ভোজবাজি- সিয়েরা লিওনের পাতাখোর-অংশুমান দাশ-বসন্ত’২৫

আগের পর্ব-  ব্যাঙ ও লাওসনেপালি বাদুরইথিওপিয়ার সিংহ, পাহাড়িয়া খাবারদাবার, সাদা চামড়ার লেহ্যপেয় , পাশের বাড়ি বাংলাদেশ, পিকনিক, তাজিকিস্তানে তাজ্জব, থমকে চমকে থাইল্যান্ড, কঙ্গোয় কয় দিন

ঢ্যাঁড়শ খেতে আমি খুব ভালোবাসি। ঢ্যাঁড়শ সেদ্ধ, ঢ্যাঁড়শ ভাজা, সর্ষে দিয়ে ঢ্যাঁড়শ – এইসব। গোরখপুরে একবার ঢ্যাঁড়শের ভিতরে আচার ভরে ভেজে খাইয়েছিলেন এক কৃষক। সে ভারি চমৎকার। কিন্তু কোনোদিন ঢ্যাঁড়শের পাতা খেতে হবে, তা কখনও ভাবিনি। সে সুযোগও হয়ে গেল সিয়েরা লিওন-এ গিয়ে।

আফ্রিকার পশ্চিমতম প্রান্তে একদিকে পাহাড় অন্যদিকে সমুদ্রে ঘেরা এই জঙ্গলের দেশে কালো মানুষেরা বসবাস করা শুরু করে অন্তত সাতশো বছর আগে। এমন চমৎকার জায়গায় ইয়োরোপিয়ানদের নজর পড়বে না তা কি হয়? প্রথম চোখে পড়ে পোর্তুগিজদের – বিনিময় প্রথায় জিনিসপত্র লেনদেন শুরু হয়। ব্রিটিশদের চোখে পড়ার পর ১৬৭২ সালে সেখানে রয়াল আফ্রিকান কোম্পানি শুরু হয় ব্যাবসা-বাণিজ্য আরও জাঁকিয়ে বসানোর উদ্দেশ্যে। কিসের ব্যাবসা? লুকিয়ে লুকিয়ে আসলে মানুষের ব্যাবসা। বুন্স দ্বীপ ইয়োরোপ-আমেরিকায় দাসদাসী হিসেবে মানুষ চালানের মুখ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সময় সময় ভাবি – মানুষের সভ্যতাকে কত লজ্জাজনক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। যারা কিনতেন তারাই বা কীভাবে ও কী ভেবে কিনতেন – আর অমন শক্তিশালী মানুষগুলো কীভাবেই বা নিজেদের বিক্রীত হতে দিতেন!

দাস ব্যবস্থা পতনের পর সিয়েরা লিওনের সমুদ্র সংলগ্ন একটা জায়গা এই দাসেদের পুনর্বাসনের জন্য নির্দিষ্ট করা হয় – রসিকতা করার মতই তার নাম রাখা হয় ফ্রিটাউন। কারণ ১৮০৮ সালেই ফ্রিটাউন সহ পুরো দেশের দখল নেয় ব্রিটিশরা, ‘সিয়েরা লিওন কম্পানি’ গঠন করে। চোরাগোপ্তা দাস চালান তখনও চলতে থাকে – তার ওপর নজরদারি করার জন্য নৌবাহিনীর ঘাঁটি তৈরি করতে হয়। তারপর বাকিটা ছাঁচে ফেলা ইতিহাস – যার সঙ্গে আমাদেরও অল্পবিস্তর পরিচিতি আছে। সিয়েরা লিওনে ইয়োরোপীয় ধাঁচের শিক্ষা, চিকিৎসা, আইনকানুনের প্রবর্তন হতে থাকে। মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য বলি – ১৮৮৩ সাল নাগাদ দাস ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়, কারণ আমেরিকায় বিলুপ্তি হচ্ছে ১৮৬৫ সালে। প্রায় ৫০০০০ মুক্ত দাস শেষ পর্যন্ত ফ্রিটাউনে ফিরে আসে (যদিও এই বন্দর দিয়ে প্রায়ই এক কোটি কালো মানুষকে পাচার করা হয়েছে)। নানা দেশ থেকে আসার ফলে আক্ষরিক অর্থেই এক মিশ্র সংস্কৃতির শহর হয়ে ওঠে ফ্রিটাউন। শহরের মাঝামাঝি আছে এক ৪০০ বছরের প্রপিতামহ শিমূল গাছ।

কথিত আছে ফ্রিটাউনে ফিরে আসার পর নানা দেশের এবং জাতির কালো মানুষেরা এখানে মিলিত হয়েছিলেন মুক্তির উদযাপনে। খাঁড়ির মধ্যে বন্দরের কাছে মাথা তুলে থাকা একটা লোহার খুঁটি – যেটা স্থানীয় লোকেরা বললেন – ওটাতেই দাসেদের জাহাজ বাঁধা হত। সেখান থেকে হাঁটা পথে সেই শিমূল গাছ। এখন কেবল তার সুবিশাল গুঁড়িটুকু বেঁচে আছে। ২০২৩-এর ঝড়ে এর কান্ড ভেঙে যায়। সেই গাছের কাছে দাঁড়িয়ে কেবল দেখতে পাচ্ছিলাম অসংখ্য পাথরে কোঁদা কালো মানুষ বন্দর থেকে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁতে এই গাছের কাছে এসে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরছে চারশো বছর আগে। দেখতে পাচ্ছি – কোনটা বৃষ্টি আর কোনটা চোখের জল বোঝা যাচ্ছে না। দেখতে দেখতে বুঁদ হয়ে মাঝরাস্তায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছি আর ভ্যাঁপ্পোর ভ্যাঁপ্পোর করে হর্ণ দিতে দিতে উত্তেজিত ট্যাক্সিচালকেরা ‘হে ম্যান’ ‘হে ম্যান’ বলে চ্যাঁচাচ্ছে।      

সিয়েরা লিওনের বিমানবন্দর লুঙ্গিতে। মিনিট চল্লিশ খাঁড়ি পেরিয়ে তবে ঢুকতে হয় রাজধানী ফ্রিটাউনে। দেশে ঢোকার পথে একরাত্রি বাস লুঙ্গির হোটেলে। সেখানে ম্যালেরিয়ার ভয়। বিশাল বড়ো বড়ো জানলাবিহীন ঘর। রাতে টিনের চালার তলায় খেতে গিয়ে দেখা গেল প্রচুর বিদেশী। সত্তরের দশকে স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৯১ থেকে ২০০২ – রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ, তারপর ইবোলায় উজাড় হয়ে যাওয়া, তারপর করোনা। সব মিলে দেশেরর মানুষের মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ অবধি হয়নি। তাই অনেক আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এখানে কাজ করেন। ফলে বিদেশী মানুষ অনেক। টিনের চালায় বসে কী খাওয়া যায় ভাবতে গিয়ে দেখা গেল – পাস্তা!! যাচ্চলে পাস্তা খেতে এতদূর এলাম? আমি এদেশী খাবার খাবই – খুঁজতে খুঁজতে পাওয়া গেল মাছ ভাজা, আর তার সঙ্গে আবার সেই ফরাসী আলুভাজা।

মুখ হাঁড়ি করে রাত্রে শুতে গেলাম। সকালে নানা রকম পাঁউরুটি, হাল্কা মিষ্টি ফসফসে কেক, কলা ভাজা – এইসব খেয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। আমরা যাব কেনেমা শহরে। সিয়েরা লিওনের অন্যতম বড়ো শহর,কেনেমা টাউন। ওখানে আশপাশ থেকে আসবেন গ্রামের মানুষজন। সেখানে চাষকথা-বাসকথা।

গোল বাধল হোটেলের টাকা মেটাতে গিয়ে। এখানে হিসেব সব বড়ো বড়ো টাকার – স্থানীয় টাকাকে এখানে লিয়ন বলে। মানে ২০০০০ লিয়নে এক কাপ চা – এই রকম আর কি। আসল সমস্যা হল এই অতিরিক্ত শূন্য। আমি কয়েক লক্ষ লিওন দিয়ে টাকা মিটিয়ে দেখলাম ফেরত পাব ১,২০,০০০ লিয়ন। ভালো কথা। তারা আমাকে একটা ৫০০০০ লিয়নের নোট, একটা ৫০ লিয়ন আর একটা ২০ লিয়ন দিয়ে হাসি মুখে গুড বাই বলল। আমি বার বার হিসেব করি। যোগ করলে হয় ৫০০৭০ লিওন এদিকে পাই ১,২০,০০০। কম বয়সী হিসেবরক্ষকের হাসি মুখ আমাকে বোঝাতে বোঝাতে গোমরা হয়ে ওঠে! অবশেষে হস্তক্ষেপ করতে ছুটে আসেন ম্যানেজার। শেষমেশ বোঝা যায় – এত শূন্য নিয়ে হিমশিম খেতে খেতে সরকার ঠিক করেছে টাকায় আর তারা তিনটে করে শূন্য ছাপবে না। বোঝো ঠ্যালা – অর্থাৎ ৫০ লিয়ন মানে আসলে ৫০০০০ লিয়ন! ২০ মানে ২০০০০। অথচ অতিরিক্ত শূন্যওয়ালা নোট তারা তুলেও নেয়নি। ব্যাটা সেটা আগে বলবি তো, মনে মনে গজ গজ করি – আর দুটো সিস্টেম একসঙ্গে চালিয়ে মানুষকে ঘাবড়ে দেওয়ার দরকার কি বাপু! মহাশূন্যের আসন্ন বিড়ম্বনার কথা ভেবে মুষড়ে পড়ি। বাকি যে কদিন ছিলাম – দোকানে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে শূন্যযুক্ত ও শূন্যহীন নোটের হিসেব করতাম। লোকে পাগল ভাবত – কিন্তু কী আর করা যাবে!   

কেনেমা শহর লম্বা রাস্তা। মাঝে কফি খেতে নামি। দোকানে সবই বিলিতি ফাস্ট ফুড। একটা দোকানে মাংসের পিঠে খাই।

আমার সঙ্গে আছে একজন জার্মান ললনা – তিনি আমাকে আতঙ্কের চোখে দেখতে থাকেন। মাঝে মাঝে বাজার পড়ে। কেনেমায় আবার হোটেল। অফিসের স্থানীয় বন্ধু রিচার্ডকে জিজ্ঞেস করি – আবার হোটেল? একটু গাঁ গেরামের কাছাকাছি যাওয়া যায় না? নাঃ – সিকিউরিটি। সারা আফ্রিকা জুড়ে সিকিউরিটির দোহাই। হোটেল মানেই সেই একই পাস্তা, নয় মাংস ভাজা, ভাতও পাওয়া যায় বটে – কিন্তু ফ্রায়েড রাইস টাইপ – জোলোফ রাইস – লঙ্কা, টমেটো আর নানা মশলা দিয়ে করা ভাত। সব পাম তেলে করা। আমার বাঙালি সঙ্গিনী একশিশি ঘি এনেছেন। আর শেফকে গিয়ে বুঝিয়ে এসেছেন – আলুসেদ্ধ, ডিম সেদ্ধ আর ভাতের ব্যাপারটা। তিনি ঘি সহযোগে ডিনারের টেবিলটাকে দিব্যি বাঙালি বানিয়ে তুললেন – আমার জার্মান সঙ্গিনীও দিব্যি আলু সেদ্ধ ডিমসেদ্ধ ভাতে মজে গেলেন। আমি যখন দেশি দারু, আর দেশজ কী কী পাওয়া যায় সেই খোঁজে হোটেলের মেনু তোলপাড় করে ফেলতাম – আমার পাশে তখন বাঙালিয়ানার তুমুল আয়োজন। হোটেলে ব্রেকফাস্টে – কলাভাজা, আলুভাজা, মুরগীর ডানা ভাজা, সবজি সেদ্ধ, পাঁউরুটি, ভাত ভাজা, আনারস এই সব পাওয়া যায়। আমি মুখিয়ে থাকি দুপুরের খাবারের জন্য। স্থানীয় এক মহিলাদল বাড়ি থেকে রান্না করে নিয়ে আসেন আমাদের ৩৫ জনের জন্য। প্রতিদিন চমক।

তেলাপিয়া মাছ এখানে ভাজা, শুকনো – দু রকম ভাবেই খায়। অন্য নানা ছোটো মাছও শুকিয়ে খায়। নানা রকম পাতা বেঁটে পেস্টের মত তরকারিতে মিশিয়ে রান্না করা হয়। যেমন আমাদের পালং পনির টাইপ। একদিন সবুজে মাখো মাখো হয়ে শুঁটকি মাছ এল। কী পাতা এটা দিদি? ওখরা। বলে কি! ঢ্যাঁড়শ পাতা! আমাদের দেশে তো … যাই হোক, সোনামুখ করে খাই। ভালোবেসে দিলে বিষ না খেতেও দু’বার ভাবব।

মাছে বেশ শুঁটকি শুঁটকি গন্ধ। তার থেকেও অসুবিধা, মুখে যেন একটু বালি বালি লাগে। শুকানোর পদ্ধতি আদি ও অকৃত্রিম রোদে শুকানো। কোনও কোনও মাছ ধোঁয়াতেও শুকোনো হয় – সেগুলোতে ধোঁয়াটে গন্ধ। শুকনো মাছ ভাজা করে রাঁধার চল নেই। ফলে একটু বিচিত্র লাগে ঝালে ঝোলে পোষা জিভের। ঢ্যাঁড়শ পাতা ছাড়াও একই পরিবারের গাছ রোজেলের পাতা দিয়ে রান্না করারও চল রয়েছে। রোজেল হচ্ছে আমাদের দেশের টক ঢ্যাঁড়শ বা চুকুই বা ঘংঘুরা। পাটশাক পেস্ট দিয়ে রান্না করা শুকনো মুরগি খেলাম। রয়েছে লাল আলুর পাতার পেস্ট। মশলা কম,কিন্তু তেল বেশি। পেস্টের মধ্যে মাছ-মাংসগুলো নিছক নাড়াচাড়া করা। কাসাভা বা ট্যাপিওকার পাতাও পেস্ট করে খাওয়া হচ্ছে – দেখে শুনে মনে হল বেটে দিলে সব পাতাই খেয়ে নেওয়া যায়। ছাগল যা যা পাতা খায় – হিসেব মত আমরাও সে সব পেঁয়াজ আদা রসুন দিয়ে কষকষে করে রেঁধে ফেললেই হল – এখানে তো অবশ্য স্রেফ পেস্ট করেই কাজ চালিয়েছে।

বাজারে না গেলে আমার দেশ দেখা হয় না। লোকে ছোটে সমুদ্র, পাহাড়, মিউজিয়াম দেখতে – আমি ছুটি বাজারে। কেনেমা টাউনের বাজারে গিয়ে মন ভরে গেল। আহা, কী অসাধারণ বাজার। আমি ঘুরে ঘুরে মুগ্ধ।

চারপেয়ে, আটপেয়ে, দুপেয়ে পাখির হাড়-মাস-মুন্ডু-পাকস্থলী-জিভ-পায়ের নখ – কী নেই! সব আলাদা আলাদা করে রাখা। কেবল তাদের বয়স নিয়ে আমার একটু সন্দেহ থাকলেও লোকে দেখলুম মহা উৎসাহে সেসব কিনছে।

আমার আর এক কলিগ হাহ্‌বা, যে কি না এই মানুষের ভিড়ে আমি যাতে হারিয়ে না যাই তাই প্রায় আমাকে বগলদাবা করে রেখেছে, তার কানে কানে বললুম – আচ্ছা, কাল গোমাংসের কোনও স্থানীয় রান্না হতে পারে কিনা। কয়েকশো বিনুনি করা চুল ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে হাহ্‌বা তাতে সম্মতি জানাল।

হাহ্‌বা খুব ভালো নাচে,গান গায়। অবশ্য কোন আফ্রিকান মেয়ে ভালো নাচে না, তা বলা মুশকিল। ওদের দেশে মেয়েরা বিশেষত ভীষণ সপ্রতিভ। কেমন শরীর ভেঙে ভেঙে হাতে তালি দিয়ে দিয়ে নাচে। কেমন নেশার মত তাল – আমার কাঠের মত হাত পা’ও নেচে উঠতে চায়। ছেলেরা সে তুলনায় বেশ স্তিমিত।

গ্রামে আমাদের আপ্যায়নের জন্য ভালো মানুষ ও তার প্রটেক্টর আত্মা সেজে দুই মহিলা অনবদ্য পারফরমেন্স করলেন। মুখোশ পরে, প্লাস্টিক ছিঁড়ে বানানো জামা পরে। আমার বহুরূপীদের কথা মনে হচ্ছিল। একটা লাউ আর পুঁতি দিয়ে বানানো বাদ্য যন্ত্র বাজাচ্ছিলেন – তার একটি সংগ্রহ করে আনা গেল। যাইহোক,কথা হচ্ছিল মাংস ভক্ষণের। পরের দিন কাসাভা পাতা দিয়ে রাঁধা গরুর মাংস এসেছিল বটে – কিন্তু তাতে শুকনো মাছের টুকরো দেওয়া। এখানের জাতীয় খাদ্য। মাছের সঙ্গে মাংস রাঁধা – সে এক হতচকিত ব্যাপার! কাতলা মাছের সঙ্গে খাসির মাংস রান্না করার মত ব্যাপার – তাও আবার শুঁটকি মাছ!

বাজারে মিলিয়ে মিশিয়ে জিনিস বিক্রি হচ্ছে। সব্জির মধ্যে কাসাভা-ঢ্যাঁড়শ-লাল আলুর পাতা, টমেটো, নানাবিধ বেগুন, লংকা।  আর মানুষ মানুষ মানুষ। আমার গায়ের রং খুব আলাদা না করা গেলেও মোট গোঁফ আর সোজা চুল দেখে বাচ্চারা আঙুল তুলে তুলে হাসে। আমিও হেসে জবাব দি। মুড়ির দোকানের মত খোলা খোলা ওষুধ বিক্রি হচ্ছে গুমটি দোকানে। তার পাশে বিক্রি হচ্ছে কাপড়ের পুঁটলিতে ইউরিয়া সার – এই একটু একটু। রাসায়নিক সারের ব্যাবহার শুরু হচ্ছে এই প্রত্যন্ত জায়গাতেও – সর্বনাশের শুরু। সীম বীজ আর নানা রকম বীজ, যা ডাল হিসেবে খায়। আর ছোটো ছোটো কিউব মশলা – যা আমাদের ম্যাগিতে দেয়।

আর সবেতে এমনকি ফ্রায়েড রাইসেও এই মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট দেওয়া প্যাকেট মশলা। মুখরোচক। দেশের চাষ ও খাদ্য ব্যবস্থাকে আবার করে গড়ে তোলার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে কি? নাকি ব্যাবসার খাতিরে অন্য দেশেরা চায় না একটি দেশ খাদ্যে স্বনির্ভর হোক? অথচ চমৎকার আবহাওয়া, বৃষ্টি, জঙ্গল – দিব্যি হতে পারে ফসল। ভারত থেকে চাল, টার্কি থেকে মুরগী,ডিম। আর এইসব চটকদার অস্বাস্থ্যকর মশলা। মায়ের দুধ ছেড়েই এই মশলায় নেশাগ্রস্ত গোটা দেশ।

মুরগি পোষো না কেন? ছাগল পোষো না কেন? আমরা সব খেয়ে নিই। পোষার ধৈর্য নেই। গ্রামে যখন সেই সব আলোচনা হচ্ছে – তখন হঠাৎ বাচ্চারা ছুটল হই হই করে – কী হল? কে যেন ছররা বন্দুক দিয়ে হনুমান মেরে এনেছে – তার ভাগাভাগি হবে। কীই বা করা যায়! জঙ্গলের দেশের মানুষ – চাষ করা এদের রক্তে নেই – আমরা শেখাতে চাইলেই বা হবে কেন? অথচ এভাবেও তো চলবে না। বন্য প্রাণীর অতিরিক্ত সংস্পর্শে আসার ফলে গত দু দশকে বেশ কিছু রোগ ভোগ বেড়েছে আমাদের – তাদের রোগ চলে আসছে আমাদের শরীরে। এই ঠোকাঠুকি চলছে … এক অনিশ্চিত যাত্রার মত আমি প্রাণপণে গুছিয়ে চাষ করা শেখাতে থাকি। সুন্দর লালমাটির উঁচুনীচু রাস্তা ধরে হ্যাঁচোর প্যাঁচোর করতে করতে গ্রামের পথে এসেছি। জঙ্গল। টলটলে হয়ে নীচু জায়গায় জমে থাকা জল,তাতে বুনো জলজ ফুল ফুটে আছে। গাছপালা কিন্তু রয়েছে দিব্যি। প্রাচুর পাম গাছ। মানুষ এখানে পাম তেলই খায়। এক স্কুলে মাস্টারমশাইদের উদ্যোগে প্রায় পাঁচ রকম লাল আলু চাষ হয়েছে। কুমড়ো, ঢ্যাঁড়শ,লঙ্কা। আমি অদের বুনো নটে শাক চিনিয়ে দিলাম – মহা উৎসাহে তারা তুলে নিয়ে গেল ভাজা খাবে বলে। কী সুন্দর হাতের কাজ। লাউয়ের খোলা দিয়ে জল খাবার পাত্র, ঝুড়ি, কুলো। সপ্রতিভ বৌদিরা সব এনে এনে দেখান। ছবি তুললে খুব খুশি হন।

গুঁড়ো করা কাসাভা আলু দিয়ে বা কাঁচকলা দিয়ে করা মন্ড ফুফু এদের একটা প্রধান খাবার। প্রায় সস্বাদহীন – তা খেতে হয় কোনও মাছ মাংস সব্জির স্টু দিয়ে। বাদামের পেস্ট দিয়ে করা মাছ মাংসের ঝোলও খুব জনপ্রিয় খাবার। বেশ খেতে। খেলাম ইয়েবেহ – কাঁচকলা, লাল আলু, কাসাভা এই সব সেদ্ধ করে লঙ্কা দিয়ে হাল্কা করে ভাজা। খাবারে পাতা, মাছ, মাংস আর শর্করার প্রাধান্য থাকলেও সবজি বেশ কম। ইয়োরোপীয়ান খাবারের চাহিদাও অনেক – এই পাস্তা জাতীয় জিনিস। প্রচুর চিনি দেওয়া রঙ্গীন স্থানীয় সফট ড্রিঙ্ক – সে একবার খেতেই হবে সব খাবারের শেষে। মাছের গুঁড়ো যেকোনো খাবারে মিশিয়ে দেওয়া হয় – তাতে গরিব মানুষ ভাবেন মাছ খেলাম – কিন্তু তার পরিমাণ অত অল্প। 

ফেরার পথে এবারে ফ্রিটাউনে থাকা – হোটেলে। একদম দেশী খাবারের অ্যাডভেঞ্চার বন্ধ। ফ্রিটাউনের খুব কাছে সমুদ্রেরর বিচ – একদম সাদা বালি – অনবদ্য। তার খোলা রেস্টুরেন্টে বসে বড়ো সাইজের সামুদ্রিক মাছ ভাজা খাওয়া গেল। এবার ফিরে যেতে হবে। ফেরার পথে ঘানা এয়ারপোর্ট হয়ে প্লেন বদলে ফিরতে হবে। আর সেই বদল করা এরোপ্লেনের চাকা ওড়ার ঠিক আগে ফেটে যায়। মরতে মরতে বেঁচে গিয়ে দু’দিন পাসপোর্ট বিহীন হয়ে ঘানায় এক হোটেলের ঘরে আটকে থাকা (কারণ পাসপোর্ট নিয়ে নিয়েছিলেন এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ – যাতে না জানিয়ে পালাতে না পারি) – সবমিলিয়ে সে এক কান্ড!    

(ক্রমশ)

Leave a Reply