অমিত দেবনাথের আরো গল্প- ওরা, অতলের ইশারা মূল-আর্থার কোনান ডয়েল, আসল নকল-বিল প্রনজিনি, নয় মাইল হাঁটা হ্যারি কেমেলম্যান, দখল ফিলিপ কে ডিক, ফাদার ম্যাকক্লেসফিল্ডের কাহিনি -রবার্ট হিউ বেনসন, ইংরিজি গল্প-ভয়ানক এক রাতের গল্প কোনান ডয়েল–নাইট অ্যামং দ্য নিহিলিস্ট, ইংরিজি গল্প-আগে আমার কথা শোন জন ম্যাকলে, ইংরিজি গল্প -একটা লোকে্র গল্প ডাবলিউ ডাবলিউ জ্যকব্স্, ইংরিজি গল্প-আর কিছুক্ষণ ডব্লিউ এফ হার্ভে-আগস্ট হিট, ইংরিজি- পোড়া বাড়ি ভিনসেন্ট ও’সুলিভান, ইংরিজি-সাইন অব ৪০০রয় ম্যাকার্ডেল,ইংরিজি-এক সন্ধ্যায় শার্লক হোমসের সঙ্গে জেমস ম্যাথিউ ব্যারি।, ইংরিজি জোর বরাত-শিয়ার্লাকস্ট্যানলি জ্যাক রুবিনস্টাইন, ইংরিজি- কাপড়-মেলা দড়ির রহস্য ক্যারোলিন ওয়েলস , সুমাত্রার দানব ইঁদুর , বিদেশি গল্প–শার্লক হোমস ও ড্রুড রহস্যএডমণ্ড লেস্টার পিয়ার্সন। অনুঃ অমিত দেবনাথ, হারানো হিরের রহস্য জর্জ এফ ফরেস্ট, কথোপকথন- আর্থার চ্যাপম্যান, বিড়ম্বিত মধুচন্দ্রিমা, হ্যালোউইন ম্যান

যে যতই বলুক, কেটি কিন্তু পুরো বিশ্বাস করে। কাকে? কাকে আবার, হ্যালোউইন ম্যানকে। তার লম্বা লম্বা হাড্ডিসার হাত, তার তীক্ষ্ণ দাঁতের সারি, কোটরে ঢোকা জ্বলন্ত চোখ, তার লম্বা কোটের ছদ্মবেশ, তার গায়ে কবরের মাটির গন্ধ, মাথাভরা মাকড়শার জালের মতো চুল—সবকিছু। স-অ-ব।
হ্যালোউইন ম্যান।
তবে কী জানো, এই কথাটা কেটি জানকে প্রথমবার বলতেই সে লাফিয়ে উঠেছিল।—”যা যা, তুই মিথ্যে বলছিস।”
জানের বয়স ন’বছর—সে কেটির চেয়ে এক বছরের ছোটো। কেটি অবশ্য ওর চেয়ে অনেক জোরে ছুটতে পারে, আর লাফও দিতে পারে।
“ওসব সত্যি না।” বলেছিল জান।
“সত্যি।” বলেছিল কেটি।
“সত্যি না।”
“সত্যি।”
আর তক্ষুনি জান কেটিকে একটা থাপ্পড় মারল। জোরসে। এত জোরে যে কেটির চোখে জল চলে এল প্রায়।
“তুই খালি মিথ্যে বলে সবাইকে ভয় দেখাস,” বলল জান, “বিচ্ছিরি মেয়ে কোথাকার!”
“আমি মিথ্যে বলছি না।” কান্না চাপতে চাপতে বলেছিল কেটি, “ও আসল। ও আমাদের এখানেও আসবে। হ্যালোউইনের রাতেই আসবে। তুই দেখে নিস।”
এ শহরে নাম সেন্টার সিটি। শহরটা ছোটো। মিসৌরির কৃষিপ্রধান অঞ্চল। চারদিকে অক্টোবর মাসের গাছপালা উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। পুবদিকে চাষের ক্ষেত, পশ্চিমে একটা লেক। দিনের বেলা এ-শহরটা দারুণ উজ্জ্বল। কিন্তু রাত্তিরে, যখন বড়ো বড়ো ওক আর মেপল গাছগুলো অন্ধকারে ঢেকে যায়, কালো কুচকুচে লেকের জলে হাওয়ার ঝাপটায় ওঠে ছলাত ছলাত ঢেউ, তখন এই সেন্টার সিটিই কিন্তু ভয়ংকর হয়ে ওঠে একটা দশ বছরের ভূতপ্রেতে বিশ্বাস করা বাচ্চার কাছে। বিশেষ করে হ্যালোউইনের রাতে।
সারা অক্টোবর মাস জুড়েই স্কুলে গিয়ে কেটি হ্যালোউইন ম্যানের কথা ভেবেছে। এ-ব্যাপারে তাকে প্রথম বলেছিল টড পেপার। টডের খুব বুদ্ধি। অনেক বড়োও ও। টডের বয়স তেরো। সত্যিকারের বড়ো শহর ইন্ডিয়ানাপোলিস থেকে এসেছে ও, আর কে না জানে সত্যিকারের বড়ো শহরের বাচ্চাদের কথাবার্তাও সেইরকমই হয়। ঝকঝকে কথা, চকচকে পালিশ। বড়ো বড়ো শহরের ব্যাপারই আলাদা।
টড ওদের এখানে এসেছিল গরমের ছুটিতে ওর ঠাকুর্দা-ঠাকুমা মি. আর মিসেস উইলার্ডের সঙ্গে দেখা করতে। আগস্ট মাসেই একদিন টাউন লাইব্রেরিতে তার সঙ্গে কেটির দেখা হয়ে যায়। টড তখন দত্যিদানোর ওপর একটা বই ঘাঁটছিল।
দুই বাচ্চা কাছাকাছি থাকলে আলাপ হতে একটুও দেরি হয় না। কাজেই কথায় কথায় কেটি যখন তাকে জিজ্ঞেস করল সে কখনও দত্যিদানো দেখেছে কি না, তখন টডের চোখ দুটো একটু কুঁচকে গেল। একটা বাঁকা হাসিও দেখা গেল তার মুখে।
“দেখেছি বইকি, দেখেছি একটাকে।” বলল টড পেপার।—”হ্যালোউইন ম্যানকেই দেখেছি। তার মাথায় থাকে একটা বিচ্ছিরি গন্ধওয়ালা টুপি, কাঁধে একটা ঝোলা। এক্কেবারে সান্তাক্লজ়ের মতো। কিন্তু সেই ঝোলাতে কোনও পুতুল থাকে না। থাকে অন্য কিছু।”
“কী থাকে?”
“আত্মা। মানুষের আত্মা। ওই জোগাড় করতেই তো ও বেরোয়।”
কেটি একটা ঢোঁক গিলল। বলল, “ওগুলো—মানে কোত্থেকে পায়?”
“ছোটোদের থেকে। বাচ্চাদের থেকে। হ্যালোউইনের রাতে।”
লাইব্রেরির একটা বড়ো কাঠের টেবিলের একধারে বসে কথা বলছিল ওরা। এবার টড সামনে ঝুঁকে মুখ নিয়ে এল কেটির মুখের সামনে।—”একমাত্র ওই সময়েই ওকে দেখা যায়। ওই সময়েই ও শক্তি পায় কিনা।” আবার সেই বাঁকা হাসি ফুটে উঠল ওর মুখে।—”ও আসে ভেসে ভেসে, গায়ে থাকে ছেঁড়াখোঁড়া কাকতাড়ুয়ার মতো কোট। ওর চোখ দুটো ভাঁটার মতো জ্বলতে থাকে, আর কাঁধে থাকে ঝোলা। রাতের অন্ধকারে পা টিপে টিপে হাঁটে, রাস্তার পাশে ঘাপটি মেরে দাঁড়ায়।”
“ও কী করে?” জিজ্ঞেস করেছিল কেটি।—”কীভাবে ও বাচ্চাদের আত্মা নেয়?”
“ও ওর দুই হাত দিয়ে বাচ্চাদের দুই গাল ধরে দারুণ ঝাঁকুনি দেয়। বড়ো বড়ো লোম সেই হাতে। সেই ঝাঁকুনির চোটেই আত্মাটা শরীর থেকে বেরিয়ে আসে, তারপর ঝোলায় ঢুকে যায়।”
শুনে কেটির খুব ভয় লাগছিল। তাও সে প্রশ্ন থামাতে পারল না।—”ও ওগুলো নিয়ে তারপর কী করে?”
বাঁকা হাসল টড। করুণার হাসি।—”খেয়ে ফেলে।” বলল টড।—”সারাবছর ধরে খায়। তারপর আবার হ্যালোউইন আসে, ওর খাবারও শেষ হয়ে যায়, ও আবার বেরিয়ে পড়ে নতুন খাবারের সন্ধানে। কাঠবেড়ালি দেখেছ তো? ওরা যেরকম শীতের জন্য খাবার সংগ্রহ করে রাখে, ও-ও সেরকম।”
“আর, তুমি তাকে দেখেছ? সত্যি সত্যি দেখেছ?”
“দেখেছি মানে? আমি যখন তোমার মতো ছোটো ছিলাম, তখন একবার হ্যালোউইন ম্যান আমাকে তাড়া করেছিল। টেক্সাসের হ্যাভারশিস-এ। ওটাও এটার মতো ছোটো শহর। হ্যালোউইন ম্যান অবশ্য ছোটো ছোটো শহরই পছন্দ করে।”
“ও আসে কীভাবে?”
“হাওয়ায় ভেসে আসে।”
“কিন্তু আসে কেন?”
“বাচ্চাদের ধরতে, আবার কেন? এইসব ছোটো শহরে বাচ্চারা আর লুকোবে কোথায়? এখানে তো সবকিছুই খোলামেলা। বড়ো শহরেই বরং ওর অসুবিধে।”
চেয়ারে নড়েচড়ে বসল কেটি। নীচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে বলল, “ও কি তোমাকে ধরেছিল—টেক্সাসে?”
“না, ধরতে পারেনি।” চোখ পিটপিট করে বলল টড।—”ধরতে পারলে তো আমি মরেই যেতাম।”
“পালালে কী করে?”
“দৌড়ে পালালাম। ও খুব জোরে দৌড়তে পারে। গিরগিটির মতো। কিন্তু আমি তার থেকেও জোরে দৌড়তে পারি। সেইরকমই একখানা জোর দৌড় মেরে লুকিয়ে পড়লাম। একেবারে মাঝরাত পর্যন্ত। কেন বলো তো? কারণ, মাঝরাত হয়ে গেলেই ওর শক্তি কমে যায়। তখন ও ধোঁয়ার মতোই ভ্যানিশ হয়ে যায়।”
“আমি কিন্তু ওকে দেখিনি।” বলল কেটি, “দেখলে ঠিক মনে থাকত।”
“সে হতে পারে।” মাথা নেড়ে বলল টড পেপার—”তবে ওকে দেখা অত সহজ নয়।”
“কেন?”
“হ্যালোউইন ম্যান জাদু জানে। ও যে-কোনো মানুষের ঘাড়ে চড়তে পারে। বাচ্চা নয়, বড়ো মানুষের। ধরো, মাঝে মাঝে আমরা যেরকম এক লাফ মেরে পাশের ঘরে ঢুকে যাই, ও-ও সেইরকম লাফ মেরে মানুষের শরীরের মধ্যে ঢুকে যায়।”
“অন্য লোকের শরীরেই যদি ঢোকে, তাহলে কী করে বোঝা যাবে এটা হ্যালোউইন ম্যান?”
“যতক্ষণ না ও তোমার ঘাড়ে লাফাবে, ততক্ষণ কিছুই বোঝা যাবে না।” বলল টড পেপার—”কিন্তু তুমি যদি ভালো করে খেয়াল করো, ওর দিকে তাকিয়ে দেখো, তাহলে নিজেই বুঝে যাবে।”
“কীভাবে?”
“শিকার যেভাবে বুঝতে পারে তার পেছনে শিকারি তাড়া করেছে, সেভাবে। তখন শিকার বুঝতে পারে পালাতে হবে। হ্যালোউইন ম্যানের ক্ষেত্রেও তাই। তবে কিনা, যে-মুহূর্তে তুমি ওকে চিনে ফেলবে, ও আর তোমাকে কিছু করতে পারবে না। তখন তুমিই ওকে চালনা করবে।”
“ওই বইয়ে ওর কোনও ছবি আছে?”
টড বইয়ের পাতাগুলো ফড়ফড় করল খানিকক্ষণ।—”নাহ্। অবশ্য ছবি তুলবেই-বা কে? ও তো বাচ্চাদের ধরেই খপাৎ করে ঝোলায় পুরে ফেলে। তবে আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি ওকে দেখতে কীরকম। কাজেই যতক্ষণ ও কারও শরীরে না ঢুকছে, তুমি ওকে চিনতে পারবেই।”
“থ্যাংকস।” বলল কেটি—”বলে ভালো করলে। আশা করি ও সেন্টার সিটিতে কখনও আসবে না।”
“হয়তো আসবে না।” টড দত্যিদানোর বইটা বন্ধ করল ফটাস করে।—”তবে কিনা, আসতেও পারে। বললাম না, ও ছোটো শহর পছন্দ করে? হয়তো এখানে আসা ওর বাকি আছে।”
কেটির সঙ্গে টড পেপারের এইটুকুই কথা হয়েছিল। গরমের ছুটি শেষ হল। স্কুল খুলে গেল। টডও ফিরে গেল ইন্ডিয়ানাপোলিসে। কেটি রয়ে গেল সেন্টার সিটিতেই। তার মাথা-ভরতি গজগজ করছে নতুন নতুন চিন্তা—সেগুলো সব হ্যালোউইন ম্যান সম্পর্কেই।
তারপর এল অক্টোবর মাস। গাছের কমলা-হলুদ-লালচে-সোনালি পাতারা কেটির স্কুল যাওয়ার পথে পায়ের তলায় লুটোতে লাগল; গাছের ফাঁক দিয়ে দেখতে পাওয়া লেকের জল ক্রমশ ঠান্ডা আর কালচে হয়ে উঠতে লাগল; ইতস্তত ঝোড়ো হাওয়া দুলিয়ে দিতে লাগল তার কোট; এলোমেলো করে দিতে লাগল মাথার চুল। বৃষ্টি হতে লাগল মাঝে-মাঝেই—অক্টোবর মাসের সেই বৃষ্টি কনকনে ঠান্ডা। চারদিকের সবকিছু সেই বৃষ্টিতে কুঁকড়ে যেতে থাকল ভেজা বেড়ালের মতো; বৃষ্টিভেজা গাছের পাতা তার পোশাকে আটকে যেতে থাকল মৃত ত্বকের মতো।
কেটি অক্টোবর মাসটা কখনোই পছন্দ করে না। কিন্তু এই বছরটা যেন তার সবচেয়ে খারাপ লাগছে। যখন থেকে সে জেনেছে হ্যালোউইন ম্যান সম্পর্কে, যখন থেকে সে জেনেছে হ্যালোউইন ম্যান হ্যালোউইনের রাত্তিরে তাদের শহরেও আসতে পারে—তার কাঁধে থাকবে আত্মা রাখার ঝোলা, অন্ধকার ফুঁড়ে এগিয়ে আসবে তার ভাঁটার মতো লাল চোখ।
গত এক সপ্তাহ ধরে কেটি স্কুলে এতই অন্যমনস্ক রইল যে তার টিচার মিস প্রেন্টিস তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন—সঙ্গে একটা চিঠি, কেটির বাবাকে লেখা। সেটা এইরকম:
কেটিকে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। সারাক্ষণই কী যেন ভাবে। পড়ায় খুবই অমনোযোগী হয়ে পড়েছে। ও হোমওয়ার্কও ঠিকমতো করছে না, ক্লাসে প্রশ্ন করলেও উত্তর দেয় না। কেটি আমাদের অন্যতম সেরা ছাত্রী, তাই আমরা খুবই চিন্তিত। ও অসুস্থ কি না সে ব্যাপারে কোনও ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন।
“তোমার শরীর খারাপ নাকি, সোনা?” তার বাবা জিজ্ঞেস করলেন তাকে। কেটির মা মারা গেছে বহু আগেই; এত আগে যে তার মনেই পড়ে না।
“না তো বাবা।” বলেছিল কেটি।—”তবে কী জানো, হ্যালোউইনের পর মনে হয় সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি না বাবা, হ্যালোউইনের আগে আর স্কুলে যাব না।”
তার বাবা বেশ অবাক হলেন। কেটি হ্যালোউইন খুবই পছন্দ করে। এই ছুটিটাই তার সেরা ছুটি। ওইদিন রাত ঘনালেই সে তার প্রিয় বন্ধু জানের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে ট্রিক-অর-ট্রিট করতে। কিন্তু জান এখন আর আসেই না। কেন, তা কেটির বাবা জানেন না।
“আমার ওকে পছন্দ নয়।” বলল কেটি—”ও আমাকে চড় মেরেছে।”
“সে কি রে, কেন?” জিজ্ঞেস করেছিলেন কেটির বাবা।
“ও বলেছিল আমি নাকি মিথ্যে কথা বলেছি।”
“কী ব্যাপারে?”
“আছে একটা ব্যাপার। তোমাকে বলা যাবে না।” কেটি তার হাতের তালুটা দেখতে লাগল।
“কেন বলা যাবে না সোনা?”
“কারণ আছে।”
“কী কারণ?”
“কারণ, এটা বলতে ভয় লাগে।”
“কী এমন ভয়ের ব্যাপার সোনা যে তোমার বাবাকে বলতেও ভয় লাগে?”
কেটি চোখ তুলে তাকাল।—”হ্যালোউইনের পরে বলব।”
“ঠিক আছে। তুমি কথা দিলে কিন্তু। হ্যালোউইন আর কয়েকটা দিনের ব্যাপার। আশা করি আর বেশিদিন ধৈর্য ধরতে হবে না।” হেসে কেটির মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিলেন কেটির বাবা।
আজ হ্যালোউইন।
কেটির কেমন যেন মনে হচ্ছিল এবারই সিটি সেন্টারে সে আসবে। হ্যালোউইন ম্যান। কেটি জানে, এ বছরটাই হচ্ছে সেই বছর।
সেদিন বিকেলে টাউন স্কোয়ারে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কেটির মনে হচ্ছিল তার যেন খুব জ্বর এসেছে। তার বাবা তাকে কিছু মুদি দোকানের জিনিসপত্র কিনতে পাঠিয়েছেন। সেগুলো জোগাড় করতেই তার অনেক সময় লেগে গেল। বাবা যে কী কী জিনিস কিনতে বলেছিলেন, সেগুলোই তো মনে পড়ছিল না। পার্স থেকে লিস্টটা বার করে বার বার দেখতে হচ্ছিল। কেনাকাটার দিকে তার মনই নেই।
মি. হ্যাকিন্সের দোকান থেকে বেরোতেই তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল জানের। “ওই কথাটা ফিরিয়ে নিবি?” জান মুখ বেঁকিয়ে বলল।
“কোন কথাটা?”
“ওই যে, গায়ে গন্ধওয়ালা বিচ্ছিরি লোকটার কথা।”
“না।” কেটির মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“মিথ্যুক কোথাকার!”
“আমি সত্যি কথাই বলছি।” বলল কেটি, “কিন্তু তুই বিশ্বাস করতে ভয় পাচ্ছিস। আবার যদি আমাকে চড় মারতে আসিস, তাহলে আমিও কিন্তু তোর কোমরে লাথি মারব!”
জান একটু পিছিয়ে গেল।—”তোর মতো বাজে মেয়ে আমি আর দেখিনি।”
“শোন, তোকে ভালো কথা বলছি। আজ রাতে বাড়িতেই থাকিস যদি হ্যালোউইন ম্যানের খপ্পরে পড়তে না চাস। ও কিন্তু ধরতে পারলেই খেয়ে ফেলবে।”
জান চোখ পিটপিট করল এটা শুনে, কিন্তু কিছু বলল না।
“আমার মনে হচ্ছে ও আজ রাত্তিরেই আসবে।” মাথা নেড়ে বলল কেটি।—”এখানে আসা ওর বাকি আছে।”
“তুই পাগল হয়ে গেছিস। আমি বেরোব আর ট্রিক-অর-ট্রিটও করব, বরাবরের মতোই।”
“ঠিক আছে। পরে কিন্তু আমাকে বলতে পারবি না।” বলল কেটি—”যখন ও তোকে ধরবে, তখন আমার কথা মনে পড়বে।”
“যত্তসব ফালতু!” চেঁচিয়ে উঠল জান। তারপর চলে গেল।
কেটি রওনা হল বাড়ির দিকে।
কিন্তু বেশ দেরি হয়ে গেছে যে এর মধ্যেই! কেনাকাটা করতে তার এত সময় লেগেছে যে কখন বেলা চলে গেছে সে টেরই পায়নি। এখন চারদিকে প্রায় অন্ধকার নেমে এসেছে।
ঈশ্বর! প্রায় অন্ধকার!
আকাশের উজ্জ্বলতা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। পশ্চিমের সূর্য ঢাকা পড়ে গেছে ঘন মেঘে। বৃষ্টি শুরু হল ঝিরঝির করে, ভিজতে শুরু করল রাস্তা।
জিনিসপত্র বোঝাই ভারী ব্যাগটা তুলে কেটি দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। এখান থেকে তার বাড়ি মাত্র দু-মাইল। পৌঁছতে বেশিক্ষণ লাগবে না। কুড়িটা ব্লক পেরোতে হবে শুধু।
বৃষ্টির সঙ্গে এবার শুরু হল ঝোড়ো হাওয়া। উড়ে আসা ভেজা গাছের পাতা আটকে যেতে লাগল তার মুখে, হাওয়ায় ঝাপটাতে লাগল তার কোট। আজ রাতে বাচ্চারা সবাই নিশ্চয়ই বাইরে বেরোবে না। এই আবহাওয়ায় সেটা সম্ভবও নয়। তার মানে হ্যালোউইন ম্যান পাকড়ানোর জন্য খুব বেশি কাউকে পাবে না। ও তো আজকের রাতেই বেরোয়, সারাবছরের খাবার ভরে তার ঝোলায়। তার মানে ও রাস্তায় যাকে পাবে তাকেই ধরবে। পছন্দ-অপছন্দের কোনও ব্যাপার নেই। তবে আমার কোনও বিপদ হবে না, ভাবল কেটি। ঘুটঘুটে অন্ধকার হওয়ার আগেই আমি বাড়ি পৌঁছে যাব। কিন্তু আকাশের অবস্থা ভালো লাগছে না। ধূসর মেঘের চাদর ছড়িয়ে পড়ছে গোটা আকাশ জুড়ে। ঘনিয়ে আসছে অন্ধকার।
কেটি পা চালাচ্ছিল দ্রুত। তাড়াতাড়ি হাঁটতে গিয়ে একটা কমলালেবু বৃষ্টিভেজা ব্যাগ থেকে ছিটকে পড়ল রাস্তায়। কেটি দাঁড়িয়ে পড়ল সেটা তুলে নেওয়ার জন্য এবং তাকে দেখল।
ঝোড়ো হাওয়ায় নুইয়ে পড়া গাছের তলা দিয়ে হেঁটে আসছিল লম্বা কঙ্কালসার একটা মূর্তি। তার জীর্ণ লম্বা কোট হাওয়ায় ঝাপটাচ্ছিল তার পায়ের দু-পাশে। কাঁধে ঝুলছিল একটা ঝোলা। মাথার বারান্দা-টুপির তলা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল তার কোটরে ঢোকা রক্ত-উজ্জ্বল চোখ।
সে কেটিকে দেখল। হ্যালোউইন ম্যান কেটিকে দেখে হাসল।
একটা চাপা আর্তনাদ করে কেটি ঘুরে গেল অন্যদিকে। তার হাতে ধরা জলে ভেজা কাগজের থলেটা পিছলে গেল। সমস্ত মালপত্র ছড়িয়ে পড়ল রাস্তায়। গড়িয়ে গেল ক্যান, দুধের কার্টন থেকে দুধ ছিটকে পড়ে সাদা ফেনায় ভরিয়ে দিল অন্ধকারে গাঢ় হয়ে যাওয়া কংক্রিট।
কেটি ছুটল। পেছনে আর তাকাচ্ছে না সে। ধকধক করছে বুক। অসম্ভব আতঙ্কে সে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে সামনের দিকে।
কিন্তু কোথায় যাবে সে? কোথায়? কেটি আর তার বাড়ির রাস্তার মাঝখানেই রয়েছে ওই মূর্তি। তার এখনই শহরের প্রাণকেন্দ্রে পৌঁছানো উচিত যাতে স্কোয়ার পেরিয়ে সে অন্যপথ ধরে বাড়ি ফিরতে পারে। কিন্তু সে কি অতদূর দৌড়তে পারবে? জান ভালো দৌড়োয়। তাকেও জানের মতো দৌড়তে হবে। সে জানের চেয়ে দ্রুত আর শক্তিশালী। কেটির পা দুটো দুর্বল হয়ে আসছে। আতঙ্ক তার শরীর শিথিল করে দিচ্ছে, কেড়ে নিচ্ছে তার রিফ্লেক্স।
টড পেপার বলেছিল, হ্যালোউইন ম্যান গিরগিটির মতো দ্রুতগামী। কেটি চাইছে না পেছনে ফিরে তাকাতে। ওকে দেখার কোনও ইচ্ছে তার নেই, কিন্তু তাকে জানতে হবে সে ওর থেকে আর কতটা দূরে আছে।
একটা অস্ফুট গোঙানির শব্দ করে কেটি ঘাড় ঘোরাল এবং থেমে গেল হঠাৎই। কেউ নেই। তার পেছনে পড়ে আছে কালো কুচকুচে ভেজা রাস্তা। তার পেছনে রয়েছে হাওয়ায় দোলা গাছের সারি, উড়তে থাকা পাতা, চকচকে রুপোলি বৃষ্টির ধারা ঝরে পড়ছে অন্ধকার পেভমেন্টে। হ্যালোউইন ম্যানের কোনও চিহ্ন নেই।
ও তার মতলব ধরে ফেলেছে। বুঝে ফেলেছে কেটি অন্য রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরার প্ল্যান করছে। তার মানে ও আগেই স্কোয়ারে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এরপরই ও সেই ভয়ংকর খেলাটা খেলবে। ভেতরে ঢুকবে।
কিন্তু কার ভেতরে ঢুকবে? কীভাবে ঢুকবে?
মাথা ঠান্ডা রাখো—কেটি বলল নিজেকে। মনে রাখো, টড পেপার সহজাত অনুভূতি সম্পর্কে কী বলেছিল। না না, ওকে দেখলে আমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারব।
কেটি এখন টাউন স্কোয়ারের মাঝখানে চলে এসেছে। যে-রাস্তা দিয়েই সে বাড়ি ফিরুক না কেন, তাকে অনেকগুলো দোকানের পাশ দিয়েই যেতে হবে। আর ও যে-কোনো দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকবে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য।
লম্বা একটা শ্বাস নিল কেটি। শক্ত করল নিজেকে আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য। তার মাথা দপদপ করছে, তার ঝিমুনি আসছে, কিন্তু সে দৌড়নোর জন্য তৈরি।
আচমকাই তার কাঁধ ধরে কে টানল। চাবুক খাওয়া কুকুরের মতো কেঁপে উঠল কেটি। শুকিয়ে আসা গলায় চরম আতঙ্কে মুখ তুলে দেখল, ডা. পিটার অসগুড তার দিকে তাকিয়ে আছেন প্রশান্ত মুখে।—”তোমার বাবা আমাকে বলেছেন তোমার শরীর খারাপের কথা, ইয়ং লেডি।” তাঁর গলায় ডাক্তারসুলভ স্নিগ্ধতা।—”আমার চেম্বারে চলো, দেখা যাক তোমার কী অসুবিধে।”
এসো, এসো, আমার ঘরে এসো! মাকড়শা এভাবেই মাছিকে ডাকে না?
কেটি পিছিয়ে এল এক পা।—”না না, আমার কিছু হয়নি, আমি ভালো আছি।”
“তোমার চোখমুখ তো লাল হয়ে গেছে দেখছি। জ্বর এসেছে বোধহয়। না না কেটি, তোমাকে…”
“সরে যান! সরে যান আমার কাছ থেকে!” চিৎকার করে উঠল কেটি—”আপনার সঙ্গে আমি কোথাও যাব না। আমি জানি আপনি কে—আপনি আসলে সে!”
তারপর দারুণ জোরে দৌড়োতে শুরু করল কেটি। পেরিয়ে গেল মি. থার্টলের মিঠাইয়ের দোকান। ওই তো সে—জানালা দিয়ে হাত নাড়ছে, লাল টকটকে চোখে।
পেরিয়ে গেল ওষুধের দোকান। ওই তো সে মি. জর্গেনের শরীরে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তীক্ষ্ণ দাঁত বের করে হেসে বলছে, ‘খুব তাড়া আছে নাকি, কেটি?’
হ্যাঁ, তাড়া তো আছেই। তোমার কাছ থেকে পালাতে হবে না?
রাস্তায় লাল আলো। রাস্তা পেরোতে হবে। একটা বিশ্রী ফোর্ড ভ্যান সজোরে ব্রেক কষে তার কাছে দাঁড়িয়ে গেল। ভেতর থেকে সে মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘কোথায় যাচ্ছিস দেখে যা হতচ্ছাড়া!’
এরা প্রত্যেকেই হ্যালোউইন ম্যান হতে পারে। কেটি জানে।
যখন কেটি তাদের ওকভেল-এর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছল, তখন তার আর দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা নেই। সে বসেই পড়ল ঠান্ডা কাঠের বারান্দায় হাঁটু গেড়ে। সে হাঁপাচ্ছিল। জলে ভরে উঠছিল চোখ, ভোঁ ভোঁ করছিল কান। তার পেট গোলাচ্ছে, গরম হয়ে উঠছে শরীর; মাথাটা মনে হচ্ছে যে-কোনো মুহূর্তে ফেটে যাবে বেলুনের মতো।
কিন্তু সে এখন নিরাপদ। সে এখন নিজের বাড়িতে। সে তাকে ধরতে পারেনি। টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল কেটি। বসার ঘরের দরজা খুলে একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে বড়ো গোলাপি সোফাটায় নিজেকে ছুড়ে দিল।
বাইরে একটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। জানালা দিয়ে দেখল কেটি। একটা গাঢ় নীল শেভ্রোলে। ডা. অসগুডের গাড়ি।
“না!” চিৎকার করে উঠল কেটি। দৌড়ে গিয়ে বাড়িতে ঢোকার সামনের দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করে ছিটকিনি আটকে দিল।
তার বাবা ওপর থেকে নেমে এসেছেন হতচকিত মুখে।—”কী হল, সোনা?”
কেটি এখন বন্ধ দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়েছে বাবার মুখোমুখি।—”ওকে ভেতরে ঢুকতে দেব না। ও আমার আত্মা চুরি করতে এসেছে!”
“কেটি, ডা. অসগুড এসেছেন। আমিই ওঁকে বলেছিলাম তোমাকে এসে দেখে যেতে।”
“না বাবা, এটা ডা. অসগুড নয়। এটা সে!”
“সে? কে সে?”
“হ্যালোউইন ম্যান। সে যে-কোনো বড়ো মানুষের শরীরে ঢুকতে পারে। সে এখন ডা. অসগুডের শরীরে ঢুকেছে।”
তার বাবা মুচকি হাসলেন শান্ত মুখে। তারপর দরজা খুলতে গেলেন।—”খুব বেশি ভয়ের ছবি দেখছ, তাই না? ভয়ের কিছু নেই। এটা ডা.—”
কিন্তু কেটি কথা শেষ হওয়ার জন্য দাঁড়াল না। সে দৌড়ে গেল সিঁড়ির দিকে। হলঘরের শেষ প্রান্তে তার নিজের ঘরে ঢুকে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল।
বিপদ! দরজায় তালা নেই, ওকে বাইরে রাখার কোনও রাস্তা নেই। এক লাফে সে বিছানায় উঠে চাদর মুড়ি দিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল যেরকম সে করত তার ছোটবেলায়, অন্ধকারে ভয় পেলে।
নীচে কিছু ঝাপসা কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। পুরুষ কণ্ঠ। বাবা ওর সঙ্গে কথা বলছেন।
তারপর শোনা গেল পায়ের আওয়াজ। সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে সেটা।
কেটি লাফ মেরে বিছানা থেকে উঠে পড়ল পাগলের মতো। তার আলমারির কাছ থেকে টেনে আনল বুককেসটা, সেটাকে ঠেসে দিল দরজার গায়ে। এটা হয়তো ওকে আটকাতে পারবে না, তবু…
দরজায় শব্দ হচ্ছে—ঠক-ঠক-ঠক। ঠক-ঠক-ঠক।
“কেটি!”
“চলে যাও!” গুঙিয়ে উঠল সে।
“কেটি, দরজা খোলো!” বাবার গলা।
“না। আমি জানি তুমি ওকে নিয়ে এসেছ! ও তোমার সঙ্গে আছে।”
“জানালার কাছে গিয়ে নিজেই দেখো।” তার বাবা বললেন তাকে।
সে দৌড়ে গেল ঘরের ও-পাশে। ছড়িয়ে থাকা বইয়ের স্তূপে হোঁচট খেয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে ডা. অসগুডের নীল শেভ্রোলে বেরিয়ে যাচ্ছে বাড়ির বাইরে।
তার মানে তার বাবা…
কেটির বাবা দরজা খুললেন।
না! কিছুতেই মুখোমুখি হব না! কেটি ঘুরে গেল পেছন দিকে।—”না, না!” সে কাঁপছিল।—”আমি বুঝেছি! তুমিই সে!”
কেটির বাবা ঢুকে এলেন ভেতরে। তার গালের দু-পাশে বড়ো বড়ো দুটো হাত রাখলেন।—”হ্যাপি হ্যালোউইন, সোনা!” বললেন তিনি। তারপর তার মাথা ধরে একটা সাংঘাতিক ঝাঁকুনি দিলেন।
মূল গল্প : ‘দি হ্যালোউইন ম্যান’ (The Halloween Man)। রচয়িতা: উইলিয়াম এফ. নোলান (William F. Nolan)। ছবি- স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়