ধারাবাহিক অভিযান-খোটানের বালুসমাধিতে(এপিসোড ১৪)-অরেলস্টাইন-অনু-অরিন্দম দেবনাথ-বসন্ত’২৫

জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- ভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়)  অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

এই ধারাবাহিকের আগের পর্ব- পর্ব ১, পর্ব ২ পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব ৫ পর্ব ৬, পর্ব ৭, পর্ব ৮ পর্ব৯, পর্ব ১০, পর্ব ১১ পর্ব ১২, পর্ব ১৩, পর্ব ১৪

obhijjaankhotancover

স্যার অরেল স্টাইন ছিলেন একজন ব্রিটিশ পুরাতাত্ত্বিক। ১৮৬২ সালের ২৬ নভেম্বর তাঁর জন্ম হাঙ্গেরিতে। তিনি ব্রিটিশ সময়কালে নানা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি মধ্য এশিয়ায় একাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তিনি শুধু একজন প্রত্নতাত্ত্বিকই ছিলেন না, ছিলেন একজন নৃতাত্ত্বিক, ভূগোলবিদ, ভাষাবিদ এবং জরিপকারী। ডানহুয়াং গুহা থেকে উদ্ধারকরা পুথি এবং পাণ্ডুলিপির সংগ্রহ মধ্য এশিয়ার ইতিহাস এবং বৌদ্ধধর্মের শিল্প ও সাহিত্যের অধ্যয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর অভিযান এবং আবিষ্কারের উপর বেশ কিছু বই লিখেছিলেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাচীন খোটান, সেরিন্ডিয়া এবং আভ্যন্তরীণ এশিয়া বিষয়ক বই। সংস্কৃত থেকে রাজতরঙ্গিণীর ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন তিনি। চিরকুমার অরেল স্টাইন ১৯৪৩ সালের ২৬ অক্টোবর কাবুলে দেহত্যাগ করেছিলেন। এই নিবন্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে চলেছে তাঁর তাকলামাকান মরুভূমির প্রত্নতাত্ত্বিক খোটান অভিযানের কথা।

চতুর্দশ পর্ব

রওয়াকের অবশিষ্টাংশ

৩ জানুয়ারি ১৯০১।  দান্দান-উইলিকএ আমাদের অনুসন্ধানের কাজ শেষ হয়েছিল। ঠিক আগের সন্ধেতে কাশগর থেকে আমার জন্য এসে পৌঁছেছিল ছ’সপ্তাহ ধরে জমা করা এক ব্যাগ ভর্তি চিঠিপত্র। ইউরোপ থেকে ভারত হয়ে আসা চিঠিপত্রের তারিখ অক্টোবরের শুরুর দিকে। আমাকে সবচাইতে খুশি করেছিল ভারতীয় পররাষ্ট্র দফতরের একটি চিঠি। কলকাতা থেকে ন’মাস আগে রাশিয়ান তুর্কিস্থানের ভেতর দিয়ে ফেরার অনুমতি চেয়ে যে আবেদন করেছিলাম সেই আবেদন রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করেছে। তাঁবুর ভেতরে সারাদিন ব্যস্ত ছিলাম চিঠি ও রিপোর্ট লিখতে।  পাশাপাশি চলছিল লন্ডনে পাঠানোর জন্য রাখা ভঙ্গুর পুরাকীর্তির নিদর্শনগুলো নিরাপদে প্যাকিং হল কিনা তার দেখভাল।  আগে পাঠানো নির্দেশ মতো উটগুলো ফেরত নিয়ে আসা হয়েছিল দূরের নদীর ধার থেকে।  নদীপারের শীতের জঙ্গলে অল্প হলেও খাবার ছিল উটগুলোকে চাঙ্গা করে রাখার মতো।  রাম সিং সহ আমার দলের সমস্ত লোকদের মুখচোখ দেখে বুঝতে পারছিলাম এই ভূতুড়ে জায়গাটা ছেড়ে যেতে সবাই মুখিয়ে আছে।  কিন্তু যেই শুনল যে আমি তুর্দির সঙ্গে কাছাকাছি আরও কয়েকটি ধ্বংসাবশেষ দেখতে চাই, ওদের মুখ ব্যাজার হয়ে উঠেছিল।  তুর্দি বহুকাল আগে দান্দান-উইলিকএর উত্তরে ওই ধ্বংসাবশেষে খোঁড়াখুঁড়ি করেছিল গুপ্তধন পাবার আশায়।  ধন-সন্ধানীদের কাছে জায়গাটা রওয়াক (উঁচু প্রাসাদ) নামে পরিচিত।   

৪ তারিখ সকালে তাওয়াক্কেল থেকে আসা কিছু শ্রমিককে ফেরত পাঠিয়ে দিলাম, খুব ভালো কাজ করলেও এরা মানসিক ভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল মরুর একঘেয়েমিতে।  বাকিদের নিয়ে ৯ মাইল মতো উত্তরে হেঁটে পৌঁছেছিলাম রওয়াক।  চলার পথেই লক্ষ করেছিলাম বালিয়াড়ির উচ্চতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।  জায়গায় জায়গায় ভাঙা মাটির পাত্রের টুকরো ভর্তি, যা বলে দিচ্ছিল কোন একসময় এখানে বসতি ছিল।  আমরা মরা নদীর খাতের ধারে ক্যাম্প করব বলে ঠিক করেছিলাম।  আজ থেকে আঠারো দিন আগে কাসিমের দল এখানে ক্যাম্প করে কুয়ো খুঁড়ে জল পেয়েছিল।  কিন্তু সেই খোঁড়া কুয়ো থেকে আমরা আর জল বের করতে পারলাম না।  জল বরফ হয়ে বালির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।  তাই আমাদের আরও একটা কুয়ো খুঁড়তে হয়েছিল।  সেই কুয়ো থেকে সামান্য জল পেলেও তা ছিল ভীষণ বিস্বাদ।      

ন’বছর পর এলেও তুর্দি এখানকার কিছু ভোলেনি।  পরদিন তুর্দি আমাকে নিয়ে এল বিশাল বিশাল বালিয়াড়ির মাঝে।  বালি পাহাড়গুলো নেই নেই করেও ফুট ষাটেক উঁচু।  বালি পাহাড়ের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে নানাবিধ বস্তুর টুকরো।  রোদে শুকানো ইটের দুটো ঢিবি কাছাকাছি পড়ে।  সম্ভবত কোন ছোটো স্তূপ ছিল এখানে।  খোঁড়াখুঁড়ি যে এখানে বারবার হয়েছে তার ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে আছে।  যেখানে সেখানে খোঁড়াখুঁড়ির ফলে জায়গাটা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।  মাপামাপি করে দেখলাম বড়ো স্তূপটির ভিত প্রায় ৩২ ফুট ব্যাসের। মাটির পাত্র আর ভাঙা কাচের টুকরো ঢিবির চারপাশে ছিটিয়ে।  তার মধ্যেই নজরে এসেছিল একটি শক্ত স্টাকোর টুকরো।  তুর্দি পাকা চোখে ভালো করে সেটা নেড়েচেড়ে দেখে বলে দিল স্টাকোর ওপর রয়েছে পাতলা সোনার পাত।  সম্ভবত স্টাকোটি ছিল সোনার পাতে মোড়া কোন মূর্তির অংশ।  

পড়ে থাকা মাটির পাত্রের নীচের অল্প বালি খুঁড়তেই বেরিয়ে এসেছিল হান আমলের চিনা মুদ্রা। এখানে বালিয়াড়িগুলো এতো উঁচু যে তার তলা থেকে কাঠের বাড়ির পুরো ধ্বংসাবশেষ খুঁড়ে বার করা প্রায় অসম্ভব।  একটা ফুট পঁচিশ উঁচু বালির টিলার মাথা থেকে কাঠের খুঁটির সামান্য অংশ বেরিয়ে ছিল।  একটু খুঁড়তেই দেখা গিয়েছিল যে প্রায় পুরো কাঠামোটাই পচে গেছে।  কোনরকমে একটা ঘরের অংশ পরিষ্কার করতে পাওয়া গিয়েছিল দুটো কাঠের আয়তাকার তক্তা যার একপাশে জড়ানো হাতের লেখায় ব্রাহ্মী লিপিতে কিছু লেখা।  তক্তার পেছনে একটি অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া মাটির শিলমোহর আটকে ছিল।     

এখানে পাওয়া হান মুদ্রা আর অনান্য কিছু চিহ্ন দেখে মনে হয় রওয়াক, দান্দান-উইলিকএর আগেই পরিত্যক্ত হয়েছিল।  কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত  না তাকলামাকানের বিভিন্ন অংশে বালিটিলার অবস্থান পরিবর্তন ও দক্ষিণের দিকে মরু-বালির অগ্রাসন নিয়ে বিশদ পদ্ধতিগত বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা হয় ততক্ষণ এই বিষয়ে কোন স্থায়ী সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না।  শুধু তাই নয় এই ধরণের সমীক্ষা হলেও যা তথ্য পাওয়া যাবে তা থেকে প্রাচীনকালে একের পর এক মরু বসতি ফাঁকা হয়ে যাবার সঠিক কারন বের করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ আছে।  

কেরিয়ার পথে

রওয়াকে অল্প বিস্তর সমীক্ষা চালিয়ে আমরা রওয়ানা হলাম মূল ধ্বংসাবশেষের উদ্দেশ্যে যার জন্য প্রায় একমাস আগে খোটান ছেড়েছি।  ৬ জানুয়ারি তাওয়াক্কেল থেকে আসা শ্রমিকদের যে অবশিষ্ট ক’জন দলে ছিল তাদেরও পাওনা গন্ডা মিটিয়ে ছেড়ে দিয়ে চল শুরু করেছিলাম কেরিয়ার পথে।  খুশি মনেই আমাদের বিদায় জানিয়েছিল তাওয়াক্কেলের শ্রমিকরা।   প্রত্যাশা মতোই অর্থ প্রাপ্তি হয়েছিল ওদের।   বিষণ্ণ মরু থেকে নিজের ঘরে ফিরে যেতে মুখিয়ে ছিল ওরা।  ছেড়ে যাওয়ার আগে ওরা আমার ‘মেল ব্যাগ’ আর খোটানের আম্বানকে সবরকম সহযোগিতা করার জন্য ধন্যবাদ জানানো চিঠি সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল।  খোটানের আম্বানের সক্রিয় সাহায্য ছাড়া দান্দান-উইলিকে অভিযান চালান সম্ভব হত না।   

বালির টিলাগুলো থেকে যত দূরে সরে যাচ্ছিলাম ততই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল।  তিন সপ্তাহকাল এদের মাঝে ছিলাম।  বিগত হাজার বছর ধরে নিঃসঙ্গ নিস্তব্ধ জায়গাটা কত ইতিহাস কত স্মৃতি বালির তলায় সঙ্গোপনে আঁকড়ে রেখেছে।  সম্ভবত পরিত্যক্ত হবার পর কেউ আমার মতো করে ওকে উল্টেপাল্টে দেখেনি – বিরক্ত করেনি হাজার বছর ধরে।  এই জায়গার বিশুদ্ধ বাতাস, নির্মম ঠান্ডা আর অস্বস্তিকর শান্তি আমৃত্যু মনে থাকবে।    

সকাল থেকেই দিনটা মেঘলা ছিল।  এগারটা নাগাদ আমাদের ক্যারাভ্যান রওয়ানা হবার পরপরই উত্তর-পূর্ব দিক থেকে জোরাল বাতাস বইতে শুরু করছিল।  রওয়াক থেকে মাইল দুয়েক যাবার পর বালির টিলার মাঝে অল্প মাটির দেখা পেয়েছিলাম।  জায়গাটা ভর্তি ছিল ভাঙা মাটির পাত্র, কাঁচের টুকরো ইত্যাদিতে।  জীবনের সব চিহ্ন মাটির তলায় চাপা পরে থাকলেও শুকনো গাছের শেকড় আর গুঁড়ি মাথা উঁচিয়ে ছিল বালির তলা থেকে।  গত কয়েক সপ্তাহে এই অঞ্চলের মরুর বুকে এই রকম বহু মৃত প্রানের চিহ্ন দেখেছি।  ঝোড়ো বাতাসে বালি মিশে।  খানিক বাদেই ধূসর কুয়াশায় ছেয়ে গিয়েছিল চারপাশ।  আগে আগে যাওয়া গাইড কাসিম আর তুর্দির পায়ের ছাপ মুছে যেতে বসেছিল উড়ন্ত বালিতে।  তাই ছোটো হয়ে যাওয়া দলটাকে যতটা সম্ভব একসঙ্গে নিয়ে এগোবার চেষ্টা করছিলাম, যাতে মরুর বুকে কেউ না পথ হারিয়ে ফেলে।  যত পূবের দিকে এগোচ্ছিলাম ততই দু’পাশের বালি পাহাড়ের উচ্চতা বাড়ছিল।  আমি টের পাচ্ছিলাম যে পথ দিয়ে আগে উটগুলো নদীর ধারে গিয়ে ফিরে ফিরে এসেছিল তার উত্তরদিকে জল পাবার সম্ভাবনা নিয়ে তুর্দির আশঙ্কা ঠিক হতে চলেছে।   এক বিশাল বালি পাহাড়ের পাদদেশে রাত কাটানোর জন্য আমরা তাঁবু খাটিয়েছিলাম।  কিন্তু সেখানে একফোঁটাও জল ছিল না।  কিছু শুকনো তামারিস্ক  গাছের শেকড় বাকড়ের দেখা পেলেও এমন কোন চিহ্ন বালির বুকে পাইনি যেখানে খুঁড়লে জল পাওয়া যেতে পারে।  এই শেকড়গুলো রাতের শীত কাটানোর জ্বালানী হয়েছিল আর সঙ্গের ছোটো জলের ট্যাঙ্কের খানিক জল, জল না বলে বরফ বলাই ভালো, আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছিল।  এই জল আমরা বইছিলাম দান্দান-উইলিক থেকে।  

প্রথমে ভেবেছিলাম সাব-সার্ভেয়ারের করা মানচিত্র অনুযায়ী পূব দিকে এগিয়ে নদীর ধারে সব চাইতে কাছের জায়গা ‘গরীব-চাকমা’ যাব।  কিন্তু পুবদিক দিয়ে পথ সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে যদি বালি খুঁড়ে জল না পাওয়া যায় তাহলে ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়তে হবে ভেবে মত বদলে দখিন-পূবে চলতে শুরু করলাম।  কারন আগে ওই পথ দিয়েই কাশিম উট নিয়ে নদীর ধারে পৌঁছেছিল।

রাতে জোরাল বাতাস বওয়া বন্ধ হওয়ায় দিনের আলোয় কুয়াশাও মরে গিয়েছিল।  যে বালির টিলাগুলো পার হতে হচ্ছিল তার প্রতিটির উচ্চতা ৩০ থেকে ৫০ ফুটের মধ্যে।  এই টিলাগুলোর মধ্যে দিয়েই তিনটে ‘দাওয়ান’ (বালি পাহাড়ের মাঝের গিরিপথ) চলে গেছে দক্ষিণ থেকে উত্তরে।   দুপাশের ছোটো টিলা ছাড়িয়ে পেছনের যে টিলাগুলো দেখা যাচ্ছিল তা দেড়শ ফুটেরও বেশি উচু।  প্রায় এগারো মাইল মরুপথ পার হয়ে তিন নম্বর দাওয়ানের মাথায় পৌঁছে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়েছিলাম।  দূরে, বহুদুরে জীবন্ত তামারিক্স গাছের বন দেখা যাচ্ছে।  কাসিম দেখেই বলে দিল ওখানে বালি খুঁড়লে জল পাওয়া যাবেই।  ওর কথা সত্যি হয়েছিল।  ছ’ফুট মতো গর্ত খোঁড়ার পর জল পাওয়া গিয়েছিল।  যদিও প্রথম দু’ফুটের মাটি জমে বরফ-মাটি হয়ে ছিল।  জল, স্বাদে নোনতা হলেও জল।  সঙ্গে জল না থাকার মতো থাকায়, গতকাল ভয়ে জল প্রায় খাইনি। জমিয়ে রেখেছিলাম জরুরি অবস্থার জন্য।  জল পেতেই উটগুলো চোঁ চোঁ করে টানতে শুরু করেছিল, দীর্ঘ পথ ভারী বোঝা টেনে আনার পর ওদের জল দরকার ছিল। রাতের তাপমাত্রা ছিল ৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস)।  

পরদিন খুব ভোরে রওয়ানা দিয়েছিলাম আমরা।  সবাই চাইছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নদীর কাছে পৌঁছতে।  দু’মাইল মতো এগোনোর পর কাসিমের অভিজ্ঞ চোখ উড়ন্ত বালিতে ঢেকে যাওয়া তার আগের পদচিহ্ন ঠিক খুঁজে পেয়েছিল।   এপথ ধরেই নদীর ধার থেকে কাসিমের দল দান্দান-উইলিক পৌঁছেছিল।  সেই পদচিহ্ন ধরে খানিক এগোতেই পাওয়া গিয়েছিল কিছুদিন আগে খুঁড়ে যাওয়া কাসিমের কুয়ো।  

চারটে দাওয়ান পার হতে হয়েছিল।  বালি গিরিপথগুলো ছিল ২০ থেকে ৩০ ফুট চওড়া।  চার নম্বর দাওয়ানের মাথায় ওঠার পর নজরে এসেছিল দূরে বহুদূরে গাছের সারির কালচে আঁকাবাঁকা রেখা।  নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম কেরিয়া দারিয়ার কাছে পৌঁছে গিয়েছি।  আরও চার মাইল মতো পথ ছোটো ছোটো বালির টিলার মধ্যে দিয়ে হেঁটে পৌঁছেছিলাম তামারিস্ক গাছের বনে।  কুমুশ ঘাসে ভরে ছিল অঞ্চলটা।  বালির শেষ টিলাটা পার হবার পর নজরে এসেছিল নদীর বুকে চকচকে বরফ।   প্রায় চোদ্দ মাইল বালির মধ্যে দিয়ে টানা হেঁটে এসে আমি বরফ হয়ে যাওয়া নদীর পারে বসতে পেরে হাঁফ ছেড়েছিলাম।  কাসিম এগিয়ে গিয়েছিল সেই পনিগুলোকে খুঁজতে যেগুলো সাব সার্ভেয়ারের দল মরুতে প্রবেশের আগে এখানে ছেড়ে গিয়েছিল।   

বুরহানুদ্দীন মাজার

আধঘণ্টা পরে কাসিম ফিরে আসে ‘ইব্রাহিম’ নামের এক দারোগাকে নিয়ে।  কেরিয়ার আম্বান ওকে পাঠিয়েছে আমাদের পথ দেখিয়ে নিরাপদে কেরিয়া শহরে নিয়ে যাবার জন্য।   নদীর ধারে পপলার গাছের তলায় আগুন জ্বালিয়ে সবকটা উট না আসা পর্যন্ত চুপ করে বসে ছিলাম।  রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে ওঠার আগেই উটগুলো সব পৌঁছে গিয়েছিল।  মাস খানেকের ওপর ধরে শুধু হলুদ বালি দেখতে দেখতে ক্লান্ত চোখ দুটো শরতে পাতা ঝরে যাওয়া গাছের ফাঁক দিয়ে দূরের বরফ ঢাকা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থেকে খুব তৃপ্তি পেয়েছিল।  

পরদিন সকালে কাসিম একজনকে সাথী করে খোটান দারিয়ার দিকে রওয়ানা দিল আর বাকীদের নিয়ে আমি চললাম কেরিয়ার দিকে।  বেশ কিছুদিন পর আবার ঘোড়ার পিঠে চাপতে পেরে খুব আনন্দ হচ্ছিল।  পথের পাশের নদী জমে বরফ হয়ে আছে।  কেরিয়া নদী এখানে ষাট থেকে দেড়শ গজ চওড়া।  বাঁকেতেই বেশি বিস্তৃতি।  নদীর বাম পারের মাইল খানেক চওড়া খাগড়ার জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আমরা এগোচ্ছিলাম।  জঙ্গলের শেষে শুরু হয়েছে বালির সাম্রাজ্য।  নদীর ডানদিকে প্রায় শ’তিনেক ফুট উঁচু বালি পাহাড়ের শিরা চলছে নদীর কোল ঘেঁষে।  এই শৈলশিরা ‘কিজিল-কুম’ (রেড স্যান্ডস) নামে পরিচিত।  নদীর দুপারেই প্রচুর উইলো আর পপলার গাছ।

চলার পথে বেশ কিছু মেষপালকের কুঁড়ে দেখলেও কারো দেখা পাইনি।  কাঠের কাঠামোর চারপাশে মাটির দেওয়াল বেশ শক্তপোক্ত।  প্রায় ষোল মাইল যাওয়ার পর প্রথম মানুষের দেখা পেয়েছিলাম সৈয়দ বুরহানুদ্দিন পাদশাহিমের মাজারে পৌঁছে।  এটাই রাতের ডেরা।  এই মাজার খোটান আর কেরিয়া জেলার লোকেদের কাছে খুব জনপ্রিয় তীর্থস্থান।  পাঁচ জন ‘শেখ’ এখানে উপস্থিত এই মাজারের দেখভাল করার জন্য।  যদিও এই পাঁচজনের কেউই আমাকে সৈয়দ বুরহানুদ্দিন পাদশাহিম সম্পর্কে কিছু বলতে পারেনি।  শুধু বলতে পেরেছিল সৈয়দ বুরহানুদ্দিন পাদশাহিম, ইমাম জাফর সাদিকের সঙ্গে কোনওভাবে যুক্ত ছিলেন।  নিয়া নদী পাহাড় থেকে নেমে যেখানে মরুভূমিতে মিশেছে সেই মরুতীর্থ ছিল ইমাম জাফর সাদিকের উপাসনা স্থল।

প্রতি বছর শয়ে শয়ে তীর্থযাত্রী সামলানো শেখরা ভালোই জানে কী করে অতিথি সেবা করতে হয়।  সাধুর সমাধির পাশে পরিপাটি করে কার্পেট দিয়ে সাজানো ‘ফায়ার-প্লেস’ওয়ালা একটি ঘর আমার জন্য তৈরি ছিল।  আমার লাগেজ এসে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল, বসে বসে ভাবছিলাম সেই সাধু-সন্তদের কথা যাঁরা নির্জন দুর্গম মরুর বুকে একের পর এক তীর্থের নামে আশ্রয়স্থল গড়ে তুলেছিলেন।  গড়ে তুলেছিলেন বসতি।  এই রকম নিঃসঙ্গ চারণভূমিতে ঘুরে বেড়ান রাখালরাও উপকৃত হয় এই মাজারে আসা তীর্থযাত্রীদের সান্নিধ্য পেয়ে।  জানতে পারে বাইরের জগত সম্পর্কে।  হতে পারে দান্দান-উইলিক যে বৌদ্ধ মন্দিরগুলো আবিষ্কার করেছি সেটাও এই রকম কোন তীর্থস্থানের নামে মরুর বুকে আশ্রয়স্থল ছিল।    

তিনদিন লেগেছিল মাজার থেকে কেরিয়া পৌঁছতে।  নদীর ধারের পথ যাত্রা শুরুর প্রথম থেকেই প্রায় এক।  প্রতিদিন বেশ কিছু করে মেষ পালকদের ফাঁকা কুঁড়ে দেখছি।  সম্ভবত প্রতিবছর নদী জমে বরফ হয়ে যাওয়ার আগেই ওরা এই জায়গা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায়।  যদিও যত এগিয়েছি তত বেশি করে সবুজের দেখা পেয়েছি।  যেখানে নদীর পলি পৌঁছয় না সেখানে বড়ো গাছ কমে গিয়ে বালির বুক আঁকড়ে রেখেছে কুমুশ আর তামারিস্ক।  কেরিয়া পৌঁছনোর আগে জঙ্গলের মাঝে বুলাক এবং চোগলমাতে আমরা ক্যাম্প করেছিলাম।  সারা পথে মানুষের বসতির সেরকম কোন চিহ্ন নজরে আসেনি।  আমাদের পথপ্রদর্শক  দারোগা ইব্রাহিম খুব ভালো করেই জানত কোথায় ক্যাম্প করা উচিত।  ফলে জ্বালানীর অভাব আমাদের হয়নি।  প্রতিদিন কুয়াশা আর সূর্যের আলোহীনতার বিপরীতে মরুর ঝকঝকে দিনগুলো মনে পরে যাচ্ছিল।  

কেরিয়ায় স্বাগত

১২ জানুয়ারি দুপুর নাগাদ পৌঁছেছিলাম বিশাল এক জলাভূমির মাঝের গ্রাম বোস্তান ল্যাঙ্গারে।  জলাভূমি থেকে অসংখ্য ছোটো ছোটো জলের ধারা বেরিয়েছে।  পুরো জলাভূমিটাই জমে শক্ত হয়ে আছে।  কাজেই এঁকে বেঁকে চলার প্রয়োজন হচ্ছিল না।  এখানেই দেখা হয়েছিল আফগান ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ খানের সঙ্গে।  প্রায় পনেরো বছর আগে কেরিয়াতে এসে ডেরা বেঁধেছিল সে।  সুদর্শন বৃদ্ধটি ‘সাহেব’-এর সেবা করার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল।  দুর্ভাগ্যবশত কোন এক অসুখ তার জিভে জড়তার জন্ম দেয়, ফলে কথা বলতে তার সমস্যা হয়।  না বলে বলে আবদুল্লাহ খান ফারসি ভুলে গিয়েছিল।  তুর্কিও ভালো শিখে উঠতে পারেনি, আর হিন্দুস্থানি এতই কম শুনেছে যে তাতে কথোপকথনে অসুবিধাই হয়।  আমার পুস্ত ভাযাজ্ঞান আবার এতই কম যে তা দিয়ে সে মাতৃভাষা ঠিক বলছে না ভুল তা বিচার করা সম্ভব নয়।  তবে আমার কথামতো কেরিয়াতে আমার থাকার ব্যবস্থা সে ঠিকঠাক করেছিল।  

খানিক পরেই ‘সরকারি সুরক্ষা’ দেবার জন্য চিনা অফিসিয়াল পোশাকে লোকজন নিয়ে হাজির হয়েছিল স্থানীয় বেগ।  সবার পরনে ছিল পশমের ঘের দেওয়া ‘খিতাই’ টুপি সহ ‘চাপ্পান’ নামের লম্বা ঝুল-ওয়ালা কোট।  একজনের মাথার লাল বোতাম দেওয়া কালো অফিশিয়াল সিল্কের টুপির ওপর থেকে বারবার ‘খিতাই’ পিছলে পড়ে গিয়ে বেচারা ঠান্ডায় কষ্ট পাচ্ছিল বলে বেগ তাকে অফিসিয়াল টুপি খুলে সরাসরি ‘খিতাই’ পরার অনুমতি দিয়েছিল।  আমাকে তাদের ভাষায় কাজ চালানো গোছের কথা বলতে শুনে বেজায় খুশি হয়েছিল বেগ।  ঘোড়ায় চেপে শহরের দিকে চলতে চলতে গপ্পো হয়েছিল প্রচুর এবং অবশ্যই শিষ্টাচার বজায় রেখে।

বোস্তান ল্যাঙ্গার থেকে মাইল চারেক চলার পর পৌঁছেছিলাম কেরিয়া মরূদ্যানের আবাদি অঞ্চলে।  সেচ খালের পাস দিয়ে পথের দুপাশে পপলার গাছের সার।  – তুর্কিস্থানের মরূদ্যানের পরিচিত দৃশ্য।  মরুভূমির নির্জনতায় মাস খানেক কাটানোর পর এই দৃশ্য মেজাজটাকে খুশি করে দিয়েছিল।  আমার ছোট্ট টেরিয়ার কুকুর ‘ইওলচি বেগ,’  এতদিন পর স্বজাতিদের দেখে বেজায় উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিল।  গ্রামের বড়ো চেহারার কুকুরদের থেকে ওকে সামলে রাখতে হচ্ছিল।  পরপর কিছু মাটির ঘর দেখতে পেয়ে বুঝতে গিয়েছিলাম আমরা শহরে উপকণ্ঠে পৌঁছে গিয়েছি।  

আবদুল্লাহ খান বাজার থেকে বেশ খানিকটা দূরে আমার জন্য একটা ভিলার ব্যবস্থা করে রেখেছিল।  ভিলাটা ওর এক আত্মীয়ের।  ভিলাটা বেশ বড়ো আর খোলামেলা।   অনেকগুলো ছোটো ঘর আর একটা বড়ো হলঘর পার হয়ে পৌঁছেছিলাম আমার জন্য নির্দিষ্ট ঘরে।  ঘরের চালের কাছে একটা ছোটো ঘুলঘুলি ছাড়া আর কিছু নেই,  এক কোনায় একটা চিমনি দেওয়া ফায়ার-প্লেস।  এই মরসুমে এই ঘর সবচাইতে আরামদায়ক।  আমার লাগেজ এসে পৌঁছনোর আগেই উপহার নিয়ে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হয়েছিল আম্বানের ব্যাক্তিগত সহকারী তথা দোভাষী।  উপহারগুলো সব কাজের ছিল।  যেমন জ্বালানী কাঠ, পোনি আর উটদের জন্য পশুখাদ্য, আমার খাওয়ার জন্য ভেড়া আর মুরগী এইরকম সব।  উপহার বিনিময় করার মতো আমার কাছে কিছু ছিল না।  উপহারের ধরণ দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম আম্বান আমাকে সবরকম সাহায্যের জন্য প্রস্তুত।  আমি পাল্টা কোন উপহার না পাঠালেও উনি কিছুই মনে করবেন না।  আমি আমার অন্তরের কৃতজ্ঞতা দোভাষীকে ঠিকমতো বোঝাতে পেরেছিলাম।  দোভাষী জানিয়েছিল আগামীকাল আম্বানের সঙ্গে আমার দেখা হবে।   

পরদিন দুপুর একটা নাগাদ ইয়াঙ্গি শাহর বাজার হয়ে আম্বান হুয়াং-দালোইের ইয়ামেনে পৌঁছেছিলাম।  আমি ইয়ামেনের গেটের সামনে পৌঁছতে তিনটে ‘গান-স্যালুট’ গর্জে উঠেছিল।  বুঝে গিয়েছিলাম আম্বান আমাকে উচ্চস্তরের অভ্যর্থনা জানাতে চান।  কেরিয়ার ইয়ামেন, খোটান, ইয়ারকান্দ ও কার্গালিকের মতো একই ধাঁচের।  গেট থেকে শুরু করে অভ্যর্থনা কক্ষের টেবিল এবং আসনগুলির অবস্থান প্রায় একই রকম।  

বছর পঁয়তাল্লিশের আম্বান হুয়াং-দালোইকে দেখতে খানিকটা রাগী মনে হলেও ভীষণ রসিক, ভালো স্বভাবের ও প্রাণচঞ্চল মানুষ বলে আমার মনে হয়েছে।  উনি চিনা সিল্কের পোশাকের ওপর সুন্দর সুতোর কাজ করা একটি হলুদ রঙের পেটিকোট পরে ছিলেন।  তার ওপর চাপানো ছিল সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি করা রাষ্ট্রীয় জ্যাকেট।   আমাদের দুজনের বসার আসনের মাঝের টেবিল ভর্তি ছিল নানা ধরণের মিষ্টি, আর ইয়োরোপিয় ওয়াইন গ্লাস ভরে ছিল মদ।  যদিও চিনে সরকারী  আলোচনায় চা পরিবেশনই রীতি।  সম্ভবত ইউরোপিয় অতিথিকে খুশি করতেই এই ব্যবস্থা।  

আমার দোভাষী নিয়াজ আখুনের খোটান থেকে পোনি নিয়ে এসে পৌঁছনোর কথা থাকলেও এখনও এসে পৌঁছতে পারেনি।  তবুও কাজ চালানোর মতো কথোপকথন দিব্যি চলেছিল।  দান্দান-উইলিকে যা যা পাওয়া গিয়েছিল তার সবই ওনাকে জানিয়েছিলাম।  বলেছিলাম হিউয়েন-সিয়াং এই অঞ্চলের বৌদ্ধ-ধর্ম বা মন্দিরের অবস্থান নিয়ে যা যা বলেছেন তার অধিকাংশই মিলে যাচ্ছে।  যদিও আম্বানের চিনা দোভাষীর বৌদ্ধ-ধর্ম নিয়ে খুব বেশি কিছু জানা না থাকায় এই নিয়ে কথাবার্তা হোঁচট খাচ্ছিল পদে পদে।  আমি নিয়া নদীর উত্তরে  হিউয়েন-সিয়াং বর্নিত নি-জাং নামের জায়গায় যেতে চাই শুনে উনি সঙ্গেসঙ্গে সব ব্যবস্থা করে দেবার হুকুম দিয়েছিলেন।  আমার ধন্যবাদ দেবার ভঙ্গী ওনার এতোই ভালো লেগেছিল যে সঙ্গে সঙ্গে উনি তা ব্যক্ত করেছিলেন।  আমি ইয়ামেন থেকে বেরিয়ে আসার সময় উনি আমার পাশে হেঁটে মেন গেট পর্যন্ত এসেছিলেন, আর ওনার সমস্ত কর্মচারীরা পরিষ্কার পোশাক পরে দুপাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।   

আমি ইয়ামেন ছাড়ার খানিক পরপরই খবর এসেছিল যে শিষ্টাচার মেনে আম্বান ফিরতি-দেখা করতে আসছেন এক্ষুনি।  আমি পড়িমরি করে ছুটেছিলাম আমার ছোট্ট ভিলাতে আম্বানের জন্য  অন্তত চায়ের ব্যবস্থাটুকু করতে।   আমার ক্যাম্প টেবিলটা ঢাকা দেবার মতো কোন কাপড় ছিল না।  চিনাদের কাছে সাদা হল শোকের রঙ।  বাজার খুঁজে একটা লাল কাপড় আনতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে ভেবে আমার কম্বলটাই চাপিয়ে দিয়েছিলাম টেবিল ক্লথ হিসেবে।  খানিক আগেই রাজকীয় অভ্যর্থনা পেয়ে এসেছি তার উত্তরে ইউরোপীয় শিষ্টাচারের খুবই করুন অবস্থা।  কিন্তু  হুয়াং-দালোইকে একবারের জন্যও শিষ্টাচার নিয়ে ভাবিত মনে হয়নি।  উনি আমার ভ্রমণ সংক্রান্ত বইপত্র, স্ট্যানিস্লাস জুলিয়ানের হিউয়েন-সিয়াং-এর সংস্করণ, দান্দান-উইলিক থেকে নিয়ে আসা পুরাতাত্ত্বিক নমুনা আগ্রহের সঙ্গে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন।    

কেরিয়ায় মোট তিনদিন থাকব বলে ঠিক করে রেখেছিলাম।  কিন্তু খোটান থেকে পোনির দল সহ কিছু লোকজন এসে না পৌঁছতে আরও দুদিন বেশি থাকতে হয়েছিল।  অবশ্য রাম সিং সহ সবাই এতদিন মরুভূমিতে কাটিয়ে আসার পর এতে খুশিই হয়েছিল।  এই বাড়তি দিনগুলো আমার চিঠিপত্র আর হিসেব লিখতে কেটে গিয়েছিল।  লেখালিখি নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিলাম যে দিনে একঘণ্টা সময়ও বের করতে পারিনি শহরে ঘোরাঘুরির জন্য।  গত চারদিন ধরেই কেরিয়াতে বেদম ঠান্ডা।  ১৪ আর ১৫ জানুয়ারি তুষারপাত হয়েছিল।  কয়েক ইঞ্চি বরফে ঢেকে গিয়েছিল মাঠঘাট।  আগুন জ্বালিয়ে তার পাশে বসে কাজ করতে ভালোই লাগছিল।  কিন্তু ঘরে কোন জানালা না থাকায় ঘরের অন্ধকারে অস্বস্তি লাগছিল।  কি আর করা খোটান সহ এখানকার সব মরুদ্যানেই শীত আটকাতে ঘরের সব জানালা বন্ধ করে শুধু ছাদের কাছের এক ফোঁকর দিয়ে হাওয়া-বাতাস চলচলা করানোই এখানকার পদ্ধতি।   

আবদুল্লাহ খান সহ কেউই উৎসাহিত করার মতো পুরাতত্ত্বের খোঁজ দিতে পারেনি।  কেরিয়ায় খোটানের মতো বাজার নেই, তাই ধন-শিকারির দল এখানে গড়ে ওঠেনি।  কিন্তু এখানে পৌঁছেই নিয়া নদীর উত্তরে এক ধ্বংসস্তূপের কথা কানে এসেছিল, তাই সে-দিকে আগে যাব বলে ঠিক করে নিয়েছিলাম।  আবদুল্লাহ নামে কেরিয়ার এক সম্পন্ন চাষী বলেছিল বছর দশেক আগে ইমাম জাফর সাদিকের মাজারের থেকে দিন কয়েক হাঁটাপথ দূরত্বে বালির মধ্যে থেকে কিছু ভাঙা বাড়িঘরের কাঠামো সে দেখেছিল।  কেরিয়ার আরও কয়েকজন এই প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষের কথা জানে বলে নিশ্চিত হয়েছিলাম।  আমার পোনিদের আশায় আর বসে না থেকে আম্বানের ঠিক করে দেওয়া পোনি আর উট নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয়েছিল।  এ এমন এক জায়গা যেখানে না আছে টেলিগ্রাফ না সত্যিকারের পোস্ট অফিস।  বিলম্বকে এখানকার মানুষ সহজভাবে নিতে শিখেছে।      

  ওভরাজ হয়ে নিয়ার পথে

কয়েকদিন মেঘলা আকাশের পর ১৮ জানুয়ারি কেরিয়া থেকে রওয়ানা দেবার সময় রোদ ঝলমলে দিনের শুরুটা ভালোই হয়েছিল।  কয়েকদিন বিশ্রাম নেবার কুঁড়েমিতে যাত্রা শুরু করতে দেরি হয়ে গিয়েছিল।  দেরির ফলে পুরনো কেরিয়ার অর্ধেক লোক আমাদের ক্যারাভানের শহর ছেড়ে যাবার দৃশ্য দেখার সুযোগ পেয়েছিল।  লম্বা গাছের ডাল, বাড়ির ছাদ যে যেখানে পেরেছিল উঠে বসেছিল।  আম্বান নিজে এসেছিলেন আমাকে বিদায় জানাতে।  তিনি শুধু কেরিয়ার নন সাময়িক ভাবে নিয়ার ও শাসক।   

সিকি মাইল চওড়া শুকনো নদী পেরিয়ে বেশ-তোঘরাক এবং ঘাডঘং গ্রাম ছাড়িয়ে মাইল দুয়েক যাবার পর আবার পৌঁছেছিলাম মরুর উপকণ্ঠে।  সেখান থেকে বালি আর নুড়ির ওপর দিয়ে দক্ষিণ দিকে হাঁটতে হাঁটতে উপস্থিত হয়েছিলাম সটান উঠে যাওয়া পাহাড়ের প্রাচীরের নীচে।  এটি পোলুর উত্তরে কুয়েন-লুয়েন পর্বতমালার বাইরের অংশ।  এই পাহাড় সাধারণত ভ্রমণকারীদের চোখের আড়ালেই থেকে যায় সর্বক্ষণ কুয়াশার মোড়কে ঢেকে থাকায়।  সাম্প্রতিক তুষারপাতে সব পাহাড়গুলোই সাদা বরফের চাদরে ঢেকে ছিল।  ফলে মরুর বিপরীতে অতি মনোরম দেখাচ্ছিল।  পোলু ছাড়িয়ে ২১০০০ ফুটের চূড়াগুলোর হালকা আভাষ পাওয়া যাচ্ছিল।    

সন্ধে নাগাদ পৌঁছেছিলাম উই-তোঘরাক নামের এক মরুদ্যানে।  গাছের নীচের ছায়ায় জমে আছে বরফ।  সারাদিন সূচ ফোটানো ঠান্ডায় কাটিয়ে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে আমার জন্য প্রস্তুত আশ্রয়ে ঢুকে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।  মাটির দেওয়াল হলেও ঘরের ভেতরটা রঙিন পুরু খোটানি কার্পেটে মোড়া।  শীত মোকাবিলা করার জন্য একেবারে আদর্শ।  সন্ধেবেলা থেকে আকাশ মেঘে ঢেকে যাওয়ায় তারা দেখে অক্ষাংশ নির্ণয় সম্ভব হয়নি।   

১৯ জানুয়ারি সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি তুমুল তুষারপাত চলছে।  গাছপালা সহ সব তুষারে ঢেকে যাওয়ায় একদম ইউরোপের মতো লাগছিল।  আটটার সময় তাপমাত্রা মেপে দেখি ৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-১২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস)।  যদিও আমাদের ক্যারাভান রওয়ানা হবার সময় তুষারপাত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সারাটা দিন আশপাশ মেঘে ঢেকে ছিল।  নুড়ি ভরা মাটিতে হাঁটতে হাঁটতে বাঁদিকে উত্তরের দিকে চলে যাওয়া বিশাল বিশাল বালি পাহাড়ের ঢাল হালকা বোঝা যাচ্ছিল।  প্রায় ষোল মাইল মতো হেঁটে একটা চওড়া শুকনো নদী খাত পার হয়ে  ইয়েসুলঘুন নামের এক ছোট্ট মরুদ্যানে পৌঁছেছিলাম।  ডজন খানেক মাটির ঘর আছে এখানে নিয়া আর সুরঘাকে সোনা খুঁজতে আসা ভ্রমণকারীদের অস্থায়ী বাসস্থান হিসেবে।  কিন্তু গ্রীষ্মে চাষবাস করে যা সামান্য ফসল উৎপন্ন হয় তা দিয়ে এখানকার বাসিন্দাদের নিজেদের খাবার জুটিয়ে অতিথি সামলানো সম্ভব হয় না, তাই ভ্রমণকারীদের নিজের রেশন সঙ্গে করে নিয়ে আসতে হয়।

গ্রামের লোকেরা জল সংগ্রহ করে এক গভীর কুয়ো থেকে।  একটিমাত্র কুয়ো থেকে জল পাওয়ায়  গ্রামের গঠন বদলে গিয়েছে।  সাধারণত তুর্কিস্থানের গ্রামের বাড়িগুলো মাঠ বা বাগানের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গড়ে ওঠে।  কিন্তু ইয়েসুলঘুনের বাড়িগুলো কুয়োকে ঘিরে গোল হয়ে গড়ে উঠেছে।  আর তাকে ঘিরে গোল করে লাগানো পপলার গাছের সার জায়গাটাকে একটা আলাদা চেহারা  দিয়েছে।     

রাতে মেঘ পরিষ্কার হয়ে গেলেও সকালে তাপমাত্র ছিল -১ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-১৮ সেলসিয়াস)।  দক্ষিণ দিকের পাহাড়গুলো আবার দেখা যাচ্ছিল।  সামনেই সুরঘাকের স্বর্ণ উপত্যকা।  এগারো মাইল নুড়ি-পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে পৌঁছেছিলাম ওভরাজ ল্যাঙ্গার।  কয়েকটি মাটির ঘর এখানে ভাড়া খাটায় এক ‘ল্যাঙ্গারচি। ’ এখানে থাকার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু পথপ্রদর্শক  ‘দারোগার’ কথা মেনে নিতে হয়েছিল।  নিয়া এখান থেকে আরও চব্বিশ মাইল পথ, যা উটগুলো একদিনে পার হতে পারবে না।   আর এই দূরত্বের মাঝে জল বা থাকার জায়গা নেই।   উই-তোঘরাক থেকে আমরা সঙ্গে করে বরফ নিয়ে এসেছিলাম, কাজেই জলের সমস্যা ওভরাজ ল্যাঙ্গারে হয়নি।  মাটির ঘরগুলো ছিল খুবই নীচু, ফায়ারপ্লেস থেকে বের হওয়া ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, তবুও তাঁবুর জায়গায় এই ঘরে থাকার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল পূব দিকে থেকে প্রবল গতিতে হাওয়া বওয়ায়।   

পরদিন সকালে ওভরাজ ল্যাঙ্গার থেকে  যাত্রা শুরু আগেই পোনি আর আমার জন্য একগুচ্ছ চিঠি-পত্র নিয়ে এসে পৌঁছেছিল নিয়াজ আখুন।  আমার বাড়ি থেকে চিঠিগুলো এসেছিল রাশিয়ার ফারগানা – কাশগর হয়ে চাইনিজ পোস্টের মাধ্যমে।  তার মধ্যে একটা ছিল ভাইয়ের পাঠানো চিঠি – ৭ ডিসেম্বর তারিখের।  অন্য চিঠিগুলো এসেছিল গিলগিট হয়ে – সব চাইতে শেষের তারিখ ছিল অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ।  অস্বীকার করার উপায় নেই ট্রান্স-কাস্পিয়ান রেলের সুবাদে ইউরোপের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার দূরত্ব অনেক কমে গেছে।  যদিও আমার মনে হয়েছে ভারতীয় পোস্ট অফিস থেকে হুঞ্জা হয়ে আসা ডাক ব্যবস্থা অনেক নিরাপদ।  

ওভরাজ ল্যাঙ্গার থেকে পুরো চব্বিশ মাইল পথ আমাদের যেতে হয়েছিল পাথর ভরা ঢাল বেয়ে।  পাহাড়ের দক্ষিণ অংশ থেকে বৃষ্টির জলের তোড়ে নেমে আসা পাথর, স্তূপ হয়ে জমে।  সঙ্গে মরু থেকে উড়ে আসা বালিতে ইতিউতি গড়ে উঠেছে বালি পাহাড়। নিয়া মরূদ্যানের কাছাকাছি পৌঁছনোর আগে পর্যন্ত সবুজের চিহ্নমাত্র ছিল না। তামারিস্ক আর কুমুশ ঝাড়ের দেখা পেতে বুঝে গিয়েছিলাম গন্তব্য এসে গেছে। অনেকগুলো ছোটো ছোটো গ্রাম নিয়ে নিয়া মরূদ্যান।  সুরঘাক উপত্যকা থেকে বেরিয়ে আসা নদীর ধারে ধারে গড়ে উঠেছে গ্রামগুলো।  বিকেল তিনটের পর কাং-সারিঘের কৃষিক্ষেত্রের পাশে পৌঁছই।  সেখান থেকে আরও মাইল দুয়েক চলার পর নিয়ার বাজারে পৌঁছলে স্থানীয় বেগের সহকারী আমাকে স্বাগত জানায়।  বাজারের কাছে এই ব্যবসায়ীর বাড়িতে আমার জন্য থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।   দিনটি ছিল নিয়ার সাপ্তাহিক বাজারের।  অন্ধকার ঘনিয়ে এলেও বাজারের সরু গলিতে ব্যবসায়ীরা ব্যস্ত ছিল শুকনো ফল, কিশমিশ, চা, মশলা নিয়ে।  স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত চমৎকার আখরোট আর তাজা আঙুর ছিল বাজার ভর্তি।  রমজানের সমাপ্তি শেষে সমাগত ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে সরগরম পুরো চত্বর।

আমার সঙ্গের লোকেরা রমজান পালন না করলেও ঈদ ভালোভাবে পালন করতে চেয়ে ২২ জানুয়ারি এখানে থেকে যেতে চেয়েছিল, আমি ওদের অনুরোধ ফেলতে পারিনি।  এতদিন মরুতে থাকার পর আবার একটা মরু যাত্রার আগে এটা ওদের প্রাপ্য।  তাছাড়া মরুতে প্রবেশের আগে শ্রমিক সহ খাবার দাবারও সংগ্রহ করতে হবে।  উৎসবের আমেজে থাকা নিয়ার মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের সুর আমার ঘর থেকে ভালোভাবে শোনা যাচ্ছিল।  আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম ভারত ও বাড়িতে পাঠানোর জন্য চিঠি লেখার পাশাপাশি দিনটা স্থানীয় মানুষদের ছবি তুলে কাটাব।   বাচ্চা থেকে বুড়ো – ছবির বিষয়বস্তুর অভাব ছিল না।  খানিক মিষ্টি হাতে তুলে দিতেই সুন্দর পোশাক পরা বাচ্চারা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল।  সুঠাম চেহারার পুরুষ কিম্বা রঙ-বেরঙের তাপ্পি মারা জোব্বা পরা ভিখিরি কেউই ক্যামেরার সামনে থেকে সরে দাঁড়ায়নি।  স্থানীয়দের চেহারা খোটানবাসীদের মতোই ককেশিয়ের মতো।  নিয়া একটি প্রাচীন জনপদ।  হিউয়েন-সিয়াং লপ-নর হ্রদ হয়ে চায়নার পথে যাওয়ার সময় এই নি-জাং শহর বা নিয়ার কথা উল্লেখ করেন।  এই শহরটি ছিল খোটানের রাজার পূর্ব সীমানা পাহারার এক ঘাঁটি।  নিয়া আগে খোটান জেলার একটা ছোটো মরূদ্যান শহর হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে কেরিয়া জেলার এক প্রশাসনিক কেন্দ্র।    

একটি উজ্জ্বল  আবিষ্কার

বিকেলবেলা যে ধ্বংসাবশেষের পথে চলেছি সেখানকার বালির নীচ থেকে পাওয়া প্রায় ফুট তিনেক ব্যাসের এক মাটির পাত্রের সন্ধান পেয়েছিলাম।  এখনও পর্যন্ত নিয়ায় পাওয়া একমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক খোঁজ।  একটু পরেই আমার এক উট চালক হাসান আখুন একজনকে ধরে নিয়ে এসেছিল যে ওই ধ্বংসস্তূপ থেকে দুটো খোদাই করা কাঠের টুকরো নিয়ে এসেছিল।  কাঠের টুকরো দুটো পরীক্ষা করেই টের পাই তাতে যে লিপি খোদাই করা আছে তা খরোষ্ঠী।   

খানিক পর জানতে পারি হাসান আখুন যাকে নিয়ে এসেছিল সে এগুলো ইমাম জাফর মাজারের পথ থেকে তুলে নিয়ে এলেও সে এগুলো বালির তলা থেকে খুঁড়ে বের করেনি, করেছিল ইব্রাহিম নামের অন্য একজন।  এক বছর আগে ইব্রাহিম ‘পুরনো শহরের’ ধ্বংসাবশেষে হানা দিয়েছিল গুপ্তধন খুঁজে পাবার আশায়।  সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি করে খান কয়েক খোদাই করা পচা কাঠের টুকরো খুঁজে পেয়েছিল।  ফেরার পথে চারটে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল আর দুটো নিয়ে এসে বাচ্চাদের খেলার জন্য দিয়েছিল।  বাচ্চারা কাঠের  টুকরোগুলো খেলে নষ্ট করে ফেললেও দুটো রয়ে গিয়েছিল ইব্রাহিম যাকে আগে নিয়ে এসেছিল তার কাছে।  কাঠের টুকরোগুলো কিনে নিতে ইব্রাহিম এর গুরুত্ব বুঝতে না পারার জন্য হাত কামড়াচ্ছিল।  আমি আবিষ্কারের উত্তেজনা চেপে রেখে ইব্রাহিমকে দলের সঙ্গে মজুরীর বিনিময়ে গাইড হিসেবে যাবার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলাম।

একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে  মধ্য এশিয়ায় খরোষ্ঠী লিপির ব্যবহার যে হত, তা ১৮৯২ সালে ফরাসি পর্যটক দুত্রিয়েল সংগৃহীত খোটান মুদ্রা ও বার্চ-গাছের ছালে লেখার টুকরো থেকে জানা গিয়েছিল।  সন্ধেতে আলো  ফিকে হয়ে যাওয়া টানা লেখায় কাঠের ওপর কি খোদাই করা  আছে বোঝার চেষ্টা করেও বিন্দুমাত্র সফল হইনি।  

নিয়া নদীর পাস দিয়ে

তিনদিন চলার পর আমরা পৌঁছেছিলাম ইমাম জাফর সাদিক মাজারে।  এখান থেকেই আবার মরু অভিযান শুরু হবে।  আবহাওয়া আমাদের অনুকূল ছিল।  রোদ ঝলমলে দিন হলেও বেদম ঠান্ডা।  রাতের তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-১৩ সেলসিয়াস) আর দিনের তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের (-৫ সেলসিয়াস) ওপরে উঠছে না।               

আমাদের পথ ছিল নিয়া নদীর ধার ঘেঁষে।  নদী খাত যেখানে বালির বুকে হারিয়ে গেছে সেটাই আমাদের গন্তব্য।  আর একটা – ‘পুরনো শহর। ’ নিয়া নদী কেরিয়া দারিয়ার মতো চওড়া হলেও গভীরতা কম।  কেরিয়া নদীর মতোই অনেক ছোটো ছোটো ঝোরার জল এসে মিশেছে নিয়াতে।  শহরের ঠিক বাইরে এক জলাভূমিও মিশেছে নদীতে।  নদীর উচ্চ খাত থেকে সেচ খালের মাধ্যমে জল টেনে নেওয়া হয়েছে।  কৃষি অঞ্চল শেষ হত কুমুশ আর বনজ গাছপালা ভরা এক জঙ্গল শুরু হয়েছিল।  প্রতি বছর শরতকালে বিপুল সংখ্যক তীর্থযাত্রী ইমাম জাফরের মাজারে আসে, তাই রাস্তাটি প্রায় ‘হাই-রোডের’ মতো হয়ে আছে।  নদীর ধার ঘেঁষে পথ গিয়েছে।  তবে নদীর বুকে জল নেই পরিবর্তে জমে আছে বরফ।  নদী কোনখানেই তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশ ফুটের বেশি চওড়া নয়।  বরফের ফাঁক দিয়ে মেপে দেখেছি নদী ফুট তিনেকের বেশি গভীর নয়।  অন্তত পারের কাছে।   বরফ গলা সময়ে জল যে প্রায়শই দু’পারে উঠে আসে সন্দেহ নেই।  নদীর দুধারের সবুজ জঙ্গল তার প্রমাণ।  এর পরেই নিয়ার মেষপালকদের চারণভূমির শুরু।  এখানে গোটা দশেক চারণভূমি আছে।  মেষপালকদের পরিচালনা করে নিয়ার ব্যবসায়ীরা।    

রাতের শিবির হয়েছিল নিয়া বাজার থেকে উনিশ মাইল দূরের নাগারা-খানা নামের চারণভূমির মেষ পালকদের থাকার কুঁড়ের কাছে এক খালের ধারে।  বছর দুয়েক হল এখানে নদী থেকে সেচ খাল কাটা শুরু হয়েছে আম্বানের নির্দেশে।  নদীর জল বাহিত পলি বালির ওপর পুরু স্তর তৈরি করে মরুকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।  এই উর্বর চারণভূমিগুলো খুব তাড়াতাড়ি চাষের খেত-এ পরিণত হবে।  

ছয় থেকে আট ফুট চওড়া এই সেচ খালের পাস দিয়ে চলতে চলতে ভাবছিলাম প্রশাসনিক সুচিন্তিত পরিকল্পনা সে ইউরোপেই হক বা প্রাচ্যেই হক চাইলে রুক্ষ মরুতেও প্রানের ছোঁয়া আনতে পারে।  নতুন সেচ খাল যে এই নিঃসঙ্গ বনভূমিতে নতুন জীবনের স্পন্দন আনবে তাতে সন্দেহ নেই।  প্রাচীনকালে মরুর বুকে একের পর এক জনপদ গড়ে উঠেছিল এই রকম সেচ ব্যবস্থার হাত ধরে।  পরিমিত জলের ব্যবহার ও তা সঞ্চয়ের ব্যবস্থা চাষকে সুরক্ষিত করেছিল।   যদিও নদীর চলার পথ পরিবর্তন ও চলমান বালির কাছে হার মানতে হয়েছিল বহু জনপদকে।  তুর্কোমান স্টেপস এবং পাঞ্জাবের দোয়াবগুলিতে একই পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে।   

নাগারা-খানা থেকে আট মাইল পথ পার হয়ে আসার পর যেখানে জঙ্গল পাতলা সেখানেই নিয়ার দক্ষিণের দূরবর্তী বরফ ঢাকা পাহাড় দেখা যাচ্ছিল।  বায়ুমণ্ডল এত পরিষ্কার ছিল যে দূরের ওট্রা ল্যাঙ্গার পর্যন্ত নজরে আসছিল।  নজরে আসছিল পথিমধ্যে তীর্থযাত্রীদের বিশ্রামের জন্য খাগড়ায় তৈরি কুঁড়েঘরগুলো।  ‘প্লেন টেবিলে’ এগুলোর সঠিক অবস্থান তুলে নিতে কোন অসুবিধাই হচ্ছিল না।

একটু পরেই শুরু হয়েছিল পপলার আর তামারিস্কের ঘন জঙ্গল।  বরফ পাহাড় সহ দূরবর্তী সব কিছু চলে গিয়েছিল চোখের আড়ালে।  জঙ্গলের প্রসারতা দেখে মনে হয় নদীপথের পরিবর্তনের ফলেই এ সম্ভব হয়েছে।  না হলে মরু অঞ্চলে এত বিস্তৃত জমির উর্বরতা সম্ভব হত না।  আমাদের মেষপালক গাইড জানিয়েছিল জঙ্গল এখানে আট থেকে দশ মাইল চওড়া।  জরিপের জন্য  একটু উঁচু জায়গা থেকে নেওয়া মাপ মেষ-পালকের অনুমানকে স্বীকৃতি দিয়েছে।  গাছের নীচে বহু জায়গায় পাতলা বরফের স্তর জমে আছে।  গতসপ্তাহের তুষারপাতের ফল।  আবছায়ায় জমে থাকা চাপ চাপ সাদা বরফ ইউরোপের শীতকালের দৃশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছিল।     

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মাইল বারো পথ পার হবার সময় একবারের জন্যও নদীর দেখা পাইনি, নজরে আসেনি মেষ পালকদের কুঁড়ের কোন চিহ্ন।  সন্ধে নামার আগে আগে পৌঁছেছিলাম কয়েকটি মেষ পালকদের কুঁড়ে সম্বলিত দোবে-বোস্তানে।  আমাদের দ্বিতীয় কাম্পিং গ্রাউন্ডে।  মাইল খানেক পূবে উপস্থিত নিয়া নদী আর পশ্চিমে মরুর বালির পাহাড়ের হালকা অবয়ব।  উটের পিঠে চেপে মালপত্র পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধে সাতটা বেজে গিয়েছিল।  তার আগেই আমার লোকজন শুকনো কাঠ জোগাড় করে আগুনের কুন্ডি বানিয়ে দিয়েছিল।  আগুনের তাপে পরিষ্কার আকাশ দেখছিলাম প্রবল ঠান্ডার অনুভূতি ছাড়াই।  শেষ পর্যন্ত তাঁবু যখন খাটানো হয়েছিল তখন তাপমাত্রা মেপে দেখেছিলাম ১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস)!

ইমাম জাফরের মাজার

২৫ জানুয়ারি মাত্র মাইল তেরো পথ পার হয়ে পৌঁছেছিলাম আবার মরু যাত্রা শুরুর আগের শেষ জনপদ ইমাম জাফর সাদিক মাজারে।  নদী এখানে মাত্র ফুট কুড়ি মতো চওড়া।  নদীর জল জমে বরফ হয়ে আছে।  সরু নদী থেকেও কয়েকটা ধারা বেরিয়ে একটু এগিয়ে বালির বুকে মিলিয়ে গেছে।  মাজার ঘিরে বড়ো বড়ো গাছ।  পশ্চিমে একটি পাহাড়ের টিলার ওপর অজস্র পোঁতা খুঁটিতে ঝুলেছে রঙ বেরঙ এর কাপড়ের টুকরো বা প্রেয়ার ফ্ল্যাগ।  ওখানেই চির-বিশ্রামে আছেন ইমাম জাফর সাদিক।  মাজার ঘিরে মসজিদ, মাদ্রাসা ও সেবকদের থাকার জায়গা।  ইতিউতি তীর্থযাত্রীদের থাকার ঘর ঘিরে গাছের ঝোপ।  তার মাঝে ছোটো ছোটো জলাশয়।  

ভবনগুলোয় দ্রুত একবার চোখ বুলিয়ে নিয়েছিলাম।  এদের মধ্যে শুধু নিয়াজ হাকিম দ্বারা নির্মিত চতুর্ভুজাকার মাদ্রাসাটি পোড়া ইটের।  বাকী মাটি আর কাঠের।   বরফ হয়ে থাকা উত্তরের জলাশয় পার হয়ে পাহাড়ের দিকে গিয়েছিলাম।  টিলার পাদদেশে ছোটো ছোটো গাছপালা দিয়ে ঘেরা মাজারের মাদ্রাসায় পড়তে আসা পণ্ডিতদের জন্য একটি বড়ো মঞ্চ।  এটি প্রার্থনার মঞ্চ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।  

সব গাছেই ছোটো ছোটো পতাকা বাঁধা।  ইয়াকের লেজ, ন্যাকরা ঝুলছে প্রায় সব গাছ থেকেই – তীর্থযাত্রীদের অর্ঘ্য।  টিলার মাথায় পৌঁছনোর রাস্তায় একের পর কাঠের খিলান।  সবেতেই  তীর্থযাত্রীদের ভক্তির স্মারক বাঁধা।  প্রথম খিলানটিতেই সবচাইতে বেশি কাপড়ের টুকরো আটকানো।  যা গুনে শেষ করা অসম্ভব।  কী নেই?  ভারতীয় মসলিন থেকে শুরু করে বার্মিংহাম কটন প্রিন্ট, চাইনিজ সিল্ক, রাশিয়ান চিন্টজ, দেশজ মোটা কাপড়।  চেনা প্রায় সব রঙই উপস্থিত।  তীর্থযাত্রীদের ভক্তির এই প্রথা বা নিদর্শন সারা ভারতে মুহাম্মাদান এবং হিন্দু তীর্থস্থানগুলিতে একইভাবে দেখা যায়।  ভাবছিলাম এই কাপড়ের টুকরোগুলোকে যদি বালির তলায় পুঁতে দেওয়া হয় এবং বেশ কয়েক শতাব্দী পর তা যদি কোন প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে বেরিয়ে আসে তবে কি প্রতিক্রিয়া হবে!

পথটি ঘুরে ঘুরে টিলার মাথায় উঠেছে।   পথের দুপাশে উঁচু মাটির স্তূপ – কোন না কোন শহীদের বিশ্রাম স্থান – ‘তাসকিরাহ’ বা কিম্বদন্তী বলে এরা ইমাম জাফর সাদিকের নেতৃত্বে ‘চিন ও মাচিন’ অর্থাৎ খোটানের কাফেরদের সঙ্গে ভূমি রক্ষার লড়াই করতে গিয়ে এখানে প্রাণ দেন।  আমার কাছে যা সবচাইতে চিত্তাকর্ষক লাগল – উপকথা যাই বলুক জলাশয় থেকে প্রায় ১৭০ ফুট উঁচু টিলাটি কিন্তু বালিপাথরের নয় এটি একটি লবন পাহাড় – রিফস অফ সল্ট।  বেশ কিছু জায়গায় ধূসর-সাদা রঙ পরিষ্কার বেরিয়ে আছে।  শিলা-লবন শুধু টিলার গায়েই নয় আশপাশের নুড়িতেও প্রচুর মিশে আছে।  অথচ নদীর দুপারে বালি ছাড়া আর কিছু নেই।  এই পাহাড়ের পবিত্রতা এই বিশেষত্বের জন্যেই যথেষ্ট।  টিলার চূড়া থেকে দূর মরুভূমি দেখা যাচ্ছিল।  উত্তর পশ্চিমে ছ-সাত মাইল গিয়েই বালির বুকে নদীর স্রোত হারিয়ে গেছে।  শুরু হয়েছে বালি সাম্রাজ্য।  প্রাচীন-শহর যাবার জন্য আমাদের ওই দিকেই যেতে হবে বলে জানাল গাইড।  

প্রাচীন শহরের দিকে যাত্রা শুরু

সবাই চাইছিল যাত্রা শুরুর আগে টিলার মাথায় গিয়ে সাধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসতে, তাই  মরু যাত্রা শুরু করতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।  আরও দেরি হয়েছিল জল নিতে গিয়ে।  জেনে গিয়েছিলাম যেখানে যাচ্ছি সেখানে বালি খুঁড়ে জল পাওয়া যাবে না।  সঙ্গে নিয়ে যাওয়া জলের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হবে।  কলকাতা থেকে নিয়ে আসা গ্যালভানাইজড লোহায় তৈরি জলের ট্যাঙ্ক দুটো দান্দান-উইলিকের ঠান্ডায় যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।  গরম কলকাতায় না আমার, না প্রস্তুতকারক মেসার্স থমসন – কারোরই মাথায় আসেনি মরুর ঠান্ডার কথা।  গতকাল রাতের তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল -১২ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-২৪ সেলসিয়াস) – এখনও পর্যন্ত মরুতে পাওয়া সর্বনিম্ন তাপমাত্রা।  অনান্য ট্যাঙ্কগুলোতেও ঠান্ডা-গরমে প্রসারনের ফলে সুক্ষ্ম ছিদ্র তৈরি হয়ে ট্যাঙ্কে ভরা বরফ গলে গেলে জল বার হয়ে আসছিল।  আমাদের সৌভাগ্য প্রচণ্ড ঠান্ডার ফলে সঙ্গে বস্তায় পেঁচিয়ে বরফ নিয়ে যাবার পরিকল্পনা ফলপ্রসূ হয়েছিল।  দলে লোকের সংখ্যা নেহাত কম নয় – প্রায় পঞ্চাশ এবং সবাইকেই থাকতে হবে অনেক দূর মরুর মাঝে।

সূর্যের আলো ঝকঝক করছিল।  বনভূমির মধ্যে দিয়ে মাইল তিনেক যেতে শীতকালীন নদী হারিয়ে গিয়েছিল তুলকুচ-কোল নামের জলাভূমি আর বালির গর্ভে।  শুকনো নদীখাত বলে দিচ্ছে গরমকালে নদীর জল আরও খানিক দূরত্ব পর্যন্ত প্রবাহিত হয়।  এই জলাভূমির প্রান্তে কুঁড়েঘর বানিয়ে থাকে মাজারের ভেড়ার পালের রক্ষক নুরুল্লা।  হাজার চারেক ভেড়া আছে ওর জিন্মায়।  নুরুল্লাকে সাধারণ মেষপালক ‘কোইচি’দের সঙ্গে তুলনা করা যায় না।  জলাভূমির শেষ প্রান্ত পর্যন্ত আমাদের এগিয়ে দিতে গিয়ে নুরুল্লা জানিয়েছিল শুধু সে ভেড়াদের দেখাশোনাই করে না নিজের পরিবারের জন্য জলাভূমির মাঝে ভুট্টা আর গম ফলায়।  মরুভূমিতে প্রবেশের আগে আমাদের পনিগুলো নুরুল্লার খামারে রেখে যাওয়া হয়েছিল।  

জলাভূমিতে গাছপালা এত ঘন ছিল যে সেই জঙ্গল সাফ করার পর উটগুলো এগোতে পারছিল।  জলাভূমিতে হরিণ, খরগোশ ও অনান্য কিছু জন্তুর উপস্থিতিও আছে।  যত এগোচ্ছিলাম ততই বন পাতলা হচ্ছিল।  মরে যাওয়া শুকনো গাছ দেখা যেতে শুরু করেছিল।  মাজার থেকে আট মাইল মতো এগোনোর পর জলা শেষ হয়ে এসেছিল মরুভূমি।  ছোটো বালির টিলা ওপর তামারিস্ক আর শক্ত গুল্মের অঞ্চল আক-টিকেন।  বালির মাঝে জেগে থাকা মৃত পপলার আর অন্যান্য গাছের গুঁড়ি ও শিকড় বলে দিচ্ছিল এইখানে কোন এক সময় নদীর জল পৌঁছত।  প্রাণ ছিল এখানে।  

শুকনো নদীপথ অনুসরণ করেই যে ‘প্রাচীন শহরে’ পৌঁছন যাবে আমার এই অনুমান ২৭ জানুয়ারি যাত্রার শেষে প্রমানিত হয়েছিল।  পাশাপাশি এটাও প্রমাণ হয়েছিল স্থানীয় গাইডরা মরুর দূরত্ব সম্পর্কে যা বলে তা অতিরঞ্জিত।  আমাকে বলা হয়েছিল ইমাম জাফরের মাজার থেকে প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষে পৌঁছতে কম করে তিনদিন হাঁটতে হবে।  সেটা আমরা দুদিনেই পৌঁছে গিয়েছিলাম।  গতকাল আমার শিবিরের কাছের এক বালি টিলার মাথায় দাঁড়িয়ে শুকিয়ে যাওয়া নদীর গতিপথ এগিয়ে যেতে দেখেছিলাম।  নদী পথের ধার ঘেঁষা প্রথম পাঁচ মাইল বা তারও বেশি পথ মৃত গাছ আর শেকড়ে ভরা ছিল।  ভারী মাল পিঠে উটকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের এগুলো সরিয়ে পথ তৈরি করতে হয়েছিল।  মরে যাওয়া গাছের শিকড়ে ফাঁকে গজিয়ে শক্ত গুল্মের ঝোপ।  অনেক মৃত গাছ এখনও ডালপালা ধরে রেখেছে।  ফুট চারেক গভীর এক শুকনো খাত মৃত জঙ্গলের পাস দিয়ে চলে গেছে।  স্থানীয় গাইড বলেছিল এটি পুরনো শহরের ‘উস্তাং’ বা খাল।  কিন্তু ‘খালের’ কৃত্রিমতার কোন নিদর্শন আমি দেখতে পাইনি।  

আরও এগিয়ে ১৫ থেকে ৩০ ফুট সারসার শঙ্কু আকৃতির বালির পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে এগোতে হয়েছিল।  সবকটি বালি পাহাড়ের মাথাতেই মৃত তামারিস্কের ঝাড় নজরে এসেছিল।  বালি পাহাড়ের পূবদিকের ঢালে এখনও সপ্তাহ খানেক আগে হওয়া তুষারপাতের বরফ ইঞ্চিখানেক পুরু হয়ে জমে আছে।  প্রায় মাইল তিনেক বিস্তৃতি নিয়ে এইরকম পুরো অঞ্চলটা।  তারই মাঝে অনেকটা জায়গা জুড়ে গাছের শুকনো শেকড়ের ফাঁকে ছড়িয়ে ছিল ভাঙা মাটির পাত্র।  সঙ্গের লোকেরা এই শেকড়গুলো দেখে এগুলোকে ফল আর পপলার গাছ বলে শনাক্ত করেছিল।  সম্ভবত এই অঞ্চলটিতে কোন খামার ছিল।  এরপর বালি পাহাড়ের উচ্চতা কমে গেলেও সেগুলো পুরো ন্যাড়া ছিল।  যদিও দুএক জায়গায় শুকনো তামারিস্কের ঝোপ দেখেছিলাম।  বালির ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা মাটির পাত্র আর ধাতুর দলা দেখিয়ে আমাদের গাইড ঠিক জায়গায় পৌঁছে যাবার সংকেত দিয়েছিল।     

সামান্য পরেই বালি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা ঘরের কাঠামো দেখতে পেয়েছিলাম।  দান্দান-উইলিকের থেকে অনেক উঁচু কাঠের খুঁটি বালির ওপর দাঁড়িয়ে।  প্রাথমিক ভাবে যা বুঝেছিলাম দুই ধ্বংসাবশেষের নির্মাণ পদ্ধতি ও নির্মাণ সামগ্রী একই ধরণের।  কিন্তু এখানে কাঠের কাঠামোর বিস্তৃতি অনেক বড়ো ও শক্তপোক্ত।  এই ধ্বংসাবশেষের প্রাচীনত্ব যে অনেক বেশি তা বুঝতে পেরেছিলাম বালির ওপর পড়ে থাকা সুক্ষ কাজ করা কাঠের এক টুকরো দেখে।  কাঠের ওপরকার অলংকরণ গান্ধারা ভাস্কর্যের মতো।  এখান থেকে আরও মাইল দুয়েক উত্তরের দিকে এগিয়ে উঁচু বালির টিলার মাঝে রোদে শুকনো ইটের ভেঙে পড়া বাড়ির কাঠামোর কাছে পৌঁছেছিলাম।  কেরিয়ার সম্পন্ন চাষী আবদুল্লাহ এই ‘পোতাই’ বা ধ্বংসাবশেষ দেখেছিল।  যেরকমটি আশা করেছিলাম – এটি একটি স্তূপর ধ্বংসাবশেষ, এবং বালির মাঝে তুলনামূলকভাবে ভালভাবে টিঁকে আছে।    

ধ্বংসস্তূপে পৌঁছে

এখানেই তাঁবু খাটিয়েছিলাম ধ্বংসস্তূপের কেন্দ্রীয় অবস্থান মনে হওয়ায়।  জায়গাটি সেরকমভাবে বালিয়াড়ি দিয়ে ঢাকা পড়েনি।  ভূমিক্ষয় যে এখানে ভীষণভাবে হয়েছে তার প্রমাণ বালির ওপর জেগে থাকা বড়ো বড়ো মাটির পাত্রের টুকরো, বড়ো বড়ো পাথর আর বিশাল জায়গা জুড়ে বিছিয়ে শুকনো গাছের শেকড় আর কাটা গুঁড়ি।  এটি সম্ভবত কোন বাগান ছিল।  না হলে এত গাছের শেকড় একজায়গায় গজাতো না।  কিন্তু শেকড়গুলোয় হাত দিতেই গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছিল সঙ্গে সঙ্গে।  বড়ো পাথরের টুকরোগুলো সম্ভবত বাড়ি তৈরির কাজে নদীর তলদেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল।   মরুর প্রবল বাতাস আর চরম জলবায়ু সব গুঁড়িয়ে দিয়েছে।  প্রাচীন শহরের ধ্বংসস্তূপের মাঝের প্রথম রাতে ভাবছিলাম জানি না কী অপেক্ষা করছে বালির তলায়।  

(ক্রমশ)

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Leave a Reply