বনের ডায়েরি-পাখি দেখা- চটক -অলোক গাঙ্গুলী-বসন্ত’২৫

আগের পর্ব ধনেশ, মাছরাঙা, মুনিয়া, কাজল পাখি , দোয়েল-কোকিল-ময়নাবুলবুল, বকপাখি, মোনাল দেখার গল্প,পাঁচ বউয়ের কাহিনি, ঘুঘুর বাসা, টুনটুনি,বাঁশপাতি, মোহনচূড়া , হাট্টিমাটিমটিম থেকে হটিটি, রামগাংড়া, ডাহুক কেন ডাকে, বাদামি কোকিল, পাপিয়া, পাতি জলমুরগি, প্যাঁচা, পানডুবি, নীলকণ্ঠ, কাস্তেচরা, চাতক, কালো মথুরা, কস্তুরা

ঝুঁটিয়াল চটক/বান্টিং (Crested Bunting)

লাল কান চটক/বান্টিং (Chestnut Eared Bunting)

হিমালয় ভ্রমণকালে পাহাড়ি পাখির দেখা পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের প্রয়োজন, বিশেষ করে পাখি দেখা যাঁদের নেশা বলে চলে। খুব উঁচু পাহাড়ে একরকমের পাখি দেখা যায়, আবার হিমালয়ের পাদদেশে অন্যরকম কিছু পাখি। কিন্তু যেখানেই অবস্থান হোক না কেন, এইসব বাহারি পাখির দিকে চোখ মেলে কেবল তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। এইসব পাখিদের মধ্যে চটক অথবা বান্টিং অবশ্যই সেরকম একটি পাখি। দু-রকমের চটক আমার দেখা এখনও পর্যন্ত হিমালয় ভ্রমণ অথবা ট্রেকিংয়ের সূত্রে।—

১) লাল কান চটক/বান্টিং (Chestnut Eared Bunting)
২) ঝুঁটিয়াল চটক/বান্টিং (Crested Bunting)
উপরোক্ত দুই বান্টিং ছাড়াও আরও যে-প্রকারের বান্টিং দেখা যায় সেগুলো নিম্নোক্ত ꞉-

৩) পুটুস (Yellow Breasted Bunting)
৪) সোনা পাখি (Black Headed Bunting)
৫) কালো মুখ বান্টিং (Black Faced Bunting)
৬) ছোটো বান্টিং (Little Bunting)
৭) লাল বান্টিং (Chestnut Bunting)
৮) পাইন বান্টিং (Pine Bunting)
৯) রক বান্টিং (Rock Bunting)
১০) সাদা মাথা বান্টিং (White Capped Bunting)
১১) দাগি বান্টিং (Striolated Bunting)
১২) হলুদ মাথা বান্টিং (Yellow Hammer)
১৩) মেটে ঘাড় বান্টিং (Grey Necked Bunting)

‘বার্ডস অফ ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্ট’ বই ঘেঁটে এই ১৩ প্রকারের বান্টিংয়ের সন্ধান পাওয়া গেল যার মধ্যে আমার ভাগ্যে কেবল প্রথম দুটি দেখা দিয়েছে। এই প্রতিটি পাখিই হিমালয়ের বাসিন্দা এবং শীতকালের পরিযায়ী হিসেবে সারাদেশেই দেখা যায়। অর্থাৎ, এর পর থেকে গ্রীষ্মকালে হিমালয় ভ্রমণের সময় একটু চোখ খোলা রাখলে দেখা মিলতে পারে এই পাখির, আবার শীতকালে সমতলেও দেখা পাওয়া যেতে পারে এদের।

পরের ১১টি পাখির বিশদ বিবরণে আর গেলাম না। গুগলে একটু খোঁজ করলেই এদের ব্যাপারে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। এবার আসি প্রথম দুটোর কথায়—কীভাবে আর কোথায় এদের দেখা পেলাম।

ঝুঁটিয়াল চটক/বান্টিং

২০১৭ সালে নভেম্বর মাসে গিয়েছিলাম জিম করবেট অভয়ারণ্যের বিজরানি অঞ্চলে। সেখানকার অনুমোদিত বিখ্যাত ফরেস্ট রেস্ট হাউসে ঠাঁই পেয়েছিলাম। এই রেস্ট হাউসটি ১৯২৮ সালে স্থাপিত এবং স্বয়ং করবেট সাহেবও বাস করেছেন এবং বহু মানুষখেকো বাঘের শিকারও করেছেন। নিজেকে বেশ সৌভাগ্যবান মনে হয়েছিল সেই বাসভবনে দু-রাত্রি যাপন কালে। আর সেই ফরেস্ট রেস্ট হাউসে থেকে জিপ সাফারিতে গিয়ে একই দিনে তিনবার বাঘ দর্শন। একে করবেট সাহেবের আশীর্বাদ ছাড়া আর কী বলব। ক’জন পর্যটক শুনে জানাল যে পরপর তিন বছর ধরে এই অভয়ারণ্যে এসে একবারও বাঘের দেখা মেলেনি। আবার কবে যাওয়া হবে অথবা আর কখনও যেতে পারব কি না জানি না, কিন্তু এই সফরে যা পেয়েছি তাতে মন তৃপ্ত হয়ে গেছে।

এখানে সকাল ৭টায় সাফারি আরম্ভ হয়। আমরা ভোর ৪টার সময় এসে পৌঁছেছিলাম। আমাদের গাড়ির চালক ও গাইড রশিদ আমাদের বলে দিল আমরা যেন তৈরি হয়ে ৭টার সময় ফটকে অপেক্ষা করি। কে জানত যে ওই দিনই করবেট সাহেবের কৃপা হবে আমাদের কপালে! আমরা সাড়ে ছ’টার মধ্যেই তৈরি হয়ে রশিদের অপেক্ষায় রয়েছি। আমার সময় কাটাবার বিকল্প তো আছেই। আশেপাশে গাছের ডালপালায় পেয়ে গেলাম অনেক প্রকারের হিমালয়ের কাঠঠোকরা। মাঠের মধ্যে কিছু অন্যান্য হিমালয়ের পাখিও পেলাম। ইতিমধ্যে রশিদ চলে এসে দেখল যে আমি পাখির ছবি তুলতে ব্যস্ত। ও নিজে একজন পাখি বিশেষজ্ঞ এবং পাখির ডাক শুনে নামে বলে দেয় পাখিটি না দেখেই। গাড়ি থেকে নেমে আমার হাত ধরে নিয়ে এল ফটকের কাছে এক গাছের দিকে। আঙুল তুলে নির্দেশ করল সেই গাছের ডালে। আমি অবাক হলাম, গাড়ি চালাতে গিয়েও ওর চোখে কিছু বাদ পড়ে না। আমি পরে ওর দৃষ্টিকে পাখির চোখ বলে আখ্যা দিয়েছিলাম। ওর জন্যেই এই অভয়ারণ্যে পেঁচা ছাড়া আর কিছুই বাদ পড়েনি।

ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডার দিয়ে দেখে নিলাম এক নতুন পাখি। মাথায় একটা সুন্দর ঝুঁটি। পুরুষ পাখি। পুরোপুরি চকচকে নীলচে কালো, কেবল ডানা আর লেজ গাঢ় বাদামি রঙের। মোটা তেকোনা ঠোঁটটি আবার গোলাপি রঙের। স্ত্রী পাখিটি তুলনায় ময়লা ধূসরাভ, সঙ্গে হালকা বাদামি ভাব মেশানো। ওপরে আর বুক জুড়ে কালচে ছিট-ছোপে ভরা থাকে। পুরুষদের তুলনায় ঝুঁটি ছোটো। এমনকি ডানা, লেজের মরচে বাদামি রঙও অতটা গাঢ় নয়। এরা মূলত হিমালয়ের পাখি হলেও শীতে পরিযায়ী হয়ে সমতলে চলে আসে। এদের বেশিরভাগ পরিত্যক্ত জমিজমা, শুষ্ক ঝোপঝাড়, ঘাসে ঢাকা সমতল কিংবা পাথুরে পাহাড়ি অঞ্চলে দেখা যায়। এই প্রথম কোনও বান্টিংয়ের হদিস পেলাম, তাও আবার আমাদের গাইড রশিদের কল্যাণে। পাখিটি চুপ করে গাছের ডালে বসে একবার ডানদিকে তো একবার বামদিকে মাথা ঘুরিয়েই চলেছিল। যাই হোক, লেন্স বন্দি করতে কোনও প্রকার অসুবিধে হয়নি আমার। শীতকালে আমার এলাকার অনেক সমতল ঘাসভূমিতে এই পাখির খোঁজ করেছি, কিন্তু দেখা পাইনি।

লাল কান চটক/ বান্টিং

২০১৮ সালের মে মাসে দ্বিতীয় বারের জন্য টংলুর উদ্দেশে যাত্রা করেছিলাম। প্রথম বার ২০১৫ সালে। কেন জানি না, এদিকে কেউ আসতে বললে আর নিজেকে বেঁধে রাখতে পারি না। কেবল পাখি আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যানের মধ্যে দিয়ে হাঁটা আর ভাগ্যক্রমে যদি বিরল লাল পাণ্ডার দেখা পাওয়া যায়। দুর্ভাগ্যক্রমে দু-বারের একবারও এই প্রাণীটির দেখা পেলাম না। অবশ্যই প্রচুর পাখির দেখা পেয়েছি এই অঞ্চলে আর তার মধ্যে অবশ্যই রয়েছে লাল কান চটক অথবা চেস্টনাট ইয়ারড বান্টিং। চড়াই পাখির আকার হবে, তবে চেনা যায় কান দেখে। কানের কাছে একটুকরো লাল ছোপের কারণে এর এমন নাম। উড়লে লেজের সাদা পালক দৃশ্যমান হয় যা দেখে সহজেই দূর থেকেও একে চেনা যায়। মাথার চাঁদি থেকে ঘাড়ে হালকা বাদামি-ধূসরের ওপর সূক্ষ্ম কালচে ছিটে ঢাকা। ওপরে ডানা, পিঠ ফিকে লালচে-বাদামি রঙের, সঙ্গে বড়ো বড়ো কালচে ছিট-ছোপে ভরা। এই পাখি প্রধানত হিমালয়ের বাসিন্দা, কিন্তু শীতে এরা পরিযায়ী হয়ে সমতলের ঘাসভূমি অঞ্চলে নেমে আসে।

ফিরে আসি আবার টংলুতে যেখানে সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম এই চটক অথবা বান্টিংয়ের। বাংলা নাম আমার খুব পছন্দের, কারণ বেশ চটক পাখি। অবশ্য বাকি যে-ক’টি চটকের উল্লেখ করা আছে ওপরে, সেগুলোর দেখা আমি এখনও পর্যন্ত পাইনি। তারাও কতটা চটক সেটা না দেখা পর্যন্ত বলা যাবে না।

আগের রাতে বেশ বৃষ্টি হয়েছিল তাই একটা আশা ছিল যে পরের দিন সকালে আকাশ পরিষ্কার থাকবে আর আমরা এবারও কাঞ্চনজঙ্ঘার দর্শন পাব। হলও তাই, সকালে ঘুম থেকে উঠে বাইরে গিয়ে দেখে নীল আকাশের নীচে সাদা ধবধবে কাঞ্চনজঙ্ঘা। এই দৃশ্য পুরোনো হওয়ার নয়। যতবার দেখি ততবার নতুন মনে হয়। চোখ মেলে প্রকৃতির এই অদ্ভুত সৌন্দর্য দেখে যেতেই ইচ্ছে করে। খুব কম বাঙালি আছেন যাঁরা আমার সঙ্গে একমত হবেন না। কলকাতার বাঙালি সুযোগ পেলেই উত্তর মুখে ছুট দেয়, কারণ এই একই—কাঞ্চনজঙ্ঘার কাঞ্চন রূপ দেখার জন্য। পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ আমাকে তার প্রাকৃতিক শোভার সঙ্গে উপহার দিয়েছে তার স্থানের আবাসিকদেরও। নানা রঙের সুন্দর পাখি আর তারই মধ্যে চমৎকার লাল কান চটক।

ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই আগে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শনের জন্য বাইরে বেরিয়ে এলাম। আগের বারের অভিজ্ঞতা আমার সঙ্গে রয়েছে যার জন্য ক্যামেরা আগের রাতেই তৈরি রাখা ছিল। মস্তিষ্কে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম, অবশ্য সঙ্গে মোবাইল ফোনেও। কিন্তু সেই অ্যালার্ম বেজে ওঠার আগেই আমি ঘুম থেকে উঠে পড়েছি। ২০১৫ সালের কথা আমার মনে আছে টংলু আসার। সারারাত ধরে বৃষ্টি হয়েছিল অঝোরে আর মনে অশান্তি নিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। কখন বৃষ্টি বন্ধ হয়েছে টের পাইনি। সঙ্গী-সাথীদের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। এক লাফে বাইরে বেরিয়ে চোখের সামনে দেখতে পেলাম সোনালি আভায় কাঞ্চনজঙ্ঘা, যেন নামের সঙ্গে মিলেমিশে রয়েছে। প্রথম বার মনে হলে এত কাছ থেকে পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ দেখছি। তার আগে অবশ্য দার্জিলিং এবং সিকিম থেকে দেখেছি, কিন্তু এখানে মনে হল হাত বাড়ালেই ধরা যাবে। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদাকে নিয়ে গল্প ‘দার্জিলিং জমজমাট’-এর এক দৃশ্যে জটায়ু যখন প্রথম বার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখলেন আর তাঁর যে অনুভূতি হয়েছিল, আমারও ঠিক যেন ওরকমই মনে হচ্ছিল। অবশ্য বাঙালির কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অনুভূতি প্রত্যেকবার একইরকম হয়, অন্তত আমার ক্ষেত্রে তো তাই। এবার আর কোনও ঝুঁকির মধ্যে যাওয়া নেই। আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে গেছে। মস্তিষ্কের অ্যালার্ম বেজে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গেই উঠে পড়ি। মোবাইলের অ্যালার্ম অনেক পরে বেজে উঠে আমাকে বিরক্তই করেছে মাত্র। ক্যামেরা নিয়েই বাইরে বেরিয়েছি, আর সেদিন আর কেউ শয্যা ছাড়েনি। এবার আর অবাক হওয়ার জন্য নয় বরং জেনেই বাইরে এসেছি যে দর্শন পাওয়া যাবেই। সোনালি আভায় সেই সোনায় মোড়ানো আমাদের অতি প্রিয় কাঞ্চনজঙ্ঘা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ ও রঙ দুই-ই বদলেছে। আর বেড়েছে নানা রঙের পাখিদের আনাগোনা। পরের টংলু অভিযানের সময় আমাদের জয়ঢাকি দলে সঙ্গে কিছু কচিকাঁচারাও ছিল যাদের প্রকৃতি সংরক্ষণের পাঠ দেওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে অনেকেই নিম্নবিত্ত ও দুঃস্থ বাড়ির সন্তান যাদের সামর্থ নেই এই স্থানে আসার। তাই আমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই তাদের একজন করে দায়ভার নিয়ে ওদের পাহাড় ও প্রকৃতি দেখাতে নিয়ে আসা যাতে ওরা ফিরে গিয়ে ওদের ভাইবোন, বন্ধুদের প্রকৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে পারে। তার সঙ্গে চলেছে পাখি পাঠশালাও। তাদের বোঝানো যে পশু, পাখি এমনকি পোকামাকড় পর্যন্ত আমাদের বেঁচে থাকার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

বিভিন্নরকমের পাখি দেখার পর আমার চোখ গিয়ে পড়ল ছোটো এক গাছের মগডালের ওপর। সেখানে চড়াই পাখির আকারের এক পাখি বসে রয়েছে। আমার সঙ্গে সেইসব বাচ্চারাও ছিল। ওদের আগেই বুঝিয়েছিলাম যে পাখি দেখার প্রথম পাঠ হল নীরবতা রক্ষা করা আর চোখ-কান খোলা রাখা। কেউ পাখি দেখলেও দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য কেবল আঙুল তুলে ইঙ্গিত করবে, মুখে কোনও কথা বলা যাবে না, তাহলে পাখি ভয় পেয়ে উড়ে যাবে। তাই আমি যখন সেই পাখি দেখলাম তখনই ইশারা করে সকলকে থেমে যেতে বললাম। আমি আগে পাখিটির ছবি তুলে নিলাম। যখন নিশ্চিত হলাম যে এই পাখি লাল কান চটক অথবা বান্টিং ছাড়া আর কিছু নয় তখনই বাচ্চাদের পাখির ব্যাখ্যা দেওয়া শুরু করি। হিমালয় পরিদর্শনের এই সুবিধা, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে গেলে, (এপ্রিল-মে মাসে) তখন ভরপুর পাখির দেখা মেলে। এই চটকই আবার শীতের পরিযায়ী হয়ে সমতলের ঘাসভূমিতে চলে আসে। এর পরে লাল কান চটকের দেখা পেলে মনে রাখতে হবে এক কথা—কান দিয়ে যায় চেনা।

বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে

Leave a Reply