অমিত দেবনাথের আরো গল্প- ওরা, অতলের ইশারা মূল-আর্থার কোনান ডয়েল, আসল নকল-বিল প্রনজিনি, নয় মাইল হাঁটা হ্যারি কেমেলম্যান, দখল ফিলিপ কে ডিক, ফাদার ম্যাকক্লেসফিল্ডের কাহিনি -রবার্ট হিউ বেনসন, ভয়ানক এক রাতের গল্প কোনান ডয়েল–নাইট অ্যামং দ্য নিহিলিস্ট, আগে আমার কথা শোন জন ম্যাকলে, একটা লোকে্র গল্প ডাবলিউ ডাবলিউ জ্যকব্স্, আর কিছুক্ষণ ডব্লিউ এফ হার্ভে-আগস্ট হিট, পোড়া বাড়ি ভিনসেন্ট ও’সুলিভান, সাইন অব ৪০০রয় ম্যাকার্ডেল, এক সন্ধ্যায় শার্লক হোমসের সঙ্গে জেমস ম্যাথিউ ব্যারি।, জোর বরাত-শিয়ার্লাকস্ট্যানলি জ্যাক রুবিনস্টাইন, কাপড়-মেলা দড়ির রহস্য ক্যারোলিন ওয়েলস , সুমাত্রার দানব ইঁদুর, শার্লক হোমস ও ড্রুড রহস্য, এডমণ্ড লেস্টার পিয়ার্সন, হারানো হিরের রহস্য জর্জ এফ ফরেস্ট, কথোপকথন- আর্থার চ্যাপম্যান, বিড়ম্বিত মধুচন্দ্রিমা, হ্যালোউইন ম্যান,

মূল কাহিনি- জাস্টিন কেস- মেনি হ্যাপি রিটার্নস
অবশেষে একখানা বাড়ি দেখা গেল। অবশ্য একখানাই।
তবে দেখা যে গেছে, এই ঢের। রাস্তার যা দশা, আরও কিছুক্ষণ এই রাস্তায় গাড়ি চালাতে গেলে, গাড়ি নির্ঘাৎ জবাব দেবে।
বাড়িটা দূর থেকে দেখেই গ্রেস মার্টিন তার স্বামীর হাত চেপে ধরেছিল, “দেখেছ! ওখানেও নির্ঘাৎ কিছু জিনিস পাওয়া যাবে। ”
তার স্বামী টম মার্টিন একটা ‘হুম’ আওয়াজ করেই গাড়িটা ঢুকিয়ে দিল সোজা বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে।
গ্রেস যেটাকে ‘জিনিস’ বলল, কয়েকদিন ধরে বহু জায়গা ঘুরে সেই ‘অ্যান্টিক’ সংগ্রহ করে বেড়াচ্ছে তারা। গাড়ির আদ্ধেক বোঝাই হয়ে গেছে সেই সব জিনিসে। টমের অবশ্য তাতে কোন পরোয়া নেই। সদ্য এম.এ. পাশ করেই একটা দারুণ নামকরা স্কুলে শিক্ষকতার কাজ পেয়ে গেছে সে, গ্রেস তার সদ্য বিবাহিত সুন্দরী স্ত্রী।
বাড়িখানা সেকেলে, বহু পুরোনো আমলের, কিন্তু তার সাইনবোর্ডখানা ঝকঝক করছে –‘ট্যুরিস্ট্স্ রেস্ট’। নতুন রঙ করা বোধহয়।
গাড়ি থেকে তারা নামতে না নামতেই বাড়ির জীর্ণ দরজাটা আওয়াজ করে খুলে গেল। বেরিয়ে এলেন একজন মানুষ, বাড়িটার সমবয়সীই বোধহয়, মাথার পাকা চুলগুলো এই শেষ বিকেলের আলোতেও চকচক করছে, নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে অভ্যর্থনা করলেন তাদের। দরজায় হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন পুতুল পুতুল চেহারার এক বৃদ্ধা, তাদের ভেতরে নেওয়ার জন্য।
“আসুন, আসুন,” হাসিমুখেই বললেন বৃদ্ধ ভদ্রলোক, “খুব ক্লান্ত লাগছে আপনাদের। আগে আপনাদের ঘর দেখিয়ে দিই, হাত-মুখ ধুয়ে চাঙ্গা হয়ে নিন, পরে চা খেতে খেতে আলাপ করা যাবে। আপনাদের ঘর দোতলায়, আশা করি কোন অসুবিধে হবে না। ”
অসুবিধে হওয়ার কথাও নয় অবশ্য। কারণ বাড়িটার চেহারা বাইরে থেকে যা-ই দেখাক না কেন, ভেতরে ঘরটা দারুণ। ঘরের ভেতর পেল্লাই একখানা খাট, তাতে ইয়া পুরু গদি, একেবারে দুগ্ধফেননিভ শয্যা যাকে বলে। টম তো একটা লাফ মেরে বিছানায় লম্বা হল, আরামের আওয়াজ করল মুখ দিয়ে, কারণ সারাদিন ধরে গাড়ি গাড়ি চালিয়ে চালিয়ে পিঠটার আর কিছু নেই।
খানিকক্ষণ বাদে, চোখেমুখে জল দিয়ে ‘চাঙ্গা হয়ে’ তারা নেমে এল নীচের একখানা ঘরে। এটাই বোধহয় ডাইনিং রুম, খুব হালকা একটা আলো জ্বলছে সেখানে, পুরোনো আমলের যত জিনিসপত্র বোঝাই ঘরটায়, আর একটা অদ্ভুত গন্ধ, পুরোনো দিনের বাড়িতে যেরকম গন্ধ থাকে।
বহু পুরোনো অথচ চমৎকার চায়ের কাপে (চায়ের কাপগুলোও অবশ্য ‘অ্যান্টিকের’ পর্যায়ে পড়ে) চা এগিয়ে দিতে দিতে বললেন বৃদ্ধা মহিলা, “আমার নাম অ্যানা উইগিন। আপনারা আমায় অ্যানা বলেই ডাকবেন। আর উনি আমার স্বামী। ” মহিলা বৃদ্ধ ভদ্রলোকের দিকে ইঙ্গিত করলেন।
“আমার নাম টম মার্টিন,” বলল টম, “আর এই হল আমার স্ত্রী গ্রেস। ”
“আলাপ করে খুশি হলাম,” বললেন বৃদ্ধ ভদ্রলোক, যাঁর নাম জেসপার। “তা এদিকে কি বেড়াতে এসেছেন?”
“বেড়াচ্ছিও, আবার অ্যান্টিকও সংগ্রহ করছি। আপনাদের এখানেও এসেছি সেই কারণেই। পুরোনো আমলের ঘর সাজাবার সেরকম কোন জিনিসপত্র আছে নাকি আপনাদের কাছে?” ঘরের পুরোনো জিনিসগুলো দেখেই অবশ্য টম বলেছিল কথাগুলো।
“আজ্ঞে না, আমরা অ্যান্টিক রাখি না। যেগুলো দেখছেন, এগুলো সবই আমাদের দরকারি জিনিস। কাজে লাগে। ”
হঠাৎ অ্যানা একগাল হেসে বললেন, “আপনাদের সদ্য বিয়ে হয়েছে মনে হচ্ছে?”
“ঠিকই ধরেছেন। সবে পাঁচ দিন হল,” গ্রেস বলল।
“আপনারা তো খুবই ছেলেমানুষ,” জেসপার বললেন।
“কই আর ছেলেমানুষ! আমার বয়স বাইশ, টমের চব্বিশ। ”
জেসপার এমনভাবে মাথা দোলালেন যেন তিনি কিছু একটা আন্দাজ করেছিলেন এবং সেটা সঠিক। যদিও তিনি বলেননি তাঁর এবং অ্যানার বয়স কত। তিনি বললেন, “আমিও আমার স্ত্রীর থেকে বয়সে সামান্য বড়। তারপর চায়ে একটা চুমুক মেরে বললেন, আপনাদের তো তাহলে অবশ্যই আপনাদের জন্মতারিখগুলো অ্যানাকে বলা উচিত। ”
“আমাদের জন্মতারিখ? কেন? কী ব্যাপার?” গ্রেস একটু হকচকিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“অ্যানার একটা দারুণ গুণ আছে। ও কারুর জন্মতারিখ জানতে পারলে, সেই তারিখ থেকে ভবিষ্যৎবাণী করতে পারে। ”
“আরে বাঃ! কীভাবে পারেন, অ্যাঁ, মিসেস উইগিন?”

“পা –রি,” মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন বৃদ্ধা, “কত তারিখে তোমার জন্ম, সোনামণি?”
“এগারোই মে। ”
“আরে না না,” টম হেসে ফেলল, “ও …”
আচমকা থতমত খেয়ে চুপ করে গেল সে, কারণ বৃদ্ধার চোখমুখের আকার বদলে গেছে।
জেসপার উঠে পড়লেন চেয়ার থেকে, হাত রেখেছেন তাঁর স্ত্রীর কাঁধে। ঘরের আলোটা যদিও খুবই আবছা, তবুও বোঝা যাচ্ছিল জেসপারের বলিষ্ঠ দুটো হাত আর লম্বা লম্বা আঙুলগুলো। আস্তে আস্তে তিনি বলছেন তাঁর স্ত্রীকে, “অ্যানা, বহুদিন পর সুযোগ এসেছে। এখন একদম উত্তেজিত হবে না। মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। ”
গ্রেস মার্টিনের গাটা কেমন শিরশির করে উঠল। স্বামীর দিকে একটা চোরা চাহনি দিয়ে সে বলল, “ঐ তারিখটার কোন বিশেষত্ব আছে কি?”
“ওটা অ্যানারও জন্মদিন। ”
“তাই নাকি? তাহলে তো আমাদের ব্যাপারই আলাদা, কী বলেন?”
“কী সব আজে বাজে বকছ?” বলে উঠল টম, “নিজের জন্মদিনটা …”
“ওঃ, টম, প্লিজ!”
“আরেক রাউন্ড চা খাওয়া যাক,” বৃদ্ধ বললেন, “নতুন আরেক সেট কাপে। আর তার সঙ্গে টোস্ট। ”
তিনি রান্নাঘর থেকে এক ট্রে বোঝাই করে চা টোস্ট নিয়ে যখন ফিরলেন, তখন বাকিরা জন্মদিন সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে হাসিঠাট্টা করছে। চারটে কাপে চা ঢেলে তিনি চেয়ারে বসে হাত তুলে বললেন, “এবারের চা-টা হল এই মহিলা দুজনের জন্মদিনের উদ্দেশ্যে। ”
আবছা আলোতেও দেওয়ালে বিরাট হয়ে পড়ল তাঁর ছায়াটা। নিজের হাতে তিনি চা এগিয়ে দিলেন টম আর গ্রেসের দিকে। সবাই হেসে চায়ে চুমুক দিল।
“গিন্নি, দেখেছ তো,” বৃদ্ধ বললেন, “বৃথা গেল না তাহলে। ”
“কী বৃথা গেল না?” টম জিজ্ঞেস করল।
“গতকালই অ্যানা বলেছিল যে এ জায়গাটা আর ভাল লাগছে না, অন্য কোথাও চলে গেলেই হয়। আজকাল আর এই রাস্তা দিয়ে ট্যুরিস্ট বেশি আসে না। আর যাও বা আসে, তাদের মধ্যে থেকেও ঠিকঠাক লোক পেতে বহু বছর অপেক্ষা করতে হয়। ”
“ঠিকঠাক লোক পেতে অপেক্ষা মানে?”
“আরে একই জন্মদিনওলা লোক, বুঝলে না?”
টম কথা না বলে ঘাড় নাড়ল। বুড়োদুটোর শোওয়ার সময় হয়ে গেছে, তবু যাচ্ছে না কেন, কে জানে। বহুদিন কোন কথা বলার লোক পায়নি বোধহয়, তাই এখনো বসে আছে। বসে আছে আর আগডুম বাগডুম বকছে। বয়স হলে ঠিক রুটিন মেনে না চললে তো এ জিনিস হবেই। কাল তাদের তিনশো মাইলেরও বেশি লম্বা রাস্তা পাড়ি দিতে হবে, এখন একটু বিশ্রামের অত্যন্ত প্রয়োজন। কাজেই ব্যাপারটা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে যাওয়ার আগেই সে উঠে পড়ল।
“আরে দাঁড়াও দাঁড়াও,” জেসপার উইগিন বললেন, “ঘুমের সময় তো আর চলে যাচ্ছে না। তোমাকে একটা জিনিস বলি, এ জিনিস তুমি বোধহয় আগে শোনো নি। ”
অগত্যা একটু কাষ্ঠ হেসে টম আবার বসল চেয়ারে।
“কিভাবে দীর্ঘজীবন লাভ করা যায়, সে সম্বন্ধে তোমার কোন ধারণা আছে?”
“আজ্ঞে না। ”
“একটা আশ্চর্য অঙ্কের খেলা কাজ করে চলেছে প্রকৃতিতে, বুঝলে,” বৃদ্ধ বললেন, “আমরা জানি, প্রতিদিন বহু মানুষ জন্মায়, বহু মানুষ মরেও যায়। কিন্তু এই আশ্চর্য অঙ্কটা দুইয়ের মধ্যে একটা ভারসাম্য বজায় রাখে। ”
“বলেন কি?” টম একটা হাই চাপার প্রাণপণ চেষ্টা করতে করতে বলল।
“ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার করে বলছি, মন দিয়ে শুনলেই বুঝতে পারবে। প্রত্যেক দিনের জন্য –এই ধর, এগারোই মে, বা নয়ই জুন, বা ছয়ই ডিসেম্বর, বা যাই হোক না কেন, সময়ের মধ্যে আলাদা খোপ থাকে। এখন ধর, আজকে যাদের জন্ম হল, সময়ের মধ্যে এদের জায়গা হবে কিন্তু এই একই তারিখে ঠিক আগের বছর যারা জন্মেছে, তাদের সঙ্গে। এই অঙ্কটা যদি ঠিক ঠিক কাজ করে, তাহলে, আজ যারা জন্মেছে, তারা গত বছর একই দিনে যারা জন্মেছে, তাদের থেকে পাক্কা এক বছর বেশি বাঁচবে। অন্যান্য দিনগুলোর জন্যও এরকম ব্যাপারটা চলতে থাকবে। আমার কথা শুনছো তো?”
“হ্যাঁ …, ” ঘুমচোখে জবাব দিল টম।
“কিন্তু এই অঙ্কটা সব সময়ে খাটে না। খাটে না এই কারণেই যে অসুখ-বিসুখ, দুর্ঘটনা –এইসব নানারকম কারণে অনেকে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই মরে যায়। বাকিরা বেঁচে থাকে ঐ ভারসাম্যটা রক্ষা করার জন্য। ”
“নিশ্চয়ই,” বিড়বিড় করল টম।
“বিভিন্ন সময়ের বছরে এই যে বিভিন্ন সময়ের খোপ, এগুলো এভাবেই পরিচালিত হতে থাকে। অঙ্কের নিয়মেই জীবন বয়ে চলেছে, ঠিক যেভাবে অঙ্কের নিয়মে ঘুরে চলেছে গ্রহ আর নক্ষত্ররা। ”
“আপনার কথায় যুক্তি আছে বটে,” টম বলল। টেবিলের ওপাশে বসে তার স্ত্রী গ্রেস বোধহয় ঘুমিয়েই পড়ল। “কিন্তু তাহলে জনসংখ্যা বাড়ছে কিভাবে?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেটাও হিসেব করে দেখা হয়েছে। এত যুদ্ধ হয়েছে, মহামারী হয়েছে, এই হয়েছে, সেই হয়েছে –এতেও তো বহু লোক মরেছে। বাকিরা তাদের জায়গা নিচ্ছে। সময় পেলে আমি পুরোটাই তোমাকে বুঝিয়ে দিতে পারি। ”
“আপনি এসব নিজে ভেবে বার করেছেন, মিঃ উইগিন?”
“আমি? না না, আমি না। একবার গরমকালে এক ইউরোপিয়ান ভদ্রলোক বেড়াতে এসে আমাদের সঙ্গে মাসখানেক ছিলেন। এই বাড়িতে নয় অবশ্য। তখন আমরা অন্য জায়গায় থাকতাম। তারপর থেকে আমরা বহুবার বাড়ি পাল্টেছি। তাঁর নাম ছিল মারেক জিয়ক। লোকটা ছিল অঙ্কের জাদুকর। আমাদের সঙ্গে থাকার সময়েই ওঁর একটা দুর্ঘটনা ঘটে। খুব বুড়ো হয়ে গেছিলেন তো –একদিন রাত্তিরে সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে কোমরে খুব চোট পান। ঐ বয়সে আর এই ধাক্কা সামলাতে পারেননি ভদ্রলোক, মারাও গিয়েছিলেন তার কয়েকদিনের মধ্যেই। খুবই দুঃখজনক ব্যাপার –তবে ঘটনা হল, ততদিনে আমরা ওঁর খুবই বিশ্বাসভাজন হয়ে গেছিলাম, যার জন্য মরার আগে উনি আমাদের এই ব্যাপারটা সম্বন্ধে বলে গেছিলেন। ”
“ও। আচ্ছা। ”
“বিশ্বাস হচ্ছে না?” জেসপার উইগিন বললেন, “জিয়ক সেসময় একটা বই লিখছিলেন –দর্শনের বই, কিন্তু পুরোটাই অঙ্কের ওপর ভিত্তি করে। বইটা তিনি শেষ করে যেতে পারেন নি। তবে ওর পান্ডুলিপিটা আমার কাছে আছে …, ”
বৃদ্ধ চেয়ার থেকে উঠে বইয়ের আলমারি থেকে বার করে আনলেন একতাড়া কাগজ, “এটা পড়ে দেখলে পুরোটাই বুঝতে পারতে … কিন্তু তোমার বোধহয় আর সময় হবে না,” মাথা নেড়ে বৃদ্ধ কাগজগুলো জায়গায় রেখে এলেন।
“আমার স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়েছে বোধহয়। ওকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া দরকার। ”
“ঠিক। মেয়েদের ক্ষেত্রেই ওটা আগে কাজ করে। ”
“কি বললেন?”
“বলছি, মেয়েদের ক্ষেত্রেই ওটা আগে কাজ করে। ”
“ ‘ওটা’ মানে?”
“পাউডারটা। ”
“পাউডার! তার মানে আপনি বলছেন …, ” গ্রেসের দিকে একবার তাকিয়ে দুহাতে ভর দিয়ে বেশ কষ্ট করে উঠে দাঁড়াল টম, “আপনি চায়ে কিছু মিশিয়েছেন … ”
“তোমাকে তো এতক্ষণ ধরে বললাম,” বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়লেন জেসপার উইগিন, “তুমি কিছুই না বুঝলে কী করব? তোমার স্ত্রী আর আমার স্ত্রী সময়ের একই খোপের অংশীদার। ওদের জন্মদিন একই। দেখতেই তো পাচ্ছ যে আমি আর অ্যানা স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় অনেক বেশি বয়সী। সেটা কিভাবে সম্ভব হল, বুঝতে পারছ না?”
“তার মানে, আপনি … আপনারা মানুষ খুন করে … ”
“ঠিক ধরেছ। ”
“আর এখন আপনি গ্রেসকে খুন করতে যাচ্ছেন?”
“শেষবার ঠিক লোকটাকে পাওয়া গেছিল উনিশ বছর আগে,” বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “তাই না অ্যানা?”
বৃদ্ধা মাথা নেড়ে বললেন, “জেসপার সেদিক থেকে ভাগ্যবান। ও শেষ লোকটাকে পেয়েছিল আট বছর আগে। ”
“উন্মাদ! বদ্ধ উন্মাদ আপনারা!” চিৎকার করে উঠল টম মার্টিন, “গ্রেস, উঠে পড়! চলে এস! আমাদের এক্ষুণি এখান থেকে চলে যেতে হবে!” কিন্তু টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে স্ত্রীকে ধাক্কা দিয়ে জাগানোর আগে সে নিজেই টলে পড়ে গেল চেয়ারটার ওপরেই, মাথা ঝুঁকে পড়ল বুকের ওপর।
কয়েক মুহুর্ত পর, আপ্রাণ চেষ্টা করে মাথা তুলল টম, জেসপার আর অ্যানা উইগিনের মুখগুলো দেখার চেষ্টা করল। কি যেন একটা মনে পড়ি পড়ি করেও পড়ছে না –কি যেন ওরা বলেছিল –নাকি তারই কিছু একটা বলার ছিল, কিন্তু তখন বলেনি…
“ভয় নেই, খোকাবাবু, কোন কষ্ট হবে না,” বৃদ্ধ জেসপারের গলায় সহানুভূতির সুর, “তোমরা দুজনেই ঘুমিয়ে পড়বে। ”
“আমরা… দু-জ-নে…”
“নিশ্চয়ই। দুজনেই। তোমাদের দুজনকেই মেরে ফেলতে হবে। না হলে তো তুমি বলে দেবে সবাইকে। ”
“দাঁড়ান,” টম অতিকষ্টে ফিসফিস করে বলল। তার চোখের সামনে এখন ছায়ারা নাচানাচি করছে। “দাঁড়ান…”
“তুমি মরে গেলেও অবশ্য ক্ষতি হবে না কোনও। বরং তোমার সময়ের খোপের কারও লাভ হবে। সে আরও বেশিদিন বাঁচবে, যার জন্মদিন আর তোমার জন্মদিন একই। ”
“জন্মদিন,” বলে উঠল টম, “জন্মদিন! হ্যাঁ, হ্যাঁ, জন্মদিন! এই তো সেই কথাটা! আপনারা ভুল করছেন… এগারোই মে…” দারুণ কষ্ট হচ্ছিল তার কথা বলতে, তবু আরও দেরি হয়ে যাবার আগেই প্রাণপণ চেষ্টায় সে শেষ করতে চাইছিল তার কথাটা, “গ্রেসের জন্মদিন নয়…”
“শান্ত হোন মিঃ মার্টিন,” বিষণ্ণস্বরে বললেন জেসপার উইগিন।
“না, না! বিশ্বাস করুন, এটা সত্যি! গ্রেস এগারোই মে-তেই জন্মেছে, কিন্তু ম্যানিলায়! ম্যানিলা ফিলিপাইন্স-এ। ওর বাবা ওখানকার কলেজে পড়াতেন। ওটা আন্তর্জাতিক তারিখরেখার ওপারে। ওটা অন্য সময়-ক্ষেত্র! বুঝতে পারছেন কথাটা? পুরো একদিনের তফাৎ…”
তার চোখের সামনে এখন সব অন্ধকার, ঘর অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যে, তার মনে হল, ভেসে এল একটা কান্নার আওয়াজ। মনে হল বৃদ্ধা কাঁদতে শুরু করেছেন, এবং তারপর সে শুনতে পেল, সেটা নিশ্চিতভাবে বৃদ্ধ জেসপারের গলা, তিনি বলছেন, “শান্ত হও, অ্যানা, শান্ত হও। কেঁদো না। আমরা অন্য কাউকে পেয়ে যাব নিশ্চয়ই, বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই। আমরা অপেক্ষা করব…”
তারপর সব মুছে গেল টমের চোখের সামনে থেকে।
চোখে রোদ পড়ায় ঘুম ভেঙে গেল টমের। সে শুয়ে আছে সেই পেল্লায় খাটখানায়। পাশে শুয়ে গ্রেস, এখনও গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। তাদের জামাকাপড় পাটপাট করে ভাঁজ করে চেয়ারের ওপর রাখা।
টম একটা হাই তুলে উঠে বসল। গ্রেসেরও ঘুম ভেঙেছে। গ্রেস বলল, “সুপ্রভাত। ”
“এখানে আমরা এলাম কীভাবে বলতো? আমার তো কিছুই মনে পড়ছে না। ”
“আমারও। ”
“দোতলায় এলাম কীভাবে, জামাকাপড়ই বা ছাড়লাম কখন, ভাঁজই বা করলাম কখন? গ্রেস…,” টমের চোখে ভ্রূকুটি, “আমি কখনও জামাকাপড় ভাঁজ করি না, তুমি তো ভালো করেই জানো। ”
“আমার যা মনে পড়ছে,” গ্রেস মস্ত এক হাই তুলে বলল, “তা হল, আমি টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম,” ঘড়ি দেখল সে, “যাই হোক, এবার বেরোন উচিত। ন’টা বেজে গেছে। ”
খানিকক্ষণের মধ্যেই তারা তৈরি হয়ে নীচে নেমে এল। টমের হাতে সুটকেস। অ্যানা উইগিন ডাইনিং রুমেই ছিলেন, এগিয়ে এসে বললেন, “সুপ্রভাত! ঘুম ভাল হয়েছিল তো?” বলে তাদের মুখের দিকে তাকালেন।
“হ্যাঁ, হয়েছিল,” সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল টম।
“ কাল এত ক্লান্ত ছিলেন,” অ্যানা বললেন, “জলখাবার খেয়ে বেরোবেন তো?”
“না, এক্ষুনি বেরোব, অনেক দেরি হয়ে গেছে। ”
টম মানিব্যাগ বার করল। রাত্তিরের ভাড়াটা মেটাতে হবে। অ্যানা ওদের একটু অপেক্ষা করতে বললেন। কারণ তাঁর স্বামী চায়ের কাজ করতে মাঠে গেছেন, তাঁকে ডেকে আনতে হবে। অ্যানা গেলেন স্বামীকে ডাকতে, টম আর গ্রেস মার্টিন গেল তাদের গাড়ির দিকে। গাড়িতে সুটকেস তুলে দিয়ে গ্রেস বসে রইল, টম আবার ফিরে এল বাড়িতে, একা।
ফিরে এল, কারণ ডাইনিং রুমে এসেই তার নজরে পড়েছিল আগের রাত্তিরের সেই টেবিল, টেবিলের ওপর রাখা ট্রে, চায়ের সেট এবং পরের বারের কাপগুলো। ঐ কাপগুলো দেখেও প্রথমে সবই গোলমাল ঠেকছিল, পরক্ষণেই মনে পড়ে গেছিল আগের রাত্রের সমস্ত ঘটনাগুলো, গ্রেসেরও মনে পড়ে যায় ঘুমিয়ে পড়ার আগের সমস্ত ঘটনাই।
সে বইয়ের আলমারি থেকে চট করে টেনে আনল সেই কাগজের তাড়াখানা। । সত্যিই, এটা একটা পান্ডুলিপিই বটে, হাতে লেখা, পাতাগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হলদে হয়ে এসেছে। পান্ডুলিপির নাম –অঙ্কের মাধ্যমে জীবনের ব্যাখ্যা, লেখকের নাম লেখা আছে মারেক জিয়ক।
লেখকের নামের তলায়, অন্য একটা হস্তাক্ষরে লেখা –জন্মঃ ১৬১৩ মৃত্যু (দুর্ঘটনায়) ১৮০২।
রান্নাঘরে কারোর পায়ের আওয়াজ পেয়ে ঝট করে পান্ডুলিপিটা জামার ভেতর ঢুকিয়ে ফেলে বইয়ের আলমারির কাছ থেকে পিছিয়ে এল টম।
চমৎকার গাছে ছাওয়া রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছিল তাদের গাড়িখানা। গ্রেস বলল, “ওঃ, জানো, আমার এখনও ঘুম পাচ্ছে। অদ্ভুত বাড়িটা, না? ঐ বাড়িটায় ঢুকলেই বোধহয় ঘুম পায়। আর বুড়োবুড়িদুটোও কেমন অদ্ভুত রকমের। তবে ওদের দু’জনেরই ব্যবহার কিন্তু খুব ভাল। তাই না?”
“যা বলেছ,” টম বলল।
“কত বয়স্ক ওঁরা, না? আমার এখন আশ্চর্য লাগছে। ”
টম উত্তর দিল না। এ ব্যাপারটা তার আগেই ভাবা হয়ে গেছে। সে এখন ভাবছিল ঐ বাড়ি থেকে ঝেড়ে আনা পান্ডুলিপিটার কথা। কী সব অমূল্য সম্পদ লুকোনো আছে ঐ পান্ডুলিপিটার মধ্যে, ভাবা যায় না! এর মধ্যে অঙ্ক কষে, রীতিমত তথ্য দিয়ে বোঝানো আছে, একজন মানুষ কীভাবে দীর্ঘজীবন লাভ করতে পারে।
যদিও, পুরো ব্যাপারটাই ভুতুড়ে এবং অশুভ। তবুও…
ভাববে না ভেবেও সে ততক্ষণে ভাবতে শুরু করেছে তার স্ত্রীর এবং তার নিজের জন্মদিনের কথা।
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস