আগের পর্ব- ব্যাঙ ও লাওস, নেপালি বাদুর, ইথিওপিয়ার সিংহ, পাহাড়িয়া খাবারদাবার, সাদা চামড়ার লেহ্যপেয় , পাশের বাড়ি বাংলাদেশ, পিকনিক, তাজিকিস্তানে তাজ্জব, থমকে চমকে থাইল্যান্ড, কঙ্গোয় কয় দিন, সিয়েরা লিওনের পাতাখোর, আম আদমির মালাওয়ি
শিলিগুড়ি পেরোলেই বাতাসে ম্যাগি মশলা, শুয়োরের মাংস আর মোমোর পুর-সেদ্ধ জলের এমন একটা মিলিমিশি গন্ধ হয় যেটা একেবারে মনটাকে হু হু করে তোলে। প্রতিটা মোড়ে ছোটো ছোটো দোকানে যে ওয়াই ওয়াই খেতে দাঁড়িয়ে পড়ি, বাড়িতে সেটা খেলেই অবশ্য অম্বুলে ভাব হতে থাকে গলার কাছে। ওখানে কিন্তু দিব্যি হজম। সে পাথুরে জল না পাহাড়ি হাওয়া না রাস্তার মোহময় বাঁকের গুণ, কে জানে। আমার এক দক্ষিণী বন্ধু আমাকে ম্যাগিতে হলদিরামের ঝুরিভাজা ছড়িয়ে খেতে শিখিয়েছিল। সে ভারি চমৎকার, কিন্তু তা ওই পাহাড়ি নুডলসের তুলনায় কিছুই নয়। পাহাড়ি রাস্তায় ওই এক প্লেট প্যাঁচানো ওয়াই-ওয়াইয়ে আমরা সাদাটে পোল্ট্রির ডিমের ঝুরো ভাজা ছড়িয়ে দিয়ে মাঙ্কি ক্যাপ থেকে নাক ডুবিয়ে পাহাড়ের গন্ধ নিই। তাতেই আধখানা পাহাড় ভ্রমণ সারা।
পাহাড়ি পথে যেতে যেতে এমনিতেই ঘুরপাক লাগে। আমার অবশ্য কোনোদিনই গা গোলায় না, তাই কখনও সঙ্গী-সঙ্গিনীরা বমিকাতর হয়ে পড়লেও আমি কাতরাই না, দিব্যি সোজা হয়ে আহারে মন দিই। সামনে একটুখানি দোকান, তার পিছনে ঘরকন্না। আড়াল করতে একখানি পর্দা, অনেক দোকানই এমনি। সরু চোখের একরত্তি ছেলেটি মায়ের আঁচল ধরে দঁড়িয়ে অবাক হয়ে মোটা গোঁফের বাঙালি দেখে। একটু পিছন দিকে হাত ধুতে গেলে দেখা যায় একচিলতে জায়গায় শসা আর বরবটি। কার্নিশে লাল ফুল। যেহেতু নদী নেমেছে পাহাড়কে কেটে কেটে, সেই পথ ধরে মানুষ বানিয়েছে পিচ রাস্তা, আর তার ধারে গড়ে ওঠা একটু একটু বাড়িঘর। তাই দোকানের পিছনে সিঁড়ি নীচে নেমে হিসি করতে গেলে পাহাড়ি এক জলধারার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবেই। নীচে নেমে না গেলেও, হয়তো বাথরুমের এত বড়ো জানালার পাড়ে রাখা একটা দুটো পাহাড়ি ফুলের ছোট্ট টবের ও-পারে শোনা যাবে তার দূরে চলে যাওয়ার আওয়াজ।
ওই বাড়ির বাগানের শসাটিই হয়তো আসবে আমার পাতে। একটু মোটাসোটা। বড়ো বড়ো বিচি। নেপালের আশেপাশে হলে সঙ্গে বাদাম আর তিলের চাটনি। কখনও তাতে টমেটোর আভাস। আর উত্তরাখণ্ডে গেলে ভাং কি চাটনি। তা সে নিছকই নিরীহ। ভাং পাতার নেশা নেই এতে; কেবল বীজ, তাতে ধনেপাতা, জিরে, লংকা নুন দিয়ে বাটা। নেশা অবশ্য হয় নামেই। রুটি, তড়কা, মুলোর সঙ্গে এক-দু’আঙুল ভাং-এর চাটনি চেটেই প্রবল সন্দেহবাতিক আমার এক সহকর্মী নেশা হয়ে গেছে নেশা হয়ে গেছে বলে প্রবল আর্ত চিৎকার শুরু করেছিল! কখনো-কখনো কোথাও মুরগির ঝোল পাওয়া যায়, ছালওয়ালা। মাঝে পেতাম শুধু নিঃস্বাদ ব্রয়লার। দিনে দিনে ব্রয়লারের পাশাপাশি এখন দেশি মুরগিও পাওয়া যায় ডবল দামে। পূর্বদিকে আরও সরে এলে ওই নদীটির মাছ পাওয়া যাবে ভাজা, শুকনো নানা ফর্মে।
এবারে নেপালে জুমলা যাওয়ার পথে দুপুরে খেতে নেমেছি এক পথিপার্শ্বস্থ দোকানে। বড়ো দোকান নয়। মাটিতে নিকানো কাঠের জ্বালের উনুন। মেটে রঙের উপরে কাঠের ধোঁয়ার ছোপ। এখনও তার গন্ধ ঘুরে বেড়াচ্ছে দোকানময়।

বেলেমাছের মতো দেখতে কাঁচা মাছ কেটে ধুয়ে রাখা ঝুড়িতে, জল ঝরছে। গৃহকর্ত্রী বাঁশের সরু লম্বা লম্বা কাঠিতে মাছ গেঁথে গেঁথে রাখছেন। উনুনের উপরে সারিবদ্ধভাবে কাঠিবিদ্ধ মাছ তাপ ও ধোঁয়ায় গা সেঁকে নিচ্ছে আদা-পিঁয়াজ-রসুন-ধনেপাতার হালকা ঝোলে যাওয়ার জন্য। মাছ, মাংস দুইই চমৎকার হালকা; তাতে মাছ ও মাংসের নিজস্ব গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে। রাইশাক সর্ষের জাতভাই। রাইশাক ভাজাও এক অনবদ্য ব্যাপার। ডাল সাধারণত মিশ্রডাল হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে বেশে মেঠো ও স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে ভীষণ চা-পান চাপল।
বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ ঝাঁকানি-লাঞ্ছিত হয়ে যে-দোকানে থামলাম, সেখানে চা পাওয়া যায়। একধরনের ভেষজ চা, বেশ ভালো খেতে। নানা মশলা, তাতে দারচিনিও আছে। সকলে খেলেও বাঙালির মাথায় দুধ-চায়ের ভূত চাপল। দোকান-মালকিন নেপালি ভাষায় ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয় পাওয়া যাবে’ বলে উদাস হয়ে আমাদের হাতে দোকান তুলে দিয়ে কোথায় যেন চলে গেল। আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোমরের ব্যায়াম করতে করতে যখন হাঁপিয়ে উঠেছি, তখন দেখলাম তিনি দুধের বোতল হাতে আসছেন।
রহস্য বোঝা গেল। মাঠে তাঁর মোষ চরতে গেছিল, তাকে ধরে দুধ দুইয়ে তিনি ফিরলেন। সেই দুধে চা হল। স্বাদ কেমন ছিল তা মনে নেই, কিন্তু সেই মহিলার আন্তরিকতা, ঠিক সময়মতো তাঁর মোষের দুধ দিতে রাজি হয়ে যাওয়া এবং সেই দুধের চা— এইসব ভেবেই আমার শরীর চাঙ্গা হয়ে গিয়েছিল। এই চা-পানের এক ঘণ্টা দেরির খেসারত আমাদের অবশ্য দিতে হয়েছিল অন্যভাবে। রাত হয়ে যাওয়ায় নেপালি পুলিশ আটকে দিয়েছিলেন ‘রাস্তা খারাপ, যাওয়া যাবে না’ বলে। বহুকষ্টে নগরপালিকার নেতা-কর্তাদের ধরে, নিজেদের দায়িত্বে খারাপ রাস্তায় চলার মুচলেকা দিয়ে, রাত্রি সাড়ে এগারোটায় দুর্গম পথে আমরা রাত্রি-আবাসে এসে পৌঁছলাম। মালিক তখনও রুটি, ডাল আর আধমরা ডিমভাজা নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
নেপালে জুমলা যাওয়ার পথেই ব্রেকফাস্টে খেলাম চাল দিয়ে তৈরি রিং-এর মতো ভাজা রুটি। ভারি হালকা মিষ্টি, সেল রুটি। তার সঙ্গে ঝোলের ধোঁয়াওঠা গরম ঘুগনি। মটর আর তার সঙ্গে অন্য কয়েকটা ডাল। আর একটা ডিমসেদ্ধ। নেপালি কমবয়সিদের মধ্যে অবশ্য সকাল-সকালই ওয়াই ওয়াই খাওয়ার চল আছে দেখলাম। সন্ধ্যাবেলায় ওই ওয়াই-ওয়াইটাই কাঁচা, নুন মশলা পেঁয়াজ ছড়িয়ে ঘটিগরম টাইপের করে কুড়মুড় করে খেতে দেখলাম।

ভারতের পাহাড়ে সেটাই হয়ে যায় গরম হাতরুটি, ফুটতে থাকা ডেকচি থেকে আধা তৈরি ডাল, মুলো, পেঁয়াজ, কখনও একটু ডিমভাজা। পাহাড়ি রাস্তায় লম্বা সময় লাগে বলে অনেক সময়ই ভোরে বেরোতে হয়, তাই ব্রেকফাস্টের সময় গরম টাটকা খাবারের মজাই আলাদা। মধ্য এশিয়াতেও চয় (চা), মুরগির রোস্ট, পাউরুটি এবং মাছি সহযোগে প্রাতরাশের কথা তো আগে কোথাও লিখেছি।
পাহাড়ি গ্রামে দুর্গমতা অনেক সময় নানা সুযোগের জন্ম দেয়। যেহেতু বাজার যেতে হলে মাথায় করে সামগ্রী বয়ে নিয়ে যেতে আসতে হয়, পাহাড়িরা চেষ্টা করেন যথাসম্ভব স্বাবলম্বী থাকার। ফলে নানারকম স্থানীয় শাকসবজি ফলের কথা তারা জানেন, ব্যবহার করেন তাঁদের রান্নায়। আমি একসময় উত্তরাখণ্ডের বেশ কিছু পাহাড়ি গ্রামের জন্য ছোটো ছোটো গ্রাইন্ডিং মেশিন জোগাড় করেছিলাম, যাতে মশলা কেনার জন্য বাজার নির্ভর না থাকতে হয়, কেউ কেউ চাইলে এটাকে ব্যাবসা হিসেবেও দেখতে পারেন। সমতল এলাকায় এ-জিনিস নিয়ে অনেক ভুগতে হয়েছে। কিন্তু পাহাড়ে তাঁরা দিব্যি চালাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, নতুন নতুন মশলাও বানিয়ে নিচ্ছেন। যেমন রসুন পাতা, পেঁয়াজ পাতা, কাঁচা লংকা— এইসবকে শুকিয়ে গুঁড়ো করে একজন বানিয়েছিলেন চমৎকার স্যুপের গুঁড়ো। আমরা বাড়িতে অনেকদিন খেয়েছি। খাবারে, পানীয়তে নানারকম পাতা খাওয়ার চল আছে। এদের অনেককেই আমরা আগাছা বলি, যদিও আগাছা বলে আসলে কিছুই নেই। সবই কাজে লাগে— হয় মানুষের, নয় অন্য কারও। তবে বদলাতে দেখছি সবই গত বিশ বছরে। যেমন এসেছে প্যাকেট-বন্দি মশলা, চটজলদি চিপস, পাহাড়ি পথে পথে বিস্কুটের প্যাকেট, সিগারেট-বিড়ির র্যাপার— সভ্যতার অপ্রতিহত পায়ের ছাপ।
উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে বছরের বেশ খানিকটা সময় জমে এমন ঠান্ডা হয়ে থাকে যে টাটকা ফসল পাওয়াও মুশকিল। সেখানে এই শুকিয়ে নেওয়া বা তেলে-নুনে জারিয়ে রাখার চল বেশ কাজে আসে। উঁচু জায়গায় আর্দ্রতা কম হওয়ায় তারা টেকেও বেশিদিন। তাজিকিস্তানের গ্রামে গোরুর চর্বিতে গোরুর মাংস নুন দিয়ে ফুটিয়ে ফুটিয়ে নরম করে রাখা হয়। তারপর ঠান্ডায় এমনিতেই উপরে চর্বির স্তর জমে একেবারে সিল। নষ্ট হওয়ার কোনও ব্যাপার নেই। নেপালে অবশ্য এমনই মোষ বা ছাগলের মাংস শুকিয়ে রাখার চল আছে উঁচু অঞ্চলে, স্থানীয় ভাষায় যাকে সুকুটি বলা হয়। পরে হয় তাকে জল দিয়ে স্যুপ আকারে খাওয়া হয়, বা মশলা দিয়ে ভেজে। তবে ছোটবেলায় নিয়মিত দাঁতের যত্ন না নিলে এই বয়সে সুকুটি খাওয়ার চেষ্টায় দন্তপ্রদাহের প্রবল সম্ভাবনা থেকেই যায়। দইকে নুন দিয়ে শুকিয়ে গোল্লা পাকিয়ে রাখার চল রয়েছে তাজিকিস্তানে, তারপর তাকে জলে গুলে লেইয়ের মতো করে নিয়ে রুটিতে মাখিয়ে খাওয়া। কিরঘিজিস্তানে এভাবে ফল, মূলত আপেল শুকিয়ে রাখা হয়। অনবদ্য খেতে। শুকনো আপেল অবশ্য আমাদের দেশে বা নেপালেও খেয়েছি। শীতের সময় অনেক উপরে গেলে এইসবই ভরসা।
কাজের প্রয়োজনে আমি বীজ, চাষ ব্যবস্থা এসব দেখতে বুঝতে গ্রামে গ্রামে ঘুরি। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে খাবারের গল্প চলেই আসে। হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে এরকম এক পাহাড়ে উঠে এক চাষিবাড়ির দাওয়ায় বসি। নীচে দেখছি আপেলের ফুল আসব আসব করছে। নাসপাতির ফুল এসে গেছে। প্লামের ফুল আসছে। সাদা, গোলাপি হয়ে আছে জায়গায় জায়গায়। দূরে একটা পাহাড়ের একটা দিক কালো। কিছুদিন আগে সেখানে দাবানলে পাহাড়ের জঙ্গল পুড়ে গেছে। নীচে নদী বয়ে যাচ্ছে নেচে নেচে। আওয়াজ নেই, কিন্তু তার আওয়াজ যেন আমি শুনতে পাচ্ছি— ছোটো ছোটো ঝাঁপে পাথর পেরিয়ে যাওয়ার শব্দ। ভাষার সমস্যা রয়েছে। এতদিন ধরে যাচ্ছি বলে ধীরে ধীরে নেপালি বললে কিছুটা বুঝি। কিন্তু সব উচ্চারণ, শব্দ বুঝি না। জানতে চাইলাম, আজ কী রান্না হল, কী কী নিজের জমি থেকেই এল? অনেক কিছু বলার পর বুঝলাম, এর স্থানীয় নাম বোঝা আমার পক্ষে দুষ্কর। বললাম, রান্নাঘরে কী কী ডাল রাখা আছে আনতে পারেন কি না, যাতে অন্তত বীজ দেখে বুঝতে পারি কী। ডাল এল— পাঁচ রকমের বিনস, নানা রঙের। তারপর আসতেই থাকল। আলু ঝুরি ঝুরি করে কেটে শুকিয়ে রাখা। একরকম দেশি গোল গোল মুলো চাকা চাকা করে কেটে শুকিয়ে রাখা। অন্তত তিন-চাররকম শাক শুকনো। জঙ্গলের মাশুরুম শুকনো করে রাখা। আসন্ন শীতকালের জন্য তাঁরা পুরোপুরি প্রস্তুত। এর থেকে অনেক কিছু অবশ্য তাঁরা এখনও খান। খাদ্য বৈচিত্র্য নিয়ে তাঁদের জ্ঞানের ভাঁড়ার এমনই পূর্ণ, যে তার থেকে কিছু ধার নিয়ে এলাম আমিও।

পাহাড়ের মানুষ যেমন টানাটানিতে থাকেন, কষ্টের মধ্যে থাকেন, তেমনই তাঁদের প্রাচুর্যও দেখার মতো। শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসে পাহাড়ের মাথায় এই মহিলাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে, তাদের খাবার নিয়ে খবর নিতে গিয়ে, গল্প শুনতে গিয়ে। কখন কোথায় কোন শাক, মূল, কন্দ তাঁদের ভাঁড়ারে এসে ঢোকে। কখন অভাব। কখন আরাম। পাত পেড়ে দুটি খেয়ে যাওয়ার কথা বলতে তাঁরা কখনও ভোলেন না।
সাধারণ হোটেলে মাছের দাম মাংসের থেকে বেশি। কারণ, মাছ ধরা বেশ শ্রমসাধ্য ব্যাপার। মাছ ভাজার ব্যাপার নেই। নদীর ছোটো মাছ রসুন-ধনেপাতা দিয়ে ঝোল। মুরগির মাংসে মশলা আর একটু বেশি। আলু-বিনস ভাজা। রাইশাক সাঁতলানো। নানারকম ডাল একটু ভেঙে মিশিয়ে রাঁধা। রসুনের ফোড়ন। তিল, টমেটো একসঙ্গে বাটা। এমন একটা মেনু খেয়ে একরকম প্রশান্তি আসে যা ঠিক রেস্তোরাঁয় খাওয়ার মতো চড়া উল্লাসের নয়। রয়েছে ঢিডো-বাকলা দিয়ে বানানো একরকম পরিজ। গুন্ড্রুক একরকম পচানো শাক— সাইড ডিশের মতো, মাঝে মাঝে টাকরায় লাগিয়ে খাওয়া যায়। কোনো-কোনো পাহাড়ের মশলা ভারি চমৎকার। নেপালের জুমলায় যেমন গোলমরিচ, সেজওয়ান, মশলা চা। লাল রঙের জুমলা চাল— গোল গোল, মোটা দানা। চৌকো চত্বরটায় দাঁড়িয়ে সকালের রোদে পিঠ দিয়ে চা খেতে দাঁড়ালে চিনি দিতে কার্পণ্য করবেন না কেউ।
স্থানীয় বাজার না দেখলে বা শুঁড়িখানায় না গেলে কোনও দেশকে একেবারে হৃদয়ে হাত দিয়ে চেনা যায় না। মধ্য এশিয়ার পাহাড়ি জায়গায় শুঁড়িখানায় যাওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার, সবই লুকিয়ে চুরিয়ে। কারণ, কিছুটা ধর্মের বাধাও বটে, তবে ঘরে বসে ঢকঢক করে আরক খাওয়ার মতো মদ্যপান না করলে লোকেরা অসন্তুষ্ট হন। এই অসন্তুষ্ট না করার তাগিদে কতবার যে উন্মত্ত হওয়ার ঠিক আগের মত্ত অবস্থায় টলতে টলতে হোঁচট খেতে খেতে ফিরেছি, সে আর বলার নয়। দিশি দারুর স্বাদও বেশ ভারী হয়, তীব্র হয়। যেমন নেপালের টোংবা বা রাক্সি। রাক্সি ভাত বা ছোটো দানাশস্য কোদো দিয়ে তৈরি, স্বচ্ছ। কিন্তু গলা দিয়ে নামবে জ্বলতে জ্বলতে। তার সঙ্গে চাট হিসেবে থাকবে শুকনো সেকুয়া।
সুরার থেকে চাটে লোভ আমার বরাবরই বেশি। একেবারে বরাভয়ে বরাহ, মোষ, ছাগল নির্বিবাদে পেটে চালান করতে পারি। এইরকম এক শুঁড়িখানার আড্ডায় দেখা পেলাম বুটান-এর। ছাগলের ক্ষুদ্রান্ত্র পরিষ্কার করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে ভাজা। সেই নাড়িভুঁড়ি টুথপিক দিয়ে টুকটুক করে খেতে হবে। সঙ্গে সয়াবিন ভাজা, সে এক রামশক্ত কটকটে ব্যাপার। এর সঙ্গে সঙ্গী হয়ে আসতে পারে চিঁড়েও। বুটান, সেকুয়া ছাড়াও খাওয়া যায় কান-গিডি-জিব্রো ভাজা। কান একটু কচকচে, গিডি অর্থাৎ ঘিলুর তো জবাব নেই, আর তার সঙ্গে জিব্রো অর্থাৎ জিভের মাংসল স্বাদ। এই ত্র্যহস্পর্শের জুড়ি মেলা ভার। সিকিমে ট্রেকিংয়ের পথে পোর্টারদের রাঁধা মুরগির ছালভাজা মুরগির মাংসের থেকে ঢের ভালো খেতে। সেইবারই ইয়াকের গোঠে রাখালদের আশ্রয়ে রাত্রিবাসের সময় তাদের রাঁধা নুডলস, মশলা, চাল-ডালের খিচুড়ির স্বাদ মনে নেই বটে, কিন্তু উষ্ণতাটি মনে আছে আজও। এ-কথাও লিখেছি অন্যত্র।
পাহাড়ি রাস্তায় যতই প্যাঁচ থাক, পাহাড়ের প্যাঁচে প্যাঁচে রস, একবারে জিলিপির মতো। চলনে প্যাঁচ থাকলেও চাল তার দিব্যি সহজ। পাহাড়ের এই সহজ সরল চালটিই আমি মানুষের মধ্যে, খাবারের মধ্যে খুঁজে পাই, আর একরকম আরামে আমার চোখ ভিজে আসে।
