ধারাবাহিক উপন্যাস-সিন্ধু নদীর তীরে -পর্ব ১৭- পিটার বিশ্বাস-বর্ষা ২০২৫

সিন্ধুনদীর তীরে –প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্বচতুর্থ পর্বপঞ্চম পর্বষষ্ঠ পর্ব , সপ্তম পর্ব, অষ্টম পর্ব, নবম পর্ব , দশম পর্ব, একাদশ পর্বদ্বাদশ পর্ব, ত্রয়োদশ পর্ব, চতুর্দশ পর্ব, পঞ্চদশ পর্ব, ষোড়শ পর্ব, সপ্তদশ পর্ব

IMG-20210913-WA0004

পঞ্চদশ অধ্যায়- পলায়ন

চাঁঁদ এখন মাঝ আকাশে। পায়ের অনেক নীচে ইন্দাতীরের ঘন অন্ধকার বন ছড়িয়ে আছে। চাঁদের ঠান্ডা ও নরম আলো সে জঙ্গলের অন্ধকারকে ভেদ করতে পারেনি। তাকে চিরে বয়ে গেছে ইন্দার জলধারা। চাঁদের আলো পড়ে তা এই উচ্চতা থেকে, একটা রূপালি ফিতের মত দেখায়। যুবতীর কেশদামে রুপোর সুতোর বাঁধন যেন। 

হঠাৎ করেই নদীতীরের সেই বন থেকে শেয়ালের মিলিত ডাকের শব্দ ভেসে এল। পাহাড়ের দেয়ালে হাত ও পায়ের আঙুল দৃঢ়ভাবে আটকে রেখেই মাণ্ডুপ একঝলক তাকিয়ে দেখল সেদিকে। তার মানে রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর পূর্ণ হল। মাথার ওপর দুর্গপ্রাকারের ভিৎ এখনও অন্তত ত্রিশ হাত দূরে। তবে এ-অংশটা তুলনায় অনেকটাই বেশি খাড়াই।  

পায়ের অনেক নীচে ইন্দার নদীগর্ভ অবধি ছড়িয়ে থাকা পাহাড়ের দেয়ালটার দিকে একনজর ঘুরে দেখে নিল মাণ্ডুপ। তারপর কৃতজ্ঞচিত্তে ফের একবার বন্ধু ও গুরু কিরামকে স্মরণ করল। নদীতীরের সমতলভূমির ছেলে সে। পাহাড়ে চড়বার এই বিদ্যা তার সহজাত ছিল না কখনোই। ম্‌হিরিতে থাকাকালিন প্রায়শই বৃদ্ধ কিরাম তাকে সঙ্গে নিয়ে সে এলাকার পাহাড়, বন, নদীতট ও গিরিসঙ্কটে ঘুরে বেড়াতেন। চলত প্রকৃতি পাঠ, ও মুখে মুখে হরেক রকমের  বিদ্যাশিক্ষা।  প্রথম প্রথম সামান্য ভয় পেত মাণ্ডুপ। পাহাড়ি ঢালে আছাড় খেয়ে চোটও কম পায়নি। কিন্তু সেই করতে করতেই কিরামের শিক্ষায় পাহাড়ে চড়াবার এই বিদ্যায় আস্তে আস্তে সড়গড় হয়ে উঠেছিল সে। তখন সে স্বপ্নেও ভাবেনি, নিয়তির নির্দেশে সে বিদ্যা একদিন কোন কাজে লাগতে চলেছে তার!

“দেহ পাথরের সংলগ্ন হবে না। যেকোনো মুহূর্তে চারটি হাত ও পায়ের তিনটি পাথরকে আঁকড়ে থাকবে…” গিরগিটির মত প্রায় উল্লম্ব সেই ত্রিশ হাত অংশ উঠে যেতে যেতে বারে বারেই কিরামের নির্দেশগুলো কানে বাজছিল মাণ্ডুপের। 

খানিক বাদে একটা কার্নিশের মত জায়গায় নিজেকে টেনে তুলল সে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক  ঢাল এইখানেই শেষে। এরপর বাকিটা মানুষের তৈরি। ইট গেঁথে গড়ে তোলা সেই দুর্গপ্রাকার পেরিয়ে যাওয়া তুলনায় অনেক সহজ। ইন্দাতীরের যেকোনো সাধারণ সেনারও সেই বিদ্যা জানা। 

ডাইনে খানিক দূরে একটা প্রাচীন আমগাছ  প্রাকারের ওপর থেকে পাহাড়ের দিকে ঝুঁকে এসেছে। সাবধানে কার্নিশ বেয়ে তার নীচে গিয়ে দাঁড়াল সে। তারপর কোমরে পেঁচিয়ে রাখা দড়িটা খুলে এনে, তার মাথায় ছোটো ছুরিটাকে আড়াআড়িভাবে বেঁধে নিয়ে দড়ির মাথাটাকে ওপরদিকে ছুঁড়ে দিল। দড়ির অন্য মাথা তার হাতে ধরা। 

প্রথম দুবার ব্যর্থ হবার পর তৃতীয়বার চেষ্টাটা সফল হল তার। ডালটার ওপর দিয়ে ঘুরে দড়িসহ ছুরিটা ফের নীচের দিকে নেমে এসেছে। এবারে ছুরিটা খুলে নিয়ে দড়ির দুই প্রান্ত একত্রে বেঁধে নিল সে। তারপর দড়ি ধরে দেয়ালে পা ঠেকিয়ে সাবধানে প্রাকারের ওপরে উঠে এল সে। 

দরদর করে ঘামছিল মাণ্ডুপ। ঘন ঘন শ্বাসে রাত্রির ঠান্ডা বাতাস বুকে টেনে নেয় সে। এতটা পর একটানা উঠে আসতে দানবিক পরিশ্রম করতে হয়েছে আজ তাকে। তবে বিশ্রামের অবকাশ তখন তার কাছে ছিল না। রাত্রি তৃতীয় প্রহর শুরু হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। সব ঠিক থাকলে, এই মুহূর্তে আহুম জৈমিনের বাসগৃহে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন; এবং তাঁর দেয়া খবরের ভিত্তিতে মান্ডুপের অরণ্যের ঘাঁটিতে হানাদারির জন্য তৈরি হচ্ছে জৈমিনের সেনারা। ঠিক হয়েছে, তৃতীয় প্রহর ঘোষণা অবধি জৈমিনের সঙ্গে থাকবেন আহুম। তার মধ্যে এখানকার কাজ মিটিয়ে জৈমিনের বাসগৃহে পৌঁছাতে হবে মান্ডুপকে। তারপর সেখানকার কাজ মিটিয়ে, ভোর হবার আগেই ফের এইখান দিয়ে দুর্গ ছেড়ে বের হয়ে যাবে সে। 

প্রাকারের ভেতরের দিকটায় ঘাসে ছাওয়া একটুকরো নাবাল জমি সামান্য নতিতে উঠে গিয়েছে ওপরের দিকে। তার শেষপ্রান্তে একটা বড়োসড়ো ঘর। ঘরটার দরজা অতি সাধারণ একটা কিলক দিয়ে আটকানো। সন্তানগোলকের ব্যক্তিগত রাজকোষ! গতকাল আহুম তাকে বলেছিলেন বটে, কিন্তু এখন নিজেচোখে দেখে একটু অবিশ্বাস্যই ঠেকছিল মাণ্ডুপের। যুগ যুগ ধরে জমে ওঠা অমিত সম্পদ জমা আছে ওই ঘরে! অথচ তার চতুঃসীমায় কোনো প্রহরী নেই। 

অবশ্য এর কারণটা মান্ডুপের অজানা নেই। ঘরটার গা ঘেঁষে উঠে যাওয়া গোলকাকার মন্দিরটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখল সে। ইট গেঁথে গড়ে তোলা ওই গোলক এই নগরীর ঈশ্বরের আবাস। ওইখানে স্বয়ং সন্তানগোলক অধিষ্ঠান করেন। তাঁর ধনভান্ডারের প্রহরী তিনি স্বয়ং! সেখানে প্রধান পুরোহিতের হাজিরা বিনা আর কারো মনের উপস্থিতি টের পেলে সে মনের মালিকের কী পরিণতি ঘটে  তার প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ তাকে শুনিয়েছেন আহুম। 

কথাটা মনে আসতেই সভয়ে নিজের কোমরে আটকানো চামড়ার ছোট্ট পুঁটুলিটায় একবার হাত ছুঁইয়ে নিল মাণ্ডুপ। জাদুপ্রস্তর! তার অদৃশ্য বর্ম এই মুহূর্তে ঘিরে রেখেছে তাকে! গোলকমন্দিরের অধিষ্ঠাতা ওই মনরাক্ষস এখন তার মনের উপস্থিতিকে টের পাবে না। 

শিকারী চিতার মতই একটা নিঃশব্দ লাফে এইবার সে নেমে এল প্রাকার থেকে। তারপর চোখের পলকে ধনাগারের সামনে পৌঁছে তার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গেল।

দ্বিশতাধিক শ্বাসগ্রহণ পরিমাণ সময় অতিক্রান্ত হবার আগেই ধনাগার থেকে ফের বের হয়ে এল মাণ্ডুপ। তার পিঠে লেপ্টে থাকা চামড়ার থলিটা সুপুষ্ট হয়ে উঠেছে এবারে। আহুমের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তির কল্যানে এক মুহূর্ত সময় অপচয় হয়নি তার সেখানে। ধনাগারের ঠিক কোনখানে প্রদীপ ও চকমকি পাথর থাকে সেই তথ্য থেকে শুরু করে, তার ঠিক কোন জায়গায় মান্ডুপের সম্পত্তি সঞ্চিত রয়েছে তার একটা বিবরণ তিনি মাণ্ডুপকে দিয়েছিলেন। কার্যক্ষেত্রে সে বিবরণে সামান্যতম ত্রুটিও পায়নি মাণ্ডুপ।

নিজের রোজগারের বিপুল সম্পদের ভাঁড়ার থেকে খুব বেশি কিছু নেয়নি সে। কী ও কতটুকু নেবে, সে বিষয়ে অনেক হিসেব তাকে করতে হয়েছে। ম্‌হিরি-র যুদ্ধের অন্তিম রাতে ঘন বৃষ্টির মধ্যে  রণাঙ্গনে শেষশয্যায় শুয়ে থাকা মহামাতৃকা সুব্রাল-এর মাথা থেকে সে খুলে এনেছিল তাঁর সোনার কেশবন্ধনী। রত্নখচিত এই কেশবন্ধনী সে ইস্কাকে উপহার দেবে বিবাহের রাত্রে। ম্‌হিরির রাজকোষ লুণ্ঠনের প্রাপ্তি রত্নরাজির থেকে বেছে নিয়েছে সে কিছু দুষ্প্রাপ্য রত্ন। এদের বিনিময়ে যেকোনো দেশে স্বচ্ছল জীবন কাটানো সম্ভব হবে তার ও ইস্কার পক্ষে। এছাড়া কিছু দুষ্প্রাপ্য ওষুধের পাত্র সে সঙ্গে নিয়েছে। বৃদ্ধ কিরাম তাকে সযত্নে এই ওষুধদের গুণাগুণ ও ব্যবহারের পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন। আর নিয়েছে চারটি মৃৎপট্ট। তার একটিতে রয়েছে কিরামের শেখানো নক্ষত্রবিদ্যার সারাংশ আর অন্য তিনটিতে রয়েছে উর দেশ, ইফ্রাৎ নদী ও সেই জাদুপ্রস্তরের ইতিবৃত্ত। মৃৎপট্টগুলো হাতে নিয়ে একটা অদ্ভুত শিহরণ খেলে গিয়েছিল মান্ডুপের গায়ে। এরা তার নিজেহাতে বানানো। চৌকো পট্টগুলো বানিয়ে তাদের গায়ে অক্ষরপাতও তার করা। এ ছিল কিরাম-এর শিক্ষাদানের বিভিন্ন পর্বে তাঁর নেয়া পরীক্ষার পট্ট। কতটুকু শিখেছে মান্ডুপ, তার পরীক্ষা নেবার জন্য মাঝে মাঝেই তিনি একেকটা বিষয়ের সংক্ষিপ্তসার তাকে একেকটা পট্টে লিখতে আদেশ দিতেন…

বাইরে বের হয়ে এসে  ধনাগারের ইটের পাঁচিলের গা ঘেঁষে দাঁড়াল মান্ডুপ। তারপর তার বের হয়ে থাকা ইটের কোনাগুলো আঁকড়ে ধরে কাঠবিড়ালির মতই তরতর করে উঠে গেল ধনাগারের খোলা ছাদে। সেখান থেকে ছোট্ট একটা লাফে পাশের গোলকাকার ছাদটার গোড়ায় পৌঁছে সাবধানে তাকে বেড় দিয়ে তার বিপরীতদিকে গিয়ে নামল সে। 

এদিকটা নির্জন ও অন্ধকার। সাধারণত মন্দিরের আশপাশে কোনো প্রহরী থাকে না। মনরাক্ষস নিজেই নিজের রক্ষক। অতএব নিশ্চিন্তে এইখানে দাঁড়িয়ে সামনে ধীরে ধীরে নেমে যাওয়া জমির দিকে নজর দিল সে। মূল মন্দির থেকে ষাট পদক্ষেপ পরিমিত স্থান ছেড়ে মন্দিরদুর্গের বসতি অঞ্চলের শুরু। এরপর অর্ধসহস্র পদ পার হয়ে মন্দিরদুর্গের সুরক্ষিত প্রাকার। তার অন্যপাশে ছড়িয়ে আছে কট্টাদিজা জনপদ।

মধ্যরাত্রি পার হয়েছে অনেকক্ষণ। মন্দিরদুর্গের ঘুমন্ত বসতি এলাকা অন্ধকারে ঢাকা ছিল। বেশ কিছুক্ষণ সেই অন্ধকার এলাকাটার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকবার পর হঠাৎ সামান্য একটু হাসি ফুটে উঠল মান্ডুপের ঠোঁটে।  অন্ধকারের বুকে প্রায় অদৃশ্য আলোর একটা হলদেটে বিন্দু ধরা পড়েছে তার চোখে। আহুম কথা রেখেছেন। নিঃশব্দ আলোকসঙ্কেতে তিনি প্রচার করে চলেছেন জৈমিনের অবস্থান।

পিঠের থলেটা থেকে একটা ছোটো পুঁটুলি বের করে আনল এবারে মাণ্ডুপ। সৈনিকজীবনের শিক্ষা তার। পরিচয় গোপন করে হামলা চালাবার উপকরণ। পুঁটুলি খুলে তার মধ্যে রাখা তৈলাক্ত, অর্ধতরল বস্তুটাকে আঙুলে তুলে শরীর ও মুখে মেখে নিচ্ছিল সে। তিলের তেল দিয়ে গোলা ভুষোকালির সে ছদ্মবেশ তার গায়ের গমরঙা চামড়াকে ঢেকে দিচ্ছিল ধীরে ধীরে। কয়েক মুহূর্ত বাদে সে কাজ শেষ করে যখন সে উঠে দাঁড়াল তখন পাতলা কালো কাপড়ে মাথা ঢাকা, অন্ধকারবর্ণ মানুষটাকে তার অতি ঘনিষ্টজনও মান্ডুপ বলে চিনতে পারবে না। এবারে,  নিশাচর কোনো শ্বাপদের মতই নিঃশব্দে ধেয়ে গেল সে দূরে দপদপ করতে থাকা আলোর বিন্দুটাকে লক্ষ করে।

***

“এবার?”

সামনে ছড়িয়ে থাকা ভয়াবহ দৃশ্যটার থেকে অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রেখে প্রশ্ন করলেন আহুম। বণিকের পেশায় পথে পথে দীর্ঘকাল কেটেছে তাঁর। পরিচিত পৃথিবীর বহু প্রান্তেই তিনি গিয়েছেন পণ্যবোঝাই সার্থবাহ নিয়ে। অতএব এহেন জীবনে যুদ্ধ ও মৃত্যু তিনি কম দেখেননি। কিন্তু তথাপি, তিনি একজন বণিক মাত্র। তলোয়ারের বদলে দাঁড়িপাল্লায় তিনি অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। মৃত্যু নয়, পণ্যের লেনদেনেই তাঁর আসল দক্ষতা। তাই খানিক আগে তাঁর সামনে ঘটে যাওয়া যুদ্ধ আর হত্যাকান্ডটার নারকীয় ছবি তিনি কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না। 

জৈমিন বোঝেননি। মৃত্যুর মুহূর্ত অবধি তিনি বুঝতে পারেননি, তাঁর মৃত্যুর জন্য আহুম দায়ী। বুঝতে পারেননি, দিনের দ্বিপ্রহরে তার সভায় মান্ডুপের অনুপস্থিতি থেকে শুরু করে, রাতের দ্বিপ্রহরে তাঁর বাড়িতে মান্ডুপের খবর নিয়ে আসা, এমনকি কথাবার্তা চলাকালিন ঘরে ধোঁয়া হবার অজুহাতে প্রদীপটাকে জানালার তাকে রেখে দেয়ার মত তুচ্ছ কাজটাও আসলে আহুমের পরিকল্পনার অংশ। আর তাই, খানিক আগে মূর্তিমান মৃত্যুর মতই জানালা দিয়ে ধেয়ে আসা মানুষটাকে দেখে জৈমিন আহুমকে সাবধান করেছিলেন। চোখের পলকে হাতে তলোয়ার তুলে নিতে নিতেই নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁর পেছনে আশ্রয় নিতে। তিনি জানতেন আহুম বণিক। তলোয়ারে তার দক্ষতা কোনো গুপ্তঘাতকের সমতূল্য হতে পারে না।

গুপ্তঘাতক! হ্যাঁ। মান্ডুপকে গুপ্তঘাতক বলেই সন্দেহ করেছিলেন জৈমিন। মন্দিরদুর্গের রাজনীতি বড়ো জটিল। ষড়যন্ত্র বা গুপ্তহত্যা এখানে দুর্লভ নয়।  অতএব হাতে তলোয়ার তুলে নিয়ে তিনি প্রথমেই তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “কে তোমায় পাঠিয়েছে? সে কত অর্থ তোমায় দিয়েছে আমায় বলো। আমি তার দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ দেব, যদি তুমি আজ রাত্রে তাকে হত্যা করতে পারো।”

আত্মবিশ্বাসে ভরপুর জৈমিন তাঁর চেষ্টার সাফল্যের বিষয়ে নিঃসন্দেহ ছিলেন। আসলে মন্দিরদুর্গের পুরোহিতসমাজে বণিকদের প্রতিনিধিরা যোগ দিতে শুরু করবার পর গত কিছুকাল ধরে এখানকার ষড়যন্ত্রে অর্থ ও সম্পদ একটা বড়ো ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। কে কত অর্থ দিচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে তাই গুপ্তঘাতকের নিশানা বদলে যাওয়া এখন আর খুব একটা দুর্লভ ব্যাপার নয়। 

কিন্তু এক্ষেত্রে তাঁর প্রস্তাবটা শুনে ছদ্মবেশী হত্যাকারীর মুখে কেবল একচিলতে ঠান্ডা হাসি ফুটে উঠেছিল। হাতে তার কোনো অস্ত্র ছিল না। কিন্তু তার সেই শীতল হাসিতে মৃত্যুর ইশারা ছিল। তার অর্থ বুঝতে ভুল করেননি অভিজ্ঞ যোদ্ধা জৈমিন। 

এরপর, প্রহরীদের ডাক দিতে গিয়ে এইবারে নিজের বিপন্নতার সঠিক আন্দাজ হয়েছিল তাঁর। আহুমের আনা খবর পেয়ে কিছুক্ষণ আগেই ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের দলটাকেই তিনি রওয়ানা করে দিয়েছেন মাণ্ডুপের গোপন অরণ্য-আবাস লক্ষ করে। দুর্গরক্ষীদের খবর দেননি। দেননি, কারণ আহুম বলেছিল, তার চরের আনা খবর অনুযায়ী মান্ডুপ কিছু একটা বিপজ্জনক পরিকল্পনা করছে। সন্তানগোলকের মন্দিরে কোনো গোপন কৌশলে হামলা চালাতে চায় সে। এবং সে-পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সে-রাত্রেই সে তার গোপন আবাস ছেড়ে অন্যত্র আত্মগোপন করবে। আস্তানা ছাড়বার আগেই তাই তাকে বন্দি করা জরুরি। অতএব দুর্গরক্ষীদের খবর দেবার সময় তখন ছিল না। 

তবে এতেও জৈমিন সন্ত্রস্ত হননি। বহু যুদ্ধের পোড়খাওয়া সৈনিক তিনি। বয়স বেড়েছে বটে,  কিন্তু এখনও তলোয়ার ধরতে ভুলে যাননি তিনি। হঠাৎ একটা আকস্মিক লাফে মাটি ছেড়ে উঠেছিলেন তিনি। তারপর আততায়ীর শরীর লক্ষ করে নেমে আসতে আসতেই তলোয়ার তুলে ধরেছিলেন নিজের বাঁ-কাধের ওপরে। জৈমিনের নিজস্ব আক্রমণ পদ্ধতি। পৃথিবীর টানে নেমে আসতে আসতে নিজের সম্পূর্ণ ওজন ব্যবহার করে আড়াআড়ি একটা কোপ। একসময় কোনো অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেবার সময়  তাঁর এই দৃষ্টিনন্দন আক্রমণ দেখবার জন্য দর্শকের ভিড় হত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঐ এক আঘাতে কোনাকুনিভাবে চিরে দুটুকরো হয়ে যায় প্রতিদ্বন্দ্বীর শরীর। 

তবে এক্ষেত্রে তা ঘটল না। বাতাসে তিনি ভেসে উঠতেই মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে একপাক গড়িয়ে গিয়েছিল তাঁর আততায়ী। তারপর চোখের পলকে মাটি থেকে ছিটকে উঠল সে-ও। ততক্ষণে তার আগের অবস্থানের ওপর নেমে আসতে আসতে জৈমিনের তলোয়ারের ব্যর্থ আঘাত  হাওয়া কেটে মেঝেতে ঘা মেরেছে। মেঝেতে ধাক্কা খেয়ে এক মুহূর্তের জন্য ভারসাম্য হারিয়ে যাওয়া জৈমিন ফের সোজা হয়ে ওঠবার আগেই আততায়ীর শরীর এসে আছড়ে পড়েছিল তাঁর ওপরে। পরমুহূর্তে দুটো পা দিয়ে তাঁর মাথাটাকে চেপে ধরে রেখে বিচিত্র এক কৌশলে তাঁর তলোয়ার ধরা হাতটাকে একপাক ঘুরিয়ে দিয়েছিল সে। মট করে হাড় ভাঙবার মৃদু শব্দ উঠেছিল কেবল। জৈমিনের অবশ হাত থেকে খসে পড়েছিল তার উদ্ধত তলোয়ার। এইবার তাঁকে মাটির ওপর চিৎ করে ফেলে তাঁর বুকে চেপে বসেছিল আততায়ী। তার সুশিক্ষিত নিপুণ হাত যখন জৈমিনের গলা চেপে ধরে তাঁর প্রাণবায়ু একটু একটু করে বের করে দিচ্ছে, তখনও জৈমিন প্রাণপণে বলে চলেছেন, “রক্ষা করো হে মহান দোরাদাবু… রক্ষা করো হে মহান সন্তানগোলক…”  

শুনে তাঁর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়া মুখটা বলে উঠেছিল, “যতোই প্রার্থনা করো জৈমিন, কেউ আসবে না। মুরালের পুত্র মাণ্ডুপকে চিনতে পারো তুমি? জেনে রেখো, আজ তোমার মৃত্যু দিয়ে আমার প্রতিশোধের সূচনা। আমার মায়ের স্মৃতি তর্পনের শুরু…”

জৈমিন অবশ্য ততক্ষণে সব ভালোমন্দের ঊর্ধ্বে। মান্ডুপের শরীরের নীচে ধড়ফড় করতে থাকা শরীরটা তার ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছিল। 

“এই শরীরটাকে নিয়ে কী করবে মান্ডুপ?”

কৌতূহলি চোখে মাণ্ডুপের দিকে দেখতে দেখতেই এবারে প্রশ্ন করলেন আহুম।  তিনি বুদ্ধিমান। চোখের সামনে হত্যাকাণ্ডটা দেখবার পর তিনি একটা ধাঁধার মুখোমুখি হয়েছেন। সন্তানগোলক তো তাঁর রাজত্বসীমার প্রতিটি বাসিন্দার মনের খবর জানতে পান। কিন্তু সেক্ষেত্রে তিনি তাঁর প্রধান পুরোহিত ও সেনাপতির এহেন হত্যাকান্ডটা ঘটতে দিলেন কেন?

এর দুটো সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আসছিল তাঁর মনে। একটা ব্যাখ্যা এই হতে পারে যে গোলকদেবতার মনোনিয়ন্ত্রণের কোনো প্রতিষেধক এর কাছে আছে, যার বলে এ গোলকদেবতার নজর থেকে যেকোনো জায়গাকে অদৃশ্য রাখতে পারে। কিন্তু ব্যাখ্যাটা এতই অবাস্তব, যে মাথায় আসবার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে বিদায় করলেন আহুম। এ অসম্ভব। পুরুষানুক্রমে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, গোলকদেবতারা সর্বশক্তিমান। তাঁদের নজর থেকে কিছুই আড়াল হয় না। 

তবে দ্বিতীয় একটা ব্যাখ্যাকে তাঁর অনেকটাই বেশি যুক্তিযুক্ত বলে বোধ হচ্ছিল সেই মুহূর্তে। মহান দোরাদাবু, অথবা কট্টাদিজায় তাঁর প্রতিনিধি সন্তানগোলক কোনো কারণে জৈমিনকে সরিয়ে দিতে চাইছিলেন, কিন্তু নিজেরা সে হত্যার দায়িত্ব নিতে রাজি হচ্ছিলেন না। তাই ম্‌হিরিবিজয়ী মান্ডুপের ওপর তাঁরা গুপ্তহত্যার দায়িত্ব দিয়ে তাকে নিম্নশ্রেণীর সেনার একটা পদ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন কট্টাদিজায়। হয়তো জৈমিন তা জেনে যান। আর জেনে গিয়েই ক্ষিপ্ত হয়ে  মান্ডুপের সর্বস্ব অপহরণ করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেবার চক্রান্ত করেছিলেন তিনি। অথচ তার শৌর্য ও বুদ্ধিমত্তার সামনে নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি এই কট্টাদিজার প্রধান সেনাপতি তথা মহাপুরোহিত! 

কথাটা মনে হতে সপ্রশংস দৃষ্টতে মাণ্ডুপের দিকে তাকিয়ে দেখলেন তিনি। হোক বন্যনারীর গর্ভজাত, কিন্তু বণিকের রক্ত বইছে এর শরীরে। ইন্দাতীরের সমগ্র বণিককূলের উচিত একে নিয়ে গর্ব করা। এর অনুগত থাকলে গোলকদেবতার কৃপা আরও বেশি করে বর্ষিত হতে তাঁর ওপরেও…

জৈমিনের নিথর শরীরটার অন্যপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে মাণ্ডুপও তখন গভীর চিন্তায় ডুবে আছে। জন্মসূত্রে বণিক সন্তান হলেও, কর্মসূত্রে সে একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ও সেনাপতি। তার হিসাব বলছিল, যে যুদ্ধ সে আজ শুরু করল, এর পরবর্তী বলি হতে চলেচ্ছেন এই আহুম। না। সে মৃত্যু তার হাতে হবে না। কারণ আহুমের কাছে সে কৃতজ্ঞ। তিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে তাকে সাহায্য করেছেন। কিন্তু তবু, আহুমের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কারণ, সন্তানগোলক অন্তর্যামী। এই মুহূর্তে তিনি জৈমিনের মৃত্যুর খবর পাননি। এই মুহূর্তে এখানে মান্ডুপ বা আহুমের উপস্থিতির কথাও তাঁর অজানা। মান্ডুপের কোমরে বাঁধা চামড়ার থলেতে রাখা জাদু প্রস্তরের অদৃশ্য বর্ম এ ঘরকে ছেয়ে আছে। কিন্তু যে মুহূর্তে সে এখান থেকে সরে যাবে…

…একজন সাধারণ মানুষের চিন্তাপদ্ধতির সঙ্গে একজন পেশাদার যোদ্ধার চিন্তাপদ্ধতির ফারাক থাকে অনেক। বেঁচে থাকাটা যেখানে প্রাত্যহিক দায়, সেখানে বাঁচবার কৌশল খুঁজতে গিয়ে একজন সৈনিক অনেক বেশি আবেগমুক্ত ও যুক্তিবান থাকেন। মাণ্ডুপ জানে আহুমকে সে বাঁচাতে পারবে না। নিজের সঙ্গে তাঁকে রাখতে পারলে, জাদু প্রস্তরের অদৃশ্য বর্ম হয়তো তাঁকেও রক্ষা করতে পারত। কিন্তু এবারে যে পলাতকের জীবন তার শুরু হবে, সে জীবনে বয়স্ক এই বৃদ্ধকে নিয়ে বেশিদিন চলা সম্ভব হবে না।

আগামীকাল সকালে জৈমিনের হত্যাকাণ্ডের খবর চাউর হবার পর সন্তানগোলক সহজেই জানতে পারবেন, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে আহুম এসেছিলেন জৈমিনের কাছে, এবং তাঁর আসবার অব্যবহিত পরেই জৈমিন তাঁর সমস্ত ব্যক্তিগত দেহরক্ষীকে  অন্যত্র পাঠিয়ে দেন। সেক্ষেত্রে আহুমকে বন্দি করিয়ে এনে তার স্মৃতি থেকে তিনি সহজেই হত্যাকারী হিসেবে মাণ্ডুপকে চিহ্নিত করতে পারবেন। আহুমকে মাণ্ডুপ জাদু প্রস্তরের কথা বলেনি। কিন্তু বলেছে, তার কিছু বিশেষ শক্তি আছে যার বলে সে গোলকদেবতাদের চোখে অদৃশ্য থাকতে পারে। কট্টাদিজার সন্তানদেবতা এর অর্থ বুঝবেন না। কোনো সন্তানগোলকই বুঝবেন না তা। কারণ মাণ্ডুপের জাদুপ্রস্তর সঙ্গে করে আনবার খবর একমাত্র দোরাদাবু জানেন, এবং তিনি নিজেই তার কথা বাইরের জগতে প্রচার করতে নিষেধ করেছেন মান্ডুপকে। কিন্তু বিষয়টা দোরাদাবুর কাছে পৌঁছোলে তিনি তা ঠিকই বুঝবেন। সেক্ষেত্রে, তাঁর বা যেকোনো সন্তানগোলকের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা একজন বিদ্রোহী… যে কিনা প্রয়োজনে অক্লেশে একটা শহরের মহাপুরোহিতকে খুন করে অক্ষতদেহে বেরিয়ে যেতে পারে, সে দোরাদাবুর দৃষ্টিতে একজন বিপজ্জনক শত্রু হিসেবে  চিহ্নিত হবে। এক কথায় ইন্দাতীরে গোলকদেবতার সম্পূর্ণ  সাম্রাজ্য এরপর তাকে খুঁজতে শুরু করবে একসঙ্গে। এতে প্রথমেই আক্রান্ত হবে তার পরিবার।

পরিবার! হাঃ! বৈক্লন্য! সন্তানের চোখের সামনে তার মায়ের মুণ্ডচ্ছেদ করা এক নরপিশাচ। এক সৈনিক আরেক সৈনিককে যুদ্ধে পরাস্ত করে তার ধনসম্পদ লুণ্ঠন করে। সেটা ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু একজন অসহায়মহিলাকে খুন করে তাঁর সন্তানকে লুণ্ঠন করা?  সেই সন্তানকে নিজের আসল পরিচয় ভুলিয়ে দিয়ে নকল পরিচয়ে বড়ো করে তোলা? এ অপ্রাধের প্রায়শ্চিত্ত তাকে করতে হবে। না। মান্ডুপ নয়, মাণ্ডুপের পিতা সাজবার অপরাধে এবার গোলকদেবতার অভিশাপের আগুন নেমে আসবে বৈক্লন্যের ও তার পরিবারের ওপরে। আসুক। বুকের মধ্যে জ্বলতে থাকা আগুনটায় বৈক্লন্যের সেই আসন্ন সর্বনাশের ছবি যেন ঘৃতাহুতি দিচ্ছিল তার। তাতে দ্বিগুণ বেগে জ্বলে ওঠে তার প্রতিশোধের আগুন। তার ঘৃণার স্রোত।

আর তারপর, একসময় সে আগুন নিভে এল। সেখানে তখন আরো একটা মুখ ভেসে উঠেছে। একটা নিষ্পাপ মুখ। ইস্কা… তার ইস্কা… 

নাঃ। এখনও তাদের সম্পর্কের কথা বাইরের জগত জানে না। ফলে এখনও ইস্কা নিরাপদেই থাকবে। কিন্তু কতদিন? কতদিন সে খবর গোপন রাখা যাবে মনরাক্ষসের কবল থেকে? 

কথাটা মনে আসতেই হঠাৎ, মনস্থির করে নিল মান্ডুপ। এরপর সে কোন পথে কোনদিকে যাবে তা আহুম জানেন না। কেউই তা জানে না। কারণ মান্ডুপ নিজেও সে নিয়ে খানিক আগে পর্যন্ত কোনো স্থির সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছোতে পারেনি। তবে এইবার সে জানে! 

ঘেরাউন! পশুপালকদলের নেতা ঘেরাউন। হঠাৎ, যেন সুদূর অতীতের আবছায়া থেকে বের হয়ে আসা একটা আধাবন্য মুখ তার দিকে তাকিয়ে ফের একবার বলে ওঠে, “তোমরা, নগরবাসীরা ঐ মনরাক্ষসের দাস হতে পারো। কিন্তু আমরা স্বাধীনচেতা পশুপালকরা তাঁর কৃপায় বাঁচি না সেনানী মাণ্ডুপ। আমাদের মাথায় ছাদ দেয় ওই তারাভরা আকাশ, আমাদের খাদ্য দেয় এই মাটি, আমাদের তৃষ্ণার জল দেয় মহান ইন্দা।

আমহিরির উত্তর-পশ্চিমে দু’দিনের পথ পার হলে যে বিস্তীর্ণ বন ও পশুচারণক্ষেত্র, সেইখানে তাদের বাস। মনরাক্ষসের অদৃশ্য হাত সেখানে পৌঁছোয় না। হ্যাঁ। সেইখানেই যাবে মাণডুপ। ইস্কাকে খবর পাঠাতে হবে কোনোভাবে! যাতে সে যথাসাধ্য নীরবে আমহিরি ছেড়ে সেখানে চলে গিয়ে তার অপেক্ষায় থাকে। সেইখানে,মুক্ত আকাশের নীচে, মনরাক্ষসের নাগাল থেকে দূরে আশ্রয় নিয়ে কিছুদিন কাটিয়ে তারপর দুজন মিলে লুথিলা বন্দর হয়ে উর দেশ… সেখানে…পণ্ডিত উকালানের বাড়ি। মনরাক্ষসের মরণকাঠির খোঁজ নেবে সে তাঁর কাছে। তারপর একদিন… 

তবে উপস্থিত এসব কথা আহুমকে বলা যাবে না। খানিক চুপ করে থেকে সে ফের যখন কথা বলল, ততক্ষণে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো তার মাথায় সেজে উঠেছে। 

“উপস্থিত এই মৃতদেহ এখানেই পড়ে থাকবে। আর, আপনি আমার সঙ্গে চলুন আহুম। এখানে আপনি নিরাপদ নন।”

“কেন মাণ্ডুপ?” কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করলেন আহুম, “এ হত্যাকাণ্ডে দেবতার সম্মতি আছে সে আমি বুঝতে পারছি। তাঁর সম্মতি ও নির্দেশ না থাকলে এ কাজ করা তোমার সাধ্য হত না। কাল তুমি যখন বলেছিলে তোমার এক বিশেষ শক্তি আছে, তখন আমি বুঝিনি তুমি সে শক্তি বলতে দেবতার সমর্থন বুঝিয়েছ। সেক্ষেত্রে  আমার নিরাপত্তার অভাব কেন হবে?”

মাণ্ডুপ আহুমের দিকে তাকিয়ে দেখল একবার। সমস্ত কথা এঁকে ভেঙে বলবার উপায় নেই। তা বিপজ্জনক হতে পারে। খানিক বাদে সে মাথা নেড়ে বলল, “ঈশ্বরীয় বিষয়ে মাথা ঘামাবেন না আহুম। তাঁদের চিন্তা কোন গহন পথে চলে তা বুঝব এমন সাধ্য কী আমাদের? আমাদের কাজ কেবল তাঁর ইচ্ছাকে পালন করে চলা, তাই নয় কি?”

“তবে তাই হোক।” বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন আহুম। পা দুটো সামান্য কাঁপছিল তাঁর। এই একটি রাতের অভিজ্ঞতা হঠাৎ করেই যেন তাঁর বয়স অন্তত দশ বছর বাড়িয়ে দিয়েছে।

রাতের অন্ধকার তাঁদের আড়াল দিয়েছিল। নির্জন বাড়ির সেইকক্ষ ছেড়ে দুটি ছায়ার মত দুজন মানুষ বের হয়ে এলেন মহাপুরোহিত জৈমিনের বাড়ির বাইরে। তারপর নিঃশব্দ পায়ে মিশে গেলেন শহরের পথে। পাহাড় ঘিরে পাকদণ্ডি পথ। সেই পথ ধরে ধীরে ধীরে তাঁরা নেমে চলেন ইন্দা নদীর তীরে। আগে আগে হেঁটে চলে মাণ্ডুপ। রাত্রির অন্ধকারে শ্বাপদের মতই নির্ভয় ও নিশ্চিত পদক্ষেপ তার। তাকে অনুসরণ করে হেঁটে চলেন বৃদ্ধ আহুম। কোন পথে চলেছেন, কোথায় চলেছেন তা তাঁর জানা নেই। আজকের একটি রাত তাঁর জীবনকে বদলে দিয়েছে অনেকটাই। 

অবশেষে, পুবের আকাশে যখন প্রথম আলোর ইশারা জেগেছে তখন মাণ্ডুপ থামল। এ চত্বরের বন-জঙ্গল নিয়ে অনেক পুরোনো স্মৃতিই তার ফিরে এসেছে এখন। শৈশবের ঘুমিয়ে পড়া স্মৃতিরা। বন্ধুদের সঙ্গে ইন্দার বুকে ঝাঁপাই, তার জলে ভেসে শহর ছেড়ে দূরদূরান্তে  চলে যাওয়া। তার পাড়ে, নির্জন অরণ্যের বুক দিয়ে কত না ছোটো ছোটো জলধারা এসে ইন্দায় মেশে। এমনই একটা ধারা, তার তীরে একসময় তাদের বিশ্রামস্থল ছিল। সেইখানে ফাঁদ পেতে ধরা ছোটো ছোটো শিকার পুড়িয়ে বনভোজন, পাশ দিয়ে ভেসে চলা বাণিজ্যের বহিত্রদের হাওয়ায় ফুলে অঠা পাল… কত না দূরদেশে চলে যায় তারা… 

“ও মাঝি কোথা যাও?” কিশোর গলায় সেই ডাক ভেসে যেত ইন্দা-র বাতাসে। কখনো বা জবাব ভেসে আসত অদেখা মাঝিদের গলা থেকে… “চলেছি লুথিলা, চলেছি আমরাহি নগরে, কিম্বা সুদূর উর , তেলমুন্দ বা এমন কত না অজানা নাম…

বাল্যলীলার দিনগুলোর সেই কুঞ্জবনে অবশেষে ফের একবার ফিরে এসেছে সে। তবে এই ফিরে আসায় শৈশবের সে আনন্দ নেই। আছে গভীর উৎকণ্ঠা, আছে পরিণতবুদ্ধি এক যোদ্ধার নীরব পরিকল্পনা…

ক্রমশ

 জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক

Leave a Reply