FUNবিজ্ঞান- মহাবিশ্বে মহাকাশে-ক্যালিস্টো-কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়-শীত ‘২৫

ভূমিকা

সৌরজগতের সবচেয়ে বড়ো গ্রহ হল বৃহস্পতি। ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত হিসাবে একে ঘিরে রয়েছে ৯৭টি উপগ্রহ। এই উপগ্রহগুলির নিশ্চিত কক্ষপথ রয়েছে। এই হিসাবে মিটার-আকারের ক্ষুদ্র উপগ্রহগুলি ধরা হয়নি। এই উপগ্রহগুলির মধ্যে অন্যতম উপগ্রহ হল ‘ক্যালিস্টো’ (Callisto)। এটি শুধু একটি উপগ্রহই নয়, বরং একটি জীবন্ত ইতিহাস যা আমাদের সৌরজগতের আদিম গঠন ও বিকাশের নানা গোপন তথ্য কোটি কোটি বছর ধরে বহন করে চলেছে। চতুর্থ গ্যালিলিয়ান উপগ্রহ ক্যালিস্টো বৃহস্পতির দ্বিতীয় বৃহত্তম উপগ্রহ।

১৬১০ সালে গ্যালিলিও গ্যালিলেই যখন তাঁর প্রাথমিক টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তখন তিনি যে চারটি বৃহৎ উপগ্রহ আবিষ্কার করেছিলেন, তার মধ্যে ক্যালিস্টো ছিল অন্যতম। গ্যালিলিয়ান উপগ্রহ হিসেবে ক্যালিস্টো সৌরজগতের সবচেয়ে পুরাতন ও সবচেয়ে গহ্বর-বহুল উপগ্রহ হিসেবে বিবেচিত। এর পৃষ্ঠতলে যে অসংখ্য গহ্বর (crater) রয়েছে, সেগুলির অবস্থান, আকার এবং বিস্তার পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীদের ধারণা এই উপগ্রহটিতে রয়েছে সৌরজগতের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন চিহ্ন।

আকার

ক্যালিস্টো আকারে প্রায় বুধ গ্রহের সমান। এটি গ্যানিমিড ও শনির বৃহত্তম উপগ্রহ টাইটানের পরে তৃতীয় বৃহত্তম উপগ্রহ। এর ব্যাস প্রায় ৪,৮০৬ কিলোমিটার এবং ঘনত্ব ১.৮৫১ গ্রাম/ঘনসেমি। এটি বৃহস্পতিকে ১৮,৮৩,০০০ (১.৮৮৩x১০৬)  কিলোমিটার দূর থেকে প্রদক্ষিণ করে। সময় নেয় ১৬ দিন ১৬ ঘণ্টা ৩২.২ মিনিট। বৃহস্পতির চারটি গ্যালিলিয়ান উপগ্রহের মধ্যে সবচেয়ে বাইরেরটি। দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে পৃথিবী থেকে একে দেখা যায়। ১৬১০ সালে ইতালীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও উপগ্রহটি আবিষ্কার করেছিলেন। একই বছরে এটি সম্ভবত জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী সাইমন মারিয়াস স্বাধীনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি গ্রিক পুরাণের ক্যালিস্টোর নাম অনুসারে উপগ্রহটির নামকরণ করেন। বৃহস্পতিকে কেন্দ্র করে আবর্তনরত উপগ্রহগুলির মধ্যে গ্যালিলিয়ান উপগ্রহ চারটিই সবচেয়ে বড়ো এবং ভারী। বাকি ৯৩টি উপগ্রহ এবং বৃহস্পতির রিং বা বেষ্টনী মিলিয়ে বৃহস্পতিকে কেন্দ্র করে আবর্তমান মোট ভরের মাত্র ০.০০৩ শতাংশ।

গঠন

বৃহস্পতির উপগ্রহ ক্যালিস্টো (Callisto) তার গঠনের দিক থেকে সৌরজগতের অন্যতম প্রাচীন, জটিল এবং রহস্যময় এক মহাজাগতিক বস্তু। এটি মূলত বরফ এবং পাথরের মিশ্রণে গঠিত, যার মধ্যে প্রায় ৪০% বরফ এবং ৬০% শিলা ও ধাতব পদার্থ রয়েছে। এটি এমন একটি উপগ্রহ যার অভ্যন্তরে সম্পূর্ণ পৃথকীকরণ (differentiation) ঘটেনি, অর্থাৎ এর ভেতরের উপাদানগুলো এখনও একে অপরের সঙ্গে অনেকটা মিশ্রিত অবস্থায় রয়েছে। অন্যান্য গ্রহ বা বৃহৎ উপগ্রহগুলি পৃথকীকরণের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ধাতব কোর, তার ওপর ম্যান্টল ও তারপর ভূত্বক নিয়ে গঠিত হয়, কিন্তু ক্যালিস্টোর ক্ষেত্রে পুরোপুরি তেমনটা নয়। এর ভূত্বক প্রায় ১৫০-২০০ কিলোমিটার পুরু। পৃষ্ঠজুড়ে রয়েছে লক্ষ লক্ষ গহ্বর (craters) ও আঘাত-চিহ্ন (impact scars) যা থেকে বোঝা যায়, উপগ্রহটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং দীর্ঘদিন এর কোনও আভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ঘটেনি।

পৃষ্ঠতল

ক্যালিস্টোর পৃষ্ঠতল তুলনামূলকভাবে শান্ত। যদিও এর পৃষ্ঠদেশ প্রায় পুরোটাই উল্কার আঘাতে সৃষ্ট গহ্বর দ্বারা পরিপূর্ণ। বড়ো বড়ো গহ্বরগুলোর চারপাশে বরফীয় বলয় দেখা যায়, যাকে বলা ‘বহুবলয়বিশিষ্ট নিম্নভূমি’ (multi-ring basins), যেমন ‘ভলহল্লা’ (Valhalla) এবং ‘আসগার্ড’ (Asgard) গহ্বর। উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত ভলহল্লা গহ্বর বেসিনটির বিস্তার প্রায় ৬০০ কিলোমিটার। এই দুটি বৃহৎ গহ্বরকে ঘিরে আছে সমকেন্দ্রিক বলয়ের ন্যায় কিছু রেখা। এগুলি দেখতে অনেকটা বড়ো বড়ো ফাটলের মতো। তবে বরফের ধীরগতির জন্য এগুলির কিনারা কিছুটা মসৃণ হয়ে গেছে। গ্যানিমিডের মতোই ক্যালিস্টোর প্রাচীন গহ্বরগুলি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়াও উপগ্রহটির পৃষ্ঠে বিভিন্ন প্রকারের ‘ক্যাটেনা’-র (Catena) সন্ধান পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীদের অনুমান এগুলির উৎপত্তি কোনও গ্রহাণু বা ধূমকেতুর সংঘর্ষের ফলে। উপগ্রহ-পৃষ্ঠে আছড়ে পড়ার পূর্বে এগুলি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় এবং সেগুলি আছড়ে পড়ে গহ্বর-শৃঙ্খল অর্থাৎ ক্যাটেনা জাতীয় ভূমিরূপ সৃষ্টি করে। ক্যালিস্টো উপগ্রহটির পৃষ্ঠে একটি উল্লেখযোগ্য গহ্বর-শৃঙ্খল হল ‘গিপুল ক্যাটেনা’ (Gipul Catena) যার ব্যাস ৬২০ কিলোমিটারর মতো।

বায়ুমণ্ডল

গ্যালিলিও মহাকাশযানের পাঠানো ছবি বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ক্যালিস্টোকে বেষ্টন করে অত্যন্ত পাতলা বায়ুমণ্ডল রয়েছে। এর ঘনত্ব এতটাই ক্ষীণ যে একে এক্সোস্ফিয়ার বলাই ভালো। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই বায়ুমণ্ডল মূলত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস দ্বারা গঠিত। এত পাতলা বায়ুমণ্ডল মাত্র চার বছরের মধ্যে উড়ে যেতে পারত, কিন্তু যায়নি। তাই ধরে নেওয়া হয়, উপগ্রহটির বরফাচ্ছাদিত ভূত্বকের কারণে এটি ক্রমাগত পুনঃপূরণ হচ্ছে। ক্যালিস্টোর এই অতি ক্ষীণ বায়ুমণ্ডল জীবের বাসোপযোগী না হওয়া সত্ত্বেও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বৃহস্পতির চৌম্বকক্ষেত্র, সৌর বায়ু ও উপগ্রহের পৃষ্ঠের পারস্পরিক ক্রিয়ার একটি নিখুঁত উদাহরণ। ক্যালিস্টোর এই রহস্যময় ও শীতল বায়ুমণ্ডল ভবিষ্যতের গবেষণায় অনেক নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে।

চৌম্বকক্ষেত্র

বৃহস্পতির অন্যতম বড়ো উপগ্রহ ক্যালিস্টোর নিজস্ব কোনও আভ্যন্তরীণ চৌম্বকক্ষেত্র নেই। তবে পাতলা বায়ুমণ্ডলের পাশাপাশি একটি রহস্যময় আংশিক ও স্থানীয় চৌম্বকক্ষেত্র (local magnetic field) লক্ষ করা যায়। এই চৌম্বকক্ষেত্র পৃথিবী বা গ্যানিমিডের মতো শক্তিশালী না হলেও বাহ্যিক কোনও পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি এই চৌম্বকক্ষেত্র (induced magnetic field) বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাঁদের অনুমান এটি বৃহস্পতির পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবে ক্যালিস্টোর অভ্যন্তরে বিদ্যমান কোনও বিদ্যুৎ পরিবাহী স্তরের মাধ্যমে সৃষ্ট। এই চৌম্বক প্রতিক্রিয়া থেকেই বিজ্ঞানীদের অনুমান যে উপগ্রহটির বরফের ১০০-২০০ কিলোমিটার গভীরে একটি তরল লবণাক্ত মহাসাগর থাকতে পারে যা ভবিষ্যতের মহাকাশ গবেষণায় জীবনের সম্ভাবনা অন্বেষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই এই উপগ্রহটিকে অনেক সময় ‘মহাসাগরীয় বিশ্ব’ (Ocean World) বলা হয়। ক্যালিস্টোর চৌম্বকক্ষেত্র প্রথম শনাক্ত করা হয় নাসা (NASA)-র গ্যালিলিও (Galileo) মিশনের মাধ্যমে, যা ১৯৯৬ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বৃহস্পতি ও তার উপগ্রহগুলোর উপর গভীর পর্যবেক্ষণ চালিয়েছিল।

তথ্যসূত্র

এই লেখকের অন্যান্য বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ
ধ্রুবতারা ধ্রুব নয়,  মহাকাশে আমরা কোথায়, বিস্ময় ভরা ‘আদ্রা’ নক্ষত্র, সৌড়ঝড়ের আঘাতে টালমাটাল পৃথিবী, কৃষ্ণগহ্বরপিঙ্গল বামন, সূর্য, সৌরকলঙ্ক, মহাকাশের ভূতুড়ে আলো, কোয়াসার, মহাকাশের অচেনা বস্তু-পালসার, মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ (অশ্বিনী থেকে রেবতী) – (১), মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-২, মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৩, মহাবিশ্বে মহাকাশে-আকাশগঙ্গার ভবিষ্যৎ, মহাবিশ্বে মহাকাশে-মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৪, মহাবিশ্বে মহাকাশে-মহাবিশ্বে মহাকাশে-চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৫,চান্দ্রপথ অশ্বিনী থেকে রেবতী-৬, অগস্ত্য-বাতাপি উপাখ্যান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান, মহাবিশ্ব সৃষ্টির গোড়ার কথা, মহাবিশ্বে মহাকাশে- নক্ষত্র সৃষ্টির রহস্য, মহাবিশ্বে মহাকাশে-নক্ষত্রের শেষ দিন, মহাবিশ্বে মহাকাশে- চাঁদের ভবিষ্যৎমহাবিশ্বে মহাকাশে তারাজগতের সৃষ্টি রহস্য, মহাবিশ্বে মহাকাশে তারাজগতের প্রকারভেদ, মহাবিশ্বে মহাকাশে –  বিচিত্র গ্যালাক্সি, ১১-এর জালে নিল আর্মস্ট্রং, মহাবিশ্বে মহাকাশে-গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে-বুধ গ্রহ, মহাবিশ্বে মহাকাশে-গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে-শুক্র গ্রহ, মহবিশ্বে মহাকাশে-আমাদের বাসভূমি পৃথিবী, মহবিশ্বে মহাকাশে-চাঁদ, মঙ্গলগ্রহ, ফোবস, ইউরোপা, গ্যানিমিড

জয়ঢাক প্রকাশন থেকে এই লেখকের লেখা মহাবিশ্বে মহাকাশে বইটি কিনতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

মহাবিশ্বে মহাকাশে

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

Leave a Reply