছিস, আমার আসল রূপ বুঝতে পেরে একেবারে মাহিনগর গোয়ালেই চলে এলুম আর কি। তোদের সঙ্গে যদি একসঙ্গে থাকা যায়। অবশ্যি এসে মনে হচ্ছে ভুল করেছি র‍্যা! গোয়ালের তবু তো একটা ছিরিছাঁদ থাকে, তো দেখছি খাটাল! আমার থাকার যোগ্যি নয়। সেই নিজের গাঁয়েই ফিরে যেতে হবে।”

একটু থেমে আবার বলে, “তা এই খাটালটাকেই তোরা মাঠ বানাবার মতলব করেছিস বুঝি!”

নরহরি খেয়াল করেনি, যারা আগাছা সাফ করার কাজে মেতেছিল তাদের মধ্যে নরেন্দ্র এবং শৈলেশ্বরও ছিল। তারা এসেছে বন্ধুকে মাঠ তৈরির কাজে সাহায্য করতে। হরিকুমার আসতে পারেনি। তার বল খেলার চাইতে কবাডিতে বেশি আগ্রহ। আজ নিজের গাঁয়ে সেই নিয়েই মেতে আছে সে।  

যাই হোক, এখন সাতকড়ি এবং নরহরির মধ্যে একটা গোল বাঁধার উপক্রম হলে, নরেন এগিয়ে আসে, “আজ টিফিন বেলা থেকেই তুই আমাদের পিছু নিয়েছিস। কী ব্যাপার রে!  অ্যাদ্দুর বয়ে বয়ে এমনি নিশ্চয়ই আসিসনি। খুলে বল দেখি ব্যাপারখানা!”

চৌকো চোয়াল নাড়িয়ে হা হা করে হাসে নরহরি। বলে, “সে কথা অবশ্য ঠিকই বলেছিস। এমনি আসিনি। এসেছি একখানা প্রস্তাব নিয়ে,” একটু থেমে আবার বলে, “হে হে…বলছিলুম যে আর একটিবার আমাদের সমিতির মাঠে আয় না, দেখি সত্যি সত্যি বল খেলায় কত দড় হয়েছিস তোরা?”

সাতকড়ি সঙ্গে সঙ্গে বলে, “কেন! তোদের মাঠে আবার কী করতে যাব? আমাদের কি মাঠ নেই! একবার তো হারিয়ে এলুম। তাতে শান্তি হয়নি বুঝি!”

হে হে হে… সে একবার না হয় হারিয়েছিস। আরও একবার যদি হারাতে পারিস তবে না বুঝব তোরা সত্যি সত্যি বল খেলা শিখেছিস।”

এরপর একটু থেমে বলে, “ঠিক আছে তোদের যদি যেতে ভয় হয়, তবে আমরাই আসছি না হয়। এই খাটালে এসেই তোদের চার গোল দিয়ে যাব এখন। এইদিকের লোকে নাকি আজকাল বলে বেড়াচ্ছে, তাদের সতু বাঁড়ুজ্জে জাঁদরেল খেলোয়াড়। সে পায়ে বল পেলে নাকি তাকে থামায় এমন সাধ্যি কারও নেই! তা আমরাও দেখি কত বড়ো খেলুড়ে হয়েছে সে?”

সাতকড়ি বলে, “সেটা আগের দিন বুঝতে পারিসনি?”

আরে সেদিন তো বেকায়দায় ধুতি খুলে গিয়েছিল গোলে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের হেবলোচরণের, আর সেই সুযোগেই তো তুই গোল করে দিলি। আরও একবার করে দেখা, তবে তো বুঝব!”

নরহরির কথা শুনে গা-পিত্তি জ্বলে যায় সবার। এদিকে নরহরির মুখে যেন খই ফুটছে। কথার বিরাম নেই তার, “তা তোরা যদি খেলতে ভয় পাস, তবে সেটা স্বীকার করে নে। তাহলেই সব মিটে যায়। তাহলে আর আমি তোদের খেলার কথা বলব না।”  

নরহরির কথাকে হেলাচ্ছেদা করে উড়িয়েই দিত সাতকড়ি, যদি না তার বাক্যগুলোর মধ্যে ‘ভয়’ শব্দটা থাকত। ঐটে শুনেই মাথাটা আগুন হয়ে যায়। এইদিকে, নরেন্দ্রর কেন যেন মনে হচ্ছে নরহরির কোনও একটা বদ মতলব আছেই আছে। খেলার নেমতন্নের পিছনে আরও গভীর কোনও উদ্দেশ্য আছে তার। সুরেন বাঁড়ুজ্জের সভার আগে কিছু একটা গোলমাল পাকাতে চাইছে না তো সে! 

সতু, নরহরিকে কিছু বলার আগেই নরেন্দ্র দু’জনের মাঝে এসে দাঁড়ায়। বলে, “ঠিক আছে নরহরি তুই এখন যা। আমরা একটু চিন্তাভাবনা করে তোকে জানিয়ে দেব।”

অট্টহাস্য করে ওঠে নরহরি। হাসির দমকে দুলতে থাকে তার ঝাঁকড়া চুল আর দস্যুর মত শরীরটা। “হা হা হা …কথায় বলে না দুষ্টের ছলের অভাব হয় না। ভয় পাচ্ছিস সে কথা স্বীকার করেই নিলি তবে?”

নরেন্দ্রর পিছন থেকে বাঘের মত গর্জন করে ওঠে সাতকড়ি, “ভয়? তোর মত একটা নেংটি ইঁদুরকে!”

বেশ… ভয় পাস নে যখন… তখন অত কতার কী আছে। চলে আয় একদিন সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে। দেখি কত মুরোদ হয়েছে তোদের?”

সে দেখতেই পাবি। কিন্তু আমি ভাবছি একটা অন্য কথা।”

কী ভাবছিস!”

ভাবছি তোর মত একখানা নেংটি ইঁদুর, যে বলে লাথি মারতেই শেখেনি, তার সঙ্গে বারবার খেললে আমাদের মান ইজ্জত থাকবে?”

নরেন্দ্র এবং শৈল ছাড়া, আরও যারা ঝোপ জঙ্গল সাফ করার কাজে জুটেছিল, তারা সবাই এতক্ষণে ঘিরে দাঁড়িয়েছে দুজনকে। হো হো করে হাসতে শুরু করে সাতকড়ির কথায়। তার খুড়াতো ভাই ক্ষিতি বড়ো বেশি ফাজিল।  লিকপিকে শরীরখানা নিয়ে নরহরির সামনে গঙ্গাফড়িঙের মত তিড়িংবিড়িং লাফাতে থাকে, আর খ্যাঁ-খ্যাঁ করে  হাসতে থাকে। বলতে থাকে, “ঠিক ঠিক…সে কথা ঠিক বটে…মান ইজ্জত যাবে বৈকি…হে হে হে…”

দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তাকে সিংহের মত থাবা দিয়ে ধরতে যায় নরহরি।

খবরদার… লজ্জা করে না বেয়াদব। একটা বাচ্চা ছেলের গায়ে হাত তুলতে যাস। ক্ষমতা থাকে তো আয় আমার সঙ্গে লড়াই কর।” কথাটা বলে হাতের কোদালখানা আছড়ে ফেলে সতু বাঁড়ুজ্জে। লাফ দিয়ে দাঁড়ায় এসে নরহরির সামনে।

নরহরি এবং সতু, বাহুবলে কেউ কারও থেকে কমতি নয়। দুজনেই এক ঘুষিতে ফাটিয়ে ফেলতে পারে ছাড়ানো নারকেল। এক রদ্দায় ভেঙে ফেলে খান চারেক টালি। নাগাড়ে একশ বুকডন আর দুশো বৈঠক, দুজনের কাছেই নস্যি। অনুষ্ঠান বাড়িতে গোটা একখানা কচি পাঁঠা ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়, দু’জনেই। এই হেন দুই মহারথীতে যদি মল্লযুদ্ধ বাঁধে তাহলে রক্তারক্তি অনিবার্য।

নরেন ফের চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় দু’জনের মাঝে এসে পড়ে। কোনোরকমে ঠেকায় কুরুক্ষেত্র। বলে, “ঠিক আছে নর তুই এখন যা। আমরা এর মধ্যেই একদিন খেলতে যাব তোদের সমিতির মাঠে। কবে যাব এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তবে আমি ওদের হয়ে কথা দিলাম, যাব একদিন।”

দশ

মাস দুই আগেই স্কুল-ইন্সপেকটার, সিদ্ধেশ্বর সরখেল বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসেছিলেন। আজ আবার এসেছেন। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে সরখেলের এই আগমন খুব স্বাভাবিক ঠেকেনি উপেনবাবুর কাছে। বিশেষ সূত্রে নির্দিষ্ট কোনও খবর পেয়ে আসেননি তো? আজ প্রথম থেকেই মানুষটির চোখমুখ কেমন যেন থমথমে। স্বতঃস্ফুর্ততার লেশমাত্র নেই। আজ উপস্থিত হওয়ার খানিকক্ষণের মধ্যেই তিনি দশম শ্রেণীতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।

নানা চিন্তায় মাথা ভারাক্রান্ত হলেও উপেন্দ্রনাথের মুখে সেই চিন্তার ভাব বড়ো একটা ফুটে ওঠে না। স্মিত হাসি তাঁর স্বভাবজাত। যথাযথ আপ্যায়ন সহকারে তিনি ইন্সপেক্টরকে নিয়ে উপস্থিত হলেন দশম শ্রেণির কক্ষে। এবং প্রবেশ মাত্রই যে বিশেষ ছাত্রটির নাম উচ্চারিত হল সিদ্ধেশ্বরবাবুর মুখে তাতে প্রধান শিক্ষকের পূর্বের ভাবনাতেই সিলমোহর পড়ল। “নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য কার নাম?”

দ্বিতীয় পঙক্তির এক ধারে দেওয়াল ঘেঁষে বসেছিল নরেন। উঠে দাঁড়িয়ে উত্তর দেয়, “আজ্ঞে আমিই সেই অধম।” নরেন মেধাবীই শুধু নয়, বিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রদের মধ্যে একজন। বুদ্ধি এবং বিচার-বিবেচনা তার প্রখর। সিদ্ধেশ্বর সরখেলের পুনরাগমন এবং ঘরে ঢোকামাত্রই তার খোঁজ,সব কিছু মিলিয়ে ঘোরতর একটা কিছু আন্দাজ করে নিয়েছে সে।

সিদ্ধেশ্বর সরখেল ঢুকেই ইতিহাস নিয়ে পড়লেন। তাও মোগল-মারাঠা এদের বাদ দিয়ে লর্ড ক্লাইভ এবং পলাশীর যুদ্ধ! প্রথমে বোঝা না গেলেও পরে বোঝা গেল, তাঁর আসল উদ্দেশ্য হল ফাঁদ পাতা। যাতে একরত্তি ছেলেটা উত্তেজিত হয়।

দু-একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর তিনি যা ভেবেছিলেন তাই ঘটল।  নরেন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সম্পূর্ণ অন্য কথা বলল, “স্যার অন্য কিছুর জন্য না হলেও একটি বিষয়ের জন্য আমাদের পলাশীর যুদ্ধ মনে রাখা দরকার।”

কী বিষয়?”

মীরজাফরের বিষয়টি আমাদের সবার আগে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন। তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি সবিশেষ বিশ্লেষণ করা দরকার। না হলে এখনকার মীরজাফরদের চিহ্নিত করা মুশকিল।”

নরেনের মত মেধাবী ছেলের পক্ষে এই ধরনের কথা বলা যে অসম্ভব নয়, তা বিলক্ষণ জানেন উপেন মিত্তির। পাছে আরও কিছু বলে ফেলে, তাই চোখের ইশারায় নরেনকে থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ‘বেয়াদপ’ ছাত্রটি স্যারের দিকে তাকিয়েও দেখে না। ইন্সপেক্টর চোয়াল চাপা ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করেন, “হঠাৎ তোমার এই কথার হেতু?”

নিজের মত বলে চলে নরেন, “তখন মীরজাফর ছিলেন মাত্র একজন। এখন মীরজাফর রয়েছেন হাজারে হাজারে। তারা সাহায্য না করলে বড়োলাট কার্জনের সাধ্য কী আমাদের উপর ছড়ি ঘোরায়!”

সিদ্ধেশ্বর সরখেলের চোখমুখে বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠলেও ক্ষণিকের মধ্যে তা মিলিয়ে যায়। সরু চোখ আরও সরু হয়ে ওঠে। তিনি গোপন সূত্রে খবর পেয়েছিলেন এই বিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র সরকার বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়েছে এবং নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য হল সেই দলের পাণ্ডা। নরেনের কথায় তার সেই ভাবনা আরও দৃঢ় হয়। তিনি আর বেশি কথা না বাড়িয়ে হেডস্যারকে নিয়ে বেরিয়ে যান ঘর থেকে।

উপেনবাবুর ঘরে এসে আসন গ্রহণ করতে না করতে তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করেন, “স্যার আপনি এখনও কি বলবেন, আপনার বিদ্যালয়ে এমন কোনও ছাত্র নেই যার আচার-আচরণ সন্দেহজনক।”

বিপরীত দিক থেকে ঠিক এইরকমই একটা প্রশ্ন যে ধেয়ে আসবে তা আন্দাজ করে নিয়েছিলেন আগেই। উপেনবাবু একটু সময় নিয়ে বলেন, “ছেলেটি তো ভুল কিছু বলেনি?”

আপনি কি ছেলেটির ইঙ্গিত বুঝতে পারেননি?”

ইঙ্গিত নিয়ে আমি অত তলিয়ে না ভাবলেও এটি বেশ বুঝতে পারছি যে, ছেলেটি নিজের দেশে ইংরেজদের শাসন একেবারেই মেনে নিতে পারছে না।”

সে যা করেছে তা অপরাধ। সে একজন বিদ্যালয় পরিদর্শককে অপমান করেছে!”

আহা…আপনি তো আর মীরজাফর নন…”

উপেন মাস্টারের এই বাক্য যেন শেল হয়ে বিঁধে যায় সরখেলের বুকে। খোঁচা খাওয়া বাঘের মত লাফিয়ে ওঠেন। বলেন, “স্যার আপনি অনুগ্রহ করে যে রিপোর্ট সরকার বাহাদুরকে পাঠিয়েছেন, সেইটের যথাযথ পরিমার্জন পরিবর্তন করে পুনরায় রিপোর্ট পেশ করুন। এবং তা যত শীঘ্র সম্ভব। অন্যথায়…”

মিস্টার সরখেলের কথার ভিতর যে ঔদ্ধত্য, তা প্রধান শিক্ষক মেনে নিতে পারেন না। তিনি জিজ্ঞাসার সুরে শেষ শব্দটি উচ্চারণ করেন, “অন্যথায়?”

সরখেল হাতলওয়ালা চেয়ার পিছনদিকে ঠেলে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলেন, “অন্যথায়, অনুদান শুধু যে বন্ধ হবে তাই নয়, এই বিদ্যালয়টিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে। এই অঞ্চলের শয়ে শয়ে ছাত্র পড়াশুনোর সুযোগ হারাবে এবং তার জন্য দায়ী থাকবেন আপনি।”

বাক্য শেষ করার পর আর এক মুহূর্ত দাঁড়ান না ইন্সপেক্টর। ধূমকেতুর মত যেইভাবে উদয় হয়েছিলেন সেই ভাবেই অন্তর্হিত হন।

নরেন্দ্রর বাবা দীনবন্ধু ভট্টাচার্য এই বিদ্যালয়েরই সংস্কৃত বিভাগের প্রধান। উপেন মিত্তির আজ অবধি দীনবন্ধুবাবুর সঙ্গে তার পুত্রের বিষয়ে কোনও কথা বলেননি। কিন্তু উপেনবাবুর মনে হচ্ছে আর দেরি করা ঠিক হবে না। কালবিলম্ব না করে দীনবন্ধুবাবুকে ডেকে পাঠান তিনি। 

দীনবন্ধু বিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী সবই জানেন। তলবের কারণ বুঝতে বাকি থাকে না তাঁর। দ্রুত হাজির হন। উপেনবাবু কোনোরকম ভণিতা না করেই নিজের কথা বলতে আরম্ভ করেন, “স্যার আজকের ঘটনা আপনি কি শুনেছেন?”

হ্যাঁ। এইমাত্র শুনলাম।”

রাজরোষে পড়লে সরকারি অনুদানই শুধু বন্ধ হবে না, এই বিদ্যালয় কালো তালিকাভুক্ত হবে।”

হ্যাঁ, এই কথাও আন্দাজ করেছেন বৈকি দীনবন্ধু। সংসারে সচ্ছলতা কোনোদিনই ছিল না। পুরোহিতের কাজ করে অতগুলো মানুষের ভরণপোষণ ছিল অসম্ভব। যজমানি করতেন আর সঙ্গে, আড়বেলিয়া গ্রামের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। কিন্তু তাতেও সংসার চালানো দায় দেখে চাঙড়িপোতায় শ্যালকের বাড়িতে ছেলেকে পাঠিয়ে দেন। পরে আড়বেলিয়ার বাস তুলে সপরিবারে চলে আসেন চাঙড়িপোতা। হরিনাভি ইশকুলে শিক্ষকতার কাজ নিয়ে।

সচ্ছলতার মুখ দেখেননি ঠিকই, তবে চলে যাচ্ছিল। উনি জানেন, সরকারি অনুদান বন্ধ হয়ে গেলে এই চাকরিও আর থাকবে না। সপরিবারে পথে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। তবে উনি সঙ্গে এটাও যে জানেন, পুত্র নরেন্দ্র কোনও অন্যায় করছে না। আর সেখানেই হচ্ছে তাঁর সমস্যা। পিতা হয়ে পুত্রের ন্যায়ের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ান কী করে!

এখন কথার পৃষ্ঠে কথা যোগায় না মানুষটির। ঐদিকে উপেনবাবু আবার বলেন, “একটি বিদ্যালয় যদি কালো তালিকাভুক্ত হয় তার ফল যে বড়ো ভয়ংকর দীনবন্ধুবাবু! ”

দীনবন্ধু এইবার খুব ধীরে ধীরে বলেন, “কিন্তু আমার যে উভয় সংকট উপেনবাবু! ”

কী রকম?”

কখনই চাই না এই বিদ্যালয় কালো তালিকাভুক্ত হোক। আবার এইদিকে, পিতা হয়ে নরেনকেই বা কীরূপে ওর লক্ষ্য থেকে সরে যেতে বলি! সুতরাং এই ক্ষেত্রে আমার হাতে একটিই মাত্র উপায় আছে।”

কী উপায় দীনবন্ধুবাবু?”

দীনবন্ধু আরও দু’এক মুহূর্ত সময় নিয়ে বলেন, “শিক্ষকতার চাকুরী থেকে ইস্তফা দেওয়া।”

আহা… আমি কি সেই কথা বলেছি! আর আপনার ইস্তফাতেই কি এই সমস্যার কিছু সুরাহা হবে!”

এই কথার পর ধীরে ধীরে, নিজের আসনে শরীরটা সম্পূর্ণ শিথিল করে দেন উপেন মিত্তির।  হাপর টানার শব্দে যে কথাগুলো বেরিয়ে আসে তাঁর পাঁজরের ভিতর থেকে তা হল, “আপনি পিতা আর আমি শিক্ষক। এমন কি আর তফাৎ দু’জনায়! কাজেই… উভয় সংকট যে আমারও দীনবন্ধুবাবু।”    

এগারো

রোদ যত চড়া হয়েছে আমগাছের ছায়া তত ঘন হয়ে পড়েছে পথের ধারে। সেই গভীর ছায়ায় আজ জড়ো হয়েছেন বেশ কয়েকজন।

যাঁরা এসেছেন তাঁদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছে খুদে বিপ্লবীরা। একে একে তিনজনের বলা শেষ হলে সামনে এসে দাঁড়ায় শেষ এবং প্রধান বক্তা নরেন্দ্রনাথ।

কাছেই ছিলেন যদুনাথ ঘোষ। যদুনাথ, রায়বাহাদুর কৃষ্ণমোহনের লিচু বাগানের প্রধান চাষি। লিচুর সময়টা ছাড়া বাদার জমিতে ভাগচাষের কাজও করেন। তবে সেইখানেও অবস্থা আলাদা কিছু নয়,লিচু বাগানের মতই। মালিক নামমাত্র মজুরি দিয়ে ফসলের দখল নেয়। তারপর সেই ফসল পাঠিয়ে দেয় শহরের বাজারে। যদু কাকার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন নিধু মণ্ডল। তিনিও লিচু বাগানে কাজ করেন। তারও অবস্থা একই রকম।

চাঙড়িপোতা গ্রামেরই একপ্রান্তে বসবাস করেন যদুনাথ ঘোষ এবং নিধু মণ্ডল। দিন কয়েক আগে কথায় কথায় একদিন নরেন্দ্রকে বলেছিলেন তাঁদের দুঃখের কথা। উদয়াস্ত খেটে যা রোজগার হয় তাতে সংসার চলে না। এইদিকে বছর বছর লিচুর ফলন বাড়ছে বৈ কমছে না। কিন্তু হলে কী হবে উপরি ফসলে তাঁদের কোনও ভাগ নেই। পুরো ফসলটাই মহাজন কম দামে কিনে শহরে চালান করে দিচ্ছে চড়া দামে, আর চাষিদের বেলা লবডঙ্কা। তাদের জুটছে শুধু নামমাত্র মজুরি।

এই বৃত্তান্ত শোনামাত্রই নরেন্দ্রনাথ ঠিক করে নিয়েছিল কিছু একটা বিহিত করতে হবে। এরপর চাষিদের নিয়েই সে এবং তার বন্ধুরা পরিকল্পনা সাজিয়েছে, কী করে সাফ করে দেওয়া যায় লিচুবাগান। তাদের কথা হল, চাষিরাই যদি তাঁদের ন্যায্য পাওনা না পান তাহলে সেই ফসল লুট করে চাষিদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া ঢের ভালো। 

যাই হোক, ছোটো জটলাটার মধ্যে এখন আছেন লালমিঞা চাচাও। যে মানুষটি নরহরিকে খড় বোঝাই গাড়ির উপর চাপিয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন সাতকড়ির গাঁয়ে। লালমিঞা তরফদার কেন যেন খুব ভালোবেসে ফেলেছেন ছেলেগুলোকে। আজকাল সময় সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন ওদের সঙ্গে। তিনিও একজন ভাগচাষী। বারুইপুর ইস্টিশনের কাছেই বিঘাখানেক জমি ভাগে নিয়ে চাষ করেন। 

 যদুনাথের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করে নরেন। “ইংরেজরা যতদিন আমাদের দেশ দখল করে থাকবে ততদিন আমাদের দুর্দশা ঘুচবে না। আসলে তাদের মদতেই মহাজন এবং জোতদাররা আপনাদের ঠকিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। আপনাদের পাওনা টাকা কম দিচ্ছে। ধান লিচু সব শহরের বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করছে। সেই ফসল আবার শহর থেকে ফিরে আসছে গাঁয়ে। আপনাদের তৈরি করা জিনিসই, আপনাদের কিনতে হচ্ছে অনেক বেশি দাম দিয়ে।”

নরেনের বাবা দীনবন্ধু ভট্টাচার্য, হরিনাভি ইশকুলের সংস্কৃত বিভাগের প্রধানই শুধু নন, সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা একজন মানুষ। বাড়িতে দেশি বিদেশি বইয়ের অভাব নেই। জাতীয় রাজনীতির খুঁটিনাটি খবরাখবরও রাখেন। কলকাতা থেকে যে পত্রিকাগুলি আজকাল আনানোর ব্যবস্থা করেছেন, সেগুলি হল সুরেন বাঁড়ুজ্জের-দি বেঙ্গলি, ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের-সন্ধ্যা এবং কৃষ্ণকুমার মিত্রের-সঞ্জীবনী। বাবার পড়া হয়ে গেলেই ঐগুলি আজকাল হস্তগত করে নরেন। পড়ার বইয়ের নীচে রেখে মুখস্থ করে। ঐটুকু ছেলে ওর মধ্যে কী যে পায় স্বয়ং ঈশ্বরই জানেন! তবে বাবার বইপত্র আর ঐসব পত্রপত্রিকা পড়ে তার মাথাটা কেমন যেন তিড়িংবিড়িং করতে থাকে। অন্যায় দেখলেই লাফিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। 

পুথি-পুস্তক পড়ে এবং বাবার থেকে শুনে যা বুঝেছে তাই নিজের মত করে পরিবেশন করতে থাকে সে। তাঁর এখন যেটা মূল উদ্দেশ্য তা হল, যা কিছু খারাপ হচ্ছে তার মূলে আছে বৃটিশ সরকার, এই বিশ্বাসটা সবার মধ্যে গেঁথে দেওয়া। বলে চলে সে, “আপনারা সবাই জানেন যে বড়োলাট বাংলাকে ভেঙে ভাগ করে দিতে চাইছেন। উনি এইসব করে হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে একটা গোলমাল বাঁধাতে চাইছেন।”

অধিনায়কত্ব নরেন্দ্রর জন্মগত। এই বয়েসেই সে যে বাগ্মিতা অর্জন করেছে তা দেখে অবাক হতে হয়। কথা বলতে বলতে একটু থেমে একবার লালমিঞা চাচা আর একবার যদু কাকার দিকে তাকায়। তারপর আবার বলতে শুরু করে,

হিঁদু অথবা মুসলিম, সে যেই হোক না কেন দুজনকেই চুষে খাচ্ছে জমিদার আর জোতদারের দল, ইংরেজ সরকারের মদতে। এখন যদি তারা এই বাংলাকে ভাগ করে, দুই জাতিকে আলাদা করে দিতে পারে তাহলে তাদের খুব সুবিধা হয়। মুসলমান আর হিন্দু, এই দুই দলে ভাগ হয়ে গেলে চাষি ভাইদের শক্তি আরও কমে যাবে। তাঁদের প্রতিবাদ করার আর কোনও ক্ষমতাই থাকবে না। সরকার বাহাদুর আর সরকারের সঙ্গে যেসব কুলাঙ্গাররা আছে, তারা সবাই মিলে ছড়ি ঘোরাতে পারবে তাঁদের উপর। কিন্তু…কিন্তু  মাননীয় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এই বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। আমাদের সবার উচিত তাঁর পাশে দাঁড়ানো। উনি বড়োলাটের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সভা করতে আসছেন আমাদের রাজপুর গাঁয়ে। আমরা ঠিক করেছি সবাই মিলে যাব তাঁর সভায়, মিছিল করে। আপনাদের আমি বিশেষ ভাবে অনুরোধ করছি আমাদের সঙ্গে সেই মিছিলে যোগদান করার জন্য। এটা নিয়ে আলোচনার জন্যই আমরা সবাই আজ এখানে জড়ো হয়েছি…বন্দে মাতরম…।”

সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষ করে ধীরে ধীরে জলচৌকিটার উপর থেকে নেমে আসে নরেন্দ্রনাথ। চারমূর্তির ডাকে সাড়া দিয়ে যারা হাজির হয়েছিলেন আমগাছতলায়, তাঁদের মুখ দেখে বেশ ভালোই বোঝা যাচ্ছে তাঁরা নরেনের কথা শুনে মুগ্ধ। ধন্যি বটে এই একরত্তি ছেলেটা। বয়েস সবে আঠারো কিন্তু এখনই কি সুন্দর কথা বলে! অবশ্যি কার ছেলে সেটা দেখতে হবে তো।

 সভা সেদিনকার মত শেষ হলেও কাজ শেষ হয় না নরেন্দ্র কিম্বা সাতকড়িদের। যাদের ডাকা হয়েছিল তাদের অনেকেই আসেননি। হাজার হোক সাধারণ মানুষের চোখে সতুরা এখনও কচিকাঁচা। কাজেই, সেই খুদেদের ডাকে সাড়া দিয়ে দলে দলে লোক আসতেই বা যাবে কেন? তবে খুদে বিপ্লবীরাও হাল ছাড়ার পাত্র নয়।

লালমিঞা তরফদার ছাড়া বয়োজ্যেষ্ঠরা সবাই একে একে ফিরে যান। তারপর, চাচাকে নিয়ে সাতকড়িরা সদলবলে বেরিয়ে পড়ে। এইবার যারা আসেননি তাঁদের বাড়ি বাড়ি যাওয়া হবে।

আমতলা থেকে খানিক দূর এগোলেই ধানিজমি। আবাদি জমির গা ঘেঁষে বেশ কয়েক ঘর বসতি। দিকেই রওয়ানা দেয় পাঁচজনের দলটা। চাচা আসার সময় তাঁর গরুর গাড়িতে করে সাতকড়িকে তুলে নিয়ে এসেছিলেন। এখানে পৌঁছানোর পর গাড়ির জোত থেকে খুলে পথের ধারে একটা তেঁতুলগাছে বাঁধা হয়েছিল ধনাই আর মনাই কে। ডোবার পাড়ে দাঁড়িয়ে আধবোজা চোখে এখন জাবর কাটছে দিব্যি।

বিশাল তেঁতুলগাছের উল্টোদিকে, ক্ষেতের মধ্যে থেকে একটা ঘন মেঘ সটান উঠে যাচ্ছে আকাশে। কালো মেঘের পেট চিরে ধানক্ষেতের সবুজ রং ছড়িয়ে যাচ্ছে এদিক ওদিক। আর পূবে খানিক দূরে, ঠাণ্ডা হাওয়ার মধ্যে দিয়ে যেন ভেসে যাচ্ছে শহরমুখী একখানা রেলের গাড়ি।    

বারো

ঘুরতে ঘুরতে বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর। চাচাও বিদায় নিয়ে ফিরে গেছেন খানিক আগে। কিন্তু এখনও বাড়ি ফেরার নামগন্ধ নেই চারজনের। সকালের দিকে মেঘ করেছিল বলে অতটা কষ্ট হয়নি। কিন্তু বেলা বাড়তেই মেঘের আড়াল সরে গিয়ে চাঁদি ফাটা রোদ্দুর বেরিয়ে পড়েছে। ঘুরতে ঘুরতে শৈলেশ্বরের বেশ ক্লান্তি বোধ হচ্ছিল। সামনেই খড়ের ছাউনি দেওয়া একটা মাটির বাড়ি। তার ঝকঝকে নিকানো উঠোনের ধারে বিশাল এক ধানের গোলা, যার ছায়ায় পাতা আছে একটা দড়ির চারপাই।

শৈল আর না পেরে সেইখানে গিয়ে বসে পড়ে ধপাস করে। উঠোনের অন্য দিকে, চালতা গাছের ছায়ার ভিতর একটা গোয়ালঘর। কে যেন একজন খড় কাটছেন পিছন করে বসে। খচরখচর আওয়াজ ভেসে আসলেও, মানুষটির চেহারা আলো আঁধারির জন্য ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না।

এইবার শুরুতে বর্ষা বেশ ভালোই হয়েছে। সারা মাঠে চারা লাগানোর কাজ শেষ হয়ে গেছে দিন কুড়ি আগেই। ফনফনিয়ে উঠতে শুরু করেছে ধান গাছগুলো। খাটিয়ায় বসে আকাশ ছোঁওয়া সবুজ চোখে পড়ছে ওদের।

এইদিকে, ওদের কথার শব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন এক মহিলা,“তোমরা কারা বাছা। এই রোদে রোদে ঘুরে বেড়াচ্ছ যে বড়ো!” কথা বলতে বলতেই তাঁর চোখ পড়ে শৈলর দিকে, “আহা মুখটা যে একেবারে শুকিয়ে গেছে। দাঁড়াও আমি এখনি আসছি।” 

আবার চলে যান ভিতরে। একটু বাদেই ফিরে আসেন। হাতে একখানা পাথরের থালা,উপরে ভারী ভারী চারটে পাথরের গ্লাস।

এটা নরেনের পাশের পাড়া। প্রৌঢ়া না চিনলেও নরেন তাঁকে চেনে। এটা কাদের বাড়ি সেটাও খুব ভালো করে জানে সে। নেহাত শৈল দুম করে ঢুকে পড়ল তাই, নাহলে এই বাড়ির ত্রিসীমানায় সে পা দিত না। কিন্তু এই মহিলা মায়ের মতন। তাঁর সঙ্গে কোনও বিরোধ নেই। একগাল হেসে নরেন শুধোয়, “গ্লাসে করে কী এনেছ গো মাসি?”

একটু বাতাসা ভেজানো জল। খেয়ে নাও দেখি বাপু চটপট। মুখগুলো যে একেবারে শুকনো হয়ে গেছে। ”

আর কথা না বাড়িয়ে এক নিঃশ্বাসে শীতল পানীয় শেষ করে ফেলে চারজন। তৃপ্তির একটা ঢেঁকুর তুলে শৈল বলে, “আঃ বাঁচালে গো মাসি। ”

প্রৌঢ়া মৃদু হেসে বলেন, “সে না হয় বুঝলুম। কিন্তু এই ঠাঠা রোদ মাথায় করে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ানো হচ্ছে শুনি! কী এমন রাজকাযযি পড়ল যে রোদ্দুর পড়া অবধি আর তর সইল না!”

সে অনেক কথা গো মাসি। আমরা লোক যোগাড় কচ্ছি, একটা বিশেষ কাজের জন্য…”

এই গাঁয়ে কম দিন ধরে বসবাস করছেন না। কিন্তু চার চারটে কচি ছেলে ঠা ঠা রোদে ঘুরে ঘুরে একটা বিশেষ কাজের জন্য লোক যোগাড় করছে, এইরকমটা কোনোদিন তিনি দেখেননি। প্রৌঢ়া বেশ অবাক হয়ে, নরম মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর, আরও সবিস্তারে জানতে চান ব্যাপারখানা।

এইদিকে, কাকে যেন একটা এগিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছিল দূর থেকে। শৈল দু’এক কথা বলতে না বলতে সেই চেহারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাথর খোদাই করা বিরাট কাঁধে কোদালখানা ফেলে এগিয়ে আসছে নরহরি নস্কর। কী আশ্চর্যি! আল ভেঙে এই বাড়ির উঠোনেই উঠে আসছে যে!

কথোপকথন বন্ধ হয়। সমস্ত আকর্ষণ গিয়ে পড়ে নরহরির উপর। মহিলা মৃদু হেসে বলেন, “ওকে চেন না? আমার ছেলে… নরহরি…।” কেউ কিছু বলার আগেই সামনে এসে দাঁড়ায় মূর্তিমান। কাঁধ থেকে কোদালখানা নামিয়ে রাখতে রাখতে বলে “তোরা এখানে কী মনে করে অ্যাঁ?”

ছেলের কথার ধরনে হতবাক হয়ে যায় মা, “ছিঃ ছিঃ এই কী কথার ছিরি রে তোর নর! রোদ্দুর সইতে না পেরে দাওয়ায় এসে বসেছে। ওদের সঙ্গে অমন করে কথা কইছিস! 

নরহরি তার মায়ের কথায় কর্ণপাত করে না। নিজের মত করে বলে যায়, “হ্যাঁ যদুকাকা বলছিল বটে তোরা এইদিকে আসবি মিছিলের জন্য লোক জোগাড় করতে…”বাক্যটা বলে সে দু-এক মুহূর্ত সময় নেয়। তারপর আবার বলে, “তবে একটা কথা বেশ ভালো করে শুনে রাখ, কৃষক সমিতি থেকে একজনও তোদের মিছিলে যাবে না।”

সাতকড়ি এক লাফ দিয়ে ওঠে, “তুই কে হে, সমিতি থেকে কে যাবে না যাবে, ঠিক করে দেওয়ার!”

সে তুই মিছিলের দিন দেখতেই পাবি। তবে যেতে পারে একটা শর্তে…”

নরেন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করে, “কী শর্তে!”

রেলের মাঠে বল খেলা হবে। সেই খেলায় তোরা যদি আমাদের হারাতে পারিস তবেই সমিতির লোকজন যাবে…নইলে নয়। আমি যখন সাতকড়িদের গাঁয়ে গিয়ে খেলার কথা বলে এসেছিলুম, তখন সেই কথা তোরা কেউ কানে নিসনি মোটে। খালি পায়তারা করেছিস। তা…এইবারেতে দ্যাখ কী করবি।”

নরহরির প্রলাপে কেউ খুব বেশি গুরুত্ব দিত না, যদি না গোয়ালঘর থেকে আরও একটা গলা ভেসে আসত। ওদের দিকে পিছন করে বসে গরুর জাবনার যোগাড় করছিলেন নরহরির বাবা গৌরহরি। কণ্ঠস্বরে তাকে চেনা যায় এতক্ষণে। চাঙড়িপোতায় হাতে গোনা যে কয়েকজন সভ্রান্ত চাষি আছেন, তাঁদের মধ্যে গৌরহরি একজন। আর শুধু তাই নয় তিনি কৃষক সমিতির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যও বটে। মাহিনগর ব্যবসায়ী সমিতির কাছে বল খেলায় হেরে গিয়ে খুব কষ্ট পেয়েছিলেন তিনিও। এখন পুত্রের কথায় যারপরনাই উৎসাহিত হন। হাতের কাজ ফেলে রেখে সামনে এসে দাঁড়ান। বলেন, “হ্যাঁ, নরহরি খারাপ কিছু তো বলেনি। খেলা হোক। তোমরা যদি আমাদের হারাতে পার, তবে আমি নিজে সমিতির লোকজনকে বুঝিয়ে তোমাদের মিছিলে নিয়ে যাব। নরুর মার সামনে দাঁড়িয়ে আজ আমি এই কথা দিলুম।”

নরহরির মা পাথরের থালা আর খালি গ্লাসগুলো নিয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়েছিলেন। কথাগুলো সব শোনার পর, তিনি কিন্তু পুরো বিষয়টার মধ্যে কেমন যেন একটা দুরভিসন্ধি আছে বলে আঁচ করেন।  

তেরো

শেষমেশ নরহরি নস্করের উদ্দেশ্য সফল হল। আয়োজন হল খেলার। চাঙড়িপোতা কৃষক সমিতি বনাম মাহিনগর ব্যবসায়ী সমিতি। সতুরা ভেবেছিল সুরেন বাঁড়ুজ্জের সভা মিটে গেলে তারপর মাঠে নামবে। কিন্তু নরহরি এবং তার পিতা গৌরহরি নস্কর, যে শর্ত রেখেছেন তারপর আর দেরি করা চলে না।

আজও মাঠে প্রচুর লোক ভিড় করেছেন খেলা দেখার জন্য। আগের দিনের মতই পাকুড় কিম্বা জামগাছের মাথাতেও উঠে পড়েছেন অনেকে। মাঠের দখিণ দিকে দু’খানা নারকেল গাছ। তার ঠিক মধ্যিখানে একটা সামিয়ানা টানানো হয়েছে। সেইখানে উপস্থিত বান্ধব সমিতি এবং ব্যবসায়ী সমিতির গণ্যমান্যরা। আছেন রায়বাহাদুর কৃষ্ণমোহন মুখোপাধ্যায়ও।

রায়বাহাদুর মাস কয়েক হল কলকাতার শোভাবাজার ক্লাব সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন। খেলার নিয়ম কানুন বেশ ভালোভাবেই জানেন। তিনিই স্থির করে দিয়েছেন, গৌরহরি নস্কর আজকের খেলা পরিচালনা করবেন। সব নিয়ম মত হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য মাঠে একজন থাকাটা খুবই দরকার। নইলে বড়ো সমস্যা হয়। গৌরহরির সঙ্গে আলাদা করে বসে তাঁকে নিয়মকানুন সব বুঝিয়ে দিয়েছেন রায়বাহাদুর।

ফাউল’ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে সবিস্তারে। সবাই এখন জানে যে, বল ছাড়া কেউ যদি কাউকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে হাত পা চালায়, তবে তাকে বলা হয় ‘ফাউল’

আগের দিন ধরাবাঁধা কোনও সময় ছিল না। এই নিয়ে চরম গোল বেঁধেছিল শেষে। যতক্ষণ চর্মগোলোকটি দেখা যাচ্ছিল ততক্ষণ চলেছিল লাথালাথি। আজ সেটি হচ্ছে না। কৃষ্ণমোহনের কাছে একখানি পকেট ঘড়ি আছে। এক সাহেব উপহার দিয়েছিলেন। চেনের সাহায্যে আটকে রাখতে হয় পোশাকের বুক পকেট কিম্বা ঝুল পকেটের সঙ্গে। সেই যন্তরটি আজ তিনি দিয়েছেন গৌরহরিকে। সময় দেখার জন্য।

এছাড়াও আরও একখানি জিনিস কৃষ্ণমোহন দিয়েছেন গৌরহরিকে। সেটি হল একটি বাঁশি। কলকাতার যে দোকানে ফুটবল পাওয়া যায়, সেখানে এই বাঁশিও পাওয়া যায়। দেখতে ঐটুকুন হলে কী হবে ফুঁকে দিলেই একেবারে চিলচিৎকার করে ওঠে। যেন কয়লার ইঞ্জিনের হুইসল।

 এইদিকে যা দিয়ে খেলা হয়, অর্থ্যাৎ সেই চর্ম-গোলকটির সবই ভালো কেবল একটি বিষয় ছাড়া। ভিতরে যে হাওয়া ভরা থাকে সেটিই হল প্রাণভোমরা। যদি কোনও কারণে ফুসসস করে বেরিয়ে যায় তবেই খেলা ভণ্ডুল। ফুটবলটি তখন একেবারে ন্যাতা। বাতিল করে দেওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না। বলের মধ্যে হাওয়া ভরে নেবার সুবিধা পাড়াগাঁয়ে নেই। কলকাতাতেই বা আছে কিনা কে জানে! কাজেই, আজ এই বিশেষ খেলার জন্য কলকাতা থেকে দু’দুখানি বল আনিয়েছেন রায়বাহাদুর।    

প্রস্তুতির কোনও খামতি রাখা হয়নি কোনোদিকেই। মাঠের চারদিকে আর মাঝ বরাবর, কোদাল দিয়ে যে লাইন কাটা হয়েছিল সেখানে চুন দেওয়া হয়েছে আজ সকালবেলা। যাতে সীমানা স্পষ্ট বোঝা যায়।

বিকেলবেলা খেলা। কিন্তু দুপুর দুপুরই দু’দলের খেলোড়ারদের মাঠে আসতে বলে দেওয়া হয়েছিল। যাতে খেলার নিয়মকানুন তাদের সঙ্গে আরও একবার ঝালিয়ে নেওয়া যায়। কথামতই মাঠে হাজির হয়েছিল দুই দল। তাদের পইপই করে আরও একবার সব কিছু বুঝিয়ে দিয়েছেন রায়বাহাদুর স্বয়ং।

যাই হোক, সব একপ্রকার মিটে গেলে বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ রেফারি গোরহরি মাঠের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর একহাতে পকেট ঘড়ি আর অন্য হাতে বল। জায়গামত দাঁড়িয়ে জোরসে একবার চিলবাঁশিটি দিলেন ফুঁকে। সঙ্গে সঙ্গে দু-দলের খেলোয়াড়রা এসে দাঁড়িয়ে পড়ল জায়গামত। রেল পুকুরের দিকে মাহিনগর ব্যবসায়ী সমিতি আর পাকুড় গাছের দিকে চাঙড়িপোতা কৃষক বান্ধব সমিতি। সতুদের আজ মরণবাঁচন লড়াই। জিততেই হবে খেলায়, নাহলে মিছিলে লোক হবে না। লোকজন ছাড়া মাঠে মারা যাবে সুরেন বাঁড়ুজ্জের সভা।

রেফারির পরনে হাঁটু অবধি খাটো ধুতি এবং একখানি নিমা। খেলোয়াড়দের খালি গা আর মালকোঁচা মারা ধুতি। এইদিকে নরহরি এবং দিকের সাতকড়ি, দুজনের শরীরই যেন একেবারে পাথর কেটে তৈরি। বিকেলের হলদেটে আলোয়, ঘামে ভেজা শরীর দুটো থেকে হিরের দ্যুতি চারদিকে ছিটকে যাচ্ছে যেন।

মাহিনগর ব্যবসায়ী সমিতির হয়ে নরেন, শৈল এবং সতু তিনজনেরই খেলার কথা ছিল। কিন্তু গতকাল অনুশীলন করতে গিয়ে পায়ে বেদম চোট পেয়েছে নরেন। আজ খেলতে পারবে না। ফলে তার জায়গায় অন্য একজন খেলবে। তবে, নরেন খোঁড়া পা নিয়েও খেলা দেখতে এসেছে। মাঠের চারদিকে উপচে পড়া ভিড়ের মাঝে সেও আছে দাঁড়িয়ে।

চোদ্দো

আরও একবার চূড়ান্ত বাঁশি বাজার পর খেলা শুরু হয়ে গেল। প্রথম থেকেই সমানে সমানে লড়াই দিতে লাগল দুই দল। বল একবার যায় পাকুড় তলার দিকে তো পরমুহূর্তেই রেলপুকুরের দিকে। এরই মধ্যে অবশ্য আলাদা করে নজর কাড়ছিল সাতকড়ি। হঠাৎ একসময় সে বল নিয়ে পৌঁছে গেল কৃষক সমিতির গোলের মুখে। সেই আগের দিনের মত। কিন্তু যখন সজোরে শেষ লাথিটা মারতে যাবে, তখনই বিপক্ষের একজন পিছন থেকে এসে মারল জোরসে এক ধাক্কা। মুখ থুবড়ে পড়ল সতু। ঠোঁটের কোণটা ফেটে রক্ত বেরিয়ে এল ঝরঝরিয়ে। তবে এই সবে কিসসু যায় আসে না তার। হাতের চেটো দিয়ে ক্ষতস্থানটা মুছে নিয়ে উঠে পড়ল এক লাফে।

যদুনাথ ঘোষ, নিধু মণ্ডল এরা সবাই চাঙড়িপোতার সমর্থক। কিন্তু এই অন্যায় সহ্য করতে পারলেন না। খেলার নিয়ম কানুন সম্পর্কে যখন বলছিলেন কৃষ্ণমোহন তখন তারাও পাশ থেকে শুনেছিলেন। কাজেই চিৎকার করে উঠলেন- ফাউউউল। এতটাই জোরে যে উপস্থিত দর্শকদের সমবেত রব ভেদ করে তাদের গলা শোনা গেল। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে গৌরহরি তা শুনতে পেলেন না।

সাতকড়ির বাবা শ্রীযুক্ত মন্মথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মাহিনগর ব্যবসায়ী সমিতির একজন সম্মানীয় সদস্য। পুত্রের খেলা দেখতে হাজির হয়েছিলেন মাঠে। সাতকড়ির ঠোঁটের রক্ত দেখে এতটুকু বিচলিত হলেন না। তিনি বেশ ভালো করে জানেন ঐটুকু আঘাতে নুয়ে পড়ার ছেলে তাঁর সতু নয়। শ্রীমানের ইদানীংকালের গতিবিধি তাঁর অগোচর নয়। এই তো দিন কয়েক আগেই, ছেলের অনুপস্থিতে ঢুকেছিলেন পড়ার ঘরে। তক্তপোষের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পড়ার বইয়ের মাঝে আবিষ্কার করেছিলেন দু’খানি অন্য বই। বঙ্কিমবাবুর আনন্দমঠ আর স্বামীজির বানি। খুব খুশি হয়েছিলেন মনে মনে।

যাই হোক, সাতকড়িকে আঘাত করার পর বল নিয়ে জটলা শুরু হল জায়গায় জায়গায়। গোলোকটিকে ঘিরে এদিক ওদিক ছুটে বেড়াতে থাকল যেন একখানি ভীমরুলের চাক। ভিড়ের মধ্যে আরম্ভ হল চোরাগোপ্তা লাথি। এর মধ্যেই হঠাৎ শৈলকে দেখা গেল, উল্কার গতিতে বলটা নিয়ে বেরিয়ে আসছে সবার মধ্যে থেকে। বিপক্ষের একজন তাকে থামানোর জন্য ছুটে এসে সপাটে পা চালাল, টাল সামলাতে না পেরে ব্যাঙের মত পড়ে গেল সে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে পড়ল বল সমেত।

মালকোঁচা মারা ধুতির একটা দিক আলগা হয়ে নেমে আসে বেশ খানিকটা। কিন্তু অবস্থাতেই বল নিয়ে শৈলর চো চা দৌড় থামায় সাধ্যি কার! অবলীলায় সে মাঝমাঠ অতিক্রম করে চলে এল কৃষক সমিতির গোলের কাছে। বাঁদিক দিয়ে পাশে পাশে দৌড়চ্ছিল সাতকড়ি। তার দিকে  বলটা বাড়িয়ে দিল চকিতে।

বল পেয়েই ডান পা দিয়ে সজোরে শট মারল সাতকড়ি। গোলরক্ষক বল ধরার কোনও চেষ্টা না করে নিজেকে বাঁচানোর জন্য তিড়িং করে একটা লাফ দিল। দু’দিকে দু’খানা বাঁশ এবং বাঁশের মাথায় একটা দড়ি টানিয়ে করা হয়েছিল গোলপোস্ট। গোলপোস্টের গা ঘেঁষে, ভিতর দিয়ে চলে গেল বল। সটান গিয়ে পড়ল একটা বুনো গাছের ঝোপে। গোওওল।

কিন্তু এরপরই শুরু হল গোলমাল। রেফারি গৌরহরি সমেত কৃষক সমিতির অনেকেই বলতে শুরু করলেন যে, বল আদৌ তেকাঠির ভিতর দিয়ে যায়নি। ফলে এটিকে কিছুতেই গোল বলে মানা সম্ভব নয়। কেউ কারো কথা মানতে চায় না মোটে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাঠ রণক্ষেত্রের রূপ নিল।

নরহরির দেহে এমনিতেই অসুরের বল। উপরন্তু নিজের গাঁ। তার সিংহবিক্রম আর দেখে কে! হনুমানলম্ফে সে এবং আরও কয়েকজন, চড়াও হল মাহিনগরের সমর্থকদের উপরে। অবাধে চালাতে শুরু করল কিল চড় লাথি ঘুষি। দু’তিনজন বেশ ভালো রকম জখম হলেন।

এইদিকে, খেলা শুরু হওয়ার খানিক বাদে মাঠে উপস্থিত হয়েছিল হরিকুমার। গোলমাল বাঁধা ইস্তক নজর করার চেষ্টা করছিল নরেনকে। অবশেষে হট্টগোলের ভিতর চোখে পড়ল তাকে।  দুই পক্ষকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু পেরে উঠছে না। হরিও নেমে পড়ল তার সঙ্গে।

সাতকড়ি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছিল বিপক্ষের দস্যুবৃত্তি। কিন্তু শেষপর্যন্ত আর পারে না। ব্যবসায়ী সমিতির সমর্থকদের ভিড়ে তার ভাই ক্ষিতিমোহনও ছিল। নরহরি যেদিন খেলার প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিল মাহিনগরে, সেইদিন তাকে বেশ ভালো রকম হ্যাটা হতে হয়েছিল এই ফচকে ছোড়াটির হাতে। ক্ষিতিকে দেখা মাত্রই সেই কথা ঝিলিক দিয়ে উঠল নরহরির মাথায়। অপেক্ষাকৃত দুর্বল ক্ষিতির উপর বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল সে।

এইবার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল সতু বাঁড়ুজ্জের। ‘বন্দে মাতরম’ শব্দে একটা রণহুংকার দিয়ে এগিয়ে গেল সামনের গোলপোস্টের দিকে। এক হাতে তুলে নিল একটা বাঁশ। হ্যাঁচকা টান মারতেই ছিঁড়ে গেল মাথায় লাগানো দড়িটা। এইদিকের বাকি আর একখানা তুলে নিল শৈল আর প্রান্তের দু’খানা হরি এবং নরেন।

নরেন্দ্রর একপায়ে চোট। খোঁড়াচ্ছিল। কিন্তু এখন আর পিছপা হবার কোনও উপায় নেই। চারজনে একযোগে বাঁশ নিয়ে তেড়ে গেল, এতক্ষণ ধরে যারা তাণ্ডব চালাচ্ছিল তাদের দিকে।

কিন্তু নরহরি নস্কর অত সহজে দমবার পাত্রটি নন। সতুদের হুংকার শুনে এক মুহূর্ত থমকে দাড়ায় বটে কিন্তু তারপরই তীর বেগে সে ছুটে যায় একটা ঝোপের দিকে। তার দেখাদেখি আরও আট দশজন দৌড় লাগায় সেইদিকে। নিমেষে ভিতর থেকে বার করে আনে তেল মাখানো বেতের লাঠি এবং কয়েকখানা লাঙলের হাতল। যেন প্রস্তুত হয়েই ছিল নরহরিরা।

বেশ বড়ো রকমের একটা গণ্ডগোলের আঁচ পেয়ে চাঙড়িপোতার যদুনাথ ঘোষ এবং নিধু মণ্ডল, দুই যুযুধান দলের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। কিন্তু তাঁদের এক ধাক্কায় সরিয়ে নরহরিরা ঘিরে ধরল চারজনকে।

সতুরা নিজেদের পিঠে পিঠ লাগিয়ে, চারজন চারদিকে মুখ করে লড়াই দিতে লাগল। নরহরির হাতে ছিল একখানা লাঙলের হাতল। খাঁজের জায়গাটায় ধরে ইচ্ছেমত চালাচ্ছিল সে। হঠাৎ সেটি সজোরে আঘাত হানল সাতকড়ির ডান হাতে। সঙ্গে সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি ছিটকে বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে। সতুরা দেখেছে আজকাল এই শব্দটা উচ্চারণ করলে ভিতর থেকে বেশ একটা জোর পাওয়া যায়।

এইদিকে, হরিকুমার অনেকক্ষণ ধরেই চেষ্টা করছিল পালের গোদাটিকে ধরাশায়ী করার। এতক্ষণে সফল হল। হাতের বাঁশটা সহসা প্রবল আঘাত করল নরহরির কাঁধে। নরহরির হাত থেকে পাকা কুলের মত খসে পড়ল অস্ত্র। সুযোগের সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করল সাতকড়ি। হাতের বাঁশ ফেলে লাফ দিয়ে চেপে ধরল নরহরির টুঁটি।

এতক্ষণে যেন দুই সিংহের মুখোমুখি মোলাকাত হল। অন্য কেউ হলে নরহরি অনায়াসে ঝেড়ে ফেলতে পারত কিন্তু সাতকড়ি তো আর তার থেকে কমতি নয়। সতুদের এখন আর বুঝতে বাকি নেই যে, খেলাটা আসল উদ্দেশ্য ছিল না নরহরির। যেন তেন প্রকারেণ নিজেদের মাঠে ডেকে একটা গোলমাল বাঁধানোই ছিল তার অভিসন্ধি। সবাই মিলে ওদের পিটিযে যদি একবার বিছানায় শুইয়ে দিতে পারে, তাহলে সুরেন বাঁড়ুজ্জের সভায় আর যেতে পারবে না তারা। আর তারাই যদি না যায়, চাঙড়িপোতার মানুষজনের যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এখন তো মনে হচ্ছে এর পিছনে বাবু কৃষ্ণমোহনও আছেন। রায়বাহাদুর হয়ত চান না, বৃটিশদের বিপক্ষে একটা বেশ বড়োসর জমায়েত হোক। একা নরর মাথা থেকে তো এই বুদ্ধি বার হবার কথা নয়!

 মাটিতে ফেলে নরহরির বুকের উপর চেপে বসে সতু। এরপর তার দু’হাতের মুঠি ক্রমশ চেপে বসতে থাকে নরহরির গলার কাছটাতে। স্বয়ং দীক্ষাগুরুর এই হাল দেখে নরহরির ভাবশিষ্যরা যায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে। রণে ভঙ্গে দিয়ে ছুট লাগায় যে যার মত।

পনেরো

অবশেষে এল সুরেন বাড়ুঁজ্জের সেই সভার দিন। যার জন্য এত কাণ্ডকারখানা। মিছিল করে যাওয়া হবে সেই রাজপুর গাঁয়ে।  প্রস্তুতি প্রায় শেষ। কিন্তু যে শোভাযাত্রা হবে বলে বলে ঠিক হয়েছিল সে আর হল কোথায়!

তাই কেমন যেন মনমরা হয়ে আছে সাতকড়িরা। মিছিলে যত লোক হবে ভাবা গিয়েছিল তার অর্ধেকও হয়নি। চাঙড়িপোতা থেকে যদুনাথ ঘোষ এবং নিধু মণ্ডল ছাড়া আর কেউ আসেননি। এখন অপেক্ষা লালমিঞা চাচার জন্য। তিনি খাসমল্লিক থেকে লোকজন নিয়ে এসে পড়লেই, হরিনাভি মোড় থেকে চলতে শুরু করবে মিছিল। এমন সময় হঠাৎ করে নরেন এসে সাতকড়িকে বলে, “দাঁড়া রে সতু আমি একটু আসছি। যাব আর আসব…।” সতু কিছু বলার আগেই নরেন হনহন করে হাঁটা লাগায় ইশকুলের পানে।

প্রধান শিক্ষক উপেন্দ্রনাথ মিত্র নিজের ঘরেই ছিলেন। তাঁর উঁচু মাথা আজ যেন কিঞ্চিৎ ঝুঁকে আছে সামনের দিকে। অপমানে নয়। চিন্তায়। সন্তানসম ছেলেগুলির জন্য। চোখের সামনে ওরা নিজেদের পায়ে আজ নিজেরা কুড়ুল মারছে। অথচ তাঁর কিচ্ছুটি করার নেই!

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নরেন মৃদু গলায় বলে, “স্যার আসব?”

এই কণ্ঠ উপেনবাবু খুব ভালো করে চেনেন।  মুখ তুলে তাকান। খুব ধীরে ধীরে বলেন, “আমার এখানে তোমার আবার কী দরকার নরেন্দ্র?” ‘বেয়ারা’ ছাত্রটি কিছু না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। আবার শোনা যায় গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর, “হ্যাঁ এস। ভিতরে এস।”

 ভিতরে ঢোকার পরও নরেনের কোনও কথা নেই। নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। এইদিকে, নিজের জায়গা থেকে উঠে জানালায় গিয়ে দাঁড়ান উপেন মিত্তির। গরাদে দু’হাত রেখে তাকিয়ে থাকেন বাইরের দিকে। যেন এই সময়টারই অপেক্ষা করছিল নরেন। পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে ঢিপ করে একটা প্রণাম করে বসে স্যারকে। চমকে ফিরে তাকান উপেনবাবু, “আহা এইসব আবার কেন…!”

আরও কিছু হয়ত বলতেন, কিন্তু গলাটা কেমন যেন ধরে আসে। নরেনও আর কিছু না বলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায়। প্রধান শিক্ষকের চোখ ঝাপসা হয়ে আসতে চায়। উপেন বাবু জানেন,  কাল থেকে আর ওদের জায়গা হবে না এই ইশকুলে। আজ যা ঘটতে যাচ্ছে এরপর ওদের  ‘রাস্টিকেট’ করা ছাড়া আর কোনও পথ খোলা রইল না তাঁর সামনে। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন না হতভাগ্য আসলে কে! দামাল ছেলেগুলো, না এই বিদ্যালয়! আরও ভাবেন, একটা বড়ো ভুল হয়ে গেল যে – ছেলেটা এল, অথচ তাকে বুকে টেনে নেওয়া হল না তো! মাথায় হাত রেখে একটিবার আশীর্বাদ করা হল না তো!

 শূন্য খাঁচার মত বুকটা নিয়ে তাকিয়েই থাকেন মানুষটি শূন্য পথের পানে।

ষোলো

লালমিঞা চাচা এসে গেছেন এতক্ষণে। আর শুধু তাই নয়, তার সঙ্গে খাসমল্লিকপুর থেকে এসেছেন কম করে জনা পঞ্চাশ। যাক তাও মন্দের ভালো। মিছিলটা একটু ভরা ভরা লাগছে এখন। নরেন ফিরে এসে নিজের জায়গায় দাঁড়ায়। ঠিক হয়েছে হরিকুমার আর শৈল থাকবে মিছিলের সামনে।  মাঝখানে থাকবে সাতকড়ি আর নরেন একদম পিছনে।

ইদানীং অষ্টম শ্রেণির জগদানন্দ ওরফে জগাইও যোগ দিয়েছিল নরেনদের সঙ্গে। তার গানের গলাটি বেশ ভালো। আজকের মিছিলের জন্য তাকে একটা বিশেষ কাজ দেওয়া হয়েছিল। কবি রজনীকান্ত সেনের ‘ মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়… ‘ গানখানা মুখস্থ করে একেবারে সড়গড় হয়ে আসার কথা বলা হয়েছিল তাকে। সমবেত কণ্ঠে বার কয়েক ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি দেওয়ার পরই নরেন জগদানন্দকে বলে গান ধরতে। সুরেলা গলায় গান ধরে জগাই। প্রথমে গলা মেলায় শৈল। তারপর সতু। অতঃপর একে একে সবাই। পায়ে পায়ে চলতে শুরু করে মিছিল।

চৌহাটি মোড়ের কাছে মিছিল আসতেই অবাক কাণ্ড। দেখা গেল,চাঙড়িপোতা থেকে এসে মিছিলে যোগ দিলেন বেশ কয়েকজন! ফুটবল খেলা শেষমেশ ভণ্ডুল হয়ে গিয়েছিল। বলা ভাল ইচ্ছে করেই ভণ্ডুল করে দেওয়া হয়েছিল। নরেনরা ধরেই নিয়েছিল যে,  নরহরি এবং তার বাবা গৌরহরি এই অজুহাতের সদ্ব্যবহার করবে। চাঙড়িপোতার মানুষজনের কানে মন্ত্র দেবে না আসার জন্য। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তাদের উদ্দেশ্যে সফল হয়নি।

আরও যেটা আশ্চর্য তা হল, যারা এসেছেন তাদের মধ্যে আছেন নরহরির মাও। তিনিও ছেলের ফাঁদে পা দেন নি!চাঙড়িপোতার মানুষজন আসার পরে গানের জোর আরও বাড়ল। আদি গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা নারকেল গাছগুলোও মেঘলা আকাশে মাথা রেখে, সুরের ছন্দে ছন্দে মাথা দোলাতে শুরু করল যেন।

 সাতকড়িদের কারও পায়ে আজ জুতো নেই। গোরাদের দেশ থেকে আমদানি করা জিনিস পায়ে দিয়ে মিছিলে হাঁটবে না ওরা। কচি কচি পাগুলো ক্ষতবিক্ষত। কিন্তু ছেলেগুলোর মাথায় আজ অন্য ভাব। সেই ভাবে মহানন্দে পথ হাঁটে তারা। গানে গানে মিছিল এগিয়ে চলে। জায়গামত যোগ দেয় রাজপুর ইশকুলের বেশ কয়েকজন ছাত্র।

সাতকড়িদের অবাক হওয়ার আরও বাকি ছিল। ভিড়ের মধ্যে কখন যেন, চুপি চুপি এসে মিশে গিয়েছিল নরহরি নস্কর। সাতকড়িরা কেউ তাকে খেয়াল করেনি। আসলে নরহরি আজ কেন যেন, কিছুতেই নিজেকে ঘরে বেঁধে রাখতে পারেনি। মিছিলে পা মিলিয়ে তবে শান্তি হয়েছে তার। খানিক বাদে তার দিকে চোখ পড়তেই প্রথমে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় সাতকড়ি, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে একগাল হাসে। এই প্রথম নরহরি আর সাতকড়ি একে অন্যের দিকে তাকিয়ে হাসল। 

রাজপুর অবধি আসার পর আরও এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল। কয়েকজন লাল পাগড়িধারি পুলিশ ঘোরাঘুরি করছে এদিক ওদিক। আসলে ছাত্ররা আজ যে এই মিছিলটা করবে, তা তো আর কারও জানতে বাকি নেই। ফলে যথারিতী খবর গেছে পুলিশের কানে। তবে যে দু’চারজন পুলিশ এসেছিল, তারা বোধহয় ভাবেনি যে, এত বড়ো একটা মিছিল হতে পারে। এত মানুষের কাছে এই দু’চারজন নেহাতই নগন্য। তাই পুলিশ কাছে না ঘেঁষে দূর থেকে নজর রাখাই ভালো মনে করল। 

তবে, তাদের দেখে ভয় পাওয়ার কোনও লক্ষণ নেই কারও। বরঞ্চ লাল পাগড়ি চোখে পড়তেই যেন আরও ঘন ঘন ধ্বনি উঠতে লাগল – বন্দে মাতরম। আজ এই পৃথিবীর কোনও শক্তি নেই যা নরেনদের আটকাতে পারে।   

রাজপথের ধারে সারি সারি মানুষ জমে গেছে এতক্ষণে। কেউ কেউ আবার লাফ দিয়ে ঢুকে পড়ছে মিছিলে। পায়ে পা মেলাচ্ছে। জগদানন্দ সেই যে গান ধরেছে এখনও থামেনি, বরং তার ভাঙা গলায় জোর এখন আগের থেকেও বেশি। এখন সে গাইছে দ্বিজেন বাবুর একখানা গান। এই গানখানা নিজের থেকেই কখন যেন চুপি চুপি রপ্ত করেছে সে।  ‘মা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি’

নরহরির মা হাঁটছিলেন বাচ্চা ছেলেগুলোর পাশে পাশে। শব্দগুলোতে চোখে জল এসে যায় তাঁর। আঁচল দিয়ে চোখ দুটো মুছে নিয়ে আবার পথ হাঁটেন। গান-স্লোগান-আর করতালির শব্দে যেন ফুলে ফুলে উঠতে থাকে, রাজপথের ধারে বয়ে চলা আদিগঙ্গার জল।

অবশেষে মিছিল এসে দাঁড়ায় কালীতলা গাঁয়ের চার রাস্তার মোড়ে। একটু বাদেই রথতলার দিক থেকে একজন ছুটতে ছুটতে এসে খবর দিল, আর বেশি দেরি নেই, উনি এলেন বলে।

আরও খানিক সময় অতিবাহিত হয়ে গেলে শেষ হয় অপেক্ষার প্রহর। পথের ধারে বিশাল এক বটগাছ, তার ঝুড়ির ফাঁক দিয়ে দেখা যায় মহাপুরুষের ‘পুষ্পরথ’একটি ফিটন গাড়ি, টেনে নিয়ে আসছে দু’খানা টগবগানো ঘোড়া।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সামনে এসে দাঁড়ায় ফিটন। প্রথমে হরিকুমার আর শৈল  বলে ওঠে-জয় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয়…সঙ্গে সঙ্গে সেই ধ্বনি বিদ্যুৎ চমকের মত ছড়িয়ে যায় মিছিলের এই মাথা থেকে মাথা। সমবেত কণ্ঠে আওয়াজ ওঠে-জয় সুরেন বাঁড়ুজ্জের জয়…।  নরেন্দ্রনাথ ধ্বনি দিতে দিতেই সাতকড়ি এবং জগদানন্দকে নিয়ে একবারে সামনে চলে আসে। 

সৌম্যকান্তি মানুষটির ক্ষুরধার এবং ছিপছিপে চেহারার মধ্যে অদ্ভুত এক আকর্ষণ আছে। মাঝখানে সিঁথি, মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, চোখে গোল ফ্রেমের চশমা। উঠে দাঁড়িয়ে এক হাত দিয়ে চশমাটি ঠিক করে নিলেন একবার, তারপর সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে করজোড়ে মাথা ঝোঁকালেন সুরেন বাঁড়ুজ্জে। তাঁর সারাটা মুখে ঝিলিক দিয়ে গেল এক স্বর্গীয় হাসি। সেই হাসিতে যেন সম্মোহিত জনতা। সম্মোহিত নরেন্দ্ররা। এই মুক্তি দূতের জন্যই তো এতদিন অপেক্ষা করেছে ওরা।

জনতার গুঞ্জনের মধ্যেই সতু এবং নরেন নিজেদের মধ্যে কী যেন এক যুক্তি করে।  নরেনের পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন লালমিঞা চাচা। তাঁকে বলতেই কাজ হয়। কালবিলম্ব না করে গাড়ির জোত থেকে ঘোড়া দু’খানা খুলে ফেললেন চাচা। সুরেন বাড়ুঁজ্জে তো ছেলেদের কর্মকাণ্ডে যারপরনাই অবাক।     

এরপর, গাড়ির জোত সামনের দিকে ধরে তা সহসা কাঁধে তুলে নিল চার মূর্তিমান। কাছাকাছিই ছিল নরহরি নস্কর। এই মহাযজ্ঞে সেও আজ পিছিয়ে থাকল না।  সে আর নিধু মণ্ডলও হাত লাগাল। এইবার একসঙ্গে সবাই মিলে টান দিল রশিতে। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে রব উঠেল-বন্দে মাতরম।

আজই প্রথম ছেলের জন্য গর্বে বুক ভরে উঠল নরহরির মায়ের। আর আজ তার একটা ছেলে নাকি! অনেকগুলো ছেলে! আরও একবার আঁচল দিয়ে চোখদুটো মুছে নিয়ে নিজেকে ভাসিয়ে দিলেন মহামিছিলে।  

সতেরো

মিছিলের পর দিন যা হওয়ার তাই হল। ইস্কুল থেকে বার করে দেওয়া হল, নরেন, সতু, শৈল এবং হরি সহ বেশ কয়েকজনকে। এটা যে ঘটতে যাচ্ছে তা ওদের জানাই ছিল। কিন্তু তাও ইস্কুলবাড়ির টান উপেক্ষা করা কি সহজ কথা! কতক্ষণ আর বনে বাঁডাড়ে ঘুরে কিম্বা শান বাঁধানো পুকুর ঘাটে বসে বসে সময় কাটে?

তবে, ওদের বয়স সতেরো আঠারো হলে হবে কি, এটা তারা এতদিনে বেশ বুঝে গেছে, এই দেশ থেকে ইংরেজদের তাড়াতে হলে আরও অনেক কষ্ট সহ্য করতে হবে। কাজেই কয়েকদিন খুব খারাপ লাগলেও ধীরে ধীরে নিজেদের জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ল তারা এবং আরও বেশি করে জড়িয়ে পড়তে চাইল স্বাধীনতার কাজে।

কিন্তু চাইলেই তো আর সবকিছু সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যায় না। এদের মধ্যে নরেন, সবার আগে এটা বুঝতে পারল যে, ইংরেজদের সঙ্গে লড়াইটা এখানে বসে বসে হবে না। কলকাতায় যেতে হবে। সে তার বাবার মুখে গল্প শুনেছে যতীন মুখুজ্জের। শুনে শুনেই সে যেন মানুষটার ভক্ত হয়ে গেছে।

যেমন ভাবনা সেইরকম কাজ। সে মাঝে মধ্যেই দেশের বাড়ি যাবার নাম করে বেরিয়ে পড়তে আরম্ভ করল বাড়ি থেকে। কিন্তু আড়বেলিয়া না গিয়ে, এসে উঠতে আরম্ভ করল মুরারীপুকুর রোডের এক বাড়িতে। এই বাড়ির খবরও সে পেয়েছিল তার বাবার কাছ থেকেই।

নরেনের বাবা দীনবন্ধু ভট্‌চাজ্জি কলকাতার ‘আগুনে’ ছেলেগুলোর খোঁজখবর বেশ ভালোই রাখতেন, আর তাঁদের গল্প করতেন ছেলের কাছে। কিন্তু তিনি স্বপ্নেও এটা ভাবেননি যে, তাঁর শ্রীমানটিও একদিন গিয়ে যোগ দেবে তাঁদের সঙ্গে।  

যাই হোক, যে বাড়িতে এসে ঘাঁটি গাড়তে আরম্ভ করল নরেন্দ্র, সেই বাড়িটি বারীণ ঘোষের পিতা শ্রীযুক্ত কৃষ্ণধন ঘোষ তৈরি করেছিলেন বেশ কিছুদিন আগে। এখন এই বাড়িটিকে দেখলে হঠাৎ করে মনে হবে পোড়োবাড়ি। কিন্তু, জঙ্গলাকীর্ণ এই বাড়িই আজকাল হয়ে উঠেছে কলকাতার বিপ্লবীদের প্রধান আখড়া।

আজও সকালবেলাই রেলগাড়িতে চেপে, এই গোপোন ঠিকানায়  হাজির হয়েছে নরেন্দ্রনাথ ওরফে নরেন। আজ একটি জরুরি সভা ডেকেছে বারীণদাদা। 

ভিতরে এখন সেই সভার কাজই চলছে। নরেন ছাড়াও উপস্থিত বারীণ, উল্লাসকর, হেমচন্দ্র, ভূপেন্দ্র এবং যতীন্দ্রনাথ। কথা হচ্ছে, বাংলার নানা স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন বিপ্লবী দলগুলিকে কীভাবে একই ছাতার তলায় আনা যায়, তা নিয়ে।

 নরেন খেয়াল করেছে, আজকাল প্রায়শই মতের অমিল হচ্ছে যতীনদাদা আর বারীণদাদার মধ্যে। বারীণদাদা এমনিতে মানুষ খারাপ নন কিন্তু তার মতের কেউ বিরোধিতা করলেই একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে যান। আজও তাই। তবে যতীনদাদাও ভয় পাওয়ার পাত্রটি নন। নিজের মত প্রকাশ করেই তবে ছাড়েন। এখনও কোনও ব্যতিক্রম নেই।

যতীন মুখুজ্জে সবগুলি গুপ্ত সংগঠনকে শুধু যে একসূত্রে গাঁথতে চাইছেন তাই নয়, তিনি চাইছেন নেতৃত্বকেও ছড়িয়ে দিতে। কারণ তিনি জানেন, দল বড়ো হলে একই জায়গায় বসে সবকিছুর খুঁটিনাটি দেখা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, মূল কেন্দ্র একটিই থাকবে কিন্তু স্থানীয় কাজের জন্য স্থানীয় একজনকেই সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। সেই ব্যক্তিই সেখানকার ব্যাপারে সবরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

কিন্তু বারীণ ঘোষ তাঁর সঙ্গে সহমত নন। তিনি যতীন্দ্রনাথের কথার বিরুদ্ধে গর্জন করে ওঠেন, “আসলে… সবাই নেতা হয়ে গেলে বড়ো মুশকিল। অতি সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট হবার ভয় থাকে। আমার মতে, বিভিন্ন জায়গায় কাজ শুরু হোক ক্ষতি নেই, কিন্তু সবরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থাক কেন্দ্রের হাতেই।”

সঙ্গে সঙ্গে যতীনদাদা বলে ওঠেন, “না। সেভাবে কাজের সুবিধে হবে না। আমাদের গ্রামে গঞ্জে এখনই ছড়িয়ে পড়তে হবে। ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় কর্ম পরিচালনার জন্য খুঁজে বার করতে হবে সেই এলাকার যোগ্যতম মানুষটিকে। তারপর সেই ব্যক্তির হাতেই তুলে দিতে হবে নির্দিষ্ট অঞলের কাজের দায়িত্ব। নইলে বৃটিশ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না..।”

দরজার পাশেই বিরাট এক কুঁজো। পাশে একটা পাথরের গ্লাস রাখা থাকে সবসময়। উত্তেজনার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। তড়িঘড়ি এক গ্লাস জল গড়িয়ে কয়েক ঢোকে শেষ করে উঠে দাঁড়ান বারীণ। ফিরে তাকান যতীন্দ্রনাথের দিকে। মুখ থমথমে, চোখে আগুন। কিছু একটা বলতে গিয়েও নিজেকে কোনোরকমে সংযত করেন। আহত সিংহের মত পায়চারী করতে থাকেন।  কিন্তু যতীনদাদার এইসবে কিছু যায় আসে না। তিনি নির্বিকার। নিজের যুক্তিতে অটল।

 নরেন্দ্রনাথ মনে মনে যতীনদাদাকেই সমর্থন করে। এই মানুষটার মধ্যে কেমন যেন একটা সম্মোহনী শক্তি আছে। যা চুম্বকের মত টানে। পেশিতে সিংহের বিক্রম কিন্তু তার অযথা কোনও প্রদর্শন নেই। নেতৃত্বের জন্য বিন্দুমাত্র আকাঙ্ক্ষা নেই কিন্তু দলের সর্বোচ্চ স্থানটি যেন তার জন্যই বরাদ্দ।

আরও দু’এক মুহূর্ত পায়চারি করার পর স্থির হয়ে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়েন বারীণ। ফিরে তাকান সবার দিকে। বলেন, “দলের বেশির ভাগ সদস্য যে ভাবে চাইবেন সে ভাবেই দল চলবে, সেক্ষেত্রে আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু আমি চাই, প্রস্তাবিত এবং প্রধান বোমার কারখানাটি তৈরি হোক এই বাড়িতেই এবং সেটির মূল দায়িত্বে থাকুক হেমচন্দ্র আর উল্লাসকর। ”

এইখানে যারা উপস্থিত তারা একটি বিষয়ে সহমত যে, সশ্রস্ত বিপ্লব ছাড়া দেশমাতৃকার মুক্তি নেই। সেই জন্য বোমা বন্দুক এইসবের প্রয়োজন। আর অস্ত্রসস্ত্র যোগাড় করতে হবে নিজেদেরই।

সব থেকে আগে দরকার একটা বোমা তৈরির কারখানার। আর সেটা কলকাতাতে হওয়াই সবথেকে ভালো। তাহলে চারদিকে বোমা পৌঁছে দেওয়ার কাজটা অনেক সহজ হবে। কাজেই, বারীণের শেষ ইচ্ছায় কেউ বাঁধা দেয় না।

আরও কিছুক্ষণ আলোচনার পর আজকের মত সভা শেষ হয়।

আঠারো

হালকা শীত কলকাতার শেষ বিকেলের বাতাসে। সন্ধ্যা নামতে আর খুব বেশি দেরি নেই। ফটকের ধারে এক প্রাচীন কাঁঠাল গাছ। যার পাতার রং ঘন সবুজ থেকে কালচে হয়ে উঠছে, দিনের আলো নিভে আসার সঙ্গে সঙ্গে।

যতীন্দ্রনাথ সবার থেকে বিদায় নিয়ে উঠে পড়েন। ফটক খুলে বেরিয়ে আসেন দ্রুত পায়ে। কাঁধে ফেলা আলোয়ানটা ঠিক করে নিতে নিতে এগিয়ে যান। মুরারীপুকুর থেকে এখন হাঁটাপথে সোজা যাবেন মানিকতলার ভাড়া বাড়িতে।

 দু’এক পা এগোতে না এগোতে পিছন থেকে নরেনের গলা শুনতে পান। “এখন কোথায় যাবেন যতীনদা?” যতীন একগাল হেসে বলেন, “আপাতত মানিকতলার বাসায় ফিরব। কাল রাতে আপিস থেকে সোজা চলে গিয়েছিলাম এক জায়গায়। সেইখানে সংগঠনের কিছু কাজ ছিল। সারতে না সারতে আজ একদম ভোর ভোর রওয়ানা হতে হয়েছে মিটিংয়ের জন্য। সারাদিন খুব ধকল গিয়েছে। বাসায় ফিরে আজ রাতটুকু একটু বিশ্রাম নিতে চাই।”

নরেন জানে যতীনদাদা একটি আপিসে সাঁটলিপির কাজ করেন। দশঘণ্টার ডিউটি। সত্যি পরিশ্রম করতে পারেন বটে মানুষটি। নরেন পাশে হাঁটতে হাঁটতেই শুধোয়, “সেখানে আবার কীসের সংগঠন?” নরেনের দিকে ভালো করে একবার দেখে নিয়ে বলেন, “কীসের আবার… মহাবিপ্লবের হা হা হা…! সেখানে ইতিমধ্যেই চারটে ব্যায়ামাগার এবং তিনখানা কুস্তির আখড়া তৈরি করা গেছে। আগে ছেলেপুলেদের টেনে আনতে হবে, তারপর তাদের কানে দিতে হবে বীজমন্ত্র, দেশভক্তির।”

দাদার কথায় এটা স্পষ্ট যে, ভিতরে ভিতরে তিনি নিজের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। এই মানুষটার সঙ্গে কথা বলতে গেলেই কেমন যেন ঘোর লাগে নরেনের। যতীনদাদার পরের কথায় তার ঘোর কাটে, “তা তুমি এখন চললে কোথায় নরেন? শিয়ালদহ থেকে চাঙড়িপোতার গাড়ি ধরবে বুঝি?”

 নরেন মৃদু হেসে বলে, “সে ধরব বটে। কিন্তু এখনই নয়। এখন আপনার সঙ্গে কথা বলার লোভেই পিছন পিছন চলে এলুম আর কী…”

যতীন্দ্রনাথ খুব কিছু অবাক হন না। তিনি নরেন, ভূপেন এদের মনের ভাষা পড়ে ফেলেছেন বেশ কিছুদিন হল। তবু তিনি কাউকে আলাদা করে দলে টানার পক্ষপাতী নন। মৃদু হাসি ফিরিয়ে দিতে দিতে বলেন, “সে তো বুঝলুম ভায়া কিন্তু শুধু যে কথায় কাজ হবে না। সত্যিকারের যুদ্ধের জন্য দলকে মজবুত করতে হবে। গাঁয়ে-গঞ্জে সশ্রস্ত আন্দোলনের বীজ বুনে দিতে হবে। চারদিক থেকে ঘিরে ধরে দমবন্ধ করে পিষে মারতে হবে ইংরেজদের।” একটু থেমে নরেনকে শুধোন, “আচ্ছা তুমি কি একটা কাজ করতে পারবে?”

শশব্যস্ত হয়ে নরেন বলে ওঠে, “আদেশ করুন যতীনদা।” যতীনদাদা উজ্জ্বল এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন তাঁর নরেনের দিকে। দু-এক মুহূর্ত সময় নিয়ে বলেন, “ভাবছি চাঙড়িপোতায় একটা ইউনিট হবে। সেই ইউনিট কাজ করবে একেবারে দক্ষিণে জয়নগর অবধি। তুমি সেই কেন্দ্রটির দায়িত্ব নিতে পারবে?”

নরেনের স্বয়ং স্বপ্নের মানুষটি তাকে প্রস্তাব দিচ্ছেন অধিনায়কত্বের। অভিভূত নরেন। আনন্দে সে বাক্যহারা হয়ে যায়। এইদিকে তার নীরবতায় বোধহয় খানিক ক্ষুব্ধ হন যতীন। বলেন, “স্বামীজি বলেছেন, আত্মবিশ্বাসটাই হল আসল। তোমার যদি নিজের উপর বিশ্বাস না থাকে, তবে থাক। আমি ভেবেছিলাম তোমার সঙ্গে সাতকড়ির মত ছেলেরা আছে। তুমি ওদের সঙ্গে নিয়ে ভালই কাজ চালাতে পারবে।”

সাতকড়ি বাঁড়ুজ্জেকে বেশ ভালোরকম চেনেন যতীন্দ্রনাথ। সতু ইতিমধ্যেই একদিন নরেনের সঙ্গে এসেছিল কলকাতায়, যতীনদাদার সঙ্গে দেখা করার জন্য।

এইদিকে, স্বামীজির কথায় দুই চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে নরেনের। সে বলে ওঠে, “আপনি নিজের চোখে স্বামীজিকে কোনোদিন দেখেছেন যতীনদা?”

দেখেছি বৈকি। হোগোলকুঁড়িয়ার, অম্বিকাচরণ গুহর কুস্তির আখড়ার নাম শোনা হয়নি বুঝি? ”

কলকাতায় এলে কি আর আখড়ার কথা কানে না এসে থাকে!”

কাঁধের আলোয়ানটা ঠিক করতে করতেই যতীন মুখুজ্জে বলেন, “ঐখানে কুস্তি লড়তে যেতুম বুঝলে। সেই মানুষটিও আসতেন। তাঁকে অবশ্য আমি কুস্তি লড়তে কখনও দেখিনি। তাঁর শরীরটাও সেই সময় খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। তবে অম্বিকাবাবুর ছেলে রামচরণ গুহর মুখে শুনেছি, একসময় তিনি নাকি বেশ ভালোই কুস্তি লড়তেন…”

এতখানি বলে মুখুজ্জে একটু থেমেছিলেন।  কিন্তু স্বামীজির কথায় খুব উৎসাহ নরেনের, “তারপর…তারপর?” 

তা একদিন আমার লড়াইয়ের ঠিক আগে আখড়ায় এসে হাজির হলেন তিনি …”

আচ্ছা…!”

আমিও তো তাঁকে সেই সময়ে পেয়ে একেবারে আহ্লাদে আটখানা। ঢিপিস করে একখানা পেন্নাম ঠুকে বসলুম। আমার মাথায় হাত রেখে ভাসা ভাসা বিরাট দুই চোখ মেলে তাকালেন আমার দিকে। বললেন, আসল শক্তি নাকি আমাদের ভিতরেই আছে। সেই শক্তিটাকে, খুঁড়ে খুঁড়ে বার করে আনতে হবে। আর সেটা যদি করা যায় তাহলে জয় হবেই।”

আবার একটু থামেন যতীন। তারপর খুব ধীরে ধীরে বলেন, “সেদিনের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ আমার সামনে দাঁড়াতেই পারেনি বুঝলে ভায়া…হা হা হা…অথচ সে ছিল আমার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। আর শুধু তাই নয়, সেদিন থেকে আমি নিজেকে খুঁড়ে ভিতরের শক্তিটাকে বার করতে শিখলুম, বুকের খাঁচা থেকে ভয়ডর একেবারে বেপাত্তা হয়ে গেল। মানুষটার কথা শুনেই আমার মনে হয়েছিল, অমন মানুষ বিশ্ব জয় করবেন না তো আর কে করবেন…! ”

এতটা বলে কেন যেন একটু থামেন মুখুজ্জে। ভালো করে একবার তাকান নরেনের দিকে। তারপর বলেন, “তুমি নরেন্দ্রনাথ, তিনিও ছিলেন নরেন্দ্রনাথ। তিনি ছিলেন দত্ত আর তুমি হলে ভট্টাচার্যি। তা… তিনি যদি পৃথিবী জয় করতে পারেন, তাহলে তুমি পারবে না দেশের জন্য নিজেকে সঁপে দিতে?”

কেন পারব না যতীনদাদা…।”  আরও কিছু বলত নরেন কিন্তু তার গলাটা কেন যেন বুজে আসে। সেও ঢিপিস করে একটা প্রণাম করে বসে তার যতীনদাকে। মাথায় একটা হাত রাখেন যতীন।

একটা অদৃশ্য বৃত্ত যেন সম্পূর্ণ হয়। এক নরেন্দ্রনাথের হাত, যেন যতীন্দ্রনাথের মাধ্যমে পৌঁছে যায় অন্য এক নরেন্দ্রনাথের মাথায়। স্বামীজির ভাসা ভাসা বিরাট সেই চোখ, যতীনের মাধ্যমে ছড়িয়ে যায় অন্য দুই চোখে…যেন এতদিনে এই নরেনের দৃষ্টিদান হল।

 নরেন অতিদ্রুত বলে ওঠে, “আমি পারব। নিশ্চয়ই পারব যতীনদা।”

এইবার আবার স্মিত হাসিতে ফিরে যান যতীন, “সে আমি জানতাম তুমি পারবে। কিন্তু…”

কিন্তু!”

কিন্তু, সংগঠন চালানোর জন্য চাই টাকা। আর…”

আর!”

আর… যতই আমরা লাঠিখেলা কিম্বা ছুরি খেলা শিখি না কেন, শুধু দিয়ে হবে না। বন্দুকের সঙ্গে লড়াই করার জন্য চাই বন্দুক। সেই জন্যও চাই টাকা।  কিন্তু… সেটি আসবে কোথা থেকে?”

বেশ খানিকক্ষণ ধরে পাশাপাশি হাঁটছে তারা। অন্ধকার বেশ ঘন হয়ে চেপে বসেছে কলকাতার বুকে। পথের ধারে গ্যাসবাতিগুলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে ইতি উতি।  মাঘী শেষের কুয়াশা মেখে যা খানিক নিষ্প্রভ।

রাজপথে ঘর ফেরতা মানুষের কলতান। কিন্তু শেষ বাক্যের পর গুরু এবং শিষ্য দুজনেই নীরব। কারণ যে সমস্যার কথা বলা হয়েছে তা খুবই গুরুতর। সত্যিই তো টাকা আসবে কোত্থেকে!              

উনিশ

ওরা ইশকুল ছাড়ার পর কেটে গেছে বেশ কিছুদিন। এক বর্ষা গিয়ে আরও এক বর্ষা এসেছিল, দেখতে দেখতে সেই বর্ষা গিয়ে এখন ফাল্গুন। এই বছর শীতের দাপট যেন অন্যবারের থেকে একটু বেশি। যাই যাই করেও পিছু ছাড়ছে না।

ধান কাটা হয়ে গেছে ঢের আগে। তবে ক্ষেতে এখনও নতুন চাষ পড়েনি। গোধূলি বেলায় চারদিকে লাল আবির ছড়িয়ে দিয়ে পশ্চিমাকাশে পাটে বসেছেন সূযযিদেব। ক্ষেতের আলে, যেখানটায় বসে আছে ওরা, তার একদিকে চোখ রাখলে দেখা যাচ্ছে রেললাইন, আর অন্যদিকে ঘরে ফেরা গরুর পাল।

 ইশকুলের জন্য প্রথম প্রথম মনটা খুব খারাপ লাগত বটে। কিন্তু সব ফাঁকা জায়গাই একদিন ভরাট হয়ে যায়। এখন আর তাদের একটুও মন খারাপ লাগে না বরং মনে হয়, যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। পড়াশুনা শিখে যদি বিদেশী শাসকের গোলাম হয়েই থাকতে হয়, তবে শিক্ষে দিয়ে হবেটা কী! সুরেন বাঁড়ুজ্জে সেদিন রাজপুরে বক্তৃতা দিতে এসে যে আগুনটা ধরিয়েছিলেন বুকের মধ্যে সেটাকেই যতীন মুখুজ্জে হাওয়া দিয়ে দাবানলে পরিণত করেছেন। বাঁড়ুজ্জে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখিয়েছিলেন আর মুখুজ্জে মন্ত্র দিয়েছেন শত্রুকে শেষ করে দেওয়ার। মারের বদলে পাল্টা মার দেওয়ার। শত্রুকে নিকেশ করে মুক্ত করতে হবে দেশ মাতৃকাকে।

আজ একটা বিশেষ সভার জন্য এই ধানমাঠে জড়ো হয়েছে নরেনরা। চারবন্ধুর সঙ্গে ইদানীং যোগ হয়েছে আরও একজন। রঘুনাথ। রঘুনাথ তাদের থেকে বয়েসে বেশ খানিক বড়ো। রেলের কর্মচারী। চাঙড়িপোতা ইস্টিশানে গেটম্যানের কাজ তার। যেদিন খেলা হয়েছিল চাঙড়িপোতা আর মাহিনগরের মধ্যে সেদিন সেও গিয়েছিল মাঠে। চাঙড়িপোতার সমর্থক হয়েও সে গোলমালের সময় পক্ষ নিয়েছিল মাহিনগর ব্যবসায়ী সমিতির। অন্যায় বরদাস্ত করতে পারেনি। সেই থেকেই বন্ধুত্বের শুরু।

যতীনদাদার প্রস্তাবমত চাঙড়িপোতা আর তার আশপাশে, দলবল পাকিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে নরেনরা। যুগান্তরের শাখা সংগঠন হিসাবে যদিও বারীণ ঘোষ এখনও তাদের স্বীকার করেন না। কিন্তু তাতে কী যায় আসে! ওরা ঠিক করে নিয়েছে যতীনদাদার দেখানো পথেই চলবে।

সবার আগে সংগঠনটাকে মজবুত করার কাজ চলছে। শুধু চাঙড়িপোতাই নয়, নরেন্দ্রর নেতৃত্বে, উত্তরে সোনারপুর থেকে দক্ষিণে বারুইপুর পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের মন্ত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে সাতকড়িরা। চাঙড়িপোতায় খোলা হয়েছে ব্যায়ামাগার আর কুস্তির আখড়া। সেখানে ছুরি আর লাঠিখেলা শেখানোর ব্যবস্থাও হয়েছে। এতে এলাকার অনেক ছেলেই যোগ দিচ্ছে একে একে।

সে না হয় হল, কিন্তু মূল সমস্যাটি হচ্ছে অন্য জায়গায়। যতীনদাদা বলেছিলেন বিপ্লবের জন্য টাকা চাই, টাকা। কথাটা যে কতটা খাঁটি তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে। শুধুমাত্র একটা কুস্তির আখড়া তৈরি করতে গিয়েই কপর্দক শূন্য হতে হয়েছে তাদের।

ধানক্ষেতে চাষ পড়েনি এখনও। কাটা গাছের গোড়াগুলো মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এদিক ওদিক। নরেন একটা বিচুলির গোড়া ছিঁড়ে নিয়ে দাঁতে কাটতে কাটতে বলে,  “আমার মাথায় একটা পরিকল্পনা এসেছে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা সফল হওয়ার জন্য আমাদের রঘুনাথদার সাহায্য দরকার।”

রঘুনাথ হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে। বাকিরাও বুঝে উঠতে পারে না তাদের দলনেতা ঠিক কী বলতে চাইছে। শেষ বিকেলের সিঁদুরে রং এর মধ্যে খড়ের আঁটি বোঝাই একটা গরুর গাড়ি দেখা যাচ্ছে, রেল লাইনের সীমানায়। সেই দিকে একবার দৃষ্টি দিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নেয় নরেন। তাকায় রঘুনাথের দিকে। বলে, “রেলের টাকা লুঠ করতে হবে।”

মানে!”

টাকা লাগবে টাকা। সেইজন্য দরকার হলে রেলের সিন্দুক ভাঙতে হবে।”

তোমার কি মাথা খারাপ হল নরেনদাদা! সে কি সহজ কথা নাকি!

এইবার দিনু ভট্‌চাজ্জির ছেলের মুখে এক স্বর্গীয় হাসি ফুটে ওঠে। যে হাসিতে উপচে পড়ে আত্মবিশ্বাস। বয়স নরেনের সবে কুড়ি ছুঁয়েছে কি ছোঁয়নি, কিন্তু এই বয়েসেই সে নেতা হওয়ার সবরকম গুন অর্জন করে ফেলেছে। খুব ধীরে ধীরে বলে, “যতীনদা মনে করেন, বিপ্লব সবার জন্য নয়। আর যারা সহজ কাজ খোঁজেন, তাঁদের জন্য তো একেবারেই নয়। ”   

রঘুনাথ বলে ওঠে, “কিন্তু রেলের টাকা থাকে সিন্দুকে। সেই সিন্দুকের চাবি কোথায় থাকে, তা একমাত্র স্টেশনমাস্টার আর টিকিটবাবু ছাড়া কেউ জানেন না!  গন্ধমাদন পর্বতের মত সিন্দুক ভাঙা অসম্ভব। একমাত্র চাবি পেলেই তবে ঐটে খুলে মালকড়ি হাতানো যায়। ”

নরেন সহসা বলে ওঠে, “চাবির খবরটাই তো তোমায় জানতে হবে রঘুনাথদা।”

রঘুনাথ বয়সে বড়ো হলেও এদের সবাইকে ‘দাদা’ বলেই সম্বোধন করে। কথা শুনে তার চোখ কপালে ওঠে, “সে অতি গোপন ব্যাপার গো নরেনদাদা। স্টেশনমাস্টারের থেকে চাবির খোঁজ বার করা কিছুতেই সম্ভব নয়।”

হরি আর শৈল অনেকক্ষণ চুপ করেছিল। এইবার দুজনে প্রায় একসঙ্গে বলে ওঠে, “রঘুনাথদা, তুমি শুধু চোখ কান খুলে রাখবে। ব্যাস তাহলেই জেনে যাবে চাবির হাল হকিকত। হয়ত একটু সময় লাগবে…।”

গোধূলির লালিমা ঢেকে দিয়ে পূবের আকাশে কেউ যেন একটু একটু করে লেপে দিচ্ছে আসন্ন অন্ধকার। শিরশিরে হাওয়াটা এখন গায়ে লাগছে বেশ। র‍্যাপারটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় সাতকড়ি ওরফে সতু। তাকে ধানমাঠ উজিয়ে অনেকটা পথ ফিরতে হবে এখন। চাঙড়িপোতা থেকে সেই মাহিনগর, দূর তো নেহাত কম নয়। পরনের ধুতিখানা ঝাড়তে ঝাড়তে বলে, “সে না হয় বুঝলুম যে রঘুনাথদাদা চাবির খোঁজ পেল। কিন্তু চাবি চুরি গেলে তো রেলের লোকজন আগে থেকেই কিছু একটা আঁচ করে সাবধান হয়ে যাবে। তখন…? ”

নরেনের যেন ইতিমধ্যেই পুরো পরিকল্পনাটি ছকা হয়ে গেছে।   

চাবি রঘুনাথদাকে সরাতে হবে না। শুধু কোথায় এবং কীভাবে থাকে সেটুকু খবর যোগাড় করলেই হবে। অত গুরুত্বপূর্ণ চাবি যখন, তখন স্টেশনমাস্টার নিশ্চয়ই সব সময় নিজের পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াবেন না। কারণ তাহলে হারাবার ভয় থাকে।” 

রঘুনাথ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তাকে চুপ করিয়ে দেয় শৈলেশ্বর, “ঠিক আছে রঘুনাথদা, নরেন যখন বলছে তখন একবার চেষ্টা করেই দেখ না…।”

 রঘুনাথ মাথা চুলকোয় আর ভাবে, ছোটোবাবুরা তো বলেই খালাস কিন্তু সে যে কোন উপায়ে চাবির খবর যোগাড় করবে তা স্বয়ং ঈশ্বরই জানেন!                         

কুড়ি

দিনের পর দিন কেটে যায় কিন্তু যে কাজের ভার রঘুনাথের উপর দেওয়া হয়েছিল তার কোনও সুরাহা হয় না। গেটম্যান রঘুনাথের কাজ রেলগেটে। নিজের কাজ ফেলে যখন তখন তার পক্ষে বুকিং আপিসে অথবা স্টেশন মাস্টারের ঘরে এসে ওঠা সম্ভব নয়। এইকথা ঠিক যে, বুকিং ক্লার্ক রাজেন্দ্রনাথ হালদারের সঙ্গে তার বেশ ভালো সম্পর্ক, কিন্তু রঘুনাথ কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না, তাতে এই বিষয়ে কী সুরাহা হতে পারে!

সময় বয়ে যায় আপন খেয়ালে। দেখতে দেখতে পুজো এসে যায়। কোদালিয়ার গোল দিঘির পাড়ে বোসেদের পৈত্রিক ভিটে। তাদের ঠাকুর দালানের সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা আছে। ফি বছর মায়ের আরাধনা হয়। বোসেরা ছাড়াও গাঁয়ের আরও দুটি অবস্থাপন্ন পরিবার এই পুজোর পৃষ্ঠপোষক।

কাজের সূত্রে জানকীনাথ বোস থাকেন সেই কটকে। তবে পুজোর সময় ঠিক চলে আসেন দেশের বাড়ি। পরিবার পরিজন নিয়ে। এইবারও তার কোনও অন্যথা হয়নি।

 সন্ধ্যার সময় হরিকুমার এবং তার তিন সঙ্গী, হাজির হয়েছিল ঠাকুর দালানে। তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মায়ের সন্ধ্যারতি দেখছিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সেখানে এসে উপস্থিত হয় তাদের নতুন সাগরেদ, রঘুনাথ। আগে থেকেই ঠিক করা হয়েছিল যে আজ, মানে অষ্টমী পুজোর দিন সন্ধ্যাবেলা, সবাই মিলে কোদালে-দিঘির মণ্ডপে যাওয়া হবে। সেই কথা মাথায় রেখে আজ সকালে ডিউটি নিয়েছিল রঘু, যাতে এই বেলাটা ঝাড়া হাত পা থাকা যায়। 

উপরে একটা সামিয়ানা টানিয়ে নীচে ফরাস পাতা হয়েছে লোকজন বসার জন্য। ইতিমধ্যেই গাঁয়ের বেশ কয়েকজন এসে হাজির হয়েছেন। দু’চোখ ভরে দেখছেন মায়ের আরাধনা। ফরাসের একধারে বসেছিলেন জানকীনাথ। সঙ্গে শিশুপুত্র সুভাষ। তারও দৃষ্টি আটকে আছে মায়ের টানা টানা দুই চোখের দিকে। 

 হরিকুমারের বাড়ি এই কোদালে গাঁয়েই। কাজেই তার সঙ্গে বেশ ভালোরকম চেনাজানা আছে জানকীনাথের। তিনি ওদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বসতে বলেন।

সুরেন বাঁড়ুজ্জের সভায় যাওয়ার জন্য বিদ্যালয় থেকে নরেনদের ‘রাস্টিকেট’ হওয়ার খবর, ভালোরকম ছড়িয়েছে আশপাশের গাঁয়ে। সংবাদ পৌঁছেছিল জানকী-ভ্রাতা কেদারনাথের কানেও। তিনি এই বিষয়ে দু’কলম লিখে জানিয়েছিলেন দাদাকেও। জানকীনাথ নিজে হরিনাভি বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। কাজেই, দু’এক কথায় তাঁর কৌতূহল বেড়েছে বৈ কমেনি।

গেলবার, পৈত্রিক বাটিতে পা রাখতে না রাখতে বিস্তারিত খবর নিয়েছিলেন ঘটনা সম্পর্কে। কিন্তু উনি তো মাত্র পুজোর কটা দিনই আজকাল থাকার সুযোগ পান কোদালিয়ার পৈত্রিক ভিটেয়। গেলবারের পুজোয় মানুষটির আর দেখা করার ফুরসত পাননি দামাল ছেলেগুলোর সঙ্গে।

 এখন যেন হরিদের পেয়ে হাতে চাঁদ পান। হরির দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে শুধোন, “ইশকুল তো আর যাওয়া হয় না, পড়াশুনোও বন্ধ। তা কী করা হচ্ছে এখন…? ”

যখন দিঘির পাড় ধরে হেঁটে মণ্ডপের দিকে আসছিল ওরা, তখনও সাঁঝের আঁধার পুরোপুরি নামেনি। মাহিনগরের দিক থেকে দিঘির পানে আসতে গেলে, পথের ধারে আছে এক প্রাচীন বটগাছ। নাম চিন্তামণির বট। সেই চিন্তামণির ডালে তখনও ডাকছিল বেনে বউ আর মাছরাঙা পাখি। পাখির ডাক আর ঢাকের বাদ্যি একসঙ্গে মিশে যাচ্ছিল দিঘির কালো জলে। দিন শেষের আলো, বটের ঝুড়ির ফাঁক দিয়ে এসে পড়েছিল চারজনের মুখে। সেই আলো শরীরে মেখে সতু বলেছিল, “দেখিস আমাদের চারজনকে একসঙ্গে দেখলে, মিছিলে যাওয়ার কথা উঠবেই উঠবে। তারপরই দেখবি, শুধোনো হবে-তা এখন কী করা হচ্ছে বাপধনেরা?”

সতুর ভঙ্গিমায় হাসি পেয়ে গিয়েছিল বাকিদের। এখন, সত্যি সত্যি সেই কথা উঠে পড়ায় একে অন্যের মুখ চাওয়াচায়ী করে। তবে জানকীকাকার পরের কথায় তাদের বুকের পাথর এক ঝটকায় নেমে যায়, “অবশ্য…তোমাদের জায়গায় আমি থাকলে, এক কাজই করতাম। মানে করার চেষ্টা করতাম আর কি……তবে পেরে উঠতাম কিনা জানি না…।”

এতটা বলে হঠাৎ করে কেন যেন গম্ভীর হয়ে যান মানুষটি। খানিক সময় নিয়ে বলেন,   “চাইলেই কি আর সবাই দেশের জন্য সব কিছু বিসর্জন দিতে পারে? পারে না।”

আরতি শুরু হয়েছে আগেই। এখন পুরুত ঠাকুরের এক হাতে ঘণ্টা আর অন্য হাতে পঞ্চপ্রদীপ। মণ্ডপের থেকে খানিক তফাৎ মশাল জ্বলছে খান চারেক। আলো আঁধারিতে ভরে আছে চারপাশ। খানিক থেমে জানকীকাকা বলেন, “হরি তোমাদের মিছিলের দিন নাকি লালপাগড়ি পুলিশও হানা দিয়েছিল!”

না কাকা। পুলিশ হানা দিয়েছিল বললে ঠিক বলা হবে না। হ্যাঁ, পুলিশ এসেছিল ঠিকই কিন্তু অত লোকজন দেখে মিছিলে হানা দেওয়ার আর সাহস পায় নি… হা হা হা…।”

মনে মনে ছেলেগুলোর সাহসের তারিফ না করে পারেন না জানকীনাথ। আবছায়ার ভিতর থাকেই ভেসে আসে তাঁর পরের শব্দগুলো, “তোমরা যা করেছ বেশ করেছ। ভারতমাতাই তো আমাদের আসল মা। আমাদের জগজ্জননী দুগগা। তাঁকে মুক্ত করার কাজটাই হল আমাদের আসল কাজ। ‘বন্দে মাতরম’ হলই আমাদের সেই পুজোর সঠিক মন্ত্র।”

ঢাকি দুজন অনেকক্ষণ ধরে বাজিয়ে বোধহয় খানিক ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। চুপ করে বসেছিলেন। উঠে আবার বাজাতে শুরু করেন। ঢাকে কাঠি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর শব্দ ওঠে। মণ্ডপ জুড়ে ধুনোর গন্ধ আর গাছপ্রদীপের কাঁপা কাঁপা শিখায় দেবী মায়ের পটলচেরা দুই চোখ যেন আরও বড়ো হয়ে যায়। এত বড়ো যে, হরিকুমারের হঠাৎ করে মনে হয় তাদের মাথার উপর দিয়ে সেই চোখ ছড়িয়ে যাচ্ছে বহুদূর। তারা যেন আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে সেই চোখের ভিতর। কোদালে-দিঘির গহিন জলে সাঁতার কাটতে কাটতে অনেক সময় যেরকমটা মনে হয়।

জানকীকাকার কথাগুলো নরেনের বুকের খাঁচাটা আরও চওড়া করে দিয়েছিল এক মুহূর্তে। সে বুক ভরে শ্বাস টানে। ধুপধুনোর গন্ধ নিয়ে বাতাস, আর ঢাকের দ্রিদিম দ্রিম শব্দ ঢুকে পড়ে বুকের ভিতর। 

 খুদে সুভাষের কানেও গিয়েছিল বাবার কথাগুলো। সে ফিরে ফিরে দেখছিল একবার বাবার দিকে আর একবার তার হরিদাদার দিকে। সে জানে পুজোর ছুটি শেষ হলেই তার ইশকুল খুলে যাবে। চলে যেতে হবে বাবার সঙ্গে। কিন্তু কেন যেন তার খুব ইচ্ছে করে এইখানে থেকে যেতে। আর শুধু তাই নয়, এই দাদাগুলোর দলে ভিড়ে যেতে। তাহলে তাকেও আর ইশকুলে যাবার ঝামেলা পোয়াতে হবে না রোজ রোজ। 

একুশ

হাতে করে খানিক ঝুরো মাটি নিয়ে হাওয়ায় ভাসিয়ে দেয় নরেন। পরখ করার চেষ্টা করে কতখানি মিহি হয়েছে মাটি। আখড়ার মাটি তৈরি করা খুব সহজ কথা নয়। চাল থেকে কাঁকর বাছার মত একটা একটা করে বাছতে হয় নুড়ি পাথর। জমি একেবারে ধুলো করে ফেলতে না পারলে ঠিকভাবে আছাড়-পিছাড় করা যায় না।

 ইস্টিশন যাবার পথের ধারে দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের আদি বাড়ি। ছাড়িয়ে আরও খানিকদূর এগিয়ে গেলে, ডানদিকে, যেখানে আগে ছিল আকন্দ আর ধুতরা ফুলের ঝোপ, এখন তা পরিষ্কার করে গড়ে উঠেছে কুস্তির আখড়া। পরিষ্কার একফালি জমির ঠিক মাঝখানটিতে তৈরি হয়েছে লড়াইয়ের জায়গা, যার উপরে দেওয়া হয়েছে হোগলা পাতার ছাউনি।

হরিনাভি গাঁয়ের বেলতলায় শ্রীযুক্ত রাজেন বসু, অনুশীলন সমিতির যে আখড়া বানিয়েছেন তার বয়স দেখতে দেখতে হয়ে গেল দু’বছর। প্রথম থেকেই, চারমূর্তির বেশ ভালোরকম যাতায়াত ছিল সেখানে। পালোয়ানদের কাছে তালিমও নিয়েছে তারা। কাজেই, কুস্তির প্যাঁচ-পয়জার কিঞ্চিৎ জানা আছে বৈকি চারজনের।  

আরও একমুঠো মাটি নিয়ে ধীরে ধীরে বাতাসে ভাসিয়ে দেয় নরেন। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। সাষ্টাঙ্গে শুয়ে মাটিতে মাথা ঠেকায়। অন্যদিকে, সাতকড়ি নিজের মত করে নানা কসরত করতে থাকে ঘুরে ঘুরে।

অন্য দুই মূর্তিমান, অর্থাৎ হরি আর শৈলেশ্বর গিয়েছিল জানকীকাকার বাড়ি। আগামীকাল কোজাগরী। নিজেদের মধ্যেই একটা কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। ওদের খুব ইচ্ছে জানকী কাকাকে কুস্তির সেই জমজমাট আসরে প্রধান অতিথি করার। সেই বিষয়ে কথা বলতেই গিয়েছিল হরিরা। এখন হইহই করতে করতে হাজির হয় দু’জনায়। কিন্তু নরেনকে অবস্থায় দেখে চুপ করে দাঁড়িয়ে যায়। উঠে না দাঁড়ানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকে।

 নরেন উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে হরিকে শুধোয়, “হ্যাঁ রে  কাকা কী বললেন?” হরি একগাল হেসে বিজ্ঞের মত বলে, “এমন ভাবে ধরে পড়লুম যে আর না করতে পারলেন না বুঝলি। পরশু রাতে কটকের গাড়ি ধরবেন, তাও কাল আসবেন। কেদারবাবু আর সুভাষকেও নিয়ে আসতে বলেছি সঙ্গে করে।”

হরির কথা শুনে খুব খুশি হয় নরেন আর সতু।

যাই হোক, প্রতিযোগিতার প্রস্তুতির জন্য এখন মেলা কাজ তাদের। তবে সবার আগে, কালকের বিষয় নিয়ে খানিক আলোচনা সেরে নেওয়ার দরকার। চারজন মিলে একজায়গায় গোল হয়ে বসে পড়ে তড়িঘড়ি।

নিজেদের মধ্যে যখন কথায় একেবারে মগ্ন ওরা তখনই আচমকা একটা শব্দে তাল কেটে যায়। মাথা তুলে তাকাতেই দেখা যায় ঝোপঝাড় ভেঙে ঋজু ভঙ্গিমায় এগিয়ে আসছেন সুঠাম মানুষটি।  আনন্দে লাফ দিয়ে ওঠে সবাই। সতু খুশিতে ডগমগ হয়ে চিৎকার করে ওঠে, “যতীনদা আপনি! ”

কেন আসতে নেই বুঝি? সশরীরে আসব আসব করেও আসা হয়নি অ্যাদ্দিন। আজ তাই একপ্রকার জোর করেই বিকেলের গাড়িটায় চেপে পড়লুম।” এইবার গলাটা একটু খাদে নামিয়ে চারদিক ভালো করে দেখে নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, “তা…দিনক্ষণ কিছু কি ঠিক হল?”

আজকাল যতীন মুখুজ্জে বেশির ভাগ সময় দার্জিলিংয়েই থাকেন।   সেখানেই দলের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন তিনি। তবে কলকাতায় এলে সঙ্গীদের সঙ্গে অবশ্যই দেখাসাক্ষাৎ করেন এবং কাজ কর্মের খবর নেন। দরকারে তাদের বুদ্ধি পরামর্শও দেন।

রেলের সিন্দুক লুঠ করার বিষয়টা বেরিয়েছিল নরেনের মাথা থেকেই। কিন্তু সে এইরকম একটি পরিকল্পনার কথা যতীনদাকে না জানিয়ে পারেনি। সে জানিয়েছে তার দীক্ষাগুরুকে এবং সমর্থনও পেয়েছে। আর শুধু সমর্থনই নয়, যতীনদাদা যতটা পারবেন সাহায্য করবেন বলেও জানিয়েছেন।

যাই হোক, এখন কথাটা বলতে বলতে ওদের পাশে বসে পড়েন যতীন। আবার বলেন, “হ্যাঁ যা বলছিলাম…তা দিনক্ষণ কিছু কি ঠিক হল?”

 নরেন তাঁর প্রশ্নের উত্তরে দু’দিকে মাথা নাড়ে। না সূচক। তারপর ধীরে ধীরে বলে, “আসলে রঘুনাথদা এখনও চাবির হদিসটাই করে উঠতে পারেনি।”

চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট হয় যতীন মুখুজ্জের কপালে। সংগঠন চালানোর খরচা তো আছেই, তাছাড়া আগামী কর্মকাণ্ডের জন্য খানকতক মাউজার পিস্তলও যে বড়ো দরকার। কিন্তু, একটা পরিকল্পনার পিছনেই যদি এত সময় চলে যায় তবে তো খুব মুশকিল।

আখড়ার একদম ধার ঘেঁষে একটা বাবলাগাছ। তার পাশে যে সন্ধ্যামালতী এবং কাঁটালতার ঝাড়টা ছিল, সেটা কাটা হয়নি। ইচ্ছে করেই আড়ালটুকু রেখে দেওয়া হয়েছিল। হঠাৎই সেই ঝোপের আড়ালে একটা খসখস শব্দ পাওয়া যায়। ঘাড় উঁচিয়ে তাকালে রঘুনাথকে দেখতে পাওয়া যায়। যেন মেঘ না চাইতেই জল!

 শৈল একগাল হেসে বলে, “এস এস রঘুনাথদাদা তোমার কথাই হচ্ছিল।” 

একটা ডাউন গাড়ি গেল এইমাত্র…পরের আপ গাড়ি সেই ঘণ্টা দেড়েক বাদে। তাই ভাবলুম একবারটি ঘুরেই যাই।”

লাইনে গাড়ি থাক অথবা না থাক, একজন গেটম্যানের ডিউটি চলাকালীন কর্মস্থল ত্যাগ করা আইনত অপরাধ। ধরা পড়লে জবাবদিহি করতে হয়।  কিন্তু তবু আজ এসেছে রঘুনাথ কারণ একটি বিশেষ খবর দেওয়ার আছে তার।

 নরেনের মুখে যতীনদাদার কথা বহু শুনেছে। কাজেই আলাপ না থাকলেও আখড়ায় নতুন মানুষটি কে, তা বুঝে নিতে কোনও অসুবিধা হয় না রঘুর, “আজ্ঞে আপনি নিশ্চয়ই যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়? তা আপনি যে আসতে পারেন, সেই কথা নরেন আমাদের একটিবারও বলেনি তো!”

কথাটা বলতে বলতে বসে পড়ে রঘুনাথ। যতীন মৃদু হেসে বলেন, “আসলে নরেনও জানত না। হঠাৎই চলে এসেছি।” আরও দু-এক কথার পর সরাসরি আসল প্রসঙ্গে ঢুকে পড়েন যতীন, “তা রঘুনাথবাবু আমি এদের কাছে শুনলুম যে, আপনি নাকি সিন্দুকের চাবির কোনও হদিস করতে পারেননি এখনও?”

রঘুনাথ মুচকি হাসে। একটু সময় নিয়ে বলে, “কাল পর্যন্ত পারিনি ঠিকই, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে পেরেছি।”

সবাই রঘুনাথের কথায় উৎসাহিত হয়ে ঝুঁকে পড়ে তার দিকে, “কী রকম?” 

টিকিটবাবু আজ নিজের থেকেই দেখিয়ে দিলেন চাবি কোথায় থাকে। না, মানে পুরোপুরি ঠিক দেখাননি, কিন্তু আমি বুঝে নিয়েছি। সে কথাই তো বলতে এলুম।”

তাই নাকি!”

তবে আর বলছি কী? আমি এইখানে আসার আগেই গিয়েছিলুম শরতের পানের দোকানে। মিঠেপাতা দিয়ে একখিলি পান খাওয়ার জন্য প্রাণটা বেশ আকুলিবিকুলি কচ্ছিল। তা সেইখানে গিয়ে দেখি রাজেন্দ্রনাথ হালদারও হাজির। হাতে দিব্যি দোল খাচ্ছে একখানা বটুয়া। বুঝতে আমার বাকি রইল না যে বটুয়াতেই সিন্দুকের চাবি আছে।”

বটুয়ায় চাবি আছে এবং তা সিন্দুকেরই চাবি-এই উদ্ভট ভাবনাকে সবাই প্রথমে আকাশকুসুম বলে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু এরপর যা বলে রঘুনাথ, তাতে মনে হয়, বটুয়ায় চাবি থাকা অসম্ভব নয়।

রঘুনাথ নাকি একটা কাজের অছিলায় একদিন ঢুকে পড়েছিল টিকিট ঘরে। সেদিনই সে ভালো করে পরখ করে নিয়েছিল ঘরের আসবাবপত্তর। টিকিট কাউন্টারের পাশে একখানা টেবিল আর একখানা চেয়ার। ব্যাস এই ছাড়া ঘরে কোনোও আসবাবপত্র নেই। এমনকি একখানা দেরাজ পর্যন্ত নয়। শুধু রেলের ভারী সিন্দুকখানা রাখা আছে পশ্চিমের দেয়াল ঘেঁষে।

 যেদিন থেকে রঘুনাথের উপর চাবির হদিস করার গুরুদায়িত্ব পড়েছে, সেদিন থেকেই ট্রেন না থাকলে, প্ল্যাটফর্মের এমুড়ো-ওমুড়ো পায়চারি করে সে। সেটা করতে করতেই সে খেয়াল করেছিল, গাড়ি না থাকলেই রাজেনবাবু চলে যান শরতের পানের দোকানে।

এখন প্রশ্ন হল, প্রতি গাড়ির জন্য যে টিকিট বিক্রি হয় সেই নগদ টাকা তিনি রাখেন কোথায়? এটা অবশ্যই সত্যি যে, নগদ টাকা সঙ্গে নিয়ে টিকিটবাবু ঘর-বার করবেন না। তাহলে অঙ্কটা কী দাঁড়াচ্ছে?  টাকা ঘরেই রাখবেন এবং সিন্দুকেই রাখবেন। এরপর সিন্দুকে অবশ্যই চাবি দিয়ে দেবেন এবং ফাঁকা ঘরে চাবি কোথাও রেখে যাবেন না। অতয়েব সেই চাবি নিজের কাছেই থাকবে, এবং তা সঙ্গের বটুয়াটার মধ্যে থাকার সম্ভাবনাই প্রবল।

নরেন বলে ওঠে, “উত্তম। চাবি টিকিটবাবুর কাছে থাকলেই সুবিধা। স্টেশন মাস্টারের ঘর দোতলায়। তার কাছে থাকলে কাজটা আরও অনেক কঠিন হয়ে যেত। কাজ কতটা কঠিন, সেটা বোঝার জন্যই আমি চাবির হালহদিশ জানতে চেয়েছিলুম।”   

যতীন মুখুজ্জে বলেন, “ঠিক আছে, চাবি বুকিং ক্লার্কের কাছে থাকে, এটা ধরে নিয়েই তবে এগোনো হোক।”

এই কথা হবার পর রঘুনাথ ওদের থেকে দ্রুত বিদায় নিয়ে ডিউটিতে ফিরে যায়। আরও দু’এক কথার পর আজকের মত বিদায় নেন যতীনদাদাও।

এইদিকে আগামীকাল কোজাগরী। আয়োজন করা হয়েছে এক কুস্তি প্রতিযোগীতার। কাল কী ভাবে কী করা হবে, নরেনদের মধ্যে ফের সেই নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। 

বাইশ

কুস্তির আখড়ার কথা রায়বাহাদুর কৃষ্ণমোহনের কানেও গিয়েছিল। কথায় বলে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। ইশকুল থেকে বার করে দিলেই যে নরেনরা হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবে না, তা কৃষ্ণমোহন বিলক্ষণ জানতেন। কুস্তির আখড়ার কথা শুনেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, এর পিছনে অন্য কোনও মতলব আছেই আছে। এদিক ওদিক থেকে স্বদেশীদের যেসব কীর্তিকলাপের কথা কানে আসছিল তাতেই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়।

যাই হোক, সরেজমিনে ব্যাপারটা পরখ করার জন্য একদিন তিনি সশরীরে হাজির হন আখড়ায়। গিয়ে দেখেন সতু আর নরেন নিজেদের মধ্যে অনুশীলন করছে। সতু বিভিন্ন প্যাঁচ খাটিয়ে নরেনকে কাবু করার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই পেরে উঠছে না। নরেন পাকা মল্লযোদ্ধার মত ‘পাঁয়তারা’ করে সেই প্যাঁচ এড়িয়ে যাচ্ছে।

স্বয়ং রায়বাহাদুর এসে দাঁড়িয়ে আছেন ঠায়, দেখেও সেদিকে যেন তাদের কোনও ভ্রুক্ষেপই নেই।  এই অসম্মান কাহাতক আর সহ্য করা যায়! কোমরে হাত দিয়ে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর কৃষ্ণমোহন সদর্পে ঘোষণা করলেন, “ওহে নরেন, পাঁয়তারা তো ভালোই শিখেছ দেখছি। তবে আমাদের রামাধীনের সঙ্গে যে এইসব দিয়ে কিসসু সুবিধা হবে না এই আমি হলফ করে বলতে পারি।”

কুস্তির ভাষায় ‘পাঁয়তারা’  অর্থ হল প্যাঁচ থেকে বাঁচার কৌশল। অনুশীলন থামিয়ে ফিরে তাকিয়েছিল নরেন। মৃদু হেসে বলে, “কে রামাধীন…ওহো মনে পড়েছে আপনার লিচুবাগানের সেই লেঠেল। তার এখনও শিক্ষে হয়নি বুঝি!”

সেদিন দল বেঁধে বাগানে চড়াও হয়েছিলে। দশজন মিলে একজনকে কাবু করা আর একজনের বিরুদ্ধে একজন লড়াই করা, দুইয়ের মধ্যে তফাৎ আছে হে।”

পাশে দাঁড়িয়েই মুগুর ভাঁজছিল হরিকুমার। ফুঁসে ওঠে, “তা আপনি নিয়ে আসুন না রামাধীনকে, দেখি কত বড়ো পালোয়ান হয়েছে সে?”

হ্যাঁ। সে নিয়ে আসব বৈকি। কিন্তু লড়াই করবে কে? তুমি, নরেন, সতু বাঁড়ুজ্যে নাকি লিকপিকে শৈলেশ্বর? হা হা হা…”

নরেন এগিয়ে আসে কথা শোনার পর, “যে কেউ একজন হলেই হয়, তবে আপনি যখন আমাকে প্রথমে বলেছেন তখন আমিই না হয় তাকে ধোবিপাট করব।”

আজকে, মানে কোজাগরীর দিনটাই সেই ‘ধোবিপাট’ এর জন্য নির্ধারিত হয়েছে। ঠিক হয়েছে নিজেদের মধ্যে কুস্তি প্রতিযোগিতা শেষ হবার পর লড়াই হবে নরেন এবং রামাধীনের।

আজ রায়বাহাদুর কৃষ্ণমোহন, স্যাঙাৎ রামাধীনকে নিয়ে হাজির হয়ে গেছেন ইতিমধ্যেই। লিচু ডাকাতির পরদিন যে রূপ দেখা গিয়েছিল রামাধীনের আজ তার লেশমাত্র নেই। ডাকাতির দিন একসঙ্গে অনেককে দেখে এমন ভড়কে গিয়েছিল, যে পরদিনও আতঙ্ক থেকে বার হতে পারেনি।

কিন্তু আজ, একজনের বিরুদ্ধে একজনের লড়াই। আজ রামার অন্য রূপ। তার ভাব দেখে মনে হয়, নরেনকে পেড়ে ফেলা শুধু যেন সময়ের অপেক্ষা যেন। ধুতি মালকোঁচা মেরে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে সে পাকানো গোঁফে তা দেয় আর মাঝে মাঝে আলতো করে উরু চাপড়ায়।        

এইদিকে, যথা সময়ে ভাই কেদারনাথ এবং পুত্র সুভাষকে নিয়ে আখড়ায় হাজির হলেন জানকীকাকা। তাঁদের জন্য কাঠের দু’খানা হাতলওয়ালা কেদারার ব্যবস্থা করা হয়েছিল আগের থেকেই। জানকীনাথ এবং কেদারনাথ সবার অনুরোধে পাশাপাশি বসলেন। সুভাষকেও কোলে নিয়ে বসানোর চেষ্টা করেছিলেন কেদার কাকা, কিন্তু কিছুতেই তাকে বশ মানানো যায়নি। সে কোনোদিন সামনে থেকে মল্লযুদ্ধ দেখেনি। কাজেই তার ভিতরে এক অদ্ভুত উত্তেজনা। সে দাঁড়িয়ে থাকে বাকি সবার মতই।

ইচ্ছা করেই কৃষ্ণমোহন মুখুজ্জের বসার কোনও বন্দোবস্ত করা হয়নি। পাশে রামাধীনকে নিয়ে তিনি ঠায় দাঁড়িয়েছিলেন। বিষয়টা জানকী কাকার খারাপ লাগে। তিনি হরিকে বলেন কৃষ্ণবাবুর জন্য একখানি কেদারার ব্যবস্থা করতে। উপায়ন্তর না দেখে হরিকুমার জানকী কাকার আদেশ পালন করে।

নরহরি নস্কর থেকে নিধু মণ্ডল, চাঙড়িপোতা থেকে অনেকেই এসেছেন কুস্তি দেখতে। একেবারে সাজ সাজ রব চারদিকে।

পুবের নারকেল গাছটায় শরৎ শেষের রোদ্দুর যখন রাঙা হয়ে পড়েছে, তখনই শুরু হয়ে গেল লড়াই।

নরহরি নস্কর বলশালী হলেও কুস্তির প্যাঁচ-পয়জার সেইভাবে কিছুই জানে না। কিন্তু সেও খানিক বাদে অতি উৎসাহে নেমে পড়ল। কিন্তু তো আর শুধু গায়ের জোরের কম্মো নয়। কায়দা কানুন জানা দরকার। রোগা পাতলা শৈলেশ্বরেই প্যাঁচেই সে কুপোকাত। তবে একটা জিনিস লক্ষ করার মতন, সেই মিছিলের পর থেকে নরহরি যেন আমূল পাল্টে গেছে। হাসি মুখে মেনে নিল পরাজয়।

প্রত্যাশিতভাবেই চূড়ান্ত পর্যায়ে গেল সাতকড়ি এবং হরিকুমার। ফাইনালে দেখবার মত লড়াই হল দু’জনায়। তবে শেষ পর্যন্ত জয় হল হরির। দেখা গেল কুস্তির প্যাঁচ সে অন্যদের থেকে একটু বেশিই রপ্ত করেছে।

জানকীনাথ কুস্তির ভক্ত বহুকাল থেকেই। হোগোলকুঁড়িয়ায় অম্বিকাচরণ গুহর আখড়ায়  তিনি বেশ কয়েকবার গেছেন কুস্তি দেখার জন্য। তিনি এবং কেদারনাথ বেশ উপভোগ করছেন লড়াই। তবে বাবু কৃষ্ণমোহনের মুখ দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। একেবারে পাথরের মূর্তি হয়ে বসে আছেন। পাশে দানবের মত দাঁড়িয়ে রামাধীন। ছয় ফুটের উপর উচ্চতা, ওজন কম করে আড়াইমন, ইয়া গালপাট্টাওয়ালা গোঁফ। দেখলে যে কোনও কুস্তিগিরের আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে যেতে পারে। কিন্তু নরেন নির্বিকার। গুরু যতীন মুখুজ্জের মত তারও আজকাল যেন কোনও কিছুতেই আর ভরডর নেই।

এটা ঠিক যে নরেনের স্বাস্থ্যও বেশ ভালো। তারও উচ্চতা অ্যাদ্দিনে ফুট ছয়েক ছাড়িয়েছে। চওড়া কাঁধের দুই পাশ থেকে নেমে গেছে শালতরুর মত পেশীবহুল দুই হাত। কিন্তু রামাধীনের কাছে সে আর এমনকি!

যাই হোক, শুধু চাঙড়িপোতা নয়। কোদালে, মাহিনগর থেকেও এসেছেন বেশ কয়েকজন। বোঝা যাচ্ছে, পালোয়ান রামাধীনের সঙ্গে নরেনের লড়াইয়ের কথা চাউর হয়েছে ভালোই। দু’একজন রামাধীনের পক্ষ নিলেও বেশিরভাগই নরেনের সমর্থক।

অবশেষে শুরু হল বহু প্রতীক্ষিত ‘মল্লযুদ্ধ’রামাধীনের শক্তি নরেনের তুলনায় বেশি, কিন্তু নরেন অনেক বেশি ক্ষিপ্র। তাকে যেই বাগে আনতে চেষ্টা করে রামা তখনই সে  পাঁকাল মাছের মত পিছলে পিছলে যায়। তার পাঁয়তারার কাছে রামাধীনের প্যাঁচ ঠিক পেরে ওঠে না।

কিন্তু বারে বারে এড়িয়ে যাওয়া মুশকিল। একে অন্যের কাঁধে হাত এবং চোখে চোখ রেখে একসময় গোল হয়ে ঘুরতে থাকে। এর মধ্যেই হঠাৎ করে রামাধীন ডান হাতের মুঠোয় পেয়ে যায় নরেনের বাঁ পায়ের গোছ। সজোরে টান দেয়। দেহের ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যায় নরেন। চকিতে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ালেও নরেনের মনে হয় আখড়ার মাটি যেন দুলছে। রামাধীনের মুঠো হল গোখরোর ছোবল। ঐটুকু সময়ের মধ্যেই বেশ করে একখানা মোচড় মেরে তবে ছেড়েছে রামা। ভালো রকম জখম হয়েছে নরেনের পা।

কাণ্ড দেখে রায়বাহাদুর বেশ মজা পান। গলা সপ্তমে চড়িয়ে বলতে থাকেন, “রাতের অন্ধকারে গাদাখানেক হতচ্ছাড়া জুটিয়ে বাগানে চড়াও হওয়া আর ময়দানে নেমে লড়াই করা, দুয়ের মধ্যে অনেক তফাৎ আছে হে। এবার সেটি টের পাচ্চ তো বাপধন?”

খোঁড়াতে খোঁড়াতে নরেন পাক খাচ্ছিল বৃত্তের চারদিকে আর তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল রামাধীন। সেই দেখে আরও উৎসাহিত হন কৃষ্ণমোহন। জানকীনাথের দিকে তাকিয়ে বলেন, “একটা কথা কিন্তু স্বীকার করতেই হয়, এরা কুস্তির প্যাঁচ শিখুক না শিখুক পাঁয়তারা কিন্তু ভালোই শিখেছে কী বলেন অ্যাঁ…হা হা হা…।”

জানকীনাথ এই কথার কিন্তু কোনও উত্তর করেন না।

গুঞ্জন পেরিয়ে নরেনের কানেও যাচ্ছিল কথাগুলো। কী করে কাবু করা যায় রামাধীনকে এই ভেবে সে যখন দিশেহারা, তখনই ভাসা ভাসা চোখ দুটো মনে পড়ে যায় তার। স্বামীজির সেই দুই চোখ। সেই সন্ন্যাসী, যতীনদাকে বলেছিলেন আসল শক্তি দেহে নয়, মনে থাকে। সেই শক্তিটাকে খুঁজে বার করতে হবে। যতীনদাদা বলেছিলেন, তিনি যদি পৃথিবী জয় করতে পারেন, তাহলে সে কেন পারবে না! তাঁর নাম নরেন্দ্রনাথ আর সে নিজেও তো নরেন্দ্রনাথ…!

পায়ের চোট এতটাই ছিল যে নরেন পা ফেলতেই পারছিল না ভালো করে। কিন্তু গেরুয়াধারী সেই মানুষটার কথা মনে হতেই তার মধ্যে কী যেন এক ভর করে। বন্দে মাতরম ধ্বনি দিতে দিতে তীর বেগে ছুটে যায় রামাধীনের দিকে। রামা এই অতর্কিত আক্রমণ আশা করেনি মোটে।

নরেন ছুটে গিয়ে ডান কাঁধ দিয়ে সজোরে এক ধাক্কা মারে প্রতিপক্ষের পেট আর বুকের সংযোগস্থলে। নরেনের উদ্দেশ্য ছিল, অকস্মাৎ ধাক্কার পর রামার পা দু’টো, দু’হাতের বেড় দিয়ে ধরে চকিতে তাকে কাঁধে তুলে নেবে। কিন্তু রামাধীনের অতিরিক্ত ওজনের জন্য সেটা সম্ভব হয় না। ধাক্কার চোটে রামাধীন বেকায়দায় পড়ে যায় ঠিকই কিন্তু তার পিঠ মাটি স্পর্শ করে না। সঙ্গে সঙ্গে উপুড় হয়ে যায় সে।

অতঃপর, নরেনও সাষ্টাঙ্গে চেপে পড়ে রামাধীনের উপর। ডান কনুই দিয়ে যত জোরে সম্ভব চাপ দিতে থাকে রামার ঘাড়ে, আর বাঁ হাতটা নিমেষে ঢুকিয়ে দেয় তার বাঁ বগলের নীচ দিয়ে। নরেনের কাণ্ড দেখে রায়বাহাদুর তো এক্কেবারে থ্‌দিকে জানকীনাথ সহ সবাই উৎসাহ দিতে শুরু করেন নরেনকে।

হাফ নেলসন’ শব্দটা নরেন শুনেছিল যতীনদাদার মুখে। এক সাহেব কুস্তিগির এসেছিলেন হোগোলকুঁড়িয়ার আখড়ায়। তিনিই শিখিয়েছিলেন প্যাঁচটা। পরে অবশ্যি নরেন ভেবে দেখেছে প্যাঁচ নতুন কিছু নয়। তারা নিজেরা আগের থেকেই কায়দার একটা নাম দিয়েছিল – ‘ঘাড়কাঁচি’। 

সবাই হাঁ করে দেখছিল দুই ওস্তাদের রুদ্ধশ্বাস লড়াই। শরীরখানা ধনুকের মত বাঁকিয়ে উপুড় হয়ে পড়েছিল রামাধীন আর তার উপরে চেপেছিল নরেন। ঐরকম থাকতে থাকতে নরেন হঠাৎই নিজের দেহটাকে রামাধীনের দেহের আড়াআড়ি নিয়ে যায়। এর ফলে একটা শরীরের সঙ্গে আর একটা শরীরের লম্ব অবস্থান হল।

এরপর নরেন, রামাধীনের ঘাড় ছেড়ে ডান বগলের নীচ দিয়ে ডান হাত ঢুকিয়ে দেয়, এবং সেই হাত ঘুরিয়ে আনে রামার মাথার পিছন দিকে, এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হাতের চেটো দিয়ে তার মাথার পিছনে প্রচণ্ড জোরে চাপ দিতে আরম্ভ করে। ঐদিকে বাম হাতটা সে আগেই ঢুকিয়ে রেখেছিল রামাধীনের বাঁ বগলের নীচ দিয়ে। সেটা দিয়ে  সে আগে থেকেই চিত করে ফেলার চেষ্টা করে যাচ্ছিল রামাধীনকে। এতক্ষণে সফল হয়। নরেনের দু’হাতের বিপুল চাপে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়তে বাধ্য হয় রামাধীন।

হঠাৎ করে দু’এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপরই শুরু হয় সাতকড়িদের হর্ষোল্লাস। নরহরিও নেচে ওঠে সবার সঙ্গে। সবাই মিলে কাঁধে তুলে নেয় নরেনকে। ‘বন্দে মাতরম’ শব্দে গম গম করে ওঠে চাঙড়িপোতার আখড়া।

হুল্লোড় থামলে কিন্তু কৃষ্ণমোহন এবং রামাধীনকে, কোথাও দেখতে পাওয়া গেল না। জানকীনাথ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন নরেনের দিকে। বুকে জড়িয়ে ধরলেন তাকে। বললেন, “পারবে… আমি জানি তোমরা ঠিক পারবে…”পাশেই দাঁড়িয়েছিল ছোট্টো সুভাষ। সে বোঝার চেষ্টা করে যেতে লাগল, তার বাবা ঠিক কী পারার কথা বলছেন! 

তেইশ

প্রথম শীতের বেলা। বিকেল চারটে বাজতে না বাজতে, ধানখেত ছোঁয়া রেলের লাইন বেঁয়ে চাঙড়িপোতাকে গিলে খেতে আসে সাঁঝের আঁধার। তাই দুপুর দুপুরই আখড়ায় হাজির হয়েছে ওরা সবাই। চূড়ান্ত অভিযানের আগে আজ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা আলোচনা করার আছে। যতীনদাদাও এসেছেন।

যতীনদাদার এই অভিযানে থাকার ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই। আলোচনার শেষেই তাঁকে ফিরে যেতে হবে কলকাতায়। সেখান থেকে দু’একদিনের মধ্যেই আবার পাড়ি দিতে হবে সেই পাহাড়িয়া দেশ, দার্জিলিয়ে। সংগঠনের কাজে।

আখড়ার একধারে মাদুর বিছিয়ে কথা হচ্ছিল নীচুগলায়। চার মক্কেল এবং যতীনদাদা ছাড়াও আছে গেটম্যান রঘুনাথ। একটা ফর্দ তৈরি করা হচ্ছে। এক এক করে বলে যাচ্ছেন যতীনদা আর দ্রুত সেই জিনিসগুলির নাম লিখে নিচ্ছে হরিকুমার। মোটা নারকেল দড়ি এক গাছা, কাপড়ের মণ্ড বেশ কয়েকটা, কাপড়ের থলে একটা, দেড় ফুটের একটি ছোটো লাঠি এবং বড়ো ছোরা, দু’খানা। শেষের বস্তুটি, খুব দরকার না হলে কোনও মতেই ব্যবহার করা হবে না। একটি ছোরা থাকবে, দলপতি নরেনের কাছে এবং আর একটি সাতকড়ির কাছে।

ফর্দ লেখা শেষ হলে। যতীনদাদা বললেন, “এইগুলি যোগাড় করতে কদ্দিন সময় লাগতে পারে বলে মনে হয়?”

সাতকড়ি দ্রুত উত্তর দেয়, “আর এমন কী যতীনদা! একদিনের মধ্যেই সব যোগাড় হয়ে যাবে।”

বাঃ খুব ভালো।” একটু থেমে আবার বলেন, “প্রত্যেকের মাথায় থাকবে হনুমান টুপি এবং গায়ে কালো চাদর। প্রথমে পুরো শরীর চাদরে ঢাকা থাকবে। কিন্তু চূড়ান্ত সময়ের আগে, অর্থাৎ কাউকে আক্রমণের আগে চাদর কষে বেঁধে নিতে হবে কোমরে…”

একটু থেমে আবার বলতে শুরু করেন যতীন, “একটা জিনিস সব সময় খেয়াল রাখবে সবাই, অকারণে যেন কোনও রক্তপাত না ঘটে। আর…কাউকে যদি শারীরিক ভাবে আক্রমণ করতেই হয় তাহলে পিছন দিক থেকে আক্রমণ করার চেষ্টা করবে। যাতে নিজেকে আড়ালে রাখা যায়। নারকেল দড়ি যে একগাছা জোগাড় করতে বলেছি সেটা অন্তত দশ বারোখানা টুকরো করে নিতে হবে। হাত পা বাঁধার কাজে লাগবে। আর…”

সবাই গোল হয়ে বসে যতীনদাদার কথা শুনছিল আর ভিতরে ভিতরে অনুভব করছিল এক অদ্ভুত উত্তেজনা। হরিকুমার কথা শেষ হওয়ার আগেই ধুয়ো ধরে, “আর…? ”

আর অতর্কিতে আক্রমণ শানালে প্রতিপক্ষের বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। সেই মূল্যবান মুহূর্তটুকুর সদ্‌ব্যবহার করতে হবে। প্রতিপক্ষ পিছন ফিরে দেখার চেষ্টা করবেই, সেইটুকু সময়ের মধ্যেই একজন তার মুখে গুঁজে দেবে কাপড়ের মণ্ড, আর অন্য একজন সেই সময়ের মধ্যেই বেঁধে ফেলবে তার হাত-পা।”

আবার একটু থামেন যতীন মুখজ্জে এবং সহসা বেশ গম্ভীর হয়ে যান। দু’এক মুহূর্ত সময় নিয়ে বলেন, “আমার একটা কথা… শুধোবার ছিল তোমাদের কাছে…” 

দিন কয়েক হল উত্তুরে হাওয়া ছেড়েছে বেশ। আখড়ায় ধুলো উড়ছিল ইতস্তত। সতু হাত দিয়ে মাথার ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলে, “বলুন যতীনদা…”

তোমরা নিজেরাই আমাকে বলেছ যে, তোমরা নাকি এর মধ্যে একদিন বেরিয়েছিলে গাঁয়ের পথে, মিছিল করে। দল বেঁধে স্লোগানও নাকি দিয়েছ। একটা বড়ো ঘটনা ঘটাতে চলেছ তোমরা। তার আগে এই  কাণ্ড অহেতুক হঠকারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে আগের থেকেই লোকের চোখে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তোমাদের।”

একটু থেমে আবার বলেন,  “আচ্ছা…তোমরা কেন ঐরকম  মিছিল করে বেরিয়ে পড়েছিলে, আমায় বল তো একটু শুনি।”

কারও কাছে এর কোনও সদুত্তর নেই। একটু থেমে মুখুজ্জে নিজেই আবার বলতে শুরু করেন, “তোমরা না বললেও আমি যে কারণটি একেবারে বুঝতে পারছি না তা নয়। আসলে আবেগের বশে তোমরা ঐসব করেছ।”

কথা ঠিক বটে। সুরেন বাঁড়ুজ্জের ভাষণ শোনার পর থেকেই কী যেন একটা হয়েছে। ভিতরে সব সময়ই কেমন যেন একটা ছটফটানি।  হ্যাঁ একদিন কয়েকজন মিলে মিছিল করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিল ওরা। বন্দে মাতরম ধ্বনি দিতে দিতে, গাঁয়ের পথে হেঁটে বেড়ানোর যে কী আনন্দ তা তারা ঠিক বলে বোঝাতে পারবে না।  তাদের সঙ্গে গাঁয়ের ছেলে ছোকরারাও জুটে গিয়েছিল বেশ কয়েকজন। 

একটু সময় নিয়ে আবার নিজের কথা বলতে শুরু করেন যতীন, “আবেগ নিজের ভিতর ধরে রাখতে হবে। আবেগের আতিশয্যে ভেসে গেলে আসল কাজ সিদ্ধ হওয়া বড়ো মুশকিল। অভিযানের দিন, কাজের আগে বা পরে চিৎকার করে ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি দেওয়া চলবে না।  মনে মনে বলতে হবে সেই বীজমন্ত্র। একজনই কেবল দরকারে কথা বলবে আর বাকিরা নিজেদের মধ্যে সমস্ত ভাবের আদান প্রদান করবে আকার ইঙ্গিতে। খেয়াল থাকে যেন, মুখ দিয়ে অযথা কোনোরকম আওয়াজ করা চলবে না। কোনোভাবেই যেন কেউ তোমাদের গলার স্বর শুনে চিনে ফেলতে না পারে।” একটু থেমে আবার বলেন,

কোথাও কোনও সূত্র যেন ফেলে আসা না হয়।” 

এরপর, আরও খানিকক্ষণ আলোচনা চলে নিজেদের মধ্যে। রঘুনাথ আগে উঠে পড়ে সবার থেকে বিদায় নিয়ে। তাকে যতীনদাদা বলেছেন ওদের সঙ্গে যোগ না দেওয়ার জন্য। অন্যরা ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়লে যতটা শাস্তি হবে, সে ধরা পড়লে শাস্তি কিঞ্চিৎ বেশিই হবে।  ডাকাতির সঙ্গে সঙ্গে যোগ হবে বিশ্বাসঘাতকতার দায়ও। কারণ সে রেলেরই একজন কর্মচারী।

 রঘুনাথ চলে যাওয়ার খানিক বাদে যতীনদাও উঠে পড়েন। কেটে কেটে বলেন, “সবার শেষে আরও একটা কথা আমার বলার আছে।”

সবাই সমস্বরে বলে ওঠে, “বলুন যতীনদাদা।”

কোনোভাবে কেউ যদি ধরা পড়ে যাও,  তার কিন্তু পুলিশের সামনে মুখ খোলা চলবে না। একদম না।” দু’এক মুহূর্ত থেমে আবার বলেন, “মরে গেলেও না।”

বাক্য শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে মুষ্টিবদ্ধ হাতগুলি একসঙ্গে উপরে উঠে যায়। শেষ বিকেলের উত্তুরে হাওয়ায় পাক খেয়ে ওঠে দু’খানা শব্দ, “বন্দেএএ… মাতরওওম।”  

চব্বিশ

এই বছর শীতটা একটু আগেভাগেই জাঁকিয়ে বসেছে চাঙড়িপোতার বুকে। সন্ধ্যা হতে না হতেই জনমানবহীন হয়ে যাচ্ছে পথঘাট। তবে আজ ভাবগতিক যেন খানিক অন্যরকম। রাতের কুয়াশা ভেদ করে একখানা গরুর গাড়ি এসে দাঁড়াল বাদুড়তলায়। জনা তিনেক নেমে এল পরপর। হন হন হাঁটা লাগাল ইস্টিশনের দিকে। সবার মাথায় হনুমান টুপি। দেহ আপাদমস্তক চাদরে মোড়া। একজনকেও চেনার উপায় নেই।    

বাদুড়তলা থেকে খানিক এগিয়ে যাওয়ার পর, রাস্তাটা দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। একটা ভাগ চলে গেছে সেই পঞ্চবটীর দিকে, আর একটা ইস্টিশানের দিকে। পথের বাঁকে একটা সুবিধামত জায়গা বেছে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল নরেন্দ্রনাথ। তার মাথায় একটা জিনিসই ঘুরছে, এতদিনে এইরকম একটা কাজ করতে চলেছে তারা, যার থেকে টাকা আসবে মাউজার পিস্তল কেনার। কত টাকা আজ লুট করতে পারবে তারা, তা দিয়ে কটা মাউজার কেনা যাবে, এই চিন্তাতেই যেন মশগুল সে।

তেঁতুল গাছের ফাঁক দিয়ে আলো পাঠাচ্ছে শুক্লাষ্টমীর চাঁদ। সেই আলোয় বেশ খানিক দূর থেকেই বন্ধুদের দেখতে পেল নরেন। ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল আড়াল থেকে।

আজ শুক্কুরবার। রাতের গাড়ি ধরে অনেকেই সপ্তাহান্তে বাড়ি ফেরেন। তাই অন্যদিনের থেকে খরিদ্দারের চাপ একটু বেশিই থাকে। রেলচত্বরে পানের দোকানটা খোলাই ছিল। সারাদিনের বিক্রিবাট্টার হিসাব মিলিয়ে যখন গুমটির ঝাঁপটা ফেলতে যাবে দোকানি, তখনই সে দেখতে পায় চারজনের দলটাকে।  সবথেকে যে লম্বা, তার হাঁটাটা যেন বেশ চেনা চেনা লাগছে। একদিন দিনু ভট্টাচাজ্জির ছেলেটা স্লোগান দিতে দিতে গাঁয়ের পথে ঘুরে বেড়াচ্ছিল না, দু-চারজনকে জুটিয়ে নিয়ে?  সেই নয়ত?  কিন্তু এত রাত্তিরে সদলবলে এইখানে এসে জোটার কী কারণ থাকতে পারে! ব্যাপার খুব সুবিধের বলে মনে হচ্ছে না তো। তড়িঘড়ি ঝাঁপ ফেলে এলাকা ছেড়ে চম্পট দেয় দোকানদার।   

সিঁড়ি বেয়ে উঠলেই একপাশে টিকিট ঘর। রাতের শেষ গাড়ি চলে গেছে খানিক আগে। তবে এখনও, কেরোসিন বাতির উজ্জ্বল আলো এসে পড়ছে বুকিং ঘরের জানালা দিয়ে। একটা ছায়ার মৃদু নড়াচড়া টের পাওয়া যাচ্ছে খড়খড়ি দেওয়া বিশাল পাল্লাটার উপর। নিশ্চয়ই রাজেনবাবু হিসাব মেলাচ্ছেন। টিকিট ঘরের দরজায় যেতে হলে, তাঁর সামনে দিয়ে গিয়ে বাম দিকে যেতে হবে।

একসঙ্গে চারজনকে এই সময়ে দেখে কিছু একটা নিশ্চয়ই সন্দেহ করবেন টিকিটবাবু রাজেন হালদার। কাজেই,দেয়াল ঘেঁষে হামাগুড়ি দিয়ে অন্য প্রান্তে উপস্থিত হয় তারা। সবার প্রথমে নরেন আর একদম পিছনে সাতকড়ি। ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে নরেন একবার উঁকি মেরে বুঝে নিতে চায় রেলের দুই নিরাপত্তা রক্ষীর অবস্থান। একটা ছোরা আছে সাতকড়ির কাছে আর একটা নরেনের কাছে। সাতকড়ি হাত দিয়ে কোমরে গোঁজা ছোরাটা একবার পরখ করে নেয়। বলা তো যায় না, হয়ত শুরুতেই এটা কাজে লেগে গেল। যাই হোক না কেন, আজ যেন কোনও বাঁধাই ওদের কাছে বাঁধা নয়, যা করতে এসেছে সেটা আজ করেই ছাড়বে ওরা।  

ঐদিক নরেন দেয়ালের আড়াল থেকে মুখ বার করে দেখে, যার ওদের দিকে মুখ করে বসে থাকার কথা, সে নেই। নিশ্চয়ই স্টেশন মাস্টার তাকে উপরের ঘরে ডেকে পাঠিয়েছেন কোনও কারণে। না হলে রাতের বেলা জায়গা ছেড়ে নড়ার কথা নয় তার। আর দ্বিতীয় জন  আছে নিজের জায়গাতেই। কিন্তু সে ওদের দিকে পিছন করে বসে আছে।

একবার প্ল্যাটফর্মের এমাথা ওমাথা ভালো করে দেখে নেয় নরেন। না, আর কেউ কোথাও নেই। শিশির আর জ্যোৎস্নায় শুনশান পড়ে আছে পুরো চত্ত্বরটা। ঝোপের আড়াল থেকে ভেসে আসছে ঝি ঝি পোকার ডাক, আর বেশ খানিক দূরে পূবের বাঁশঝাড়ে মাঝে মাঝে ডেকে উঠছে শেয়াল, হুক্কাহুয়া রবে। ব্যস এই ছাড়া আর কোনও আওয়াজ নেই কোথাও।  

কিছুটা দূরে গেটম্যান রঘুনাথের ঘর। শীতে জানলা দরজা বন্ধ নিশ্চয়ই। নাহলে এখান থেকে আলোর হলদেটে আভা ঠিক ঠাহর করা যেত। নরেন্দ্রর পিছনেই ছিল শৈলেশ্বর। নরেন্দ্র তাকে ইশারা করে। শৈল দ্রুত এগিয়ে যায় রঘুনাথের ঘরের দিকে। কাছে গিয়ে বুঝতে পারে ভিতরে আলো জ্বলছে।  দরজার আংটা দু’টোর মধ্যে দড়ি গলিয়ে খুব ভালো করে গিঁট মেরে দেয়। যাতে ভিতর থেকে হাজার চেষ্টা করলেও খোলা না যায়।

অ্যাদ্দিনে রঘুনাথকে এখানে-সেখানে, ওদের সঙ্গে দেখে ফেলেছে অনেকেই। যাতে ঘুণাক্ষরেও তাদের সন্দেহ না হয় যে,রঘুনাথও এই ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত, সেইজন্যই এই বন্দোবস্ত করা হল। এইটা যতীনদা বলেননি। হরিকুমারের মাথা থেকে বেরিয়েছে। ওরা ধরা পড়লেও রঘুনাথ যাতে বেঁচে যায়।

প্ল্যাটফর্ম দিয়ে গেলে পাছে নিরাপত্তা রক্ষীর নজরে পড়ে যায় সেইজন্য শৈলেশ্বর রেল লাইনের পাশের ঝোপে নেমে গিয়েছিল। কাজ সেরে ঝোপ জঙ্গলের মধ্যে দিয়েই ফিরে আসে আবার।

পঁচিশ

ঝিঁঝিঁপোকার একঘেয়ে একটা আওয়াজ ছাড়া আর কোনও আওয়াজ নেই এখন। শিয়ালগুলোও যেন কী এক কারণে চুপ করে গেছে সহসা। এইদিকে টিকিট ঘরের দেয়ালে প্রায় টিকটিকির মত সেঁটে আছে ওরা সবাই।

শৈল এসে আগের জায়গাতেই হামাগুড়ি দিয়ে বসে পড়লে, মাথাটা সামান্য বার করে ফের উঁকি মারে নরেন। এখান থেকে নিরাপত্তারক্ষীর দূরত্ব খুব বেশি হলে ফুট দশেক। দশাসই চেহারার সেই নিরাপত্তারক্ষীর হাতে বিরাট এক বল্লম। যার ফলাটা চকচক করছে চাঁদের আলোয়। ধারালো বল্লমের চকচকে ফলা এইখান থেকে বেশ নজরে পড়ছে ওদের। চাঁদের আলোর খুব একটা জোর নেই, কিন্তু তা সত্ত্বেও বেশ বোঝা যাচ্ছে অস্ত্র কতটা ভয়ংকর! রক্ষীটির যা চেহারা, তাতে সে ইচ্ছে করলে, বল্লম দিয়ে গেঁথে একটা ছোটোখাটো বাছুরকে মাটি থেকে শূন্যে তুলে ফেলার ক্ষমতা রাখে।

তবে একটাই সুবিধা যে নিরাপত্তা রক্ষী নরেনদের দিকে পিছন করে বসে আছে। এবং শুধু তাই নয়, তার শরীরের ভঙ্গিমা দেখে নরেন এটা বেশ বুঝতে পারছে যে, ক্রমশই তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন তিনি। মাঝে মাঝে টাল খেয়ে পড়ে যাবার দশা হচ্ছে টুল থেকে। না, আর বেশি দেরী করা ঠিক হবে না। সবাই উঠে দাঁড়ায় একে একে। নিজেদের সাজ সরঞ্জামগুলো হাত দিয়ে পরখ করে নেয় একবার। এগিয়ে যায় পা টিপে টিপে।

শ্বাপদের মত নিঃশব্দে ওরা এসে দাঁড়ায় নিরাপত্তা রক্ষীর একদম পিছনে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই, পিছন থেকে নরেনের লৌহ কঠিন হাত রক্ষীর ঘাড় এবং গলা পেঁচিয়ে ধরে। রক্ষীটি বোঝার চেষ্টা করে বিষয়টা। কিন্তু পারে না। বেচারা চিৎকার করে উঠতে যায় যন্ত্রণায়। ইতিমধ্যেই, কাপড়ের একটা মণ্ড নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল শৈলেশ্বর। প্রহরীর মুখটা সামান্য ফাঁক হতেই চকিতে মুখের ভিতর সেটি ঢুকিয়ে দেয় সে। আর এর মধ্যেই সতু তার হাতদুটো পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে, চোখের নিমেষে। এরপর, টুলের উপর বসা অবস্থাতেই নিরাপত্তারক্ষীর পা দুটোও বেঁধে ফেলা হয়, নিপুণ দক্ষতায়।

এখান থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরেই দোতলার সিঁড়ি।  উপরে স্টেশন মাস্টারের ঘর। সিঁড়ির ঠিক পাশটিতেই একখানা ছোট্টো জারুল গাছ। নরেন, হরিকে বলেছিল গাছের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াতে। যাতে যে প্রহরীটি স্টেশন মাস্টারের ঘরে গিয়েছে, সে নেমে আসতে থাকলেই নজর করা যায়। সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল হরিকুমার। যখন প্রথম প্রহরীকে ধরাশায়ী করে ফেলার কাজ প্রায় শেষ, তখনই হঠাৎ করে তার নজরে পড়ে দ্বিতীয় জনকে। দ্রুত গতিতে নেমে আসছে সিঁড়ি বেয়ে।

 দ্বিতীয় নিরাপত্তা রক্ষী প্ল্যাটফর্ম চত্বরে পা দিতে না দিতে, পিছন থেকে তার উপর বাঘের মত লাফিয়ে পড়ল হরিকুমার। হরিও আজকাল দিনে কম করে একশো বুকডন আর শতখানেক মুগুর ভাজে। দুই হাতে তারও এখন অসুরের বল। দ্বিতীয় রক্ষীকে পেড়ে ফেলে সে একাই।

সাতকড়ি পুরো বিষয়টা খেয়াল করেছিল, খানিক তফাৎ দাঁড়িয়ে। এখন নিঃশব্দে ছুটে আসে। কাপড়ের একটা ছোটো মণ্ড সে ঢুকিয়ে দেয় দ্বিতীয়জনের মুখে। এরপর হরিকুমার তাকে জাপটে ধরে রাখে, আর সতু বেঁধে ফেলে হাত পা। ঠিকঠাক জব্দ করার পর দ্বিতীয় প্রহরীটিকে ফেলে রাখা হয় ঝোপের পাশে।

এইদিকে, শৈল এবং নরেন পায়ে পায়ে এসে, বুকিং ঘরের দরজায় দাঁড়িয়েছিল। দু’দিক থেকে উঁকি মেরে। বুকিং ক্লার্ক রাজেন হালদার ছাড়া ঘরে আর কেউ নেই এখন। রাজেনবাবু এক মনে হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। সতু আর হরি, দ্বিতীয় প্রহরীকে জব্দ করে এসে দাঁড়ায় ওদের পিছনে। চোখে চোখে কথা হয় চারজনের। আক্রমণের আগে র‍্যাপারগুলো ডান বগলের তলা দিয়ে পেঁচিয়ে নিয়েছিল সবাই। এইবার কষে কোমরে বেঁধে নেয়, যতীনদাদার কথা মত।

অতঃপর নরেন ঢুকে পড়ে ঘরে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। মেঝেতে পা ঘষার যে সামান্য আওয়াজ, তাতেই টের পেয়ে যান টিকিটবাবু। হনুমানটুপিতে চারজনকে ঘরের মধ্যে দেখে হঠাৎ করে মানুষটির মনে হয়, চার অশরীরী মূর্তি ভিতরে ঢুকে পড়েছে বুঝি। কিন্তু ভয়ে চিৎকার করে ওঠার আগেই নরেন ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁর উপর। যত জোরে পারে চেপে ধরে পিছন থেকে।

শৈল এবং সাতকড়ি দুজনের কোমরেই বাঁধা ছিল একটা করে থলে। নরেন পিছমোড়া করে রাজেনবাবুকে চেপে ধরার সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে কাছে আসে শৈল। থলের ভিতর থেকে ছোটো লাঠিটা বার করে পিছন থেকে চেপে ধরে রাজেন হালদারের কাঁধে। মানুষটির থরহরিকম্প আরও বাড়ে। বলা বাহুল্য ডিসেম্বরের শীতে নয়, ভয়ে। কাঁপা কাঁপা গলায় কী যে বলেন ঠিক বোঝা যায় না। কানের কাছে মুখ নিয়ে হিসহিসিয়ে ওঠে নরেন, “কী বলছেন পরিষ্কার করে বলুন…”

আজ্ঞে আমার কাঁধে ওটা কী ঠেকানো হয়েছে?”

সেরকম কিছু নয়। বন্দুকের নল।”

অ্যাঁ! সেরকম কিছু নয়!”

আজ্ঞে না সেরকম কিছু নয়। যদি বেগড়বাই কিছু করেন তবে হাল্কা করে ঘোড়াটা একটু চেপে দেওয়া হবে, এই আর কি।”

নরেনের কথার ধরনে রাজেনবাবুর অক্কা পাওয়ার অবস্থা হয়। কোনোরকমে বলেন, “কী চান আপনারা?”

আজ্ঞে চাবি। সিন্দুকের চাবি।”

কোন সিন্দুকের।”

 হাতের বজ্র আঁটন আরও বাড়ায় নরেন। অবস্থাতেই বলে ওঠে, “কোনোরকম চালাকি করার চেষ্টা করবেন না। সিন্দুক এই ঘরে কটা আছে?”

ব্যাস, এতেই কাজ হয়। কলের পুতুলের মত টিকিটবাবু বলে ওঠেন, “আজ্ঞে এইখানে চাবি।” বসে বসেই কোমরে গোঁজা বটুয়াটা দেখানোর চেষ্টা করেন হালদার সাহেব।

নরেন বলে, “বাঃ খুব ভালো। ঠিক আছে চলুন। আপনি নিজের হাতে খুলে দেবেন।”

রাজেন হালদার কী মনে করে একবার পিছন ফিরে দেখবার চেষ্টা করেন। সঙ্গে সঙ্গে হুংকার দিয়ে ওঠে নরেন, “উহুহু পিছন ঘুরে তাকাবার চেষ্টা করলে খুলিখানা উড়িয়ে দিতে আমাদের এক মুহূর্ত সময় লাগবে না। কোনোরকম চালাকি না করে উঠে পড়ুন চেয়ার ছেড়ে। সামনের দিকে তাকাতে হবে এবং সোজা পায়ে এগিয়ে যেতে হবে সিন্দুকের দিকে। লেফট-রাইট যেভাবে করে ঠিক সেইভাবে।”

বলা বাহুল্য, নরেন স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর গোপন করে অন্য গলায় কথা বলার চেষ্টা করছিল।  যাই হোক, উপায়ন্তর না দেখে টিকিটবাবু উঠে পড়েন চেয়ার ছেড়ে। যে ভাবে বলা হয়েছে সেইভাবেই এগিয়ে যান। নরেন, শৈলর হাত থেকে ছোটো লাঠিটা নিয়ে মানুষটির কাঁধে চেপে ধরে থাকে আগের মতই। কাঁপা হাতে বটুয়া থেকে চাবি বার করে সিন্দুক খোলেন রাজেনবাবু। এরপর, যে ভাবে উঠে গিয়েছিলেন সেইভাবেই তাকে আবার নিজের জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়।          

উনি চেয়ারে বসার সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে সিন্দুকের দিকে এগিয়ে যায় সাতকড়ি।  কোমরে গোঁজা থলেটা বার করে।  দু’হাত দিয়ে রেলের খাজানা ভরে ফেলে তাতে। যত দ্রুত সম্ভব। তারপর যে নগদ টাকা নিয়ে হিসাব মেলাতে ব্যস্ত ছিলেন হালদার সাহেব, সেটুকুও নিমেষের মধ্যে হস্তগত করে থলেতে পুরে ফেলে। কাজ হয়ে গেলে শিস দিয়ে ইশারা করে অন্যদের।

 অবশেষে নরেনের বজ্র আঁটন থেকে মুক্তি পান বুকিং ক্লার্ক। কিন্তু তিনি পিছন ফিরে তাকালেই খুলি উড়িয়ে দেবার ভয় দেখানো হয় আবার। অগত্যা ঠুঁটো জগন্নাথের মত সামনের দিকে তাকিয়েই বসে থাকতে হয় মানুষটিকে। নরেনরা সবাই একে একে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। 

বাইরে বেরিয়ে ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি দিতে গিয়েও থমকে যায় ওরা। প্রাণভরে একবার চিৎকার করে ওঠার জন্য পাঁজরার ভিতরটা হাঁচরপাচড় করতে থাকে কিন্তু করে না। বুকের ভিতরে গুমরে ওটা আওয়াজটা জ্যোৎস্না ভেজা আধো অন্ধকারে মিশে যায়। দ্রুত পায়ে এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ করে জানকীকাকার কথাটা মনে পড়ে হরির, “তোমরা যা করেছ বেশ করেছ। ভারতমাতাই তো আমাদের আসল মা। আমাদের জগজ্জননী দুর্গা।”

এইদিকে নরেন ভাবে, আজকেই একবার গুনে দেখতে হবে কত টাকা পাওয়া গেল। এই টাকা দিয়ে কতগুলো মাউজার পিস্তল কেনা যাবে সেটাও দেখে নিতে হবে, আজ কালের মধ্যেই। একবার পিস্তল হাতে এসে গেলে, এই বৃটিশদের আর তাদের লালগাগড়িধারী পুলিশদের সে বুঝিয়ে ছাড়বে, কত ধানে কত চাল…। 

নরেনের পাশে এগিয়ে যেতে যেতে সাতকড়ি কেমন যেন একটা গন্ধ পায়। সেই কথা শৈলর কানে কানে বলতেই, তারও যেন একইরকম মনে হয়। প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে ওরা বুঝতে পারে, ওটা আসলে ধুপধুনো আর আলোর গন্ধ।  চোখের সামনে ওরা দেখতে পায় গাছপ্রদীপের কাঁপা কাঁপা শিখায়, দেবী মায়ের পটলচেরা সেই চোখ দু’টো। যে চোখ আরও বড়ো হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। এত বড়ো যে,  মনে হয় তাদের মাথার উপর দিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে দূরে, আরও দূরে। তারা আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে সেই চোখের ভিতর। কোদালে দিঘির গহীন জলে সাঁতার কাটতে কাটতে ঠিক যেমনটা মনে হয়।

——————————————————–

উপন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি বিষয়ের নিবেদন

এই কিশোর উপাখ্যান ইতিহাস আশ্রিত। যেসব মণিমুক্তা ইতিউতি ছড়িয়ে আছে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে, কিন্তু যাদের দীপ্তি এখনও সেইভাবে চোখ মেলে দেখা হয়নি আমাদের, সেগুলিকে যথাসাধ্য সংগ্রহ করে গাঁথা হয়েছে, একে একে।  প্রায় একশো কুড়ি বছর পূর্বের প্রেক্ষাপটে লিখিত এই উপন্যাস।  সেই সময়কার গ্রামীণ জীবন এবং রাজনীতির সঙ্গে বর্তমান গ্রামীণ জীবন এবং রাজনীতির বিস্তর ফারাক। প্রভূত তফাৎ রয়েছে দৈনন্দিন জীবনের নৃত্য ব্যবহার্য খুঁটি নাটি সামগ্রীগুলির মধ্যেও।  লেখার সময় সেই দিকে যথাসাধ্য খেয়াল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তৎসত্ত্বেও যদি কোথাও কোনোরূপ ত্রুটি কোথাও থেকে থাকে তা অবশ্যই সংশোধনীয়। 

বিভিন্ন সংগৃহীত তথ্যের উপর ভিত্তি করে এই উপন্যাস লিখিত।  কিন্তু সর্বদা আন্তরিক ভাবে চেষ্টা করা হয়েছে যে এটি একটি তথ্য নির্ভর প্রবন্ধ না হয়ে, একটি প্রকৃত কিশোর উপাখ্যান হয়ে উঠুক।  বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে, চারজন ছাত্রের ভিতরে কীভাবে গাঁথা হল স্বদেশপ্রেমের বীজ, এবং যা পরবর্তীতে পল্লবিত হল বাংলার প্রথম সফল (কারও কারও মতে ভারতবর্ষের) রাজনৈতিক ডাকাতিতে, সে রূপকথার গল্পই এই রচনায় মূল উপাদান।  

লিচুবাগানে ডাকাতি এবং নরেন্দ্রনাথ (এম এন রায়)-       

কিশোর বয়স থেকেই নরেন্দ্রনাথ প্রতিবেশী গরিব মানুষদের প্রতি একটা আন্তরিক সমবেদনা অনুভব করতেন। সোনারপুর-চাঙড়িপোতা অঞ্চলে দিগন্তব্যাপী ক্ষেতে অঢেল সোনার ফসল ফলত। অথচ সমস্ত ফসলই চালান হয়ে যেত কলকাতায়। নরেনের মনে প্রশ্ন জাগত যারা পরিশ্রম করে ফসল ফলালেন, সেই গ্রামের মানুষরা কেন ফসলের পর্যাপ্ত ভাগ পাবেন না। নরেনের গ্রামে লিচুও ফলত অঢেল। ধানের মত লিচুও রপ্তানি হয়ে যেত শহরে। একবার নরেনের নেতৃত্বে তার বন্ধুরা লিচুবাগান থেকে লিচু চুরি করে বিলিয়ে দিল গ্রামের মানুষের মধ্যে। গাঁয়ের লোকও সেইদিন, বিনা অপরাধবোধেই লিচুর স্বাদ নিলেন।

মানুষের জন্য দরদ তো ছিলই সেই সঙ্গে নেতৃত্ব দেবার দুর্লভ ক্ষমতাও সেই ছেলেবেলা থেকেই নরেন্দ্রনাথের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছিল।” {বিপ্লবী-দার্শনিক মানবেন্দ্রনাথ রায়-অপূর্ব দাশগুপ্ত ( ভূমিকা-শ্রীযুক্ত শিবনারায়ণ রায়)পৃষ্ঠা-১৮}

বঙ্গভঙ্গ এবং রাজপুর গাঁয়ে শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

১৯০৫ সাল।  বড়োলাট লর্ড কার্জন সিদ্ধান্ত নিলেন বঙ্গভঙ্গের। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের প্রবল বিরোধিতা করলেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, কৃষ্ণকুমার মিত্র এবং আরও অনেকে। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীপ্ত কণ্ঠ আগুন ছড়াল চতুর্দিকে। বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠল সারা বাংলা।

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের ঢেউ প্রবলভাবে প্রভাবিত করল বাংলার ছাত্র সমাজকে। আন্দোলনের আঁচ গিয়ে লাগল হরিনাভি অ্যাঙ্গলো সায়েন্সক্রিট স্কুলের গায়েও। ১৯০৪ সালে পাশ হল কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয় আইন। সরকার বাহাদুর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির রাশ নিয়ে নিলেন নিজের হাতে। বিদ্যালয়ের কোনও ছাত্র এমন কিছু করতে পারবে না, যা সরকারের চোখে সন্দেহজনক। কিন্তু নবীন রক্তকে কি অত সহজে বশ মানানো যায়!

জানা গেল, মহামতি সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় আসছেন রাজপুর গাঁয়ে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী সভা করতে। নরেন্দ্রনাথ, সাতকড়ি, শৈল এবং হরি এই চারজন জন ছাত্রই কিঞ্চিৎ ‘বেয়ারা’পৃথিবীর কোনও শক্তির সাধ্য কী তাদের আটকায়! বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বারংবার বারণ করলেও কথা কানে তোলেননি তাঁরা সেদিন।  সুরেন বাঁড়ুজ্জের সভার গিয়েছিলেন মিছিল করে। আর শুধু কি যাওয়া! বাঁড়ুজ্জের ফিটন গাড়ির ঘোড়া খুলে, নিজেরাই টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই ‘রথ’, সভাস্থলে। মুষ্টিবদ্ধ হাতগুলি উঠে গিয়েছিল আকাশের পানে। আওয়াজ উঠেছিল- বন্দে মাতরম।

ইতিহাস ঘাঁটলে যে তথ্য জানা যায় তাতে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে  যতগুলো উল্লেখযোগ্য সভা করেছিলেন সুরেন্দ্রনাথ, সেগুলির মধ্যে একটি হয়েছিল দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার রাজপুরে। এবং সেই সভায় যোগ দেবার অপরাধে পরের দিনই হরিনাভি স্কুল থেকে ‘রাস্টিকেট’ হয়েছিলেন নরেন্দ্রনাথ, সাতকড়ি, শৈল এবং হরি। চারজনের মধ্যে একমাত্র নরেন্দ্রনাথ ছাড়া আরও কারো পড়াশুনো হয়নি (তদানীন্তন বেঙ্গল টেকনিকাল ইন্সটিটিউট, অধুনা যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে নরেন্দ্রনাথ ওরফে এম এন রায় পড়াশুনো করেন পরবর্তীকালে)তবে দেশের জন্য জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য করে চলা সেদিনের সেই সব কিশোর-যুবাদের কাছে এই আত্মত্যাগ অভাবনীয় তো নয়ই বরং স্বাভাবিক।

[বিপ্লবী-দার্শনিক মানবেন্দ্রনাথ রায়-অপূর্ব দাশগুপ্ত (ভূমিকা-শ্রীযুক্ত শিবনারায়ণ রায়)সোনারপুরের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য- হরিলাল নাথ। এম এন রায় (পলিটিকাল বায়োগ্রাফি)-সমরেণ রায়। হরিনাভি স্কুল (ইতিহাসে স্মৃতিকথায় দেড়শো বছর)-(সম্পাদনা) অধ্যাপক শ্রীযুক্ত রাজকুমার চক্রবর্তী, শ্রীযুক্ত মির্জা রফিউদ্দিন বেগ এবং শ্রীযুক্ত সৌমিক বন্দ্যোপাধ্যায়]

শ্রীযুক্ত জানকীনাথ বসু এবং সুভাষচন্দ্র বসুর 
সঙ্গে বিপ্লবীদের যোগাযোগ- 

নেতাজি-জনকের সরাসরি প্রভাব তাঁদের উপর ছিল বলে লিখেছেন, স্বয়ং হরিকুমার চক্রবর্তী। যার সমর্থন পাওয়া যায় অন্যান্য বইতেও। প্রসঙ্গত আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, মাননীয় জানকীনাথ বোস এবং তার ভ্রাতা কেদারনাথ বোসও ছিলেন, হরিনাভি অ্যাঙলো সায়েন্সকৃট বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র ( ১৯২৩ সালে বিদ্যালয়ের বার্ষিক পারিতোষিক বিতরণী সভায় প্রাক্তন এবং উল্লেখযোগ্য ছাত্র হিসাবে বিশেষ অতিথি হয়ে এসেছিলেন জানকীনাথ। সঙ্গে ছিলেন পুত্র সুভাষ এবং শরৎ)  জানকীনাথের পৈত্রিক ভিটা কোদালিয়া গ্রামে (তদানীন্তন ‘কোদালে’)নিজে পেশাগত কারণে কটকে (কটকে জানকীনাথের যে বাড়ি,  তা অনেকটাই কোদালিয়ার পৈত্রিক বাড়ির আদলে তৈরি)  থাকলেও তিনি কেদারনাথের কাছ থেকে পৈত্রিকভিটা এবং তার আশেপাশে ঘটে চলা সমস্ত ঘটনা প্রবাহের খবরাখবর পেতেন। এই অঞলের বিপ্লবী এবং বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের প্রতি মানুষটি স্পষ্টতই ছিলেন সহানুভূতিশীল। কটকে থাকলেও বছর বছর শারদোৎসবের সময় কোদালিয়ার এসে সপরিবারে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে যেতেন। মূলত জানকীনাথের উদ্যোগেই পৈত্রিক বাড়িতে বেশ ধূমধাম করে দেবী মায়ের আরাধনা হত।  পুজোর সময় গাঁয়ের মানুষের সঙ্গে বহু সময় কাটাতেন জানকীনাথ। শ্রীযুক্ত হরিলাল নাথ এর ‘সোনারপুরের ইতিহাস ঐতিহ্য’ বইটি(মাহিনগরের বসু পরিবার। পৃষ্ঠা-১০৬)  এবং ক্ষেত্র সমীক্ষা থেকে এই তথ্যই উঠে আসে। 

ক্রমে, উপন্যাসে উল্লিখিত কিশোর বিপ্লবীদের সঙ্গে বন্ধন এতটাই দৃঢ় হয় যে, পরবর্তীকালে এটাও দেখা যায়, বিপ্লবী সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় পাঠাগার { পুরন্দর খাঁ স্মৃতি পাঠাগার-মালঞ্চ মাহিনগর। ২৪ পরগনা (দ)।}   প্রতিষ্ঠা করছেন এবং সেই পাঠাগারের জন্য জমি দান করছেন স্বয়ং জানকীনাথ বোস। সেই পাঠাগারের ফলকে আজও নেতাজি জনকের প্রতি সেই ঋণস্বীকার ভাস্বর হয়ে আছে।

প্রভাবতীদেবী তাঁর পরবর্তী জীবনের বেশ কিছুটা সময় কাটিয়েছেন কোদালিয়ায়। এবং শুধু তাই নয় শিকড়ের টানে স্বয়ং নেতাজি বারে বারে এসেছেন তাঁর পৈত্রিক ভিটায়। নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য (এম এন রায়), সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ ছিলেন তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ। কাজেই তাঁদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব নেতাজির উপর পড়াটাই স্বাভাবিক।  নিজের ক্ষেত্র বৃহত্তর থাকার দরুন,  যে বৈপ্লবিক ক্রিয়াকলাপ চলছিল তাঁর পৈত্রিক ভিটার চারপাশে, তাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে না পারলেও, সেখানকার বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে পরোক্ষ ইন্ধন যে যুগিয়েছিলেন তা বলা বাহুল্য। চাঙড়িপোতা গাঁয়ের নাম পরবর্তীকালে নেতাজির নাম অনুসারে হয়  ‘সুভাষগ্রাম’, এবং চাঙড়িপোতা স্টেশনের নাম হয় ‘সুভাষগ্রাম’ স্টেশন।  

 বাংলার প্রথম সফল রাজনৈতিক( চাঙড়িপোতা স্টেশনে) 'ডাকাতির' অভিঘাত 

 ১৯০৭ সালের ডিসেম্বর চাঙড়িপোতা স্টেশনে যে ঘটনা ঘটল তার মূল্য ইতিহাসের চোখে অপরিসীম। কত টাকা রেলের সিন্দুক ভেঙে লুট করা হয়েছিল এই নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও,  ১৯০৭ সালের ডিসেম্বর রেলের টাকা যে লুট হয়েছিল এই নিয়ে কোনও মতবিরোধ নেই।

{এই ঘটনাটিকে নিয়ে ‘চাঙড়িপোতা স্টেশনে ডাকাতি’ শীর্ষক দুই পর্বে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, স্টেটসম্যান পত্রিকার বাংলা সংস্করণে-১৬ এপ্রিল ২০০৮ এ (বাংলার প্রথম সফল রাজনৈতিক ডাকাতির ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে)} 

{গবেষক এবং স্থানীয় ক্ষেত্র সমীক্ষক, জয়ন্ত চক্রবর্তী তাঁর ‘চার পুণ্য ধাম গ্রাম’ নামক বইতে (পৃষ্ঠা-৬) এই প্রতিবেদনগুলির কথা উল্লেখ করেন এবং বিস্তারিত তুলে ধরার চেষ্টা করেন। কাহিনি নির্মাণের স্বার্থে কিছু ‘টেকনিক্যাল’ বিষয়ের যৎসামান্য পরিমার্জন করা হলেও ডাকাতির মূল বিষয়কে কোনও পরিবর্তন করা হয়নি।}

বলা বাহুল্য, ঘটনার অভিঘাত ছিল সুদূরপ্রসারী। এরপরই সারা বাংলা তথা দেশ জুড়ে শুরু হয়ে যায় স্বদেশী ‘ডাকাত’ দের দৌরাত্ম্য। দিশেহারা বৃটিশ শাসক যত বেশি দমন নীতি প্রয়োগ করতে শুরু করে, বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে পড়তে থাকে তত বেশি করে। গঠিত হয় একের পর এক গুপ্ত সমিতি। যা হয়ে ওঠে সশ্রস্ত সংগ্রামের আঁতুড় ঘর।

এই ঘটনায় শুধু যে রেলের ‘তিজোরি’  লুট হয় গেল তাই নয়, বড়োসর ঘা পড়ল বৃটিশ পুলিশ-প্রশাসনের আত্মবিশ্বাসেও।   দেখা গেল একটি স্পষ্ট জলবিভাজিকা। যার একদিকে থাকল আবেদন নিবেদনের রাজনীতি আর অন্যদিকে শাসকের চোখে চোখ রেখে লড়াই।

কয়েকটি দামাল ছেলের দুঃসাহসিক সেই ডাকাতিই এই উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য। চেষ্টা করা হয়েছে, এই উপন্যাসে ‘নায়ক’ যদি কাউকে করতেই হয়, তাহলে তা যেন হয়ে ওঠে  বংলার প্রথম সফল রাজনৈতিক ডাকাতির ঘটনাটিই। কোনও ব্যক্তি নন। 

[বিপ্লবী-দার্শনিক মানবেন্দ্রনাথ রায়-অপূর্ব দাশগুপ্ত (ভূমিকা-শ্রীযুক্ত শিবনারায়ণ রায়)সোনারপুরের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য- হরিলাল নাথ। এম এন রায় (পলিটিকাল বায়োগ্রাফি)-সমরেণ রায়।  মানবেন্দ্রনাথ (জীবন দর্শন) –স্বদেশরঞ্জন দাস।  ইন  ফ্রিডম্‌স্‌ কোয়েস্ট- লাইফ অফ এম এন রায় (প্রথম খণ্ড)-শিবনারায়ণ রায়।  চার পুণ্য ধাম গ্রামঃ-  জয়ন্ত চক্রবর্তী ]

ফুটবলের ইতিহাস 

উপন্যাসে, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে আরও এক ইতিহাস। বাঙালির ফুটবলের ইতিহাস। নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী যে খেলাটির বীজ বপন করেছিলেন বাঙালির মনে, তাই দিনেকালে ডালপালা বিস্তার করে মহীরুহ হয়ে ওঠে। শহর কলকাতার বুকে একে একে প্রতিষ্ঠিত হয় ওয়েলিংটন ক্লাব ( ১৮৮৪), টাউন ক্লাব (১৮৮৫), কুমারটুলি (১৮৮৫), মোহনবাগান (১৮৮৯) এবং মোহামেডান স্পোর্টিং ( ১৮৯১) ইত্যাদি। ১৮৮৮ সালে শুরু হয় ডুরান্ড কাপ।

ইণ্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (পরে হয়-অল ইণ্ডিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। ‘অল ইণ্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন’ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে অবধি পূর্বোক্ত সংস্থাটিই, বাংলা তথা সারা দেশের ফুটবল সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় নিয়ন্ত্রণ করত) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯৩ সালে।

১৯০০ সালের মধ্যেই শহর কলকাতা ছাড়িয়ে দূরদূরান্তের গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে থাকে ফুটবল। ধুতি মালকোঁচা মেরে নিয়ে গোলাকার বস্তুটি নিয়ে মাঠে নেমে পড়লেই হল। দেদার আনন্দ আর মজা। প্রথমে বাতাবি লেবু অথবা কাপড়ের মণ্ড (বেশ কিছু কাপড়ের টুকরো একসঙ্গে জড়ো করে দড়ি দিয়ে বেঁধে নেওয়া হত) দিয়ে কাজ চালানো হত। তারপর শহর থেকে আসে চামড়ার বল। বাঙালির জীবনে পরতে পরতে জড়িয়ে যেতে থাকে ফুটবল। ইংরেজদের দেশ থেকে আমদানিকৃত খেলাটি একসময় হয়ে ওঠে তাঁদেরই বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক হাতিয়ার। যার সম্পূর্ণ প্রকাশ আমরা দেখতে পাই ১৯১১ সালে। দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করল স্বদেশী খেলোয়াড়রা, দুর্ধর্ষ বৃটিশ দলের বিরুদ্ধে। জিতে নিল আই এফ শিল্ড। সেই জয়ও তো আসলে ছিল এক ‘মুক্তি’সেও এক স্বাধীনতা।

তবে সেই ‘মুক্তি’ সহজে আসেনি। এর পিছনে আছে দুই দশকের এক যাত্রাপথ। যে পথে হাঁটতে হাঁটতে স্বাধীনতা সংগ্রামের আঁচ নিজের গায়ে মেখে নিয়েছিল ফুটবলও। সেই যাত্রাপথেরই একটি অংশ ধরা হয়েছে এই উপাখ্যানে।

 আরও একটি কথা অবশ্যই সত্য যে, ফুটবল খেলাটি কলকাতা শহর ছাড়িয়ে গাঁয়ে গঞ্জে ঠিক কবে থেকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে তার সঠিক দিনপঞ্জি ইতিহাসে নেই। সেই ভাবে সন তারিখের উল্লেখ আদৌ থাকা সম্ভব কিনা, সে নিয়েও প্রশ্ন আছে। তবে, সোনারপুরের স্থানীয় ইতিহাস ঘেঁটে এবং অশীতিপর মানুষজনের ( তাঁরা জেনেছেন তাঁদের বাপ জেঠার কাছ থেকে। ) মধ্যে ক্ষেত্র সমীক্ষা চালিয়ে এই বিষয়টি জানা গেছে যে এইখানেও উণবিংশ শতাব্দীর একদম শেষ থেকেই ফুটবল খেলাটি একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এবং বিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুতেই বেশ প্রভাব বিস্তার করে। মাহিনগর কিম্বা চাঙড়িপোতা অঞল অতি বর্ধিষ্ণু। সেখানে একাধিক ‘ক্লাব’ আছে (এইগুলিকে এখন ‘ক্লাব’  বলা হলেও গোড়ার দিকে এইগুলি ছিল ‘সমিতি’ রূপে)  যেগুলি শতাব্দী প্রাচীন।

এক সমিতির সঙ্গে তখন আর এক সমিতির প্রতিদ্বন্ধিতামূলক খেলার চল হতেও আরম্ভ করে। মাহিনগর অঞ্চলে সমীক্ষা চালিয়ে এটিও জানা গেছে যে, সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় এবং নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ফুটবল খেলতে ভালোবাসতেন। তবে এর বেশি খুব কিছু আর জানা যায় না। তাঁদের অন্য বন্ধুরাও (তাঁদের যে বয়সের কথা উপন্যাসে ধরা হয়েছে) ওই বয়েসে খেলাধুলায় আগ্রহী হবেন, এটা ধরে নিয়েই এই উপন্যাস নির্মাণ করা হয়েছে। তবে সব সময় খেয়াল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে যে, ইতিহাস যাতে কোনোভাবেই বিকৃত না হয়।

কলকাতায় প্রথম কুস্তির আখড়া 

কুস্তির ইতিহাস ঘাঁটলে এই তথ্য পাওয়া যায় যে বিশ্ববরেণ্য কুস্তিগির গোবর গুহর পিতামহ ছিলেন অম্বিকাচরণ গুহ। অম্বিকাচরণের পিতামহের নাম ছিল আবার শ্রীযুক্ত শিবচরণ গুহ। এই শিবচরণ গুহই তদানীন্তন কলকাতার হোগলকুঁড়িয়ায় (অধুনা শোভাবাজার মসজিদবাড়ি স্ট্রিট), বঙ্গের প্রথম আধুনিক কুস্তির আখড়াটি স্থাপন করেন। সেইখানে বিভিন্ন সময়ে শরীর চর্চার জন্য নানা মনিষীর পদধূলি পড়েছে। এদের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দ যেমন ছিলেন সেরকমই আবার ছিলেন বাঘাযতীনও।      

 দেশাত্মবোধক গানের উল্লেখ   

যে সময় কালের কথা এই উপাখ্যানে ধরা হয়েছে সেই সময়, রজনীকান্ত সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এই তিন মহাকবির বেশ কিছু গানই সারা বাংলার বিপ্লবী মানসে ঝড় তুলেছে বা তোলার অপেক্ষায়। এইখানে সেইরকমই একখানি দেশাত্মবোধক রজনীকান্তের গান এবং একখানি দ্বিজেন্দ্রগীতি উল্লেখ করা হয়েছে।  

শ্রীযুক্ত কৃষ্ণধন ঘোষের বাড়ি (৩২ নং, মুরারীপুকুর রোড)

১৯০৬ সালে ‘যুগান্তর’ এর পথ চলা শুরু হলেও সংগঠনের সলতে পাকানোর কাজ শুরু হয়েছিল আগের থেকেই। ৩২ নং মুরারীপুকুরের রোডের বাড়িতে ( ইতিহাসখ্যাত এই ঠিকানা থেকেই ১৯০৮ এর রা মে,মজঃফরপুর বোমা বিস্ফোরণের দু’দিন পর, গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, শচীন সেন প্রমুখ)বাড়িটি ছিল বারীন্দ্র এবং অরবিন্দের পিতা ডাঃ কৃষ্ণধন ঘোষের (কলকাতায় অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের গোপন আস্তানাঃ- তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য। ৩২, মুরারীপুকুর রোড এবং মানিকতলা। পৃষ্ঠা-৩৫) পোড়ো এবং জঙ্গলাকীর্ণ এই বাড়ি বিপ্লবীরা তাঁদের কর্মস্থল রূপে ঠিক কবে থেকে ব্যবহার করতে শুরু করেন তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। তবে এই কথা অনুমান করা যায় যে,যুগান্তর ( ১৯০৬ সাল)  পত্রিকা প্রকাশ এবং দল তৈরির আগে থেকেই এই আস্তানা বিপ্লবীরা তাঁদের গোপন ডেরা হিসাবে ব্যবহার করে থাকবেন। যেহেতু বাড়িটি বারীন্দ্র কুমার ঘোষের পৈত্রিক সম্পত্তি।

বাঘাযতীনের সঙ্গে শ্রীযুক্ত বারীন্দ্র কুমার ঘোষের রিরোধ এবং এম এন রায় এর যোগসূত্র  

অনুশীলন সমিতি গঠিত হয় ১৯০২ সাল নাগাদ। বলা-বাহুল্য শ্রীযুক্ত প্রমথনাথ মিত্র এবং  সতীশচন্দ্র বসু ছাড়াও এই সমিতির অন্যতম প্রাণপুরুষ ছিলেন মাননীয় অরবিন্দ ঘোষ।  ১৯০৩ সাল নাগাদ অরবিন্দের সঙ্গে ( বৃটিশরাজ বনাম বাঘাজ্যোতিনঃ অমিত দেবনাথ। ১ম অধ্যায়। পৃষ্ঠা-১৮) বাঘাযতীনের যোগাযোগ হয়।

বাঘাযতীন ছিলেন অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতার অধিকারী। তরুণ বিপ্লবীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে শ্রীযুক্ত নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য (এম এন রায়)  বলেছেন- বিপ্লবীগোষ্ঠির প্রধান মানুষটিকে সেকালে ‘দাদা’ ডাকবার চল ছিল। অনেক ‘দাদা’নিজেকে মোহিনীশক্তির অধিকারী বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইতেন। কিন্তু সত্যিকারের মোহিনীশক্তি ছিল একমাত্র যতীনদাদার মধ্যেই (বিপ্লবী-দার্শনিক মানবেন্দ্রনাথ রায়ঃ অপূর্ব দাশগুপ্ত। ২য় অধ্যায়। পৃষ্ঠা-২৫)

এইদিকে, সময় অনুশীলন সমিতি ছাড়াও বাংলার আনাচে কানাচে গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক গুপ্ত সমিতি। যাদের মধ্যে কাজের পদ্ধতি নিয়ে পার্থক্য থাকলেও মূল লক্ষ্য ছিল একটিই। বৃটিশ উচ্ছেদ। এম এন রায় যে জনপ্রিয়তার কথা বলেছেন, তা কাজে লাগিয়েই বৃহত্তর সংগ্রামের জন্য বিপ্লবী সমিতিগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজ শুরু করেন বাঘাযতীন। অরবিন্দের সঙ্গে যুক্তি বুদ্ধি করেই তিনি তখন এই কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। বলা বাহুল্য, বৈপ্লবিক সংগঠনগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে তিনি বহুলাংশে সফলও হন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে যতীনের এই সাফল্যে স্বয়ং অরবিন্দ মুগ্ধ হয়ে বলেন, “He was my right-hand man.” (বৃটিশরাজ বনাম বাঘাজ্যোতিনঃ অমিত দেবনাথ। ১ম অধ্যায়। পৃষ্ঠা-১৮)

অনুশীলন সমিতির সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন অরবিন্দ ভ্রাতা বারীন্দ্র ঘোষও। ১৯০৬ সাল নাগাদ, অনুশীলন সমিতির উদ্দেশ্য এবং পরিচালন পদ্ধতি নিয়ে বারীন্দ্রর সঙ্গে মতবিরোধ ঘটে প্রমথনাথ মিত্রের (সহযোদ্ধাদের কলমে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের স্মৃতিকথা – সম্পাদনা: সৈকত নিয়োগী, সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত। ১ম অধ্যায়। পৃষ্ঠা-১১) এবং জন্ম হয় আর একটি বিপ্লবী সংগঠনের, যার নাম ‘যুগান্তর’প্রথমে পত্রিকা প্রকাশ দিয়ে পথ চলা শুরু হলেও, অব্যবহিত সময়ের মধ্যেই যুগান্তরের সদস্যরা স্বাধীনতা সংগ্রামের যাবতীয় কার্যকলাপে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েন। এবং অচিরেই ‘যুগান্তর’, সমগ্র বাংলার বিপ্লবী সমিতিগুলির মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠে। বাঘাযতীন থেকে শুরু করে এম এন রায়, প্রত্যেকেই এই দলের কর্মকাণ্ডের শরিক হয়ে পড়েন, কোনও না কোনও ভাবে।

কিন্তু এখানেও দলের কর্মপদ্ধতিকে কেন্দ্র করে নানা সমস্যার সূত্রপাত হতে শুরু করে, যার মূলে ছিল বাঘাযতীন এবং বারীন্দ্র কুমার ঘোষের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটি বেশ বড়োসড় ফারাক। ‘যুগান্তর’ এর জন্মলগ্ন থেকেই ( ১৯০৬ সাল) দুজনের এই মত বিরোধ ছিল (বিপ্লবী-দার্শনিক মানবেন্দ্রনাথ রায়ঃ অপূর্ব দাশগুপ্ত। ২য় অধ্যায়। পৃষ্ঠা-২৫)যার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ ক্রমে ‘যুগান্তর’ বিভিন্ন শাখা সংগঠনে ভেঙে যেতে থাকে এবং এর মধ্যে কিছু শাখা,  নিজেদের মত করে স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত হয়।  উচ্চ নেতৃত্ব এদের স্বীকার না করলেও এই বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলির কার্যকলাপকে কিন্তু কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় ছিল না।

বাঘাযতীনের মনোমুগ্ধকর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে যেসব তরুণ বিপ্লবী তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে নরেন্দ্রনাথ ওরফে এম এন রায়ও ছিলেন।

বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের পর, ১৯০৫ এর শেষের দিকে, নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য যোগ দেন অনুশীলন সমিতিতে (বিপ্লবী-দার্শনিক মানবেন্দ্রনাথ রায়ঃ অপূর্ব দাশগুপ্ত। ১ম অধ্যায়। পৃষ্ঠা-১৯)কিন্তু অনুশীলন সমিতির সঙ্গে তার সেই প্রত্যক্ষ যোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তিনি যুগান্তর এবং তার থেকেও বেশি করে বাঘাযতীনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে থাকেন।  

আমরা জানি, ১৯০৭ এর ডিসেম্বর তদানীন্তন চাঙড়িপোতা রেলস্টেশনে (বর্তমানে সুভাষগ্রাম) যে যুগান্তকারী ঘটনাটি ঘটেছিল তার ‘মাথা’ ছিলেন এম এন রায়। এর সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস ঘাঁটলে আরও যে তথ্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যে এই ঘটনার আগেই বাঘাযতীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায় এম এন রায়ের। সেক্ষেত্রে, এই কথা অবশ্যই স্বীকার্য যে এই ঘটনাটির নেপথ্যে স্বয়ং বাঘাযতীনের উপস্থিতি পুরোভাগে থাকাই স্বাভাবিক। যদিও তিনি নিজে তখন দার্জিলিংয়ের সংগঠনের কাজে ব্যস্ত। কিন্তু, যখন কলকাতায় আসতেন এখানকার সতীর্থদের কাজের খোঁজ খবর নিতেন এবং প্রয়োজনে যথেষ্ট বুদ্ধি-পরামর্শ দিতেন। এই কথা অনস্বীকার্য যে, এম এন রায় এত বড়ো একটি কাণ্ড তাঁর প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণাতেই ঘটিয়েছিলেন। এবং সেটিই স্বাভাবিক।   

ক্ষেত্র সমীক্ষা 

ক্ষেত্র সমীক্ষা করতে গেলে অনেক সময়ই প্রকৃত ঘটনার উপর কল্পনার রং চড়ানোর একটা প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু যতটা সম্ভব সেই কল্পনাকে ছেঁটে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যগুলিকে যতটা সম্ভব পুস্তক এবং স্থানীয় পত্র পত্রিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে।  পণ্ডিত দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ (বিদ্যাসাগরের প্রেরণায়) ‘সোমপ্রকাশ’ নামক সাপ্তাহিক পত্রিকাটির প্রকাশ শুরু করেন ১৮৫৮ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে। ‘সোমপ্রকাশ’ প্রকাশের কয়েক বছর বাদেই (১৮৬৬ সালে)  প্রতিষ্ঠা করেন ‘হরিনাভি ইংরাজি সংস্কৃত বিদ্যালয়’সমাজ সংস্কারক শ্রীযুক্ত দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ ছিলেন কর্মবীর। তাঁর কর্মযজ্ঞময় জীবন মানিক্যখচিত। তবে অনেক গবেষকই বলে থাকেন, নানা মানিকের মধ্যেও এই দুটি মহৎ কাজ আলাদা করে উল্লেখের দাবি রাখে।

বহুগুণীজন (মহামান্য শিবনাথ শাস্ত্রী থেকে শুরু করে বরেণ্য বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়) এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন বিভিন্ন সময়ে। বিপ্লবী ক্ষীরোদ দত্ত (সহযোদ্ধাদের কলমে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের স্মৃতিকথা-(সম্পাদনা) সৈকত নিয়োগী, সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত। ১ম অধ্যায়। পৃষ্ঠা-১২) লিখেছেন, ‘যুগান্তর’ পত্রিকাটির নামকরণ হয়েছিল এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্রীযুক্ত শিবনাথ শ্রাস্ত্রীর সামাজিক উপন্যাস ‘ যুগান্তর’ নাম অনুসারেই।

 হরিনাভি ইংরাজি সংস্কৃত বিদ্যালয়ের ছাত্র রূপে যাদের নাম অতীব উল্লেখযোগ্য তাঁদের মধ্যে আছেন, শ্রীযুক্ত জানকীনাথ বোস,  নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য (এম এন রায়), শ্রীযুক্ত সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়,  শ্রীযুক্ত সলিল চৌধুরি প্রমুখ। কাজেই, স্থানীয় অঞলের ইতিহাসের সঙ্গে এই বিদ্যালয়ের ইতিহাস শুধু যে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে তাই নয়, এই বিদ্যালয়ের ইতিহাস অনেক সময়ই হয়ে উঠেছে সংলগ্ন এলাকা তথা সমগ্র দক্ষিণ ২৪ পরগনার ইতিহাসের দিক নিয়ন্ত্রক। উপন্যাস লিখতে গিয়ে প্রায় ১৬০ বছরের পুরাতন বিদ্যালয়ের নথি (যতগুলি এখনও অক্ষত আছে) খতিয়ে দেখা হয়েছে।

এছাড়াও, বিশেষ ভাবে সাহায্য নেওয়া হয়েছে, ‘হরিনাভি স্কুল –ইতিহাসে স্মৃতিকথায় দেড়শো বছর’ এই বইটির। এই বইটির সম্পাদনা করেছেন, অধ্যাপক শ্রীযুক্ত রাজকুমার চক্রবর্তী,  শিক্ষক শ্রীযুক্ত মির্জা রফিউদ্দিন বেগ এবং শ্রীযুক্ত সৌমিক বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও এই উপন্যাসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ নেই, তাও ‘ক্রসচেক’ করার খাতিরে সাধ্যমত ঘেঁটে দেখা হয়েছে  রাজপুর-সোনারপুর (তদানীন্তন ‘রাজপুর’ পৌরসভা। যা স্থাপিত হয় ১৮৭৬ সালের ১লা এপ্রিল)  পৌরসভার নথিও।

ঋণ

> মানবেন্দ্রনাথ (জীবন দর্শন) –  স্বদেশরঞ্জন দাস।

> এম এন রায় (পলিটিকাল বায়োগ্রাফি)-  সমরেণ রায়।

> বিপ্লবী-দার্শনিক মানবেন্দ্রনাথ রায়ঃ-  অপূর্ব দাশগুপ্ত ( ভূমিকা-শ্রীযুক্ত শিবনারায়ণ রায়)

> চার পুণ্যধাম গ্রামঃ-  জয়ন্ত চক্রবর্তী।

> সোনারপুরের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যঃ- হরিলাল নাথ।

> স্মারকসংখ্যাঃ- পুরন্দর খাঁ স্মৃতি পাঠাগার (মাহিনগর)। 

> ইন ফ্রিডম’কোয়েস্টঃ লাইফ অফ এম এন রায় (প্রথম খণ্ড)-  শিবনারায়ণ রায়।

> হরিনাভি স্কুল (ইতিহাসে স্মৃতিকথায় দেড়শো বছর)-  (সম্পাদনা) অধ্যাপক শ্রীযুক্ত রাজকুমার চক্রবর্তী,  শ্রীযুক্ত মির্জা রফিউদ্দিন বেগ এবং শ্রীযুক্ত সৌমিক বন্দ্যোপাধ্যায়। 

> ফুটবলঃ নগেন্দ্র প্রসাদ এবং বাঙালির ফুটবল অভিযানঃ-  সৌমেন শূর

> সোনারপুর পত্রিকাঃ- ( সম্পাদনা ) অধ্যাপক জীবন মুখোপাধ্যায়

> কলকাতায় অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের গোপন আস্তানাঃ- তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য।

অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের সাংকেতিক ভাষা আইনজীবীরাঃ-তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য।

> সহযোদ্ধাদের কলমে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের স্মৃতিকথাঃ-   (সম্পাদনা ) সৈকত নিয়োগী, সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত।

> বৃটিশরাজ বনাম বাঘাজ্যোতিনঃ- অমিত দেবনাথ।

( বাঘাজ্যোতিনঃ এই বানানটিই লেখক ব্যবহার করেছেন। ) 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি, ‘মাহিনগর সাতকড়ি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়’ এর প্রধান শিক্ষকের কাছে। এছাড়াও, ক্ষেত্র সমীক্ষা করতে গিয়ে যে মানুষগুলির অকুণ্ঠ সহযোগিতা পেয়েছি, আলাদা করে ঋণ স্বীকার করি তাঁদের কাছেও।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস