ধারাবাহিক উপন্যাস-সিন্ধু নদীর তীরে -পর্ব ১৩- পিটার বিশ্বাস-বর্ষা ২০২৪

সিন্ধুনদীর তীরে –প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্বচতুর্থ পর্বপঞ্চম পর্বষষ্ঠ পর্ব , সপ্তম পর্বঅষ্টম পর্বনবম পর্ব , দশম পর্বএকাদশ পর্ব,  দ্বাদশ পর্বত্রয়োদশ পর্বচতুর্দশ পর্বপঞ্চদশ পর্বষোড়শ পর্বসপ্তদশ পর্ব

IMG-20210913-WA0004

ত্রয়োদশ অধ্যায়-কট্টাদিজা

ইস্কা,                   

মজার কথা হল এই চিঠিটা যখন তুমি হাতে পাবে তখন একে তুমি চিঠি বলে চিনতে পারবে না। কারণ মাটির পট্টের গুচ্ছের গায়ে লেখা এই চিঠিকে আমি প্রথমে বন্য লতাপাতা দিয়ে আপাদমস্তক জড়িয়ে নেব। তারপর তাকে পুরু কাপাসবস্ত্রের আবরণে মুড়িয়ে তবে পাঠাব তোমার কাছে। তার ভেতরে কী আছে তা বাইরে থেকে বোঝা যাবে না।

উপহার বয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমার বিশ্বস্ত বন্ধু ও যুদ্ধের সঙ্গী কর্কন। মঞ্জাদাহির থেকে কাল সে নিজের যুদ্ধের উপার্জন নিয়ে রওয়ানা হবে আমহিরির দিকে। এই মুহূর্তে আমি আমহিরি যেতে পারব না জেনে, আমার উপার্জনও সে দুটি গোযানে করে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে স্বীকৃত হয়েছে। সে উপার্জন আমি তোমার কাছেই পাঠাব বলে স্থির করেছি।

তবে, এই কাপাসবস্ত্রের আবরণের ভেতরে কোণ উপহারটি যাচ্ছে সেইটি কর্কন নিজে জানতে পাবে না। সে তোমাকে বলবে, একে যত্ন করে লুকিয়ে রাখবার নির্দেশ দিয়েছি আমি। বলবে, এ আমার এক প্রিয়তম মানুষের জন্য বিশেষ উপহার। বলবে যথাসময়ে আমি আমহিরি নগরীতে এসে এই গচ্ছিত ধন তোমার কাছ থেকে ফেরৎ নেব।

আমার ইস্কা… জানি এই শুনে তোমার ঈর্ষা হবে, সেই অজানা প্রাপকের প্রতি, যাকে পাঠানো উপহার এমনকি তোমারও দেখা বারণ। প্রিয়সখী মিল্লোকে সেকথা বলতে বলতে তোমার লাল হয়ে ওঠা মুখটা আমি মনের চোখে দেখতে পাচ্ছি এইখানে বসে। মিল্লো বড়ো দুষ্টু। জানি সে তোমাকে বলবে এ উপহার আমি অন্য কোনো ভালোবাসার জনের জন্য পাঠিয়েছি। আমি বড়ো নিষ্ঠুর, তাই তোমার কাছেই গচ্ছিত রেখেছি সেই উপহার। হয়তো ম্‌হিরি বিজয় করে পাওয়া মূল্যবান কিছু ধাতুর পাত, কিংবা ধনরত্নে পূর্ণ একটি ধাতব পেটিকা আছে এই কাপাসের মোড়কে। তখন সেই অজানা জনের ওপরে কুপিতা হবে তুমি। সে ভারী সুন্দর হবে দেখতে। তোমার নাকের পাটা ফুলে উঠবে, চোখে আগুন ছুটবে।

আমি মনের চোখে দেখতে পাচ্ছি, তুমি আর মিল্লো মিলে গোপনে কাপাসের পুঁটুলি খুলে এই লিপিপট্টের গুচ্ছকে বের করে এনেছ। তোমার পুঁতি কারখানার ভেতরে, চুল্লির দপদপে আলোয় সেই লিপিপট্টের দিকে বড়ো ভয় পেয়ে তাকিয়ে আছ। ভয়, কারণ, তোমার ধারণা এক ভয়ানক অশুভ বস্তু তা। কারণ মহান দোরাদাবু বলেন, তাঁর আশীর্বাদধন্য পুরোহিতরা বাদে আর কারো পক্ষে লিখিত লিপি পাঠ করতে শেখা, পাঠ করা বা কাছে রাখা এক ভয়ানক পাপ। একমাত্র মৃত্যুই পারে সে পাপের স্খালন করতে! তাই দোরাদাবু আমাদের জীবনরক্ষার্থে তা সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ করেছেন।

হয়তো তিনি ঠিকই করেছেন। হয়তো ইন্দাতীরের লিপিপট্টেরা সত্যিই অভিশপ্ত! সামান্য মানুষ আমি। কতটুকুই বা জানি! তবে একটা বিষয়ে আমি নিশ্চিত- ম্‌হিরির দানবনগরীর লিপিতে এমন কোনো অভিশাপ নেই। সেইখানে থাকাকালিন মহাপণ্ডিত কিরাম আমায় ম্‌হিরির দানবলিপিতে দিক্ষা দিয়েছেন। বহুলাংশেই তা ইন্দালিপির সদৃশ। সেখানকার লিপিপট্ট মহাকাশ-সমুদ্রে ভাসমান নক্ষত্রমৎস্যদের কথা বলে, তাদের অবস্থান বিচার করে ঋতুপরিবর্তনের খবর দেয়, কখনো বা সে লিপিপট্টে দেশের ও দশের ইতিহাস লিখে রাখা হয়, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অতীতের কথা ভুলে না যায়। সেইখান থেকেই আমি ম্‌হিরির দীর্ঘ ইতিহাস জেনেছি, এবং জেনে মুগ্ধ হয়েছি। এবং এ-ও জেনেছি, তাদের দানব বলে ধরে নিয়ে ভুল করেছি আমরা। তারা মানুষ ইস্কা! আমাদের মতই মানুষ! কেবল, শিল্পে জ্ঞানে, বিজ্ঞানে অনেক বেশি এগিয়ে ইন্দাতীরে দোরাদাবুর সাম্রাজ্যের বাসিন্দাদের চেয়ে। তারাও আমাদের মতই হাসে, কাঁদে, যুদ্ধ করে… ভালোবাসে। সেখানে কিরামের মত জ্ঞানী, মহামাতৃকা সুব্রালের মত যোদ্ধা, অগ্রীণের মত মৃৎশিল্পী, কিংবা জিত্রার মত…

…থাক সে প্রসঙ্গ। ম্‌হিরির ইতিহাস বলবার জন্য এ চিঠি নয়। প্রিয়তমা ইস্কা আমার, এ চিঠি আমি লিখছি কেবল তোমার জন্য। তুমি বলবে, যা তোমার দেখাও বারণ, যা তুমি দেখলেও পড়তে পারবে না, তা কেমন করে তোমার জন্য হবে? এর উত্তর সহজ। এ চিঠি আমি নিজেই তোমকে পড়ে শোনাব ইস্কা। শোনাব আমাদের বাসর রাত্রিতে। হ্যাঁ ইস্কা। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। সংসার গড়তে চাই তোমার সঙ্গে। আর সেইজন্যই আমার যুদ্ধোপার্জিত সম্পত্তি আমি আমার মায়ের কাছে না পাঠিয়ে, অগ্রিম যৌতুকস্বরূপ তোমার কাছে পাঠাচ্ছি। একে তুমি স্বীকার কোরো।

তুমি বলবে, তুমি তো বেনের মেয়ে। আর আমি যোদ্ধাচুড়ামণি সেনাপতি বৈক্লন্যের সন্তান! তবে কেমন করে…

জানি না আমি। কেবল জানি, এই বাধাকে আমি মানব না।  আমার মন ভুল বলে না। তোমাকে বলতে দ্বিধা নেই, তোমার প্রতি আমার আসল অনুভূতিটি ঠিক কী, সে সত্য আমাকে জানিয়েছিল জিত্রা। ম্‌হিরি নগরীর এই কিশোরী… অপ্রতিরোধ্য রূপ ছিল তার। সে আমাকে স্বামীরূপে পেতে চেয়েছিল। বড়ো দুঃখের পরিণতি হয়েছে তার। কিন্তু সে-কাহিনি বলে আমি তোমাকে ভারাক্রান্ত করব না। শুধু এইটুকুই বলব,  তার ইচ্ছেটা জানবার পর আমি আসল সত্যটাকে টের পেয়েছিলাম। সে সত্য হল, আমি আমার ইস্কাকে চাই। সে ছাড়া আর কেউ আমাকে কখনো মুগ্ধ করতে পারেনি। পারবেও না। এমনকি, অগ্নিসম রূপবতী মহামাতৃকা সুব্রাল স্বয়ং এলেও আমি অবিচল থাকব এই জেনো।

যাক সে কথা। এখন আমার স্বপ্নের কথা বলি। আমাদের বিবাহের উৎসব যখন শান্ত হবে, অতিথিরা বিদায় নেবেন, তখন আমাদের নতুন ঘরের বারান্দায় বসে ছুটন্ত ইন্দার বুকে ভেঙেচুরে যাওয়া চাঁদের আলো দেখতে দেখতে আমি এই চিঠি পড়ে শোনাব তোমায়। সেইদিন তুমি বুঝবে, এই উপহারের প্রাপক, আমার প্রিয়তম মানুষটা কে।

তখন তুমি বলবে, সেই যদি নিজেমুখেই আমাকে বললে সবকিছু, তাহলে অতদিন আগে সেসব কথা মৃৎপট্টে লিখে পাঠাবার দরকার কী ছিল? ঠিকই বলবে তুমি। সত্যিই তো, কেন লিখছি এগুলো এখন? লিখছি, কারণ এই মুহূর্তে তোমার সঙ্গে কথা বলতে ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছে আমার। অনেক দূরে আছি আমি। তবু তোমায়-আমায় ছুঁয়ে আছে একই ইন্দা। সেই ইন্দার বুকের মাটি তুলে, তাকে যত্ন করে ছেনে আমি এই মৃৎপট্টদের গড়েছি।

এখন এখানে রাত্রি। আকাশে চাঁদের আলো। সেই আলোতে, এই নির্জন বনভূমির গভীরে পাহাড়ের ঢালে সেই মাটির নরম পট্টদের ছড়িয়ে আমি তাদের গায়ে এই লিপি খুদে চলেছি বাঁশের চাঁচড়ি দিয়ে। লিখতে লিখতে আমার কিরামের কথা মনে পড়ছে। হাতে ধরে তিনি আমাকে এই মৃৎপট্ট গড়তে, তার ওপর অক্ষরপাত করতে শিখিয়েছিলেন। আর এখন তিনি… একজন বোবা ক্রীতদাস হয়ে গোলকদেবতার সেবায় নিয়োজিত। বড়ো দুঃখ হয় ইস্কা। কিন্তু তবু তাকে মেনে নিতে হয়। কারণ এই-ই দোরাদাবুর বিধান। তিনি সর্বদর্শী। যা অরেন, মঙ্গলের জন্যই করেন হয়তো।

ভয় পাচ্ছ? পাছে আমার এই অধার্মিক পাপকাজ কোনো মন্দিরসেনার চোখে পড়ে যায়? পাছে মহান দোরাদাবু জেনে যান, তাঁর রাজ্যে তাঁর এক সন্তান, পুরোহিত না হয়েও মৃৎপট্টে অক্ষরপাতের মত অনধিকার চর্চা করছে? ভয় পেও না ইস্কা, প্রিয়তমা আমার! তিনি জানবেন না। কারণ, স্বয়ং দোরাদাবুও এই মুহূর্তে আমার মনকে দেখতে সক্ষম নন। এর কারণ, ম্‌হিরি থেকে আনা এক আশ্চর্য জাদুপাথরের খণ্ড। কাছে রাখলে সে ধারককে ঘিরে এক অদৃশ্য ও অভেদ্য বর্ম তৈরি করে। তাকে স্বয়ং দোরাদাবুও ভেদ করতে সক্ষম নন। জানো ইস্কা, এই আশ্চর্য জাদুপাথরের শক্তিতেই ঈশ্বর দোরাদাবুর আক্রমণকে এতকাল প্রতিরোধ করেছে ম্‌হিরি। তুমি শুনে গর্বিত হবে, তোমার মাণ্ডুপই এই বাধা সরিয়ে ম্‌হিরি জয়ের মূল কারিগর ছিল। তারই একটা ছোটো টুকরো আমি আমার কাছে রেখেছি। সীসার একটা ছোটো পাত্রে তাকে রাখি আমি, কারণ একমাত্র সীসাই তার থেকে বের হওয়া হরিদ্রাভ জ্যোতিকে রোধ করতে পারে। এই পট্ট রচনার সময় সে পাথরকে আমি তার বন্দিশালা থেকে বের করে পাশে রেখেছি। তার জাদু এখন আমায় ঘিরে আছে। দোরাদাবু জানতেও পারবেন না এই মুহূর্তে আমি কোথায়…

এই প্রসঙ্গে বলি, শুনে ভয় পেও না, ম্‌হিরিবাসীদের বিশ্বাস ছিল, এই পাথরের জাদু মানুষের ক্ষতি করে। তাই তারা সীসার পোশাকে নিজেদের ঢেকে তার কাছে যেত। কিন্তু আমি দেখেছি তা মিথ্যা। কারণ গত তিনদিন ধরে আমি একে পাশে রেখে এই লিপি লিখছি, কিন্তু তারপরেও আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। ওহো, পেটের সামান্য পীড়া হয়েছে বটে গতকাল থেকে। সামান্য জ্বরভাবও হয়েছে। তবে এই যৎসামান্য পীড়া যদি এই জাদুপাথরের রোষে ঘটে থাকে তবে আমি বলব, তার শক্তি বড়োই কম।

তবে রঙ্গ-রসিকতা থাক। সে বরং সাক্ষাতে হবে। জানো, আমার নিজের ইচ্ছা অনুসারে সবকিছু চললে হয়তো আজ, এই মুহূর্তে আমি সত্যিই তোমার পাশে বসে এই কথাগুলো বলতাম তোমাকে। কারণ, ম্‌হিরিবিজয়ী বীর হয়ে কয়েকদিন আগে যখন মঞ্জাদাহিরে পা দিই, ভেবেছিলাম, দেবতার কাছে আমার কাজের পুরস্কারস্বরূপ চেয়ে নেব আমহিরি মন্দিরদুর্গের সেনাপতিত্ব, চেয়ে নেব যোদ্ধার সন্তান হয়েও বণিক কন্যাকে বিবাহ করবার জন্য প্রয়োজনীয় আশীর্বাদ।

কিন্তু দেবতা আমার সে ইচ্ছাকে পূরণ করেননি। করেননি আমারই মঙ্গল চেয়ে অবশ্য। সর্বদ্রষ্টা পিতা তিনি। তিনি মঙ্গলময়। আমার ভবিষ্যতকে তিনি আমার চেয়ে অনেক ভালোভাবে জানেন। আর তাই, এই মুহূর্তে আমাকে আমহিরি নগরীর মন্দিরসেনার দায়িত্ব নিয়ে ফিরে যেতে দিতে তিনি সম্মত নন। তার বদলে তিনি আমাকে স্বয়ং মহাপুরোহিত আহীন-এর অধীনস্থ শিক্ষানবীশ সেনানি হিসাবে যোগদান করবার আদেশ দিয়েছেন।

এ আদেশ পেয়ে প্রাথমিকভাবে আমি ব্যথিত হয়েছিলাম। সে আশাভঙ্গ অস্বাভাবিক নয়। তবে এর ফলে একটা ঘটনা ঘটেছে মঞ্জাদাহিরে, যা আমার কাছে নিতান্তই অপ্রত্যাশিত ছিল।  মহাপুরোহিত আহীন দোরাদাবুর আদেশ জানাবার পর অন্য সকলেই তা নতমস্তকে মেনে নিলেও ঐশিকসহ পুরোহিতমণ্ডলের চারজন বণিক সদস্যই এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, যোদ্ধা মাণ্ডুপ ম্‌হিরিতে যে কৃতিত্বের পরিচয় রেখেছে তার তুলনায় তার এই তুচ্ছ পদপ্রাপ্তি একেবারেই সম্মানজনক নয়। এরপর এই কথার প্রতিধ্বনি তুলেছিল মঞ্জাদাহিরের প্রতিটি বণিক সঙ্ঘই। এ নিয়ে তাদের অসন্তোষ তীব্র হয়ে উঠবার পর অবশেষে এ নিয়ে এক আলোচনাসভা আহ্বান করেন আহীন। সেখানে, আমার উপস্থিতিতে এ-বিষয়ে ঈশ্বর দোরাদাবুর মনোবাসনার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়ে তাঁদের শান্ত করতে হয় আহীনকে।

dharabahik8902

তিনি বলেন, এ-বিষয়ে দোরাদাবু তাঁকে বিস্তারিত জানিয়েছেন। নাকি ঈশ্বর আমার ভবিষ্যতকে দেখেছেন। নাকি সে ভবিষ্যৎ এক মহাবীর ও প্রাজ্ঞ পুরোহিতের; জ্ঞানে, শক্তিতে ও দক্ষতায় যিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরোহিত যোদ্ধা হয়ে উঠবেন, এবং যাঁর আমলে ইন্দাতীরের সভ্যতা তার ডানা মেলবে অর্ধেক পৃথিবীতে। লাগাশ, এরিদু, তেলমুন্দ, কিশ, মুন্দিগ্র, ঈষক, তেলমুন্দ, এমনকি সুদূর উর নগরীও ইন্দাতীরের সাম্রাজ্যের বশীভূত হবে মহাপুরোহিত মাণ্ডুপের আমলে। আর সেইজন্যই আমাকে প্রস্তুত করে তোলবার পথ নির্ধারণ করেছেন স্বয়ং দোরাদাবু। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেনাবিভাগের একেবারে নিম্নস্তরে ছুঁড়ে ফেলবেন আমকে। সে আমার শাস্তি নয় ইস্কা। সে আমার আশীর্বাদ। আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে একজন অতি সাধারণ সেনানীর পদ থেকেই ধাপে ধাপে আমাকে উঠে আসতে হবে ক্ষমতার চূড়ায়। আর সেই যাত্রাপথে ঈশ্বর দোরাদাবুর সস্নেহ দৃষ্টির নীচে আমার হাত ধরে থাকবেন অভিজ্ঞ মহাপুরোহিত আহীন। তাঁর দেয়া তিরস্কার, পুরস্কার, আঘাত, ভালোবাসা, সম্মান ও অসম্মান মাথায় নিয়ে ক্রমাগত নিজের কর্তব্যপালন করতে করতে আমার মহান ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হয়ে উতে হবে আমায়, এই হল দেবতার নির্দেশ।

অসামান্য সেই ব্যাখ্যা শুনে সমস্ত পুরোহিতমণ্ডলীই স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। এরপর সেই নৈঃশব্দ্য প্রথম ভঙ্গ করেন স্বয়ং ঐশিক। ঈশ্বর দোরাদাবুর নামে জয়ধ্বনি দিয়ে তিনিই সেদিন আমাকে প্রথম অভিনন্দনটি জানিয়ে আমায় নতুন এক উপাধি দান করেছিলেন। আমি তাই এখন পৃথিবীর সম্মুখে আর নিছক মাণ্ডুপ নই ইস্কা। তোমার সেই মাণ্ডুপ আজ অনেক পথ পেরিয়ে এসে হয়ে উঠেছে ‘দেবপ্রিয় মাণ্ডুপ।’

তবে একটা কথা বলি তোমায়, আজকের মঞ্জাদাহির বা ভবিষ্যতের সারা পৃথিবী আমাকে যে নামেই জানুক, তোমার কাছে আমি চিরকালই কেবল মাণ্ডুপ হয়েই থাকব এই জেনো। নিকটজনের কাছে আমি সেই সাধারণ মাণ্ডুপ হয়েই থাকতে চাই যে!

এক এক সময় নিজেকে বড়ো ধন্য মনে হয় ইস্কা। যখন আমহিরি ছেড়ে প্রথম মঞ্জাদাহিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি… এক অবোধ কিশোর… তারপর পথে যখন বন্য দস্যুদের হাতে ধরা পড়ে অকথ্য নির্যাতন সহ্য করি… সেই মুহূর্তগুলোতে কখনো ভাবিনি একদিন স্বয়ং দোরাদাবুর কৃপা এইভাবে বর্ষিত হবে এই অধমের মাথায়। ভাবিনি, এমন বিচিত্র গতিতে আমার নিয়তি আমাকে টেনে নিয়ে চলবে আমার দেবতানির্দেশিত ভবিষ্যতের দিকে!

বলতে শ্লাঘা হচ্ছে, সেই পথে যাত্রা আমার শুরু হতে চলেছে আগামীকাল থেকে। এবং হ্যাঁ ইস্কা, সেই কারণেই, হয়তো আগামি বেশ কয়েক মাস আমি তোমার কাছে যেতে সক্ষম হব না।

অথচ, তোমার কাছে যাবার সুযোগ আমার হয়েছিল বইকি। মহাপুরোহিত আহীন আমাকে সর্বনিম্ন স্তরের যোদ্ধা পদে অভিষিক্ত করবার পরে সুযোগ দিয়েছিলেন ইন্দাতীরের যেকোনো নগরীকে আমার কর্মক্ষেত্র হিসাবে বেছে নিতে। তখন চাইলে আমি আমহিরি নগরীকে বেছে নিতেই পারতাম। কিন্তু, তোমার কাছে অস্বীকার করব না ইস্কা,  আমি তা চাইতে পারিনি। কেন জানো? জানবে, মহান দোরাদাবুর ইচ্ছা আমার কাছে অমোঘ আদেশ। তাঁর আদেশে যেকোনো কাজ আমি হাসিমুখে করতে সক্ষম। সে আদেশ পালনের জন্য সর্বনিম্ন স্তরের সৈনিক হিসেবে নতুন করে জীবন শুরু করতেও আমার সঙ্কোচ নেই কোনো। কিন্তু… তোমার সামনে আমি সেই রূপে এসে দাঁড়াতে চাই না। সে বড়ো লজ্জার হবে ইস্কা আমার! তার চেয়ে, যেদিন এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হব আমি, সেদিন সেনাপতির পদে এসে সগৌরবে আমি ফিরে আসব আমহিরি নগরীতে। সেদিন ইস্কা… সেদিন আমি তোমায় পাবার যোগ্য হব। আমি জানি তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করবে।

শুধু একটা বিষয়েই সামান্য অবাক লাগছে আমার। এইখানে তা লিখে রাখি। হয়তো যখন বাসরশয্যায় বসে এই লিপি তোমায় পড়ে শোনাব ততদিনে নিশ্চয় সে প্রশ্নেরও সমাধান হয়ে যাবে, কিন্তু তবু আজ, এই মুহূর্তে এই প্রশ্নটা আমাকে সত্যিই খানিক বিব্রত করে রেখেছে। তা হল, কেন ঐশিক? আমার  যোদ্ধাসম্প্রদায়ের পুরোহিতদের বদলে একজন বণিক কেন আমার মানসম্মান নিয়ে এত চিন্তিত হবে? কেন তারা স্বয়ং দোরাদাবুর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করেও আমায় এভাবে সমর্থন করবে?

এখন আমি আর আমহিরি থেকে পথে বের হওয়া সেই সরল কিশোর নই। জীবন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে ইস্কা। শিখিয়েছেন ম্‌হিরির মহজ্ঞানী কিরাম নিজেও। এখন আমি জানি নির্দিষ্ট কারণ বিনা এই জগতে একটি গাছের পাতাও স্থানচ্যূত হয় না। অতএব, মঞ্জাদাহিরের বণিকমণ্ডলীর আমার সমর্থনে এগিয়ে আসবারও কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ থাকতে বাধ্য।  

আর তাই, একটা ক্ষীণ সন্দেহ আমার মনে কাজ করে ইস্কা। কাউকে বলতে পারি না  মুখ ফুটে, বড়ো জ্বালায় সে সন্দেহ আমি কেবল নিজের বুকে বয়ে নিয়ে চলেছি। তবে তোমাকে আমার কিছুই গোপন করার নেই প্রিয়তমা আমার। তোমার কাছে আমি সব নির্দ্বিধায় বলতে পারি আজ, কারণ আমি জানি, এখনও বহুদিন এ চিঠি তোমারও চোখের আড়ালেই থাকবে। তাই, এইখানেই বলি। হয়তো তাতে আমার বুকের পাষাণভার খানিক লাঘব হবে!

জানো ইস্কা, আমহিরি থেকে বের হয় মঞ্জাদাহির যাবার পথে আমি দস্যুদের হাতে অপহৃত হয়েছিলাম। না না ভয় পেও না। কোনো ক্ষতি তারা আমার করতে পারেনি। পারলে এই চিঠি আমি তোমায় লিখতাম কীভাবে? তবে হ্যাঁ বড়ো অত্যাচার করেছিল তারা আমার ওপরে। আমার অন্যতম ঘনিষ্ট বন্ধু দৈমিত্রির(সেই শ্বেতাঙ্গ যোদ্ধা যার সঙ্গে প্রথম যুদ্ধে তুমিই আমায় জয়ের পথ দেখিয়েছিলে। মনে আছে? তবে সে আমার শত্রু নয়, বড়ো ঘনিষ্ট বন্ধু হয়ে উঠেছিল পরে। বন্ধু… এবং হ্যাঁ প্রথম গুরুও বটে। অনেক কিছু শিখিয়ছে সে আমায়।) নিষ্ঠুর মৃত্যুর পেছনেও তাদেরই মূল ভূমিকা ছিল। সে অত্যাচারের প্রতিশোধ নেবার জন্য আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম। ম্‌হিরি বিজয় শেষ হবার পর, সম্প্রতি দোরাদাবুর আদেশে মঞ্জাদাহির ফেরবার পথে মরু অঞ্চলে আমি ফের সেই দস্যুদলের দেখা পাই। সসৈন্যে আক্রমণ করে তাদের পর্যূদস্ত করবার পর তাদের দলপতিকে আমি নিজে হাতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলাম। মৃত্যুর ঠিক আগে সে আমায় একটা অদ্ভুত কথা বলে যায়। বলেছিল, সে আমার বিষয়ে অনুসন্ধান করেছে। আমি নাকি বৈক্লন্যের সন্তান নই। নাকি এক বন্য রমণীর গর্ভে আমার জন্ম। এক বণিকশ্রেষ্ঠ নাকি আমার পিতা ছিলেন।

বলা বাহুল্য আমি তার কোনো কথাতেই বিশ্বাস করিনি। হতভাগ্য দস্যু বিষাক্ত সর্পের মতই মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও বিষাক্ত মিথ্যার দংশনে আমাকে আহত করতে চাইছে বলে আমার বিশ্বাস হয়েছিল। এখনও সে বিশ্বাস আমার অটুট আছে।

কিন্তু ইস্কা, এই মুহূর্তে একটা সন্দেহ উপস্থিত হয়েছে আমার মনে। বারে বারে কেবল মনে হয়, দস্যুসর্দার যদি মৃত্যুর আগে সত্যকথা বলে গিয়ে থাকে! যদি সে সত্যই মঞ্জাদাহিরে আমার বিষয়ে অনুসন্ধান করতে এসে এই ভয়ঙ্কর মিথ্যা শুনে থাকে? তার একটাই অর্থ হবে- আমার জন্ম বিষয়ে এই গুজব মঞ্জাদাহিরেও প্রচলিত।

আমার প্রতি মঞ্জাদাহিরের বণিকদের এই যে সমর্থন, তা থেকে মনে হয়, তাঁরাও এই গুজবের খবর রাখেন ও তাতে বিশ্বাস করেন। এমন ভাববার কারণ আছ ইস্কা। আহীনের মত প্রাচীন বংশজাত পুরোহিতদের মধ্যে জাতি, জন্ম এইসব নিয়ে বহু সংস্কার রয়েছে। কিন্তু বণিকরা তার থেকে মুক্ত। সম্ভবত দেশে দেশে ভিন্ন ভিন্ন আচার ও ধর্মের মানুষদের মধ্যে বাস করে করে তাঁদের সেইসব সংস্কার মুছে গিয়েছে। বিবাহের ক্ষেত্রেও জাতিবিচার নিয়ে তাঁদের মধ্যে কঠোরতা কম। ফলে এই বিশ্বাসের মধ্যে থেকে তাঁরা আমার বণিকবংশের পিতৃপরিচয়কেই গুরুত্ব দেবেন ও আমাকে স্বজাতীয় হিসেবে ধরে নিয়ে আমায় সমর্থন করবেন সেটা অস্বাভাবিক নয়।  

যাক সে কথা। এখন কাজের কথা বলি। আমহিরি নগরীর বদলে আমি যে জায়গাটিকে আমার কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছি তার নাম শুনে তুমি অবাকই হবে। কট্টাদিজার দুর্গ। ইন্দা নদীর অন্য তীরে এক পাহাড়ের গায়ে দাঁড়ানো এই অতি নগণ্য দুর্গনগরীকে ঠিক শহরও বলা চলে না। আদতে তা, নদীকুলে এক প্রহরী সেনাছাউনি বিনা আর কিছু নয়। একটা টিলার মাথায় তার অবস্থান। সেনাছাউনি ঘিরে সামান্য কিছু মানুষের বসতি। তার নীচে থেকে গভীর অরণ্য ছড়িয়ে গিয়েছে ইন্দা নদীকূল অবধি। ছোট্ট সেনা নগরীটি ঘিরে সেই অরণ্যে আদিম মানুষদের বাস। এখনও সভ্যতার আলো পায়নি তারা। বন্যজন্তুর মাংস, ইন্দার মাছ ও অরণ্যের ফলমূল তাদের আহার। তাদের কেউ কেউ সেনা নগরীতে ভৃত্যশ্রেণীর কাজে নিযুক্ত। বাকিরা জঙ্গলবাসী। এই নগরীতে যে সেনাদের অবস্থান, তারাও দীর্ঘকাল প্রকৃত সভ্য ও উন্নত কোনো ইন্দানগরীতে পা রাখবার সুযোগ পায়নি। তারা অসংস্কৃত, কলহপরায়ণ ও নীচ মনের মানুষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় বনবাসী মানুষদের তারা নিম্নশ্রেণীর জীবজন্তুর মতই ব্যবহার করে। 

তথাপি, মঞ্জাদাহিরের মন্দির দুর্গের বারান্দা থেকে নদীর অন্যপাড়ে বহুদূরে এই কট্টাদিজার দুর্গ ও অরণ্য নজরে পড়ে কেমন যেন জাদু করে ফেলেছিল আমাকে। সমস্ত যুক্তিবুদ্ধিকে ছাপিয়ে এক মুহূর্তের জন্য তীব্র একটা অপরিচিত আবেগ ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল আমায়। হঠাৎ কেমন যেন মনে হয়েছিল ও আমার বড়ো চেনা জায়গা। চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল স্বপ্নের মত কিছু ঝাপসা ছবি… অরণ্য, শিকার, একটা নরম কোল…

হয়তো তা কোনো মনোবিকার! হয়তো সেই মুহূর্তে আমার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া কোনো অপদেবী এক নিষ্ঠুর রসিকতা করেছিলেন আমার মধ্যে অমন কিছু অনুভূতি জাগিয়ে… কিন্তু সেই মুহূর্তে, সেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি মহাপুরোহিত আহীনকে অনুরোধ করেছিলাম, আমায় তিনি কট্টাদিজায় পাঠিয়ে দিন। সেইখানেই শুরু হোক আমার শিক্ষা। আহীণ আমার অনুরোধ স্বীকার করেছেন। আর সেই দিনটি থেকেই এক অপ্রত্যাশিত যন্ত্রণার সূচনা হয়েছে আমার জীবনে। দুঃস্বপ্নের যন্ত্রণা ইস্কা। সম্ভবত নিজের অতীত নিয়ে ক্রমাগত সন্দেহ আর উৎকণ্ঠা মিলে বেশ কিছুদিন হল আমার দুঃস্বপ্নে দেখা দিতে শুরু করেছে। তাতে অন্ধকারে গোপনচারিণী এক নারী আসেন, রক্তলোলুপ পিশাচের রূপ ধরে আবির্ভূত হন পিতা বৈক্লন্য। ভেবেছিলাম, মঞ্জাদাহির থেকে দূরে সরে গেলে, জনবিরল, অরণ্যবহুল এই কট্টাদিজায় এসে পড়লে সেই দুঃস্বপ্নদের অত্যাচার কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে, এই নির্জনবাসে এসে সেই দুঃস্বপ্নের প্রকোপ ক্রমশই বাড়ছে।

আর, সেইজন্যই তোমাকে এই চিঠি লিখতে বসেছি ইস্কা! তোমার কাছে গোপন করব না। হঠাৎ করেই বড়ো অসহায় লাগছে আমার। বাইরের জগতের চোখে আমি ম্‌হিরিজয়ী বীর মাণ্ডুপ। দোরাদাবুর আশীর্বাদধন্য দেবপ্রিয় মাণ্ডুপ। বাইরের জগতের কাছে তো আমার এই বৃথা শঙ্কা, এইসব বালখিল্য দুঃস্বপ্নের কথা বলা শোভা পায় না। সে বড় লজ্জা। কিন্তু তোমার কাছে আমার কোনো লজ্জা নেই। সঙ্কোচ নেই কোনো। তাই, তোমাকে সবকিছু বলতে পারি আমি। আজ আমার এই দুঃস্বপ্নের কথা, অনিশ্চয়তার কথা, আমার পিতৃপরিচয় নিয়ে মানুষের সন্দেহের কথা, এই সব তোমার উদ্দেশে এই মৃৎপট্টে লিখে আমি একটু ভারমুক্ত হতে চাই।

তিনটি দিনের সময় চেয়ে নিয়েছিলাম আমি মহাপুরোহিত আহীনের কাছে। নতুন কাজে যোগ দেবার আগে, তিনটে বিশ্রামের দিন। মঞ্জাদাহির ছাড়বার পর, সমস্ত দায়িত্বের বাইরে, কট্টাদিজার অরণ্যে পাহাড়ে একলা ঘুরে বেরিয়ে নির্জনে বিশ্রাম করবার সামান্য একটু সুযোগ চাই- এই কথা আমি বলেছিলাম তাঁকে। তিনি তাতে সম্মত হয়েছিলেন। মিথ্যা বলেছিলাম ইস্কা। আসলে এই তিনটে দিন, নির্জনে, সারা পৃথিবীর চোখের আড়ালে তোমাকে এই চিঠিটা লেখবার জন্য চুরি করে নিয়েছিলাম আমি। সে কাজ শেষ হয়েছে আমার। আজ রাত্রে এই মৃৎপট্টদের পুড়িয়ে নিয়ে কাল সূর্যোদয়ের আগে আমি দুর্গে ফিরে যাব। সেখানে কর্কনকে আসতে বলেছি। সে কাপাসবস্ত্রের আচ্ছাদনে লুকানো এই মৃৎপট্টগুচ্ছ সঙ্গে নিয়ে মঞ্জাদাহির ফিরে সেখান থেকে আমহিরি রওয়ানা হয়ে যাবে। তারপর, আমি দুর্গস্বামীর কাছে গিয়ে শুরু করব আমার নতুন জীবন।

ভালোবাসা জেনো। আমার জন্য অপেক্ষা কোরো।

তোমরা মাণ্ডুপ।

dharabahik8901

এক হাত পরিমিত, বর্গাকার ছটি মৃৎপট্ট লেগেছে তার সম্পূর্ণ লেখাটা শেষ হতে। তার মধ্যে পাঁচটা এর মধ্যেই চুল্লিতে পোড়ানো চলছে। শেষ মৃৎপট্টটায় লেখা শেষ করে সামনে চুল্লীর মাথাটার দিকে ঘুরে দেখল মাণ্ডুপ। চারপাশে সাজানো নুড়িপাথরের স্তূপ, শঙ্কু আকারের মাথাটাকে দৃষ্টির আড়ালে রেখেছে। একমাত্র তার খাড়া ওপরে চোখ নিলে মটির নীচে জ্বলন্ত আগুনের গনগনে আভাটুকু চোখে পড়ে।

অবশ্য এখানে জঙ্গল গভীর। আশপাশে মানুষের গতায়াত নেই কোনো। কী করছে সে এখানে বসে তা কারো জানবার কথা নয়। তবু, সাবধান থাকে সে। যতটুকু খবর সে পেয়েছে তাতে বোঝা যায়, সেনাধ্যক্ষ পুরোহিত আরকিন বড়ো বিচিত্র মানুষ। এই সেনানগরীতে তাঁর কথাই ঈশ্বরের আদেশ। মৃৎপট্টে লিপি রচনা তো অনেক বড়ো অপরাধ! তার সহস্র ভাগের এক ভাগ পরিমাণ অপরাধের জন্যও মাণ্ডুপের স্তরের একজন সৈনিককে চাইলে মৃত্যুদণ্ডও দিতে পারেন আরকিন।

কথাটা মনে হতে মাণ্ডুপের মুখে সামান্য হাসি খেলে গেল। কয়েকদিন আগে, মঞ্জাদাহিরে আহীনের ডাকা আলোচনাসভায় আরকিনকে সে দেখেছে। চেহারা শুষ্ক একটা রজ্জুর মত। অস্ত্রবিদ্যায় তিনি দক্ষ, কিন্তু মাণ্ডুপ যতটুকু বুঝেছে তাতে সম্মুখযুদ্ধে মাণ্ডুপের সামনে কয়েক মুহূর্তের বেশি টিকে থাকবার শক্তি হবে না তাঁর। অথচ, মঞ্জাদাহিরের আদেশে এই রজ্জুই এখন ম্‌হিরিবিজয়ী মাণ্ডুপের জীবনমরণের মালিক!

আর তাই কেবলমাত্র অরণ্যের নির্জনতার ওপরে ভরসা না করে মৃৎপট্ট পোড়াবার চুল্লির গড়ণটাই সে বদলে দিয়েছে একেবারে। কিরামের কাছে সে এই কাজের জন্য চুল্লির নির্মাণকৌশল শিখেছিল। মাটির ওপর গায়ে গায়ে পাথর সাজিয়ে তৈরি চোঙাকার চুল্লি। আধমানুষ উচ্চতা তার। পাথরের ফাঁকফোকর মাটি দিয়ে ভরাট করা। নীচে থেকে বায়ুচলাচলের পথ… তাতে বড়ো বড়ো কাঠের খণ্ড দিয়ে আগ্নিকুণ্ড নির্মাণ। কিন্তু এখানে তেমন চুল্লি গড়লে দূর থেকে তা নজরে পড়ে যাবার সম্ভাবনা। তাছাড়া সে চুল্লি থেকে যে পরিমাণ ধোঁয় তৈরি হয় তা জঙ্গলের ঢাকনা ছেড়ে বাইরের বাতাসে ভেসে উঠবেই। সেক্ষেত্রে তা সেনাছাউনির কারো না কারো নজরে পড়ে যেতে পারে। তারপর কেউ এ ধোঁয়ার উৎস খুঁজতে এলে…

…সমস্যাটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে একেবারে হঠাৎ করেই মাণ্ডুপের কেমন যেন মনে হয়েছিল, এর সমাধান তার জানা। আর সেইটে মনে হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই যেন পূর্বজন্মের কোনো স্মৃতির মতই একটা বিশেষ ধরনের চুল্লির নির্মাণ-কৌশল ফিরে আসে তার মনে। সহজ। অতি সহজ তা। মাটিতে একটা গর্ত খুঁড়ে নেয়া কেবল। তার ওপরে সেই খুঁড়ে তোলা মাটি দিয়েই একটা ছোটো শঙ্কু আকৃতির চুল্লি। সামান্য উঁচু। সহজেই তাকে নুড়িপাথরের ঘের দিয়ে দৃষ্টির আড়ালে রাখা যায়। তার মধ্যে দিয়ে মৃৎপট্টগুলোকে ভূগর্ভস্থ চুল্লির পেটের ভেতর নামিয়ে দেয়া। সেখানে আগুন জ্বলবে মাটির নীচে। পট্টদের ঘিরে। শিখাহীন আগুন! নীলাভ রঙ তার…

চোখের সামনে হঠাৎ করেই ছবিগুলো ফুটে উঠছিল মাণ্ডুপের। যেন কোনো জাদু। যেন সে চুল্লি সে দেখেছে কোথাও! অথচ…

না। কাঠ ব্যবহার করা যাবে না এতে। চুল্লিটা তৈরি হতেই তার দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল মাণ্ডুপ। মাটির নীচে যথেষ্ট বাতাসের অভাবে আগুন ধরতে চাইবে না তাতে। তাছাড়া আগুন ধরলেও বড় তীব্র ধোঁয়া হবে। তাতে ধরা পড়বার শঙ্কা আছে। তবে, তারও সমাধান আছে! মাণ্ডুপ জানে… খুবই সরল সমাধান… হ্যাঁ… অগ্নিকর্দম! পাথরের ফাটল বেয়ে চুঁইয়ে আসা কাদার মত এক বস্তু। দুর্গন্ধময়। চুল্লির ভূগর্ভস্থ দেয়ালে পুরু করে সে জিনিস মাখিয়ে নিয়ে তার গায়ে অগ্নিপ্রস্তর ঘষে কিছু ফুলকি ফেলে দিতে হয়। তাহলেই তীব্র নীলাভ রঙ নিয়ে জ্বলে উঠবে সেই কর্দম। ধোঁয়াহীন। কথাটা মনে হতে চারদিকে তাকিয়ে দেখেছিল মাণ্ডুপ। সম্পূর্ণ অজানা এই অরণ্য সেই মুহূর্তে হঠাৎ করেই কেন যেন খানিক পরিচিত ঠেকছিল তার। সামনে যে পাথরের শিরাটা বেঁকে গিয়েছে পাহাড়ের বিপরীত ঢালের দিকে… সেদিকে কিছুদূর এগোলে…

তারপর, মন্ত্রমুগ্ধের মত সেদিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়েছিল সে। তখন রাত্রি। পাহাড়ে আঁধার ছেয়ে আছে। কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যেই, ভূতগ্রস্তের মত হেঁটে গিয়ে সে খুঁজে নিয়েছিল পাহাড়ের কঠিন গায়ে একটা গোপন খাঁজ। তার আত্মবিশ্বাসী হাত সেই খাঁজের মধ্যে আঙুল বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখেছিল, পাহাড়ের শরীর থেকে ফোঁটায় ফোঁটায়  বের হয়ে চলা, চটচটে কাদার মত, দুর্গন্ধ অগ্নিকর্দম! 

আগের পাঁচটা মৃৎপট্ট ইতিমধ্যেই চুল্লিতে ঢুকিয়ে দিয়েছে সে। এইবার শেষতম পট্টটি সেখানে ঢুকিয়ে দিতে গিয়ে একটু থমকাল মাণ্ডুপ। তারপর লেখনি বের করে ফের তার গায়ে অক্ষরপাত করল সে-

পুনশ্চ- কর্কন আমার হয়ে তোমার কাছে আরো কিছু সম্পদ পৌঁছে দেবে। ম্‌হিরি থেকে ফেরবার পথে দস্যুদলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া সম্পদের থেকে আমার ভাগ সেটা। মূল্যবান ধাতু, রত্ন, গহনা, প্রচুর শস্য ও দামি বস্ত্র আছে সেখানে। আমি নিশ্চিত, তুমি তার উপযুক্ত ব্যবহারই করবে। তুমি বণিকের কন্যা।সম্পদের কুশলী ব্যবহারের জ্ঞান তোমার রক্তে আছে। যতদিনে আমি তোমার কাছে পৌঁছাব, ততদিনে এই মূলধন কাজে লাগিয়ে তুমি আমহিরির ধনীতম বণিকে পরিণত হবে বলে আমার বিশ্বাস। ভাগ্য সদয় হলে, কিছুকাল বাদে যখন এই চিঠি আমি তোমায় পড়ে শোনাব তখন  আমার এই ভবিষ্যবাণী তোমাকে পড়িয়ে আমি প্রমাণ করে দেব, তোমার স্বামী মাণ্ডুপ আসলে কত দূরদর্শী এক পুরুষ

কথাগুলো লিখে মাটির পাটাটকে আগুনে ঢুকিয়ে দিল মাণ্ডুপ। তারপর সাবধানে সেখানে উঁকি দিয়ে একবার দেখে নিল। আজ মধ্যরাত অবধি পাটাগুলোকে পোড়াতে হবে। তারপর, আগুন নিভিয়ে সেই মৃৎপট্টদের সঙ্গে করে মাণ্ডুপ ফিরে যাবে সেনাছাউনিতে। আগামীকাল কর্কন এলে তার হাতে কার্পাসবস্ত্রে মোড়া এই চিঠি তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হবে সে।

বাইরে সন্ধ্যা নামছিল। পাহাড়ের ঢালের ওপরের দিকে বেশ খানিক দূরে বনের ফাঁক দিয়ে কট্টাদিজা-র সেনাছাউনি চোখে পড়ে। অরণ্যর সবুজ আস্তরণের মধ্যে একটা বিশ্রী ঘা-র মতই জেগে আছে তার সুবিশাল ইটের গাঁথুনি। সেইদিকে একনজর তাকিয়ে দেখল মাণ্ডুপ। তিনদিনের বিরতি আজই শেষ। কাল থেকে ওইখানে… নতুন দায়িত্বে… দোরাদাবুর সেবায়…

মধ্যরাত অবধি কেবল অপেক্ষা এখন। তার আগে আর কিছু করবার নেই তার। ক্লান্ত লাগছিল মাণ্ডুপের। আস্তে আস্তে চোখদুটি জুড়ে আসে তার… 

এইখানটায় চুল্লীর আঁচ আসে। গরমের সন্ধ্যা। চামড়ায় ছ্যাঁকা আগে যেন। আধাঘুমন্ত চোখ নিয়ে হঠাৎ উঠে বসল মাণ্ডুপ। এইখানে কষ্ট করে লাভ কী? ওইতো ডাইনে খানিক দূরে সেই লতাবিতান। ওর ভেতরে ঝুলন্ত কাষ্ঠল লতাদের একত্র করে হরিণের শুষ্ক অন্ত্র দিয়ে বেঁধে তার ঝুলন্ত শয্যা গড়ে দিয়েছিল মা… যেন স্বপ্নের ঘোর নিয়ে সে হেঁটে যায়, চুল্লীর পাশ কাটিয়ে… নিশ্চিত পদক্ষেপে গভীর খাদের পাশে পাশে সরু পার্বত্য অলিন্দ ধরে কিছু দূরে দাঁড়ানোএকদল গাছের ভিড়ের দিকে… তাদের ডালে ডালে… ওইতো দোলনাটি বাঁধা আছে তার… শুকনো মৃগ-অন্ত্র দিয়ে তার বাঁধন, এখনও খোলেনি… মায়ের হাত্র বাঁধন যে…  

স্বপ্নচারী কিশোর, স্বপ্নে তার ঘুমন্ত স্মৃতিকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে হারানো শৈশবের শয্যাটিকে খুঁজে বের করে নেয়, তারপর অভ্যস্ত ভঙ্গীতে দুলন্ত কাষ্ঠল লতার সেই বিছানায় নিজেকে ছড়িয়ে দিয়ে ডুবে যায় গভীর ঘুমে।  তারপর… সেই ঘুমে এক অন্য স্বপ্ন আসে তার… এক মুখহীন নারী, অন্ধকার অবয়ব তাঁর… তাকে জড়িয়ে ধরে তিনি নিজের বুকে পেতে নেন এক নিষ্ঠুর সৈনিকের তরবারির আঘাত… বৈক্লণ্য… “পিতা… না… মা নির্দোষ পিতা… মুঢ়াল… আমার মা… তাঁকে তুই প্রাণভিক্ষা দাও পিতা… পিতা…”

তরবারির আঘাত নেমে এসেছে। ছুটন্ত, ফুটন্ত মাতৃরতের ধারায় স্নান করে সে… ডুবে যায় নোনতা, আঁশটে, ধাতব স্বাদের সেই চটচট তরলের স্রোতে… আর তারপর নিজের অস্ফুট আর্তনাদের শব্দে নিজেই জেগে ওঠে সে…

***

…আকাশে গ্রীষ্মমৎস্য মধ্যগগনের সামান্য দক্ষিণে ঢলেছেন। তার মানে, মধ্যরাত্রি অতিক্রান্ত। তাড়াতাড়ি তার ঝুলন্ত শয্যা ছেড়ে পাথরে পা রাখল মাণ্ডুপ। খানিক দূরে একটু নীচে তার চুল্লির মাথার আবছা লালচে আভাটুকু চোখে পড়ছে এখান থেকে। এইখানে… এই ঝুলন্ত শয্যায়… কেমন করে এসে পৌঁছাল সে? ওই স্বপ্ন… মূঢ়াল… কী অদ্ভুত নাম? কার নাম? ও নামের অর্থ কী?

চিন্তাগুলোকে একরকম জোর করেই ঝেরে ফেলে দিল মাণ্ডুপ। এখন কাজের সময়। পট্টগুলোকে  বের করে, চুল্লি নিভিয়ে দিতে হবে। তারপর জঙ্গলের বুক থেকে তার সমস্ত চিহ্ন মুছে দিয়ে, শুকনো পাতার পুঁটুলিতে পট্টগুলোকে লুকিয়ে নিয়ে, রাত শেষ হবার আগেই তাকে ফিরতে হবে কট্টাদিজা-র সেনাছাউনিতে। সেখানে… নতুন জীবনে…

ক্রমশ

শীর্ষচিত্র- অতনু দেব।

 জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক

Leave a Reply