
কানাডার চিঠি- পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব ৫ পর্ব ৬, পর্ব ৭, পর্ব-৮, পর্ব ৯, পর্ব ১০, পর্ব ১১
রকি বেয়ে গল্পেরা সব প্রেইরি জুড়ে নামে,
জুটিয়ে নিয়ে লিখছি চিঠি, মেপল পাতার খামে।
তা এ-দেশে এসে বিভারের ঘন লোমওলা চামড়া দেখে ইউরোপিয়ানদের চোখ তো লোভে চকচক করে উঠল। ও-জিনিসের ব্যাবসা যে চূড়ান্ত লাভজনক, তা বুঝতে ধুরন্ধর ব্যবসায়ীদের বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হল না। কিন্তু এমন ঘন জঙ্গুলে দেশ, তার ওপর বাঘাটে শীত। স্থানীয় লোকজন মানুষ হিসেবে ভালো হলেও, অন্য দেশের বাসিন্দারা এসে তাদের নানা ব্যাপারে নাক গলাবে, তা মোটেই পছন্দ করে না। সুতরাং শান্তিতে ব্যাবসাপত্তর চালাতে গেলে ফার্স্ট নেশনদের সঙ্গে সদ্ভাব রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। যদিও তখন ইউরোপিয়ানরা নিজেদের মধ্যে ফার্স্ট নেশনদের সম্বন্ধে অসভ্য বর্বর, নেটিভ বা এস্কিমো এই জাতীয় অপমানকর সম্বোধনই ব্যবহার করত, তবু ব্যাবসা বড়ো বালাই। তার ওপর আবার আনকোরা বিভারের লোমের থেকে পুরোনো, পরা, ঘষা খাওয়া বিভারের লোমের কদর বেশি। আসলে গায়ের ঘাম-তেল লেগে লোমের বাইরের দিকের কর্কশ আবরণ উঠে গেলে তবেই ভেতরের নরম আস্তরণ বেরিয়ে আসে। সেই নরম অংশটাই টুপি বানানোর কাজে লাগে। ফার্স্ট নেশনদের সঙ্গে মেলামেশা না বাড়ালে তেমন পুরোনো বিভারের লোম পাওয়া মুশকিল। আশেপাশের নদীনালার খবরও তারা অনেক ভালো জানে। তাই নিজেদের স্বার্থেই ইউরোপিয়ানরা ফার্স্ট নেশনদের সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব কমিয়ে এনেছিল। এ ব্যাপারে সবচেয়ে সফল হয়েছিল ফরাসি আর স্কটিশ সওদাগররা। ক্রি, ওজিবোয়ে, সলটো (সোটো) গোষ্ঠীর ফার্স্ট নেশনদের সঙ্গে এরা বৈবাহিক সম্পর্কও স্থাপন করতে শুরু করে। কারণ, ফার্স্ট নেশন মেয়েদের সাহায্য ছাড়া ব্যাবসা করা দুরূহ ব্যাপার। দুর্দম শীতের উপযোগী পোশাক তৈরি করা হোক বা বিভারের লোমের আঁশ ছাড়ানো— সব বিষয়েই মেয়েদের একটা বড়ো ভূমিকা ছিল। ক্রমে এই নতুন সামাজিক বন্ধন জন্ম দেয় নতুন জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি আর ধর্মীয় ভাবধারার। তৈরি হয় এক নতুন গোষ্ঠী, যার নাম মেটিস।
স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের অন্তর্গত হওয়ার ফলে দু-পক্ষই নিজের নিজের দেশের উপকথা, লোককথা ভাগ করে নিত। সময়ের প্রবাহে কখন যে সেসব উপকথা মিলেমিশে নতুন উপকথার জন্ম দিল, কেউ খেয়ালও করল না। পরের প্রজন্ম সেই ফিউশন-উপকথা শুনেই বড়ো হল; হয়তো ফার্স্ট নেশনদের আদি উপকথার বিশুদ্ধতা কিঞ্চিৎ ক্ষুণ্ণ হল এতে, তবু এই প্রভাব অবশ্যম্ভাবী, একে আটকানোর চেষ্টা করলে সেটা অর্থহীনই হত।
ক্রিদের উপকথার এক প্রিয় চরিত্রের কথা বলা যাক। উইসাকেচাক নামে এক ধড়িবাজ চরিত্রকে নিয়ে তাদের নানা গল্প। উইসাকেচাক বেজায় মতলববাজ, কিন্তু ক্ষতিকারক নয়। সে দিবারাত্র লোক ঠকানোর মতলব ভাঁজে, কিন্তু সেগুলো উলটে তাকেই বিপাকে ফেলে। এদিকে সে আবার বন্ধু হিসেবে অত্যন্ত বিশ্বস্ত, আবার বনের প্রাণীদের রক্ষকও। আসলে কমবয়েসিদের বেহিসাবি কাণ্ডকারখানার কুফল বোঝানোর উদ্দেশ্যেই এই চরিত্রের সৃষ্টি। কালক্রমে ফরাসি উপকথার রুগারু নামক চরিত্রের বৈশিষ্ট্যও উইসাকেচাকের ওপর বর্তাল। এই রুগারু একে নেকড়ে-মানব, তার ওপর ইচ্ছামতো নিজের রূপ পরিবর্তন করতে পারে। এসব গুণাগুণের অধিকারী হয়ে উইসাকেচাকের উপকথার আখেরে রসবৃদ্ধিই হল। উল্লেখ্য, রুগারুর কাহিনিও কিন্তু ধর্মীয় উৎসবের সময়ে কচিকাঁচারা যাতে উচ্ছৃঙ্খল না হয়ে পড়ে, সেই দিকে নজর রেখেই বানানো হয়েছিল।
মেটিসদের আর এক উপকথার নায়কের নাম চি-জিন বা টি-জিন। সেও বেজায় চতুর, দৈত্য-দানো হোক বা লোভী বণিকের দল— সবাইকে সে ঘোল খাওয়াতে ওস্তাদ। স্বয়ং শয়তানকেও এক হাত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে সে। এই চরিত্রটি কিন্তু আদতে ফরাসি, কিন্তু মেটিসরা তাকে সযত্নে প্রেইরির ঘাসজমিতে প্রতিস্থাপন করেছিল। ফরাসি আর স্কটিশ বণিকের দল ততদিনে কানাডাতেই স্থিত হয়েছে, তাই তাদের পরিচিত কাহিনির পটভূমির পরিবর্তনে তাদের আপত্তি করার বিন্দুমাত্র কারণ ছিল না। যেমন চিনদেশের নুডল কলকাত্তাইয়া মশলা মেখে মুখরোচক চাউমিন হয়ে ঘরে ঘরে বিনা বাধায় পৌঁছে গেছে, তেমনই।
ফার্স্ট নেশনদের জঙ্গলের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা থেকে মা-মা-কোয়া-সে-সাক নামের নানাধরনের স্পিরিট বা অশরীরী অস্তিত্বের জন্ম হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় পরি বা ব্রাউনিদের চঞ্চলতা আর দুষ্টুমির ছাপ পড়েছিল এদের ওপর।
বলা বাহুল্য, ইউরোপিয়ান ঔপনিবেশিকরা মূলত ক্যাথলিক ছিল। তাই তাদের উপকথায় শয়তান উপস্থিত থাকত হামেশাই। শুভ-অশুভের শিক্ষা দেওয়াই এসব কাহিনির মূল উদ্দেশ্য। ক্রি, ওজিবোয়ে, সলটোদের আদি উপকথায় তেমন কিছু না থাকলেও, মেটিসদের কাহিনিতে কিন্তু সুপুরুষ বা হিংস্র কালো কুকুরের ছদ্মবেশে শয়তান উপস্থিত হয়।
ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ওকানাগেন লেকের নহাহাইটকো-র কথা তো আগে বলেছি। স্বাভাবিকভাবেই এর ওপর স্কটিশ নেসির বিস্তর প্রভাব পড়েছে, যার ফলে অমন গম্ভীর নামটাও পরবর্তী সময়ে হয়ে দাঁড়িয়েছে ওগোপোগো। কানাডার ইউরোপীয় বা অন্য দেশের বাসিন্দাদের কাছে ওগোপোগোর চেহারাটা অনেকটাই কার্টুনে ব্যবহৃত চরিত্রের মতো হলেও, ফার্স্ট নেশনরা কিন্তু আজও তাকে যথাযোগ্য সম্মান দেয়। এমনকি ওগোপোগো নামের আরও আধুনিকীকরণ আটকাতে নামের স্বত্বাধিকার ওকানাগেন নেশন অ্যালায়েন্সকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। যতই হোক, ওগোপোগো হল কানাডার জলভাগের পবিত্র রক্ষক।
স্যাসকোয়াচ বা বিগফুটের ওপরেও ভিনদেশি প্রভাবের অভাব নেই। ইউরোপিয়ানদেরও নিজস্ব জঙ্গুলে বুড়ো আছে। ফার্স্ট নেশনদের স্যাসকোয়াচ অনেকটাই জঙ্গলের আত্মার সমতুল্য, হয়তো-বা সংখ্যায় একাধিক। এমনও হতে পারে, গভীর জঙ্গলে বসবাসকারী অন্য অচেনা কোনও গোষ্ঠীকে ওরা স্যাসকোয়াচ ভাবত। ফলে দানো নয়, ফার্স্ট নেশনদের কল্পনায় স্যাসকোয়াচের চেহারা বা প্রকৃতি অনেকটাই মানুষের মতো। ইউরোপীয় প্রভাবে কালক্রমে তা হয়ে দাঁড়াল লোমশ এক বনমানুষ—কিঞ্চিৎ উগ্র এবং ক্ষতিকারকও।
দীর্ঘ শীতকালের কঠোর জীবন এবং কখনো-কখনো শীতকালীন খাদ্যাভাব ফার্স্ট নেশনদের নিত্যসঙ্গী ছিল, এমন জীবন তাদের জন্মগত অভ্যাসের অংশ। কিন্তু প্রথম প্রথম এ সমস্ত কিছুই বিস্তর অসুবিধায় ফেলেছিল ইউরোপিয়ানদের। কখনও পথের দিশা না পেয়ে হারিয়ে যেত কেউ কেউ, অথবা উৎকট ঠান্ডায় জমে মৃত্যু হত কারও। শীতকালীন খাদ্যাভাব এ-দেশে খুবই সাধারণ ব্যাপার বলে মনে করা হত। ফার্স্ট নেশনদের নিয়ম অনুযায়ী, তেমন কঠিন সময় উপস্থিত হলে লোভ করতে নেই, যেটুকু জোটে সেটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। অ্যলগনকুইয়ানদের ওয়েন্ডিগোর কথা তো বলেছি, নিঃস্বার্থ থাকার শিক্ষা দেওয়ার জন্য তার সৃষ্টি। ফার্স্ট নেশনদের এই উপকথার চরিত্রগুলোর মধ্যে একটা আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ ছিল; প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় মেলবন্ধনের ভেতর প্রকাশ পেত সে আধ্যাত্মিকতা। কিন্তু ইউরোপিয়ানদের কাছে ওয়েন্ডিগোর মতো চরিত্রদের ভয়ানক দিকটাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। তাই তাদের চোখে ওয়েন্ডিগো হয়ে দাঁড়াল বুভুক্ষু ও নিষ্ঠুর, ক্ষমাহীন।
পশ্চিম কানাডায় যেমন মেটিস গোষ্ঠীর উৎপত্তি ঘটেছিল, উত্তরাঞ্চলে একইভাবে সামাজিক মিশ্রণ সম্ভব হয়েছিল স্ক্যান্ডিনেভিয়েন আর ইনুইটদের মধ্যে। এর ফলে সুমেরু অঞ্চলের জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গিয়েছিল পরির কল্পকাহিনি আর ক্রিশ্চান জীবনযাত্রার ভাবধারা। ইনুইটরা সমুদ্রমাতা নুলিয়াজুক বা সেডনাকে সমস্ত সামুদ্রিক প্রাণীর স্রষ্টা বলে বিশ্বাস করত। তিনি আবার ফার্স্ট নেশন আর ইনুইটদেরও মা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে শ্বেতাঙ্গরাও তাঁর সন্তান হিসেবে পরিগণিত হয়। এই কাহিনি ইনুইটদের নিজেদের বাসভূমিতে বহিরাগতদের অস্তিত্ব মেনে নিতে সাহায্য করেছিল। প্রাচীন মরেভিয়ান চার্চের মিশনারিদেরও আগমন ঘটেছিল তার মধ্যে। এর ফলে ইনুইটদের চিরাচরিত উপকথায় প্রবেশ ঘটল শয়তান আর দেবদূতদের। পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরকের কথাও বাদ গেল না।
তবে পশ্চিম কানাডার মতো এই অঞ্চলেও ইনুইট আর সেটলারদের মানসিকতার মধ্যে অনেকখানি বিভেদ ছিল। ইনুইটদের কাছে প্রাণী বা প্রকৃতির কোনোকিছুই মানুষের থেকে নিম্নস্তরের নয়, তাদের প্রত্যেকেরই আত্মা বা তাদের ভাষায় ‘ইনুয়া’ আছে। এমনকি শিকার করার সময়ও কোনও প্রাণীকে দমন করার মনোভাব যেন প্রকাশ না পায় সেইদিকে তাদের লক্ষ থাকত, আজও তাই থাকে। এটাই ইনুইটদের ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতা। এই মনোভাব ইউরোপিয়ানদেরও থাকবে, সেটা আশা করা চলে না। প্রকৃতিকে পোষ মানানোর মধ্যেই তাদের সার্থকতা। জঙ্গল, নদী, বিস্তীর্ণ তুষারাবৃত অঞ্চল জয় করে বসতি স্থাপন করাই তাদের লক্ষ্য ও ধর্ম। দুই বিপরীতমুখী সংস্কৃতি মিশে গেলে দু-পক্ষের উপকথাতেই যে তার প্রভাব পড়বে, তাতে আর আশ্চর্য কী। এই একই তফাত অবশ্য পাওয়া যায় ফার্স্ট নেশন আর মেটিসদের উপকথার মধ্যে।
যার যার প্রাচীন আলাদা উপকথা আর তাদের বৈশিষ্ট্যের অবশ্যম্ভাবী মিশ্রণ, এ তো গেল একটা দিক। মজার ব্যাপার হল, ইউরোপিয়ানরা কানাডায় আসার পর এ-দেশের আদি বাসিন্দারা আর সেটলাররা পরস্পরকে নিয়ে নানা গল্প বানিয়েছিল। ইনুইটদের কথাই ধরা যাক আগে। তাদের মধ্যে প্রচলিত এই জাতীয় প্রতিটি গল্পে দেখা যায়, তারা শান্তির পক্ষে আর ‘কালোনাক’ বা শ্বেতাঙ্গরা অশান্তি বাধাতে চাইছে এবং পরিণামে নিজেদের বিনাশ ডেকে আনছে। অপর পক্ষের গল্পগুলোয় ইনুইটদের ‘স্ক্রেলিংইয়ার’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই শব্দটার সঠিক মানে বর্তমানে হারিয়ে গেলেও অর্থটা যে খুব সম্মাননীয় কিছু নয়, এটুকু বোঝা যায়। এসব গল্পে ইনুইটদের বুনো জাতি হিসেবেই দেখা যায়; তারা লোহার ব্যবহার পর্যন্ত জানে না, কাঁচা মাংস খায়, তিমির দাঁত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ইত্যাদি ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, বর্তমান প্রজন্মের ইনুইটরা তাদের উপকথা সংরক্ষণ করে রাখতে রীতিমতো উৎসাহী। শুধু কাহিনি তো নয়, ইনুইট শিল্পকলার ওপরেও বিস্তর প্রভাব পড়েছিল ভিনদেশিদের।
বলা বাহুল্য, পূর্ব কানাডাতেও একই জিনিস ঘটেছিল। সেখানে মিগমাহ্, আবেনাকি, ম্যালাসিট উপকথার সঙ্গে মিশেছিল ফরাসি আর ব্রিটিশ কল্পকাহিনি। মিগমাহ্ মহিলাদের ওষধি গাছপালার সম্বন্ধে গভীর জ্ঞান ছিল। ফরাসি উদ্ভিদবিদদেরও প্রচুর উৎসাহ ছিল সে ব্যাপারে। ইউরোপীয় উদ্ভিদবিদ্যা আর মিগমাহদের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান মিশে নানা নতুন উপকথার জন্ম হয়েছিল। লা বেল মারির গল্প তেমনই এক কিংবদন্তি। ফরাসি মারি গ্র্যান্ডভিলের বাবা ছিলেন জাহাজের কাপ্তেন। তিনি সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়ার পর মারি মিগমাহদের সংস্পর্শে আসে। মিগমাহ্ যুবরাজ সোসেপকে ভালোবেসে বিয়ে করে মারি। সুখেই কাটছিল দিন, কিন্তু মিগমাহ্ মহিলাদের কাছ থেকে পাওয়া ওষধি গাছের নানা শিক্ষা কাজে লাগাতে গিয়েই মহা সমস্যাতে পড়ে মারি। গল্পের এইখানটাতে একটু মতভেদ আছে। কেউ বলে ফরাসিরা মিগমাহদের জ্ঞানের গভীরতা দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিল, কেউ বলে আসলে মিগমাহদেরই ব্যাপারটা পছন্দ হয়নি। মোট কথা, মারির নামে কুকথা রটে, সে নাকি ডাকিনীবিদ্যা জানে। মারিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মিগমাহদের একটা প্রাচীন পুথির ভেতর নাকি মারির শেষ দিনগুলোর আর বিচারের বিবরণ লেখা একটা পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়, কিন্তু ঐতিহাসিকরা সেটা ভুয়ো পাণ্ডুলিপি বলে বাতিল করেছেন।
পূর্ব কানাডার ফার্স্ট নেশনদের উপকথার আর এক প্রিয় চরিত্র গ্লুস্ক্যাপ। সৃষ্টির একেবারে আদিকালে তার আবির্ভাব ঘটেছিল। পৃথিবী তখন জলমগ্ন, মাটির চিহ্নমাত্র নেই। পাথরের ডিঙি চড়ে ভেসে এসেছিল গ্লুস্ক্যাপ। সেই ডিঙিই নাকি পরে নোভা স্কোশার কেপ ব্রেটন আইল্যান্ডে পরিণত হয়। যাই হোক, গ্লুস্ক্যাপ একে একে পাহাড়, উপত্যকা বানাতে থাকে। সেসব হয়ে গেলে সে জন্তুজানোয়ার বানানোতে মন দেয়। তার বানানো বিভারগুলোর আকার নাকি ভালুকের মতো ছিল। তারপর অ্যাশ গাছের কাঠ দিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর ফার্স্ট নেশনদের সৃষ্টি হয়। তবে তার এই সৃষ্টিকর্ম নির্ঝঞ্ঝাট ছিল না একেবারেই। এক ঝামেলাবাজ যমজ ভাই ছিল গ্লুস্ক্যাপের, সে সমানে তার কাজ পণ্ড করত। এই হয়তো নদীগুলোকে বাঁকিয়ে চুরিয়ে গোলমাল বাধাল, অথবা পাহাড়গুলোকে এমন দুর্গম করে ফেলল যে কেউ আর তা পেরোতে পারে না। গ্লুস্ক্যাপ অনেক চেষ্টার পর ভাইকে তাড়িয়ে শান্তি স্থাপন করল। তারপর জন্তুজানোয়ারদের শিকার করতে শেখানো, মানুষদের নৌকা বানানো, মাছ ধরার জাল বুনতে শেখানো—এসব দায়িত্বও সে গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছিল। তাছাড়া প্রকৃতি আর গুরুজনদের শ্রদ্ধা করার শিক্ষাও এসেছিল তার কাছ থেকে। অমিত শক্তিধর গ্লুস্ক্যাপ ইচ্ছামতো নিজের আকার বদলাতে পারত।
এটাই উপকথার আদি রূপ, অন্যান্য কাহিনির মতো এই উপকথাও গল্প বলার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ত এক প্রজন্ম থেকে অনেক প্রজন্মে। সেটলাররা এসে এসব গল্প শুনেছিল এবং নিজেদের সুবিধার্থে কিছু পরিবর্তন করে নিয়েছিল। যমজ ভাইয়ের সঙ্গে লড়াইটা ইউরোপীয় প্রভাবে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল ঈশ্বর আর শয়তানের চিরন্তন লড়াইতে। আগে বলেছি, রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। তাই সেই প্রজন্ম ইউরোপীয় সংস্করণটাই শিখেছিল বাধ্য হয়ে। আগের প্রজন্ম ততক্ষণে গ্লুস্ক্যাপের গল্পে একটা ছোট্ট সংযোজন করে নিয়েছে, সেখানে উপকথার শেষে ভিনদেশিদের আগমনে অসন্তুষ্ট ও বিচলিত গ্লুস্ক্যাপ অস্তগামী সূর্যের দিকে, অর্থাৎ পশ্চিমদিকে কোথাও উধাও হয়ে যায়।
এছাড়া পূর্ব কানাডার উপকথাতেও উইসাকেচাকের মতো ধড়িবাজ চতুর চরিত্র ছিল; তাদেরও বিবর্তন ঘটেছিল ইউরোপীয় প্রভাবে।
আবার নতুন দেশে, নতুন পরিবেশে এসে আনকোরা নতুন উপকথাও তৈরি হয়েছিল সেটলারদের মধ্যে। সে উপকথায় ফার্স্ট নেশনদের বিশ্বাস আর জীবনবোধের ছাপ পড়েছিল। যেমন নিউ ব্রানসউইক অঞ্চলের ডাঙ্গারভন হুপারের গল্প। ডাঙ্গারভন নদীর কাছে এক ইউরোপিয়ান ক্যাম্পে রায়ান নামে এক রাঁধুনি ছিল, তার কোমরের গেঁজেতে থাকত বিস্তর টাকাপয়সা। সেই লোভে তারই ক্যাম্পের লোকজন তাকে খুন করে। ঠিক সেই সময় তুষারঝড় শুরু হতে তার মৃতদেহ ঝটপট ডাঙ্গারভন নদীর পাড়ে পুঁতে দেয় খুনিরা। তারপর থেকেই নাকি ওই কবরে শুয়ে শুয়ে সে বিটকেল আর্তনাদ করে। তারপর বহুদিন কেটে গেছে। একবার নাকি ওঝা এনে ভূত ছাড়ানোর চেষ্টাও করা হয়েছিল, কোনও লাভ হয়নি। নদীর ধারের গাছের সারি, ডাঙ্গারভন নদীর জল আজও সেই অন্যায়ের কথা মনে রেখেছে। রায়ানের অতৃপ্ত আত্মা চিরদিন থেকে যাবে আর আর্তনাদ করে বেড়াবে। এমনিতে সাধারণ একটা ভূতের গল্প বলে মনে হলেও এর একটা বৈশিষ্ট্য কিন্তু আছে। ওই যে নদী আর তার পাড়ের গাছের সারির ওপর ব্যক্তিসত্তা আরোপ করা হয়েছে, তাদের স্মৃতি আছে মেনে নেওয়া হয়েছে, এখানেই ফার্স্ট নেশন জীবনবোধের ছাপ স্পষ্ট।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, কানাডার ডাকবিভাগের একটা ‘হন্টেড কানাডা’ সিরিজ আছে ডাকটিকিটের, সেখানে ডাঙ্গারভন হুপারের নামেও ডাকটিকিট বানানো হয়েছে। নীচে রইল সে ভূতুড়ে ডাকটিকিটের ছবি।

ফার্স্ট নেশনদের বর্তমান প্রজন্ম এই উপকথাদের সম্মান করে, তাই বনে জঙ্গলে পাহাড়ে নদীতে মিশে থাকা হাজারো কাহিনি যাতে হারিয়ে না যায় সেই ব্যাপারে তারা অত্যন্ত সচেতন। ভার্চুয়াল মিউজিয়াম অফ মেটিস হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচারের সংগ্রহে প্রায় চৌদ্দ হাজার অডিও ফাইল আছে। ফার্স্ট নেশন গল্পবুড়োদের বলা কিংবদন্তি আর উপকথা রেকর্ড করা আছে সেসব ফাইলে। তাছাড়া নিরন্তর নগরায়নের ফলে যাতে উইসাকেচাকরা হারিয়ে না যায়, তাই আজও ফার্স্ট নেশনরা তাদের যে-কোনো সামাজিক জমায়েতে গল্প বলা আর শোনার প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করে। হয়তো চায়ের কাপ হাতে বয়স্ক কোনও মেটিস শুরু করেন উইসাকেচাকের চিরন্তন গাথা। আজও চকচকে চোখে তাঁকে ঘিরে বসে কচিকাঁচার দল। আগুন-গরম পাথরের ওপর ঝলসাতে থাকা পাতলা করে কাটা এল্কের মাংসের গন্ধ ভেসে আসে নাকে। হয়তো দু-চারটে আধুনিক জীবনের ব্যাপার-স্যাপারও ঢুকে পড়ে, জায়গা করে নেয় উপকথার ভেতর।
কিংবদন্তির যে মৃত্যু হয় না কোনোদিন।
এ তো গেল গম্ভীর সব গল্প। বেশ মজার মজার বাজার বসে কিন্তু এখানে— ফ্লি মার্কেট, নাইট মার্কেট, ক্রিসমাস মার্কেট। সেসব বাজারের আশ্চর্য সব গল্প থাকে, নিয়ে আসব পরের পর্বে।
আজ তবে এখানেই ইতি। টা টা।