ভোজবাজি- আম আদমির মালাওয়ি-অংশুমান দাশ-বর্ষা’২৫

আগের পর্ব-  ব্যাঙ ও লাওসনেপালি বাদুরইথিওপিয়ার সিংহ, পাহাড়িয়া খাবারদাবার, সাদা চামড়ার লেহ্যপেয় , পাশের বাড়ি বাংলাদেশ, পিকনিক, তাজিকিস্তানে তাজ্জব, থমকে চমকে থাইল্যান্ড, কঙ্গোয় কয় দিন, সিয়েরা লিওনের পাতাখোর

লিলংওয়ে এয়ারপোর্ট থেকে পূর্ব দিক বরাবর ডানদিকে মোজাম্বিককে রেখে গাড়ি করে ঘন্টা পাঁচেক গেলে মাঙ্গোচি। এবার যাত্রা দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার মালাওয়িতে। এ দেশের নাম শোনার সুযোগ হয়নি আগে। তাঞ্জানিয়া-জাম্বিয়া-মোজাম্বিক দিয়ে চারদিক ঘেরা একফালি লম্বাটে দেশ মালাওয়ি। জন সংখ্যা দু কোটির একটু বেশি। পুরো দেশটার একের পাঁচ ভাগ জুড়ে আছে এক বিশাল লেক। ৭৫ কিমি চওড়া আর ৫৮০ কিমি লম্বা এই লেকই এ দেশের প্রাণ। মাঙ্গোচি গিয়ে আমরা উঠেছি সেই লেকের ধারে এক আবাসে। লেকের ধারে গ্রামের মানুষ কী করেন? কী আর করেন, মাছ ধরেন আর খান। খেয়ে খেয়ে যে সব শেষ হয়ে গেলে? তখন আর খাবে না, যতটুকু পাবে ততটুকু খাবে। ওছাড়া আর কিছু তারা করবেনই না! মৎস্য মারিব খাইব সুখে – এ বাক্য বাঙালির থেকেও মালাওয়াইনদের ক্ষেত্রেই খাটে বেশি দেখা যাচ্ছে।

তবে মাছের থেকেও দেখলাম বটে আম কাকে বলে! যেতে যেতে রাস্তার ধারে ধারে লাইন দিয়ে লোকে বসে আছে আম নিয়ে। হলুদ রঙের দেশি আম। গোল, লম্বা, বড়, ছোট…। চমৎকার টক মিষ্টি স্বাদ, প্রচুর দাড়ি – চুষে চুষে শেষ হয় না। গাড়ি থামিয়ে আম কিনলেন আমার আফ্রিকান, জার্মান সহকর্মীরা। আমি গাড়িতে যেতে যেতে তাদের বাঙালিমতে আম খাওয়ার ট্রেনিং দিলাম। প্রথমে টিপে টিপে ভিতরের সব শাঁস নরম করে নিতে হবে, তারপর নীচের দিকে ফুটো করে রস চুষে চুষে খেতে হবে – মোটামুটি রস শেষ হয়ে এলে ছাল ছাড়িয়ে আঁটি চোষো। আমার এই পারফর্মেন্সে মুগ্ধ হয়ে সাদা চামড়া কালো চামড়া সবাই আমের চামড়া ছাড়িয়ে কনুই অবধি রস মেখে হাত চাটতে চাটতে আধা রাস্তা পেরিয়ে এলেন।

রাস্তার ডানদিকে মোজাম্বিক, চাইলে এমনি এমনি ঢুকে পড়া যায়। কিছু কিছু রাস্তায় পুলিশ দাঁড়িয়ে। ছোট ছোট যে গঞ্জবাজার পড়ছে, তাতে শিকে গাঁথা মাছ পোড়ানো হচ্ছে। কোথাও কোথাও মুরগি অথবা ছাগলের টুকরো মাংস। দিগন্তবিস্তৃত মাঠ, ইতিউতি পাহাড়। পাহাড়ের মাঝখানে দশ বারোটা ঘর নিয়ে এক একটা বসতি। খুব বড়ো গ্রাম চোখে পড়ে না। চোখ কুঁচকে দেখে নেওয়ার চেষ্টা করছি মাঠের ফসল গাছ পালা – কারণ ঢেঁকিকে তো ধান ভানতেই হবে। কাল থেকে চাষবাসের চর্চা শুরু হবে।

মালাওয়াইনরা অতি শান্ত স্বভাবের মিশুকে মানুষ। খুব কথাবার্তা হইহুল্লোড় দেখিনি। ১৮৯১ সালে এই দেশ ব্রিটিশরা দখল করে। তিনটে দেশের মধ্যে স্যান্ডউইচ হয়ে থাকা এই ফালি খুব জরুরি হয়ে পড়ে পর্তুগিজদের আফ্রিকা দখল আটকাতে – কারণ মোজাম্বিকে তখন পর্তুগিজরা। তাছাড়া একটু-আধটু ধর্মপ্রচারের কাজও হবে। যেহেতু খুব বেশি খনিজ পদার্থ ইত্যাদি ছিল না, তাই আস্তে আস্তে ব্রিটিশদেরও উৎসাহ কমে আসে। ১৯৬৪ সালে দেশ স্বাধীন হয়। খুব বেশি যুদ্ধটুদ্ধ হয়নি। কিন্তু দেশের নেতা হেস্টিংস বান্ডা দীর্ঘদিন একনায়কত্ব চালান। ১৯৯৪ সালে সেই জমানা গিয়ে গণতন্ত্র ফিরে আসে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের সঙ্গেই এই দেশের সখ্যতা। আপাদমস্তক নির্ঝঞ্ঝাট এই দেশটি তাই রিফিউজিদের মস্ত আশ্রয়। সে কারণেই প্রচুর বিদেশী সাহায্য আসে এদেশে।

যখন মাঙ্গোচিতে এসে ঢুকেছি, তখন সন্ধ্যাবেলা। বৃষ্টি পড়ছে। ঘরে জল ঢুকে এসেছে। ডেঙ্গুর ভয় দেখিয়ে রেখেছে সবাই। বিশাল ঘরে মশা খুঁজে খুঁজে দেখে মশারি টাঙিয়ে শুয়ে পড়া গেল। তার মধ্যে লোডশেডিং। ভোরবেলা বাইরে বেরোনোর জন্যে ছটফট করছি। আলো ফুটতেই বাইরে এসে দেখি ঘর একেবারে লেকের সামনে, লেক-এ জলের ঢেউ। সামনে রীতিমত প্রায় ১০০ ফুট সাদা বালির বিচ! আশ্চর্য, একেবারে মিনিয়েচার সমুদ্র। পাড়ে দু’চারটে নৌকা বাঁধা। তালে তালে দুলছে। তাতে একটা সাদা মাছরাঙা জলের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। পাড়ে ইতিউতি দু’চারটে লোক। আমাদের দলের কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি। এক দাদু বাগানে কাপড় বিছিয়ে কাঠের উপর কোঁদা হাতের কাজের পসরা সাজাচ্ছে। আমাকে ডেকে নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরাধরি। খুব ভালো লাগল না। পরে কিছুমিছু একটা কেনা যাবে, এই বলে ব্রেকফাস্ট খেতে গেলাম।

চা। কফি। পাঁউরুটি। ডিমসেদ্ধ। কলা – এই সব দেখে মনটা দমে গেল। এই খেতে এতদূর আসা? কাজ শেষ করে না বেরোনো অবধি তো বাজারে যাওয়া যাবে না! বিদেশী দেখে কি আমাদের স্বদেশী খাবারে বঞ্চিত করে রাখবে?

দুপুর থেকে অবশ্য আর নিরাশ করেনি কেউ। পাওয়া গেল সিমা – ভুট্টার আটা দিয়ে তৈরি পরিজের মত এক ধরণের মন্ড। স্বাদহীন হওয়ার জন্য নানা ঝোল ঝালের সঙ্গে দিব্যি চলে যায়। সঙ্গে পাওয়া গেল টমেটো পেঁয়াজ দিয়ে রাঁধা কুমড়ো পাতার একটা ভাজা আর ঝোলের মাঝামাঝি কিছু একটা। এদেশের খাবারে বোঝা গেল মশলাপাতি বেশ কম। কুচি কুচি করে কাটা টমেটো, পেঁয়াজ, ক্যাপসিকাম, শশা – তার সঙ্গে নানা মশলা দিয়ে তৈরি স্যলাড নিয়ে বেশ আদিখ্যেতা দেখি – সব খাবারের সঙ্গেই অনুসঙ্গ হিসেবে আসে। রাশভারী নাম দিয়েছে – কচুম্বারি। মন রাখতে পাতের কোনায় মাঝে মাঝে তুলে নিই।

সন্ধ্যাবেলায় হানা দিয়েছি স্থানীয় পাবে। স্থানীয় বিয়ার কুচোকুচো – তাই দিয়ে ছাগল ও মুরগি পোড়া খাওয়া হবে। মুরগি যাও বা হার মানে – ছাগল ছিঁড়তে বাঙালি দাঁত হিমসিম খায়। আমি যা খাই তার থেকে দাঁত খায় বেশি – অর্থাৎ এদিক ওদিক নানা খাঁজে মাংস এমন লুকিয়ে থাকে যে জিভ ও আঙুলের যৌথ প্রয়াসেও তার মান ভাঙানো যায় না।

এরই মধ্যে একদিন গ্রামে গিয়ে ঘোরাঘুরি। ছাগল পোষার চল কম, মুরগি পোষেন অনেকেই। ভুট্টা চাষই প্রধান। কিছু ঘেসো মটর। ইতিউতি বড় বড় মাঠ পড়ে আছে। কেউ খুব একটা চাষবাসের চেষ্টা করছেন না। বাড়ির পেছনে কাসাভা, কলাগাছ। লতিয়ে চলে গেছে লাল আলু। সার, বিষ, ভ্যাক্সিন – এসবের কোনও চিহ্ন নেই কোথাও। অথচ আরও কত কী হতে পারে – কীভাবে গুছানো যায় – কী কী নিয়ে আসা যায় খাবারের প্লেটে এ নিয়ে প্রচুর চর্চা , বাগান তৈরি – এসব চলতে থাকে। অধিকাংশ লোক অনির্দিষ্টভাবে দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। মহিলারা উৎসাহের সঙ্গে বোঝার চেষ্টা করেন। দুচারটে মুরগি জমায়েতের মাঝখান দিয়ে ঘুরে যায়। আমার মনের কোণে উঁকি মেরে যায় – এসব না করলেই বা কী হত, এরা তো দিব্যি আছে – খেয়ে, না খেয়ে!

নিরীহ ঘটনাহীন দিন কিছু কেটে যায়। সারপ্রাইজহীন। বড় বড় তেলাপিয়া ভাজা – উপরে মশলা মাখানো – যাকে এরা বলে চাম্বো – সে মাঝে মাঝে আসে।

জিতুম্বুয়া – পাকা কলার বড়া আসে সকালে।

একদিন চায়ের সঙ্গে এল মুরগির পাকস্থলী ভাজা। কোনোদিন মাংসের পুর দেওয়া পিঠে। অধিকাংশ সন্ধ্যাতেই আমরা পাবে গিয়ে হানা দিই। একদিন খাবার চেষ্টা করলাম মাসেসে – বাজরা দিয়ে বানানো দেশি পানীয় – একেবারে আমাদের হাঁড়িয়ার পরিচিত স্বাদ। কাসভা সেদ্ধ, অথবা লাল আলু সেদ্ধ – গোটা অথবা চটকে মূলত শর্করা হিসাবে আসে। কখনও গরুর মাংসের স্টু। নদীতে ধরা ছোট ছোট মাছ শুকনো ও পরে হাল্কা ভাজা বেশ প্রচলিত খাবার। নানারকম মাছের শুঁটকি এখানে প্রায় ঘরে ঘরে। কচি ভুট্টা সেদ্ধ কোনোদিন আসে পাঁউরুটির বদলে।

আমার দিন ফুরিয়ে আসে মালাওয়িতে। এমন নিস্তরঙ্গ দেশভ্রমণ খুব কমই হয়েছে জীবনে। যাওয়ার সময় দেখেছিলাম হঠাৎ হঠাৎ গ্রামের সামনে কাঠ খোদাইয়ের হাতের কাজের ছোট্ট দোকান – ফেরার সময় সেগুলোতে থেমে কিছু কিনে নিয়ে যাব – এমন ভাবা ছিল। রাস্তার ধারে এমনি এক দোকান থেকে কিনলাম কাঠের প্লেন, গাড়ি, গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকা একদল মানুষের ভাস্কর্য।

ছোট্ট দোকানদার প্রতিটা জিনিসের দাম বাবার কাছ থেকে জিজ্ঞেস করে আসে পাহাড়ের নীচের ঢালের এক বাড়ি থেকে দৌড়ে দৌড়ে গিয়ে। দেখি এয়ারপোর্টে এই একই জিনিসের দাম দশগুণ। একটা চমৎকার লংকার সস কিনলাম। লেক মালাওয়ির ভিজে হাওয়া এয়ারপোর্টের দরজা থেকে ফিরে গেল।

(ক্রমশ)

Leave a Reply