ধারাবাহিক উপন্যাস-সিন্ধু নদীর তীরে -পর্ব ১৪- পিটার বিশ্বাস-শীত ২০২৪

সিন্ধুনদীর তীরে –প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব, পঞ্চম পর্ব, ষষ্ঠ পর্ব , সপ্তম পর্ব, অষ্টম পর্ব, নবম পর্ব , দশম পর্ব, একাদশ পর্ব,  দ্বাদশ পর্ব, ত্রয়োদশ পর্ব, চতুর্দশ পর্ব, পঞ্চদশ পর্ব, ষোড়শ পর্ব, সপ্তদশ পর্ব

IMG-20210913-WA0004

আত্মপরিচয়

দিনের বেলা মন্দিরদুর্গের এই ঘরটা থেকে দূরে ইন্দা নদীর ধারা চোখে পড়ে। চাঁদনি রাতেও। অবশ্য এখন, রাত্রির এই তিন প্রহরে তা সম্ভব নয়। কারণ চাঁদ অস্ত গিয়েছে খানিক আগে। তবে স্রোতের শব্দ আর থেকে থেকে ঠান্ডা হাওয়ার ঝলক বলে দেয় যে ওদিক দিয়ে ইন্দা বয়ে চলেছে। সেইদিকে চোখ ধরে রেখে নিঃশব্দে বসেছিলেন জৈমিন। আকাশে অজস্র তারার ঝিলিমিলির মাঝে মাঝে খানিকটা করে অন্ধকার এলাকা। ওগুলো মেঘ। ওই মেঘগুলির আড়ালেই কোথাও কি…

…মনের মধ্যে দুটো বিপরীত অনুভূতির লড়াই চলছে তাঁর উপস্থিত। জৈমিন জানেন, এ লড়াই আজ অবশিষ্ট রাতটুকুও দু’চোখের পাতা এক করতে দেবে না তাঁকে। একদিকে, বিপুল ধনসম্পদ হাতে পাবার একটা অপ্রত্যাশিত সুযোগ। আর অন্যদিকে…একটা গভীর ভয়…

কথাটা মনে হতে ফের একবার শিউরে উঠলেন জৈমিন। দোরাদাবুর এহেন অজ্ঞেয় লীলার অর্থ তাঁর মত সাধারণ মানুষের বোঝা সম্ভব নয়। এ কোন কঠিন পরীক্ষায় ফেললেন তাঁকে ঈশ্বর দোরাদাবু…

 ***

ইন্দাতীরের যেকোনো শহরের মতই এই কট্টাদিজাতেও বাজেয়াপ্ত হওয়া সম্পত্তির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। সেই নিয়মের বলে শহরসীমার মধ্যে বাজেয়াপ্ত হওয়া যাবতীয় সম্পত্তির ওপরে মন্দিরদুর্গের প্রধান পুরোহিতের একচ্ছত্র অধিকার। সে-সম্পদ তিনি শহরের মঙ্গলসাধনে খরচ করবেন এইটিই এ আইনের উদ্দেশ্য হলেও, একবার সেই সম্পদ হাতে পাবার পর প্রধান পুরোহিত কোথায় তা খরচ বা লগ্নি করছেন সে আর কেউ দেখতে আসে না। ফলে অধিকাংশ প্রধান পুরোহিতই এই পথে পাওয়া সম্পত্তি ব্যক্তিগত ভোগদখলের জন্যই কাজে লাগিয়ে থাকেন। 

ধনাগারে জমা রাখা মাণ্ডুপের সম্পত্তির তালিকা হাতে আসবার পর জৈমিন নিজে একদিন জিনিসপত্রগুলো সরেজমিনে দেখে এসেছিলেন, এবং দেখবার পর তাঁর বিস্ময়ের সীমা ছিল না। দানব নগরী ম্‌হিরির সমৃদ্ধি নিয়ে বহু গুজব ইন্দাতীরের হাওয়া ভাসে। কিন্তু বাস্তব যে কখনো কখনো কল্পনাকেও বহুগুণে ছাপিয়ে যায়, তার প্রমাণ মাণ্ডুপের ওই দুই গোযান বোঝাই সম্পদ। মূল্যবান রত্ন, দুর্লভ ধাতু, বিচিত্র গড়ণের ভারী ভারী অজস্র গহনা, বস্ত্র, মাটির পাত্রে রাখা গন্ধদ্রব্য, কী নেই তাতে! তবে এই সবকিছুর চেয়েও বহুগুণে মূল্যবান সম্পদের বিরাট সঞ্চয় রয়েছে সেখানে। সাধারণের চোখে তুচ্ছ কিছু বস্তু হলেও, জৈমিনের সুশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ দৃষ্টি তাদের প্রকৃত মূল্যকে বুঝে নিতে দেরি করেনি। যেমন, যে পাত্রে এই বস্তুগুলি রক্ষিত হয়েছে সেই পাত্রগুলি। অসামান্য সুগঠিত এই পাত্রেরা ইন্দাতীরের মতই পোড়ামাটিতে তৈরি। কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কৌশলে তাদের পোড়াবার ফলে পাত্রগুলোকে সজোরে মাটির বুকে আছড়ে ফেললেও তারা অটুট থাকে। তাদের গায়ে বিভিন্ন পদ্ধতিতে যে চিত্রন করা হয়েছে, তাদের ঔজ্জ্বল্য ও বর্ণবিন্যাস তৈরি করবার পদ্ধতি ইন্দাতীরের শিল্পীদের কাছে এখনও অজানা। জৈমিন জানেন, এই পাত্রগুলোকে নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষায় এদের নির্মাণকৌশল আয়ত্ত করা গেলে তা আগামী বহু পুরুষ ধরে তাঁর পরিবারের বিপুল আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে।

এছাড়া একটি বিশাল পেটিকায় তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন কয়েকশো ছোটো ছোটো পাত্র। তাদের ভেতরে রাখা নানান রঙের গুঁড়ো আর তরলগুলোর প্রতিটির চরিত্র আলাদা। সেইসঙ্গে পেটিকার ভেতরে নানান গড়ণের সুক্ষ্ম ছোটোবড়ো অস্ত্রের এক বিশাল সঞ্চয়ও রয়েছে। অস্ত্রগুলো পাথর আর কালো রঙের কোনো অজানা ধাতুতে তৈরি। তাদের সবচেয়ে বড়োটি আধহাত মতো লম্বা একটা তুরপুন। সবচেয়ে ছোটোটা হল এক আঙুল লম্বা একটা ছোটো ছুরি। রয়েছে পশুর অন্ত্র শুকিয়ে তৈরি  কিছু শক্ত সুতো এবং হাড়ের তৈরি সুক্ষ্ম ছুঁচ। বলা বাহুল্য এগুলোর কোনোটাই যুদ্ধাস্ত্র নয়।

জৈমিনের স্ত্রী হামুর চিকিৎসক পরিবারের মেয়ে। মন্ত্র ও ওষধি প্রয়োগ করে চিকিৎসাবিদ্যায় সে নিজেও যথেষ্ট বিদগ্ধা। তার কাছে তিনি অনেক দিন ধরেই ম্‌হিরি নগরীর দানব চিকিৎসকদের প্রায় অলৌকিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কথা শুনে আসছেন। তাদের আবিষ্কৃত ভেষজ ও খনিজ ওষুধের সংখ্যা বিপুল। নাকি সেইসব ওষুধের পরাক্রমের সামনে কঠিনতম ব্যাধিও সহজেই হার মানে। এছাড়া, তাদের চিকিৎসকরা নাকি জাদুবলে রোগীর প্রাণ সুরক্ষিত রেখে অলৌকিক অস্ত্রের ঘায়ে তাদের মাথার হাড় ফুটো করে তার ভেতরে ওষুধ ঢুকিয়ে দুরূহ রোগের নিরাময় করতে পারেন। প্রয়োজনে দেহের যেকোনো স্থানকে ধারালো অস্ত্রে কেটে তার ভেতরে তৈরি হওয়া রোগকে সারিয়ে তুলবার চেষ্টাতেও তাঁরা সফল হয়েছেন বহুকাল আগেই। কাজেই এই পেটিকা খুলে দেখবার পর জৈমিন বুঝেছিলেন, দানব চিকিৎসকদের সেই জাদুকরী ওষুধ আর শল্যচিকিৎসার অস্ত্রভাণ্ডার ছাড়া এ অন্য কিছু হতে পারে না। তাঁর মুখে এর বিবরণ শুনে একদিন হামুর নিজেও এসেছিল আহুমের ধনাগারে। পেটিকার উপকরণগুলোকে দেখে হামুর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “ইন্দাতীরের অধীশ্বর স্বয়ং ঈশ্বর দোরাদাবু। তিনি সর্বশক্তিমান। এই সম্পদে তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই তা জানি। কিন্তু একজন চিকিৎসক হিসাবে বলতে পারি, এই পেটিকার জন্য উর, মুন্দিগ্র বা ইষক রাজ্যের সম্রাটরা তাঁদের ধনাগার খুলে করে দিতে দ্বিতিয়বার ভাববেন না।”

বলা বাহুল্য, আজ সূর্যাস্তের কিছু আগে যখন ঈশ্বর দোরাদাবু তাঁর সঙ্গে মানসিক সংযোগ স্থাপন করে তাঁকে আদেশ দেন যে মাণ্ডুপের গচ্ছিত সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করবার নির্দেশ দিতে হবে জৈমিনকে, তখন এহেন এক মহামূল্যবান সম্পত্তির মালিক হতে চলেছেন এই সুখে খানিক বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন জৈমিন। আর বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন বলেই তাঁর মনে একেবারেই প্রাথমিক খটকাটাও লাগেনি সেই মুহূর্তে। অথচ লাগাটা উচিত ছিল। কারণ, কট্টাদিজার পুরোহিতদের সঙ্গে মানসিক সংযোগ করবার কথা এখানকার স্থানীয় প্রশাসক সন্তানগোলকের। ইন্দার বিপরীত তীরে দাঁড়ানো মঞ্জাদাহির এখান থেকে যতটা দূরে রয়েছে ততটা দূর থেকে গোলকদেবতার পক্ষে কারো সঙ্গে মানসিক সংযোগ সম্ভব নয়।  

খটকাটা তাঁর প্রথম লেগেছিল সূর্যাস্তের খানিক পর। কট্টাদিজাকে ঘিরে থাকা বনাঞ্চলের গভীরে শেয়ালরা তখন রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর ঘোষণা করছিল। রাতের খাওয়াদাওয়ার পর এই সময়টা জৈমিন তাঁর বাড়ির পেছনদিকের উঠোনে খানিকক্ষণ একলা পায়চারি করেন। দিনের এইসময়টা তাঁকে বিরক্ত করায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আছে। এমনকি হামুরও এই সময়টা তাঁর কাছে আসে না। আজ, সেই নির্জন মুহূর্তে হঠাৎ একটা মানসিক আহ্বান এসে ঢেউ তুলেছিল তাঁর মাথায়। সে ডাককে চিনতে ভুল হয়নি জৈমিনের। ঈশ্বর দোরাদাবুর মানসিক ইশারা তা। ফের তিনি তার সঙ্গে মানসিক সংযোগ স্থাপন করেছেন। এইবার, জৈমিনের সতর্ক মনে সেই প্রশ্নটা মাথা তুলেছিল- সন্তানগোলকের পরিবর্তে কেন স্বয়ং দোরাদাবু… তাছাড়া, সুদূর মঞ্জাদাহিরের মন্দিরদুর্গ থেকে এতদূরে তাঁর মানসিক সঙ্কেত… কীভাবে? এর উত্তরটাও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আন্দাজ করে নিয়েছিলেন জৈমিন। একমাত্র দোরতাদাবু সশরীরে কট্টাদিজা নগরীর সীমানার মধ্যে ঢুকে এলেই এই সংযোগ সম্ভব। 

আন্দাজটা করেই সভয়ে ঘুরে তাকিয়েছিলেন মাথার ওপরে ছড়ানো রাতের আকাশের দিকে। কিন্তু সেখানে একরাশ তারা ও তাদের মাঝে মাঝে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘেদের আবরণ ছাড়া আর কিছু তাঁর চোখে পড়েনি। হয়তো ওই মেঘেদের আড়ালে… হয়তো…কিন্তু কেন তিনি সশরীরে আসবেন এই তুচ্ছ নগরীর বুকে? তাঁর হয়ে সন্তানগোলকই তো… 

পরমুহূর্তে অস্থির এই চিন্তাগুলোকে মন থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন জৈমিন। তিনি অন্তর্যামী। সশরীরেকাছাকাছি এসে থাকলে তার এই চিন্তাদেরও সচ্ছন্দে পড়ে নেবার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। ঈশ্বরের কার্যকলাপের অর্থ নিয়ে নিজের অজান্তেও কোনো প্রশ্ন তোলা পাপ। এর চেয়ে অনেক কম অপরাধে বহু মানুষের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন জৈমিন নিজেও! 

অতএব, অবৈধ ও উদ্ধত সেইসব চিন্তাকে মন থেকে সরিয়ে দিয়ে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিলেন জৈমিন। মাথা নীচু করে, অদৃশ্য ঈশ্বরকে স্বাগত সম্ভাষণ জানিয়ে বলেছিলেন, “আদেশ?”

এবং এর পরই ঈশ্বর তাঁকে এক অদ্ভুত ও ভয়াবহ ধর্মসঙ্কটে ফেলে দিয়ে যান। তিনি জানান, কট্টাদিজায় তিনি সত্যই সশরীর উপস্থিত হয়েছেন, এবং সে খবর কেবলমাত্র জৈমিন জানবেন। এমনকি সন্তানগোলকের চেতনার থেকেও আড়ালে রাখা হয়েছে তাঁর উপস্থিতি। আগামী দুই দিনের জন্য তাঁর আদেশে জৈমিনের মনও সন্তানগোলকের অধিকারের বাইরে। তিনি আরও জানান যে, আগামীকাল জৈমিনের সঙ্গে সাক্ষাত করতে আসবে মাণ্ডুপ। আর তারপর ছলে-বলে-কৌশলে তাকে উত্তেজিত করে…

তারপর, দীর্ঘ সময় ধরে, তাঁকে ঠিক কী করতে হবে তার পুঙ্খাখানুপুঙ্খ নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন দোরাদাবু। প্রায় সমস্ত রাতটাই সেই কাজে ব্যয় করে মাত্র কয়েক দণ্ড আগে তিনি বিদায় নিয়েছেন জৈমিনের মন থেকে।

কাজটা জৈমিনের পক্ষে কঠিন কিছুই নয়। তাঁর মত ধুরন্ধর প্রশাসকের পক্ষে মাণ্ডুপ নামের ওই তুচ্ছ কিশোরকে উত্তেজিত করে দোরাদাবুর বিরুদ্ধে ইচ্ছামত কিছু কুবাক্য বলিয়ে নেয়া নিতান্তই সহজ কাজ। আর তারপর ঈশ্বরদ্রোহী হিসেবে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি বন্দোবস্ত নেয়া কঠিন হবে না। 

কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। জৈমিনের ভয়টার শেকড়ও রয়েছে সেইখানেই। যেখানে সামান্য একটা আদেশ পেলেই এই তুচ্ছ কাজটুকু করে দিতে পারতেন জৈমিন, সেখানে কেন স্বয়ং দোরাদাবু এলেন এইখানে? কেন এই গোপনতা? কট্টাদিজার প্রশাসক যে সন্তানগোলক… তিনি তো দোরাদাবুরই সন্তান! তাঁকেও এই বিষয়ে কেন অন্ধকারে রাখতে চাইছেন তিনি? কেন তিনি জানিয়ে গিয়েছেন, আগামীকাল সকালে জৈমিনের সঙ্গে মাণ্ডুপের সাক্ষাতের সময় প্রচ্ছন্নভাবে উপস্থিত থাকবেন তিনি নিজে? 

তবে কি ঈশ্বরের কোনো গোপন পরিকল্পনার পুতুল হিসেবে তাঁকে ব্যবহার করা হতে চলেছে? অথবা… এইটি কি জৈমিনের কোনো পরীক্ষা? কীসের পরীক্ষা হতে পারে? তাঁর আনুগত্যের? 

নগরে ঘটা বা ঘটতে চলা যেকোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ সন্তানগোলকের কাছে পেশ করতে হয় প্রধান পুরোহিতকে। আবহমান কাল ধরে এই নিয়ম চলে আসছে। এর ব্যত্যয়ের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অবধি হতে পারে। অথচ স্বয়ং দোরাদাবুর কট্টাদিজায় আসবার মত উল্লেখনীয় একটা ঘটনা প্রশাসক সন্তানগোলককে জানানো যাবে না! কেন? ঈশ্বর কি সন্তানগোলকের প্রতি তার আনুগত্য কতটা, তার পরীক্ষা নিচ্ছেন এইভাবে? অথবা… তাঁর নিজের প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষা? কোনদিকে যাবে সে? নগরের প্রচলিত আইন মোতাবেক, দোরাদাবুর সঙ্গে এই সাক্ষাতকারের খবরটি সন্তানগোলকের কাছে গিয়ে জানানো তাঁর কর্তব্য। সেক্ষেত্রে ঈশ্বর দোরাদাবুর আদেশকে অমান্য করতে হবে তাঁকে। অন্যদিকে, দোরাদাবুর আদেশকে শিরোধার্য করবার অর্থ প্রচলিত আইনকে ও সন্তানগোলকের অধিকারকে অবমাননা করা। এই পরীক্ষায় কোন আচরণটি সঠিক উত্তর হবে তাঁর পক্ষে? 

তাঁর চিন্তিত চোখদুটি বারে বারে রাত্রির আকাশের দিকে চেয়ে দেখে। ওইখানে কোথাও… কাছাকাছি… ঈশ্বর আছেন। নিজের গোপন অভিসন্ধিকে গোপনে রেখে ভেসে আছেন রাত্রির আকাশে… সকলের চোখের আড়ালে… 

অথবা… হয়তো নজর রাখছেন তিনি জৈমিনের ওপরে! তার প্রতিটি চিন্তাকে পড়ে নিচ্ছেন অভিনিবেশ সহ! হয়তো… হয়তো… 

হাজারো বিচিত্র চিন্তার স্রোতে ভেসে চলেন প্রধান পুরোহিত জৈমিন… তাঁকে ঘিরে ভেসে চলে সময়ের স্রোত… ঘুরন্ত পৃথিবীর পূর্বার্ধ ফের একবার সূর্যের দিকে মুখ ঘোরানো শুরু করে… চিন্তাগ্রস্ত জৈমিনের অগোচরে আকাশে ছড়িয়ে থাকা খণ্ড খণ্ড মেঘের দল হাওয়ার টানে ধীরে ধীরে একত্র হয়ে ঢেকে দিতে শুরু করে প্রাকপ্রত্যূষের আকাশকে… পাহাড়ের গায়ের ঘন জঙ্গলের গভীরে কোথাও শেয়ালেরা রাত্রির শেষ প্রহর ঘোষণা করে…আর তারপর, হঠাৎ প্রাকপ্রভাতের নৈঃশব্দ্যকে ভেঙেচূরে দিয়ে জঙ্গলের গভীর থেকে ভেসে আসে তীক্ষ্ণ, কর্কশ একটা আহত শব্দ… শ্বাপদের কবলে পড়া  কোনো জীবের শেষ আর্তনাদ… চমকে উঠে জানালা দিয়ে দূরে পাহাড়ের ঢালে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে দেখেন জৈমিন। সেখানে নিবিড় অন্ধকারের গায়ে প্রভাতি আলোর ছোঁয়া লাগেনি তখনও… অন্ধকার আকাশ থেকে তখন নেমে আসতে শুরু করেছে অকাল বর্ষণের অপ্রত্যাশিত ধারা…

*** 

তবে, শুধু জৈমিন নয়, তীক্ষ্ণ, কর্কশ আর্তনাদটা সেই মুহূর্তে আরও একজন মানুষের ঘুমন্ত স্মৃতিতেও ঢুকে আসছিল… বিস্মৃতির অতলে চাপা পড়ে যাওয়া বহু পুরোনো এক রক্তক্ষরণের স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলছিল সেই আর্তনাদ… স্বপ্নে সে তখন ফিরে গিয়েছে নিজের ভুলে যাওয়া শৈশবের সেই কালরাত্রিতে। ফের একবার, অবোধ কিশোর তার ফাঁদ পেতে ধরা প্রথম শিকারটিকে ফাঁদ থেকে ছাড়িয়ে নেবার মুহূর্তেই… অন্ধকার থেকে উড়ে আসা একটা তির… আর্তনাদ করে উঠেছে তিরবেঁধা জীবটা… আর তারপর অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসা সেনারা… বাবা… 

***

না। সেই রাত্রে  আহুমের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বের হয়ে নিজের ঘরে আর ফেরেনি মাণ্ডুপ। দুঃখ আর রাগের একটা জ্বালা ধরানো মিশেল তাকে আনমনা করে রেখেছিল গোটা সময়টাই। সেই জ্বালায় জ্বলতে জ্বলতেই অনির্দেশ্যভাবে পা চালিয়েছিল সে মন্দিরদুর্গের সীমানা ছেড়ে। তারপর, কখন যে সে শহরের একপ্রান্তে দাঁড়ানো তার কুঠুরি পেরিয়ে গভীর জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গিয়েছে তা তার নিজেরও খেয়াল ছিল না।

বনের গভীর পা দিতে তার মখমলি অন্ধকার আর মোলায়েম নৈঃশব্দ্য এসে যেন মায়ের মত স্নেহে জড়িয়ে নিয়েছিল তাকে। মায়ের কোলে এসে মুখ গুঁজবার মতই একটা অনুভূতি যেন। হঠাৎ করেই বুকের জ্বলুনিটা নিভে গিয়েছিল মাণ্ডুপের। তার জায়গায় ছেয়ে গিয়েছিল গভীর বিষাদ। আর, যেন তার সেই বিষাদেরই মূর্তরূপ ধরে মাথার ওপরে ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা মেঘের দল ধীরে ধীরে জোট বেঁধে বর্ষণমেঘের রূপ নিতে শুরু করেছিল। আকাশের এই ভাবান্তর অপবশ্য মাণ্ডুপের নজরে আসেনি সেই মুহূর্তে। আসেনি, কারণ নিজের যন্ত্রণা ও দুঃখ নিয়েই একেবারে মগ্ন হয়ে হেঁটে চলেছিল সে তখন। চলতে চলতেই বারে বারে বৈক্লন্যর মুখটা তার মনে ভেসে উঠছিল। তার পিতা বৈক্লন্য। তার আদর্শ মানুষ বৈক্লন্য…চিরটাকাল সে স্বপ্ন দেখে এসেছে, একদিন সে তাঁকে গর্বিত করবে। ভাগ্যে, কর্মে ও সাফল্যে সে ছাড়িয়ে যাবে তার কীর্তিমান পিতাকে। অথচ আজ…

কর্মজীবনে ঈশ্বর দোরাদাবুর বিশ্বস্ত সেবক ছিলেন বৈক্লন্য। সারা জীবন ধরে তার জন্য পুরস্কারও কম পাননি। খ্যাতি, অর্থ, সম্মান সমস্তই এসেছে দু’হাত ভরে। আমহিরি নগরে আজ তিনি এক সম্মানিত নাম। মাণ্ডুপও তো তার আদর্শ, তার পিতা বৈক্লন্যেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে জীবনের পথে! সেও তো মনপ্রাণ দিয়েই সেবা করে চলেছে ঈশ্বর দোরাদাবুর! 

দোরাদাবুর বিধান, সন্তান বাপ-মায়ের পথ ধরে চলবে। সৈনিকের সন্তান সৈনিক হবে। পুরোহিতের সন্তান নিজেকে গড়বে পুরোহিত হিসেবেই। সে নিয়মের ব্যত্যয় করেনি সে। ব্যাবসা-বাণিজ্যে তার রুচি আছে। আমহিরির বণিকশ্রেষ্ঠ সৌগমের ছেলে বিসারার পণ্যবহরের রক্ষি হয়ে সে বেশ কিছু বাণিজ্যযাত্রায় গিয়েছে। সেসব যাত্রায় মূল কাজের পাশাপাশি ব্যাবসাপত্রের কাজেও সে হাত লাগাত। এবং, সে কাজে তার স্বভাবজাত দক্ষতা দেখে বিসারা স্বয়ং মুগ্ধও হয়েছেন একাধিক বার। বড়ো ইচ্ছা ছিল তার, একদিন সে-ও বিসারার মতই নিজের পণ্যবহর নিয়ে লুথিলা বন্দরে যাবে, তার পণ্য সেখান থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পৌঁছোবে উর, মগন, কিংবা তেলমুন্দদের দেশে! কিন্তু তবু, বৈক্লন্য তাঁর কর্মজীবনের শেষে যখন আমহিরিতে ফিরে এলেন, তখন সেই স্বপ্নকে দমন করে ঈশ্বর নির্ধারিত পারিবারিক পেশাতেই তো সে নিজেকে নিয়োগ করেছিল! আর, তার পর থেকে, মহান দোরাদাবুর করুণা বিধর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করেছে সে বহুবার! ম্‌হিরি বিজয় ও তার পর সেখানে দোরাদাবুর শাসন প্রতিষ্ঠার পেছনে তার ভূমিকার কথা সমগ্র ইন্দাতীরের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। অথচ তবু, বারংবার পুরস্কারের বদলে তিরস্কারই জোটে তার ভাগ্যে! কেন তার পিতার কীর্তিকে ছাপিয়ে গিয়ে তাঁকে গর্বিত করবার সুযোগ তাকে দেবেন না ঈশ্বর দোরাদাবু? কোন অপরাধে…

অবুঝ এক অভিমানের আগুনে দগ্ধাতে দগ্ধাতেই পথ চলছিল মাণ্ডুপ। চলতে চলতে কখন যে সে জঙ্গলের গভীরে তার প্রিয় জায়গাটায় এসে পৌঁছেছে তা তার খেয়াল ছিল না… 

জায়গাটায় বারবার ঘুরেফিরে আসে সে। কেন যেন বড়ো চেনা লাগে জায়গাটাকে তার। চারপাশে খাড়াই ঢালের মাঝখানে একটুকরো সমতল জমি। পাহাড়ের ঢালে অরণ্য গভীর। ডাইনে একটা পায়েচলা শূঁড়িপথ এগিয়ে গিয়েছে নীচের দিকে। মানুষ ও পশুদের পায়ে পায়ে গড়ে ওঠা বন্য পথ। পথটার মুখে মাণ্ডুপের গড়া সেই মৃৎপট্ট পোড়াবার অগ্নিকুণ্ড। অবশ্য বাইরে থেকে তা দেখা যায় না। শুকনো লতাপাতা দিয়ে জায়গাটাকে সযত্নে ঢেকে রেখে গিয়েছে মাণ্ডুপ। এ তার গোপন কর্মশালা।

জায়গাটার একপাশে একটা লতাকুঞ্জ। এইবারে আস্তে আস্তে সেইদিকে এগিয়ে গেল সে। কেন সে জানে না, কিন্তু এই জায়গাটিতে এসে পৌঁছালে বড়ো নিশ্চিন্তবোধ হয় তার। কিছু একটা স্বপ্ন আছে তার এই জায়গাটাকে ঘিরে। কিন্তু, জাগরণে সে স্বপ্নের কথা মনে পড়ে না তার… বড়ো চেনা… বড়ো সুন্দর… অথচ…

***

…এইখানে তাকে ঘিরে সুগন্ধ বনলতারা এক মায়াবি ঘেরাটোপ রচেছে। সেই ঘেরাটোপের নীচে, পাথরের বিছানায় শরীরটি ছড়িয়ে দিয়ে মাণ্ডুপ ঘুমায়। এবং, সেই অবসরে তার ঘুমন্ত চেতনায় ফের জেগে ওঠে শৈশবের অবদমিত স্মৃতিরা…

আসলে, যন্ত্রণা ও দুঃখের স্মৃতিদের মানুষ ভুলে যেতে চায়। অসহনীয় ব্যথার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে মন সে স্মৃতির ওপর টেনে দেয় বিস্মৃতির ঘেরাটোপ। একদিন এই পাহাড়ে, এই জায়গায় যে ভয়াবহ দৃশ্য দেখেছিল একটি শিশু, তার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করবার জন্য তার মন নিজেই সে দৃশ্যের স্মৃতিকে লুকিয়ে ফেলেছিল তার অবচেতনের গভীরে। 

সচেতন মন থেকে সে স্মৃতিকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে নিজের নতুন পরিচয়কেই একমাত্র পরিচয় বলে নিজেকে বুঝিয়েছিল মাণ্ডুপ নামের সেই শিশু – সে সেনাপতি বৈক্লন্যের সন্তান। এছাড়া আর কোনো পরিচয় নেই তার। এই কথাটুকুকে ঘিরেই সে গড়ে তুলেছিল একটা নতুন, মিথ্যা জীবন। 

সেই মিথ্যা জীবনের আবরণে প্রথম আঘাত হেনেছিল ইলতাস। ম্‌হিরি থেকে ফেরবার পথে সেই ডাকাতকে পরাস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেবার আগের মূহূর্তে, মাণ্ডুপের আসল পরিচয়ের একটা ঝলক সে দেখিয়ে গিয়েছিল তাকে। দাবি করেছিল সে বৈক্লন্যের সন্তান নয়। সে দাসীপুত্র।

মাণ্ডুপ তা বিশ্বাস করেনি। কিন্তু বিশ্বাস না করলেও, চেতনার গভীরে, হয়তো বা নিজেরই অজ্ঞাতে, সে অনুভব করেছিল, কথাটার কোথাও একটা সত্যতা আছে। তার স্ব-আরোপিত বিস্মৃতির ওপরে সেই ছিল নিয়তির প্রথম আঘাত।

সেখান থেকে মঞ্জাদাহিরে ফিরে আসবার পর গত কিছুকাল ধরে বিভিন্ন মানুষের কথায় বা ইঙ্গিতে বারংবার তার জন্ম ও বংশ নিয়ে কিছু কিছু ইশারা, একটু একটু করে ছোটো ছোটো আঘাতে সেই বিস্মৃতির দেয়ালকে দুর্বল করেছে। এবং অবশেষে যেদিন মঞ্জাদাহিরের মন্দিরদুর্গের প্রাকার থেকে প্রথমবার দূরে কট্টাদিজার দিকে চোখ ফেলল, সেইদিন, সেই সেই স্ব-আরোপিত বিস্মৃতির দেয়ালে প্রথম ফাটল ধরিয়েছিল সেই অরণ্য-পাহাড়ের ছবি। 

এবং, তার পর থেকেই, তার শৈশবের ভয়াল স্মৃতিদের বিষবাষ্প সেই ফাটল বেয়ে তার স্বপ্নে এসে হানা দিতে শুরু করেছিল; একটু একটু করে।

কট্টাদিজায় আসবার পর, কোনো অন্ধ আকর্ষণে এইখানে, এই লতাবিতানটিতে- বারংবার সে ঘুরেফিরে এসেছে। এবং প্রতিবারই, ইঙ্গিতে সেই স্বপ্নেরা তাকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছে তার আসল পরিচয়ের অসম্পূর্ণ কিছু ছবি। কিন্তু মাণ্ডুপ তাকে স্বীকার করেনি। তার চেতন মন তাকে উড়িয়ে দিয়েছে নিতান্ত স্বপ্ন বলেই।

কিন্তু, ক্রমশই সেই স্বপ্নদের শক্তি বাড়ছিল। আর অবশেষে আজ, আহুমের দফতরে পাওয়া তার শেষতম আঘাতটা, কোনো অজানা পথে তার স্বেচ্ছা-বিস্মৃত স্মৃতির অনেকখানিই ফের ফিরিয়ে দিতে শুরু করেছে। এইবার সেই স্মৃতিরা ঝাঁপিয়ে আসে তার স্বপ্নে…

…হরিণশাবকের অন্তিম আর্তনাদ… দুহাতে কান চাপা দেয় বালকটি…

খাড়াই পথটার নীচে একটা ছোট্ট কুণ্ডি… তার পাড়ে পাতা ফাঁদে একটা ছোটো হরিণশাবক ধরা পড়েছে। নিতান্তই ছোটো! কিশোরটির লোভি চোখ তার দিকে তাকিয়ে দেখে। তারপর ফাঁদের লতা ছাড়িয়ে তাকে তুলে নিতে যাবার মুহূর্তে ওপরের অন্ধকার থেকে ধেয়ে আসা তিরটা অব্যর্থ লক্ষ্যে গেঁথে গেছে প্রাণীটার ছোট্ট শরীরে… অসহায় আর্তনাদে রাতের নৈঃশব্দ্যকে ফাল;আফালা করে দিচ্ছে মৃত্যুপথযাত্রী হরিণশিশু…

আর তারপর অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসা দুটো নিষ্ঠুর হাত সেই বালককে বাতাসে তুলে নেয়… তার বাঁধনে যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠেছিল মাণ্ডুপ… হাত থেকে মাটির বুকে খসে পড়েছে আহত হরিণশিশু…

এইবার তার একপাশে এসে দাঁড়িয়েছেন সেই নারী… তার মুখের একেবারে সামনে তাঁর মুখটি…তীক্ষ্ণ চোখে সেদিকে তাকিয়ে দেখে মাণ্ডুপ…  

কট্টাদিজার বনপাহাড়ের দিকে প্রথম চোখ পড়বার পর থেকে বারংবার বহু স্বপ্নেই এই নারীটি এসে দাঁড়িয়েছেন তার কাছে… মুখহীন… পরিচয়হীন… 

…কিন্তু আজ…

সৈনিকের হাতে ধরা মশালের আলো পড়েছে তাঁর মুখে। ভয়ার্ত এক যুবতীর মুখ… বড়ো চেনা  মুখ তার… মা… 

“তুমি… মূঢ়াল? মা?”

তীব্র দুটি চোখ মেলে যুবতী এইবার তার দিকে তাকাল। সে চোখে ভালোবাসা, সে চোখে কান্না, সে চোখে ভর্ৎসনা…

আর পরক্ষণেই মশালধারী সৈনিক একটা হ্যাঁচকা টানে তাকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন মাণ্ডুপের সামনে থেকে। গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন,

-এ তোমার কে হয়?

-আমার ছেলে।

তোমার গর্ভজাত?

-হ্যাঁ।

-এর পিতা, তোমার স্বামীর পরিচয় তুমি জান?

-জানি। তাঁর নাম সৌগম। তিনি একজন ভ্রাম্যমাণ শ্রেষ্ঠী।

মাণ্ডুপের মুখের সামনে জ্বলন্ত মশাল এগিয়ে ধরেছেন সেই সৈনিক। মৃদু হাসি ফুটে উঠছে তাঁর মুখে। বিড়বিড় করে বলছেন, “গোধুমবর্ণ চর্ম। সুন্দর দেহসংস্থান… আজ থেকে বৈক্লন্যের পুত্র তুই…”

কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চারদিকে তাকিয়ে দেখছে বালক মাণ্ডুপ। তার অপরিণত মন যেন এই সবকিছুর অর্থ বুঝতে পারে না। অবোধ দৃষ্টিতে সে দেখে, হাতে তলোয়ার তুলে নিয়েছে সেই সৈনিক…

“পিতা… না… মা নির্দোষ পিতা… মুঢ়াল…আমার মা… তাঁকে তুমি প্রাণভিক্ষা দাও পিতা… পিতা…”

পরমুহূর্তে তলোয়ারের একটা নিখুঁত আঘাতে মুঢ়ালের মাথাটা এসে ছিটকে পড়েছে মাণ্ডুপের পায়ের কাছে। মাথাহীন ধড় থেকে ফিনকি দিয়ে উঠে আসা রক্ত ছড়িয়ে পড়ছিল থরথর করে কাঁপতে থাকা বালকের মুখে ও গায়ে…

ফুটন্ত মাতৃরক্তের ধারায় স্নান করে সে… ডুবে যায় নোনতা, আঁশটে, ধাতব স্বাদের সেই চটচট তরলের স্রোতে… শরীর ভিজে উঠেছে তার… তাকে ঘিরে ভিজে উঠেছে ঘাসে ছাওয়া পাথুরে মাটি… দূরে পাহাড়ের মাথায় আগুনের হলকা চোখে পড়ে, তাদের গ্রামে আগুন লেগেছে। পশুর মত উল্লাসের শব্দ তুলে সেইদিকে ধেয়ে যায় সৈনিকের দল… খোলা তলোয়ার হাতে, দোরাদাবুর নামে জয়ধ্বনি দিতে দিতে ওই তাদের পুরোভাগে ছুটে চলেছে তার মায়ের হত্যাকারী… বৈক্লণ্য… আর ঠিক তখন আসুরিক শক্তিতে তাকে কাঁধে চেপে ধরে রেখে অন্য এক পথে ছুটে যায় অন্য এক সৈনিক…

ঘুম ভেঙে গেছে। ধীরে ধীরে সেই ভেজা শয্যায় চোখ খুলে উঠে বসে মাণ্ডুপ। রাত শেষের মুখে। তবে আলো ফোটেনি এখনও ভালো করে। কখন যেন বৃষ্টি নেমেছে পাহাড়ে। সেই জলে ভিজে উঠেছে তার তৃণশয্যা। আকাশ থেকে নেমে আসা ধূসর বৃষ্টির স্রোত তার গায়ে মুখে ঝড়ে পড়ছিল অবিরল। তাকে ঘিরে ভীমবেগে নীচের দিকে ছুটে যায় জলের স্রোত…

আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল মাণ্ডুপ। অবশেষে, স্মৃতির আগল সম্পূর্ণ খুলে গেছে তার। স্বপ্ন নয়। এইবার সে জানে, খানিক আগের নিদ্রায় যা দেখেছে সে, তার প্রতিটি মুহূর্ত ততটাই সত্যি, যতটা সত্যি তার নিজের অস্তিত্ব। বুকের গভীরে সেই সত্যতার প্রতিধ্বনি জেগেছে তার। এবং, সেইসঙ্গেই, আমূল বদলে গিয়েছে তার গোটা জীবনটা।

বৈক্লন্য তার পিতা নয়। সে সৌগমের…

“না!” হঠাৎ দুটি মুষ্টিবদ্ধ হাত বাতাসের দিকে ছুড়ে দেয় সে, “না… না… না…”

তার গলার সেই তীক্ষ্ণ ঘোষণাদের লুফে নিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছিল প্রাকপ্রত্যূষের ভেজা বাতাস।

একটি মাত্র শব্দ! বারংবার তাকে বাতাসে ছুড়ে দিয়ে একে একে তার জীবনের প্রতিটি মিথ্যাকে অস্বীকার করে চলেছিল তখন মূঢ়ালপুত্র মাণ্ডুপ… সুযোগসন্ধানী বেনে সৌগমের অপ্রার্থিত সন্তান সে নয়, মঞ্জাদাহিরের অনুগত সৈনিক সে নয়… দোরাদাবুর যে হৃদয়হীন সেবক তার নিরপরাধ মাকে খুন করে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল, সেই বৈক্লণ্য তার পিতা নয়, যে দোরাদাবু এত অন্যায়ের পরেও পাপীদের মাথায় বজ্রাঘাত করলেন না, যাঁর আদেশে ইন্দাতীরের সৈনিকরা এসে তার মাকে হত্যা করে, তার গোটা গ্রামটাকেই আগুনে ছাই করে দিয়ে ওই সৈন্যাবাস গড়ে তুলেছে কট্টাদিজার পাহাড়ে, তিনি আর তার ঈশ্বর নন!

আকাশের দিকে উদ্যত মুষ্টি তুলে গর্জন করে ওঠে সে… “ঈশ্বর নও তুমি দোরাদাবু… তুমি দানব… তুমি দানব… একদিন আমি তোমায়… দেখে নিও…”

নির্জন বনপাহাড়ে তার সেই রণহুঙ্কার শোনবার মত কোনো মানুষ ছিল না। কিন্তু সে ডাক গিয়ে পৌঁছেছিল মেঘের আড়াল থেকে পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে চলা সেই গোলকদেবতার চেতনায়। এহেন ঈশ্বরবিরোধীতার একমাত্র শাস্তি মৃত্যু। এই মুহূর্তে এই পরজীবীকে হত্যা করা তেমন কোনো কঠিন কাজও নয়। একটা মানসিক আঘাত… তাতেই এদের দুর্বল ও জৈব মস্তিষ্ক চোখের পলকে অকেজো হয়ে যাবে।

সেটা করতে পারলে অন্য একটা বিষয়ে নিশ্চিন্তও হতে পারতেন তিনি। ইফ্রাত নদীকূল হতে আসা যে অলৌকিক জাদুপ্রস্তরের বলে ম্‌হিরিবাসীরা তাঁর অমিত মানসিক শক্তির হানাদারীকে রুখে রেখেছিল দীর্ঘকাল, সেই জাদুপ্রস্তরের খবর ও ব্যবহার একমাত্র এই যুবকের জানা আছে। তার মৃত্যু হলে দোরাদাবু বা তাঁর সন্তানগোলকদের এই একমাত্র দুর্বলতার কথা ইন্দাতীরের বাসিন্দাদের কাছে অজ্ঞাত থেকে যাবে। সেটা নিশ্চিত করা জরুরি প্রয়োজন।

কিন্তু এইভাবে একে হত্যা করে সে লক্ষ্যপূরণ করা উচিত হবে না। ম্‌হিরিবিজয়ী মাণ্ডুপ! ইন্দাতীরের নগরে নগরে  তার খ্যাতি ছড়িয়েছে। শক্তিশালী বণিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি রয়েছে তার প্রতি। এহেন মাণ্ডুপকে কট্টাদিজার মত তুচ্ছ জায়গায় অপমানজনক এক পদে নিয়োগ করায় এমনিতেই মন্দিরসেনার প্রতি বণিক সম্প্রদায়ের অসূয়া বেড়েছে। এর ওপরে তার যদি অরণ্যের বুকে এভাবে অপঘাতে মৃত্যু হয়, সেক্ষেত্রে তার দেহটি দেখবার পর যে কেউ বুঝতে পারবেন, দোরাদাবুর মানসিক আঘাতই এর মৃত্যুর কারণ। সেক্ষেত্রে বণিকদের সঙ্গে নতুন করে শত্রুতা অর্জন করবেন দোরাদাবু ও তাঁর সন্তানগোলক সম্প্রদায়। এতে ইন্দাতীরের অর্থনীতি ভেঙে পড়বার ভয় আছে। তাঁর সমস্ত শক্তি সত্ত্বেও এই ধূর্ত ও শক্তিমান বাণিয়া সম্প্রদায়কে ইদানীং সমীহ করতে শিখেছেন দোরাদাবু। এদের নিয়ন্ত্রণে রাখা তত সহজ নয়।

তবে সে কাজটি করবার কোনো আশু প্রয়োজনও বোধ করছিলেন না দোরাদাবু। কারণ, নিজের মৃত্যুর পথ এই যুবক নিজেই গড়ে নিচ্ছে। জৈমিনকে যা যা নির্দেশ দিয়েছেন তিনি আজকের জন্য, সম্ভবত তার কোনো প্রয়োজন হবে না আর। এই যুবক তার সঙ্গে সাক্ষাতে গিয়ে নিজের মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা নিজেই করে নেবে। যে ঘোষণা সে এইখানে করেছে তার সামান্যতম অংশও জনসমক্ষে যদি সে করে তবে প্রকাশ্য ঈশ্বর-বিরোধীতার জন্য মন্দিরসেনা নিজে থেকেই তার শাস্তির বন্দোবস্ত করবে… বণীক সম্প্রদায়ের কিছু বলবার থাকবে না তাতে। দোরাদাবুর দিকে সন্দেহের আঙুলও উঠবে না আর…

ক্রমশ

শীর্ষচিত্র- অতনু দেব।

 জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক

Leave a Reply