আগের পর্ব ধনেশ, মাছরাঙা, মুনিয়া, কাজল পাখি , দোয়েল-কোকিল-ময়নাবুলবুল, বকপাখি, মোনাল দেখার গল্প,পাঁচ বউয়ের কাহিনি, ঘুঘুর বাসা, টুনটুনি,বাঁশপাতি, মোহনচূড়া , হাট্টিমাটিমটিম থেকে হটিটি, রামগাংড়া, ডাহুক কেন ডাকে, বাদামি কোকিল, পাপিয়া, পাতি জলমুরগি, প্যাঁচা, পানডুবি, নীলকণ্ঠ, কাস্তেচরা, চাতক, কালো মথুরা
Blue Whistling Thrush
আজ পর্যন্ত যতবার হিমালয় ভ্রমণে গেছি, আমার প্রথম পাখি দর্শন আরম্ভ হয়েছে পাহাড়ি কস্তুরা দিয়ে। তাই জন্য এই পাখিকে আমি আমার লাকি ম্যাসকট বলে মনে করি কারণ একে দেখার পর থেকে শুরু হয় অন্যান্য পাখিদের আগমন। সর্বশেষ ভ্রমণে কোলাখামে ভোর বেলা আমার ঘুম ভেঙেছিল বড়ো বসন্তবৌরির ডাকে। কিন্তু বাইরে এসে প্রথমেই চোখে পড়ে কস্তুরা। সামনে এক ডালে বসে যেন আমার দিকেই তাকিয়ে, মনে হয় কত দিনের পরিচিত। এমন একটা ভাব যে আমাকে বুঝিয়েই ছেড়েছে যে ওর ছবি না তুলে ক্যামেরা অন্যদিকে তাক করা যাবে না। এর আগে বিজনবাড়িতেও একই ঘটনা। এমনকি জিম করবেট, গোরুমারা, জলদাপাড়া, লাটপাঞ্চার, তুঙ্গনাথ, চন্দ্রশীলা ও বক্সাতেও এই আমাকে প্রথম দর্শন দিয়েছে। আর কি আশ্চর্য, ছবি না তুলে পারা যাবে না। একবারে যাকে বলে নাছোড়বান্দা। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি এই পাখির দেখা এমনই যেন সর্বদা পাই যেখানেই যাই। কারণ যেমন সুন্দর দেখতে, তেমনই মিষ্টি এর ডাক। দৃষ্টি এর দিকে পড়বেই। দ্য জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া(জেডএসআই), ভারত সরকারের পরিবেশ, বন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক দ্বারা প্রকাশিত বই – দা বার্ডস্ অফ ইন্ডিয়া – তে এই পাখিকে প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন (International Union for Conservation of Nature – I.U.C.N) ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণা পক্ষিপ্রেমিকদের কিছুটা আশ্বস্ত করবে।
এ পাখিটির নাম কস্তুরা অথবা নীল শিসদামা। ইংরেজি নাম Blue Whistling-thrush এবং বৈজ্ঞানিক নাম Myophonus Caeruleus। এরা মাঝারি আকারের পতঙ্গভুক পাখি। এদের ঠোঁট চাপা এবং শক্ত। মাঝে মাঝে দেখা মেলে; সব সময় নয়। এরা আকারে আমাদের কাক-এর মতো। প্রায় ৩৩ সেন্টিমিটার। শরীর কালচে-নীল রঙের। তবে সারা শরীরে হালকা রূপোলি রঙের তিলা রয়েছে। চঞ্চু হলুদ। পা কালো রঙের এবং চোখের রং কালচে বাদামি। ছেলে এবং মেয়ে পাখির চেহারা অভিন্ন। এরা খুব সকালে এবং সন্ধে নামার ঠিক আগে খুব বেশি কর্মচঞ্চল থাকে। কেঁচো, শামুক, কাঁকড়া, ব্যাঙ, লার্ভা, পানি বা ছড়ার পোকা, পাকা ফল এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে। এরা বাঁশির মতো সুর করে গান গাইতে পারে। নীল শিসদামা সাধারণত বনের স্রোতধারা, নদী ও বৃক্ষঢাকা অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়। পাহাড়ি জলধারের কাছে ভূমিতে ঝরাপাতা উল্টে খাবারের সন্ধান চালায়। এছাড়াও নরম মাটি চঞ্চু দিয়ে খনন করে এবং অগভীর জলে ঠোকর মেরে শিকার ধরে খায়।
ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন, তিব্বত, আফগানিস্তান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ এশিয়ায় এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে। এপ্রিল-আগস্ট মাসে প্রজননকালে ছেলে পাখি মেয়ে পাখিকে আকর্ষণ করার জন্য বুক ফুলিয়ে লেজ মেলে ডানা প্রসারিত করে এলাকা রক্ষা করে। এরা জলধারার কাছে পাহাড়ে বা মাটির ফাটলে সবুজ শেওলার উপর ক্ষুদ্র মূল বিছিয়ে বাটির মতো বাসা বানায়। নিজেদের বানানো বাসায় মেয়েপাখি ৩-৪টি ডিম পাড়ে।
এই পাহাড়ি কস্তুরার প্রথম দর্শন আমি পাই বক্সাদুয়ার অভয়ারণ্যে। আমরা দুপুরে পোঁছে চুনাভাতি নামে এক গ্রামের উদ্দেশে রওনা হব। সকলে তৈরি হচ্ছে। আমি আগেই প্রস্তুত ছিলাম। সকলে বাইরে বেরোবার আগে আমি আমার ক্যামেরা হাতে নিয়ে আশেপাশে একটু পর্যবেক্ষণ করতে গেলাম। প্রথমেই এক বাড়ির চালের ওপর দেখলাম এই অদ্ভুত সুন্দর নীল রঙের পাখি। একটু পরে উড়ে গিয়ে আরেক ঝোপের মধ্য গিয়ে বসল। বক্সা-র প্রথম পাখি দর্শন। তারপর গোরুমারাতে, জলদাপাড়াতে, লাটপাঞ্চারে এবং জিম করবেট টাইগার রিজার্ভেও সর্বপ্রথম কস্তুরার দর্শন পেয়ে তারপর থেকে অন্যান্য পাখিদের দেখতে পেয়েছি। তারপর থেকেই আমার মনের মধ্যে একটা ধারণা হয়ে গেল যে আগে যদি পাহাড়ি কস্তুরার দর্শন মেলে তবেই আকাঙ্ক্ষিত পাখির দেখা পাওয়া যাবে। তাই এখন যখনই হিমালয়ের উদ্দেশে রওনা হই আগে পাহাড়ি কস্তুরার ডাক শোনার চেষ্টা করি। একবার পেয়ে গেলে বাকি পাখিদের নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।
গোরুমারা ও জলদাপাড়া অভয়ারণ্যে জিপ সাফারি করতে গিয়ে এক পর্যবেক্ষণ মিনার (ওয়াচ টাওয়ার) থেকে গাছের ডালে দেখতে পেলাম। নাম জানা ছিল, কিন্তু সাক্ষাত সেই প্রথম, এবং সেইসঙ্গে পাখি দেখার সূচনাও। তারপর থেকে হিমালয় ভ্রমণের সব স্থানে নীল শিসদামাকে দিয়েই প্রারম্ভ হয়েছে পাখি দেখা। ২০১৯ সালে শান্তনু আহ্বান জানাল তুঙ্গনাথ ও চন্দ্রশিলা ট্রেকের জন্য। নাম শুনেই চমকে উঠেছিলাম। চোপতা থেকে চন্দ্রশিলা পর্যন্ত এলাকা কেদারনাথ অভয়ারণ্যের মধ্যে পড়ে। বহু দিনের ইচ্ছা যে একবার স্বচক্ষে হিমালয়ের মোনাল পাখির দর্শন পাওয়া। সুতরাং সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। মোনাল আমাকে দেখতে হবেই। উত্তরাখণ্ড রাজ্যের প্রাদেশিক ও নেপালের জাতীয় পাখি বলে কথা। পাড়ি দিলাম তুঙ্গনাথ ও চন্দ্রশিলার উদ্দেশে জয়ঢাকি দলের এক সদস্য হয়ে। চোপতা থেকে ৩.৫ কিমি পথ হেঁটে ওঠা, পুরোটাই চড়াই, প্রায় ১২০৭৩ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত মহাদেবের মন্দির ও তৃতীয় কেদার হিসাবে চিহ্নিত। সেখান থেকে আবার পরের দিন চন্দ্রশিলা চূড়া, উচ্চতা আনুমানিক ১৩০০০ ফুটের কাছাকাছি। এসেই যখন পড়েছি তখন উঠতে তো হবেই। যতই চড়াই উঠে চলেছি চারদিকের সৌন্দর্যে ততটাই সম্মোহিত অনুভব করছি। একদিকে তুষারাবৃত বিভিন্ন পাহাড় চূড়া। প্রথমেই চোখে পড়ে চৌখাম্বা – চারটে মিনার বরফে ঢাকা, তার পেছনে জাহ্নুকূট, অন্যদিকে কেদারনাথ চুড়া ও তার পাশেই সুমেরু, কড়চাকুন্দ, মন্দনিস ও অন্যদিকে জাঁওলি, গঙ্গোত্রী ও যোগিন ইত্যাদি। আর পথের দু’ধারে রয়েছে প্রকৃতির তৈরি বাগান যেখানে ফুটে রয়েছে অপুর্ব রঙিন রডোডেন্ড্রন। পথ চলার ক্লান্তি গায়ে লাগে না। আর আমার চোখ জোড়া খুঁজে বেড়াচ্ছে হিমালয়ের পাখি, অবশ্যই মোনাল আর অন্য পাখি সঙ্গে উপরি পাওনা। তুঙ্গনাথ পর্যন্ত সেদিন পথে কোনও পাখি পাওয়া গেল না।
দুপুরে পৌঁছে তখন শীতে কাঁপছি। মে মাস, দিল্লিতে তাপমান ৪৮ ডিগ্রি, হরদ্বারে ৪৪ ডিগ্রি এমনকি দেবপ্রয়াগ ও রুদ্রপ্রয়াগে তাপমাত্রা যথাক্রমে ৩২ থেকে ৩৫এর মধ্যে। সেদিন বিকেলে যখন উখিমঠ পৌঁছলাম তখন তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রির কাছাকাছি আর রাতে ৯-১০ ডিগ্রির মধ্যে। পরের দিন সকালে চোপতায় জানা গেল তা নেমে দিনের বেলায় ১২ ডিগ্রি যেটা তুঙ্গনাথে ১০-এ নেমে এসে এসেছে। তাহলে একবারে ৪৮ থেকে ১০এ এলে শরীরের মানিয়ে নিতে সময় তো লাগবেই। আমরা বাঙালিরা তো আর পাহাড়ের মানুষের মতো নয়। বিপরীত পরিস্থিতে পাহাড়ি মানুষেরও একই অবস্থা হবে। যাই হোক স্নান আহার সেরে বসে রয়েছি আর অন্যদের সঙ্গে গল্পে মেতে রয়েছি- তার মধ্যে চোখ অনুসন্ধানের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মন্দিরের ঠিক নীচে বসে আছি আমরা আর আমাদের ওপরেই এক মস্ত উঁচু পাহাড়ি শিলা। এক জোড়া পাখি সমানে উড়ে যাচ্ছে আর ফিরছে খড়কুটো নিয়ে। বুঝলাম পাহাড়ের পাথরের খাঁজে মধ্যে এদের বাসা রয়েছে। চোপতা- তুঙ্গনাথ পাহাড়ে প্রথম পাখি দর্শন সেও কস্তুরা অথবা নীল শিসদামা। আমার পাখি দেখার শুভ সূচনা হল। এই তার ছবি।

সব শেষে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কালিম্পঙে অবস্থিত কোলাখাম পাহাড়ি গ্রামে ভ্রমণ গিয়েছিলাম। এই কোলাখামে কেবল ৫৬০ জন মানুষের বসবাস। এই গ্রামটি নেওড়া ভ্যালি অভয়ারণ্যের মধ্যে অবস্থিত সুতরাং পাখি যে প্রচুর পরিমাণে আছে তাতে সন্দেহ নেই।
আমাদের পৌঁছতে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। হোমস্টের দোতলায় থাকার ঘর আর সামনে খোলা বারান্দা আছে। সামনে পাহাড় দেখা যায়। অনেক গাছপালা আছে। অর্থাৎ পাখির অভাব হবে না। পরদিন ভোরবেলা ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে। বাইরে একটা বড়ো বসন্তবৌরি ডাকছে শুনতে পেলাম। ক্যামেরা তৈরি ছিল। নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম বাকিদের যাতে ঘুম না ভাঙে। কিন্তু কী আশ্চর্য! বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে প্রথমেই একটি বাঁশের খুঁটির ওপর দেখলাম এক পাহাড়ি কস্তুরি। সোজা আমার দিকে তাকিয়ে। মনে মনে ভাবলাম এটা আবার আমার শুভ সূচনা হল কোলাখামে পাখি দেখার। ওকে লেন্সবন্দি করার পর থেকে এক এক করে প্রতিদিন নতুন সব হিমালয়ের পাখি ধরা দিল আমার লেন্সে। এই তার ছবি।

হোমস্টের মালিক অবাঙালি এক ভদ্রলোক, চন্ডিগড়ের মানুষ কিন্তু কোলাখামকে ভালবেসে এখানে এক হোমস্টে খুলে বসেছেন। ওঁর উদ্দেশ্য কেবল অর্থ উপার্জন নয়। উনি সর্বপ্রকার প্রকৃতি সংরক্ষণের কাজ করে চলেছেন এখানে। প্লাস্টিকের বোতলে মাটি ভরে নানারকম গাছ লাগাচ্ছেন। বর্জ্য আবর্জনা থেকে সার তৈরি করছেন। সব থেকে বড়ো কথা ওঁর হোমস্টে সম্পূর্ণ সৌরশক্তিতে চলে। নিজে একজন প্রকৃতিবিদ এবং কোলাখামের পাখি দেখার ব্যাপারে খুব ভাল অভিজ্ঞতা। আমাকে খুব সাহায্য করেছেন কোলাখাম চেনাতে। কিন্তু পাখির দেখা পাওয়া অবশ্যই তিনটি ব্যাপার খুব প্রয়োজনীয় – ভাগ্য, সময় আর ধৈর্য। সবকটাই এই সফরে আমার সঙ্গে ছিল তাই পাখি দেখার অভাব হলনা। কারণ কিন্তু একটাই – আমার শুভ সূচনা – পাহাড়ি কস্তুরার প্রথম দর্শন।
বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে