
বৃহস্পতির সবচেয়ে ছোটো গ্যালিলিয়ান উপগ্রহ ইউরোপা গ্রহটির থেকে দূরত্বের বিচারে বর্তমানে ষষ্ঠ উপগ্রহ। এর ব্যাস ৩,১২০ কিলোমিটার। পৃথিবীর চাঁদের চেয়ে সামান্য ছোটো। এর ঘনত্ব প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে ৩.০১৮ গ্রাম। এ থেকেই বোঝা যায় ইউরোপা সিলিকেট পাথরে তৈরি। উপগ্রহটি আইয়োর চেয়ে ছোটো হলেও ঔজ্জ্বল্যের বিচারে আইয়োকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। এর কারণ, যে-পরিমাণ সূর্যকিরণ উপগ্রহটির পৃষ্ঠে আপতিত হয় তার ৭৫ শতাংশই প্রতিফলিত হয়। এই কারণেই ইউরোপাকে অত উজ্জ্বল দেখায়। সমগ্র উপগ্রহটি বরফে আচ্ছাদিত। এর নীচে রয়েছে এক বিশাল তরল জলের মহাসমুদ্র। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই জলের পরিমাণ পৃথিবীতে যত জল আছে তার চেয়েও বেশি। সৌরজগতের কোনও বস্তুর ভূমিরূপের সঙ্গে ইউরোপার ভূমিরূপের কোনও মিল নেই, এটি একেবারেই স্বতন্ত্র। উপগ্রহটির খুব পাতলা বায়ুমণ্ডল আছে যার প্রধান উপাদান অক্সিজেন। যেহেতু ইউরোপায় জলের এবং বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের উপস্থিতি রয়েছে, তাই বিজ্ঞানীদের অনুমান, উপগ্রহটি এককোষী জীব বা ব্যাকটেরিয়া-সদৃশ প্রাণীর মতো বহির্জাগতিক জীবনের আবাসস্থল হলেও হতে পারে।
আবিষ্কার ও নামকরণ
উপগ্রহটি স্বাধীনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন গ্যালিলিও গ্যালিলি এবং সাইমন মারিয়াস। মারিয়াস গ্রিক দেবতা জিউসের প্রেমিকা এবং ক্রিটের রাজা মিনোসের ফিনিশীয় মা ইউরোপার নামে উপগ্রহটির নামকরণ করেন ‘ইউরোপা’। ১৬১০ সালের ৮ জানুয়ারি গ্যালিলিও ইউরোপার সঙ্গে বৃহস্পতির আরও তিনটি উপগ্রহ আইয়ো, গ্যানিমিড ও ক্যালিস্টোর আবিষ্কার করেছিলেন। নিজের তৈরি দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে তিনি এই চারটি উপগ্রহ আবিষ্কার করেছিলেন। যন্ত্রটি নিম্ন রেজোলিউশনের হওয়ায় প্রথম দিকে তিনি আইয়ো এবং ইউরোপাকে পৃথক করতে পারছিলেন না। পরে অবশ্য তিনি উপগ্রহ দুটিকে পৃথকভাবে দেখতে পান।
পূর্ববর্তী জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ইউরোপাকে বৃহস্পতির দ্বিতীয় উপগ্রহ বা ‘বৃহস্পতি-২’ নামে উল্লেখ করতেন। ১৮৯২ সালে আমালথেয়ার আবিষ্কারের পর ইউরোপা তৃতীয় অবস্থানে সরে যায়। কারণ, আমালথেয়ার দূরত্বের বিচারে গ্যালিলিয়ান উপগ্রহগুলির তুলনায় বৃহস্পতির আরও কাছে। ইউরোপার এই তৃতীয় অবস্থানও বেশিদিন রইল না। ১৯৭৯ সালে গ্রহটির কাছাকাছি আরও তিনটি উপগ্রহ আবিষ্কারের পর ইউরোপা এখন বৃহস্পতির ষষ্ঠ উপগ্রহ, যদিও এটিকে এখনও বৃহস্পতি-২ হিসাবেই উল্লেখ করা হয়।
ভূপৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্য ও আভ্যন্তরীণ গঠন
ইউরোপা সৌরজগতের মসৃণতম বস্তু। এখানে উঁচু পাহাড় এবং গভীর গহ্বর অনুপস্থিত। ১ কিলোমিটারের চেয়ে উঁচু পাহাড় এখানে নেই বলেই বিজ্ঞানীদের অনুমান। উপগ্রহটির পৃষ্ঠে ১০ থেকে ৩০ কিলোমিটার ব্যাসের সীমানার মধ্যে মাত্র ৫টি উল্কাপাতজনিত ক্ষত দেখতে পাওয়া গেছে। এখনও পর্যন্ত ৩টি গহ্বর খুঁজে পাওয়া গেছে যাদের ব্যাস ৫ কিলোমিটারের বেশি। এ থেকে বিজ্ঞানীদের অনুমান, ইউরোপার পৃষ্ঠ যথেষ্ট নবীন ও সক্রিয়। তবে এ-কথাও ঠিক, ভয়েজার মারফত এখনও পর্যন্ত উপগ্রহটির সামান্য এক অংশের স্পষ্ট ছবি পাওয়া গেছে। তাই পর্যবেক্ষণ এখনও অনেক বাকি। অনুমান করা হয় যে, ইউরোপায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার পুরু একটি জলীয় স্তর রয়েছে যার উপরের স্তর বরফে আচ্ছাদিত এবং নীচে রয়েছে লবণাক্ত তরল মহাসাগর। উপগ্রহটির সঠিক বয়স এখনও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
ইউরোপার সমগ্র পৃষ্ঠতল জুড়ে রয়েছে কালো আড়াআড়ি কাটা রেখা। এই ধরনের ভূমিরূপকে বলা হয় ‘শিরা’ (ridges) ও ‘লিনিয়া’ (linea)। এছাড়াও রয়েছে ফোলা, ফাটল এলাকা যাদের বলা হয় ‘ক্যাওস’ (chaos), সরু দীর্ঘ খাঁজ বা রেখা (grooves) এবং অগভীর খাদ (pits)। উপগ্রহটির পৃষ্ঠে আরও একটা জিনিস দেখা যায়, সেগুলি হল কালো কালো ছোপ (marks)। এগুলির ব্যাস ৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটারের মতো। আরও একটি আকর্ষণীয় ঘটনা লক্ষ করা গেছে। সেগুলি হল চক্রাকার চিড়। এদের বলা হয় ‘ফ্লেক্সি’ (flexi)। বিজ্ঞানীদের অনুমান, বরফের নীচে যে জল রয়েছে তার উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে জলের যে প্রসারণ ঘটে তার চাপেই বরফে ফাটল ধরে।
ভৌত বৈশিষ্ট্য
পৃথিবীর চাঁদের তুলনায় ইউরোপা আকারে সামান্য ছোটো। এর ব্যাস ৩,১০০ কিলোমিটারের চেয়ে সামান্য বেশি। এটি সৌরজগতের ষষ্ঠ বৃহত্তম চাঁদ। এটি সিলিকেট শিলা দ্বারা গঠিত। উপগ্রহটিতে খুব পাতলা অক্সিজেনের বায়ুমণ্ডল রয়েছে। এই বায়ুমণ্ডল সৃষ্টির পিছনে রয়েছে সূর্যালোক ও আয়নিত কণার প্রভাব। বিজ্ঞানীদের অনুমান, ইউরোপার পৃষ্ঠদেশে যে সূর্যালোক আপতিত হয় তাতে বরফের চাদরের উপরিতল থেকে যে জলীয় বাষ্পের উৎপত্তি হয় তা বিয়োজিত হয়ে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন তৈরি করে। উপগ্রহটি হালকা হাইড্রোজেন ধরে রাখতে পারে না, তা বায়ুমণ্ডলের আওতায় ছেড়ে চলে যায়, অক্সিজেন থেকে যায়। উপগ্রহটি অত্যন্ত ঠান্ডা, উষ্ণতা (-)১৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিজ্ঞানীদের মতে, উপগ্রহটিতে প্রাণের উদ্ভবের পরিবেশ রয়েছে।
প্রাণের অস্তিত্ব
ইউরোপায় এখনও পর্যন্ত কোনও জীবনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা এই সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তাঁদের ধারণা, ইউরোপার তলদেশে মহাসাগরের হাইড্রোথার্মাল ভেন্টগুলির মতো পরিবেশে জীবন থাকলেও থাকতে পারে। অন্যথায়, পৃথিবীর মেরু অঞ্চলে যেমন শৈবাল ও ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, তেমন ইউরোপার বরফের স্তরের নীচে অথবা উপগ্রহটির মহাসাগরে মুক্তভাবে এদের থাকাটা অসম্ভব নয়। ফ্লাইলোসিলিকেটস (মাটিজাতীয় একধরনের খনিজ) ইউরোপার বরফের আবরণে পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই খনিজগুলির উপস্থিতি সম্ভবত কোনও অ্যাস্টেরয়েড বা কমেটের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে হতে পারে।
উপসংহার
আমাদের সৌরজগতের অন্যতম রহস্যময় উপগ্রহ ইউরোপা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। এর বরফে ঢাকা উপসমুদ্রগুলিতে পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্বের আশাকে জাগিয়ে তোলে। যদি সত্যিই ইউরোপার সমুদ্র-জলে প্রাণের কোনও চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় তবে তা হবে আমাদের গ্রহের বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। তাই ইউরোপা শুধু বৃহস্পতির একটি উপগ্রহ নয়, বরং এটি বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের উৎসস্থল।
ধ্রুবতারা ধ্রুব নয়, মহাকাশে আমরা কোথায়, বিস্ময় ভরা ‘আদ্রা’ নক্ষত্র, সৌড়ঝড়ের আঘাতে টালমাটাল পৃথিবী, কৃষ্ণগহ্বর, পিঙ্গল বামন, সূর্য, সৌরকলঙ্ক, মহাকাশের ভূতুড়ে আলো, কোয়াসার, মহাকাশের অচেনা বস্তু-পালসার, মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ (অশ্বিনী থেকে রেবতী) – (১), মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-২, মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৩, মহাবিশ্বে মহাকাশে-আকাশগঙ্গার ভবিষ্যৎ, মহাবিশ্বে মহাকাশে-মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৪, মহাবিশ্বে মহাকাশে-মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৫,চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৬, অগস্ত্য-বাতাপি উপাখ্যান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান, মহাবিশ্ব সৃষ্টির গোড়ার কথা, মহাবিশ্বে মহাকাশে- নক্ষত্র সৃষ্টির রহস্য, মহাবিশ্বে মহাকাশে-নক্ষত্রের শেষ দিন, মহাবিশ্বে মহাকাশে- চাঁদের ভবিষ্যৎ, মহাবিশ্বে মহাকাশে তারাজগতের সৃষ্টি রহস্য, মহাবিশ্বে মহাকাশে তারাজগতের প্রকারভেদ, মহাবিশ্বে মহাকাশে – বিচিত্র গ্যালাক্সি, ১১-এর জালে নিল আর্মস্ট্রং, মহাবিশ্বে মহাকাশে-গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে-বুধ গ্রহ, মহাবিশ্বে মহাকাশে-গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে-শুক্র গ্রহ, মহবিশ্বে মহাকাশে-আমাদের বাসভূমি পৃথিবী, মহবিশ্বে মহাকাশে-চাঁদ, মঙ্গলগ্রহ, ফোবস
জয়ঢাক প্রকাশন থেকে এই লেখকের লেখা মহাবিশ্বে মহাকাশে বইটি কিনতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন
বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে