উপন্যাস-পয়েন্ট নিমো-পুষ্পেন মণ্ডল-শরত ২০২৫

পুষ্পেন মণ্ডলের আরো লেখা: বাউটম্যানের বাংলো, কুয়াশার ডাক, অরেলস্টাইন ক্যাসেল, সমুদ্রগুপ্তের তরবারি, গৌরীভিটিলের অদ্ভুত গন্ধ, জলদস্যুর রক্তচক্ষু, মেজাম্বা, কালযন্ত্র, ওম মণি পদ্মে হুম

বিমান উধাও!

“বোর্ডিংয়ের জন্য ঘোষণা শুরু হয়ে গেছে। এবার উঠে পড় রোজ, আর অপেক্ষা করা যাবে না।”

“আইসক্রিমটা খেয়ে নিয়েই উঠছি মা।”

“ওটা তুমি যেতে-যেতেই খেতে পারবে।”

রোজ একহাতে ছোট্ট গোলাপি টেডি আর অন্য হাতে পছন্দের চকোলেট আইসক্রিম নিয়ে মায়ের সঙ্গে বোর্ডিং কাউন্টার পেরিয়ে এগিয়ে গেল বিমানের দিকে। সে বারো বছরের জন্মদিনে মায়ের সঙ্গে কুয়ালালামপুর এসেছিল ছুটি কাটাতে। খুব মজা হল ক’দিন। রোজের বাবাও এসেছিল ওদের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু ফেরার সময়ে বিশেষ কাজ পড়ে যাওয়ায় এয়ারপোর্ট থেকেই ওদের সি-অফ করে চলে যেতে হল বাবাকে। হাঁটতে হাঁটতে করিডোরের উপরে রোজের চোখে পড়ল একটা ইলেকট্রনিক ডিসপ্লের ওপর লেখা ৮ মার্চ, ২০১৪, রাত্রি ০০টা ৩০ মিনিট। মানে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমান ছেড়ে দেবে। মা ঠিকই বলেছিল, হাতে সময় বেশি নেই।

বিমানের মধ্যে নিজেদের বসার জায়গা খুঁজে নিতে আরও কিছুটা সময় লাগল। সিটে বসেই রোজের মনে হল একটু জল খেতে হবে। একজন ক্রুকে ডেকে জল দিতে বলল ওর মা। কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যানাউন্স শোনা গেল, “হ্যালো! আমি জাহারি আহমেদ শাহ্‌, মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স ফ্লাইট এম.এইচ-৩৭০ বিমানের ক্যাপ্টেন। এই যাত্রীবাহী বিমানটি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে চিনের বেইজিং যেতে আনুমানিক সময় নেবে ছ’ঘণ্টা। বিমানের যাত্রী সংখ্যা ২২৭ জন এবং ১২ জন বিমান কর্মী রয়েছে আপনাদের সহায়তার জন্য।”

কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিমানটি আকাশে উড়ে গেল কুয়ালালামপুর ছেড়ে। সিট বেল্টের সিগন্যাল বন্ধ হয়ে যেতে বিমানসেবিকারা এসে শুরু করে দিল খাবার পরিবেশন। আনুমানিক আধঘণ্টার মধ্যে বিমানটি পৌঁছে গেল থাইল্যান্ড সাগর এবং দক্ষিণ চিন সাগরের মাঝামাঝি। কুয়ালালামপুর এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল থেকে বেরিয়ে প্রবেশ করল ভিয়েতনামের হোচিমিন এ.টি.সি-র মধ্যে। কিন্তু তার পরেই বিমানটি আচমকা গায়েব হয়ে গেল হোচিমিন এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের রাডার থেকে। হইচই শুরু হল এয়ার ট্রাফিক রুমে। অনেকে ভাবল, কোনও কারণে হয়তো বিমানটির সিগন্যাল পাঠানোর সিস্টেমে গণ্ডগোল হয়েছে।

নির্ধারিত সময়ে বিমানটি বেইজিং পৌঁছল না। ততক্ষণে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে শুরু হয়েছে খোঁজাখুঁজি। জলে, স্থলে, আকাশে সব জায়গায় তন্নতন্ন করে খোঁজা হল। পরের কয়েক মাস ধরে ৩৪টি বিমান ও ৪০টি জাহাজ সব জায়গাতে অনুসন্ধান চালাল। ব্রিটিশ ও ফ্রান্স এয়ার ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেটিং এজেন্সি নামল তদন্তে। মালয়েশিয়া ছাড়াও ভারত, অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, ব্রুনাই, চিন, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনাম বিভিন্নভাবে অনুসন্ধানে অংশগ্রহণ করল। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিমানটিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

রবার্ট কক্সের ডায়েরি

চুন-সুরকি আর লাল ইটের তৈরি ভগ্নপ্রায় প্রাচীন ইউরোপিয়ান ইমারতটা অস্থিসার হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে শুয়ে আছে। তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে বট-অশ্বত্থ গাছের শিকড়-সমেত ডালপালাগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিগত বেশ কয়েক যুগ ধরে। চারপাশ ঘিরে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেছে ঘন আগাছা আর ঝোপ জঙ্গল। সঙ্গে বড়ো বড়ো আম, জাম, নিম, আসান, তেঁতুল ও আরও গাছের ছায়া। দিনের বেলাতেও মাটিতে রোদ পড়ে না সেখানে। ভিজে স্যাঁতসেতে জমি। বাড়িটার ভাঙাচোরা সিঁড়ির পরে সবুজ ঘাসের ফাঁকা একটা উঠোন। মনে হয় অলৌকিক কোনও কারণে মাঝের কয়েক প্রস্থ জমিতে আগাছাগুলো বংশবিস্তার করেনি।

সৌম্য মাঠের কোণে ইটের চাতালে বসে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল পুরোনো বাড়িটার দিকে। রবিবারের দুপুর। সে মাঝে-মধ্যেই ছুটি পেলে একা এসে বসে থাকে নদীর তীরে ব্রিটিশ আমলের এই নির্জন ভূতুড়ে বাংলোটার সামনে। বহুযুগ আগে এখানে নাকি এক ইংরেজ সাহেব থাকতেন। দশ-বারো ফুট উঁচু বাংলোর দরজা আর জানালাগুলো হাওয়া-বাতাস খেলার জন্য আদর্শ। এখন যদিও কাঠের জানালা-দরজার ছিটেফোঁটাও নেই। নেই কড়িবরগার ছাদ। শুধু চারদিক দিয়ে কুড়ি ফুট উঁচু নোনা ধরা দেয়াল কঙ্কালের মতো খাড়া হয়ে আছে। বাংলোর বাউন্ডারিটা পেরোলেই উত্তরের দিকে হুগলি নদী। মাঝে আছে নদী বাঁধের উপর দিয়ে রাস্তা। নদীর ধার দিয়ে পরপর ছোটো-বড়ো গাছ সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে।

ওর বড়ো ভালো লাগে এই নির্জনতা। কিছুটা দূরে কলকারখানার ধুলো ধোঁয়া শব্দ ছেড়ে এখানে কিছুক্ষণ বসে থাকলেই যেন সে টাইম মেশিনে করে হারিয়ে যায় অতীতে। কানে আসে কতরকমের পাখির ডাক। এই তো মিনিট খানেক আগে, সৌম্য যে ইটের চাতালে এসে বসেছিল, তার নীচে দিয়ে গায়ে ডোরাকাটা একটা কালো-হলুদ সাপ বেরিয়ে ঘাসের মধ্যে দিয়ে চলে গেল এঁকে-বেঁকে। বাংলায় এর নাম শাঁখামুটি। মারাত্মক বিষধর। সেই ভয়েই এই এলাকাতে মানুষজন খুব একটা আসে না। প্রায় সপ্তাহ খানেক আগে এই পোড়ো বাংলোর পিছনে একজন সাপের কামড়ে মারা গেছে। সৌম্য দেখল, কারা যেন মাটি খুঁড়ে রেখেছে পিছন দিকের বাগানে। আর আছে ভূতের ভয়। ভূত বলে আদৌ কিছু আছে কি না সে-বিষয়ে সৌম্যর যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ওর মনে হয় এটা হয়তো কোনও সূক্ষ্ম অনুভূতি, যেটা সব মানুষের ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়ে না। মানুষ যদি একটা জৈব যন্ত্র হয় তাহলে ইন্দ্রিয়গুলো রাডারের মতো। তার মানে সব মানুষের রাডার সমান কাজ নাও করতে পারে। কথাগুলো অনেক কাল আগে দেবুদা ওকে বুঝিয়েছিল। স্কুলে চার বছরের সিনিয়র ছিল দেবুদা। পরে বিদেশ চলে যায়। তবে যোগাযোগটা এখনও আছে।

একটা কালো ভোমরা ভোঁ ভোঁ করে অনেকক্ষণ উড়ছে মুখের সামনে। সৌম্য হাত নেড়ে সেটাকে তাড়ানোর চেষ্টা করেছে অনেকবার। কিন্তু সে ফিরে ফিরে আসছে। চারপাশে হলুদ রঙের থোকা থোকা জংলি ফুল ফুটে রয়েছে অনেক। সেই ফুলের টানেই ভোমরাটা উড়ে বেড়াচ্ছে। দু-দিন আগেই একটা ম্যাগাজিনে পড়ছিল সে, এই মৌমাছি বা ভোমরাগুলো হঠাৎ যদি একদিন পৃথিবী থেকে চলে যায় তাহলে গোটা প্রাণীকুল মুছে যাবে।

ঈপ্সিতা মৌমাছি পুষত। একটা ভাঙা কাঠের বাক্স তার দিয়ে বেঁধে রেখেছিল আমগাছের সঙ্গে। সেখানে প্রথমে রানি মৌমাছি-সমেত একটা দল এসে বাসা বাঁধল। তারপর পুরো একটা কলোনি বানিয়ে ফেলল মৌমাছিরা। বহুকাল আগে ঈপ্সিতা এই জায়গাটা চিনিয়েছিল ওকে। ছুটি পেলেই দুজনে মিলে সাইকেল নিয়ে চলে আসত নদীর পাড়ে। এই পোড়ো বাংলোতে তখনও কাঠের দরজা-জানালাগুলো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বাউন্ডারি ওয়ালে কাঁটাতারের জং ধরা বেড়াগুলোও দেখা যেত। খেজুর গাছের গোড়ায় ওরা সাইকেল দুটো রেখে ঘুরে বেড়াত বাংলোয়। সৌম্যর মনে পড়ছে, বাংলোর নীচে একটা ঘর ছিল। সিঁড়ি দিয়ে নামলে দেখা যেত হরেকরকম ভাঙাচোরা শিশি, ফানেল, টেস্টটিউব, বার্নার।

গতকাল ঈপ্সিতার ইমেলটা পেয়ে এই পোড়বাড়িটার কথা আবার মনে পড়ে গেল সৌম্যর। তাই এই ভরদুপুরে এসে বসে আছে এখানে। ঝোপঝাড় আর বুনো গাছেদের বাড়বাড়ন্তে বাংলোর ভিতরে ঢোকার সাহস পায়নি। পকেট থেকে ফোনটা বের করে গতকালকের ইমেলটাতে আবার চোখ বুলিয়ে নিল সৌম্য।

‘কেমন আছিস? অনেকদিন তোর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই। বাড়িতে সবাই ভালো আছেন আশা করি। আমি কত বছর দেশে ফিরতে পারিনি! তোর ফোন নম্বর হারিয়ে গেছে। অনেক খুঁজে তোর পুরোনো মেল আইডি পেলাম। যদি মেলটা পাস তৎক্ষণাৎ আমাকে জানাবি।

মনে আছে নদীর ধারে সেই ভূত বাংলো? সেই পোড়ো বাড়িটা কি এখনও আছে? মা চলে যাওয়ার পর থেকে আর দেশে যাই না। মনখারাপ লাগে। কিন্তু আমাদের গ্রামের সেই বড়ো পুকুর, মাঠ, চাষের জমি, হাজরাবাড়ির পিছনের সেই আম গাছ, যেখানে আমরা রাজাদের বাড়ির পিছনে কুমিরডাঙা খেলতাম, নদীর ধারে যেখানে বসে আড্ডা মারতাম— সব মনে পড়ে। সেগুলো কি এখনও সেরকম আছে?

এতদিন পর তোকে মেল করছি, তার অবশ্য একটা কারণ আছে। তোকে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে। আমাদের বাড়ির নীচের তলা তো ভাড়া দেওয়া আছে। উপরে যে-ঘরে আমি থাকতাম, আসার সময় সেই ঘরের চাবি তোদের বাড়িতেই কাকিমার কাছে রেখে এসেছিলাম। আমার ঘরটা খুলে খাটের ডানদিকে দেরাজের মাথায় দেখবি একটা চামড়ার সুটকেস আছে। সুটকেসটা খুলে কাগজপত্রের নীচে একটা পুরোনো নোটবুক পাবি। ওইটা আমাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কুরিয়ারে পাঠিয়ে দে। আমার ঠিকানা নীচে দিয়ে দিলাম।

ভালো থাকিস।

ইতি— তোর ছোটোবেলার বন্ধু ঈপ্সিতা।

৫৭, ওয়েডিংটন রোড, স্টারটোরড, লন্ডন।’

ঈপ্সিতাদের দোতলা বাড়িটা পুকুরের ও-পাড়ে। সৌম্যদের বাড়ি থেকে সরাসরি দেখা যায় গাছপালার ফাঁক দিয়ে। ছোটোবেলায় ওর বাবা মারা যান। তারপর কাকিমা স্কুলে শিক্ষাকতা করে মানুষ করেছেন ঈপ্সিতাকে। প্রথম থেকেই খুব মেধাবী ছিল সে। স্কুলে কোনোদিন দ্বিতীয় হয়নি। কলেজের পড়াশোনা শেষ করে স্কলারশিপ পেয়ে আমেরিকা চলে গেল। তারপরে বছর পাঁচেক আগে মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে একবারই দেশে ফিরেছিল। সপ্তাহ দু-একের মধ্যেই সব কাজ মিটিয়ে আবার ফিরে গেল আমেরিকাতে। আর কোনও যোগাযোগ নেই। এত বছর পর হঠাৎ একটা ইমেল করেছে। সৌম্যর মায়ের কাছেই চাবি ছিল। বছরে কয়েকবার সৌম্যর মা লোক লাগিয়ে পরিষ্কার করিয়ে দেন সেই ঘর। আজ সকালে মায়ের কাছ থেকে চাবি নিয়ে গিয়ে ঈপ্সিতাদের উপরের ঘরটা খুলেছিল সৌম্য। আলমারির মাথা থেকে বাক্সটা নামিয়ে নোটবুকটা বের করল। খয়েরি চামড়ার মোটা নোটবইটা হাতে নিয়ে উলটেপালটে দেখল হলদে হয়ে যাওয়া মোটা পাতা, ইংরাজি হাতের লেখা, পুরোনো দিনের কারসিভ ম্যানুস্ক্রিপ্ট। দোয়াতের কালিতে লেখা। বহুকাল হল এই লেখার চল বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ইংরাজির সঙ্গে প্রচুর গ্রিক সংখ্যা আর শব্দ মিশিয়ে লেখা হয়েছে। পাতার পর পাতা শুধু বৈজ্ঞানিক ফরমুলা। কীসের ফরমুলা এগুলো? কিছুই বুঝতে পারল না ও। তার বোঝার দরকারও নেই। নোটবইটা ভালো করে প্যাকিং করে অফিসের ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছে। কালকে সোমবার। দুপুরে লাঞ্চ টাইমে অফিস থেকে বেরিয়ে পোস্ট করে দেবে। ওর অফিসের পাশেই পোস্ট অফিস।

বিকালের আলো কমে আসছে ক্রমশ। পাখিরা দল বেঁধে নদীর দু-পাড়ে বড়ো বড়ো গাছের মধ্যে নিজেদের বাসায় ফিরছে। সৌম্য ইটের চাতাল থেকে উঠে পড়ে সিমেন্টের বাঁধে রাখা বাইকে স্টার্ট দিয়ে ভাবছিল এই পোড়ো বাড়িটার মধ্যে যেন কিছু একটা রহস্য লুকিয়ে আছে। ইউরোপিয়ান ধাঁচের এত বড়ো বাংলোয় কে থাকত? এত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিই-বা কেন ওই ঘরের মধ্যে? এই ভূতুড়ে বাড়িটার কথাই-বা ঈপ্সিতা এত বছর পর ওর চিঠিতে উল্লেখ করল কেন?

জীবনের গতিপথ আচমকা কোন দিকে মোড় নেয়, সেটা আগে থেকে কল্পনা করা কোনও মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। তেমনই কয়েকদিনের মধ্যে একটা ফোন এসে সৌম্যর শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবনে হঠাৎ করে ঝড় তুলে দিল।

“হ্যালো!”

“ইজ দিস মিস্টার সৌম্য প্রামাণিক?” খাঁটি ইউরোপিয়ান উচ্চারণে ভারী গলায় প্রশ্নটা ভেসে এল ফোনের অপর প্রান্ত থেকে।

অফিস থেকে ফিরে সবে বাড়ি ঢুকেছে সৌম্য। চায়ের কাপটা হাত থেকে নামিয়ে রেখে সোজা হয়ে বসল। আর একবার তাকিয়ে দেখল ফোনের দিকে। নম্বরটা ০৪৪ দিয়ে শুরু। তার মানে ফোনটা ইংল্যান্ড থেকে আসছে। সৌম্য ইংরাজিতে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, বলছি।”

“আমি লন্ডন পুলিশ থেকে অফিসার ম্যাকলি বলছি। মিস ঈপ্সিতা বিসওয়াসকে তুমি চেনো?”

“ঈপ্সিতা আমার ছোটোবেলার বন্ধু। কেন বলুন তো?”

“তুমি জানো সে এখন কোথায়?”

“লন্ডনে তার বাড়িতে থাকার কথা।”

“না, সে এক সপ্তাহ হল তার ভাড়াবাড়িতে নেই। ব্রেন্টউডে তার অফিসেও খোঁজ নেওয়া হয়েছে। সেখানেও যাচ্ছে না। অফিসের কলিগরা কিছু জানে না। বাড়ির মালিক মি. মার্ক আমাদের কাছে কমপ্লেন করেছে। সেটার ভিত্তিতে আমরা তদন্ত শুরু করেছি। এক সপ্তাহ আগে মিস বিসওয়াসের ফোন থেকে তোমার এই নম্বরে ফোন গিয়েছিল। কী কথা হয়েছিল যদি জানাও।”

“ঈপ্সিতা আমার কাছে একটা পুরোনো নোটবুক চেয়েছিল। সেটা ওকে পোস্টে পাঠিয়েছিলাম। এক সপ্তাহ আগে আমাকে ফোন করে জানাল, নোটবুকটা ও পেয়ে গেছে।”

“আচ্ছা, পরে ঈপ্সিতা অন্য কোনও নম্বর থেকে ফোন করেছিল তোমাকে?”

“না।”

“বেশ, এই ফোন নম্বরটা তুমি সেভ করে নাও। যদি ভবিষ্যতে ওর কোনও খবর পাও আমাদের অবশ্যই জানাবে।”

“নিশ্চয়ই জানাব। আচ্ছা, ঈপ্সিতার বাড়ির মালিক মি. মার্কের ফোন নম্বরটা পাওয়া যাবে?”

“মি. মার্কের সঙ্গে কথা বলে তোমাকে দিতে পারব।”

“বেশ।”

ফোনটা কেটে যেতে সৌম্য নম্বরটা ‘অফিসার ম্যাকলি লন্ডন পুলিশ’ নামে মোবাইলে সেভ করে রাখল। তারপর ঈপ্সিতাকে ফোন করার চেষ্টা করল। বার বার নট রিচেবল বলছে। ফোনটা পাশের টেবিলে নামিয়ে রেখে ভাবল মাত্র এক সপ্তাহ আগে তার সঙ্গে ঈপ্সিতার সামান্যই কথা হয়েছিল। সৌম্য সেদিন অফিসে ছিল। ঈপ্সিতার ফোনটা এসেছিল দুপুরের পরে। ইংল্যান্ডে তখন সবে সকাল হচ্ছে। ও ধন্যবাদ জানাল নোটবইটা এত তাড়াতাড়ি ওকে পাঠানোর জন্য। তারপর বলল, “এটা পেয়ে আমার গবেষণার খুব উপকার হবে, বুঝলি।”

সৌম্য অবাক হয়ে জানতে চাইল, “এটা তো বহু পুরোনো একটা ফরমুলার খাতা মনে হচ্ছে। কীসব হিজিবিজি লেখা আছে। এই রবার্ট কক্স কে? এটা তো তাঁর ডায়েরি দেখছি। প্রায় একশো বছরের পুরোনো। তোর কোন কাজে লাগবে?”

“ও তুই বুঝবি না। ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’ কথাটা শুনেছিস তো? এটা হল সোনার খনি। যাক, এসব কথা ফোনে আলোচনা করা যাবে না। তুই এক কাজ কর, ইউকের ভিসা অ্যাপ্লিকেশনটা করে দে। আর অফিস থেকে দিন পনেরোর ছুটি নিয়ে চলে আয় লন্ডনে। ছোটোবেলার অনেক গল্প আর ঘোরা, দুটোই হবে।”

সৌম্য হেসে বলল, “ভালো প্রস্তাব। আমি ভেবে দেখি। অফিস থেকে ছুটি পেলে আমি তোকে জানাব।”

ঈপ্সিতার কথাটাকে সেদিন খুব বেশি গুরুত্ব দেয়নি সৌম্য। আজ লন্ডন পুলিশের ফোন পেয়ে চিন্তায় পড়ে গেল। সৌম্য যতদূর জানে ঈপ্সিতার কাছের আত্মীয় তেমন কেউ নেই। ওর মা দুজনেই খ্রিস্টান মিশনারিতে মানুষ। আর ওর বাবা এখানে এক স্কুলে চাকরি পেয়ে এসেছিলেন। সৌম্য মাকে ঈপ্সিতার কথাটা বলতে তিনি খুব বিচলিত হয়ে উঠলেন।

সৌম্যর মনের ভিতরে অদ্ভুত একটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে সোজা তিনতলার ছাদের মাথায় উঠে এল সে। আকাশের দিকে তাকাল। মেঘ নেই, কিন্তু ঘোলাটে আকাশ। দু-একটা খুব উজ্জ্বল নক্ষত্র ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না। আসলে কলকাতার দক্ষিণে এই মফস্‌সল শহরে বিভিন্ন কলকাখানার ধোঁয়া-ধুলো গ্রাস করেছে আকাশকে। ঈপ্সিতার সঙ্গে সৌম্যর বন্ধুত্ব হয় এই পাড়াতেই। ওর বাবা বাড়ি করেছিলেন জায়গা কিনে। ওদের দুজনেরই বয়স তখন পাঁচ অথবা ছ’বছর। স্কুলে একই ক্লাসে ভরতি হল ঈপ্সিতা। ওদের বন্ধুদের একটা গ্রুপ ছিল। এখন কারোর সঙ্গেই তেমন কোনও যোগাযোগ নেই। ফেসবুকে বছরে একদিন করে জন্মদিনের শুভেচ্ছা বার্তা পাঠায় শুধু। ঈপ্সিতা সবসময়ই পড়াশোনায় ছিল ভীষণ সিরিয়াস এবং কেরিয়ার সচেতন। একটু বড়ো হওয়ার পর থেকে পড়াশোনার বিষয় ছাড়া আর কোনোকিছুই আলোচনা করত না। তারপরেই তো বিদেশে চলে গেল। মাঝে এক যুগ আর কোনও যোগাযোগ নেই। কিন্তু হঠাৎ করে কিছুদিন আগের ঈপ্সিতার ইমেল, তারপর ফোন। ঈপ্সিতার কথার মধ্যে এতটা আন্তরিকতা ছিল যে সৌম্যর মনেই হচ্ছিল না যে ওদের মধ্যে এত বছর কোনও কথা হয়নি।

সৌম্য অনেকক্ষণ বসে রইল ছাদের কোণে। কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। ঠিক সেই সময়ই টিং করে একটা মেসেজ ঢুকল ওর হোয়াটস-অ্যাপে। দেবুদা মেসেজ করেছে। দেবতোষ দাস ওরফে দেবুদা এখন ইংল্যান্ডে থাকে। পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। প্রায়ই সন্ধ্যাবেলা কাজের শেষে একা বসে মোবাইলে বাংলা কবিতা লেখে। তারপর সেটা কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে সৌম্যকেও ফরোয়ার্ড করে। অতঃপর সেই সদ্যোজাত কবিতা সন্তানকে নিয়ে মেসেজ চালাচালি চলে ঘণ্টা খানেক ধরে। আর বছরে একবার করে দেশে আসার আগে লম্বাচওড়া একটা বাংলা বইয়ের লিস্ট পাঠিয়ে দেয়। সেই লিস্ট মিলিয়ে কলেজ স্ট্রিট থেকে একগাদা বই কিনে রাখতে হয় সৌম্যকে।

আজকে কবিতাটা পাঠিয়ে কিছুক্ষণ পরে কোনও রিপ্লাই না পেয়ে দেবুদা ফোন করেছে, “কী খবর? এখনও মন্তব্য এল না কেন? কোনও টেনশন চলছে নাকি?”

সৌম্য বেশ অবাক হল। এত হাজার কিলোমিটার দূর থেকে ওর মনের কথাটা দেবুদা ধরে ফেলেছে ঠিক। বলল, “হ্যাঁ, মানে একটু চিন্তায় আছি দেবুদা।”

“বলে ফেল। চিন্তার তরঙ্গ ইন্ডিয়া থেকে ইংল্যান্ডে ট্রান্সফার হলে সেটার ভর তোর মাথার মধ্যে অনেকটা কমে যাবে।” তারপর মন দিয়ে সব কথা শুনে মুখ খুলল, “ব্যাপারটা বেশ ঘোরালো মনে হচ্ছে। কয়েকদিন সময় দে আমাকে। আমারও চেনাশোনা লোকজন কিছু আছে লন্ডন পুলিশে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে খোঁজখবর নিচ্ছি। ইতোমধ্যে তুই ইউকের ভিসা অ্যাপ্লিকেশনটা করে দে। চলে আয় আমার কাছে।”

“আমি লন্ডন যাব?”

“হ্যাঁ, তোকে তো আগেও অনেকবার বলেছি। তুই তো জানিস রেডিং-এর বাড়িতে আমি একাই থাকি। আমার এখানেই থাকবি। লন্ডন থেকে মাত্র আধঘণ্টার দূরত্ব। আমি তোকে একটা ইনভিটেশন লেটার পাঠাচ্ছি। তোর ভিসা অ্যাপ্লিকেশনে সুবিধা হবে, বুঝলি?”

দেবুদার যেমন কথা তেমন কাজ। মিনিট পনেরোর মধ্যেই ওর ইউনিভার্সিটির লেটার-হেডে ইনভিটেশন মেল চলে এল। তারপর নিজের ঘরে এসে ল্যাপটপ খুলে ইউকের টুরিস্ট ভিসা অ্যাপ্লিকেশনটা করে দিল সৌম্য। ঈপ্সিতাও ওকে লন্ডনে যাওয়ার কথা বলেছিল। তখন ব্যাপারটা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু ওর নিরুদ্দেশের খবরটা শোনার পর থেকে বুকের ভেতরটা খুব ফাঁকা লাগছে।

পরের দিন অফিস থেকে ফেরার পথে কসবাতে অ্যাক্রোপলিস মলের পাশে ইউকের ভিসা অফিসে পাসপোর্ট জমা দিতে হবে। এক সপ্তাহের মধ্যে ভিসা এসে যাবে আশা করা যায়। এর মধ্যেই অনেক কিছু গুছিয়ে নিতে হবে তাকে। ভাবল ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে নেবে কালকেই।

মাঝরাত পেরিয়ে যাচ্ছে। বিছানায় শুয়ে এ-পাশ ও-পাশ করছে সৌম্য। কিন্তু ঘুম আসছে না। ওর পাঠানো পুরোনো নোটবুকটা পাওয়ার পরেই ঈপ্সিতা নিরুদ্দেশ অথবা কিডন্যাপ হল। তাহলে রহস্যটা কি নোটবুককে নিয়ে? সেটার মধ্যে কি এমন কোনও তথ্য ছিল, যার জন্য ঈপ্সিতার প্রাণসংশয় হতে পারে? নোটবুকটা ওদের বাড়িতে এল কীভাবে? সৌম্য ভাবল কালকে অফিস থেকে ফিরে আবার যাবে ঈপ্সিতার ঘরে। আরও ভালো করে খুঁজতে হবে। দেখতে হবে সেখানে আরও কিছু জানা যায় কি না।

কিন্তু পরের দিন যে এমন অশনিসংকেত পাওয়া যাবে সেটা সৌম্য দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেনি। বসকে এমার্জেন্সি ছুটির দরখাস্ত দিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে ভিসা অফিসের কাজ সেরে সোজা চলে গেল স্থানীয় ইতিহাসবিদ কার্তিক ঘোষের বাড়ি। অঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে কার্তিকবাবু প্রচুর গবেষণা করেছেন। বেশ কিছু বইও আছে ওঁর লেখা। সৌম্যর বাবার সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল কার্তিকবাবুর। সেই সূত্রেই আলাপ। এখন ওদের পাড়ার পুরোনো বাড়ি ছেড়ে বালিগঞ্জে মেয়ের বাড়িতে থাকেন। নব্বইয়ের কাছাকাছি বয়স। বাড়ি থেকে বাইরে বের হন না। তবু ওঁর সঙ্গে দেখা করাটা জরুরি। বছর পাঁচেক আগে পাড়ার এক রক্তদান শিবিরে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য দল বেঁধে গিয়েছিল সৌম্য। তখনই বাড়িটা চিনে এসেছে। বাইক নিয়ে পৌঁছতে বেশি সময় লাগল না।

পিকনিক গার্ডেন রোডে জার্মান হোমিওপ্যাথি ওষুধ দোকানের উপরে একটা ফ্ল্যাটে থাকেন উনি। সিঁড়ি দিয়ে উঠে কলিং বেল চাপতে দরজা খুলে গেল।

“কাকে চাই?” একজন পরিচারিকা দরজা খুলে মুখ বার করেছেন।

“কার্তিকবাবু আছেন? ওঁর সঙ্গে দেখা করব।”

“উনি কারও সঙ্গে দেখা করেন না। শরীর ভালো নেই।”

“ওঁকে বলুন, নন্দনপুর থেকে শিবনাথ প্রামাণিকের ছেলে এসেছে। মিনিট পাঁচেক কথা বলে চলে যাব। খুব জরুরি দরকার।”

“আচ্ছা দাঁড়ান একটু, জিজ্ঞেস করে আসি।” বলে মহিলা ভিতরে চলে গেলেন। দু-মিনিটের মধ্যে ফিরে এসে সৌম্যকে ডেকে নিয়ে গিয়ে হাজির করলেন কার্তিকবাবুর সামনে।

একটা ঘরে খাটের উপর শুয়ে ছিলেন বৃদ্ধ মানুষটি। মহিলা তাঁকে ধরে বসিয়ে দিলেন, পিঠে বালিশের হেলান দিয়ে। ঘোলাটে চোখের উপর মোটা কাচের চশমাটা পরে তিনি সৌম্যর দিকে তাকালেন। সৌম্য সামনের চেয়ারে বসার আগে কার্তিকবাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলল, “আমি ছোটোবেলায় বাবার সঙ্গে আপনার পুরোনো বাড়িতে বেশ কয়েকবার গেছি।”

তিনি একটু কেশে নিয়ে ফোকলা গালে ধীরে ধীরে বললেন, “শিবনাথ আমার ছাত্র ছিল। খুব ভালো ছেলে। তুমি কেমন আছ বাবা?”

সৌম্য গলা উঁচিয়ে জানতে চাইল, “আমি ভালো আছি স্যার। একটা পুরোনো কথা জানার জন্য আপনার কাছে ছুটে এসেছি। বাবা বলতেন আপনি স্কুলে শিক্ষাকতা করার আগে অ্যালবিয়ান জুটমিলে কয়েক বছর কাজ করেছিলেন। তাই তো?”

কার্তিকবাবু নিঃশব্দে উপর-নীচে মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ।”

সৌম্য আবার প্রশ্ন করল, “অ্যালবিয়ান জুটমিলে নদীর ধারে একেবারে শেষ প্রান্তে একটা পুরোনো বাংলো আছে। মনে আছে আপনার?”

তিনি কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর মুখ খুললেন, “একটা খুব বড়ো তেঁতুল গাছ ছিল ওখানে। এখনও আছে?”

“তেঁতুল গাছ? হ্যাঁ, আছে তো। বাগানের উত্তরদিকে। ওই বাংলোতে কে থাকতেন মনে আছে আপনার?”

আবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন তিনি। একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “ওটা তো ফাঁকাই পড়ে থাকত। আমি কোনোদিন কাউকে থাকতে দেখিনি ওখানে। সবাই বলত জায়গাটা গরম, মানে ওখানে অপদেবতার বাস।”

“একটু মনে করার চেষ্টা করুন স্যার। কেউ না কেউ তো নিশ্চয়ই থাকত ওই বাংলোয়।”

“নাহ্‌, মনে করতে পারছি না।”

সৌম্য এবার অন্য একটা প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, আপনি রবার্ট কক্স নামে কাউকে চিনতেন? নাম শুনেছেন কখনও?”

“রবার্ট কক্স! হ্যাঁ, এই নাম আমি কোথাও দেখেছি মনে হচ্ছে।”

আরও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পরিচারিকাকে হাঁক দিলেন, “মালতী, ওই র‍্যাকের মাথা থেকে পুরোনো ছবির অ্যালবামটা পেড়ে দাও তো।”

মহিলা ছবির অ্যালবাম নামিয়ে দিতে ধীরে ধীরে পাতাগুলো ওলটাতে লাগলেন তিনি। সাদা-কালো সব পুরোনো ছবিগুলো মোটা হলদে হয়ে যাওয়া কাগজের গায়ে আটকানো আছে। শেষের দিকের একটা পাতায় চোখ আটকে গেল কার্তিকবাবুর। একটা ছবিতে আঙুল রেখে বললেন, “মনে পড়েছে। এই ছবিটা বিশ্বকর্মা পুজোর সময়ে তোলা। খুব ধুমধাম করে বিশ্বকর্মা পুজো হত কারখানায়। আমার বয়স তখন পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। মিলের বোর্ডের সামনে ইয়াশিকা ক্যামেরায় ছবিটা তুলে দিয়েছিল রবিনদা। ওই বোর্ডের লেখাটা দেখো। বুঝতে পারছ কিছু?”

সৌম্য এগিয়ে গিয়ে দেখল, একজন শার্ট-প্যান্ট পরা অল্পবয়সি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। পিছনে অ্যালবিয়ান জুটমিলের নাম বড়ো বড়ো করে লেখা।

কার্তিকবাবু আবার মুখ খুললেন, “দেখো মিলের নামের নীচে ছোটো ছোটো করে লেখা আছে, চিফ ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট কক্স। কিন্তু আমরা অ্যালবিয়ান জুটমিলে কাজে ঢোকার অনেক আগেই উনি এখান থেকে চলে গিয়েছিলেন। শুনেছি যখন এই মিল তৈরি হয়েছিল, কক্স সাহেব সবকিছুই নিজের হাতে প্ল্যান করেছিলেন। মিলের পুরো ড্রয়িং, মেশিনপত্র সব ওঁর নির্দেশে তৈরি।”

“তাহলে রবার্ট কক্স কি নিজেই থাকতেন ওই বাংলোতে?”

“হতেও পারে।”

“এই বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও তথ্য আছে কারও কাছে?”

“সে তো প্রায় সত্তর বছর আগের ঘটনা। তখন তো ওই এলাকা অন্যরকম ছিল। তুমি একটা কাজ করো, নন্দনপুরে একটা পুরোনো ক্যাথলিক চার্চ আছে, সেখানে ফাদার জোসেফের সঙ্গে দেখা করো। আমার কথা বলবে ওঁকে গিয়ে। ওঁর কাছে চার্চের পুরোনো দস্তাবেজ আছে। রবার্ট কক্স নিশ্চয়ই চার্চে যেতেন। সেখানে ওঁর সম্পর্কে তথ্য হয়তো থাকবে।”

“অনেক ধন্যবাদ স্যার আমাকে সময় দেওয়ার জন্য।”

সৌম্য ওঁকে বিদায় জানিয়ে ফ্ল্যাটের নীচে এসে বাইকে স্টার্ট দিল। সন্ধ্যা নেমেছে। হেলমেট পরার সময় স্ট্রিট লাইটের আলোয় দেখল রাস্তার উলটোদিকে দুজন নেপালি লোক দাঁড়িয়ে কথা বলছে। হাতে সিগারেট। হলুদ অ্যাপাচে বাইকের উপর বসে আছে একজন। সৌম্যর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মুখটা ঘুরিয়ে নিল। এদের দুজনকে আগেও সৌম্য দেখেছে। ভিসা অফিসের বাইরে গাছের নীচে দাঁড়িয়ে ছিল ওরা। বার বার ঘুরে ওর দিকেই তাকাচ্ছিল। লোকগুলো কি ফলো করছে ওকে?

বাইক নিয়ে বালিগঞ্জ ফাঁড়ির দিকে এগোল সৌম্য। সেখান থেকে ঘুরে গড়িয়াহাট মোড় হয়ে রাসবিহারী অ্যাভিনিউর দিকে যাওয়ার সময় আচমকা একটা সাদা সুমো গাড়ি পিছন থেকে জোরে ছুটে এল ওর দিকে। শেষ মুহূর্তে সৌম্য বাইকের মুখটা ঘুরিয়ে নিয়েছিল তাই ধাক্কাটা লাগেনি। কালো কাচ দেওয়া গাড়ি। ভিতরে কে বা কারা আছে বোঝা গেল না। তিরবেগে ছুটে গেল হাজরার দিকে। গাড়ির নম্বরের শেষ চারটে সংখ্যা দেখে নিয়েছে সৌম্য। কিন্তু ধাওয়া করার আগেই মাঝের সিগন্যাল পড়ে গেছে। দাঁড়িয়ে পড়তে হল ওকে। লুকিং গ্লাসে দেখল ওর পিছনে দুটো গাড়ির পরে সেই হলুদ অ্যাপাচে। শ্যাওলা রঙের টি-শার্ট পরা দুজন নেপালি। যদিও ওদের মুখ বোঝা যাচ্ছে না। কালো হেলমেটে ঢাকা।

ট্রাফিক লাইট সবুজ হতে সৌম্য সোজা এগোল দুর্গাপুর ব্রিজের দিকে। নিউ আলিপুর হয়ে তারাতলা রোড ধরবে। কিন্তু ওকে ভাবাচ্ছিল এই ছোটো ছোটো ঘটনাগুলো। নেপালি লোক দুটো গোটা রাস্তা বেশ দূরত্ব রেখে সৌম্যকে অনুসরণ করে চলেছে। কারা এরা? ও ভেবে দেখল, এদের কাছ থেকে পিছু ছাড়ানোর একটাই রাস্তা, জোরে গাড়ি চালিয়ে একটা সিগন্যাল এগিয়ে যাওয়া। ডানহাতে অ্যাক্সেরেলেটর ঘুরিয়ে স্পিড নিল বাইকে। প্ল্যানটা কাজে লেগে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পিছনে আর দেখতে পেল না লোকগুলোকে।

কিন্তু তারাতলা পেরোতেই ফাঁকা রাস্তায় মেরিন কলেজের উলটোদিকের রাস্তা থেকে চোখের পলকে সাদা সুমোটা পাশ থেকে ধাক্কা মারল সৌম্যর বাইককে। ও ছিটকে পড়েছে গার্ড-রেলের পাশে। মাথায় হেলমেট ছিল বলে খুব জোর বেঁচে গেছে। বাইকে ধাক্কা মেরে অন্ধকারের মধ্যে গাড়িটা ঝড়ের বেগে ভ্যানিশ হয়ে গেছে। আশপাশ থেকে মেরিন কলেজের ছেলেরা ছুটে এসে ওকে চাগিয়ে তুলল রাস্তা থেকে। কিন্তু এ কী! ও তো নিজের পায়ে দাঁড়াতেই পারছে না। হয় পায়ের গোড়ালি ভেঙেছে, না-হলে মোচড় লেগেছে। বাইকটাকেও সোজা করা গেল না। হ্যান্ডেল বেঁকে গেছে। ব্রেক অয়েল লিক করে ছড়িয়ে আছে রাস্তাময়।

অযাচিতভাবে কলেজ-পড়ুয়া ছেলেমেয়েগুলো ওকে অনেকটা সাহায্য করল। চোখে-মুখে জল দিয়ে পাশে চায়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে বসাল। সৌম্যর পা দুটো থরথর করে কাঁপছে তখনও। বাঁ-পায়ের গোড়ালিটা ফুলেছে খুব। এখুনি ডাক্তারের কাছে দৌড়তে হবে। কিছুটা দূরে একটা বাইক সারানোর দোকান আছে, সেখানে বাইকটাকে টেনে নিয়ে গিয়ে ঢুকিয়ে দিল। গাড়ি ঠিক করে রাখবে ওরা। দু-দিন পরে আসতে বলল নিয়ে যাওয়ার জন্য। তারপর একটা ট্যাক্সি ডেকে তুলে দিল ওকে।

ডাক্তার দেখিয়ে, এক্স-রে করিয়ে, ওষুধ কিনে সৌম্য যখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাড়ি ঢুকল তখন রাত দশটা বেজে গেছে। মাকে আগেই ফোনে জানিয়ে দিয়েছিল অ্যাক্সিডেন্টের কথা। শুধু এটা বলেনি যে অ্যাক্সিডেন্টটা কেউ ইচ্ছাকৃত ঘটিয়েছে।

“এক্স-রে কী বলছে?” মা জানতে চাইল।

সৌম্য জানাল, “ভাঙেনি, গোড়ালিটা মচকেছে শুধু। ডাক্তার হাড় বসিয়ে দিয়েছেন। দু-দিন রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে।”

“দু-দিন নয়, এক সপ্তাহের আগে বাড়ির বাইরে বেরোবি না একদম। চুপচাপ শুয়ে থাক বিছানায়।”

মায়ের সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে নিজের ঘরে চলে গেল সৌম্য।

একটি আহত টিয়া

শিকাগো শহরে মিশিগান লেকের পাশে পার্কের মাঝে একটা বিশাল বড়ো প্রাচীন শিমুল গাছ আছে। বহুদিন ধরে তার ডালপালার খাঁজে অজস্র সন্ন্যাসী টিয়া মানে ‘মংক প্যারট’ বাসা করে আছে। মাঝারি মাপের সবুজ রঙের টিয়াগুলি ঝাঁক বেঁধে বসে ট্যাঁ ট্যাঁ করে আওয়াজ করে দিনভর। কখনও খাবারের খোঁজে উড়ে যায় দূরে। আবার ফিরে আসে সন্ধ্যা হওয়ার আগে। অনেক বছর আগে এদের কোনও একজোড়া পূর্বসূরি উড়ে এসেছিল সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার অ্যামাজনের জঙ্গল থেকে। এখন এরা বাচ্চাকাচ্চা পরিবার নিয়ে সবাই এই আধুনিক শহরের স্থায়ী বাসিন্দা। সেই দলেরই একটা পাখি মনের আনন্দে উড়ছিল আকাশে। হঠাৎ তার ডানাটা ঝনঝন করে উঠল। টাল সামলাতে না পেরে সোজা নেমে এসে পার্কের রাস্তার পাশে ঝোপের মধ্যে পড়ে রইল। সামান্য ঘটনাটা কারও নজরে গেল না।

আজকে শিকাগোতে ঝকঝকে রৌদ্রোজ্জ্বল চনমনে একটা সকাল। প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন অনেকেই। বেশ কিছু মানুষ লেকের ধারে শরীরচর্চা করছেন, অনেকে দৌড়াচ্ছেন পার্কের রাস্তা দিয়ে। বাচ্চা ছেলেমেয়েরা সাইকেল চড়ছে।

লিও রয় প্রতিদিনের মতো সকালের জগিং করতে ব্যস্ত। ব্লু-টুথে পছন্দের সংগীত বাজছে। ঠিক সেই সময়ে ফোনটা বেজে উঠল। কানেক্ট করে লিও ‘হ্যালো’ বলতে অপর প্রান্ত থেকে খাঁটি আমেরিকান উচ্চারণে ভেসে এল ফিনিতের চেনা গলা, “কী ভায়া! দৌড়চ্ছ নাকি?”

“হ্যাঁ, তুমি তো জানো আমার রোজকার রুটিন। মিনিট পনেরো হল হ্যারল্ড পার্কে ঢুকেছি।”

“বেশ, তোমার মতো লোকের শরীরচর্চা করাটা খুব জরুরি। কিন্তু একটু সাবধানে থেকো, বুঝলে!”

“কেন বলো তো?”

“তোমার শত্রুরা সব চারদিকে ওত পেতে আছে। কখন কী হয়, তা কি বলা যায়?”

“ধুর! কী যে বলো, আমার আবার শত্রু এল কোথা থেকে? আমি সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে রিটায়ার্ড লাইফ কাটাচ্ছি। হেঁয়ালি না করে যেজন্য ফোন করেছ, সেটা বলে ফেলো।”

ফিনিত গলা ঝেড়ে নিয়ে বলল, “একটা কাজের খবর এসেছে ভাই। করবে নাকি?”

“কীরকম কাজ?”

“বিস্তারিত জানি না। তবে ওরা শুধু তোমার সঙ্গেই যোগাযোগ করতে বলেছে। অন্য কোনও লোক ওদের পছন্দ নয়। ব্যাপারটা খুব আর্জেন্ট। তাই মাঝরাতে উঠে তোমাকে এখন ফোন করছি।”

“মাঝরাত কোথায়, এখন তো সকাল।”

“আমি এখন মস্কোতে। ওরা জানাল, তুমি শুধু হ্যাঁ বললেই তোমার সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পঞ্চাশ হাজার ডলার জমা পড়বে।”

লিও দৌড় জারি রেখেই জানতে চাইল, “এই ওরাটা কারা? খোলসা করে বলো।”

“লিয়ন্স গ্রুপের নাম শুনেছ নিশ্চয়ই?”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লিও মুখ খুলল, “গ্লাসগোর সেই লিয়ন্স ফ্যামিলি কি? শুনেছি তারা নাকি সব আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে। গ্রুপের বেশিরভাগ লোকই তো জেল খাটছে। আর বাকিরা মারা গেছে।”

“ঠিকই শুনেছ। আসল কথা হল যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, স্পেন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার বহু দেশে এদের মাদক পাচার, মানি লন্ডারিং, কন্ট্রাক্ট কিলিং, অস্ত্র পাচার, তোলাবাজি, ব্ল্যাকমেলিংয়ের কারবার ছিল। তবে সেটা আট থেকে নয়ের দশকের কথা। এখন আর সে-সব কিছু নেই। বর্তমানে ওদের যা-কিছু ব্যাবসা চলছে সেগুলো সব হোয়াইট।”

“আমাকে কী করতে হবে?”

“তা আমি জানি না ভাই। তবে কাজটা যে সাধারণ নয় সেটা আন্দাজ করা যায়। নইলে এত টাকা অফার করত না।”

“তুমি কিছু না জেনেশুনে মস্কো থেকে ফোন করেছ এত রাতে! এটা বিশ্বাস করতে পারলাম না ভায়া। সত্যি কথাটা ঝেড়ে কাশো। নইলে ফোন কাটছি।”

“দাঁড়াও লিও ভাইটি। ফোন কেটো না। আমার হাতে একদম সময় নেই। কাজটা তোমাকে নিতেই হবে।”

“কেন? এমন কী কাজ যেটা আমি ছাড়া কেউ করতে পারবে না?”

“ওদের কাছে খবর আছে, তুমি ইউ.এস. মিলিটারিতে ছিলে, তোমার বাবা ছিলেন ভারতীয় এক বিজ্ঞানী, মা অ্যামেরিকান এবং তুমি একসময় সরকারি স্পাই ছিলে, এখন রিটায়ার করেছ। তোমার বয়েস বেড়েছে, কিন্তু বুদ্ধি আর শক্তিতে যে এখনও মরচে পড়েনি, সে-খবর ওরা রাখে।”

“বিষয়টা কী? এত লম্বা না করে বলে ফেলো।”

“অ্যালকেমি সম্পর্কে তোমার ধারণা আছে নিশ্চয়ই?”

“মানে অপরসায়ন?”

“হ্যাঁ। এরা মনে করে, লোহায় যদি অক্সিডাইসড হয়ে মরচে পড়ে ধাতুর গুণগত রূপান্তর হতে পারে, তাহলে  অন্য কোনও পদ্ধতিতে সাধারণ ধাতুকে সোনা বা রূপার মতো মূল্যবান ধাতুতে পালটে ফেলাও সম্ভব। হাজার বছর ধরে খোঁজ চলছে। এই পদ্ধতিকেই বলে অ্যালকেমি বা ট্রান্স-মিউটেশন, আর যাঁরা এই কাজ করতেন তাঁদের অ্যালকেমিস্ট বলা হত।”

“কিন্তু ওসব তো বাতিল চিন্তাভাবনা।”

“না ভায়া, পুরোটাই বাতিল নয়। তবে আমি শুনেছি অ্যালকেমিস্টরা নাকি শুধুমাত্র সাধারণ ধাতুকে সোনা বা রূপায় রূপান্তর করা ছাড়াও অনেক গভীর চিন্তাভাবনা আর বিস্তারিত গবেষণার কাজও করতেন। প্যারা-সাইকোলজি, মিস্টিরিয়াস রিলিজিয়ন, টেলিপ্যাথি, প্যারালাল ইউনিভার্স ইত্যাদি।”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লিও উত্তর দিল, “তার মানে কি তুমি বলতে চাইছ আমাকে ড. রিচার্ডের মৃত্যুর তদন্ত করতে হবে?”

“এতক্ষণে আমি বুঝতে পারলাম লিয়ন্সরা তোমার কথাই কেন বলেছে? এই হাঁ করলে হাওড়া বুঝতে পারার ক্ষমতা সবার মধ্যে নেই, বুঝলে?”

“বুঝলাম। ওদের বোলো অন্য লোক দেখতে।”

“কেন ভায়া? আমি মাঝখানে কিছু কমিশন পাব, বুঝতেই তো পারছ। তা সে-গুড়ে বালি দেবে?”

“ড. রিচার্ড একজন পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানী। শুনেছিলাম তিনি কোনও গোপন বিষয় নিয়ে রিসার্চ করছিলেন এবং এই রিসার্চের পিছনে কয়েকশো মিলিয়ন ডলারের খেলা চলছে। খবরে দেখলাম গত সপ্তাহে লন্ডনে তাঁর নিজের বাড়িতে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। যদিও পুলিশ প্রথমে বুঝতেই পারেনি যে সেটা হার্ট অ্যাটাক, না হত্যা। পরে অটোপসিতে ড. রিচার্ডের শরীরে একটা সূক্ষ্ম বিষ ধরা পড়ে। তারপর থেকে ওঁর পরিচারিকাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। গতকাল টাইমস নিউজে দেখলাম, ব্রিস্টলের কাছে ওঁর পরিচারিকা মিসেস ডিকের মৃত্যু হয়েছে একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে। এরপর আজ তোমার ফোন। দুইয়ে দুইয়ে চার করে নিতে খুব একটা অসুবিধা হল না। এসবের মধ্যে লিয়ন্সরা কেন জড়াচ্ছে? আমার মন বলছে সাংঘাতিক কোনও প্ল্যানিং আছে এর ভিতরে। আমি এসবে নেই, জানিয়ে দিও ভায়া। এখন বেশ শান্তিতে আছি।”

“আরে শোনো ভাইটি, তুমি একবার সরাসরি মি. লিয়ন্সের সঙ্গে দেখা করে নাও। তারপর কাজটা পছন্দ না হলে ওঁকে জানিয়ে দিও।”

ফোনটা কেটে দিল লিও। পার্কের কিনারে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে সে। নির্মেদ শরীর ঘামে ভিজে গেছে। তার কাঁচাপাকা জুলপির ভিতর দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে শক্ত চোয়ালে। সামনে মিশিগান লেকের টলটলে নীল জল। আকাশের গায়ে দূরে সার দিয়ে সাদা বকের দল উড়ে যাচ্ছে। বড়ো সুন্দর দৃশ্য। বেশ কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল লিও। ভাবছিল, তার জীবনটাও ওই সাদা বকেদের মধ্যে হতে পারত। কিন্তু এই বিপদসংকুল পথ ওর নিজের বেছে নেওয়া। যদিও বহুবছর হল সেই রাস্তা ছেড়ে দিয়েছে সে। কিন্তু ফিনিতকে যতদূর চেনে, ও লিওর পিছু ছাড়বে না কিছুতেই। মোটা টাকার রফা হয়েছে। সেটা ওর কথা শুনেই বোঝা যায়।

ফেরার পথ ধরতেই ব্লুবেরি ঝোপের নীচে দৃষ্টি আটকে গেল ওর। একটা টিয়াপাখি পড়ে আছে। ক্ষীণ স্পন্দন চোখে পড়তে দ্রুত হাত বাড়িয়ে সে তুলে নিল পাখিটাকে। আহত হয়েছে। ডানার নীচে রক্তের দাগ। ক্ষতটা খুঁটিয়ে দেখে ওর মনে হল একটা এয়ারগানের গুলি ডানাটাকে ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে। পাখিটা ডানাটিকে নাড়ার চেষ্টা করেও ক্লান্ত হয়ে নেতিয়ে পড়ল। লিওর মনে হল এর বাঁচার সম্ভাবনা খুব বেশি নেই। তবুও শেষ চেষ্টা করে দেখল সে। পাখিটাকে ঘাসের উপর শুইয়ে লেকের জল আঁজলাভরে তুলে ছিটিয়ে দিল। দু-তিনবার করতে পাখিটার শরীরে নতুন করে প্রাণসঞ্চার হল যেন। ঠোঁটের কোনা দিয়ে কিছুটা জল গড়িয়ে গেল তার জিভে। ফেরার পথে পুরোনো শিমুল গাছটার ডালের খাঁজে পাখিটাকে রেখে দিল লিও। মনে মনে বলল, ‘ক’দিন এখানেই থাকো বন্ধু, ফিরে এসে দেখা হবে।’

আরব সাগরের তীরে

বিমানটা অন্ধকার আকাশে তিনবার চক্কর দিয়ে নেমে এল ‘জায়েদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট’ আবুধাবিতে। লিও হিথরো থেকে এমিরেটস এয়ারলাইনসের জানালার পাশে সিট বুক করেছিল। লম্বা সফরে লোকে বার বার ওয়াশ-রুম যায়, তাই ভিতরের দিকের সিটে বসলে টানা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে না। দু-বার খাবার দিয়েছে ফ্লাইটে। সেগুলো পেটে চালান করে চোখে কভার চাপিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে লিও। কিছুক্ষণ আগে ক্যাপ্টেনের অ্যানাউন্সমেন্ট শুনে তন্দ্রা ছেড়ে সোজা হয়ে বসল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল জ্বলজ্বল করছে ছোট্ট বালির শহর আবুধাবি। যদিও আলোগুলো জড়ো হয়ে আছে সীমিত জায়গার মধ্যে, বাকিটা অন্ধকার। একদিকে আরব সাগর, অন্যদিকে ধু ধু বালি।

আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন পেরিয়ে বিমানবন্দরের বাইরে আসতে আধঘণ্টা সময় লাগল লিওর। দুধসাদা পোশাকে লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেল ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে। ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলে উঠে পড়ল পিছনের সিটে। বাইরে বেশ গরম। কিন্তু গাড়ির ভিতরটা ঠান্ডা। এখান থেকে দুবাই পৌঁছতে ঘণ্টা খানেক সময় লাগবে। প্রথম গন্তব্য দুবাই মল। চব্বিশ ঘণ্টা সারাবছর খোলা থাকে বিশ্বের আধুনিকতম ধনীদের এই বাজার। বিশ্বের সমস্ত নামি কোম্পানির সেরা জিনিস সর্বপ্রথম এসে হাজির হয় এখানে। লিও এর আগেও দু-বার গেছে। কিন্তু তখন সঙ্গে অন্য কেউ ছিল। দুবাই মলের গা ঘেঁষে উঠেছে আকাশচুম্বী বুর্জ খলিফা। সিটের পিছনে মাথাটা হেলিয়ে দিল সে। চোখটা আধবোজা হয়ে খোলা রয়েছে, দৃষ্টি বাইরের দিকে। মাঝে বেশ কিছুটা সময় রাস্তার উপর শুধু স্ট্রিট লাইটগুলো চোখে পড়ছে। দুবাই ঢোকার পরে শুরু হল চোখ ধাঁধানো আলো আর ঝকঝকে অট্টালিকার সারি। সমুদ্রপাড়ে আনুমানিক আশি কিলোমিটার লম্বা একটা আধুনিক মরু শহর।

একগোছা দিরহাম ড্রাইভারের হাতে দিয়ে দুবাই মলের আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিংয়ে ট্যাক্সিটাকে ওয়েটিংয়ে রেখে লিও লিফটে করে উঠে এল সেকেন্ড লেভেলে। চারদিকে ঝলমল করছে আলো আর নামি সব ব্র্যান্ডের শো-রুম। ডানদিকে বেঁকে কিছুটা এগিয়ে আইস রিংয়ের সামনে দাঁড়াল সে। মাঝখানে কাচে ঘেরা ফুটবল মাঠের মতো বড়ো একটা জায়গায় বরফ জমিয়ে সাদা স্কেটিং রিং বানানো হয়েছে। যেন মরুভূমির মধ্যে বিশাল বড়ো একটা রেফ্রিজারেটর বসিয়ে রেখেছে আরব শেখেরা। বাইরের তাপ যখন পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি, ভিতরে জিরো ডিগ্রিতে বাচ্চাকাচ্চারা বরফের উপর দৌড়াচ্ছে। মাঝরাতে লোকজন খুব কম। তবু কিছু টুরিস্ট আছে। সামনে দেয়ালজোড়া একশো ফুটের এল.ই.ডি-তে স্নো বিয়ার দৌড়াচ্ছে। লিও দেখল এল.ই.ডি-র উলটোদিকে ‘রিচার্ড মিল’-এর হাতঘড়ির শো-রুম। এটার সামনেই দাঁড়ানোর কথা ছিল লিওর। নিজের ঘড়ির দিকে তাকাল একবার। নির্ধারিত সময়ের আধঘণ্টা আগেই পৌঁছে গেছে ও। পিঠের ব্যাগ থেকে লাল রঙের টুপিটা বের করে মাথায় পরে নিল। এটাই বিশেষ চিহ্ন।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না লিওকে। আর একজন একই রঙের টুপি পরা মোটা মধ্যবয়স্ক লোক মিনিট দু-একের মধ্যেই হেলতে-দুলতে এসে হাজির হল লিওর সামনে। ওর দিকে না তাকিয়েই জানতে চাইল, “কোড?”

“ওয়ান থ্রি ফাইভ।”

লোকটা ট্রাউসারের পকেট থেকে একটা স্মার্ট ফোন বের করে এগিয়ে দিল লিওর হাতে। তারপর যেদিক দিয়ে এসেছিল তার উলটোদিকে চলে গেল জলহস্তির মতো। লিও ফোনটা অন করল। পিন নম্বর চাইছে। নম্বরটা লিও জানত আগে থেকেই। ফিনিত বলে রেখেছিল। টাচ প্যাডে আঙুল ছোঁয়াতেই খুলে গেল ফোন। ঠিক সেই মুহূর্তে মেসেজ ঢুকল। তাতে ক্লিক করতে দেখল একটা গুগল লোকেশন। লিও জোরে পা চলাল পার্কিংয়ের দিকে। ট্যাক্সি ড্রাইভারকে লোকেশনটা দেখাতে সে আফগানি টানে বলল, “প্লাম জুমেরিয়া। ভিলা নম্বর ১৫। ওকে, স্যার।”

“লেটস গো।”

ট্যাক্সি আবার ছুটল শহরের দক্ষিণদিকে। শেখ জায়েদ রোড ধরে ইন্টারনেট সিটির পাশ দিয়ে ডানদিকে বেঁকে ব্রিজের উপর দিয়ে পৌঁছে গেল একদম আরব সাগরের উপরে। সমুদ্রের বুকে কৃত্রিম দ্বীপের উপর আধুনিক বাংলো। দুবাইয়ের সবথেকে অভিজাত এলাকা। সবক’টা বাড়িতেই তিনদিকে সমুদ্র। সিকিউরিটির কড়াকড়ি পেরিয়ে ১৫ নম্বর ভিলাতে পৌঁছতে আরও কুড়ি মিনিট সময় লাগল লিওর। বাড়ির পেল্লায় দরজার সামনে দাঁড়াতেই ওর সদ্য পাওয়া ফোনে টিং করে একটা মেসেজ এল আবার। এটা একটা স্ক্যান কোড। সেটা লক সিস্টেমের সামনে ধরতে খুলে গেল দরজা। ভিতরের দৃশ্য যে-কোনো ফিল্মের ছবিকেও হার মানাবে। বিশাল বড়ো দেয়ালজোড়া অ্যাকোয়ারিয়াম। তার মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বড়ো বড়ো রঙিন মাছ। ঘরের মধ্যেই মস্ত বড়ো সবুজ গাছ ডালপালা ছড়িয়েছে। পায়ের নীচে মোটা কাচের মেঝে। তার নীচে ডলফিন ঘুরে বেড়াচ্ছে নীল জলে। সামনে অন্ধকার সমুদ্র। হালকা আলোয় সাদা ঢেউ জ্বলজ্বল করছে। লিও এগিয়ে গিয়ে দেখল একজন ভারী চেহারার বয়স্ক মানুষ পানীয়ের পাত্র পাশে নিয়ে বসে আছেন একা। পরনে সাদা বুক-খোলা সিল্কের গাউন। চুলদাড়ি সব সোনালি। ওর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, “স্বাগত মি. রয়। কেমন আছেন?”

“ধন্যবাদ, মি. লিয়ন্স। আমি ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন?”

ঘাড় নেড়ে তিনি বললেন, “খুব ভালো। আমার সামনের চেয়ারে বসুন।”

লিও বসল ওঁর সামনে।

“এখান পর্যন্ত আসতে কোনও সমস্যা হয়নি তো?”

লিও মাথা নেড়ে জানাল, “একেবারেই না।”

“পানীয় কিছু নেবেন?”

“না, ধন্যবাদ। আপনি কাজের কথাটা বলুন।”

“নিশ্চয়ই। তবে তার আগে আমি একটা বিষয়ে আপনার কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিতে চাই। আপনি ইউ.এস. আর্মির ফিল্ড এজেন্ট ছিলেন। ঠিক তো?”

লিও মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনেছেন। তবে অতীতে কোথায় কী করেছি, সে-সব বিষয়ে মুখ খোলা বারণ।”

“জানি। আসলে আমি একজন অভিজ্ঞ লোক চাইছিলাম এই কাজের জন্য। আপনি সেদিক থেকে পারফেক্ট।”

“আমি ঠিক বুঝলাম না মি. লিয়ন্স। আমার কাজটা কী?”

“একটা মিসিং কোড খুঁজে বের করতে হবে আপনাকে। একটা থিসিস বা ফরমুলা বা ডায়েরি হতে পারে। ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলছি। তার আগে বাইরে যে ট্যাক্সি ড্রাইভারকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, তাকে ছেড়ে দিই। ও-লোকটা একজন রাশিয়ান এজেন্ট। বেশিক্ষণ এখানে থাকালে আমাদের সিকিউরিটির সমস্যা হতে পারে।”

বলে মি. লিয়ন্স নিজের রিস্ট ওয়াচের মাধ্যমে কাউকে ট্যাক্সি ড্রাইভারটাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। তারপর শুরু করলেন, “১৯৪০ সালে রাশিয়ার কয়েকজন বিজ্ঞানী গবেষণা করছিলেন একটা প্রোজেক্টের উপর। প্রাচীন অ্যালকেমি পদ্ধতির সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানকে যুক্ত করে প্যারালাল ইউনিভার্সে পৌঁছানোর একটা রাস্তা বানানোর চেষ্টা করছিলেন। মনে করুন আমরা পৃথিবীর একটা স্তরে বাস করছি। এরকম আরও অনেকগুলো স্তর একই সময়ে পৃথিবীতে অবস্থান করছে। দুর্ভেদ্য কিছু দেয়াল সেই স্তরগুলোকে আলাদা করে রেখেছে। একটা স্তর থেকে অন্য স্তরে যাওয়া-আসার যদি কোনও রাস্তা বা ব্রিজ তৈরি করা যায়, তাহলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইনফর্মেশন সেখান থেকে পাওয়া যাবে।

“এখন যে ওয়ার্মহোলের থিওরি নিয়ে কাজ হচ্ছে, ব্যাপারটা অনেকটা সেইরকম। যদিও এই থিওরিটার সূত্রপাত রাশিয়ান বিজ্ঞানীদের দ্বারা হয়নি। এরও অনেক আগে ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ হেনরি প্রচুর খরচ করে অ্যালকেমিস্টদের দিয়ে এই কাজ করাতেন। ওঁদের একটা গুপ্ত সংগঠন ছিল। এর প্রমাণ আছে। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেই সংগঠনের অনেক মানুষ মারা যান। গবেষণার নোটস সব হারিয়ে যায়। রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা নতুন করে শুরু করেছিলেন। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানরা সেই গবেষণাগার গুঁড়িয়ে দেয়। বন্ধ হয়ে যায় সমস্ত এক্সপেরিমেন্ট।”

লিও এতক্ষণ থেকে চুপ করে শুনে হঠাৎ হাত তুলে থামাল মি. লিয়ন্সকে। বলল, “প্যারালাল ইউনিভার্স সম্পর্কে আপনি এত নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে? এটা তো একটা থিওরি মাত্র। প্রমাণিত সত্য নয়।”

মি. লিয়ন্স সামান্য হেসে উত্তর দিলেন, “তাহলে কয়েকটা ঘটনার কথা উল্লেখ করি। ১৯৩৭ সালে প্রশান্ত মহাসাগরের উপর আন্তর্জাতিক ডেট লাইনে নিরুদ্দেশ হয় অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের বিমান। ১৯৬২ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় অ্যামেরিকান সেনার বিমান ৭৩৯ নং ‘ফ্লাইং টাইগার’ প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে গুয়াম থেকে ফিলিপিনস যাওয়ার পথে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের কাছে উধাও হয়ে যায়। কয়েক বছর আগের ঘটনা, ৮ মার্চ ২০১৪, মালয়েশিয়ার কুয়ালালুমপুর থেকে বেইজিং যাচ্ছিল ফ্লাইট এম.এইচ-৩৭০, মাঝপথে হারিয়ে গেল। এছাড়াও অনেক বিমান আর জাহাজ গত একশো বছরের মধ্যে নিরুদ্দেশ হয়েছে যাদের অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও কোনও ট্রেস পাওয়া যায়নি। না পাওয়া গেছে কোনও ভগ্নাবশেষ, না ব্ল্যাক বক্স। ড. রিচার্ড এবং তাঁর টিম এই নিয়ে কাজ করছিলেন। তাঁর মতে, এই নিরুদ্দেশ হওয়া বিমান এবং জাহাজগুলো কোনোভাবে ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে সমান্তরাল পৃথিবীর অন্য জগতে পৌঁছে গেছে। এরকম ব্রিজ কখনো-সখনো প্রাকৃতিক কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্যে নিজে থেকেই তৈরি হয়। ড. রিচার্ড এই ব্রিজ কৃত্রিমভাবে তৈরি করার উপায় প্রায় বের করে ফেলেছিলেন। রবার্ট কক্স নামে এক ব্রিটিশের রিসার্চ পেপারের কিছু সাংকেতিক কোড এক্ষেত্রে মিসিং লিংকের কাজ করছিল। আমার মনে হয় ড. রিচার্ড তাঁর সাফল্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। দুঃখের বিষয় কয়েকদিন আগেই কে বা কারা তাঁকে হত্যা করেছে। তার মানে কেউ কি চাইছে না যে এই রাস্তাটা তিনি খুঁজে বের করুন?”

“মি. লিয়ন্স, আমার দুটো প্রশ্ন আছে।”

কথাটা শুনে তিনি ভ্রূ তুলে তাকালেন।

লিও বলল, “বিজ্ঞানী বিশ্বজ্যোতি রায়চৌধুরী আমার বাবা ছিলেন, এটা জেনেই মনে হয় আপনি আমাকে ডেকেছেন, তাই তো? প্রায় পঁচিশ বছর আগে উনিও প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে এরকম একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন।”

কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে পান পাত্রে একটা চুমুক দিয়ে মি. লিয়ন্স মাথা নেড়ে জানালেন, “হ্যাঁ, আমি জানি আপনার বাবার পরিচয়। সমান্তরাল বিশ্ব নিয়ে নিয়ে ড. রায়চৌধুরীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু গবেষণাপত্র রয়েছে। যতদূর মনে পড়ছে, ১৯৯৯ সালের জুন মাসে ব্যক্তিগত কোনও এক্সপেরিমেন্টের জন্য একটা জাহাজ ভাড়া করে তিনি হনুলুলু থেকে যাত্রা করেছিলেন। তারপরে আপনার বাবার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। আমার মনে হয় এই কেসটার সঙ্গে আপনি নিজেকে রিলেট করতে পারবেন। এবার আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নটা শুনি।”

লিও গলাটা একবার ঝেড়ে নিয়ে বলল, “আমার ধারণা, ড. রিচার্ড যে গবেষণা করছিলেন সেটার জন্য আপনার কোম্পানিই ইনভেস্ট করেছিল। ঠিক তো?”

মি. লিয়ন্স হেসে বললেন, “আপনি বুদ্ধিমান লোক। এটা অস্বীকার করে লাভ নেই যে ড. রিচার্ডের আকস্মিক মৃত্যুতে লিয়ন্স গ্রুপ বিশাল একটা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। কে বা কারা এই খুনটা করেছে, সেটা আমরা ঠিক খুঁজে বের করব। পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তেই তারা থাক না কেন কেউ নিস্তার পাবে না। আমি অনেক ভেবেচিন্তে এই কেসে আপনাকে দায়িত্ব দিয়েছি। আপনার সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অ্যাডভান্স জমা পড়ে গেছে। আপনার হাতে যে ফোনটা আছে সেটাতে এই কেস-সংক্রান্ত সমস্ত ফাইল আপলোড করে দিয়েছি। ইংল্যান্ড থেকে রবার্ট কক্স ইন্ডিয়াতে চলে গিয়েছিলেন। তারপর তাঁর আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। ওঁর রিসার্চ পেপারের কী হল, সেটা যেভাবেই হোক খুঁজে বের করার দায়িত্ব আপনার।” কিছুক্ষণ থেমে তিনি আবার বললেন, “দুবাই এয়ারপোর্টের সার্ভিলেন্স ক্যামেরার অ্যাক্সেস অনেকগুলো এজেন্সির হাতে আছে। আপনি চেষ্টা করবেন ছোটো কোনও এয়ারপোর্ট দিয়ে এ-দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার।”

“ওকে, গুড বাই মি. লিয়ন্স!”

লিও বাইরে আসতে দেখল তার জন্য গাড়ি রেডি। ল্যাম্বরগিনি ডিয়াব্লো। বার দুবাইয়ে ক্যানালের গায়ে হোটেল সিটাডেলের টপ ফ্লোরে একটা সুইট বুক করা ছিল লিওর নামে। ভোররাতে চেক-ইন করে টানা ছ’ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিল। তারপর দুবাই থেকে একশো কুড়ি কিলোমিটার দূরে ‘রাস-অল-খাইমা’ থেকে ওইদিন রাতে মুম্বইয়ের এয়ার টিকিট বুক করল লিও। রুম সার্ভিসে খাবার আনিয়ে পেট পুজোর পর কেসের ফাইলগুলোতে মনোনিবেশ করল সে। যত কেসটার ভিতরে ঢুকছে ততই ওর বাবাকে মনে পড়ছে। হঠাৎ একদিন লিওর জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। লিও তখন কলেজ ছাত্র। চাকরি জীবনে কত জটিল বিষয় তদন্ত করে সমাধান করেছে সে। কিন্তু ওর বাবার ফাইল ওকে কেউ খুলতে বলেনি। ও নিজেও খুঁটিয়ে দেখেনি কোনোদিন। এখন এসব দেখে মনের মধ্যে একটা ক্ষীণ আশা জেগেছে। সবার আগে ওকে ইন্ডিয়া যেতে হবে। কলকাতা। ওর পূর্বপুরুষ সেখানেই থাকতেন। বাবার ছোটোবেলাও কেটেছে সেখানে।

কিন্তু ওর পিছনে যে ফেউ লেগেছে সেটা বুঝতে পারল আরও কয়েক ঘণ্টা পরে। ধু ধু মরুভূমির মাঝে। একটা ট্যাক্সি বুক করে দিয়েছিল হোটেল থেকে। দুবাই পেরিয়ে যখন বাইরে এল, রাস্তার দু-দিকেই যতদূর চোখ যায় শুধু বালিয়াড়ি। মরুভূমির উপর দিয়ে চলে গেছে রাস্তা। মাঝে মাঝে কাঁটাগাছের ঝোপ। উটের সওয়ারি দেখা যাচ্ছে কখনো-সখনো।

প্রায় চল্লিশ মিনিট গাড়ি চলার পর আচমকা একটা টায়ার ফাটার শব্দ হল। ড্রাইভার গাড়িটা ডানদিক চেপে দাঁড় করিয়ে দিল রাস্তার গায়ে। নেমে গেল লোকটা। পিছনের চাকার দিকে তাকিয়ে মুখ দিয়ে চিকচিক করে আওয়াজ করল। লিও মুখ বাড়িয়ে জানতে চাইল, “কী হল?”

“পিছনের চাকা ফেটে গেছে।”

“স্টেপনি আছে তো? চাকা পালটাতে কত সময় লাগবে?”

“মিনিট দশেক সময় লাগবে। কিন্তু নতুন চাকা ফাটল কী করে?”

ড্রাইভারের কথা শুনে গাড়ির বাইরে এল লিও। চাকার দিকে লক্ষ করে বুঝতে পারল ড্রাইভার ঠিক কথাই বলছে। তখন দ্রুত সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ফাঁকা রাস্তা পেরিয়ে দু-দিকেই লাল আবির-মাখা বালির ঢেউ। একটাও গাড়ি নেই কোনোদিকে। দিগন্তে লাল সূর্য ডুবে গেল চোখের সামনে। গায়ের চামড়া-পোড়া তাপ কমে আসছে। ড্রাইভারটা মাথা নীচু করে গাড়ির চাকা খুলতে ব্যস্ত। সে বলল, “দেখুন এখানে। মনে হচ্ছে টায়ারে কেউ পেরেক পুঁতে দিয়েছে। এই ফাঁকা রাস্তায় এ-জিনিস এল কী করে?”

তার মানে লিওর উপর দূর থেকে লক্ষ রাখছে কেউ। কেউ কি ইচ্ছা করে এরকম লোহার পেরেক রাস্তায় ছড়িয়ে রেখেছে? লিওর মন বলল কিছু একটা হতে চলেছে। অচেনা ঝড়ের পূর্বাভাস এটা। এইসব বিষয়ে ওর সিক্সথ সেন্স ভালো কাজ করে।

ঠিক সেই সময়ই ওদের পিছন দিক থেকে একটা বড়ো গাড়ির হেড-লাইট চোখে পড়ল অন্ধকারের মধ্যে। লিও দ্রুত গাড়ির পিছনের সিট থেকে পিঠের ব্যাগটা নিয়ে লাফ দিল। গার্ড রেল টপকে ঝোপের পিছনে চলে গেল। মাথা নীচু করে বসে পড়ল সেখানে। কিন্তু নিজেকে আড়াল করার জায়গা খুব বেশি নেই। ও এখন নিরস্ত্র। অপরদিক থেকে যদি আধুনিক অস্ত্রের আক্রমণ হয়, এই শুনশান এলাকায় দৌড়ে পালানোটাও বোকামি হবে। ওরা হয়তো সেটাই চাইছে।

গাড়িটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে এদিকে। আরও কিছুটা এগিয়ে আসতে বুঝতে পারল ওটা বড়ো একটা ট্রাক। লিও ট্যাক্সি ড্রাইভারকে মোটা বকসিশ-সমেত ওর পাওনা মিটিয়ে দিয়ে ট্রাকটাকে দাঁড় করাতে বলল। ট্রাক ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলার জন্য যেই লিও ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়েছে, ট্যা ট্যা করে চাপা গর্জন জানান দিল কাছ থেকেই ফায়ার হচ্ছে অটোম্যাটিক আগ্নেয়াস্ত্র থেকে। পরমুহূর্তেই অন্ধকার ফুঁড়ে একটা কালো ওয়াগন ঝড়ের বেগে এসে দাঁড়াল লিওর সামনে। ওকে কোনও সুযোগ না দিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মাথায় কালো কাপড় ঢেকে হাত দুটো পিছনে টাইট করে বেঁধে ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিল ওয়াগনের ভিতরে। তারপর অন্ধকার মরুভূমির বুক চিরে গাড়ি ছুটতে শুরু করল। লিও মড়ার মতো শুয়ে রইল চুপটি করে। এরকম অভিজ্ঞতা ওর নতুন নয়। ও জানে এই সময় মাথা ঠান্ডা রাখাটা খুব জরুরি। মুখে টেপ মারা। মাথাটা কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। তাই চারপাশের কোনও দৃশ্য ওর পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু কান দুটো খোলা আছে। গাড়ি চলার শব্দ ছাড়াও লিওর চারপাশ থেকে ভারী জুতোর নড়াচড়া আর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ ওর কানে আসছে। কিছুক্ষণ মেঝেতে কান পেতে শুয়ে থেকে লিও বুঝল, মোট ছ’জন লোক আছে ওর চারপাশে। এদের কালো কমান্ডো পোশাক দেখে বোঝা যায় ট্রেন্ড লোক। আরও দুজন রয়েছে ড্রাইভারের কেবিনে। সবাই নিশ্চুপ। নিজেদের মধ্যে কেউ কোনও কথাবার্তা বলছে না। নিশ্চয়ই ওদের জন্য সেরকমই নির্দেশ রয়েছে।

অনেকক্ষণ হয়ে গেল গাড়ি চলছে। এরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওকে? ড. রিচার্ডকে লন্ডনের বাড়িতে যারা হত্যা করেছে, এরা কি সেই গ্রুপ? নাকি রাশিয়ান এজেন্ট? মি. লিয়ন্স বলেছিলেন, ওর ট্যাক্সি ড্রাইভার ছিল একজন রাশিয়ান খোচর। কিংবা এরা হয়তো তৃতীয় কোনও পক্ষ। মি. লিয়ন্সের তো আর শত্রুর অভাব নেই। প্রায় সারা পৃথিবীজুড়ে যাদের বিলিয়ন ডলারের কালো টাকার ব্যাবসা, তাদের পিছনে কত দেশের পুলিশ, স্পাই আর রাইভাল গ্রুপ পড়ে আছে তার কি হিসেব আছে নাকি! এখন চিন্তা হল এদের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার রাস্তা কি পাওয়া যাবে? লিওর নাকে যে বারুদের গন্ধ এসে লাগছিল সেটা ক্রমশ হালকা হয়ে আসছে। তার মানে যে-অস্ত্র থেকে ফায়ার করা হয়েছে কিছুক্ষণ আগে, সেটা কাছেই রাখা আছে। এক ঝলক দেখেই চিনতে পেরেছে লিও। জার্মানদের তৈরি সাবমেশিনগান এম.পি-ফর্টি। প্রতি জিরো পয়েন্ট ওয়ান ওয়ান সেকেন্ডে একটা করে বুলেট ফায়ার হয়। রেঞ্জ দুশো মিটার।

গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়ল। লোকজন যারা এতক্ষণ বসে ছিল ওর চারপাশে, গাড়ির দরজা খুলে একে একে নামল সবাই। তারপর ওকেও টেনে নামাল। চোখ বাঁধা অবস্থাতেই নিয়ে চলল কোথাও। ভোঁ-ও-ও-ও করে একটা গম্ভীর শব্দে লিও বুঝল ওকে কোনও ডকে নিয়ে আসা হয়েছে। ওটা জাহাজের সাইরেন। একটা সরু লোহার জেটি দিয়ে টেনে উপরের দিকে তোলা হচ্ছে ওকে। বিলক্ষণ এটা একটা জাহাজ। মোটা ইস্পাতের উপর ভারী বুটের শব্দ। পায়ের নীচে স্টিলের পাটাতন। মৃদু দুলছে। ভোঁও শব্দ কানে আসছে বারংবার। এবার জাহাজটা ছেড়ে দিল ডক থেকে। লিওকে একটা কেবিনে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে লোহার দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল। দুবাই থেকে রাস-অল-খাইমা যাওয়ার রাস্তার মাঝামাঝি কিডন্যাপ করা হয়েছে লিওকে। তারপর ওকে তিরিশ মিনিট গাড়িতে করে এনে জাহাজে তোলা হল। মানে এটা নিশ্চয়ই শারজার আগে পোর্ট ওম-আল-কোয়ান হবে।

লিও কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। চোখে দেখতে না পেলেও ওর ঘ্রাণ আর শ্রবণশক্তি বলছিল, এ-ঘরে আপাতত আর কেউ নেই। তবে সিসি টিভির নজরদারি নিশ্চয়ই থাকবে। তাই হাত আর মুখের বাঁধন খোলা লিওর কাছে কয়েক সেকেন্ডের কাজ হলেও চুপচাপ পড়ে রইল ওই অবস্থায়।

টেমস নদীর তীরে

কলকাতা থেকে দিল্লি দু-ঘণ্টা, তারপর ইন্দিরা গান্ধি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে তিন ঘণ্টা রেস্ট নেওয়ার পর আবার দিল্লি থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট আট ঘণ্টায় পৌঁছবে সোজা লন্ডন। আন্তর্জাতিক বিমানে এর আগেও কয়েকবার উঠেছে সৌম্য। তবে সেগুলো সবই দু-এক ঘণ্টার উড়ান। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোটোখাটো কয়েকটা দেশ। অফিসের প্রোগ্রামে অংশ নিতে গিয়েছিল। এতক্ষণের প্লেন জার্নি এই প্রথম। সৌম্য সঙ্গে করে দুটো বই এনেছিল পড়বে বলে। কিন্তু কিছুক্ষণ বইয়ে চোখ রেখে ক্লান্ত হয়ে গেল সে। শেষে সিনেমা চালিয়ে দিল। কিন্তু তাতেও মন লাগছে না। আসলে বুকের মধ্যে একটা উত্তেজনা আর দুঃশ্চিন্তা দুই-ই আসছে। সন্ধ্যা ছ’টায় দিল্লি থেকে বিমান ছাড়ল। রাত্রি দেড়টার সময় লন্ডন পৌঁছানোর কথা। কিন্তু ইংল্যান্ডের সময় অনুযায়ী ওখানে তখন সন্ধ্যা ন’টা। উত্তর গোলার্ধ তখন সবে অন্ধকার হচ্ছে। হিথরো এয়ারপোর্টে নেমে ইমিগ্রেশন সেরে লম্বা করিডোর পেরিয়ে বাইরে আসতে সৌম্য দেখল দেবুদা দাঁড়িয়ে আছে একগাল হাসি নিয়ে।

“ওয়েলকাম টু লন্ডন।” বলে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল দেবুদা, “অনেক কথা আছে, বুঝলি? পার্কিংয়ে রবিন অপেক্ষা করছে গাড়ি নিয়ে। চল, যেতে যেতে কথা হবে।”

সৌম্য জানতে চাইল, “রবিন কে?”

“রবিন খুব ভালো ছেলে। গাড়ি চালায়। বাড়ি বাংলাদেশে।”

দেবুদার সঙ্গে পার্কিংয়ে পৌঁছে সৌম্য অবাক। মার্সেডিজের ডিকিতে লাগেজ তুলে দিয়ে দুজনেই বসে গেল পিছনের সিটে। রবিনের সঙ্গেও পরিচয় হল, সে খুব অমায়িক ছেলে। চাকরির ফাঁকে টুকটাক গাড়িও চালায়। হিথরো এয়ারপোর্ট থেকে বাইরে আসতে প্রথমে একটু জ্যামে পড়তে হল। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই হাই-রোডে পৌঁছতে বেড়ে গেল গাড়ির গতি। ভারতের মতোই সব গাড়ির ডানদিকে ড্রাইভিং সিট দেখে সৌম্য অবাক হয়ে মন্তব্য করল, “আমি ভেবেছিলাম, এখানে ভারতের উলটো হবে।”

“ধুর পাগল, ভারতের গাড়িগুলো তো ব্রিটিশ আমলে এখান থেকেই গেছে সব। তবে আমেরিকায় সব উলটো।”

বাইরের দৃশ্যের দিকে মন দেওয়ার চেষ্টা করল সৌম্য। আকাশে এখনও হালকা লাল আলোর আভাস রয়ে গেছে। মেঘলা স্যাঁতসেতে ঠান্ডা আবহাওয়া। এখুনি মনে হয় বৃষ্টি নামবে। বলতে-বলতেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে উইন্ড-স্ক্রিন ভরে গেল।

“এটাই লন্ডনের আসল মেজাজ। এখানে যখন-তখন বৃষ্টি আসে। তুই সবসময় ছাতা নিয়ে ঘুরবি। এবার বল তোর ইনভেস্টিগেশন কতদূর এগোল।”

গলায় মাফলারটা জড়িয়ে নিয়ে সৌম্য বলল, “হ্যাঁ, বেশ কিছুদূর এগিয়েছে। তোমাকে তো বলেছিলাম, নন্দনপুরের পুরোনো ক্যাথলিক চার্চের ফাদার জোসেফের সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলেন কার্তিক ঘোষ।”

“সে তো শুনলাম। তুই গিয়েছিলি ওঁর সঙ্গে দেখা করতে?”

সৌম্য মাথা নেড়ে জানাল, “গিয়েছিলাম। ফাদার জোসেফ এখন খুবই বৃদ্ধ আর অসুস্থ। অনেক বছর হল রিটায়ার করেছেন। এমনিতে কারও সঙ্গে দেখা করেন না। আমার অনেক অনুনয় বিনয়ে দেখা করলেন। অ্যালবিয়ান জুটমিলের চিফ ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট কক্সের কথা শুনে চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর মুখ খুললেন। জানালেন, রবার্ট কক্স কলকাতায় এসেছিলেন ১৯১০ সাল নাগাদ। তখনও ওই চার্চ তৈরি হয়নি। ফাদার জোসেফ এখানে এসেছিলেন স্বাধীনতার অনেক পরে। রবার্ট লন্ডনে এক ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল থেকে পড়াশোনা করে ভারতে চলে আসেন কাজের খোঁজে। কলকাতার দক্ষিণে হুগলি নদীর দুই তীরে ইংরেজদের হাত ধরে তখন গড়ে উঠছে একের পর এক চট তৈরির কারখানাগুলো। তিনি প্রধান ইঞ্জিনিয়ার পদে যোগ দিলেন অ্যালবিয়ান জুটমিলে। সেই সময় ম্যানচেস্টার থেকে পাটের মেশিন নিয়ে এসে দক্ষিণ কলকাতায় শুরু হচ্ছিল কারাখানাগুলো। পূর্ববঙ্গে, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে বিস্তীর্ণ জলাজমিতে প্রচুর পাট চাষ হত। আর এখানে পাওয়া যেত সস্তার শ্রমিক। ইংরেজ শিল্পপতিরা জলের দামে জায়গা পেয়ে মেশিন লাগিয়ে শুরু করল চট উৎপাদন। সারা পৃথিবীতে রফতানি হতে লাগল এখানকার চটজাত দ্রব্য। কোম্পানি রবার্ট কক্সের থাকার জন্য হুগলি নদীর তীরে ইউরোপিয়ান ধাঁচে একটা বাড়ি বানিয়ে দিল। কারখানার বাউন্ডারির শেষ প্রান্তে চারদিকে গাছপালায় মোড়া দু-মানুষ উঁচু দরজা-জানালা সহ সুসজ্জিত ইউরোপিয়ান বাংলো। সামনে প্রশস্ত লন, রঙিন ফুলগাছের ঝাড়, তারপরেই নদী। ভারী মনোরম পরিবেশ। ওঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন অ্যালকেমিস্ট। ওঁর মধ্যেও সেই নেশা ছিল। এখানে এসে নদীর ধারে ওঁর বাংলোর সঙ্গে একটা ল্যাবরেটরি তৈরি করেছিলেন। তিনি কাজের ফাঁকে তাঁর ছোটোবেলার অভ্যাসবশত সেই বংশগত অ্যালকেমি চর্চা ভোলেননি। তাঁর বাংলোর একটা ঘরে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, হরেকরকম পাত্র আর রাসায়নিক জোগাড় করে পরীক্ষানিরীক্ষা করতেন।

“বেশ কয়েক বছর এরকমভাবেই কাটল। ভারতের স্বাধীনতার পরও রবার্ট সাহেব এ-দেশে থেকে গিয়েছিলেন। মিশে গিয়েছিলেন এখানকার মানুষদের সঙ্গে। তারপর আচমকা চলে গেলেন একদিন। কোথায় যে গেলেন কেউ কিছুই জানতে পারল না। অনেক খোঁজাখুঁজি হল। কিন্তু রবার্ট সাহেবের অন্তর্ধান রহস্যের আর কিনারা হল না। অ্যালবিয়ান জুটমিলের সেই বাংলো বন্ধ হয়ে পড়ে রইল। লোকমুখে রটে গেল, সাহেবের বাংলোতে ভূত আছে। এই কথা ঝড়ের বেগে কারখানায় প্রচার হয়ে যেতে দিনের বেলাতেও লোকজন বড়ো বড়ো গাছপালার ছায়ায় ঘেরা সেই বাংলোটা এড়িয়ে চলত। এরপর পেরিয়ে গেল আরও কয়েক যুগ। চট শিল্পের রমরমা এখন শেষ। বাড়িটার ভগ্নপ্রায় অবস্থার কথা তোমাকে আগেই বলেছি।”

“হুম! বুঝলাম। রবার্ট কক্স নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন কত সালে?”

“আনুমানিক ১৯৭৫ সাল নাগাদ।”

“তার মানে প্রায় ৫০ বছর আগে। এতদিন পরে এই রহস্যের নতুন করে কিনারা করা মুশকিল।”

“তা ঠিক, তবে আমি স্কুলের প্রাক্তন এক বিজ্ঞানের শিক্ষক বিজনবাবুর কাছ থেকে জানতে পারলাম রবার্ট সাহেবের একজন অল্পবয়সি সাগরেদ ছিলেন। সেই যদুনাথবাবুর মেয়ের ঘরের নাতনি হচ্ছে ঈপ্সিতা। ঈপ্সিতার বাবা ছিলেন খ্রিস্টান।”

“আচ্ছা, সেই জন্যই রবার্ট কক্সের ডায়েরিটা ঈপ্সিতাদের ঘরে ছিল?”

সৌম্য মাথা নেড়ে বলল, “লন্ডন পুলিশের কাছ থেকে কিছু জানতে পেরেছিলে?”

দেবুদা জানাল, “এর মধ্যে আমি একবারই বিশপস গেটে লন্ডন পুলিশের অফিসে যেতে পেরেছি। অফিসার ম্যাকলির সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। তবে আমার পরিচিত এক সিনিয়র ডিটেকটিভ আছেন লন্ডন পুলিশে, নাম ড্যান কলউইল। ওঁর সঙ্গে কথা হয়েছে। ঈপ্সিতাকে এখনও ট্রেস করা যায়নি। আমি তোর কথা বলে রেখেছি। তুই গিয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা কর। এখানের পুলিশ নিশ্চয়ই তোকে সাহায্য করবে।”

“তুমি যাবে না আমার সঙ্গে?”

“না রে, আমার এখন ভীষণ চাপ চলছে। ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষা। তার উপরে খাতা দেখা। ডেড-লাইনের মধ্যে জমা দিতে হবে। নেহাত তুই প্রথমবার লন্ডন এলি তাই তোকে রিসিভ করতে এলাম। তাও আসার আগে তোর জন্য আলু দিয়ে মাছের ঝোল আর ভাত রান্না করে এসেছি। এখানে সব নিজেকেই করতে হয়, জানিস তো!”

ওদের নিয়ে রবিন যখন রেডিংয়ে ওদের বাড়ি পৌঁছল, রাত প্রায় দশটা বাজে। নিস্তব্ধ পাড়া। স্ট্রিট লাইটগুলো জ্বলছে। ভেজা রাস্তাঘাট। দেবুদা লাগেজ ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, “ফ্রেশ হয়ে, খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়। বাকি কথা কাল সকালে হবে।”

ভারতে এখন মাঝরাত। সৌম্য মাকে মেসেজ করে জানিয়ে দিল ও পৌঁছে গেছে। ওর মাথার মধ্যে একটা কথাই ঘুরছে, ঈপ্সিতার কোনও খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি! কোথায় গেল মেয়েটা? এখান থেকে নিরুদ্দেশ হওয়া কি এতই সহজ? কাল পুলিশের কাছে গেলে আসল ছবিটা পরিষ্কার হবে।

পরের দিন সকালে উঠে প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়ল সৌম্য। একদম রৌদ্রোজ্জ্বল ঝকঝকে সকাল। ইংল্যান্ডে যাকে বলে ‘সানি ওয়েদার’। সারারাত ঘুমিয়ে নিতে ওর জেট ল্যাগ কেটে গেছে। অতএব বাড়িতে বসে থাকার কোনও মানে হয় না। দেবুদাও রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ল ওর সঙ্গে। রেডিং ইউনিভার্সিটি একদম কাছেই। বাড়ি থেকে বেরিয়ে দু-পা হাঁটতেই ছোট্ট বাস-স্ট্যান্ড। বাসের টাইম টেবল লাগানো আছে সেখানে। ঘড়ির কাঁটা ধরে বাস চলে। চারপাশটা ছবির মতো সুন্দর। নামিদামি গাড়ি সব হুস-হাস করে বেরিয়ে যাচ্ছে। কোনও হর্নের শব্দ নেই। রাস্তার দু-দিকে সব একই প্যাটার্নের ইটরঙা দোতলা বাড়ি। মাথায় ত্রিভুজাকৃতি টালির চাল। কী সুন্দর সব রঙিন ফুলের গাছ! বাস-স্ট্যান্ডের উলটোদিকে সবুজ ঘাসে মোড়া বিশাল মাঠ। গাঢ় চেরি রঙের দোতলা বাস এসে দাঁড়াতে একে একে উঠে গেল সবাই। দেবুদা ওকে বলে দিল, “ব্যাংকের কার্ডটা বাসে ওঠা আর নামার সময় একবার করে ঠেকালেই হল। ওরা ভাড়া আপনা-আপনি কেটে নেবে।”

সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে বসে পড়ল দুজনে।

“রেডিংয়েও অনেক কিছু দেখার আছে, বুঝলি। ইংল্যান্ডের রাজধানী আগে কিন্তু ছিল এই রেডিং। পুরোনো প্রাসাদ, চার্চ, যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যাওয়া অ্যাবি রুইন্স, সিমেট্রি, মিউজিয়াম— সময় পেলে এগুলো দেখে নিস।”

চার-পাঁচটা স্টপেজ পরেই ইউনিভার্সিটির সামনে নেমে গেল দেবুদা। সৌম্য নামল লাস্ট স্টপেজ রেডিং রেলওয়ে স্টেশনে। আধঘণ্টা ছাড়া ছাড়া ট্রেন। দেবুদা সব বুঝিয়ে দিয়েছে। অটোম্যাটিক মেশিন থেকে সারাদিনের টিকিট কেটে নিল সৌম্য। এখান থেকে লন্ডন প্যাডিংটন যাতায়াত আর লন্ডনে সারাদিন বাস, ট্রাম, ট্রেনে ঘোরাঘুরি— সব মিলিয়ে এই টিকিট। মাত্র তিনটে স্টেশনে থামল ট্রেনটা। আধঘণ্টার মধ্যেই সৌম্য পৌঁছে গেল প্যাডিংটনে। প্যাডিংটন একটা মস্ত বড়ো জংশন, কলকাতার হাওড়া বা শিয়ালদহ স্টেশনের মতো বিশাল বড়ো জমজমাট স্টেশন। হাজারে হাজারে দৌড়চ্ছে মানুষজন। প্যাডিংটন স্টেশনের নীচেই আছে আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে লাইন। অর্থাৎ, কলকাতায় আমরা যাকে মেট্রো বলি। এই আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে গোটা লন্ডনের নীচে দিয়ে জালের মতো বিছিয়ে আছে।

সৌম্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে লাইনের ম্যাপ ফোনে ডাউনলোড করে নিয়েছে। ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে বুঝে নিল ব্যাপারটা। প্যাডিংটন থেকে এলিজাবেথ এবং সেন্ট্রাল, এই দুটো লাইনই দু-দিক দিয়ে যাচ্ছে লিভারপুল স্টেশনে। আর লিভারপুল স্টেশন থেকে উপরে উঠে কাছেই বিশপ গেট লন্ডন সিটি পুলিশের সদর দপ্তর। সিঁড়ি দিয়ে প্রায় দুটো ফ্লোর নীচে নেমে এলিজাবেথ লাইনের ট্রেন ধরল সৌম্য। একটা জিনিস লক্ষ করে ও অবাক হয়ে গেল, ট্রেনে উঠে অনেক মহিলা-পুরুষই বই পড়ছে। যেটা এখন আর আমাদের দেশে দেখাই যায় না।

সিটি পুলিশের দপ্তরে পৌঁছে ডিটেকটিভ ড্যান কলউইলের খোঁজ করতে তিনতলার অফিসে তাঁর দেখা পাওয়া গেল। অমায়িক ভদ্রলোক। সৌম্যকে চেয়ারে বসতে বলে হেসে বললেন, “হ্যালো ইয়ংম্যান, আমি খুব অবাক হয়েছি তোমার হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে খুঁজতে তুমি ইন্ডিয়া থেকে এখানে এসেছ জেনে। আমি মিস বিসওয়াসের কেস ফাইল দেখেছি। বসো।”

“অফিসার ম্যাকলি আমাকে ফোন করেছিলেন। উনিই আমাকে জানান ঈপ্সিতা বিশ্বাসকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”

“হ্যাঁ, এই কেসটা অফিসার ম্যাকলি ইনভেস্টিগেশন করছিল। কিন্তু সে এখন ছুটিতে আছে। আমি যতটুকু জানতে পেরেছি, মিস বিসওয়াস একটা প্রাইভেট কোম্পানির ল্যাবে কাজ করছিলেন। মাস খানেক হল ওঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। স্ট্র্যাটফোর্ডে যে-বাড়িতে মিস বিসওয়াস ভাড়া থাকতেন, সেখান থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। তিনদিন বাসায় না ফেরায় বাড়ির মালিক থানায় ফোন করে।”

“তারপর নিশ্চয়ই আপনারা তদন্ত শুরু করেছেন?”

“হ্যাঁ, মিস বিসওয়াস স্ট্র্যাটফোর্ড থেকে ব্রেন্টউডে ট্রেনে করেই রোজ অফিস যেতেন।” কথা বলতে-বলতেই সৌম্যর সামনে লন্ডন সিটির একটা ম্যাপ খুলে ধরলেন ডিটেকটিভ কলউইল।— “এই যে স্ট্র্যাটফোর্ড থেকে শেনফিল্ড, আন্ডারগ্রাউন্ড এলিজাবেথ লাইন। সময় লাগে পঁয়ত্রিশ মিনিট। আমরা সিসি টিভি চেক করেছি। মিস বিসওয়াস সেদিন স্ট্র্যাটফোর্ড থেকে ট্রেনে উঠেছিলেন, কিন্তু শেনফিল্ড স্টেশনে নামেননি।”

“তাহলে কোথায় নেমেছিল সে?”

“সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না ইয়ংম্যান। আমরা সমস্ত স্টেশনের সিসি ক্যামেরা ফুটেজ এবং টিকিট পাঞ্চিং মেশিন চেক করেছি। কিন্তু কোথাও ট্রেস পাওয়া যায়নি।”

“এটা কী করে সম্ভব? মেয়েটা আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে উঠল, কিন্তু নামল না। তাহলে কি মাঝখানে ভ্যানিশ হয়ে গেল? স্যার, নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে।”

“না, ভুল আমাদের হচ্ছে না মি. প্রামাণিক। তবে…”

“তবে কী স্যার?”

“স্ট্র্যাটফোর্ড আর শেনফিল্ডের মাঝখানে অনেকগুলি স্টেশন আছে। তার মধ্যে রমফোর্ড একটি। রমফোর্ডের কাছেই রয়েছে ইসলামিক কালচারাল সেন্টার। সেদিন মিস বিসওয়াস যে-ট্রেনে উঠেছিলেন, সেই ট্রেনে বেশ কিছু ধর্মীয় মানুষজনও যাত্রা করছিলেন। একটা ভালো গ্যাদারিং হয়ে ছিল ট্রেনে। প্রচুর মানুষ রমফোর্ড স্টেশনে একসঙ্গে নামেন। স্টেশনে অতিরিক্ত ভিড় হয়ে যাওয়ায় এক্সিটের টিকিট পাঞ্চিং মেশিন ওপেন করে দেওয়া হয়। ওদের পোশাকও প্রায় একইরকম ছিল। ভিড়ের মধ্যে আলাদা করে কাউকে চেনা সম্ভব ছিল না। হয়তো মিস বিসওয়াস কোনোভাবে ওই ভিড়ের সঙ্গে মিশে রমফোর্ডে নেমে গেছেন এবং অন্য কোনও গাড়িতে লন্ডন ছেড়েছেন। তাহলেই একটা জাস্টিফায়েড লজিক পাওয়া যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে কিডন্যাপিংয়ের অভিযোগ খাটছে না। কারণ, রমফোর্ড স্টেশনের আশেপাশে যত সিসি ক্যামেরা ছিল, আমরা চেক করেছি। জোর করে কাউকে কেউ ধরে নিয়ে যায়নি। মনে হচ্ছে মিস বিসওয়াস নিজেই লুকিয়ে কোথাও চলে গেছেন।”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সৌম্য জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু সে লুকিয়ে পালাবে কেন?”

“সেটা নিয়ে ইনভেস্টিগেশন চলছে। মিস বিসওয়াস যে-ল্যাবে কাজ করতেন, সেই কোম্পানির সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ড. রিচার্ড তাঁর বাড়িতে খুন হয়েছেন কিছুদিন আগে। এই ঘটনার কয়েকদিন পরেই মিস বিসওয়াস নিরুদ্দেশ হন। দুটো ঘটনার মধ্যে কোনও যোগসূত্র আছে কি না সেটার অনুসন্ধান চলছে। এর থেকে বেশি আমি এখন কিছুই বলতে পারব না।”

“ওকে ডিটেকটিভ কলউইল, একটা শেষ প্রশ্ন করতে চাই। ফিফটি সেভেন ওয়েডিংটন রোডে ঈপ্সিতা বিশ্বাস যে-বাড়িতে ভাড়া থাকত, আমি সেই বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলতে চাই। এতে কোনও অসুবিধা নেই তো?”

“ওয়েল! সেই বাড়িতে বৃদ্ধ এক দম্পতি থাকেন মিস্টার অ্যান্ড মিসেস মার্ক। তাঁরা যদি তোমার সঙ্গে কথা বলতে স্বচ্ছন্দ হন তাহলে আমার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু কোনও কমপ্লেন যেন না আসে। টেক কেয়ার। মি. দাসকে হ্যালো বোলো আমার তরফ থেকে।”

“বেশ! আমি তাহলে এখন চলি ডিটেকটিভ কলউইল। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।”

হাসিমুখে তাঁকে বিদায় জানিয়ে সৌম্য লন্ডন সিটি পুলিশের দপ্তর থেকে বেরিয়ে লিভারপুল স্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। অনেকক্ষণ থেকেই খিদেটা চাগাড় দিয়ে উঠেছে। স্টেশনে ঢোকার আগে রাস্তার ধারে একজায়গাতে হটডগ বিক্রি হচ্ছিল। সেটার সঙ্গে কফি অর্ডার করল সৌম্য। ঠান্ডায় কফি খেতে সবসময়ই ভালো লাগে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে রেডি হয়ে ওর হাতে উঠে এল দশ ইঞ্চি লম্বা একটা হটডগ। কামড় বসিয়ে ভাবল খাবারটা অ্যামেরিকান হলেও এখন সারা পৃথিবীজুড়ে এর বিক্রি। ঈপ্সিতাকে যদি খুঁজে পায়, ওর সঙ্গে লন্ডনের ব্রিক লেনের বাঙালি পাড়াতে গিয়ে একদিন মাছের ঝাল ভাত খেয়ে আসবে। কিন্তু তাকে কি আদৌ খুঁজে পাওয়া যাবে? পৃথিবীর অপর প্রান্তে অচেনা শহর, সব অচেনা লোকজন, তার মধ্যে ও কী করে খুঁজবে ঈপ্সিতাকে? আর অনন্তকাল তো এখানে বসে থাকা সম্ভব নয়।

আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে সৌম্য দেখল লিভারপুল থেকে স্ট্র্যাটফোর্ড পৌঁছতে সেন্ট্রাল লাইন ট্রেন ধরতে হবে। স্টেশনে দু-মিনিট অপেক্ষা করতেই ট্রেন এসে গেল। এই ট্রেনটা বেশ ফাঁকা। পনেরো মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেল স্ট্যাটফোর্ড। বাইরে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করল গুগল ম্যাপ দেখে। মিনিট পাঁচেকের হাঁটা রাস্তা। ফিফটি সেভেন ওয়েডিংটন রোড খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না। লন্ডনের সাধারণ দোতলা বাড়ি। সাদা রঙের কাঠের দরজা। সামনে গিয়ে বেল বাজাল সৌম্য। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই একজন লম্বা বয়স্ক মানুষ এসে গেট খুললেন।

“হ্যালো, স্যার। আমি সৌম্য। ঈপ্সিতার বন্ধু। ভারত থেকে আসছি।”

কথাটা শুনেই ভদ্রলোকের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। ডানহাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “ও ইয়েস! প্লিজ ওয়েলকাম মি. সৌম্য। ডিটেকটিভ কলউইল কিছুক্ষণ আগে ফোন করেছিলেন। আপনার কথা বলেছেন। ভিতরে আসুন।”

“অনেক ধন্যবাদ, মি. মার্ক।”

সৌম্যকে নিয়ে গিয়ে ড্রয়িং-রুমে বসালেন মি. মার্ক।— “বি কমফোর্টেবল ইয়ংম্যান। কী নেবে বলো? কফি বানাই?”

সোফায় বসে সৌম্য বলল, “না মি. মার্ক, আমি এইমাত্র খেয়ে এসেছি।”

“বেশ! বলো কী জানতে চাও?”

“মিসেস মার্ককে দেখছি না? উনি কি বাড়িতে নেই?”

“আছে, এমিলির শরীরটা ভালো নেই। ও ভিতরের ঘরে শুয়ে আছে। এমনিতেও ঈপ্সিতাকে খুঁজে না পেয়ে ও ভীষণ আপসেট হয়ে পড়েছে। আসলে আমাদের তো কোনও সন্তান নেই, ও বছর দু-এক আমাদের কাছে নিজের মেয়ের মতোই ছিল। ভারতীয়দের এমনিতেই আমরা খুব পছন্দ করি। ঈপ্সিতা খুব ভালো মেয়ে। নিজের কাজ নিয়ে থাকত। এমিলি অসুস্থ হয়ে পড়লে বাড়ির সব কাজ ও নিজেই করত। কিন্তু হঠাৎ করে কী যে হল?”

কিছুক্ষণের নিরাবতা কাটিয়ে সৌম্য জানতে চাইল, “ওর নিরুদ্দেশ হওয়ার আগে আগে কিছু বুঝতে পারেননি?”

“না, কিছুই বোঝা যায়নি। আমাদের ধারণা, ওকে কেউ কিডন্যাপ করেছে।”

“একটা সাধারণ চাকরি করা মেয়েকে কেউ কেন কিডন্যাপ করবে? লন্ডনে ওর কোনও বন্ধু ছিল?”

“বন্ধু বলতে ওর একজন কলিগ ছিল, মানে আছে। সেন ড্যানইয়ং। কো-রিসার্চার ছিল। পুলিশ ওকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। সে জানিয়েছে কিছু জানে না।”

“আচ্ছা, মেয়েটির ফোন নম্বর পাওয়া যাবে?”

“সরি, আমাদের কাছে সেনের কোনও ফোন নম্বর নেই। তবে…” একটু ভেবে নিয়ে তিনি জানালেন, “সেন অনেকবার এসেছে এই বাড়িতে। খুব মিশুকে হাসিখুশি মেয়ে। ও বলেছিল চায়না টাউনে থাকে। একটা চাইনিস রেস্টুরেন্ট আছে ‘তাও তাও জু’, তার উপরের কোনও ফ্ল্যাটে পেয়িং গেস্ট থাকে সেন।”

সৌম্য সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে সার্চ করে দেখে নিল। জায়গাটা পিকাডেলি সার্কাস স্টেশনের কাছে। তারপর মি. মার্ককে অনুরোধ করল, “আমি কি একবার ঈপ্সিতার রুমটা দেখতে পারি?”

“নিশ্চয়ই! তুমি ঈপ্সিতার ছোটোবেলার বন্ধু। এতদূর থেকে তাকে খুঁজতে এসেছ। ওর ঘরে যাওয়ার অধিকার তোমার নিশ্চয়ই আছে। তবে পুলিশ যেহেতু ইনভেস্টিগেশন করছে, একটু সাবধান থাকতে হবে।”

“ধন্যবাদ, মি. মার্ক। আপনি চিন্তা করবেন না, আমি সতর্ক থাকব।”

কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠেই ডানদিকে ঈপ্সিতার রুম। মার্ক ডুপ্লিকেট চাবি দিকে দরজা খুলে দিতে ভিতরে ঢুকল সৌম্য। কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়াল। দশ বাই বারো ফুটের একটা নিজস্ব পৃথিবী। কিন্তু খুব সুন্দর করে গোছানো সবকিছু। একদিকে একটা সিঙ্গল খাট, জানালার পাশে রাইটিং ডেস্ক, তারপর বুক-শেলফ, ওয়ার্ডরোব। বুক-শেলফের মধ্যে একটা ছবির ফ্রেম, সেখানে ওর বাবা-মার ছবি। একটা মিষ্টি পারফিউমের গন্ধ এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘরের মধ্যে। বড়ো করে ঘ্রাণ নিল সৌম্য। হঠাৎ বইয়ের তাকের কোণে চোখটা আটকে গেল ওর। বেশ কিছু বাংলা বইয়ের মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা কবিতার বই উঁকি মারছে। ওরা যখন হাই-স্কুলে পড়ত তখন ওকে সৌম্য এই বইটা উপহার দিয়েছিল ঈপ্সিতার জন্মদিনে। সেখান থেকে বের করে বইটা হাতে নিল। মলাট ওলটাতে প্রথম পাতাতেই চোখে পড়ল ওর নিজের হাতের লেখা। মনটা আবার মুচড়ে উঠল। ঈপ্সিতার মা মারা যাবার পর থেকে এই পৃথিবীতে ওর নিজের বলে কেউ নেই। ও যে হারিয়ে গেছে, কোথায়, কীভাবে আছে? কারও কিছু যায় আসে না। কেউ খোঁজও রাখে না। কিন্তু সৌম্য মনের মধ্যে আর একবার সংকল্প করল, এর শেষ দেখে তবে ছাড়বে।

মি. মার্কের হাত ধরে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে পড়ল ওর পরের ডেস্টিনেশন চায়না টাউনের উদ্দেশে। টিউব রেলে আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন পিকাডেলি সার্কাসে পৌঁছতে বেশি সময় লাগল না। উপরে উঠে হাঁটতে শুরু করল। আধঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেল বিশাল বড়ো চায়না টাউনের গেটের সামনে। এই চাইনিজ লোকেরা যে-শহরেই বসতি বানাক, একটা করে চায়না টাউন ঠিক বানাবে। আর নিজেদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্য একটা রঙিন তোরণ সেখানে অবশ্যই থাকবে। যেমন কলকাতার চায়না টাউনেও আছে। অবশ্য সব জায়গাতেই চায়না টাউনের রেস্তোরাঁগুলো খুব লোভনীয় হয়।

বাইরে দিনের আলো কমে আসছে ক্রমশ। তবে ভারতের মতো এখানে ঝপ করে অন্ধকার নামে না। ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়। এখন এখানে গরমকাল, তাই দিনের আলো বহুক্ষণ থাকে।

সৌম্য গুগল ম্যাপের দৌলতে চায়না টাউনের তোরণ পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ডানহাতের রাস্তা দিয়ে এগিয়ে ‘তাও তাও জু’ রেস্তোরাঁ খুঁজে পেল লিসলি স্ট্রিটের উপরে। রেস্তোরাঁর হোর্ডিংয়ের নীচে লেখা— ‘ডিম সাম ফুড’। মানে হাতেগরম খাবার। রেস্তোরাঁটার গা দিয়ে উঠে গেছে একটা সরু সিঁড়ি। দোতলায় উঠে সৌম্য দেখল মাঝে লম্বা করিডোর আর পরপর সারি দিয়ে ঘর। একজন বয়স্ক চিনা মহিলাকে জিজ্ঞেস করতে তিনি আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলেন, “তিনতলার এগারো নম্বর ঘরে থাকে সেন ড্যানইয়ং।”

তিনতলায় উঠে সৌম্য দেখল এগারো নম্বর ঘর তালাবন্ধ। সম্ভবত ফ্ল্যাটে কেউ নেই। পাশের একটি লোককে জিজ্ঞেস করে ও জানতে পারল সেন রাতে ফিরবে। সৌম্য এখন বেশিক্ষণ অপেক্ষাও করতে পারবে না। ঘড়িতে প্রায় সন্ধ্যা আটটা বাজে। ও একটা ছোটো কাগজে ওর নাম আর ফোন নম্বর লিখে চিনা লোকটির হাতে দিয়ে অনুরোধ করল যেন সেন ড্যানইয়ংয়ের হাতে কাগজটা দিয়ে দেয়। তিনতলার বারান্দা থেকে বাইরে চোখ যেতে দেখতে পেল দূরে বিল্ডিংয়ের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে টেমস নদীর গায়ে বিগবেন আর লন্ডন আই।

পিকাডেলি সার্কাস থেকে প্যাডিংটন স্টেশন, তারপর সেখান থেকে রেডিং এসে পৌঁছতে প্রায় ন’টা বেজে গেল। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে তখন। স্টেশন থেকে বেরিয়ে ছাতা খাটিয়ে বাস-স্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে শুরু করল সৌম্য। ফাঁকা শুনশান বৃষ্টির জলে ধোওয়া রাস্তার উপরে লাল-হলুদ রঙিন আলো এসে পড়েছে। জ্যাকেট ভেদ করে ঠান্ডা হাওয়া ঢোকার চেষ্টা করছে শরীরের মধ্যে। স্ট্রিট লাইটের নীচে লোয়ার আর্লি ২১ নং বাস-স্ট্যান্ড। কয়েকজন অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে গুলতানি করছে স্ট্যান্ডে। রাস্তার উলটোদিকে পাবের হই-হল্লা দমকা ভিজে হাওয়ায় ভর করে জোর হচ্ছে মাঝে মাঝে। লাল চেরিরঙা দোতলা বাসটা এসে দাঁড়াতে সৌম্য সোজা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গিয়ে বসল।

বাড়ি ফিরে দেখল দেবুদা বই পড়ছে। ওকে ঢুকতে দেখে জিজ্ঞেস করল, “রাতের খাবার খেয়ে এসেছিস, নাকি খাবি?”

“খাব।” বলে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে পোশাক পালটে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল সৌম্য।

“এবার বল গোটা দিন কী করলি। খোঁজখবর পাওয়া গেল কিছু?”

গরম গরম সবজি, ডাল আর ঝাল আলুর চোখা দিয়ে ভাত সারাদিনের পর অমৃতের মতো লাগল খেতে। দেবুদা রান্নাটা ভালোই করে। বিদেশ-বিভূঁইয়ে এসে এমন ঘরের মতো খাবার পাবে, সৌম্য একবারও ভাবেনি। সে খেতে খেতে পুরোটাই বলল। দেবুদা মন দিয়ে শুনে মন্তব্য করল, “ড. রিচার্ড খুব বিখ্যাত মানুষ। রিসার্চের জন্য বেশ কিছু অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন। আমার স্যার প্রফেসর সুরিয়া আইয়ার আছেন বাথ ইউনিভার্সিটিতে। উনি ড. রিচার্ডের সঙ্গে বেশ কয়েক বছর কাজ করেছিলেন। আমি কাল সকালে ড. আইয়ারকে একবার ফোন করে দেখব। যদি ওঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায়, তাহলে তোকে নিয়ে বাথে ঘুরে আসব একদিন। ওঁর কাছ থেকে নতুন কোনও তথ্য পাওয়া গেলেও যেতে পারে।”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দেবুদা আবার মুখ খুলল, “ঈপ্সিতা রমফোর্ডে নেমে কোথায় যেতে পারে? এ-দেশের সিকিউরিটি সিস্টেম খুবই স্ট্রং। ওদের চোখে ধুলো দেওয়া অত সহজ নয়। প্রায় মাস খানেক হতে চলল মেয়েটার কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। খুব অবাক ব্যাপার!”

সেই সময় সৌম্যর ফোনটা বেজে উঠল। প্রথমে ভেবেছিল মা বুঝি ফোন করছে। কিন্তু না, ভারতে তো এখন মাঝরাত। তারপর ফোনের স্ক্রিনে ইংল্যান্ডের অচেনা নম্বর দেখে অবাক হল সৌম্য।

“হ্যালো!”

সরু মহিলা গলায় ভেসে এল, “হ্যাঁ, আমি সেন ড্যানইয়ং বলছি। তুমি কি সৌম্য?”

“বলছি।”

“আমি জানি ঈপ্সিতা কোথায় গেছে।”

“কোথায়?”

“কাল দেখা করো। বলছি।”

“কোথায়? কখন দেখা করতে হবে?”

“ওয়েস্টমিনিস্টার, টেমস রিভার-ক্রুজ সার্ভিসের সামনে। ঠিক দুপুর বারোটা।”

ফোনটা কেটে গেল। দেবুদা বলল, “খেয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়। কাল হয়তো একটা ব্রেক থ্রু পাওয়া যাবে।”

পরের দিন যথারীতি প্রাতরাশ সেরে সৌম্য বেরিয়ে পড়ল লন্ডন ওয়েস্টমিনিস্টারের উদ্দেশে। রেডিং থেকে প্যাডিংটন, সেখান থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড লাইনে ওয়েস্টমিনিস্টার। স্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে সৌম্য ভিড়ের মধ্যে দিয়ে উপরে উঠে এসে দেখল আকাশের মুখ ভার। যে-কোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। ঠান্ডা হাওয়া বইছে। রাস্তায় পা দিতেই কানে এল বিগবেনের মিষ্টি ঘণ্টার ধ্বনি। সামনেই ওয়েস্টমিনিস্টার পার্লামেন্ট হাউস। রাস্তা দিয়ে ছুটে যাচ্ছে লাল দোতলা বাস আর কালো ট্যাক্সি। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিগবেন টাওয়ার। কিছুক্ষণের জন্য হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল সৌম্য। সামনেই টেমস নদী। ভিড়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। ফুটপাতে ছোট্ট দোকানে হরেক সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। লন্ডন লেখা টুপি থেকে বিগবেনের স্মারক, চাবির রিং, রুমাল, ঘর সাজানোর লাইট। রাস্তা পেরিয়ে একটা আইসক্রিম স্টল। সৌম্য ভাবল ঠান্ডার দেশে এসেও লোকে আইসক্রিম খায়! সোজা একটা ব্রিজ টেমস নদীর উপর দিয়ে চলে গেছে। মাঝখান দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। আর দু-দিকে মেলার মতো লোক ভিড় করেছে। সেখানে কেউ স্যাক্সোফোন বাজাচ্ছে, কেউ বাদাম ভাজা বিক্রি করছে। সৌম্য একটু এগিয়ে গিয়ে ছোট্ট জটলা দেখতে পেল। ভিড়ের মধ্যে উঁকি মেরে দেখল সেখানে প্রবল উৎসাহে তিন কাপের জুয়া খেলা চলছে। ব্রিজের উপর থেকে টেমস নদীটা দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার। বাঁদিকে রিভার-ক্রুজের জেটি। ওই জেটির মুখেই দেখা করার কথা সেন ড্যানইয়ংয়ের। ব্রিজের পাশে সিঁড়ি দিয়ে নেমে রিভার-ক্রুজ সার্ভিসের দিকে এগোল সৌম্য। পরপর লাইন দিয়ে লাল, হলুদ, নীল টুপি পরে এজেন্টরা দাঁড়িয়ে আছে। চলছে টুরিস্টদের সঙ্গে টানাটানি আর দরদাম। মাথা খোলা ‘রেড’ বাসে করে লন্ডন ট্যুর, সঙ্গে ক্রুজ অর্থাৎ খোলা লঞ্চে টেমস নদীতে ঘোরা।

জেটির গেটে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সৌম্য। সময়ের আগেই সে পৌঁছেছে। সেন ড্যানইয়ংকে সে যেহেতু আগে দেখেনি কোনও চাইনিস মহিলা দেখলেই ঘুরে তাকাচ্ছে। গতকাল যে নম্বর থেকে ফোন এসেছিল সেই নম্বরে বারংবার রিং করেও কোনও প্রত্যুত্তর পেল না সৌম্য। নদীর ধারে চওড়া ফুটপাতের পাশে কাঠের বেঞ্চ করা আছে পরপর। সৌম্য একটাতে গিয়ে বসল। অনেক আশা নিয়ে সে আজ এখানে এসেছিল। যত সময় এগোচ্ছে তত ক্ষীণ হচ্ছে সেই আশা। নদীর ও-পাড়ে আকাশছোঁয়া ‘লন্ডন আই’। বিশাল বড়ো আধুনিক নাগরদোলা। ওর উপর থেকে নাকি গোটা লন্ডন দেখা যায়। কত মানুষ জোড়ায় কিংবা দল বেঁধে ঘুরতে এসেছে। তারা সেলফি তুলতে ব্যস্ত। পিছনে সার দিয়ে অনেকগুলো ই-রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। ওতে চেপে বসলে টেমস নদীর ধার দিয়ে টুরিস্টদের ঘুরিয়ে দেয়। সৌম্যরও ইচ্ছা ছিল এগুলোতে ওঠার। কিন্তু ঈপ্সিতাকে যতক্ষণ না খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ কিছুই ভালো লাগছে না। আচমকা ঠান্ডা হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। মেঘের ফাঁক দিয়ে সরু একটুকরো সূর্যের আলো এসে পড়েছে টেমস নদীতে। কী অপূর্ব লাগছে!

মুহূর্তের মধ্যে টেমসের পাড় ফাঁকা হয়ে গেল। সৌম্য ছাতাটা খুলে নিয়ে সেই বেঞ্চেই বসে রইল চুপ করে। পাথর বিছানো ভেজা রাস্তার একপাশে সার দিয়ে ‘লন্ডন প্লেন ট্রি’ আর নদীর দিকে রেলিংয়ের গায়ে কিছুটা ছাড়া ছাড়া ডলফিন আকৃতির কালো ল্যাম্প-পোস্ট। বৃষ্টির ঝাপটায় ভিজে যাচ্ছে প্যান্ট, জুতো, জ্যাকেট। তবু কেন যে উঠতে ইচ্ছা করছে না এখান থেকে কে জানে! মেয়েটা হয়তো মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছে ওকে। সে হয়তো আজকে আসবেই না। কিন্তু কিছুতেই আশা ছাড়তে পারছে না সৌম্য। বৃষ্টিটা মাঝে মাঝে জোরে আসছে, আবার কমে যাচ্ছে। ছাতা মাথায় মানুষজন রাস্তা দিয়ে হাঁটছে বটে, কিন্তু চোখে পড়ার মতো সেই ভিড় আর নেই। তবে বৃষ্টি কমে আসতেই ফিরে এল মানুষজনের ভিড়।

সৌম্য ছাতাটা বন্ধ করে সামনের কফি শপের দিকে এগোল। একজন কোঁকড়ানো চুলের শ্যামলা মধ্যবয়স্ক মহিলা কফিশপ চালাচ্ছে। তাকে একটা কফি আর একটা স্যান্ডউইচ দিতে বলল সৌম্য। মহিলাটি বার বার সৌম্যর দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।

সৌম্য জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি আমাকে কিছু বলবেন?”

মহিলাটি গলা নামিয়ে জানাল, “প্রায় দু-ঘণ্টা ধরে আমি আপনাকে লক্ষ করছি। বৃষ্টির মধ্যে ওই সামনের বেঞ্চে বসে ছিলেন। আপনি কি কারোর জন্য অপেক্ষা করছেন?”

গরম কফিতে চুমুক দিয়ে সৌম্য মাথা নাড়ল।— “একটি মেয়ের এখানে দেখা করতে আসার কথা ছিল। ওকে ফোনে পাচ্ছি না। তাই অপেক্ষা করছি।”

“বাই এনি চান্স, মেয়েটির নাম কি সেন ড্যানইয়ং?”

কথাটা শুনে চমকে উঠল সৌম্য।— “আপনি কী করে জানলেন?”

সে জানাল, “মেয়েটি আমার পরিচিত, চায়না টাউনে থাকে। সে আজ এখানে আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারবে না।”

“কেন? সে-ই তো আমাকে গতকাল রাত্রে ফোন করে বলেছে এখানে আসার কথা।”

“জানি। কিন্তু এই জায়গাটা সেফ নয়। আপনি এক কাজ করুন, এই সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে যান। শেষে ডানদিকে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড সাবওয়ে পাবেন। ওটার মাঝামাঝি গিয়ে দেখবেন একটি ছেলে গিটার বাজাচ্ছে। ওর কাছে গিয়ে দাঁড়ান কিছুক্ষণ। ড্যানইয়ং ওখানেই আপনার সঙ্গে দেখা করবে।”

সৌম্য মহিলাকে আর কোনও প্রশ্ন না করে স্যান্ডউইচটা নাকে-মুখে গুঁজে, কফিতে চুমুক দিয়ে দ্রুত পা চালাল সাবওয়ের দিকে। প্রায় দশ-বারো ফুট চওড়া আর বেশ লম্বা সাবওয়ে। কিছুটা ছাড়া ছাড়া মাথার উপরে আলো জ্বলছে। লোকজন খুব বেশি নেই। হাতে গোনা দু-একজন যাতায়াত করছে আন্ডারগ্রাউন্ড রাস্তা দিয়ে। সৌম্য কিছুদূর এগোতেই কানে এল একটা বাজনার শব্দ। দূর থেকে চোখে পড়ল, একজন লোক গিটার বাজাচ্ছে। সাবওয়ের মধ্যে অনেক দূর পর্যন্ত গমগম করছে সেই গিটারের আওয়াজ। এরা পয়সা ইনকামের জন্য সবসময়ই পরিচিত আর জনপ্রিয় সংগীতের সুর বাজায়। সৌম্য হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে পৌঁছল লোকটার কাছে। বেশি কেউ নেই। একা একা দাঁড়িয়ে লাল জ্যাকেট পরা সোনালি চুলের লোকটা গিটার বাজিয়েই যাচ্ছে। সৌম্যকে দেখে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। মিউজিকটা চিনতে না পারলেও মনে হল সুরটা কোথাও সে শুনেছে। বেশ ফুরফুরে আর তরতাজা করে দিল ওর মনটা। সুরটা শুনে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছা করল সৌম্যর। সাবওয়ের দেয়ালে হেলান দিয়ে ও অপেক্ষা করছিল সেন ড্যানইয়ংয়ের। মেয়েটা কি আদৌও আসবে এখানে? মনে পড়ল, কিছু খুচরো পেনি ফেরত দিয়েছিল সেই কফি বিক্রেতা মহিলা। কয়েকটা পেনি সৌম্য পকেট থেকে বের করে রেখে দিল লোকটার সামনে রাখা বাক্সে।

হঠাৎ সৌম্যর লক্ষ পড়ল, সাবওয়ের উলটোদিকের রাস্তা দিয়ে একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে এদিকে। পরনে কালো কোট আর স্কার্ট। চাইনিজ মেয়েদের মতোই দেখতে। সোজা সটান কালো চুল নেমে এসেছে ঘাড় পর্যন্ত। এই কি তবে সেন ড্যানইয়ং? ঈপ্সিতার কলিগ? মেয়েটার চোখে একটা চশমা। কোন দিকে তাকিয়ে আছে বোঝা যাচ্ছে না। মেয়েটা হাই-হিল জুতো পরে গটমট করে হেঁটে চলে গেল সৌম্যকে পাশ কাটিয়ে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে ও পিছন ঘুরে দেখল চার-পাঁচজন ষন্ডামতো ছেলে দাঁড়িয়ে আছে ওকে ঘিরে। আসলে ওই মেয়েটাকে লক্ষ করতে গিয়ে পিছনে চোখ যায়নি সৌম্যর। ছেলেগুলো আচমকা আক্রমণ করল ওকে। কিছুটা চেষ্টা করেছিল সেই আক্রমণ প্রতিহত করার। কিন্তু ওরা সবাই তৈরি হয়ে এসেছিল। প্রচণ্ড জোরে একটা ঘুসি মারল কেউ। চোখের সামনেটা ব্ল্যাক-আউট হয়ে গেল সৌম্যর। মাথাটা ঝিমঝিম করতে শুয়ে পড়ল মেঝেতে।

মরুঝড়

লিও অনেকক্ষণ চুপ করে শুয়ে ছিল। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টার বেশি হবে তো কম নয়। ও হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় ঘুমিয়েও নিয়েছে। সুযোগমতো মস্তিষ্ক যদি বিশ্রাম পায় তাহলে সে ভালো কাজ করে। এসব ওর অভ্যেস আছে। কম্যান্ডো ট্রেনিংয়ে শেখানো হয়েছে ওদের। এবার সোজা হয়ে বসল লিও। ওর মাথার মধ্যে একটা কথাই ঘুরছে, কারা ওকে কিডন্যাপ করল। জাহাজে করে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওকে? পোর্ট ওম-আল-কোয়াইন থেকে যদি জাহাজ ছাড়ে তাহলে পশ্চিমদিকে পার্সিয়ান সাগর কুয়েতে গিয়ে শেষ। কিন্তু যদি জাহাজ পূর্বদিকে যায় তাহলে গালফ অফ ওমান পেরিয়ে আরব সাগর। তারপর ইরান, পাকিস্তান আর ভারত। এরা তাকে ভারতে নিয়ে যাবে কি?

কেবিনের দরজা সামান্য ফাঁক করে বার্গার আর জল গলিয়ে দিয়েছে। সারাদিনের জন্য এটাই একমাত্র খাবার। ইতোমধ্যে হাত আর মুখের বাঁধন লিও নিজেই খুলে ফেলেছে। জাহাজ চলছে বুঝতে পারছে ও। মৃদু দুলুনি অনুভব করা যায় আর মেঝেতে কান পাতলেই ইঞ্জিনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। নইলে নিস্তব্ধ। লিও ইঞ্জিনের শব্দে আন্দাজ করল এটা একটা বড়ো জাহাজ। কোনও কার্গো শিপ হতে পারে। এই ছোট্ট কেবিনে কোনও জানালাও নেই। বাইরের আলো অথবা অন্ধকার কোনোটাই প্রবেশ করে না এখানে। শুধু পাঁচ ওয়াটের টিমটিমে একটা আলো জ্বলছে। এককোণে টয়লেটের ব্যবস্থা। সবকিছুই মোটা স্টিলের পাত দিয়ে তৈরি। মাথার উপরে এককোণে ছোট্ট একটা ক্যামেরা আছে। ওর উপরে নিশ্চয়ই সারাক্ষণ কেউ নজরদারি করছে। ওরা বোঝার চেষ্টা করছে লিওর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে।

লিও খাওয়া সেরে চুপচাপ মড়ার মতো পড়ে রইল। এখন ওর কাজ হচ্ছে যতটা সম্ভব ঘুমিয়ে নেওয়া আর এনার্জি জমিয়ে রাখা। পরে সুযোগ তো নিশ্চয়ই আসবে। তার জন্যই অপেক্ষা করছে লিও।

আনুমানিক তিনদিন পর সুযোগটা এল। লোহার দরজা খুলে ছ’জন ঢুকল। সবাই সশস্ত্র। চারটে মারণ এম.পি-ফর্টি তাক করা আছে ওর দিকে। দুজন এগিয়ে এসে লিওর দুটো হাত পিছনে করে স্ট্রিপ আটকে দিল। মুখের উপরে একটা আঠা টেপ আটকে কালো কাপড় দিয়ে মুণ্ডুটা বেঁধে দিল। ঠিক আগের মতো। তারপর ওর কনুই দুটো শক্ত করে ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল। লিও একফোঁটা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেনি। এই ছজন লোককে ছোট্ট ঘরের মধ্যে নিকেশ করা ওর কাছে খুব বড়ো ব্যাপার নয়। কিন্তু তারপরেও এখান থেকে যে ও ছাড়া পাবে তেমন নিশ্চয়তা নেই। বাইরে কে বা কারা আছে? কতজন আছে? এগুলো মোটামুটি আন্দাজ না করে বেচাল করলে ওকেই ভুগতে হবে পরে।

লোকগুলোর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে জাহাজের বাইরে এল লিও। ওর চোখ কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকলেও দিনের আলোর আভা এসে পৌঁছচ্ছে। ওর মনে হল জাহাজ থেকে নামানো হচ্ছে ওকে। তার মানে এটা কোনও বন্দর। চলতে গিয়ে বুঝতে পারল পায়ের নীচে সরু লোহার পাটাতন। সেটা নীচের দিকে হেলে আছে। দু-পাশে রেলিং দেওয়া। অর্থাৎ নীচে জল। লিও ঠিক করে নিল, এটাই সুবর্ণসুযোগ। বড়ো করে শ্বাস নিল। তারপর শরীরটা দুলিয়ে নিয়ে এমনভাবে লাফ দিল যাতে দুজনকে সঙ্গে নিয়ে পড়ে। এসব ক্ষেত্রে রিস্ক ফ্যাক্টর অনেকটাই থাকে। কিন্তু ঝুঁকিটা নিলে অনেক ক্ষেত্রে লাভ হয়। দু-তিন সেকেন্ড সময় লাগল জলে পড়তে। উপর থেকে গুলির শব্দ শুরু হয়ে গেছে। তবে ওরাও ঘাবড়ে গেছে আকস্মিক ঘটনাতে। ওদের দুজন সঙ্গীও নীচে পড়েছে। অতএব গুলি চালাতে গিয়েও থমকে যেতে হচ্ছে বার বার। সেই সুযোগটাই লিও নিল। ডুবসাঁতার দিয়ে চলে যেতে পারল অনেকটা দূরে। কোনও একটা ভারী লোহার জিনিসে আটকে গেল জলের ভিতর। হাত দুটো পায়ের মধ্যে দিয়ে সামনে নিয়ে এসে সেই ডুবন্ত লোহার আংটায় ঘষতে কেটে গেল হাতে বাঁধন। তারপর মাথার ঢাকনা আর মুখের টেপ তুলতে আরও কয়েক সেকেন্ড লাগল। হালকা করে নাক-মুখটা ভাসিয়ে দ্রুত আর একবার শ্বাস নিল বড়ো করে। তারপর লিও এতদূরে গিয়ে উঠল যে বিপক্ষ দলের ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাথা তুলে দেখল কয়েকটা ছোটোবড়ো জাহাজ ভাসছে বন্দরের গায়ে। তার মধ্যে তেলের কার্গো শিপের সংখ্যা বেশি।

প্রায় আধঘণ্টা সাঁতার টানা কেটে উঠে এল পাড়ে। এদিকটা অনেক ফাঁকা। কেউ কোথাও নেই। বালির উপর হাঁটতে গিয়ে লক্ষ পড়ল একটা টিনের হোর্ডিং, ফারসিতে লেখা ‘বন্দর-ই-জাস্ক’, মানে এটা ইরান। অর্থাৎ, আরব সাগরের তীরে আর একটা পোর্ট। লিওর যখন মধ্যপ্রাচ্যে পোস্টিং ছিল, ফারসি শেখানো হয়েছিল ওদের। কিন্তু এখান থেকে বেরোনোর রাস্তা কী? ওর সঙ্গের ব্যাগটা গেছে। মোবাইল, টাকা, ব্যাংকের কার্ড, পাসপোর্ট কিছুই নেই। প্যান্টের পকেট পুরো ফাঁকা। মনটা শক্ত করে হাঁটতে শুরু করল বালির উপর দিয়ে। একটা ইন্টারন্যাশনাল ফোন করার মতো জায়গা চাই। কিন্তু দিনের আলোয় বেশি ছটফট করলে শত্রুপক্ষের নজরে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। চোখে পড়ল, কিছুটা দূরে বালির মধ্যে গেঁথে আছে একটা ছোটো ভাঙাচোরা জাহাজ। কাছে গিয়ে দেখে লিও খুশি হল। সূর্যের আলো নামা পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষা করা যাবে। ভাঙা জাহাজটার ভিতরে ঢুকে বসে পড়ল সে। এদিকে কেউ নেই। জামা, প্যান্ট, জুতো খুলে শুকোতে দিয়ে দিল। সমুদ্রের টানা হাওয়ায় জল ঝরে যাবে।

সূর্যাস্তের জন্য ঘণ্টা পাঁচেক অপেক্ষা করতে হল লিওকে। তবে আরব সাগরের তীরে সেই দৃশ্য বেশ মনোরম। এক ঝাঁক সামুদ্রিক ঈগল উড়ে যাচ্ছে মাথার উপর দিয়ে। টিউলিপ ফুলের মতো টকটকে লাল আকাশ। অন্ধকার হওয়ার পর আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল লিও। তারপর জামা-প্যান্ট পরে বেরিয়ে পড়ল। কিছুটা হাঁটতে একটা সরু পাথর বাঁধানো রাস্তা পেল লিও। দূরে টিমটিম করে আলো জ্বলছে। আরও কিছুক্ষণ পর একটা গাড়ি দেখতে পেয়ে এগিয়ে গিয়ে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল, “এখানে কোনও হোটেল আছে? থাকার কোনও জায়গা?”

লোকটা ওকে দেখে মাথা নাড়ল। আঙুল তুলে ওকে বলল, “উধার যাও।”

লিও দেখল অন্ধকারের মধ্যে ওদিকটা বেশ আলো ঝলমল করছে। আরও মিনিট দশেক হেঁটে একটা ছোট্ট বসতি অঞ্চলে পৌঁছল ও। পেট্রোল পাম্প, স্টেশনারি দোকান, রেস্তোরাঁ, সুপার স্টোর— সবই আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। লিও ছাড়া সবাই অ্যারাবিয়ান পোশাক পরে আছে। বড়ো বেমানান লাগছে ওকে। সবাই ভূত দেখার মতো দেখছে ঘুরে ঘুরে। একটা সুপার স্টোরে ঢুকে দেখল একজন মাঝবয়সি লোক বসে আছে। পরনে সাদা আলখাল্লা আর মাথায় টুপি। তার পাশে বসে একটি বাচ্চা মেয়ে খেলা করছে। সম্ভবত স্টোরের সঙ্গে লাগোয়া ওদের বাড়ি। লিও জিজ্ঞেস করল, “একটা ফোন করা যাবে?”

লোকটা মাথা নাড়তে ফোনটা হাতে দিতে প্রথমেই ফিনিতের নম্বর ডায়াল করল লিও। প্রথমবার রিং হয়ে কেটে গেল। তার পরের বার ধরল।

“হ্যালো!”

“ঘুমের ব্যাঘাত ঘটালাম নাকি?”

“লিও! কোথা থেকে ফোন করছ তুমি?”

“ইরানের একটা ছোট্ট তেলের বন্দর জাস্ক থেকে।”

“দুবাই থেকে তুমি ওরকম দুম করে গায়েব হয়ে গেলে কেন? মি. লিয়ন্স খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন। রস-অল-খাইমা থেকে প্লেনে ওঠার কথা ছিল।”

লিও মোটামুটি সংক্ষেপে ওকে বুঝিয়ে বলল গত তিনদিনে ওর সঙ্গে কী কী ঘটছে। ফিনিত সব শুনে বলল, “স্টোর মালিককে ফোনটা দাও। আর তুমি ওখানেই অপেক্ষা করো। আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”

ফোনে লোকটির সঙ্গে ফিনিত কিছু কথা বলল আর মিনিট পনেরো মধ্যেই একটা মোটা টাকা ট্রান্সফার হয়ে গেল ইরানি লোকটার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। সে নিজের কমিশন কেটে নিয়ে কিছু ডলার আর লোকাল টাকা তুলে দিল লিওর হাতে। সেই স্টোর থেকেই লিও স্থানীয় পোশাক, একটা ব্যাগ আর কিছু দরকারি জিনিস সংগ্রহ করে বেরিয়ে গেল তাড়াতাড়ি। পোশাকটা পালটে নিয়েছে, ফলে নিজেকে আর খুব একটা বেমানান লাগছে না। ছোট্ট জনপদটা এক চক্কর ঘুরে এল। তারপর স্টোরের ঠিক উলটোদিকে একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে কিছু খাবার অর্ডার করল লিও। খিদে পেয়েছে খুব। এখানের জনপ্রিয় খাবার ‘চেলো কাবাব’। মাংসের কাবাবের সঙ্গে হলুদ ঝরঝরে ভাত আর স্যালাড।

কয়েকটা গ্রাস তখন সবে মুখে পুরেছে, দুটো টয়োটা স্পিডে এসে থামল সেই সুপার স্টোরের সামনে। জনাদশেক লোক নামল। সবার হাতেই ভারী আগ্নেয়াস্ত্র। এটাই ভয় পাচ্ছিল লিও। ওর পিছনে যারা পড়েছে এত সহজে কি ছেড়ে দেবে?

খাবারের দাম মিটিয়ে লিও ব্যাগটা নিয়ে নিঃশব্দে রেস্তোরাঁর পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল। ঝামেলা যতটা এড়িয়ে যাওয়া যায় ততই ভালো। এদিকে ফিনিত আবার ওকে বলেছে ওই স্টোরের কাছাকাছিই থাকতে। তার মানে ও নিশ্চয়ই কোনও হেল্প পাঠাবে। দূরে পালিয়ে গেলে ইরানের সমুদ্র উপকূলের এই অচেনা শহর থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। লিও দূর থেকে লক্ষ রাখছিল ওই স্টোরের দিকে। চারজন লোক এ.কে-ফর্টি-সেভেন নিয়ে বাইরে পাহারা দিচ্ছে। বাকিরা ঢুকেছে ভিতরে। চেহারা আর পোশাক দেখে লিওর মনে হল এরা স্থানীয় কোনও গ্যাং। প্রফেশনাল মিলিটারি বা কম্যান্ডোদের হাঁটাচলা, অস্ত্র ধরার টেকনিক আলাদা।

কিছুক্ষণ পরে স্টোরের ভিতর থেকে দু-রাউন্ড গুলির আওয়াজ এল। ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল সামনের কাচ। স্টোরের মালিকটা বড়ো ভালো ছিল। দুষ্কৃতিরা লিওকে খুঁজতে গিয়ে ওই লোকটার প্রাণ নিল মনে হচ্ছে।

না, এখনও তাকে মারেনি। তবে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে বের করেছে। মাথার পিছনে বন্দুকের নল ঠেকানো। একজন চেঁচিয়ে বলল, “রয়! তুমি যেখানেই থাকো সামনে চলে এসো। না এলে এই নিরীহ মানুষটার প্রাণ যাবে। এর জন্য দায়ী থাকবে তুমি। এক, দুই, তিন…”

লিও তবু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল অন্ধকারের মধ্যে। ওর গায়েও সাদা আলখাল্লা আর মাথায় ফেজ টুপি। চট করে লক্ষ পড়বে না। কিন্তু দুষ্কৃতিরা কি সত্যিই ওই লোকটার প্রাণ নেবে? ও তো ইরানি। স্থানীয় লোকেরা কি কোনও প্রতিবাদ করবে না? ভাবতে-ভাবতেই আর একটা গুলির শব্দ হল। রাস্তাতেই লুটিয়ে পড়ল লোকটা। নৃশংস দৃশ্য। এরপর ওরা যেটা করল সেটা আরও সাংঘাতিক। ছোট্ট বাচ্চা মেয়েটিকে চুলের মুটি ধরে টানতে টানতে নিয়ে এল রাস্তায়। এবারে লিও আর চুপ করে থাকতে পারবে না। অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল সে। শান্তভাবে হাঁটতে লাগল রাস্তার উলটোদিক দিয়ে। সামনেই ইলেকট্রিকের ট্রান্সফর্মার। এখান থেকেই এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। লিও পিঠের ব্যাগ থেকে এক লিটার পেট্রোলের বোতলটা বের করল। এটা কিছুক্ষণ আগেই সে কিনেছে। বোতলের ঢাকনাটা সরিয়ে একটা রুমাল পেট্রোলে ভিজিয়ে ঢুকিয়ে দিল ভিতরে। তৈরি হয়ে গেল পেট্রোল বোম। তেলের দেশে এসে এইটা করা ছিল সবথেকে সহজ কাজ। রুমালে আগুন দিয়ে ছুড়ে দিল ট্রান্সফর্মারের গায়ে। বিকট আওয়াজ করে আগুন ধরে গেল। আর মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকার হয়ে গেল গোটা এলাকা। তারপরে এক-দু’মিনিট কিছু চিৎকার আর আর্তনাদের শব্দ কানে এল স্থানীয় বাসিন্দাদের। আগুনের ঝলকানির আলোতে কিছু দৌড়দৌড়ি। তারপরেই সব শান্ত হয়ে গেল। বাড়ি থেকে টর্চ হাতে বাচ্চা মেয়েটির মা দৌড়ে এসে মেয়েকে কোলে তুলে আবার ঢুকে গেল বাড়িতে। টর্চের আলোয় দেখল জনাদশেক লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে চারপাশে। কারও শরীরে প্রাণ নেই।

কলকাতার হালহকিকত

স্থানীয় সময় রাত তিনটে পঁয়তাল্লিশে একটা প্লেন ল্যান্ড করল কলকাতায়। ক্যাপ্টেন ঘোষণা করলেন, “আমরা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে গেছি।”

ইমিগ্রেশন পর্ব মিটিয়ে বাইরে আসতেই একজন মোটাসোটা লোক লিওকে উদ্দেশ করে নমস্কার করল।— “ওয়েলকাম স্যার, আমার নাম অঞ্জন পাত্র। আপনার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। লাগেজ আমি নিচ্ছি, আপনি আসুন। কলকাতায় আমি আপনার ম্যানেজার কাম গাইড।”

লিও লোকটার সঙ্গে গিয়ে উঠল একটা কালো অডি গাড়িতে। কলকাতার তাপমাত্রা দুবাইয়ের তুলনায় কম হলেও আর্দ্রতা বেশি। তবে গাড়ির ভিতরটা বেশ ঠান্ডা। লোকটা ড্রাইভারের পাশে বসে জানাল, “হোটেল পৌঁছতে পনেরো মিনিট সময় লাগবে স্যার। হায়াত রিজেন্সি। খুব ভালো হোটেল।”

রাতের অন্ধকারে আলো ঝলমলে কলকাতা এই প্রথম দেখছে লিও। সে ভাঙা বাংলায় জিজ্ঞেস করল, “অঞ্জনবাবু, আপনাকে কিছু খোঁজখবর নিতে বলেছিলাম। কাজ কিছু এগিয়েছে?”

“হ্যাঁ, স্যার। তবে পাখি ফুড়ুৎ।”

“মানে?”

“ওই যে ছেলেটি, ঈপ্সিতার বন্ধু, নাম সৌম্য প্রামাণিক, সে গত পরশু লন্ডন চলে গেছে। আমরা চেষ্টা করেছিলাম ওকে আটকানোর। কিন্তু সম্ভব হল না। আপনি আসতে দেরি করে দিলেন স্যার।”

“হুম! দুবাই থেকে কিডন্যাপ করা হয়ে ছিল আমাকে। জাহাজে করে নিয়ে যাওয়া হল জাস্ক। সেখানে ইরানের একটা ক্রিমিনাল গ্যাং অ্যাটাক করেছিল আমার উপর। তাদের হাত থেকে কোনোরকমে ছাড়া পেয়ে আবার জাহাজে করে পৌঁছলাম ওমানের মাসকট। মাসকটে মি. লিয়ন্সের ডেরায় রইলাম এক সপ্তাহ। নতুন করে পাসপোর্ট করাতে সময় লাগল। তারপর সেখান থেকে মুম্বই হয়ে কলকাতা। মাঝে অনেকগুলো দিন বেকার নষ্ট হল।”

কিছুক্ষণ চুপ করে লিও জানতে চাইল, “আপনি কি রবার্ট কক্সের ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছিলেন?”

“আপনি তো বলেই খালাস স্যার। সে প্রায় একশো বছর আগের ঘটনা। তখন ইংরেজ সরকার এ-দেশ শাসন করত। রবার্ট কক্স ছিলেন দক্ষিণ কলকাতায় হুগলি নদীর ধারে অ্যালবিয়ান জুটমিলের চিফ ইঞ্জিনিয়র। নদীর পাড়ে ওঁর বাংলোর এখন ভগ্নপ্রায় দশা। সেখান থেকে কোনও তথ্য পাওয়া গেল না। তবে আমিও নাছোড়বান্দা! খোঁজ নিয়ে জানলাম ষাটের দশকে অ্যালবিয়ান জুটমিলের বড়ো কর্তা মানে জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন রাজনাথান মেসরাম। তাঁর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়, গোরাচাঁদ বারিক। তিনি জানালেন, রবার্ট কক্সের এক শাগরেদ ছিল। সেই যদুনাথ দাসের মেয়ের মেয়ে হচ্ছে ঈপ্সিতা। এর কাছে নাকি রবার্ট কক্সের কিছু পুরোনো কাগজপত্র আর খাতা ছিল। আমার লোক সে-ঘরে ঢুকে তন্নতন্ন করে খুঁজেছে। কিন্তু তেমন কিছু পায়নি। সৌম্য নামে একটি ছেলে কিছুদিন আগেই নাকি কাগজপত্র বের করে পোস্টে লন্ডন পাঠিয়েছে ঈপ্সিতার কাছে। এ একদম পাকা খবর স্যার। তবে আমরা ছাড়া আরও অনেকে খোঁজখবর করছে এদিকে।”

“আর কে?”

“কিছুদিন আগে একজনের লাশ পাওয়া গেছে রবার্ট কক্সের বাংলোর কাছে। সাপের কামড়ে মারা গেছে। ওই পোড়ো বাংলো তো এখন বিষধর সাপের আড়ত। কেউটে ঘুরে বেড়ায় দিনের বেলায়।”

“ডেড বডিটা কার?”

“সেটাও খোঁজ নিয়েছি স্যার। লোকাল থানায় দৌড়োদৌড়ি করতে হয়েছে অনেক। এই যে ডায়েরিতে নোট করা আছে। বিদঘুটে নাম, ডামুলিও মাফাঙ্গুলি। সাউথ আফ্রিকার নাগরিক। টুরিস্ট ভিসায় ভারতে এসেছে। পুলিশ জানাল, বাইপাসের এক নামি পাঁচ তারা হোটেলে লোকটা এক সপ্তাহ ধরে ছিল। তার মধ্যে তিনদিন ট্যাক্সি ভাড়া করে দক্ষিণ কলকাতার ওই বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা জুটমিলে গেছে। রবার্ট কক্সের বাংলোর পিছনে গিয়ে নাকি মাটি খুঁড়ছিল।”

“আচ্ছা, ঠিক আছে। কাল সকালে আমরাও একবার ঘুরে আসব রবার্ট কক্সের বাংলোতে।”

“বেশ, তাই হবে স্যার।”

গাড়ি ঢুকে গেল হোটেলের পোর্টিকোতে।

পরের দিন হোটেলের ডাইনিং হলে ব্রেকফাস্ট সেরে লাউঞ্জে এসে লিও দেখল অঞ্জনবাবু স্যুট-বুট পরে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছেন। লিও হেসে জিজ্ঞেস করল, “কোনও অফিসে যাবেন মি. পাত্র?”

অঞ্জনবাবু ঘাবড়ে গিয়ে উত্তর দিলেন, “আপনার সঙ্গে যাওয়ার কথা স্যার।”

“তাহলে এত সেজেগুজে এসেছেন কেন?”

“না মানে, আপনি আমার প্রথম অ্যামেরিকান ক্লায়েন্ট। তাই স্যুট পরে এলাম।”

“খুব ভুল কাজ করেছেন। আমি জন্মসূত্রে অ্যামেরিকান হলেও পৈতৃক বাড়ি ছিল এখানেই। যদিও আমি ভারতে এর আগে কোনোদিন আসিনি। গোয়েন্দাগিরির প্রথম শর্ত হল অতিসাধারণভাবে সবার মধ্যে মিশে থাকা। আপনি এক কাজ করুন, এখান থেকে বাড়ি যান। গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে একদম সাধারণ কিছু পরুন। তারপর একটা হলুদ ট্যাক্সি ভাড়া করে স্পটে আসুন। আমি ততক্ষণে লোকাল ট্রান্সপোর্টে পৌঁছচ্ছি।”

“আপনি একা যাবেন? আপনার সিকিউরিটি?”

“সে নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না।”

লিওর পরনে নীল জিন্স, আকাশি টি-শার্ট, মাথায় একটা কালো টুপি। হোটেল থেকে বেরিয়ে গুগল ম্যাপ ঘেঁটে একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা চলে এল শিয়ালদহ স্টেশনে। সেখানে সাউথের লোকাল ট্রেনের টিকিট কেটে উঠে পড়ল ভিড় ট্রেনে। ঘণ্টা খানেক লাগল গন্তব্যে পৌঁছতে। স্টেশন থেকে নেমে এগিয়ে গেল অটো স্ট্যান্ডের দিকে। অ্যালবিয়ান জুটমিলের নাম শুনে অটো ড্রাইভারগুলো নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। শেষে একজন বয়স্ক অটো ড্রাইভার এগিয়ে এসে বলল, “সে-মিল তো বহুবছর বন্ধ, সাহেব।”

“হ্যাঁ, আমি জানি। জুটমিলের শেষে হুগলি নদীর ধারে একটা পুরোনো বাংলো আছে। আমি সেই বাংলোটা দেখতে যাব।”

“ও! ভূতবাংলো?”

“হ্যাঁ, সেটাই।”

“চলুন।”

প্রথমে বড়ো রাস্তা, তারপর এ-গলি সে-গলি হয়ে অটো ছুটল। শেষে বাঁধের উপরে সিমেন্টের রাস্তা দিয়ে গিয়ে দাঁড়াল একটা জঙ্গলঘেরা পোড়ো বাড়ির সামনে। অটোওলাকে দাঁড়াতে বলে লিও এগিয়ে গেল সেদিকে। ইউরোপিয়ান কাঠামোর কিছুটা অংশ এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ভাঙা গেট দিয়ে ঢুকেই বাঁদিকে একটা পেয়ারা গাছ দেখে এগিয়ে গেল লিও। একটা লম্বা শক্ত ডাল ভেঙে নিল। হাতে একটা শক্তপোক্ত লাঠি থাকা দরকার। তারপর সেই লাঠি ঠুকে ঠুকে এগিয়ে চলল বাংলোর ভিতরে। অজস্র আগাছা আর ছোটোবড়ো গাছেদের ভিড়ে পথ খুঁজে পাওয়া একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ। সদ্য তৈরি করা হাতের ডাণ্ডাটা দিয়ে সপাৎ সপাৎ করে গাছের পাতার উপর আঘাত করে রাস্তা তৈরি করে নিল। পিছন থেকে অটো ড্রাইভার চেঁচিয়ে সাবধান করল, “কিছুদিন আগেই এক বিদেশি কালো মানুষ এখানে এসে সাপের কামড়ে মারা গেছে। সাবধান সাহেব!”

জঙ্গলটা পেরিয়ে ভাঙাচোরা সিঁড়ি দিয়ে উপরের চাতালে উঠে দাঁড়াল লিও। চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে ওর মনে হল একেবারে এখানে কেউ আসে না, এটা বলা ভুল। কারণ, পানীয়ের কাচের বোতল গোটা এবং ভাঙা অবস্থায় এককোণে পড়ে আছে। তার মানে স্থানীয় কিছু মানুষজনের আনাগোনা আছে এখানে। মাথার উপরের ছাদ অনেকটাই ফাঁকা। যেটুকু ঝুলছে সেটাও যে-কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। সাপের খোলস চোখে পড়ল দুটো। বেশ বড়ো সাইজের সাপ। কাছাকাছি কোথাও এদের আস্তানা আছে। কিন্তু যারা এখানে আড্ডা মারতে আসে তাদের তো সাপ কিছু করে না। তাহলে ওই আফ্রিকান লোকটা সাপের কামড়ে মারা গেল কেন? হাতের ডাণ্ডা দিয়ে শব্দ করতে করতে সাবধানে ভিতরে ঢুকল লিও। সূর্যের আলো সরাসরি এখানে প্রবেশ করছে না। স্যাঁতসেতে আবছা অন্ধকার। একটা সরু সিঁড়ি নেমে গেছে নীচের দিকে। সেখানেও আগাছা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে। লিও আগাছাগুলোকে সরিয়ে ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল। এই জায়গাটা বেশ অন্ধকার। মোবাইলের টর্চটা জ্বেলে নিল। এটাই মনে হচ্ছে সাপেদের আদর্শ বাসস্থান। ভাঙাচোরা মেঝের উপরে মোটা শ্যাওলার আস্তরণ। সাপেদের চলাফেরার চিহ্ন সর্বত্র। একটা পচা গন্ধ নাকে আসছে। এখানে কোনও সাধারণ ব্যক্তি ঢোকার সাহস পাবে না। লিও মোবাইলের আলোয় জায়গাটা খুঁটিয়ে দেখছিল। হঠাৎ কোনও একটা জিনিসে আলো পড়তে চকচক করে উঠল সেটা। এক পা এক পা করে এগিয়ে দেখল একটা কাচের শিশি। বেশ নতুন। হাতে তুলে নাকের কাছে ধরতে একটা ঝাঁজালো গন্ধ পেল লিও। কার্বলিক অ্যাসিড। তার মানে লোকটা হয়তো তৈরি হয়েই এসেছিল। কিন্তু তাও তাকে মরতে হল। কিন্তু কেন? দেখে মনে হল নীচের ঘরটার একসময় গবেষণাগার হিসেবেই ব্যবহার হত। পুরোনো দিনের হাপর, চৌবাচ্চা, বড়ো লোহার হাতুড়ি— এরকম টুকটাক জিনিস ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে। কিন্তু ওই লোকটা কী খুঁজতে এসেছিল এখানে?

হঠাৎ উপর থেকে একটা চিৎকার লিওর কানে এল।— “বাবা গো! মা গো! বাঁচাও!”

এ তো মিস্টার পাত্রর গলা মনে হচ্ছে!

দৌড়ে উপরে উঠে এল লিও। বাংলোর পিছন দিক থেকে চিৎকারটা আসছে। সেদিকে গিয়ে লিও দেখল মি. পাত্র মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছেন।— “ওরে বাবা রে! মরে গেলাম রে!”

অটো ড্রাইভারটাও দৌড়ে এসেছে চেঁচামেচি শুনে। লিও গলা উঁচিয়ে জানতে চাইল, “কী হল আপনার?”

“পিঁপড়ে স্যার! সারা গায়ে লাল পিঁপড়ে ছেঁকে ধরেছে। খুব কামড়াচ্ছে। গোটা শরীর জ্বালা করছে। আমাকে বাঁচান!”

লিও দেখল অঞ্জনবাবু সারা গায়ে পিঁপড়ে ছেঁকে ধরেছে। হাতে, গলায়, ঘাড়ে থিকথিক করছে একেবারে। পিঁপড়ের হুলে থাকে ফরমিক অ্যাসিড। সেটাই মূলত জ্বালার কারণ। লিও অঞ্জনবাবুর মোটাসোটা শরীরটা ধরে জোর করে দাঁড় করিয়ে নির্দেশ দিল, “জামাটা তাড়াতাড়ি খুলে ফেলুন।” তারপর রুমাল দিয়ে ঝেড়ে পিঁপড়েগুলো তাড়ানোর চেষ্টা করল দুজনে।

“আপনি এদিক দিয়ে কী করে এলেন?”

“গুগল নিয়ে এল স্যার! আমার কোনও দোষ নেই। বাড়ি গিয়ে জামা পালটে ট্যাক্সি ভাড়া করে সোজা আসছি এখানে। মিলের ভিতর দিয়ে এই রাস্তাটা গুগুল ম্যাপে দেখাল। মিল তো বন্ধ। গেটে দারোয়ান আটকেছিল আমাকে। তাকে কোনোরকমে বকশিস দিয়ে ম্যানেজ করলাম। তাও ট্যাক্সি পুরো রাস্তা এল না। চারদিকে জঙ্গল। আমি খুঁজে হেঁটে আসছিলাম। হঠাৎ ডানদিকে একটা সরসর করে শব্দ হতে বুকটা ধড়াস করে উঠল। মনে হল একটা কালো লম্বা সাপ চলে গেল। বেখেয়ালে গর্তের মধ্যে পা আটকে পড়লাম ওই ঝোপের উপর। ওখানেই ছিল লাল পিঁপড়ের বাসা।”

“হুম! বুঝলাম। আপনার সারা গা তো ফুলে যাচ্ছে। এখুনি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।” তারপর লিও ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল, “এখানে কাছাকাছি কোনও ডাক্তার বা হসপিটাল আছে?”

“আছে, কিন্তু হসপিটাল বেশ দূরে। তবে পাশেই একজন বাবাজি আছেন, আয়ুর্বেদ টোটকা করেন। ওঁর ওষুধে ভালো কাজ হয়। একবার দেখবেন নাকি?”

লিও ড্রাইভারের কথা শুনে মন্তব্য করল, “কোথায়?”

“আসুন আমার সঙ্গে।”

নদীর বাঁধের উপর দিয়ে দু-মিনিট হাঁটতেই বাঁকে দেখা গেল বড়ো গাছের গোড়ায় একটা ছোট্ট শিবমন্দির। আর তার সঙ্গে লাগোয়া একটা ঝুপড়ি। অঞ্জনবাবুকে নিয়ে দুজনে হাজির হল সেখানে। কিন্তু শিবমন্দির বা ঝুপড়ির কোথাও কেউ নেই। অটো ড্রাইভার বলল, “আপনারা এখানে বসুন, আমি লোকটাকে খুঁজে আনছি।”

এদিকে অঞ্জনবাবু ‘বাবা গো, মা গো,’ করে মাথা খারাপ করে ফেলছেন। তাঁকে দেখে লিওর হাসিও পাচ্ছে আর কষ্টও হচ্ছে। কৌতূহলবশত লিও বাবাজির কুঁড়েঘরে ঢুকে দেখল থরে থরে প্রচুর শিশি-বোতল ভরতি জড়িবুটি, শিকড়-বাকড় রাখা আছে। কিন্তু আচমকা এককোণে রাখা একটা সিগারেটের বাক্সে লিওর চোখ পড়ল। ডানহিল! এই ব্রান্ডের সিগারেট ভারতে খুব একটা চলে না। ইউরোপের কোম্পানি। অবশ্য সারা পৃথিবীতে এর সাপ্লাই আছে। কিন্তু এই কুঁড়েঘরে এ-জিনিস খুবই বেমানান। হাতে নিয়ে দেখল, তাতে এখনও বেশ ক’টা সিগারেট পড়ে রয়েছে। বাবাজির কাছে এ-জিনিস এল কোথা থেকে?

“এই যে বাবাজিকে ধরে নিয়ে এলাম। নদীতে স্নান করছিলেন।”

লিও দেখল ষাটোর্ধ্ব বয়স, বাদামি গায়ের রঙ, জটাজুট বড়ো চুল, নিম্নাঙ্গে শুধু একটা লাল কাপড় জড়ানো। চোখ দুটো ট্যাঁরা। কোন দিকে তিনি তাকিয়ে আছেন বোঝা যায় না। সারা গা ভিজে। সব শুনে কুঁড়েঘরে ঢুকে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে একটা শিশি আর শুকনো শিকড় বের করে আনলেন। একটা লোহার হামানদিস্তাতে ফেলে ঠুকে ঠুকে ভেষজ গুঁড়োর মিশ্রণ তৈরি করলেন। তারপর সেটা জল দিয়ে ঘন করে গুলে অঞ্জনবাবুর সারা গায়ে লাগিয়ে দিলেন। কাজ হল ম্যাজিকের মতো। মিনিট দশেকের মধ্যেই অঞ্জনবাবুর সারা গায়ের লাল দাগ মিলিয়ে গেল। যন্ত্রণাও কমে এল। তিনি ভক্তিভরে সাষ্টাঙ্গে একটা প্রণাম সেরে বললেন, “বোম শঙ্কর!”

লিও সাধুবাবাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে গলা নামিয়ে বলল, “গুরুজি, আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল।”

বিস্মিত চোখে সাধুবাবা তাকালেন লিওর দিকে।

“ডামুলিও মাফাঙ্গুলি নামে এক সাউথ আফ্রিকার লোক কিছুদিন আগে এখানে সাপের কামড়ে মারা গেছে। আপনার পরিচয় হয়েছিল তার সঙ্গে?”

কথাটা শুনেই সাধুবাবা কোনও কথা না বলে ধড়মড়িয়ে উঠে পড়লেন। তারপর তাড়াতাড়ি নেমে গেলেন নদীর পাড়ে। অটো ড্রাইভার বলল, “চলুন স্যার, ওঁর এখন মৌনব্রত চলছে। কোনও কথা বলবেন না।”

ট্যাক্সি করে ফেরার পথে লিও মুখ খুলল, “বুঝলেন অঞ্জনবাবু, এ সাধুবাবা অনেক কিছু জানে। উপযুক্ত পারিশ্রমিক পেলে নিশ্চয়ই মুখ খুলবে।”

“মানে?”

“আজকে রাত্রে মনে হচ্ছে আর একবার আসতে হবে এখানে।”

“রাতে আবার আসবেন?”

“হ্যাঁ, গোপন কথা বাবাজির মুখ দিয়ে বার করতে গেলে রাতটাই উপযুক্ত সময়।”

“তাহলে এই ট্যাক্সিওলাকেই বলে রাখি?”

“না, তার দরকার হবে না। আমাকে একটা বাইক জোগাড় করে দিতে পারবেন?”

“এতদূর বাইক নিয়ে আসবেন? তাও রাতে?”

লিও বাইরের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “হ্যাঁ। তবে এ-ট্যাক্সিকে এখুনি ছাড়ছি না। এখন হুগলি যেতে হবে। আমার পূর্বপুরুষের বাড়িটা এই ফাঁকে ঘুরে আসি একবার।”

রাত বারোটাতে লিও হোটেলের বাইরে এসে দেখল শুনশান রাস্তায় অঞ্জনবাবু একা দাঁড়িয়ে আছেন। পাশে দাঁড় করানো আছে একটা রয়্যাল এনফিল্ড। তাঁর হাতে দুটো হেলমেট আর একটা ব্যাগ নিয়ে। লিও এগিয়ে এসে হেলমেট দুটোর দিকে তাকিয়ে হেসে জিজ্ঞেস করল, “আপনিও যাবেন নাকি আমার সঙ্গে?”

“হ্যাঁ স্যার, আপনার সিকিউরিটি আমার বড়ো দায়িত্ব। বিদেশ-বিভূঁইয়ে এসে আপনার কিছু হয়ে গেলে আমাকেই জবাবদিহি করতে হবে স্যার।”

“বেশ, হেলমেট পরে বসে পড়ুন আমার পিছনে।”

“আপনার রাস্তা জানা আছে নিশ্চয়ই?”

লিও বাইকে স্টার্ট দিয়ে মন্তব্য করল, “আপনি আছেন তো আমার সঙ্গে। চিন্তা কী?”

সল্টলেক স্টেডিয়ামকে অন্ধকারের মধ্যে তখন বিশাল বড়ো দুর্গের মতো লাগছে। বাইক ছুটতে শুরু করল কলকাতার ফাঁকা রাস্তায়। আরো দু-একটা ছোটোবড়ো গাড়ি ছুটছে। নো-এন্ট্রি উঠে যেতে বড়ো বড়ো ট্রাকগুলো মাঝরাতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজপথে। ক্রসিংয়ের ট্রাফিক লাইটগুলো সব হলুদ হয়ে নিভছে আর জ্বলছে। রাতে গরমটা অনেক কম। দু-একটা পুলিশের গাড়ি চোখে পড়লেও কর্তব্যরত পুলিশ রাস্তায় একটাও নেই। বড়ো বড়ো হোর্ডিংগুলোর উজ্জ্বল আলোয় শহরটাকে রঙিন করে তুলেছে। তারাতলা পেরোনোর পর স্ট্রিট লাইট আর হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের দাপট অনেকটা কমে গেল।

বাইকে প্রায় ঘণ্টা খানেক লাগল বাবাজির কুঁড়েঘরের সামনে পৌঁছাতে। এদিকটা ঘোর অন্ধকার। কোনও আলো নেই। নদীর দিক থেকে মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া আসছে। বাইকটা একটু দূরে রেখে শিবমন্দিরের সামনে হেঁটে পৌঁছল দুজন।

লিও ফিসফিস করে অঞ্জনবাবুকে বলল, “যেমন শিখিয়ে দিয়েছি, বাবাজিকে ডাকুন।”

অঞ্জনবাবু দরজায় ধাক্কা দিয়ে সরু গলায় ডাকলেন, “বাবাজি বাঁচান, আমার মেয়েকে সাপে কামড়ে নিয়েছে। ওকে বাঁচান! তাড়াতাড়ি বাইরে আসুন!”

কথাটা দু-তিনবার চেঁচিয়ে বলতে আর দুমদুম করে ধাক্কা দিতে বাবাজি সাড়া দিলেন, “আসছি!”

তিনি বাইরে বেরোতেই সাঁড়াশির মতো শক্ত আঙুল দিয়ে ওঁর কবজি চেপে ধরল লিও। অঞ্জনবাবুর হাতে উঠে এসেছে গ্লক সেভেন্টিন অটোম্যাটিক নাইন এম.এম. পিস্তল। মুখের উপরে টর্চের আলো ফেলতে বাবাজি ভূত দেখার মতো ঘাবড়ে গেছেন।

“আর মুখ বন্ধ করে থাকলে হবে না বাবাজি। আপনি সাপের বিষ সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। আফ্রিকান লোকটার সাপের কামড়ে মৃত্যুর জন্য আপনি দায়ী। বলুন সত্যি কি না?”

অঞ্জনবাবুর বাজ পড়ার মতো গলার স্বর আর ঘটনার আকস্মিকতায় বাবাজির মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “লোকটা আমাকে ব্ল্যাকমেল করছিল।”

এবার লিও চাপ দিল, “আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি মাফাঙ্গুলি সাউথ আফ্রিকায় নিষিদ্ধ ড্রাগসের কারবারে যুক্ত। ডানহিল সিগারেটের প্যাকেট ও-ই দিয়েছে তোমাকে। কিন্তু ও তোমাকে চিনল কী করে?”

কথাটা না শোনার ভান করে চুপ করে রইল বাবাজি। অঞ্জনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কথায় দক্ষিণ ভারতের টান রয়েছে। ওই জন্যই মৌন সেজে থাকো, তাই তো?”

“প্রথমেই বলি আমরা পুলিশের লোক নই। আগে তুমি কী করেছ, সে নিয়ে আমাদের কোনও মাথাব্যথা নেই। কক্স সাহেবের বাংলো সম্পর্কে তুমি কী জানো সেটা বলো। মাফাঙ্গুলি এখানে কেন ঘুরঘুর করছিল? আমাদের কথার ঠিকঠাক উত্তর দিলে মোটা টাকা বকশিস পাবে।” বলে পকেট থেকে একগোছা ডলার বের করে সামনে রাখল লিও।

তাতে কাজ হল। হাঁটু মুড়ে বসে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাবাজি মুখ খুলল। দক্ষিণী টানে ইংরাজিতে বলল, “আমার নাম রাপ্পা মুরুগান। চেন্নাইতে আমি একটা ওষুধ কারখানায় কাজ করতাম। সাপের বিষের চাষ হত সেখানে। আর ওষুধের আড়ালে নিষিদ্ধ ড্রাগস পাচার হত দক্ষিণ আফ্রিকায়। মাফাঙ্গুলির সঙ্গে সেই সূত্রে আলাপ প্রায় বছর দশেক আগে। তারপর আমি একটা পারিবারিক খুনের মামলায় জড়িয়ে পড়ি। পুলিশের তাড়া খেয়ে চেন্নাই থেকে পালিয়ে যাই। বেশ কয়েকবছর হিমালয়ে সাধুসন্তদের মধ্যে কাটে। ঘুরতে ঘুরতে মুন্সিয়ারিতে গিয়ে আলাপ হয় এক দিব্য পুরুষের সঙ্গে। স্বামী অমৃতানন্দ মহারাজ। তারপর থেকে আমার জীবন পালটে যায়। আমি আয়ুর্বেদ শিখি। একবার গল্প করতে গিয়ে তিনি বলেন কক্স সাহেবের কথা। ওই আশ্রম নাকি উনিশশো ষাটের দশকে কক্স সাহেব তৈরি করেছিলেন। হিন্দুধর্ম গ্রহণ করে তাঁর শেষ দিন পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন তিনি। নদীর ধারে এই নির্জন বাংলোর কথা আমি স্বামীজির মুখেই শুনেছিলাম। চলে এলাম এখানে। কিন্তু দেখলাম বাংলোয় থাকা অসম্ভব। বিষধর সাপের আড়ত। এখানে এই ছোটো শিবমন্দিরের পাশে কুঁড়েঘরে বানিয়ে থাকতে শুরু করলাম। আমার দেওয়া আয়ুর্বেদ ওষুধে অব্যর্থ কাজ হতে ধীরে ধীরে পসার জমে উঠল। সাপের বিষ চালান করার পুরোনো ব্যাবসাটাও আবার শুরু করলাম। আর সেটাই কাল হল আমার। মাফাঙ্গুলি কুকুরের মতো গন্ধ শুঁকে এসে হাজির হল এখানে। বাংলোয় নাকি কী গুপ্তধন লুকানো আছে। একটা পুরোনো পুথি, সেটা ওর চাই। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোনও পুথি বা বই পাওয়া যায়নি।”

“হুম! বুঝলাম। তারপর তুমি সাপের কামড় খাইয়ে মাফাঙ্গুলিকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলে। যাতে চেন্নাইয়ের পুলিশ আবার এখানে এসে হাজির না হয়। তাই তো?”

বাবাজি মাথা নাড়ল।

লিও জিজ্ঞেস করল, “মুন্সিয়ারির আশ্রমের ঠিকানাটা আমাকে দাও। স্বামী অমৃতানন্দ মহারাজ এখনও বেঁচে আছেন?”

“বছর দু-এক আগে পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। এখন বলতে পারছি না।”

ঠিকানাটা লিখে নিয়ে অঞ্জনবাবু উঠে পড়লেন।

ফেরার পথে ফাঁকা অন্ধকার রাস্তায় ঝড়ের বেগে বাইক চলছে। লিও হেলমেটের মধ্যে দিয়ে চেঁচিয়ে বলল, “সকালে আপনি পিঁপড়ের কামড় না খেলে এত সহজে এই কেস সলভ হত না।”

মি. পাত্র গলা উঁচিয়ে বললেন, “কেস কি সলভ হয়ে গেছে স্যার?”

“নাহ্‌! পুরোপুরি হয়নি। পরের ধাপ মুন্সিয়ারি।”

রোদ ঝলমলে বাথ

“বাথ শহরের অনেক পুরোনো ইতিহাস আছে, বুঝলি!” দেবুদা বলল, “পাহাড়ের গায়ে অ্যাভন নদীর তীরে মনোরম পরিবেশে প্রাকৃতিক গরম জলের কুণ্ড। সেখানে সবাই স্নান করতে আসত। পরে সেটাকে ঘিরেই শহর তৈরি হয়েছিল রোমানরা। দেবী সুলিসের মন্দির বা মিনার্ভা ছিল সেখানে। ইউরোপে সেই সময় গেঁটে বাতের রোগ ছিল ঘরে ঘরে। তারা এখানে এসে গরম জলে স্নান করে আরাম পেত। সেজন্যই এ-শহরের নাম বাথ স্পা। শহরের উপরে গোলাকার সবুজ পাহাড়ের মাথায় আছে বাথ ইউনিভার্সিটি। সেখান থেকে পুরো বাথ শহরটা দেখা যায়। এখানে আগে ছিল একটা টেকনিক্যাল সায়েন্স কলেজ। সাতের দশকে এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পায়।”

ট্রেনে করে রেডিং থেকে বাথে পৌঁছতে আনুমানিক ঘণ্টা খানেক সময় লাগল। এর মধ্যেই দেবুদা বাথের ইতিহাস-ভূগোল নিয়ে একটা ছোটোখাটো লেকচার দিয়ে দিল সৌম্যকে। রেডিং ইউনিভার্সিটিতে আসার আগে দেবুদা কিছুদিন বাথে প্রফেসরি করেছে। তাই এই শহরের নাড়িনক্ষত্র সব ওর জানা। ‘ব্রিস্টল টেম্পল মিডস’ ট্রেনের বড়ো বড়ো কাচের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে দু-দিকেই বিস্তৃত সবুজ গালিচার মতো ঢেউখেলানো মালভূমি। রেডিং স্টেশনে ঝমঝম করে বৃষ্টি হয়ে গেল সকালে। এখন কিন্তু নীল আকাশ একেবারে পরিষ্কার। টুকরো টুকরো মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশ আরামদায়ক ঠান্ডা।

মাঝে মাঝে সৌম্যর চোয়ালটা টনটন করে উঠছে। ব্যথাটা এখনও পুরোপুরি সারেনি। ওকে যে ঘুসি মেরেছিল সে নিশ্চয়ই কোনও বডি বিল্ডার বা বক্সার হবে। ওয়েস্টমিনিস্টার আন্ডারপাসে জবরদস্ত ঘুসি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। পরে পুলিশ এসে জল-টল দিয়ে সুস্থ করে। তারপর তিনদিন রেডিংয়েই শুয়ে, ঘুরে, ল্যাদ খেয়ে সময় কাটল। ঈপ্সিতার এইভাবে বেপাত্তা হয়ে যাওয়াটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না সৌম্য। ইতোমধ্যে দেবুদা ডিটেকটিভ কলউইলকে বার দু-এক ফোন করেছে। কিন্তু তিনিও কোনও সুখবর দিতে পারেননি। শুধু বলছেন, “ইনভেস্টিগেশন আন্ডার প্রসেস।” তবে বাথে যাওয়ার আগে আকস্মিকভাবে একটা ক্লু পেয়ে গেল সৌম্য। ঘটনাটা ঘটল রেডিংয়েই। কথাপ্রসঙ্গে দেবুদার কাছে ও জানতে পেরেছিল, রেডিংয়ে একটা লোকাল মিউজিয়াম আছে। সৌম্য একদিন ঘুরতে ঘুরতে চলে গেল সেখানে।

৬ নং রেড ল্যান্ডস রোডে ‘মিউজিয়াম অফ ইংলিশ রুরাল লাইফ’। অর্থাৎ গত দু-তিনশো বছর ধরে ইংল্যান্ডের গ্রাম্য সভ্যতার ধারাবাহিক ইতিহাস। গোটা মিউজিয়ামটাই ভীষণ ইন্টারেস্টিং। টাইম মেশিনে করে যেন অতীতে গিয়ে পড়ল। মানুষের ব্যবহার করা পুরোনো দিনের বিভিন্নরকমের লাঙল, কুড়ুল, কাস্তে, ঘোড়ার গাড়ি, গোরুর গাড়ি, লন্ঠন, শিকারের জন্য ব্যবহৃত বন্দুক, অস্ত্রশস্ত্র, কতরকমের ছোটোবড়ো যন্ত্রপাতি, ব্যবহৃত পোশাক, কাপড় তৈরির যন্ত্র, কাঠের তৈরি ওয়াগন— মানে যাতে শস্য বোঝাই করে ঘোড়া বা বলদ দিয়ে টেনে নিয়ে আসা হত। একটা লম্বা হল-ঘরে পরপর বিভিন্ন ধরনের আর সাইজের ওয়াগান দাঁড় করানো আছে। সেগুলো দেখলেই বোঝা যায় তার গায়ে এখনও মাটি লেগে রয়েছে, বহুবছর ব্যবহারের ফলে রঙ চটে গেছে, হয়তো ক্ষয়ে গেছে চাকার একটা বিশেষ জায়গা। সৌম্য খুঁটিয়ে লক্ষ করছিল প্রতিটা জিনিস। এই ওয়াগনগুলো যারা বানিয়েছিল, কাঠের তৈরি করা তাদের ফলকগুলোও ঝোলান আছে পরপর। একটা জায়গাতে চোখ আটকে গেল সৌম্যর। ‘এডওয়ার্ড কক্স’-এর নামে কাঠের কারুকাজ করা রঙিন বোর্ড! বেশ পুরোনো। তাতে ইংরাজিতে লেখা আছে, ‘১৮৬০ সালে স্থাপিত, সোনিং গ্রামের কোচ প্রস্তুতকারক এডওয়ার্ড কক্স অসাধারণ কারিগরির জন্য রেডিংয়ের প্রদর্শনীতে প্রথম এবং দ্বিতীয় পুরস্কার পেলেন।’ সৌম্য কিছুক্ষণ স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সেইখানে। এই এডওয়ার্ড কক্স যদি ভারতের সেই অ্যালবিয়ান জুটমিলের চিফ ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট কক্সের পূর্বপুরুষ হন, তাহলে নিঃসন্দেহে এটা একটা বড়ো খোঁজ। সেখান থেকেই উচ্ছ্বসিত হয়ে প্রথম ফোনটা করল দেবুদাকে। দেবুদা জানাল, “সোনিং হল রেডিংয়ের মধ্যেই একটা ছোটো অঞ্চল। তুই কিউরেটরের সঙ্গে দেখা করে কক্স ফ্যামিলির ঠিকানাটা জোগাড় কর।”

কিউরেটর একজন বয়স্ক মিষ্টভাষী ব্রিটিশ মহিলা। তাঁকে পুরো ব্যাপারটা সংক্ষেপে বুঝিয়ে বলতে তিনি কম্পিউটার থেকে রেকর্ড খুঁজে বের করলেন। তারপর একটা কাগজে ঠিকানাটা লিখে দেওয়ার পাশাপাশি কক্স ফ্যামিলিকে ফোনে কথা বলে পারমিশনও করে দিলেন, যে একজন ভিজিটর দেখা করতে যাচ্ছে।

৯ নং, দ্য ওল্ড ফ্রগ, পিয়ারসন রোড, সোনিং। এই ঠিকানায় দু-বার বাস পালটে পৌঁছতে প্রায় আধঘণ্টা সময় লাগল সৌম্যর। রেডিংয়ে সমস্ত বাড়িই প্রায় একইরকম দেখতে। শুধু বাড়ির চারপাশে রঙিন ফুলগাছের বাহার দেখে আলাদা করে চেনা যায়। দরজায় নক করতে লাল হাতে বোনা উলের সোয়েটার গায়ে লম্বা গৌরবর্ণ এক ব্যক্তি সৌম্যকে স্বাগত জানালেন। ব্রিটিশদের মধ্যে মিষ্টি ভদ্রতাবোধের কোনও ঘাটতি সৌম্যর এখনও চোখে পড়েনি। ভদ্রলোকের সত্তরের গোড়ায় বয়স। চুল সব ঘিয়ে রঙের। দাড়িগোঁফ কামানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চেহারা। সৌম্যকে সুন্দর করে সাজানো একটা বড়ো ড্রয়িং-রুমে নিয়ে গিয়ে বসালেন। সৌম্য লক্ষ করল, একটা প্রমাণ সাইজের সাদাকালো পুরোনো হাতে আঁকা ছবি সুন্দর করে বাঁধিয়ে লাগানো আছে দেয়ালে।

পরিচয়পর্ব সেরে সৌম্য শুরু করল, “রবার্ট কক্স নামে এক ব্যক্তি উনিশশো সালের গোড়ায় ভারতে গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন দক্ষিণ কলকাতায় হুগলি নদীর তীরে সদ্য গড়ে ওঠা এক জুটমিলের ইঞ্জিনিয়ার।”

“হ্যাঁ, তিনি আমাদের বংশের একজন পূর্বপুরুষ ছিলেন। ওই যে ছবিটা দেখছেন, উনি হলেন এডওয়ার্ড কক্স, আমাদের পূর্বপুরুষ। রবার্ট ছিলেন তাঁর এক নাতি। বড়ো ছেলের ছেলে। আমাদের বংশে অনেকেই ওরকম ছিলেন— বাউন্ডুলে, অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়। রবার্ট যেমন ভারতে চলে গিয়েছিলেন, তেমনি আর একজন গিয়েছিলেন আফ্রিকা এক্সপ্লোর করতে। তাঁর নাম ছিল ডেভিড কক্স।”

“রবার্ট কক্স কি পরে ইংল্যান্ডে ফিরেছিলেন?”

“মনে হয় না। যদি ফিরতেন তার কোনও রেকর্ড নিশ্চয়ই থাকত। বাবার মুখে শুনেছিলাম রবার্ট ভারতে গিয়ে সাধু হয়ে গেছেন।”

“আচ্ছা, আপনাদের বংশে কি অ্যালকেমির কোনও চর্চা হত?”

“অ্যালকেমি তো আমাদের রক্তে। রেডিং ছিল একসময় ইংল্যান্ডের রাজধানী। ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ হেনরি প্রচুর খরচ করে অ্যালকেমিস্টদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। কতরকমের পরীক্ষানিরীক্ষা করাতেন তাঁদের দিয়ে। তাঁর ইচ্ছা ছিল অমর হওয়ার। ওঁদের একটা গুপ্ত অ্যালকেমি সংগঠন ছিল। আর আমাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন সেই সংগঠনের সদস্য।”

চা পান করতে করতে আরও অনেকক্ষণ কথাবার্তা চলল। তিনি জানালেন, “অ্যালকেমির জন্ম কিন্তু সিন্ধু সভ্যতা থেকে। তারপর সেটা ছড়িয়ে পড়েছিল মিশর, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। তবে অ্যালকেমিস্টদের পরীক্ষা পদ্ধতি বড়ো অদ্ভুত। আমাদের বাড়িতেই একসময় বড়ো বড়ো লোহার কড়া, ফানেল, ফার্নেস, বোতল, টেস্ট-টিউব গড়াগড়ি যেত। আমরা ছোটোবেলায় সেগুলো নিয়ে কত খেলেছি।”

***

বাথ স্টেশন থেকে বাইরে আসতেই সুন্দর রোদ ঝলমলে সকাল দেখে মনটা বড়ো ভালো হয়ে গেল সৌম্যর। দেবুদা বলল, “বাসে করে পাহাড়ের মাথায় ইউনিভার্সিটিতে যেতে হবে। তার আগে পেট পুজো করে নিই চল। পাশেই একটা অথেন্টিক চাইনিজ রেস্টুরেন্ট আছে।”

স্টেশন থেকে নেমে বাঁদিকে বাস-স্ট্যান্ড। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দেখল বাস-স্ট্যান্ডের গায়েই রাস্তার উপরে ‘চিলি ফ্যামিলি নুডুলস’ নামে চাইনিস রেস্তোরাঁ। দেবুদা দুটো ‘চিকেন সাটে’ চাউমিনের অর্ডার করে দিল। তারপর চেয়ারে বসে জানাল, “বাথ স্পা এখান থেকে হাঁটা পথে মিনিট দশেক। স্টেশন থেকে নেমে নাক বরাবর সোজা রাস্তা। ওই যে হেঁটে যাচ্ছে সবাই। তবে পুরো শহরটাই একটা দেখার মতো জিনিস। সারাদিন হেঁটে ঘোরা যায়। সব রোমান স্থাপত্য।”

যেদিকেই চোখ যাচ্ছে অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে সৌম্য। চারদিকে অপূর্ব সব প্রাসাদোপম বাড়ি। খাওয়া সেরে বাসে করে আধঘণ্টার মধ্যেই পাহাড়ের মাথায় ইউনিভার্সিটির গেটে পৌঁছে গেল ওরা। লেক, খোলা সবুজ মাঠ, লাইব্রেরি, হোস্টেল নিয়ে বিশাল ছড়ানো ক্যাম্পাস।

প্রফেসর সুরিয়া আইয়ারের কেবিনে ঢুকতেই তিনি উঠে এসে ওদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে বসতে বললেন।— “এসো দেবতোষ, তোমাদের জন্যই অপেক্ষা করছি।”

“এর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই স্যার। সৌম্য হল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ভারত থেকে এখানে এসেছে ওর বন্ধুকে খুঁজতে। ঈপ্সিতা লন্ডনে চাকরি করত। কিন্তু বেশ কিছুদিন হল সে নিরুদ্দেশ। পুলিশ এখনও তেমন কিছু করতে পারেনি। ড. রিচার্ড ছিলেন ঈপ্সিতার প্রজেক্ট হেড। যিনি কিছুদিন আগে লন্ডনের বাড়িতে খুন হন। সে-খুনের কিনারাও এখনও হয়নি। আপনি তো ড. রিচার্ডকে চিনতেন?”

প্রশ্নটা শুনে প্রফেসর আইয়ার কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে গেলেন। তারপর ধীরে ধীরে জানালেন, “চিনতাম তো বটেই। আমার সঙ্গে ড. রিচার্ডের খুবই হৃদ্যতা ছিল বলতে পারো। একজন বন্ধুকে খুঁজতে তুমি এতদূর থেকে এসেছ, শুনে খুব অবাক হলাম। আজকালকার দিনে এরকম দেখা যায় না।”

দেবুদা আবার জিজ্ঞেস করল, “ড. রিচার্ড কী নিয়ে গবেষণা করছিলেন?”

প্রফেসর আইয়ার বললেন, “বলছি। তার আগে বলো, এম.এইচ-৩৭০ বিমানটির কথা মনে আছে তোমাদের? ৮ মার্চ, ২০১৪-তে মালয়েশিয়ার কুয়ালালুমপুর থেকে বেইজিং যাচ্ছিল?”

“বিমানটি মাঝ আকাশে হারিয়ে গিয়েছিল।” সৌম্য ঝটপট উত্তর দিল।

“ঠিক। ২৩৯ জন ব্যক্তি নিয়ে বিমানটি মাঝ আকাশে গায়েব হয়ে যায়। পরে অনেক খোঁজাখুঁজি হয়েছিল। কিন্তু বিমানের কোনও অংশ বা কোনও ব্যক্তি, কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়নি। ড. রিচার্ড তাঁর একটা পেপারে লিখলেন, বিমানটি সমান্তরাল বিশ্বে পৌঁছে গেছে।”

সৌম্য জানতে চাইল, “সমান্তরাল বিশ্ব, মানে বহু মহাবিশ্ব তো? ওটা একটা থিওরি। এটা বাস্তবে কি সম্ভব?”

প্রশ্নটা শুনে প্রফেসর চেয়ার ছেড়ে উঠে পায়চারি করতে শুরু করলেন। মনে হল তিনি গভীরভাবে কিছু চিন্তা করছেন। বললেন, “তোমরা কী জানো, এরকম ঘটনা এর আগেও ঘটেছে? বহু-মহাবিশ্ব মানে ইংরেজিতে যাকে বলে মাল্টিভার্স বা অধি-মহাবিশ্ব। এটা হল মহাবিশ্বগুলির প্রকল্পিত সম্ভাব্য গুচ্ছ। যার মধ্যে আমরা যে মহাবিশ্বে বসবাস করি, সেটিও অন্তর্ভুক্ত। এই মাল্টিভার্সের মধ্যে বিভিন্ন মহাবিশ্বকে ‘সমান্তরাল মহাবিশ্ব’ বা ‘অন্যান্য মহাবিশ্ব’ অথবা ‘বিকল্প মহাবিশ্ব’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।”

একটু থেমে আবার তিনি বলে চললেন, “১৯৫৩ সালে ডাবলিনে এরভিন শ্রোডিঙ্গার একটি ভাষণ দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি কৌতুকপূর্ণভাবে তাঁর শ্রোতাদের সতর্ক করেছিলেন এই বলে যে তিনি যা বলতে যাচ্ছেন তা হয়তো পাগলের প্রলাপ বলে মনে হবে। তিনি বলেছিলেন যে, যখন তাঁর অঙ্কের সমীকরণগুলি বিভিন্ন ইতিহাস বর্ণনা করছে বলে মনে হচ্ছে, তখন এগুলি বিকল্প নয়, কিন্তু সব সত্যিই একযোগে ঘটেছে। উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে গেলে বলতে হবে, তোমার চোখের সামনে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে একজন মারা গেল। কিন্তু মাল্টিভার্সের থিওরি বলছে, লোকটা একটা বিশ্বে মারা গেল, অন্য বিশ্বে সে আহত হয়ে বেঁচে রইল, আবার কোনও বিশ্বে লোকটার ওই অ্যাক্সিডেন্ট হয়নি।

“মাল্টিভার্সের থিওরিটাকে অনেকে অলীক কল্পনা বলে উড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই তত্ত্বকে পরীক্ষা এবং যাচাই করা অসম্ভব মনে হলেও সম্প্রতি অনন্ত মহাবিশ্বের কিছু পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।”

“আপনি এর প্রমাণ পেয়েছেন?”

“মানুষ এই ব্রহ্মাণ্ডের একটা ক্ষুদ্র প্রাণী। তার কতটুকু ক্ষমতা? আমাদের দেখার শক্তি, শোনার শক্তি, ঘ্রাণ, স্পর্শ সবই সীমিত। এর বাইরেও নিশ্চিতভাবে অনেক কিছু আছে। তোমরা অতিন্দ্রিয় ক্ষমতার কথা জানো নিশ্চয়ই। ছোটোবেলায় আমি প্রায়ই আমার পরিবারকে আমাদের ধর্মগ্রন্থ এবং তাদের অসীম গভীর জ্ঞান সম্পর্কে কথা বলতে শুনতাম। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রতিও আমার আকর্ষণ ছিল। তাই আমি ভাবতে থাকি, হাজার হাজার বছর আগে লেখা এই প্রাচীন গ্রন্থগুলি আধুনিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সঙ্গে কীভাবে সঙ্গতিপূর্ণ, বিশেষ করে সমান্তরাল মহাবিশ্বের মতো আশ্চর্যজনক কিছু সম্পর্কে? প্রশ্ন জাগে, পুরাণ অনুযায়ী বিশ্বতত্ত্ব কি তার সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারত? এমন ধারণাগুলি ঋষিমুনিরা একসময় কল্পনা করতেন যা বিজ্ঞানীরা এখন খোঁজ করছেন?”

দেবুদা মন্তব্য করল, “তার মানে আপনি বলতে চাইছেন প্রাচীন কালে ভারতীয় মুনি-ঋষিরা যা বলে বা লিখে গেছেন, আধুনিক বিজ্ঞান সেগুলোই নতুন করে আবিষ্কার করছে?”

প্রফেসর মাথা নেড়ে বললেন, “পুরাণ দিয়েই শুরু করা যাক, যা প্রাচীন ধর্ম গ্রন্থের একটি সংগ্রহ, যা আমাদের সৃষ্টিতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব এবং দর্শনের গভীরে নিয়ে যায়। ভগবত পুরাণের একটি গল্প আমার মনে পড়ে যেখানে ভগবান বিষ্ণু নারদ ঋষিদের কাছে একাধিক ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্বের কথা বলেছিলেন। প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ড তার নিজস্ব ব্রহ্মা দ্বারা পরিচালিত ছিল। প্রথমে আমার মনে হয়েছিল এটি একটি ক্লাসিক পৌরাণিক কাহিনি। বৈজ্ঞানিক তথ্যের চেয়ে আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করার জন্য তৈরি একটি গল্প। কিন্তু তারপর আমি আধুনিক পদার্থবিদ্যায় বহু-বিশ্বের ধারণাটি পেয়েছিলাম এবং তখনই আমার মাথার মধ্যে ক্লিক করেছিল। বহু-বিশ্ব তত্ত্ব অনুসারে, আমাদের মহাবিশ্ব অনেকের মধ্যে একটি হতে পারে।

“প্রতিটির নিজস্ব ভৌত আইন রয়েছে। হিউ এভারেটের মতো বিজ্ঞানী এবং পরবর্তীকালে ম্যাক্স টেগমার্কের মতো তাত্ত্বিকরা যুক্তি দিয়েছেন যে এই সমান্তরাল মহাবিশ্বগুলি পাশাপাশি থাকতে পারে। যদিও আমরা কখনোই তাদের উপলব্ধি করতে সক্ষম হই না। এটি পুরাণের গল্পগুলির অলীক কল্পনার মতো শোনাচ্ছে। কিন্তু আমাদের নিজস্ব বাস্তবতার বাইরে এগুলো প্রতিটি আলাদা আলাদা এবং এমনভাবে নিজেদের মধ্যে যুক্ত যা আমরা সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারি না। সেটা হতে পারে আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের অক্ষমতার কারণে।”

বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল তাত্ত্বিক আলোচনা। অনেকক্ষণ একটা টানা কথা বলার পর প্রফেসর একটু থামলেন। এই ফাঁকে দেবুদা এবার একটু বলার সুযোগ পেল।— “সে সবই বুঝলাম প্রফেসর। কিন্তু এডওয়ার্ড কক্স বা রবার্ট কক্স, এঁরা তো ব্রিটিশম্যান, তাঁরা কীভাবে এই সমান্তরাল বিশ্বের রহস্যের সঙ্গে জুড়ে গেলেন?”

ইতোমধ্যে প্রফেসর সবার হাতে একটা করে কফি মগ ধরিয়ে দিয়েছেন। তারপর চেয়ারে বসে প্রফেসর আইয়ার মন্তব্য করলেন, “দেখো দেবতোষ, এই তত্ত্বগুলো চোরাস্রোতের মতো সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সব দেশেই ছড়িয়ে পড়েছিল আদিকাল থেকে। ভারতে যাঁদের আমরা মুনি, ঋষি বা যোগী বলি, এদের দেশে তাদেরকেই হয়তো অ্যালকেমিস্ট বলা হত। যেমন ধরো, সময়। আমি সবসময় ভাবতাম, আমাদের কাছে সময়ের অভিজ্ঞতাটা ঠিক কী? এটি কতটা দ্রুত বা ধীর গতিতে চলে? এটা তো ব্যক্তিগত ধারণা। ভেবেছ কখনও, কৃষ্ণের বিশ্বজনীন রূপের সেই প্রাচীন জ্ঞান আসলে কী? আমরা এখন যাকে সময়ের প্রসারণ বলে জানি, সেটাই বর্ণনা করার আর একটি উপায় নয় তো?”

আবার কিছুক্ষণের জন্য চুপ করলেন তিনি। সৌম্য ভাবছে, এই কথাগুলো ভারতে বসে কোনও ধর্মান্ধ শিক্ষক বললে সে হয়তো উড়িয়ে দিত, কিন্তু তার সামনে বসে বলছেন বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটির ফিজিক্সের নাম করা প্রফেসর। কফিতে চুমুক দিয়ে তিনি আবার বললেন, “যখন আমি প্রথম এই কথা শুনেছিলাম, তখন এটা প্রতীকী মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি যে এটি মহাজাগতিক স্ফীতি তত্ত্বের মতো আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধারণার একটা প্রতিফলন। যেখানে মহাবিশ্ব বার বার সম্প্রসারণ এবং সংকোচনের মধ্য দিয়ে যায়। প্রতিটি ‘বিগ ব্যাং’ একটি নতুন মহাবিশ্বের জন্মকে চিহ্নিত করে। আমার মনে হয় পদার্থবিদ্যার ভাষা বর্ণনা করার অনেক আগেই প্রাচীন ভারতীয় ঋষিরা অস্তিত্বের গঠন সম্পর্কে মৌলিক কিছু ধারণা তৈরি করতে পেরেছিলেন। হয়তো তাঁরা একাধিক সমান্তরাল বিশ্বের মধ্যে যাতায়াত করতে পারতেন। এখন আধুনিক বিজ্ঞানের মাধ্যমে আমরা সেই রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করছি।”

সৌম্য জানতে চাইল, “তাহলে ঈপ্সিতা কি সমান্তরাল বিশ্বের রাস্তা খুঁজে পেয়েছে? সেখানেই চলে গেছে? সেজন্যই কি তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না?”

“দেখো ভাই, সমান্তরাল বিশ্বের রাস্তা যদি কেউ তৈরি করেও ফেলে, সে-রাস্তা তো পৃথিবীর সব জায়গায় খুলবে না। তার জন্য দরকার ফাঁকা নিরিবিলি কোনও স্থান। যেমন ধরো বিশাল কোনও মরুভূমির মাঝামাঝি কোনও জায়গা কিংবা মহাসমুদ্রের মাঝে অথবা মহাশূন্যে, যেখানে কয়েকশো বা হাজার কিলোমিটারে কোনও জনবসতি নেই।”

দেবুদা এবার প্রশ্ন করল, “আপনি যদি এই পরীক্ষা করার সুযোগ পেতেন তাহলে কোথায় করতেন?”

উত্তর দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ ভেবে নিলেন প্রফেসর আইয়ার। তারপর বললেন, “এক বাঙালি বিজ্ঞানীকে আমি চিনতাম, প্রফেসর রায়চৌধুরী, তিনি হাভার্ডে পড়াতেন। ১৯৯৯ সালে এই বিষয়ে গবেষণা করার জন্য একা একটা জাহাজ ভাড়া করে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝামাঝি পয়েন্ট নিমোর দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পরে তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। জাহাজ-সমেত তিনি গায়েব হয়ে গেলেন।”

সৌম্য বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, “পয়েন্ট নিমো!”

দেবুদা ওর কথাটা ধরে নিয়ে উক্তি করল, “পয়েন্ট নিমো নামটি এসেছে জুলে ভার্নের ‘ক্যাপ্টেন নিমো’ থেকে, যিনি ‘টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগ আন্ডার দ্য সি’-র নায়ক। ল্যাটিন ভাষায় ‘নিমো’-র অর্থ ‘কেউ নেই’।”

প্রফেসর তাঁর ল্যাপটপটা খুলে প্রশান্ত মহাসাগরের ম্যাপ বের করে আরও জানালেন, “এই যে পয়েন্ট নিমোকে অগম্যতার মহাসাগরীয় মেরুও বলা হয়। এটি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে 48°52.6′S 123°23.6′W স্থানাঙ্কে সবথেকে কাছের স্থলভূমি থেকে প্রায় ২,৬৮৮ কিমি দূরে অবস্থিত। ১৯৯২ সালে জরিপ করতে গিয়ে হ্রোভজে লুকাতেলা এই জায়গাটা আবিষ্কার করেন। তিনিই নামকরণ করেছিলেন ক্যাপ্টেন নিমোর নামে। প্রশান্ত মহাসাগরের ঠিক মাঝামাঝি দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত, গুগল ম্যাপে যাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। মজার বিষয় হল, পয়েন্ট নিমোর আর একটা পরিচয় হল ‘মহাকাশযান কবরস্থান’ হিসেবে। জনবহুল এলাকা এড়াতে ইচ্ছাকৃতভাবে বিধ্বস্ত মহাকাশযানগুলিকে এখানে মহাসমুদ্রের মাঝখানে ফেলা হয়।”

বাকি কফিটা শেষ করে তিনি গলা নামিয়ে জানালেন, “তোমাদের জানিয়ে রাখি, আমার এক বন্ধু আছে কেপটাউন ইউনিভার্সিটিতে, ড. মস বাসিতেরে। তাঁর সঙ্গে কিছুদিন আগে কথা হচ্ছিল। একদল অভিযাত্রী ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, তারা ছবি তোলা এবং আরও কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা করার জন্য পয়েন্ট নিমো যেতে চায়। ওঁকে অফার করেছিল ওদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য। ভালো টাকা দেবে বলেছিল। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি যেতে পারেননি। এখন তোমাদের কথা শুনে আমার মনে হচ্ছে ওরা হয়তো এই ধরনের কিছু পরীক্ষা করতে চলেছে। কেপটাউনের একজন মাল্টি-মিলিওনিয়ারকে আমি চিনি। নাম জেকব কক্স। সে নাকি এই এক্সপিডিশনটাকে ফান্ডিং করছে।”

কথাটা শুনে চমকে উঠল সৌম্য। বলল, “আমি গতকালই রেডিংয়ে কক্স পরিবারের এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তিনি জানিয়েছিলেন, ওঁদের বংশের ডেভিড কক্স নামে একজন আফ্রিকায় গিয়ে সেটল করেছিলেন। জেকব কি ওঁদের বংশের কেউ?”

“হতেই পারে। অসম্ভব কিছু নয়। শুনেছি দক্ষিণ আফ্রিকায় জেকবের বিশাল সম্পত্তি। অনেকরকম দু-নম্বরি কারবারের সঙ্গেও ও যুক্ত। প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে ওর ইন্টারেস্ট বাংশানুক্রমিক হলে আশ্চর্য হব না।”

সৌম্য জানতে চাইল, “স্যার, পয়েন্ট নিমো যেতে গেলে তো জাহাজই একমাত্র ভরসা। সে-জাহাজ কোথা থেকে ছাড়ে?”

প্রফেসর আইয়ার হেসে জানালেন, “পুয়ের্তো মন্ট নামে একটা বন্দর আছে, চিলিতে। সেখান থেকে যাওয়াই সবথেকে সুবিধাজনক। প্রায় আট হাজার নটিক্যাল মাইল। যাওয়া-আসা নিয়ে প্রায় কুড়ি-বাইশ দিন লাগবে। তবে তোমরা পয়েন্ট নিমো যেতে পারবে কি? একটা গোটা জাহাজ ভাড়া নিতে হবে। প্রচুর খরচ।”

কুয়াশায় ঘেরা মুন্সিয়ারি

“মুন্সিয়ারির মূল আকর্ষণ হল পঞ্চচুল্লি শৃঙ্গ। সেটা এখন রাতের অন্ধকারে বুঝতে পারবেন না স্যার। এখন মেঘে ঢেকে আছে। সকালে আকাশ ক্লিয়ার থাকলে তাক লেগে যাবে।”

অঞ্জনবাবুর উচ্ছ্বসিত কথা শুনে লিও বেশ মজা পেল। উনি জানেন না, যে-কোনো জায়গাতে পা রাখার আগেই তার নাড়িনক্ষত্র আগে থেকে জেনে নেওয়ার বদ অভ্যাস ওর বহু পুরোনো। আজ সকালে পন্তনগর থেকে গাড়িতে করে যাত্রা শুরু হয়েছে। উত্তরাখণ্ডের রামপুর আর হলদওয়ানির মাঝে একটা নিরিবিলি এয়ারপোর্ট এই পন্তনগর। সারাদিনে দু-চারটে প্লেন ওঠানামা করে মেরেকেটে। একতলা এয়ারপোর্ট বিল্ডিং ফাঁকা, ধু ধু করছিল। সকাল আটটার মধ্যে অঞ্জনবাবু আর লিও কলকাতা থেকে সেখানে পৌঁছে গেছে একটা ছোটো বিমানে করে। এয়ারপোর্টের বাইরে ওদের জন্য দাঁড়িয়ে ছিল একটা সাদা স্করপিও। তাতে করেই মুন্সিয়ারি যাত্রা। লোহাঘাটে দুপুরের লাঞ্চ করে, পিথোরাগড় হয়ে রাত দশটার মধ্যে মুন্সিয়ারি পৌঁছানোর কথা। কিন্তু এদিকে এখন বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। হঠাৎ ধস নেমে রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে মুন্সিয়ারি ঢুকতে বেশ রাত হবে। রাস্তার বেশিরভাগ অংশই কুয়াশায় মোড়া। হলুদ ফগ লাইট জ্বেলে গাড়ি চালাচ্ছে ড্রাইভার।

অঞ্জনবাবু গলা আর মাথায় মাফলারটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে একটু নড়েচড়ে বসে বললেন, “হাত-পা আর কোমর একদম ধরে গেল স্যার। গাড়িটা একটু থামাব? হাত-পাটা একটু ছাড়িয়ে নিতাম আর কী!”

মোবাইল থেকে চোখ তুলে লিও জানাল, “আর বেশিক্ষণ লাগবে না অঞ্জনবাবু। প্রায় এসে গেছি। হোটেলে পৌঁছে একদম লম্বা হয়ে শুয়ে পড়বেন। কাল আপনার রেস্ট।”

“রেস্ট? খুব ভালো হল স্যার। পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ির ঝাঁকুনিতে গায়ে যা ব্যথা হয়েছে, একদিন রেস্ট নেওয়া খুব দরকার ছিল।”

“হ্যাঁ, সেই ভালো। কাল আমি ভোরবেলা বেরিয়ে পড়ব। কিছুটা গাড়িতে গিয়ে বাকিটা হাঁটতে হবে। খাড়াই পাহাড়ি রাস্তা। আপনি অতটা ধকল সহ্য করতে পারবেন না। জিমিয়া পাহাড়ের মাথায় অলোকনাথদেবের মন্দির। আপনি নোট করলেন সেদিন, মনে নেই?”

“তার মানে আমি শুয়ে থাকব, আর আপনি পাহাড়ে চড়বেন?”

“আপনার শরীরের যা অবস্থা, কালকেই সারাদিনের ট্রেকিংয়ে বেরোতে পারবেন বলে মনে হয় না। আপনি রেস্ট নিন। আমি একদিন সামলে নেব।”

“আপনি খেপেছেন নাকি মশাই! এই কথা বিগ বসের কানে গেলে পঞ্চচুল্লির আগুনে আমাকেই রোস্ট করে খেয়ে ফেলবেন কোথায়! যত কষ্টই হোক, আমি যাব আপনার সঙ্গে।”

লিও শেষবারের মতো মি. পাত্রকে বোঝানোর চেষ্টা করল, “শুনুন, এখানে শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, জীবনমরণ সমস্যা হতে পারে। সমতল থেকে প্রায় সাত-সাড়ে সাত হাজার ফুট উপরে একদিনে উঠে এসেছেন। এসেই আপনার এই ভারী শরীর নিয়ে হাই অল্টিচুড ট্রেকিং করা ঠিক নয়। আমার নেহাত অভ্যাস আছে।”

“সে আপনি যাই বলুন লিওবাবু, আপনাকে আমি একা ছাড়তে পারব না। আপনার কিছু হলে আমার কী হবে? বাড়িতে বউ-বাচ্চা আছে তো! তাদের কে দেখবে?”

“আমিও তো সেটাই বলছি, আপনার কিছু হলে তাদের কী হবে?”

“কেন, বিগ বস আছেন, তিনি দেখবেন। তাঁর অসীম ক্ষমতা।”

লিও আর কিছু বলতে পারল না। বিগ বসের ক্ষমতা সেও দেখেছে। ইরানের জাস্ক থেকে ওকে উদ্ধার করে আরব সাগর পেরিয়ে তাকে মাসকটে নিয়ে আসা। আবার কয়েকদিনের মধ্যেই নতুন পাসপোর্ট ভিসা বানিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া। এ কোনও সাধারণ মানুষের কম্ম নয়।

কিছুক্ষণ পরে লিও জানতে চাইল, “আপনার লন্ডনের এজেন্টের সঙ্গে এর মধ্যে কথা হয়েছে? সেই ঈপ্সিতা আর সৌম্যর কী খবর?”

“ঈপ্সিতা তো নিরুদ্দেশ স্যার। তাকে সম্ভবত কেউ কিডন্যাপ করেছে। আর সৌম্য লন্ডনে গিয়ে তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে।”

“ঈপ্সিতাকে কিডন্যাপ করেছে? কে কিডন্যাপ করবে? সৌম্যর কন্ট্যাক্ট নম্বরটা পারলে জোগাড় করে দেবেন।”

“ঠিক আছে স্যার। আমি খোঁজ নিচ্ছি।”

পাহাড়ের ঢালে হিমালয়ান গ্লাম্পিংয়ে দুটো কটেজ বুক করা ছিল ওদের নামে। পরের দিন ভোরবেলা উঠে চোখ আটকে গেল পঞ্চচুল্লি শৃঙ্গগুলোতে। পরপর পাঁচটা চূড়াতে ভোরের প্রথম আলোয় যেন আগুন লেগেছে। সাদা বরফে মোড়া শৃঙ্গগুলো প্রথমে টকটকে লাল, তারপর ক্রমশ কমলা ও হলুদ হয়ে গেল। কিন্তু পুরো দৃশ্যটা শুধুমাত্র কয়েক মিনিটের জন্য দেখা দিয়ে চলে গেল মেঘের আড়ালে। অঞ্জনবাবু ভক্তিভরে ওদিকে তাকিয়ে ঠকঠক করে তিনবার জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে নিলেন। সেটা দেখে লিও মৃদু হাসছে দেখে বললেন, “আপনি মশাই আমেরিকান। এসব বুঝবেন না। মহাভারতে আছে, দ্রৌপদী তাঁর পাঁচ স্বামীর রান্নার জন্য এখানে পাঁচটা উনুন জ্বেলেছিলেন।”

ব্রেকফাস্ট সেরে হাঁটা শুরু হল জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। কুয়াশায় ঢাকা স্যাঁতসেতে দেবদারু গাছের ঘন জঙ্গল। নীচে সূর্যের আলো পৌঁছায় না সব জায়গাতে। রাস্তা বলে তেমন কিছু নেই। হোটেল থেকে একটা গাইডের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। অল্পবয়সি একটা গাড়ওয়ালি ছেলে, নাম ভিকু, সে একটা লাঠি নিয়ে আগে হাঁটছে। তারপর লিও। শেষে হাঁপাতে হাঁপাতে চলেছেন অঞ্জনবাবু। লিও মাঝে-মধ্যে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ছবি তুলছে।

জঙ্গলটা পেরিয়ে এসে পড়ল ফাঁকা খাড়াই পাহাড়। রাতে তাপমাত্রা দুই-তিন ডিগ্রি থাকলেও এখন বেশ গরম হচ্ছে। অঞ্জনবাবু জ্যাকেট খুলে কোমরে জড়িয়ে নিলেন।

জিমিয়া পাহাড়ের মাথায় অলোকনাথদেবের মন্দির পৌঁছতে ওদের দুপুর গড়িয়ে গেল। কারণ, অঞ্জনবাবু এক হাত জিভ বের করে হাঁপাচ্ছেন, কিন্তু ফিরে যেতে বললে কিছুতেই কথা শুনছেন না। লিও পড়েছে আতান্তরে। ছেড়েও যেতে পারছে না অঞ্জনবাবুকে। শেষ পর্যন্ত তিনি পাহাড়ের মাথায় ছোট্ট শিবমন্দিরে পৌঁছে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লেন ধপাস করে। লিও বোতল থেকে জল খেয়ে একটু জিরিয়ে নিল। চারপাশটা বড়ো সুন্দর। নিরিবিলি। পাহাড়ের মাথা থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মাঝে-মাঝেই মেঘের আড়ালে চলে যাচ্ছে সেই অপার্থিব দৃশ্য।

স্বামী অমৃতানন্দ মহারাজের খোঁজ নিতে জানা গেল তিনি এখনও বেঁচে আছেন। শিবমন্দিরের এক পূজারি জানালেন, “তিনি বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। পাহাড়ের ঢালে ওই আশ্রমেই তিনি থাকেন।” লোকটা আঙুল তুলে দেখাল।

ওরা হাঁটতে হাঁটতে নেমে এল উলটোদিকের ঢালে। প্রায় জনা-কুড়ি আশ্রমিকের থাকার ব্যবস্থা আছে এখানে। গাছের ছায়ায় পরপর সবুজ কাঠের ঘর। মাঝে একটা ধ্যানকক্ষ রয়েছে। পাশেই পাহাড়ের ধাপে বিভিন্ন আয়ুর্বেদ ঔষধি গাছের চাষ হয়। এক আশ্রমিক ওদের সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দিল। একটা ছোট্ট ঘরে কম্বল গায়ে শুয়ে আছেন স্বামীজি। সাদা শনের মতো চুলদাড়ি, মাথায় জটা। খুব কষ্ট করে উঠে বসলেন। ওদের মুখ থেকে সব শুনে বললেন, “রবার্ট কক্সের সমাধি আছে পাশেই। উনি ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। এই আশ্রম ওঁর চেষ্টাতেই তৈরি। শেষজীবনে ভারতীয় আধ্যাত্মবাদ, বেদ, পুরাণ এসব নিয়ে চর্চা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমান্তরাল বিশ্ব আছে এবং বিশেষ পদ্ধতিতে সেখানে যাওয়া যায়। একটা ডায়েরিতে তিনি সবকিছু লিখে গেছেন। কিন্তু সে-সব বৈজ্ঞানিক গবেষণা করার জন্য প্রচুর অর্থ আর লোকবল প্রয়োজন।”

“সেই ডায়েরি কি একবার দেখা যায়?”

স্বামীজির নির্দেশে একজন আশ্রমিক একটা পুরোনো কাঠের বাক্স এনে রাখল সামনে। সেই বাক্সের মধ্যে বের হল রবার্ট কক্সের শেষ ডায়েরি। লিও খুব যত্ন করে একটা একটা করে পাতা উলটে ছবি তুলে নিল পুরো ডায়েরিটার। তারপর গলা নামিয়ে বলল, “এ তো সাংঘাতিক জিনিস!”

আশ্রম থেকে ফেরার পথে অঞ্জনবাবু জানতে চাইলেন, “স্যার, এরপর কোথায়?”

“আপাতত আমার কাজ মনে হয় শেষ, অঞ্জনবাবু। ডায়েরির এই ছবিগুলো মি. লিয়ন্সকে মেল করে দিলে আমার ছুটি।”

কিছুক্ষণ পরে হাঁপাতে হাঁপাতে অঞ্জনবাবু বললেন, “একটা কথা বলব স্যার, কিছু মনে করবেন না। ক’দিনে আপনাকে যা দেখলাম আর চিনলাম, মনের মধ্যে আপনার প্রতি একটা ভক্তিভাব জেগে উঠেছে। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যাচ্ছে বুঝলেন!”

“আচ্ছা! বেশ। শুনে হাসি পাচ্ছে।”

“হ্যাঁ, স্যার। বলছি এ-কেস তো এখনও সলভ হল না। বড়ো সাহেবের মেয়েকে তো পাওয়া গেল না এখনও!”

“মানে?”

“কেন, আপনি জানেন না? হারিয়ে যাওয়া এম.এইচ-৩৭০ বিমানটিতে বড়ো সাহেবের মেয়ে ছিল। ওঁর মেয়ে রোজকে যতদিন না খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, উনি কাউকে নিশ্চিন্তে থাকতে দেবেন না। সেই জন্যই তো সাহেব এত টাকা খরচ করে এই প্রজেক্ট তৈরি করেছেন। ড. রিচার্ড বলেছিলেন, বিমানটি অন্য সমান্তরাল বিশ্বে চলে গেছে। সাহেব প্রতিজ্ঞা করেছেন, সেখান থেকেই তাঁর মেয়েকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন।”

কথাটা শুনে নিশ্চুপ হয়ে গেল লিও। সারাদিন ধরে হাঁটার ধকলে শরীর ক্লান্ত। কিন্তু মহেশ্বর কুণ্ডের সামনে এসে লিও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সামনে সূর্যাস্তের লাল রঙে পঞ্চচুল্লির শৃঙ্গগুলো আবার জেগে উঠছে। তার অপরূপ প্রতিচ্ছবি পড়েছে কুণ্ডের জলে। পাখিরা কিচিরমিচির করে বাড়ি ফিরছে। হ্যারল্ড পার্কের সেই সন্ন্যাসী টিয়াটা এখন কেমন আছে কে জানে! সে কি বেঁচে আছে এখনও?

“চলুন স্যার, অনেকটা পথ চলার বাকি।”

উঠে পড়ল লিও।

উত্তাল সমুদ্র

রহমান-স্যারের বাড়ি ফেলে নীহার যাশুদের বড়ো পাঁচিলঘেরা বাড়ির সামনে দিয়ে চলে গেছে সাঁতরাপাড়ার সরু ইট বিছানো রাস্তা। ঈপ্সিতার স্কুলের বন্ধু মিনতি সাঁতরার বাড়ি এই পাড়ার একদম শেষ প্রান্তে, জলার ধারে। যদিও এই প্রথম মিনতিদের বাড়ি যাচ্ছে ঈপ্সিতা। দরকারটা খুব জরুরি। স্কুল থেকে কিছুদিন আগে ঈপ্সিতার উপপাদ্যের খাতা নিয়ে এসেছে মিনতি। তারপর থেকে তার আর কোনও পাত্তা নেই। স্কুলে গরমের ছুটি পড়ে গেছে। নোটসগুলো ওর দরকার। তাই বেরিয়ে পড়েছে দুপুরবেলা। সাইকেলটা খুব লাফাচ্ছে এই এবড়ো-খেবড়ো ইটের রাস্তার উপর দিয়ে চলতে গিয়ে। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর ইটের রাস্তা শেষ হতে পড়ল একটা বাঁশবন। তার মধ্যে দিয়ে প্রায় লাউডগার মতো সরু একটা মাটির রাস্তা চলে গেছে জলার দিকে। থমকে দাঁড়াল ঈপ্সিতা। এটা ছাড়া আর কোনও রাস্তাও নেই। এবার কোন দিকে যাবে? দুপুরবেলা এদিকটা একেবারে নির্জন আর শুনশান। কাউকে জিজ্ঞেস করতেও পারছে না। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সাইকেল থেকে নেমে। জ্যৈষ্ঠের দুপুরে নির্জন বাঁশবনের মধ্যে দমকা হাওয়ায় কটকট করে আওয়াজ হচ্ছে। ঈপ্সিতা ভেবে নিল, যা হবার হবে, এই রাস্তাতেই এগিয়ে গিয়ে একটু দেখে আসা যাক। সাইকেলে উঠে আবার প্যাডেলে চাপ দিল সে।

বেশ কিছুটা এগিয়ে যেতে বাঁশবনটা শেষ গেল। কিন্তু এদিকে কোনও বাড়িঘর কিচ্ছু নেই। ছোটো জঙ্গল পেরিয়ে ধু ধু মাঠ। ধানজমি। ধান গাছ কাটা হয়েছে কিছুদিন আগে। এখন গোড়াগুলো কটকটে রোদে বাদামি হয়ে গেছে। তবে বেশ হাওয়া দিচ্ছে জলার দিক থেকে। আচমকা কিচকিচ করে শব্দ শুনে চমকে উঠে ঈপ্সিতা দেখল গাছের মাথায় একদল হনুমান। ওকে দেখে দাঁত খিঁচাচ্ছে। নাহ্‌! এখানে আর বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যাবে না। সাইকেল ঘুরিয়ে ফেরার পথ ধরল। কিন্তু বিপত্তিটা হল ঠিক সেই সময়। হনুমানগুলো ভরদুপুরে ওকে একা পেয়ে তাড়া করে এল পিছনে। ঈপ্সিতা ভয় পেয়ে জোরে চালাল সাইকেল। কিন্তু আঁকাবাঁকা সরু রাস্তায় জোরে সাইকেল চালতে গিয়ে কাঁটাঝোপের মধ্যে আটকে গেল ওর ফ্রক। চিরে গেল পা। টাল সামলাতে না পেরে সাইকেল-সমেত হুড়মুড় করে পড়ে গেল পাশেই একটা ছোটো ডোবার মধ্যে। নোংরা জলে পড়ে গা ঘিনঘিন করছে। গরমকালে জল কম ছিল। কিন্তু তাও ওর পা ঢুকে যাচ্ছে পাঁকে। কোমর অবধি পানায় ভরতি হয়ে, পোশাক ভিজে গিয়ে বেশ শোচনীয় অবস্থা ঈপ্সিতার। আরও অবস্থা খারাপ হল যখন বুঝল ডোবাটা ছোটো হলেও বেশ গভীর আর খাড়াই। সাইকেলটা গেছে পাঁকে ঢুকে। সেটাকে তোলার আশা ছেড়ে দিয়ে ঈপ্সিতা দেখল সে নিজেই উপরে উঠতে পারছে না আর। যতবার চেষ্টা করছে, গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে নীচে। এবার কান্না পাচ্ছে। জোরে চেঁচাতে ইচ্ছা করছে। বাড়িতে কাউকে কিছু না জানিয়েই চলে এসেছে সে।

***

জাহাজের দুলুনিতে তন্দ্রাটা ভেঙে গেল ঈপ্সিতার। জাহাজটা এত দুলছে কেন? তার মানে উত্তাল কোনও সমুদ্র বা মহাসমুদ্রের উপর দিয়ে যাচ্ছে। আটল্যান্টিক মহাসাগর হবে নিশ্চয়ই। একটা কন্টেনারের মধ্যে একা বন্দি ঈপ্সিতা। কতদিন হয়ে গেল! দিন, সপ্তাহ বা মাসের কোনও হিসেব নেই। সেদিন রমফোর্ড স্টেশনে ভিড়ের মধ্যে মিশে বেরিয়ে এসেছিল ঈপ্সিতা। ওরা ব্যাগে রাখা কালো স্টোলটা দিয়ে ভালো করে মাথাটা ঢেকে নিয়েছিল। লোকজনের সঙ্গে মিশে রাস্তার ধারে দাঁড়ানো একটা কালো ট্যাক্সিতে ঝটপট উঠে ড্রাইভারকে বলল, “আমাকে হিথরো এয়ারপোর্ট নিয়ে চলো।”

ঈপ্সিতা বুঝতে পেরেছিল, ওর উপর চাপ আসছে। ল্যাবে কাজ করা মুশকিল হয়ে উঠছিল প্রতিদিন। যদিও নিজের কাজকে প্রচণ্ড ভালোবাসে ঈপ্সিতা, এতদিন যেটা ও মনপ্রাণ দিয়ে করে এসেছে। কিন্তু মালিকপক্ষ ওকে এমন কিছু কাজ করার জন্য চাপ দিচ্ছিল যেটা মন থেকে ঈপ্সিতা মেনে নিতে পারছিল না কিছুতেই। ড. রিচার্ডের অসমাপ্ত কাজ করার জন্য ঈপ্সিতার সাহায্য ওদের চাই। এই কথাটা ঈপ্সিতা যেমন জানত, তেমনি ওরাও বুঝতে পেরেছিল। তারপর রবার্ট কক্সের ডায়েরিটা ভারত থেকে নিয়ে এসে আরও সর্বনাশ হয়েছে। কোম্পানির উপরতলার লোকেরা ব্যাপারটা জানতে পেরে সর্বক্ষণ নজর রাখছে ওর উপর। ও কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে কথা বলছে, কী করছে— সবকিছু। এই দম বন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তির একটাই উপায় ছিল। যে-কোনোভাবে লুকিয়ে ইংল্যান্ড থেকে পালিয়ে যাওয়া। কিন্তু সারা পৃথিবীতে এদের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচা প্রায় অসম্ভব। তবু ঈপ্সিতা চেষ্টাটা করবে। ও ঠিক করেছিল ভারতে নিজের বাড়িতেই ফিরে যাবে। সেইমতো সমস্ত প্ল্যান ও সাজিয়ে নিয়েছিল। ওর বন্ধু সেন ড্যানইয়ংকে দিয়ে ভারতে যাবার জন্য হিথরো এয়ারপোর্ট থেকে টিকিটও কেটে নিয়েছিল ঈপ্সিতা। সবকিছু চলছিল পরিকল্পনা অনুযায়ী। কিন্তু ঈপ্সিতা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে ওকে সেদিন ট্রেনের মধ্যেও কেউ ফলো করছে। রমফোর্ড স্টেশন থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সিতে উঠতেই আচমকা দুজন লোক ওর নাকে একটা রুমাল চেপে ধরল। ক্লোরোফর্মের মিষ্টি ঝাঁজালো গন্ধে দু-তিন সেকেন্ডের মধ্যেই জ্ঞান হারাল ঈপ্সিতা।

ওর জ্ঞান যখন ফিরল তখন দেখল ও একটা ছোটো ঘরে বন্দি। তবে ঈপ্সিতার হাত-পা কেউ বেঁধে রাখেনি। ঘরের মধ্যে শোওয়ার জন্য একটা ম্যাট্রেস রাখা আছে আর ওর মাপের কিছু পোশাক, খাবার, পানীয় জল, টয়লেটের ব্যবস্থা আছে। তবে বাইরে যাওয়ার একটাই দরজা। ছোট্ট ঘরটা দুলছে। ঈপ্সিতা বুঝতে পারল ও একটা জাহাজের মধ্যে আছে। একটা কন্টেনারের মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে ওকে। জাহাজ চলছে। আনুমানিক তিন-চারদিন পর ওর কন্টেনারটাকে অন্য কোনও জাহাজে শিফট করা হল। তারপর থেকে এইভাবেই চলছে। দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে। কোনও লোকজনের ওর সঙ্গে কথা নেই। কেউ ওর সঙ্গে দেখা করতেও আসে না। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওকে কে জানে। দিনের মধ্যে একবার ওরা সিলিংয়ের ছোট্ট ঢাকনা সরিয়ে খাবার আর জলের প্যাকেট ফেলে দেয়। খাবারের মধ্যে থাকে বান রুটি, সঙ্গে কোনোদিন জেলি, মাখন বা চিকেনের টুকরো। একঘেয়ে জীবনে পড়ে পড়ে ঘুমানো ছাড়া আর কোনও কাজ নেই। কিন্তু একটা মানুষ কত ঘুমাবে? যদি দু-একটা বই দিত এরা, পড়ে সময় কাটত। বাইরে দিন না রাত, কিছুই বুঝতে পারে না ঈপ্সিতা। বাইরে থেকে কোনও আলোই ভিতরে ঢোকে না। ভিতরে মৃদু একটা আলো জ্বলে সারাক্ষণ। সেই সামান্য আলোটাও বড়ো অসহ্য আর একঘেয়ে মনে হয় ঈপ্সিতার। মাঝে মাঝে কন্টেনার সরানোর ঘরঘর করে ধাতব আওয়াজ কানে আসে। জীবনে এরকম কোনও সময় আসবে, ঈপ্সিতা স্বপ্নেও ভাবেনি।

দুলুনিতে তন্দ্রা এসে গিয়েছিল। তখনই ওই অদ্ভুত স্বপ্নটা দেখল ঈপ্সিতা। ছোটোবেলার সেই দিনগুলো কী সুন্দর ছিল! সেই গ্রামের বাড়ি, মাঠ, বাঁশবন, আম-জাম, পেয়ারার জঙ্গল; সে-সব আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। ভীষণ মনখারাপ হয় সে-কথা মনে পড়লে। সাঁতরাপাড়ার সেই বাঁশবনের মধ্যে ঈপ্সিতা পড়ে গিয়ে ছটফট করছে সেখান থেকে ওঠার জন্য। অনেকবার চেষ্টা করার পর সে চেঁচিয়ে সাহায্য চাইল, “কেউ আছেন? আমি এখানে পড়ে গেছি। উঠতে পারছি না।”

বেশ কয়েকবার গলা ফাটিয়ে চিৎকার করার পর কেউ একজন সাড়া দিল। ঈপ্সিতা উপরদিকে তাকিয়ে দেখতে পেল সৌম্যকে। সে অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, “তুই এখানে পড়ে গেলি কী করে?”

ওর কথার উওর না দিয়ে ঈপ্সিতা তাকে জিজ্ঞেস করল, “তুই এখানে কী করছিস?”

তারপর সৌম্য অনেক কষ্টে কলাগাছের ব্যানা জোগাড় করে গাছের সঙ্গে বেঁধে ডোবা থেকে উদ্ধার করল ঈপ্সিতাকে।

জাহাজটা ভীষণরকম দুলছে। সমুদ্রে মনে হয় বড়ো ঝড় উঠেছে। ধাতব দেয়ালে কান পাতলে ঘরঘর করে আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। স্থির হয়ে বসা বা শোওয়া যাচ্ছে না। পেট গোলাচ্ছে ঈপ্সিতার। বমি হবে মনে হয়। শরীরের মধ্যে খুব অস্বস্তি হচ্ছে। দুলুনি থামছে না কিছুতেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একইরকম চলেছে। আর হয়তো বেঁচে ফেরা হবে না ঈপ্সিতার। ঝিমঝিম করছে মাথা। আবার মনে একটাই জিজ্ঞাসা তৈরি হল, এরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তাকে?

রাজমণি কুইসিন

“লোকটা কে?”

“বুঝতে পারছি না দেবুদা! আমি তো চিনিই না। ভাঙা ভাঙা বাংলায় কথা বলল ফোনে। উচ্চারণ বাঙালিদের মতো নয়।”

“কিন্তু তোর আর আমার সম্পর্কে এত কথা জানল কী করে? দেখি ফোন নম্বরটা। +১ দিয়ে শুরু। মানে এটা অ্যামেরিকান নম্বর। সবথেকে আশ্চর্য, লোকটা আমার ঠিকানা পর্যন্ত জানে। না-হলে রাজমণিতে দেখা করার কথা বলবে কেন?”

“সেটাই তো!”

সৌম্যর মাথা পুরো ব্ল্যাংক হয়ে গেছে আজকে সকালের ফোনটা পেয়ে। এমনিতেই কিছুদিন আগে ওয়েস্টমিনিস্টারের কাছে আন্ডারগ্রাউন্ড পাসে ওর উপর হামলা হয়েছে। এখানে আসার আগে কলকাতাতেও ওকে কেউ ফলো করছিল এবং অ্যাক্সিডেন্টের মাধ্যমে থ্রেট দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তার মানে কিছু লোক চায় না যে ও ঈপ্সিতাকে খুঁজুক। অর্থাৎ, এটা বোঝা যাচ্ছে যে ঈপ্সিতাকে কেউ কিডন্যাপ করেছে। কিন্তু এখানের পুলিশ তেমন কিছুই করছে না। শুধু বলছে ইনভেস্টিগেশন আন্ডার প্রসেস। বাথ থেকে ফেরার পর দু-দিন ধরে খুবই হতাশ লাগছে সৌম্যর। ঈপ্সিতাকে ফিরিয়ে আনার কোনও রাস্তাই খুঁজে পাচ্ছে না ও। তাহলে কি এতদূর ছুটে আসা বেকার হবে! ঈপ্সিতা হারিয়ে যাবে চিরকালের মতো! প্রফেসর যা বললেন, মানে সমান্তরাল বিশ্বে যাওয়ার জন্য যদি কোনও এক্সপেরিমেন্ট করতে হয় তাহলে সেটা করতে হবে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝামাঝি কোনও জায়গাতে। একদল লোক নাকি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে চিলির উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। কিন্তু ঈপ্সিতা যে তাদের সঙ্গেই আছে, তার তো কোনও নিশ্চয়তা নেই। শুধুমাত্র অনুমানের উপর ভিত্তি করে লন্ডন থেকে চিলি ছুটে যাওয়া কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে? তারপর বিশাল একটা খরচের ধাক্কাও তো আছে। শেষ পর্যন্ত যদি কিছুই খুঁজে না পাওয়া যায়? সৌম্য দেবুদার সঙ্গেও এ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেছে। কিন্তু কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি ওরা। এখন হয়তো ঈপ্সিতাকে না নিয়েই দেশে ফেরার মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে সৌম্যকে। কথাটা ভাবলেই কান্না পাচ্ছে। মায়ের কাছে মুখ দেখাবে কী করে?

রবিবার দুপুর বারোটা নাগাদ সৌম্যর কাছে অচেনা একটা নম্বর থেকে ফোন এল। ভাঙা ভাঙা বাংলায় জানতে চাইল, “তুমি সৌম্য বলছ তো?”

“হ্যাঁ!”

“আমার নাম লিও রয়। তুমি আমাকে চিনবে না। কিন্তু আমি তোমাকে ভালো করে চিনি। এখন তুমি রেডিংয়ে প্রফেসর দাসের বাড়িতেই আছ আশা করছি?”

“হ্যাঁ, তা আছি। কিন্তু…”

“বেশ। এবার যেটা বলছি মন দিয়ে শোনো। ঈপ্সিতাকে ফিরে পেতে চাইলে আজকে বিকালে ঠিক পাঁচটা নাগাদ তুমি ইন্ডিয়ান কুইসিন রাজমণিতে চলে এসো। তোমার দেবুদার বাড়ি থেকে দু-মিনিটের হাঁটাপথ। সঙ্গে দেবুদাকেও নিয়ে আসবে।”

কেটে গেল ফোনটা। দৌড়ে নীচের লনে গিয়ে দেখল দেবুদা কাটার দিয়ে ঘাস ছাঁটছে। তাকে ঘটনাটা বলতে সে আকাশ থেকে পড়ল।

যথারীতি পাঁচটা বাজার কয়েক মিনিট আগেই ওরা দুজন পৌঁছে গেল রাজমণিতে। দেবুদা এই রেস্তোরাঁর বাঁধা কাস্টমার। ইতোমধ্যে সৌম্যকেও দু-বার খাবার খাইয়েছে এখানে। জিভে জল আনা মোগলাই রান্নাগুলো এখানে ভালোই করে। দেবুদা ঢুকতেই রেস্তোরাঁর মালিক জসিমভাই হাসিমুখে মাথা নাড়লেন। ওরা কোণের প্রিয় টেবিলে বসতেই কমপ্লিমেন্টারি পাঁপড় সেঁকা চলে এল। এর মিনিট দশেকের মধ্যেই একজন লম্বা সুগঠিত চেহারার লোক ঢুকল রেস্তোরাঁয়। সৌম্য লক্ষ করল, লোকটার মাথায় টুপি, গায়ে হালকা লেদারের জ্যাকেট, চোখে কালো চশমা। চশমাটা খুলে মুহূর্তে চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে এগিয়ে এল ওদের টেবিলের দিকে।

“হ্যালো! আমি লিও রয়। তুমি সৌম্য আর আপনি প্রফেসর দাস, রাইট?”

ওরা মাথা নাড়তে লিও সামনের চেয়ারে বসে বলল, “কয়েকদিন আগে ঈপ্সিতার খবর জানানোর অছিলায় সৌম্যকে লন্ডনে ডেকে নিয়ে গিয়ে ফিজিক্যালি অ্যাসল্ট করা হয়েছে। সেজন্য আমি তোমাদের বাড়ির কাছেই এই রেস্তোরাঁয় ডাকলাম। এখানে সবাই তোমাকে চেনে। তাই ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই আশা করি।”

“কিন্তু আপনাকে তো আমরা ঠিক চিনতে পারলাম না?” প্রশ্ন করল দেবুদা।

“হ্যাঁ, আমার পরিচয়টা আগে দিই। তাহলে আপনার বুঝতে সুবিধা হবে। আমার নাম লিও রয়। আগে আমি অ্যামেরিকান সরকারের মিলিটারি এবং পরে ওদের ইন্টেলিজেন্সের ফিল্ড এজেন্ট ছিলাম। বিগত পাঁচ বছর আমি সে-কাজ ছেড়ে দিয়েছি। এখন মাঝে-মধ্যে কিছু কনসালট্যান্সি আর প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশনের কাজ করি। কিছুদিন আগে সেরকমই একটা কাজ আমার হাতে এসেছে, প্রায় একশো বছরের পুরোনো রবার্ট কক্সের একটা ডায়েরি খুঁজে দেওয়ার ভার পড়েছিল আমার উপর। সেজন্য আমাকে কলকাতায় যেতে হয়েছিল।”

সৌম্য ওকে থামিয়ে জানাল, “কিন্তু সে ডায়েরি তো আমি অনেক আগেই ভারত থেকে ঈপ্সিতাকে পাঠিয়ে দিয়েছি।”

“তুমি যেটা পাঠিয়েছিলে, সেটা ছিল ওই ডায়েরির প্রথম ভাগ। কক্সের লেখা দ্বিতীয় আর একটা ডায়েরি ছিল। সেটা আমি উদ্ধার করেছি মুন্সিয়ারির এক আশ্রম থেকে। যাই হোক, ডায়েরিটা খুঁজে পাবার পরে আমি সেটা নিয়ে যখন স্টাডি করলাম, বুঝতে পারলাম, এই বিশেষ অ্যালকেমি বিদ্যার মাধ্যমে প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে যাওয়ার এক ভয়ংকর পদ্ধতির কথা লেখা আছে ডায়েরিটাতে। সূর্যগ্রহণের সময় জনশূন্য এক জায়গায় একজনকে হত্যা করতে হবে। এছাড়াও সেখানে দরকার বিশাল একটা শক্তি। যা প্রাকৃতিকভাবে একমাত্র বজ্রপাতের ফলে তৈরি হয়। অথবা অ্যাটমিক ফিউশনের ফলে সেই শক্তি তৈরি করা যেতে পারে। সদ্যোমৃত মানুষের আত্মার সাহায্যে সেই বিশেষ মুহূর্তে খুলে যাবে সমান্তরাল বিশ্বের দরজা।”

“তার মানে ঈপ্সিতাকেই কি বলি দেবে ওরা?”

“আমারও তাই মনে হচ্ছে। যেভাবেই হোক মেয়েটিকে বাঁচাতে হবে। সেজন্য আমি যাচ্ছি পুয়ের্তো মন্ট। সৌম্য নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে যেতে চাইবে?”

সৌম্য প্রায় লাফিয়ে উঠল, “হ্যাঁ, আমি অবশ্যই যাব।”

“সুদূর ভবিষ্যতে যাতায়াতও সম্ভব। কিন্তু জগতের সব ভালো কাজে যেমন বাধা আসে, তেমনই এখানেও আছে। কুখ্যাত লিয়ন্স গ্রুপ, সি.আই.এ., এম.আই.সিক্স.— এরা কিছুতেই আমাকে শান্তিতে কাজ করতে দেবে না।”

দেবুদা বলল, “এই কথাটা বলার জন্য আপনি এতদূর ছুটে এসেছেন? আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, এসবের পিছনে সাংঘাতিক কোনও ক্রিমিনাল দল রয়েছে। তারাই আপনাকে হায়ার করেছিল। এখন হঠাৎ তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে ঈপ্সিতাকে বাঁচাতে চাইছেন কেন? যারা ডক্টর রিচার্ডকে লন্ডনের বাড়িতে হত্যা করেছে, ঈপ্সিতাকে কিডন্যাপ করছে, সৌম্যর উপরে বার বার অ্যাটাক করেছে, তারা এই ভয়ংকর এক্সপেরিমেন্ট করতে কতটা মরিয়া সেটা অনুমান করা যায়। এক্ষেত্রে সৌম্য আপনার সঙ্গে গেলে কতটা সেফ থাকবে আমি নিশ্চিত নই। মি. রয়, আপনাকে তো আমরা ভালো করে চিনি না।”

ইতোমধ্যে কফি এসে গেছে। কাপে চুমুক দিয়ে লিও রয় বলল, “আপনার কথায় অবশ্যই যুক্তি আছে, প্রফেসর দাস। আপনাদের জানাই, বাঙালি বিজ্ঞানী বিশ্বজ্যোতি রায়চৌধুরী ছিলেন আমার বাবা। তিনিও প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে রিসার্চ করতে গিয়ে চিরকালের মতো পৃথিবী থেকে হারিয়ে যান। তখন আমি খুব ছোটো। কিছুদিন আগে আমি যখন কলকাতায় ছিলাম, একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। আমাদের পৈতৃক ভিটে ছিল হুগলিতে। এবারেই প্রথম গেলাম সেই বাড়িতে। সেখানেই পরিচয় হল আমার এক পিসতুতো ভাই নিতাই বিশ্বাসের সঙ্গে। কথাপ্রসঙ্গে তিনি জানালেন, ওঁর দাদা গৌরাঙ্গ বিশ্বাস খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে একটি মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। ওঁর বাবা সেজন্য বড়ো ছেলেকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন। তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যান। কিন্তু দুই ভাইয়ের মধ্যে গোপনে যোগাযোগ ছিল। জানতে পারলাম, ঈপ্সিতা হল গৌরাঙ্গ বিশ্বাসের মেয়ে। কী অদ্ভুত সমাপতন ভাবুন!”

“তার মানে ঈপ্সিতা আপনার ভাইঝি?”

“হ্যাঁ, ব্যাপারটা তাই দাঁড়াল। এবার প্রফেসর দাস যদি এই সম্পর্কের প্রমাণ চান তাহলে আমার মোবাইলে তোলা পিসতুতো ভাই নিতাইয়ের সঙ্গে ছবি দেখতে পারি। এই যে। আর এই নিন নিতাইয়ের ফোন নম্বর। আপনি নিতাইয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পারেন।”

দেবুদা আর সৌম্য দুজনেই চুপ করে গেল।

লিও আবার মুখ খুলল, “দু-দিন পর আমি ফ্লাইটের দুটো টিকিট কেটেছি। চিলির ভিসা অ্যাপ্লিকেশনটা আজকেই করে দাও। আশা করি অ্যাপ্রুভ হয়ে যাবে তোমার।”

দেবুদা বলল, “মি. রয়, আপনি একটা কথা ভুলে যাচ্ছেন, ঈপ্সিতা আমারও বোন হয়। পাড়াতুতো। আপনার ফ্লাইটের ডিটেলটা পাঠান। আমিও টিকিটটা কেটে নিই।”

তিনজনের মুখেই একটা অদ্ভুত হাসি দেখা গেল।

ক্যালবুকো আগ্নেয়গিরির সামনে

ড. আন্দ্রেই পেত্রোভ হোটেলের লিফট দিয়ে উঠে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গেলেন। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে মি. কক্সের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের পাশ কাটিয়ে ব্যালকনির শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ালেন তিনি। সামনে খোলা আকাশ। পিছনে দিগন্তরেখায় পুয়ের্তো মন্ট শহরের উত্তরে সন্ধ্যার অন্ধকারেও চিলির বিখ্যাত ক্যালবুকো আগ্নেয়গিরির ঘুমন্ত চূড়াটা চকচক করছে সাদা বরফ পড়ে। সন্ধ্যার মুখে ঠান্ডা হাওয়ার স্রোত বয়ে আসছে ওদিক থেকে। সামনে মি. কক্সকে ঘিরে বসে আছে টিমের তিনজন সিনিয়র টেকনিশিয়ান, চারজন সিকিউরিটি অফিসার এবং দুজন অভিজ্ঞ অভিযাত্রী। এক্সপিডিশন নিয়ে গম্ভীর আলোচনা চলছে।

মি. কক্স ওঁকে দেখতে পেয়ে ডেকে নিলেন, “আসুন, ড. পেত্রোভ। আপনারা তৈরি তো?”

ড. পেত্রোভ সোফায় বসে মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ, গোসপাইদিন! আগামীকাল সকালেই আমাদের জাহাজ ছাড়ছে। আমরা পুরোপুরি তৈরি।”

“বেশ! সেই মেয়েটির কী খবর?”

“মিস বিসওয়াস এখন আমাদের সঙ্গে কো-অপারেট করছে। ওর রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হয়ে গেছে। ডি.এন.এ সিকোয়েন্স মিলে গেছে। রবার্ট কক্সের ডায়েরিতে যা যা লেখা ছিল, সবকিছু পরিমাণমতো সংগ্রহ করা হয়ে গেছে। শুধু রবার্টের আত্মা নামানোর ব্যাপারটা আপনাকেই দেখে নিতে হবে। বাকি সমস্ত বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম জাহাজে প্রস্তুত। নিউক্লিয়ার ফিউশনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যাটমিক রি-অ্যাক্টর সেট করা হয়ে গেছে। আমরা পুরোপুরি তৈরি, মি. কক্স।”

“বেশ। আমাদের সৌভগ্য দক্ষিণ আমেরিকা থেকে একজন ব্ল্যাক ম্যাজিক বিশেষজ্ঞকে পেয়েছি, ডাজালমা পাকুয়েটা। এঁকে আপনি সঙ্গে নিয়ে যান। আজকে রাতের মধ্যে সবকিছু গুছিয়ে জাহাজে উঠে যেতে হবে। প্রার্থনা করুন যাতে আমাদের এই যুগান্তকারী প্রচেষ্টা সফল হয়।”

হোটেল গ্রান পুয়ের্তোর প্রেসিডেন্সিয়াল সুইটে মিটিং শেষ করে সবাই উঠে গেল একে একে। মধ্যবয়স্ক জেকব কক্সও উঠে গিয়ে দাঁড়ালেন ব্যালকনির হাতল ধরে। সামনে অন্ধকার চিলো সাগরের বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মিটমিট করে জ্বলছে কয়েকশো আলো। ওগুলো সব মাছধরা ট্রলার। স্থানীয় বাসিন্দাদের এটাই প্রধান জীবিকা। প্রশান্ত মহাসাগরে স্যামন মাছ ধরা এবং বিভিন্ন জলজ চাষের উপর নির্ভরশীল এরা। এই শহরটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্যামন অ্যাকোয়াকালচার শিল্পের কেন্দ্রস্থল বলা যায়। হ্যাচারি, মাছ, মৎস্যজাত খাবার এবং প্যাকিং প্ল্যান্টগুলি বেশিরভাগই পুয়ের্তো মন্টের দক্ষিণদিকে আছে। প্রতিদিন প্রশান্ত মহাসাগরের অফুরন্ত ভাণ্ডার থেকে তাজা স্যামন ও অন্যান্য মাছ তুলে আনা এবং বিশ্ব বাজারে পাঠানো হয় এখান থেকে।

মি. কক্স সেদিকেই তাকিয়ে ছিলেন। পিছনে কখন যে চিতার মতো নিঃশব্দে পা ফেলে থমাস এসে দাঁড়িয়েছে, টের পাননি।

“গুয়ে আন্দ, মিনের!”

“গুড ইভনিং, থমাস। কখন এলে তুমি?”

“আনুমানিক এক ঘণ্টা আগে সান্তিয়াগো এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট টেপুয়াল বিমানবন্দরে পৌঁছল। সেখান থেকে সোজা আপনার কাছে এলাম। দুটো খবর আছে, মিনের।”

“বলো!”

“জোসেফ লিয়ন্স গতকাল লন্ডনে একটা গোপন মিটিং করেছে। খবর আছে, দলবল নিয়ে আগামীকাল বিকালের মধ্যে সান্তিয়াগোতে পৌঁছে যাবে।”

পাইপের তামাকে আগুন লাগিয়ে কয়েক রাউন্ড ধোঁয়া ছেড়ে মি. কক্স বলল, “জোসেফ আসছে এখানে? আশ্চর্য! ওর এত ইন্টারেস্ট কীসের?”

“জোসেফ লিয়ন্সের মেয়ে ফ্লাইট-৩৭০-এ ছিল। ও কিছুতেই সেই ঘটনাটা ভুলতে পারছে না।”

“আচ্ছা, সামনাসামনি একটা বোঝাপড়া হয়ে গেলে ভালোই হত। কিন্তু কাল সকালেই আমরা পুয়ের্তো মন্ট বন্দর ছেড়ে পয়েন্ট নিমোর দিকে যাত্রা করছি। অতএব ব্যাড লাক!”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মি. কক্স বললেন, “আমার পূর্বপুরুষ ছিলেন প্রাচীন গুপ্ত অ্যালকেমি গোষ্ঠীর সদস্য। প্রায় দেড়শো বছর আগেই তাঁরা তৈরি করে ফেলেছিলেন সমান্তরাল বিশ্বের যাতায়াতের রাস্তা। কিন্তু সে-রাস্তা খোলার জন্য যে বিপুল শক্তির প্রয়োজন ছিল, সেই বিদ্যা তাঁরা জানতেন না। এখন আধুনিক ফিজিক্সের নিয়ন্ত্রিত অ্যাটমিক ফিউশনের সাহায্যে সেই দরজা খোলা সম্ভব। আর একবার যদি সেই দরজা খোলা যায়, তাহলে…

“হ্যাঁ, আমি সব জানি মিনের।”

“গোপনে ইউরেনিয়াম জোগাড় করা থেকে ড. রিচার্ডের আকস্মিক মৃত্যু, তারপর মিস বিসওয়াসকে প্রথমে লন্ডনের রমফোর্ড থেকে সাউথাম্পটন, তারপর রাশিয়ানদের সাহায্যে সাউথাম্পটন পোর্ট থেকে কার্গো শিপে করে চিলিতে নিয়ে আসা— সবেতেই তোমার নিখুঁত পরিকল্পনা কাজ করেছে। পয়েন্ট নিমোতে পূর্ণ সূর্যগ্রহণের দিন এগিয়ে আসছে। এই সুযোগ আর দ্বিতীয়বার পাওয়া যাবে না।”

“একটা প্রশ্ন ছিল, মিনের। মিস বিসওয়াসকে কেন সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বুঝলাম না। মেয়েটির কাছে যা তথ্য ছিল সে-সব তো আগেই দিয়ে দিয়েছে।”

কিছুক্ষণ পাইপ টেনে ধোঁয়া ছেড়ে মনোসংযোগ করে মি. কক্স উত্তর দিলেন, “অ্যালকেমি বিদ্যায় স্থান, কাল, বিজ্ঞানের সঙ্গে আরও কিছু দরকার পড়ে। যেমন স্পিরিচুয়ালিজম, আত্মা, মিডিয়াম, এমনকি তাজা রক্ত আর সদ্য শরীর থেকে বেরিয়ে আসা প্রাণ। এ সবকিছু মিলে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়। তিথিনক্ষত্র মিলে গেলে মাঝ-আকাশে অথবা সমুদ্রের মাঝখানে প্রাকৃতিকভাবে বজ্রপাতের ফলে তৈরি হওয়া শক্তিতে হঠাৎ করে অনেক সময় সেই দরজা খুলে যায়। আমরা সেটাই চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কৃত্রিমভাবে তৈরি করার চেষ্টা করছি।”

“বুঝলাম, মিনের। সেজন্যই কি ডাজালমা পাকুয়েটাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে?”

“হ্যাঁ, তুমি যাও, নিজে সবকিছু দেখে নাও। রাতের অন্ধকার কাটার আগেই যেন জাহাজ এই বন্দর থেকে বেরিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পড়ে।”

কথাটা শুনে থমাস ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে যেমন এসেছিল, আবার তেমনই নিঃশব্দে চলে গেল।

পয়েন্ট নিমো

পরের দিনে সূর্য ওঠার আগেই মাঝারি সাইজের আধুনিক জাহাজ ‘এক্সপ্লোরার অ্যাভেঞ্জার’ পোর্ট পুয়ের্তো মন্ট থেকে বেরিয়ে পশ্চিমদিকে রওনা হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে গিয়ে পড়ল চিলো সাগর পেরিয়ে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মহাসমুদ্রে। গন্তব্য, ‘পয়েন্ট নিমো’। এটি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের ঠিক মাঝামাঝি প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। নিকটতম স্থলভাগ হল উত্তরে পিটকেয়ার্ন দ্বীপপুঞ্জের অংশ ডুসি দ্বীপ, উত্তর-পূর্বে ইস্টার দ্বীপের অংশ মোটু নুই এবং দক্ষিণে অ্যান্টার্কটিকার মেরি বার্ড ল্যান্ডের উপকূলে সিপল দ্বীপের কাছে মাহের দ্বীপ। অত্যন্ত দুর্গমতা এবং সমুদ্র স্রোতের কারণে পয়েন্ট নিমোর আশেপাশের এলাকাটিকে একটি জৈবিক মরুভূমি বলা হয়, যেখানে সামুদ্রিক জীবন নেই বললেই চলে।

জাহাজের একদম সামনে ডেকের উপরে মহাসমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল থমাস। গোটা আকাশ মেঘে ঢেকে আছে। কালচে ছাইরঙা সমুদ্রের জল। মাঝারি মাপের ঢেউয়ের উত্তাল ফণা আছড়ে পড়ছে একের পর এক। এই জাহাজের গতি ঘণ্টায় মোটামুটি ৪০ নটিক্যাল মাইল। আনুমানিক দশদিন লাগবে পৌঁছতে।

ঈপ্সিতা এই জাহাজের একটা কেবিনে বন্দি। এখন তার সামনে একটা বড়ো কাচের জানালা। যতদূর চোখ যাচ্ছে শুধু জল আর জল। সাদা সি-বার্ডগুলো মাছের লোভে উড়ে আসছে জাহাজের কাছে। সমুদ্রের জলে ভাসমান মাছেরাই ওদের প্রধান খাদ্য। উড়তে উড়তে এরা হাঁপিয়ে পড়লে নেমে যাচ্ছে জলে। ঢেউয়ের সঙ্গে জলের উপর ভাসছে। কত স্বাধীন ওরা! ঈপ্সিতার এখন সকাল থেকে রাত প্রতিদিন একই রুটিন। খাওয়া, শোওয়া আর ঘুম। দেড় মাস হতে চলল বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে তার কোনও যোগাযোগ নেই। সে নিজে এখনও যে বেঁচে আছে, এই কথাটাও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। জাহাজের একজন মহিলা ক্রু এসে দিনে তিনবার করে খাবার, জল আর কফি দিয়ে যায়। মিষ্টি করে হেসে কথা বলে মহিলাটি। কিন্তু ওর সঙ্গে নাকি বেশি কথা বলা তার বারণ। সে জানিয়েছিল, জাহাজ এখন প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে। ঈপ্সিতা আন্দাজ করতে পারে ওকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নিশ্চয়ই সেই ভয়ংকর এক্সপেরিমেন্টের গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করা হবে ওকে। ড. রিচার্ড এই সাংঘাতিক পরীক্ষা না করতে চাওয়ায় খুন হয়েছেন। প্রথমদিকে কথাটা ভাবলে ওর ভয় লাগত। কিন্তু এখন মনে হয়, এটাই হয়তো ওর ভবিতব্য ছিল। এই পৃথিবীতে ওর নিজের বলে কেউ নেই। না, আছে একজন। দুনিয়ার উলটোদিকে তার একটা বন্ধু আছে, সৌম্য। কী করছে সে এখন? ভারতে এখন মধ্যরাত। সবাই নিশ্চয়ই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

দেশ থেকে একদিন অনেক স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল ঈপ্সিতা। পড়াশোনা শেষ করার পরে ড. রিচার্ডের মতো বিজ্ঞানীর সঙ্গে কাজের সুযোগও পেয়ে গেল। তখন নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হয়েছিল ঈপ্সিতার। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই বুঝতে পারল সে একটা চক্রব্যূহের মধ্যে ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে। টাকার পিছনে ছুটতে গিয়ে দেখল কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ তাকে দিয়ে জঘন্য একটা কাজ করাতে চাইছে। ড. রিচার্ডের খুনের দায় চাপানোর চেষ্টা করা হল ঈপ্সিতার উপর। বারংবার হুমকি ফোন আসছিল অচেনা নম্বর থেকে। এদের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়া বা পালিয়ে যাওয়ার কোনও রাস্তা ছিল না। ঈপ্সিতা এখন বুঝতে পারছে মৃত্যুটা চারদিক থেকে ক্রমশ এগিয়ে আসছে তার দিকে, তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে অক্টোপাসের মতো। তবু আগের মতো এখন আর ভয় লাগছে না তার। নার্ভগুলো আগের থেকে অনেক বেশি স্টেডি।

***

মাহেন্দ্রক্ষণ আসন্ন। ড. আন্দ্রেই পেত্রোভ এবং তাঁর টিম সম্পূর্ণ প্রস্তুত। যন্ত্রপাতি সাজানো হয়ে গেছে জাহাজের ডেকে। পাওয়ার সাপ্লাই রেডি। আর মাত্র বারো ঘণ্টার অপেক্ষা। তারপরেই পয়েন্ট নিমোতে পৌঁছে যাবে ওরা। শুরু থেকেই আকাশ মেঘে ঢেকে আছে। থমাস জাহাজের ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞেস করায় তিনি জানালেন, “সামুদ্রিক আবহাওয়ার এখানে খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ক’দিন ধরেই আকাশের মুখ ভার আর প্রচণ্ড হাওয়ার টান। স্যাটেলাইট ইমেজে একটা ঝঞ্ঝার ফোরকাস্ট আছে। আশা করছি খুব বড়ো কোনও ঝামেলায় পড়তে হবে না।”

থমাস বলল, “গত দু-দিন আগে যে তুফানটা আমরা পেরিয়ে এলাম, তাতেই অনেকের অবস্থা শোচনীয়। ড. পেত্রোভের পেট গোলাচ্ছে। আরও বেশ কয়েকজনের মাথা ধরেছে।”

“ওটা সাধারণ সামুদ্রিক অসুস্থতা। সমুদ্রের ক্রমাগত ঢেউয়ের সঙ্গে সমতলে থাকা মানুষের শরীর অ্যাডজাস্ট করতে সময় লাগে। প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে এরকম তুফান হামেশাই দেখা যায়। জাহাজ একবার ঢুকে যায় জলের গভীরে, আবার ভেসে ওঠে। ও নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। সঙ্গে ডাক্তার আছে, ওষুধ দিলে ঠিক হয়ে যাবে।”

ডেকের উপরে এসে ক্যাপ্টেন আরও জানালেন, “একটা ফিশিং ট্রলার ডুবে গেছে শুনেছ নিশ্চয়ই? তিনজন জেলে টিউব বোটে করে সমুদ্রের মাঝে ভাসছিল। তাদের গতকাল সকালে উদ্ধার করা হয়েছে।”

থমাস রেলিংয়ের উপর হাত দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, দেখলাম লোকগুলোকে। নীচের একটা ঘরে ওদের রেখে দিয়েছি আপাতত। সিকিউরিটির অফিসাররাও চেক করেছে। কোনও সমস্যা নেই।”

“এদিকে জাহাজ চলাচল খুব কম। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছে জেলেগুলো। আমি ভাবছি, ফিশিং ট্রলার এতদূর তো আসে না!”

“এ-কথাটা আমি লোকগুলোকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ওরা জানাল, চারদিন আগেই ওদের ট্রলারের রেডিও আর কম্পাস বজ্রপাতে খারাপ হয়ে গেছিল। তারপর দু-দিন ধরে ওরা অন্ধের মতো বোট চালিয়েছে। আকাশে মেঘ থাকায় নক্ষত্র দেখে দিক নির্ণয় করার সুযোগ পায়নি। ভুল করে আরও গভীরে চলে এসেছে। তারপর ওদের ট্রলারটাও ডুবে যায়।”

“হুম! চলো কেবিনের ভিতরে গিয়ে বসি। নোনা ঝোড়ো হাওয়ার জন্য বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যাচ্ছে না। ঢেউয়ের প্রকৃতিও ক্রমশ ভয়ংকর হচ্ছে।”

তারপর আবার কেবিনে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করে ক্যাপ্টেন বললেন, “তোমাদের পরীক্ষার জন্য সব সরঞ্জাম তো দেখছি প্রস্তুত। কিন্তু আবহাওয়া যদি আরও খারাপ হয় তাহলে জাহাজ আর এগোনো যাবে না।”

“জাহাজ তো ঘোরানো যাবে না ক্যাপ্টেন। আগামীকাল পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। তার আগে পয়েন্ট নিমোতে আমাদের পৌঁছতেই হবে।”

***

জাহাজের মহিলা ক্রু তিনজন আগন্তুকের জন্য খাবার নিয়ে সাতাশ নম্বর কেবিনের দরজাতে গিয়ে ধাক্কা দিল। তারপর ল্যাচ ঘুরিয়ে দরজা ঠেলে প্রবেশ করল ভিতরে। তিনটে বিছানা দেওয়া হয়েছিল। মেঝেতে পেতে তাতেই শুয়ে মড়ার মতো ঘুমাচ্ছে ওরা।

মহিলাটি স্থানীয় অধিবাসী। তাই চিলিতে প্রচলিত স্প্যানিশ ভাষায় ও জানতে চাইল, “পো ফ্যাবর ডিসপিয়েরতা ইয় তোমা তু কোমিদা।”

অর্থাৎ, খাবার এসে গেছে, তোমরা উঠে পড়ো। লোকগুলো উঠে বসল। মহিলা ওদের খুঁটিয়ে লক্ষ করে জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের বাড়ি কোথায়?”

ওদের মধ্যে একজন ঢ্যাঙামতো লোক উত্তর দিল, “নোসোত্রাস ভিভিমোস এন তেমুকো।” মানে আমরা তেমুকোর বাসিন্দা। তেমুকো হল পুয়ের্তো মন্ট বন্দরের উত্তরে চিলির একটা ছোটো শহর।

মহিলার তবু সন্দেহ গেল না। সে মন্তব্য করল, “তোমাদের দেখে তো বাপু জেলে বলে মনে হয় না। কতদিন এসেছ এ-লাইনে?”

প্রশ্ন শুনে তিনজন নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে সেই লোকটাই আবার উত্তর দিল, “হেরমানা, তুমি একটু বসো, তোমার সঙ্গে কথা আছে।”

মহিলা চোখ বড়ো বড়ো করে জানতে চাইল, “কীসের কথা?”

“এ-জাহাজ কোথায় যাচ্ছে তুমি জানো?”

“জানি বইকি! কিন্তু তোমাদের বলব কেন?”

“আমি বলছি। তোমরা কোথায় যাচ্ছ তা আমি জানি।”

“কোথায়?”

“তিয়েরা দে মুরতোস!”

“মৃত্যুপুরী! কী বলছ তুমি?”

“হ্যাঁ, আমি ঠিকই বলছি। এ-জাহাজ যেখানে যাচ্ছে, সেখান থেকে কেউ ফেরে না।”

“তোমরা আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছ?”

“না, আমরা তোমাকে সত্যি কথা জানানোর চেষ্টা করছি। এখন তুমি মানবে কি না তোমার ব্যাপার।”

কিছুক্ষণ সবাই নিশ্চুপ হয়ে রইল। তারপর সেই আগন্তুক আবার চাপা গলায় জানাল, “আমি জাতে মেছুয়া হলেও ভবিষ্যৎ পড়তে জানি। এটা আমার পারিবারিক পেশা। দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি, এই জাহাজে কালাজাদুর সেই শয়তানটা আছে, যাকে আমাজনের জঙ্গল থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। তার নাম ডাজালমা পাকুয়েটা। ঠিক কি না বলো? কাল পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। একটা মেয়েকে ওরা বলি দেবে সমুদ্রের মাঝে। তারপর জেগে উঠবে সমুদ্র দৈত্য।”

মধ্যবয়স্ক মহিলাটা ততক্ষণে বসে পড়েছে মেঝেতে। ভয়ে চোখ-মুখ থমথমে হয়ে গেছে। এই জেলে তো ঠিক কথাই বলছে। তার মনেও যে সন্দেহ হয়নি তা নয়। কিন্তু সে-কথা কাউকে ভয়ে বলতে পারেনি। ওরা জানিয়েছিল, একটা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা হবে মহাসমুদ্রের মাঝখানে। তাহলে ওই মেয়েটাকে বন্দি করে নিয়ে যাচ্ছে কেন? সত্যিই কি ওকে বলি দেবে? আহা রে! মিষ্টি দেখতে মেয়েটাকে! কী সুন্দর কথা বলে ওর সঙ্গে। ওর নিজেরও মেয়ে আছে দুটো। আর সেই বিকট-দর্শন ডাজালমা পাকুয়েটাকেও দেখেছে। লাল টকটকে চোখ তার। শয়তানের মতোই চাহনি। যেন সবকিছু ভস্ম করে দেবে!

“কী ভাবছ, হেরমানা? এরা কোনও সায়েন্টিস্ট নয়, এরা হল ‘মাগিয়া নেগরা’, কালাজাদুর লোক।”

মহিলা ভাঙা গলায় জানাল, “আমার বাড়িতে ছোটো দুটো মেয়ে আছে। আমি এখন কী করব?”

“তুমি আমাদের সাহায্য করো, আমরা তোমাকে এখান থেকে ঠিক বাঁচিয়ে নিয়ে যাব।”

“তোমরা আমাকে বাঁচাবে! কী করে?”

“কাছে এসো বলছি।”

ঢ্যাঙা লোকটা তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে কিছু কথা বলল। মহিলাটি শুনে মাথা নেড়ে উঠে গেল সেখান থেকে। মহিলাকে ভয় পাওয়াতে পেরেছে ভেবে লোকটি মনে মনে খুশি হল।

রাত শেষ হতে আর কিছুক্ষণ বাকি। জাহাজের দুলুনি আগের থেকে অনেকটা বেড়েছে। ঈপ্সিতা নিজের কেবিনেই ঘুমিয়ে নিচ্ছিল। তবে দুশ্চিন্তার কারণে ঘুম তেমন আসছে না। হঠাৎ ঠকঠক করে আওয়াজ হল দরজায়। ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ল ঈপ্সিতা। “কে?” ভয়ার্ত গলায় হাঁক দিল।

“আমি সৌম্য।”

কিছুক্ষণের নীরবতা। দরজা ঠেলে ভিতরে এল একটি ছেলে। বেড ল্যাম্পের আলোয় যেন ভূত দেখছে ঈপ্সিতা। নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছে না। ছেলেটি আবার বলল, “চিনতে পারছিস? আমি সৌম্য।”

“তুই! তুই এখানে এলি কী করে?”

“সে অনেক কথা। পরে বলব। এখন তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে। আমি তোকে নিতে এসেছি।”

ঈপ্সিতা ভাবল সে স্বপ্ন দেখছে। বন্দিদশায় ঘোরের মধ্যে আছে অনেকদিন হয়ে গেল। তারপর সমুদ্রের এই দুলুনি। মনে হয় হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। সৌম্য এগিয়ে এসে তার কাঁধ ধরে নাড়া দিল, “হাঁ করে দেখছিস কী? চল, আমাদের এখুনি বেরোতে হবে।”

সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “কোথায় যাব?”

“তা আমি জানি না। লিও রয় জানে। দেবুদাও আমাদের জন্য বোটে অপেক্ষা করছে। এখুনি বেরিয়ে যেতে হবে এখান থেকে।”

ঈপ্সিতা তার পিঠের ব্যাগটা নিয়ে নিল। সৌম্য তার হাত ধরে কেবিন থেকে বের করে এনে দৌড় দিল জাহাজের পিছন দিকে। সেখানে ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল একটা ছোটো এমারজেন্সি বোট। প্রচণ্ড ঢেউয়ে সেটা যেন ছটফট করছে। সৌম্য আর ঈপ্সিতা কোনোরকমে লাফিয়ে উঠে পড়ল তাতে। কাছি খুলে দিতে সেটা বড়ো জাহাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্ধকার সমুদ্রের মাঝখানে হারিয়ে গেল।

ঝোড়ো হাওয়া বইছে জোরে। নাকে-মুখে ছিটকে আসছে সমুদ্রের ফেনা। বোটটা একবার ডুবে যাচ্ছে জলের মধ্যে, পরক্ষণেই লাফিয়ে উঠছে মাথায়। ক্যাপ্টেন চেঁচিয়ে বললেন, “সবাই লাইফ জ্যাকেট পরে বেল্টের সঙ্গে নিজেকে ভালো করে বেঁধে নাও। আমি সিগন্যাল পাঠিয়ে দিয়েছি। ঘণ্টা চারেকের মধ্যে রেসকিউ টিম এসে পড়বে। ততক্ষণ আমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।”

লাইফ জ্যাকেট পরে নিল সবাই। সৌম্য ঈপ্সিতার বেল্টটা ভালো করে বেঁধে দিয়ে চেঁচিয়ে পরিচয় করিয়ে দিল সবার সঙ্গে, “ইনি হলেন লিও রয়, আগে দীর্ঘদিন গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেছেন। আমেরিকার বসিন্দা হলেও ওঁর বাবা ছিলেন ভারতীয় বাঙালি বিজ্ঞানী। ঘটনাচক্রে জড়িয়ে পড়েছেন এই কেসে। শেষ মুহূর্তে ঈপ্সিতাকে বাঁচানোর জন্য এই ‘অপারেশন পয়েন্ট নিমো’ উনিই প্ল্যান করেছেন। ওঁর সঙ্গে সাহায্য করেছেন ডাজালমা পাকুয়েটা। ইনি অবশ্য ব্রাজিলের বাসিন্দা, লিও রয়ের পুরোনো বন্ধু।”

লিও চেঁচিয়ে বলল, “যিনি এই বোট চালাচ্ছেন, মি. পাকুয়েটা পেশায় জাহাজের প্রাক্তন ক্যাপ্টেন, কিন্তু ওঁর নেশা হল ব্ল্যাক ম্যাজিক। ওকে শেষ মুহূর্তে কক্সের টিমে প্ল্যান করে আমিই ঢুকিয়েছিলাম। সঙ্গে ও প্রচুর জড়িবুটি নিয়ে উঠেছিল জাহাজে। তার মধ্যে ছিল ঘুমের ওষুধ। জাহাজের সিকিউরিটি গার্ড-সমেত বেশিরভাগ লোক খাবারের সঙ্গে কড়া ঘুমের ওষুধ খেয়ে পাঁচ-ছ’ঘণ্টার জন্য ঘুমিয়ে পড়েছে। কালকে সকালের আগে ওদের ঘুম ভাঙবে না। আর একজন এই কাজে আমাদের সাহায্য করেছেন। জাহাজের ক্রু মেরি ভেলেন্সিয়া।”

সবার মুখের দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে ঈপ্সিতা জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু একটা ব্যাপার আমার মাথায় ঢুকছে না, তোরা চলন্ত জাহাজের মধ্যে এলি কী করে?”

সৌম্য দাঁত বের করে একগাল হেসে বলল, “সেটাও লিও-স্যারের কৃতিত্ব। মি. পাকুয়েটা একটা ট্র্যাকিং ডিভাইস নিয়েই জাহাজে উঠেছিলেন। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে জাহাজটাকে ট্র্যাক করা হচ্ছিল। লিও-স্যারের ভাড়া করা চাটার্ড প্লেনটা ইউ.এস. থেকে চিলি আসতে দু-দিন দেরি করেছে। চাটার্ড প্লেন আমাদের তিনজনকে সান্তিয়াগো থেকে নিয়ে এসে জাহাজের সামনে কিছুটা এগিয়ে সমুদ্রের মাঝখানে ছেড়ে দেয়। আমরা একটা রবার বোটে করে ভাসতে থাকি। মাঝসমুদ্রে বিপদে পড়া যে-কোনো মানুষকে সাহায্য করা ক্যাপ্টেনদের নৈতিক কর্তব্য। ওঁরাই আমাদের জাহাজে তুলে নেন।”

“বাপ রে! আমার জন্য তোরা এত রিস্ক নিয়েছিস? মি. রয়কে অনেক ধন্যবাদ।” ঈপ্সিতার কথা শেষ হওয়ার আগেই একরাশ নোনা জল উড়ে এসে আপাতমস্তক ভিজিয়ে দিল ওদের।

আবার কলকাতা

চার মাস কেটে গেছে সেই ঘটনার পর। একদিন সন্ধ্যায় ঈপ্সিতার জন্মদিনে ওদের নন্দনপুরের বাড়ির ছাদে জড়ো হয়েছে অনেকে। একজন মোটাসোটা স্যুট পরা লোক হাতে একটা বিশাল বড়ো ফুলের বোকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলেন গটমট করে। ইপ্সিতার কাছে এসে তার হাতে বোকে-টা দিয়ে তিনি বললেন, “হ্যাপি বার্থডে টু ইউ ঈপ্সিতা! জন্মদিনের অনেক শুভেচ্ছা তোমাকে।”

“আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না?”

ঈপ্সিতা প্রশ্নটা করে সৌম্যর দিকে তাকাল। সেও মাথা নাড়ল ভদ্রলোককে দেখে।

“হে হে… চিনতে পারলে না তো? ভাবছ বিনা নিমন্ত্রণে এসে পড়েছি। না, আমি এসেছি জেমস বন্ডের নির্দেশে। মানে লিও রয় পাঠিয়েছেন আমাকে, এই বিশাল বড়ো ফুলের বোকে-সহ শুভেচ্ছা জানানোর জন্য।”

সৌম্য উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, “আচ্ছা! তাহলে আপনিই সেই প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর মি. অঞ্জন পাত্র?”

“ইয়েস স্যার! আমি লিওবাবুকে না জানালে উনি কিন্তু আপনাকে উদ্ধার করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তেন না।”

“আচ্ছা, সেই জাহাজটা, মানে এক্সপ্লোরার অ্যাভেঞ্জার, সেটাকে পরে আর খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল?”

“না, ভাইটি। সেই জাহাজটিও অদ্ভুতভাবে পুরো ভ্যানিশ হয়ে গেল। জাপান, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া সার্চ টিম পাঠিয়েছিল খোঁজার জন্য। কিন্তু জলের উপরে বা মহাসমুদ্রের নীচে, কোথাও কোনও চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। মনে হয় জোসেফ লিয়ন্স তাঁর মেয়েকে খুঁজে পেয়েছেন প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে গিয়ে।”

ঈপ্সিতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “জোসেফ লিয়ন্সও ওই জাহাজে ছিলেন?”

“হ্যাঁ, ছিলেন তো! জেকব কক্স আর জোসেফ লিয়ন্স— দুজনেই ওই জাহাজের সঙ্গে চিরকালের মতো পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছেন। দুজন দুজনের ব্যাবসার কম্পিটিটর হলেও শেষ মুহূর্তে ওঁরা হাত মিলিয়েছিলেন। প্রথমজন খুঁজছিলেন নিজের মেয়েকে, আর দ্বিতীয়জনের উদ্দেশ্য ছিল নতুন কিছু আবিষ্কার করে বিজ্ঞানের জগতে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করা। তবে দুজনের রাস্তাই ছিল এক। সেজন্যই জোসেফ লিয়ন্স ডায়েরির দ্বিতীয় পার্ট খোঁজার জন্য লিও রয়কে পাঠিয়েছিলেন ভারতে।”

কথাটা শুনে ঈপ্সিতা আর সৌম্য দুজনের মুখই হাঁ হয়ে গেল। 

জয়ঢাক প্রকাশন থেকে প্রকাশিত পুষ্পেন মণ্ডলের দুটি থ্রিলার-

adokakamike

Leave a Reply