আগের পর্ব- ব্যাঙ ও লাওস, নেপালি বাদুর, ইথিওপিয়ার সিংহ, পাহাড়িয়া খাবারদাবার, সাদা চামড়ার লেহ্যপেয় , পাশের বাড়ি বাংলাদেশ, পিকনিক, তাজিকিস্তানে তাজ্জব, থমকে চমকে থাইল্যান্ড
বঙ্গ ছেড়ে এবার কঙ্গো হানা। কঙ্গো বললেই অরণ্যদেবের কথা মনে পড়ে। আর সকালবেলা একবার অরণ্যদেবকে মনে পড়লেই তার বিয়েতে কী রকম খাওয়া দাওয়া হয়েছিল সেকথা একবার মনে পড়বেই। আফ্রিকা আমাকে সব সময় হিড় হিড় করে টানে। তবে কঙ্গো যেতে হবে শুনেই সবাই হাঁ হাঁ করে উঠল – ‘খবরদার না’, ‘ওখানে ম্যালেরিয়া’, ‘বৃষ্টির মত বোমা পড়ছে’, ‘অখাদ্য কুখাদ্য খায়!’
কুছ পরোয়া নেই। ডাক যখন এসেছে যেতেই হবে – সে শুধু চাষবাস শেখা আর লেখাপড়া কোদাল চালানোর অফিশিয়াল ডাকে নয় – নিছক চাকার টানে। চাকার যে কী টান – যে অজানা রাস্তায় চাকায় চড়ে না বসেছে সে বোঝে কী করে। সেই টানের কাছে মশা কোন ছাড়, টেরোডাক্টিলেও আপত্তি নেই।
ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো আফ্রিকা মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। ৯০০০০ বছর আগে মানুষ এখানে বাস করা শুরু করে, তারপর বান্টু উপজাতির দখল, তারপর কঙ্গোর নানা কোণে কোণে নানা রাজা, বেলজিয়ামের উপনিবেশ এইসব পেরিয়ে ১৯৬০ সালে স্বাধীনতা পাওয়ার পরেই পাঁচ বছর ধরে আভ্যন্তরীণ যুদ্ধ চলে। সাদায়-কালোয়, কালো মানুষদের নানা উপজাতিদের মধ্যে – এ লড়াই ঠান্ডা যুদ্ধের ফল হিসেবেও মনে করেন ঐতিহাসিকরা। আমেরিকা ও রাশিয়া একে ওকে সাহায্য করতে থাকে। বিপাকে পড়ে জাতি সঙ্ঘ শান্তি বাহিনী পাঠায়। এই এতদিনে তা সরিয়ে নেওয়ার কথা হচ্ছে। মাঝখানে একবার দেশের নাম বদল হয়ে ‘জাইরে’ হয়ে যায়। ১৯৯৬-৯৭ সালে একদফা যুদ্ধের পর আবার ১৯৯৮-২০০৩ – গ্রেট আফ্রিকান ওয়ার। কাগজে কলমে মারা যায় ৫৪ লক্ষ লোক। সেই ঝুট ঝামেলা এখনও চলেছে। ৯টা দেশের প্রায় ২৫টা সশস্ত্র গোষ্ঠী এই ঝামেলায় জড়িয়ে। আজে এখানে বোমা, কাল ওখানে আগুন! পাশাপাশি দেশগুলিও নানাভাবে মদত দিয়ে চলেছে এই দ্বন্দ্বে। দু’কোটির উপর লোক হরদম এখান থেকে ওখান ঘুরে বেড়াচ্ছেন উদ্বাস্তুর মত। শরণার্থী শিবিরে দেশ ভর্তি। টিন, টাংস্টেন, টাটালাম, সোনা – এই চারটে খনিজ পদার্থে দেশটা উপচে পড়ছে। সেটাও আসলে এই চমৎকার দেশে হরবখত ঝামেলা জিইয়ে রাখার একটা কারণ – যাতে এই গোলমালের সুযোগে খনিজ পদার্থের উপর দখলদারিত্ব টিঁকে থাকে।
দেশটা আর ভর্তি বিশাল বড়ো বড়ো হ্রদে। সেগুলো সব আগ্নেয় পাহাড়ের উপত্যকায় – ফলে অনেক গভীর। সেখানে মাছ তেমন পাওয়া যায় না। নেমেছি গোমা শহরে। তার এয়ারপোর্টের গায়ে জ্যান্ত আগ্নেয়গিরি। মাঝে মাঝেই নাকই ভুস ভুস করে ধোঁয়া ওঠে, ভূমিকম্প হয়। আর পাঁচটা গরিব দেশের মতই রাস্তার ধারে সব্জির দোকান। অনেক পুরোনো বড়ো বড়ো গাড়ির গায়ে তেল রং দিয়ে নানা ছবি আঁকা। ওটাই লোকাল ট্যাক্সি। রিসাইকেল্ড জামাকাপড়ের পসরা। পাথরে কোঁদা মানুষজন। পরিশ্রমী। আমার বন্ধুরা বার বার সাবধান করছেন – ‘জানলার কাচ তুলে রাখো, ক্যামেরা বার করবে না।’
নতুন দেশে আমার অসীম কৌতূহল। গলা বাড়িয়ে বাড়িয়ে দেখি। পাশ দিয়ে একপায়ে চালিয়ে ছেলে বুড়োরা সাঁ সাঁ করে চালিয়ে যাচ্ছে সুকুডু। কাঠের তৈরি একটা দু’চাকা পায়ে ঠেলা গাড়ি। মাল বওয়া, এখান সেখান যাওয়ার নিখরচার যান।
গোমাতে রাত্রিবাস রোয়ান্ডার বর্ডারে – যাতে ইভ্যাকুয়েশনের প্রয়োজন হলে টুক করে এক লাফে রোয়ান্ডা ঢুকে যাওয়া যায়। গোমার গায়ে যে লেকটা তার একটু খানিক কঙ্গোয়, বাকি সবটাই রোয়ান্ডায়। ইয়োরোপিয়ানরা অনেকেই রবিবার রবিবার রোয়ান্ডার পাহাড়ে চড়তে যান, সকালে এদেশ থেকে ওদেশে মর্নিং ওয়াকে যান।
যেহেতু প্রায় সন্ধ্যায় নেমেছি, শহরটা ভালো করে বুঝিনি। বুঝলাম পরদিন সকালে। আমাদের বেরোনোর কথা সকাল এগারোটায়। যাওয়ার কথা একটি শরণার্থী শিবিরে, সেখানে কোনও ভাবে অস্থায়ী চাষবাস করা যায় কিনা দেখতে। ফোন এল সাড়ে আটটায়। সরকার থেকে খবর পাওয়া গেছে ‘রেবেল’রা শিবিরের আশে পাশে বোমা মারবেন সকাল এগারোটায় – আমাদের তার মধ্যে কাজ সেরে ফিরে আসতে হবে। পড়িমরি করে ছোটা হল। বলে কয়ে বোমা মারার অভিজ্ঞতা প্রথম – আরও প্রথম, কোনও একটা প্রায় ৭০ বছর ধরে চলতে থাকা অস্থির দেশের একটা শরণার্থী শিবিরে যাওয়া। সত্তর বছর ধরে চলছে বলেই হয়ত কয়েকশো লোকের মৃত্যু আর বোমা পড়া এখানে গা সওয়া হয়ে গেছে – স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
অতি সুন্দর দেশ। একপাশে হ্রদ। আর একপাশে বড়ো বড়ো রাজপ্রাসাদের মত দৃষ্টিকটু বাড়ি। শহর ছাড়িয়ে দু’পাশে সবুজ, টিলার মত পাহাড়। তারপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ল সাদা সাদা ঢেউ। ঢেউ-এর মত সাদা সাদা প্লাস্টিকের বাড়ি, প্লাস্টিকের থলির থেকে একটু বড়ো। উদ্বাস্তুদের থাকার জায়গা। গরমে-বর্ষায়-শীতে কী হয় আমি জানি না। উঁচু নীচু জমি – জল, আবর্জনা, প্লাস্টিকের উপর গড়াগড়ি খেয়ে খেলতে থাকা কিছু শিশু, এত ঘন ঘন থাকা মানুষের ভিড় – বৃষ্টি এলে কী হয়! আমাদের ঘিরে ধরেছে মানুষ। এরকম রিলিফের গাড়ি, জল-ওষুধের গাড়ি – এ সব দেখে তারা অভ্যস্ত। ফিরে আসতে আসতে শহরের বাড়িগুলো আরও দৃষ্টিকটু লাগতে থাকল। শুনলাম এরা পয়সা জমিয়েছেন খনিজ পদার্থ থেকে। শুনলাম এই মুহূর্তে প্রায় বাহাত্তর লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া। ৭২০০০০০। গোটা পৃথিবীর কাছে এই শূন্যগুলোর কোনও মানে আছে কিনা ভাবতে থাকি। ওরই মাঝখানে কোনও বেসরকারি সংস্থা ইস্কুল চালাচ্ছে। কেউ ব্যবস্থা করেছে জলের। কেউ ওষুধপত্র। কেউ টয়লেট – সেখানে জল নেই। শুকনো। কাঠকয়লা দিয়ে কেউ বানাচ্ছেন রান্নার জন্য জ্বালানি – বিক্রি করে রোজগার হবে কিছু। স্যানিটরি প্যাড। আমাদের দেখে হৈ হৈ করে গান ধরেন কাজ করতে থাকা মহিলারা। তালে তালে তালি দিয়ে। এইরকম সময়ে, এইরকম জায়গায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে গান গেয়ে উঠতে পারেন কেবল আফ্রিকা উপমহাদেশের লোকেরাই। ওদিকে তাড়া আসে – এবার বোমা পড়ার সময় এগিয়ে এল।
আজ আমাদের একজন সহকর্মী চলে যাবেন – তার কাজের দিন ফুরিয়েছে। তাই তিনি খাওয়াবেন। এই সব কিছুর মধ্যেই বিরস বদনে খেতে আসি। শর্করা জাতীয় খাবার, মাছ-মাংস আর বিন্স্–এই হল কঙ্গোলিজদের মূল খাদ্য। তার নানা ধরণ। এবং এক এক জনের খাবারের পরিমাণ যে কতটা হতে পারে– এ নিয়ে আমার কোনও ধারণাই ছিল না বোঝা গেল।

প্রথম দুপুরেই অফিসে পেলাম – পালং শাকের ভাজা আর ঘণ্টের মাঝামাঝি একটা জিনিস, তেলাপিয়া মাছ ভাজা, মুরগির মাংস ভাজা, ছাগলের মাংসর রসা রসা মত একটা কিছু, প্রচুর কাঁচা বাঁধাকপি অ্যান্ড গাজরের স্যালাড। সঙ্গে গলা ভেজানোর জন্য গাজরের আর কমলা লেবুর শরবত।
পরদিন যেতে হবে উত্তরের এক শহরে। গাড়ি করে যাওয়া যায় না? নাঃ। যেতে নাকি দু’দিন লেগে যাবে। প্লেনে গেলে একঘণ্টা! আমরা যাব বুনিয়া। মাঝখানে প্লেন একবার বেনিতে থামবে। সেখান থেকে কিছু লোক উঠবেন।
সেদিন সকাল থেকে শুরু হল কঙ্গোর আসল অভিজ্ঞতা। দেশের নানা জায়গার ছোটখাটো বিমানবন্দরগুলি ইউএন-এর বানানো। এমনকি প্লেনও চালায় ইউএন। কারণ এদেশে প্রচুর পরিমানে ইউএন কর্মী কাজ করেন, বেসরকারি সংস্থার লোক কাজ করেন – ফলে বিদেশী নাগরিকেদের সুবিধার্থে এই দায় ইউএনই তুলে নিয়েছে। কিছু প্রাইভেট সংস্থা প্লেন চালায় বটে – কিন্তু তাদের ওই অরণ্যদেবের কমিক্সের প্লেনের মত চেহারা ও হাবভাব।
বিস্তর ঝামেলা – কে, কেন, কোথা থেকে এসেছ – তিন দফা জিজ্ঞাসাবাদের পরে টিনের তৈরি অস্থায়ী এয়ারপোর্টে বসতে পারলাম। পেট চুঁইচুঁই। ধোঁয়া ওঠা কফি আর স্যান্ডুইচ নেওয়া গেল। ইতি মধ্যে হন হন করে ঢুকে এল একগাদা ইউএন-এর সেনা। হাতে সব ভয়ানক চেহারার রাইফেল গুলি বন্দুক। একবারে ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই। নাকের ডগায় অত বন্দুক – তার কোনও কোনোটা আবার আমারই দিকে তাক করা, তা দেখে আমার অবস্থাও নিশ্চয় জটায়ুর মতই হয়েছিল! দুজন সৈন্য কাঠ বাঙাল ভাষায় কথা বলছিলেন – বাংলা শুনে মনটা কথা বলার জন্য নেচে উঠতেও বন্দুক দেখে আবার স্যান্ডুইচে মন দেওয়াই যথাযুক্ত মনে করলাম। এখানে অনেক ইউরোপিয়ান ও আমেরিকান নানা সেবা সংস্থার হয়ে কাজ করায় এখানে বেশ কিছু রেস্টুরেন্টে নিখাদ কন্টিনেন্টাল খাবার পাওয়া যায়। কঙ্গোলিজ খাবারের বেলজিয়ান ও ফরাসি খাবারের প্রভাব ঢুকেছে আস্তে আস্তে। শেষদিনে এমনই এক ফরাসি দোকানে নিয়ে গিয়েছিলেন আমাদের বন্ধুরা। শোনা গেল তারা ছাগল পুষে ছাগলের দুধের চিজও বানায়।
যাই হোক, শোনা গেল ফ্লাইট যখন তখন ক্যান্সেল হয় – কারণ আবহাওয়া দপ্তরের মত এখানে বোমা পরা দপ্তর আছে, তারা খবর দেয় কখন কোথায় বোমা পড়ছে না – তখন সেই মত প্লেন ওঠে নামে। ফলে একঘণ্টার রাস্তার জন্য একদিন রিজার্ভ রাখতে হয়। তবে আমাদের ডানা লাগানো মিনিবাসটি উড়লেন – বানিতে মাটি ছুঁইয়ে আবার বুনিয়াতে গিয়েও নামলেন। নির্বিঘ্নে। বানির বিমানবন্দর একটি গ্রামের মধ্য। রানওয়ের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে পায়ে চলার মেঠো পথ। নামার সময় দেখলাম মাঠে দাঁড়িয়ে উপরদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন – প্লেন পেরিয়ে গেলেই তারা পারাপার হবেন। একজন সৈনিক নারী হাতে লাঠির মত কিছু একটা নিয়ে ঘাসের জঙ্গলের কাছাকাছি দৌড়াদৌড়ি করছেন। এই প্রথম একজন সৈনিক দেখলাম – যার হাতে বন্দুক নেই – লাঠি। জিজ্ঞেস করায় জানা গেল তিনি পাখি তাড়াচ্ছেন, মুরগি তাড়াচ্ছেন যাতে তারা রানওয়ের উপর এসে পড়ে কোনও দুর্ঘটনা না ঘটায়। পকেটে গুলতির মত কিছু একটাও গোঁজাও রয়েছে দেখলাম।
বুনিয়ায় নেমে চক্ষু চড়কগাছ। আমার দিকে তাক করা সাঁজোয়া গাড়ির উপরে একটা অ্যান্টিএয়ারক্রাফট মেশিনগান। তারপর তারপর এদিকে ওদিক তাকিয়ে দেখি – না ঠিক আমার দিকে নয়, কোনও সেনাবাহিনীর কেউ আসবেন তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য সব ভারি ভারি গোলাবন্দুক নিয়ে প্রচণ্ড চড়া রোদে শ’খানেক সৈন্য দাঁড়িয়ে।
আমার কলিগরা চাপা গলায় বলতে বলতে যাচ্ছেন আমার কানে – খবরদার ক্যামেরা বার কোরো না। আর ক্যামেরা! আমি প্রাণ নিয়ে পালাতে পারলে বাঁচি। দেশের মধ্যে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য পারমিট লাগে – সেই পারমিটে যতক্ষন না কেউ সিল লাগাচ্ছে ততক্ষণ শান্তি নেই। একে বিদেশী, তায় ফ্রেঞ্চ জানি না। ভরসা আমার কঙ্গোলিজ কলিগ-বান্ধবী ম্যাগডালিন আর করডুলা। দেখা হওয়া ইস্তক তারা আমাকে এমন বগলদাবা করেছে যে হাঁসফাঁস অবস্থা। প্রতি পদে তারা আমার খেয়াল রাখে, আদব কায়দা শিখিয়ে দেয়। পারমিটে সিল লাগল – অফিসার আমাকে গুজরাটি ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন কেমন আছি। জানা গেল একজন গুজরাটি এই বুনিয়াতেও দোকান ফেঁদে বসেছেন। আমি দেঁতো হাসি হাসলাম। এক মস্ত জাবদা খাতায় আমার ঠিকুজি কুষ্ঠি লেখা হল। এত সব তথ্য কে যে দ্যাখে, কে-ই বা পড়ে কেউ জানে না! কিন্তু কথায় কথায় বন্দুক ব্যাপারটা হজম হয় না। একদিন অন্ধকার রাস্তায় একজন লম্বা লোকের গায়ে ধাক্কা খেতে সে যখন আমাকে ‘দেজোল’ বলে তুলে ধরল – দেখি তার কাঁধেও রাইফেল। বোঝা গেল সে একজন রেবেল। এখানে কে বিদ্রোহী, কে সরকারি, কে ইউএন – সবই গুলিয়ে যায়। কারণ সবাই দামি বন্দুক নিয়ে ঘোরে। ফসকে একটা গুলি টপকে গেলে হল আর কী!
শহরের গুলি বন্দুক থেকে পরদিন পৌঁছানো গেল গ্রামে। আমাদের বীরভূমের রাঙামাটি খোয়াই-এর মত রাস্তা দিয়ে হাঁচোর পাঁচোর করতে করতে গ্রাম থেকে গ্রাম ঘুরছি। সবুজ ঘেসো পাহাড়, মাঝে মাঝে জঙ্গল – ঘন নয়, এলোমেলো গাছ। ফাঁকা ফাঁকা। জঙ্গলে কেন জানি না প্রচুর পেয়ারা গাছ। জংলি পেয়ারা – এলো কোথা থেকে? জানি না। জানে না। দরজা খুলে বিদেশীদের নামার উপায় নেই। পাঁচ কিলোমিটার ছাড়া ছাড়া এক সৈনিক – অস্থায়ী ছাউনির তলায় ঠান্ডা চোখে বসে আছে। কোথা থেকেই বা এল – কোথায় বা যাবে! পাহারা দিচ্ছে নাকি! কাকে পাহারা? কিন্তু হাত তুলতে হয় – একটা সেলাম, স্যলুট বা তার মাঝামাঝি কিছু একটার মত করে। তারই মাঝে মাঝে প্রকৃত হেসে ওঠে। আগুনরঙা ফুল। এ গাছের পাতা পলাশের মত – ফুলের রং পলাশের মত হলেও মাথায় এর অবাধ্য টিন এজারের মত ঝাঁকড়া চুল।

এক গ্রামে আয়োজন হয়েছিল স্থানীয় ফসল দিয়ে রান্না করা খাবারের প্রতিযোগিতা। নটে শাক, নদীর চুনো মাছ, পেঁয়াজ, টমেটো দিয়ে রাঁধা ঝোলকেই প্রথম পুরস্কার দেওয়া গেল। রান্নায় তেল অনেক – অথচ ভাজা নয়, একরকম সাঁতলানো। সঙ্গে কাসাভা সেদ্ধ। আর ছিল অ্যাভোকার্ডো, আনারস, পেঁপে, কলা। আভোকার্ডো এখানে ছড়াছড়ি। মাঠে ঘাটে রাস্তায় পড়ে থাকে। নটে শাক হয় বেশ বড়ো বড়ো। নদীর চুনো মাছ মাঝে মধ্যে জোটে। ছাগল-মুরগি একধরণের বিলাসিতা।

কঙ্গোয় মিনারেলস উপচে পড়ছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সোনা। মূলত চীন থেকে ব্যবসাদাররা এসে নানা বাঁকা পথে যেখানে সেখানে সোনা খুঁড়ে তুলে – তাকে ধুয়ে, নিজের দেশে পাচার করে দিব্যি ব্যাবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের লিমুজিন, মাখনের মত চামড়া, তিনটে করে দেহরক্ষী – আমার দেখার ‘সৌভাগ্য’ হল বাজারে সিগারেট কিনতে গিয়ে। প্রাকৃতিক সম্পদের উপর স্থানীয় মানুষের কোনও অধিকার নেই – কঙ্গো সরকারের ভূমিকাও এখানে প্রায় জড়পদার্থের মত। এর ফলে অসম্ভব জলদূষণ। গ্রামের মানুষ হলুদ রঙের যে তরলটি পান করেন, তাকে আর যাই হোক পানীয় জল বলা যায় না। জিজ্ঞেস করলাম – এই জল কেমন খেতে? বলল, ‘জানি না। আমরা তো সাদা জল তো কখনও খাইনি। তাই এইটাই জলের মত স্বাদ ভাবি।’ লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম।
এদেশে ‘পিছিয়ে’ পড়া চাষ আমাদের থেকে উন্নত। আমরা ভুলতে বসেছি, কিন্তু ভুট্টা আর বিন্সের যৌথ চাষ এখানে বেশ প্রচলিত। পিঁয়াজ, কাসাভা, লাল আলু, নটেশাক, বিন্স্। বড়ো গাছ, বুনো অ্যাভোকার্ডো, কলা। ঠিক যে গুছিয়ে করা তা নয়। কখনোই মানুষজন জমিয়ে বসে উঠতে পারেন না। মাঝে মাঝেই বিপ্লবী রেবেলরা এসে জায়গা দখল করে। তখন গ্রামের লোক আবার উদ্বাস্তু।
বুনিয়া শহরে এক ভারতীয় রসুইখানার সন্ধান পাওয়া গেল। আমি বাইরে গিয়ে ভারতীয় খানার একদম মুখাপেক্ষী নই। তবুও পাঁচের মত মুখ করে গিয়ে জানা গেল ওখানে কঙ্গোদেশীয় খাবারও পাওয়া যায়। বাঁচা গেল। স্থানীয় লোকেরা বলল – তুমি একটু ভারতীয় শেফের সঙ্গে কথা বলে দ্যাখো তো ঠিকঠাক ভারতীয় খাবার পাওয়া যায় কিনা। ভারতীয় শেফ! আছে নাকি? ডাক পাড়তেই নাচতে নাচতে এসে হাজির অমরজিত। হিন্দী বলে সে বাঁচল। উত্তরপ্রদেশ থেকে বম্বে হয়ে সে বহু রাস্তা লেক পেরিয়ে এসে ঢুকেছে বুনিয়ায়। বহাল হয়েছে সাতদিন। দুঃখ করে বলতে থাকল – ‘কালো জিরে পাচ্ছিনা। ধুর মশাই – বিচ্ছিরি গরম মশলা। এমনি করে রান্না হয় নাকি। আমি সব মশলা আনতে দিয়েছি – দশদিনের আগে তারা আসবে না। তদ্দিন কোনোমতে চালাচ্ছি।’ কঙ্গোলীজরা ভারতীয় খাবার খাবেই। ভাত-আলুসেদ্ধ-ডালসেদ্ধ-বাটার আর মাটন কারি অর্ডার করা গেল। অমরজিতকে দেখে বুঝলাম এখনও তার গা থেকে ভারতীয় গন্ধ যায়নি – ফলে রন্ধনপ্রণালী এখনও জগাখিচুড়ি হয়ে যায়নি। আমি অবশ্য খেলাম মাছ ভাজা আর আলুভাজা। তিলাপিয়া মাছ ওদেশে জাম্বো। মাছ দিয়েই পেট ভরে। সঙ্গে রাশি রাশি আলুভাজা। মাছ স্রেফ কড়কড়ে করে ভাজা – ব্যাস। স্বাদ যে দারুন এমন নয়। তবে টাটকা।
মাছের অন্য অপশন কিং ফিশ। তার মস্ত বড়ো পিস। সঙ্গে আবার ওই আলু ভাজা।

অমরজিতের মাটনকারি খেয়ে লোকে মুগ্ধ। আমরা বুনিয়ায় প্রায় দিন ছয়েক ছিলাম – কত ছাগল যে প্রাণ দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
সন্ধ্যায় স্থানীয় বিয়ারের সন্ধান করতে পাওয়া গেল সিংহের ছবি দেওয়া ‘সিম্বা’, হাতির ছবি দেওয়া ‘টেম্বো’, কুমীরের ছবি দেওয়া ‘নক’ বা আর একটু বড়ো বোতলে প্রাইমাস। কঙ্গোলীজরা মাছ ভাজা আলুভাজা দিয়ে দু বোতল প্রাইমাস ঢক ঢক করে খেয়ে ফেলেন অনায়াসেই। আমি অল্প অল্প চুমুক দিয়ে শেষ করতে পারি না। একটু আলুভাজা দাঁতে কাটি। তাতেই পেট ভরে যায়। তারপর আবার আমাকে টানতে টানতে নিয়ে যায় ডিনার করাতে। আমি বিমর্ষ হয়ে পড়ি – ‘আমি আর কিছু খাব না… ওই তোমাদের থেকে নিয়ে…’ ‘আচ্ছা তুমি আমাদের থেকে নিয়ে এই প্লেটটা থেকে খাও আমি আমার জন্য আর একটা বলে দিচ্ছি।’ মহা জ্বালা!
দুপুরের খাবারে কাসাভা বা ভুট্টার পেস্ট ভাপিয়ে বানানো বলের মত ফুফু। ওই প্রায় একই জিনিস কখনও কাঁচকলা দিয়ে তৈরি – তার নাম লিটুমা। কাঁচকলা এমনি এমনি সেদ্ধও আসে – তাকে কাঁটা চামচ দিয়ে কেটে কেটে খেতে হয়। সঙ্গে কখনও সাদা, কখনও লাল, ধূসর, সবুজ বিন্সের তরকারির মত। একটু গায়ে মাখো মাখো ঝোল – সামান্য মশলা। ওই রকম মাখো মাখো ঝোল দিয়ে গরু ও ছাগলের মাংসও রান্না হয়। একদিন তা খেলাম লাল আলু সেদ্ধ দিয়ে। মাছো এমনই রান্না হয় হার্বস দিয়ে, সামান্য রস রস। মাছ বলতে কিং ফিশ নয় তেলাপিয়া। শাক মানে রাই শাকের মত কিছু একটা হাল্কা তেলে ভাজা। একদিন মটরশুঁটির তরকারি টাইপ কিছু একটা পাওয়া গেল দুপুরে। মেয়োনিজ খাওয়ার চলও আছে। ডিম খাওয়া অবশ্য দেখি না সেরকম!
দু’তিন দিন খুব স্থানীয় দোকানে গেছি – কিছুটা জোর করেই – মানে মদের ঠেকে। কোনও হইহুল্লোড় নেই – লোকে বেশ মন দিয়ে খায়। পাহাড় প্রামাণ আলু, মাংস ভাজা। আমার দাঁতের নানা জায়গায় নানা ফাঁক ফোঁকড় – আমি খাওয়ার থেকেও, সেই বৃদ্ধ ছাগলের শুকনো ও শক্ত মাংস দাঁতেই খায় বেশি। আমি টুথপিক নিয়ে সেই দাঁত খোঁচানোয় ব্যাস্ত থাকি আর লোকজন দেখি। একটাই সুবিধা – ও সব দোকানে কাঁটা চামচের বালাই নেই। ফলে দিব্বি হাড় থেকে মাংস দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে শেষ মাংসটুকু পর্যন্ত খাওয়া যায়। আঃ, কী আরাম। এখানে আমার জার্মান কলিগদের ডাকি না। জনসন, ম্যাগডালিন – আমার সব দশাসই কঙ্গোলীজ বন্ধুরা অস্থানে কুস্থানে আমাকে সঙ্গ দেয়।
ছোট মফঃস্বল শহরের কাঁচা বাজার আমার খুব ভালো লাগে – মনে হয় গোটা দেশটা চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মাছ, মাংস, সবজি, জামা, কোদাল … সব একসাথে।

একদিকে কর্ডুলা, অন্যদিকে ম্যাগডালিন আমার দুই কনুই ধরে থাকে দু দিক থেকে। আমি দুই মহিয়সীর হাতে ঝুলতে ঝুলতে যাই। তারা বলে দিয়েছে পার্স নেবে না, মোবাইল নেবে না। যা কিনবে আমাদের বলবে। এত সাবধান হওয়ারও অবশ্য কিছু ছিল না – আমার গায়ের রং প্রায় তাদেরই মত। কেবল গোল বাঁধল চুল নিয়ে – এমন লম্বা সোজা চুল দেখেনি তারা – সকলেরই তো কোঁকড়া চুল। ছোটরা আমার চুলের দিকে আঙুল তুলে তুলে হি হি করে হাসে। আর সবাই নানা রকম মন্তব্য করতে থাকে। একদিকে গরুর মাংস – বিশাল বড়ো বড়ো পা ঝুলছে, অন্যদিকে শুকনো মাছ, ফলপট্টি। হাতে গোনা কয়েক রকম শাক। একরকম মোটা লাল চাল। আর অন্তত সাত আট রকম বিন্স্। আমি সব বিন্স কিনি খানিকটা করে করে। একটা জামার কাপড় কিনি।
একটা দেশে প্রায় দশ বারোদিন থাকতে থাকতে দেশটাকে নিজের মনে হতে থাকে। একই থালা থেকে সকলের সঙ্গে মাংস খুঁটে খেতে খেতে সবাইকেই ভাই-বোন-বন্ধু মনে হয়। সম্বিত ফিরে আসে রাইফেল স্টেনগান দেখে – কেন যে আমরা দেশের সীমানার নামে কিছু কাল্পনিক বেড়া বানিয়ে চতুর্দিক তুলকালাম করে তুললাম!
