ধারাবাহিক উপন্যাস-সিন্ধু নদীর তীরে পর্ব ৫-পিটার বিশ্বাস-বসন্ত২০২২

সিন্ধুনদীর তীরে  প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব– তারপর…

IMG-20210913-WA0004

ধীরপ্রবাহিনী ইন্দা। এ জায়গাটা তার নিকটতম কূল থেকে ক্রোশপাঁচেক ভেতরে। মাটির কাছ থেকে সে নদী চোখে পড়ে না। এই মন্দিরদুর্গকে ঘিরে রয়েছে মাটি থেকে ছাব্বিশ হাত উঁচু পোড়ানো ইটের প্রাকার। তার ওপরে উঠে দাঁড়ালেও ইন্দার দেখা মেলে না। কিন্তু তারও ভেতরে ক্রমশ উঁচু হয়ে উঠে যাওয়া মন্দিরদুর্গের পথ ধরে আরও খানিক এগোলে দূরে মহান ইন্দার ধারা চোখে পড়ে। উত্তরের অজানা পাহাড়ি অঞ্চলের দিক থেকে অলসভাবে বয়ে এসে তা এগিয়ে চলেছে দক্ষিণের শঙ্খপুরী পেরিয়ে সমুদ্রের দিকে। নদী ছাড়িয়ে অন্যপাড়ে, দুপুরের উজ্জ্বল রোদের নীচে আবছা ধোঁয়াশায় ধিকিধিকি কাঁপে একটা দুর্গপ্রাকার।

হাঁফ ধরছিল বৈক্লন্যর। শরীরের সে তেজ আর নেই তাঁর। এতটা পথ হেঁটে এসে…

ঘুরে ঘুরে উঠে যেতে থাকা পথটার একপাশে একটু বসলেন তিনি। দূর দিগন্তের গায়ে আবছায়া দুর্গপ্রাকারটার দিকে একনজর দেখে মাথা নাড়লেন একবার। কট্টাদিজির দুর্গ। বুনোদের বসতিটাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবার পরে পুরো পাঁচ বছর সময় কেটেছিল সেই ভস্মস্তূপের বুকে ঐ দুর্গ গড়ে উঠতে।

আহা সেইসব স্বপ্নের দিন! স্মৃতিগুলো চোখে ভেসে উঠতে কুঞ্চিত মুখে একটা প্রশান্ত হাসি ছড়িয়ে গেল তাঁর। তখন আমহিরির অজেয় সৈন্যদল কট্টাদিজির বিজীত ভূমি ছেড়ে ইন্দার ধারা পার হয়ে এসে দাবানলের মত ধেয়ে চলেছে তার উর্বর পশ্চিমপাড়ের বুক জুড়ে। তার পুরোভাগে তীক্ষ্ণধার অস্ত্র হাতে সাক্ষাত মৃত্যুর মত বৈক্লন্যবন্যজাতিদের অজস্র ছোটো ছোটো বসতিকে রক্তের ধারায় ভাসিয়ে দিয়ে, তাদের লতাপাতায় তৈরি কুঁড়েগুলোকে আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়িয়ে ছাই করে দেয়ার আদেশ ছিল তাঁর প্রতিমৃত সেই অর্ধপশুদের স্তূপ তখন এই ভূমির পরিচিত দৃশ্য ছিল। সৈনিকদের মুখে তার পরিচিতি গড়ে উঠেছিল মঞ্জাদাহির এই নামে। মঞ্জাদাহির… শবের পাহাড়…

এই অর্ধপশুদের সকলকে নিঃশেষে ধ্বংস করা অবশ্য মহাপুরোহিত আহীনের আদেশ ছিল না। একেকটা বসতি জয় করবার পরে  কেবল এদের মধ্যে বৃদ্ধ ও অশক্ত জঞ্জালগুলোকে ভল্লের ফলায় শেষ করে দেয়া হত। দেহগুলো ছুঁড়ে ফেলা হত তাদেরই ঘরবাড়ির জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডেসুস্থসবল দোপেয়ে অপমনুষ্যগুলোকে লতার শেকলে বেঁধে তাদের অর্ধেককে পাঠিয়ে দেয়া হত ইন্দার অন্যপাড়ে। সেখানে একজন পুরোহিতের অধীনে তারা ইট গড়ে, পুড়িয়ে তাই দিয়ে গড়ে তুলত কট্টাদিজির দুর্গ। দ্বিতীয় দলটাকে পাঠানো হত মঞ্জাদাহিরের একেবারে পশ্চিমপ্রান্তে এই মন্দিরদুর্গ গড়বার কাজে।

পায়ের নীচে, মন্দিরদুর্গ ছাড়িয়ে জ্যামিতিক নকশায় ছড়িয়ে থাকা বিরাট শহরটার দিকে একবার চোখ ফেললেন বৈক্লন্য। কট্টাদিজির দুর্গ ও মঞ্জাদাহিরের এই মন্দিরদুর্গের নির্মাণ শেষ হয়েছে বছর পাঁচেক আগেই। কিন্তু এখনো এই দুয়ের মধ্যে দাঁড়ানো মঞ্জাদাহির নগরী সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে ওঠেনি। ইতিউতি বহু ফাঁকা এলাকায় এখনও নির্মাণকার্য চলেছে।

নির্মীয়মান শহর ও তার সীমানা পেরিয়ে ইন্দার কূল অবধি প্রসারিত কৃষি, বাগিচা ও চারণক্ষেত্রদের বুকে সূর্যের অবিরল আলোর আশীর্বাদ নেমে আসছিল। উজ্জ্বল সবুজ সেই সমুদ্রের বুকে ছোটো ছোটো গ্রামগুলি!  তাদের মধ্যে দিয়ে ইন্দার কূল থেকে মানুষের একটা স্রোত মন্দিরদুর্গের দিকে এগিয়ে আসছিল।

ইন্দার কূলে বাঁধা নৌকাটার দিকে একনজর তাকিয়ে দেখলেন বৈক্লন্য। ছাব্বিশ দাঁড়ের খোলা নৌকা। পাল নেই। অর্থাৎ দূরপাল্লার, তবে সমুদ্রগামী নয়। সম্ভবত উত্তরের কোন সভ্য জনপদ থেকে নতুন বাসিন্দার দল এল। আজকাল প্রায়শই আসে। গড়ে উঠতে থাকা এই শহর, তার বৈভব, নগরের দুপাশে এই মন্দিরদুর্গ ও কট্টাদিজি দুর্গের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা এই সবকিছুর  আকর্ষণেই আসে তারা। আসে ইন্দা বেয়ে মঞ্জাদাহিরের সঙ্গে বাণিজ্য করতে আসা বণিকদের মুখে খবর পেয়ে।

এদেরই লাঙলের ফলায় সবুজ হয়ে উঠেছে এই শহরকে ঘিরে থাকা সুবিপুল জমি। এদেরই হাতে গড়ে উঠছে পায়ের নীচে ছড়িয়ে থাকা ওই মঞ্জাদাহির নগরী। তার মৃতের স্তূপের স্মৃতি গত দশ বছরে হারিয়ে গেছে। তার বুকে জেগে উঠছে জীবন্ত এই শহর।

একটা হতাশা জেগে উঠছিল বৈক্লন্যর মুখে। সবই মাতৃকার ইচ্ছা। এই তো সেদিনের কথা! বৈক্লন্য তখনও এই কর্মযজ্ঞের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিলেন। প্রথমে কট্টাদিজি দখল। সেই কাজে সফল হবার পর এই এলাকা থেকে জংলি অর্ধমনুষ্যদের উৎখাত করবার গুরুদায়িত্বও তাঁর হাতে দিয়েছিলেন মহাপুরোহিত আহীন। সে কাজ শেষ হবার পর, নবনির্মিত মন্দিরদুর্গের গর্ভগৃহে ঈশ্বর দোরাদাবু প্রতিষ্ঠিত হলে, এখানকার নিরাপত্তা সাধনে অতন্দ্র থাকত তাঁর অধীনস্থ আমহিরির সৈন্যদল। এই মন্দিরদুর্গের প্রতিটি ইট তাঁর চেনা।

অথচ আজ! একচিলতে দুঃখের হাসি ফুটল বৈক্লন্যর মুখে। কট্টাদিজি থেকে ইন্দা পেরিয়ে মঞ্জাদাহিরের এই মন্দির দুর্গ অবধি হেঁটে আসতেই তাঁর শরীর অবসন্ন হয়ে পড়ে। আজ তিনি কট্টাদিজির নেগারামাউখু! নগরের অধিপতি! হাঃ! যেদিন আহীনের আদেশে মন্দিরদুর্গের অধিষ্ঠাতা দোরাদাবুর প্রহরার কাজ থেকে সরিয়ে তাঁকে কট্টাদিজির নেগারামাউখু করে পাঠানো হল, সেদিনই তিনি বুঝেছিলেন, প্রকৃত কাজের থেকে অবসর হয়ে গেছে তাঁর রণক্ষেত্রে শত্রুর সামনে ঝড়ের গতিতে ধেয়ে যাওয়া নয়, মহান দোরাদাবুর মন্দিরদুর্গের রক্ষণ নয়, তুচ্ছ ওই দুর্গনগরী কট্টাদিজির এক কোণে একটা সুসজ্জিত ঘরে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে এককালের মহান যোদ্ধা বৈক্লন্যকে।

স্বাধীনভাবে কাজ করবার ক্ষমতা নেই তাঁর। আসলে প্রত্যক্ষভাবে দেশ শাসণে যোগ দেন না সর্বত্যাগী পুরোহিতরা। তেমনই মহান দোরাদাবুর নির্দেশ। জনসাধারণের থেকে নির্বাচিত বৈক্লন্যের মত কিছু পুতুলের হাত দিয়ে রাজ্যশাসন করেন বিভিন্ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পুরোহিতরা। এখন, দুর্গের ভারপ্রাপ্ত পুরোহিতরা কাঁচামাটির পট্টে তাঁদের আদেশ উৎকীর্ণ করে পাঠান। তাতে কট্টাদিজির নেগারামাউখু-র চিহ্ন খোদাই করা শিলমোহরের ছাপ দিয়ে দেয়াই তাঁর একমাত্র কাজ। এমনকি তাতে কী লেখা আছে তাও তাঁর জানা থাকে না। কারণ লিপিপাঠের অধিকার পুরোহিত ভিন্ন আর কারও নেই।

প্রকৃত কাজগুলোর দায়িত্ব মহান দোরাদাবু তুলে দিয়েছেন তাঁর তরুণতর ভৃত্যদের হাতে। তরুণদের শক্তি ও বিশ্বস্ততার ওপরেই তাঁর ভরসা বেশি। আর এইখানেই সামান্য আশা জেগেছে বৈক্লন্যর মনে। এইজন্যই বহু চেষ্টায় আজ মহাপুরোহিত আহীনের সঙ্গে এই সাক্ষাতের অনুমতি আদায় করে, এতটা পথ পার হয়ে মন্দিরদুর্গে আসা তাঁর। 

হালকা হাওয়া দিচ্ছিল। কপালের ঘামের বিন্দুগুলো শুকিয়ে এসেছে এতক্ষণে। ফের একবার উঠে দাঁড়ালেন বৈক্লন্য।

ইন্দার কূলে সদ্য এসে পৌঁছানো মানুষগুলো এতক্ষণে মন্দিরদুর্গে এসে পৌঁছেছে। খানিক নীচে বিশাল জলাধারটির পাশে তাদের ভিড়। তার একপাশের সিঁড়ি বেয়ে জলে নেমে আসছে পথশ্রান্ত মানুষের সার। অন্যপাশের দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে, স্নানশেষে ভেজা শরীরে তারা হেঁটে চলেছে দোরাদাবুর গর্ভগৃহের দিকে। সেখানে গিয়ে দূর থেকে দেবদর্শন ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের পর তাদের বসবাসের অধিকার জন্মাবে মঞ্জাদাহিরে। যার যার পেশা অনুসারে স্থান মিলবে মন্দিরদুর্গ, নগরীর অথবা তাকে ঘিরে গড়ে উঠতে থাকা কৃষক ও পশুপালক সম্প্রদায়দের গ্রামে।

সেদিকে চোখ ফেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল বৈক্লন্যর বুক থেকে। আজকের সাক্ষাতকার সফল হলে হয়তো এ-দৃশ্য এরপর এ-জীবনে আর দেখতে পাবেন না তিনি।

কিন্তু পরমুহূর্তেই সেই দুঃখকে ছাপিয়ে উঠল নতুন একটুকরো আশা। মহাপুরোহিত আহীন তাঁর শৈশবের বন্ধু। কৈশোরে পা দিয়ে তাঁরা যার যার পূর্বপুরুষের পেশায় সরে গিয়েছিলেন। জনসমক্ষে হয়তো তিনি মহাপুরোহিতের পদচুম্বন করেন। তাঁর সামনে আসন গ্রহণ করেন না। সর্বশক্তিমান পুরোহিতদের তা প্রাপ্য। সেটাই প্রথা।  কিন্তু তবু, শৈশবের বন্ধুত্ব! সেই বন্ধুত্ব, এবং এতদিনের একনিষ্ঠ সেবার প্রতিদানস্বরূপ আহীন হয়তো তাঁর এই অনুরোধটুকু অস্বীকার করবেন না। আজ, বার্ধক্যের প্রান্তে এসে আমহিরির ছোট্ট বাড়িটার কথা বড়ো মনে পড়ছে তাঁর। হয়তো তা মঞ্জাদাহিরের মত বিখ্যাত নগরী নয়। কিন্তু তবু… নিজের বাড়ি তো! প্রার্থনাটি পুরণ হলে এরপর বাকি দিনগুলো সেখানেই, শান্তিতে…

মন্দিরদুর্গ ঘিরে পাক খেয়ে উঠে যাওয়া পথটা এসে শেষ হয়েছে একটা খাড়াই সিঁড়ির মুখে। আকাশমুখো সিঁড়িটা উঠে গেছে দুর্গের শীর্ষবিন্দুকে লক্ষ করে। সেখানে ছোটো একটা চাতালে একটা রত্নখচিত কাঠের আসন। আহীন নিঃশব্দে সেই আসনে বসে অপেক্ষায় ছিলেন। চাতালে উঠে এসে হাঁফ ছাড়তে ছাড়তে আহীনের এখনও দৃঢ় ও শক্তিশালী শরীরের দিকে সামান্য ঈর্ষান্বিত চোখে তাকিয়ে দেখলেন বৈক্লন্য। দোরাদাবুর বিচিত্র জাদু। কৈশোরে পা দেবার পর পুরোহিত বংশের সন্তানদের দোরাদাবুর কাছে দীক্ষা নিতে হয়। সে নাকি বড়ো যন্ত্রণার দৃশ্য। জীবনে সেই একবারই দোরাদাবুর কাছে যাবার অনুমতি মেলে কোন মানুষের। দীক্ষার প্রয়োজনে কয়েক মুহূর্তের জন্য তিনি সরিয়ে নেন তাঁকে ঘিরে রাখা আতঙ্কের অদৃশ্য জাদুপ্রাচীর।

কিশোরটি তাঁর কাছে এসে হঠাৎ করেই দু’হাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরে। তারপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে তার দুমড়েমুচড়ে উঠতে থাকা শরীরের দৃশ্য, তার যন্ত্রণার অসহনীয় চিৎকার অতিবড় সাহসীরও রক্ত জল করে দেয় নাকি। প্রায়শই দীক্ষান্তে কিশোরটি আর বেঁচে থাকে না। তার চোখমুখ দিয়ে বের হয়ে আসা রক্তে মাখামাখি দোমড়ানো শরীরটা ফেরৎ নিয়ে গিয়ে নিঃশব্দে সমাধিস্থ করা হয়। আর, যারা সেই দীক্ষা নিয়ে বেঁচে থাকে, গুজবে আছে, সেই যন্ত্রণার সময়টিতে তারা নাকি বহু আশ্চর্য দৃশ্য দেখতে পায়। মহান দোরাদাবুর উন্মুক্ত মনের শক্তি নাকি সেই পুণ্যবান পুরোহিত সন্তানকে অন্ধকার স্বর্গভূমি ও সেখানে ভাসমান গ্রহদেবতাদের জগতের ছবি দেখায়। তারপর তারা ফিরে আসে তীক্ষ্ণ মেধা, অজর শরীর ও দোরাদাবুর প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য নিয়ে। দীক্ষান্তে একজন চোদ্দ বছরের কিশোর যখন ফিরে আসে তখন সে আমূল বদলে যাওয়া একজন মানুষ। গম্ভীর, নিষ্ঠুর ও তীক্ষ্ণধী সেই পুরোহিতের সামনে বসতির বয়স্কতম মানুষ, ধনীতম বেণে কিংবা সবচেয়ে শক্তিমান যোদ্ধাও নতশির হন। 

নিঃশব্দে তাঁর দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছিলেন আহীন। এবার চোখাচোখি হতে একটু হেসে ইশারায় তাঁকে ডাক দিয়ে নিঃশব্দে নিজের পা দুটোর দিকে দেখিয়ে দিলেন।

পায়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে মুখ তুলে তাকিয়ে বৈক্লন্য বললেন, “একটা প্রার্থনা নিয়ে আজ…”

ইশারায় তাঁকে থামিয়ে দিলেন আহীন, “আমি জানি প্রিয় বন্ধু।”

“তু…তুমি…”

আহীন হাসলেন। গত দশ বছরে দশটি সন্ততিগ্রহ প্রসব করেছেন মহান দোরাদাবু। তাদের সুশাসনে ইন্দার পূর্ব ও পশ্চিমে একে একে গড়ে উঠেছে সুকুর, নুহাতা, ঘুন্দাই এহেন আরো দশটি ছোটো শহর। তাদের কেন্দ্রে গড়ে উঠতে থাকা মঞ্জাদাহির এই দশ নগরী ও তাদের ঘিরে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়া গ্রামগঞ্জকে একটি শাসনের ছত্রছায়ায় ধরে রেখেছে। আহীন শুনেছেন, সুদূর উত্তরে রাইবি নদীর তীরে আরাপা নামে এমনই আরো একটি রাজধানী শহরও গড়ে উঠছে দোরাদাবুর আরো এক সন্তানের অধীনে।

ঈশ্বর দোরাদাবু বা তাঁর সন্তানরা, ক্রমশ বেড়ে চলা এই সাম্রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন মুষ্টিমেয় বিশ্বস্ত ও অনুগত পুরোহিতের সহায়তায়। অতএব সে-কাজকে সুষ্ঠুভাবে সমাধা করবার জন্য আহীন ও তাঁর সমব্যবসায়ী পুরোহিতদের অজস্র চোখ ও কান ছড়িয়ে রাখতে হয় সর্বত্র। সদ্য গড়ে উঠতে থাকা এই সাম্রাজ্যের কোথাও একটি পাতার পতনও পুরোহিতদের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে না। কোনো সামান্যতম অপরাধ বা বিরোধীতাও কঠোরতম শাস্তি পায়

এহেন সতর্কতা অবশ্য কেবল সাম্রাজ্যের মঙ্গলের জন্যই নয়, আহীন বা অন্য পুরোহিতদের নিজেদের মঙ্গলের জন্যও বটে। কারণ তাঁদের চোখ এড়িয়ে এমন কোনো ঘটনা ঘটবার একটাই ফল- প্রথমে সেই অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড ও তা সমাধা হলে তারপর দোরাদাবুর আদেশে সংশ্লিষ্ট পুরোহিতের জনসমক্ষে আত্মহত্যা। দীর্ঘ কর্মজীবনে তেমন আত্মহত্যা একাধিকবার দেখেছেন আহীন। দোরাদাবুর অদৃশ্য অঙ্গুলীহেলনে হতভাগ্য পুরোহিত স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসে ঝাঁপ দেয় তাঁকে ঘিরে থাকা আতঙ্কের মৃত্যুবর্মের ভেতরে। সে-মৃত্যুযন্ত্রণার বীভৎসতার তুলনা নেই।

শৈশবের বন্ধুর দিকে ফের একবার ফিরে  চাইলেন আহীন। এর মনোগত ইচ্ছার খবর তিনি আগে থেকেই জেনেছেন। নাঃ। সেখানে তেমন কোন অপরাধের ছায়া নেই। দুটো ইচ্ছা নিয়ে সে এসেছে। প্রথমটি সরল। বৃদ্ধ হয়েছে সে। এখন কর্মজীবন শেষ করে নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যেতে চায়। কিন্তু দ্বিতীয় ইচ্ছাটি…

“মিত্র আহীন…”

“হ্যাঁ বৈক্লন্য। ফিরে যেতে চাও তুমি আমহিরি শহরে, তাই তো! তাতে আমার পূর্ণ সম্মতি রইল। মহান দোরাদাবুর আশীর্বাদ নিয়ে ফিরে যাও তুমি যেদিন চাও। রক্তপাত, কোলাহল ও রাজনীতি থেকে দূরে, নিজের পরিবারের কাছে শান্তির জীবন হোক তোমার এবারে।”

“অজস্র ধন্যবাদ তোমায়। কিন্তু আরো একটা মনোগত ইচ্ছা নিয়ে তোমার কাছে আসা। যাবার আগে, সারাজীবনের সেবার একটি পুরস্কার চাইব আমি। আমার একটিমাত্র সন্তান, মাণ্ডুপ। তাকে…”

হাত তুলে ইশারায় বৈক্লন্যকে থামিয়ে দিলেন আহীন। এই মূর্খ জানে না, যতই সময় পেরিয়ে যাক, যতই সে সব চিহ্ন, সব প্রমাণ মুছে দিক, কিন্তু মান্ডুপের প্রকৃত পরিচয় আহীনের অজানা নেই। শরীরে কট্টাদিজির অর্ধপশুর রক্ত বইছে তার। তার সেই পরিচয় গোপন করে, নিজের সন্তান হিসেবে তাকে জগতের সামনে তুলে ধরেছে বৈক্লন্য।

পরক্ষণেই মনটা ফের নরম হয়ে এল আহীনের। দোষ কী? জীবন ও রাষ্ট্রের বিষয়ে দোরাদাবুর যে উপদেশমালা তাতে এহেন সম্পর্ক নিষিদ্ধ নয়। স্থানীয় এই অর্ধপশুদের অনেকেই বিবাহসূত্রে এখন শহরের মানুষজনের পরিবারের সদস্য হয়ে উঠছে। সৈন্যাধক্ষের সন্তান সৈন্যাধক্ষের পদ পায়। সেটাই প্রচলিত নিয়ম। নিজের ছেলের জন্য সেই দাবিই নিয়ে এসেছে বৈক্লন্য, তা তিনি জানেন। কিন্তু, অশুদ্ধ রক্তের একজন মানুষকে দোরাদাবুর সৈন্যাধ্যক্ষের পদ দেয়া…

তাঁর গম্ভীর মুখ দেখে বৈক্লন্যর মুখে সামান্য ভয়ের ছায়া লেগেছে। সেদিকে তাকিয়ে মুখে একটু ভরসার হাসি তুলে আনলেন আহীন। পুরোহিতের জীবন বড়ো কঠোর। কিন্তু তবু হৃদয়হীন শৃঙ্খলায় এতগুলো বছর শাসনকার্য চালিয়েও শৈশবের সেই খেলার দিনগুলো তিনি ভুলে যেতে পারেননি। ইন্দার বুকে তাঁদের দুজনের সেই উদ্দাম সাঁতার, একসঙ্গে মহারণ্য পেরিয়ে পশ্চিমের বালুকাসমুদ্রের দিকে অভিযান করবার অবোধ শিশুসুলভ কল্পনা…

নিজের পরিবারের কাছে, শান্তিময় মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে এই বৃদ্ধ। কী হবে সত্য বলে একে দুঃখ দিয়ে? সমাজে মিশ্র রক্তের মানুষের যা স্থান, মঞ্জাদাহিরে এলে সেই স্থানই পাবে মাণ্ডুপ। কিন্তু সে কথা একে বলে লাভ কী?

“মিত্র, তুমি…”

আহীনের হাসিটা চওড়া হল। উঠে দাঁড়িয়ে বৈক্লন্যের ঝুঁকে পড়া কাঁধদুটো এক মুহূর্তের জন্য দুহাতে ধরে নরম গলায় বললেন, “মাণ্ডুপের বিষয়ে তোমার প্রার্থনা আমার বা মহান দোরাদাবুর অজানা নেই। ফিরে গিয়ে তাকে মঞ্জাদাহিরে পাঠাও। আমি তার দায়িত্ব নেব।”

বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটদুটি একটু একটু কাঁপছিল বৈক্লন্যর। যে চোখে একদিন যুদ্ধের আগুন জ্বলত সেই চোখই আজ বড়ো অবাধ্যতা করছে তাঁর সঙ্গে। কুঞ্চিত হাতের চেটোয় সেখান থেকে ঝরে পড়া জল মুছে নিয়ে তিনি এইবার এগিয়ে গেলেন মন্দিরচূড়ার ঠিক মাঝখানের এলাকাটার দিকে। সেখানে একটি গর্ত দিয়ে দুপুরের সূর্যের আলো সোজা নেমে গিয়ে বহু তলায় দোরাদাবুর গর্ভগৃহে গিয়ে পড়েছে। সেখানে আলোর উজ্জ্বল বৃত্তে নিজের রত্ন-সিংহাসনে অধিষ্ঠিত নিশ্চল গোলকটির উদ্দেশে একটি নমস্কার জানিয়ে, ফের একবার পাদস্পর্শ করলেন তিনি  দোরাদাবুর প্রধান পুরোহিত আহীনের। তারপর নেমে চললেন নীচের শহরের দিকে। তাঁর মন এখন ভারমুক্ত।

 

“ইস্কা…”

“উঁ!”

হাতের কাজটা করতে করতেই ইস্কা সাড়া দিল। পাশের দোকানে ডাঁই করা মেটে হাঁড়িকলসির ফাঁক থেকে মিল্লোর মুখটা এদিকে উঁকি মারছে।

বাজারের এই জায়গাটায় মণিহারি দোকানের সার। খেলনা, গয়নাগাটি, বাসনপত্র, কী নেই! 

“রোদ যে মাথার ওপরে উঠল! যাবি না? এরপর শুরু হয়ে গেলে…”

“এই যাই। হাতের কাজটা সেরে…” বলতে বলতেই ইস্কা উখো দিয়ে হাতে ধরে রাখা হাড়ের টুকরোটার মাঝখানটা সাবধানে আরো একবার ঘষে সেইখানটায় ফুঁ দিয়ে হাড়ের গুঁড়ো উড়িয়ে দিল। খরগোশের কশেরুকা। ছোটো ও ভঙুর। সাবধানে না ঘষলে চিড় ধরে যেতে পারে। আর তেমন হলে এতক্ষণের চেষ্টাটাই নষ্ট।

তার বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মধ্যে ধরে রাখা ডমরু আকারের খুদে হাড়ের টুকরোটার দিকে একনজর তাকিয়ে দেখল মিল্লো। তারপর এগিয়ে ইস্কার দোকানে ঢুকে এসে জিনিসটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “দেখি দেখি…”

ইস্কা তাড়াতাড়ি হাতটা সরিয়ে নিতে নিতে বলে উঠল, “ধরিস না… ধরিস না… ভারী পলকা তো। শেষে নষ্ট হয়ে গেলে…”

মিল্লো মুখ ভার করল। এমনিতেই ইস্কার ওপরে তার খানিক হিংসে আছে মনে মনে। সে অবশ্য আমহিরির সব মেয়েরই আছে খানিক খানিক। সেনাধ্যক্ষ বৈক্লন্যের ছেলে মাণ্ডুপ যার বন্ধু তাকে মেয়েরা খানিক হিংসা করবেই। তারপর ইস্কার পাশে এসে বসে বলে, “কেন, আমি ধরলেই বুঝি ও জিনিসের জাত যাবে? তুই ভারী খারাপ মেয়ে ইস্কা।”

ইস্কা হাসল। মিল্লো মেয়েটা ভালো। একটু মাথা গরম, তবে সরলসিধে। কাজেরও বটে খুব। এই পনেরো বছর বয়েসেই চাক ঘুরিয়ে দিব্যি হাঁড়ি বানাতে পারে। বাবা চলে যাবার পর একা হাতে দিব্যি বাজারের ভেতরে এই দোকানটা চালাচ্ছে।

নিজের নাকে আটকানো নাকফুলটার দিকে দেখিয়ে একটু নরম গলায় সে বলল, “আচ্ছা বাবা ঠিক আছে। রাগ করতে হবে না। এই যে আমারটা খুলে নিয়ে দ্যাখ বরং। কিন্তু ওগুলো ধরিস না। অনেক দূরদেশে যাবে কি না! সেখানের লোকজন ভারী খুঁতখুঁতে।”

উজ্জ্বল তারার মতো নাকফুলটা ইস্কার ধারালো মুখের মেটে রঙের চামড়ায় ভারী চমৎকার মানিয়েছে। সেদিকে একবার হাত বাড়িয়েই ফের হাতটা সরিয়ে নিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল মিল্লো, “থাকগে। ভারী চমৎকার মানিয়েছে তোকে! বের করতে গেলে যদি ভেঙেটেঙে যায়। ভারী পলকা বললি কি না! তা দূরদেশ মানে কোথা? মঞ্জাদাহির? নাকি অসুরনগরী ম্‌হিরি?”

“উঁহু। আরো দূর,” ইস্কা মাথা নাড়ল, “সৌগমপুত্র বিসারা এগুলো বানাবার বরাত দিয়েছেন। তাঁর নৌকো করে এই পুঁতি প্রথমে যাবে ইন্দা বেয়ে লুথিলা বন্দরে। সেখানে জাহাজের ব্যাপারীরা এগুলো কিনে নেবে। সেখান থেকে যাবে উর দেশে। নাকফুল আর কানফুলের জন্যে এই  হাড়ের পুঁতি সেখানকার মেয়েদের ভারী পছন্দের কি না। অনেক দাম দিয়ে কেনে। ব্যাপারীগুলো নেবার আগে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তো। একখানাও দাগ লাগা বা চির ধরা বেরোলে পুরো ঝুড়িই বাতিল।”

মিল্লোর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল ইস্কার এইসব জাহাজি গল্প সে আদৌ বিশ্বাস করেনি। চুড়িভরা ডানহাতটা  ইস্কার মুখের সামনে নেড়ে বলে, “মিথ্যেকথা বলিস না তো ইস্কা। বিসারা তোর কথা জানলেন কেমন করে? অতবড়ো বেণে। যখন বাজার দিয়ে হেঁটে যান, পোশাক আর গায়ের গয়নার জেল্লা দেখে মানুষ চমকে যায়। তাঁর কাজকারবার বড়ো বড়ো মহাজনদের সঙ্গে। সেই তিনি তোর মতো একটা …”

ইস্কা হাসল। কথাটা মিল্লো ভুল বলেনি। সোনা, হাতির দাঁত আর ঝিনুক থেকে পুঁতি গড়বার বিশাল কারখানা বিসারার। সে পুঁতির মালা, কর্ণাভরণ, নাকছাবি আমহিরি থেকে ইন্দার ধারে ধারে দশটা শহরই শুধু নয়, তার বাইরেও দানবনগরী ম্‌হিরি, মুন্দিগ্র, ইষক, এমনকি সমুদ্র পার হয়ে উর, মগন বা তেলমুনদের দেশেও রফতানি হয়। কাজেই ইস্কার মতন  ছোটোখাটো পুঁতিওয়ালির কথা বিসারার জানবার কথা নয়।

এহেন অসম্ভবটাকে সম্ভব করেছিল মাণ্ডুপ। সেনাধ্যক্ষ বৈক্লন্যের ছেলে সে। যুদ্ধ তার রক্তে। এই সতেরো বছর বয়সেই যুদ্ধশিল্পে দুর্দান্ত হয়ে উঠে উপস্থিত সে বিসারার প্রধান দেহরক্ষীর দলে কাজ পেয়েছে।  মাঝে মাঝে যখন বিসারার সঙ্গে তামার বর্মে সেজে, হাতে তীক্ষ্ণধার শূল নিয়ে সে বিসারার সঙ্গে পথ হাঁটে, সেদিকে দেখে ভারী অবাক লাগে ইস্কা-র। কদিন আগেও যার সঙ্গে ইন্দার জলে ঝাঁপাই খেলেছে, আজ সে একজন এমন বড়োসড়ো মানুষ হয়ে গেল কী করে!

তবে বড়োসড়ো মানুষ হয়ে গেলে কী হয়, ইস্কার সঙ্গে এখনো ভারী ভাব মাণ্ডুপের। ছোটোবেলায় তো বলত, “আমি যখন সেনাপতি হব, তুই তখন সেনাপতির বউ হবি ইস্কা দেখিস।”  এখন অবশ্য বড়ো হয়ে মুখে সেসব ছেলেমানুষী কথা কখনো আনে না সে।

ইস্কাও ওসব স্বপ্ন দেখে না। মাণ্ডুপকে তার ভালো লাগে তা ঠিক। কিন্তু, সে হল বেণের ঘরের সামান্য পুঁতিওয়ালি। যোদ্ধাবংশের ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হলে লোকে বলবে কি? মাণ্ডুপের বাবা মঞ্জাদাহিরের প্রধান পুরোহিতের ডানহাত। একদিন বাপের পদ তো ও-ই পাবে। কতো বড়ো বড়ো যোদ্ধা বাড়ির মেয়ে তাই মাণ্ডুপের  গলায় মালা দেবার জন্যে বসে আছে! তবে সে যাই হোক, মাণ্ডুপ এখনো ইস্কার ভালো বন্ধু। সুযোগ পেলেই কীসে তার একটু ভালো হয় সে খেয়ালও রাখে। যেমন এই পুঁতি। ইস্কা বেচারা মাটি, পাথরের পুঁতি বানানোই শিখেছিল ছোটোবেলা থেকে। সেই নিয়েই দোকান চালাত। সাধারণ মানুষের সাজগোজের জিনিস। কতটুকুই বা তার দাম! তা একদিন মাণ্ডুপ খুদে একটা থলেতে করে ক’টা খরগোশের হাড় নিয়ে ইস্কার দোকানে এল। বলে ওর থেকে নাকি পুঁতি হয়। দেখে তো ইস্কা হেসেই বাঁচে না। সে হল দশ পুরুষের পুঁতিওয়ালি। তাকে কিনা তলোয়ারবাজ ছোকরা এসে পুঁতির কথা শেখায়? সে মুখ মটকে বলেছিল, “তোর যেমন তলোয়ার চালানো বুদ্ধি! ওরে বুদ্ধু, ঐ হাড় দিয়ে পুঁতি বানাতে গেলে ছুরির ঘায়ে মটমট ভেঙেচূরে একশা  হবে তা-ও বুঝিস না?”

শুনে মাণ্ডুপ মুচকি হেসে ইস্কার উখোটা টেনে নিয়েছিল কাছে। আর তারপর ইস্কা অবাক হয়ে দেখেছিল, যে হাতের তলোয়ারের কোপে বর্ম কেটে দু-ফাঁক হয়ে যায়, সেই হাতই কী আশ্চর্য পালকের মত ছোঁয়ায় উখো ঘষে ঘষে ওই ছোট্ট, পলকা হাড়ের টুকরো থেকে ডমরুর আকারের একটা পুঁতি বের করে আনল!

অবাক হয়ে সে জিজ্ঞাসা করেছিল, “হ্যাঁ রে মাণ্ডুপ, তুই এ বিদ্যে…”

জবাবে মাণ্ডুপ একটু উদাস হয়ে বলেছিল, “বোধায় কখনো কোথাও দেখেছি, বুঝলি? হয়তো অনেক ছোটোবেলায়। ছায়া ছায়া মনে পড়ে। হাতে উখো ধরতেই মনে হল, কী করতে হবে আমি জানি!”

এরপর ব্যাপারটা তাকে ভেঙে বলেছিল মাণ্ডুপ। বিসারার সঙ্গে কদিন আগে লুথিলা বন্দরে যেতে হয়েছিল তাকে, পণ্যের নৌকোর পাহারাদার হয়ে। সেখানে উর নগরীর বেণেরা বিসারাকে এই হাড়ের নাকছাবির বিষয়ে প্রশ্ন করতে  বিসারা তাদের জানায়, এ জিনিস তার কারখানায় বানানো হয় নাএমন সুক্ষ্ম কাজ করবার মত শিল্পী নাকি নেই আমহিরি নগরে। শুনে বেণেরা মাথা নেড়ে বলেছিল, ও জিনিস উর-এর মেয়েমহলে নাকি ভারী জনপ্রিয়। আর খরগোশের কশেরুকা থেকে বানানো হলে তো সে-জিনিস সোনার দামে বিকোয়। সেই শুনেই মাণ্ডুপের মাথায় এই মতলব এসেছে। আমহিরি ফিরে, জঙ্গলে গিয়ে একটা খরগোশ মেরেছে সে প্রথমে।  তারপর তার কশেরুকার হাড় পরিষ্কার করে নিয়ে ইস্কার কাছে এসেছে সিধে। চাইলে সে ইস্কাকে কায়দাটা শিখিয়েও দিতে পারে।

ইস্কা শুনে হতাশভাবে মাথা নেড়েছিল। খরগোশের হাড়ের অত জোগান সে পাবে কোথা? শিকারীদের বললে তারা জোগাড় করে এনে দেবে হয়তো, কিন্তু তার যা দাম চাইবে সে দেবার মত সামর্থ্য নেই তার বাড়ির।

শুনে মাণ্ডুপ তার আসল মতলবটা ভেঙে বলেছিল। বনেজঙ্গলে ঘুরে ফাঁদ পেতে খরগোশ শিকারে সে সিদ্ধহস্ত। কাঁচামাল জোগাড় করে আনবার ভার তার। বিসারাকে বলে পুঁতির চালানের বন্দোবস্তও সে করে দেবে। তবে তাতে লাভ যা হবে তার চার ভাগের তিন ভাগ হিস্যা মাণ্ডুপের।

ইস্কা একটু অবাকই হয়েছিল প্রস্তাবটা শুনে। একজন যোদ্ধার ছেলের মাথায় এত সুক্ষ্ম ব্যাবসাবুদ্ধি যে হতে পারে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। মাণ্ডুপের হিসেবমতো সে পুঁতির দাম যা দেবেন বিসারা তার চার ভাগের একভাগও যথেষ্ট হবে তার মত মেয়ের জন্য। একগাল হেসে সে বলেছিল, “তুই কেন বেণের ছেলে হয়ে জন্মালি না মাণ্ডুপ! এমন যার ব্যাবসাবুদ্ধি…”

কথাটার মধ্যে একটা অন্য চাপা দুঃখও মিশে ছিল হয়তো, তবে ইস্কা তা বাইরে প্রকাশ পেতে দেয়নি। সেই থেকে এই কাজে নেমেছে সেএখন আর মাটি বা পাথরের পুঁতি সে বানায় না মোটে। মাসে দুবার দুই ঝুড়ি ওই হাড়ের নাকছাবি পুঁতির চালান পাঠিয়ে ঘরে যা আসে তাতে গত এক বছরে তাদের অনেক উন্নতি হয়েছে। শহরের একটেরেতে গরিব মানুষদের গণগৃহের একটা ছোটো ঘরে কোনোমতে মাথা গুঁজে থাকত তারা। কিছুদিন হল, সে-ঘর ছেড়ে বাজারের কাছে একটা ছোটো পাথরের বাড়িতে উঠে এসেছে সে তার মা’কে নিয়ে। সে বাড়ির ছাদে শল্লিকা কাঠের পুরু ছাউনি। ইস্কার খুব শখ বাড়িতে এবারে একটা ছোটো স্নানাগার বানাবে সে। ইন্দায় স্নান করতে যেতে তার মন চায় না আর। বড়ো ভিড় সেই স্নানের ঘাটে। রোজগার যা হচ্ছে তাতে সে শখও পুরতে দেরি হবে না বলে মনে হয়।

“কী রে? আসল কথাটা জিজ্ঞেস করতেই মুখ যে বন্ধ হয়ে গেল তোর? বললি না বিসারা কী করে তোর কথা…”

মিল্লোর বাক্যটা অবশ্য পুরো শেষ হতে পারল না। কারণ তার আগেই বাজারের একপাশে ইন্দার ধার থেকে শিঙার শব্দ ভেসে এসেছে।

শব্দটা শুনেই মিল্লোর মাথা থেকে প্রশ্নটশ্ন সব উবে গেল এক নিমেষে। বলে, “ওই রে। লড়াই শুরু হয়ে গেল যে! আমি চললাম। তুই এলে আয়, নয়তো…”

ইস্কা সতৃষ্ণ নয়নে পাশে রাখা ছোটো ছোটো হাড়ের স্তূপটার দিকে দেখে নিল একবার। কালকের মধ্যে কাজটা শেষ করে না দিতে পারলে এযাত্রা চালান যাবে না। মাণ্ডুপ বলে গেছে আগামীকাল সন্ধ্যায় ফের তাদের নৌকা ভাসবে লুথালির উদ্দেশে। একটু বাদে মাথা নেড়ে সে বলল, “তুই ঘুরে আয় বরং মিল্লো। এসে আমায় বলিস কেমন লড়াই হল। কে কে লড়ল।”

মিল্লো যাবার জন্য পা বাড়িয়েছিল, কিন্তু কথাটা কানে যেতে দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ। তার মুখে দুষ্টুমিভরা হাসির একটা ঝলক ফুটে উঠেছে। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “ও হো তুই জানিস না বুঝি? নগরে মুন্দিগ্র দেশের এক যোদ্ধা এসেছে যে। দৈমিত্রি না কী যেন নাম। সোনার মত চুলদাড়ি। পাহাড়ের মত চেহারা। সে দেশে দেশে লড়াই করে খায়। স্থলপথে মঞ্জাদাহির হয়ে পরশুদিন এসে আমহিরি পৌঁছে লড়াই দেবার হাঁক দিয়েছিল, তোর মাণ্ডুপ সে হাঁক ধরেছে তো!  সবাই  ঐ দৈমিত্রির নামে বাজি ধরছে। মাণ্ডুপ তো ওর কাছে চোখের পলক না ফেলতেই…”

বলতে বলতে মিল্লো প্রায় নাচতে নাচতে ছুটে বেরিয়ে গেল তার দোকান থেকে।

ভেতরে একলা দাঁড়িয়ে ইস্কার মুখটা শক্ত হয়ে উঠছিল। চোখদুটোয় চাপা আগুন জ্বলছে যেন। ভীষণ… ভীষণ রাগ হচ্ছিল তার মাণ্ডুপের ওপর। মুন্দিগ্রার সাদা চামড়া লোকগুলোর দানবের মত চেহারা। হাতের কুড়ুল তো নয় যেন রাক্ষসের খাঁড়া। এমন একটা লোকের লড়াইয়ের হাঁক ধরতে গেল কেন মাণ্ডুপ? কেন সে তাকে আগে একবার বলল না? বললে পরে সে তাকে মানা করবে সেইজন্য? কিন্তু সে মানা করবারই বা কে? শুধু একবার যদি তাকে সে আগে জানাত…

একটা ভীষণ অবুঝ রাগ তার ভেতরটায় আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল যেন। সে জানে এর কোন যুক্তি নেই। সে  জানে মাণ্ডুপ যুদ্ধব্যবসায়ী। এই লড়াই তার জীবিকার অংশ। সে জানে, এই তলোয়ারের প্রতিযোগিতায় কেউ কেউ আহত হয় বটে কিন্তু তা মৃত্যু অবধি গড়ায় না। পুরোহিতের নির্দেশে আকস্মিক মৃত্যু আটকাবার জন্য মন্দিরের সেনারাও মোতায়েন থাকে এমন লড়াইয়ের জায়গায়। মানুষজন আনন্দ করে দেখতে আসে। জয় পরাজয় নিয়ে বাজি লড়া হয়।

কিন্তু তবু, সব ছাপিয়ে একটা অহেতুক ভয় জড়িয়ে আসছিল তাকে। আর সেইসঙ্গে একটা তীব্র রাগ। কেন তাকে মাণ্ডুপের লড়াইয়ের খবর মিল্লোর কাছ থেকে শুনতে হল। কেন…

হাত ধরা হাড়ের টুকরোটাকে ফের পাশের ঝুড়িতে নামিয়ে রেখে দিল ইস্কা। তারপর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে দোকানঘর ছেড়ে বের হয়ে এল বাইরে। পেছনে তার দোকানের দরজা হা হা করে খোলা পড়ে রইল। ওর ভেতরে রফতানির বহুমূল্য পুঁতির ঝুড়ি পড়ে আছে। থাকগে। তাকে এখন লড়াইয়ের জায়গায় যেতে হবে। যদি… যদি মাণ্ডুপের কিছু হয়ে যায়! হেই মাতৃকা। হেই মন্দিরের অধিষ্ঠাতা দোরাদাবুর সন্তানদেবতা। তোমরা মাণ্ডুপকে ভালো রেখো… তোমরা…

***

ইন্দার তীরে শহরের মানুষজন ভেঙে পড়েছে আজ দুপুরে। লড়াইয়ের এই আসরগুলো এখানে খুবই জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। এখন হেমন্ত। নগরকে ঘিরে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে কৃষিক্ষেত্রগুলো খাঁ খাঁ করছে। আমহিরি নগরটি ছোটো হলেও তাকে ঘিরে কৃষিক্ষেত্রের বিপুল বিস্তার। নগরের বাসিন্দাদের সারা বছরের খাবারের জন্য সেখানে উৎপন্ন গম ও যবের সম্ভারের সামান্য অংশেই খরচ হয়।

ফলে বছরের এই সময় আমহিরির বাজারে সেই বিপুল উদ্বৃত্ত  শস্যের বাজার বসে। উত্তর ও দক্ষিণের একাধিক নগর থেকে ব্যাপারীদের মালবাহী নৌকা এসে সেই সোনালি ফসলের সম্ভার বয়ে নিয়ে যায় আমহিরি থেকে। বিনিময়ে চাষীদের হাতে দিয়ে যায় ঝুলি ভরা তামা, ব্রোঞ্জ ও স্বর্ণপিণ্ডের স্তূপ।

গ্রামাঞ্চল থেকে ফসল নিয়ে বিক্রয়ের জন্য আসা কৃষকরাই তাই এই সময়ে আমহিরির বাজারের প্রধান আকর্ষণ। অলঙ্কার, রংবেরঙের বস্ত্র, পোড়ামাটি ও গজদন্তের তৈরি খেলনা, বিভিন্ন শ্রেণীর পুঁতির সম্ভার নিয়ে ব্যাপারীরা এই সময় ভিড় করে এই বাজারে। পাশাপাশি বিভিন্ন সুখাদ্য ও যবের মদের দোকানিরাও রোজগারের আশায় পসরা সাজিয়ে বসে। ধাতব কবচ, বন্য জড়িবুটি নিয়ে নিরাময়কারীদের ব্যাবসা জমজমাট হয়। এমনকি সুদূর দক্ষিণের সমুদ্রতীরবর্তী শঙ্খপুর বসতি থেকে আনা জাদুশক্তিযুক্ত শঙ্খবলয়ও থাকে তাদের পসরায়। এ ছাড়াও বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে জড়ো হওয়া জাদুকর, শস্ত্রজীবি, নর্তক নর্তকীরা যার যার দক্ষতা প্রদর্শন করে খোলা আকাশের নীচে।  আসে ভবঘুরে, মন্ত্রজীবী, ঠগের দলও। আর, এই সমস্ত মানুষজনেরই লক্ষ হয় কৃষকদের সদ্য রোজগার করা ধাতুখণ্ডের বিপুল সম্পদ।

একসময় এক পক্ষকালের এই উৎসব শহরের মানুষের পক্ষে ভয়ের কারণও ছিল। সম্পদের লোভে নিরীহ কৃষকের সঙ্গে তঞ্চকতা, নকল ধাতুখণ্ডের বিনিময়ে ফসল কিনে নিয়ে যাওয়া, এমনকি হত্যার মত ঘটনাও ঘটত। তবে ইদানিং কিছুকাল হল সে নৈরাজ্যের সমাপ্তি ঘটেছে। মঞ্জাদাহিরের নির্দেশে স্থানীয় মন্দিরদুর্গের প্রহরী সেনার একটা দলকে কাজে লাগানো হচ্ছে এই বাজারের সুরক্ষায়। তারা মেলা ঘিরে সদা সতর্ক থাকে।

পাশাপাশি, বিনিময়ের জন্য যে ধাতুখণ্ডগুলো ব্যবহার হয় তাদের ওজন নির্দিষ্ট করে তাতে স্থানীয় মন্দিরের চিহ্ন খোদাই করবার ব্যবস্থা হয়েছে। সেই খণ্ডগুলি বাদে বিনিময়ের জন্য অন্য কোন ধাতুখণ্ড ব্যবহারও নিষিদ্ধ হয়েছে।

তবে এই মেলার প্রধান আকর্ষণ হল মুখোমুখি যুদ্ধের প্রদর্শনী। দূর দূরান্ত থেকে আসা শস্ত্রজীবিদের দ্বন্দ্বযুদ্ধে মেলা সরগরম হয়ে ওঠে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর বাজি ধরায় বহু ধাতুখণ্ড নিয়োজিত হয়। তবে এখন অবধি মুন্দিগ্র প্রদেশের কোন স্বর্ণকেশ বিশালদেহ অসুর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার আসরে এসে উপস্থিত হয়নি। ফলে আজকের লড়াই নিয়ে মেলায় আসা জনতার আগ্রহ তুঙ্গে। বাজির দর যুদ্ধ শুরু আগেই আকাশ ছুঁয়েছে।

পেটানো মাটির যুদ্ধভূমিটি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে  ত্রিশ হাত পরিমিত। তার একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে মাণ্ডুপ যুদ্ধভূমির মাঝখানটার দিকে সতর্ক নজর রেখে চলেছিল। নিজে সে যথেষ্টই লম্বাচওড়া হয়ে উঠছে এখন। কিন্তু এই মুহূর্তে যুদ্ধভূমির কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে যে মানুষটা তার বিরাট কুঠার নিয়ে আস্ফালন করছে তার পাশে আকারে সে নিতান্তই শিশু।

যুদ্ধের আগে এই আস্ফালন পেশাদার দ্বন্দ্বযোদ্ধার সুপরিচিত কৌশল। এর ফলে আস্ফালনকারীর পক্ষে বাজির দর চড়ে। তাতে, যুদ্ধে জয় পেলে তার ভাগের অর্থের পরিমাণও বেড়ে যায়। তাছাড়া এই কৌশলে প্রতিদ্বন্দ্বীর মনে খানিক ভয়ও ঢুকিয়ে দেয়া যায় যুদ্ধের আগেই।

অস্ত্রশিক্ষক মেরক-এর কথাগুলো কানে ভেসে উঠছিল মাণ্ডুপের। এই ধরণের মুখোমুখি যুদ্ধে ঐ ভয়টাই যোদ্ধার প্রধান শত্রু। অথচ তাকে এড়ানো গেলে এই আস্ফালনগুলো থেকে অতি সহজেই বুঝে নেয়া যায় শত্রুর শক্তি বা  দুর্বলতাদের। নিজের আস্ফালনের মধ্যে দিয়েই তার অগ্রিম খবর সে জানিয়ে দেয় প্রতিপক্ষকে।

বুকের মধ্যে জেগে উঠতে থাকা গুরগুরানি সামলে খুব মনোযোগ দিয়ে মানুষটার প্রতিটি নড়াচড়াকে মেপে চলেছিল মাণ্ডুপ। এবং যত দেখছিল, ততই  একটা হতাশা এসে ছেয়ে ফেলছিল তাকে। এত নিখুঁত কুঠারচালনা, আঘাতের এত ভয়ঙ্কর শক্তি ও  নির্ভুলতা, ক্ষিপ্র পদচারণা… কোথাও সামান্যতম কোন দুর্বলতার চিহ্নও নেই এর। কুঠারচালনায় মাণ্ডুপের শেখা প্রতিটি আঘাতভঙ্গীতেই এ সিদ্ধহস্ত, এবং সেইসঙ্গে মাটি ছেড়ে বাতাসে ভেসে উঠে এমন কিছু আঘাত সে করে দেখাচ্ছে যার কৌশল, বা যা থেকে আত্মরক্ষণের উপায় মাণ্ডুপ শেখেনি কখনো। এইবার সে অনুভব করতে পারছিল, কেন সম্মুখযুদ্ধে মুন্দিগ্রর স্বর্ণকেশ যোদ্ধাদের অপরাজেয় বলা হয়।

দৃশ্যটা আর একজনেরও তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণকে এড়িয়ে যায়নি। সে ইস্কা। ভিড় সরিয়ে যুদ্ধভূমির একেবারে কাছে এসে পৌঁছেছে সে খানিক আগে। মাণ্ডুপের ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে গোটা দৃশ্যটার দিকে সতর্ক নজর রাখছিল সে। সেই শৈশব থেকেই মাণ্ডুপের অস্ত্রচর্চার সময় সে তার কাছাকাছি থেকেছে। কখনো কখনো ক্রীড়াচ্ছলে মাণ্ডুপের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে হাতে তুলে নিয়েছে কুঠারও। এ-বিদ্যার প্রাথমিক তত্ত্বগুলো অতএব তার অপরিচিত নয়। মুন্দিগ্রর এই শ্বেত দানবের অস্ত্রচালনার  দক্ষতার আন্দাজ করে নিতে কোন অসুবিধা হচ্ছিল না ইস্কারও। ভ্রূদুটি কুঞ্চিত করে সে চিন্তা করে। মাণ্ডুপ বড়ো সরল মানুষ। কুঠারের বিরুদ্ধে আরেকটি কুঠার ভিন্ন অন্য কোনো কৌশলের কথা তার সরল যোদ্ধামস্তিষ্কে আসবে না। এবং সেক্ষেত্রে ঐ দানবের বিরুদ্ধে এর পরাজয় সুনিশ্চিত।

তার ক্রুদ্ধ মুখে একটুকরো হাসি খেলে যাচ্ছিল। বেশ হয়েছে। যেমন তাকে না জানিয়ে যুদ্ধ করতে আসা, এবার তার ফল পাক ওই দুর্বিনীত মাণ্ডুপ।

কিন্তু পরক্ষণেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল তার। যুদ্ধক্ষেত্রে রক্তাক্ত মাণ্ডুপ… তার মাণ্ডুপ… তার ওপরে দুপাশে দুটি পা রেখে ওই স্বর্ণকেশ দানব… হাতে রক্তাক্ত কুঠার…

মাথা নীচু করে চিন্তা করে সে। যুদ্ধ শুরুর দেরি নেই আর। যুদ্ধপ্রাঙ্গণ ঘিরে ঝড়ের মত গর্জন তুলতে থাকা জনতার ভিড় এইবার দুপাশে সরে গিয়ে পথ করে দিচ্ছিল। সেখান দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে আসছেন মন্দিরসেনাদের অধিনায়ক। এ-ধরনের দ্বন্দ্বযুদ্ধের পরিচালনভার তাঁর হাতেই থাকে… আর সময় নেই বেশি…

ভাবতে ভাবতেই কিছু একটা চিন্তা মাথায় এসে হঠাৎ চোখদুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার। পথ আছে একটা… একটা সম্ভাবনা…

হঠাৎ তার হিলহিলে শরীরটা পেছন ফিরে ভিড়ের ফাঁক দিয়ে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল। হ্যাঁ, একমাত্র এই রাস্তাতেই ওই অসুরকে…

মন্দিরসেনার অধিনায়ক মাঠের ঠিক মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছেন। একপাশে মুন্দিগ্রর বিশালদেহী যোদ্ধা ও অন্যপাশে মাণ্ডুপের দিকে চোখ ফেলে তাঁর মুখে উদ্বগের একটা রেখা ফুটে উঠল। উদ্বেগ একাধিক কারণে। এ যুদ্ধের ফলাফল কী হতে চলেছে তা অনুমান করবার মত রণদক্ষতা তাঁর আছে। মাণ্ডুপ সৈন্যাধক্ষ বৈক্লন্যর পুত্র। বৈক্লন্য মঞ্জাদাহিরের প্রধান পুরোহিত আহীনের ঘনিষ্ট। সে এ যুদ্ধে আহত হলে তাতে বৈক্লন্য অসন্তুষ্ট হতে পারেন। তাছাড়া, মুন্দিগ্র শত্রুদেশ। সরাসরি তার সঙ্গে ইন্দাতীরের সাম্রাজ্যের কোনো সঙ্ঘাত হয়নি তা ঠিক। বাণিজ্যিক সম্বন্ধও রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বহুবারই মুন্দিগ্র থেকে আসা চরদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে আমহিরি, বিষক অথবা মঞ্জাদাহির নগরীতে। এর বিপরীতে মঞ্জাদাহিরের একাধিক চরও একইভাবে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছে মুন্দিগ্রের সৈন্যাবাসে। এহেন শত্রুদেশের একজন যোদ্ধার হাতে মাণ্ডুপের পরাজয় ঘটলে তাতে আমহিরির গায়ে কলঙ্কের টিকা লাগবে। মহান দোরাদাবু বা আমহিরির দায়িত্বে থাকা তাঁর সন্তানদেবতা যদি সেই কলঙ্কের জন্য কাউকে শাস্তি দেবার কথা ভাবেন…

তবে এই মুহূর্তে সে নিয়ে দুশ্চিন্তা করে কোন লাভ ছিল না। উপযুক্ত কারণ ছাড়া এ-দ্বন্দ্ব থামিয়ে দিলে তাতে আমহিরির সম্মান কমবে বই বাড়বে না। তাছাড়া দ্বন্দ্বযুদ্ধে পৌরহিত্য করার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি কাজ পড়ে আছে তাঁর। সুদূর দক্ষিণের কলহারুপ্রদেশ থেকে আমহিরির মন্দিরসেনা সবে অভিযান সেরে ফিরেছে। সেখানকার ভূগর্ভে সোনা মেলে। তারই সন্ধানে গিয়ে সেনারা চূড়ান্ত সফল। তবে সোনার পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক অর্ধমনুষ্যকেও বন্দি করে সঙ্গে এনেছে তারা। মানুষগুলি কর্মঠ এবং ভূগর্ভের গভীরে কাজ করতে দক্ষ। সাম্রাজ্যপ্রসারের অভিযান বা পশ্চিমের বালুকাপ্রদেশবাসী হিংস্র আদিবাসীদের আক্রমণ প্রতিরোধের যুদ্ধে যেসব দাস বন্দি হয় তাদের চেয়ে এদের বিক্রয় করে মন্দিরের কোষে অনেক বেশি সম্পদ আসবে। সেনাধিনায়কের ম্ন অতএব সেদিকেই পড়ে ছিল। অতএব বৃথা চিন্তায় কালক্ষয় না করে এইবার তিনি নীচু গলায় যুদ্ধের নিয়মকানুনগুলো আওড়াতে শুরু করলেন।

জনতার গর্জন থেমে এসেছে, দমচাপা নিস্তব্ধতার মধ্যে অধিনায়কের গলাটা একটানা ভ্রমরের গুঞ্জনের মত শব্দ তুলছিল। সেদিকে কান রেখে হাতের কুঠারে ভর করে দাঁড়িয়েছিল মাণ্ডুপ, তখন হঠাৎ পেছন থেকে একটা পরিচিত চাপা গলার শব্দে তার চমক ভাঙল। তার নাম ধরে ডেকে উঠেছে কেউ পেছন থেকে।

ইস্কার গলা! ইস্কা… এইখানে… যুদ্ধ শুরুর মুখে…

ঘুরে দাঁড়িয়ে ভ্রূকূটি করে মাণ্ডুপ বলল, “ইস্কা, তুই… এখন এভাবে আমার মনঃসংযোগ…”

“থাম তুই…” উত্তেজনায় ঠোঁটগুলো কাঁপছিল ইস্কার। অনেকটা পথ ছুটে এসে মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। হেমন্তের মোলায়েম আবহাওয়াতেও তার কপালে, গালে ঘামের ফোঁটা, “এইটা নে…”

বলতে বলতেই হাত বাড়িয়ে সে মাণ্ডুপের হাতে একটা ছোটো জিনিস গুঁজে দিল। জিনিসটার দিকে একনজর তাকিয়ে দেখে ভ্রূ দুটো কূঁচকে উঠেছিল মাণ্ডুপের। ইতস্তত করে বলেছিল, “এ…এটা…”

আর তার পরেই চোখদুটো হাসি হাসি হয়ে উঠল তার। ইস্কার এনে দেয়া এই নতুন বস্তুটা চোখে পড়তেই তার তার যোদ্ধামস্তিষ্ক এ-যুদ্ধে এর গুরুত্বটাকে বুঝে নিয়েছে। এহেন সহজ বুদ্ধিটা কেন যে তার নিজের মাথায় আসেনি আগে সেটা ভেবে নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছিল মাণ্ডুপের।

“তুই…”

“ইস্কা হাসল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “আর কথা নয়। এবারে যা, দৈত্যটার চোখ কানা না করে যদি ফিরেছিস…”

হাত বাড়িয়ে তার চুলগুলো একটু নেড়ে দিল মাণ্ডুপ। এইবারে ফের নতুন করে আত্মবিশ্বাসটা ফিরে এসেছে তার। এ যন্ত্রে সেই ছোটোবেলা থেকেই তার দক্ষতা গোটা আমহিরিতেই সুপরিচিত।

***

যুদ্ধ শুরুর শিঙা বেজে উঠতেই বাঁহাতে চামড়ার ঢালটিকে নিজের বুকের কাছে ঘিরে ধরল দৈমিত্রি। তারপর ডানহাতের কুঠার উঁচিয়ে ধরে অবলীলায় বাতাসে ভেসে উঠল তার শরীর। পাশবিক শক্তি ও দক্ষতার মিশেলে ওই তুচ্ছ কিশোরকে পরাস্ত করে এ যুদ্ধকে দ্রুত শেষ করে দেয়াই তার লক্ষ্য। তার উড়ন্ত স্বর্ণাভ চুলে সূর্যের আলো ঝিলিক দিচ্ছিল। ক্রূঢ় একটা মুখকে ঘিরে যেন ফণা তুলেছে একদল বিষাক্ত সাপ।

নিজের জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ চোখে লাফটাকে মাপছিল মাণ্ডুপ। ধেয়ে আসা শত্রুকে নিজের পরিকল্পনা বুঝতে দেয়া উচিত হবে না। উড়ন্ত অবস্থায় তার শরীরের প্রতিটা অঙ্গের অবস্থানকে মনে গেঁথে নিচ্ছিল সে। একবারে হবে না। আরো দু’একটা আক্রমণে আসতে দিতে হবে একে, সঠিক সময় ও আঘাতবিন্দুটাকে বুঝে নেবার জন্য। একবারের বেশি প্রত্যাঘাতের সুযোগ সে পাবে না এর কাছে।

পায়ের নীচে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে একটু করুণাই হচ্ছিল দৈমিত্রের। শিকারীর অস্ত্রের সামনে হতভম্ব বন্য হরিণের মতই আতঙ্কে স্থির হয়ে গেছে এ। আহা অনভিজ্ঞ বালক!

dharabahiksindhu80

কিন্তু হঠাৎ যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল ছেলেটার শরীরে। একেবারে শেষমুহূর্তে, অপ্রত্যাশিতভাবেই মাটির ওপরে ঝুঁকে পড়েছে ছেলেটার শরীর। তারপর দ্রুতবেগে গড়িয়ে সে সরে গেল নেমে আসা কুঠারের ফলার পাশ থেকে। ভারসাম্য হারিয়ে দৈমিত্রের বিরাট শরীরটা মাটির বুকে আছড়ে পড়তে চারপাশে থেকে জনতার গর্জন ভেসে উঠল হঠাৎ। এতক্ষণ ধরে ভিনদেশি যোদ্ধার বীরত্বপূর্ণ অঙ্গভঙ্গী দেখে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকলেও এইবার হঠাৎ করেই নিজের শহরের ছেলের হাতে তার এহেন নাকাল হবার দৃশ্য তাদের সমর্থনকে ফের মাণ্ডুপের দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে।

একটা বিপরীত লাফে পলকের মধ্যে ফের সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল দৈমিত্র। শয়তান এই কিশোর সম্মুখযুদ্ধে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবার সাহস ধরে না। আক্রমণকে বীরোচিত পথে প্রতিহত করবার চেষ্টা না করে তুচ্ছ শৃগালের মতই পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত। ঘৃণা হচ্ছিল তার। তবে জীবনধারণের প্রয়োজনে অস্ত্র ধরে সে। কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে কখনো বা এইরকম ক্রীড়াক্ষেত্রে। শত্রু  ভীরু না সাহসী তা বিচার করবার বিলাসিতা তার সাজে না। ছেলেটাও ভূমিশয্যা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে ফের। ফের একবার, তার নাগালের বাইরে গিয়ে হাতের কুঠারটিতে ভর দিয়ে, ঠোঁটে একটা চতুর হাসি ঝুলিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছে। দৈমিত্র ফের প্রস্তুত হল।

ফের একটা অতিকায় ঝাঁপ, ফের একবার একেবারে শেষমুহূর্তে আশ্চর্য কৌশলে মাটিতে গড়িয়ে গিয়ে সে আক্রমণের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করেছে ছেলেটা। রাগে মাথায় আগুন জ্বলে উঠল দৈমিত্রের। এর থেকে প্রতি আক্রমণের ভয় নেই কোন সে ব্যাপারে এইবার সে নিঃসন্দেহ হয়েছে। আত্মরক্ষার জন্য ঢালটিকে ধরে রাখবার প্রয়োজন নেই এর বিরুদ্ধে। ঢালটাকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে, দুহাতে কুঠারটাকে সজোরে চেপে ধরে ফের একবার একটা অতিকায় পাখির মতই বাতাসে লাফিয়ে উঠল সে।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আশ্চর্য একটা দৃশ্য দেখে একটু চমকে উঠেছিল মুন্দিগ্রের স্বর্ণকেশ যোদ্ধা। খানিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা চোখের পলকে নিজের কুঠারটা মাটিতে শুয়ে রেখে কোমরবন্ধে ঝুলতে থাকা ছোটো একটা যন্ত্র বের করে এনেছে। জিনিসটা সামান্য। আধহাত পরিমিত, মাথার দিকে হরিণের শিঙের মত শাখাযুক্ত একটা গাছের ডাল। শাখাদুটির পেছনে বাঁধা লম্বা চামড়ার দড়ির শেষপ্রান্তে একটা বড়সড়ো পাথরের গুলি টেনে ধরে সে নিশানা নিয়েছে উড়ন্ত দৈমিত্রের দিকে। আর তারপর চোখের পলক পড়বার আগেই সেখান থেকে বিদ্যুতের মত ছিটকে এল পাথরের গুলিটা। মাটিতে নেমে আসবার মুহূর্তেই হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ আগুনে যন্ত্রণা ছড়িয়ে গেল দৈমিত্রের ডান চোখটাতে। চোখের সামনে উল্লাসরত জনতা, যুদ্ধভূমি এই সবকিছুর ছবি ঝাপসা হয়ে উঠে গাঢ় চটচটে একটা অনুভূতি আহত চোখটা থেকে বের হয়ে এসে সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ছিল তার।

মাটিতে নেমে আসবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টাল খেতে খেতে সে দেখেছিল, তার অরক্ষিত শরীরকে লক্ষ করে ধেয়ে আসছে ছেলেটার হাতে ধরা কুঠারের ভোঁতা দিকটা। পরমুহূর্তে বুকের ওপর একটা প্রবল ঘা খেয়ে মাটির বুকে চিৎ হয়ে ছিটকে পড়ল আহত দৈমিত্র। আর সেই একই মুহূর্তে মাটি থেকে লাফিয়ে উঠে তার ওপরে ছিটকে এল মাণ্ডুপের শরীর। দৈমিত্রের বুকে একবার পা ছুঁইয়ে আকাশের দিকে হাত তুলে একটা জয়ধ্বনি করেই সে ফের সরে গেল নিরাপদ দূরত্বে।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফের একবার উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছিল সে। এইবার তার মাথায় হত্যার উল্লাস জেগেছে। ওই চতুর যোদ্ধা কিশোর হলেও আর তার ক্ষমা নেই দৈমিত্রের হাতে। আজ তার বুকে পা ছুঁইয়ে অপমান করবার সাজা পাবে ওই দুর্বিনীত কিশোর। আজ এ খেলার শেষ দেখে ছাড়বে মুন্দিগ্রর বীর যোদ্ধা দৈমিত্র।

কিন্তু ততক্ষণে বিকেলের আকাশ কাঁপিয়ে ফের শিঙার শব্দ বেজে উঠেছে। দুপাশ থেকে এগিয়ে আসা চারজন যোদ্ধা তাকে চেপে ধরে সাবধানে হাত থেকে সরিয়ে নিচ্ছিল তার কুঠার। দ্বন্দ্বযুদ্ধের নিয়ম অনুসারে, প্রতিদ্বন্দ্বিকে মাটিতে ফেলে তার বুকে পা ছোঁয়াবার সঙ্গে সঙ্গেই বিজয়ী ঘোষিত হয়েছে মাণ্ডুপ। চারপাশ থেকে ঘন ঘন জয়ধ্বনি উঠছিল মাণ্ডুপের নামে। মুন্দিগ্রজয়ী মাণ্ডুপ। আমহিরি শহরের সম্মানরক্ষক মাণ্ডুপ।

***

“আমাকে তুই আগে বলিসনি কেন, তুই দ্বন্দ্বযুদ্ধে যাবি?”

ইন্দার পাড়ে সন্ধ্যা নেমেছে। তাদের পেছনে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে আমহিরি শহর। বাজারের জায়গাটা এখন প্রায় নির্জন। সেখানে এই মুহূর্তে মশালের ধিকিধিকি আলোয় সদ্য সংগ্রহ করে আনা দাসগুলিকে ঘিরে বিভিন্ন শহর থেকে আসা কিছু ধনী ব্যবসায়ীর ভিড়।

তাদের থেকে অনেক দূরে, নির্জনে, দুটি মানুষ কেবল ইন্দার ধারার পাশে চুপচাপ বসে থাকে। মাণ্ডুপ আস্তে আস্তে ইস্কার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরল, “তারপর বলল, “বললে তুই ভয় পেতি যে। লড়তে মানা করতি। তাই…”

“আমি ভয় পেতাম?” ফের একবার রেগে উঠছিল ইস্কা, “যুদ্ধের কৌশল বুঝি তুই একলাই বুঝিস, না রে?  আজ আমি ঠিক সময়ে ঐ গুলতির বুদ্ধিটা না করলে তুই এতক্ষণে…”

“আচ্ছা আচ্ছা হয়েছে,” মাণ্ডুপ হাসিমুখে বাধা দিল, “আজ বাজি জিতে যা পেয়েছি তার অর্ধেক তবে তোর। হল তো? নে। এখন ওঠ। অন্ধকার হয়েছে। এরপর আরো দেরি করলে…”

তখন আকাশে সন্ধ্যাতারা জেগে থাকে। তার আবছায়া আলোয় ইন্দা নদীর পাড় ধরে তাদের বসতির দিকে হেঁটে যায় দুই কিশোর কিশোরী। ভবিষ্যৎ তাদের কার ভাগ্যে কী লিখে রেখেছে তারা তা জানে না। জানতে চায়ও না। তারা দুজনেই জানে, সমাজ তাদের জন্যজীবনের দুটো আলাদা পথ আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে। ভালো লাগুক বা না লাগুক সেই যার যার পথ ধরেই চলতে হবে তাদের। সেটাই নিয়ম। তবে সেই মুহূর্তে সে নিয়ে তারা ভাবতে চাইছিল না। চুপ করে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে তারা শুধু এই মুহূর্তটাকে উপভোগ করে যায়।

চলতে চলতে দূরে, উত্তর থেকে চলে আসা বাণিজ্যপথের বুকে একটা আবছায়া সাদা আকারকে নড়তে দেখে একটুক্ষণ থমকে দাঁড়াল তারা। তারপর তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে সেদিকে নজর চালিয়ে খানিক দেখে মাণ্ডুপ বলে উঠল, “কেউ আসছে। চার বৃষের যান। মঞ্জাদাহিরের বার্তাবহ হবে সম্ভবত।”

শুনে ইস্কা হাসল, “সে আসুক। মন্দিরে পুরোহিতের কাছে কোনো সংবাদ আসছে হয়তো। তাতে তোর আমার কাজ কী? এখন চল, আগে তুই তোর জেতা সম্পদ থেকে আমার হিস্যার ভাগ দিবি, তারপর কালকে সৌগমপুত্র বিসারার আদেশ করা পুঁতিগুলো গড়া শেষ করতে সাহায্য করবি আমায়, তারপর ঘরে ফিরতে পারবি তুই আজ।”

আসলে পরদিন বিকেলে মাণ্ডুপ, বিসারার সঙ্গে জলপথে লুথিলা রওয়ানা হয়ে যাবে। অন্তত পনেরো দিন তার দেখা মিলবে না। আজ তাই এই অজুহাতে আরও খানিকক্ষণ মাণ্ডুপের কাছে কাছে থাকবার চেষ্টায় ছিল ইস্কা।

হাত ধরাধরি করে তারা দুজন এগিয়ে যায় শহরের দিকে। আগে আগে চলেছে ইস্কা। হাতে তার মাণ্ডুপের যুদ্ধজয়ী গুলতি। তার পেছনে পেছনে আস্তে আস্তে পা ফেলে মাণ্ডুপ এগিয়ে চলে তার কুঠার আর লড়াইতে জেতার পুরস্কারের পুঁটলিটি সঙ্গে করে। তাদের থেকে অনেক পেছনে তখন ধীরে ধীরে আমহিরির দিকে এগিয়ে আসছিল মঞ্জাদাহির থেকে আসা বৃষযানটি। তার আরোহী বৈক্লন্যের বয়ে আনা বার্তা এইবার মাণ্ডুপের জীবনকে একেবারে অজানা এক পথে যাত্রা করাবে। তবে ভারী আনন্দে কথা বলতে বলতে পথ চলা সেই কিশোর ও কিশোরীর কাছে তখনও তার খবর ছিল না। তারা তখন নিজের আনন্দেই মশগুল।

ক্রমশ

শীর্ষচিত্র- অতনু দেব।  ভেতরের চিত্র- ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য

 জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s