ধারাবাহিক উপন্যাস-সিন্ধু নদীর তীরে -পর্ব ১৪- পিটার বিশ্বাস-শরৎ ২০২৪

সিন্ধুনদীর তীরে –প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্বচতুর্থ পর্বপঞ্চম পর্বষষ্ঠ পর্ব , সপ্তম পর্বঅষ্টম পর্বনবম পর্ব , দশম পর্বএকাদশ পর্ব,  দ্বাদশ পর্বত্রয়োদশ পর্বচতুর্দশ পর্বপঞ্চদশ পর্বষোড়শ পর্বসপ্তদশ পর্ব

IMG-20210913-WA0004

চতুর্দশ পর্ব

“সাবধান কর্কন। আগুন…”

বলতে বলতেই মাণ্ডুপ তার বন্ধুর হাত ধরে সজোরে টান দিয়ে তাকে সরিয়ে আনল পেছনদিকে। সেই হ্যাঁচকা টানে কর্কনের হাতে ধরা পত্রপূট মাটিতে ছিটকে পড়ে সেখান থেকে শূল্যপক্ক মাংসের টুকরোগুলো পথের ধুলোয় ছড়িয়ে পড়েছে।

আকস্মিক ঘটনাটায় সামান্য চমকে উঠে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে বন্ধুর দিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখেছিল কর্কন। কিন্তু পরমুহূর্তে, যেন তার না-বলা প্রশ্নের জবাবেই আর্তনাদ করে উঠল একটি পথকুক্কুর। সরাইখানার সামনে, পথের ওপর ছুঁড়ে ফেলা উচ্ছিষ্টে পেট ভরাতে ব্যস্ত ছিল সেই অবোলা প্রাণী। বিপদের মুখে টেনে সরিয়ে নেবার জন্য মাণ্ডুপের মত কোনো বন্ধু ছিল না তার। ফলে, উলটোদিকের কর্মশালার ভেতর থেকে হঠাৎ উড়ে আসা নিভন্ত অঙ্গারের টুকরোগুলোর খানিক এসে তার গায়ে ছ্যাঁকা দিয়েছে।

সরাইখানাটা বিশেষ বড়ো নয়। পথের পাশে, রোদে শুকানো ইট দিয়ে গড়া দুটো কুঠুরি। তার একটি কুঠুরিতে কয়েকটি শয্যা বিছানো। শহরে আসা পথিকরা সেখানে কখনো কখনো রাত্রিবাস করে। অন্য কুঠুরিটির ভেতরে পাথরের মেঝেয় চুলা জ্বালিয়ে রান্নার বন্দোবস্ত। চুলার পাশে একদিকে রান্নার সরঞ্জাম আর অন্যদিকটিতে সরাইয়ের মালকিনের শয্যা। খরিদ্দাররা সাধারণত পথে দাঁড়িয়েই তার হাত থেকে পত্রপুটে খাবার কিনে খায়। আজও বেলা দুই প্রহরে অন্যান্য দিনের মতই কুঠুরির ভেতর থেকে তার গ্রাহকদের খাদ্য সরবরাহে ব্যস্ত ছিল সরাইয়ের তরুণী মালকিন। মাণ্ডুপের গলা আর পথকুক্কুরের আর্তচিৎকার শুনে ঘর ছেড়ে বাইরে বের হয়ে এসেছে সে। তারপর, পথে ছড়িয়ে থাকা খাবার ও অঙ্গার, তার দুই গ্রাহকের হতভম্ব মুখ আর ছুটন্ত কুকুরটাকে দেখে ঘটনাটা কী ঘটেছে তা আন্দাজ করে নিতে দেরি হয়নি তার। এবং তাতেই তার ভ্রুদুটি কুঁচকে উঠেছে। তার চোখে ঝড়ের ইঙ্গিত।

এমনিতেই প্রখর গ্রীষ্মে জ্বলন্ত উনুনের পাশে কাজ করতে গিয়ে তার গমরঙা শরীরে আগুনের হলকা ফুটেছিল। এইবার তাতে ক্রোধ মিশে সেই লালিমা আরও উচ্চকিত হয়েছে। অযত্নে জড়িয়ে রাখা খোঁপার বাঁধন খুলে তার পিঙ্গলবর্ণ চুল ছড়িয়ে পড়েছে টকটকে লাল মুখটি ঘিরে। সে মুখ পথের উলটোদিকে ঘুরিয়ে, তীক্ষ্ণ গলায় এবার সে গাল পাড়তে শুরু করল। তার লক্ষ্য পথের উলটোদিকে দাঁড়ানো এক ধাতুকর্মীর কর্মশালা। তার দাবী, সেই দোকানের মালিক তার প্রতি শত্রুতাবশেই তার খরিদ্দারকে উদ্দেশ্য করে জ্বলন্ত অঙ্গার ছুঁড়ে মেরেছে।

ধাতুশিল্পীর ঘরটি তুলনায় আয়তনে বড়ো। তার আধখোলা দরজা দিয়ে সে-ঘরের গভীর থেকে ধাতু গলাবার চুল্লির ধিকিধিকি আভা দেখা যায়। মাঝে মাঝেই হাপরের টানে হাওয়ার স্রোত চুল্লির ভেতরে ধেয়ে গিয়ে সেই আভাকে লেলিহান অগ্নিশিখায় বদলে দিচ্ছিল। সে আলোয় ধাতুশিল্পীর বিশাল ও পেশীবহুল শরীরের আভাস দেখা যায়। এক হাতে হাপরের দড়িতে টান দিতে দিতে অন্য হাতে সে হাতুড়ির ঘা মেরে চলেছে উত্তপ্ত তামার পাতের গায়ে।

প্রথমে সরাই-মালকিনের গলার শব্দ তাকে বিশেষ বিচলিত করতে পারেনি। তাকে উপেক্ষা করেই সে আপনমনে তার কাজ করে চলেছিল। হাতুড়ির শব্দ, হাপরের ফোঁসফোঁস এই দুয়ের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল তার কর্কশ গলায় গেয়ে চলা বেসুরো গানের শব্দ। খানিক তাই দেখে তরুণীর গলার স্বর আরো উচ্চকিত হয়ে উঠল। তীক্ষ্ণমধুর গলায় সে এবারে ধাতুশিল্পী মার্জালের পূর্বপুরুষের হরেক কুৎসা নিয়ে রসালো মন্তব্যের ফোয়ারা ছুটিয়েছে। পাশাপাশি, তার বর্তমান পরিবারের বাপ-মা ভাইবোনদের উদ্দেশ্যে চোখা চোখা  বিশেষণের স্রোত বইছে তার মুখে। কথার সে হুলে যত বিষ তত রসিকতা। সেই শুনতে শুনতে হাসির হররা উঠছিল পথচলতি মানুষজনে মধ্যে। আনন্দের এমন এক খোরাক পেয়ে তারা তাদের কাজকর্ম ভুলে তখন সেখানে জড়ো হয়েছে এসে।

এহেন উত্তেজক মন্ত্রপাঠে স্বয়ং ঈশ্বরের আসনও বিচলিত হতে বাধ্য। মার্জাল তো নগণ্য মানুষ মাত্র। কাজেই খানিক বাদে, তার ধ্যানভঙ্গ হল। ধীরচালে সে তার বিরাট হাতুড়িটি কাঁধে করে কর্মশালার দরজায় এসে দাঁড়াল এবারে। তার পরনের আলুথালু কার্পাসবস্ত্রের খণ্ডটি চামড়ার বন্ধনী দিয়ে কোমরে আঁটা। পেশল, নগ্ন ঊর্ধ্বাঙ্গ ঘামে ভেজা। এক হাতে হাতুড়ি ধরে রেখেই সে মাথায় জড়ানো পাগড়ি খুলে এনে ভেজা শরীর মুছে নিল একবার। তারপর কয়েক মুহূর্ত গণগণে চোখে পথের এপাশে উত্তেজিত তরুণীর দিকে তাকিয়ে থেকে রূঢ় ও অমার্জিত ভাষায় গালির একটা স্রোত ছুটিয়ে দিল সে। প্রায় অবোধ্য সেই গর্জনের যেটুকু বোধগম্য হচ্ছিল তার থেকে তার বক্তব্যের সার কথাটি আন্দাজ করা যায়; তার দাবি, পথে সকলেই আবর্জনা ফেলে। দোকনদারনি জাভালি-র ছুঁড়ে ফেলা উচ্ছিষ্ট ও উদ্বৃত্ত খাদ্য  মুখে করে বহুবার বহু কুকুর তার কর্মশালাকে নোংরা করে গিয়েছে। অতএব তাকে গালি দেয়া এই উদ্ধত যুবতীর সাজে না। আর অতই যদি তার তেজ, তবে ক্ষমতা থাকলে সে নিজের দোকানটিকে বড়ো করুক ও গ্রাহকদের তার ভেতরে নিরাপদে বসবার বন্দোবস্ত করুক।

দুপাশ থেকে চলতে থাকা তর্জনগর্জনের মাঝখানে, অপ্রশস্ত পথ বেয়ে আর্তনাদ করতে করতে ছুটে যাচ্ছিল কুকুরটা। সেদিকে তাকিয়ে বিরক্তিভরে মাথা নাড়ল কর্কন। সামান্য নতিতে মন্দির দুর্গের দিকে উঠে যাওয়া এই পথটাই কট্টাদিজির প্রধান বাজার অঞ্চল। বাজার! হাঃ। কথাটা মনে আসতে আপনমনেই বিরক্তিসূচক শব্দটা উঠে এল কর্কনের ঠোঁটে। পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরমুখো এগিয়ে যাওয়া একটা গলি। তার বুকে এবড়োখেবড়োভাবে ছড়িয়ে রাখা কিছু পাথরের চাঁই। সেই হল গিয়ে নগরীর মূল পথ। এ পথের, অথবা তার থেকে বিভিন্ন দিকে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে যাওয়া অসমান ও সরু সরু গলিপথগুলোর না আছে কোনো শ্রী, না আছে কোনো সৌষ্ঠব। তাদের দুপাশে ছোটো বড়ো কিছু কুঠুরি এলোমেলোভাবে সাজানো। ওর মধ্যেই দোকানদারদের বসবাস, ওর মধ্যেই তাদের কর্মশালা। দোকানগুলো থেকে নিয়মিত নানান ধরণের আবর্জনা ছুঁড়ে ফেলবার একমাত্র জায়গা ওই পথ। আবর্জনার এই দুর্গন্ধময় কুণ্ডকে বাজার বা রাজপথ বলতে ঘৃণাবোধ হচ্ছিল তার।

এতে তাকে দোষ দেয়া যায় না অবশ্য। সুবিখ্যাত আমহিরি নগরীর প্রশস্ত পথঘাটে খেলা করে সে বড়ো হয়ে উঠেছে। মাণ্ডুপেরই মত। সেইসব পথঘাট তিরের মত সোজা। পোড়ামাটির ইট দিয়ে সযত্নে বাঁধানো। দুপাশে নর্দমাগুলি সুচারুভাবে ইট দিয়ে ঢাকা। বড়ো হয়ে ওঠবার পর, মন্দিরসেনার জীবিকার কল্যাণে মঞ্জাদাহির বা দানবনগরী ম্‌হিরির সৌন্দর্যও সে কাছে থেকে দেখেছে। ইন্দাতীরের যেকোনো নগরী বলতে সে তাই এতকাল তেমনই সুন্দর ও সুনির্মিত জনপদই বুঝত। আর তাই, আজ সে তার প্রিয় বন্ধু ও প্রিয় নেতা মাণ্ডুপের সঙ্গে তার বর্তমান কর্মক্ষেত্র এই কট্টাদিজা নগরীতে দেখা করতে এসে বড়োই হতাশ হয়েছে।

সেই হতাশার আগুনে এই মুহূর্তের এই বিবাদ যেন ঘৃতাহুতি দিচ্ছিল তার। খিদের মুখে হাত থেকে লোভনীয় খাবারের ধুলায় লুটানো সে আগুনে বায়ুসঞ্চালন করেছে। এর জন্য দায়ী ওই ধাতুশিল্পী! তার ছোঁড়া অঙ্গার আর একটু হলেই কর্কনকে দগ্ধ করতে পারত। তাছাড়া, বিবদমানদের একপক্ষে আছে এক নিরস্ত্র তরুণী। ইন্দাতীরের নারীরা ম্‌হিরির মত যোদ্ধা নয়। তারা বংশানুক্রমে পুরুষ-রক্ষিত। অথচ সেই ইন্দাতীরের বাসিন্দা হয়েও এই পুরুষ একাকিনী তরুণীর সঙ্গে প্রকাশ্যে দুর্ব্যবহার করতে পিছপা নয়। তাই, গুরুতর না হলেও কিঞ্চিৎ শিক্ষা এর প্রাপ্য।

অতএব পিঠে বাঁধা শূলটিকে খুলে হাতে নিয়ে কর্মশালার দরজায় দাঁড়ানো ধাতুশিল্পীর দিকে পা বাড়াল কর্কন। সঙ্গে সঙ্গেই রঙ্গ দেখবার আশায় মানুষজন ঘিরে দাঁড়াল এসে তাদের।

ধাতুশিল্পী মার্জালের দানবিক চেহারার বিপরীতে ছিপছিপে, ছোটোখাটো গড়ণের কর্কনকে কখনই উপযুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে হয় না। তবে সে কেবল বহিরঙ্গের বিষয়। মাণ্ডুপের মত ঘনিষ্ট সহযোদ্ধারা তাকে ভালো করেই চেনে। ক্রুদ্ধ কর্কনের চেয়ে কোনো পূর্ণবয়স্ক বিষধর কুহিত্রসর্পকেও অধিকতর নিরাপদ বলে মানে তারা। অতএব অস্ত্র হাতে তাকে ধাতুশিল্পীর দিকে এগোতে দেখে বিপদের আশঙ্কা করেছিল মাণ্ডুপ। তার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে দেখেছিল সে। কিন্তু, পরমুহূর্তেই কর্কনের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ও সুপরিচিত মাথানাড়াটুকু দেখে সে নিশ্চিত হল, প্রিয় বন্ধুটি এই  মূর্খ ও পশুসদৃশ ধাতুশিল্পীকে নিয়ে খানিক রঙ্গই করতে চায়। অতএব সে একপাশে সরে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল, যদিও তার চোখদুটি সতর্কভাবে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে ধরা ছিল। কারণ, কর্কন যতই রঙ্গচ্ছলে এগিয়ে যাক, মাণ্ডুপের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বলে, অস্ত্র হাতে যেকোনো দ্বন্দ্ব যেকোনো মুহূর্তে নিছক ক্রীড়া থেকে প্রাণঘাতী যুদ্ধে বদলে যেতে পারে।   

মার্জালও কর্কনের চেহারা ও পোশাক দেখে তাকে ভুল বুঝেছিল। ম্‌হিরি অভিযানের অন্তে, উপস্থিত নিজের শহর আমহিরিতে ফিরে চলছে কর্কন। সেখানে পৌঁছে মন্দিরসেনায় ফের যোগ দেবার আগে অবধি তার ছুটির সময়। অতএব শরীরে তার মন্দিরসেনার বর্মচর্মের বদলে নাগরিক পোশাক। এই পোশাকটা দেখেই তাকে ভুল বুঝেছিল মার্জাল। আসল, সে বা তার সমগোত্রীয় দরিদ্র মানুষেরা কোমরে জড়ানো একখণ্ড বস্ত্র ও মাথায় একটি পাগড়ি জড়িয়েই খুশি থাকে। কিন্তু এই ভিনদেশীর পরণে মহার্ঘ্য আলখাল্লা। তার বাঁ কাঁধ থেকে গোটা শরীরটি ঢেকে হাঁটু অবধি নেমে এসেছে তা। সুদূর উত্তর হতে আনা মহার্ঘ পশুলোম থেকে বোনা সে পোশাকে স্বর্ণসূত্রের নকশা। ভিনদেশীর খোলা দক্ষিণ বাহুতে মূল্যবান রত্নখচিত বলয়। তার কণ্ঠে স্বর্ণসুত্রে গাঁথা রত্নমালা। তার কটিবন্ধটি মৃত পশুর চামড়ার তৈরি নয়। মূল্যবান তুষাতন্তুতে বোনা হয়েছে তা।

সব দেখেশুনে মার্জালের ধারণা হয়েছিল, এই ভিনদেশী কোনো বণিকের সন্তান হবে। পথচলতি জাভালিকে দেখে তাকে মোহমুগ্ধ করবার বাঞ্ছায় বীরত্ব দেখাতে উদগ্রীব হয়েছে। আর তাই, মার্জালের মত মহাশক্তিধরের সঙ্গে যুদ্ধকামনা করছে এই মূর্খ।

দেশ-দেশান্তরে পরিব্রাজনকারী বণিকদের এহেন মোহমুগ্ধ হবার অভ্যাস অবশ্য নতুন কিছু নয়। এমনটা আগেও বহুবার দেখেছে এই শহর। এমনকি ইন্দাতীরের সেনারা এ জায়গার দখল নেবার আগেও এমনটা ঘটেছে বহুবার। যেমন মার্জালের এই কর্মশালা। একসময় এখানে পুঁতি তৈরি করত মুঢ়াল নামে এক স্থানীয় যুবতী। শৈশবে মার্জাল তাকে দেখেছেও একাধিকবার। সুদূর দক্ষিণ হতে আগত এক বণিক তাকে মোহমুগ্ধ করে। নাকি তাদের একটা পুত্রসন্তানও জন্মেছিল। তারপর ইন্দাতীরের সৈনিকরা হানা দেবার পর মুঢ়াল, সেই বণিক ও সেই সন্তান সকলেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সম্ভবত তারা সকলেই সে সময় নিহত হয়েছিল। মার্জালের অবশ্য তাতে লাভই হয়েছিল। মূঢ়ালের পরিত্যক্ত কর্মশালাটিকে নিজের ছোট্ট কর্মশালার সঙ্গে মিশিয়ে তার বাবা তাকে বেশ বড়োসড়ো করে তোলেন। এখন সে নিজেই সেই কর্মশালার মালিক।

অস্ত্রহাতে বণিকপুত্রকে এগিয়ে আসতে দেখে মনে মনে কিঞ্চিত খুশিই হচ্ছিল মার্জাল। এখানে জাভালি উপস্থিত। তেজস্বিনী এই তরুণীর দিকে কিছুকাল হল নজর পড়েছে তার। তার সামনে এবারে একটা দ্বন্দ্বযুদ্ধ হবে। সে যুদ্ধে এই মহামুর্খ বণিকপুত্রকে পরাস্ত করে নিজের শক্তির প্রমাণ রাখবে সে আজ জাভালির কাছে। তারপর, এর পরিধানের মূল্যবান পোশাক ও গহনাগুলি সে জাভালিকে উপহার হিসাবে দান করে তাকে বিবাহ করবার প্রস্তাব দিলে জাভালির সে প্রস্তাব অস্বীকার করবার কোনো কারণ থাকবে না। নিজের শক্তিতে গভীর আস্থাবান মার্জাল অতএব তার বিরাট হাতুড়িটি মাথার ওপর উঁচিয়ে ধরে দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হল।

শূলধারী যুবক তার দুহাত দূরত্বে এসে পৌঁছোতে প্রথম আঘাত হানল ধাতুশিল্পী। তবে হ্যাঁ। সাবধানে। এই ধনীপুত্রকে হত্যা করে নাহক বিপদ সে বাড়াতে চায় না। তাতে তার মূল্যবান পোশাকটিও রক্তাক্ত হয়ে অব্যবহার্য হয়ে উঠতে পারে। তার পরিবর্তে একে খানিক ভয় দেখিয়ে বশীভূত করাই তার উদ্দেশ্য ছিল। আর তাই বিরাট হাতুড়িটা সে যুবকের মাথার সামান্য ওপর দিয়ে সজোরে ঘুরিয়ে আনল সে। আর তার পরেই সে বিস্মিত হয়ে দেখল, শূল হাতে এগিয়ে যেতে থাকা যুবকের মুখে এতে বিচলিত হবার বিন্দুমাত্র লক্ষণ ফুটে ওঠেনি। উলটে সেখানে যেন বাঁকা হাসি ফুটে উঠেছে একচিলতে।

আসলে ধাতুশিল্পীর অস্ত্রের গতিমুখ কর্কনের তীক্ষ্ণদৃষ্টিকে ফাঁকি দিতে পারেনি। তার অভিজ্ঞ চোখ পলকে নির্ণয় করে নিয়েছিল, আঘাতটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে চলেছে। এরই সঙ্গে মার্জালের শরীরি ভাষা তাকে জানান দিয়েছিল, লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়াটা ইচ্ছাকৃত। তাকে ভয় দেখিয়ে বশে আনতে চাইছে এই মূর্খ ধাতুশিল্পী। ফলে এই নকল আক্রমণ তাকে বিচলিত করতে পারেনি। এইবার, ধীরেসুস্থে প্রতি-আক্রমণ শানাল সে। না। অস্ত্রে নয়। অন্য পথে…

আসলে, দ্বন্দ্বযুদ্ধ কেবলমাত্র অস্ত্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। কুশলী বাক্যবিনিময়ও তার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাক্যবাণের প্রয়োগে দক্ষ যোদ্ধারা এর সাহায্যে শত্রুর মধ্যে ইচ্ছামত আবেগের সঞ্চার করে তার সুযোগ নেয়। অতএব এবারে সেই নীতিরই একটি দক্ষ প্রয়োগ করল কর্কন। বিদ্রুপ ভরা গলায় সে বলল, “সামান্য দুই হাত দূর থেকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেন? তা, আমি স্থির হয়ে দাঁড়ালে আঘাত করতে সুবিধা হয় কি মহাশয়? যদি বলেন তো সেইভাবেই নাহয়…”

এতে ফল ফলতে দেরি হল না। কর্কনের কথা শুনে দর্শকদের বিদ্রুপের হাসির শব্দ আগুন ধরিয়ে দিল মার্জালের মাথায়। হাতুড়ি উঁচিয়ে সে একটি বন্যমহিষের মত ধেয়ে গেল কর্কনের দিকে। তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে, তাকে লক্ষ করে সবলে হাতুড়ি চালিয়ে দেবার সময় সে খেয়ালও করল না কখন তার প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষিপ্র পায়ের দোলায় নিজের জায়গা ছেড়ে বাতাসে লাফিয়ে উঠেছে। মাপা লাফটি, হাতুড়ির গতিপথ এড়িয়ে কর্কনকে পৌঁছে দিয়েছিল ধাতুশিল্পী মার্জাল-এর নীচু হয়ে ঝুঁকে থাকা মাথার ঠিক ওপরে। পরমুহূর্তে তার কাঁধের ওপর নেমে এসে দুপায়ে তার পাঁজরায় সজোরে ঘা মারতে নিছক প্রতিবর্ত ক্রিয়াতেই সামনের দিকে কয়েক পা ছুটে গেল মার্জাল। তার পিঠে বসে তখন হাতের শূলটি মাথার ওপর উঁচিয়ে ধরেছে কর্কন। আর সেই অবস্থাতেই তার তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর বলে উঠল, “এই দ্বিপদ মহিষ আজ হতে কর্কনের…”

কিন্তু কথাটা শেষ করবার আগেই মার্জাল হঠাৎ করে সটান উঠে দাঁড়িয়ে প্রবল এক ঝাঁকুনিতে মাটিতে ছিটকে ফেলেছে কর্কনকে। মাটিতে পড়েই সাপের মত পিছলে সরে যেতে গিয়েছিল কর্কন, কিন্ত ভাগ্য তখন তার প্রতি বিরূপ। হঠাৎ করেই ছুটন্ত মার্জালের একটি পা এসে তার বাম বাহুর ওপরে পড়ল। পরমুহূর্তেই তার হাতটাকে সেইভাবে চেপে ধরে রেখে মার্জাল ঘুরে দাঁড়িয়ে ফের হাতুড়ি উঁচিয়েছিল তার মাথা লক্ষ করে।  

কিন্তু, কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যাবার আগেই মাণ্ডুপ তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে মার্জালের হাতুড়িশুদ্ধ হাতটিকে চেপে ধরল। তার পরনে মন্দিরসেনার পোশাক। পিঠে বাঁধা তীক্ষ্ণধার কৃপাণের ফলা রৌদ্রে ঝলকায়।

এবারে দেখা গেল, ইন্দাতীরের অন্যান্য শহরের সঙ্গে অনেক অমিল  থাকলেও এই একটি বিষয়ে কট্টাদিজাও একই পথের পথিক। সে হল, মন্দিরসেনার প্রতি অসীম ভয়মেশানো সমীহ। ধাতুশিল্পী মুহূর্তে তার হাতুড়ি নামিয়ে ফেলল। তারপর মাণ্ডুপের নিঃশব্দ ইশারার আদেশকে শিরোধার্য করে নিজের কর্মশালার ভেতরে ফিরে গেল সে।

কর্কন তাকে অনুসরণ করে তার কর্মশালার দরজায় গিয়ে পৌঁছেছিল। আহত ডানহাতে বড়ো যন্ত্রণা হচ্ছে তার। আর তাই, কৌতুক অতিক্রম করে এইবার সে সত্যিই খানিক ক্রুদ্ধ হয়েছে। এইবার ওই মূর্খ ধাতুশিল্পীকে সে খানিক সত্যকার সহবতের শিক্ষা দিতে চায়।

তবে সে ইচ্ছাকে কাজে পরিণত করবার আগেই এগিয়ে গিয়ে দুহাতে তাকে ধরে ফেলল মাণ্ডুপ। হেসে বলল, “শান্ত হও হে। কর্কনের মত বীরের পক্ষে একজন তুচ্ছ ধাতুশিল্পীর আচরণে এমন উত্তেজিত হওয়া সাজে না। এসো আগে অসমাপ্ত খাওয়াটা শেষ করা যাক।”

রঙ্গ দেখবার ইচ্ছেয় এসে জড়ো হওয়া মানুষগুলি অতৃপ্তমুখে তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে। এহেন একটি প্রদর্শনীর এমন অকাল সমাপ্তিতে তারা খানিক হতাশ। মাণ্ডুপ ইশারায় তাদের নিজের নিজের কাজে ফিরে যেতে বলল। তারপর ভিড় সরে গেলে কর্কনের হাত ধরে ফিরে এল জাভালির সরাইখানার সামনে।

এসে দেখা গেল, জাভালি কর্কনের প্রতি বড়োই প্রীত হয়েছে। একে তো এই ভিনদেশী তরুণ তার হয়ে অস্ত্র ধরতে গিয়েছিল। তায় আবার সাক্ষাত এক মন্দিরসেনার বান্ধব সে। অতএব সমীহ পাবার যোগ্যতা তার আছে। তার বন্ধু, মাণ্ডুপ নামের এই মন্দিরসেনাকে জাভালি অবশ্য আগে থেকেই চেনে। সদ্যই কিছুদিন হল এই শহরের সেনাদলে যোগ দিয়েছে এই তরুণ সৈনিক। মাঝেমধ্যেই তার দোকানে সে দ্বিপ্রাহরিক আহারের জন্য আসে। একে নিয়ে কিছু কিছু গুজবও ভাসে কট্টাদিজার বাতাসে। লোকে বলে নাকি আদতে সে এক মহাবীর সৈনিক। ম্‌হিরির যুদ্ধে নাকি কীসব অমর কীর্তিও স্থাপন করে গোলকদেবতা দোরাদাবুর কৃপাধন্য হয়েছে সে। তবে সেসব গুজবে দোকানদারনি বিশ্বাস করে না আদৌ। কারণ, এই সেনানির গায়ে একেবারে সর্বনিম্ন স্তরের শিক্ষানবিশ সৈনিকের পোশাক। তার আচার আচরণেও বিশেষ কোনো মহাবীরের লক্ষণ সে দেখেনি কখনো। অবশ্য মানুষটি সে ভালো। কথায় কথায় খানিক আলাপও হয়েছে তাদের। অনাথা জাভালি তাকে নিজের ছোট্ট জীবনের সুখদুঃখের কথা বলেছে। মাণ্ডুপও বলেছে কিছু কিছু। নাকি সুদূর আমহিরি নগরে তার বাড়ি। সেইখানে তার এক প্রেমিকা আছে, এই কথা সে বলেছে জাভালিকে। না দেখা সেই মেয়েকে হিংসা করে জাভালি। কারণ তার কথা বলতে গিয়ে এই যুবকের মুখ এক অন্য আলো জ্বলে ওঠে। তবে এর বেশি নিজের বিষয়ে তাকে কিছু বলেনি মাণ্ডুপ। জাভালিও প্রশ্ন করতে সাহস পায়নি। কারণ, যতই তার আচার-আচরণে ভালোমানুষীর ছাপ থাকুক না কেন, মন্দিরসেনা… মন্দিরসেনাই। মহাবিষাক্ত কুহিত্র সর্পের ক্ষুদ্রতম সন্তানটিও মহাসর্পই হয়ে থাকে তাতে তার কোনো সন্দেহ নেই।  

দুই বন্ধু একত্রে তার দোকানের সামনে ফিরে এলে জাভালি এবারে কৃতজ্ঞচিত্তে তাদের যত্ন-আত্তির দিকে নজর দিল। অন্যান্য খরিদ্দারদের ইশারায় বিদায় করে সে তাদের ডেকে নিল সরাইয়ের ভিতরে। সেখানে দ্বিতীয় ঘরটিতে এই মুহূর্তে কোনো অতিথি নেই। সেইখানে তাদের ডেকে এনে সে দুটি আসন বিছিয়ে দিল মুখোমুখি।  তার মধ্যে একটি সাধারণ কাপাসতন্তুতে বোনা। তার বুকে রঞ্জিত সুতোয় বহুবর্ণ চিত্র আঁকা। এই আসনটির দিকে ইশারা করে মাণ্ডুপকে তাতে বসতে বলল সে।

dharabahik90

তার মুখোমুখি পেতে দেয়া দ্বিতীয় আসনটি  ধূসর, পীতাভ তন্তুতে বোনা। তুষা নামের এই তন্তুদের মাণ্ডুপ চেনে। একশ্রেণীর দুর্লভ বন্য মথের শূককীটের লালারস থেকে উৎপন্ন হয় এই ‘তুষা’ নামের সুতা। নগরসীমা ছাড়িয়ে ইন্দাতীরের গভীর জঙ্গলে সেই বন্য মথের বাস। বনবাসী বর্বরেরা তার খানিক খানিক সংগ্রহ করে আনে। ইন্দাতীরের বিভিন্ন নগরের বাজারে চড়া দামে বিক্রি হয় সেই তন্তু।

সেই আসনটির দিকে ইশারা করে নম্রস্বরে কর্কনকে তাতে বসবার অনুরোধ করল জাভালি। দেখে মাণ্ডুপের মুখের হাসিটি প্রশস্ত হল। মাথা নেড়ে সে বলল, “ওহে জাভালি। আমার এই মিত্রকে আমা অপেক্ষা অধিক যত্ন করছ দেখি যে! আমার জন্য কাপাসতন্তুর আসন অথচ এর জন্য তুষাতন্তুর মূল্যবান আসন! তোমাকে আগে থেকেই সাবধান করছি, প্রিয়বন্ধু কর্কন কিন্তু বিবাহিত। আমহিরি নগরীতে তার স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। সে নারী আমারও ভগিনীসমা।”

শুনে জাভালির মুখটা সিন্দুরবর্ণ হয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে সে পাশের কক্ষে ঢেকে রাখা খাদ্যের পাত্রগুলি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্ত বাদে যখন আহার্যের আয়োজন সম্পূর্ণ হল, ততক্ষণে তার মুখের লালিমা অন্তর্হিত হয়েছে। চোখদুটি নীচু। সেদিকে তাকিয়ে কর্কন খানিক লজ্জিত গলায় বলল, “আমার বন্ধুর আচরণের জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।”

একটুক্ষণ চুপ করে রইল জাভালি। তারপর থালাদুটি তাদের সামনে বিছিয়ে দিয়ে তাতে যবের মণ্ড ও বন্য তিত্তিরের খানিক শূল্যপক্ক মাংস রাখতে রাখতে নীচুগলায় সে বলল, “আমি কিছু মনে করিনি ভদ্র। সেনানী মাণ্ডুপ আমার পরিচিত। তিনি স্বভাবতই পরিহাসপ্রিয় মানুষ। তবে তাঁর একথাটি সত্য যে, আমি আপনার প্রতি আজ বিশেষ যত্নবতী। আপনার জন্য আমার স্বর্গত পিতার আসনটি আজ আমি পেতে দিয়েছি। সে আমার কর্তব্য। কারণ, আজ এই অনাথার সম্মানরক্ষার্থে আপনি অস্ত্র ধরেছেন। ধাতুশিল্পী মার্জাল আসুরিক শক্তির অধিকারী। এই শহরে ওই বর্বরের বিরুদ্ধে যাবার সাহস কারো নেই। আপনার মত একজন সাধারণ নাগরিকের পক্ষে, তার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে নিজের জীবনকে বিপন্ন করা… তাও আমি হেন এক অপরিচিত অনাথিনীর জন্য…”

শুনে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল মাণ্ডুপ। তারপর বলল, “ওহে জাভালি, কাকে তুমি সাধারণ নাগরিক বলছ? আমার মিত্র এই কর্কন আমহিরি নগরীর এক মন্দির-সেনাধ্যক্ষ। সম্প্রতি ম্‌হিরির  যুদ্ধে তার শূল যেসব দানবের প্রাণ নিয়েছে তার তুলনায় তোমাদের ওই বর্বর ধাতুশিল্পী নিতান্তই তুচ্ছ।”

শুনে সশ্রদ্ধ দৃষ্টিতে ফের একবার কর্কনের দিকে দেখল জাভালি। এই সাধারণদর্শন মানুষটিকে এহেন শক্তি ও রণদক্ষতার অধিকারী বলে সে ভাবতে পারেনি।

সেদিন তাদের আহারের শেষ পদটি ছিল খগ্‌গ নামের একশ্রেণীর মাছের ব্যঞ্জন। দক্ষিণে ইন্দানদীর মোহানার কাছে সাগরের লবণাক্ত জলে এই মাছের বাস। তার রৌদ্রে শুকানো মাংসখণ্ড ব্যাপারীদের কাছে থেকে উচ্চমূল্যে কিনে সঞ্চয় করে রাখে জাভালি। মাঝেমধ্যে কোনো ধনী ব্যাপারী বা উচ্চপদস্থ সেনানী তার দোকনে এলে তবেই সে তার সদ্ব্যবহার করে। আজ সে তার সেই সঞ্চয় উজার করে দিয়েছে এই দুই অতিথির জন্য।

তাদের থালায় সেই দুর্লভ খাদ্য সাজিয়ে দিতে দিতেই সে প্রশ্ন করল, “সেনানি মাণ্ডুপ, আপনার সঙ্গে এই বীর সেনানায়কের বন্ধুত্ব…”

মাণ্ডুপ খেতে খেতেই বলল, “আমরা দুজনেই আমহিরি নগরীর বাসিন্দা যে। তাছাড়া…” কিন্তু, দ্বিতীয় এই বাক্যটা শুরু করেও হঠাৎ করেই থেমে গেল মাণ্ডুপ। নিজের পরনে মন্দিরসেনার সবচেয়ে নীচুস্তরের সেনানীর পোশাকের দিকে নজর গিয়েছে তার। জাভালি তাকে মিথ্যাবাদি ভাবতে পারে।

তবে কর্কনের সেদিকে খেয়াল ছিল না। মাণ্ডুপের অসম্পূর্ণ কথাটিকে সে সম্পূর্ণ করে দিল, “তাছাড়া, ম্‌হিরি অভিযানে মাণ্ডুপের অধীনেই অংশ নিয়েছিলাম আমি। তার মত বীর…”

বলতে বলতেই জাভালির চোখে বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠতে দেখে একটু থমকে গিয়েছিল কর্কন। মাণ্ডুপের মুখেও তখন অস্বস্তির সুস্পষ্ট ছায়া।

তবে পরক্ষণেই নিজের মুখ থেকে বিস্ময় বা কৌতূহলের সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলল জাভালি। মাণ্ডুপের বিষয়ে ভাসা ভাসা যে কথাগুলি সে ইদানীং বাজারে শুনেছে, কিন্তু আদৌ বিশ্বাস করেনি, সেই কথাগুলো এবার ফের একবার ফিরে আসছিল তার স্মৃতিতে। তার জন্মরহস্য নিয়ে, ম্‌হিরির যুদ্ধে তার ভূমিকা নিয়ে…

কিছু একটা অস্বস্তিকর, ব্যাখ্যাহীন রহস্য আছে এইখানে, তা সে অনুমান করতে পারছিল। মাণ্ডুপ নিঃসন্দেহে এক খ্যাতনামা যোদ্ধা। তা না হলে কর্কন হেন সঙ্গে একজন উচ্চপদস্থ সেনানায়কের সঙ্গে তার সখ্যের ব্যাখ্যা কী? কেবল সখ্যই নয়, মাণ্ডুপকে কর্কন নিজের নেতা হিসাবে স্বীকার করেছেন। সেক্ষেত্রে ম্‌হিরির যুদ্ধে তার ভূমিকার বিষয়ে উড়ো খবরগুলোর একটা ভিত্তি আছে! আর তাই যদি হবে, তাহলে স্বয়ং দোরাদাবুর স্নেহধন্য একজন মহাবীর… তিনি কট্টাদিজা-হেন তুচ্ছ প্রহরীনগরে একজন সামান্য নীচুস্তরের সেনানীর পেশায় নিযুক্ত হবেন কেন? তবে কি কোনো গর্হিত অপরাধের শাস্তি… অথবা কোনো ষড়যন্ত্র…নাকি… এর জন্মরহস্য নিয়ে যে অবিশ্বাস্য গুজব জাভালি শুনেছে তার জন্যই…

তবে জাভালি বুদ্ধিমতী। কট্টাদিজার পথে সরাইখানা চালিয়ে সে কৈশোর থেকে যৌবনে এসে পৌঁছেছে। তাই সে ভালো করেই জানে, মন্দিরসেনার বিষয়ে নাক গলানো সাধারণ নাগরিকদের পক্ষে বিপজ্জনক। বিশেষ করে তার মত কোনো অনাথা মেয়ের পক্ষে তো বটেই। অতএব, মনে মনে কৌতূহলী হয়ে উঠলেও বাইরে তার কোনো ইঙ্গিত সে প্রকাশ হতে দিল না। বরং নিরীহ মুখে দুই বন্ধুর পাত্রে খানিক মিষ্টান্ন তুলে দিতে দিতে বলল, “তাই বুঝি!”

তার চোখের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে একবার তাকিয়ে দেখে নিল মাণ্ডুপ। সেই আপাত শান্ত দৃষ্টির আড়াল থেকে বেশ কিছু প্রশ্ন ফুটে বের হচ্ছিল। প্রশ্নগুলো আন্দাজ করে নিতে কোনো অসুবিধা হচ্ছিল না তার। কারণ ইদানীং তার নিজের মনেও মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে এই প্রশ্নরা। জাগরণে, এবং স্বপ্নেও… বারংবার…

হঠাৎ অর্ধভূক্ত খাবারের থালা ফেলে উঠে দাঁড়াল সে। তারপর কর্কন ও জাভালির প্রশ্নসূচক চাউনিকে অগ্রাহ্য করে ঘরের একপাশে রাখা পাত্রের জলে হাতমুখ ধুয়ে পথে গিয়ে দাঁড়াল।

***

আঁকাবাঁকা পথটা চওড়ায় বড়োজোর হাতদশেক হবে। সেই পথ বেয়ে নেমে যেতে যেতে কর্কন চারদিকে তাকিয়ে দেখছিল বারংবার। পিঠে বাঁধা প্রচণ্ড ভারী পুঁটুলিটা বয়ে নিয়ে উৎরাইয়ের পথে নামতে গিয়ে এই অপরাহ্নেও তার শরীরে স্বেদবিন্দু দেখা দিচ্ছিল। চলতে চলতে আপনমনেই সে হাসল একটু। বন্ধুকৃত্য! আহারাদির শেষে মাণ্ডুপ তাকে নিয়ে নিজের কুঠুরিতে গিয়েছিল একবার। সেখানে পৌঁছে সে কাপাসবস্ত্রে শক্তপোক্তভাবে বাঁধা চতুষ্কোণ  পেটিকাহেন এই বস্তুটি কর্কনের হাতে তুলে দিয়েছে। কর্কন এতে সামান্য অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিল কী আছে এই পুঁটুলিতে। জবাবে মৃদু হেসে মাণ্ডুপ বলেছে এটি আমহিরি নগরীতে তার জন্য অপেক্ষায় থাকা কুমারী ইস্কার জন্য বিশেষ এক উপহার। একমাত্র ইস্কা ভিন্ন আর কেউ এর ভেতরে কী আছে তা জানুক এ তার ইচ্ছা নয়। মাণ্ডুপ ও ইস্কার সম্পর্কের বিষয়টা কর্কনের অজানা নয়। ফলে এই কথা শোনবার পর পুঁটুলিতে কী রয়েছে তা জানবার জন্য কর্কন আর মাণ্ডুপকে উত্যক্ত করেনি।

তখন অপরাহ্ন ঘনিয়ে আসছিল। সেদিন রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরের সূচনায় চন্দ্রোদয় হবে। চন্দ্রোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই কর্কন রওয়ানা হবে আমহিরির পথে। কট্টাদিজায় বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে আসবার সময়, শহরের ঠিক বাইরে সে তার সার্থবাহকে উপযুক্ত প্রহরায় রেখে এসেছে। অতএব অন্ধকার নামবার আগেই তাকে সেইখানে ফিরে গিয়ে যাত্রার প্রস্তুতি নিতে হবে। তাই, এইবার কর্কন তার এখানে আসবার মূল বিষয়টি উত্থাপন করে প্রশ্ন করেছিল, “আর, তোমার ম্‌হিরি বিজয়ের ধনরত্নের শকটগুলো?”

শুনে মাণ্ডুপ সামান্য হেসে বলে, “উপহারের এই পুঁটুলিটি নিয়ে তুমি এগিয়ে যাও কর্কন। যাত্রার জন্য তৈরি হও। আমার শকটদুটি মন্দির দুর্গের ধনাগারে সুরক্ষিত আছে। আমি সেখান থেকে সেগুলো ফেরত নিয়ে চন্দ্রোদয়ের আগেই তোমার শিবিরে পৌঁছে দেব। সেগুলিও তুমি…”

“ইস্কার হাতেই তুলে দেব। বলা বাহুল্য। তাই তো?” হাসতে হাসতে তার তার অসমাপ্ত বাক্যটিকে সম্পূর্ণ করে দিয়েছিল কর্কন। তারপর প্রশ্ন করেছিল, “তোমার ব্যক্তিগত ধনরত্নের শকট মন্দির দুর্গের ধনাগারে গচ্ছিত আছে… কেন? এমন তো হবার কথা নয়?”

জবাবে মাণ্ডুপ মাথা নেড়ে বলেছিল, “সবই সৈন্যাধ্যক্ষের কৃপা। গোযান দুটি নিয়ে এইখানে এসে পৌঁছাবার পর তিনি নিজেই বলেছিলেন, যতদিন না আমার যাবার সময় হয়, এদের দায়িত্ব নেবে মন্দির দুর্গ। কারণ, একজন  সাধারণ সেনানীর বাসস্থল হিসেবে এই যে ছোট্ট কুঠুরিটি আমার প্রাপ্য তাতে এর স্থান সঙ্কুলান হওয়া কঠিন।”

এই বলে কুঠুরীর সামনে দিয়ে মূল রাস্তার দিকে খাড়া নেমে যাওয়া গলিপথটার দিকে ইশারা করে সে ফের বলে, “এই পথ দিয়ে দুটি বৃহৎ গোযান টেনে তোলা সম্ভবও ছিল না। আর তোলা গেলেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার অভাব আছে এখানে।”

“নিরাপত্তার অভাব?” একটু বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করেছিল কর্কন। ইন্দাতীরের নগরগুলোতে সাধারণত কোনো বাসিন্দা ঘরের দরজা বন্ধ করে না। করবার প্রয়োজনই হয় না। মূল্যবান গহনায় সজ্জিত নাগরিকারা রাতের মধ্যযামেও একাকি নিশ্চিন্তে চলাফেরা করেন। অতএব, মাণ্ডুপের এহেন কথায় তার বিস্মিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

তার কুঞ্চিত ভ্রু দেখে মাণ্ডুপ মাথা নেড়েছিল, “শুরুতে আমিও বিস্মিত হয়েছিলাম। তারপর ধীরে ধীরে বুঝেছি। আমহিরি বা মঞ্জাদাহিরের মত নগরের সঙ্গে কট্টাদিজার মিল নেই বিশেষ। নামে নগর হলেও বাস্তবে এটি নেহাতই ইন্দাতীরের এক সেনাছাউনি। এককালে এই পাহাড় ও অরণ্য এখানকার আদিম বাসিন্দাদের বাসভূমি ছিল। তাদের উৎখাত করে পাহাড়চূড়ায় গড়ে তোলা হয়েছে মন্দিরদুর্গ, যা আসলে একটা সেনাছাউনি ভিন্ন আর কিছু নয়। ইন্দাতীরে কিছু দূরে দূরে বেশ কিছু এহেন প্রহরী সেনাছাউনি গড়ে উঠেছে মূলত বড়ো নগরগুলোর নিরাপত্তা বিধানের কারণে।

“কট্টাদিজার এই সেনাছাউনির বাসিন্দাদের অন্নবস্ত্রের প্রয়োজন মেটাবার জন্যই এ পাহাড়ের ঢালে গড়ে উঠেছে এই জনপদ। এর নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি বা আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সেনাদের মাথাব্যথা নেই কোনো। যেমন ধরো, এর সম্পূর্ণ বাজারের দেখভালের দায়িত্বে আছি আমরা পাঁচজনমাত্র নিম্নপদের সেনা।

“অথচ, ইন্দা অববাহিকার দক্ষিণ ও উত্তরের নগরীদের মধ্যে যাত্রাপথের গুরুত্বপূর্ণ বিরামস্থল এই কট্টাদিজা। প্রতিদিনই বহুসংখ্যক বণিক ও পথিক এইখানে আসেন। শহরের ভেতরে বা আশপাশের এলাকায় এক কি দুই দিনের যাত্রাবিরতি দিয়ে রসদ সংগ্রহ করে ফের রওয়ানা হয়ে যান। বলা বাহুল্য শিকার হিসাবে এঁরা দস্যু ও তস্করদের কাছে লোভনীয়। একদিকে দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ও অন্যদিকে নিয়মিত লোভনীয় শিকারের উপস্থিতি… এই দুই মিলে এ শহরে নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। আর সেই কারণেই সৈন্যাধক্ষের পরামর্শ মত মন্দিরদুর্গের ধনাগারেই যানদুটিকে গচ্ছিত রেখেছি আমি।”

এই বলে বস্ত্রের আড়াল থেকে পোড়ামাটিতে তৈরি চতুষ্কোণ একটি স্বীকৃতিমুদ্রা বের করে এনে সে জানিয়েছিল, “ধনাগারের অধ্যক্ষ পুরোহিত আহুম শকটদুটি জমা রেখে এই স্বীকৃতিমুদ্রা দিয়েছেন আমায়। এতেই মোট ধনের পরিমাণ, তা জমা রাখবার জন্য বার্ষিক কত পরিমাণ ধন এখান থেকে সরিয়ে রাখা হবে তার হিসাব লেখা আছে। ফেরত নেবার সময় এই মুদ্রাটি নিয়ে গিয়ে ধনাগারে দেখানোই যথেষ্ট হবে।”

কথাগুলো শুনে একটু বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকিয়েছিল কর্কন। তারপর বলেছিল, “এতে কী লেখা আছে তা তুমি জানলে কেমন করে?”

প্রশ্নটা যুক্তিযুক্ত। কারণ, এক পুরোহিত ভিন্ন ইন্দাতীরে লিপিপাঠের জ্ঞানার্জনের অধিকার আর কারো নেই। মাণ্ডুপ পুরোহিত নয়। অতএব ওই চতুষ্কোণ মৃৎপট্টে কী লেখা আছে তা তার পক্ষে জানা আইনত সম্ভব নয়।

জবাবে মাণ্ডুপ একটুক্ষণ চুপ করে রইল প্রথমে। ম্‌হিরি নগরীতে কিরাম তাকে যে লিপির শিক্ষা দিয়েছিলেন, সামান্য হেরফের থাকলেও স্বীকৃতিপত্রের এই লিপি প্রায় তারই সদৃশ। অতএব তা পড়ে নিতে বিশেষ সমস্যা হয়নি মাণ্ডুপের। সেখানে গচ্ছিত ধনের পরিমাণ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে তাতে মালিক হিসেবে মাণ্ডুপের নামোল্লেখ আছে। উল্লেখ আছে গচ্ছিত রাখবার জন্য দুর্গ কর্তৃপক্ষ তার থেকে বার্ষিক কতটুকু অর্থ সরিয়ে রাখবেন তার সুনির্দিষ্ট হিসাবও। কিন্তু তবু, কর্কনের এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর সে তাকে দিতে পারবে না। একমাত্র ইস্কা ভিন্ন আর কাউকে তা দিতে পারে না সে। কারণ পুরোহিত না হয়েও সে লিপিপাঠের বিদ্যা অর্জন করেছে এ কথা জানাজানি হবে মৃত্যুদণ্ডই হবে তার একমাত্র শাস্তি। অতএব কয়েক মুহূর্ত বাদে মাথা নেড়ে সে একটি বিশ্বাসযোগ্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিল। জনিয়েছিল, কিছু মুদ্রার বিনিময়ে এক শিক্ষানবীশ পুরোহিত তাকে এ লিপি পড়ে শুনিয়েছেন।

ব্যাখ্যাটা শুনেও পুরোপুরি সন্তুষ্ট হয়নি কর্কন। সন্দিগ্ধ  গলায় বলেছিল, “তবুও, মন্দিরদুর্গের পুরোহিতদের কাছে ধন গচ্ছিত রাখা… আমার মতে তা খুব নিরাপদ নয়। এদের লোভের কথা সর্বজনবিদিত।”

মাণ্ডুপ তার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়েছিল একবার। বলেছিল, “পুরোহিতদের প্রতি তোমার অবিশ্বাস আজও গেল না বন্ধু!”

জবাবে মাথা নেড়েছিল কর্কন। মহান দোরাদাবুর প্রতি তার ভক্তি অচলা। কিন্তু তাঁর সেবক পুরোহিতদের সে ভয় পেলেও তাদের খুব একটা বিশ্বাস সে করে না। কারণ অতি শৈশবে কোনো এক অপরাধে তার পিতাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। মহান দোরাদাবুর নামে সে দণ্ড তাদের বাড়িতে এসে কর্কন ও তার মায়ের সামনেই কার্যকর করেছিলেন এক পুরোহিত। সেই থেকে পুরোহিতদের প্রতি একটা ভয়মিশ্রিত গভীর অবিশ্বাস কর্কনের চিরসঙ্গী।  

আঁকাবাঁকা পথটি ধরে নেমে কর্কন দৃষ্টির আড়ালে চলে যাবার পর মাণ্ডুপ উঠল। পশ্চিমে, মন্দিরদুর্গশিলার পেছনে সূর্যদেব ইন্দার জলস্রোতের দিকে নেমে চলেছেন দ্রুত। অস্তগামী নক্ষত্রের কমলা আলো ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিম আকাশ জুড়ে। সেদিকে একনজর দেখে নিয়ে দ্রুত পাহাড় ভাঙতে শুরু করল সে। আর দেরি নয়। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই মন্দিরদুর্গের দ্বার বন্ধ হয়ে যায়।

***

কট্টাদিজার মন্দিরদুর্গটি পাহাড়ের মাথায় প্রায় দ্বিশতাধিক হাত লম্বা একখণ্ড জমির ওপর দাঁড়িয়ে। এক কালে এই জায়গায় এখানকার আদি বাসিন্দাদের এক সুরক্ষিত গ্রাম ছিল। এরপর তাকে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করে সেই ভস্মের ওপরেই নতুন করে গড়ে তোলা হয় এই মন্দিরদুর্গ। এ কাহিনি মাণ্ডুপ তার পিতা বৈক্লন্যের কছে শুনেছে। শুনেছে ও গর্বিত হয়েছে। অন্ধকারের পূজারি কিছু অর্ধপশুর পাপে পরিপূর্ণ বসতিকে ধ্বংস করে সেখানে ঈশ্বর দোরদাবুর পূণ্য শাসন প্রবর্তনের কাজে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন তারই পিতা… এ তার অহঙ্কার। নগরীস্থাপনের পর এই পাহাড়ের আদিম বাসিন্দাদের ভারবাহী পশুর মত ব্যবহার করে পশ্চিমে বহু নীচে বহমান ইন্দানদীর তীর থেকে উর্বর মাটি বহন করিয়ে আনা হয়েছিল। সেই মাটি দিয়ে সমতল ও চৌরস করে নেয়া হয়েছে জায়গাটিকে। তারপর সেই মাটি দিয়ে নির্মিত ইটে গড়ে তোলা হয়েছে এই মন্দিরদুর্গকে।

মাণ্ডুপ যখন তার দরজায় গিয়ে পৌঁছাল তখন তা বন্ধ করবার তোড়জোর শুরু হয়েছে সবে। দরজায় নজরদারের দায়িত্বে থাকা প্রহরী সুরা তার পূর্বপরিচিত। তার সঙ্গে সামান্য হাসি বিনিময় করে ভেতরে ঢুকে এল মাণ্ডুপ।

মন্দির দুর্গের দ্বিতীয় তলে ধনাগারের অধ্যক্ষ আহুমের কক্ষ। তাঁর দরজায় পৌঁছে বাধা পেল মাণ্ডুপ। সেখানে দাঁড়ানো সৈনিক দুজন তার পরিচিত নয়। তাদের পোশাক থেকে বোঝা যায়, সেনাবাহিনীতে মাণ্ডুপের থেকে কয়েক ধাপ উঁচুতে তাদের অবস্থান। সামান্য রূঢ়ভাবেই তাকে সেখানে দাঁড় করিয়ে দিল তারা। সঠিক কারণটি না জেনে নিম্নশ্রেণীর এই সৈনিককে তারা সরাসরি অধ্যক্ষের দরবারে পৌঁছোতে দিতে রাজি নয়।

এবারে মাণ্ডুপ তার পোশাকের ভেতর থেকে আহুমের দেয়া স্বীকৃতিমুদ্রাটি বের করে তাদের দেখাতে সামান্য বিস্মিত হল তারা। তুচ্ছ এক সৈনিকের ধন গ্রহণ করে স্বয়ং আহুম তাকে স্বীকৃতিমুদ্রা দিয়েছেন… এ তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়। তার হাত থেকে মুদ্রাটি নিয়ে কক্ষের ভেতরে চলে গেল তাদের একজন।  

কক্ষের সামনের এই অলিন্দ থেকে পশ্চিমে ইন্দানদীর স্রোতটি চোখে পড়ে। সেখানে নদীর অন্যপাড়ে সূর্য ধীরে ধীরে দিগন্তে ডুব দিচ্ছিলেন। তার আলোয় ইন্দানদীর ধারা তার নীলাভ রঙ ছেড়ে রক্তিম হয়ে উঠল। তারপর একসময় সূর্য ডুবতে সেই রক্তিম স্রোত অন্ধকারের স্রোতে বদলে গেল। কক্ষের ভেতরে তখন তৈলদীপের মৃদু আভা জেগেছে।

এইবার চঞ্চল হয়ে উঠছিল মাণ্ডুপ। রাত্রি প্রথম প্রহরের সূচনা হয়েছে। এখনই রওয়না না হলে চন্দ্রোদয়ের আগে কর্কনের কাছে শকটগুলি নিয়ে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে উঠবে।

ইতিমধ্যে কক্ষের দরজার প্রহরী পরিবর্তিত হয়েছে। নতুন প্রহরীর কাছে এগিয়ে গিয়ে সে বিনীতভাবে তার আবেদনটি জানাল। প্রহরী নিরুত্তর রইল। যেন সে এই সাধারণ সৈনিকের আবেদন শুনতেই পায়নি। মাণ্ডুপ দ্বিতীয়বার তার আবেদনটি পেশ করল। এবার তার গলার স্বর সামান্য উঁচু হয়েছিল। প্রহরীটি সচকিত হয়ে তার দিকে ঘুরে তাকাল একবার। নিম্নতম স্তরের এই সেনানীর পক্ষে তার মত একজন সম্মানিত প্রহরীর সঙ্গে উঁচুগলায় কথা বলবার সাহস দেখানোটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অতএব সে তাকে একটা প্রবল ধাক্কায় সরিয়ে দিতে গেল নিজের সামনে থেকে। এইবারে একটা নিঃশব্দ বিস্ফোরণ হল যেন মাণ্ডুপের মাথায়। সে বুঝেছে বিনা প্রতিবাদে অপেক্ষা করতে হলে আজ হয়তো তার অধ্যক্ষের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগটাই হবে না আর। অতএব ঘুরে এসে সে একরকম জোর করেই প্রহরীকে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করল। ইতিমধ্যে ঘটনাটি নজরে পড়তে সেখানে আরো দুজন প্রহরী  এসে উপস্থিত হয়েছে…দুপাশ থেকে তারা মাণ্ডুপকে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরেছিল। ঠিক তখন কক্ষের ভেতর থেকে আহুমের গলা জেগে উঠল…

***

আহুম গভীর চিন্তায় ডুবে ছিলেন। তাঁর হাতে মাণ্ডুপের পাঠানো স্বীকৃতিমুদ্রাটি ধরা। খানিক আগে প্রহরী সেটি এনে তাঁর হাতে দেবার পর থেকেই তিনি চিন্তিত রয়েছেন। দর্শনপ্রার্থী অতিথিদের বাকি সকলকেই বিদায় করে দিয়েছেন তিনি। জীবনে এই প্রথম এমন এক ধর্মসঙ্কটের  মুখোমুখি তিনি হয়েছেন, যেখানে কোন পথ তিনি নেবেন তা তিনি বুঝতে পারছেন না।

আসলে আহুম পেশায় বণিক। মন্দিরদুর্গের পুরোহিত সমাজে বণিকদের প্রতিনিধিরা সবেমাত্র কিছুকাল হল যোগ দেবার অনুমতি পেয়েছেন। এখনও বিভিন্ন নগরে তাঁদের ধনাগার ও অর্থ সংক্রান্ত কাজের দায়িত্বেই রাখা হয়। মূল প্রশাসণে অধিকাংশ নগরেই তাঁদের কোনো ভূমিকা থাকে না। কট্টাদিজা নগরীতেও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি, নিয়মরক্ষার্থেই নগরের বাসিন্দা কয়েক ঘর বণিকের থেকে তাঁকে নির্বাচন করা হয়েছে পুরোহিত সমাজের সদস্য হিসাবে। কিন্তু ধনাগারের অধ্যক্ষ হয়ে অর্থের হিসাব রক্ষা ভিন্ন নগরের আর কোনো বিষয়ে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই। ধনাগারের প্রশাসনের ক্ষেত্রেও, মন্দিরদুর্গের প্রধান পুরোহিত জৈমিন এবং তাঁর উপদেষ্টামণ্ডলীর আদেশ মেনে চলাই তাঁর একমাত্র কাজ। এমনকি এই নগরের সর্বময় কর্তা যে সন্তানগোলক, তিনিও পরম উপেক্ষায় তাকে এতকাল দূরেই রেখেছেন। কখনও সরাসরি তাঁর সঙ্গে মানসিক সংযোগ স্থাপন করেননি। করেননি… আজকের আগে। আজ সন্ধ্যায়, এইমাত্র প্রথমবার তাঁর কণ্ঠ নিজের মস্তিষ্কে প্রতিধ্বনিত হতে শুনেছেন আহুম। কিন্তু সে নির্দেশ…

মাণ্ডুপ নামের এই তরুণের বিষয়ে মঞ্জাদাহিরের পুরোহিত সমাজে প্রচলিত কথাবার্তা আবছাভাবে কানে এসেছে তাঁর। সেনাপতি বৈক্লণ্যের পুত্র সে। তার পাশাপাশি, ম্‌হিরিবিজয়েও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অথচ তা সত্ত্বেও এই তরুণকে পুরস্কারের বদলে নিতান্তই নিষ্ঠুর এক শাস্তি দিয়েছেন মহান দোরদাবু। শাস্তি দিয়েছেন এই অখ্যাত দুর্গে সাধারণতম সৈনিকের পদে তাকে কাজ করতে পাঠিয়ে। বিষয়টি কানে আসবার পর থেকেই এই যুবকের প্রতি তাঁর একটা দুর্বলতা ছিল। সম্প্রতি আরো একটা গুজব কানে আসতে সে দুর্বলতা তাঁর বেড়েছে বই কমেনি। তা হল, এ নাকি বৈক্লন্যের পালিত সন্তান। আদতে এর ধমনীতে কোনো বণিকের রক্ত বইছে। বিষয়টা নিয়ে খুব বেশি কিছু আহুমের জনা নেই বটে। কিন্তু একজন বণিক হিসেবে কোনো বণিকের সন্তানকে এহেন দুর্ভাগ্যের মুখোমুখি হতে দেখে তাঁর মন সহানুভূতিতে এর প্রতি দ্রব হয়ে উঠেছিল।

তবে তাতেও খুব বেশি বিচলিত হননি তিনি। মহান গোলকদেবতা দোড়াদাবুতে অখণ্ড বিশ্বাস তাঁর। তাঁর সন্তানগোলক তাঁকে মন্দির পুরোহতের পদ দিয়েছেন, এ তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে সর্বদা স্মরণে রাখেন। মাণ্ডুপের এই দুর্ভাগ্যজনক অবস্থার পেছনে নিশ্চয় কোনো মহান উদ্দেশ্য রয়েছে দেবতার, এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন আহুম।

কিন্তু আজ, এই যুবক যখন দরজায় উপস্থিত হয়ে তার স্বীকৃতিমুদ্রাটি পেশ করল, ঠিক সেই মুহূর্তে প্রধান পুরোহিত জৈমিন-এর কাছ থেকে একটি বার্তা এসে পৌঁছায় তাঁর কছে। তিনি জানিয়েছেন, দোরাদাবুর নির্দেশে মাণ্ডুপের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। অতএব তাকে যেন তা কোনোভাবেই প্রত্যার্পণ না করা হয়।

সৈনিকের ধর্ম বিজিত ভূমির সম্পদ কেড়ে নেয়া। কিন্তু বণিকের ধর্ম তা নয়। আদান-প্রদানের মাধ্যমে ধনের হস্তান্তরেই তার অভ্যাস। অন্যের গচ্ছিত ধনের এহেন অপহরণ বণিকের ধর্মবিরুদ্ধ। তার ওপর, এ যদি সত্যিই বণিকপুত্র হয় তবে নিজে বণিক হয়ে তার প্রতি এহেন অবিচারে ভাগ নিলে মহাপাপ হবে তাঁর! অথচ জৈমিনের এই আদেশ…

গভীর চিন্তায় কখন যে দিন কেটে অন্ধকার নেমে এসেছে তা খেয়াল করেননি আহুম। খেয়াল হল বাইরে থেকে উঁচু গলায় চিৎকারের শব্দে। সেখানে কিছু একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে বাইরে চোখ রাখলেন আহুম। তারপর সেখানের দৃশ্যটা দেখে বুঝলেন, আর বিলম্ব করা যাবে না। এবারে এর নিষ্পত্তি করে নিজের হাত থেকে বিষয়টাকে সরিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে হবে তাঁকে। বণিকের নীতিবোধ হয়তো খানিক আহত হবে তাতে। কিন্তু জৈমিনের মাধ্যমে আসা স্বয়ং দোরাদাবুর আদেশ অগ্রাহ্য করা… সে তাঁর মত তুচ্ছ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সৈনিকদের হাতে বন্দি হতে চলা মাণ্ডুপকে ভেতরে আসবার অনুমতি দিলেন তিনি।

খানিক বাদে সামনে এসে দাঁড়ানো বিধ্বস্ত তরুণের দিকে একনজর তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলেন আহুম। তারপর ধীরে ধীরে কাটা কাটা গলায় তাকে জানিয়ে দিলেন জৈমিনের আদেশ। শুনে, যেন বজ্রাহতের মত দাঁড়িয়ে রইল মাণ্ডুপ। এহেন অপ্রত্যাশিত আঘাত সে অতিবড়ো দুঃস্বপ্নেও আশা করেনি। খানিক বাদে নিজেকে সামলে নিয়ে সে প্রশ্ন করল, “কিন্তু কেন?”

“সে প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই মাণ্ডুপ। প্রধান পুরোহিত জৈমিনের আদেশ। নাকি স্বয়ং দোরাদাবুর তাই ইচ্ছা। এর কারণ জানতে চাইলে তুমি জৈমিনের দরবারে গিয়ে সে প্রশ্ন করো।”

***

সদ্য ওঠা চাঁদ তার কোমল আলো ছড়াচ্ছিল পাহাড়ের গায়ে। সে আলোয় দূরে বহমান সিন্ধুর জল রুপোলি ছোঁয়া। সেদিকে চোখ ধরে রেখে পায়ে পায়ে নিজের কুঠুরীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল মাণ্ডুপ। কর্কন চলে গেছে। তার সঙ্গে আর দেখাও করতে যায়নি মাণ্ডুপ। একটা আশ্চর্য বিষাদ আর ক্রোধের মিশ্রণ তাকে বেপথু ক্রে রেখেছে এই মুহূর্তে। তার সমস্ত সত্ত্বা একযোগে প্রশ্ন করে চলেছে কেবল, “কেন? কেন?”

সে জানে, আগামীকাল দ্বিপ্রহরে জৈমিনের দরবারে যাবার আগে এ প্রশ্নের উত্তর জানা সম্ভব হবে না। প্রতিকারের কোনো আশাও নেই তার আগে। আর তাই পথ চলতে চলতে অসহায় যন্ত্রণায় বারবার ছটফট করে ওঠে সে। অস্ফুটে তার মুখ থেকে বের হয়ে আসে একাক্ষরা একটা শব্দ… “মা… ওহ মা…”

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই জৈমিনের মনে ভেসে আসছিল পরদিনের কর্মপদ্ধতির বিষয়ে দোরাদাবুর পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশ। পথের কাঁটা মাণ্ডুপকে নিশ্চিন্তে সরিয়ে দেবার যে পরিকল্পনা রচেছেন দোরাদাবু, আগামীকাল দ্বিপ্রহরে তার আরো একটি ধাপের অভিনয় সুসম্পন্ন হবে কট্টাদিজার মন্দিরদুর্গে, জৈমিনের দরবারে…

ক্রমশ

শীর্ষচিত্র- অতনু দেব।

 জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক

Leave a Reply