Funবিজ্ঞান-আণবিক দানবিক (পর্ব ৩)-অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়-শরৎ ‘২৬

(তৃতীয় পর্ব)

১৯৩৫, কোপেনহেগেন।

নিলস বোর ইন্সটিটিউটে পদার্থবিজ্ঞানী জন হুইলার বোরকে জানালেন, রোমে এনরিকো ফের্মি কম গতির নিউট্রন দিয়ে মৌল পদার্থ আঘাত করে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তার পরীক্ষায় চমৎকার ফল পেয়েছেন। সদ্য রোম থেকে ফিরে এসেছেন হুইলার, তবে এই বিষয়ে তিনি খুব বেশি জ্ঞান আহরণ করে উঠতে পারেননি। আপাতত নাকি ফের্মি বাইরের দুনিয়ার কাছ থেকে নিজের গবেষণা খানিকটা গোপন রাখতে চাইছেন। বোর ইন্সটিটিউটেও এমন কাজ হওয়া উচিত অবশ্যই।

হুইলারের কথায় সারবত্তা আছে বুঝে নিলস বোর ছাত্রদের নিয়ে এক আলোচনা সভার আয়োজন করলেন। আণবিক পদার্থবিদ্যার সাম্প্রতিক কাজ নিয়ে সবাই নিজের নিজের বক্তব্য পেশ করতে লাগল। নিউট্রন দিয়ে কোনও মৌল পদার্থকে আঘাত করে তেজস্ক্রিয়তা লক্ষ করা যায়— এটা বোর মানতেন না। যেই একজন ফের্মির সম্ভাব্য কাজ নিয়ে বক্তব্য রাখলেন, তাঁর কথার মাঝেই বোর চেঁচিয়ে উঠলেন, “এক মিনিট, এক মিনিট!” তারপর মাথায় হাত দিয়ে চেয়ারের হাতলে বসে চোখ বুজলেন। ছাত্ররা ছুটে এল। বোর নিশ্চয়ই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

লিজ মেইটনারের বোনপো অটো ফ্রিস জিজ্ঞেস করল, “কী হল, স্যার? ডাক্তার ডাকব? শরীর কি খারাপ লাগছে?”

বোর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হো হো করে হেসে উঠে পকেট হাতড়ে বার করলেন তাঁর প্রিয় পাইপ। বাঁহাতে পাইপ ধরে তাতে ডানহাতের লাইটার জ্বালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে একমুখ ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর ফ্রিসকে বললেন, “এখনও পঞ্চাশ বছর হতে কয়েকটা দিন বাকি আছে। শরীর ভালো হয়ে গেল একটা নতুন সম্ভাবনার কথা ভেবে। দাঁড়াও, ব্ল্যাকবোর্ডে গিয়ে ব্যাপারটা বোঝাচ্ছি।”

(প্রফেসর নিলস বোর)

যে তরুণ পদার্থবিদ লেকচার দিচ্ছিলেন, তিনি সরে দাঁড়ালেন। বোর ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে একটা গোল এঁকে বললেন, “ধরা যাক এটা একটা নিউক্লিয়াস। এবার নিউট্রন আর প্রোটন আঁকছি। এই একটা নিউট্রন বাইরে থেকে ছোড়া হল নিউক্লিয়াসের ওপর। মনে রাখতে হবে, এটা ফার্স্ট নিউট্রন নয় যে নিউক্লিয়াসের মধ্যের ফাঁকফোকর দিয়ে পালাবে। এটা হল স্লো নিউট্রন, কম গতির। এবার নিউক্লিয়াসে ঢুকে ব্যাটা পালাবে না, আটকে যাবে অন্য নিউট্রন আর প্রোটনের সঙ্গে। তাহলে ওর শক্তির কী হবে? শক্তি ছড়িয়ে পড়বে অন্যান্য নিউক্লীয় কণার মধ্যে। নিউক্লিয়াস আগের চাইতে বেশি শক্তি পেয়ে আন্দোলিত হতে থাকবে। তারপর ঠিক যেমন জলের একটা বড়ো ফোঁটা দুটো আলাদা ফোঁটায় বিভক্ত হয়, এক্ষেত্রেও তাই হবে। নিউক্লিয়াসটা ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যাবে। কেমন দাঁড়াল আইডিয়াটা? খারাপ নাকি খুব?”

ছাত্ররা হইচই ফেলে দিল। একেবারে মনের মতো বিবরণ দিলেন প্রফেসর বোর। মুখে তাঁর বিজয়ীর হাসি। কিছুক্ষণ আগেও ইনি নিউট্রন দিয়ে পরমাণু ভেঙে ফেলার কথা শুনলেই বিরক্ত হতেন। বোরের ধারণা আণবিক বিজ্ঞানের পাতায় ‘লিকুইড ড্রপ মডেল’ নামে খ্যাত হল।

এবার প্রফেসর বোরের ছাত্ররা সবাই ঠিক করল, এমন পরীক্ষা বোর ইন্সটিটিউটে না করলেই নয়। অটো ফ্রিসের মনে পড়ল, কীভাবে প্রফেসর বোর আমেরিকাতে তার জামার আস্তিন ধরে টান দিয়ে পাশে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার ইন্সটিটিউটে কাজ করবে? তোমার মতো পদার্থবিদের আমার বড়ো প্রয়োজন।’ তরুণ ফ্রিস সেদিন আকাশ থেকে পড়েছিল অধ্যাপকের সারল্যে। মাত্র চব্বিশ বছর বয়স তার, বোরের মতো বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী তাকে কাজ দিচ্ছেন, তাও এত কুণ্ঠিত হয়ে! ফ্রিস মহানন্দে কোপেনহেগেনে এসে তাঁর ল্যাবে কাজ করতে গিয়ে কত কী শিখে চলেছে। অধ্যাপকের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে ফ্রিসের।

প্রফেসর বোর ফ্রিসকে জানিয়েছিলেন, আণবিক পদার্থবিদ্যায় গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার মতো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি জোটানো তাঁর ইন্সটিটিউটে মুশকিল। আমেরিকান পদার্থবিদ আরনেস্ট লরেন্স সাইক্লোট্রন বানিয়ে ফেলেছেন, কিন্তু সেই কাজে প্রচুর অর্থ লাগে। সাইক্লোট্রন যন্ত্রে আধানযুক্ত কণার শক্তি বহুগুণ বাড়ানো যায়, কিন্তু নিউট্রন তো আবার আধানমুক্ত নিরপেক্ষ একটা পারমাণবিক কণা। তাকে সাইক্লোট্রন যন্ত্রে ঘুরিয়ে শক্তি সঞ্চারিত করা যাবে না। তাই কিছুটা রেডিয়াম লাগবে নিউট্রনের উৎস হিসাবে ব্যবহার করতে। এদিকে খুব সহজে রেডিয়াম কোপেনহেগেনের মতো শহরে পাওয়া দুষ্কর, দামও আকাশছোঁয়া।

এক ছাত্রের মাথা দিয়ে আইডিয়া গজাল, ক্রাউড ফান্ডিং করলে কেমন হয়? চেয়েচিন্তে জুটেও গেল অর্থ। এক লক্ষ ক্রোনার জমা হয়ে গেল শহরের বুদ্ধিজীবীদের দেওয়া অর্থে। এসে গেল আধ গ্রাম রেডিয়াম। ফ্রিস খুব খুশি। এবার বেরিলিয়াম পাউডার তৈরি করে কাচের বোতলে রেডিয়ামের সঙ্গে রেখে দিয়ে বানানো হল নিউট্রনের উৎস। কার্বন ডাই-সালফাইড দ্রবণের মধ্যে সেই বোতল রেখে দিলে পাওয়া গেল কম গতির নিউট্রন। পরবর্তী কাজ হল একে একে বোরন, ক্যাডমিয়াম, ফসফরাস ইত্যাদি মৌলের উপর কম গতির নিউট্রন আঘাত করে দেখা, নতুন আইসোটোপ তৈরি হয় কি না।

অটো ফ্রিসের চেষ্টায় এবং নিলস বোরের উৎসাহে একটা ছোট্ট সাইক্লোট্রন মেশিন কেনা হল বোর ইন্সটিটিউটে। ১৯৩৬ সালের গোড়ার দিকে বোর এবং তাঁর ছাত্ররা যখন নিজেদের গবেষণা নিয়ে একটি বিশেষ প্রবন্ধ ছাপাতে পাঠালেন, ঠিক তখনি আমেরিকার দুই পদার্থবিদ ব্রেইট ও উইগনার বোরের পথে হেঁটে (তাঁরা বোর ইন্সটিটিউটের কাজের সম্পর্কে জানতেন না) লিকুইড ড্রপ মডেলের গাণিতিক তত্ত্ব দিয়ে অন্য একটি গবেষণাপত্র লিখে সাড়া ফেলে দিলেন।

১৯৩৭, রোম/আমেরিকা।

রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক মারিয়ো করবিনো অকস্মাৎ মারা গেলেন। তাঁর জায়গায় যিনি যোগ দিলেন, তিনি নাৎসি সমর্থক পদার্থবিদ। নতুন পদে যোগ দিয়েই তিনি ইহুদি বিজ্ঞানীদের বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। এনরিকো ফের্মি পড়লেন গভীর চিন্তায়। নিজে ইহুদি না হলেও স্ত্রী লরা ফের্মি ইহুদি হওয়ায় তাঁর চিন্তা বাড়তে লাগল। একদিকে আণবিক পদার্থবিদ্যায় তাঁর গবেষণাগারের সাফল্য এবং নিজের খ্যাতির চাপ সামলে নানা জায়গায় বক্তৃতা দেবার আমন্ত্রণ পাচ্ছেন, অন্যদিকে কাজের জায়গায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হতে থাকায় যথেষ্ট বিরক্ত হলেন তিনি। আমেরিকাতে বক্তৃতা করার ডাক পেলেন এনরিকো। ততদিনে ফের্মি দম্পতির দ্বিতীয় কন্যাসন্তান জন্মেছে। বড়ো মেয়ের বয়স পাঁচ, তার নানা আবদার বাবার কাছে। লরা সারাক্ষণ দুই মেয়ে সামালতে হিমসিম খাচ্ছেন। তবুও তাদের ইতালিতে ফেলে আমেরিকা যাবার কথা ভাবতেই পারছেন না তিনি। স্থির করলেন, সপরিবারেই আমেরিকা যাবেন এনরিকো, যতই কষ্টকর হোক জীবন।

রোমে এডলফ হিটলার বেনেটো মুসলিনির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে যোগ দিতে আসছেন। রোমের রাস্তায় রাস্তায় ফ্যাসিস্টদের সমর্থনে পোস্টার পড়েছে। হিটলার ও মুসলিনির পাশাপাশি ছবি দিয়ে বিশাল বিশাল ছবি লাগানো হয়েছে। রাস্তাঘাট সব পরিষ্কার করা হচ্ছে। মুসলিনি হিটলারকে আগে সমর্থন দেননি। এখন দুই পরাক্রমী নেতার সাক্ষাৎকার দেখে বোঝা যাচ্ছে, গভীর ষড়যন্ত্র চলছে এবং বদলে যাচ্ছে ইতালির সমাজ। বাড়ছে ইহুদি বিদ্বেষ।

আমেরিকায় সাত মাস ধরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংস্থায় বক্তৃতা করতে লাগলেন এনরিকো ফের্মি। দেখা হল নিলস বোরের সঙ্গে। বোর একটি সম্মেলনের মধ্যাহ্নভোজের ফাঁকে এনরিকোকে একপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে জানালেন, “খুব শিগগির ভালো খবরের জন্য প্রস্তুত থেকো। খুব ভালো কাজ হচ্ছে তোমার!”

এনরিকো কানাঘুষোয় শুনেছিলেন, নোবেল পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম পাঠানো হয়েছে স্টকহোমে। কিন্তু এই পুরস্কারের পুরো বিষয়টা গোপন থাকে। বোরের জানবার কথা নয় যে পুরস্কার কে পাচ্ছেন। তাই এনরিকো বিস্মিত হয়ে বলেন, “কোন খবর, প্রফেসর? আমার জানা নেই।”

ফের্মির কাঁধে নিজের একটা হাত রেখে ভরসা দিয়ে বলেন তিনি, “আরে, নোবেল পুরস্কার হে! তোমার কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তার কাজ যে অনন্যসাধারণ, কে না জানে? এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আর হ্যাঁ, যদি পুরস্কার পাও, কোপেনহেগেনে আমার ইন্সটিটিউট বা আমেরিকাতে এসে কাজ কোরো, রোম তোমার পরিবারের জন্য নিরাপদ নয়।”

এনরিকো অবাক হয়ে গেলেন বোরের কথায়। পদার্থবিদ্যা ছেড়ে ইনি কি আজকাল গোয়েন্দাগিরি করে বেড়াচ্ছেন নাকি? হেসে ফেলেন ফের্মি।— “ইংরেজি বলতে আবার লরার খুব অসুবিধা, স্যার! তবে আমি কয়েকটা জায়গা থেকে আমন্ত্রণ পেয়েছি অধ্যাপনা করার জন্য। রোম বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য অর্থ জোটানো যথেষ্ট মুশকিল হয়ে পড়ছে। হয়তো আপনি ঠিকই বলছেন, রোম হয়তো আমার পরিবারের জন্য নিরাপদ নয়, তবে গোটা পৃথিবীর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আপনার দেশ ডেনমার্কও কতদিন যে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারবে বলা দুষ্কর।”

১৯৩৭, কেমব্রিজ।

আরনেস্ট রাদারফোর্ড নিজের বাগানে প্রতিদিনের মতো কাজে নেমেছিলেন। একটা উঁচু গাছের মাথা ঝাঁকড়া হয়ে গেছে, সেটাকে ছেঁটে ফেলা দরকার, এই ভেবে মালিকে না ডেকে নিজেই মই লাগিয়ে উঠে পড়লেন লাফ দিয়ে। গাছের মাথায় কাঁচি চালাতে গিয়ে শরীরের ভার সামলাতে না পেরে মইসুদ্ধ সশব্দে মাটিতে আছড়ে পড়লেন রাদারফোর্ড। পতনের আওয়াজ শুনে স্ত্রী মারি ছুটে এলেন। সাতষট্টি বছরের বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক ততক্ষণে আঘাত সামলে উঠে বসেছেন বাগানের ভিতরেই। কিন্তু যন্ত্রণার ছাপ তাঁর মুখে স্পষ্ট।

অনেকদিন ধরে পেটে হার্নিয়া ছিল রাদারফোর্ডের। মারির সাহায্যে পেট চেপে ধরে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। হঠাৎ বমি করলেন অনেকটা। মারি ডাক্তার ডাকলেন। ডাক্তার হাসাপাতালে নিয়ে যাবার পরামর্শ দিলেন। হাসপাতালে পরীক্ষা করে দেখা গেল, রাদারফোর্ডের অন্ত্রে কিছু প্যাঁচ হয়ে আছে, পড়ে যাবার কারণে বেড়ে গিয়েছে সমস্যা। অস্ত্রোপচার করতে হবে তক্ষুনি। রাদারফোর্ড অপারেশন টেবিলে যাবার আগে স্ত্রী মারিকে বললেন, “হয়তো ফিরে আসব। যদি না আসি, মনে করে নেলসন কলেজকে ১০০ ডলার পাঠিয়ে দিও। ওদের অনুদান দেব বলেছিলাম। ভুলে যেও না কিন্তু!”

অস্ত্রোপচারের পরদিন রাদারফোর্ড উঠে বসলেন বিছানায়। তাঁকে দেখতে কেমব্রিজ থেকে এল অসংখ্য ছাত্র ও অধ্যাপক। তিনি সবার সঙ্গে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে কথাও বললেন। কিন্তু সেই রাতেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন আণবিক পদার্থবিদ্যার জনক লর্ড আরনেস্ট রাদারফোর্ড। টেলিগ্রাম চলে গেল পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থায়।

ইতালির বলগোনা শহরে পালিত হচ্ছিল লুই গ্যালভানির জন্মের দ্বিশতবার্ষিকী। বিজ্ঞানীদের বিশাল সমাবেশ। অনুষ্ঠান শুরুতেই আমন্ত্রিত বৈজ্ঞানিক নিলস বোর মঞ্চে উঠে অশ্রুসিক্ত নয়নে রাদারফোর্ডের মৃত্যুসংবাদ শোনালেন। উপস্থিত বিজ্ঞানী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা রাদারফোর্ডের প্রতি উঠে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানালেন। বোর তাঁর স্ত্রীকে টেলিগ্রাম করলেন— ‘আজ আমি একজন অভিভাবক হারালাম।’

গোটা গবেষণা জীবনে নিলস বোর সবসময় রাদারফোর্ডের পরামর্শ নিয়ে নিজের কাজ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। বহু সময় একসঙ্গে কাটিয়েছে বোর ও রাদারফোর্ড পরিবার। স্মৃতির সরণি বেয়ে কত কথা, কত গল্প মনে পড়ে মার্গারেট বোরের। আরনেস্ট রাদারফোর্ড নিলস বোরের প্রিয় মানুষ ছিলেন বলেই নিজের ছ’টি পুত্রের মধ্যে একজনের নামকরণ করেছিলেন আরনেস্ট।

১৯৩৮, বার্লিন।

কিউরি দম্পতি (১৯৩৫ সালে) নোবেল পুরস্কার পাবার পর থেকে ফ্রান্সে পৃথক গবেষণাগারে কাজ করতে থাকেন। আইরিন কিউরি ইউরেনিয়ামের ওপর কম গতির নিউট্রন আঘাত করে পরীক্ষার ফলাফল যাচাই করছিলেন। বার্লিনের কাইজার উইলহেম ইন্সটিটিউটে হান এবং মেইটনার ঠিক একই কাজ করছিলেন। এই সময়টাতে বিশ্বের বহু বিজ্ঞানী ইউরেনিয়ামের পরমাণু ভাঙার চেষ্টা করছিলেন। রাদারফোর্ড যে মৌল ভেঙে ফেলার কথা আকাশকুসুম কল্পনা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, আলবার্ট আইনস্টাইন যাঁকে অন্ধকারে তির ছুড়ে পাখি মারার চেষ্টা বলে উপহাস করেছিলেন; নিলস বোর, উলফগ্যাং পাউলি, রবার্ট ওপেনহাইমার, এনরিকো ফের্মি, লিজ মেইটনার, আইরিন কিউরি, অটো হান প্রভৃতি বিজ্ঞানীরা পরমাণু থেকে বিপুল শক্তি লাভ করার স্বপ্ন দেখে নিজের নিজের কাজকে এগিয়ে নিয়ে চলেছিলেন। সম্ভাবনা ছিল বেশি ভরের পরমাণুরা, কারণ তাদের নিউট্রন সংখ্যা প্রোটনের চাইতে বেশি হওয়ায় ভেঙে ফেলা সহজ।

আইরিন কিউরি ইউরেনিয়ামকে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করে পারমাণবিক বিক্রিয়ায় যে পরমাণু পেলেন, তাঁর সঙ্গে থোরিয়ামের মিল ছিল। এদিকে লিজ মেইটনার একই পরীক্ষা করে পেলেন অনেক কম ভরের এক পরমাণু, যা থোরিয়াম আদৌ নয়। আইরিনের গবেষণাপত্র বলছে, তিনি নাকি বিক্রিয়ায় আলফা কণার সন্ধান পেয়েছেন, কিন্তু সেই একই পরীক্ষা কাইজার গবেষণাকেন্দ্রের তরুণ বিজ্ঞানী ফ্রিজ স্ট্র্যাশম্যানকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে লিজ কোনও আলফা কণা পেলেন না।

পুরো ব্যাপারটা দেখেশুনে লিজ মেইটনার অটো হানকে আইরিন কিউরি সম্পর্কে বললেন, “নোবেল পেয়ে মেয়েটার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। বিশ্বখ্যাত নোবেলজয়ী মায়ের কন্যা যা খুশি তাই গবেষণার নামে চালিয়ে দিচ্ছে। থোরিয়াম বলে যা পাচ্ছে, আমাদের পরীক্ষাগারে ঠিক উলটো হচ্ছে। মনে হচ্ছে ফ্রান্স আর জার্মানির বিজ্ঞান যেন আলাদা। ভাবছি, আণবিক পরীক্ষানিরীক্ষা ছেড়ে অন্য কাজ ধরতে হবে।”

হান শান্ত গলায় মিষ্টি হেসে বললেন, “আহা, চটো কেন? এমনও তো হতে পারে, আইরিন হয়তো নতুন কোনও আইসোটোপ আবিষ্কার করেছে, হয়তো একদিন  কিউরইওসিয়াম নামে তা স্থান পাবে পিরিয়ডিক টেবিলে।”

হানের রসিকতায় একটুও মজা পেলেন না লিজ। তিনি ধূসর হয়ে আসা চুলের গোছা খুলে আবার নট বেঁধে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে গিয়ে নিজের টেবিলে বসে একটা কড়া চিঠি লিখলেন আইরিন কিউরিকে—

‘তোমার গবেষণার ফলাফল সম্পূর্ণ ভুল। ইউরেনিয়ামের ওপর নিউট্রন আঘাত করে ট্রান্স ইউরানিক এলিমেন্ট পাওয়ার কথা। কিন্তু তোমার গবেষণা দেখাচ্ছে অন্য এক মৌল, যার পারমাণবিক ভর অনেক কম। পিরিওডিক টেবিলে কোথায় বসাবে একে, তাও পরিষ্কার নয়। আমি নিজের গবেষণাগারে পরীক্ষা করে ও করিয়ে দেখেছি, তোমার গবেষণার সঙ্গে তার কোনও মিল নেই। এই একই বিষয়ে আমি ও অটো হান দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় প্রাপ্ত জ্ঞান সম্বল করে ১৯৩৫ সালেই একটি তত্ত্ব দিয়েছি। আমাদের পরীক্ষার ফলাফল ভিন্ন ছিল। চিঠির সঙ্গে সেই গবেষণাপত্রের একটা কপি পাঠালাম। সেই তত্ত্বের সঙ্গে তোমার ফলাফলের কোনও মিল যে নেই, তা সুস্পষ্ট হয়ে যাবে।’

আইরিন লিজের পত্র পাওয়া মাত্র উত্তর দিলেন—

‘এটা হয়তো অ্যাক্টিনিয়াম হতে পারে। আবার পরীক্ষা করে দেখেছি, কোনও কম ভরের মৌল কিন্তু আমরা পাইনি।’

কিছুদিন পর আবার আইরিন কিউরির একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ পেল, যাতে তিনি লিখলেন— একই পরীক্ষা করে যে মৌল তিনি পেয়েছেন, তা ইউরেনিয়ামের অর্ধেক ভরের কোনও মৌল, হয়তো ল্যান্থানিয়াম হলেও হতে পারে।

ফ্রিজ স্ট্রাশম্যান লিজ এবং অটো হানকে জানাল, সে নিজেই আবার আইরিনের পদ্ধতি প্রয়োগ করে দেখতে চায় ফলাফল কী আসে। দুই প্রবীণ অধ্যাপক সম্মতি দিলে ফ্রিজ নিজেও আইরিনের মতোই এক অদ্ভুত আইসোটোপ পেল। হান এবং লিজ বিমূঢ় হয়ে ভাবতে লাগলেন পরবর্তী পর্যায়ে কাজ কেমন করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

মার্চ মাসের বারো তারিখে জার্মান সৈন্যবাহিনী হিটলারের নির্দেশে অস্ট্রিয়ার দখল নিল। দুই দেশের সীমান্তের বেড়া ভেঙে দেওয়া হল। লিজ মেইটনার সেই রাতে অস্ট্রিয়ার নাগরিকত্ব হারিয়ে জার্মান ইহুদি হয়ে গেলেন। ফলে অন্যান্য ইহুদি বিজ্ঞানীর সঙ্গে তাঁর আর কোনও পার্থক্য রইল না। জার্মানির সব নিয়ম এখন তাঁর উপর বর্তাবে। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে লিজ যখন নিজের অস্তিত্বের সঙ্কট বুঝতে পারলেন, তখন এই দেশ ছেড়ে পালাবার কথা তাঁর সর্বপ্রথম মনে এল। ডাক পড়ল অটো হানের ঘরে।

বিধ্বস্ত লিজকে দেখে তাঁকে সামনের চেয়ারে বসতে বলে অটো হান বললেন, “কাল রাতে কাইজারে নাৎসি সমর্থকেরা উল্লাস করেছে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। জানি না কতদিন কাইজারে তোমার চাকরি থাকবে।”

“বছর তিনেক আগে যদি প্রফেসর বোরের কথা শুনতাম। তিনি রকফেলার ফেলশিপ দিতে চেয়েছিলেন আমাকে। বলেছিলেন জার্মানি ছেড়ে কোপেনহেগেনে গিয়ে কাজ করতে। যদি চলে যেতাম, তাহলে আজকের দিনটা দেখতে হত না।” গলা ধরে আসে লিজের। অটো হান জলের গ্লাস সামনে বাড়িয়ে দেন।

লিজ কিছুটা জল খেয়ে আবার বলেন, “এখন কী হবে তাও বুঝতে পারছি না। আমার অস্ট্রিয়ার পাসপোর্ট আর চলবে না। ওঁরা কি আমাকে অ্যারেস্ট করবে? নিয়ে যাবে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে? কত কাজ পড়ে আছে…”

অটো হান চেয়ার থেকে উঠে এসে লিজের কাঁধে একটা হাত রেখে ঘরে পায়চারি করতে করতে বলেন, “কাজটা থামিও না। আমি ডাইরেক্টরের সঙ্গে কথা বলে দেখছি তোমার জন্য কী করা যায়। এখন শুনলাম নতুন আইন আসবে, কোনও জার্মান শিক্ষিত নাগরিক দেশের বাইরে আর যেতে পারবে না। আর এই ইন্সটিটিউটে আমাদের শত্রুর তো অভাব নেই। কার্ট হেস, হিটলার সমর্থক লোকটা, যে কাইজার ইন্সটিটিউটের দখল নিয়ে ফেলেছে, সে বলছে এখানে ইহুদিদের কোনও জায়গা নেই। মেলা লোকজন জুটিয়ে ফেলছে সে। কথা বলছি, তুমি আজ আর ল্যাবে নাই-বা গেলে, আমার বাড়িতে না-হয় ক’টা দিন থাকো। এখানে তোমার সুরক্ষা নেই আপাতত।”

কাইজার ইন্সটিটিউটের আস্তানা ছেড়ে হোটেলে উঠে গেলেন লিজ মেইটনার। এদিকে অটো হান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে লিজের চাকরি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সুবিধা করতে পারলেন না। তিনি বুঝলেন, লিজের পক্ষ নিতে গেলে তাঁকে নিজের চাকরি খোয়াতে হতে পারে। তাই তিনি লিজকে লোক মারফত জানিয়ে দিলেন, অধ্যাপনার পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া লিজের পক্ষে সম্মানজনক হবে। তবে নিজের কাজ বিনা বেতনে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন তিনি।

কাইজার উইলহেম ইন্সটিটিউটের নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর মেইটনারকে শ্রদ্ধা করতেন। তিনি লিজকে চাকরিতে পুনর্বহাল করার প্রস্তাব জানালেন শিক্ষা অধিকর্তাদের। সেটি খারিজ হলে তিনি লিজকে অন্য কোনও দেশে সসম্মানে চলে যেতে দেবার অনুমতি চাইলেন। এবার জবাব এল, রেইখ কাউন্সিল চায় না যে কোনও ইহুদি বিজ্ঞানী বাইরের দেশে গিয়ে কোনও কাজ করে। এরা জার্মানির পক্ষে ক্ষতিকারক কোনও কাজ করতে পারে, যা দেশের পক্ষে মঙ্গলজনক নয়।

নিলস বোরের কাছে লিজের বেহাল অবস্থার কথা পৌঁছলে তিনি লিজকে বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে যোগ দিতে কোপেনহেগেনে আমন্ত্রণ জানালেন। বিভিন্ন জায়গায় তিনি লিজকে জার্মানির বাইরে নিয়ে আসার জন্য চেষ্টা চালাতে লাগলেন। লিজের বোনপো অটো ফ্রিস আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলেন কখন তাঁর মাসি কোপেনহেগেনে এসে কাজের দায়িত্ব নেন।

প্রফেসর নিলস বোরের অনুরোধে হল্যান্ডের পদার্থবিদ ডির্ক কোস্টার অর্থ জোটাতে লাগলেন লিজকে জার্মানি থেকে হল্যান্ডে নিয়ে আসার জন্য। সুইডেনের পদার্থবিদ, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মানে সিগবান কিছুদিন আগেই পদার্থবিদ্যার গবেষণার জন্য নিজের ইন্সটিটিউট খুলেছেন। লিজের অবস্থা জেনে তিনি তাঁকে চাকরি দিতে রাজি হয়ে গেলেন। কিন্তু সমস্যা হল, লিজ মেইটনার জার্মানি ছেড়ে যাবেন কী করে?

ডির্ক কোস্টার একটা ফন্দি আঁটলেন। কাইজার ইন্সটিটিউটের পদার্থবিদ্যা বিভাগের নতুন অধিকর্তা হয়েছেন ডক্টর পিটার ডিবাই। তিনি যথেষ্ট ভালো লোক বলেই জানা আছে। কোস্টার প্রফেসর ডিবাইকে সাংকেতিক চিঠি পাঠিয়ে বললেন, তিনি গবেষণায় কাজ করার জন্য একজন লোক খুঁজছেন, অনুমতি পেলে নিজে কাইজার ইন্সটিটিউটে এসে ছাত্রদের ইন্টারভিউ নেবেন। প্রফেসর ডিবাই সব বুঝে গেলেন। ছাত্র খোঁজা আসলে লিজ মেইটনারকে জার্মানি থেকে বার করে নিয়ে যাওয়ার ফন্দি। ডিবাই কোস্টারকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি কাল বিলম্ব না করে চলে এলেন বার্লিন।

প্রফেসর লিজ মেইটনার দ্বিধায় পড়লেন— সুইডেনে যাবেন, না ডেনমার্ক? অটো হান বললেন, “আগে কোস্টারের সঙ্গে জার্মানি ছাড়ো, তারপর ভেবে নিও।”

(লিজ মেইটনার ও অটো হান)

ডির্ক কোস্টার গোপনে লিজের সীমান্ত পার হবার বন্দোবস্ত করে রেখেছিলেন। হল্যান্ডের সীমান্তরক্ষী প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করে লিজের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে রেখেছিলেন তিনি। একদিন রাতের বেলায় কোস্টার আর লিজ বেরিয়ে পড়লেন বার্লিন রেলস্টেশনের উদ্দেশে। তাঁরা হল্যান্ড পাড়ি দেবার জন্য প্রস্তুত। নজর এড়াবার জন্য লিজ হোটেলে নিজের জিনিসপত্র পর্যন্ত আনতে গেলেন না।

অটো হানের বাড়ি থেকে দুজনে বিদায় নিলেন। লিজকে বিদায় জানাতে গিয়ে অটো হানের গলা ধরে এল। দীর্ঘকালের বন্ধুত্ব তাঁদের। আজ এক অনিশ্চয়তার মধ্যে লিজকে ছেড়ে দিয়ে স্বস্তি পাচ্ছেন না হান। তিনি নিজের হাত থেকে হিরে বসানো সোনার আংটি খুলে লিজের হাতে দিয়ে বললেন, “এটা রেখে দাও। প্রয়োজনে কাজে আসবে। এই আংটিটা আমার ঠাকুমার। দরকার বুঝলে বেচে দিও। ব্যাংকে তোমার যে টাকা আছে, সময় সুযোগ বুঝে তুলে নিলেই হবে। চিঠিতে যোগাযোগ রেখো। সাবধানে যেও।”

লিজের চোখে জল দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন ডির্ক কোস্টার। তাড়া লাগালেন লিজকে, “গাড়ি এসে গিয়েছে, ডক্টর মেইটনার। দেরি হলে ট্রেন মিস হবে।”

লিজ মেইটনার দেখলেন, ড্রাইভারের সিটে বসে রয়েছেন কাইজার ইন্সটিটিউটের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর পল রোসবাউড।

বার্লিন স্টেশন থেকে ট্রেনের আলাদা আলাদা বগিতে উঠলেন কোস্টার ও মেইটনার। সাত ঘণ্টা পর আসবে জার্মানি আর হল্যান্ডের সীমান্ত। ক্লান্ত মেইটনারের দু-চোখ বন্ধ হয়ে এল। এই যাত্রা বড়ো দুঃখের। তাঁর মনে হল, জীবনের এক সুখকর অধ্যায় শেষ হল। সামনে অনিশ্চিত জীবন। হয়তো পারমাণবিক গবেষণায় চিরকালের মতো ইতি টেনে দিতে হবে তাঁকে। ডক্টর মানে সিগবান এক্স-রে নিয়ে কাজ করেন, পারমাণবিক পরীক্ষানিরীক্ষা করার যন্ত্রপাতি যে সেখানে নেই, তা তাঁর জানা আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে নাৎসিদের হাত থেকে মুক্তি পেতে হবে। নইলে হয়তো সারাজীবন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের অন্ধকূপে বসে মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকতে হবে।

ফার্স্ট ক্লাসে উঠেছেন মেইটনার। সেভাবেই ডক্টর কোস্টার টিকিট রিজার্ভ করে রেখেছেন। প্রতিটি স্টেশনে পুলিশ এবং টিকিট পরীক্ষকের ভিড়। ভয়ে, উত্তেজনায় মেইটনারের শ্বাস রোধ হয়ে আসছে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শ্রেণির কামরায় চলছে যাত্রীদের পরিচয়পত্র তল্লাশি। অনেককে ট্রেন থেকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জানালা বন্ধ করে দিলেন মেইটনার। ভাগ্য ভালো যে প্রথম শ্রেণির কামরায় কেউ এখনও ওঠেনি।

সীমান্ত স্টেশন এসে গেল প্রায়। আর ঠিক তার আগের স্টেশন থেকে কামরায় উঠল একদল এস. এস. বাহিনীর লোক। আস্তিনে তাদের স্বস্তিক চিহ্ন দেখে সহজেই পরিচয় বুঝে নেওয়া যায়, তারা নাৎসি বাহিনীর। জার্মান সীমান্ত রক্ষীর দু-একজন ছাড়াও রয়েছে একজন ডাচ সীমান্ত রক্ষী। লিজ মেইটনারকে জার্মান সীমান্ত রক্ষীর একজন পাসপোর্ট দেখাতে বলল। বুকে হাতুড়ির ঘা পড়ছে লিজের। তিনি পাসপোর্ট বাড়িয়ে দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন। এবার তাঁকে নির্ঘাত নামিয়ে নিয়ে যাবে এরা। নিজের পাসপোর্ট যে বাতিল হয়ে গিয়েছে, গতকালই তিনি জানতে পেরেছেন। লিজের কাছে একটা কাগজ ছিল, যেখানে লেখা— লিজ মেইটনার পদার্থবিদ্যার এক সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন। সেই কাগজটা লিজ রক্ষীর দিকে বাড়িয়ে ধরলেন। কাগজটাতে চোখ বুলিয়ে কঠোর দৃষ্টিতে লিজকে দেখে নিয়ে লোকটা তাঁর পরিচয়পত্র দেখতে লাগল মন দিয়ে। ডাচ পুলিশদের একজন এবার এগিয়ে এসে প্রায় ফিসফিস করে কী যেন বলল জার্মান সীমান্ত রক্ষীর উদ্দেশে, ভালো শোনা গেল না।

লিজকে সব ডকুমেন্ট ফেরত দিয়ে ফিরে গেল সীমান্ত রক্ষীরা। দরদর করে ঘামছেন লিজ মেইটনার। সীমান্ত স্টেশন ছেড়ে ট্রেন এগোতে লাগল হল্যান্ডের ভিতর। গ্রোনিঙ্গেন স্টেশন আসতে এখনও ঢের দেরি। লিজ ব্যাগ থেকে বিস্কুটের প্যাকেট খুলে খেতে লাগলেন। এ-যাত্রা বেঁচে গিয়ে তাঁর মনে খুশির হাওয়া। এতক্ষণ যেন খিদে-তেষ্টা সব উধাও হয়ে গিয়েছিল।

গ্রোনিঙ্গেন স্টেশনে নেমেই কোস্টার টেলিগ্রাম করলেন অটো হানকে— ‘বাচ্চাটা নিরাপদে নেমেছে।’ হান সেই টেলিগ্রাম পেয়ে উত্তর দিলেন— ‘অভিনন্দন তোমাকে ও বাচ্চাকে।’

লিজ মেইটনারের হল্যান্ড পাড়ি দেবার সংবাদ পেয়ে সুইজারল্যান্ড থেকে পদার্থবিদ উলফগ্যাং পাউলি কোস্টারকে অভিনন্দন বার্তা জানিয়ে টেলিগ্রাম করলেন— ‘হাফনিয়াম (রেডিও-অ্যাক্টিভ আইসোটোপ) আবিষ্কারের জন্য তুমি যত না বিখ্যাত, লিজ মেইটনারকে অপহরণ করার জন্য আরও বেশি খ্যাতি পাবে।’

জার্মানির পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশে বাস করা অসম্ভব জেনে পাউলি সুইজারল্যান্ডের নাগরিকত্ব চেয়ে অপেক্ষা করছিলেন সেখানে। কিন্তু সুইজারল্যান্ড তাঁকে আশ্রয় দিতে অসম্মত হল। পাউলি আমেরিকাতে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজের জন্য আবেদন করলেন। কর্তৃপক্ষ সম্মত হলে উলফগ্যাং পাউলি আমেরিকা পাড়ি দিলেন।

নভেম্বর ১৯৩৮, জার্মানি/রোম।

অস্ট্রিয়া অধিকার করার পর হিটলারের নজর পড়ল চেকোস্লোভাকিয়ার দিকে। সেই দেশের এক-তৃতীয়াংশে জার্মানদের বসবাস। জার্মান ইহুদির সংখ্যাও কিছু কম নয়। ব্রিটেন এবং ফ্রান্স বাধ্য হয়েই মধ্যস্থতা করা থেকে পিছিয়ে এল। ফলে নাৎসি বাহিনী চেকোস্লোভাকিয়ার এক বিশাল অংশ নিজেদের অধিকারে নিয়ে নিল।

পোল্যান্ডের জন্ম নেওয়া এক জার্মান ইহুদি পরিবারকে নাৎসিরা জার্মানি থেকে বিতাড়িত করে ঠেলে দেয় পোল্যান্ডে। পরিবারের একটি পুত্রসন্তান প্যারিসে পড়াশুনো করতে গিয়েছিল। বাবা-মা ও তাঁর ভাইবোনদের পোল্যান্ডে ফেরত পাঠানোয় ক্ষুব্ধ হয়ে তরুণটি জার্মান দূতাবাসে ঢুকে গিয়ে একজন কূটনীতিকের ওপর গুলি চালায় নভেম্বরের আট তারিখে। পরদিন গুলিবিদ্ধ জার্মান সরকারি কর্মচারী মারা যায়। এই সংবাদ বার্লিনে পৌঁছনো মাত্র হিটলার এবং গোয়েবলস রেডিওতে সারা জার্মানি জুড়ে ইহুদি নিধনের আহ্বান জানান জ্বালাময়ী ভাষায়। বার্লিন এবং মিউনিখ-সহ জার্মানির প্রায় প্রত্যেক বড়ো শহরে লাগে দাঙ্গা।

নাৎসি বাহিনী, এমনকি বহু সাধারণ মানুষ মাঝরাতে ইহুদিদের বাড়ি আক্রমণ করে। তাদের বাড়ির কাচের জানালা ভাঙা হয় পাথর ছুড়ে। লুঠ হয়ে যায় ইহুদি ব্যাবসাকেন্দ্র এবং দোকানগুলি। বহু ঘর লুঠ করে জ্বলিয়ে দেওয়া হয়। ইহুদিদের উপাসনাগৃহগুলিতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হতে থাকে। সম্ভ্রান্ত ইহুদি পরিবারগুলো বেলজিয়াম কাচের বাসন ব্যবহার করত। সেই সমস্ত বাসন রাস্তায় ছুড়ে ভাঙা হতে থাকে। হাজারের ওপর ইহুদি নিধন করে, তিরিশ হাজারের কাছাকাছি ইহুদি গ্রেপ্তার করে তিনটি অস্থায়ী কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। জার্মানির রাস্তায় রাস্তায় ভাঙা কাচের টুকরো তুলে পরিষ্কার করার জন্য আবার গৃহছাড়া ইহুদিদেরই কাজে লাগায় গেস্টাপো বাহিনী। সারা পৃথিবী এই নারকীয় তাণ্ডবলীলার নিন্দে করতে থাকে। ইউরোপের সমস্ত দেশে ইহুদিদের মধ্যে ত্রাসের সৃষ্টি হয়। ইতিহাসের পাতায় এই রাত ‘ক্রিস্টালন্যাক্ট’, বা ‘ভাঙা কাচের রাত’ বলে কুখ্যাত হয়।

(ইহুদিদের ভাঙা দোকান)

১০ নভেম্বর সকালে রেডিওতে জার্মানির ইহুদি নিধন যজ্ঞের কথা সম্প্রচারিত হতে থাকে। ইতালির রোম শহরে রেডিওর খবর শুনতে শুনতে প্রাতরাশের ব্যবস্থা করতে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন লরা ফের্মি। তখনও তাঁর দুই মেয়ে ঘুমে কাতর। এনরিকো রোজকারমতো প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন। টেলিফোনটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠতে লরা সেদিকে ছুটে গেলেন। অপর প্রান্তে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে প্রফেসর এনরিকো ফের্মিকে চাইল কেউ। ফোনটা সুইডেনের স্টকহোম থেকে কেউ করেছে।

লরা শুনেছিলেন, এনরিকো নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন। কিন্তু পুরস্কার যে তিনি পাবেনই, এমন বিশ্বাস তাঁর এবং এনরিকো দুজনেরই ছিল না। তবে স্টকহোম থেকে যে ফোন করেছে, সে বিশেষ একটা সংবাদ শুধু প্রফেসর ফের্মিকেই দেবে, এমন কথা জানানোয় লরা ফোন রেখে দিয়ে ভাবলেন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে সবাইকে সুসংবাদটা জানিয়ে দেন। কিন্তু পুরস্কারের খবরে লরার বিখ্যাত স্বামীর যে বিশেষ তাপ-উত্তাপ দেখা যাবে না এবং সেই নিয়ে হইচই করা তাঁর আদৌ পছন্দ হবে না, তা লরার ভালোই জানা ছিল।

এনরিকো প্রাতঃভ্রমণ থেকে ফিরে লরার কাছে স্টকহোম থেকে টেলিফোন আসার সংবাদ শুনে মন্তব্য করলেন, “এই হচ্ছে ইতালি থেকে পালানোর মোক্ষম সময়। প্রফেসর বোর এই কারণেই আমাকে পুরস্কার পাবার সম্ভাবনা আগাম জানিয়ে রেখেছিলেন। যাই হোক, ফোন আসার আগেই বরং আমরা আমেরিকা যাত্রার প্রস্তুতি নিতে থাকি। বাজার যেতে হবে, অনেক কিছু কেনার আছে এখন।”

লরা হতভম্ব হয়ে গেলেন। বাজারে যাবার নাম শুনলে যার গায়ে জ্বর আসে সে কিনা বলে, এখনই বাজার যেতে হবে!

“অত বিস্মিত হবার কিছু নেই, মাই লেডি। ইতালিতে বিদেশ যাবার আইনকানুন বদলে দিয়েছে সরকার। মাত্র পঞ্চাশ ডলার হাতে নিয়ে বিদেশ যেতে হবে। কোনও ব্যাংক থেকে নজরে পড়ার মতো বেশি অর্থ তুললে বা কোথাও পাঠালে বিদেশ যাওয়া আটকে দেবে কর্তৃপক্ষ। মনে হচ্ছে নোবেলটা আমি পেয়ে গিয়েছি। কাজেই এই দেশ থেকে আপাতত পালিয়ে যাবার অসুবিধা নেই।”

একটু বেলার দিকে এনরিকোর কাছে ফোন এল নোবেল কমিটি থেকে। তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে বলা হল, এই বছরে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার শুধু একা তাঁকেই দেওয়া হয়েছে। সপরিবারে স্টকহোম যাওয়ার টিকিটের মূল্য দেবে নোবেল কমিটি।

ফোন রেখে দিয়ে লরার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন এনরিকো। বহুদিন পর এনরিকোর দুটো দাঁতের মধ্যের ফাঁক নজরে এল লরার। আজকাল কাজের চাপে হাসতেও ভুলে গিয়েছিলেন নোবেল বিজয়ী এনরিকো ফের্মি।

ডিসেম্বর, ১৯৩৮, বার্লিন।

কাইজার উইলহেম ইন্সটিটিউটের নিউক্লিয় রসায়ন বিভাগে তিনটি ঘরে শুধু দুজন ছাড়া আর সবার প্রবেশ নিষেধ। এই দুইজন হলেন অটো হান এবং তাঁর ছাত্র ফ্রিজ স্ট্র্যাশম্যান। পরপর তিনটি ছোটো ঘরের একটিতে টেবিলে রাখা তামার টিউবে ভরা ইউরেনিয়াম অক্সাইড। রেডিয়াম আর বেরিলিয়াম চূর্ণের মিশ্রণের একটি কাচের টিউব, যা মাঝে মাঝে তামার টিউবের একটু দূরে রেখে দেওয়া হচ্ছে প্যারাফিন মোমের ভিতর গেঁথে দিয়ে। এটি হল নিউট্রনের উৎস। প্যারাফিনের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় নিউট্রনের গতি কমে যাচ্ছে। সেই কম গতির নিউট্রন ইউরেনিয়াম অক্সাইডের সঙ্গে বিক্রিয়া করছে। কিছুক্ষণ ইউরেনিয়াম টিউবকে নিউট্রন উৎসের কাছাকাছি রেখে পাশের ঘরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রাসায়নিক পরীক্ষা করে দেখার জন্য। বিক্রিয়ায় কোন পদার্থ পাওয়া যাচ্ছে, সেই নিয়ে চলছে গবেষণা। তিন নম্বর ঘরে রাখা আছে গাইগার মুলার কাউন্টার। সেখানে তামার টিউবটা রেখে দেখা হচ্ছে কতগুলো পারমাণবিক কণা নির্গত হচ্ছে বিক্রিয়ায়।

একই ধরনের কাজ, ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন হান, কিন্তু উৎসাহের অন্ত নেই। এই কয়দিনে বোধ হয় প্রফেসর হানের চুল আরও সাদা হয়ে গিয়েছে, মনে হয় স্ট্র্যাশম্যানের। রাসায়নিক পদার্থের ঝাঁঝালো গন্ধের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে প্রফেসর হানের চুরুটের ধোঁয়া। প্রফেসরকে বিশ্রাম নিতে বলে রাত জেগে পরীক্ষা করতে থাকে স্ট্র্যাশম্যান। বার বার একই পরীক্ষা করে যা ফল পাওয়া যাচ্ছে, তা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে অটো হানের। তাই তিনি বিরক্ত হচ্ছেন। কম গতিবেগের নিউট্রন আঘাত করে ইউরেনিয়াম থেকে যা পাওয়া যাচ্ছে, তা রেডিয়ামের সঙ্গে মিল খায়। অথচ রেডিয়াম নয় বলেই বোধ হচ্ছে। তাহলে কি পদার্থটি বেরিয়াম? বেরিয়ামের পারমাণবিক ভর তো ১৩৮, ইউরেনিয়ামের প্রায় অর্ধেক! তা কি সম্ভব?

ইউরেনিয়ামের সহজলভ্য আইসোটোপের ভর ২৩৮। রেডিয়ামের অনেক আইসোটোপ, তদের মধ্যে সবচাইতে বেশি পাওয়া যায় যে আইসোটোপ, তার ভর ২২৬। যদি বিক্রিয়ার পর ইউরেনিয়াম থেকে রেডিয়াম পাওয়া যায়, তবে পিরিওডিক টেবিলের চার ধাপ নীচে নেমে যাবে বিক্রিয়ার পরের মৌলটি। আর যদি রেডিয়াম না হয়ে তা বেরিয়াম হয়, তবে একটি দুটি নয়, পিরিওডিক টেবিলের ছত্রিশটি ধাপ নীচে নেমে যাবে মৌল। তা কি আদৌ সম্ভব? ইউরেনিয়ামকে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করে বড়োজোর পিরিওডিক টেবিলের দু-চারটে ধাপ উপরে বা নীচের মৌল পাওয়া সম্ভব, কিন্তু এ যে একেবারে ইউরিয়াম ভেঙে দু-টুকরো হবার জোগাড়!

স্ট্র্যাশম্যান নিজেও পরীক্ষায় একই ফলাফল পেয়ে বিমূঢ়, কিন্তু সেও হাল ছাড়ছে না। দুই নম্বর ঘরে গিয়ে বার বার পরীক্ষা করে আলাদা করতে পারছে না রেডিয়াম থেকে বেরিয়াম। হানকে সেই কথা জানাতে তিনি ঘন ঘন সিগারে টান দিচ্ছেন আর পায়চারি করছেন।

“বিক্রিয়ার ফলে তাপমাত্রা কি বাড়ছে?” অন্যমনস্ক হয়ে প্রশ্ন করেন অটো হান।

“তেমন উল্লেখযোগ্য নয়, স্যার। তবে আরও পর্যবেক্ষণ করতে হবে, তবেই…”

“এই সময় লিজ থাকলে উত্তরটা ঠিক দিয়ে দিত। এমন সময়েই ওকে চলে যেতে হল… একটা চিঠি লিখি বরং, কী বলো? আমাদের পরীক্ষার ফলাফল জানিয়ে একটা সদুত্তর চাই ওর কাছ থেকে। না-হয় তিনজনের নামই দিয়ে দেব গবেষণাপত্রে। আমি জানি, লিজ ছাড়া এর উত্তর আর কারও কাছে অন্তত এই মুহূর্তে নেই। কিন্তু খুব দ্রুত আমাদের পেপার পাবলিশ করতে হবে। কারণ, অনেক জায়গাতেই কম গতিবেগের নিউট্রন আর ইউরেনিয়াম নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করছে। অন্য কেউ পেপার লিখে দিলে আমাদের এতদিনের সব পরিশ্রম বৃথা যাবে।”

কাগজ কলম নিয়ে লিজ মেইটনারকে চিঠি লিখতে বসলেন প্রফেসর হান। এতদিনের কর্মসঙ্গী হঠাৎ চলে যাওয়ায় খানিকটা যেন দিশেহারা হয়ে গিয়েছেন প্রফেসর। তবে লিজ এখন নিরাপদ, তাই জেনে স্বস্তি। তবে মানে সিগবানের ল্যাবে নাকি অর্থাভাবের কারণ দেখিয়ে লিজকে মাইনে দেওয়া হচ্ছে না। ডক্টর মানে সিগবান এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফিতে নোবেল পেয়েছিলেন, তাঁর ভীষণ নাক উঁচু। কিন্তু পারমাণবিক পদার্থবিদ্যার কানাকড়ি জ্ঞানও তাঁর নেই। লিজ তাঁর অধীনে কেমন করে কাজ করবেন, সেই নিয়ে দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়ে হানের।

চিঠি লেখা শেষ হলে খামে ভরে আঠা লাগিয়ে স্ট্র্যাশম্যানের হাতে দিয়ে বলেন, “কাল সকালের ডাকেই সিগবানের ল্যাবে পাঠিয়ে দিও। এতদিনে কাইজারে সবাই জেনে গিয়েছে লিজ কোথায় কাজ করছে। মনে হয় আর কেউ চিঠিটা আটকাবে না।”

স্ট্র্যাশম্যান হানের হাত থেকে চিঠিটা নিজের কোটের পকেটে চালান করে দিয়ে বলে, “বলা যায় না। ডাকে নয় স্যার, হাতে পাঠাব। সময় লাগবে হয়তো, কিন্তু চিঠিটা খোয়া যাবার ভয় নেই। আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন।”

ডিসেম্বর, ১৯৩৮, সুইডেন।

ক্রিসমাসের ছুটি পেতেই লিজ মেইটনার চললেন কতিপয় নতুন বন্ধুদের সঙ্গে গোথেনবার্গ শহরে। সিগবানের ল্যাবে কাজ করে তিনি হাঁপিয়ে উঠেছেন। এই শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে এই সময়ে বহু পর্যটকের ভিড়। তবে লিজ উত্তর সমুদ্রের তীরে না গিয়ে চলে এসেছেন নদীর ধারে এক গ্রামে। স্থানীয়রা এই নদীকে বলে কিংস রিভার। শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে লিজের মস্তিষ্ক অনেক হালকা। তিনি মনের সুখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে চলেছেন গ্রামের পথ ধরে, কখনও জঙ্গলে ঢুকে পড়ে আবিষ্কার করছেন নানা ফুল আর ফল। বোনপো অটো ফ্রিসকে ডেকে নিয়েছেন এখানেই। বহুদিন তার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ নেই।

ক্রিস্টালন্যাক্টের রাতে মিউনিক শহরে লিজ মেইটনারের ভগ্নীপতি, অটো ফ্রিসের বাবাকে বাড়ি থেকে গেস্টাপো বাহিনী তুলে নিয়ে পাঠিয়ে দেয় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। বাবার জন্য ফ্রিসের চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না আজকাল। তিনি তাই মন ভালো করতে মাসির কাছে ছুটে এসেছেন গোথেনবার্গের গ্রামে। বোরের ল্যাবে নিজের সাম্প্রতিক কাজ নিয়ে লিজের সঙ্গে আলোচনা করার দুর্নিবার ইচ্ছা নিয়ে হোটেলে ঢুকে পড়লেন ফ্রিস। লিজ তখন প্রাতরাশ সারছেন ডাইনিংয়ে। মাসিকে দেখে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন ফ্রিস। একসঙ্গে তাঁরা দুজনে প্রাতরাশ সারলেন, তারপর বাইরে বেরিয়ে পড়লেন বেড়াতে।

ক্রিসমাস পালনের মাত্র একদিন বাকি। হোটেল সাজিয়ে তুলতে ব্যস্ত কর্মচারীরা। ছুটি কাটাতে আসা পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। প্রকৃতিও যেন নিজেকে সাজিয়ে তুলছে শীতের পোশাকে। কিংস রিভার বরফের চাদরে ঢেকে গিয়েছে। দিব্যি সেই নদীর ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া যায়। নদীর ওপর দিয়ে লিজ ও ফ্রিস হেঁটে চললেন জঙ্গলের দিকে। বাবার চিন্তা ফ্রিসের মাথা থেকে ঘুরিয়ে দিতে লিজ তাঁকে গবেষণা নিয়ে প্রশ্ন করতে লাগলেন।

কোপেনহেগেনেও নিলস বোর ইউরেনিয়াম নিয়ে কাজ করছেন জেনে অটো হানের পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন লিজ। ফ্রিস বললেন, অটো হানের পরীক্ষাতে হয়তো সত্যি লুকিয়ে আছে। লিজ নিজেও তাই মনে করেন এবং হানকে উৎসাহ দিতে দু-দিন আগেই চিঠি লিখেছেন বলে জানালেন।

অটো ফ্রিস তাঁর বুদ্ধিমতী মাসির বুদ্ধির দৌড় সম্পর্কে অবগত ছিলেন। জঙ্গল থেকে হোটেলে ফিরে গিয়ে দুজনে নিরিবিলিতে বসে নিউক্লীয় বিভাজনের ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য অঙ্ক কষতে লাগলেন। লিজ কাগজের ওপর একটা গোল নিউক্লিয়াস আঁকলেন। সেটাকে লম্বা করে দিলেন পরের আঁকায়। তারপর আর একটা ছবিতে লম্বা আকার হয়ে গেল ডাম্বেল। তারপর সেই ডাম্বেল থেকে বেরিয়ে এল দুটো আলাদা গোল বস্তু।

“অসাধারণ! লিকুইড ড্রপ মডেল দিয়ে নিউক্লিয়াসের বিভাজনের ব্যাখ্যা। প্রফেসর বোরও এরকম একটা ধারণা দিয়েছিলেন আমাদের। কিন্তু মাসি, অঙ্ক বলছে ২০০ মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্টের কাছাকাছি শক্তি পাওয়া যাবে। কোথা থেকে উদয় হবে সেই শক্তি?”

লিজ কাগজের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন, “প্রফেসর আইনস্টাইন। তিনি জানিয়েছিলেন, পদার্থের ভর থেকে পাওয়া যায় শক্তি। বিক্রিয়ার আগে ইউরেনিয়াম ও নিউট্রনের যা মোট ভর ছিল, বিক্রিয়ার পর দ্বিখণ্ডিত টুকরো দুটোর মোট ভর হিসেব করে দ্যাখ দেখি। যদি ভরের তফাত থাকে, তবে মনে হয় সেই ভর আইনস্টাইনের সমীকরণ ব্যবহার করে ২০০ মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্টের কাছাকাছি পাওয়া যাবে।”

কিছুক্ষণ  জটিল সব অঙ্ক কষে ফ্রিস চেঁচিয়ে উঠলেন, “মাসি! ওয়ান্ডারফুল! একেবারে মিলে গেছে। যদি ইউরেনিয়াম ভেঙে গিয়ে একটা বেরিয়াম আর একটা ক্রিপটন হয়ে যায়, তবে আমাদের হিসেব ঠিক আছে। প্রফেসর হানকে জানিয়ে দাও এখুনি। উনি শান্তি পাবেন যে ভুল কিছু পরীক্ষা করেননি।”

জানুয়ারি ১৯৩৯, কোপেনহেগেন।

অটো ফ্রিস নিজের গবেষণার জায়গা কোপেনহেগেনে বোর ইন্সটিটিউটে ফিরে এলেন। ফিরেই তিনি ছুটলেন নিলস বোরের কাছে। অটো হান আর ফ্রিজ স্ট্র্যাশম্যানের গবেষণার ব্যাখ্যা তিনি ও লিজ কীভাবে সমীকরণ দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন, সে-কথা বোরকে না জানিয়ে শান্তি ছিল না। সবটা শুনে ও তাঁদের খসড়া পড়ে প্রফেসর বোর এক হাতের তালুতে নিজের আর এক হাত দিয়ে ঘুসি মেরে চেঁচিয়ে উঠলেন, “এই কথাটা আমার মাথায় এল না কী করে! যাক, খুব ভালো হয়েছে। এবার তোমার আর লিজের গবেষণাপত্র পাঠিয়ে দাও সোজা নেচার পত্রিকায়। তবে তোমাদের গবেষণাপত্রের ব্যাপারে কাউকে কিছু জানিও না এখন। মনে হয় হান এতদিনে ওদের কাজ কোথাও প্রকাশ করার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছে। এমন হলে তুমি ও লিজ কিন্তু এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত হবে।”

প্রফেসর বোরের মনে পড়ে গেল, জার্মান পদার্থবিদ ইভা নোডাক বছর চারেক আগে নিউট্রনের আঘাতে ইউরেনিয়ামের ভেঙে টুকরো হয়ে যাওয়া নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করলে সবাই তাঁর কাজকে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। তাঁর পরিশ্রম বিফলে যাওয়ায় নোডাক মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। অথচ হানের গবেষণা এখন প্যারিসেও অজানা নয়, সেখানে একই কাজ করে চলেছেন আইরিন কিউরি।

নিলস বোর পাড়ি দিলেন আমেরিকা। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ও প্রফেসর আইনস্টাইনের লেকচার সিরিজ শুরু হতে চলেছে। জাহাজে উঠে বসলেন ছাত্র জন হুইলারের সঙ্গে। প্রফেসর বোর হুইলারকে বলে দিলেন লিজ মেইটনার ও অটো ফ্রিসের অনন্য আবিষ্কারের কথা। যে গবেষণার খবর প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তিনি গুপ্ত রাখতে চেয়েছিলেন, সেই খবর চাউর হয়ে গেল সর্বত্র। সরল অধ্যাপক নিজের অজান্তে এক বিশাল বড়ো ভুল করে বসলেন। লিজ-ফ্রিসের আগেই হান-স্ট্র্যাশম্যানের গবেষণাপত্র প্রকাশ হল এবং ইউরোপ ও আমেরিকার বিজ্ঞান জগতে চর্চা চলতে লাগল সেই নিয়ে।

কোপেনহেগেনে অটো ফ্রিস নিজের এক শারীরবিদ বন্ধুর কাছে শুনেছিলেন প্রাণীদেহের কোশ বিভাজনকে তাঁরা বলেন ফিসন। ইউরেনিয়াম নিউট্রনের আঘাতে দুই টুকরো হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে তিনিও নব-আবিষ্কৃত বিক্রিয়ার নাম দিলেন ‘নিউক্লিয়ার ফিসন রি-অ্যাকশন’। 

মেইটনার ও ফ্রিসের গবেষণাপত্র হানের নব আবিষ্কারের ঘটনা প্রকাশ হবার কিছুদিন পরই নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত হল। কিন্তু এই কাজ বিজ্ঞানী মহলে তেমন সাড়া পেল না, কারণ হানের আবিষ্কার নিয়ে তখন চলছে জোর আলোচনা। এই আবিষ্কারের মধ্যে যে বিধ্বংসী বোমা তৈরি হবার মশলা আছে, সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা সেই নিয়ে আলোড়ন তুললেন। আমেরিকায় লিও জিলার্ড এনরিকো ফের্মির সঙ্গে দেখা করে তাঁর সমস্ত গবেষণা গোপন রাখার অনুরোধ করতে চাইলেন। অধ্যাপক ফের্মি বক্তৃতা দিতে ব্যস্ত থাকায় লিওর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হল না। লিও ফের্মির জন্য একটা চিঠি লিখলেন, যাতে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হল, কোনোক্রমেই যেন পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনও ফর্মুলা জার্মানি না পৌঁছায়। ঘাতক হিটলারের হাতে বোমা তৈরির ফর্মুলা পড়লে সারা পৃথিবীর মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। এই একই চিঠি তিনি লিখলেন আইরিন কিউরিকে। আইরিন তাঁর গবেষণা গোপন রাখতে অস্বীকার করলেন সরাসরি। কিছুদিন পর জুলিয়ট-আইরিনের গবেষণাপত্র বিজ্ঞানী মহলে হইচই ফেলে দিল। পারমাণবিক বোমা যে পাগলের প্রলাপ নয়, সব বিজ্ঞানীরাই তা উপলব্ধি করতে পারলেন।

মেইটনারের নাম হানের গবেষণাপত্রে উল্লেখ না থাকায় তিনি বেজায় চটে গিয়ে হানকে পত্রাঘাত করে জানালেন, সেদিন হান নিজের স্বার্থে মেইটনারের সাহায্য চাইলে অবিলম্বে তিনি তাঁর গবেষণাকে এগিয়ে দিয়েছিলেন অনেকটা পথ। আর বিশ্বের বাজারে আজ সমস্ত কৃতিত্ব অটো হান নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন।

মেইটনারের চিঠি পেয়ে হান খবরের কাগজে প্রকাশ্যে তাঁর সমালোচনা করতে চেয়ে প্রতিবাদী খোলা চিঠি দিতে চাইলেন। মেইটনারকে সমর্থন করতে গিয়ে কাইজার ইন্সটিটিউটে হানকে পদে পদে কত অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, সেই কথা জানিয়ে তিনি বিবৃতি দিতে চাইলেন। বিজ্ঞানের জগতের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে অটো হানের মনে হল— মেইটনারের জন্যই তাঁর পেশাদারি জীবনে নানা বাধা এসেছে, যা তিনি নাকি আগে কোনোদিন বুঝে উঠতে পারেননি। মেইটনারকে লেখা হানের খোলা চিঠি প্রবল বিতর্ক জন্ম দেবে বুঝে খবরের কাগজের সম্পাদক সেই চিঠি কাগজে ছাপালেন না।

মৌল পদার্থ রেনিয়ামের আবিষ্কারক জার্মান পদার্থবিদ ইডা নোডাক কিন্তু বসে রইলেন না। তিনি হানের এবং মেইটনারের দুটি গবেষণাপত্র আলাদাভাবে প্রকাশ হবার সঙ্গে সঙ্গে জার্মানির এক জনপ্রিয় সংবাদপত্রে পাঁচ বছর আগে নিজের একই আবিষ্কারের দাবি জানিয়ে বসলেন। তাঁর প্রতি বঞ্চনার অভিযোগের আঙুল তুললেন দুইজনের দিকে। ইডা নোডাকের কাছে প্রমাণ দেবার জন্য দাবি জানালেন অটো হান। মেইটনার ইডার কাজ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না, এই বলে বিতর্ক এড়িয়ে গেলেন। ইডা নোডাকের কথা বিজ্ঞানীরা কেউ পাত্তাই দিলেন না। কোন দেশ কার আগে পারমাণবিক বোমা বানাতে পারে, সেই নিয়ে তাঁদের মধ্যে চলল প্রতিযোগিতা, কিন্তু জনসমক্ষের এল না কিছুই।

জুন, ১৯৩৯, আমেরিকা।

জার্মানি থেকে আমেরিকা যাবার জাহাজে চেপে বসলেন ওয়ার্নার হাইসেনবার্গ। বেশ কয়েকটি শহরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক এসেছে বক্তৃতার জন্য। কোথাও কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে বলবেন, কোথাও মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণা তুলে ধরবেন ছাত্র-শিক্ষকদের সামনে। প্রথমেই যাচ্ছেন বার্কলে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ওপেনহাইমার প্রতি শুক্রবার একটা সেমিনারের আয়োজন করেন। বিশেষ করে চিঠি দিয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন রবার্ট ওপেনহাইমার। হাইসেনবার্গ জানেন, একটু নাক-উঁচু আছে অধ্যাপক রবার্ট ওপেনহাইমারের। হয়তো তিনি খানিকটা ঈর্ষাই করে হাইসেনবার্গকে! গটিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতে এসে তর্ক জুড়ত খুব। ক্যাভেন্ডিস ল্যাবে হাতে কলমে কাজ করতে তেমন পারদর্শী না হওয়ায় রাদারফোর্ড একরকম ওপেনহাইমারকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সবাই আড়ালে সে নিয়ে হাসাহাসি করত বলে মেলামেশায় যথেষ্ট সচেতন থাকত সে। তবে হাইসেনবার্গের মনে আছে, তাঁর ক্লাসে সে বেশ বুদ্ধিমত্তা দেখাত। স্যামুয়েল গাইডস্মিট জানিয়েছিল, জিন ট্যটলক নামের একজন সক্রিয় কমিউনিস্ট তরুণীর সঙ্গে রোমান্সের ইতি টেনে ইদানীং সে নাকি কম্যুনিস্টদের এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে। তা ভালো, রাজনীতি ছেড়ে সে যদি পদার্থবিদ্যায় মন বেশি দেয়, তবে সমাজের বিশেষ উপকার হয়।

রাজনীতি থেকে নিজেকে অনেকটাই দূরে সরিয়ে রাখেন হাইসেনবার্গ। গত একবছর জার্মানির রাজনৈতিক অস্থিরতায় প্রতিমুহূর্তে নিজেকে অসহায় দেখেছেন তিনি। তাঁর দোষের মধ্যে এই ছিল যে, প্রফেসর আইনস্টাইন আর নিলস বোরের প্রশংসা করে তিনি ক্লাসে ছাত্রদের জানাতেন পদার্থবিদ্যার জগতে এই দুজন প্রবাদ-পুরুষের কী অসামান্য দান। আর সেটাই হয়ে উঠল কাল।

আইনস্টাইন এবং অন্যান্য প্রসিদ্ধ ইহুদি পদার্থবিদেরা দেশ ছেড়ে চলে যেতে হাইসেনবার্গ এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে, এক কাগজে প্রবন্ধ লিখে জানান, জার্মানি থেকে সেরা বিজ্ঞানীদের দেশছাড়া করে দ্বিতীয় শ্রেণির বিজ্ঞানীদের সেইসব পদে বসিয়ে দেশের প্রভূত ক্ষতি হচ্ছে।

হাইসেনবার্গের বক্তৃতায় ইহুদি বিজ্ঞানীদের সমর্থন জানানোর কারণে নাৎসি সমর্থক জার্মান বিজ্ঞানীরা তাঁকে ‘সাদা ইহুদি’ বলে দাগিয়ে দিল, যদিও তিনি ছিলেন খাঁটি জার্মান রক্তের খ্রিস্টান। প্রফেসর জোহানেস স্টার্ক হাত ধুয়ে হাইসেনবার্গের পিছনে পড়ে গেলেন। প্রতিদিন ছাত্র ও শিক্ষকদের খ্যাপাতে লাগলেন হাইসেনাবার্গের বিরুদ্ধে। তাঁর ক্লাসে উপস্থিত না থাকতে তিনি আড়ালে নির্দেশ দিতেন ছাত্রদের। ক্রমে গটিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করা মুশকিল হয়ে উঠল হাইসেনবার্গের পক্ষে।

নাৎসি চরেরা হাইসেনবার্গের বিরুদ্ধে সোজা গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান হাইনরিখ হিমলারের দপ্তরে নালিশ জানাল। একদিন জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য স্থানীয় পুলিসের অফিসে হাজিরা দিতে হল হাইসেনবার্গকে। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানীকে অপদস্থ করতে তারা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করল না। কোন কোন ইহুদি বিজ্ঞানীর সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রাখেন, সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে পুলিস কর্তা লিখে রাখল খাতায়। এরপর হাইসেনবার্গের বাড়ির টেলিফোনে আড়ি পাতল তারা। বাড়ির চারদিকে গোয়েন্দা বাহিনীর গুপ্তচরেরা ঘোরাফেরা করে, হাইসেনবার্গ পরিবার তা বুঝতে পারে। কিছুদিন আগেই ওয়ার্নার হাইসেনবার্গ বিয়ে করেছেন। তাঁর স্ত্রীর ওপরেও নজর রাখল এস. এস. বাহিনী। গবেষণার কাজে মন লাগানো দায় হল হাইসেনবার্গের। ওয়ার্নার হাইসেনবার্গের মায়ের বন্ধু ছিলেন হাইনরিখ হিমলারের মা। দুই মায়ের মধ্যস্থতায় সমস্যা মিটল। হিমলারের লিখিত আদেশ হল, এস. এস. বাহিনীর কেউ যেন ওয়ার্নারকে বিরক্ত না করে, কারণ সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে হলেন অধ্যাপক হাইসেনবার্গ। তিনি একজন খাঁটি দেশভক্ত জার্মান।

জাহাজে বসে পুরোনো দিনের কথা মনে করে ওয়ার্নার হাইসেনবার্গের মুখ বিকৃত হল। নাৎসিদের কোনও কার্যকলাপ তাঁর পছন্দ নয়, কিন্তু প্রকাশ্যে তাদের সমালোচনা করাও তাঁর অপছন্দের। তিনি মনেপ্রাণে মনে করেন, পদার্থবিদ্যার গবেষণার পীঠস্থান হল জার্মানি এবং বিশ্বের সমস্ত উৎকৃষ্ট বিজ্ঞানীদের নিয়ে কাজ করলে বিজ্ঞানের জগতে যে উন্নতি হবে তা নয়, জার্মানিও হয়ে উঠবে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দেশ।

বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে হাইসেনবার্গের বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর যখন সবাই কফি খেতে ব্যস্ত, তখন মোক্ষম প্রশ্নটা হাইসেনবার্গের দিকে ছুড়ে দিলেন ওপেনহাইমার— জার্মানি কি পারমাণবিক বোমা বানাবার কোনও প্রস্তুতি নিচ্ছে?

হতভম্ব হাইসেনবার্গ নিজের কফির কাপে মনোযোগ দিয়ে বললেন, “আমি এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ অনবগত। আর পারমাণবিক কোনও গবেষণা যখন করছি না, আমি কেনই-বা জানতে পারব? একটা জিনিস লক্ষ করলাম, আমেরিকা প্রযুক্তির দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে গিয়েছে। এখন রোপওয়েতে ‘ক্যাবল কারে’ চড়ে পাহাড়ের এক মাথা থেকে আর এক মাথায় চলে যাওয়া যায়! পরিবর্তনটা খুব দ্রুত হচ্ছে, তাই না?”

হাইসেনবার্গ যে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিচ্ছেন, ওপেনহাইমার তা বুঝতে পেরে আর প্রশ্ন করে তাঁকে বিব্রত করলেন না। কিন্তু নিজের অধ্যাপক বন্ধু মহলে বলে বেড়াতে লাগলেন, ‘ওয়ার্নারকে বিশ্বাস করা যায় না। জার্মানিতে একমাত্র বিজ্ঞানী হল এ নিজে, যে পারমাণবিক বোমা বানিয়ে হিটলারের হাতে তুলে দিতে পারে। তবে লোকটা ইহুদি বিদ্বেষী নয় তা জানি।’

বার্কলে থেকে শিকাগো, তারপর শিকাগো থেকে ট্রেনে চেপে ওয়ার্নার হাইসেনবার্গ গেলেন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে যোগ দিতে। সেখানে ইউরোপ থেকে অন্যান্য বিজ্ঞানীরাও এসেছেন সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে ও শুনতে। হাইসেনবার্গের উপস্থিতি এই সম্মেলনে বিজ্ঞানীদের বিশেষ আগ্রহের কারণ হয়ে উঠল। নানা জায়গায় আড়ালে অনেকেই হাইসেনবার্গকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন জার্মান বোমার বিষয়ে। বিরক্ত হতে লাগলেন হাইসেনবার্গ।

(গাউডস্মিট, ইয়োকুম, হাইজেনবার্গ, ফের্মি)

দেখা হল বহুদিনের বন্ধু ডাচ পদার্থবিদ স্যামুয়েল গাউডস্মিটের সঙ্গে। তিনিও ছাড়বার পাত্র নন, একই প্রশ্ন করে বসলেন হাইসেনবার্গকে। ওপেনহাইমারকে যা বলতে পারেননি, বন্ধু গাউডস্মিটকে বলতে তিনি দ্বিধা করলেন না— “আমি যে নাৎসি সমর্থক নই, তা তো তুমি ভালো করেই জানো। এবার বলো দেখি, এমন একটা বোমা বানাবার আদেশ এলে একজন জার্মান হয়ে সেই আদেশ উপেক্ষা করার ক্ষমতা কি আমার আছে? অস্বীকার করলে হিটলার আমায় ছেড়ে দেবে? হিমলার আমাকে দিয়ে মুচলেকা লিখিয়ে নিয়েছে যে, প্রফেসর আইনস্টাইন ও বোরের মতো ইহুদি বিজ্ঞানীদের তত্ত্ব আমি ক্লাশে পড়াতে পারলেও, তাঁদের নাম উল্লেখ করতে পারব না। আমেরিকাতে বসে তোমরা ধারণাই করতে পারবে না, বিজ্ঞানীদের ওপর কতটা চাপ দিচ্ছে জার্মান রেইখ।”

দুজনের কথার মাঝে এনরিকো ফের্মি এসে পড়ায় আলোচনা থেমে গেল। ফের্মিকে দেখে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন হাইসেনবার্গ। তারপর রসিকতা করলেন— “এই লোকটার হাতেই জন্ম নেবে পারমাণবিক শিশু। আমি এই ব্যাপারে নিশ্চিত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেমন করে। হানের পরীক্ষাতে জানা যাচ্ছে না কতগুলো নিউট্রন একটা বিক্রিয়া থেকে নির্গত হতে পারে। যদি এই সমস্যা মিটে যায়, তবেই জন্মাবে বোমা। চেইন রি-অ্যাকশন নিয়ে নাকি জিলার্ড অনেক কাজ করছে?”

স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে মৃদু হেসে স্বল্পভাষী ফের্মি কথা এড়িয়ে বললেন, “আজ ডিনারটা সবাই একসঙ্গে করলে মন্দ হয় না, কী বলো তোমরা?”

স্যামুয়েল গাউডস্মিট সম্মতি দিয়ে হাইসেনবার্গের হাত চেপে ধরে অনুনয় করলেন, “ওয়ার্নার, জার্মানি থেকে আমেরিকায় চলে এসো বরং। যে-কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তোমাকে লুফে নেবে। যুদ্ধ লাগলে জার্মানির পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাবে। এতসব বিজ্ঞানীরা এখানে গবেষণা করছেন, তুমি এলে সবাই খুব খুশি হবে।”

“আমার পরিবার আর দেশ ছেড়ে আমি কোথাও যাব না, স্যামুয়েল। নাৎসিদের ঘৃণা করলেও আমি দেশকে ভালোবাসি। আমি জানি, অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আমাকে কাজ করতে হবে, তবু…”

(ক্রমশ)

বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক-নাসির অল-দিন অল-তুসি – এক বহুমুখী প্রতিভা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬২
বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক-টাইকো ব্রাহেঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৩
বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক-মাইকেল ফ্যারাডেঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৪
বিজ্ঞান দিশারী নিকোলা টেসলাঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৫
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-নেপিয়েরঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৬
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-অ্যাম্পিয়ারঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৭
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-নোবেলে উপেক্ষিতা পদার্থবিদ লিস মেইটনারঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৮
বাগ্মী হকিং ১অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৮
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-ল্যাভশিয়ারঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৯
বাগ্মী হকিং -২ ব্রহ্মাণ্ডে প্রাণ সৃষ্টি প্রসঙ্গেঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৬৯
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক রোবোটিক্সের পূর্বপুরুষ আল জাজারিঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭০
তেজষ্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ(১)-মেরি কুরিগৌতম গঙ্গোপাধ্যায়৭০
বাগ্মী হকিং-৩অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭০
মহাকাশে সুরের খোঁজে । উইলিয়াম হার্শেল অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭১
তেজস্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগন(২) হ্যারিয়েট ব্রুকসগৌতম গঙ্গোপাধ্যায়৭১
বাগ্মী হকিং -৪অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭১
বাগ্মী হকিং -৫অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭২
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-লুই আগাসিজঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭২
তেজস্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ- নিউক্লিয় বিজ্ঞানে নারী (৩) লিজে মাইটনার, স্টেফানি হরোভিৎজ, এডা হিচিন্স ও এলেন গ্লেডিচগৌতম গঙ্গোপাধ্যায়৭২
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-রবার্ট বয়েলঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৩
তেজস্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ পর্ব ৪গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়৭৩
বাগ্মী হকিং ৬অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৩
জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৪
তেজস্ক্রিয় ভদ্রমহিলাগণ- নিউক্লিয় বিজ্ঞানে নারী (৫)গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়৭৪
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক লিউয়েন হকঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৫
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক অঙ্কের যাদুকর- কার্ল ফ্রেড্রিক গসঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৬
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-লুই মর্গ্যানঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৭
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-লিওনার্দো দা ভিঞ্চিঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৮
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-রন্টগনঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৭৯
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-বোলজম্যানঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮০
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-উপেক্ষিত বিজ্ঞানী রবার্ট মেয়ারঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮১
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন –দ্য ডার্ক লেডি অফ ডি এন এঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮২
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-প্রতিবাদী বিজ্ঞানী- জোসেফ প্রিস্টলেঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮৩
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-বিজ্ঞান সাধক কবি ওমর খৈয়ামঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮৪
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-লুইগি গ্যালভানিঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮৫
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮৬
ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-লাপ্লাসঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮৭
এডোয়ারড জেনারঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮৮
এডমণ্ড হ্যালিঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৮৯
গ্যালিলিওর দুরবিণঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৯১
ক্ষুদ্রতম কণার খোঁজে ডিমোক্রিটাস থেকে ডালটনঅরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়৯৩

জয়ঢাকের  বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

 

Leave a Reply