
গ্যানিমিড বৃহস্পতি তথা সৌরজগতের বৃহত্তম উপগ্রহ। ৫,২৬৮ কিলোমিটার ব্যাসের এই উপগ্রহটি বুধ গ্রহের তুলনায় বড়ো, তবে ভর বুধের অর্ধেক। এর সামগ্রিক ঘনত্ব জলের চেয়ে ২ গুণেরও কম। দূরত্বের বিচারে এটি বৃহস্পতির তৃতীয় উপগ্রহ। উপগ্রহটিতে বরফে আচ্ছাদিত পৃষ্ঠের নীচে রয়েছে জলের বিশাল ভান্ডার। এর কেন্দ্র প্রস্তরময় উপাদান দিয়ে গঠিত। বিজ্ঞানীদের অনুমান, এর ভূভাগ ৬০ শতাংশ প্রস্তরময় উপাদান এবং ৪০ শতাংশ বরফের সমন্বয়ে গঠিত।
১৬১০ সালের ৭ জানুয়ারি গ্যালিলিও গ্যালিলি দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে বৃহস্পতির যে চারটে উপগ্রহ আবিষ্কার করেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হল ‘গ্যানিমিড’। চিনা প্রাচীন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৩৬৫ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী গান দে সম্ভবত খালি চোখে বৃহস্পতির একটি উপগ্রহ শনাক্ত করেছিলেন। এটি গ্যানিমিড ছিল বলে অনেকের অনুমান। তবে এ নিয়ে বিতর্ক আছে। কারণ, গান দে এর রঙ লালচে বর্ণনা করেছিলেন। এতদূর থেকে খালি চোখে উপগ্রহটির প্রকৃত রঙ শনাক্ত করা খুবই কঠিন ব্যাপার।
গ্যালিলিও তাঁর আবিষ্কৃত উপগ্রহগুলির নামকরণ করেছিলেন প্রথমে ‘কসমিয়ান তারকা’, পরে ‘মেডিসিয়ান তারকা’। এই নাম দুটির কোনোটিই জনপ্রিয় না হওয়ায় ফরাসি জ্যোতর্বিজ্ঞানী নিকোলাস-ক্লদ ফাব্রি দে উপগ্রহটির নাম দেন ‘বৃহস্পতির বৃহস্পতি’। না, এই নামটিও গৃহীত হয়নি। পরবর্তীকালে জন কেপলার গ্রিক পুরাণ অনুসারে নামকরণের প্রস্তাব দেন। সেইমতো রাজা ট্রোসের পুত্রের নামানুসারে সিমন মারিয়াস উপগ্রহটির নাম রাখেন ‘গ্যানিমিড’। এই প্রসঙ্গে বলি, গ্যানিমিডের আবিষ্কারের কৃতিত্ব গ্যালিলিও গ্যালিলি এবং সিমন মারিয়াস উভয়কেই দেওয়া হয়।
গ্যানিমিডের গঠন তিনটি প্রধান স্তরে বিভক্ত—
১) ধাতব কেন্দ্র
২) শিলাময় আবরণ
৩) বরফে ঢাকা পৃষ্ঠতল
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর আভ্যন্তরীণ কাঠামোতে রয়েছে গলিত লৌহ অথবা লৌহ-সালফারের একটি ছোটো কেন্দ্র অঞ্চল, যা এর নিজস্ব চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে। গ্যানিমিড ব্যতীত সৌরজগতে আর কোনও উপগ্রহের নিজস্ব চৌম্বকক্ষেত্র নেই। এই কেন্দ্র অঞ্চলটিকে ঘিরে রয়েছে সিলিকেট শিলার কঠিন আস্তরণ। এর উপরিভাগে আছে জল অথবা বরফ-জলের বৃহৎ ম্যান্টল, সঙ্গে রয়েছে পৃষ্ঠদেশের বরফ।
গ্যানিমিডের পৃষ্ঠতল মূলত দুটি ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চলে বিভক্ত— একটি হল বহু প্রাচীন গহ্বর সমৃদ্ধ অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চল যা প্রচুর পরিমাণে উল্কাপিণ্ডের আঘাতের ফলে গঠিত এবং প্রায় ৪ বিলিয়ন বছরের পুরোনো। আর অপরটি প্রচুর খাঁজ বা রেখা (grooves) ও রিজ (ridges) দ্বারা আবৃত। এই অঞ্চলগুলির এমন ভূতাত্ত্বিক গঠনের কারণ বিস্তারিত এখনও কিছু জানা যায়নি, তবে মনে করা হয় যে এদের উৎপত্তির পিছনে রয়েছে সম্ভবত টেকটনিক ক্রিয়াকলাপ। অন্ধকারাচ্ছন্ন বা কৃষ্ণকায় এলাকার যে অঞ্চলটি স্পষ্টভাবে নিরূপণ করা যায়, সেটার নাম রাখা হয়েছে ‘গ্যালিলিও রিজিও’ (Galileo Regio)।
গ্যানিমিডের অতি হালকা বায়ুমণ্ডল আছে। এটি প্রধানত অক্সিজেন দ্বারা গঠিত। তবে এখানে অক্সিজেনের উপস্থিতি এতটাই ক্ষীণ যে পৃথিবীর কোনও প্রাণীর পক্ষে শ্বাসকার্য চালানো সম্ভব নয়। ১৯৯৬ সালে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ উপগ্রহটির চারপাশে একটি পাতলা ওজোন স্তরের অস্তিত্ব শনাক্ত করেছে। উপগ্রহটি বৃহস্পতির চারপাশে ১,০৭০,৪০০ কিলোমিটার দূরত্বে আবর্তিত হয়। এটি প্রতি ৭ দিন ৩ ঘণ্টায় বৃহস্পতিকে একবার পূর্ণ আবর্তন করে।
গ্যানিমিডের নিজস্ব চৌম্বক পরিমণ্ডল রয়েছে যা বৃহস্পতির চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে নিহিত। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, উপগ্রহটির আভ্যন্তরীণ গঠনে লোহাযুক্ত কেন্দ্র রয়েছে, তার কারণেই এর নিজস্ব চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এখানে মাঝে মাঝে ক্ষীণ অরোরা সৃষ্টি হয়। লক্ষণীয়, গ্যানিমিড ব্যতীত সৌরজগতের আর কোনও উপগ্রহের চৌম্বকক্ষেত্র নেই।
গ্যানিমিড শুধুমাত্র বৃহস্পতির বৃহত্তম উপগ্রহই নয়, এটি সৌরজগতের অন্যতম আকর্ষণীয় মহাজাগতিক বস্তু। এর অনন্য বৈশিষ্ট্য, যেমন নিজস্ব চৌম্বকক্ষেত্র, আভ্যন্তরীণ মহাসাগর এবং ভিন্ন ধরনের ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামো একে বিজ্ঞানীদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র করে তুলেছে। ভবিষ্যতের গবেষণা ও মহাকাশ মিশনের মাধ্যমে গ্যানিমিড সম্পর্কে আরও তথ্য জানা যাবে।
এই লেখকের অন্যান্য বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ
ধ্রুবতারা ধ্রুব নয়, মহাকাশে আমরা কোথায়, বিস্ময় ভরা ‘আদ্রা’ নক্ষত্র, সৌড়ঝড়ের আঘাতে টালমাটাল পৃথিবী, কৃষ্ণগহ্বর, পিঙ্গল বামন, সূর্য, সৌরকলঙ্ক, মহাকাশের ভূতুড়ে আলো, কোয়াসার, মহাকাশের অচেনা বস্তু-পালসার, মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ (অশ্বিনী থেকে রেবতী) – (১), মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-২, মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৩, মহাবিশ্বে মহাকাশে-আকাশগঙ্গার ভবিষ্যৎ, মহাবিশ্বে মহাকাশে-মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৪, মহাবিশ্বে মহাকাশে-মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৫,চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৬, অগস্ত্য-বাতাপি উপাখ্যান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান, মহাবিশ্ব সৃষ্টির গোড়ার কথা, মহাবিশ্বে মহাকাশে- নক্ষত্র সৃষ্টির রহস্য, মহাবিশ্বে মহাকাশে-নক্ষত্রের শেষ দিন, মহাবিশ্বে মহাকাশে- চাঁদের ভবিষ্যৎ, মহাবিশ্বে মহাকাশে তারাজগতের সৃষ্টি রহস্য, মহাবিশ্বে মহাকাশে তারাজগতের প্রকারভেদ, মহাবিশ্বে মহাকাশে – বিচিত্র গ্যালাক্সি, ১১-এর জালে নিল আর্মস্ট্রং, মহাবিশ্বে মহাকাশে-গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে-বুধ গ্রহ, মহাবিশ্বে মহাকাশে-গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে-শুক্র গ্রহ, মহবিশ্বে মহাকাশে-আমাদের বাসভূমি পৃথিবী, মহবিশ্বে মহাকাশে-চাঁদ, মঙ্গলগ্রহ, ফোবস, ইউরোপা
জয়ঢাক প্রকাশন থেকে এই লেখকের লেখা মহাবিশ্বে মহাকাশে বইটি কিনতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন
বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে