গল্প- গুবরে পোকা শিকারী-কোনান ডয়েল-অনু অমিত দেবনাথ। জয়ঢাক৪৯-বর্ষা ২০১৫

galpoamitonubad01

এই যে আমি, ডা. হ্যামিলটন, ডাক্তারিতে দেশজোড়া খ্যাতি আমার। কিন্তু মশাইরা, আপনারা জানেন কি, আজ আমার এত পসার, এত নামডাকের পেছনে লুকিয়ে আছে এক দারুণ অভিজ্ঞতা, নিদারুণও বলতে পারেন। ঘটনাটা এতই কৌতুহলজনক এবং বিস্ময়কর যে, কোনও লোকের ক্ষেত্রে এরকম ঘটনা দুবার ঘটবে বলে মনে হয় না। সেই ঘটনাই আজ আপনাদের শোনাব, বিশ্বাস করা না করা আপনাদের অভিরুচি।

তখন সদ্য ডাক্তারি পাশ করে বেরিয়েছি, প্র্যাকটিশ তখনও শুরু করিনি, থাকতাম গোয়ার স্ট্রিটের এক ভাড়া বাড়িতে। এখন অবশ্য সে রাস্তার নাম পালটে গেছে। মেট্রোপলিটন স্টেশন থেকে নেমে বাঁ হাতে তখনকার রাস্তায় ওইরকম খিলান দেওয়া জানালাওলা বাড়ি একটাই ছিল। তিনজন ডাক্তার আর একজন ইংজিনিয়ারিং-এর ছাত্র তখন ভাড়া থাকত ওই বাড়িতে। মার্চিনসন নামের এক বিধবা মহিলা ছিলেন ওই বাড়ির মালকিন। সবচেয়ে সস্তা হবে বলে আমি ছাদের ঘরটায় থাকতাম। তখন আমার জমানো পুঁজি ছিল খুব সামান্যই, আর প্রতি সপ্তাহেই দ্রুত কমে আসছিল তা। প্রতিদিনই টের পাচ্ছিলাম যে বসে না থেকে কিছু একটা করা দরকার। আসলে তখনও পর্যন্ত আমার সাধারণ ডাক্তারি প্র্যাকটিশ করার ইচ্ছে ছিল না, কারণ বিজ্ঞান ছিল আমার প্রিয় বিষয়, বিশেষ করে প্রাণীবিদ্যার ওপর ঝোঁকটা ছিল আমার বরাবরই বেশি। যাই হোক, যখন আরও পড়াশোনার ব্যাপারে হাল প্রায় ছেড়ে দিয়ে সেই চিরাচরিত ডাক্তারির একঘেঁয়ে উঞ্ছবৃত্তিই বেছে নিতে চলেছিলাম, সে সময়েই এমন একটা অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটল, যা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।

একদিন সকালে খবরের কাগজটার ওপর চোখ বোলাচ্ছিলাম। যথারীতি সেই বস্তাপচা রাজনীতির একঘেয়ে খবর পড়ে বিরক্ত কাগজটা ছুঁড়ে ফেলে দিতে যাচ্ছি, সেই সময় ব্যাক্তিগত কলামে একটা বিজ্ঞাপনের ওপর চোখ পড়ে গেল। বিজ্ঞাপনটা অনেকটা এই রকম-

“এক বা তার বেশিদিনের জন্য একজন ডাক্তার চাই। আবেদনকারীকে চমৎকার স্বাস্থ্য, কঠিন স্নায়ু এবং দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী হতে হবে। কীটপতঙ্গের ওপর জ্ঞান থাকা আবশ্যক। গুবরে পোকা সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ হলে অগ্রাধিকার। আবেদনকারী নিজে, আজ দুপুর বারোটার মধ্যে ৭৭বি, ব্রুক স্ট্রিটে এসে দেখা করুন।”

বন্ধুগণ, আগেই বলেছি যে প্রাণীবিদ্যা আমার প্রিয় বিষয় এবং প্রাণীবিদ্যার বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে গুবরে পোকা সম্পর্কে জ্ঞান ছিল আমার সবচেয়ে বেশি। বেশ কিছু লোক আছে যারা প্রজাপতি সংগ্রহ করে। কিন্তু অনেকেই জানেনা যে কীটপতঙ্গের মধ্যে গুবরে পোকার বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি। সে কারণেই গুবরে পোকা আমাকে অনেক বেশি আকর্ষণ করত এবং আমি প্রায় শ-খানেক গুবরে পোকার একটা সংগ্রহও গড়ে তুলেছিলাম। আমি জানতাম, স্নায়ুর ওপর আমার যথেষ্ট দখল আছে আর ডাক্তারি পড়ার সময় শটপাটে আমি ইন্টার কলেজ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। পরিষ্কার ব্যাপার এই, যে আবেদন করার পক্ষে আমার যথেষ্ট যোগ্যতা আছে। সুতরাং বিজ্ঞাপনটা পড়ার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই একটা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে আমি ব্রুক স্ট্রিটের দিকে রওনা হলাম।

     যেতে যেতে এই অদ্ভুত বিজ্ঞাপনটার মানে বোঝার চেষ্টা করছিলাম। চমৎকার স্বাস্থ্য, কঠিন স্নায়ু, দৃঢ় সংকল্প, ডাক্তারি, আবার গুবরে পোকা সম্পর্কে জ্ঞান-এসবের মধ্যে যোগসূত্রটা কোথায়? তার ওপরে আবার কাজটা পাকা নয়, যে কোনও দিনই চাকরি নাকচ হয়ে যেতে পারে। যতই ভাবছিলাম, ততই যেন সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ভাবাই ছেড়ে দিলাম, কারণ তখন আমার যা অবস্থা, তাতে আমার আর হারাবার কিছু ছিল না, পয়সাকড়ি প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল বললেই চলে, কাজেই আমি যে কোনও কাজই করতে রাজি ছিলাম, যাতে সৎভাবে দুটো পয়সা রোজগার করা যায়। আমার অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই জুয়াড়ির মতো, যার পকেটে একটা ফুটো পয়সাও নেই, তাও এটা সেটা বাঁধা রেখে জুয়া খেলে ভাগ্য ফেরানোর চেষ্টা করছে!

     ৭৭বি, ব্রুক স্ট্রিটের বাড়িটা বেশ পুরনো, কমসে কম পঞ্চম জর্জের আমলে তৈরি বলেই মনে হয়, বিবর্ণ, মলিন, প্রথম দর্শনে তেমন নজরকাড়া নয়। গাড়ি থেকে নামতেই দরজা খুলে বেরিয়ে এল একজন যুবক, ব্যাজার মুখে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে আমার দিকে এমন বিচ্ছিরি আর কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকাল যে আমার মনটা বেশ খুশি খুশি হয়ে উঠল। হাঁ বন্ধুগণ, বেশ খুশি খুশি হয়ে উঠল! কারণটা আর কিছুই নয়, ছোকরার হাবভাবে মনে হচ্ছিল যে ও-ও একজন আবেদনকারী এবং ইনটারভিউতে বিশেষ সুবিধে করতে পারেনি। অতএব আমার এখনও সুযোগ আছে। সুতরাং বেশ আশা নিয়েই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে দরজায় জোরে কড়া নাড়লাম।

     একজন চাপরাশি এসে দরজা খুলে দিল। তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল বাড়ির মালিক অত্যন্ত সচ্ছল এবং শৌখিন।

     “বলুন স্যার, কাকে চাইছেন?”

     “আমি একটা ইন্টারভিউয়ের ব্যাপারে-”

     “হ্যাঁ, হ্যাঁ, আসুন স্যার,” চাপরাশিটি বলল, “লর্ড লিনচমেয়ার আপনার জন্য লাইব্রেরি রুমে অপেক্ষা করছেন।”

লর্ড লিনচমেয়ার! নাম যেন শুনেছি শুনেছি মনে হল, কিন্তু কোথায় শুনেছি সেই মুহূর্তে মনে করতে পারলাম না। যাই হোক, চাপরাশির পেছন পেছন লাইব্রেরি রুমে উপস্থিত হলাম। বইবোঝাই বিরাট ঘরের একপাশে একটা লেখার টেবিলের পেছনে একজন ছোটখাটো চেহারার মানুষ বসে ছিলেন। প্রশান্ত মুখ, দাড়িগোঁফ পরিষ্কার করে কামানো, ধুসর লম্বা চুলের গোছা ব্যাকব্রাশ করা। আমার নাম লেখা কার্ডটা চাপরাশি তাঁর হাতে দিতে, তিনি সেটা ডানহাতে ধরে আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর, তাঁর মুখে এমন একটা হাসি ফুটে উঠল যে আমার মনে হল যেভাবেই হোক, প্রথম ধাপটা বোধহয় উতরে গেলাম।

“ডা. হ্যামিলটন, আপনি তো আমার কাগজে দেওয়া বিজ্ঞাপনটা দেখেই আসছেন?” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।

“হ্যা, স্যার।”

“আপনার কি মনে হয়, আমারা যেসব যোগ্যতা চেয়েছি সেগুলো আপনার আছে?”

“আমার মনে হয়, আছে।”

“আপনি অবশ্য বেশ শক্তিশালী লোক, সেটা আপনাকে দেখেই বুঝতে পারছি।”

“আমার গায়ে বেশ জোর আছে বলেই আমার ধারণা।”

“দৃঢ়তা?”

“যথেষ্ট।”

“আপনি কি জানেন, আপনি যে কাজে এসেছেন, তাতে বিপদের সম্ভাবনা আছে?”

“না, তা জানি না।”

“অথচ আপনার মনে হচ্ছে সে সময়ে আপনি মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারবেন?”

“আমার বিশ্বাস আমি পারব।”

 “ঠিক আছে, আমারও মনে হচ্ছে, আপনি পারবেন। আমার দেখে ভাল লাগল যে আপনি কাজটা সম্পর্কে কিছু না জেনেও সবজান্তা ভাব দেখাননি। আমার ধারণা, আপনিই সেই লোক, যাঁকে আমি খুঁজছি। তাহলে এবার আমরা পরের কথায় যেতে পারি।”

“পরের কথা?”

“গুবরে পোকা সম্বন্ধে আপনি কতদূর কী জানেন, বলুন তো?”

গুবরে পোকা! ঠাট্টা করছে নাকি লোকটা? সোজা তাকালাম তাঁর মুখের দিকে, দেখলাম তিনি টেবিলের উপর ঝুঁকে পড়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।

“আমার মনে হচ্ছে, এ ব্যাপারে আপনি কিছুই জানেন না!” তিনি বলে উঠলেন।

“আপনাকে আমি একটা কথাই বলতে পারি যে বিজ্ঞানের এই শাখাটায়, আমার ধারণা, আমি সত্যিই কিছু খোঁজখবর রাখি।”

“আমি শুনতে আগ্রহী। আপনি বলুন, কী কী জানেন?”

আমি বললাম। গুবরে পোকা সমন্ধে বিশদ বিবরণে না গিয়ে, এদের স্বভাব, এদের বিভিন্ন প্রজাতি ইত্যাদি সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা দিলাম, আমার যে ছোট সংগ্রহটা আছে এবং গুবরে পোকা নিয়ে আমার লেখা একটা প্রবন্ধ যে কীটপতঙ্গ সম্বন্ধীয় জার্নালে বেরিয়েছে, তাও জানালাম।

“বাঃ, চমৎকার!” চেঁচিয়ে উঠলেন লর্ড লিনচমেয়ার, “আপনার নিজস্ব সংগ্রহশালাও আছে!” তাঁর চোখ দুটো আনন্দে নেচে উঠল। “আপনি নিশ্চিতভাবেই সেই লোক যাঁকে আমি খুঁজছি! আপনাকে দিয়েই আমার কাজ হবে, এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। আমি জানতাম এত বড় লন্ডন শহরে এরকম একজন লোক থাকবে না এটা হতে পারে না, তবে তাঁকে খুঁজে বার করাই মুশকিল। আপনাকে যে পেয়েছি, এতে আমি নিজেই নিজেকে সত্যিই ভাগ্যবান মনে করছি।”

তিনি ঘণ্টা বাজিয়ে চাপরাশিকে ডাকলেন।

galpoamitonubad02

“লেডি রোজিস্টারকে এখানে নিয়ে এসো,” তিনি বললেন এবং একটু পরেই ঘরে প্রবেশ করলেন লেডি রোজিস্টার। ছোটখাটো চেহারার মাঝবয়সি মহিলা, লর্ড লিনচমেয়ারের সঙ্গে চেহারার সাদৃশ্য আছে। চুলের রঙ ও তেমনই কালচে-ধূসর রঙের। লর্ড লিনচমেয়ারের মুখে যে একটা উদ্বেগের ছাপ লক্ষ করছিলাম, দেখলাম, এই মহিলার মুখেও সেই রকম উদ্বেগের ছাপ, এ ছাপ বরং আরও গভীর। মনে হল, কোনও কারণে মহিলা খুব সন্ত্রস্ত হয়ে রয়েছেন। লর্ড লিনচমেয়ার আমার সঙ্গে তাঁর আলাপ করিয়ে দেওয়ার সময় যখন তিনি ঘুরে পূর্ণদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন, আমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলাম। তাঁর কপালে ডান ভুরুর ওপরে প্রায় দু-ইঞ্চি লম্বা একটা দাগ শুকিয়ে এসেছে। একটা প্লাস্টার দিয়ে ক্ষতটা ঢাকা দেওয়া, কিন্তু আমি নিশ্চিত যে ক্ষতটা বেশ গভীর এবং খুব বেশি আগে ওটা ঘটেনি।

“ইভলিন, আমাদের পরম সৌভাগ্য যে ডা.হ্যামিলটনকে আমাদের মধ্যে পেয়েছি, আমাদের কাজের পক্ষে উনি একেবারে যোগ্য ব্যাক্তি,” লর্ড লিনচমেয়ার বললেন, “উনি একজন গুবরে পোকা বিশেষজ্ঞ ও সংগ্রাহক এবং এ সমন্ধে ওঁর লেখা প্রবন্ধও বিভিন্ন জার্নালে বেরিয়েছে।”

“ওমা, তাই নাকি?” লেডি রোজিস্টার বললেন, “তাহলে আপনি নিশ্চয়ই আমার স্বামীর নাম শুনেছেন। গুবরে পোকা সম্বন্ধে যাঁদেরই আগ্রহ আছে, তাঁরা সবাই নিশ্চয়ই স্যার টমাস রোজিস্টারের নাম শুনবেন।”

অ্যাই! এই প্রথমবারের জন্য আমি এই অদ্ভুত ঘটনাগুলোর মধ্যে একটা ক্ষীণ আলোর রেখা দেখতে পেলাম। এতক্ষণে, এঁদের সঙ্গে গুবরে পোকার একটা যোগসূত্র পাওয়া গেল। স্যার টমাস রোজিস্টার এ বিষয়ে বিশ্বে সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ব্যাক্তি। তিনি সারাজীবন এদের নিয়ে গবেষণা করেই কাটিয়েছেন এবং এ বিষয়ে তাঁর বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রবন্ধও বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। আমি বললাম যে আমি শুধু তাঁর নামই শুনিনি, তাঁর বহু লেখাও পড়েছি এবং মুগ্ধ হয়েছি।

লেডি বললেন, “আমার স্বামীর সঙ্গে আপনার আলাপ আছে?”

 “আজ্ঞে না।”

“এবারে করবেন,” লর্ড লিনচমেয়ার বেশ জোরের সঙ্গেই কথাটা বললেন।

ডেস্কের পাশে, লর্ড লিনচমেয়ারের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিলেন লেডি রোজিস্টার। তাদের মুখের এত মিল যে আমি নিশ্চিত হলাম তাঁরা নিশ্চয়ই ভাইবোন।

“চার্লি, তাহলে তুমি সত্যিই কাজটা করতে যাচ্ছ? তুমি হয়ত ভালোর জন্যই করছ, কিন্তু আমার খুব ভয় করছে।” লেডির গলাটা কেঁপে কেঁপে উঠছিল অজানা আশঙ্কায় এবং লর্ড লিনচমেয়ার যখন কথা বললেন, তাঁর গলাও কেঁপে উঠল, যদিও তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন নিজেকে সংযত রাখার।

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেছে, কোনও ভয় নেই, আর, আর-এছাড়া তো অন্য কোনও রাস্তাও নেই।”

“কিন্তু উপায় তো আছেই।”

“না না, ইভলিন, কোনোমতেই তোমার কোনও ক্ষতি আমি হতে দেব না- কিছুতেই না। সব ঠিক হয়ে যাবে, আর এটা ঈশ্বরের আশীর্বাদ ছাড়া আর কিছুই না যে, এই ভদ্রলোককে আমারা আমাদের মধ্যে পেয়েছি।”

আমি তাঁদের কথাবার্তার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে না পেরে বোকার মতো দাঁড়িয়েছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল, আমি যে তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, সেটা বোধহয় এঁরা ভুলেই গেছেন। কিন্তু সেই মুহূর্তেই লর্ড লিনচমেয়ার সচেতন হয়ে উঠলেন আমার সম্পর্কে এবং আমার দিকে তাকালেন।

“কাজের কথায় আসা যাক, ডা. হ্যামিলটন। আমি চাই, আপনি এখন থেকে সম্পূর্ণ আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবেন। আপনাকে আমার সঙ্গে এক জায়গায় যেতে হবে এবং সব সময়ে আমার সঙ্গে থাকবেন। আর আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে আমি এখন থেকে যা বলব, আপনি ত্ৎক্ষণাৎ তাই করবেন, সে আপনার কাছে যতই অর্থহীঊন মনে হোক না কেন।”

“আপনি সে ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন,” আমি বললাম।

“দুর্ভাগ্যবশত, আমি এখন এর চেয়ে বেশি কিছু আপনাকে বলতে পারছি না কারণ আমি নিজেই জানিনা কী ঘটতে চলেছে। তবে একটা ব্যাপার আমি বলতে পারি যে আমি আপনাকে এমন কিছু করতে বলব না যা আপনার বিবেকে বাধবে এবং আপনাকে আরো একটা কথা বলতে চাই যে যদি সবকিছু ঠিকঠাক শেষ হয় তবে এ কাজের সঙ্গে থাকবার জন্য আপনি গর্ববোধ করবেন।”

 “যদি সবকিছু ঠিকঠাক শেষ হয়,” লেডি বললেন।

 “ইয়ে, আমি কোন পারিশ্রমিক পাবো কি?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

“দিনে কুড়ি পাউন্ড।”

আমার চমকানিটা লর্ড লিনচমেয়ার লক্ষ করেছিলেন, মৃদু হেসে তিনি বললেন, “বিজ্ঞাপনটা পড়ে যেমন আশ্চর্য হয়েছিলেন, আমরাও আপনাকে পেয়ে তেমনি অবাক হয়েছি, কারণ এতগুলো বিভিন্ন ধরণের বৈশিষ্ট্য একজন মানুষের মধ্যে পাওয়ার ঘটনাও খুবই বিরল। সে কারণেই আপনার পারিশ্রমিকটাও উপযুক্ত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। গোপন করে লাভ নেই, আপনার কাজটা বেশ কষ্টকর। এমনকি বিপজ্জনকও হতে পারে। তবে এটুকু আপনাকে বলতে পারি, পুরো ব্যাপারটা বোধ হয় একদিন কি দুদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। অন্তত সেরকম সম্ভাবনা আছে।”

“ওঃ ভগবান!” অস্ফুট স্বরে বলে উঠলেন লেডি রোজিস্টার।

“তা হলে ডঃ হ্যামিলটন, আপনার ওপর আমি সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে পারি তো?”

“সম্পূর্ণভাবে,” আমি বললাম, “শুধু বলুন, আমাকে কী করতে হবে।”

“আপনার প্রথম কাজ হল এখনই বাড়ি ফিরে যাওয়া। দিনকয়েক বাইরে যাবার জন্য গোছগাছ করে তৈরি হয়ে নিন। আজ বিকেল ৩টে ৪০ মিনিটে প্যাডিংটন স্টেশন থেকে আমরা যাত্রা শুরু করব।”

“অনেক দূরের পথ?”

“প্যাংবোরন পর্যন্ত ট্রেনে যেতে হবে। আমি টিকিট কেটে রাখব।তাহলে এখন গুডবাই ড: হ্যামিলটন। আর হ্যাঁ, দুটো জিনিস যদি আপনি সঙ্গে নিয়ে আসতে পারেন তাহলে বড়ই বাধিত হব। একটা হচ্ছে আপনার সংগ্রহের কিছু গুবরে পোকা, আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে একটা লাঠি। লাঠিটা বেশ বড়ো আর মোটাসোটা হলে ভালো হয়।”

বন্ধুগণ, বুঝতেই পারছেন, ব্রুক স্ট্রিট থেকে বাড়ি ফিরে আবার প্যাডিংটন স্টেশনে লর্ড লিনচমেয়ারের সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত অজস্র হাবিজাবি চিন্তা মাথায় ঘুরতে লাগল। পুরো ব্যাপারটাই এমন অবাস্তব মনে হচ্ছিল যে ভেবে কোনও কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না। চিন্তা করে প্রত্যেকবারই একেকটা নতুন নতুন কারণ খুঁজে বের করছিলাম, আর প্রত্যেকটা আগের চেয়ে এমন উদ্ভট ঠেকছিল যে শেষ পর্যন্ত ভাবাই ছেড়ে দিলাম। দরকারি জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে নিলাম একটা ছোট ব্যাগে, গুবরে পোকা সংগ্রহের একটা বাক্স নিলাম, আর নিলাম শক্তপোক্ত একটা বেতের ছড়ি। ঠিক সময়েই পৌঁছে গেলাম প্যাডিংটন স্টেশনে। প্রায় তখনই পৌঁছে গেলেন লর্ড লিচেনমেয়ার। আমি যতটা ভেবেছিলাম, তাঁকে তার চেয়েও ছোটখাটো লাগছিল—আরো দুর্বল, আরো ফ্যাকাশে, সকালের চেয়েও আরো অনেক বেশি সন্ত্রস্ত মনে হচ্ছিল তাঁকে। একটা লম্বা, পুরু ওভারকোট পরেছিলেন তিনি এবং আমি লক্ষ করলাম তাঁর হাতে একটা কালো রঙের মোটা লাঠি। সেটা এতই মোটা যে লাঠি না বলে লগুড় বললেই ভালো হয়।

“টিকিট কিনে এনেছি। চলুন যাওয়া যাক,” বলে তিনি প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।

“এই আমাদের ট্রেন। আমি একটা গোটা কামরাই রিজার্ভ করে নিয়েছি। কারণ যেতে যেতে আপনাকে দু একটা কথা বলবার প্রয়োজন মনে করছি।”

বন্ধুগণ, সারা সারা রাস্তা তিনি যা বলতে বলতে গেলেন তা হল এই যে, আমি তাঁর রক্ষক হিসেবে যাচ্ছি, আমি যেন তাঁকে সাহায্য করি এবং আমি যেন কোন অবস্থাতেই তাঁকে ছেড়ে এক মুহূর্তের জন্যও কোথাও না যাই। গোটা রাস্তায় এই কথাগুলিই তিনি ঘুরিয়েফিরিয়ে বারবার বলতে লাগলেন এবং আমি দেখতে পেলাম, কথাগুলো বলতে গিয়ে তিনি কেঁপে কেঁপে উঠছেন।

শেষ পর্যন্ত, আমার বিস্মিত দৃষ্টির সামনে আমি কিছু বলবার আগেই তিনি বলতে বাধ্য হলেন, “হ্যাঁ ড: হ্যামিলটন, আমি ভয় পাচ্ছি। আমি বরাবরই ভিতু মানুষ, দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে আমার সাহস আরও কম। কিন্তু মনের জোর আমার যথেষ্টই আছে, বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে আমি ভয় পাইনা। অনেক শক্তিশালী মানুষের চেয়েও আমার মনের জোর বেশি। আজ আমি যা করতে চলেছি, সেটা বাধ্য হয়ে নয়, পুরোপুরি দায়িত্ববোধ থেকে, যদিও নিঃসন্দেহে কাজটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এ কাজে যদি ব্যর্থ হই তাহলেও জানব যে একটা মহৎ কাজ করতে গিয়ে আমার মৃত্যু ঘটল।”

এই প্রহেলিকা, হেঁয়ালিভরা কথাবার্তা শুনতে শুনতে আমার মনে হল, আমার কিছু বলা দরকার।

“স্যার, আমার মনে হয় আপনি আমার ওপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখলে ভালো করবেন,” আমি বললাম, “আমাদের কাজটা কী, এমন কি আমরা কোথায় যাচ্ছি সে সম্বন্ধে কিছু না জানলে আমার পক্ষে সবকিছু ঠিকঠাক করা সম্ভব নয়।”

“হ্যাঁ নিশ্চয়, নিশ্চয়, আমরা কোথায় যাচ্ছি এটা বলতে আর আপত্তি কোথায়?” তিনি বললেন, “আমরা যাচ্ছি ডেলামেয়ার কোর্টে, স্যার টমাস রোজিস্টারের বাড়িতে, যাঁর নাম আর কাজের সঙ্গে আপনি পরিচিত। এ যাত্রা আমাদের কোন লাভ হবে কি না বলতে পারছি না, যদিও আপনার ওপর আমার পুরোপুরি আস্থা আছে। আপনাকে গোপন করে লাভ নেই, আমরা অভিনয় করছি। হ্যাঁ ড: হ্যামিলটন, ‘আমরা’ মানে আমি আর আমার বোন, লেডি রোজিস্টার, কারণ এর সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্মান জড়িত। আমি চাই, যেভাবেই হোক পারিবারিক কেচ্ছা কেলেংকারিকে রুখতে হবে। এর চেয়ে বেশি কিছু এখনই আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়, আর এক্ষুণি তার কোন প্রয়োজনও নেই। আপনাকে সব খুলে বললে এখন বরং উলটো ফল হতে পারে। সবচেয়ে ভালো যেটা হবে তা হল আপনার সক্রিয় সহযোগিতা, যেটার প্রয়োজন আমার সবচেয়ে বেশি। আমি আপনাকে ঠিক ঠিক সময়ে বলে দেব কখন কী করতে হবে।”

এর পরে আর কোনও কথা চলে না। তার ওপর আবার দিনে কুড়ি পাউন্ড পারিশ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে। তবুও আমার মনে হচ্ছিল, লর্ড লিনচমেয়ার খুব বাজে ব্যবহার করছেন আমার সঙ্গে। তাঁর ইচ্ছে, তাঁর হাতের ওই মোটা লাঠিটার মতই আমাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। যাই হোক, তাঁর মেজাজ দেখে মনে হচ্ছিল যে এই ঘটনাটা, সেটা যা-ই হোক না কেন, তাঁর কাছে বড়োই চিন্তার বিষয় এবং আরেকটা ব্যাপারও আমার মনে হচ্ছিল যে যতক্ষণ অন্য কোনও কিছু না ঘটছে ততক্ষণ তিনি পুরোপুরি  আমার ওপর ভরসা করতে পারছেন না। এ রহস্যের সমাধানের জন্য চোখ আর কানের ওপর ভরসা রাখতে হবে, তবে এটুকু আত্মবিশ্বাস আমার ছিল যে তাঁরা যে আমার ওপর ভরসা করছেন তা বিফলে যেতে দেব না।

প্যাংবোরন স্টেশন থেকে ডেলামেয়ার কোর্ট প্রায় মাইল পাঁচেকের পথ। এই রাস্তাটুকু আমরা একটা খোলা গাড়িতে চেপে গেলাম। গোটা রাস্তাটাই লর্ড লিনচমেয়ার চুপ করে রইলেন। মনে হচ্ছিল তিনি গভীরভাবে কিছু একটা চিন্তা করছেন। যখন আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি, তখন তিনি হঠাৎ এমন একটা কথা বললেন, যা আমাকে সত্যিই অবাক করল, “ আপনি কি জানেন ডঃ হ্যামিলটন যে আমিও আপনার মতন একজন ডাক্তার?”

“বলেন কী? আমি তো জানতাম না!”

“আমার তরুণ বয়সে আমি ডাক্তারি পাশ করি। আমি কখনো প্র্যাকটিশ করিনি বটে, কিন্তু শিক্ষাটা নিয়ে রেখেছিলাম। ডাক্তারি পড়ার সেই দিনগুলোর কথা আমি এখনো ভুলতে পারি না। এই যে ডেলামেয়ার কোর্ট এসে গেছে।”

গেটের দুপাশে দুটো পিলারের মাঝখান দিয়ে ছায়াঢাকা পথ ঢুকে গেছে প্রাসাদের বুকে, লরেল আর রডোডেনড্রন ঝোপের ফাঁক দিয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম, প্রাসাদের আইভিলতায় ছাওয়া পুরোনো ইটের তৈরি ত্রিকোণাকৃতি ছাদের কানাগুলোকে। সম্ভ্রমের সঙ্গে তাকিয়ে ছিলাম এই বিরাট, চমৎকার প্রাসাদের বিভিন্ন অংশগুলোর দিকে, এমন সময় আমার সঙ্গী উত্তেজিতভাবে আমার হাত খামচে ধরলেন।

“ওই আসছেন টমাস,” চাপা গলায় বললেন তিনি, “গুবরে পোকা সম্বন্ধে যা জানেন বলবেন।”

galpoamitonubad03

লম্বা, রোগা চেহারার এক ব্যক্তি লরেল ঝোপের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এলেন। দস্তানা পরা হাতে একটা খুরপি। বড়োসড়ো কানাওয়ালা টুপিতে তাঁর মুখটা ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না বটে, তবে মুখভর্তি এলোমেলো দাড়ি আর একেবারেই সাদামাঠা চালচলনে বোঝা যাচ্ছিল যে ভদ্রলোকের জীবনযাত্রা খুবই সাধারণ। গাড়ি থামতেই লর্ড লিনচমেয়ার লাফ দিয়ে নামলেন।

“টমাস, কেমন আছো?” খুব আন্তরিকভাবেই জিজ্ঞাসা করলেন তিনি।

কিন্তু স্যার টমাস কোন উত্তর না দিয়ে তাঁর শ্যালকের কাঁধের ফাঁক দিয়ে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে, আর আমি অস্পষ্টভাবে শুনতে পেলাম তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা টুকরো টুকরো কথার ফুলকি, “হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে, ঠিক আছে—এটা কে এসেছে সঙ্গে—আস্ত উজবুকের মত চেহারা—যত্তসব ফালতু ঝামেলা—” শেষে লর্ড লিনচমেয়ার তাঁকে ফিসফিস করে কী বললেন, তারপর তাঁরা দুজনে গাড়ির পাশ দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন।

“ডঃ হ্যামিলটন, স্যার টমাস রোজিস্টারের সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দিই,” লর্ড লিনচমেয়ার বললেন, “ওঁর সঙ্গে আলাপ করে আপনার আশা করি খুব ভালো লাগবে।”

আমি তাঁকে অভিবাদন করলাম। স্যার টমাস অত্যন্ত কঠোরভাবে তাঁর টুপির ফাঁক দিয়ে আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে ছিলেন।

“লর্ড লিনচমেয়ার আমাকে বললেন যে তুমি নাকি গুবরে পোকার সম্বন্ধে কিছু জানো টানো? কী জানো হে তুমি?”

“গুবরে পোকা সম্বন্ধে আপনার যে সমস্ত গবেষণাপত্র রয়েছে সেগুলো থেকেই আমি অনেককিছু জানতে পেরেছি স্যার টমাস,” আমি বললাম।

“ব্রিটেনে যেসব প্রজাতির গুবরে পোকা দেখা যায় তার কয়েকটার নাম বলো তো শুনি।”

আমি ঠিক এরকম প্রশ্নের জন্য তৈরি ছিলাম না, যদিও সৌভাগ্যবশত কয়েকটার নাম আমার মনে ছিল, সেগুলো বললাম। আমার উত্তরটা তাঁকে খুশি করল বলেই মনে হল, কারণ তিনি অনেকটা সহজ হলেন।

“বাঃ। আপনি তো সত্যিই আমার বইপত্র পড়েছেন বলে মনে হচ্ছে মশাই” তিনি বললেন, “এসব ব্যাপারে আগ্রহ আছে এরকম লোকজনের তো প্রায় দেখাই পাই না। মানুষ এত আজেবাজে ব্যাপারে সময় নষ্ট করে, কিন্তু গুবরে পোকার মত আশ্চর্য প্রাণী নিয়ে মাথাই ঘামায় না। আপনাকে বলছি, আমাদের দেশের বেশির ভাগ মাথামোটা লোকগুলো জানেই না যে আমি—হ্যাঁ , একমাত্র আমিই এদের নিয়ে গবেষণা করছি বা কোনও বইপত্র লিখেছি। আপনার সঙ্গে আলাপ করে বড়োই খুশি হলাম। চলুন, আপনাকে আমার সংগ্রহশালা দেখাই। আমি নিশ্চিত, দেখে আপনার খুব ভালো লাগবে।” তিনি গাড়িতে উঠে বসলেন আর বাড়ি না পৌঁছানো পর্যন্ত তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণা সম্পর্কে আমাদের বলতে লাগলেন।

আগেই বলেছি যে স্যার টমাস রোজিস্টার এক বিরাট কানাওয়ালা টুপি পরেছিলেন, যেটাতে তাঁর ভুরু পর্যন্ত ঢাকা ছিল। হলঘরে প্রবেশ করে তিনি টুপিটা খুলে ফেললেন, আর তখনই একটা অত্যাশ্চর্য জিনিস দেখে আমি চমকে উঠলাম। এতক্ষণ সেটা টুপির আড়ালে ছিল বলে বোঝা যায় নি। তাঁর চওড়া কপালটা, যেটা চুলের স্বল্পতার জন্য আরো বেশি চওড়া দেখাচ্ছিল, থরথর করে কেঁপে চলেছে। স্নায়বিক দুর্বলতার কারণে মাংসপেশিগুলো কখনও সামান্য কাঁপছিল, আবার পরক্ষণেই প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিচ্ছিল। এমন অদ্ভুত ব্যাপার আমি আগে কখনও দেখি নি। পড়ার ঘরে ঢোকার পর তিনি আমাদের দিকে তাকাতেই এটা আরও বেশি করে চোখে পড়ল। ঠকঠক করে কাঁপতে থাকা কপালের নীচের ভুরুর তলা দিয়ে  একজোড়া কঠিন, ধূসর চোখ মেলে তিনি যখন আমাদের দিকে তাকাচ্ছিলেন, ব্যাপারটার অদ্ভুত বৈপরিত্যের জন্য তখন রহস্যময় মনে হচ্ছিল তাঁকে।

“আমি দুঃখিত,” তিনি বললেন, “লেডি রোজিস্টার এখন এখানে নেই। আপ্যায়নের হয়তো একটু ত্রুটি হবে। ভালো কথা চার্লি, ইভলিন কবে ফিরবে কিছু বলেছে নাকি?”

“ও তো শহরে আরও কয়েকদিন থাকবে বলল,” লর্ড লিনচমেয়ার বললেন, “আর তুমি তো জানোই যে মেয়েরা একবার শহরে গেলে আর আসতেই চায় না। কতরকম কাজ যে ওদের থাকে, কে জানে! বোন এখন লন্ডনে তার পুরোনো বন্ধুদের সাথে দেখা করে বেড়াচ্ছে।”

“তাই নাকি? ঠিক আছে, ও ওর মতন ঘুরেফিরে আসুক, যে ক’দিন থাকতে চায় থাকুক, আমার আপত্তি নেই। তবে ও ফিরে এলেই ভালো হতো। ও না থাকলে বাড়িটা বড়ো খালি খালি লাগে।”

“ঠিকই তো। খালি খালি তো লাগবেই। সেইজন্যেই তো আমি ড: হ্যামিলটনকে নিয়ে এখানে চলে এলাম। তোমার বিষয়ে ওঁর আগ্রহ এত বেশি যে আমি জানি ওঁকে নিয়ে এলে তুমি কিছু মনে করবে না।”

“আমার এখন অবসর জীবন ড: হ্যামিলটন, আর সেইজন্যেই আমি আজেবাজে লোককে একদম পাত্তা দিই না,” স্যার টমাস বললেন, “যৌবন বয়সে আমাকে গুবরে পোকার খোঁজে প্রচুর ঘুরে বেড়াতে হয়েছে, বহুবার আমাকে অস্বাস্থ্যকর সব জায়গায় থাকতে হয়েছে। বহুবার ম্যালেরিয়াতেও ভুগেছি। সে জন্য ফালতু লোকদের এখন আমার কাছে ঘেঁষতে দেখলেই আমার মাথায় রক্ত চড়ে যায়। তবে আপনার মতন একজন ভ্রাতৃপ্রতিম গুবরে পোকা বিশেষজ্ঞ সবসময়েই আমার কাছে স্বাগত। আমি খুব খুশি হব যদি আপনি আমার সংগ্রহ দেখেন। জোর দিয়ে বলতে পারি, এ ব্যাপারে গোটা ইউরোপে আমার থেকে বেশি কেউ জানে না।”

বাস্তবিক এতে কোন সন্দেহই নেই। ওককাঠের তৈরি বিরাট ক্যাবিনেটের মধ্যে খোপে খোপে সাজানো ছিল বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা গুবরে পোকা—কালো, বাদামি, নীল, সবুজ এবং আরো নানারকম রঙের। প্রত্যেকটি সঙ্গে আটকানো ছিল নাম আর শ্রেণীবিভাগ করা টিকিট, প্রতি মুহূর্তেই তাঁর হাত ঘুরছিলো এধার থেকে ওধারে। অনর্গল তিনি তাদের নাম-ধাম-স্বভাব সম্বন্ধে বলে যাচ্ছিলেন, পরম মমতায় হাত বোলাচ্ছিলেন পোকাগুলোর ওপরে আর ধারাভাষ্য চলছিল ক্রমাগত—কীভাবে এই দুর্লভ জীবগুলো তাঁর হাতে এলো। এ’রকম একটা অসাধারণ গবেষণার বিষয় নিয়ে এত মনোযোগী শ্রোতা তিনি সম্ভবত আগে পাননি, সেই কারণেই অনর্গল বকে যাচ্ছিলেন তিনি,যতক্ষণ পর্যন্ত না বিকেল রাতের আঁধারে মিলিয়ে গেল। চমক ভাঙল ঘন্টার শব্দে—ডিনারের সময় সমাগত।

সারাক্ষণই লর্ড লিনচমেয়ার তাঁর ভগ্নীপতির একেবারে কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মনে হচ্ছিল তিনি কোনও কিছুকে ভয় পাচ্ছেন, কোনও কিছুর প্রতীক্ষা করছেন। কিন্তু সেটা যে কী তা অনেক ভেবেও বের করতে পারলাম না।

বিকেলটা বেশ ভালোভাবেই কাটল। সত্যি কথা বলতে কি, আরও ভালোভাবে কাটত, যদি লর্ড লিনচমেয়ারকে অত চিন্তা করতে না দেখতাম। এর মধ্যে গৃহস্বামীর সঙ্গেও আলাপ আরও গাঢ় হয়েছে। তিনি বারংবার বলছিলেন তাঁর স্ত্রীর কথা, আর সেইসঙ্গে তাঁর ছোট ছেলের কথাও, যে এখন বোর্ডিং স্কুলে থাকে। ওরা থাকলে বাড়ির চেহারাটাই পালটে যেত বলে তিনি ক্রমাগত আক্ষেপ করছিলেন। তাঁর গবেষণাগার আর সংগ্রহশালাটি না থাকলে যে তাঁর সময় কাটত না, বলতে লাগলেন তাও। ডিনারের পর আমরা বিলিয়ার্ড রুমে বসে কিছুক্ষণ ধুমপান করলাম, তারপর একটু তাড়াতাড়িই শুতে চলে গেলাম।

সেই প্রথমবার আমার মনে হল, লর্ড লিনচমেয়ারের মাথায় বোধ হয় একটু ছিট আছে। স্যার টমাস নিজের ঘরে চলে যাওয়ার পর তিনি সোজা আমার শোবার ঘরে চলে এলেন।

“ডাক্তার,” তিনি দ্রুত চাপা গলায় বললেন, “আপনি আমার ঘরে আসুন। আজ রাত্রে আপনি আমার ঘরে শোবেন।”

“তার মানে?”

“মানে বোঝানোর সময় নেই। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আপনি আমার কথা মানতে বাধ্য। আমাদের ঘরদুটো একদম কাছাকাছি, কাজেই সকালে চাকররা এসে ডাকবার আগেই আপনি স্বচ্ছন্দে নিজের ঘরে ফিরে আসতে পারবেন।”

“কিন্তু কেন?”

“কারণ আমি একা শুতে ভয় পাচ্ছি,” তিনি বললেন, “আর এটাই কারণ।”

পরিষ্কার পাগলামির লক্ষণ।অনেকগুলো প্রশ্ন মুখের সামনে গজগজ করছিল। কিন্তু তক্ষুনি দিনে কুড়ি পাউন্ড পারিশ্রমিকের কথাটা মাথায় আসায় প্রশ্নগুলো আপাতত মুলতুবি রেখে তাঁর পেছনপেছন তাঁর ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলাম।

“দেখুন,” আমি বললাম, “ঘরে কিন্তু একটাই বিছানা।”

“হ্যাঁ, কেবল একজনই শুতে পারবে,” তিনি বললেন।

“তাহলে আরেকজন কী করবে?

“সে জেগে পাহারা দেবে।”

“কী ব্যাপার বলুন তো?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি এমন করছেন যেন কেউ আমাদের আক্রমণ করতে আসছে।”

“আমি সেইরকমই আশংকা করছি।”

“তাহলে দরজা বন্ধ করে দিচ্ছেন না কেন?”

“হয়তো আমি আক্রান্ত হতে চাই বলে!”

রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে দেখা গেল। পাগল আর কাকে বলে! যাই হোক, এখন আর দেখা ছাড়া কোনও কাজ নেই। আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে ফায়ার প্লেসটার সামনের আরামকেদারাটাতে বসে পড়লাম।

“তাহলে আমি বসে পাহারা দিই,” আমি বললাম একটু ক্ষুব্ধ হয়েই।

“না না, আমরা ভাগাভাগি করে পাহারা দেব। আপনি যদি দুটো অবধি জেগে থাকেন তাহলে বাকি রাতটা আমি পাহারা দেব।”

“বেশ।”

“তাহলে ঠিক দুটোর সময় আমাকে ডেকে দেবেন।”

“ঠিক আছে।”

“সবসময়েই সজাগ থাকবেন, কান খোলা রাখবেন। যদি কোনওরকম শব্দ শোনেন তবে সেই মুহূর্তেই—বুঝতে পেরেছেন—সেই মুহূর্তেই আমাকে ডেকে দেবেন।”

“আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেন,” আমি গুরুত্ব দিয়েই বললাম, যতটা তিনি দিচ্ছেন।

“আরেকটা কথা, ঈশ্বরের দিব্যি দিয়ে বলছি, কোন অবস্থাতেই ঘুমোবেন না,” বলে তিনি কোটটা খুলে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন।

আমার অত্যন্ত বিরক্ত লাগছিল। গোটা ব্যাপারটাই গোলমেলে। যদি ধরেও নিই যে লর্ড লিনচমেয়ার যে কোনও  কারণেই হোক স্যার টমাস রোজিস্টারের বাড়িতে তাঁর নিজের ওপরে হামলার আশংকা করছেন, তাহলে কেন তিনি নিজেকে রক্ষা করবার জন্য দরজাটা বন্ধ করে দিলেন না? তাঁর নিজের ভাষায়, তিনি আক্রান্তই হতে চান—এ আবার কেমন কথা? কেন তিনি নিজের ওপর আক্রমণ চাইছেন? আর, কে-ই বা তাঁকে আক্রমণ করবে? পরিষ্কার কথা, লর্ড লিনচমেয়ার কোনও মানসিক রোগে ভুগছেন, আর তার ফলে যেটা হল, আমার রাতের ঘুমের বারোটি বাজল। যাই হোক, যখন তাঁর সঙ্গে, তাঁর হয়ে কাজ করতে এসেছি, তখন তাঁর নির্দেশ আমাকে অক্ষরে অক্ষরে মানতেই হবে। ফাঁকা ফায়ারপ্লেসটার পাশে বসে বসে আমি শুনতে লাগলাম বাইরের কোনও ঘড়িতে পনেরো মিনিট অন্তর অন্তর ঘন্টা বাজবার শব্দ। সময় যেন আর কাটতে চাইছিল না। ঘড়ির ওই শব্দ ছাড়া গোটা বাড়িটা একেবারে শুনশান, নিস্তব্ধ। আমার সামনের টেবিলটায় একটা ছোট বাতি জ্বালানো ছিল। তাতে আমার সামনেটায় একটু আলো হচ্ছিল বটে কিন্তু ঘরের বাকি অংশটা একেবারে ছায়াচ্ছন্ন হয়ে ছিল। খাট থেকে লর্ড লিনচমেয়ারের গভীর নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তাঁকে ঘুমোতে দেখে আমার রীতিমত হিংসে হচ্ছিল, আর বারবার চোখের পাতা ঘুমে জড়িয়ে আসছিল। কিন্তু চটকা ভেঙে যাচ্ছিল বারবারই, কারণ আমার অবচেতন মনে কাজ করছিল, যে জেগে থাকাটাই আমার কাজ, তাই বারবারই ফের সোজা হয়ে বসছিলাম, চোখে পাতা কচলে ঘুম তাড়াবার চেষ্টা করছিলাম, আর প্রতীক্ষা করছিলাম কখন সময় শেষ হয় তার জন্য।

অবশেষে দীর্ঘ ক্লান্তির প্রতীক্ষার অবসান হল। বাইরের ঘড়িতে ঢং ঢং করে দুটো বাজল। আমি ঘুমন্ত লর্ড লিনচমেয়ারের কাঁধে হাত রাখতেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠলেন, তাঁর চোখেমুখে একটা উদগ্রীব জিজ্ঞাসা।

“কিছু শুনতে পেয়েছেন?”

“না স্যার। এখন ঠিক দুটো বাজে।”

“ঠিক আছে। এখন আমি জাগছি। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন।”

আমি আর কথা  না বাড়িয়ে কম্বলটা মুড়ি দিয়ে লম্বা হলাম, আর অচিরেই চোখ ঘুমে জড়িয়ে এল। শেষ মনে আছে বাতির গোল আলোটা, আর লর্ড লিনচমেয়ারের কুঁজো, ঝুঁকে পড়া ছোট্ট শরীরটা, মুখে উৎকন্ঠার স্পষ্ট ছাপ।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম জানি না, আচমকা হাতে একটা হ্যাঁচকা টান খেয়ে আমার ঘুম ভেঙে গেল। ঘরজোড়া ঘুটঘুটে অন্ধকার। শুধু একটা তেলপোড়া গন্ধে বোঝা যাচ্ছিল, বাতিটা নেভানো হয়েছে।

“তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি,” আমার কানের কাছে লর্ড লিনচমেয়ারের গলা শোনা গেল। আমি বিছানার ওপর লাফিয়ে উঠলাম, তিনি তখনও আমার হাত ধরে টানছেন।

“ওদিকে—ওদিকে–” তিনি চাপা স্বরে বলেই আমাকে টেনে ঘরের এক কোণায় নিয়ে গেলেন, “চুপ! শুনুন-”

রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেঙে, আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম, বাইরের করিডোর দিয়ে কে যেন আসছে। খুব নিঃশব্দে, আস্তে আস্তে পা ফেলে হাঁটছে। প্রতিটি পদক্ষেপের পরই একটু বিরতি—তারপর আবার, যেন কোন লোক পা ফেলছে খুব মেপে মেপে –যেন কেউ জানতে না পারে। মাঝে মাঝে একএকটা পদক্ষেপের পরে প্রায় আধমিনিটখানেক নৈঃশব্দ্য, তারপর খসখস আওয়াজ। আমার সঙ্গী উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছিলেন। যে হাত দিয়ে তিনি আমার হাত খামচে ধরেছিলেন, তা এত কাঁপছিল, মনে হচ্ছিল যেন ঝোড়ো হাওয়ায় বাঁশপাতা থরথর করে কাঁপছে।

“কে আসছে?”  আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলাম।

“উনি।”

“স্যার টমাস?”

“হ্যাঁ।”

“কী ব্যাপার?”

“চুপ। আমি না বলা পর্যন্ত কিচ্ছু করবেন না। চুপচাপ থাকুন।”

তখনই বুঝতে পারলাম, দরজা দিয়ে কেউ ঢোকবার চেষ্টা করছে। একেবারে আস্তে খুট করে দরজার হাতলটা ঘোরানোর শব্দ হল আর অস্পষ্ট আলোয় দেখতে পেলাম একটা ছায়ামূর্তিকে। বাইরে দূরে কোথাও একটা আলো জ্বলছিল। সেটা আমাদের অন্ধকার ঘর থেকে বাইরেটা দেখতে পাবার পক্ষে যথেষ্ট। ধূসর ছায়ামূর্তিটা ক্রমেই এগিয়ে আসছিল , খুব ধীরে ধীরে—খুব নিঃশব্দে। অবশেষে একটা মানুষের পরিষ্কার অবয়ব বোঝা গেল। গুঁড়ি মেরে, প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছিল সে। ধীরে ধীরে দরজাটা পুরোপুরি খুলে গেল আর তার মাঝখানে দেখতে পেলাম সেই অশুভ মূর্তিটাকে। তখনই হামাগুড়ি দেয়া মূর্তিটা ছিলে-ছেঁড়া ধনুকের মত ঘরে ঢুকে বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল খাটের ওপর আর দমাস-দমাস-দমাস—তিনটে ভয়ানক আওয়াজ ভেসে এল খাট থেকে। যেন কোন ভারী জিনিস দিয়ে প্রচন্ডভাবে ঘা দেয়া হল খাটের ওপর।

galpoamitonubad04

আমি পুরো ঘটনাটার আকস্মিকতায় এতই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম যে নড়াচড়া করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার সঙ্গীর প্রচন্ড চিৎকারে সম্বিৎ ফিরে এল। খোলা দরজা দিয়ে আসা সামান্য আলোতে দেখতে পেলাম, ছোট্টখাট্টো লর্ড লিনচমেয়ার ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তাঁর ভগ্নীপতির ওপর, হাত দিয়ে তাঁর গলা পাকড়ে পেড়ে ফেলার চেষ্টা করছেন তাঁকে। লম্বা, রোগা চেহারার স্যার টমাস ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন, কিন্তু লর্ড লিনচমেয়ারও প্রাণপণে পেছন থেকে জাপটে ধরেছিলেন তাঁকে, যদিও তাঁর চিল-চিৎকারে বোঝা যাচ্ছিল যে তাঁর দম ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। কারণ, লড়াইটা হচ্ছিল অসম। আমিও ঝাঁপিয়ে পড়লাম তাঁর ওপর আর দুজনে মিলে কোনক্রমে স্যার টমাসকে মাটিতে পেড়ে ফেললাম। যদিও তার মধ্যেই স্যার টমাস দাঁত বসিয়ে দিয়েছেন আমার কাঁধে। তিনি যেভাবে হাত পা ছুঁড়ছিলেন, তাতে আমার শরীরে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করতে হয়েছিল তাঁকে বশে আনতে। অবশেষে তাঁর পরনের ড্রেসিং গাউনের দড়ি দিয়েই তাঁর হাতদুটো বেঁধে ফেলা হল। পরে আমি তাঁর পা দুটো জাপটে ধরলাম। এর মধ্যেই লর্ড লিনচমেয়ার বাতিটা জ্বালাবার চেষ্টা করছিলেন। আর তখনই শুনতে পেলাম, বাইরে অনেকগুলো পায়ের আওয়াজ। পরক্ষণেই ঘরে প্রবেশ করল বেয়ারা আর দুজন চাপরাশি। চিৎকারের চোটে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল ওদের। এবার আর বন্দিকে আয়ত্বে আনতে কোন অসুবিধে হল না। মেঝেতে শুয়ে রাগে ফুঁসছিলেন তিনি। জ্বলন্ত চোখ মেলে তাকিয়েছিলেন আমাদের দিকে। তাঁর মুখের দিকে একঝলক তাকিয়েই বোঝা যাচ্ছিল যে কি সাংঘাতিক বিপজ্জনক একজন মানসিক রোগী তিনি এবং খাটের ওপর রাখা ছোট হাতুড়িটাই বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে কী ভয়ংকর এক খুনি মানসিকতা কাজ করছে তাঁর মধ্যে।

“ব্যস ব্যস আর কিছু করার দরকার নেই,” লর্ড লিনচমেয়ার যখন বললেন, আমরা তখন ছটফট করতে থাকা মানুষটাকে তুলে ধরে দাঁড় করিয়ে দিলাম। একটু পরেই উনি ঝিমিয়ে পড়বেন, এমনকি অচৈতন্য হয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়, এবং আমার ধারণা সেই সময় তখন হয়ে এসেছে। লর্ড লিনচমেয়ার যখন কথা বলছিলেন, স্যার টমাসের ছটফটানি ততক্ষণে কমে আসছিল, এবং মানসিক রোগগ্রস্ত মানুষটার মাথা আচমকা ঝুলে পড়ল তাঁর বুকের ওপর, যেন তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন।

আমরা তাঁকে ধরাধরি করে তাঁর ঘরে নিয়ে গিয়ে খাটের ওপর শুইয়ে দিলাম। নিস্পন্দ হয়ে গেছিলেন মানুষটা। বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস পড়ছিল তাঁর।

“তোমাদের মধ্যে দুজন ওঁকে পাহারা দাও,” লর্ড লিনচমেয়ার বললেন, “আর ড: হ্যামিলটন, আপনি যদি আমার ঘরে আসেন তাহলে গোটা ঘটনাটা খুলে বলতে পারি। পারিবারিক কেলেংকারির ভয়ে যে ঘটনা এতক্ষণ আপনাকে জানাতে পারিনি। আজকের রাতটায় আপনি যা করেছেন, তার জন্য আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা আমার নেই।”

তাঁর ঘরে গিয়ে মুখোমুখি বসবার পর তিনি বললেন, “পুরো ঘটনাটা সংক্ষেপে বলছি। আমার হতভাগ্য ভগ্নীপতিটি বিশ্বের অন্যতম সেরা পতঙ্গবিদ, স্বামী হিসেবে চমৎকার মানুষ এবং একজন স্নেহময় পিতা। কিন্তু তিনি এমন এক বংশের মানুষ, যে বংশধারায় পাগলামির বীজ লুকিয়ে আছে। এর আগে একাধিকবার তাঁর মধ্যে নরহত্যার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, আর যেটা সবচেয়ে বেদনাদায়ক তা হল, তিনি তাদেরই আক্রমণ করেন যাঁদের তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন বা পছন্দ করেন। তাঁর ছেলেকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করবার জন্যই বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আর আমার বোন, তাঁর স্ত্রী কোনওক্রমে প্রাণে বেঁচে গেছে, জখম অবস্থায় পালিয়ে গেছে লন্ডনে, সে ক্ষতচিহ্নটি আপনি হয়ত লক্ষ করে থাকবেন। আশ্চর্যের ব্যাপার, তিনি যখন সুস্থ থাকেন তখন এসব কথা কিছুই মনে রাখতে পারেন না, এমনকি এ ব্যাপারে তাঁকে কিছু বলতে গেলে তিনি সেটা হেসেই উড়িয়ে দেন, কারণ তিনি বিশ্বাসই করতে পারেন না যে যাদের তিনি এত ভালোবাসেন তাদের তিনি কোন আঘাত করতে পারেন। আপনি নিশ্চয় জানেন যে এটা এক বিশেষ ধরণের রোগের লক্ষণ, যে রোগে রোগীদের বোঝানোটাই খুব মুশকিল হয়ে পড়ে যে তাঁরা এ কাজ করতে পারেন।”

“আমাদের লক্ষ ছিল একটাই যে তাঁর হাত যেন আর রক্তরঞ্জিত না হয়। কিন্তু তাতে অসুবিধে ছিল।  উনি একা থাকতেই ভালোবাসেন বেশি, আর কখনো ডাক্তার দেখাতে চান না। অথচ তিনি যে একজন মানসিক রোগী সে কথা প্রমাণ করবার জন্য একজন ডাক্তারের পরামর্শ খুব জরুরি। সাধারণ সময়ে উনি কিন্তু আমার-আপনার মতই সুস্থ মানুষ, খুব কদাচিৎ তাঁর এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। কিন্তু যখন তাঁর মধ্যে রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটবার সম্ভাবনা থাকে তখনই  তাঁর মধ্যে কিছু কিছু লক্ষণ পরিষ্কার ফুটে ওঠে যেটা অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত হয়ে দাঁড়ায় অন্যের পক্ষে। জানান দেয় যে নিজেদের রক্ষা করবার সময় এসে গেছে। এর মধ্যে প্রধান লক্ষণটাই হল কপালের শিরাগুলো ফুলে ওঠা আর লাফানো। সাধারণত রোগের আক্রমণের তিন থেকে চারদিন আগে থেকেই এই লক্ষণগুলো দেখা দেয়। এবার যেদিন এটা দেখা দিয়েছিল, সেদিনই তাঁর স্ত্রী সোজা লন্ডনে ব্রুক স্ট্রিটে আমার বাড়িতে গিয়ে উঠেছিলেন।

“এখন, স্যার টমাসের এই পাগলামির রোগটা প্রমাণ করবার জন্য একজন ডাক্তারের সার্টিফিকেট আমার কাছে জরুরি ছিল। কিন্তু সাধারণ অবস্থায় যখন তিনি সুস্থ, তখন এটা প্রমাণ করা মুশকিল। তিনি গুবরে পোকা বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ, আর এই বিষয়ে আগ্রহী কোনও ব্যক্তিকে তিনি খুব পছন্দ করেন এটা আমার মাথায় ছিল। সেইজন্যেই আমি ওইরকম অদ্ভুত বিজ্ঞাপনটা কাগজে দিয়েছিলাম এবং আমার সৌভাগ্য যে আপনার মতন একজন লোককে আমি খুঁজে বের করতে পেরেছি। একজন শক্তিশালী মানুষ এক্ষেত্রে জরুরি ছিল, কারণ যে বিপদের ঝুঁকিটা আমি নিয়েছিলাম, তাতে আমার মৃত্যুও হতে পারত। কারণ আমি জানতাম যে সম্ভবত উনি আমাকেই হত্যা করতে চাইবেন, কেন না সুস্থ অবস্থায় তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর। বাকিটা আশা করি আপনাকে আর বুঝিয়ে বলতে হবে না। আমি অবশ্য বুঝতে পারিনি যে আজ রাতেই আমার ওপর আক্রমণ হবে। তবে তার সম্ভাবনা একটা ছিলই। এর আগে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আক্রমণগুলো হয়েছিল খুব ভোরের দিকে। আমি খুব ভিতু মানুষ। কিন্তু এ ঝুঁকিটা আমায় নিতেই হয়েছিল। কারণ, এছাড়া আমার বোনকে আর বাঁচাবার কোন পথ ছিল না। এবার আপনি ঠিক করুন, ওঁর পাগলামির সপক্ষে কোন সার্টিফিকেট আপনি দেবেন কি না।”

“এ ব্যাপারে কোন প্রশ্নই উঠবে না লর্ড লিনচমেয়ার, কিন্তু দুজন ডাক্তারের সই এখানে জরুরি,” আমি বললাম।

মৃদু হেসে লর্ড লিনচমেয়ার বললেন, “আপনি ভুলে যাচ্ছেন যে আমারও একটা ডাক্তারি ডিগ্রি আছে। আমি সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এনে রেখেছি। কাজেই আপনি এখনই লেখালেখিগুলো করে সইসাবুদ করে দিলে কাল সকালের মধ্যেই রোগীকে হাসপাতালে পাঠানো যাবে।”

বন্ধুগণ, এই হল আমার বিখ্যাত গুবরে পোকা শিকারী স্যার টমাস রোজিস্টারের সঙ্গে দেখা হওয়ার গল্প। আর সাফল্যের প্রথম সোপান হিসেবে এটাই আমাকে বিখ্যাত করে দিল। লেডি রোজিস্টার আর লর্ড লিনচমেয়ারের সঙ্গে আমার দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গেল। কোনও দিনও তাঁরা আমার আমার সাহায্যের কথা ভুলতে পারেন নি। স্যার টমাসও এখন সম্পূর্ণ সুস্থ, কিন্তু যদি কোনওদিন আবার আমাকে ওই ডেলামেয়ার কোর্টে রাত্রিবাস করতে হয় তাহলে আমি অবশ্যই ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে রাখব।

স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের “দা বিটল্‌ হান্টার” অবলম্বনে।

ছবিঃ শিমুল

অমিত দেবনাথের আরো গল্প- ওরা, অতলের ইশারা মূল-আর্থার কোনান ডয়েল, আসল নকল-বিল প্রনজিনি, নয় মাইল হাঁটা হ্যারি কেমেলম্যান, দখল ফিলিপ কে ডিক, ফাদার ম্যাকক্লেসফিল্ডের কাহিনি -রবার্ট হিউ বেনসন, ভয়ানক এক রাতের গল্প কোনান ডয়েল–নাইট অ্যামং দ্য নিহিলিস্ট, আগে আমার কথা শোন জন ম্যাকলে, একটা লোকে্র গল্প ডাবলিউ ডাবলিউ জ্যকব্স্, আর কিছুক্ষণ ডব্লিউ এফ হার্ভে-আগস্ট হিট, পোড়া বাড়ি ভিনসেন্ট ও’সুলিভান, সাইন অব ৪০০রয় ম্যাকার্ডেল, এক সন্ধ্যায় শার্লক হোমসের সঙ্গে জেমস ম্যাথিউ ব্যারি।,  জোর বরাত-শিয়ার্লাকস্ট্যানলি জ্যাক রুবিনস্টাইন,  কাপড়-মেলা দড়ির রহস্য ক্যারোলিন ওয়েলস , সুমাত্রার দানব ইঁদুর, শার্লক হোমস ও ড্রুড রহস্য, এডমণ্ড লেস্টার পিয়ার্সন, হারানো হিরের রহস্য জর্জ এফ ফরেস্ট, কথোপকথন- আর্থার চ্যাপম্যান, বিড়ম্বিত মধুচন্দ্রিমা, হ্যালোউইন ম্যান,  শুভ জন্মদিন

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

 

Leave a Reply