ধারাবাহিক উপন্যাস-সিন্ধু নদীর তীরে -পর্ব ১১- পিটার বিশ্বাস-শরৎ ২০২৩

সিন্ধুনদীর তীরে –প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব, পঞ্চম পর্ব, ষষ্ঠ পর্ব , সপ্তম পর্ব, অষ্টম পর্ব, নবম পর্ব , দশম পর্ব, একাদশ পর্ব,  দ্বাদশ পর্ব, ত্রয়োদশ পর্ব, চতুর্দশ পর্ব, পঞ্চদশ পর্ব, ষোড়শ পর্ব, সপ্তদশ পর্ব

IMG-20210913-WA0004

দশম অধ্যায়-শিক্ষালাভ

বৃদ্ধ আনমনে কাঁচা মাটির পাটার গায়ে আঁচড় কাটছিলেন। পাশে বসে মাণ্ডুপ নিঃশব্দে তাঁর কাজ দেখে যাচ্ছিল। আঁচড়গুলো এখন তার কাছে আবছা আবছা অর্থ বয়ে নিয়ে আসে। ওরা কথা বলে যেন তার সঙ্গে! তার সবকিছুর অর্থ এখনও সে বোঝে না, কিন্তু আস্তে আস্তে তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে তার কাছে। এ এক আশ্চর্য জাদু!

ইন্দাতীরে, আমহিরি শহরে মন্দিরদুর্গে এ শিল্প মাণ্ডুপ দেখেছে। তবে দূর থেকে। সভয়ে ও সসম্ভ্রমে। দোরাদাবুর আদেশে এ বিদ্যায় একমাত্র অধিকার মন্দির দুর্গের পুরোহিতদের। অন্য কেউ তার চর্চা করলে সেই বিধর্মীর মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্য হয়।

অবশ্য, সেখানে সুযোগ পেলেও এর চর্চা মাণ্ডুপ হয়তো কখনো করত না। কারণ চিরকাল সে একে একধরণের অন্ধকার জাদুবিদ্যা বলেই জেনে এসেছে। তা না হলে, এইরকম বিভিন্ন অর্থহীন আঁকিবুঁকি দেয়া একটা মাটির পাটা সামনে তুলে ধরতেই পুরোহিতদের মুখে অমন সব আশ্চর্য সব কথা উঠে আসবে কেন? সে কথা কখনো কোনো বিচিত্র মন্ত্র, কখনো বা কারো মৃত্যুদণ্ডের কথা শোনায়। আবার যে বেণেরা এর সামান্য জ্ঞান পায় তাদের হাতের পাটার আঁকিবুঁকি কীভাবে তাদের ব্যাবসার নিখুঁত হিসাব জানিয়ে দিতে পারে? এই অন্ধকার জাদুর বিষয়ে তাই মান্ডুপের চিরকালই একটা আতঙ্ক কাজ করত। এবং তার মতই ইন্দাতীরের প্রায় সমস্ত সাধারণ মানুষের মধ্যেই এই ভয়টা কাজ করেছে চিরকাল।

কিন্তু… কিরাম নামের এই বৃদ্ধ তার সব হিসেব বদলে দিয়ে গেলেন…

***

কাঁচা মাটির পাটার গায়ে আঁচড়ে আঁচড়ে অক্ষর সাজিয়ে ম্‌হিরির পতনের কাহিনি লিখে রাখছিলেন কিরাম। এই লেখার শিল্পে তাঁর বহুকালের অভ্যাস। পাটার দিকে চোখ ফেলতে হয় না তাঁকে। তাঁর শিক্ষিত আঙুলেরা চোখের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই সচ্ছন্দে তাদের কাজ চালিয়ে যায়।

তাঁর ভেজা চোখদুটো এখন ধরা রয়েছে বায়ুকোণে ছড়িয়ে থাকা একটা পরিত্যক্ত এলাকার দিকে। এখান থেকে বেশি দূর নয় তা। অনেকটা এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা জায়গাটাকে কেমন যেন ভূতুড়ে দেখায় এখান থেকে। তার মাঝখানের উঁচু একটা এলাকায় এখনও কিছু কিছু ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি চোখে পড়ে। সেদিকে তাকিয়ে বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়লেন কিরাম। ওই ধ্বংসাবশেষদের প্রতিটি তাঁর চেনা। জ্যোতিগৃহ, সৈন্যাবাস, মহামাতৃকার আবাস! এককালের সম্ভ্রম জাগানো সেই ম্‌হিরি শহরের অবশেষ! কিন্তু তার পর থেকে নদীদুটো অবধি ছড়িয়ে থাকা বিরাট শহরটার চিহ্ন প্রায় মুছে গিয়েছে। কারণ, এ-বছর বর্ষায় মার্জাগ আর বুলানিতে একসঙ্গে বান ডেকেছিল। ক্ষেপে উঠেছিল শহরের পেছনে আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওই পর্বতরাজও। নদীর পলি আর পাহাড়ের মাথা থেকে নেমে আসা কাদা ও পাথরের স্রোত এসে প্রায় ঢেকে দিয়েছে শহরটাকে। আর একটা কি দুটো বছর। তারপর আর চিহ্নও থাকবে না এককালের ওই মহান শহরটার!

সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল বৃদ্ধের গলা বুক থেকে। মার্জাগ আর বুলানিতে আগেও তো কতবারই বান ডেকেছে! পেছনের ওই গিরিসঙ্কট থেকে বর্ষায় কাদার ঢল কিংবা শীতে হিমানী সম্প্রপাতও বারংবার ধেয়ে এসেছে এই শহরকে লক্ষ্য করে। কিন্তু তাতে শহরের এই দশা কখনো হয়নি। তাকে ঘিরে থাকা ত্রিস্তর দেয়াল, সেই আক্রমণের ধারকে অনেকটাই ভোঁতা করে দিয়েছে প্রতিবার। তা সত্ত্বেও প্রতিবারই কিছু ক্ষতি হত শহরের। তবে তার বাসিন্দা আর অজস্র দাসের একত্র পরিশ্রমে সে ক্ষতি মিলিয়ে যেতে দেরি হয়নি কখনো। কিন্তু এবারে এ শহরের সেই রক্ষাকবচ ছিল না। বিধ্বস্ত, লুণ্ঠিত, পুড়ে ছাই শহরটাকে ছেড়ে যাবার আগে তার প্রতিরক্ষা দেয়ালগুলোকে গুঁড়িয়ে দিয়ে গেছে ইন্দাতীরের দোরাদাবুর সেনাবাহিনী। তাছাড়া, বিপর্যয়ের পর শহরকে আগের রূপ ফিরিয়ে দেবার জন্য পরিশ্রমী দাসের দলও আর নেই। ম্‌হিরির অবশিষ্ট এক হাজারেরও কম মানুষ আজ নিজেরাই ইন্দাতীরের রাক্ষসের দাস!

মাত্রই ন’মাস পার হয়েছে ওই ভয়ঙ্কর যুদ্ধের পরে। এখনও সে-সময়টার প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত যেন খোদাই হয়ে আছে কিরাম-এর মস্তিষ্কে…

সে এক বর্ষার রাত ছিল। সে রাতে ঘুমোবার উপায় ছিল না কিরামের। ঘুমোয়নি তাঁর দুই প্রিয় শিষ্যও। রাত্রি তিন প্রহরেও তাঁর উঁচু পাঁচিল ঘেরা বাড়ির উঠোনে মশালের আলো জ্বলছিল। উঠোনের এক কোনে একটা মাটির বিরাট চুল্লির মুখ খোলা। তার ভেতরে তখনও নিভন্ত আগুনের আভা দেখা যায়। সেখান থেকে বের করে আনা মাটির পাটাতনগুলো তাঁর সামনে সাজিয়ে রাখছিল তাঁর দুই শিষ্য।

পাটাতনগুলোর গায়ে খোদাই করা লেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখছিলেন কিরাম। ইন্দাতীরের ইতিহাসের আরো একটা অধ্যায় লেখা সম্পূর্ণ হয়েছে। তবে, আরো একদিন অন্তত আগুনের তাতে রাখা দরকার ছিল এদের। কিন্তু,  তিনি নিরুপায়। বিকেলে মহামাতৃকা সুব্রালের কাছ থেকে দূত এসেছিল। পরদিন সকালে সভায় ডাক পড়েছে তাঁর। তিনি তাঁর কাজের অগ্রগতির খবর নিতে চান।

ইন্দাতীরের ইতিহাস লিখবার দায়িত্ব দিয়েছেন সুব্রাল তাঁর ওপরে। প্রায় এক দশক ধরে সে কাজ চলছে কিরাম-এর। কাজটা শ্রমসাধ্য। ইন্দাতীরের নানান শহরে ম্‌হিরির অজস্র গুপ্তচর আছে। তাদের পাঠানো খবর ছাড়াও ম্‌হিরিতে আসা ক্রীতদাস, যুদ্ধব্যবসায়ী, বেনে- এদের কাছেও প্রচুর খবর মেলে। সেইসব খবর একত্র করে তিল তিল করে সে কাজ করে চলেছেন কিরাম।

সাধারণত তাঁর কাজে কোনো নজরদারি করেন না মহামাতৃকা। কেবল মাঝে মাঝে সভায় ডাকিয়ে এনে পরখ করে নেন, কতটা এগোলো কাজ। সুব্রাল মানুষ ভালো, কিন্তু কেউ আদেশ না মানলে ক্রুদ্ধ হন। তাঁর ক্রোধের মুখোমুখি হবার সাহস ম্‌হিরি নগরীতে খুব কম মানুষের আছে। অতএব তাঁর ডাক আসতে কিরাম আর দেরি করেননি। সদ্য সমাপ্ত হওয়া অধ্যায়টার পাটাগুলোকে চুল্লিতে পোড়াতে দেয়া হয়েছিল আগের দিন। তাড়াতাড়ি চুল্লি নিভিয়ে সেই আধপোড়া পাটাদেরই বের করে আনা শুরু করেছিলেন তিনি।   

কাজ চলতে চলতেই অনেক দূরে, শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা থেকে একটা বড়োসড়ো হইচইয়ের শব্দ উঠেছিল। তবে কিরাম তাতে বিশেষ ভ্রূক্ষেপ করেননি। ওখানে ইন্দাতীরের অসভ্যেরা এসে জড়ো হয়েছে। এই অশিক্ষিত বর্বরেরা সম্ভবত ওইভাবেই আনন্দ-উৎসব করে থাকে। তাদের সামলানোর জন্য ম্‌হিরির সেনাদল আছে। আছেন স্বয়ং মহামাতৃকা সুব্রাল। তাছাড়া শহরের একটেরেতে দাঁড়ানো তাঁর এই বাড়ি ও-জায়গা থেকে অনেকটাই দূরে। কাজেই নিজের বাড়ির উঁচু পাঁচিলের আড়ালে নিশ্চিন্তেই হাতের কাজ সারছিলেন মহাপণ্ডিত কিরাম।

কিন্তু সে কাজ আর শেষ করা হয়নি তাঁর। ভোররাত্রির দিকে, যখন পুব আকাশে প্রথম আলোর ছোঁয়া লেগেছে ঠিক সেই সময় তাঁর বাড়ির বন্ধ দরজায় ঘন ঘন ঘা পড়েছিল। বিরক্ত হয়েছিলেন কিরাম। মহামাতৃকার প্রধান লিপিকরের বাড়ির দরজায় অসময়ে এমন উৎপাত করবার সাহস হল কার? এক শিষ্যকে ইশারা করেছিলেন দরজা খুলে উদ্ধত অতিথিকে বিদায় করতে।

কিন্তু দরজা অবধি যাবার প্রয়োজন হয়নি সেই তরুণের। তার আগেই প্রচণ্ড এক ধাক্কায় কাঠের দরজা ভেঙে ফেলে বন্যার মত ভেতরে ধেয়ে এসেছিল ইন্দাতীরের পোশাক পরা একদল সৈন্য। মুখে তারা কোনো কথা বলেনি। কিরাম বা তাঁর শিষ্যদের কোনো কথাতেও তারা কান দেয়নি। কেবল তাঁদের টেনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল সার বেঁধে দাঁড়ানো একদল মানুষের পেছনে। মানুষগুলোর প্রত্যেকেই কিরামের চেনা। তাঁর প্রতিবেশী তারা। ম্‌হিরি নগরের একটেরেতে দাঁড়িয়ে থাকা এই পণ্ডিতপল্লীর এই প্রত্যেকটি মানুষ পেশায় শিক্ষক, গবেষক, পণ্ডিত। প্রত্যেকের ঘুমজড়ানো চোখেই তখন অজানা আতঙ্কের ছাপ। একটা লম্বা দড়িতে একের পর এক বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে তারা ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায় থরথর করে কাঁপছিল।

প্রতিবাদ করেছিলেন কিরাম। এদের দলনেতার সামনে গিয়ে বলতে চেয়েছিলেন, এ অন্যায়। কিন্তু মুখ খোলবার আগেই লোকটার হাতে ধরা তলোয়ারের ভোঁতা দিকের একটা ঘা খেয়ে যন্ত্রণায়, অপমানে বোবা হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এমন অপমান কখনো সইতে হবে তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি।

তারপর হাতে দড়ি বাঁধা অবস্থায় তাঁদের দলটাকে পশুর মত তাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল ইন্দাতীরের সৈন্যদলটা। পেছনে তাকিয়ে কিরাম দেখেছিলেন, পল্লীর প্রতিটা বাড়ি থেকে পণ্ডিতদের মাটির টালিতে খোদাই করা পুথির স্তূপ বের করে এনে মহিষে টানা গাড়িতে বোঝাই করছে সেনারা। তারপর বাড়িগুলোতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে বন্দি ও লুঠের জিনিসপত্র নিয়ে রওনা হল তারা।

শুধু তাঁদের পল্লীটুকুই নয়, কিরামদের পেছনে তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে গোটা ম্‌হিরি শহরটাই। সেখান থেকে উঠে আসা আগুনের ফোঁসফোঁসানি আর একের পর এক বাড়ির ধ্বসে পড়ার শব্দে যেন মরণ আর্তনাদ করছিল তাঁদের প্রিয় ম্‌হিরি।

এরপর, প্রায় একবেলার পথ হাঁটিয়ে তাঁদের, বোলান নদীর পাড়ের এই জায়গাটায় নিয়ে আসা হয়। চারদিকে তাকিয়ে কিরাম দেখেছিলেন, শহরের বিভিন্ন পেশার পল্লী থেকে বাছাই করা মানুষের এক-একটা দলকে সেইখানে এনে হাজির করেছে সেনারা। সে দলে মৃৎশিল্পী, শঙ্খশিল্পী, চিত্রকর, ধাতুশিল্পী, স্থপতি, পণ্ডিত, তাঁতি, মণিকার, অস্ত্রনির্মাতা… কে নেই! প্রতিটা দলের সঙ্গে মোষের গাড়িতে বোঝাই করে আনা হয়েছে তাদের পেশার যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণ।

সব মিলিয়ে বড়োজোর এক হাজার মানুষ। এ শহরে প্রায় দশ হাজার মানুষের বাস ছিল। বাকিরা কোথায় গেল সে প্রশ্ন আর তোলেননি কিরাম। ধূ ধূ করে জ্বলছে তখন শহরটা। সেখান থেকে ভেসে আসা ধোঁয়ায় মেশা পোড়া মাংসের গন্ধ তাঁকে সে প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিয়েছিল।

কিরাম এবং তাঁর মত অন্যান্য বন্দিরা সবাই ভেবেছিলেন, তাঁদের দাস হিসাবে সঙ্গে নিয়ে ইন্দাতীরে ফিরে যাবে বিজয়ী সেনারা। কিন্তু বাস্তবে একটা অন্য ছবি দেখা গেল। এইখানে এসে পৌঁছোবার পর সৈন্যরা তাঁদের নিয়ে অপেক্ষায় রইল। তাঁদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিত না তারা।  কেবল উদ্যত অস্ত্র  হাতে নিঃশব্দে পাহারায় থাকত তাঁদের ঘিরে। 

তৃতীয় দিনের শেষে, একেবারে হঠাৎ করেই তাঁদের সেখানে রেখে পাহারাদার সৈন্যরা অনেকটা দূরে সরে যায়। তারপর সেদিন রাতের অন্ধকারে তাঁদের মাথার ওপর আকাশে ভেসে এসেছিল একটা ছোট্ট গোলক। অসহ্য আতঙ্কের একটা ঢেউ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ছড়িয়ে গিয়েছিল সেই এক হাজার মানুষের মনে। যেন কেউ তাঁদের মনের মধ্যে একটা ভয়াল অন্ধকারের স্রোত বইয়ে দিয়েছে।

আর তারপর আতঙ্কে পঙ্গু হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর মাথায় কিছু সুনির্দিষ্ট আদেশ ভেসে এসেছিল। কোনো প্রশ্ন করেনি তারা। একেবারে যন্ত্রের মতই সেই আদেশ অনুসরণ করে উঠে দাঁড়িয়ে হাতে তুলে নিয়েছিল মাটি খোঁড়বার যন্ত্র।

এর এক সপ্তাহের মধ্যে, ম্‌হিরি নগরীর পোড়া ধ্বংসাবশেষে থেকে খানিক দূরে এই বন্দিদের হাতে গড়ে উঠেছিল একটা গ্রাম। তার একপাশে একসার ছোটো ছোটো মাটির কুঁড়েঘর। অন্যপাশে একসার কর্মশালা। বিভিন্ন পেশার মানুষের দলগুলো ভাগ ভাগ হয়ে নিজের নিজের কর্মশালা গড়ে তুলেছিল সেই গোলকদেবতার নিঃশব্দ আদেশে। কেবল কিরাম-দের কর্মশালা গড়ে তোলবার কাজে সাহায্য করেছিল মৃৎশিল্পীদের দলটা। তাঁরা পণ্ডিত। মাটির পাটা বানাবার ছাঁচ কিংবা তাতে লেখার পর তা পোড়াবার চুল্লি- এদের কোনোটা বানাবার কৌশলই তাঁদের জানা ছিল না। অন্তর্যামী গোলকদেবতার তা টের পেতে সমস্যা হয়নি কোনো।

এই দুটো সারির মাঝখানে একটা চওড়া জায়গায় পাহাড় থেকে বয়ে আনা পাথরের বড়ো বড়ো চাঙড় সাজিয়ে একটা মন্দির গড়ে তোলা হয়। এইখানে গোলকদেবতা তাঁর আসন নেন। এই মন্দির তৈরির কাজটা করেছিল ইন্দাতীরের সেনারা। কারণ গোলকদেবতার মন্দিরের স্থাপত্যের বা তার মধ্যেকার নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো জ্ঞান ম্‌হিরিবাসীর মস্তিষ্কে ছিল না। পিতা দোরাদাবুর পরামর্শে তাদের সে তত্ত্ব জানাতে চানওনি এই নতুন জনপদের দায়িত্বে থাকা সন্তান গোলক।

dharabahik86

ইন্দাতীরের সেনারা এরপর তাঁদের সেখানে রেখে ফিরে গিয়েছিল মঞ্জাদাহিরের পথে। ফিরে গিয়েছিল, কারণ সেখানে আর তাদের পাহারার প্রয়োজন ছিল না কোনো। ঘর আর কর্মশালার দুটো সারির মাঝখানে অধিষ্ঠিত সন্তানগোলকের মানসিক নিয়ন্ত্রণই এদের বশে রাখবার পক্ষে যথেষ্ট ছিল।

কিন্তু এরপর একটা বিচিত্র সমস্যা দেখা দেয়। ইন্দাতীরের সৈনিকেরা মঞ্জাদাহিরের পথে রওনা দেবার তিনদিন বাদে প্রথম মৃত্যুটা ঘটে এই গ্রামে। সন্তানগোলকের মানসিক নির্দেশে তখন গ্রামে একটা দৈনন্দিন কর্মসূচি তৈরি হয়েছে। মানুষগুলো সূর্যোদয়ের আগে যন্ত্রের মত ঘুম থেকে ওঠে, তারপর যার যার কর্মশালায় গিয়ে কাজ শুরু করে। তাদের প্রত্যকের মস্তিষ্কের সঙ্গে সংযোগ রেখে প্রতিটি কাজকে নিবিড় মনোযোগে অধ্যয়ন করেন সন্তানগোলক। এইভাবে সারাদিন কাজ চলবার পর, রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরে তারা ফের যন্ত্রের মতই কর্মশালা ছেড়ে বের হয়ে যার যার কুটিরে ফিরে আসে ও সামান্য কিছু খাবার খেয়ে মড়ার মত ঘুমিয়ে পড়ে।

এই সময় কিরাম বা তাঁর সঙ্গী পণ্ডিতরা একটা আশ্চর্য সমস্যায় পড়েছিলেন। অন্যান্যদের মত তাঁরাও একই সময়ে তাঁদের বাসগৃহ ছেড়ে কর্মশালায় গিয়ে উপস্থিত হতেন বটে, কিন্তু কোনো অজানা কারণে তাঁদের ধীশক্তি প্রায় লোপ পেয়েছিল এই সময়টা। ফাঁকা মস্তিষ্ক নিয়ে নিজেদের লেখা মাটির পাটাগুলোর দিকে সারাদিন তাকিয়ে থাকতেন তাঁরা। তার শব্দগুলো তাঁদের পরিচিত হলেও সেগুলোর সুসম্বদ্ধ কোনো অর্থ তাঁরা বুঝতে পারতেন না। নতুন কোনো মাটির পাটায় অক্ষরপাত করবার চেষ্টা করলে তা একেবারেই অর্থহীন কিছু শব্দসমষ্টি হয়ে ফুটে উঠত।

কর্মপদ্ধতি শুরু করবার তৃতীয় দিনে এক প্রস্তরশিল্পী পাথর খুদে শস্যপেষণের একটা উন্নতমানের যন্ত্র তৈরির কাজে ব্যস্ত ছিল। ম্‌হিরির এই শস্যপেষক যন্ত্র ইন্দাতীরের মানুষ কখনো দেখেনি। এতে দুটো ঘূর্ণায়মান পাথরের চাকার সংযোগস্থলে এঁরা সুকৌশলে কিছু ছোটো ছোটো পাথরের মসৃণ গোলক ঢুকিয়ে দেন। এর ফলে ভারী চাকাদুটো অল্প আয়াসে মসৃণভাবে দ্রুত ঘুরে অল্প সময়ে অনে বেশি শস্য পেষণের কাজ শেষ করতে পারে।

তা, সেদিন সকালে, নিঃশব্দে এই কাজটা করতে করতেই হঠাৎ এক প্রস্তরশিল্পী উঠে দাঁড়ায়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সন্তানগোলকের মানসিক শক্তির একটা ধারা চাবুকের মত আঘাত করেছিল তার মনে। কিন্ত তাতে কুঁকড়ে গিয়ে ফের নিজের কাজে ফিরে যাবার বদলে সে অমানুষিক শক্তিতে নিজের হাতুড়ির ঘায়ে নিজের খুলিটাকে ভেঙে দেয়। তার হতভম্ব সহকারীর গায়ে তার ছিন্নবিচ্ছিন্ন মস্তিষ্কের রক্তমাখা অবশেষ ছড়িয়ে গিয়েছিল। 

ঘটনাটা এরপর খুব তাড়াতাড়ি মহামারীর আকার নেয়। পরবর্তী তিনদিনের মধ্যে অন্তত পঞ্চাশজন শিল্পী এই একইভাবে আত্মঘাতী হবার পর একদিন সকালে মাণ্ডুপ নামে ইন্দাতীরের এক সেনা পঞ্চাশজন সৈনিককে নিয়ে এই গ্রামে ফিরে আসে।

এর দুদিন পরে এক সন্ধ্যায় সন্তানগোলক তাঁর মন্দির ছেড়ে ফের বাতাসে ভেসে উঠে দিগন্তে মিলিয়ে যান। এরপর মাণ্ডুপ গ্রামের সমস্ত মানুষকে একত্র করে জানান, পরবর্তী গোলকদেবতার দায়িত্ব নেবার আগে পর্যন্ত কিছুদিন তিনি ও তাঁর পঞ্চাশজন সৈনিক এই গ্রামের দায়িত্বে থাকবেন। তাদের কোনো ভয় নেই। তারা যেন নিশ্চিন্তে তাদের নিজের নিজের শিল্পের চর্চা চালিয়ে যান।

সন্তানগোলক বিদায় নেবার পর আশ্চর্যভাবে এই গ্রামে আত্মহত্যার প্রবণতা থেমে এসেছিল। এবং একই সঙ্গে কিরাম খেয়াল করেছিলেন, ফিরে এসেছে তাঁর ধীশক্তিও। তবে শরীরের জোর যে তাঁর কমে আসছে এ কথা বুঝতে পেরেছিলেন কিরাম। আজন্ম চেনা ঘরবাড়ি, জীবনযাত্রা সব হারিয়ে বিদেশী শত্রুর হাতে এই ক্রীতদাসের জীবনকে মেনে নিতে না পেরে বাঁচবার ইচ্ছেটাই যে মিলিয়ে যাচ্ছে তা টের পেতে তাঁর অসুবিধে হয়নি কোনো। আর তাই, অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর আসবার আগেই যতটুকু সময় আছে তাতে ইন্দাতীরের রাক্ষস সভ্যতার শেষ পাপটার কথা লিপিবদ্ধ করে রেখে যেতে তিনি উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন। যেন কোনো আসুরিক শক্তির বশ হয়ে এখন তিনি দিনরাত লিখে যান।

আর, তারই পাশাপাশি আরো একটা কাজ শুরু করেছেন তিনি। প্রথমে সে কাজকে একটা অসহ্য দায় বলেই মনে হয়েছিল কিরাম-এর। কারণ তা করবার নির্দেশ এসেছিল, ইন্দাতীরের পাহারাদার সেনার নায়ক ও মাণ্ডুপের তরফ থেকে। ছেলেটা মুখে বিনয়ী। কিন্তু তার বিনীত অনুরোধটাও যে আসলে আদেশ সেটা বুঝিয়ে দেবার মত দৃঢ়তা সেই অনুরোধে তার ছিল।

***

ম্‌হিরি ছেড়ে রওয়ানা হবার দিন তিনেকের মাথায় একেবারে আকস্মিকভাবেই মহান দোরাদাবুর একটা নির্দেশ ভেসে এসেছিল মাণ্ডুপের মাথায়। ম্‌হিরিতে ফিরে যাবার নির্দেশ। আদেশ ছিল, পঞ্চাশজন বাছাই সৈনিককে নিয়ে তাকে ফিরে যেতে হবে সেখানে। সন্তানগোলকের হাত থেকে অস্থায়ীভাবে ওই গ্রামের দায়িত্ব নেবে সে। পরবর্তী সন্তানগোলক সেখানে ফিরে এসে দায়িত্ব নেবার পর সে মঞ্জাদাহিরে ফিরে আসবে। দোরাদাবুর দ্বিতীয় নির্দেশ ছিল, এই সময়টা যেন একজন ম্‌হিরিবাসীরও মৃত্যু না ঘটে তার বা তার সেনাদের হাতে।

আদেশটা পেয়ে যারপরনাই অবাক হয়েছিল মাণ্ডুপ। যুদ্ধ শেষ হবার পর সবার নজরের আড়ালে জ্যোতিগৃহ থেকে বিষপাথর রাখা সীসার পাত্রটাকে তুলে এনে সে নিজের কাছে রেখেছে। আহীন এর কথা জানেন না। এ কথা দ্বিতীয় কাউকে জানাতে নিষেধ আছে মহান দোরাদাবুর। একাধিকবার তিনি তাকে জানিয়েছেন যে জিনিসটার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছেন তিনি। এ অবস্থায় তাকে ফের একবার ম্‌হিরিতে ফিরে যেতে বলবার আদেশটা অস্বাভাবিক। নিঃসন্দেহে বড়ো সমস্যা হয়েছে কোনো! এমন সমস্যা, যার প্রতিকার করতে এমনকি দোরাদাবুরও অনির্দিষ্টকাল সময় লেগে যাবে! এমন কোনো সমস্যা, যাতে একমাত্র তাকেই বিশ্বাস করে ফেরৎ পাঠানো যায়।

কাজেই ফিরতি সেনাদলের থেকে বেছে বেছে আমহিরির পঞ্চাশজন সৈনিককে একত্র করে নিয়ে সে এরপর ম্‌হিরির পথে ফিরে যায়। এরা প্রত্যেকেই তার পরিচিত। অনেকেই তার শৈশবের খেলার সাথী। তাদের সঙ্গে থাকলে বোঝাপড়াটা থাকবে, আর নির্বাসনের অনির্দিষ্ট সময়টাও ভালো কাটবে এই তার আশা ছিল।

ম্‌হিরি পৌঁছে গ্রামের দায়িত্ব নেবার পর মাণ্ডুপ প্রথমেই তার সেনাদলকে ছোটো ছোটো কয়েকটা দলে ভাগ করে নিয়েছিল। দলগুলোর কাজ ছিল সেই কারিগরদের কাজে সহায়তা করা ও তাদের শিক্ষানবিশী করে নির্দিষ্ট কারিগরি বিদ্যাটাকে যথাসাধ্য রপ্ত করবার চেষ্টা করা। এর পেছনে দুটো উদ্দেশ্য ছিল মাণ্ডুপের। একে তো কতদিন তাকে এইখানে থাকতে হবে সে জানে না। দোরাদাবুর আদেশ, যেন একজন ম্‌হিরিবাসীরও মৃত্যু না হয় তাদের হাতে। কাজেই, এই সময়টা যাতে ইন্দাতীরের সৈনিকদের সঙ্গে এদের কোনো রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব তৈরি না হয় সেই উদ্দেশ্যেই এদের কাজের সূত্রে কাছাকাছি নিয়ে আসবার পরিকল্পনাটা ছকেছিল সে।

তবে এছাড়াও, একটা দ্বিতীয় উদ্দেশ্যও ছিল তার। সে সৈনিক পরিবারের ছেলে হলেও ব্যাবসাবুদ্ধি তার রক্তে। ইস্কাও সে কথা বহুবার বলেছে তাকে। মাঝে মাঝেই সে মজা করে বলত, মান্ডুপের ধমনীতে যেন বেণের রক্ত বইছে! কাজেই, দায়িত্বটা পেয়েই বুদ্ধিটা তার মাথায় খেলে গিয়েছিল। ম্‌হিরির শিল্প, ধাতুবিদ্যা, প্রযুক্তি বেশ উন্নতমানের। ইন্দাতীরের বাজারে তার কদর আছে। আমহিরির বাসিন্দা এই সৈনিকরা সে বিদ্যা খানিক শিখে গেলে, মঞ্জাদাহির পৌঁছে যদি সে তাদের নিয়ে একটা কর্মশালা গড়তে পারে, তাহলে দু’এক বছরের মধ্যেই ইন্দাতীরের শ্রেষ্ট বেণে হয়ে উঠতে কোনো সমস্যা হবে না তার।

তবে, নিজের উদ্দেশ্যগুলো তার কাছে পরিষ্কার থাকলেও, দোরাদাবু কেন গোলকদেবতাকে সরিয়ে তাকে এ দায়িত্ব দিলেন সে নিয়ে তার প্রশ্নটা থেকেই গিয়েছিল। ম্‌হিরি পৌঁছে, আত্মহত্যার খবরগুলো পেয়ে রহস্যটা আরো ঘনীভূত হয়েছিল। অবশেষে এর একটা মোটামুটি ব্যাখ্যা কিরামই দিয়েছিলেন তাকে। তবে সে ব্যাখ্যা পেতে কয়েক দিন সময় লেগেছিল তার। একেবারে শুরুতে তার কাছে একেবারেই মুখ খোলেননি কিরাম…

***

…মানুষটা শান্ত। আপনমনে তাঁর কাঁচা মাটির পাটার বুকে আঁক কেটে যান সারাটা দিন। কিছুকাল তাঁকে লক্ষ করবার পর একদিন কৌতূহলী মাণ্ডুপ এসে তাঁর কাছে বসেছিল। জানতে চেয়েছিল…

…কিন্তু শুরুতে কিরাম তার কোনো প্রশ্নেরই জবাব দেননি। বরং তাঁর হাবভাবে মাণ্ডুপের প্রতি একটা গভীর ভয় আর বিতৃষ্ণা ফুটে বের হত। বিষয়টা খেয়াল করে মাণ্ডুপ তার কৌশল বদলায়। বৃদ্ধের কাছাকাছি সে এসে চুপ করে বসে থাকত। কখনও কখনও তাঁর অন্যমনস্ক হাতে এগিয়ে ধরত একপাত্র তরমুজের রস, অথবা সিদ্ধ যবের পিণ্ড। মাটির পাটায় আঁক কাটবার ধাতব কাঠিগুলোকে জলে ধুয়ে পরিষ্কার করে রাখা, অতিরিক্ত গরমে ঘাম মোছবার জন্য একটুকরো কাপড় কিরামের দিকে এগিয়ে দেয়া এই তার সারাদিনের কাজ হয়ে উঠেছিল তখন।

অবশেষে এতে কাজ হল। একদিন দুপুরে বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে খানিক নরম গলায় বললেন, “কী চাও তুমি হে ইন্দাপাড়ের সৈনিক?”

জবাবে একটু হেসে মাথা নেড়েছিল মাণ্ডুপ, “কিছু চাই না। কিন্তু আপনি যে শান্তভাবে বসে মাটির পাটায় আঁচড় কাটেন তা দেখতে আমার ভালো লাগে। এ আঁচড়ে অন্ধকার ও নিষিদ্ধ জাদুর বাস সে আমি জানি। আমাদের দেশে এর চর্চা করেন কেবল মন্দিরদুর্গের পুরোহিতরা। তাঁরা এর প্রভাবে হিংস্র ও নিষ্ঠুর হন। তাঁদের দেখে ভয় লাগে। অথচ এই অন্ধকার জাদুবিদ্যার চর্চা করেও আপনি এমন শান্ত ও স্নিগ্ধ থাকেন, কারো কোনো ক্ষতি করেন না, এটা বড়ো ভালো লাগে আমার।”

শুনে একটুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ হা হা করে হেসে উঠেছিলেন বৃদ্ধ কিরাম, “অন্ধকার জাদুর আঁচড়! হাঃ। এ হল লিপিবিজ্ঞান হে মূর্খ। মানুষের জ্ঞানকে মাটির পাটার গায়ে মুদ্রিত করে ধরে রাখবার প্রযুক্তি। তোমাদের দেশে ওই পিশাচ পুরোহিতরা বাদে আর কারো এ বিদ্যায় অধিকার নেই। তাই তো?”

নীরবে মাথা নাড়ল মাণ্ডুপ। বৃদ্ধ ভুল বলেননি।

“কিন্তু কেন, তা বলতে পারবে কি?”

“কেমন করে জানবে? ওতে যে অন্ধকার জাদুর মন্ত্র লেখা থাকে! একমাত্র পুরোহিতরা বাদে আর কারো পক্ষে তা জানা… সে যে মহাপাপ! তার একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত যে দোরাদাবুর আদশে মৃত্যুদণ্ড!”

কথাটা শুনে একটুক্ষণ চুপ করে গিয়েছিলেন কিরাম। তাঁর সামনে বসা তরুণের সরল মুখটা দেখে বোধ হয় একটু করুণাই হয়েছিল তাঁর। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর তিনি বলেছিলেন, “বেশ। তাহলে আমিই এদের উচ্চারণ করি। তুমি শোনো। ভয় পেও না। তোমার তরবারি বের করো। তাকে সাবধানে ধরে রাখো আমার গলায়। আমার পাঠ শুরু হলে যদি সামান্য কোনো অশুভের উপস্থিতি অনুভব করো তবে তরবারির একটা আঘাতে আমাকে শেষ করে দিও তুমি।”

অদ্ভুৎ প্রস্তাবটা শুনে মাণ্ডুপের কৌতূহল তার আজন্মলালিত ভীতিকে ছাপিয়ে উঠেছিল। সাবধানে কোমর থেকে অস্ত্র খুলে এনে কিরামের গলায় তার ফলাটা ঠেকিয়ে সে ইশারা করেছিল তাঁকে।

পাশে রাখা একটা পোড়ানো পাটার স্তূপ থেকে একটা পাটা বেছে নিয়েছিলেন কিরাম। তারপর তার গায়ের আঁকিবুঁকিগুলোর দিকে চোখ রেখে তাঁর স্নিগ্ধ আর প্রাচীন গলাটা হঠাৎ বলে উঠেছিল,

“মহামাতৃকা সুব্রানের পতন।

যুদ্ধক্ষেত্রে ম্‌হিরি ও ইন্দাতীরের সৈনিকদের ঘোর যুদ্ধ চলাকালিন মহামাতৃকার বাসগৃহের দ্বার উন্মুক্ত হইল। উন্মুক্ত দ্বারপথে তাহার অঙ্গনে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নারীসৈন্যদের ত্রিভূজাকার ব্যুহের শীর্ষদেশে মহামাতৃকা শূলহস্তে মহিষারূঢ় হইয়া…”

আস্তে আস্তে হাতের তলোয়ার নীচু হয়ে আসছিল মাণ্ডুপের। পাটার আঁকিবুঁকিগুলো যেন জাদুবলে কিরামের গলা ছুঁয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে তাকে ঘিরে। তার চোখের সামনে তারা ফের জীবন্ত করে তুলছে সেদিনের সেই যুদ্ধের ভয়াবহ দৃশ্যকে…হ্যাঁ। এ জাদুই তবে এতে তো গল্প আছে, চিত্র আছে। অন্ধকার তো নেই!

তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে গিয়েছিলেন কিরাম। অস্ত্র ততক্ষণে ফের কোমরে আটকে নিয়েছে মাণ্ডুপ। চোখদুটো বড়ো বড়ো করে কিরামের কাছে ঘন হয়ে এসে সে বলল, “তারপর?”

সেদিন দশটা মাটির পটে লেখা সেই অন্তিম যুদ্ধের বিবরণ শেষ হবার পর মাণ্ডুপ তাঁর কাছে এই অনুরোধটা রেখেছিল। তাকে ওই আঁকিবুঁকি থেকে গল্প বের করবার বিদ্যা শেখাতে হবে কিরামকে।  

এরপর বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেছে। এখন নিজের লেখবার কাজটার পাশাপাশি কিরাম মাণ্ডুপকে নিয়মিতই পাঠ দেন কিছু কিছু। আশ্চর্য ধীশক্তি এই কিশোরের। অক্ষরজ্ঞান সম্পূর্ণ করতে সে মাত্র তিনটে দিন সময় নিয়েছিল। আর তারপর, ক্রমাগত চেষ্টায় একটু একটু করে লিপি পাঠের জটিল কৌশলকে সে আয়ত্ত করে চলেছে প্রবল অধ্যবসায়ে।

এরই পাশাপাশি একটা দ্বিতীয় কারণেও কিরামের প্রতি তার একটু শ্রদ্ধা বেড়েছে। সে হল ইন্দাতীরের জীবন বিষয়ে কিরামের গভীর জ্ঞান। সে আমহিরি শহরের ছেলে এ কথা শোনার পর আমহিরি নিয়ে যে নিখুঁত বিবরণটা তিনি দিয়েছিলেন, তাতে বুকে মোচড় দিয়ে বাড়ির জন্য মন কেমন করে উঠেছিল মাণ্ডুপের। এরপর, সে বৈক্লন্যের সন্তান এই কথা শোনবার পর দেখা যায় বৈক্লন্যের বীরত্ব, তাঁর নানান যুদ্ধ ও জয়লাভের খবর কিরামের কণ্ঠস্থ। বাবার ব্যাপারে খুব বেশি জানা ছিল না মাণ্ডুপের। কিরাম তাকে সেনাপতি বৈক্লন্যের জীবনের অনেক অজানা কথাই জানিয়েছেন। এমনকি মহান দোরাদাবুর বিষয়েও তাঁর জ্ঞান ঈর্ষণীয়।

আর এই দোরাদাবু প্রসঙ্গেই একদিন সে কিরামকে প্রশ্ন করেছিল, এমনভাবে কেন দোরাদাবু তাকে এইখানে ফেরৎ পাঠালেন? কেনই বা এখানকার শাসক সন্তানগোলক হঠাৎ উধাও হয়ে গেলেন?

প্রশ্নটা শুনে একটুক্ষণ চুপ করে ছিলেন কিরাম। তারপর মাথা নেড়ে বলেছিলেন, “এর একটাই ব্যাখ্যা আসছে আমার মনে। ম্‌হিরির জন্ম ইন্দাতীরের শহরদের বহু আগে। এর বাসিন্দারা এখানকার মানুষ নয়। ওই  বুলানি গিরিসঙ্কট পার হয়ে দূরের কোনো এলাকা থেকে এইখানে এসেছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। ইন্দাতীরের মানুষরা এখানকার স্থানীয় প্রজাতি। দুই প্রজাতির মনের গঠন হয়তো আলাদা। দোরাদাবুর যে জাদু ইন্দাতীরের মানুষকে বশ করে সে জাদুকে হয়তো ম্‌হিরির মানুষের মন সহ্য করতে পারছে না।

সেক্ষেত্রে ম্‌হিরির মানুষের জন্য কার্যকরী জাদুর সন্ধান না পাওয়া অবধি সম্ভবত দোরাদাবু এ-জায়গায় তাঁর কোনো সন্তানগোলককে পাঠাবেন না। আর, সেই সময়টুকুর জন্য মাণ্ডুপকে এ শহরের দেখভাল করবার জন্য নির্বাচন করাটাই স্বাভাবিক দোরাদাবুর পক্ষে। কারণ,যতটুকু তিনি শুনেছেন মাণ্ডুপের কাছে তাতে এটা পরিষ্কার যে ম্‌হিরি বিষয়ে তার জ্ঞান,এখানে আসা সৈন্যদলের প্রত্যেকের চাইতেই বেশি।

এবং,সম্ভবত,ম্‌হিরি-র উন্নততর জ্ঞানকে নিজের ভাঁড়ারে সংগ্রহ করাও দোরাদাবুর উদ্দেশ্য। তা না হলে তার কিছু মানুষকে তিনি এভাবে বাঁচিয়ে রাখতেন না।

অনির্দিষ্টকালের জন্য তাকে এইখানে থাকতে হবে বুঝতে পেরে অতএব মাণ্ডুপ এইবার এই ছোট্ট গ্রামেই মন বসাবার চেষ্টা শুরু করেছে। আজন্ম শহরে বড়ো হয়েছে সে। সেখানে প্রতি মুহূর্তে কত আনন্দ। কত উত্তেজনা। অথচ নির্জন পাহাড়ও নদীর কোলে এই গ্রামটা যেন ঘুমন্ত এক দেশ। তাকে ঘিরে বয়ে যাওয়া দুই পাহাড়ি নদীর পাড়ে আপনমনে ঘুরে বেড়ানো, মাঝে মাঝে দূরের গিরিসঙ্কটে শিকারে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উত্তেজনা নেই এখানে। অথচ কাছেই হাজারো মানুষের মৃত্যু বুকে নিয়ে জেগে থাকে শ্মশানের মত এক শহরের মৃত শরীর। ভয় লাগে তার সেদিকে তাকালে।

আস্তে আস্তে লিখিত লিপি পড়বার বিদ্যাকে রপ্ত করে এবারে সে তাই সময় কাটাবার জন্য মন দিয়েছে কিরামের পুথিশালার দিকে। এবং একেবারে শুরুর পাটাগুলোর ওপরে চোখ পড়তেই মগ্ন হয়ে গিয়েছে তার আশ্চর্য, অবিশ্বাস্য সব কাহিনিতে।

তার প্রিয় আমহিরি নগরীর আদিম রূপ দিয়ে এ পুথির কাহিনি শুরু। সে কাহিনি কিরাম জোগাড় করেছেন ম্‌হিরি নগরীর প্রাচীন পুথিশালা থেকেই। বহুকাল আগে মহাত্মা আনজিন নামে ম্‌হিরির এক দ্রষ্টা সে কাহিনি লিখে গিয়েছিলেন। তিনি তা শুনেছিলেন, ইন্দাতীরে অভিযানে গিয়ে পর্যুদস্ত হয়ে ফেরা বাহিনীর পুরোহিত অনিগ-এর মুখে, শুনেছিলেন, সে অভিযানের নেতা বীর ইম্‌স্রার অসম্বদ্ধ উন্মাদ প্রলাপে।

সে কাহিনি এক নিঃসীম আতঙ্কের ইতিহাস। ইন্দা নদীর তীরে সেই প্রথম দোরাদাবুর আবির্ভাব। ম্‌হিরি নগরীর তৎকালিন মহামাতৃকা ঐমায়ার স্বামী মহাবীর ইমস্রা সে সময় দোরাদাবুর মানসিক আক্রমণে পর্যুদস্ত হন। এরপর ম্‌হিরিতে ফিরে আসবার পথেই সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন ইম্‌স্রা। তাঁর করুণ পরিণতি নিয়ে ‘ঐমায়ার বিলাপ’ নামের অধ্যায়টা পড়ে মাণ্ডুপের চোখে জল এসেছিল।

গল্পটা প্রথমে বিশ্বাস করতে মন চায়নি মাণ্ডুপের। জন্ম থেকে মন্দিরের গাথায়, পুরোহিতের বাণীতে তারা শুনেছে, মহান দোরাদাবুই এই পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা। পৃথিবীকে সৃষ্টি করবার পরে, আমহিরির পবিত্র মাটিতে তিনি নিজের বাসস্থান নেন। তাঁরই আদেশে এরপর পাহাড়ের বুক চিরে আবির্ভাব হয় পবিত্র ইন্দানদীর ধারার। এরপর তাঁরই অলৌকিক জাদুতে সেই নদীর তীরে প্রথম মানুষের আবির্ভাব। তারা, ইন্দাতীরের মানুষরা দোরাদাবুর সন্তান, পৃথিবীর প্রথম মানুষ। তারা শুনেছে, সেই মানুষের বিপথগামী সন্তানরা এরপর দোরাদাবুর অভিশাপে ইন্দাতীরের স্বর্গ থেকে নির্বাসিত হয়ে পৃথিবীর নানান অঞ্চলে গড়ে তুলেছে অজস্র দানবনগরী। তারা বিশ্বাস করে একদিন ইন্দাতীরের লক্ষ তলোয়ার ফের সেই দানবদের সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করবে। পৃথিবীতে ফিরে আসবে ঈশ্বর দোরাদাবুর পবিত্র সাম্রাজ্য।

অথচ, মহাত্মা আনজিন-এর এই কাহিনি সম্পূর্ণ অন্য কথা বলে। তার দাবি, ইন্দাতীরে সে সময় যে আদিম অর্ধপশুদের বাস ছিল, তারা আদপেই পৃথিবীর প্রথম মানুষ নয়। সেই সময়েই এই ম্‌হিরি শহর উন্নতির শীর্ষে ছিল। এবং তা ছিল বিশ্বজোড়া আরও বহু উন্নত মনুষ্যবসতির একটি। কোনো অলৌকিক গোলকদেবতা তাদের শাসন করত না। নিজের জোরেই তারা নিজেদের শহর গড়েছিল। ইন্দাতীরের বন্য মানুষরা সে সময় ম্‌হিরির দাস বাহিনীর উৎস ছিল। বার্ষিক অভিযানে এদের বন্দি করে এনে দাস হিসেবে কাজে লাগাত তারা, দাস হিসেবে তাদের বিক্রি করা হত অন্যান্য শহরের বেণেদের কাছে।

কথাগুলো বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু অনিগ আর ইমস্রার বলা সেই কাহিনির ভিত্তিতে দোরাদাবুর মানসিক আক্রমণের যে বিবরণ দিয়েছেন আনজিন, তার সঙ্গে মাণ্ডুপের নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা গভীরভাবে মিলে যায়। দোরাদাবুর আক্রমণের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষি না হলে কেউ এতটা নিখুঁত বিবরণ দিতে পারে না! এ ছাড়াও, সেই আদিম আমহিরির যে ভৌগলিক চিহ্নগুলো ধরা আছে সে বিবরণে, তার বর্তমান চেহারাতেও সেই চিহ্নগুলোকেও সে খুঁজে পাচ্ছিল নিখুঁতভাবে। আনজিনের কাহিনি বলে, আমহিরির উত্তরে এক গভীর পাহাড়ি জঙ্গল ছিল। বর্ষা কেটে গেলে শরতের শুরুতে ম্‌হিরির যোদ্ধারা ইন্দা তীরে দাস সংগ্রহের অভিযানে যেত।  আমহিরির উত্তরের ওই জঙ্গল বেয়েই পাহাড় থেকে নদীর ধারে সেই অর্ধপশুদের আস্তানায় নেমে আসত তারা। আর তাই, অর্ধপশুরা সেইখানে শরতে তাদের বসতির বৃদ্ধ ও অশক্তদের নজরদারির কাজে বসিয়ে রাখত। এরা হত ম্‌হিরির অগ্রবর্তী বাহিনীর প্রথম শিকার। এদের মৃত্যু আর্তনাদ নদীতীরের ওই অর্ধপশুদের সতর্কবার্তা দিত।  বাস্তবে, আমহিরির উত্তর-পশ্চিম এলাকা জুড়ে সে জঙ্গল এখনও আছে। তার নাম রাক্ষসদুয়ার। তার ভেতর দিয়ে এক প্রাচীন বাণিজ্যপথ উঠে যায় পাহাড়ের ওপরের দিকে। এখনও শরতের শুরুতে ওই রাক্ষসদুয়ারে আমহিরির মানুষ একত্র হয়ে নগরপ্রহরী আত্মাদের উপাসনা করে। ঐ পথে স্থলপথে বাণিজ্যযাত্রায় বের হবার মুখে বেণেরা রাক্ষসদুয়ারে প্রার্থনা জানায় যাতে রাক্ষসরা ঐ পথ দিয়ে নেমে এসে তাদের কোনো ক্ষত না করতে পারে। কিছুটা সত্যি না থাকলে, এই প্রাচীন বিশ্বাসের সঙ্গে আনজিনের কাহিনি তাহলে এতটা মিলে যায় কেমন করে?

এরপর ধীরে ধীরে, এ কাহিনি যত এগিয়েছে ততই একটু একটু করে মাণ্ডুপের চোখের সামনে গড়ে উঠেছে ইন্দাতীরে এক একটা শহরের গড়ে ওঠবার কাহিনি। সে ইতিহাস নিষ্ঠুর আক্রমণ, কঠোর শাসণ আর রক্তপাতের ইতিহাস। এর বহু কাহিনির সত্যতা সে জানে।

ফলে, পড়তে পড়তে ক্রমশই একটা গভীর দ্বন্দ্বের দোলায় ক্রমাগত দুলতে শুরু করেছিল মাণ্ডুপের মন। হয়তো এ ইতিহাস মিথ্যা। মনগড়া কাহিনি। তার মধ্যে সত্যের খানিক খানিক জুড়ে দিয়ে তাকে আসল ইতিহাস বলে লিখতে চাইছিল চিরশত্রু ম্‌হিরি।

কিন্তু… এ ইতিহাস যদি সত্যি হয়! সন্দেহটা মনে এলেই, একটা গভীর ভয় আর বিতৃষ্ণার অনুভূতি তাকে ছেয়ে ফেলে। তারা, ইন্দাতীরের নগরসভ্যতার গর্বিত বাসিন্দারা… তারা এক আগন্তুক মনরাক্ষসের দাস! তাদের সীমানার বাইরে ছড়িয়ে থাকা বিশাল মানব সভ্যতার স্বাধীনতার স্বাদ তারা জানে না!

না। এ সত্যি হতে পারে না! এই সবই ম্‌হিরির তৈরি করা মিথ্যা ইতিহাস। দোরাদাবু, রাক্ষস নন। তিনি সৃষ্টিকর্তা দেবতা। তিনি ইন্দাতীরের সমস্ত মানুষের পুজ্য অভিভাবক। কিন্তু… যদি…

সেই দ্বিধায় দুলতে দুলতেই সেই তরুণ গোগ্রাসে গিলে চলে কিরামের লেখা ইন্দাতীরের ইতিহাস। পড়তে পড়তে, ইন্দাতীরের কোনো সাফল্যের কাহিনিতে আনন্দে উদ্বেল হয় সে, তার কোনো নিন্দায় সে দুঃখ পায়, রেগে ওঠে, আবার কখনো কখনো তার এক একটা জায়গার পাঠ, একটা অদ্ভুত, অলৌকিক অনুভূতি ছড়িয়ে দেয় তার মনে।

যেমন, কট্টাদিজার দুর্গনগরী নগরী প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। ইমস্রার যুগের বহুকাল বাদে, মাত্রই কিছুকাল আগে আমহিরিরি সেনাবাহিনী ইন্দাতীরে এক রাক্ষস বসতিকে অধিকার করে এই দুর্গ গড়ে তোলে। এর থেকে কিছুদূরে ইন্দার অন্যপাড়ে মঞ্জাদাহির নগর গড়ে উঠেছে ইন্দাতীরের দক্ষিণাঞ্চলের রাজধানী হিসেবে। মূলত সেই মহানগরী প্রতিষ্ঠার ইতিহাস লিখতে গিয়েই কিরাম কট্টাদিজি অধিকারের কাহিনি লিখেছেন। গুরুত্বহীন একটা সেনাছাউনি। তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস অতএব গুটিদুয়েক পোড়ামাটির পাটাতেই শেষ করেছেন কিরাম। তারপর মঞ্জাদাহির নিয়ে তাঁর বিস্তারিত লেখা শুরু হয়েছে। কিন্তু ওই দুটো পোড়া পাটা বহুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল মাণ্ডুপকে। রেখেছিল, কারণ, সেখানে কট্টাদিজার যে আদিম বসতি আর অরণ্যের কথা আছে, তা তার বড়ো পরিচিত লেগেছিল। হঠাৎ করেই ছায়াছায়া কিছু ছবি যেন ফুটে উঠতে শুরু করেছিল তার চোখের সামনে… একটা ছোটো ছেলে… এক দুখিনী মা… সেই আদিম গ্রাম আর অরণ্যে তারা হেঁটে বেড়ায়… তাদের হাসি… খেলা… আনন্দ… অনাহার… দুঃখ…

ব্যাপারটা প্রায় অলৌকিক। যে জায়গায় সে কখনো পা ফেলেছে বলে তার মনে পড়ে না, সে জায়গার সামান্য একটা বর্ণনা কেন তাকে এভাবে নাড়িয়ে দিয়ে যায় তার কোনো ব্যাখ্যা পায়নি মাণ্ডুপ। তবে বেশিক্ষণ সে অনুভূতি অবশিষ্ট থাকেনি তার, এর পরেই মঞ্জাদাহিরের প্রতিষ্ঠার অসামান্য কাহিনি তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মাত্রই দেড় দশকের মধ্যে প্রায় জাদুর মতই ইন্দাতীরে গড়ে উঠেছে ওই বিশাল রাজধানী শহর…

***

ম্‌হিরিতে ফিরে আসবার প্রায় ছ’মাস বাদে একদিন মাণ্ডুপের কাছে ফের একটা মানসিক বার্তা এসে পৌঁছোল। তখন বসন্তের শেষ। সভ্যতার মূলধারা থেকে বহুদূরে, প্রকৃতির কোলে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিচ্ছিন্ন গ্রামে ততদিনে ইন্দাতীরের প্রহরী বাহিনী আর গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে একটা সখ্যের সম্পর্কই গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে কিরাম আর মাণ্ডুপের মধ্যে সম্পর্ক তো সে মুহূর্তে একেবারেই গুরুশিষ্যের।

এই ক’মাসে অনেক শিখেছে সে কিরামের কাছে। তাঁর লেখা ইতিহাস নিয়ে বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মধ্যে সে দোলে। কিন্তু কিরাম তাতে নির্বিকার। নিজের কথাকে জোর করে চাপিয়ে দেন না তিনি। কেবল বলেন, যখন ফিরে যাবে, তখন একটু সতর্কভাবে মিলিয়ে নিও আমার কথাদের। তারপর, তোমার ঈশ্বরের কথা বা আমার কথা- এদের মধ্যে  তোমার স্বাধীন বিচার যাকে বিশ্বাস করতে বলবে তাকেই বিশ্বাস কোরো তুমি।

প্রথম প্রথম এই স্বাধীন বিচার ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারত না মাণ্ডুপ। জন্ম থেকে সে জেনেছে, মহান দোরাদাবু সত্যকে জানেন ও জানান। ভাগ্যবান পুরোহিতদের মুখ দিয়ে তিনি যা জানান, সেইটিই একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য। তার বাইরে আর কোনো সত্য হতে পারে না। তিনিই সভ্যতার একমাত্র উৎস।

কিন্তু গত ছ’মাস ধরে ম্‌হিরির এই মানুষদের নিবিড়ভাবে দেখবার পরে সে বুঝেছে, মহান দোরাদাবুর প্রচারিত কথার ওপর ভরসা না করেও সমাজ গড়ে তোলা যায়। মানুষ তা পারে। ম্‌হিরির এই সৃষ্টিশীল মানুষরা তার প্রমাণ। অনেক কিছুই শিখিয়েছে তারা এই ছ’মাসে ইন্দাতীরের মানুষদের। তাদের জ্ঞানবিজ্ঞান, তাদের প্রযুক্তি এই সবকিছুতেই এমন অনেক উন্নততর সত্যি রয়েছে যা দোরাদাবুর শাসনে থাকা ইন্দাতীরের মানুষের কাছে অজানা ছিল।

আর ঠিক এমন সময়েই সেই বার্তাটা এসে পৌঁছোয় মাণ্ডুপের কাছে। সরাসরি দোরাদাবুর থেকে নয়; এক সন্ধ্যায় সে বার্তা এসে পৌঁছেছিল অন্য এক সন্তানগোলকের কাছ থেকে। সংক্ষিপ্ত সেই বার্তায় তিনি জানিয়েছেন, ম্‌হিরির কাছাকাছি অঞ্চলে এসে পৌঁছেছেন তিনি। পরদিন সকালে সূর্যোদয়ের আগে এখানকার সমস্ত বাসিন্দাকে গ্রামের মাঝখানে গোলকদেবতার মন্দির ঘিরে জড়ো করবে ইন্দাতীরের সৈনিকরা। তারপর তাদের থেকে একশো হাত দূরে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে পাহারায় থাকবে। এরপর গোলকদেবতা মন্দিরে অধিষ্ঠিত হলে তারপর মাণ্ডুপকে এই জায়গা ছেড়ে যত দ্রুত সম্ভব মঞ্জাদাহিরে পৌঁছাতে হবে তার সৈনিকদের নিয়ে। এবং, সে নিজে মঞ্জাদাহির পৌঁছে সরাসরি গোলকদেবতার প্রধান পুরোহিত আহীনের সঙ্গে সাক্ষাত করবে। তিনি তাকে পরবর্তী কাজের নির্দেশ দেবেন।

খবরটা এসে পৌঁছোবার পরেই সাজো সাজো রব উঠেছিল ইন্দাতীরের সৈনিকদের মধ্যে।  বেশ কিছুকাল বাদে ফের তাদের শরীরে উঠেছিল ইন্দাতীরের সৈনিকের পোশাক। হাতে উঠেছিল অস্ত্র। নির্জন এই জায়গায়, একটা ভূতুড়ে ধ্বংসস্তূপের পাশে এই ছোটো গ্রামে তাদের নির্বাসন শেষ হতে চলেছে। ফের বাড়ি ফেরবার আনন্দে খুশিয়াল হয়ে উঠেছিল তারা।

অন্যদিকে, একটা ভয় আর দুঃখের ছায়া ছড়িয়ে গিয়েছিল ম্‌হিরির দুর্ভাগা মানুষগুলোর মধ্যে। গোলকদেবতার শাসনের সামান্য অভিজ্ঞতা তাদের কিছুকাল আগে হয়েছে। ফের কোন নতুন দুর্বিপাক ফিরে আসছে তাদের জীবনে তারা জানে না। খবরটা আসবার পর,  অজানা সেই আশঙ্কা তাদের মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছিল সেই রাত্রে।

সেদিন শেষরাত্রে জেগে উঠেছিল গোটা গ্রাম। মশালের আলোয় অস্ত্রধারী সৈনিকদের পাহারায় একে একে তারা এসে জড়ো হয়েছিল গোলকদেবতার মন্দিরকে ঘিরে।

সে রাতটা কিরামের সঙ্গেই কাটিয়েছিল মাণ্ডুপ। আদেশটা শোনবার পরে একটাও প্রতিবাদ করেননি বৃদ্ধ। শুধু মাণ্ডুপের অপ্রস্তুত মুখটার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “নিজেকে দোষী ভেবো না। তুমি তো তোমার কর্তব্য করছ কেবল!”

এরপর আর কোনো কথা বলেননি কিরাম। নিজের চিন্তাতেই ডুবে থেকেছিলেন বাকি রাতটা। তারপর ভোর রাতে মাণ্ডুপের সঙ্গে নিঃশব্দে হেঁটে গিয়ে মন্দিরের দরজার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিলেন সৈনিকদের নির্দেশে।

পুব আকাশ ফর্সা হয়ে আসছিল। সময় হয়েছে। মন্দির ঘিরে হাঁটু গেড়ে মাথা নুইয়ে অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলোকে রেখে ধীরপায়ে পিছিয়ে আসা শুরু করল সৈনিকেরা। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁকে ছেড়ে যেতে থাকা মাণ্ডুপের হাতটা আঁকড়ে ধরেছিলেন কিরাম। তাঁর চোখেমুখে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা ভর করেছে তখন। মাণ্ডুপ তাড়াতাড়ি তাঁর হাত ছাড়াতে গিয়ে সামান্য ঝুঁকে পড়েছিল তাঁর দিকে। সেই কয়েকটা মুহূর্তের মধ্যে ফিসফিস করে একটা অদ্ভুত কথা তাকে বলে ওঠেন বৃদ্ধ কিরাম:

“দোরাদাবু দেবতা নয়। সে দানব। কখনো সে সত্য বুঝতে পারলে, তুমি বা তোমার বংশধর যেন উর নগরীতে পণ্ডিত উকালান বা তাঁর বংশধরদের কাছে যায়। সেখানে উকালানের বন্ধু কিরাম-এর নাম বললে সঠিক উপদেশ পাবে। মহামাতৃকার নামে আমার অনুরোধ, এ কথা গোপন রেখো তুমি মাণ্ডুপ। মনে রেখো তুমি বা তোমার বংশধররা বাদে দ্বিতীয় কেউ যেন এ-কথা জানতে না পারে… মনে রেখো…”

কথাটা কানে যেতে শিউরে উঠেছিল মাণ্ডুপ। এই প্রথম কেউ সরাসরি তার ঈশ্বরকে দানব আখ্যা দিল। এক্ষেত্রে তার উচিৎ একে মৃত্যুদণ্ড দেয়া। কিন্তু কেন যেন, সে কাজটা করতে হাত ওঠেনি তার সেই মুহূর্তে। মনের গভীরে তার একটা অবিশ্বাস্য সন্দেহের বীজ পুঁতে দিয়েছেন ম্‌হিরি-র এই লিপিকর।  তার অজান্তেই সে বীজ তখন অঙ্কুরিত হয়েছে সেখানে। কোনো উত্তর না দিয়ে তাঁর হাতটা এক ঝটকায় ছাড়িয়ে সে পিছু ফিরে রুতপায়ে এগিয়ে গিয়েছিল একশো হাত দূরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়া তার সৈনিকদের দিকে। তখন পুবের সদ্য আলো ফোটা আকাশে  হঠাৎ দেখা দেয়া একটা কালো ফোঁটা দ্রুত বড়ো হয়ে উঠে ভেসে আসছিল গ্রামটাকে লক্ষ করে।

নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে এরপর তারা দেখেছিল নতুন সন্তানগোলক নেমে এসে  আস্তে আস্তে মদিরের গর্ভগৃহে দৃশ্য হলেন। পরমুহূর্তেই কোনো অদৃশ্য জাদুর ঢেউ যেন নেমে এল হাঁটু গেড়ে বসে থাকা মানুষগুলোর শরীরে। তবে এবারে আর কোনো যন্ত্রণার অভিব্যক্তি তাদের শরীরে ছড়িয়ে পড়েনি। যেন কোনো আরামদায়ক তন্দ্রা নেমে এল মানুষগুলোর শরীরে। তাদের শরীরে অসীম তৃপ্তির ভাব, তাদের মুখে সামান্য আচ্ছন্ন হাসি। সেই অবস্থাতেই এরপর উঠে দাঁড়িয়ে পায়ে পায়ে তারা ফিরে চলল যার যার কর্মশালার দিকে। সেদিকে তাকিয়ে একটু নিশ্চিন্ত বোধ করেছিল মাণ্ডুপ। মহান দোরাদাবু কৃপার সমুদ্র। এদের মনকে আঘাত না দিয়ে বশ করবার নতুন কৌশল আবিষ্কার করে সেই শক্তি দিয়েই তিনি পাঠিয়েছেন নতুন সন্তানগোলককে। অন্তত নিষ্ঠুর যন্ত্রণা বা মৃত্যুর অভিশাপ পাবে না এই অভাগারা…

ক্রমশ

শীর্ষচিত্র- অতনু দেব।

 জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক

Leave a Reply