সিন্ধুনদীর তীরে –প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব, পঞ্চম পর্ব, ষষ্ঠ পর্ব , সপ্তম পর্ব, অষ্টম পর্ব, নবম পর্ব , দশম পর্ব, একাদশ পর্ব, দ্বাদশ পর্ব, ত্রয়োদশ পর্ব, চতুর্দশ পর্ব, পঞ্চদশ পর্ব, ষোড়শ পর্ব, সপ্তদশ পর্ব
ম্হিরি বিজয়
অবশেষে নৃত্যগীতের উচ্ছলতা শেষ হয়েছে। নিভে এসেছে ম্হিরির আগন্তুক ব্যাপারীদের সম্মানে আয়োজিত উৎসবের আলোকমালা, থেমে এসেছে তাদের মনোরঞ্জনের আসরে ম্হিরির কণ্ঠ ও যন্ত্রশিল্পীদের সুমধুর সঙ্গীতধ্বনি।
দূরে সুসজ্জিত তাঁবুগুলির আলো একে একে নিভে আসে। তাঁবুগুলিকে ঘিরে দাঁড়ানো ব্যাপারীদের বড়ো বড়ো পণ্যযানগুলিকে অন্ধকারে এক একটি ছোটো ছোটো পাহাড়ের মতই দেখায়। তাদের মধ্যে একটি যানের চাকায় হেলান দিয়ে সে বসে ছিল। এক সহস্র যানের সঙ্গে আসা ছোটো রক্ষিদলটির একজন হয়েই তার এই শহরে অভিযানে আসা।
মহামাতৃকা সুব্রানের বাসস্থানের জানালা থেকে খানিক আগেই আলোর রেখা মুছে গিয়েছে। ঘুমিয়ে পড়েছে সমস্ত ম্হিরি। কেবল একটি ছোটো রক্ষিদল জেগে আছে সুব্রানের প্রাসাদ ঘিরে। তবে তারা আর কতটুকু!
যানের ভেতর থেকে রাত্রির নিস্তব্ধতার মধ্যে হালকা… অত্যন্ত হালকা ধাতব টুংটাং শব্দ থেকে সে বুঝতে পারে, দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে সেখানে আত্মগোপন করে থাকা ইন্দাতীরের সৈনিকরা এইবার বাইরে বের হয়ে আসবার শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন, কেবল একটি সঙ্কেতের অপেক্ষা। তার আর সামান্যই দেরি আছে। এইবার… যেকোনো মুহূর্তে…
বিচিত্র একটুকরো হাসি ফুটে উঠল সেই তরুণ রক্ষীর মুখে। মহিষবাহিত এক সহস্র যানে নিজেদের গোপন রেখে এইখানে আসা ইন্দাতীরের দশ সহস্র সুদক্ষ সৈনিক… আসন্ন বিজয় ও চিরশত্রুর নিধনের জন্য বদ্ধপরিকর মহাবীরের দল… তারা ঘুণাক্ষরেও জানে না, এ যুদ্ধে তাদের অধিকাংশেরই আসল ভূমিকা কেবলই ম্হিরির তরবারিতে বলি হওয়া ভিন্ন আর কিছু নয়। মহাপুরোহিত আহীন স্বয়ং এসেছেন এই বণিকদলের সঙ্গে, ইন্দাতীরের দোরাদাবুর মহান সাম্রাজ্যের মুখপাত্র হয়ে। কিন্তু তাঁরও বিশেষ কোনো ভূমিকা নেই এই সংগ্রামে। এ-যুদ্ধের আসল যোদ্ধা একলা সে। এবং সে কথা একলা সে ছাড়া এই সেনাদলের আর দ্বিতীয় কেউ জানে না। সে দায়িত্ব তাকে দিয়েছেন, স্বয়ং ঈশ্বর দোরাদাবু। বাজিকরের সুক্ষ্ম কৌশল তা। কার্যোদ্ধারের আগে দ্বিতীয় কেউ তা জানলে এই অভিযান ব্যর্থ হবে।
মহাপুরোহিত আহীনের সঙ্গে সেই সাক্ষাতকারে সেরে মন্দিরদুর্গ থেকে বের হয়ে আসবার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের মস্তিষ্কে সেই আকস্মিক সুক্ষ্ম অথচ সুস্পষ্ট আহ্বানটা তার জীবনের গতিমুখকে আমূল বদলে দিয়েছে। দোরাদাবু… মহান ঈশ্বর, তিনি স্বয়ং তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছিলেন সেদিন। ঐশ্বরীয় মায়ায় তার মনের সঙ্গে সরাসরি যোগস্থাপন করে, কথা বলেছিলেন তিনি তার সঙ্গে।
সে সংযোগ মঞ্জাদাহির হতে ম্হিরি-র যাত্রাপথে এতদিন ধরে তার নিত্যসঙ্গী হয়ে থেকেছে। এই সময়টাতে তার আমহিরি নগরী থেকে বের হবার পর থেকে মঞ্জাদাহির অবধি পৌঁছানো অবধি প্রতিটি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তিনি শুনেছেন মাণ্ডুপের কাছে। এবং, তারপর, ধীরে ধীরে তার কাছে এই যুদ্ধের সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটি খুলে জানিয়েছেন তিনি।
মান্ডুপ যেন ভবিষ্যদ্দ্রষ্টা। আগামী কয়েক ঘণ্টায় যা ঘটতে চলেছে তার এক যুক্তিসিদ্ধ পূর্বাভাষ তাকে আগেই জানিয়েছেন মহান দোরাদাবু। জানিয়েছেন এই সময়ে তার নিজের কর্মপ্রণালী কী হবে সেই কথাও। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
এ-বিষয়ে অবশ্য আহীনের কোনো ধারণা নেই। সম্পূর্ণ বিষয়টা নিয়েই তাকে অন্ধকারে রেখেছেন দোরাদাবু। তার কারণটা মাণ্ডুপ বোঝে। জানলে পরে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এভাবে এগিয়ে যাবার বিষয়ে হয়তো অনিচ্ছা গড়ে উঠতে পারত আহীনের মনে। পরিকল্পনাটির বিষয়ে তার সম্পূর্ণ অজ্ঞতাই এর সাফল্যের চাবিকাঠি।
এটি ছাড়া আরও একটা ব্যাপারও মাণ্ডুপ জানে, যা আহীনের কাছে অজ্ঞাত। তা হল, গোপনে দোরাদাবু এই অভিযানের সঙ্গে সঙ্গে চলেছেন। সশরীরে উপস্থিত রয়েছেন তিনি এই রণক্ষেত্রের কাছাকাছি। বিষয়টি দোরাদাবু তাকেও জানাননি অবশ্য। কিন্তু একটি সরল যুক্তি দিয়ে তা অনুমান করে নিতে অসুবিধা হয়নি মাণ্ডুপের। সে খেয়াল করেছে, দোরাদাবু ইন্দাতীরের সম্পূর্ণ সাম্রাজ্যের পরিচালনা একা করেন না। নদীর দুই পাশে গড়ে ওঠা অজস্র নগরীর প্রতিটির ভার রয়েছে তাঁর একেকটি সন্তানগোলকের হাতে। এদের মস্তিষ্কের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে থাকলেও প্রতিটি নগরের বাসিন্দাদের মানসিক নিয়ন্ত্রণ থাকে সেই নগরীর শাসক সন্তানগোলকের কাছে। দোরাদাবুর সঙ্গে আলাপচারিতায় তাঁর শাসন প্রণালীর এই ছবিটি সামনে আসবার পর তা থেকে মাণ্ডুপের অনুমান করে নিতে অসুবিধা হয়নি যে নিজের অবস্থান থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বের বাইরে এই গোলকদেবতার মানসিক নিয়ন্ত্রণ কাজ করে না। অথচ ম্হিরির যাত্রাপথে তিনি নিয়মিত তার সঙ্গে মানসিক আলাপচারিতা বজায় রেখে চলেছেন। এর থেকে মাণ্ডুপ খুব সহজেই সিদ্ধান্ত করতে পেরেছিল যে দোরাদাবু তাদের বাহিনীর সঙ্গে চলেছেন।
দূরে কোথাও একটি বাঁশি বেজে উঠেছে। ইন্দাতীরের অতি পরিচিত এক লোকসঙ্গীতের ধুন বাজাচ্ছে কেউ সেই বাঁশিতে। মাণ্ডুপ সচকিত হয়ে উঠে দাঁড়াল। বাঁশির সুর ভেসে আসছে আহীনের তাঁবু থেকে। প্রস্তুতির সঙ্কেত! হঠাৎ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে চোখদুটি বন্ধ করে মনঃসংযোগ করল সে। নিতান্তই অভাসের বশে, শেষবারের মত একবার মহান দোরাদাবুর সঙ্গে চেতনাসংযোগ, শেষমুহূর্তের কোনো আদেশ…
পরক্ষণেই চোখদুটি খুলে ফেলল সে। তার মনে পড়েছে, এইমুহূর্তে তা আর সম্ভব নয়। ম্হিরি নগরীর ভেতরে, তার জ্যোতিগৃহের প্রভাবক্ষেত্রে অবস্থান করছে তারা এই মুহূর্তে। এই প্রভাবক্ষেত্রকে ভেদ করে দোরাদাবুর চিন্তাতরঙ্গের প্রবেশাধিকার নেই । এইবার, এই রণক্ষেত্রে সে একা!
সময় বয়ে চলে। ধীরে ধীরে বাঁশির সেই ধুন তার গতি ও ছন্দ বাড়াতে বাড়াতে একসময় এক চূড়ান্ত উচ্চতায় পৌঁছে যায়। আর তারপর, সম-এ পৌঁছে একেবারে হঠাৎ করেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল তার সুর।
সঙ্গে সঙ্গেই যেন কোনো জাদুমন্ত্রে হঠাৎ ভূমিকম্পের মত দুলুনি জেগে উঠল ব্যাপারীদের পণ্যযানগুলিতে। আর তারপর… পাশবিক হুঙ্কার ছেড়ে তাদের ভেতর থেকে লাফ দিয়ে বের হয়ে আসা শত শত সৈনিক খোলা অস্ত্র হাতে সামনের দিকে ছুটতে শুরু করল।
তাঁবুগুলিকে চাকার মত ঘিরে থাকা পণ্যযানগুলি থেকে লাফিয়ে পড়ে বৃত্তাকারে তারা ছুটে যাচ্ছিল তার চতুর্দিকে। যেন এক বৃত্তাকার ঢেউ জলাশয়ের কেন্দ্র থেকে উঠে ছড়িয়ে পড়ছে তার চতুর্দিকে।
আক্রমণের এই পদ্ধতি নির্ধারণ করেছিলেন আহীন নিজে। এর সপক্ষে একেবারে সরল যুক্তি ছিল তাঁর। ম্হিরিদের নিজের নগরীতে সম্মুখযুদ্ধে পূর্ণশক্তির ম্হিরি সেনবাহিনী প্রায় অজেয়। সেক্ষেত্রে নিশ্চিন্তে ঘুমন্ত ও অপ্রস্তুত নগরীর বুকে, একই সঙ্গে তার প্রতিটি অঞ্চলে সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণের আকস্মিকতার ওপরে ভরসা রেখেছিলেন তিনি। নগরকেন্দ্র থেকে বৃত্তাকারে ছড়িয়ে পড়া এই আকস্মিক আক্রমণ এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত পদ্ধতি বলে সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর। পরিকল্পনা ছিল, ম্হিরির অপ্রস্তুত সেনাবাহিনী জেগে ওঠবার আগেই ঝটিকা আক্রমণে নগর জুড়ে মৃত্যুর স্রোত বইয়ে দিয়ে শাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলিকে দখলে নিয়ে আসা হবে।
আক্রমণের সূচনা হবার সঙ্গে সঙ্গেই, শরীর থেকে ইন্দাতীরের সমস্ত রণসজ্জা খুলে ফেলে কৌপিনসর্বস্ব মাণ্ডুপ হাতে একটা ছোটো পুঁটুলি নিয়ে সৈনিকবৃত্ত থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। খানিক বাদে, কাছাকাছি একটা বাড়ির দেয়ালের আড়ালে আশ্রয় নিল সে। তারপর হাতের পুঁটুলিটি খুলে ফেলে তাতে সযত্নে রাখা একটি পোশাক ও কিছু অস্ত্রশস্ত্র পরিধান করে নিয়ে ফের যখন উঠে দাঁড়াল সে তখন তাকে দেখে ম্হিরির একজন সাধারণ যোদ্ধা বলে চেনা যায়। নগরে পৌঁছে এই পোশাকটি সংগ্রহ করতে তাকে কয়েকটি স্বর্ণখণ্ড খরচ করতে হয়েছিল। তার বিক্রেতা একে ভিনদেশি সৈনিকের এক নিরীহ কৌতূহল ভিন্ন অন্য কোনো সন্দেহ করেনি। করবার কারণও ছিল না।
ছদ্মবেশ সম্পূর্ণ করে অন্ধকারের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখে ইন্দাতীরের সেনাদলের সেই অগ্রগতি লক্ষ করছিল মাণ্ডুপ। ভুল। বিরাট এক ভুল করেছেন মহাপুরোহিত এবং বীরশ্রেষ্ঠ আহীন। মাণ্ডুপ তা জানে, কারণ ম্হিরি নগরীর আত্মরক্ষার কৌশল বিষয়ে তাকে আগেই অবহিত করেছিলেন মুন্দিগ্র নগরীর পরিব্রাজক যুদ্ধব্যবসায়ী দৈমিত্রি।
এ নগরী কখনো ঘুমায় না। সে জানে, আপাতদৃষ্টিতে নিদ্রিত এই নগরীর প্রতিটি সেনা এই মুহূর্তে জেগে আছে। অন্ধকারের আড়ালে এই বণিকদের অস্থায়ী আবাসের চতুর্দিকে, ম্হিরি নগরীর কেন্দ্রীয় অঞ্চলকে ঘিরে নিঃশব্দে, শ্বাপদ হেন সতর্কতায় ও হিংস্রতায় জেগে আছে তাদের বৃত্তাকার ও গভীর রক্ষণব্যুহ। সেটাই তাদের নগর রক্ষার কৌশল। শান্তি অথবা যুদ্ধ, কোনো পরস্থিতিতেই তাদের রক্ষীসেনাদলের এই সঙ্গোপন অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয় না। ম্হিরির অজেয় হবার এইটিই মূল কারণ। এ নগরে বাইরে থেকে আসা বণিক, গুপ্তচর কিংবা সাধারণ মানুষের কাছে এই রক্ষণব্যবস্থা সম্পূর্ণ অদৃশ্য থাকলেও তীক্ষ্ণধী যুদ্ধব্যবসায়ী দৈমিত্রির চোখকে তা ফাঁকি দিতে পারেনি।
মাণ্ডুপের কাছে এই খবরটি জানবার পরেই সম্পূর্ণ আত্মঘাতী আক্রমণের এই কৌশলটি আহীনের মস্তিষ্কে, তার অজান্তেই বপন করছিলেন দোরাদাবু।
আহীন জানে না, এই নিষ্ফলা আক্রমণে ইন্দাতীরের শত শত বীর সৈনিকের নিষ্ঠুর মৃত্যু আজকের আসল যুদ্ধ নয়। সুপরিকল্পিতভাবে নিজের সৈনিকদের হত্যাযজ্ঞের এই পরিকল্পনা আহীন নিজে করেননি। তা করেছেন দোরাদাবু স্বয়ং। করেছেন আজকের যুদ্ধের আসল সৈনিক মাণ্ডুপকে তার নিভৃত আক্রমণ শানাবার সুযোগ করে দেবার জন্য।
এবং দৈমিত্রির সেই বিশ্লেষণকে সত্য প্রমাণিত করেই যেন বা, হঠাৎ তাদের চতুর্দিকে ঘিরে কণ্ঠহারের মত শত শত মশাল জ্বলে উঠল দপ করে। বৃত্তাকার ঢেউয়ের মত ধাবমান ইন্দাতীরের সৈন্যদলটিকে ঘিরে বেশ কিছুটা দূরত্বে
কয়েকমুহূর্ত স্থির হয়ে রইল সেই আলোর মালা। তারপর দ্রুত সঙ্কুচিত হতে হতে ঝড়ের বেগে তা ধেয়ে আসতে শুরু করল ভেতরের দিকে।
দুটি বৃত্তাকার ঢেউ। তার একটি, ম্হিরির কেন্দ্রীয় অঞ্চলে দাঁড়ানো ইন্দাতীরের ব্যাপারীদের পণ্যযানগুলি থেকে বের হয়ে এসে রণধ্বনি করে ছুটে চলেছে বাইরের দিকে, আর অন্যটি তাকে ঘিরে রেখে ভেতরের দিকে ছুটে আসতে আসতে তাদের মশালের আগুনের ব্যুহকে ক্রমশই ছোটো করে একটা ফাঁসের মত এঁটে বসছে বহির্গামী সৈন্যদলকে ঘিরে।
ইতিমধ্যে কখন যেন খুলে গিয়েছে মহামাতৃকা সুব্রানের বাসগৃহের দরজা। সেখান থেকে, বল্লমের ত্রিভূজাকৃতি ফলার মত ব্যুহবদ্ধ হয়ে ছুটে আসছিল, সুব্রানের অর্ধসহস্র নারীযোদ্ধার অজেয় দেহরক্ষী বাহিনী। ফলার তীক্ষ্ণ অগ্রবিন্দুতে, খোলা কৃপাণ হাতে একটি বিশাল মহিষের পিঠে ধেয়ে আসছিলেন মহামাতৃকা সুব্রান স্বয়ং। তাঁর উড়ন্ত মেঘের মত চুলে মশালের লোহিতাভ আলো ঠিকরে যাচ্ছিল।
দুটি বৃত্তব্যুহ ততক্ষণে একে অন্যের কাছাকাছি পৌঁছে মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। ইন্দাতীরের যোদ্ধারা কাপুরুষ নয়। আকস্মিক ঝটিকা আক্রমণে অপ্রস্তুত শত্রুকে ধ্বংস করবার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে জেনেও তারা হাল ছেড়ে দেয়নি। বরং পরাজয় নিশ্চিত জেনেও আহত বাঘের মতই লড়াই দিচ্ছিল তারা। দুপক্ষেরই যোদ্ধাদের মরণ আর্তনাদে কেঁপে উঠছিল নিশুতি রাত্রির অন্ধকার আকাশবাতাস।
ইতিমধ্যে সুব্রানের বল্লমের ফলার মত ত্রিভূজাকৃতি ব্যুহ যুদ্ধরত সৈনিকদের বৃত্তকে সহজেই ছিঁড়েখুঁড়ে যুদ্ধক্ষেত্রের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে এসে পৌঁছেছে। সেখানে আহীনকে ঘিরে ব্যুহবদ্ধ পাঁচশতাধিক পুরোহিতসেনার সঙ্গে মরণপণ লড়াই শুরু হয়েছে সুব্রানের দেহরক্ষী বাহিনীর।
হিংস্র সেই প্রতি-আক্রমণে অধিকতর দক্ষ ম্হিরি সেনাদলের সামনে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়োছিল ইন্দাতীরের সেনাদলের প্রতিরোধ। জয়ের ঘ্রাণ পেয়ে তখন আরও উদ্দাম হয়ে উঠেছে ম্হিরির যোদ্ধারা। বিজয়ের মহাগৌরবের অংশীদার হবার জন্য নগরের অন্যান্য এলাকায় পাহারায় থাকা সেনারাও অস্ত্র হাতে ছুটে চলেছে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে। কাজেই নগরকেন্দ্রে অবস্থিত ‘জ্যোতিগৃহ’ নামের পঞ্চভূজাকৃতি প্রাসাদটির প্রহরী সৈনিকদলকে, রণক্ষেত্র থেকে ছুটে আসা ম্হিরির সৈনিকটি যখন খবর দিল, মহামাতৃকা সুব্রান তাদেরও এই যুদ্ধের গৌরবে অংশ নেবার আদেশ দিয়েছেন, তখন তাদের এতে কোনো সন্দেহ উপস্থিত হয়নি। যুদ্ধে যোগ দেবার তীব্র আকাঙ্খায়, বার্তাবহ সৈনিকটিকে কোনো জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনও মনে করেননি প্রহরীদের দলনেতা।
বার্তাবহ সৈনিকটি তাঁকে জানিয়েছে এ যুদ্ধে ম্হিরির জয় প্রায় সুনিশ্চিত। ইন্দাতীরের বর্বরদের বন্যপশুর মতই সম্পূর্ণ ঘিরে ফেলে তাদের হত্যা করছে ম্হিরির অজেয় বীরেরা।
অতএব সেই মুহূর্তে জ্যোতিগৃহকে সদলে রক্ষা করবার কোনো প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেননি প্রহরীদের দলনেতা। ভারী সীসার বর্মগুলিকে খুলে ফেলে রেখে দ্রুতগতি সম্মুখযুদ্ধের উপযুক্ত রণসজ্জায় সজ্জিত হবার আদেশ দিয়েছিলেন তিনি প্রহরীদের দলটাকে। সে আদেশ পালন করতে মুহূর্তমাত্র বিলম্ব করেনি সেই প্রহরী সৈন্যদল।
কয়েক মুহূর্ত বাদে কেবলমাত্র একজন প্রহরীকে সেখানে রেখে বাকি দলটি রণধ্বনি করে ছুটে গিয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে। এবং, তারা অন্ধকারে মিলিয়ে যাবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অন্ধকারের আড়াল থেকে ক্ষিপ্র বাঘের মতই সেই একমাত্র প্রহরীর ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ছদ্মবেশী মাণ্ডুপ। তার হাতে তখন উঠে এসেছে একটা তীক্ষ্ণধার বাঁকানো ছুরি।
দৈমিত্রির যুদ্ধব্যবসায়ী ছিলেন। প্রতিপক্ষের দুর্বলতার সন্ধানে দক্ষ ছিল তাঁর চোখ। জ্যোতিগৃহের প্রহরী সৈনিকদের অভেদ্য সীসার বর্মের একটি দুর্বলতা তাই তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। মাণ্ডুপকে তিনি সযত্নে সেই দুর্বলতাটির বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছিলেন মৃত্যুর আগের রাত্রে।
কাজেই বর্মধারী প্রহরীর পিঠের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বার পর প্রথমেই মাণ্ডুপের আঙুল একটা সুক্ষ্ম ফাটলের সন্ধান করেছিল তার বর্মে। এবং তা খুঁজে বের করতে বিশেষ দেরি লাগেনি তার। এ বর্মের দুটি ভাগ। একটি সৈনিকের শরীরকে আবৃত রাখে। আর অন্যটি শিরস্ত্রাণ। মাথা ও ঘাড়কে সুরক্ষিত রাখে তা। এই দুটি ভাগের মধ্যে সংযোগস্থলটি অরক্ষিত থাকে। দৈমিত্রি বলেছিলেন, এই বর্মধারী প্রহরীদের দেহে ওই একটিমাত্র দুর্বল স্থান।
ফাটলটিকে খুঁজে পেয়ে সেখানে বাঁকানো ছুরির ফলাটি ঢুকিয়ে দিতে আর কোনো সমস্যা হয়নি মাণ্ডুপের। কিন্তু তারপর হঠাৎ করে একটা অদ্ভুত অনুভূতি ছড়িয়ে গিয়েছিল তার শরীরে। মানুষটা কে তা সে জানে না। তা মুখ দেখেনি সে কখনো। তার সঙ্গে কোনো শত্রুতা হয়নি তার। অথচ এইবার সে তাকে, অপরিচিত, শত্রুতাহীন এওজন মানুষকে…
তবে সে নিয়ে ভাববার সময় তখন তার ছিল না। প্রহরী যথেষ্ট শক্তিমান। হাতাহাতি লড়াইতে তার শিক্ষা যথেষ্ট উচ্চমানের। পিঠে সওয়ার হওয়া আক্রমণকারীকে নিয়ে সে তখন জ্যোতিগৃহের পাথরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে নিজের শরীর ও বর্মের ওজন দিয়ে তাকে দেয়ালের গায়ে পিষে ফেলবার কৌশল করেছে। সে নিষ্পেষণে নিঃশ্বাস বন্ধ অয়ে আসছিল মাণ্ডুপের। অবশেষে, নিতান্তই বাঁচবার তাড়ণায় সে শেষ পদক্ষেপটি নিতে আর দ্বিধা করল না। তার হাতের একটি সজোর ধাক্কায় ছুরির ফলাটা বর্মের সেই ফাটল দিয়ে এগিয়ে গিয়ে প্রহরীর ঘাড়ের কশেরুকার ফাঁকে গেঁথে গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে নিঃশব্দে সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল প্রহরীটি। তার সুষুম্নাকাণ্ড ছিন্ন হয়ে মস্তিষ্কের সঙ্গে দেহের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। প্রায় রক্তপাতহীন ও নিঃশব্দ মৃত্যু এসেছে মুহূর্তে।
প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান ছিল সেই সময়। বিদ্যুৎবেগে কাজ করছিল মাণ্ডুপ। মাটিতে ফেলে যাওয়া সীসার বর্মগুলির একটি তুলে নিয়ে দ্রুত হাতে নিজের গায়ে তা পরে নিতে কয়েক মুহূর্তের বেশি সময় লাগল না তার। তারপর জ্যোতিগৃহের দরজা খুলে সে এগিয়ে গেল তার ভিতরে।
সাধারণ, নিরাভরণ একটি ঘর। তার কেন্দ্রে একটি পাথরে তৈরি বেদি। বেদির ওপরে অত্যন্ত সাধারণ চেহারার একখণ্ড পাথর। একটাই দৃষ্টি আকর্ষণকারী বৈশিষ্ট্য আছে তার। ঘরের অন্ধকার বাতাসে তার থেকে একটা আবছা সবুজাভ জ্যোতি ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে।
সেই আবছা আলোয় চারদিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে দেখল মাণ্ডুপ। এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই উদ্দিষ্ট বস্তুটি চোখে পড়ল তার। বেদীর ঠিক নীচেই রাখা ছিল তা। সীসানির্মিত একটা বাক্স। জ্যোতিগৃহে কোনো সীসানির্মিত আধার থাকবার সম্ভাবনার কথা তাকে দোরাদাবুই জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, একমাত্র সেই আধার ব্যতীত এই বিষপ্রস্তরকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করা যায় না। কাজেই যেখানে সেই বিষপ্রস্তর রাখা হবে তার কাছাকাছিই এহেন কোনো আধার থাকবার সম্ভাবনা।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হাতে পাথরের খণ্ডটিকে তুলে নিল মাণ্ডুপ। তারপর সীসার বাক্সটি টেনে এনে তার ডালা খুলে তার মধ্যে তাকে বসিয়ে ডালা বন্ধ করে দিল সে।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তার মাথার মধ্যে ফিরে এল দোরাদাবুর পরিচিত কণ্ঠস্বর। প্রসন্ন কণ্ঠে তিনি বলছিলেন, “ধন্য তুমি বালক। আজ তোমার হাতেই অপরাজেয় ম্হিরি নগরীর পতন সম্ভব হল। বাক্সটিকে বন্ধ অবস্থায় উপস্থিত কোনো গুপ্তস্থানে রাখবে তুমি। মঞ্জাদাহিরে ফিরে আসবার পর সেটি আমাকে সমর্পণ করে তোমার কর্তব্য শেষ হবে।” এবং তার পরেই মানসিক সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে মাণ্ডুপ ফের একা হয়ে গেল।
বাক্সটিকে হাতে ধরে একটুক্ষণ চিন্তা করল মাণ্ডুপ। তারপর তার মুখে মৃদু একটুকরো হাসি ফুটে উঠল। সমাধানটা কঠিন নয়। জ্যোতিগৃহ থেকে হারিয়ে যাওয়া সম্পদ খোঁজবার জন্য খোদ জ্যোতিগৃহের দিকে চোখ পড়বে না কারো। হাতের ছুরিটি দিয়ে সযত্নে তার মেঝের একটা পাথরের পাটাতন খুঁড়ে তুলতে শুরু করল সে…
কয়েক মুহূর্ত বাদে, পাটাতনের নীচে খোঁড়া গর্তটায় বাক্সটা লুকিয়ে রাখতে গিয়ে একটু থমকেছিল সে। মাথায় তার তখন একটা অন্য চিন্তা এসেছে। গর্তে রাখা বাক্সটার ডালার মধ্যে নিজের সীসার বর্মে মোড়া হাতটা ঢুকিয়ে দিয়ে পাথরটাকে সেখানে সজোরে ঠুকতে শুরু করল সে।
কয়েকবার ঠোকবার পর তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল। মূল পাথর থেকে একটা ছোটো টুকরো আলগা হয়ে এসেছে। দুটো টুকরোকেই বাক্সে রেখে দিয়ে এবারে বাইরে বের হয়ে এল মাণ্ডুপ। জ্যোতিগৃহের প্রহরীদের সীসার এই বর্মগুলো বিচিত্র প্রযুক্তিতে নির্মিত। মাছের আঁশের মত একএকটি ছোটো ছোটো পাত একে অন্যের ওপরে সাজিয়ে গড়ে তোলা এই বর্ম কেবল হালকাই নয়, সেইসঙ্গে নমনীয়ও বটে। ফলে বর্ম পরিহিত যোদ্ধার শরীরের নড়াচড়ায় কোনো বাধা হয়ে ওঠে না তা।
মাটিতে পড়ে থাকা বর্মগুলোর একটার থেকে এমনই একটা ছোটো পাত খুলে নিয়ে ফের জ্যোতিগৃহের ভেতরে ফিরে এল সে। তারপর বাক্সে হাত ঢুকিয়ে সাবধানে, জাদুপ্রস্তরের ছোটো টুকরোটাকে সেই পাতে জড়িয়ে নিয়ে সেটা বের করে এনে বাক্স বন্ধ করে দিল মাণ্ডুপ। খানিক বাদে মেঝের পাথরে পাটাতন আগের জায়গায় বসিয়ে দিয়ে, সীসার পাতে মোড়া পাথরের ছোটো টুকরোটা হাতে নিয়ে ফের যখন সে বের হয়ে এল, তখন তার পরনে ইন্দাতীরের সৈনিকের পুরোনো পোশাক ফিরে এসেছে।
বিচিত্র মানুষ সে। তার ধমনীতে একদিকে ধূর্ত বণিকের রক্ত বয়, অন্যদিকে তার সঙ্গে মিলেছে বন্য ও আদিম মায়ের স্বভাবজাত সাবধানতা ও শক্তিমানের প্রতি অবিশ্বাস। আবার তার পালক পিতার ঘরে বেড়ে ওঠা তাকে দিয়েছে এক জাত যোদ্ধার আত্মরক্ষার প্রবণতা। এই তিন গুণ মিলে যে কোনো অবস্থার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখার অভ্যাস গড়ে উঠেছে তার। সে জানে এই মুহূর্তে ঈশ্বর দোরাদাবু থেকে শুরু করে মহাপুরোহিত আহীন প্রত্যেকেই তার পক্ষে, কিন্তু ভাগ্যচক্রের ঘুর্ণন যেকোনো মুহূর্তে তার পট পরিবর্তন করে দিতে পারে। এই জাদুপ্রস্তর আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ, কিন্তু স্বয়ং দোরাদাবুকে রুখে দেবার ক্ষমতা রাখে এ। অতএব তার সামান্য নমুনা নিজের কাছে রাখলে ভবিষ্যতে হয়তো কখনো তা কাজে এসে যেতে পারে তার। হয়তো…
***
মাণ্ডুপ যখন জ্যোতিগৃহে তার চিন্তা ও কাজে ব্যস্ত ছিল ঠিক সেই সময়টিতেই হঠাৎ করেই শহরের কেন্দ্রে চলতে থাকা যুদ্ধের উন্মাদনা তুঙ্গে পৌঁছেছে। চতুর্দিকে ইন্দাতীরের সেনানীর রক্তবৃষ্টির মধ্যেই সেখানে সুব্রাণের মুখোমুখি শক্তিপরীক্ষায় নেমেছেন মহাপুরোহিত আহীন। এবং, বিস্মিত হচ্ছেন। নগরীতে এসে পৌঁছোবার পর যে রূপবতী ও কোমলাঙ্গী মহামাতৃকা নিজে এসে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিলেন নগরের দরজায়, তিনি যে এমন ভয়াল, সর্বগ্রাসী রূপ ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হতে পারেন তা তিনি স্বপ্নেও কল্পনা করেননি। না। শক্তিতে তিনি আহীনের সমকক্ষ নন। উচ্চতায় তাঁর থেকে অনেকটাই খাটো। অথচ যে রণকৌশলে তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন তাকে প্রথমে উপলব্ধি করতে পারেননি রণপণ্ডিত আহীন।
কোনো বর্মের আড়ালে নিজেকে লুকোননি মহামাতৃকা। আঁটো অথচ পাতলা একটি পোশাক তাঁর শরীরে। যুদ্ধের সূচনায় তা দেখে ঠোঁটে একটুকরো ব্যাঙ্গের হাসি ফুটে উঠেছিল আহীনের। অনভিজ্ঞ রমণী। সাধারণ, দৈনন্দিন পোশাকে রণক্ষেত্রে এসে সে বর্মে আচ্ছাদিত মহাযোদ্ধা আহীনকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করেছে!
তবে কিছুক্ষণ যুদ্ধ চলবার পর আহীন সন্দেহ করতে শুরু করেন, এ পোশাক মহামাতৃকার মূর্খতার নয়, নিজের রণদক্ষতার ওপর অসীম আস্থার বহিঃপ্রকাশ। আহীনের প্রতিটি তীব্র আক্রমণের মুখে প্রস্তরমূর্তির মতই দাঁড়িয়ে থেকে একেবারে শেষমুহূর্ত অবধি অপেক্ষা করেন তিনি। তারপর তার ভারী তরবারির আঘাত নেমে আসবার আগে, একেবারে শেষমুহূর্তে হালকা পায়ের নির্ভুল দোলানিতে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে তিরবেগে আহীনের থেকে বিশ হাত পরিমিত দূরত্বে গিয়ে ফের দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন তার পরবর্তী আক্রমণের। ছোটোখাটো হালকা শরীরটি তাঁর এইভাবে কখনো একক দৌড়ে, কখনো বা অনুপম ও লীলায়িত ভঙ্গীতে বেঁকেচুরে উড়ন্ত পক্ষীর মতই বাতাসে ভেসে উঠে, সরে যায় আহীনের তরবারির নাগাল থেকে। আর, সরে যাবার আগে, প্রতিবারই তাঁর তরবারির ফলা আহীনের খোলা উরুতে, জঙ্ঘায় বা বাহুমূলে রেখে যায় একটি রক্তমুখী আঘাতের চিহ্ন।
সামান্যক্ষণ এইভাবে কেটে যাবার পর আহীন খেয়াল করছিলেন, ভারী বর্ম নিয়ে ক্রমাগত সেই নিষ্ফলা দৌড় তাঁকে ক্লান্ত করে ফেলছে। তাঁর শরীরের আঘাতগুলি কোনোটা মারাত্মক নয়, কিন্তু প্রতিটি থেকেই রক্ত ঝরছে অঝোরে। তিনি টের পান এক নিষ্ঠুর অহিনকুল সংগ্রামের মতই, দুর্বলতর নকুলের কুশলী আক্রমণে ক্রমেই ক্লান্ত করে আনছে মহাবিষধর নাগরাজকে। এবং সেই আসন্ন অপমানকর পরাজয়ের অনুভূতি তাঁকে আরও উন্মাদ, আরও যুক্তিহীন প্রতিপক্ষ করে তুলছিল।
রানি সুব্রান বুঝতে পারছিলেন, আর দেরি নেই। এইবার, যেকোনো মুহূর্তে ক্লান্ত আহীনের পদস্খলন হবে। আর সেই মুহূর্তেই…
বুঝতে পারছিলেন আহীনও। তিনি নিজে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। তাঁর চারপাশে ইন্দাতীরের বাহিনীর রক্তস্রোত… এইভাবে, মঞ্জাদাহির থেকে বহুদূরে এক তুচ্ছ ও দুর্বল রমণীযোদ্ধার হাতে মঞ্জাদাহিরের মহান দোরাদাবুর মহাপুরোহিত আহীনের শেষ পরিণতি হতে চলেছে তবে? সেই সম্ভাবনার মধ্যে অদৃষ্টের এক অন্ধকার কৌতুক দেখতে পাচ্ছিলেন যেন তিনি। আর সেই হতাশা থেকে, হঠাৎ করে তাঁর কন্ঠে উঠে এল এক আকুল শেষ প্রার্থনা, “হে মহান দোরাদাবু… আপনার সেবক আহীনকে কৃপা করুন… জ্ঞানে বা অজ্ঞানে কখনও আপনার সেবায় কোনো ত্রুটি ঘটায়নি এই সেবক…”
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে, যেন তাঁর প্রার্থনার প্রত্যুত্তরেই, তাঁর মস্তিষ্কে জেগে উঠল ঈশ্বর দোরাদাবুর কণ্ঠস্বর… “পালাও আহীন। তোমার সৈন্যদলকে রণক্ষেত্র ছেড়ে, ম্হিরির সীমানার বাইরে নিষ্ক্রান্ত হবার আদেশ দাও… মনে রেখো এক সহস্র নিঃশ্বাস ফেলবার জন্য যতটুকু সময় ব্যয় হয় ততটুকু সময়ের মধ্যে এই রণক্ষেত্র ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে হবে তোমাদের। অবশিষ্ট যুদ্ধ আমি ও আমার সন্তানেরা সমাপ্ত করব এইবার।”
আদেশটা পেয়ে মুহূর্তের মধ্যে একরাশ চিন্তা বিদ্যুতবেগে ধেয়ে এল আহীনের মনে। এক অসীম কৃতজ্ঞতা… তাঁর প্রার্থনায় আসন টলে উঠেছে ঈশ্বরের। মহান দোরাদাবু তাঁর দাসদের রক্ষা করবার জন্য স্বয়ং তাঁর মন্দির ছেড়ে এসে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়েছেন…
যুদ্ধ পরিত্যাগ করে দ্রুত ছুটতে ছুটতেই শঙ্খধ্বনি করছিলেন আহীন। পশ্চাদপসরণের সঙ্কেত। সেই শব্দকে অনুসরণ করে হঠাৎ করেই যুদ্ধ ছেড়ে নগরসীমার বাইরের দিকে ছুটে চলেছে ইন্দদাতীরের সেনারা।
ঘটনাস্রোতের এহেন আকস্মিক পরিবর্তনে ম্হিরির যোদ্ধারাও একটু বিস্মিত হয়েছে। যুদ্ধের উন্মাদনায় তারা ইন্দাতীরের পলায়মান শত্রুদের অনুসরণ করবার উদ্যোগ নিচ্ছিল, কিন্তু তখনই মহামাতৃকা সুব্রালের মধুর অথচ তীক্ষ্ণ অথচ কর্তৃত্বব্যঞ্জক আদেশ ভেসে এল বাতাসে। পরাস্ত শত্রু নগর ছেড়ে পালাচ্ছে। তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে নিজেদের আরো সৈন্যক্ষয়ের কোনো প্রয়োজন নেই তাঁর। ইন্দাতীরের ওই বর্বরেরা এইবার সরাসরি ম্হিরির তরবারির স্বাদ পেয়েছে। রণপণ্ডিত সুব্রাল জানেন, এরপর ম্হিরির ওপরে দ্বিতীয়বার আক্রমণ শাণাবার আগে তারা দুবার ভাববে।
অবশ্য সে সুযোগ তিনি তাদের দেবেন না। এই যুদ্ধে ইন্দাতীরের বর্বরদের রণকৌশল তিনি নিবিড়ভাবে অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছেন। এবং বুঝতে পেরেছেন, এরা আদপে জাতযোদ্ধা নয়।
এর কারণও তিনি জানেন। তাঁর গুপ্তচররা দীর্ঘদিন ধরেই ইন্দাতীরের নগরসভ্যতার অন্দরমহলের যে সংবাদ তাঁকে এনে দিয়েছে তা থেকে একটা বিষয় তাঁর জানাই ছিল। তা হল, অন্য সভ্যতায় দিগ্বিজয়ে এরা যায়নি কখনো। এদের রাক্ষস গোলকদেবতার কল্যাণে বহিঃশত্রুর আক্রমণও এদের সইতে হয়নি বহুকাল। ফলত, এদের সেনাদল একদিকে নতুন নগরস্থাপনের জন্য বন্য ও বর্বর আদিম জনগোষ্ঠীদের নির্বিচারে হত্যা কিংবা নিরীহ প্রজাদের ওপরে কর্তৃত্ব বজায় রাখবার কাজেই চিরকাল নিয়োজিত থেকেছে। শত্রুকে নিরীহজ্ঞানে তাচ্ছিল্য করে এরা। তাকে পরাস্ত করতে সুদক্ষ রণনীতির বদলে নিতান্তই পাশবিক শক্তির ওপরে ভরসা রাখে। রণদক্ষ বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে আক্রমণ বা আত্মরক্ষা এর কোনোটিরই কোনো অভিজ্ঞতা এদের নেই।
যুদ্ধ একইসঙ্গে এক শিল্প ও বিজ্ঞান। প্রকৃত যুদ্ধের স্বাদ কখনো না পাওয়ায় এরা যুদ্ধের সেই প্রকৃত রূপকে চিনতে শেখেনি। এদের শিল্পে সঙ্গীতে ও অন্যান্য কৃষ্টিতে যুদ্ধের কোনো উল্লেখ বা ছবি মেলে না তাই।
অতএব এইবার, ম্হিরির অজেয় বাহিনী নিশ্চিন্তে এদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযান শুরু করবে। এবং আগামীকাল থেকেই শুরু হবে তার প্রস্তুতি।
একটি হালকা লাফে নিজের মহিষটির ওপরে উঠে পড়লেন সুব্রাল। তারপর তার পিঠে দাঁড়িয়ে তাঁর তীক্ষ্ণ আহ্বান ছড়িয়ে গেল তাঁর সৈনিকদের উদ্দেশ্যে। এই রণক্ষেত্রেই শত্রুবিজয় উৎসব পালন করবার জন্য তাদের ডাক দিয়েছেন মহামাতৃকা।
ম্হিরি মাতৃপূজা করে। মহামাতৃকা মনুষ্যদেহে তাদের সর্বোত্তম ঈশ্বরী। তাঁর সেই আহ্বান পেয়ে তখন যুদ্ধ ছেড়ে ম্হিরির অগণিত সৈনিক ধেয়ে আসছিল তাঁকে লক্ষ করে। আর সেই অসীম আনন্দ ও উল্লাসের মধ্যে তারা খেয়াল করেনি, আকাশে ভাসমান মেঘখণ্ডদের আড়ালে কখন রণক্ষেত্রের ওপরে একে একে উড়ে এসেছে চারটি গোলক। একলা আসেননি দোরাদাবু। তাঁর আহ্বানে নিকটোবর্তী পৈরাক, জুর্জাদাহির ও নশেরা- এই তিন ইন্দানগরীর শাসক তিন সন্তানগোলকও একত্র হয়েছে তাঁর সঙ্গে। ম্হিরির জ্যোতিগৃহের বাধা সরে যাবার পর আর এই নগরের সীমায় ঢুকে আসতে তাদের কোনো বাধা ছিল না।
সেখানে এসে উপস্থিত হবার পর, এই প্রথমবার ম্হিরির প্রকৃত পরিচয় বিষয়ে যম্পূর্ণ তথ্য আহরণের সুযোগ পেয়েছিলেন তাঁরা। তাঁদের পাথুরে শরীরের অসংখ্য অনুভাবক প্রত্যঙ্গ তন্ন তন্ন করে পর্যবেক্ষণ করে চলেছিল দানবনগরীর প্রতিটি কোণকে। এবং বিস্মিত হচ্ছিল তারা।
মানুষ বলতে এতকাল তারা ইন্দাতীরের বন্য পরজীবীদেরই জানত। দোরাদাবুর সাম্রাজ্যস্থাপনের শুরুতে এই গুহাবাসী বনচারী অর্ধপশুদের হাতে পাথরে তৈরি শিকারের অস্ত্র ছাড়া আর কোনো প্রযুক্তি ছিল না।
তারপর গোলকদেবতাদের দীর্ঘ শাসনকালে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের উন্নত করেছে। নিজেদের প্রয়োজনের যন্ত্র ও বিজ্ঞানকে নিজেরাই বিকশিত করে চলেছে একটু একটু করে।
গোলকদেবতারা গ্রহজীব। বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি এর কোনোটিই তাঁদের অধিগত নয়। নিতান্তই প্রকৃতিদত্ত ক্ষমতাটুকু তাঁদের সম্বল। আর তাই প্রকৃতির এক নিষ্ঠুর খামখেয়ালিতে একদিন মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল গ্রহজীবদের নক্ষত্রমণ্ডলব্যাপী বিপুল সভ্যতা। প্রকৃতির এই অপ্রমেয় নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলবার ক্ষমতা তাঁদের ছিল না।
অথচ, এই পরজীবীরা তাদের প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে প্রকৃতিকে বশ করতে সক্ষম। প্রকৃতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির উপায় সন্ধান তাদের রক্তর্গত। ইতিমধ্যেই তিনি দেখেছেন, ইন্দাতীরের মানুষ এই গ্রহের মাটিকে বাধ্য করেছে তাদের প্রয়োজনীয় ফসল উৎপাদনে, এই গ্রহের খামখেয়ালি আবহাওয়ার শিকার না হয়ে, তাকে প্রতিরোধ করে নিরাপদ বাসস্থান নির্মাণের প্রযুক্তিও এরা করায়ত্ত করেছে। দুর্ল্যঙ্ঘ সমুদ্রকে তুচ্ছ করে এর মধ্যেই তাদের উন্নত প্রযুক্তির বাণিজ্যতরীরা ছড়িয়ে পড়ছে পরিচিত পৃথিবীর বিভিন্ন গন্তব্যে।
তাদের অগ্রগতির সাক্ষি হতে হতে কিছুকাল ধরেই একটা ক্ষীণ আশা মাথা তুলেছিল দোরাদাবুর চেতনায়। এই পরজীবীদের মস্তিষ্কের আতঙ্ক উদ্রেককারী প্রত্যঙ্গটিকে নিয়ন্ত্রণ করবার প্রকৃতিদত্ত ক্ষমতা তাঁর আছে। ফলে চিরকাল এদের নিজের আজ্ঞাবহ করে রাখা তাঁর পক্ষে কঠিন হবে না। আর তাই, তিনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন, অধীনস্থ এই জৈবপ্রাণীরা যদি প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে এইভাবে নিজেদের প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তাহলে হয়তো দূর কোনো ভবিষ্যতে এদের নির্মিত কোনো প্রযুক্তির হাত ধরে প্রাণদায়ী জানুস বিকীরণকে কৃত্রিমভাবে জন্ম দেয়া সম্ভব হবে! আর সেইদিন… তারকাপুঞ্জ জুড়ে নতুন করে জন্ম নেবে সচেতন, শক্তিশালী গ্রহজীবের সভ্যতা…
দোরাদাবু সেইদিন নিজের প্রজাতির সৃষ্টিকর্তা হয়ে প্রকৃত ঈশ্বর হবেন। সেইদিন…
আর এইখানেই, ম্হিরির প্রাচীনতর অগ্রগামী সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হচ্ছিলেন দোরাদাবু! নিজেদের শিল্প, জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে যে দূরত্বে প্রসারিত করেছে এরা, তা ইন্দাতীরের বাসিন্দাদের নিজস্ব মেধায় অর্জন করতে আরো কয়েকটি শতাব্দি লেগে যাবে হয়তো। যেন ইন্দাতীরের কয়েক শতাব্দি ভবিষ্যতের ছবিটিই এইখানে ঘটমান বর্তমানে বদলে গিয়েছে।
একটা সুবর্ণ সুযোগ যেন ধরা পড়ছিল গোলকদেবতা দোরাদাবুর চোখে। ম্হিরির অগ্রগতিকে আত্মসাৎ করে এক মহালম্ফে নিজের পরজীবী সাম্রাজ্যের জ্ঞানভাণ্ডার ও প্রযুক্তিকে কয়েক শতাব্দি এগিয়ে দেবার সুযোগ। এক অর্থে তা তাঁর স্বপ্নের সত্য হয়ে ওঠবার জন্য প্রয়োজনীয় সময়কালকে কমিয়ে আনতে পারবে হয়তো! যা ছিল দূর ভবিষ্যতের স্বপ্ন, তা হয়তো ততটা দূর থাকবে না আর।
নতুন এই চিন্তাস্রোতটি একবার জেগে ওঠবার পর ক্রমশই শক্তিশালী হয়ে উঠছিল দোরাদাবুর মনে। রণকৌশলে পরিবর্তন আনতে হবে তাঁকে। ম্হিরিকে জনশূন্য করে দেবার পরিকল্পনাকে ত্যাগ করেছেন তিনি এইবার। ধ্বংস করা হবে কেবল তার সৈন্যদলকে। কিন্তু তার অগণিত স্রষ্টা, শিল্পী ও প্রযুক্তিবিদ দানবরা… তাদের দোরাদাবুর জীবন্ত প্রয়োজন। তাদের…
তবে প্রথমে এর সামরিক শক্তির বিনাশ প্রয়োজন। আহীনের নেতৃত্বে অবশিষ্ট সৈনিকেরা নিরাপদ দূরত্বে সরে যাবার পর এইবার তাঁরা সে-কাজের জন্য প্রস্তুত হলেন। তারপর মেঘের আড়াল থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে উৎসবরত ম্হিরির সৈন্যদলকে লক্ষ করে বাতাস কেটে ধেয়ে এল সেই চার গ্রহজীব। তাদের প্রত্যেকের কেন্দ্রীয় ম্যাগমাস্রোত থেকে উঠে আসছিল একটা সুনির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের শক্তিতরঙ্গ।
ভয়! এক আদিম অনুভূতি। প্রাণীর মস্তিষ্কে এই অনুভূতির জন্ম দেবার জন্য একটা নির্দিষ্ট এলাকা আছে। কোনো কিছুতে তার অস্তিত্ব বিপন্ন হবার সম্ভাবনা আছে এমনটি মনে হলে সেই চিন্তাস্রোত মস্তিষ্কের সে এলাকাকে উত্তেজিত করে তোলে। ফলে প্রাণীটির মনে ভয়ের উদ্রেক হয়। এ অনুভূতি মঙ্গলময়। জীবনদায়ী। কারণ এরই কল্যাণে বিপজ্জনক অবস্থা থেকে পালিয়ে গিয়ে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়। মানবমস্তিষ্কের এই এলাকাটিই দোরাদাবু ও তাঁর সন্তানগোলকের ক্ষমতার উৎস। সুনির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের শক্তিতরঙ্গের সাহায্যে তাঁরা এদের মস্তিষ্কের সেই অংশটিকে তীব্রভাবে উত্তেজিত করবার ক্ষমতা রাখেন। সে-তরঙ্গের নাগালে ধরা দেয়া যেকোনো মানুষ কারণহীন চুড়ান্ত আতঙ্কের বশবর্তী হয়। তরঙ্গের শক্তির প্রয়োজনমত হ্রাসবৃদ্ধি করে তাঁরা শিকারকে সামান্য মানসিক যন্ত্রণা থেকে শুরু করে নিষ্ঠুর মৃত্যু অবধি যেকোনো শাস্তি দিতে সক্ষম। এইবার দোরাদাবু ও তাঁর তিন সন্তানগোলক, সেই অস্ত্রের প্রয়োগে…
***
নগরসীমা থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব পার হয়ে আসবার পর ফের দোরাদাবুর আদেশ পেয়ে সৈন্যদলকে থামিয়ে দিয়েছিলেন আহীন। নতুন আদেশ এসেছে। সেই অনুযায়ী আরো একবার তাদের নিয়ে অর্ধচন্দ্রাকার একটা ব্যুহ সাজিয়ে নিলেন তিনি। আর তাঁর কোনো শঙ্কা নেই। খানিক আগেই রণক্ষেত্রে প্রবল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল যে সৈনিকদের, কাছেই দেবতার উপস্থিতির খবর পেয়ে তারাও পূর্ণ উদ্যমে ফের একটা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন দেবতার পরবর্তী আদেশের জন্য প্রতীক্ষা কেবল…
ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘখণ্ডগুলো কখন যেন পরস্পর জুড়ে গিয়ে একটা অন্ধকার চাঁদোয়া তৈরি করেছে আকাশের গায়ে। বৃষ্টি আসবে এবারে। আসুক। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর সেই বর্ষাধারা তো শান্তির প্রলেপই দেবে ম্হিরির রণক্লান্ত সৈনিকদের গায়ে। তাই, আসন্ন দুর্যোগের সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করেই তাদের বিজয়োৎসব চলছিল রণক্ষেত্র জুড়ে। মৃতদের তারা সম্মান করে। তাই সৈনিকদের একটি দল তখন পক্ষনির্বিশেষে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেয়া শরীরগুলোকে সৎকারের উদ্দেশ্যে জড়ো করছিল একপাশে। যে পতিত সেনাদের দেহে তখনও প্রাণ আছে, তাদের আর একপাশে একত্র করে বৈদ্যদের একটি দল তাদের চিকিৎসার উদ্যোগ করছিল। এদের মধ্যে ইন্দাতীরের সেনার সংখ্যাই অধিক। তাদের সুস্থ করে তুলে দাসের কাজে লাগানো যাবে। ম্হিরির প্রাচীন সভ্যতা মানবসম্পদকে অপচয় করতে চায় না।
আর ঠিক সে মুহূর্তেই সমস্ত আকাশ যেন একযোগে জেগে উঠল ঘন ঘন বিদ্যুতের শিখায়। আকাশচেরা সেই চোখ ঝলসানো আলোর ধারার দিকে মুখ তুলে তারা এক পলকের জন্য দেখেছিল, সেখানে মেঘের কোল ছেড়ে, ঝোড়ো বাতাসের ধাক্কাকে উপেক্ষা করে তাদের দিকে ধীরে ধীরে নেমে আসা চারটে গোলককে।
না। বহু ঊর্ধ্বাকাশে সর্ষের দানার মত চারটে বিন্দুকে ধীরে ধীরে নেমে আসতে দেখেও তারা ভয় পায়নি। তারা সদ্যই এই রাক্ষস গোলকদেবতাদের দাস, ইন্দাতীরের বর্বর বাহিনীকে শোচনীয় পরাজয়ের স্বাদ দিয়েছে। তারা জানে, এই গোলকদেবতাদের প্রভাবের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী অস্ত্র তাদের কাছে আছে। সে অস্ত্রের শক্তিবিচ্ছুরণের বর্ম এই গোলকদেবতাদের তাদের নগরীর কাছাকাছি নেমে আসাকে প্রতিহত করবে এই বিশ্বাসে তারা নিশ্চিন্ত ছিল।
অতএব, দৃশ্যটি চোখে পড়তে মহামাতৃকা সুব্রানের মুখে একটি হিংস্র হাসি খেলে গেল। নিছক আত্মরক্ষা আর নয়, এবারে, এরা যদি ম্হিরির আকাশপথে নগরীর কাছাকাছি আসয়ার দুঃসাহস দেখায়, তবে সেই অস্ত্রে এদের সমুচিত প্রত্যাঘাত করবেন তিনি, যাতে আর কখনো এরা ম্হিরির দিকে ঘুরে তাকাবার সাহস না পায়।
তাঁর ইঙ্গিতে তখন এক দেহরক্ষিনী ততক্ষণে একটি সীসানির্মিত পোশাক এনে তাঁকে সাজিয়ে দিচ্ছিল সেই পোশাকে। কয়েক মুহূর্ত বাদে সেই পোশাকে সজ্জিত হয়ে শিরস্ত্রাণটি মাথার ওপর টেনে নিয়ে তিনি চারপাশে ঘুরে দেখলেন একবার। তারপর সেখানে একত্র হওয়া সৈনিকদের তীক্ষ্ণ গলায় আদেশ দিলেন, “আমাকে অনুসরণ করো।”
ঝড় উঠেছিল তখন। গিরিসঙ্কটের দিক থেকে ধেয়ে এসেছে তীব্র বাতাসের ঝাপটা। তাতে সওয়ার হয়ে ছুটে চলা হিমশীতল বৃষ্টিধারা সৈনিকদের শরীরে নিষ্ঠুর কশাঘাত করে চলেছিল যেন। সেই ঝড়বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে ছুটন্ত মহিষের পিঠে সওয়ার মহামাতৃকাকে অনুসরণ করছিল তাঁর সৈনিকেরা। বজ্রপাতের কানফাটানো শব্দে তাদের জয়ধ্বনির শব্দ ঢেকে যাচ্ছিল বারে বারে।
খানিক বাদে বাদে আকাশচেরা বিদ্যুতের ঝলকে একেকবার তাদের চোখে পড়ছিল, মেঘের কোল ছেড়ে নগরীর দিকে ধেয়ে আসতে থাকা উড়ন্ত গোলকদের মৃদুমন্দ নিম্নমুখী গতিতে তখনও কোনো ছেদ পড়েনি। ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে উঠছিল তাদের আকার।
শহরের ভেতরে ঢুকে এসে, নিখুঁত সমকোণে ছড়িয়ে থাকা পথজালিকা ধরে এগোতে এগোতে একসময় জ্যোতিগৃহের চুড়া নজরে এল মহামাতৃকার। ঘনবসতি এলাকার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া সামনের পথটি ধরে বাঁদিকে বাঁক নিলেই সামান্য দূরে তার অবস্থান।
এইবার হাতের শঙ্খটি মুখে লাগিয়ে তাতে একটি সতর্কতাজ্ঞাপক ধ্বনি তুললেন সুব্রানের দেহরক্ষিনী এক যোদ্ধা। জ্যোতিগৃহের প্রহরীদের প্রস্তুত হবার সঙ্কেত। কিন্তু, তার পরেই একটা অস্বস্তি ছড়িয়ে গেল সুব্রানের মনে। মহামাতৃকার আগমনের খবর বহন করা সেই শঙ্খধ্বনির কোনো প্রত্যুত্তর জাগেনি জ্যোতিগৃহের প্রহরীদের শঙ্খে।
আকাশের দিকে চোখ তুলে দেখলেন তিনি একবার। বিদ্যুতের আলোয় সেখানে চারটি গোলক হাতের মুষ্ঠির আকার নিয়েছে ইতিমধ্যে। তাদের নেমে আসবার অলস অথচ মসৃণ গতিতে এখনও থামবার কোনো লক্ষণ ফুটে ওঠেনি।

একটা অজানা আশঙ্কায় এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠলেন সুব্রান। তারপর প্রাণপণে মহিষকে ছুটিয়ে দিলেন জ্যোতিগৃহের উদ্দেশ্যে।
জ্যোতিগৃহের সেই অস্বস্তিকর নীরবতা, অনুসরণকারী সৈনিকদেরও দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। গতি বাড়িয়ে তারাও এইবারে ধেয়ে চলেছে মহামাতৃকার মহিষকে অনুসরণ করে।
রাস্তার বাঁক পেরিয়ে জ্যোতিগৃহের দিকে চোখ ফেলে সুব্রাণের আশঙ্কাটা সত্যে বদলে গেল। সেখানে একজন প্রহরীও উপস্থিত ছিল না তখন। সেখানে পড়েছিল কেবল একটি মৃতদেহ ও শতাধিক সীসার পোশাক। জ্যোতিগৃহের দরজাটি হা হা করছে খোলা। তার ভারী পাল্লাদুটি ঝোড়ো হাওয়ায় ধাক্কা খেয়ে এক অশরীরি অট্টহাসির শব্দ তুলছিল সেখানে। যেন তা সুব্রানকে বিদ্রুপ করছে। তাঁর আত্মবিশ্বাস, রাক্ষস গোলকদেবতাদের উপযুক্ত শিক্ষা দেবার স্বপ্ন, এই সবকিছুকেই যেন নির্মমভাবে পরিহাস করে চলেছে সেই শব্দ।
খোলা দরজার সামনে মহিষ থেকে নেমে এসে জ্যোতিগৃহের ভেতরে এসে ঢুকে দাঁড়ালেন সুব্রান। তারপর কয়েক মুহূর্ত সেখানের ফাঁকা বেদিটির দিকে তাকিয়ে থেকে, অবশেষে তিনি খুলে ফেললেন মাথার শিরস্ত্রাণ। সীসার আচ্ছাদনের নিরাপত্তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে তাঁর। বেদি থেকে উধাও হয়েছে উর নগরীর উপহার, উকালানের পাঠানো, ইফ্রাত নদীকূল থেকে সংগৃহীত সেই জাদুপ্রস্তর।
এইবার সুব্রান বুঝতে পারছিলেন, কেন ওই রাক্ষস গোলকের দল অত নিশ্চিন্তে নেমে আসতে পারছে আকাশ বেয়ে ম্হিরি নগরীর দিকে!
যুদ্ধ চলাকালীন ওই গোলকরা ম্হিরির ওপরে, বহু ঊর্ধ্বাকাশে মেঘের আড়ালে একত্র হয়ে অপেক্ষা করছিল। অর্থাৎ তারা আগে থেকেই জানত, এই নগরীর বুকে তাদের নেমে আসবার পথে একমাত্র বাধাটিকে অপসারণ করবার একটা সম্ভাবনা রয়েছে। তার মানে, ম্হিরির বুকে কোনো বিশ্বাসঘাতক… কিংবা কোনো গুপ্তচর…
এর একটাই অর্তহ হয়- খানিক আগে ঘটে যাওয়া ওই যুদ্ধটি ইন্দাতীরের আক্রমণকারীদের প্রকৃত আক্রমণ ছিল না! তা ছিল, ম্হিরি নগরীর দৃষ্টিকে তার আসল বিপদের থেকে কিছুক্ষণের জন্য অন্যদিকে সরিয়ে রাখার একটি নিখুঁত পরিকল্পনা…
কেবল একটা বিষয় কিছুতেই পরিষ্কার হচ্ছিল না তাঁর কাছে। জ্যোতিগৃহের শতাধিক প্রহরী কোন আতঙ্কে বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ না করে, তাদের বর্ম খুলে ফেলে রেখে অদৃশ্য হল, সে রহস্যের কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। তবে কি সত্যিই, জনশ্রুতিতে যা বলে, ওই গোলকদেবতারা কোনো শক্তিশালী জাদুর মালিক! এমন জাদু, যা ওই জাদুপ্রস্তরের বাধাকে অবশেষ অতিক্রম করতে পেরেছে কোনো অন্ধকার কৌশলে! নাকি…
তবে সুব্রান জাত যোদ্ধা। রণক্ষেত্রে নিষ্ফলা চিন্তায় কালক্ষয় করা, কিংবা কোনো অবস্থাতেই হতোদ্যম হওয়া তাঁর চরিত্রে নেই। অতএব মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সংযত করে সীসার পরিচ্ছদ ত্যাগ করে নিজের যুদ্ধের পোশাকে ফিরে গেলেন তিনি। তারপর খোলা তরবারি হাতে জ্যোতিগৃহের বাইরে এসে নিজের সৈন্যদলের পুরোভাগে দাঁড়ালেন।
অঝোর বৃষ্টি, বজ্রপাত ও তীব্র বাতাসকে উপেক্ষা করে চারটি গোলক ততক্ষণে নেমে এসেছে জ্যোতিগৃহের সামনে। মাটি থেকে পাঁচ হাত ঊর্ধ্বে, যেন প্রকৃতির নিয়মকে তুচ্ছ করেই, নিশ্চল হয়ে ভাসছিল তারা।
হাতের অস্ত্রটি উঁচিয়ে ধরে তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন সুব্রান। হাত-পা হীন চারটি গোলক। নিঃসঙ্গ, নিরস্ত্র। ইন্দাতীরের সেনাদলের একটি মানুষও উপস্থিত নেই তাদের রক্ষা করবার জন্য। ততক্ষণে তাঁর ইঙ্গিতে, পেছনে সুশৃঙ্খলভাবে সজ্জিত ম্হিরির সৈন্যদল হাতে তুলে নিয়েছে তিরধনুক।
হাতের উঁচিয়ে ধরা তরবারিটিকে হঠাৎ নামিয়ে আনলেন সুব্রান। আক্রমণের সেই ইঙ্গিত পাবামাত্র সহস্র যোদ্ধার ধনুক থেকে ছুটে আসা তিরগুলি বৃষ্টির মত ধেয়ে যেতে শুরু করল চারটি গোলককে লক্ষ্য করে। ততক্ষণে আক্রমণের চিরাচরিত পদ্ধতি মেনে সেই তিরবৃষ্টির সুযোগ নিয়ে এক সহস্র পদাতিক খোলা তরবারি হাতে ধেয়ে যেতে শুরু করেছে গোলকগুলির উদ্দেশে।
কিন্তু তাদের তরবারি সেই গোলকদেবতাদের স্পর্শ করবার সুযোগ পেল না। হঠাৎ করেই যেন বজ্রাহত হয়ে মাঝপথে থেমে গিয়ে তারা নিজেদের মাথাগুলিকে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরে লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে। কী ঘটছে সেটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টের পেলেন সুব্রান, যদিও তার অর্থ অনুধাবন করার সাধ্য তাঁর ছিল না। এক অকারণ ভয়ঙ্কর আতঙ্কে কুঁকড়ে গিয়ে মাথাটিকে দুহাতে আঁকড়ে ধরে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে পড়তে এক মুহূর্তের জন্য একট তীব্র লজ্জার অনুভূতি ছেয়ে গিয়েছিল তাঁর মনে। তিনি… মহামাতৃকা সুব্রান… কাপুরুষের মত যুদ্ধক্ষেত্রে আতঙ্কিত হয়ে…
সুব্রান জানতেন না, এ আতঙ্ক তাঁর কোনো দুর্বলতা নয়। মস্তিষ্কের ভয় উদ্রেককারী কেন্দ্রটির কৃত্রিমভাবে উত্তেজিত হয়ে ওঠবার ফলস্বরূপ গড়ে উঠেছে তা। এই নিঃসীম ও যন্ত্রণাদয়ক আতঙ্কের ওপর তাঁর কোনো হাত নেই।
আক্রমণটার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই, সেই অসহনীয়, অকারণ ভয়ের অকল্পনীয় শক্তিশালী অনুভূতি তাঁর হৃৎপিণ্ডের গতি ও রক্তচাপকে চুড়ান্ত উচ্চতায় তুলে নিয়ে গিয়ে মস্তিষ্কের রক্তবাহী একটি শিরায় একটা ক্ষুদ্র বিস্ফোরণ ঘটালো। অসহনীয় যন্ত্রণায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সমস্ত সুখদুঃখের ঊর্ধ্বে চলে গেলেন, স্বাধীন ম্হিরির শেষ মহামাতৃকা সুব্রান। তাঁকে ঘিরে তখন একইভাবে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে ম্হিরি নগরীর সুবিখ্যাত সৈন্যবাহিনী।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে, সেই নিতান্ত একতরফা যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়ে অগণিত মৃতদেহ শুয়ে রইল জ্যোতিগৃহকে ঘিরে। একবিন্দু রক্ত ঝরেনি, ওঠেনি একটি আর্তনাদের শব্দও। ম্হিরির ঘুমন্ত সাধারণ বাসিন্দারা তাই জানতেও পেল না, সেই ঘন বৃষ্টির অন্ধকার রাতে অবশেষে শেষ হয়ে গেছে তাদের অতি প্রাচীন ও ঐতিহ্যময় সভ্যতার গৌরবময় ইতিহাস।
বহুকাল আগে, যখন তাদের পশুচারক পূর্বপুরুষরা উত্তরের গিরিসঙ্কট পার হয়ে নেমে এসে বুলানি ও মার্জাগ নামে জলধারাদুটির মধ্যবর্তী অঞ্চলে তাঁদের এই মহান সভ্যতার গোড়াপত্তন করেন, তখন ইন্দাতীরের ওই বর্বর সভ্যতার জন্মও হয়নি। তার কূলে কূলে ছড়িয়ে থাকা আদিম মানুষের দল ম্হিরি নগরীর নির্মাণ ও পরিচালনায় প্রয়োজনীয় দাসের জোগান দিত। আজ নিয়তির বিচিত্র পরিহাসে সেই ইন্দাতীরের বর্বর সভ্যতার প্রতিষ্ঠাতাদের হাতেই নিভে গেল ম্হিরির স্বাধীনতার আলো!
সেই শ্মশানভূমির ওপর কয়েক মুহূর্তে স্থির হয়ে ভেসে রইল চারটি গোলক। তাদের কাজ উপস্থিত শেষ। বহুদূর থেকে একটা কোলাহলের শব্দ ভেসে আসছিল। আস্তে আস্তে বেড়ে উঠছিল সেই শব্দের তীব্রতা। ইন্দাতীরের সেনাবাহিনী নতুন উদ্যমে ফিরে আসছে এবার এই জ্যোতিগৃহের দিকে… সেদিকে এক মুহূর্ত মনঃসংযোগ করে নিজের চিন্তাকে তাদের দিক থেকে সরিয়ে নিলেন দোরাদাবু। তাঁর ইঙ্গিতে ততক্ষণে তিন সন্তানগোলক ক্রমশ উঁচু থেকে আরও উঁচুতে উড়ে চলেছে। এবারে তাদের সঙ্গী হলেন দোরাদাবু নিজেও। আহীনকে প্রয়োজনীয় আদশগুলো জনিয়ে দিয়েছেন তিনি। বিজিত ম্হিরি নগরী নিয়ে তার কর্তব্য কী হবে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশাবলী এখন আহিনের মস্তিষ্কে গাঁথা। কাজেই এইখানে আর তাঁর… বা তাঁর সন্তানগোলকদের উপস্থিত থাকবার প্রয়োজন ফুরিয়েছে।
তখন, যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে দ্রুত এগিয়ে আসতে আসতে আহীনও দোরাদাবুর শেষতম নির্দেশটি নিয়ে ভাবছিলেন। যুদ্ধজয়ের পরে পরাজিত নগরীর লুণ্ঠন ও কিছু দৃষ্টান্তমূলক হত্যাকাণ্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্বীকৃত কৌশল। এতে বিজিতের মনোবল ভেঙে দিয়ে তার বশ্যতাকে দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব হয়। মহান দোরাদাবু লুণ্ঠনে আপত্তি জানাননি। তবে লুণ্ঠনশেষে নিয়মমাফিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তাঁর নিষেধাজ্ঞা জানিয়েছেন খানিক আগে। জানিয়ে দিয়েছেন, ম্হিরি-র কোনো জ্ঞানতপস্বী, প্রযুক্তিবিদ বা শিল্পীর হত্যাকাণ্ড ঘটলে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের জন্য আহিনের দশজন অনুচরকে মৃত্যুবরণ করতে হবে দোরাদাবুর মৃত্যু আশীর্বাদ নিয়ে।
এছাড়া আরও দুটি নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। লুণ্ঠনশেষে ম্হিরি নগরটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে, এবং তার পরে এখানকার শিল্পী ও প্রযুক্তিবিদদের জন্য একটি গ্রাম নির্মাণ করে, সেখানে কঠোর প্রহরায় তাদের পুনর্বাসন করে তবে কর্তব্য শেষ হবে আহীনের।
এহেন বিচিত্র আদেশের কোনো কারণ খুঁজে পাননি আহীন। তবে স্বয়ং ঈশ্বরের ইচ্ছা, তা সে যতই অকারণ হোক, তার পালনই আহীনের একমাত্র ধর্ম।
অতএব বিনাদ্বিধায় সেই আদেশ পালনের জন্য সসৈন্যে নগরির বসতি অঞ্চলের দিকে যাত্রা শুরু করলেন তিনি।
(ক্রমশ)
শীর্ষচিত্র- অতনু দেব।
