সিন্ধুনদীর তীরে –প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব, পঞ্চম পর্ব, ষষ্ঠ পর্ব , সপ্তম পর্ব, অষ্টম পর্ব, নবম পর্ব , দশম পর্ব, একাদশ পর্ব, দ্বাদশ পর্ব, ত্রয়োদশ পর্ব, চতুর্দশ পর্ব, পঞ্চদশ পর্ব, ষোড়শ পর্ব, সপ্তদশ পর্ব

“…এবং এইটি মূল্যবান বস্ত্র, আভরণ ও অলঙ্কারের তালিকা…” বলতে বলতে সপ্তম মৃৎপট্টটি আহুম এগিয়ে ধরলেন। ডাক শুনে ঘরের দরজাটা সামান্য খুলে বাইরে বের হয়ে এলেন জৈমিন।
জায়গাটা একেবারে নির্জন। কট্টাদিজা পাহাড়ের একেবারে চুড়ায় সন্তানগোলকের গর্ভগৃহ। তার লাগোয়া খানিকটা নাবাল জমির ওপর এই বড়োসড়ো ঘরটা দাঁড়িয়ে। তাকে ঘিরে পশ্চিমদিক জুড়ে গোলাকার দুর্গপ্রাকার বাঁক নিয়ে দক্ষিণদিকে এগিয়েছে। প্রাকারের দক্ষিণ অংশে একটামাত্র প্রবেশপথ। প্রবেশপথের বাইরে আহুমের নিয়ে আসা গো-যান দুটো দাঁড়িয়ে। দুজন অন্ধ ভারবাহক গোযান থেকে মাণ্ডুপের বাজেয়াপ্ত করা সম্পদ এনে ঘরটার ভেতরে নামিয়ে রাখছিল। সেখানে জৈমিন দাঁড়িয়ে তদারকিতে ব্যস্ত।
দরজার বাইরে আহুম দাঁড়িয়ে ছিলেন। জৈমিন বের হয়ে আসবার সময় একঝলকের জন্য ঘরের ভেতরে সামান্য দেখতে পেয়েছিলেন আহুম। সেখানে একটা মাটির প্রদীপ জ্বলছে। প্রদীপের হালকা আলোয় ঘরটার মধ্যে মাটি ও ধাতুর বড়ো বড়ো পাত্রের সার তার একেবারে ভেতর অবধি চলে গেছে। সন্তানগোলকের ব্যক্তিগত রাজকোষ! সেখানে এক প্রধান পুরোহিত বাদে দ্বিতীয় কোনো চক্ষুষ্মানের ঢোকা নিষিদ্ধ।
দোরাদাবুর সেবায় অনেকেই পরিবারের একটি সন্তান উৎসর্গ করে থাকেন। এই উৎসর্গীকৃতদের দিয়ে মন্দিরদুর্গের বিরাট ভৃত্যবাহিনী গড়া হয়। এদের মধ্যে ধনাগারের ভারবাহক হিসেবে যে সৌভাগ্যবানরা নির্বাচিত হয় তারা এক বিশেষ পূজায় সন্তানগোলককে নিজেদের চোখগুলি উৎসর্গ করে স্বেচ্ছায় দৃষ্টিহীন হয়। এ নিয়ম বহুকাল ধরেই ইন্দাতীরে প্রচলিত। আহুম, জৈমিন বা তাঁদের মতই ইন্দাতীরের বিভিন্ন মন্দিরদুর্গের পুরোহিতরা সকলেই বিশ্বাস করেন এ নিয়ম স্বয়ং দোরাদাবুর সৃষ্টি। বিশ্বাস করে সাধারণ মানুষও। তারা বলে, যে উৎসর্গীকৃত সন্তান দোরাদাবু বা তাঁর সন্তানগোলককে নিজের চোখদুটি করে তার পরিবারের অক্ষয় স্বর্গবাস হয়। দোরাদাবুর ইচ্ছায় এই প্রথার সৃষ্টি নিয়ে তাদের মধ্যে কিছু অলৌকিক আখ্যানও চালু আছে। বলাবাহুল্য মন্দির দুর্গে সন্তান উৎসর্গের সময় কোনো কোনো বাবা-মা তাই সন্তানগোলকের কাছে ঐকান্তিক প্রার্থনা করেন, তাঁদের সন্তানকে যেন এই মহাদানের জন্য নির্বাচন করেন ঈশ্বর। সন্তানগোলকেরা তাঁদের এই ঐকান্তিক ইচ্ছার কথা শুনতে পান। প্রধান পুরোহিতকে তিনি জানিয়েও দেন সেই ইচ্ছুকদের কথা।
অবশ্য সন্তানগোলকরা জানেন যে এ প্রথা আদৌ দোরাদাবুর বা তাঁর কোনো সন্তানগোলকের সৃষ্টি নয়। ইন্দাতীরে এই দোপেয়ে পরজীবীদের সভ্যতার সূচনা থেকে তাঁর পুরোহিত শ্রেণীর সমস্ত ইতিহাসকে নিজেদের সিলিকনসমৃদ্ধ স্মৃতিতে সংগ্রহ করে রেখেছেন ঈশ্বর দোরাদাবু ও তাঁর সন্তানগোলকেরা। তাই তাঁরা জানেন, পঞ্চম মহাপুরোহিত জিনিন এই প্রথার জনক ছিলেন। চতুর্থ মহাপুরোহিত বিতাখ-এর আমলে প্রথম ইন্দাতীরে অর্থের মাধ্যমে কেনাবেচার প্রথা শুরু হয়। শুরু হয় ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও তার হিসাব রাখবার প্রথা। এই সময়েই বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি থেকে দোরাদাবুর নিজস্ব ধনাগারের প্রতিষ্ঠা হয়। এই ধন খরচের একমাত্র অধিকার বিতাখ নিজের হাতে রেখেছিলেন।
বিতাখ নিতান্তই ধার্মিক মানুষ ছিলেন। এই ধনাগারের অর্থ তিনি ঈশ্বরের নামে জনহিতকর কাজে ব্যবহার করতেন। কিন্তু তাঁর উত্তরসূরী জিনিন তেমন ছিলেন না। তিনি একজন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন বটে, কিন্তু তারই পাশাপাশি প্রবল লোভি আর ভোগীও ছিলেন। “ঈশ্বরের ধনাগার’-এর জমানো সম্পদ তিনিই প্রথম নিজের ভোগে ব্যবহার করতে শুরু করেন। দোরাদাবুর অবশ্য তাতে কিছু আসে-যায়নি। জিনিন দক্ষ প্রশাসক। ইন্দাতীরে তাঁর সাম্রাজ্যকে তিনি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন এইটাই তাঁর কাছে প্রধান ছিল। তার বাইরে এই তুচ্ছ পরজীবী দোপেয়েরা কিছু ধাতু বা রত্নের টুকরো নিজে নিল বা অন্যকে দান করল কিনা তাতে তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না।
এই জিনিনই প্রথম ধনাগারের ভেতরে প্রধান পুরোহিত ভিন্ন আর কারো প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এঁর নির্দেশেই শুরু হয়েছিল ধনাগারের ভারবাহকদের চক্ষুদান উৎসব। জিনিন তা ঈশ্বরের নাম নিয়েই করেছিলেন। দোরাদাবু তাতে বাধা দেবার প্রয়োজন অনুভব করেননি। বিশ্বাস ও ভক্তি এই দুটি হল সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখবার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। ঈশ্বরের কৃপা চেয়ে স্বেচ্ছায় অন্ধত্ব বরণ তো সেই প্রশ্নহীন, অন্ধ বিশ্বাসেরই প্রতিফলন। অতএব সে প্রথা সেই থেকে চলে আসছে ইন্দাতীরে। পরবর্তী সম য়ে সন্তানগোলকরাও যার যার নগরে এই একই প্রথাকে প্রতিষ্ঠা হতে দেখেছে।
উপস্থিত ঈশ্বরের ধনাগারের অর্থসংগ্রহের নীতিনিয়মের জন্য অর্ধশতাধিক মৃৎপট্টে লিখিত বিস্তারিত নিয়মাবলী আছে। যুদ্ধে আহরিত সম্পদের ষোলো ভাগের এক ভাগ, নাগরিকিদের দেয়া রাজস্ব ও বহির্বাণিজ্য থেকে আসা রাজস্বের বত্রিশ ভাগের এক ভাগ এই ব্যক্তিগত ধনাগারে জমা হয়। সেইসঙ্গে উত্তরাধিকারীবিহীন, মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত ও পলাতক নাগরিকদের বাজেয়াপ্ত হওয়া সম্পূর্ণ সম্পত্তির বিক্রয়মূল্যও এই ধনাগারে আসে। এছাড়া, যেকোনো কারণে কোনো নাগরিকের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হলেও তার বিক্রয়মূল্যের স্থান হয় এই রাজকোষেই। বলা বাহুল্য ধনাগারের পরিচালক পদে স্বয়ং প্রধান পুরোহিতই রয়েছেন। এবং এই ধনের উপভোক্তাও তিনি নিজে।
ম্হিরিবিজয়ী মাণ্ডুপের কষ্টার্জিত ধনও তবে এই জৈমিনের ভোগে যাবে! তাহলে, সেইজন্যই কি তাকে গোড়া থেকেই চক্রান্ত করে… এই জৈমিন…
…চিন্তাটাকে সম্পূর্ণ হয়ে ওঠবার আগেই দাবিয়ে দিয়ে সন্ত্রস্তভাবে এদিক-ওদিক ঘুরে তাকালেন আহুম। সন্তানগোলকের গর্ভগৃহের একেবারে কাছেই এই ধনাগার। এটা ঠিক যে ঈশ্বর সচরাচর বিনা প্রয়োজনে তাঁর ভৃত্যদের মনে উঁকি দেন না। তবে কে বলতে পারে…
তাঁর সন্ত্রস্ত ভাবটা জৈমিনের চোখেও ধরা পড়েছিল। তবে তিনি অন্যের মন পড়তে পারেন না। তাই আহুমের মুখে ক্ষণিকের ত্রাসের অভিব্যক্তিকে তিনি অন্যভাবে পড়লেন। মৃদু হেসে বললেন, “ভয় পেও না আহুম। এই ধনাগার সুরক্ষিত।“
“কিন্তু কোনো প্রহরী তো নেই!” আহুম বিস্মিত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন। বিষয়টা সত্যিই তাঁকে একটু হতবাকই করেছে। ‘ঈশ্বরের নিজস্ব ধনাগার’-এর কথা তিনি জানেন বইকি। নগরীর সকলেই সে ধনাগারের খবর জানে। জায়গাটায় সচরাচর প্রধান পুরোহিত বাদে আর কারো প্রবেশাধিকার নেই। ফলে সে নিয়ে আহুমের কৌতূহল একটা ছিলই। আজ খানিক আগে, ভোর রাতের অন্ধকারে যখন একজন দুর্গসেনা তাঁর বাড়ি এসে তাঁকে সেই অদেখা ধনাগারে যাবার জন্য জৈমিনের আদেশ শোনাল, তখন আদেশ মোতাবেক মাণ্ডুপের জমা রাখা সম্পদ গো-যানে সাজাতে সাজাতে আহুম অনেক কিছুই কল্পনা করে নিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, কঠোর নিরাপত্তার মোড়কে ঢাকা কোনো সুরক্ষিত দুর্গই হবে বা সেই ধনাগার। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল বিষয়টা একেবারেই তা নয়। মন্দিরদুর্গের উঠোন থেকে একটা সরু পাকদণ্ডী পথ পাহাড়ের গা বেয়ে সেই ধনাগারের দিকে উঠে যায়। পথের গোড়ায় একটা ভারী দরজা। তার বাইরের দিকে একটা পাহারা চৌকি। মশালধারীরা আগে আগে গিয়ে সেই পাহারাচৌকিতে জৈমিনের সঙ্কেতচিহ্ন দেখিয়ে তাঁর আদেশ শোনাতে তারা নিঃশব্দে দরজা খুলে দিয়েছিল কেবল। সেখান দিয়ে গো যান সহ আহুম ঢুকে আসতে ঘরঘর শব্দ করে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সেই দরজা। কিন্তু তারপর গোটা পথটায় একজনও প্রহরীর দেখা মেলেনি তার। এই ধনাগারের উঠোনে এসেও একজনও সশস্ত্র প্রহরী দেখেননি তিনি।
“নেই, কারণ দৃষ্টিহীন প্রহরী দিয়ে প্রহরার কাজ হয় না।” বলতে বলতে মাথা নাড়লেন জৈমিন, “এ বিষয়ে নিয়ম বড়ো কঠোর হে আহুম। ধনাগারে নিয়মিত আসাযাওয়ার অধিকার একমাত্র প্রধান পুরোহিতের, সে তো তুমি জানো! আমি ছাড়া এখানে আর যারা নিয়মিত যাতায়াতের অধিকারী তারা ঈশ্বরকে চক্ষুদান করে তবেই সে অধিকার পায়। তারা ভারবাহক। দৃষ্টিহীন হলে দোষ নেই। কিন্তু প্রহরী দৃষ্টিহীন হলে…”
“তাহলে প্রহরীহীন হয়েও তা সুরক্ষিত থাকে কোন পথে?”
জৈমিন মৃদু হাসলেন, “এখানে ঢোকবার একমাত্র যে পথ রয়েছে, সেখান দিয়ে তুমি খানিক আগে এসেছ আহুম। পাহাড়ের পাদদেশে সে পথের প্রবেশমুখ যে সুরক্ষিত তা তুমি দেখেছ। সে পথ ছাড়া অন্যভাবে এইখানে আসতে গেলে পশ্চিমের ওই প্রাকার পার হয়ে ঢুকতে হবে। সেদিকে খাড়াই পাহাড়ি ঢাল ইন্দা অবধি ছড়িয়ে। দুর্গমতার জন্যই সে পথ নিরাপদ। আর এইসব বাধা পার হয়ে কেউ যদি বিনা অনুমতিতে এইখানে এসে পৌঁছাতেও পারে, সেক্ষেত্রে তার দায় স্বয়ং ঈশ্বরের। তখন নিজের ধনাগারকে তিনি নিজেই তস্করের হাত থেকে রক্ষা করবার ভার নেবেন।”
বলতে বলতেই ধনাগারের পুবদিকে আকাশের দিকে উঁচু হয়ে যাওয়া একটা অর্ধ গোলকাকার ছাদের দিকে ইশারায় দেখালেন জৈমিন, “ওইখানে সন্তানগোলকের গর্ভগৃহ হে আহুম। এইখানে তোমার, আমার, ওই ভারবাহকদের… সকলের উপস্থিতিই তিনি অনুভব করছেন। কিন্তু কখনো, প্রধান পুরোহিতের অনুপস্থিতিতে দ্বিতীয় কোনো মনের উপস্থিতি এইখানে অনুভব করলে কী হয় তার একটা উদাহরণ তোমাকে দেখাই। একটা ছোটো পরীক্ষা।“
পরীক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই মহান জৈমিন,“ আহুম মাথা নাড়লেন, “সন্তানগোলক তাঁর সম্পদকে পাহারা দেন, এই কথাটি প্রধান পুরোহিতের মুখ থেকে শোনাই আমার পক্ষে যথেষ্ট। তার প্রমাণের পরীক্ষা চাইবার মত ধৃষ্টতা আমার নেই।”
জৈমিন মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন। প্রশ্নটা ঈশ্বরে বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের নয়। কয়েক মুহূর্ত আগেই ধনাগারের খোলা দরজা দিয়ে আহুমের লোভাতুর দৃষ্টি তাঁর নজর এড়ায়নি। ঐশ্বর্যের লোভ বড়ো লোভ। এই ধনাগারের দিকে দৃষ্টি দেবার পরিণতি কী তা একে দেখিয়ে রাখাটা প্রয়োজন। প্রয়োজন এইজন্যই, যে, অকারণে একজন দক্ষ পুরোহিতকে তিনি হারাতে চান না।
একজন অন্ধ ভারবাহক ঘরের মধ্যে একটা পাত্রে কিছু মূল্যবান রত্ন ও গহনা সাজিয়ে রাখছিল। বাইরের দিকে পেছন করে রয়েছে সে। তাকে সেইভাবে রেখেই সাবধানে ধনাগারের দরজা ছেড়ে বের হয়ে এলেন জৈমিন। তারপর আহুমের হাত ধরে দ্রুতপায়ে হেঁটে ধনাগারের চৌহদ্দির বাইরে সেই পাকদণ্ডি পথের ওপরে চলে এলেন।
এখান থেকে সরাসরি ধনাগারের দরজা চোখে পড়ে। দ্বিতীয় ভারবাহক আরেকটা ভারী পাত্র হাতে করে গো-যান থেকে ধনাগারের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু পথ ত হেকে ধনাগারের প্রাঙ্গণে ঢোকবার আগেই হাত ধরে তাকে পথের ওপরেই আটকে দিলেন জৈমিন। একদিনে দুজন ভারবাহকের মৃত্যু তিনি চান না।
হঠাৎ ধনাগারের ভেতর থেকে বুকফাটা একটা আওয়াজ উঠে ভোরের নির্জনতাকে ফালা ফালা করে দিয়ে গেল। জৈমিন নিঃশব্দ ইশারায় আহুমকে সেদিকে দেখালেন। সেখানে ধনাগারের ভেতর থেকে টলতে টলতে বের হয়ে আসছিল সেই ভারবাহক। অকল্পনীয় যন্ত্রণার একটা বোবা গোঁ গোঁ শব্দ বের হয়ে আসছিল তার গলা থেকে। আতঙ্কে বিস্ফারিত চোখের অন্ধ মণিদুটো তার অসহায়ভাবে এদিক ওদিক দেখে। দু’হাতে প্রাণপণে নিজের মাথাটাকে চেপে ধরে রেখেছে সে।
ধনাগারের দরজা থেকে কয়েক পা এগিয়ে এসেই বৃষ্টিভেজা মাটির বুকে লুটিয়ে পড়ল ভারবাহকের শরীরটা। একটু বাদেই কয়েকটা ঝাঁকুনি দিয়ে শান্ত হয়ে গেল সে…
আহুমকে অনুসরণ করতে ইশারা করে এবারে বড়ো বড়ো পায়ে ধনাগারের উঠোনে ঢুকে এলেন জৈমিন। তাঁদের পেছনে বোঝা মাথায় ঢুকে এসেছে দ্বিতীয় ভারবাহকও। তার নির্লিপ্তি দেখলে বোঝা যায়, মন্দির প্রাঙ্গণে এ-দৃশ্য সে আগেও বহুবার দেখেছে, এবং এই পরিণতিকে নিয়তি বলে মেনেও নিয়েছে।
মৃতদেহটার কাছে এসে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুকটা কেঁপে উঠল আহুমের। তার বেঁকেচূরে যাওয়া মুখে একটা অপার্থিব ভয়ের ছাপ। বোঝা যায় হঠাৎ ধেয়ে আসা তীব্র আতঙ্কের ধাক্কা তার হৃৎপিণ্ডকে থামিয়ে দিয়ে গেছে। কিন্তু মৃত্যুর ঠিক আগে সেই ভয়ের আঘাতে যে নারকীয় যন্ত্রণা সে পেয়েছিল, তার ছাপ রয়ে গেছে তার ঠেলে বের হয়ে আসা চোখে, তার বিকৃত মুখভঙ্গীতে, তার কুঁকড়ে ওঠা শরীরের প্রতিটি কুঞ্চনে।
“এই হল সন্তানগোলকের প্রহরা। প্রধান পুরোহিতের অনুপস্থিতিতে এই ধনাগারের আশপাশে দ্বিতীয় কোনো মনের উপস্থিতি অনুভব করলে তাঁর অদৃশ্য দৈবাস্ত্র এইভাবেই সেই পাপীর দণ্ডবিধান করে আহুম।” বলতে বলতেই ফের তাঁর মুখে শান্ত হাসিটি ফিরে এসেছে, “আর তাই, এই ধনাগার পৃথিবীর সবচাইতে সুরক্ষিত স্থান জানবে।”
ভোরের আলো ফুটে উঠছে এবারে। বৃষ্টি থেমে গিয়ে কখন যেন নীল আকাশ বের হয়েছে মাথার ওপরে। পশ্চিমের পাঁচিলের ওপার থেকে ইন্দানদীর বুক ছুঁয়ে ঠান্ডা হাওয়া বহে আসছিল। পুবে, সন্তানগোলকের গর্ভগৃহের অর্ধবৃত্তাকার ছাদের পেছনটা রক্তাভ হয়ে উঠেছে। সূর্য উঠছে ওদিকে। সেদিকে চোখ রেখে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন আহুম। তারপর সামান্য ইতস্তত করে প্রশ্ন করলেন, ”অভয় দিলে একটা প্রশ্ন করতে চাই হে মহাপুরোহিত জৈমিন।“
সমস্ত রাত জেগে কাটালেও এই মুহূর্তে জৈমিনের ক্লান্তির বোধ ছিল না। কারণ যে পরিমাণ সম্পদ আজ তাঁর হস্তগত হয়েছে তা কট্টাদিজার মত ছোটোখাটো নগর দূরস্থান ইন্দাতীরের প্রধান নগরীদের দৈব ধনাগারেও আছে কি না সন্দেহ। আহুমের প্রতিও তিনি এই মুহুর্তে বড়োই প্রসন্ন। তার প্রশ্নহহীন আনুগত্য না থাকলে এত সহজে ও নির্বিঘ্নে কাজটা করা সম্ভব হত না। তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে জৈমিন বললেন, “নির্ভয়ে বলো বন্ধু আহুম।“
“আমি জানতে চাই, কোন অপরাধে ম্হিরিবিজয়ী বীর মাণ্ডুপ…”
হঠাৎ মুখের ভাব বদলে গেল জৈমিনের। পাকদণ্ডী পথে এই মুহুর্তে তাঁরা দুজন বাদে আর তৃতীয় কেউ নেই। পথের মাঝখানেই থমকে দাঁড়িয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “ঈশ্বরের সেইরকমই আদেশ। তুমি কি ঈশ্বরের আদেশের প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করছ আহুম?”
জবাবে একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন আহুম। তিনি পেশায় বণিক। এককালে দেশ ও বিদেশের বহু এলাকায় বহু সমাজেই যাতায়াত করেছেন, বাণিজ্য করেছেন। বিপজ্জনক পরিস্থিতিকে মাথা ঠান্ডা করে সামাল দেয়া তাঁর কিংবা তাঁর মত যেকোনো বণিকেরই মজ্জাগত। সামান্য একটুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজের উত্তরটা সাজিয়ে নিয়ে তিনি মুখ খুললেন, “না মহাপুরোহিত। ঈশ্বরের আদেশে সম্পূর্ণ বিশ্বাস ও ভরসা রাখি আমি। সেইসঙ্গে অটুট ভক্তি ও বিশ্বাস আছে আপনার ওপরেও। আপনিই তো তাঁর প্রধান মুখপাত্র। কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্য কারণে। আমি জানতে চাই, কোন ঘৃণিত অপরাধ করেছে ওই মাণ্ডুপ যার পাপে তার ম্হিরিবিজয়ের পূণ্যও ক্ষয় হয়ে গিয়ে তাকে ঈশ্বরের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। জ্ঞানে বা অজ্ঞানে সে পাপ যেন কখনো আমার দ্বারা না ঘটে সেইজন্যই জানতে চাওয়া। আমার সন্তানরা যাতে কখনো তেমন পাপ না করে সেজন্য তাদের উপযুক্ত শিক্ষা দেবার দায়িত্বও আমার। তাদের স্বার্থেও আমার এই প্রশ্ন হে মহান জৈমিন।”
জৈমিন মৃদু হাসলেন। আগের দিন সন্ধ্যায় দোরাদাবু যখন তাঁকে প্রথম মাণ্ডুপের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করবার নির্দেশটা দিয়েছিলেন, তখন তিনি নিজেও খানিক অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু তারপর তাঁর দীর্ঘ নির্দেশাবলী শুনতে শুনতে মাণ্ডুপের পাপ বিষয়ে একটা ধারণা হয়েছে তাঁর। দোরাদাবু বারংবার তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন, মাণ্ডুপ তাঁর সভায় নিজের বাজেয়াপ্ত সম্পদ ফেরৎ চাইতে এলে তার জন্মরহস্য নিয়ে কটুক্তি করে তাকে যেন তিনি উত্তেজিত করেন। অতএব সেই জন্মরহস্যেই তার সমস্ত পাপ লুকিয়ে আছে বলে জৈমিনের বিশ্বাস। অতএব মাথা নেড়ে তিনি বললেন, “আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না পুরোহিত আহুম। যে পাপ মাণ্ডুপ করেছে, আপনার বা আপনার সন্তানদের পক্ষে সে পাপ করা সম্ভব নয়।”
“তার অর্থ?”
“অর্থ খুব কঠিন নয়। আর খানিক বাদে আমার সভায় সে উপস্থিত হলে সকলেই তা জানতেও পারবে। অতএব এই মুহূর্তে আপনাকে তা লুকোবার কিছু নেই।” বলে মাথা নাড়লেন জৈমিন, “মাণ্ডুপের পাপ লুকিয়ে আছে তার জন্মে। সে সেনাপতি বৈক্লণ্যের সন্তান নয় হে আহুম। তার মাতা একজন বন্য অর্ধমানবী। এই কট্টাদিজা পাহাড়ের কোলে এককালে যে অর্ধপশুর দল বাস করত তাদেরই একজন ছিল মাণ্ডুপের জননী। তার পিতা ছিলেন সৌগম নামে আমহিরি নগরীর এক বণিক। এই অপরাধে, কট্টাদিজা নগরী দখলের আগে এই সৌগমকে বলি দেয়া হয়েছিল। তার মাকে সেনাপতি বৈক্লন্য নিজে হাতে হত্যা করেছিলেন কট্টাদিজার অরণ্যে।
“এক ধর্মভ্রষ্ট বণিক ও এক অর্ধপশু বন্যনারীর সন্তান হয়ে, পিতামাতার পাপের ভার তার ওপরে বর্তেছে। তার পরেও, নিজের সেই ঘৃণ্য পরিচয় গোপন করে মন্দিরসেনা হবার চেষ্টা করেছিল সে- এই মহাপাপেরই শাস্তি শুরু হয়েছে তার- এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সে শাস্তির প্রথম ধাপ ছিল তার সম্পত্তির বাজেয়াপ্ত হওয়া। আর, এর দ্বিতীয় ও শেষ ধাপ দেখতে হলে আজ দুপুরে আমার সভায় এসো তুমি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সেই পাপী সেইখানে আসবে তার পাপের ধন ফেরত পাবার দাবি নিয়ে। সেইখানেই নিজের প্রাণ দিয়ে সে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত পূর্ণ করবে…”
***
সূর্য উঠেছে অনেকক্ষণ হল। তার আলোয় জঙ্গলের ভেজা মাটি থেকে বাষ্প উঠে আসে। ভেজা ঝোপঝাড় থেকে বন্য গাছগাছড়ার কটুগন্ধ উঠে আসছিল। পায়ের নীচে পাহাড়ের শরীর ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে নীচের দিকে। মাথার ওপর বনস্পতিদের পত্রমুকুটের ফাঁকফোকড় বেয়ে রৌদ্রশলা নেমে এসে ভেজা মাটির বুকে আলোছায়ার নকশা বুনেছে। তার ওপরে পা ফেলে ফেলে সন্তর্পণে ইতিউতি দেখতে দেখতে এগিয়ে যান বয়স্ক মানুষটি।
হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে একটুকরো তিক্ত হাসি ছড়িয়ে গেল আহুমের মুখে। তিনি একজন সফল বণিক। কট্টাদিজা নগরের একজন সম্মানিত পুরোহিতও বটে। গতকাল অবধি তিনি ঈশ্বর ও প্রধান পুরোহিতের ইচ্ছায় আহুমের শাস্তিবিধানে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন। অথচ আজ, মাত্রই কয়েক দণ্ডের তফাতে, ঈশ্বর এবং প্রধান পুরোহিত জৈমিন- দুজনেরই ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তিনিই আবার তার প্রাণ রক্ষার জন্য এই জঙ্গলে এসে তাকে খুঁজে চলেছেন!
বদলটা আসবার মুহূর্তটাও আহুমের মনে গেঁথে আছে। ঈশ্বরের ধনাগার ছেড়ে আসবার মুখে জৈমিনের উচ্চারিত একটি নাম… সৌগম!
বড়ো ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন তাঁর এই সৌগম। দুজনেই সমব্যবসায়ী। আহুম আরাপা নগরীর সন্তান। সৌগম আমহিরি নগরীর। দুই নগরের মধ্যে দূরত্ব অনেক। অথচ তাও নিয়তি তাঁদের বন্ধুত্বের সুতোয় একত্র বেধেছিল এককালে। সে সুতো ছিল ইন্দাতীর হয়ে সুদূর উত্তরে ছড়িয়ে যাওয়া দুর্গম বাণিজ্যপথ। সে সুতো ছিল দক্ষিণে লুথালি বন্দর থেকে উর বন্দরের দিকে চলে যাওয়া বিপজ্জনক সমুদ্রপথ। বাণিজ্যপথেই তাঁদের আলাপ। সে আলাপ একসময় গাঢ় বন্ধুত্বে বদলে গিয়েছিল। তারপর একসময় সৌগম কোথাও হারিয়ে গেলেন। লোকমুখে আহুম শুনেছিলেন কোনো এক বাণিজ্যযাত্রায় নাকি অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে তাঁঁর। আর আজ, অবশেষে জৈমিনের মুখে তাঁর মৃত্যুর ইতিহাস ও তার কারণ জেনে বড়ো আঘাত পেয়েছেন আহুম।
আঘাত পেয়েছেন, কারণ সৌগমের কাজে কোনো অপরাধ তিনি দেখেন না। এক জায়গায়, একই সংস্কৃতিতে কখনও বন্দি থাকে না বণিকরা। তাদের জীবন গড়ে ওঠে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে মিশে মিশে, বাণিজ্য যাত্রার পথে পথে। চেনা-অচেনা বিভিন্ন জনপদে প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া তাদের জীবনযাত্রার অঙ্গ। ভিন্ন দেশে ভিন্ন সংস্কৃতিতে সংসার পাতার বিষয়ে তাই তাদের তেমন কিছু গোঁড়ামি নেই। অথচ তাকেই মহাপাপ বলে চিহ্নিত করে তার শাস্তির বোঝা দেবতা চাপিয়ে দিয়েছেন মাণ্ডুপের মাথায়।
তাছাড়া, আশৈশব মাণ্ডুপ নিজেকে বৈক্লণ্যের সন্তান বলেই জেনেছে। এমনও তো হতে পারে, সে নিজেও নিজের এই জন্মরহস্য জানে না! সেক্ষেত্রে মন্দিরসেনা হবার জন্য সে তো কিছু গোপনও করেনি! যা সে জানে না তা সে গোপন করবে কীভাবে?
আর সর্বোপরি, সে নিজে জানুক বা না জানুক, আহুমের বন্ধুস্থানীয় সৌগম তার পিতা। এবং, দেবতা বা প্রধান পুরোহিত যা-ই বলুন না কেন, আহুম জানেন, সে নির্দোষ। নিষ্পাপ।
জৈমিনের শেষ কথাগুলো শোনবার পর থেকেই এই ভাবনাগুলো তাঁকে ছিন্নভিন্ন করে চলেছিল। সেই মানসিক ঝড় নিয়ে পথ চলতে চলতে কখন যে তিনি নিজের বাসস্থানের বদলে শহরের প্রান্তে মাণ্ডুপের বাসস্থানের সামনে এসে হাজির হয়েছিলেন খানিক আগে তা তিনি নিজেও খেয়াল করেননি। ততক্ষণে একটা সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছেন আহুম। সতর্ক করে দিতে হবে মাণ্ডুপকে। এর বেশি আর কিছু করবার শক্তিও তো নেই তাঁর!
কিন্তু হতাশ হতে হয়েছিল আহুমকে। বাড়িতে ফেরেনি মাণ্ডুপ। অভিজ্ঞ আহুম তাতে বুদ্ধি হারাননি। ঠান্ডামাথায় সে অঞ্চলে খানিক খোঁজখবর নিয়ে জেনেছিলন, অদ্ভুত এই যুবক নাকি শহরের নীচে ছড়িয়ে থাকা অরণ্যে একা একাই ঘুরে বেড়ায় মাঝে মাঝে। অনেক সময় ওই বনেই রাতও কাটিয়ে ফেরে সে। জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে দূর থেকে কেউ কেউ তাকে দেখেছেও সেখানে একটা বিশেষ এলাকায়। জায়গাটার একটা মোটামুটি বর্ণনাও পেয়েছিলেন আহুম। সেখানে খাড়াই ঢালের মাঝখানে একটুকরো সমতল জমি। তার ডাইনে একটা পায়েচলা শূঁড়িপথ এগিয়ে গিয়েছে নীচে একটা ছোটো জলকুণ্ডের দিকে।
এরপর আর দেরি করেননি আহুম। বেলা বাড়ছিল। কিছু না জেনে সে যদি এখন জৈমিনের দরবারে গিয়ে উপস্থিত হয় তাহলে আর তাঁর কিছু করবার থাকবে না। তাঁর বিশ্বাস ছিল বনের মধ্যে জায়গাটাকে তিনি ঠিকই খুঁজে নিতে পারবেন। আজ পাঁচ বছরের বেশি এই শহরে আছেন তিনি। এ জঙ্গল তাঁর কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত নয়।
খুঁজে খুঁজে খাড়াই ঢালের গায়ে সমতল জমির টুকরোটায় এসে যখন পৌঁছোলেন আহুম, তখন সূর্যের অবস্থান বলছিল, বেলা দ্বিতীয় প্রহর শুরু হয়েছে সবে। জলতৃষ্ণা পাচ্ছিল আহুমের। বয়স হচ্ছে। একসময় যে পথকে সামান্য বোধ হত এখন তাই এক কষ্টকর বলে ঠেকে। জলের সন্ধানে ইতিউতি চোখ ফেলেন তিনি। আর তাঁর অজান্তে একটা লতাকুঞ্জের গভীর থেকে একজোড়া সতর্ক চোখ তাঁকে লক্ষ্য করে চলেছিল সেই মুহূর্তে…
***
অনুভূতিগুলো সাধারণের তুলনায় অনেক বেশি তীক্ষ্ণ মাণ্ডুপের। সকলে যে শব্দ প্রায় শুনতে পায় না সেই শব্দরা তার কানে অক্লেশে ধরা দেয়। গভীর অন্ধকারেও তার দৃষ্টি আর পাঁচজনের চেয়ে বেশি তীক্ষ্ণ। প্রয়োজনে বিড়ালের চেয়েও নিঃশব্দ গতিতে চলাফেরা করা তার আপনা আপনি আসে। যোদ্ধা জীবনে এই গুণগুলো তার সহায়ক হয়েছে। এতকাল তার ধারণা ছিল এই সব গুণই ঈশ্বর দোরাদাবুর আশীর্বাদ। কিন্তু এখন সে জানে, এর পেছনে ঈশ্বরের হাত ছিল না কোনো। তার বনচারিণী মা মুড়াল, তাঁর বহু প্রজন্ম ধরে ধারালো করে তোলা এই গুণগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে তাকে দিয়ে গিয়েছেন। সেই মাতৃদত্ত ক্ষমতাই খানিক আগে তাকে খবর দিয়েছিল, কেউ আসছে…
কিন্তু এই অসময়ে কে আসবে এই নির্জন বনে! সতর্ক হয়েছিল মাণ্ডুপ। আর তারপর, তার তীক্ষ্ণ ইন্দ্রিয়রা তাকে খবর দিয়েছিল, অদেখা আগন্তুকের লক্ষ তার এই নিজস্ব আস্তানাই। ইতিউতি ঘুরতে ঘুরতে তার পায়ের শব্দ নির্দিষ্টভাবে এই জায়গাটার দিকেই এগিয়ে আসছিল।
অতএব তৈরি হল মাণ্ডুপ। লতাকুঞ্জের ভেতরে তার দোলনাটাকে ছেড়ে আরো গভীরে ঢুকে গিয়ে অপেক্ষায় রইল সে নিঃশব্দে। সেইখানে বসে সে নিবিষ্ট হয়ে সেই পায়ের শব্দ শোনে। তরুণের হালকা চালে চলা পদক্ষেপের শব্দ এ নয়। সৈনিকের ভারী জুতোয় পাথরের গায়ে উদ্ধত শব্দ তুলে এগিয়ে আসবার শব্দও নয় তা। আলস্যজড়ানো পদক্ষেপে কেউ এগিয়ে আসছেন। তিনি নগ্নপদ নন। কারণ পাথরের গায়ে তাঁর জুতোর ঘষা লাগবার শব্দ উঠছে। অতএব, তিনি নাগরিক মানুষ। পদক্ষেপের শব্দ ইঙ্গিত করছে, মানুষটির শরীর ভারী। বড়ো কষ্টে নিজের শরীরকে টেনে নিয়ে তিনি এগিয়ে আসছেন পাহাড়ি পথ ধরে। মাঝে মাঝেই থেমে যাচ্ছে তাঁর ক্লান্ত পদক্ষেপের শব্দ। তারপর, যেন বড়ো কষ্টে ফের শুরু হচ্ছে তা। একজন বয়স্ক নাগরিক মানুষ… শহর ছেড়ে এই দুর্গম জঙ্গলে…
খানিক বাদেই আগন্তুকের দেখা মিলল। পাহাড়ের কাঁধ বেয়ে তার নীচের সমতল জমির টুকরোটার দিকে নেমে আসছিলেন তিনি। লতাকুঞ্জের গভীর থেকে তাঁর মুখ দেখা যায় না। সাবধানে হামাগুড়ি দিয়ে কিছুটা এগিয়ে এল মাণ্ডুপ এবারে। এইখান থেকে তাঁর সমস্ত শরীরটাই চোখে পড়ে। নেমে আসতে আসতেই মুখ ঘুরিয়ে ইতিউতি দেখছেন তিনি। কিছু খুঁজছেন? তারপর তাঁর চোখ পড়ল এই গভীর লতাকুঞ্জের দিকে। ক্লান্ত মুখটায় রোদ এসে পড়েছে।
এবারে সরাসরি তাঁর মুখের দিকে চোখ পড়তে চমকে উঠল মাণ্ডুপ। আহুম! এখানে! কেন? তবে কি তারই খোঁজ করতে… কিন্তু তাই বা কী করে হবে? সে যে এখানে আসে সে কথা তো সে কাউকে কখনো…
ঠিক তখনই, তার সব সন্দেহের নিরসণ করে মানুষটা নীচুগলায় ডাক দিলেন, “মাণ্ডুপ…”
উত্তর দিল না সে। কেন এই মানুষটা এখানে এসে তাকে খুঁজছে তা সে জানে না। মাত্রই গতকাল তার একটা বড়োসড়ো ক্ষতি করেছে এ। অতএব আজকেও কোনো মাণ্ডুপের মঙ্গলের ইচ্ছায় এই নিবিড় জঙ্গলে সে তাকে খুঁজতে এসেছে এটা বিশ্বাস করে নেয়া যায় না।
আসলে, গতকালের ঘটনার পর একটা বিষয় মাণ্ডুপের কাছে পরিষ্কার- কট্টাদিজার মন্দির কর্তৃপক্ষ তার শত্রু। এখানে আসবার পর থেকে তার প্রতি প্রতিটি ব্যবহারকে সাজিয়ে দেখে সে বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ অবশিষ্ট নেই তার। তবে তার যুক্তি বলছিল এর পেছনে গোলকদেবতার হাত থাকা সম্ভব। কারণ ইন্দাতীরের কোনো নগরে কোনো কাজ সেই দেবতার ইশারা ছাড়া সম্ভব হয় না। অতএব সেই যুক্তিতেই অনুমান করে নেয়া যায় আহুম জৈমিনের নির্দেশে যা করেছেন সে নির্দেশের প্রতি গোলকদেবতার সমর্থন রয়েছে।
কেন এই শত্রুতা তা মাণ্ডুপ জানে না। অথচ এ প্রশ্নের উত্তর তার জানা দরকার। গোলকদেবতার সেবা তো সে কম করেনি! তাঁর হয়ে ইন্দাতীরের কঠিনতম যুদ্ধ সে জয় করেছে। পদানত করেছে ম্হিরি নগরীকে। ম্হিরি নগরের জ্যোতিগৃহে রক্ষিত সেই আলোকদায়ী পাথর, যার শক্তির কাছে দোরাদাবুও অসহায়, সেই পাথরকে সেখান থেকে সরিয়ে এনে দোরাদাবুকে উপহার দিয়েছে সে। অথচ তবু… এর কারণ জানা দরকার তার। হয়তো এই মানুষটা তার কোনো ইঙ্গিত দিতে পারবেন…
সমতল জমিটায় এসে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন মানুষটা। তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে, ঢালু শূঁড়িপথটা ধরে তিনি নীচে কুণ্ডিটার দিকে নেমে গেলেন পায়ে পায়ে। চলতে চলতেই তাঁর সতর্ক দৃষ্টি ইতিউতি ঘুরে বেড়ায়ূ। আর মাঝে মাঝেই তিনি ডাক দেন, “মাণ্ডুপ… আমি একলা এসেছি… আমি নিরস্ত্র… দেখা দাও…তোমার মঙ্গলের জন্যই…”
এইবার ধীরে ধীরে ঝোপ থেকে বের হয়ে এল মাণ্ডুপ। তারপর একটা শিকারী পশুর মতই নিঃশব্দে ক্ষিপ্রগতিতে ধেয়ে গেল সে মানুষটার দিকে…
একেবারে কাছাকাছি এসে পৌঁছোতে পায়ের নীচে একটা শুকনো পাতার শব্দ উঠেছিল মাণ্ডুপের। নিঃশব্দ বনে সেই সামান্য শব্দেই চমকে উঠে পেছন ঘুরে দেখেছিলেন আহুম। কিছু বলতে গিয়েছিলেন বুঝি। কিন্তু তার আগেই একটা চিতার মতই লাফ দিয়ে মাণ্ডুপ তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার বাঁহাত কোনো বিচিত্র কৌশলে গলায় জড়িয়ে গিয়েছে আহুমের। ডানহাতে উঠে আসা ছোটো একটা ছুরি তাঁর গলায় ঠেকিয়ে ধরে প্রথম প্রশ্ন করল মাণ্ডুপ, “কে তোমাকে সন্ধান দিল এ জায়গার?”
“আমি নিজেই তার সন্ধান বের করেছি মাণ্ডুপ।” তার দুটো শক্তিশালী হাতে বাঁধা পড়া মানুষটা শান্ত গলায় জবাব দিলেন মানুষটা। তাঁর চোখে ভয়ের চিহ্নমাত্র নেই।
“অসম্ভব। কেউ জানে না আমার এ জায়গাটার কথা…”
“অথচ, কত সহজেই না আমি তার সন্ধান বের করে নিলাম। কীভাবে করেছি তা নাই বা বললাম। শুধু এইটুকু জেনে নাও, নিজেকে নিরাপদ ভাবাটা তোমার ভুল মাণ্ডুপ। আরো অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে তোমায়।
“সতর্ক? তুমি আমায়… কেন?”
“কারণ, তোমার জীবন বিপন্ন। এবং, এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ কট্টাদিজায় আমিই একমাত্র তোমার মঙ্গলাকাঙ্খী।”
“আমি বিশ্বাস করি না।”
“স্বাভাবিক,” মাথা নেড়ে মলিন একটুকরো হাসি ফোটালেন প্রৌঢ় তাঁর মুখে, “গত কাল তোমার সঙ্গে যে অবিচার আমি বাধ্য হয়ে করেছি, তারপর আমাকে বিশ্বাস না করাই তোমার পক্ষে স্বাভাবিক। কিন্তু তখন আমি একটা কথা জানতাম না মাণ্ডুপ। জানতাম না তুমি আমার বন্ধুপুত্র। জানতাম না, তুমি সৌগমের সন্তান।”
“আ… আপনি সে কথা…”
“মাত্রই কিছুক্ষণ আগে আমি জৈমিনের সঙ্গে ছিলাম। সেখানে তোমার ইতিহাস যা জেনেছি, তা আমি তোমাকে বলতে পারি। কিন্তু তুমি কি মানসিকভাবে সেই সত্যকে মেনে নিতে পারবে?”
ধীরে ধীরে একটা পাথরের ওপর বসে পড়ল মাণ্ডুপ। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “যা বলবেন তার অনেকটাই আমি আন্দাজ করেছি। কিন্তু তবু, আপনি বলুন। আমি নিশ্চিত হতে চাই…”
“বলব মাণ্ডুপ। সবই বলব। এবং সেইসঙ্গে কেন তোমায় সতর্ক করতে এভাবে ছুটে এসেছি সে কথাও জানাব তোমায়…”
এবং সূর্য ক্রমশ মাথার ওপর উঠে আসে। উত্তপ্ত পাথরে বসে এক প্রৌঢ় এক তরুণকে বলে চলেন তার জীবনের যন্ত্রণাময় ইতিহাস। বলে চলেন, কীভাবে তাকে হত্যা করবার সুচতুর পরিকল্পনা করেছেন অর্থলোভী জৈমিন। তাঁর একান্ত অনুরোধ, মাণ্ডুপ এই যেন মন্দিরদুর্গে জৈমিনের সভায় না যায় আজ। গেলে তাকে জীবন্ত ফিরতে দেবেন না তিনি। সে যেন এখনই এই অরণ্যপথ বেয়ে দূরে কোথাও চলে যায়… বিশাল এই পৃথিবীতে এখনও বহু জায়গা আছে, যেখানে দোরাদাবুর হাত পৌঁছায় না। তেমনই কোথাও সে চলে যাক…
“তাহলে? কী সিদ্ধান্ত নিলে মাণ্ডুপ?”
চুপ করে বসেছিল সেই তরুণ। আহুমের কথা শুনতে শুনতেই অনেকগুলো বদলের মধ্যে দিয়ে চলেছিল সে এতক্ষণ। প্রথমে যন্ত্রণা, তারপর অসহনীয় ক্রোধ, তারপর তীব্র হতাশা… এই সবকিছু পেরিয়ে এইবার সে একটা সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছে।
“ঠিকই পরামর্শ দিয়েছেন আপনি ভদ্র। চলেই যাব আমি। আমি সামান্য সৈনিক। গোলকদেবতাকে ঈশ্বর ভেবে তাঁর সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে গিয়েছিলাম এককালে। অথচ তিনি আমার সে সেবা গ্রহণ করে আমাকে অক্লেশে ছুঁড়ে ফেললেন। শুধু তাই নয়, অবশেষে আমাকে হত্যা করবার আদেশ দিয়েছেন তিনি তাঁর পুরোহিত জৈমিনকে। হ্যাঁ হ্যাঁ এ গোলকদেবতারই আদেশ আহুম। তাঁর ইচ্ছা ভিন্ন ইন্দাতীরে একটা পাতা অবধি নড়ে না। আতবড়োপ সিদ্ধান্তটাও তাই জৈমিনের পক্ষে নেয়া সম্ভব নয়। সেই অকৃতজ্ঞ গোলককে আমি আর ঈশ্বর বলে স্বীকার করি না।”
“চুপ চুপ মূর্খ। তাড়াতাড়ি উঠে এসে ত্রস্ত হাতে মাণ্ডুপের মুখে চাপা দিতে গিয়েছিলেন আহুম, “জানো না তিনি সকলের মনের কথা বুঝতে পারেন! অমন কথা মনে আনবার শাস্তি…”
শান্তভাবে তাঁর মঙ্গলাকাঙ্খী হাতটা সরিয়ে দিল মাণ্ডুপ। তারপর সামান্য হেসে বলল, “চিন্তা করবেন না ভদ্র। ভুলে যাবেন না, যে ম্হিরিতে ওই সর্বশক্তিমান গোলকের ঢোকবার ক্ষমতা ছিল না, সেই মহিরিকেও আমিই পদানত করেছি। আমারও কিছু কৌশল, কিছু বিশেষ শক্তি আছে। কী সে কৌশল তা আমার কাছেই গুপ্ত থাকবে। তবে এটা সত্য যে, তার বলে এই মুহূর্তে আমি, আপনি ওই মনরাক্ষসের কাছে অদৃশ্য।”
“মনরাক্ষস! এই নামে তুমি দেবতাকে…”
“হ্যাঁ আহুম। আপনার কাছে তিনি দেবতা হতে পারেন। সবই দিয়েছেন তিনি আপনাকে। কিন্তু যাঁর ইশারায় আমি, শৈশবে মাতৃহারা হলাম, যৌবনে যাঁকে সেবার পুরস্কার হিসেবে সর্বস্বান্ত হয়ে এবারে প্রাণদণ্ড পেলাম, যে আমার অরণ্যকন্যার গর্ভে জন্ম নেয়াকে অপরাধ বলে মনে করে, আমার কাছে সে আর দেবতা নয়। মহাপণ্ডিত কিরাম… আমার গুরু কিরাম… তিনিই তার প্রকৃত স্বরূপ চিনেছিলেন। তাই তাঁর দেয়া নামকেই আজ থেকে একে সম্বোধন করব আমি। দেবতা নয়, ও এক রাক্ষস। মনরাক্ষস।
আর জৈমিন! না ওই তস্করের সভায় আমি যাব না আহুম। কিন্তু তার ওই ধনাগারে আমি যাব আজ রাতে। চলে যাবার আগে ওখান থেকে কিছু মূল্যবান সংগ্রহ সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে আমাকে…”
“মূর্খ। তুমি তো শুনলে! ওখানে একলা গেলে তুমি…”
“সন্তানগোলকের হাতে মারা যাব, এই ভয় পাচ্ছেন তো!” মৃদু হেসে মাথা নাড়ল মাণ্ডুপ, “ভয় নেই। আগেই তো আপনাকে বলেছি, আমাকে সে স্পর্শ করতে পারবে না। আর হ্যাঁ। জৈমিনের ঘৃণিত অপরাধের শাস্তি আমি দিয়ে যাব। তার জন্য আপনার সামান্য সহায়তা দরকার হবে আমার।”
“মাণ্ডুপ! প্রতিহিংসায় উন্মাদ হয়ে তুমি নিজেই ফাঁদে পড়তে চলেছ… শান্ত হও।” বলতে বলতে তার হাতদুটি জড়িয়ে ধরলেন আহুম। ভয় পেয়েছেন তিনি, “প্রধান পুরোহিতের ওপরে প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করা স্বেচ্ছামৃত্যুর শামিল…”
মাণ্ডুপ শান্ত গলায় প্রতিপ্রশ্ন করল, “আমার মাকে সে চূড়ান্ত অসম্মান করেছে আহুম। আপনি নিজেমুখেই আমার মায়ের বিষয়ে তার কটূক্তির কথা আমাকে জানিয়েছেন। প্রশ্ন করি, আপনার মাকে কেউ এই অসম্মান করলে আপনি কী বেত্রাহত কুকুরের মত পালিয়ে যেতেন, না সে অসম্মানের প্রতিশোধ নিতে জীবনপণ করতেন?”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন আহুম। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, “এর উত্তরে আর কিছু বলবার নেই আমার। কী সাহায্য করতে হবে আমায়? কথা দিলাম সাধ্যে থাকলে তা আমি করব।”
মৃদু হাসল মাণ্ডুপ, “বিপজ্জনক কিছু নয়। সামান্য কৌশল। এখান থেকে বের হয়ে জৈমিনের সভায় যাবেন আপনি। আজ আমি সেখানে না পৌঁছোলে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন হবেন তিনি। কারণ মনরাক্ষসের আদেশের অবমাননাকে প্রধান পুরোহিতও ভয় পায়। তখন তাঁকে নির্জনে ডেকে বলবেন, আমি কোথায় আত্মগোপন করেছি সে বিষয়ে আপনি কিছু খবর পেয়েছেন। আজ রাত্রির মধ্যে আপনার চর তার আত্মগোপনের জায়গাটিকে খুঁজে বের করবে। তাকে নিয়ে নিয়ে আজ রাত্রি দ্বিপ্রহরে আপনি জৈমিনের বাসভবনে দেখা করবেন।”
“তারপর?”
“রাত্রি দ্বিপ্রহরে সাক্ষাতের সময়, আপনি তাঁকে নির্দ্বিধায় আমার এই লুকোবার জায়গাটার খবর দেবেন। এবং তিনি যাতে এখানে সৈন্যদল পাঠান তা সুইনিশ্চিত করবেন।”
“কী বলছ তুমি মাণ্ডুপ। আমি তোমায় ধরিয়ে দেব? সেইজন্যই কি তোমাকে খুঁজে বের করবার জন্য এত প্রযত্ন করলাম? তোমাকে সাবধান করলাম? না না, এভাবে তোমার মৃত্যুর কারণ আমি…”
“ এত সহজে আমার মৃত্যু হবে না আহুম,” মাথা নাড়ল মাণ্ডুপ। তার গলায় ইস্পাতের দৃঢ়তা, “যান। আমার কথামত কাজ করুন। আজ রাত্রি দ্বিপ্রহরে জৈমিনের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে আপনার এই সাক্ষাতকার ঘটলে তবেই আমার উদ্দেশ্য সাধন করা সম্ভব। এবং হ্যাঁ। কেবল অনুরোধ এই সময়টা জৈমিনের বাড়ির যে ঘরে আপনাদের সাক্ষাত চলবে সেখানে একটা প্রদীপ যেন জ্বলতে থাকে।”
বিমূঢ়ের মত তার মুখের দিকেচেয়ে দেখলেন আহুম। কিন্তু মাণ্ডুপের চেহারায় তখন একটা নতুন প্রত্যয়ের ছাপ। গভীর আত্মবিশ্বাস যেন ফুটে বের হচ্ছে তার গুটা শরীর থেকে। হঠাৎ নীচু হয়ে সে আহুমকে প্রণাম করল। তারপর মাথা তুলে বলল, “ম্হিরিবিজয়ী যোদ্ধা মাণ্ডুপের ওপর ভরসা রাখুন আহুম। আপনার আশীর্বাদ থাকলে আমি সফল হব।”
“আশীর্বাদ রইল প্রিয় পুত্র,” ধরা গলায় উত্তর দিলেন আহুম। তিনি যোদ্ধা নন। যুদ্ধের কূটকৌশল তাঁর আয়ত্তের বাইরে। এই অভিজ্ঞ যোদ্ধা ঠিক কী করতে চাইছে তা না বুঝলেও একটা বিষয়ে ততক্ষণে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন, “এ যা বলছে তা কোনো গভীর ও যুক্তিসঙ্গত ভাবনার ফসল। একে ভরসা করা যায়।
“তাই হবে পুত্র। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব তোমার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবার।”
“বেশ। আজ রাত্রে…”