[লেখক পরিচিতি: হারবার্ট জর্জ (এইচ জি )ওয়েলস ব্রিটিশ সাংবাদিক , ঔপন্যাসিক , সমাজবিজ্ঞানী এবং ঐতিহাসিক হলেও সারা বিশ্বের কাছে তিনি পরিচিত কল্পবিজ্ঞান লেখক হিসাবে। লন্ডনে টি এইচ হাক্সলের তত্ত্বাবধানে বিজ্ঞান পড়ার সময়ই কল্পবিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মায়, তার ফলেই বিশ্ববাসী তাঁর কাছে উপহার পায় ‘দি টাইম মেশিন(১৮৯৫)’’দি ইনভিজিবল ম্যান (১৮৯৭)’ এবং ‘দি ওয়ার অফ দি ওয়ার্ল্ড(১৮৯৮ )’ এর মত কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস। তিনি আরও লিখেছেন ‘টোনো ব্যাঙগে(১৯০৮’)এবং ‘দি হিস্ট্রি অব মিঃ পলি(১৯১০)’এর মত উপন্যাস। “দি আউটলাইন অফ হিস্ট্রি” লিখেছেন ১৯২০ সালে। এছাড়াও তিনি লিখেছেন বেশ কিছু চমকপ্রদ ছোটগল্প, ‘দি রেড রুম’যার অন্যতম।]

“আপনারা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, কোনও অশরীরির সাধ্য নেই, আমাকে ভয় দেখায়।” কথাগুলো বলে গ্লাস নিয়ে আমি উঠে দাড়ালাম। সামনে জ্বলছে ফায়ার প্লেসের গনগনে আগুন।
“সেটা তোমার ব্যাপার,” রোগাভোগা শুকনো চেহারার মানুষটা কথাটা বলে আমার দিকে বাঁকাভাবে তাকাল।
“আমার এই আঠাশ বছর বয়স হল এখন পর্যন্ত ভূত দেখলাম না,” আমি বললাম।
বয়স্কা মহিলাটি এতক্ষণ একদৃষ্টে আগুনের দিকে তাকিয়েছিল, আমার কথা শুনে ঘোলাটে চোখে আমার দিকে তাকাল, “তা বাপু আঠাশ বছরে এমন একখানা বাড়িও তো দেখনি। অনেক কিছুই এখনো দেখতে বাকি। মাত্র আঠাশ বছর বয়স তোমার। আরো কত কি এখনও দেখবে আর দুঃখ পাবে।” কথার তালে তালে তার মাথাও এদিক-ওদিক দুলছিল।
বুড়ো মানুষগুলোর একঘেয়ে ঘ্যানর ঘ্যানর শুনতে শুনতে আমার সন্দেহ হচ্ছিল যে তারা বোধহয় এই বাড়ির অশরীরি আতঙ্ক সম্বন্ধে আমাকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করছে। আমার শূন্য গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে ঘরের চারদিকে একবার চোখ বোলানোর ফাঁকে,ঘরের শেষ প্রান্তের অদ্ভুতদর্শন আয়নাটাতে নিজের সংক্ষিপ্ত অথচ অবিশ্বাস্যরকম বলিষ্ঠ অবয়বের একঝলক দেখতে পেলাম । চমকে উঠলাম নিজেই।
“শুনুন,” আমি বললাম, “আজ রাতে আমি যদি কিছু দেখতে পাই আমার জ্ঞানের ভান্ডার তাতে বাড়বে। আমি খোলা মনে সবকিছু বিচার করার জন্য এসেছি।”
“সেটা তোমার ব্যাপার,” রোগাভোগা শুকনো চেহারার মানুষটা আরেকবার কথা বলল।
ঠিক এই সময় বাইরের পাথরের মেঝেতে লাঠির ঠুকঠুকানি আর অন্য একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম, যেন কেউ পা টেনে টেনে হাঁটছে। তারপর ক্যাঁ-চ করে খুলে গেল দরজাটা আর ঘরে প্রবেশ করল আরেকজন বৃদ্ধমানুষ। আরো কুঁজো, চামড়া আরও কোঁচকানো, প্রথমজনের চেয়ে আরো বেশি বয়স্ক। একটা লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিল সে, চোখ ঢাকা ছিল অস্বচ্ছ চশমায় আর আধখোলা,ঝুলে পড়া ফ্যাকাশে –গোলাপী নিচের ঠোঁট থেকে হলদে, ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছিল। টেবিলের উল্টোদিকে থাকা আরামকেদারাটার দিকে সোজাসুজি এগিয়ে গিয়ে ঘাড় গুঁজে বসে পড়ল সে, শুরু হল কাশির দমক। শুকনো চেহারার মানুষটা এই বৃদ্ধের দিকে একবার তাকাল মাত্র, বিরক্তির ছাপ তাতে স্পষ্ট। বয়স্কা মহিলা তার আসাকে কোনোরকম পাত্তা না দিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়েছিল আগুনের দিকেই।
কাশির আওয়াজ একটু কমে এলে, শুকনো চেহারার মানুষটি বলল, “আমি বলছি- এটা তোমার ব্যাপার।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ আমি তো বলছি, এটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত আগ্রহ,”আমি বললাম।
ঘোলাটে চশমা পর মানুষটা এই প্রথম আমার উপস্থিতি সম্পর্কে সতেচন হয়ে উঠল। আমাকে দেখার জন্য একঝলক ঘাড় ঘোরাল সে। চশমার ফাঁক দিয়ে এক মুহুর্তের জন্য দেখতে পেলাম তার ছোট ছোট তীক্ষ্ণ লালচে চোখ দুটি। তারপর আবার শুরু হল কাশির দমক, থুথু ছিটকোতে লাগল চতুর্দিকে।
“আচ্ছা তুমি পান করছ না কেন?” রোগাভোগা শুকনো চেহারার মানুষটা তার দিকে বিয়ারের পাত্রটা এগিয়ে দিল। ঘোলাটে চশমা পরা মানুষটা কাঁপা কাঁপা হাতে একটা গ্লাসে বিয়ার ঢালল, যার অর্ধেকটাই আবার ছড়িয়ে পড়ল টেবিলের ওপর। বিরাট ছায়াটা দেওয়ালে রাক্ষুসে ভঙ্গিতে হামাগুড়ি দিয়ে যেন ভ্যাঙাচ্ছিল তার বিয়ার ঢালা আর পান করার ভঙ্গিটাকে। আমি স্বীকার করতে বাধ্য যে এখানে এমন ভূতুড়ে মানুষজনের সান্নিধ্য আমি আশা করিনি। একটানা দমবন্ধ করা ভাব ক্রমেই জাঁকিয়ে বসেছিল মনের মধ্যে। এই তিনজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল তারা কেউ কাউকে পছন্দ করে না এবং তারা আমাকেও বিশেষ পছন্দ করছে না। তাদের এই হঠাৎ হঠাৎ কথা বলা পরক্ষণেই চুপ করে যাওয়া – এইসব ব্যাপার স্যাপার দেখে অস্বস্তিটা ক্রমশই বাড়ছিল আমার। সেটা কাটানোর জন্য আমি বললাম,”আমাকে বরং এ বাড়ির ভূতের ঘরটা দেখিয়ে দিন, সেটাই বরং ভালো হবে।”
কাশতে থাকা বুড়োটা আচমকা তার ঘাড়টা আমার দিকে ঘুরিয়ে , ঘোলাটে চশমার ফাঁক দিয়ে দুটো লাল চোখে এমনভাবে তাকাল যে আমি কেঁপে উঠলাম। কেউ কোনও উত্তর দিল না অবশ্য।
মিনিটখানেক অপেক্ষা করে, আমি একটু জোরেই বললাম “যদি আপনারা আমাকে এ বাড়ির ভূতুড়ে ঘরটা দেখিয়ে দেন , তাহলে আপনাদের আর কষ্ট করে আমাকে সঙ্গ দিতে হবে না।”
“দরজার বাইরে চাতালে একটা মোমবাতি আছে,” রোগাভোগা শুকনো চেহারার মানুষটা বলল, “কিন্তু আজকের রাতটায় তুমি যদি ঐ লাল কামরায় যাও—”
“বিশেষ করে আজকের রাতটায়,” বৃদ্ধা মহিলাটির কাঁপা কাঁপা গলায় মন্তব্য ।
“তুমি একা যাও!”
“ঠিক আছে, একাই যাব”, আমি বললাম ,”কিন্তু কোনদিক দিয়ে যাব?”
“বারান্দা দিয়ে হেঁটে খানিকটা গেলে তুমি একটা দরজা পাবে, সেখানে একটা ঘোরানো সিঁড়ি আছে। সিঁড়ি দিয়ে অর্ধেক উঠলে একটা বারান্দা । সেখানে পাবে আরেকটা দরজা, মোটা পশমের পর্দা ঝোলানো। সেই দরজা দিয়ে ঢুকে ল-ম্বা করিডরের একেবারে শেষ মাথায় চলে যাবে, সেখানে বাঁদিকে কয়েকটা সিঁড়ি ভাঙলেই লাল কামরা।”
“বেশ আমি তাহলে এই পথে যাব,” বলে আমি যাত্রাপথটা আরেকবার ঝালিয়ে নিলাম। রোগাভোগা শুকনো চেহারার মানুষটা শুনে ঠিকঠাক করে দিল।
“তাহলে তুমি সত্যিই যাচ্ছ?” ঘোলাটে চশমা পরা, অস্বাভাবিক মুখের মানুষটা তৃতীয়বারের জন্য আমার দিকে তাকিয়ে , সেই প্রথমবার আমাকে জিজ্ঞাসা করল।
“বিশেষ করে আজকের রাতটায়!” বৃদ্ধা মহিলাটির কাঁপা কাঁপা গলা শোনা গেল।
“আমি সেজন্যই এসেছি,” বলে আমি দরজার দিকে এগোলাম। যখন আমি এগোচ্ছি, দেখতে পেলাম ঘোলাটে চশমা পরা মানুষটা আরামকেদারা থেকে উঠে টেবিলের পাশ দিয়ে টলতে টলতে এগোতে লাগল ফায়ারপ্লেসের কাছটায় যাওয়ার জন্য , যেখানে সবাই বসে আছে। দরজার কাছে গিয়ে আমি ঘুরে আরেকবার সবার দিকে তাকালাম। দেখতে পেলাম তারা সবাই আলো আঁধারির মধ্যে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে, একে অন্যের কাঁধের ফাঁক দিয়ে ইতিউতি চাইছে আমার দিকে, তাদের প্রাচীন, বয়স্ক মুখগুলোতে পড়েছে একটা অদ্ভুত অভিসন্ধির ছাপ।
“শুভরাত্রি,” বলে আমি দরজাটা খুললাম।
“এটা তোমার ব্যাপার , তুমি নিজেই যাচ্ছ বাপু,” রোগাভোগা শুকনো চেহারের মানুষটা বলল।

বাইরে গিয়ে আগে মোমবাতি জ্বালিয়ে নিলাম। তারপর দরজাটা টেনে দিয়ে , কনকনে ঠান্ডা বারান্দায় পা বাড়িয়ে দিলাম। আমার পায়ের শব্দ বারান্দায় সৃষ্টি করছিল প্রতিধ্বনি। আমি স্বীকার করছি , যে তিনজন কর্মচারীর হাতে নাইটের স্ত্রী এই প্রাসাদ রক্ষণাবেক্ষণের ভার দিয়েছেন, তাদের এমন ধরনের আচার-আচরণ, যে ঘরটায় তারা বসেছিল সেই ঘরের গাঢ় রঙ , তার প্রাচীন আমলের আসবাবপত্র, সবকিছুই আমার মনের মধ্যেই একটা অদ্ভুত প্রভাব ফেলেছিল। মনে হচ্ছিল , ওরা যেন এক অন্য যুগের মানুষ, প্রাচীন যুগের , যে যুগে আধিভৌতিক বিষয়গুলো ছিল অনেক বেশি প্রকট, যে যুগে অশুভ লক্ষণ আর ডাইনি-মায়ারা ছিল বিশ্বাস্য, যখন অশরীরি আত্মায় অবিশ্বাসের প্রশ্নই উঠতো না। মানুষগুলোর চালচলনই যেন কেমন ভৌতিক ধরনের , ওদের পোশাক-আশাক পরার ধরন-ধারণ, চলাফেরার কায়দাকেতা সবকিছু যেন কোনও মৃত মানুষের কল্পনাপ্রসূত। যাই হোক এই ধরনের চিন্তাভাবনাগুলোকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলে পথের দিকে তাকালাম। ধুলোভরা, কনকনে ঠান্ডা, সামনের লম্বা খোপকাটা পথের দু’পাশে আমার মোমবাতির টিমটিমে আলো তৈরি করছিল অদ্ভুত ছায়াছবি। ঘোরানো সিঁড়িপথের ওপর নিচে , আমার পদশব্দ সৃষ্টি করছিল প্রতিধ্বনি। একটা ছায়া এঁকেবেঁকে আমার পিছুপিছু চলছিল, আর একটা আমার সামনে দিয়ে মাথার ওপরের অন্ধকারে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছিল, কে জানে। ল্যান্ডিং এ পৌছে কয়েক মুহুর্ত স্তব্ধ হয়ে রইলাম, মনে হল কোনও কিছু নড়াচড়ার আওয়াজ পেলাম , কিন্তু সেখানে বিরাজ করছিল এক অপরিসীম নৈঃশব্দ। তারপর আমি পশমের ভারী পর্দা ঝোলানো দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে করিডরের সামনে দাঁড়ালাম।
নিচের সিঁড়ির বিরাট জানলা দিয়ে প্রবেশ করছিল চন্দ্রালোক, ধুইয়ে দিচ্ছিল সবকিছু, কালচে-রুপোলি ছায়াছায়ার মায়াজালে আচ্ছন্ন ছিল চারদিক। এমন দৃশ্য দেখব আশা করিনি। প্রতিটি জিনিস ছিল ঠিকঠাক জায়গায়, যেন এ প্রাসাদ আঠেরো মাস আগে নয়, গতকালই পরিত্যক্ত হয়েছে। দেওয়ালগিরিতে বসানো ছিল মোমবাতি। যতটুকু ধুলো পড়েছিল কার্পেটে অথবা পালিশ করা মেঝেতে, তা এমন সূক্ষ, এমন মসৃণতায় সমানভাবে ছড়ানো ছিল , যে চাঁদের আলোয় তা প্রায় বোঝাই যাচ্ছিল না। আমি এগোতে গিয়েও আচমকা দাঁড়িয়ে পড়লাম। ল্যান্ডিং এর একেবারে শেষ প্রান্তে, কিছু ব্রোঞ্জের মূর্তি দাঁড় করানো ছিল(যেগুলো আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না)কিন্তু এদের ছায়া এমন অত্যাশ্চর্য জীবন্তভাবে দেওয়ালের সাদা প্যানেলে পড়েছিল যে মনে হচ্ছিল , সামনে আমার চলার পথে কারা যেন গুটিসুটি মেরে বসে আছে, যে কোনও মুহূর্তে আক্রমণের উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার ওপর। ভয়ে গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল আমার। প্রায় আধমিনিট মতো আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর পকেটের রিভলবারের ওপর একটা হাত রেখে এগিয়ে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, এটা একটা গ্যানিমিড আর ঈগলের মূর্তি- চন্দ্রালোকে চকচক করছে। মুহূর্তেই চাঙ্গা হয়ে উঠল আমার হতোদ্যম স্নায়ুতন্ত্র। এতটাই , যে কিছুটা এগিয়েই একটা টেবিলের ওপর বসানো যে পোর্সেলিনের চিনামাটির মূর্তিটা নিঃশব্দে মাথা নাড়ছিল ,পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেটা দেখেও আমি খুব সামান্যই চমকে গেলাম। করিডোরের শেষ প্রান্তে, আলো আঁধারির মধ্যে কয়েকটা সিঁড়ি উঠে গেছে লাল কামরার দরজার দিকে। দরজা খোলার আগে , আমি মোমবাতির আলোয় চারদিক ভালো করে দেখে নিলাম। আমার মনে পড়ল, এই ঘরের রহস্যভেদ করার জন্য আমার আগেও একজন এসেছিল। সেই কাহিনীর স্মৃতি আমার চেতনাকে ক্ষণিক বেদনায় আচ্ছন্ন করল, আমি ঘাড় ঘুরিয়ে সেই চন্দ্রালোকিত গ্যানিমিডের মূর্তির দিকে তাকালাম , তারপর চকিত হাতে লাল কামরার দরজা খুললাম, ল্যান্ডিং এর চাপা , বিষণ্ণ নৈঃশব্দ্যকে পেছনে ফেলে।
ঘরে ঢুকেই আমি তৎক্ষণাৎ চাবি ঘুরিয়ে দরজাটা আটকে দিলাম। তারপর মোমবাতি তুলে ধরলাম, যে ঘরে রাত কাটাতে হবে , সেই ঘরের সমস্ত কিছু ভালো করে দেখে নেওয়ার জন্য। এই তাহলে লোরেইন ক্যাসেলের সেই কুখ্যাত লাল কামরা, সেই ঘর যেখানে সেই তরুণ ডিউক মারা গেছিলেন। নাকি এটা বলাই ভালো যে এখান থেকেই তাঁর মরণের ডাক এসেছিল, তিনি দরজা খুলে সিঁড়ির ধাপ থেকে সোজা নিচে পড়ে গিয়েছিলেন , মটকে গেছিল ঘাড়, সেই সিঁড়ির ধাপ, যেগুলো বেয়েই আমি এখুনি উঠে এলাম। এখানকার ভৌতিক পরিবেশের কুসংস্কার ভাঙতে চেয়েছিলেন তিনি, পরিণামে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল তাঁকে। আমার ধারণা, তাঁর মৃত্যু হয়েছিল মৃগীরোগে , কিন্তু সবার ধারণা , ভূতে তাঁর ঘাড় মটকে মেরেছে। এ ঘরে প্রথমে ভয় পেয়ে মৃত্যু হয়েছিল এক মহিলার, যদিও ঠাট্টা করে ভয়টা দেখিয়েছিলেন তাঁর স্বামীই। একটা তরতাজা প্রাণের অবসান হয়েছিল এমন মর্মান্তিকভাবে। এ ঘরের আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে আরো পুরোনো নানান সব কাহিনি। এই বিরাট বিষণ্ণ, অন্ধকারাচ্ছন্ন কামরার আবছায়া জানালায়, এর দেওয়ালের চোরাকুঠুরি আর কুলুঙ্গির দিকে তাকিয়ে যে কেউ বুঝতে পারবেন যে ভয়ের কাহিনী পল্লবিত করতে এ ঘরের কালো কালো প্রান্তগুলোয় জমে থাকা অন্ধকারই যথেষ্ট। আমার হাতের মোমবাতিটার ছোট্ট আলো এই প্রকান্ড কামরার জমাট বাঁধা অন্ধকার সরিয়ে দিতে ব্যর্থ হচ্ছিল। অপার রহস্য আর ছমছমে পরিবেশের মাঝে ছোট্ট একটা আলোর দ্বীপ সৃষ্টি করে দাঁড়িয়েছিলাম আমি।
ঠিক করলাম প্রথমে ঘরটাকে একবার ভাল করে দেখে নেব। কারণ, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনও কিছু চোখের সামনে না ঘটছে, ততক্ষণ আজেবাজে কোনও চিন্তাভাবনাকে প্রশ্রয় দেওয়া কাজের কথা নয়। দরজাটা ভাল করে বন্ধ করা হয়েছে কিনা সেটা আরেকবার দেখে নিয়ে আমি সামনের দিকে তাকালাম। প্রতিটা আসবাবপত্রে চোখ বোলালাম, খাট থেকে নামানো ঝালরটা তুলে দেখলাম, সরিয়ে দেখলাম চাদরটাকেও। জানালার খড়খড়িগুলো টেনে, তার কবজাগুলো পরীক্ষা করে দেখলাম সব ঠিক আছে কিনা, তারপর বন্ধ করে দিলাম।
নিবিড় আঁধারে দাড়িয়েছিল ফায়ারপ্লেসের চিমনিটা, সামনে ঝুঁকে দেখলাম তাও,আর গাঢ় রঙের ওককাঠের প্যানেলগুলো ঠক ঠক করে বাজিয়ে দেখলাম, সেখানে কোনও গোপন পথ আছে কিনা। ঘরে দুটো বিরাট আয়না ছিল, প্রতিটার সঙ্গে সংলগ্ন রয়েছে একজোড়া করে মোমদানি, আর ফায়ারপ্লেসের পাশের ম্যান্টেলশেলফের চিনামাটির মোমদানিতেও বসানো ছিল অনেকগুলো মোমবাতি। একে একে সবকটাই জ্বালিয়ে দিলাম, আগুন ধরানোর জন্য তৈরি করা ছিল ফায়ারপ্লেসটা – এতটা দায়িত্বশীলতা অবশ্য আমি বুড়োদের কাছ থেকে আশা করিনি। অন্তত শীতের কাঁপুনির হাত থেকে তো রক্ষা পাওয়া যাবে। আগুনের আঁচ গনগনে হয়ে উঠলে আমি সে দিকে পিছন ফিরে ঘরটাকে আরেকবার দেখলাম। তারপর ছিটকাপড়ের ঢাকনা দেওয়া আরামকেদারাটা আর একটা টেবিল সামনে নিয়ে নিলাম যাতে সেটা টপকে কেউ সরাসরি আমার কাছে আসতে না পারে। টেবিলের ওপর রইল আমার রিভলভার–প্রয়োজনবোধে যেকোনো মুহুর্তে সেটা হাতে তুলে নেওয়ার জন্য।
এতকিছুর পরও আমি ঠিক স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। ঘরের কোণে কোণে জমে ছিল ঘন অন্ধকার, থমথম করছিল চতুর্দিক, এক অস্বাভাবিক নৈঃশব্দ্য নানারকম অলীক কল্পনার জন্ম দিছিল আমার মনে। ঘরে প্রতিধ্বনিত হছিল ফায়ারপ্লেসের আগুন জ্বলার ফটফট আওয়াজ, যার শব্দে বার বার চমকে উঠছিলাম আমি। কেবল মনে হচ্ছিল, ঘরের শেষ প্রান্তের ছায়াচ্ছন্ন চোরাকুঠুরিতে অজানা কারও উপস্থিতি, যেন কেউ লুকিয়ে আছে, জীবন্ত কিছু, এই স্তব্ধতা আর নিঃসঙ্গতার মধ্যে এই চিন্তাভাবনাগুলো বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল মনের মধ্যে। কিছুতেই অস্থিরতা সামলাতে না পেরে, শেষ পর্যন্ত নিজেকে আশ্বস্ত করার জন্যই, একটা মোমবাতি নিয়ে সেখানে গিয়ে দেখে এলাম যে সত্যিসত্যিই সেখানে কেউ নেই। মোমবাতিটা চোরাকুঠুরির মেঝেতেই দাঁড় করিয়ে দিলাম।
এ সময়টা কেন যেন আমার স্নায়ুগুলো অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে উঠছিল , খুব বিচলিত বোধ করছিলাম আমি, যদিও এমনটা হওয়ার কোনও সঙ্গত কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। যাই হোক, যদিও আমি জানতাম ও নিশ্চিত ছিলাম যে আলৌকিক বলে কিছু হয় না, তাই সময় কাটানোর জন্যই কিছু ছড়া আওড়াতে লাগলাম। কিন্তু কয়েকটা জোর গলায় বলার পরই বুঝতে পারলাম যে আওয়াজটার প্রতিধ্বনি হচ্ছে, যা মোটেই শুনতে ভাল লাগছে না। খানিক বাদে টের পেলাম এসব হানাবাড়ি আর অলৌকিক ব্যাপার যে কতটা ফালতু, সে সম্বন্ধে আমি নিজের মনেই বকরবকর করছি! বুঝতে পারলাম ঘাবড়ে গেছি। আমার মন বারবার ফিরে যাচ্ছিল নিচের তলার তিন বিচিত্রদর্শন বৃদ্ধ-বৃদ্ধার দিকে। চেষ্টা করেও মনকে বশে আনতে পারছিলাম না। এই বিরাট ঘরের বিবর্ণ লালচে আর কালোরঙ মনেও মধ্যে ছাপ ফেলেছিল যথেষ্ট। এমনকি, সাতখানা মোমের আলোতেও ঘরটা খুব ম্লান লাগছিল। চোরাকুঠুরির মোমবাতিটা দমকা বাতাসে কেঁপে উঠছিল, কম্পমান অগ্নিশিখা তৈরি করছিল নানারকম ছায়া আর উপছায়া, ক্রমাগত নড়েচড়ে স্থান পরিবর্তন করছিল সেগুলো। উপায় ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল বাইরের বারান্দায় দেখা মোমবাতিগুলোর কথা। অতএব, একটা মোমবাতি হাতে নিয়ে চন্দ্রলোকিত বারান্দায় গিয়ে গোটাদশেক মোমবাতি নিয়ে ফিরে এলাম। দরজাটা খোলাই রইল। ঘরের এদিক-ওদিক ছড়ানো ছিল চিনামাটির তৈরি কয়েকটা টুকটাক জিনিস, প্রত্যেকটার ওপর একটা করে মোমবাতি বসিয়ে জ্বালিয়ে দিলাম, তারপর সেগুলো ছড়িয়ে দিলাম ঘরের বিভিন্ন জায়গায় যেখানে অন্ধকার গভীর । কিছু রাখলাম মেঝের ওপর , কিছু জানালার ফাঁকে, সাতেরোটা মোমবাতির প্রত্যেকটাকেই এমনভাবে সাজালাম যাতে ঘরের প্রতিটি ইঞ্চিই কোনও না কোনও মোমবাতির থেকে আলোকিত হয়। এবার অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগল। মোমবাতিগুলোর পলতে টলতেগুলো মাঝে মধ্যে ঠিকঠাক করে দেওয়া আমার এখন সময় কাটানোর একটা খেলা হয়ে দাঁড়াল।
অত কিছু করা সত্ত্বেও, একটা অজানা আশঙ্কা মনের মধ্যে হানা দিয়ে যাচ্ছিল বার বার,যেন যে কোনো মুহূর্তেই ভয়ানক একটা কিছু ঘটে যাবে এখানে। মধ্যরাত্রির কিছু পরেই চোরাকুঠুরির মোমবাতিটা আচমকা নিভে গেল, আর মসীকৃষ্ণ ছায়া লাফিয়ে ফিয়ে এল তার জায়গায়। আমি মোমবাতিটা নিভতে দেখিনি। কেবল ঘুরে তাকিয়ে সেখানে অন্ধকার দেখতে পেলাম, যেন কেউ সচকিত হয়ে দেখল কোনো অপ্রত্যাশিত আগন্তুকের উপস্থিতি। “আরিব্বাস!” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, “জোর হাওয়া ছেড়েছে দেখছি!” টেবিল থেকে দেশলাইটা তুলে নিয়ে ধীরেসুস্থে এগিয়ে গেলাম সেদিকে, মোমবাতিটা জ্বালিয়ে দেব বলে। প্রথম কাঠিটা ধরাতে পারলাম না। যখন দ্বিতীয়টা জ্বালালাম, মনে হল সামনের দেয়াল থেকে কে যেন চোখ টিপল আমার দিকে তাকিয়ে। শক্ত হয়ে গেল আমার ঘাড়, কোনোক্রমে একান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও মুখ ঘোরালাম পিছন দিকে। আশ্চর্য, ফায়ারপ্লেসের সামনের টেবিলের মোমবাতি দুটোও নিভে গেছে! চকিত পায়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি। “অদ্ভুত ব্যাপার, ” আমি বললাম “আমি আবার ওগুলো নেভালাম কখন?”
ফিরে গিয়ে আবার তাদের একটাকে জ্বালালাম। যখন জ্বালাচ্ছিলাম, দেখতে পেলাম একটা আয়নার ডানদিকের মোমদানির একটা মোমবাতি মিটমিট করেই নিভে গেল আর প্রায় পরক্ষণেই তার পাশেরটাও নিভে গেল। এবার আর কোনও ভুল নেই। শিখাটা স্রেফ অদৃশ্য হয়ে গেল, যেন কেউ পলতেটাকে বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে চেপে ধরল, কোনও লালচে আভা হল না, ধোঁয়া ছাড়ল না, পলতেটা শুধু কালো হয়ে গেল। আমি হাঁ করে দেখছিলাম, আর তখনই , খাটের পাশের মোমবাতিটা নিভে গেল আর ছায়ারা যেন আমার দিকে আরেক পা এগিয়ে এল।
“এ হতে পারে না,” আমি বলে উঠলাম আর সঙ্গে সঙ্গেই ম্যান্টেলশেলফের প্রথম মোমবাতিটা আর তারপরেই তার পরেরটাও নিভে গেল।
“কী হচ্ছে কী এসব!” আমি কোনওক্রমে চেঁচিয়ে উঠলাম। গলাটা নিজের কানেই বিচিত্র শোনালো। তক্ষুনি ওয়ারড্রোবের মোমবাতিটা নিভে গেল আর চোরাকুঠুরির যে নিভে যাওয়া বাতিটা আমি আবার জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম, নিভে গেল সেটাও।
“দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা,” হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মত চেঁচিয়ে উঠে আমি দেশলাইটা খামচে ধরলাম, ম্যান্টেলশেলফের বাতিগুলো জ্বালাব বলে। আমার হাত এত কাঁপছিল যে প্রথম দুটো কাঠি দেশলাইবাক্সের গায়ে লাগাতেই পারলাম না। যখন ম্যান্টেলশেলফের বাতিগুলো জ্বালালাম, ঠিক সেই সময়েই ঘরের দু’প্রান্তের দুটো মোমবাতি নিভে গেল, তার জায়গায় ফিরে এল আঁধার। একটা দেশলাইকাঠি দিয়ে আয়না সংলগ্ন অপেক্ষাকৃত বড় মোমবাতিগুলো আবার জ্বালালাম, আর দরজার কাছে মেঝেতে যেগুলো ছিল ,জ্বালালাম সেগুলোও; মনে হল, বাতি জ্বলা-নেভার এই ভয়ঙ্কর খেলায় জিতে গেলাম আমিই, কিন্তু ঠিক তখনই এক ঝটকায় ঘরের বিভিন্ন প্রন্তের চারটে আলো একসঙ্গে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি শিহরিত হয়ে দ্রুত আরেকটা কাঠি ধরালাম, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে , বিবর্ণ মুখে দাঁড়িয়ে রইলাম, কী করব ভেবে না পেয়ে।
যখন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম , তখনই মনে হল যেন একটা অদৃশ্য হাত এসে এক ঝটকায় টেবিলের সমস্ত বাতিগুলো নিভিয়ে দিল। তীব্র আতঙ্কে চিৎকার করে আমি ছুটে গেলাম চোরাকুঠুরিতে, সেখান থেকে জানলায়। তিনটে মোমবাতি জ্বালালাম। সঙ্গে সঙ্গেই ফায়ারপ্লেসের সামনের দুটো মোমবাতি নিভে গেল। দেশলাইটা ঘরের কোণের লোহার বাক্সের দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আমি একটা বড় বাতিদান তুলে নিলাম, দেশলাই ধরানোর সময়টা বাঁচানোর জন্য । কিন্তু আমার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বাতিগুলো ক্রমাগত নিভে যাচ্ছিল, ফিরে আসছিল ছায়ারা, যাদের ভয় পাচ্ছিলাম আমি, যাদের বিরুদ্ধে আমি লড়ে যাচ্ছিলাম , গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছিল তারা, একবার এদিক থেকে, একবার ওদিক থেকে। থেকে থেকেই একটা ছায়া ফিরে আসছিল , মিনিটখানের জন্য নেচে বেড়াচ্ছিল , আবার কোথায় মিলিয়ে যাচ্ছিল। এগিয়ে আসা অন্ধকারের ভয়ে আমার আতঙ্ক তখন প্রায় চরম পর্যায়ে পৌছেছিল, আত্মবিশ্বাস সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি। আমি লাঁফাচ্ছিলাম, আমি হাঁফাচ্ছিলাম , আমি খ্যাপার মতো ছুটে যাচ্ছিলাম একটা মোমবাতি থেকে আরেকটার দিকে, এগিয়ে আসা ছায়াদের সঙ্গে একটা ব্যর্থ লড়াই করার জন্য।

টেবিলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আমার জানুতে কালশিটে পড়ে গেল, হোঁচট খেলাম চেয়ারের সঙ্গে , উল্টে গেল চেয়ার , উল্টে পড়লাম আমিও, টেবিলের চাদরটাকে জড়িয়ে। মোমবাতিটা হাত থেকে ছিটকে পড়ল আমার তক্ষুনি আরেকটা তুলে নিয়ে আমি উঠে দাঁড়ালাম। টেবিলের থেকে এটা তুলে নিতে যাওয়ার সময় আচমকা আমার গতিতে তৈরি হওয়া বাতাসে এটা নিভে গেল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই, শেষ দুটো বাতিও নিভে গেল!
কিন্তু আছে, ঘরে এখনও একটা আবছা আলো আছে, একটা রক্তিম আলো। যেটা অন্ধকারকে এখনও আমার কাছ থেকে ঠেকিয়ে রেখেছে। ফায়ারপ্লেস! হ্যাঁ এই আগুন থেকেই আমি মোমবাতি জ্বালিয়ে নিতে পারি।
আমি সেদিকে ফিরলাম, যেখানে জ্বলন্ত কাঠ আর কয়লার মাঝে আগুনের শিখাটা নাচছিল, লালচে আলোর প্রতিফলনগুলো ছড়িয়ে পড়ছিল আসবাবপত্রের ওপরে, সেদিকে দু’পা এগিয়ে যেতেই জ্বলন্ত শিখাটা ক্রমশ ছোট হতে হতে নিভে গেল , নিভে গেল ধিকধিক করে জ্বলতে থাকা আগুন, হারিয়ে গেল প্রতিফলনগুলো, আমার মোমবাতিটা সেখানে চেপে ধরতেই অন্ধকার গ্রাস করল আমাকে , আচ্ছন্ন করল আমার দৃষ্টি, যেন আমার চোখ অন্ধ হয়ে গেছে, আর চূরমার করে দিল আমার মস্তিস্কের যুক্তির শেষ টুকরোগুলোও। বাতিটা আমার হাত থেকে পড়ে গেল। একটা ব্যর্থ প্রচেষ্টায় আমি দু’হাত ছুঁড়লাম সেই অকল্পনীয় অন্ধকারকে দূরে ঠেলে দেওয়ার জন্য আর গলার স্বর সপ্তমে তুলে আমি সর্বশক্তিতে চেঁচিয়ে ঊঠলাম – একবার, দুবার, তিনবার। আর তখনই আমার মনে হল পালাতে হবে। ছুটে পালাতে হবে এখান থেকে।
আমি জানি, বাইরেই আছে সেই চন্দ্রালোকিত করিডর। তাই মাথা নিচু করে, দুহাতে মুখ ঢেকে আমি দরজার দিকে ছুটলাম।
কিন্তু আমি খেয়াল করতে পারিনি , যে দরজার অবস্থানটা ঠিক কোথায়। ফলে দৌড়তে গিয়ে খাটের কোনায় সজোরে ধাক্কা খেলাম। টলতে টলতে পিছিয়ে এলাম আমি, ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার এগোতে গিয়ে এবার ধাক্কা খেলাম আরও বড় কোনও জিনিসের সঙ্গে । আমার আবছা মনে আছে, আমি এভাবে বারংবার আঘাত পাচ্ছিলাম, সেই নিকষ কালো অন্ধকারে চলছিল একটা অন্ধ লড়াই, আমি পাগলের মত চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে একদিক থেকে অন্য দিকে ছুটে যাচ্ছিলাম, অবশেষে কপালে এক ভয়ঙ্কত আঘাত ,পতনের এক ভয়াবহ অনুভুতি যা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে থাকবে, উঠে দাঁড়ানোর মরিয়া প্রচেষ্টা , তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।
দিনের আলোয় চোখ মেললাম আমি। আমার মাথায় একটা হালকা ব্যান্ডেজ বাঁধা। রোগাভোগা শুকনো চেহারার মানুষটা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার মুখের দিকে উদগ্রীব হয়ে আছে। আমি নিজেকে দেখলাম, কী ঘটেছিল মনে করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুই মনে পড়ল না। চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলাম ঘরের কোনে সেই বৃদ্ধা, ছোট একটা শিশি থেকে একটা গ্লাসে কয়েক ফোঁটা ওষুধ ঢালছে, এখন আর তাকে রাতের মত রহস্যময় লাগছিল না।

“আমি কোথায়?”আমি জিজ্ঞসা করলাম,” মনে হচ্ছে আপনাদের আগে দেখেছি, কিন্তু কোথায় দেখেছি ঠিকঠাক মনে করতে পারছি না।”
তখন তারা আমাকে বলল সেই ভয়ঙ্কর লাল কামরার কথা। “আমরা তোমাকে ভোরবেলা উদ্ধার করেছি” রোগাভোগা মানুষটা বলল, “তোমার কপালে আর ঠোঁটে রক্ত মাখা ছিল।”
খুব ধীরে ধীরে রাতের অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ছিল আমার। “তুমি নিশ্চয়ই এখন স্বীকার করবে, ঐ ঘরটা ভূতুড়ে?” রোগাভোগা মানুষটা বলল। সে এখন আর আমার সঙ্গে রুক্ষভাবে কথা বলছিল না , বরং তার কথায় ফুটে ঊঠেছিল সহমর্মিতার ছাপ, যেন কোনও ভেঙে পড়া বন্ধুকে সান্ত্বনা দিচ্ছে।
“হ্যাঁ,” আমি বললাম ”ঘরটা ভূতুড়ে।”
“তাহলে তুমি ভূত দেখেছ। আর আমরা ,যারা সারাটা জীবন এখানেই কাটিয়ে দিলাম , আমরা তো কখনোই ওখানে রাতে পা দেওয়ার সাহস পর্যন্ত পাইনা। এখন বলো এটা কি সত্যিই বৃদ্ধ আর্লের আত্মা, যিনি—“
“না, ” আমি বললাম, “সে সব কিছু নয়। ”
“আমি বলছি,” গ্লাস হাতে বৃদ্ধা মহিলাটি বলল, “এটা সেই দুঃখি তরুণী কাউন্টেস যিনি ভয় পেয়ে—”
“না, তাও নয়,” আমি বললাম, “ওখানে কোনো আর্ল বা কাউন্টেসের ভূত নেই, ওখানে কোনও ভূতই নেই- কিন্তু যা আছে তা ভয়ঙ্কর, আরো ভয়ঙ্কর–”
“তার মানে?” তারা জিজ্ঞাসা করল।
“সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জিনিস যা সাধারণ মানুষকে সারাক্ষণ তাড়া করে ফেরে,” আমি বললাম, “আর তা হল – ভয়! আতঙ্ক ! যার কোনও আলো নেই, শব্দ নেই, যা কোনও যুক্তির ধার ধারে না, যা মানুষকে বধির করে ফেলে, অন্ধকারে ঢেকে ফেলে, অসহায় করে ফেলে! এটা করিডর থেকে আমার পিছু নিয়েছিল, এটাই লাল কামরায় আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল-”
আমি আচমকা থামলাম! হাঁফাচ্ছিলাম। হাতটা উঠে এসেছিল কপালে ব্যান্ডেজের ওপর। সবাই স্তব্ধ হয়ে ছিল।
তারপর ঘোলাটে চশমা পরা বুড়ো মানুষটা বলল, “আমি জানতাম। এটা সেটাই। এটা তাহলে সেটাই। সেই অন্ধকারের শক্তি। এই অন্ধকারের শক্তি ওখানে লুকিয়ে আছে। দিনের বেলা এটা লুকিয়ে থাকে যবনিকার অন্তরালে। সন্ধে হলেই এটা ছড়িয়ে পড়ে করিডোরে, গুঁড়ি মেরে থাকে, তোমার পিছু নেয়। এমনভাবে , যাতে তোমার ঘাড় ঘোরানোর সাহসটাও না থাকে। ভয় আছে ঐ ঘরে। কুৎসিত কালো ভয়, আর থাকবেও – যতদিন পর্যন্ত এই প্রাসাদে পাপ থাকবে। ”
ছবিঃ শিমুল
অমিত দেবনাথের আরো গল্প- ওরা, অতলের ইশারা মূল-আর্থার কোনান ডয়েল, আসল নকল-বিল প্রনজিনি, নয় মাইল হাঁটা হ্যারি কেমেলম্যান, দখল ফিলিপ কে ডিক, ফাদার ম্যাকক্লেসফিল্ডের কাহিনি -রবার্ট হিউ বেনসন, ভয়ানক এক রাতের গল্প কোনান ডয়েল–নাইট অ্যামং দ্য নিহিলিস্ট, আগে আমার কথা শোন জন ম্যাকলে, একটা লোকে্র গল্প ডাবলিউ ডাবলিউ জ্যকব্স্, আর কিছুক্ষণ ডব্লিউ এফ হার্ভে-আগস্ট হিট, পোড়া বাড়ি ভিনসেন্ট ও’সুলিভান, সাইন অব ৪০০রয় ম্যাকার্ডেল, এক সন্ধ্যায় শার্লক হোমসের সঙ্গে জেমস ম্যাথিউ ব্যারি।, জোর বরাত-শিয়ার্লাকস্ট্যানলি জ্যাক রুবিনস্টাইন, কাপড়-মেলা দড়ির রহস্য ক্যারোলিন ওয়েলস , সুমাত্রার দানব ইঁদুর, শার্লক হোমস ও ড্রুড রহস্য, এডমণ্ড লেস্টার পিয়ার্সন, হারানো হিরের রহস্য জর্জ এফ ফরেস্ট, কথোপকথন- আর্থার চ্যাপম্যান, বিড়ম্বিত মধুচন্দ্রিমা, হ্যালোউইন ম্যান, শুভ জন্মদিন, গুবরে পোকা শিকারী
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস