ধারাবাহিক উপন্যাস-সিন্ধু নদীর তীরে -পর্ব ৭- পিটার বিশ্বাস-শরৎ২০২২

সিন্ধুনদীর তীরে –প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্বচতুর্থ পর্বপঞ্চম পর্বষষ্ঠ পর্ব , সপ্তম পর্ব

IMG-20210913-WA0004

পঞ্চম অধ্যায়

বুনোদের ডেরায়

তিনটে বৃত্ত। তার একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে সুম্ভের গো-যান। যানের মধ্যেই তাঁর বিশ্রামের বন্দোবস্ত হয়েছে। তাকে ঘিরে ছ’জন বাছাই যোদ্ধার অতন্দ্র প্রহরা। তাদের চারপাশে সুম্ভের পণ্যসামগ্রী ভরা গো-যানগুলো ঘেঁষাঘেঁষি করে সাজানো। তাদের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় বারোজন রক্ষী ছড়িয়ে আছে। গোযানের চালকদেরও অস্ত্র দেয়া হয়েছে। সবশেষে, শিবিরের একেবারে বাইরে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেয়া ছয়জন রক্ষীর সঙ্গে রয়েছে মাণ্ডুপ নিজে। প্রতিটি দলের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে পালা করে রাত্রির একেকটি যাম বিশ্রাম নেবে।

সুম্ভ আপত্তি করেছিলেন। চব্বিশজন রক্ষীকে দিয়ে শিবির ঘিরে একটা ব্যুহ তৈরি করা হোক এই ছিল তাঁর ইচ্ছা। এতকাল বহু যাত্রায় এতেই অভ্যস্ত ছিলেন তিনি। তেমনটা হলে শক্তিশালী নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে পণ্যসামগ্রী নিয়ে তিনি অনেক নিশ্চিন্তে রাত কাটাতে পারবেন বলে তাঁর ধারণা।

কিন্তু মাণ্ডুপ তাতে রাজি হয়নি। এ-রণকৌশল একেবারেই মাণ্ডুপের নিজস্ব ভাবনার ফল। তার বক্তব্য ছিল, কোনো আক্রমণ হলে হানাদাররা সুম্ভের পরিকল্পিত বহির্ব্যুহই আশা করবে। সেক্ষেত্রে তারা ব্যুহের কোনো একটা এলাকায় আক্রমণ কেন্দ্রিভূত করে একবার প্রতিরোধে ফাটল ধরাতে পারলে শিবিরের সমস্ত সম্পদ সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় তাদের হাতে আসবে। কিন্তু মাণ্ডুপের এই রক্ষণপদ্ধতিতে শিবিরের প্রতি অঙ্গুলীপরিমাণ জমিতেই প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হবে তাদের।

তার যুক্তির সামনে সুম্ভকে শেষ অবধি একরকম নিমরাজি হয়েই সম্মতি দিতে হয়েছিল। অবশ্য না দিয়ে উপায়ও ছিল না তাঁর। কারণ প্রথা অনুযায়ী এ-ধরনের যাত্রায় নিরাপত্তার বিষয়ে পণ্যের মালিক মতামত দিতে পারেন অবশ্যই, কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা প্রহরীদলের নায়কের হাতেই থাকে।

এবং আক্রমণ এলো। আর তা এলো এতই অপ্রত্যাশিত একটা জায়গা থেকে যে, সুম্ভের পরিকল্পিত প্রথাগত ব্যুহ হলে সেদিন প্রায় বিনাযুদ্ধেই আত্মসমর্পণ করতে হত সেই পণ্যবাহিনীকে। কারণ, শিবিরকে বাইরে থেকে আক্রমণের কোনো চেষ্টাই করেনি শত্রুরা। রাত্রি মধ্যযাম পেরোবার পর, সুম্ভের গোযানের প্রহরীদের একজন তার পালার ঘুম শেষ করে, অন্য এক সঙ্গীর জায়গা নিতে বের হয়ে এসেছিল। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার চোখের সামনে তার সঙ্গীটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। চমকে উঠে সদ্য ঘুম থেকে ওঠা রক্ষীটি বন্ধুর কাছে এগিয়ে গিয়ে দেখে একটা ছোটো তির এসে তার গলায় বিঁধে কন্ঠনালী ছিন্ন করে দিয়েছে।

রক্ষীটি অভিজ্ঞ যোদ্ধা ছিল। তিরের অবস্থান লক্ষ করে সে বুঝতে পারে আক্রমণ এসেছে মাথার ওপর থেকে। চোখের পলকে অস্ত্র ছেড়ে সে মৃত সঙ্গীকে দুহাতে মাথার ওপর ঢালের মত তুলে ধরে ও তার ফলে ওপর থেকে তাকে লক্ষ করে ছুটে আসা একাধিক মৃত্যুমুখী তিরের আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। 

ততক্ষণে তার চিৎকারে গোটা শিবির জেগে উঠেছে। শিবিরের বাইরে থেকে মাণ্ডুপের চিৎকার করে পাঠানো নির্দেশ মেনে সকলেই গোযানগুলোর আড়ালে আশ্রয় নিয়ে ধনুকের নিশানা করেছে মাথার ওপর ছড়িয়ে থাকা গাছগুলোর অন্ধকার মাথার দিকে।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মাণ্ডুপের রণকৌশলের উপকারিতা প্রমাণিত হতে শুরু করল। নীচে গোযানদের নিরাপত্তায় সুরক্ষিত শিবির রক্ষীদের কোনো ক্ষতি হচ্ছিল না। কিন্তু তাদের ছুঁড়ে দেয়া অজস্র তিরের হানায় কিছুক্ষণ বাদে বাদেই ওপরের অন্ধকার শাখাগুলো থেকে তিরবেঁধা একেকটা শরীর আছড়ে পড়ছিল নীচের দিকে।

সম্মুখযুদ্ধের উত্তেজনা মাণ্ডুপের রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল যেন সেইমুহূর্তে। রক্ত, মৃত্য আর হত্যার নেশা শক্তিশালী মাদকের মতই তার শিরায় শিরায় উন্মাদনা জাগিয়ে তুলছিল। সে উন্মাদনা মৃত্যুকে তুচ্ছ করতে শেখায়। সে-উন্মাদনা মানুষের কানে কানে বলে, তুমি অপরাজেয়। দুনিয়ার কোনো শক্তি তোমার কোনো ক্ষতিসাধন করতে পারবে না।

সে জানত না, যুদ্ধের সেই তীব্র উত্তেজনার মধ্যেও, কয়েকটা গাছের মাথায় স্থির হয়ে অপেক্ষায় থাকা কিছু মানুষ অচঞ্চল দৃষ্টি ধরে রেখেছে কেবল তারই দিকে। অপেক্ষায় আছে কখন সে একলা হয় তার জন্য।

সেই মুহূর্তটা আসতে বেশি দেরি হল না। সুশিক্ষিত মহিষটির পিঠে চেপে শিবিরকে ঘিরে বিদ্যুতের মত পাক দিয়ে চলেছিল মাণ্ডুপ। অজস্র মশালের আলোয় দিনের মত হয়ে উঠেছে জায়গাটা এতক্ষণে। জয়ের গন্ধ পেয়ে শিবিরের প্রহরী ও গোযানের চালকরা দ্বিগুণ উৎসাহে আক্রমণ শানাচ্ছে অন্ধকার পত্রমুকুটদের ভেতরে অদৃশ্য শত্রুদের উদ্দেশে। একেকটা এলাকায় গিয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে, যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি দেখে, প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছিল মাণ্ডুপ।  এক হাতে মাথার ওপর তুলে ধরা বৃষচর্মের ঢাল তাকে ওপর থেকে আসা আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে চলেছে। অন্য হাতে ব্রোঞ্জের তীক্ষ্ণ ফলাযুক্ত বল্লম শত্রুর রক্তপানের জন্য সদাই উন্মুখ।

উত্তেজিত সেই দৌড়ের মধ্যেই কখন যে সে একটা অপেক্ষাকৃত নির্জন এলাকায় এসে পড়েছে তা মাণ্ডুপ খেয়াল করেনি। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ মাথার ওপর থেকে তীক্ষ্ণ একটা শিসের শব্দ উঠল। চমকে উঠে মাণ্ডুপ খেয়াল করল, হঠাৎ করেই তার সামনে কিছুদূরে একটা গাছের ডালপালায় চাঞ্চল্য জেগেছে। পরমুহূর্তেই এক গাছ থেকে অন্যগাছে পরপর কিছু ঢেউ ধেয়ে গেল অরণ্যের গভীর এলাকার অভিমুখে। তীক্ষ্ণধী মাণ্ডুপের সেই দুলুনিগুলোর অর্থ বুঝে নিতে অসুবিধে হল না। পালাচ্ছে এরা! অতর্কিতে ওপর থেকে আক্রমণ চালাতে এসে নিজেরাই বিপদে পড়ে এইবার প্রাণ নিয়ে সরে পড়বার পথ ধরেছে।

মাণ্ডুপের রক্তে তখন যুদ্ধের উন্মাদনা জেগেছে। এদের এভাবে পালাতে দেয়া যায় না। চারপাশে একনজর তাকিয়ে দেখে নিল সে। দ্বিতীয় কোনো সঙ্গী নেই কাছাকাছি। তাদের খবর দিতে গেলে এদের একজনকেও আর বন্দি করা সম্ভব হবে না। অথচ, সে জানে, এদের দলটার অন্তত দু’একজনকে জীবিত ধরা প্রয়োজন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে যা তথ্য মিলবে তা থেকে আগামী পাঁচদিনের জঙ্গলযাত্রাকে অনেকটাই নিরাপদ করা সম্ভব হতে পারে।

কিন্তু সমস্যা হল, এই মুহুর্তে সে একেবারে একা। একটু ইতস্তত করে মনস্থির করে নিল মাণ্ডুপ। তারপর প্রাণপণ চিৎকারে তার সঙ্গীদের তাকে অনুসরণ করবার আদেশটা দিয়ে মহিষের মুখ ঘুরিয় নিল দুলতে থাকা গাছের মাথাগুলোকে লক্ষ করে।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ছুটন্ত মহিষের পেছনে মিলিয়ে গিয়েছিল শিবিরের যুদ্ধের শব্দ। উত্তেজিত মাণ্ডুপ খেয়াল করেনি, তখনও শিবির থেকে খুব বেশি দূরে সরে যায়নি সে। খেয়াল করলে সে হয়তো বুঝতে পারত, হঠাৎ করেই যুদ্ধের কোলাহল এভাবে থেমে যাওয়াটা কোনো স্বাভাবিক ব্যাপার নয়।

ওদিকে তাদের শিবিরে তখন একটা অন্য দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। সেখানে গাছের আড়াল থেকে তিরের ঝাঁক  ছুটে আসা একেবারে হঠাৎ করেই থেমে গিয়েছে। বিস্মিত প্রহরীদের চোখের সামনে গাছের মাথার দুলুনিগুলো শিবির ছেড়ে ক্রমশই একটা বিশেষ দিকে ছুটে সরে যাচ্ছিল।

পালাচ্ছে শত্রুরা! যুদ্ধজয়ের উল্লাস ছড়িয়ে পড়ছিল প্রহরীদের মধ্যে। অস্ত্র ছেড়ে মহানন্দে তারা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরতে ব্যস্ত হয়েছে তখন। তিরবৃষ্টিতে আহত সঙ্গীদের শুশ্রূষায়, কিংবা তিরের আঘাতে গাছের আড়াল থেকে আছড়ে পড়া শত্রু দস্যুদের মৃতদেহে উল্লসিত আঘাত করতে ব্যস্ত শিবিরের মানুষজন খেয়াল করল না তাদের নেতা মাণ্ডুপ তখন সেখানে আর উপস্থিত নেই।

তখন, শিবির থেকে বেশ খানিকটা দূরে, জঙ্গলের গভীরে, মাণ্ডুপ তার বর্শা পিঠে আটকে নিয়ে তিরধনুক তুলে নিয়েছে হাতে। সামনে খানিক দূরে ঘন ঘন দুলে ওঠা একটা গাছের মাথার দিকে লক্ষ্যস্থির করে ধনুকে তির পরাল সে। আর সেই গভীর মনঃসংযোগই কাল হল তার। সে খেয়াল করল না, পেছনদিকে দাঁড়ানো একটা গাছের মাথা থেকে তাকে লক্ষ করে উড়ে আসছে ফাঁস লাগানো একটা লতার মাথা।

পরক্ষণেই, হঠাৎ কালসর্পের মত তার শরীরটাকে জড়িয়ে ধরে একটা হ্যাঁচকা টানে তাকে মহিষের পিঠ থেকে গাছের পত্রমুকুটের মধ্যে তুলে নিয়ে গেল সেই দড়ির ফাঁস। হতচকিত মাণ্ডুপ সামান্যতম বাধা দেবার চেষ্টা করবার আগেই তার মাথার পেছনে আছড়ে পড়ল কাঠের তৈরি মুগুরের একটা সজোর আঘাত। তার কানের কাছে বিজাতীয় ভাষায় হিসহিস করে উঠল একটা কর্কশ গলা। দুটো নিষ্ঠুর শক্তিশালী হাত তার আহত শরীরটাকে পালকের মত তুলে নিয়ে পিঠে ছুঁড়ে ফেলে জড়িয়ে নিল শক্তপোক্ত লতার বাঁধনে।

এইবার, গাছের মাথায় মাথায় তাকে পিঠে নিয়ে ধেয়ে গেল তার অদৃশ্য শত্রু… চারপাশের গাছগুলো থেকে পাশা পাশে ছুটতে থাকা আরও অজস্র গলায় বিজাতীয় কোনো ভাষায় আনন্দোল্লাসের শব্দ ভেসে এল তার কানে। তারপর আর তার কিছু মনে নেই।

 

পথ চলেছে অন্তহীন। যেন এ-পথের শেষ হবে না কখনো। অবশ্য মাণ্ডুপের মত শহরে পালিত মানুষের পক্ষে একে পথ বলে চেনা সম্ভব নয়। পথ দূরস্থান, জায়গাটাকে সে তার চেনা পৃথিবীর সঙ্গেই মেলাতে পারে না একেবারে। আজীবন ইন্দার রুপালি জলধারা আর তার পাড়ের ঘন সবুজে অভ্যস্ত তার চোখ। চিরপরিচিত সেই ইন্দা, বা তার দুই কুল ধরে ছড়িয়ে যাওয়া অজস্র জনবসতির চিহ্ন নেই কোনো এখানে। দিগন্তবিস্তৃত উঁচুনীচু পাহাড়, বালি ও নুড়িপাথরে ছাওয়া জমি, ইতস্তত ছড়ানো সামান্য কিছু কাঁটাঝোপ, কোথাও কোথাও আবার সোনালি বালির সমুদ্র ছড়িয়ে আছে যেন। রুক্ষ পাথুরে ঢেউ ওঠা জলহীন সমুদ্রের মত সেই মরা দেশ পেরিয়ে যেতে যেতে ইন্দাতীরের চিরচেনা সবুজ দুনিয়াটার জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকে তার চোখ।

সেদিন রাত্রে সুম্ভের শিবিরের সেই যুদ্ধের সময় মাথায় আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারাবার পর, সে প্রথম চোখ মেলেছিল একটা ছোটোখাটো আধামরু জাতীয় এলাকায় এসে। সেখানে ইতিউতি ছড়িয়ে থাকে দু’একটা রুক্ষ টিলা আর তাদের ঘিরে চারপাশে যতদূর চোখ যায় বালি আর নুড়ি ছড়ানো ঊষর শূন্যতা। এমনই একটা টিলার গায়ে নীচুমত একটা ফাটলের ভেতরে শুইয়ে রাখা হয়েছিল তাকে। গর্তটার মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকা হিংস্র চেহারার মানুষগুলো তাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে নিঃশব্দে তাকিয়েছিল কেবল। কোনো বাধা দেয়নি।

আস্তে আস্তে উঠে গর্তের বাইরে বের হয়ে এসেছিল মাণ্ডুপ। আর সঙ্গে সঙ্গেই ঝাঁঝালো রোদ, মাথার ওপর তীব্র নীল আকাশ আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ঊষর, পাথুরে জমি থেকে প্রতিফলিত জ্বালা ধরানো উত্তাপ, ঘা মেরেছিল এসে তার চোখে। মাথার পেছনদিকে তখনও ফুলে থাকা এলাকাটা দপদপিয়ে উঠেছিল যন্ত্রণায়।

কিন্তু তবু হার মানেনি সে। নেহাত মনের জোরেই টিলাটার এবড়োখেবরো ধারালো পাথর বেয়ে হামাগুড়ি তার মাথায় উঠে গিয়েছিল। আর তারপর হঠাৎ করেই বুকটা ধ্বক করে উঠেছিল তার দূরে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে। জল! বিস্তীর্ণ একটা এলাকা জুড়ে টলটল করছে ইন্দার ধারার মতই রুপালি, নীলাভ জল।

দৃশ্যটা চোখে পড়বামাত্র ফিরে এসেছিল তার তৃষ্ণার বোধ। মন্ত্রমুগ্ধের মত টলতে টলতে সেই জলরাশির দিকে খানিক এগিয়ে যেতে হঠাৎ উধাও হয়েছিল সেই জলের মায়া। আংরার মত গরম পাথরের বুকে মুখ থুবড়ে পড়ে নীচের দিকে গড়িয়ে গিয়েছিল তার দুর্বল শরীর, আর পেছন থেকে উঠে এসেছিল তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ মেশা অট্টহাসির শব্দ।

একটু বাদেই দুটো কঠোর হাত এসে একটা নির্দয় ঝাঁকুনি দিয়ে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল তাকে। তারপর একটা চামড়ার থলে বের করে তার ঠোঁটে গুঁজে দিয়েছিল। কষাটে নোনতা সেই জলে একটা চুমুক দিয়ে গা গুলিয়ে উঠেছিল মাণ্ডুপের। কিন্তু জলটাকে মুখ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেবার ইচ্ছেটা সে সংবরণ করেছিল অসীম মনের জোরে।

ততক্ষণে চিন্তাভাবনা খানিক স্বচ্ছ হয়ে এসেছে তার। পুবের মরু এলাকা কিংবা পশ্চিমের জলহীন এই বুনো অঞ্চলের বুকে এই প্রাণঘাতী জাদু জলাশয়দের কাহিনি সে অনেক শুনেছে আমহিরির মন্দিরের গল্পকথকদের মুখে। সেইসব গাথায় বলে, বিস্তীর্ণ এই জলহীন নরকের বুকে নাকি ঈশ্বর দোরাদাবুই প্রথম জাদুবলে ইন্দা নদীর ধারা বইয়ে দেন। নিজের ঈশ্বরসন্তানদের সহায়তায় তারই তীরে তীরে গড়ে তোলেন আশ্রিত সেবকদের স্বর্গহেন নগরীগুলোকে। আজ, এই জলহীন রুক্ষ নরকের মাঝখানে একলা দাঁড়িয়ে ঈশ্বর দোরাদাবুর অসীম ক্ষমতা ও করুণাকে নতুন করে চিনতে পারছিল মাণ্ডুপ। টের পাচ্ছিল, অর্ধচেতন অবস্থায় কী মহাভুল সে করতে চলেছিল কয়েক মুহূর্ত আগে। মরুভূমির বুকে অশরীরি উপদেবতাদের সৃষ্ট ওই মায়াজল মানুষকে ভুলিয়ে নিয়ে গিয়ে তার প্রাণ কেড়ে নেয়!

নিজেকে সংযত করে এইবার ধীরে ধীরে আরও কিছুটা বিস্বাদ জল সে মুখে টেনে নিয়েছিল। জ্ঞান হবার পর থেকেই সে দোরাদাবুর একনিষ্ঠ ভক্ত। এই ঘোর বিপদেও সে ভক্তি তার অটল আছে। ঈশ্বর তাকে মঞ্জাদাহির নগরীতে ডেকে পাঠিয়েছেন। সেখানে যাবার পথে এই দুর্ভোগও তবে তাঁরই কোনো অজ্ঞাত লীলা। হয়তো, তাকে অনেক বড়ো কোনো দায়িত্ব দেবার ইচ্ছা তাঁর। হয়তো সেজন্যই এই কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় তাকে ঠেলে দিয়েছেন তিনি অদৃশ্য অঙ্গুলীহেলনে।

চিন্তাটা তার উদ্বিগ্ন মনে শান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দিয়েছিল। তাই যদি হয় তবে এই মুহূর্তে বেঁচে থাকা ও যতদূর সম্ভব নিজেকে সতেজ রাখা তার একমাত্র কাজ। তারপর ঈশ্বরের যেমন ইচ্ছা তাই পূর্ণ হোক।

কয়েকটা চুমুক দেবার পর লোকটা থলেটা তার মুখ থেকে একটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিয়ে রাগত গলায় কিছু বলে উঠল। সে ভাষার বিন্দুবিসর্গও না বুঝলেও মাণ্ডুপের টের পেয়েছিল, জল এই শিবিরে দুর্লভ সম্পদ। তার মত একজন বন্দির পেছনে নিতান্ত প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত একবিন্দু  জলও খরচ করবার কোনো ইচ্ছে নেই এদের।

এরপর থেকে তার দৈনন্দিন জীবন একটা নির্দিষ্ট ছন্দে কেটে চলেছে। এই দুর্গম ও ভয়াবহ এলাকায় প্রকৃতির চরিত্র একেবারেই আলাদা। এখানে পথ চলবার উপযুক্ত সময় হল রাত্রি। সময়ভেদে চাঁদ বা নক্ষত্রদের আবছা আলোয়, উঁচুনীচু পাহাড় কিংবা নুড়ি ও বালিছড়ানো রুক্ষ প্রান্তর বেয়ে সারা রাত জুড়ে যতটা সম্ভব পথ চলে নেয় তারা। তারপর সকালে সূর্যোদয়ের সামান্য সময়ের মধ্যে আকাশ ও পাথুরে জমির থেকে ছড়িয়ে পড়া তীব্র উত্তাপে গোটা জায়গাটা অগ্নিকুণ্ড হয়ে ওঠে। এ-সময়টা কোনো একটা টিলার পাথরের আড়ালে কিংবা ফাটলের গভীরে আশ্রয় নেয় গোটা দলটা।

দিনের বেলাটা এরা ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেয় মূলত। কেবল দলের দু’তিনজন পালা করে জেগে থাকে শিবিরের পাহারার কাজে। তখন তাদের ঝোলা থেকে বের হয়ে আসে পোড়ানো মাটির ছোটোছোটো চাকতি, আর ছোট্ট একটা চামড়ার গোলক। চাকতিগুলোকে একের পর এক স্তূপ করে সাজিয়ে সেই গোলক ছুঁড়ে ছুঁড়ে তাকে ভেঙে দেয়া, ফের নতুন করে গড়া, এই তাদের খেলা।

শুরুতে এ খেলার মর্ম কিছুই বুঝত না মাণ্ডুপ। আমহিরি নগরীর ছেলে সে। শৈশব থেকেই ছক কাটা চতুষ্কোণের বুকে হাড়ের তৈরি নকশাদার ঘুঁটিদের নিয়ে যুদ্ধক্রীড়া অথবা ফুটকি কাটা চৌপল ছুঁড়ে ছুঁড়ে পার্ষ্টিক খেলায় সে অভ্যস্ত। সে খেলায় বুদ্ধি ও ভাগ্যের তীব্র দ্বন্দ্ব চলে প্রতিযোগীদের মধ্যে। এদের এই শিশুসুলভ খেলায় সে তাই কোনো আগ্রহ বোধ করত না।

কিন্তু তারপর কয়েকদিন যেতে আস্তে আস্তে তার খেয়াল হয়, মরুভূমির বাসিন্দা অনুন্নত দস্যুজাতির এই অতি সাধারণ খেলাতেও অজস্র কৌশল রয়েছে। রয়েছে জয়পরাজয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতার মজা। আর এই খেলাটাকে গভীরভাবে দেখতে দেখতে ও সেই সময় তাদের কথাবার্তা শুনতে শুনতে সে খেয়াল করেছিল, এদের অপরিচিত উচ্চারণে বলা অচেনা ভাষার মধ্যে আসলে তার পরিচিত বহু শব্দই হাজির আছে, তবে সামান্য ভিন্ন উচ্চারণে।

এইখানে একটা সাবধানতা সে অবলম্বন করেছিল। এদের ভাষার খানিক খানিক যে সে বুঝতে পারছে সেটা সে নিজের হাবভাবে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দেয়নি কাউকে। আর তার ফলে, এদের কথাবার্তাগুলো থেকে মোটামুটি একটা ছবি সে তৈরি করে নিতে পেরেছে গত কয়েকদিনে।

আর সেটা তৈরি করে নেবার পর থেকে একটা অন্যরকম ভয় বাসা বেধেছে তার মধ্যে। কারণ যতটা নীচুস্তরের বর্বর পশু সে ভেবেছিল এই মরুবাসী দস্যুদের ততটা নীচুস্তরের জীব এরা আদৌ নয়। এদের হানাদারীর পেছনে দীর্ঘ পরিকল্পনার ছাপ আছে। আমহিরি সহ ইন্দাতীরের বিভিন্ন নগরীর আশপাশের গ্রামগুলোতে এদের চরেরা নানান নিম্নস্তরের পেশায় নিযুক্ত হয়ে জীবন কাটায়। আমহিরি অঞ্চলে তাদের এই চরদের মুখেই মাণ্ডুপের পরিচয় ও তার যাত্রার খবর পেয়ে সুনির্দিষ্টভাবে তাকেই বন্দি করবার জন্য আক্রমণ শানিয়েছিল এরা। সুম্ভের পণ্য এদের মূল লক্ষ কখনই ছিল না।

খবরটা শুনে সামান্য ভয় হলেও তারই পাশাপাশি একটা বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছে মাণ্ডুপ। উপস্থিত এরা যাই করুক প্রাণে মারবে না তাকে। কারণ যেটুকু সে বুঝেছে তাতে, সে ধরা পড়বার পর দলটার নেতারা এই প্রহরীদের হাতে তাকে নিয়ে আসবার ভার দিয়ে নিজেরা দ্রুতগামী উটে চেপে তাদের আস্তানার দিকে এগিয়ে গেছে। তাকে অক্ষত ও জীবিত অবস্থায় সেখানে এনে পৌঁছে দেবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এদের।

তবে সমস্যা হল, ঠিক কোন উদ্দেশ্যে তাকে এভাবে বন্দি করে আনা হয়েছে তার কোনো ইঙ্গিত সে এই দলটার কথাবার্তায় পায়নি। সেটাই স্বাভাবিক অবশ্য। মাণ্ডুপ নিজে পেশাদার যোদ্ধা। নিজের প্রহরীদলের নেতৃত্ব দেয় সে। দলের নীচুতলার সদস্যদের কাছে সে-ও তার রণকৌশল খুলে বলে না কখনো। তাদের কাজ হয় কেবল বিনাপ্রশ্নে দলপতি আদেশ মান্য করা। এই বন্য দস্যুরাও সেই একই শৃঙ্খলায় তাদের দল পরিচালনা করে।

অতএব, লম্বা যাত্রাটা শেষ হবার জন্য শান্তভাবে অপেক্ষা করা ছাড়া সে-মুহূর্তে আর কিছুই করবার ছিল না তার। না। তাকে বেঁধে বা সতর্ক পাহারায় রাখা হয় না বিশেষ। তার প্রয়োজনও নেই। কারণ এরা এবং মাণ্ডুপ সকলেই একটা সত্য ভালো করেই জানে- পথ না চেনা থাকলে এই মরু-নরকে একলা পা বাড়ানো মানে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া।

সন্ধ্যার মুখমুখ সূর্য পশ্চিম দিগন্তে ঢলে পড়লে ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে দলটা।  দিনের অস্থায়ী আস্তানা থেকে বের হয়ে শিকারী পশুর একটা দলের মত তারা ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। আপাতদৃষ্টিতে রুক্ষ হলেও জায়গাটা সম্পূর্ণ জলহীন নয়। মাঝে মাঝেই তার পাথুরে জমির বুকে শুকনো বালিতে ভরা এলোমেলো কিছু নালার চিহ্ন মেলে। তাদের বুকে ঠিক কোন জায়গায় বালি খুঁড়লে জল মিলতে পারে তা এদের নখদর্পণে। সে এলাকাগুলোকে খুঁজে নিয়ে বালি খুঁড়ে গভীর গর্ত বানিয়ে তাতে চুঁইয়ে জমা হওয়া জল সংগ্রহ করা তাদের প্রধান কাজ হয়। কটু স্বাদের ঘোলাটে রঙের জল। তবু, এই দুরধিগম্য অঞ্চলে সেই জলটুকুই বেঁচে থাকবার চাবিকাঠি।

আর, বেঁচে থাকবার দ্বিতীয় উপকরণটাও তারা খুঁজে নেয় এই বালি ও পাথরের বুক থেকেই। আপাতদৃষ্টিতে নিষ্প্রাণ এই দেশ আসলে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। এরা তার খবর রাখে। এদের তীক্ষ্ণ চোখ, আর দক্ষ হাত তাই সহজেই সাপ, মাকড়শা, বিছা, গিরগিটি হেন অজস্র ছোটোবড়ো জীবকে খুঁজে নেয় পাথরের ফাঁকফোকর থেকে। কখনো কখনো কৃপণ পাথুরে মাটির বুক থেকে খুঁড়ে আনে দুর্লভ কিছু কন্দমূল। দলটার সঙ্গে গোটাতিনেক পোষমানা শিকারি বাজ আছে। তাদের বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে কখনো কখনো ছোটো ছোটো পাখি বা খরগোশও সংগ্রহ করে আনে তারা খাদ্য হিসেবে। তারপর সেই শিকারদের পুড়িয়ে সেই দিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করে, রাত খানিক গভীর হলে শুরু হয় তাদের পথচলার পালা।

প্রথম দু’একদিন বড়ো ঘৃণায় এইসব বর্বরোচিত খাবার খেতে অস্বীকার করেছিল মাণ্ডুপ। তারপর ধীরে ধীরে এর সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে সে। মানিয়ে নিয়েছে বাঁচবার তাগিদেই। আর তারপর, একটু একটু করে এই খাদ্যপানীয়ে অভ্যাস হয়ে যেতে এখন আর এই জীবনযাপনকে খুব একটা অসহ্য বোধ হয় না তার।

ইদানিং এদের শিকার অভিযানে নিজেও সে যোগ দেয় খুশিমনে। অরণ্যজীবনে তার সহজাত দক্ষতা রয়েছে। তার চেতনা শৈশবের সেইসব স্মৃতিকে ভুলে গেলেও, তার প্রবৃত্তি এখনও সে-জীবনের স্মৃতিকে কোনো একটা স্তরে ধরে রেখেছে। তারই কল্যাণে এই কঠোর  জীবনে টিকে থাকবার প্রধান দক্ষতাটাকে রপ্ত করে নিতে তার খুব বেশি সমস্যা হয়নি। বালির বুক কিংবা পাথরের খাঁজ থেকে শিকার খুঁজে নিয়ে ক্ষিপ্র মুঠোয় তাকে হস্তগত করবার কাজে সে নিজে এখন এই দলটার মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ মানুষ। দক্ষতা অর্জন করেছে শুকনো কোনো নালার বুকের বালির চরিত্র দেখে তার নীচে জলের উৎস খুঁজে নেবার কাজেও।

সুম্ভের শিবিরের যুদ্ধ যেদিন ঘটেছিল সেদিন আকাশে চাঁদ ছিল না। এরপর চাঁদটা বাড়তে বাড়তে যেদিন সম্পূর্ণ থালার আকার নিল, সেদিন সারারাত পথ চলবার পর ভোরের মুখমুখ এসে তারা আশ্রয় নিয়েছিল একটা বেশ উঁচু টিলার গায়ের গভীর ফাটলে। ইতিমধ্যেই তার প্রহরীদের কথাবার্তা থেকে মাণ্ডুপ টের পেয়েছিল, যাত্রার এই পর্ব শেষ হবার মুখে এসে পৌঁছেছে। কাজেই ফাটলে পৌঁছে যখন দুজন প্রহরী এগিয়ে এসে তার হাতে ও গলায় দড়ির ফাঁস পরিয়ে দিল তখন সে তাতে কোনো বাধা দেয়নি।

এর খানিক বাদে একজন প্রহরী তার মুখের সামনে এগিয়ে ধরেছিল খানিক পোড়া মাংস ও জলের পাত্র। হাত ও পা বাঁধা অবস্থায় বসে থাকা মাণ্ডুপ সে খাবার খেতে দ্বিধা করেনি। খাওয়ার শেষে হঠাৎ করেই গভীর এবং অস্বাভাবিক একটা ঘুম নেমে এসেছিল তার চোখে। সম্ভবত খাবারের মধ্যে মেশানো কোনো নিদালি ঔষধির রসের ক্রিয়া। তারপর আর কিছু মনে নেই তার।

সেই ঘুম অবশেষে ভেঙেছিল তার, মানুষজনের গলার শব্দে। সেই শব্দে হঠাৎ করেই চোখ মেলে মাণ্ডুপ দেখে, গত কয়েকদিনের সেই খোলা প্রান্তর আর সমুদ্রের ঢেউয়ের মত টিলাদের মিছিল অদৃশ্য হয়েছে তার চারপাশ থেকে। তার বদলে উত্তরে মাথা তুলেছে পর্বতের দেয়াল। সেখান থেকে একটা পাহাড়ি পথ পাক খেয়ে নেমে এসেছে তার পাদদেশের দিকে। ঘুমের মধ্যে এই পর্বতের পাদদেশেই একটুকরো সমতল জমির বুকে এসে পৌঁছেছে সে। জমিটা ঘিরে কয়েকটা ছোটো ছোটো গুহা ইতিউতি ছড়িয়েছিল। একটু খেয়াল করতে বোঝা গেল, প্রাকৃতিক গুহা সেগুলো নয়। পাথরের নানা আকারের অসমান টুকরো কোনোমতে সাজিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে তাদের। সেগুলোকে ঘিরে মানুষ ও তাদের পোষ্য জীবজন্তুদের ভিড়। গোটা এলাকাটা জুড়ে একটা পচাটে গন্ধ ঘন কুয়াশার মত ভাসছিল। আর তারই সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল হাজারো কথাবার্তার মিশ্রিত শব্দ।

আদিম এই গ্রামটার শরীরে কোনো স্থায়িত্বের চিহ্ন ছিল না। দেখে মনে হচ্ছিল, চলার পথে একদল যাযাবর তাদের অস্থায়ী আশ্রয় গড়েছে সেখানে কোনোমতে।

পরিস্থিতিটাকে একটু বুঝে নিয়ে এবার মাণ্ডুপ নিজের অবস্থার দিকে নজর দিল। কৃত্রিম গুহাগুলোর মাঝখানে একটুকরো চৌরস জমি। সেখানে একটা ধাতব খাঁচার মধ্যে বন্দি করে রাখা হয়েছে তাকে।

এই খাঁচাটার দিকে নজর পড়তে একটু চমকে উঠল মাণ্ডুপ। আমহিরি নগরীর ছেলে সে। খাঁচা সে অনেক দেখেছে সেখানে। এ খাঁচাটা তারই একটা বড়সড়ো রূপ। একটা পাটাতনকে ঘিরে শক্তপোক্ত গোল একটা বেড়া। তার মাথার দিকটা খোলা। কিন্ত চমকটা হল খাঁচার উপাদানে। অবিশ্বাসী আঙুলে ফের একবার বেড়াটাকে ছুঁয়ে পরীক্ষা করে নিল মাণ্ডুপ। নাঃ। কোনো ভুল নেই। পোড়ানো মাটি নয়, এ-বেড়াটা বিশুদ্ধ ধাতু দিয়ে তৈরি। ধাতুকে বাখারির মত পাতলা করে নিয়ে ঝুড়ির মত করে তাকে বুনে বুনে যেন কেউ এই খাঁচার দেয়াল গড়েছে।

খুব সামান্য হলেও ধাতুবিদ্যার কিছু জ্ঞান মাণ্ডুপের আছে। আমহিরির কামারশালায় ধাতব কুঠার, তরবারি, তিরের ফলাসহ বহু প্রয়োজনীয় বস্তুই তৈরি হয়, কিন্তু এইভাবে ধাতুকে বাখারির মত পাতলা চেহারায় এনে তাকে কাজে লাগাবার প্রযুক্তি এখনো আমহিরির কামারদের নাগালের বাইরে। অথচ এই বন্য বর্বররা…

“যা ভাবছ তা সত্য নয় হে ক্ষুদ্রযোদ্ধা…”

হঠাৎ কাছাকাছি কোথাও থেকে একটা চেনা গলা কথা বলে উঠতে চমকটা ভেঙে গেল মাণ্ডুপের। ভারী গলায় ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে তার মাতৃভাষা মেলুহায়ে বলে ওঠা কথাগুলো কোনো স্থানীয় মানুষের মুখ থেকে আসেনি, কারণ এই খাঁচার কাছাকাছি কিছু কৌতূহলী শিশু বাদে তাদের আর কেউ নেই।

“আমি এখানে হে, ক্ষুদ্রবীর মাণ্ডুপ…”

ফের একবার কথা বলে উঠল গলাটা। এইবার মাণ্ডুপের খেয়াল হল, খানিক দূরে একটা কাঠের খোঁটার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা রয়েছে দ্বিতীয় একজন মানুষ।  সেদিকে একনজর দেখেই মাণ্ডুপ বিস্মিত গলায় বলল, “দৈমিত্রি! তুমি…”

দৈমিত্রির শুকনো রক্ত লেগে থাকা ঠোঁট হালকা একটা হাসিতে বিকৃত হয়ে উঠল। তার রুগ্ন শরীরে অজস্র ক্ষতচিহ্ন, তার রুক্ষ, ধুলিধূসরিত অবিন্যস্ত স্বর্ণাভ কেশরাজি বুঝিয়ে দিচ্ছিল বন্দিদশা মাণ্ডুপের মত ততটা সুখের হয়নি তার।

“তুমি এখানে…”

মাণ্ডুপের গলার স্বরে বিস্ময় গোপন থাকছিল না। সম্মুখযুদ্ধে দৈমিত্রিকে সে কপালজোরে একবার পরাস্ত করেছিল বটে, তবে সে জয়কে সে একটা ব্যতিক্রম বলেই বারংবার স্বীকার করেছে নিজের কাছে। দৈহিক শক্তি কিংবা রণকৌশল এই দুয়েতেই মুন্দিগ্র নগরীর এই মহাবীরকে সে নিজের চেয়ে অনেক উচ্চস্তরের যোদ্ধা বলে স্বীকার করে। সেই মহাবীরকেও…

“আশ্চর্য হচ্ছ?”  দৈমিত্রি হাসল। তারপর বলল, “আমহিরি নগরী থেকেই এরা আমাকে অনুসরণ করেছিল। নিঃশব্দ অনুসরণে আশ্চর্য দক্ষতা এদের। নগর ছাড়িয়ে মহাবনের পথে খানিকদূর এগোবার পর এদের সাতজনের একটা দল আমাকে আক্রমণ করে। তবে হ্যাঁ ধরা দেবার আগে এদের অন্তত তিনজন অর্ধমানব আমার হাতে ঘায়েল হয়েছে। কিন্তু তাতেও…”

বাক্যটা শেষ করা হয়ে উঠল না দৈমিত্রির। তার আগেই হঠাৎ তার দিকে এগিয়ে এসে একজন দস্যু তার হাতে ধরা শূলটা দিয়ে সজোরে আঘাত করেছে তার উরুতে। একটা যন্ত্রণাকাতর শব্দ তুলে চুপ হয়ে গেল সেই শ্বেত দানব। শূলহাতে দাঁড়ানো দস্যুটি তার ঠোঁটে আঙুল দিয়ে তাকে চুপ করবার নির্দেশ দিচ্ছিল। দৈমিত্রির চোখদুটো তখন দস্যুটিকে পেরিয়ে তার পেছনদিকে স্থির হয়েছে।

সে দৃষ্টিকে অনুসরণ করে সেদিকে চোখ ফেলে একটু চমকে উঠল মাণ্ডুপ। সেখানে তখন পাথরের ঘরগুলোর পেছনে একটা অদ্ভুৎদর্শন যান পাহাড়ি পথটা বেয়ে নেমে এসে স্থির হয়েছে। নীচু গড়ণের যানটার দুটো চাকা। ব্রোঞ্জের পাত দিয়ে তৈরি তার শক্তপোক্ত গড়ণ দেখে অনুমান করা যায়, কুশলী ধাতুবিদের হাতে অপরিচিত কোনো প্রযুক্তিতে তার সৃষ্টি। দুটি বিশালকায় রোমশ বলদ যানটিকে টানে। তাদের চেহারা ও যানটার শক্তপোক্ত গড়ণ বুঝিয়ে দেয়, এই পার্বত্য অঞ্চলের অসমতল ও উঁচুনীচু জমিতে চলবার জন্য একেবারে উপযুক্ত বাহন তা।

যানটা থেকে নেমে আসা মানুষ দুজনের একজন পুরুষ, অন্যজন একজন মহিলা। দুজনেরই পরনের সামান্য পোশাক উচ্চমানের রঙিন কাপড় সেলাই করে তৈরি। পুরুষটির জলপাইরঙা শরীর পেশিবহুল। উজ্জ্বল ঝিলিক দেয়া চামড়া। পিঠে তিরপূর্ণ তূনীর, কাঁধে ধনুক, কোমরে তরবারি ও একটি বাঁকানো ছুরি। তবে, মহিলাটির দিকে তাকিয়ে একটু বেশিই বিস্মিত হচ্ছিল মাণ্ডুপ। তাঁর পোশাক একেবারেই পরিচিত কোনো শহরবাসী মহিলার মত নয়, বরং ধাতুর পাতলা পাত দিয়ে গড়া বর্ম, কোষবদ্ধ তরবারি আর পেশিবহুল শরীর দেখে বোঝা যায় যুদ্ধ তাঁর কাছে কোনো অপরিচিত শিল্প নয়। তবে বিস্ময়ের আরো একটু বাকি ছিল। মহিলাটির মাথায়, দুভাগ করে বাঁধা দীর্ঘ কেশরাশির মাঝখানে লম্বা একটি রক্তের দাগ।

তাঁদের পাশে পাশে সসম্ভ্রমে মাথা নীচু করে একটি দস্যু এগিয়ে আসছিল। তার বিনীত হাবভাবের ভেতর থেকেও কর্তৃত্বব্যঞ্জক দৃঢ়তা ফুটে বের হচ্ছে। খাঁচার কাছে এসে সে হাত বাড়িয়ে মান্ডুপ ও তার খাঁচার পাশে খুঁটিতে বাঁধা দৈমিত্রিকে দেখিয়ে অপরিচিত ভাষায় দ্রুত কিছু কথা বলে গেল। শুনে পুরুষটি তার উত্তরে একই ভাষায় আরও কিছু প্রশ্ন করলেন। কথাগুলো বোঝা না গেলেও তাঁদের শরীরের ভাষা থেকে মাণ্ডুপ অনুমান করছিল সম্ভবত বন্দিদের নিয়ে কোনো দরদস্তুর চলছে তাঁদের মধ্যে। মহিলাটি কিন্তু সে বিতর্কে কোনো ভাগ নেননি। তিনি খাঁচার

কাছে এগিয়ে এসে নিবিষ্ট চোখে মাণ্ডুপকে পর্যবেক্ষণ করে চলেছিলেন। খানিক বাদে  দেখা শেষ হলে তিনি তর্করত পুরুষদুজনের দিকে ঘুরে, মৃদু হেসে কিছু বলে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গেই তর্কের অসমাপ্তি ঘটল। বোঝা যাচ্ছিল, এ-বিষয়ে শেষ কথা বলবার অধিকার ওই মহিলা যোদ্ধার, এবং অন্যেরা তাঁর কথাকে মেনে নিতে অভ্যস্ত।

Sindhu3

আরও কিছুক্ষণ খাঁচার ধারে দাঁড়িয়ে কিছু কথাবার্তা বলে মহিলা ইশারায় দস্যুদলের নেতাকে কোনো নির্দেশ দিয়ে ফিরে গিয়ে তাঁদের সেই বিচিত্র রথে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর তাঁর সঙ্গী পুরুষযোদ্ধাটি তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াতে রথের রশি ধরে মহিলার সামান্য একটা ইঙ্গিতে সুশিক্ষিত বলদদুটি মুখ ঘুরিয়ে গ্রামের পেছনদিকের পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে যাওয়া শূঁড়িপথটা ধরে রওনা দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পথটা ধরে উঠে গিয়ে বিচিত্র মানুষদুজনকে নিয়ে পাহাড়ের অন্যদিকে হারিয়ে গেল সেই রথ।

***

সেদিন এই পরিদর্শনের পরে তার খাঁচার কাছাকাছি দস্যুদের কাউকে আর দেখা যায়নি। সন্ধ্যার মুখমুখ এদের একজন এসে একটি ঝলসানো বড়ো আকারের গিরগিটি ছুঁড়ে দিয়ে গিয়েছিল তার খাঁচার মধ্যে। দৈমিত্রিরও হাতের বাঁধন আলগা করে বর্শাধারী একজন দস্যুর সতর্ক পাহারায় সেই একই খাদ্য ছুঁড়ে দেয়া হয়েছিল তার সামনে।

দৈমিত্রি এবং মাণ্ডুপ দুজনেই পরম আগ্রহে সেই খাবার তুলে নিয়ে তাদের শেষ অস্থিটুকু অবধি নিঃশেষে উদরসাৎ করেছিল। তারা জাতযোদ্ধা। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও শরীরের শক্তিকে অটুট রাখবার যেকোনো সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করার প্রশিক্ষণ তাদের আছে।

সেদিন রাত গভীর হলে ফের কথা বলেছিল দৈমিত্রি। এবং তখন সে যা বলেছিল তা শুনে মাণ্ডুপের দুঃসাহসী বুকও কেঁপে উঠেছিল একটুক্ষণের জন্য।

আগন্তুকদের মুখের যে-ভাষা মাণ্ডুপের কাছে অপরিচিত ঠেকেছিল, সে ভাষা দৈমিত্রির জানা। ভ্রাম্যমাণ যুদ্ধব্যবসায়ী সে। এ-অঞ্চলের বিভিন্ন জনপদের ভাষায় তার ব্যুৎপত্তি আছে। সে মাণ্ডুপকে জানায়, অসুর-নগরী ম্‌হিরির ভাষায় কথা বলছিল সেই আগন্তুক নারীপুরুষ। তারা সেই নগরীরই দুই প্রধান রাজপুরুষ।

“কিন্তু অসুরনগরী ম্‌হিরির রাজপুরুষ… এই অসভ্য বর্বর জাতির মধ্যে…” বিস্মিত গলায় বলে উঠেছিল মাণ্ডুপ। এই মঞ্জাদাহিরের উত্তরে বেশ কিছুদূরে বুলানি নদীর তীরে দাঁড়ানো এই প্রাচীন নগরের বহু জাদুকরী প্রযুক্তির কথা ইন্দাতীরেরমানুষের মুখে মুখে ফেরে। এইবার, এই বর্বর জাতির হাতে উন্নততর ধাতুবিদ্যার ফসল এই খাঁচার আসবার পথটা পরিষ্কার হয়ে উঠছিল তার কাছে। এ-প্রযুক্তি ম্‌হিরি নগরীর। কিন্তু… কেন?

“অসুরনগরী ম্‌হিরি! কিন্তু তারা এখানে, এই বর্বর জাতির সঙ্গে…”

চিন্তিতভাবে মাথা নাড়ল দৈমিত্রি, “এদের কথা থেকে যতটুকু বুঝেছি, তাতে তোমার ধরা পড়বার খবর পেয়ে এরা তার জন্য এই দস্যুদের চড়া মূল্য দিতে রাজি হয়েছে। এরাই তোমাকে আবদ্ধ রাখবার জন্য এই বহনযোগ্য ধাতব খাঁচা সরবরহ করেছে এই অসভ্যদের। এবং এদের দাবির সত্যতা যাচাই করবার জন্য সেখানকার দুই গুরুত্বপূর্ণ রাজপুরুষ এখানে এসে উপস্থিত হয়েছেন।”

কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল মাণ্ডুপ। সে যে এই দস্যুদের কাছে মূল্যবান সেকথা সে এখানে আসবার পথে দস্যুদের কথাবার্তা থেকে আগেই অনুমান করেছিল। কিন্তু শয়তানী শক্তির ঘাঁটি ম্‌হিরি নগরীর এতটা উৎসাহের কারণ সে অনুমান করতে পারছিল না।

খানিক বাদে সে জিজ্ঞাসা করল, “কিন্তু… কেন?”

“কারণ, যতটুকু বুঝেছি, তুমি আমহিরির এক বিশিষ্ট মানুষের সন্তান। দোরাদাবুর প্রতিষ্ঠিত প্রথম নগরীর একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। আমহিরির সঙ্গে  ম্‌হিরি নগরীর শত্রুতার ইতিহাস দোরাদাবুর থেকেও প্রাচীন।”

সামান্য অবিশ্বাসের সঙ্গে মাথা নাড়ল মাণ্ডুপ, “একথা সত্য হতে পারে না।”

“কেন?” দৈমিত্রির গাঢ় নীল চোখদুটোতে সামান্য কৌতুক খেলা করে উঠল।

এইবার মাণ্ডুপ ধীরে ধীরে তার যুক্তিগুলোকে সাজিয়ে ধরল দৈমিত্রির সামনে:

ঈশ্বর দোরাদাবুর শাসনের সীমার বাইরে, মঞ্জাদাহিরের উত্তরে দাঁড়ানো এই অসুর নগর ও তার বাসিন্দাদের ব্যাপারে আমহিরিতে একটা জনশ্রুতি রয়েছে। সে জনশ্রুতিতে বলে প্রাচীনকালে, ঈশ্বর দোরাদাবুর আবির্ভাবেরও আগেকার যুগে এই নগরীর অসুররা আমহিরির ওপরে বার্ষিক আক্রমণ শাণাত। রক্ত ও মৃত্যুর বাণ ডাকত তাদের সেই আক্রমণের সময়ে।

তবে বিষয়টা সত্য নয়। কারণ পুরোহিতরা বলেন, ঈশ্বর দোরাদাবুই ইন্দার ধারার স্রষ্টা ও তার কূলে প্রথম মানুষের জন্মদাতা। তাঁর প্রথম সন্তান, আদিপিতা মুহিরাকে জন্ম দিয়ে পবিত্র দশ অনুদেশের তালিকা তার হাতে তুলে দিয়েই তিনি মানবজাতির সূচনা করেন এই ইন্দাতীরে। ঈশ্বরের সৃষ্ট এই মানুষদের মধ্যে কিছু কিছু মানুষের ওপর শয়তান তার অন্ধকার ছায়া ফেলেছিল। তাদের পাপ আচরণে ক্রুদ্ধ দোরাদাবু তাদের ইন্দাতীর থেকে নির্বাসন দেন। নির্বাসিত এই এই শত্রু মানুষরাই এরপর শয়তানের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ম্‌হিরি, মুন্দিগ্র, এমনকি সমুদ্র পেরিয়ে সুদূর উর নগরী অবধি তাদের পাপনগরদের স্থাপন করেছে। অতএব তাঁর আবির্ভাবের আগে এই জায়গায় মানুষের উপস্থিতি ছিল এ-কথা সম্ভবত নিতান্তই অন্ধবিশ্বাস।

নীচুগলায়  তার বলে ওঠা কথাগুলো শুনে হালকা একটা হাসি ছড়িয়ে গিয়েছিল দৈমিত্রির মুখে। আসলে সরল ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন এই কিশোরটিকে তার ভালো লেগে গেছে। যুদ্ধ তার কাছে নিতান্তই পেশা। জয় বা পরাজয় দুই-ই তার অঙ্গ। আমহিরির এই কিশোর যোদ্ধার কাছে পরাজয় তাই তাকে আসলে লজ্জিত বা অপমানিত করেনি। বরং মুন্দিগ্র নগরীর উপকন্ঠে একটি ছোট্ট বাড়ির উঠানে দাঁড়ানো একটি বালকের অভিমানী মুখ মনে পড়িয়ে দিয়েছিল।  গাঢ় সবুজ ইরান্দি লতায় শোভিত সে বাড়িটি দৈমিত্রির বাসগৃহ। কতকাল সেই বালককে দেখেনি সে! হয়তো সে এতদিনে এই কিশোরটির মতই বড়ো হয়েছে! হয়তো এরই মত অস্ত্রচালনায় সুদক্ষ হয়ে উঠেছে সে! হয়তো দেখা হলে সে-ও পিতাকে সম্মুখযুদ্ধে পরাস্ত করে তাকে গর্বিত করবে!

পেশাগত কারণে দীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলে তার ঘোরাফেরা। এখানকার ইতিহাসে তার জ্ঞান গভীর। অপরপক্ষে এই কিশোর সম্ভবত জীবনে কখনো তার ছোট্ট শহরটার বাইরে পা বাড়ায়নি।স্বাভাবিকভাবেই তাকে যা শেখানো হয়েছে তাতে অটুট বিশ্বাস বজায় রেখে চলেছে সে। ইন্দাতীরে সভ্যতার সূচনার বহু আগেই যে সেই নদীর কূলে কূলে, তার উত্তরে বুলানি গিরিসঙ্কটের পাদদেশে বুলানি নদীর তীরে, কিংবা তারও উত্তরে মুন্দিগ্র অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির মানুষের বসতি ও আদিম সভ্যতার  অস্তিত্ব ছিল সে কথা তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য ঠেকবে না। 

তবে এই মুহূর্তে সে তর্কে সময় অপচয় করা ঠিক হবে না। অতএব খানিক বাদে মাথা নেড়ে সে ধীরে ধীরে বলল, “হয়তো তাই। তবে জেনে রেখো একথা সত্য যে অসুরনগরী ম্‌হিরির শস্ত্রবিদ্যা ও প্রযুক্তি অনেক অগ্রসর। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা ইন্দাতীরে দোরাদাবুর এই সাম্রাজ্যে আক্রমণ হানার সাহস পায় না। পায় না এর অধিষ্ঠাতা দেবতা দোরাদাবুর ভয়ে। শস্ত্র ও প্রযুক্তিতে তাঁর সাম্রাজ্যের বাসিন্দারা তুলনায় দুর্বল ও দোরাদাবুর মুখাপেক্ষি। কিন্তু  সংখ্যায় তারা বিপুল। ইন্দার তীরে তীরে এর মধ্যেই সাত শতাধিক নগরীর প্রতিষ্ঠা করেছে তারা। প্রতিদিনই সে সংখ্যা বাড়ছে। একটা কালব্যধির মতই এই ঐক্যবদ্ধ নগরীরা উত্তরে হিমপর্বত থেকে দক্ষিণের সমুদ্র অবধি, এবং পূর্বের উর্বর অরণ্যাঞ্চলগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।তাদের প্রযুক্তি ও শস্ত্রবিদ্যা যতই অনুন্নত হোক, তাদের বিপুল সংখ্যা, এবং কঠোর ঐক্য ম্‌হিরির কাছে আতঙ্কের কারণ। কারণ তারা জানে এই শক্তি একদিন না একদিন তাদের নগরীর দিকে নজর ঘোরাবেই। আর তাই

“আমি এদের কাছে মূল্যবান একজন বন্দি!” মাণ্ডুপ কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল।

“হ্যাঁ, কারণ তুমি দোরাদাবুর সাম্রাজ্যের শাসক শ্রেণীর একজন সদস্য।সও্যং দোরাদাবু তোমায় আহ্বান করেছেন মঞ্জাদাহির নগরীতে। তবে শুধুমাত্র দোরাদাবুর সাম্রাজ্যের বিষয়ে খবরাখবরই সংগ্রহই নয় মাণ্ডুপ,” ঈষৎ দুঃখী গলায় দৈমিত্রি ফের বলে উঠল, “ওই রাজপুরুষদের কথায় আমি আরো ভয়াবহ একটা ইঙ্গিতও পেয়েছি। এরা মনে করে তোমরা, দোরাদাবুর সৃষ্ট ইন্দাতীরের যোদ্ধা ও পুরোহিত শ্রেণীর সদস্যরা স্বাভাবিক মানুষ নও। মনরাক্ষস দোরাদাবু তোমাদের বুদ্ধিবৃত্তি ও মনকে বশীভূত করে তার সাম্রাজ্য পরিচালনা করে।

“তাই প্রয়োজনীয় তথ্যসংগ্রহের পর এদের জ্ঞানতপস্বী পুরোহিতরা তোমার শরীরটিকে চিরে তার ভেতরেও মনরাক্ষসের প্রভাবে আসা বদলগুলিকে অনুসন্ধান করে দেখতে চায়, যাতে তার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কৌশলের জন্ম দেয়া যায়।

“আর সেই কারণেই তোমার ধরা পড়বার খবর পাবার পর তোমাকে নিরাপদে, সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় ম্‌হিরি নগরীতে নিয়ে যাবার জন্য এরা এই সুরক্ষিত খাঁচার বন্দোবস্ত করেছে। ইতিমধ্যে নিকট ও দূরস্থ বহু প্রতিবেশী নগরেই তোমার বন্দি হবার সংবাদ পাঠানো হয়েছে। তাদের মন ও শরীর বিশেষজ্ঞ পুরোহিতরাও সেই কাজে অংশগ্রহণের জন্য ম্‌হিরির পথে রওনা হয়েছেন। এঁদের মধ্যে মুন্দিগ্রের রাজভিষগ মহর্ষি কেন্নাও একজন।”

কথাগুলোর আকস্মিকতায় একেবারে মূক হয়ে গিয়েছিল মাণ্ডুপ। তার ফ্যাকাশে হয়ে ওঠা মুখটার দিকে একনজর তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে দেখল দৈমিত্রি। একেবারেই তার বহুকাল অদেখা পুত্রের বয়সি এই কিশোর। নিষ্ক্রিয় থেকে একে ভয়াবহ যন্ত্রণাদায়ক একটা মৃত্যুর পথে এগিয়ে দেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে একটা পরিকল্পনা তার মাথায় গড়ে উঠছিল। তার প্রথম ধাপটা স্বয়ং দৈবই গড়ে দিয়েছেন খানিকক্ষণ আগে। এই দস্যুরা চতুর ব্যবসায়ী। মাণ্ডুপের জন্য অস্বাভাবিক চড়া মূল্য হাঁকবার পর অতিরিক্ত হিসেবে বদি দৈমিত্রিকেও সেইসঙ্গে তারা দান করেছে ম্‌হিরির রাজপুরুষদের। আর কিছু না হোক, একজন শক্তিশালী শ্বেতাঙ্গ দাস যেকোনো শহরেই একটি কাম্য সম্পত্তি। তাঁরা সে দান অস্বীকার করেননি। যেটুকু সে শুনেছে তাতে ম্‌হিরির একটা প্রহরীদল এখান থেকে দুদিনের দূরত্বে রয়েছে। তারা এসে পৌঁছোবার পর তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় তাদের ম্‌হিরির দিকে যাত্রা শুরু হবে সেই সৈনিকদের প্রহরায়।

***

 দিন কেটে যায়। খাঁচায় বন্দি কিশোরটিকে দেখে বিস্ময়ের অন্ত থাকে না দৈমিত্রির। কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রবল যন্ত্রণাদায়ক নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সে তার স্থিরতা হারায়নি। সেদিন রাতে দৈমিত্রির মুখে তার ভয়াবহ নিয়তির কথা শুনে মাত্রই কিছুক্ষণের জন্য আতঙ্কিত হয়েছিল বটে, কিন্তু তারপরই নিজের স্থিরতা ফিরে পেয়েছে সে। একেবারেই প্রকৃত জাতযোদ্ধার লক্ষণ। তার দিকে তাকিয়ে দৈমিত্রির বুকটা গর্বে ফুলে ওঠে। আহা, এ যদি তার সন্তান হতো! প্রকৃত যোদ্ধার সন্তান আর এক প্রকৃত যোদ্ধা। যুদ্ধে স্থির, বিপদে অচঞ্চল। ভেঙে পড়বার বদলে সে দৈমিত্রিকে অজস্র প্রশ্ন করে করে জেনে নিয়ে চলে অসুরনগরী ম্‌হিরির খুঁটিনাটি। তার শহরের প্রতিটি রাস্তা, তার মানুষজন, তাদের বিশ্বাস, ঈশ্বর, সমাজ, ঘরবাড়ি, বাজার, সে-শহরে ঢোকা ও বের হবার প্রতিটি পথের খবর

দৈমিত্রি বুঝতে পারে, সাক্ষাত মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও আশায় বুক বাঁধছে এই কিশোর। জেনে নিতে চাইছে শত্রুর শক্তি ও দুর্বলতাগুলোকে। তারপর সেই জ্ঞানকে সম্বল করে সঠিক সময়ে নিজেকে রক্ষা করবার আশা রাখে সে। সবচেয়ে আশ্চর্য ছিল তার নতুন ভাষাকে অধিগত করবার ক্ষমতা। সেই রাত্রির পরের একটি সম্পূর্ণ দিন দৈমিত্রির শিক্ষণে নিবিড় অনুশীলনে সে ম্‌হিরির ভাষাকে অনেকটাই আয়ত্ব করে নিয়েছে।

তার মুখের দিকে তাকিয়ে বারংবার একটা হতাশা ছড়িয়ে যায় দৈমিত্রির বুকে। আহা অবোধ অনভিজ্ঞ কিশোর। ম্‌হিরির অসুরনগরীর কঠোর প্রহরা ও নিষ্ঠুরতম রক্ষণব্যবস্থার কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তার নেই। দৈমিত্রির তা আছে। আর তাই সে জানে শত চেষ্টাতেও একাকি ওই কিশোরের একবার সেখানে পা দিলে আর জীবন্ত বের হয়ে আসবার কোনো সম্ভাবনা নেই। আর তাই, যেকোনো মূল্যে একে রক্ষা করবার তীব্র একটা আকাঙ্খা তার মনে জেগে উঠছিল।

ভ্রাম্যমান যুদ্ধব্যবসায়ী কখনোই নিরস্ত্র থাকে না। বুনো দস্যুদের এই বন্দিশালা থেকে পালাবার পথ দৈমিত্রির জানা। দীর্ঘ অভ্যাসে গলার কাছে একটা স্ফটিকের ধারালো টুকরো লুকিয়ে রাখবার কৌশল সে রপ্ত করেছে বহুকাল আগেই। সেটি বের করে এনে রাতের অন্ধকারে নিজের বাঁধন কেটে পালাবার সমস্ত প্রস্তুতিই সে নিয়েছিল, কিন্তু তার আগেই এই কিশোর এসে পৌঁছোতে সে পরিকল্পনা সে ত্যাগ করেছে। নিজে হয়তো সে পালাতে পারবে, কিন্তু এই ধাতুনির্মিত খাঁচা থেকে এই কিশোরকে সরাসরি উদ্ধার করা সম্ভব নয়। দৈমিত্রির দেহের লতার বাঁধন কাটতে সক্ষম হলেও ওই স্ফটিকের টুকরো এর খাঁচার ধাতব প্রতিরোধের সামনে নিতান্তই নির্বিষ।

কিন্তু উপায় একটা হতে পারে! দ্বিতীয়দিন রাতে খাঁচার মধ্যে ঘুমন্ত কিশোরটির দিকে চোখ রেখে জেগে থাকা দৈমিত্রি হঠাৎ গাঝাড়া দিয়ে উঠল। হ্যাঁ। এখান থেকে মহিরি যাবার পার্বত্য পথের প্রতিটি অঙ্গুলীপরিমাণ স্থান তার পরিচিত।

সেখানে একটা জায়গা আছে উপায় একটা হতে পারে তবে সেজন্য সামান্য একটু সময় দিতে হবে এই কিশোরকেতার পালাবার পর একটুক্ষণ আটকে রাখতে হবে এর প্রহরীদের। কথাটা মাথায় আসতেই গোটা পরিকল্পনাটা যেন ছবির মত ভেসে উঠল তার চোখের সামনে। মাথা নেড়ে নিজের মনেই মৃদু হাসল সে একবার।তারপর ধীরে ধীরে কোমল গলায় ডাক দিল, “মাণ্ডুপ জেগে ওঠো।”

ধীরে ধীরে ঠান্ডামাথায় গোটা পরিকল্পনাটা তাকে বুঝিয়ে বলল দৈমিত্রি। মাণ্ডুপের চোখদুটো জলে ভরে উঠছিল। শৈশব থেকেই সে ইন্দাতীরে দোরাদাবুর সাম্রাজ্যের বাইরের প্রতিটি জনপদকে সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে। তাদের বাসিন্দাদের ভয় ও ঘৃণা করতে শেখানো হয়েছে তাকে। তাদের বাসিন্দাদের সঙ্গে ইন্দাতীরের বাণিজ্যের সম্পর্ক রয়েছে, অথচ তাদের পরিচয় তার কাছে মানুষ হিসেবে দেয়া হয়নি। কোনো বসতির বাসিন্দাদের অসুর, কোনো বসতির বাসিন্দাকে শ্বেতদানব হিসেবে চিনতে শিখিয়েছে তাকে তার শহর। শহরে আসা মুন্দিগ্র নগরীর শ্বেতদানবদের কাউকে কাউকে গুপ্তচর সন্দেহে মন্দিরে ধরে নিয়ে গিয়ে ঈশ্বরের সন্তানগোলকের হাতে তাদের নিষ্ঠুর মৃত্যুদণ্ড দেখতে ভিড় জমিয়েছে তারা। সে মৃত্যুর পর উল্লসিত জয়ধ্বনি করাকে ধর্ম হিসবেই পালন করেছে সে চিরকাল।অথচ তেমনই এক শ্বেতদানব, এভাবে নিজের জীবন উৎসর্গ করে তার প্রাণ বাঁচাবার জন্য

হিসেবটা কিছুতেই মিলছিল না তার। আসলে সেই মুহূর্তে নিজের অজান্তেই বড়ো হয়ে উঠছিল সেই কিশোর। তার মনের ওপরে সযত্নে গড়ে তোলা অন্ধতার পাঁচিলে প্রপ্তহম ঘা দিয়েছিল বনবাসী মানুষ ঘেরাউন। এবারে দৈমিত্রির সংস্পর্শে এর সেই ফাটল দিয়ে সেখানে বাইরের আলো আসার সূচনা হচ্ছিল। তবে তখনও সে ফাটল বড়ো হয়ে তার মনকে মুক্তি দেবার অনেক দেরি ছিল। তার জন্য আরো অনেক বড়ো আঘাতের প্রয়োজন ছিল তার। তার নিয়তি সে আঘাতের ক্ষেত্র তখন গড়ে তুলছিলেন তার স্বপ্নের গন্তব্যের শহরে, দোরাদাবুর আর এক মৃত্যুদণ্ডের আসরে

ক্রমশ

শীর্ষচিত্র- অতনু দেব।  ভেতরের চিত্র- ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য

 জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s