
আমরা তখন সেই বারোতলা বাড়িটার ন’তলায় ভাড়া থাকি। উলটোদিকের ইউনিটে এক ভারতীয় পরিবার থাকতেন। ঠিক মনে পড়ছে না, সম্ভবত তাঁরা মারাঠি ছিলেন। দুই সন্তান নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর চমৎকার পরিবার। বাচ্চাগুলোর একজনের ছয়, আর একজনের চার বছর বয়স মোটে। দরজা খোলা পেলেই লম্বা করিডোরে বেরিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াত ওরা। একদিন আমাদের দরজা খুলে বেরিয়েছি, দেখি ওঁরা একরাশ মালপত্র দরজার বাইরে এনে রাখছেন। দেখেই বোঝা যায় চলে যাচ্ছেন অন্য কোথাও। এমনিতে এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা, ভাড়াবাড়িতে কিছুদিন থেকে যে-যার মতো নিজের বাড়ি কিনে চলে যায়, আনন্দ করেই যায়। কিন্তু এঁদের মুখ গম্ভীর, একটু যেন উদ্বিগ্নও। জিজ্ঞেস করাতে বললেন, বিল্ডিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অশান্তির ফলে ওঁরা চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এখানে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা ভালো চোখে দেখে না কেউ, করা উচিতও নয়, তবু দেশের মানুষ কী কারণে ঝামেলায় জড়ালেন জিজ্ঞেস করেছিলাম। উত্তর শুনে আমি হতবাক। আটতলার বাসিন্দারা নাকি কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ জানিয়েছেন সারাদিন দুটো বাচ্চা ঘরে দৌড়ে বেড়ায়, তাঁদের খুব অসুবিধা হয় তাতে। চার বছর আর ছয় বছরের দস্যিকে কি আর একজায়গায় বসিয়ে রাখা সম্ভব! একটু অবাক হয়েছিলাম, কারণ কানাডিয়ানরা দয়ালু, ভদ্র, বন্ধুত্বপূর্ণ বলেই জেনে এসেছি ততদিন। পরে ব্যাপারটা বুঝলাম। নিজের ঘরে শান্তিতে ইচ্ছামতো থাকতে পারার ন্যায্য অধিকার সবার আছে। সেই অধিকার খর্ব হলে এরা মেনে নিতে পারে না। শুধু এটা কেন, যে-কোনো প্রাপ্য অধিকার বিঘ্নিত হলে হাসিমুখ কানাডিয়ানরা মুহূর্তে উগ্র হয়ে ওঠে।
রাস্তা পার হওয়ার ক্ষেত্রে এমন মনোভাব বেশ বিপদ ডেকে আনতে পারে। কতবার দেখেছি যেহেতু নিয়ম অনুযায়ী ভেতরের ছোটো রাস্তায় অগ্রাধিকার পায় পথচারীরা, তাই কোনোদিকে না তাকিয়ে কানে ইয়ারফোন গুঁজে এঁয়ারা পার হয়ে যাবেন। বড়ো রাস্তায় ওয়াক (হাঁটার) সিগন্যাল হলে গাড়ি সত্যি থামল কি না দেখার প্রয়োজনই বোধ করে না এরা। মনোভাবটা হল, হাঁটার সিগন্যাল এলে রাস্তা পার হতে পারা আমার নাগরিক অধিকার, তাই আমি যাব। হয়তো এমনটাই হওয়া উচিত, তবু দুর্ঘটনা যে একেবারেই হয় না তা কিন্তু নয়। নিজের অধিকার সম্বন্ধে এমন সচেতনতা অবশ্যই প্রয়োজন, তবু বাচ্চাদের পায়ের আওয়াজে বিরক্ত হয়ে তার পরিবারকে তাড়াতে বোধ হয় আমরা অন্তত পেরে উঠব না। আমাদের ওপরের তলায় কেউ বাস করত না, বিল্ডিং মেরামতির মালপত্রের ভাঁড়ার ছিল ওই তলাটা, তাই কানাডিয়ান বাচ্চারা ঘরের মধ্যে পা টিপে টিপে হাঁটে কি না সেটা জানার সুযোগ হয়নি।
আমাদের মারাঠি প্রতিবেশী চলে যাওয়ার পর এক রবিবার সকালে ঘুম ভাঙল নীচ থেকে আসা প্রবল কোলাহলে। ড্রাম পেটানো, ভেঁপু বাজানো, সাইকেলের ক্রিং ক্রিং, পোষ্যদের ঘৌ ঘৌ, ছোটোদের ক্যাঁওম্যাঁও— সব মিলিয়ে সে এক শব্দকল্পদ্রুম। পড়িমড়ি করে বারান্দায় বেরিয়ে দেখি প্রলয় কাণ্ড। ড্রাম, ক্ল্যারিনেট বাজাতে বাজাতে আর কীসব স্লোগান দিতে দিতে একদল মানুষ চলেছে; দলে রয়েছে বাচ্চা, বুড়ো, মায় পোষ্যরাও। সাইকেল আরোহীরা তো আছেই, কেউ কেউ হুইলচেয়ার নিয়েও যোগ দিয়েছে। সে বিপুল শব্দতরঙ্গ ভেদ করে যতটুকু স্লোগান কানে এসে পৌঁছাল তাতে বুঝলাম এরা অ্যান্টি-ভ্যাক, অর্থাৎ করোনা ভাইরাসের টিকা নিতে মোটেই রাজি নয়। তখন সদ্য ফাইজারের টিকা বাজারে এসেছে, অন্যান্য দেশের মতো কানাডার সরকারও দেশবাসীকে আহ্বান জানাচ্ছে নিজেদের সুরক্ষিত করার জন্য। কিছু মানুষ তার মধ্যে মিছিল করে জানাচ্ছে টিকা না নেওয়ার অধিকার তাদের আছে। সে বেশ কথা, কিন্তু সে অবস্থায় বাচ্চা-বুড়ো মিলে মিছিলে বেরিয়ে পড়াটা কোন নাগরিক অধিকারের আওতায় পড়ে জানি না। বলা বাহুল্য, সে-সব মিছিলের ফলে অসুখ আরও খানিকটা ছড়িয়েছিল। দেখেছিলাম পুলিশ হতাশ মুখ করে তাদের পেছন পেছন যাচ্ছিল।
তবে এরা যে সমস্ত ব্যাপারে নিজেদের পোষ্যদেরও জুটিয়ে নেয়, সেটা খুব ভালো লাগে। এখানে বাসে বা ট্রেনে পোষ্যদের নিয়ে ওঠার অনুমতি আছে। সবরকম ক্যাবে অবশ্য উঠতে দেয় না, ওদের নিয়ে ওঠার জন্য আলাদা ক্যাব পাওয়া যায়। বেশিরভাগ দোকানেও ঢুকতে দেয় পোষ্যদের। আমাদের দেশের প্রায় সব বিজ্ঞাপনে যেমন সুদর্শন মহিলা বা পুরুষ থাকবেই, এখানের বিজ্ঞাপনে মানুষ অনুপস্থিত থাকলেও পোষ্য বা বন্যপ্রাণী থাকবেই, তা পণ্য যা-ই হোক না কেন। বিল্ডিং থেকে কয়েক পা দূরে সুন্দর একটা পার্ক ছিল, সেখানে সন্ধের পরে একজন বয়স্ক মানুষ আসতেন, সঙ্গে একটা ট্রলি। চার চাকার, ক্যানভাস দিয়ে ঘেরা, টানার জন্য হাতলওয়ালা ট্রলি। এখানকার ছোট্ট বাচ্চারা অমন ট্রলিতে চেপে ঘুরে বেড়ায়। ওঁর ট্রলিতে থাকত মাঝারি আকারের একটা সাদা কুকুর, তার একটা পা নেই। সন্ধের অন্ধকারে প্রায় ফাঁকা পার্কটায় সযত্নে নামিয়ে আনতেন তেঠেঙেটাকে, ধীরে ধীরে পার্কটায় পাক খাইয়ে আবার তুলে বসিয়ে দিতেন ট্রলিতে। অদ্ভুত একটা মায়ার রেশ ছড়িয়ে দুজনে মিলে আবার ফিরে যেতেন।
যা বলছিলাম। অধিকার সচেতন কানাডিয়ানরা বাজারের প্যাকেট খুলে খুঁতো ফল বা সবজি দেখতে পেলে সঙ্গে সঙ্গে তা ফেরত দিয়ে যায়। এখানে তো আর পাড়ার মোড়ে মোড়ে দোকান নেই, যেতে হবে সেই ওয়ালমার্ট কি রিয়েল কানাডিয়ান সুপারস্টোর। তা হলেও পয়সা দিয়ে উপযুক্ত জিনিস না পেলে কনজিউমার ফোরামে নালিশ-টালিশ জানিয়ে একাকার করে। তাই সুপার মার্কেটগুলোও বিনা বাক্যব্যয়ে জিনিসপত্র ফেরত নিয়ে রিফান্ড করে দেয়, অনেক সময়ে ফেরত দেওয়ার কারণ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করে না। তবে এমন সুবিধার ব্যবস্থা বেশিদিন থাকবে বলে মনে হয় না, কারণ কেউ কেউ এর অন্যায় সুযোগ নেয়। জিনিস কিনে, তা ব্যবহার করে এবং প্রয়োজন মিটে গেলে ফেরত দিয়ে সুন্দর রিফান্ড নিয়ে চলে যায়। সৌভাগ্যবশত খাবারদাবারের বিষয়ে এটা করা চলে না। এই ‘কেউ কেউ’-দের বেশিরভাগটাই কিন্তু অন্য দেশ থেকে এ-দেশে আসা মানুষজন। তবে এ-দেশের নাগরিকরাও যে একেবারেই করে না, তাও নয়।
কানাডিয়ানরা শুধু নয়, পশ্চিমের লোকজন একই জিনিস খুব বেশিদিন ব্যবহার করা পছন্দ করে না, সেটা বার বার দেখেছি। বংশপরম্পরায় পাওয়া অ্যান্টিক বা খুব ব্যক্তিগত জিনিসের কথা বলছি না, রোজকার ব্যবহারের জিনিস ভালো থাকা অবস্থাতেও বাতিল করে দেয় এরা। বাড়ি বদলানোর সময়ও রাজ্যের জিনিস সঙ্গে না নিয়ে রেখে যায় অন্যদের জন্য। ফেলে দেয় না, আমার লাগছে না কিন্তু অন্য কারও লাগতে পারে— এই চিন্তাটা কাজ করে দেখেছি। আমাদের সেই বিল্ডিংয়ের লন্ড্রি-রুম ছিল একতলায়। ছোট্ট একটা লাইব্রেরি আর পড়ার ঘর ছিল লন্ড্রির পাশে। সেখানে যার যা অপ্রয়োজনীয় বা ‘আর কাজে লাগছে না’ গোত্রের জিনিসপত্র ‘ফ্রি’ লেবেল লাগিয়ে রেখে দিয়ে যেত। আমি নিজেই একবার একেবারে আনকোরা জলরঙ আর তুলির প্যাকেট পেয়েছিলাম। এই বন্দোবস্তের একটাই অলিখিত নিয়ম আছে, নষ্ট হয়ে যাওয়া বা ব্যবহারের অযোগ্য জিনিস রাখা চলবে না। ও-পাড়া ছেড়ে আসার সময়ে আমরাও রেখে এসেছিলাম অনেক কিছু, কারও কাজে লেগে থাকবে।
বর্তমান পাড়ার বাসিন্দারা সে-সব বাড়তি জিনিস স্যালভেশন আর্মির চার্চে দান করে, বড়দিনের আগে সেখান থেকেই বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। এতে প্রতিবেশীদের ভেতর বিনিময় বন্ধ হলেও সত্যিকার যাদের প্রয়োজন তাদের কাছে নানা জিনিস ঠিকই পৌঁছে যায়। তবে চেনা পরিজনের মধ্যে জামাকাপড়, জুতো বিনিময়ের চল আছে খুব। আমাদের দেশে যেমন দাদা-দিদিদের ব্যবহার করা পোশাক দিয়ে ছোটো ভাইবোনরা দিব্য কাজ চালিয়ে নিত একসময়, এখানে কিন্তু খুব কাছের বন্ধুদের মধ্যেও সেটা হয়। আমাদের ওদিকে অবশ্য সে-সব আজকাল আর ভাবা যায় না। এদের রোজকার পোশাকের ব্যাপারে একটা মজার কথা বলি। দশ-বারো ডিগ্রি (সেলসিয়াস) এদের কাছে যথেষ্ট গরম, তাই তাপমাত্রা দশ ছুঁলেই এরা হাফ প্যান্ট পরে তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু হাজার হোক, কানাডা তো বটে, তার ওপর আমাদের এদিকটা রকির পাদদেশ। প্রেইরির কুখ্যাত হাওয়া তো আছেই, তাই হুডি ছাড়ে না কেউ। যত গরম লাগুক না কেন, হুডি থাকবেই সঙ্গে। তবে আমার সন্দেহ, দীর্ঘ শীতকাল কাটানোর পর শীতের পোশাক একটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে যায়। নেহাত স্নো জ্যাকেট পরলে হিট স্ট্রোকে মরবে, তাই হুডি সই। শীতের শুরুতে অভাবী মানুষদের জন্য শীতের পোশাক জোগাড় করার উদ্যোগ নেয় প্রতিটা স্কুল। সেগুলো বিতরণের দায়িত্ব নেয় স্যালভেশন আর্মি চার্চ অথবা মিউনিসিপ্যালিটি, যাকে এখানে বলে সিটি কাউন্সিল। এছাড়া আছে শহরের ফুড ব্যাংক, সেখানে টিনের খাবার বা সহজে নষ্ট হয় না এমন খাবার বছরভর জমা দেওয়া যায়। যথেষ্ট না হলেও গৃহহীন মানুষদের জন্য কিছু আশ্রয়ের ব্যবস্থা আছে। তবে সেখানে থাকতে গেলে কিছু নিয়ম মানতে হয় যেটা হয়তো সবার পছন্দ হয় না। মুশকিল হল বেশিরভাগ গৃহহীন মানুষদের প্রধান আয়ের উৎস ড্রাগ বিক্রি। এখানে হেরোইন, কোকেন রাখা বা ব্যবহার করা বেআইনি হলেও গাঁজা, চরস, ভাঙের ওপর কোনও বাধানিষেধ নেই। মোড়ে মোড়ে বাহারি দোকান আছে এসবের, আঠারো বছর বয়স হলেই সে-দোকানে ঢোকা যায়। হোমলেসরা সে-বস্তু সস্তায় বিক্রি করে, সঙ্গে বেআইনি নেশার জিনিসও। শহরের রেলস্টেশনগুলো এদের ঘাঁটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কতবার দেখেছি রাস্তার ধারে সবার সামনে বসে নেশায় ঝিমাচ্ছে ছেলেমেয়ের দল। কতই-বা বয়স হবে তাদের— কুড়ি, একুশ! বাপ-মা হয়তো জানেও না এসব কীর্তির কথা। এখানে তো আবার আঠারোর পর কিছু বলাও যায় না, নিজের মতো চলতে দিতে হয়। কিছু বছর আগেও আঠারো হলেই নিজের মতো এক কামরার ঘর ভাড়া নিয়ে বা কোনও রুমমেটের সঙ্গে ভাগাভাগি করে স্বাধীনভাবে থাকার রেওয়াজ ছিল। অবশ্যই নিজের খরচ চালানোর জন্য ছোটোখাটো কাজ করাই দস্তুর সেক্ষেত্রে। কিন্তু গত কয়েক বছরে বাড়িভাড়া যে হারে বেড়েছে তাতে ছাত্রজীবনে এহেন স্বাধীনতা পাওয়া আর সম্ভব নয়। অভিবাসীদের অনিয়ন্ত্রিত আগমনই এর মূল কারণ। এছাড়া গরমের লম্বা ছুটিতে প্রায় সব সতেরো-আঠারো বছর বয়সিরা কিছু না কিছু কাজ করে। সে রেস্তোরাঁ বা দোকান বাজারে হোক, কি কোনও বাড়ির লোকের অনুপস্থিতিতে তাদের পোষ্যকে দেখাশোনা করার কাজই হোক। লোক বেড়ে যাওয়ায় এইসব কাজও আজকাল পাওয়া কঠিন হচ্ছে। আঠারোর পর নিজের দায়িত্ব নিতে পারা খুবই ভালো ব্যাপার সন্দেহ নেই, কিন্তু তার একটা অন্য পিঠও আছে। ড্রাগের নেশায় অর্ধচেতন ছেলেমেয়েগুলোকে দেখলে বড়ো অসহায় লাগে।
পুলিশ যে এই ব্যাপারে খুব সক্রিয় তাও নয়। পুলিশের খুব একটা দাপট দেখিনি এখনও পর্যন্ত। ঘোরতর কিছু ঘটলে সামাল দেওয়ার ক্ষমতা কতদূর আছে সত্যি জানি না, সম্ভবত এরা নিজেরাও জানে না। পুলিশকে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বাহার দিয়ে বেড়াতে দেখা যায়, আর সুযোগ পেলেই বাচ্চাদের সঙ্গে খেলায় নেমে পড়ে ওরা। তবে শুনেছি, কেউ হারিয়ে গেলে নাকি দ্রুতগতিতে খুঁজে দিতে পারে। খাস শহরের দিকে, মানে যাকে বলে ডাউনটাউন, গ্যাং ওয়র হয় ঘনঘন। তাছাড়া ফার্স্ট নেশনদের মধ্যে ছোটোখাটো গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। আগের পাড়া ডাউনটাউনের খুব কাছাকাছি ছিল, শুক্রবার রাতে ছোটখাটো মারপিট লেগেই থাকত ও অঞ্চলে। আমাদের বিল্ডিংয়ের উলটোদিকে ম্যাকডি’র মস্ত একটা আউটলেট ছিল আগে বলেছি বোধ হয়। একদিন রাতে এক মাতাল প্রচণ্ড গোলমাল শুরু করল সেখানে। চেঁচামেচি, গালিগালাজ, ডাস্টবিন উলটে দেওয়া ইত্যাদি মিলিয়ে সে এক বিশ্রী অবস্থা। পুলিশ এল বটে, কিন্তু কিচ্ছুটি না করে তাকে ঘিরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সে তো এদিকে পাড়া মাথায় করে চেঁচাচ্ছে। আসলে আইন অনুযায়ী সে ধ্বংসাত্মক কিছু, নিদেন পুলিশকে আক্রমণ করার চেষ্টাটুকু না করলে পুলিশ কিস্যু করতে পারবে না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চেঁচানো বা ডাস্টবিন উলটে দেওয়া তো আর বেআইনি কর্ম নয়! অবশেষে ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছিল বেচারা মাতালটির, সে কী যেন একটা ছুড়ে মেরেছিল পুলিশদের দিকে। ব্যস, আর যায় কোথায়, পুলিশ পরমুহূর্তেই চ্যাংদোলা করে গাড়িতে তুলে নিয়েছিল তাকে।
ভ্যান্ডেলিজম কিন্তু খুব বেশিরকম ঘটে এখানে। এখনকার বাড়ির সামনের রাস্তার ও-পারেই কাচে ঘেরা বাস-স্টপ। গতবছর কে বা কারা যেন সেই কাচ বার পাঁচেক ভেঙে খানখান করে দিয়েছিল। যতবার সিটি কাউন্সিলের লোক এসে সারিয়ে যায়, ততবার শেষরাতে এসে কারা যেন ভেঙে দিয়ে যায়। শেষে সিটি কাউন্সিলই হার মেনে নিয়েছিল। পুরো শীতকাল পেরিয়ে তারপর সারিয়েছিল আবার। তারপরে অবশ্য ভাঙচুর বন্ধ হয়েছিল। তবে আশ্চর্য হল, পুলিশ কিন্তু কাউকে পাকড়াও করতে পারেনি। এসব কারণেই বোধ হয় এখানকার বাচ্চাদের কাছে আদর্শ হল ফায়ার ফাইটাররা। তাঁরা শুধু আগুন নেভান না, সমস্ত বিপদ-আপদে সবার আগে পৌঁছেও যান, ঝাঁপিয়েও পড়েন। এমনকি রাস্তায় গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটলেও পুলিশের আগে তাঁরাই পৌঁছান। জনসাধারণের জন্য কাজ করেন যাঁরা, তাঁদের খুব সম্মান করে এখানকার মানুষ। যাঁরা জঞ্জাল সংগ্রহ করেন, ডাকবিভাগে কাজ করেন, রাস্তার আগাছা পরিষ্কার করেন, তাঁরাও বেশ জনপ্রিয়। বাচ্চারা তাঁদের দেখলে হাসিমুখে হাত নাড়ে। বর্তমান প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীরা কিন্তু রাজনীতিতে একেবারেই উৎসাহ হারিয়েছে। আর দিন কয়েক বাদেই এখানে পৌরসভা নির্বাচন, দেখা যাক কী হয়। ক্যালগেরি শহরের বর্তমান মেয়র কিন্তু ভারতীয় বংশোদ্ভূত। এখানে কিন্তু নির্বাচন প্রচারে দেওয়াল লিখনের অনুমতি নেই। ব্যানার, পোস্টার দিয়ে কাজ চালাতে হয়।
ডাউনটাউনে উঁচু বাড়ি বেশি, একটানা পাঁচিল বা দেওয়াল থাকলে ছবি এঁকে সুন্দর করে রাখা হয়। নীচে রইল সেরকম কিছু দেওয়াল ছবি।

পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই দোকান বা পাবলিক টয়লেটের দেওয়ালে অশোভন বাক্য লেখার চল আছে। কানাডা কিন্তু এই জায়গাটায় বেশ আলাদা। এরা ‘হ্যাভ আ গুড ডে’ লিখে রাখে। আমি একবার একটা দেওয়ালে ‘হ্যাপি বার্থডে’ লেখা আছে দেখেছিলাম। মানুষের যে-কোনো সৃষ্টিশীল কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া এদের আর একটা বড়ো গুণ। তাই হাতে বানানো সমস্ত জিনিসের দাম খুব চড়া, সে স্যান্ডউইচ হোক বা বড়দিনের গাছ সাজানোর গয়না।
দেশ হিসাবে কানাডা ভালো, অত্যন্ত বাসযোগ্য। প্রকৃতি শৈত্যের কারণে কঠোর হলেও অপরূপ। মানুষজনও সরল, আন্তরিক, সহানুভূতিসম্পন্ন। এমন একটা দেশে আজও কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য থাকাটা বড়োই লজ্জার। বিশেষ করে বেতনের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য বারে বারে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আশার কথা মানুষ সচেতন হচ্ছে, সমাজ থেকে এই মালিন্য দ্রুত দূর হলেই মঙ্গল।
আগেই বলেছি এরা হ্যালোউইন পালন করে খুব আনন্দের সঙ্গে। ভূতপ্রেত নিয়ে কানাডিয়ানরা রীতিমতো উৎসাহী। টাইটানিক জাহাজের বেশিরভাগ যাত্রীদের কবর সংরক্ষিত আছে নোভা স্কোশিয়ার হ্যালিফ্যাক্স শহরে। তাই গোটা শহরটার নানা জায়গায় ভূতুড়ে ব্যাপার-স্যাপারের ছড়াছড়ি। ক্যালগেরি শহরেও আছে বেশ কিছু ভূতুড়ে জায়গা। এইসব ভূতুড়ে উপাখ্যান নিয়ে কথা বলব পরের পর্বে। এখনকার মতো তবে এই পর্যন্ত, টা টা।