আগের পর্ব ধনেশ, মাছরাঙা, মুনিয়া, কাজল পাখি , দোয়েল-কোকিল-ময়নাবুলবুল, বকপাখি, মোনাল দেখার গল্প,পাঁচ বউয়ের কাহিনি, ঘুঘুর বাসা, টুনটুনি,বাঁশপাতি, মোহনচূড়া , হাট্টিমাটিমটিম থেকে হটিটি, রামগাংড়া, ডাহুক কেন ডাকে, বাদামি কোকিল, পাপিয়া, পাতি জলমুরগি, প্যাঁচা, পানডুবি, নীলকণ্ঠ, কাস্তেচরা, চাতক, কালো মথুরা, কস্তুরা, চটক
(Rufous Gorgeted Flycatcher)

আজ পর্যন্ত যত চুটকি গোত্রের পাখি দেখেছি, বোধ হয় এই কমলাকণ্ঠি চুটকিই হল সবথেকে শান্ত প্রকৃতির পাখি। তা না হলে এই গোত্রের পাখিদের ছবি তোলা এক বড়ো ধরনের সমস্যা। কিছুতেই এক স্থানে স্থির হয়ে বসে থাকে না। অনেকটা টুনটুনির মতো। কিন্তু হিমালয়ের এই পাখিদের নিজ গোত্রীয় পাখিদের তুলনায় একটু ভিন্নরকমের স্বভাব। এক স্থানে বসে থেকে শিকারের অনুসন্ধান করতে থাকে। শিকারের সন্ধান পেলেই ফুড়ুৎ করে উড়ে ধরে নিয়ে এসে আবার যথাস্থানে ফিরে আসে। তাই পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পং জেলার কোলাখাম গ্রামে ভ্রমণ করতে গিয়ে এই পাখির ছবি বেশ অঙ্গবিন্যাসের সঙ্গে সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। সেই বিবরণই এবারের পাখি দেখা পর্বের বিষয় করে তুললাম।
পাখির বিবরণ দেওয়ার আগে প্রথমে এই অদ্ভুত সুন্দর হিমালয়ের গ্রাম্বের কথায় আসা যাক। ৬,৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত নেওড়া উপত্যকা অভয়ারণ্যের মধ্যে পড়ে এই কোলাখাম গ্রাম। মূল সদর শহর লাভা এখান থেকে প্রায় ১৫ কিমি দূরত্বে। যাবতীয় যা কিছু, এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী থেকে আরম্ভ করে চিকিৎসা ব্যবস্থা পর্যন্ত এই শহরে। হঠাৎ করে রাতের দিকে কেউ অসুস্থ হলে যদি তাকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করতে হয় তাহলে এই নেওড়া জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গাড়ি করে এক অসম্ভব খারাপ রাস্তায় ১৫ কিমি পার করে তবেই হাসপাতালে পৌঁছতে হবে। ছায়াছবিতে যেমন আমরা দেখি যে বিপদের সময় যেমন পথ শেষ হয় না, গাড়ি চলতেই থাকে, এখানেও সেইরকম। দিনের বেলাতেই গা ছমছম করে। তাহলে রাতে কী হতে পারে চিন্তা করলে হাড় হিম হয়ে যায়। এক রক্ষে এই বনে হাতি নেই, হিংস্র প্রাণীদের মধ্যে আছে কেবল লেপার্ড ও ভালুক।
আমি যখন এই গ্রামে পৌঁছাই তখন সূর্যাস্ত হয়ে গেছে এবং অন্ধকার নেমে এসেছে। লাভা চেক-পোস্ট থেকে ১৩ কিমি পথ আর কোনও গাড়ি কোনও দিকেই চলতে দেখলাম না। আমার গাড়ি একাই চলেছে হেড-লাইট জ্বালিয়ে এই পথে। চালককে জিজ্ঞাসা করলাম কখনও কোনও বন্যপ্রাণীর সম্মুখীন হয়েছে কি না। সে হেসে বলে বহুবার হয়েছে তার অভিজ্ঞতা। চিতা অর্থাৎ লেপার্ড (লেপার্ডকে স্থানীয়রা চিতা বলে) বহুবার গাড়ির সামনে এসেছে, তারপর পাহাড়ের ঢাল ধরে নীচে উপত্যকায় নেমে গেছে। এখন পর্যন্ত এখানে কোনও মানুষের ওপর লেপার্ড অথবা ভালুকের আক্রমণের কথা শোনা যায়নি। তবে প্রায়ই নাকি গ্রামের হাঁস-মুরগি, গোরু-ছাগল তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গত ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ সালে শুনেছিলাম, এই গ্রামে মাত্র ৫৬০ জনের বসবাস। পর্যটকের সংখ্যাও নেহাত কম। যারা আসে কোলাখাম বেড়াতে, তারা হয় লাভা নয় লোলেগাঁওতে রাত্রিবাস করে। এখানে কেবল ছাঙ্গে জলপ্রপাত দেখে ফিরে যায়। আমার মতো পক্ষীপ্রেমী অথবা দুঃসাহসী প্রকৃতি প্রেমিক খুব কমই আছে যারা কোলাখামে থাকতে সাহস দেখাবে। আমি এই পাহাড়ি গ্রামে পাঁচ রাত কাটিয়ে মন ভরে কেবল পাখিই দেখিনি, বরং বহু মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি যাঁদের আমার মনে হয় অনেক বেশি দুঃসাহসী। তাঁদের একজন হলেন সেখানকার হোম-স্টের মালিক। আদপে চণ্ডীগড়ের মানুষ, কিন্তু চেয়েছেন এই পাহাড়ি গ্রামে বসবাস করতে। যেখানে হোম-স্টে বানিয়েছেন সেটা ছিল একসময় কোনও বাঙালি ভদ্রলোকের। তাঁর থেকে ক্রয় করে এক হোম-স্টে বানিয়েছেন যেখানে বৈদ্যুতিক সংযোগ সৌরশক্তি দ্বারা পরিবেশিত। চণ্ডীগড় থেকে হিমাচল প্রদেশ পাথর ছোড়া দূরত্বে হওয়া সত্ত্বেও তিনি কাঞ্চনজঙ্ঘার কাছে থাকতে বেশি পছন্দ করেছেন। আজ তিনি কিন্তু যথেষ্ট জনপ্রিয় এই পাহাড়ি গ্রামের মানুষের কাছে।
ফিরে আসি আবার পাখির কথায়। হোম-স্টেতে আমার জন্য একটা স্থান বরাদ্দ করে রাখা ছিল। পাখি দেখার আদর্শ জায়গা। ৩৬০ ডিগ্রি দৃষ্টিকোণ। পাখিরা যেখানেই থাকুক দেখা যাবেই। আর আমার গদা লেন্সে তারা ধরা পড়তে বাধ্য। হোম-স্টের সামনে যে জমি রয়েছে সেখানে নানারকমের সবজির ফলন হচ্ছে। তাছাড়া একটা বাঁশের মাচা বানানো আছে আর তাতে শসার ফলন চলছে। সামনে অনেক প্রকারের গাছগাছালি আর সেখানে বসে হিমালয়ের বহু প্রজাতির পাখির মেলা। হঠাৎ করে দেখি সেই বাঁশের মাচার ওপর একটা ছোটোমতো পাখি বসে রয়েছে। গলার কাছে একটা কমলা রঙের পট্টি। ভীষণ নীচু স্বরে ডাক তার, খুব মনোনিবেশ না করলে শোনা যায় না। পাখিটাকে আমি এক দেখাতে চিনতে পেরেছি। সামাজিক মাধ্যমে আমার কিছু পক্ষীপ্রেমী বন্ধুরা হিমালয় বেড়াতে এলে এই পাখির ছবি তুলে সেখানে দিয়ে দেয়। তাই চিনতে অসুবিধে হয়নি। এই পাখির নাম কমলাকণ্ঠি চুটকি – রুফাস জরজেটেড ফ্লাইক্যাচার ইংরেজি নাম।
হোম-স্টের মালিকের নাম শ্রী সন্দীপ সাইগল। তিনি আমাকে আমার পছন্দের স্থান দেখিয়ে দিয়েছেন যেখানে সারাক্ষণ বসে আমি প্রাণভরে পাখি দেখা ও ছবি তোলার কাজ নির্বিঘ্নে করতে পারি। আগেই লিখেছি, পক্ষীপ্রেমীদের জন্য স্থানটি চমৎকার। বসার জন্য সুন্দর চেয়ার আর সামনে বড়ো লেন্স লাগানো ভারী ক্যামেরার জন্যেও একটি বিশেষ জায়গা রয়েছে আর সেখান থেকে বসে ৩৬০ ডিগ্রি দেখা যায়। যেখানে বসে ছবি তুলেছি তার বাঁদিকের পাহাড়ে রিশভ ও লোলেগাঁও, পেছনে লাভা আর সামনে সিক্কিম আর দু-দিকের পাহাড়ের মাঝে শূন্যস্থানে ফাঁকা আকাশে সামনে থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য। যদিও এবারের ভ্রমণে সেই দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হয়নি অতিরিক্ত ফগের কারণে। তবে পাহাড়ের নীচে উপত্যকার মধ্যে দিয়ে সরু নালার মতো বয়ে চলা খরস্রোতা ঋষি নদীর আওয়াজে সেই শূন্যতাও উধাও হয়ে যায়। আর তার সঙ্গে রয়েছে পাখির কলরব। এই দুই মিলিয়ে শান্ত কোলাখামে কোলাহলের সৃষ্টি করেই চলেছে।
এই কোলাখাম পাহাড়ি গ্রামে এসে আমার একজনের কথা খুব মনে পড়ছে। তিনি হলেন আমাদের জয়ঢাকের শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় যিনি পাহাড়ি গ্রাম নিয়ে তাঁর গ্রন্থ ‘পাহাড়ি গ্রামের গল্প’-এ সুন্দর সব গল্প লিখেছেন। আমার মনে হয়েছে যদি শান্তনু এই গ্রামে একবার ঘুরে যেতেন আরও একটা সুন্দর গল্প পাঠক উপহার পেতে পারত। কোলাখামে আমি যত প্রকারের পাহাড়ি পাখি দেখেছি তা নিয়ে প্রত্যেকটি সংখ্যায় লিখতে গেলে বার বার একই কথার পুনরাবৃত্তি হবে। তবে পাখির বর্ণনা বদলাতে থাকবে। হিমালয়ের এমন বহু স্থান আছে যেখানে পক্ষীপ্রেমীদের বিচরণ চলতেই থাকে পর্বতারোহীদের মতো। উত্তরাখণ্ডের সাত্তাল ও প্যাঙ্গোট নামে দুই পাহাড়ি গ্রাম যেখানে পর্বতারোহীদের চেয়ে পক্ষীপ্রেমীদের ভিড় বেশি হয়। কালিম্পংয়ের কোলাখাম এমনই এক পাহাড়ি গ্রাম যেখানে পর্বতারোহী ও পক্ষীপ্রেমী দুই-ই দেখা যায়। লাভার মোড় থেকে কোলাখামের দিকে পথ ঘুরতেই চেক-পোস্টে নাম ও গাড়ির নাম্বার নথিভুক্ত করতে হয়। গাড়ি পিছু কিছু শুল্ক দিতে হয় এখানে। কিছুটা এগোলেই একটি সরু চড়াই পায়ে হাঁটা পথ ডানদিক দিয়ে ওপরে উঠে যায় নেওড়া ভ্যালি অভয়ারণ্যের মধ্যে দিয়ে। সেই পথ ধরে পর্বতারোহী ও পক্ষীপ্রেমীরা রাচেলার দিকে এগিয়ে যায়। সেখান থেকে তারা কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব দৃশ্য দেখে তাদের চোখ ও জীবন সার্থক করে তোলে আর পক্ষীপ্রেমীরা পেয়ে যায় কিছু বিরল হিমালয়ের পাখি।
আমাকে অবশ্য সেদিকে পাড়ি দিয়ে হয়নি। আমি সন্দীপবাবুর হোম-স্টের পাখি দেখার প্ল্যাটফর্ম থেকেই পেয়ে গিয়েছি বহু বিরল পাখি। সবক’টি পাখি নিয়েই আগামী পর্বগুলিতে উপস্থিত হব। এবারের মতো এই কমলাকণ্ঠি চুটকিতেই সীমাবদ্ধ থাকি। অন্যান্য চুটকিদের মতো চঞ্চল নয় বরং আমার মনে হল বেশ শান্ত স্বভাবের। একজায়গায় বসে অনেক সময় দেয় চিত্রগ্রাহককে তার ছবি তোলার। বসে থেকে বোধ হয় মাথা এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে কেবল দেখতে থাকে। বাংলায় চুটকি নাম হলেও ইংরেজি নাম ফ্লাইক্যাচার অর্থাৎ ফ্লাই অথবা পোকামাকড় শিকার করে খায়। তাই সমানে মাথা ঘুরিয়ে শিকারের সন্ধানে থাকে। ছবি অনেক ভঙ্গিমায় তোলা গেছে, কিন্তু একজন চিত্রগ্রাহকের কাছে সেরা ছবি একটাই হয়। তাই সেই ছবিটাই লেখার শুরুতে দিলাম।
পাখি দেখার বিভিন্ন গ্রন্থে এই পাখির বিবরণ দিতে গিয়ে বলা আছে যে শান্ত স্বভাবের ও লাজুক প্রকৃতির। সাধারণত একা থাকতে পছন্দ করে। আমিও একাই দেখেছি একে প্রতিদিন আমার কোলাখামে থাকাকালীন। এই পাখির ডানা পিঠ সমেত ওপরটা গাঢ় জলপাই-বাদামি রঙের। কপাল-ভ্রূ সাদা। গলা এবং মুখ-চোখের সামনেটা কালচে স্লেটরঙা। বুক নীলচে ধূসরাভ। গলা ও বুকের মাঝবরাবর উজ্জ্বল কমলাটে ছাপ আর কালো লেজের গোড়ার দু-ধারে সাদা রঙের লম্বাটে টান দুটি বেশ পরিষ্কারভাবে চোখে পড়ে। পা দুটো ফিকে কালচে বাদামি রঙের। স্ত্রী পাখির গায়ের রঙ ফ্যাকাসে মতো। কিন্তু এখানে আমি কেবল পুরুষ চুটকির দেখা পেয়েছি কারণ, সে বোধ হয় একাই থাকতে পছন্দ করে। বেশি ঝুট-ঝামেলা সঙ্গে নিতে একবারেই নাপসন্দ। তবে একটা কথা না বললে চলে না যে এই পাহাড়ি গ্রাম এতটাই শান্ত যে আমার থেকে অন্তত দশ মিটার দূরত্বে বসে থাকা এই পাখির খুব ক্ষীণ ডাকের শব্দও আমি শুনতে পেরেছি। ঋষিখোলার বয়ে চলার শব্দকেও ছাপিয়ে এই কমলাকণ্ঠি চুটকির গলার ডাক শোনা গেছে এটা অবশ্যই বিস্ময়কর ব্যাপার। এই জন্যেই আমার মনে হয়েছে কোলাখামের কোলাহল কেবল প্রকৃতির আওয়াজের।
বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে