সিন্ধুনদীর তীরে –প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব, পঞ্চম পর্ব, ষষ্ঠ পর্ব , সপ্তম পর্ব, অষ্টম পর্ব, নবম পর্ব , দশম পর্ব, একাদশ পর্ব, দ্বাদশ পর্ব, ত্রয়োদশ পর্ব, চতুর্দশ পর্ব, পঞ্চদশ পর্ব, ষোড়শ পর্ব, সপ্তদশ পর্ব

একাদশ অধ্যায়-প্রত্যাবর্তন
“মাথার ওপর চোখ রাখো মাণ্ডুপ। ওইখানে শৈত্যমৎস্য তাঁর নির্দিষ্ট আসনে উপস্থিত কি? তাঁকে চিহ্নিত করো।”
পাথরে শুয়ে তীক্ষ্ণচোখে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল মাণ্ডুপ। সেখানে নেমে আসতে থাকা আধো অন্ধকারে একে একে উদিত হচ্ছে নক্ষত্রমৎস্যের দল। কিরামের প্রশ্নটা শুনে তার মুখ হালকা হাসি ফুটে উঠল। পরীক্ষা করছেন তিনি তাকে। এ তার জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাস, দুয়েরই পরীক্ষা। মাথা নেড়ে সে জবাব দিল, “নক্ষত্রমৎস্যেরা গগনসমুদ্রে সতত চলমান। নির্দিষ্ট সময় বিনা কোনো ঋতুরাজ নক্ষত্রমৎস্য নির্দিষ্ট আসনে উপস্থিত হয় না কিরাম। হেমন্তরাজের আসন গ্রহণের সময় এখনো আসেনি।”
“চমৎকার,” কিরামের তৃপ্ত গলা শুনে বোঝা গেল তাঁর কূট ছলনার ফাঁদে ছাত্রটি পা না দেয়ায় খুশিই হয়েছেন তিনি, “আর কতক্ষণ?”
পশ্চিম দিগন্তে রৌপ্যমৎস্য এখনও উপস্থিত। তার অস্তগমনের পর ত্রিশ হস্তপরিমিত খেত কর্ষণ করতে যতটুকু সময় লাগে তা পার হলে…”
“কী করে বুঝবে যে সেই সময় হয়েছে?”
“রক্তচক্ষু লোহিত মৎস্য পূর্বদিগন্তে দেখা দিয়ে মুষ্টিপরিমাণ ঊর্ধ্বগমন করলে সেই সময় আসবে কিরাম।”
“ভালো ভালো। নক্ষত্রবিদ্যায় তোমার অগ্রগতি প্রশংসনীয় হে ইন্দাতীরের যুবক।” কিরামের গলা শুনে বোঝা যাচ্ছিল, সন্তুষ্ট হয়েছেন তিনি, “এবারে আরো দুটি প্রশ্ন। এক, চন্দ্রবৃত্তের কোন দিবস আজ?”
আকাশে চাঁদ নেই এখন। তবে এ প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য চন্দ্রকলার দিকে তাকাবার কোনো প্রয়োজন ছিল না মাণ্ডুপের। তেরদিন আগের রাতে চন্দ্রমা পূর্ণরূপে দৃশ্য হয়েছিলেন। মাণ্ডুপ এখন একটা মাটির পাটায় দাগ কেটে কেটে সে হিসাব রাখায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
“নিতান্তই শিশুর যোগ্য প্রশ্ন কিরাম। আজ হেমন্তের চন্দ্রবৃত্তের চতুর্থ ভাগের চতুর্দশ দিবস।” বলতে বলতে ভূমিশয্যা ছেড়ে উঠে দাঁড়াচ্ছিল সে।
“বেশ। এবারে শেষ প্রশ্ন। এই বাক্যালাপ চলাকালিন তুমি একটা ভুল তথ্য দিয়েছ। সেটা কী?”
মাণ্ডুপ অস্বস্তিভরে মাথা নাড়ল। কিরাম বড়ো খুঁতখুঁতে মানুষ। তীক্ষ্ণ কান। বেফাঁস কথাটা মুখ থেকে বের হয়ে যাবার পর থেকেই সে তাই এই প্রশ্নের আশঙ্কায় ছিল। মাথা নেড়ে সে বলল, “সমস্ত নক্ষত্রমৎস্যই চলমান হন না। সমস্ত যাঁকে ঘিরে আকাশের সকল নক্ষত্রমৎস্যেরা গগন পরিক্রমা করেন, উত্তরের সেই নক্ষত্রমৎস্য চিরস্থির।” বলতে বলতেই তার গলায় কৌতূহল ঘিরে আসে, “কিন্তু কিরাম, গগনসমুদ্রে একটি মৎস্য অচল থাকে কোন শক্তিতে?”
দুদিকে মাথা নাড়লেন কিরাম। এ প্রশ্নের উত্তর তাঁর জানা নেই। একটা বিস্ময়ের বোধ ছেয়ে যাচ্ছিল তাঁকে। মাত্রই এক বছরের প্রশিক্ষণে এই যুবক স্বাধীন ভাবনা ও প্রশ্ন করবার শক্তি অর্জন করেছে। এমন প্রশ্ন, যা তার শিক্ষককেও মৌন রাখতে পারে। মনরাক্ষস দোরাদাবুর প্রভাবে বেড়ে ওঠা কোনো মানসিক দাসের পক্ষে এ বড়ো কম সাফল্য নয়!
উত্তর আকাশে চিরস্থির নক্ষত্রমৎস্যের দিকে চোখ ঘুরিয়ে ধরল মাণ্ডুপ। ওইখানে জেগে থেকে সে উত্তরের দিশা দেখায় মানুষকে। একবার তাকে চিনে নিলে এই বিরাট বিশ্বে আর কখনো পথ হারাবার ভয় থাকে না। এইখানে দাঁড়িয়েই একদিন সে নক্ষত্রকেকে চিনিয়ে দিয়েছিলেন কিরাম… গত হেমন্তের এমনই এক কুয়াশাচ্ছন্ন সন্ধ্যায়…
গ্রাম ছেড়ে বের হয়ে, ম্হিরির ধ্বংসাবশেষ পেরিয়ে এই পাহাড়। এককালে এর ওপার থেকেই নাকি বোলানী-র কূলে নেমে এসেছিলেন ম্হিরির আদি পিতারা। কিরামের সঙ্গে প্রায় প্রতি সন্ধ্যাতেই এইখানে আসে আজকাল মাণ্ডুপ। এইখানে বসে, তাকে নক্ষত্রবিদ্যার পাঠ দেবার পাশাপাশি, দিনের পর দিন তার বহু প্রশ্নের, বহু সংশয়ের সমাধানও করে চলেছেন বৃদ্ধ কিরাম।
এখন বর্ষা প্রায় শেষ। আকাশ থেকে মেঘের ঘন আস্তর উধাও হয়েছে। সেখানে ছেঁড়া ছেঁড়া জলহীন মেঘের আনাগোনা। সন্ধ্যার মুখ মুখ পাহাড় থেকে ঠান্ডা হাওয়া নামছিল। হালকা শিসের শব্দ তুলে তা ধেয়ে যায় খানিক নীচে ছড়িয়ে থাকা ম্হিরির ধ্বংসাবশেষের দিকে। এইখান থেকে পায়ের নীচে সম্পূর্ণ ম্হিরি ও তার দুপাশের দুটো নদী একসঙ্গে চোখে পড়ে। এমনকি মূল নগর ছাড়িয়ে খানিক দূরে তার শিল্পীদের গ্রামটাও আবছা নজরে আসে।
সেইদিকে চোখ ধরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল মাণ্ডুপ। চড়াইয়ের গায়ে এই জায়গাটা যেন একটুকরো অলিন্দ। পাথরের দেয়াল এইখানে সামান্য অবতল। তার ভেতরে ছড়িয়ে যাওয়া পাথুরে জমিটুকুর তিনদিকে পাহাড়ের আবডাল। তবে তাতেও প্রথম শীতের ঠান্ডা বাতাসকে পুরোপুরি রুখে দিতে পারছিল না সে। পশুলোমের চাদরটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিল মাণ্ডুপ। পাশেই পাথরের মেঝের ওপরে বসে থাকা কিরাম-এর অবশ্য এ ঠান্ডায় কোনো তাপ-উত্তাপ নেই। সেটা স্বাভাবিক অবশ্য। তাঁর জন্ম এই পাহাড়ের পাদদেশে। এই আবহাওয়াতেই তো দীর্ঘ সত্তরটা বছর কেটে গেল তাঁর।
পায়ের নীচের উপত্যকায় আবছায়া অন্ধকার নেমে এসেছে। সেদিকে চোখ রেখে মাণ্ডুপের তীক্ষ্ণ চোখ কেবল কিছু উঁচুনীচু মাটির ঢিবি দেখতে পায়। এ-বছর বর্ষা তীব্রতর ছিল। পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদা আর নুড়িপাথরের স্রোত হাত মিলিয়েছিল বোলানি ও মার্জগের বন্যার সঙ্গে। বর্ষার জল সরে যাবার পর, এবারে পৃথিবীর বুক থেকে সম্পূর্ণ মুছে গিয়েছে ম্হিরির সমস্ত চিহ্ন। পলি, বালি ও পাথরের গভীরে সম্পূর্ণ সমাহিত হয়েছে তার মৃতদেহ। বাইরে থেকে সমাধিস্তূপের মত কিছু উঁচুনীচু টিলা দেখা যায় গোটা এলাকাটা জুড়ে। তার গায়ে ঘাসের হালকা আস্তর পড়েছে। ইতিউতি একটি-দুটি বৃক্ষের আভাস।
সেদিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল মাণ্ডুপের বুক থেকে। যে প্রতিশোধের আগুন বুকে নিয়ে, মহান দোরাদাবুর আদেশে সে এই নগরীতে পা রেখেছিল একদিন, সে আগুন অবশেষে নিভেছে। ধ্বংস হয়েছে অজেয় ম্হিরি। ইন্দাতীরের এই জয়ের একজন কারিগর হিসেবে কিরাম-এর ইতিহাসে লেখা হয়ে গিয়েছে তার নামও। যদিও, ম্হিরির-র পতনের পেছনে তার আসল ভূমিকাটি কিরাম বুঝতে পারেননি। পারলে হয়তো তাকে স্নেহভরে গ্রহণ করতে তাঁর বাধত।
কিন্তু তবু এই সাফল্যে সে তৃপ্তি পায় কই? গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কিরাম ও তাঁর সহচরদের সঙ্গে এই গ্রামে কাটিয়ে তার চোখটাই বদলে গিয়েছে যে! এখন আর সে এই মানুষদের চিরশত্রু জাদুকর দানব হিসেবে ভাবতে পারে না। পারে না মূলত দুটো কারণে।
এর প্রথম কারণ, কিরামের লেখা ইতিহাসের সুদীর্ঘ পাঠ। ম্হিরির রাজকীয় গ্রন্থাগারের প্রধান ইতিহাসবিদ কিরাম, এ-নগরীর পত্তন থেকে পতন অবধি ইতিহাস রচনা করেছেন। রচনা করেছেন ইন্দাতীরের ইতিহাসও। সে ইতিহাসের সমাপ্তি হয়েছে ম্হিরির করুণ পরিণতির বিবরণ দিয়ে। গত এক বছর ধরে সেই ইতিহাসের পাঠ নেবার পর এখন সে জানে, প্রাচীন যুগে ইন্দাতীরে ম্হিরির সেনারা বার্ষিক অভিযান চালাত। এর উদ্দেশ্য ছিল সেখানকার বর্বর বাসিন্দাদের মধ্যে থেকে দাস সংগ্রহ। সেইসব নিষ্ঠুর অভিযানের সময় থেকেই ইন্দাতীরে ম্হিরির বাসিন্দাদের ‘দানব’ হিসেবে পরিচিতির শুরু।
কিন্তু এরই পাশাপাশি যখন ইন্দাতীরের নগরদের সম্প্রসারণের ইতিহাস সে পড়েছে কিরামের পুথিপট্টে, তখন সে দেখেছে সেই একই অপরাধে অপরাধী ইন্দাতীরের সেনারাও। তবে, তাদের অপরাধ ম্হিরির তুলনায় আরও বেশি ভয়াবহ। ম্হিরির সেনারা ইন্দাতীরে অত্যাচার করেছে এককালে তা ঠিক, কিন্তু তাকে তারা শ্মশানে পরিণত করেনি। বিপরীতে ইন্দাতীরের সেনারা যেখানে পা রেখেছে, সেখানেই স্থানীয়দের বদতি নির্মূল করে সেই শ্মশানের ওপরে গড়ে তুলেছে নিজেদের শহর। কাজেই, অন্যের বাসভূমি আক্রমণের অপরাধে দানব উপাধি দিতে হলে তাতে অগ্রাধিকার ইন্দাতীরের মানুষদের। ম্হিরির নয়। তাহলে কেন…
বিষয়টার মীমাংসা করে দিয়েছিলেন কিরাম স্বয়ং। এ প্রশ্নের জবাবে তার কাছে তিনি খুলে ধরেছিলেন, সুদূর উর, তেলমুন্দ সহ অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস। সেই কাহিনিদের শুনতে শুনতে মাণ্ডুপ উপলব্ধি করেছিল, যুদ্ধ আর রক্তপাতের প্রতি আনুগত্য সব মানুষেরই রয়েছে। প্রতিটি সভ্যতার ভিতই গড়া হয়েছে মানুষের রক্তে। সেখানে ইন্দাতীরের বাসিন্দা আর ম্হিরির বাসিন্দায় তফাৎ নেই কোনো। আর, যা মানুষেরই চরিত্রের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি তাকে দানবিক আখ্যা দেবার কারণ নেই কোনো।
দানব অভিধার পাশাপাশি ম্হিরিবাসীদের জাদুকর হিসেবে পরিচিত হবার কারণটা একটু অন্যধরনের ছিল। যুগযুগান্তর ধরেই তাদের উন্নত, শক্তিশালী সমাজ, তাদের গড়া নানান বিচিত্র যন্ত্র, প্রকৃতিকে বশ করবার জন্য তাদের বিভিন্ন অজানা কৌশলের কাহিনি ইন্দাতীরে প্রচলিত। ইন্দাতীরের মানুষ, নিজেদের জীবনধারণ, শক্তি, উন্নতি এই সবকিছুর জন্যই গোলকদেবতাদের ওপরে নির্ভরশীল। তাঁদের পথনির্দেশ ভিন্ন এক পা-ও এগোবার শক্তি তাদের নেই। একেই তারা প্রকৃতির স্বাভাবিক বিধান বলে বিশ্বাস করে। আর তাই, এমন কোনো দেবতার সহায়তা ছাড়াই ম্হিরিবাসীদের অগ্রগতিকে এক শক্তিশালী জাদু বলেই ধরে নিয়েছিল ইন্দাতীরের সভ্যতা।
মাণ্ডুপের ক্ষেত্রে এই দ্বিতীয় সন্দেহটার অবসান ঘটেছে কয়েকটি ঘটনার মধ্যে দিয়ে। একাধিকবার স্বচক্ষে এদের তথাকথিত ‘জাদুকরী’ ক্ষমতার প্রয়োগ দেখেছে মাণ্ডুপ। দেখেছে, এবং তার পরে তার বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা জেনে স্তম্ভিত হয়েছে।
এর শুরু হয়েছিল আগের বছর, মাণ্ডুপ সসৈন্যে এই গ্রামের দায়িত্ব নেবার দিন সাতেক পর। তখন বর্ষার তেজ কমে এসেছে। রাতের আকাশে ফের তারকামণ্ডল চোখে পড়ে। এই সময় দেখা গিয়েছিল আতীশ নামে গ্রামের আর এক বৃদ্ধ পণ্ডিত প্রতি রাত্রে গ্রাম ছেড়ে তার পেছনের পাহাড়ে এইখানে এসে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে যাচ্ছেন। এই যাত্রাগুলোয় তাঁর সঙ্গী হতেন গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ্য পণ্ডিত কিরাম। তাঁকে এ-বিষয়ে প্রশ্ন করে মাণ্ডুপ জেনেছিল, আতীশ তাঁরই শিষ্য। নক্ষত্রবিদ্যার পাঠ নিয়েছেন তিনি কিরামের কাছে। নাকি রাতের আকাশে নক্ষত্রদের চলাচল লক্ষ করে তিনি ঋতুগণনার দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
এরপর একদিন সকালে কিরাম ও আতীশ গ্রামের ঠিক মাঝখানে গোলকদেবতার শূন্য মন্দিরের বাইরে গ্রামের সমস্ত বাসিন্দাকে ডাক দেন। আতীশের সঙ্গে একটা ছোটো পেটিকা ছিল। পেটিকা থেকে তিনি একটা পোড়ামাটির পট্ট কিরামের হাতে তুলে দেন। তাতে একটা মাছের ছবি আঁকা। মাছের ছবির পাশে পাঁচটি দাগ কাটা। সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠ হিসাবে কিরাম এইবার সেই পট্টটি মাথার ওপর তুলে ধরে ঘোষণা করেন, বর্ষারাজ ত্রিনক্ষত্র মহামৎস্য অবশেষে তাঁর আসন থেকে, আকাশের দ্বাদশভাগের এক ভাগ পরিমিত দূরত্বে সরে গিয়েছেন। পঞ্চনক্ষত্র মহা-মৎস্য হেমন্তরাজ এইবার আকাশের নির্ধারিত স্থানে আবির্ভূত হয়েছেন। ফলত বর্ষা বিদায় নিয়ে সেদিন থেকে হেমন্ত ঋতুর সূচনা হল।
ঘোষণাটির সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামবাসীদের সহর্ষ উল্লাস ছড়িয়ে পড়েছিল চারপাশে। এবং কী আশ্চর্য, এই ঘোষণার পর থেকেই সত্যিসত্যিই বর্ষা সম্পূর্ণ বিদায় নিয়ে কুয়াশাচ্ছন্ন হেমন্তঋতুর আবির্ভাব ঘটে এইখানে।
ঘটনাটাকে শুরুতে একটা শক্তিশালী জাদু হিসাবেই ধরে নিয়েছিল মাণ্ডুপ। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ, শক্তিশালী জাদু ছাড়া দূর আকাশের তারকাদের থেকে কেমনভাবে মানুষ ঋতুবদলের খবর পাবে?
কিন্তু এরপর কিরাম তার এই ভুলটি সযত্নে ভাঙিয়ে দেন। পাহাড়ের গায়ে যে পর্যবেক্ষণক্ষেত্রটায় তারা এখন দাঁড়িয়ে আছে, এইখানে রাতের পর রাত তাকে ডেকে এনে তিনি আকাশের ছয়টি নক্ষত্রমণ্ডলকে চিনিয়েছেন। তারা কেউ ত্রিনক্ষত্র, কেউ বা চার, পাঁচ সাত বা দশ নক্ষত্রের সমষ্টি।
কিরাম তাকে বলেছিলেন, মাথার ওপর ছড়িয়ে থাকা ওই নীল আকাশ আসলে এক বিশ্বব্যাপী মহাসমুদ্র। তার বুকে অসংখ্য জলজ জীবের মতই ভেসে বেড়ায় নক্ষত্রের দল। রাত্রে যখন তারা দেখা দেয় তখন তাদের মধ্যে কিছু কিছু নক্ষত্রের দলকে এক একটি মাছ হিসাবে চিহ্নিত করেন এঁরা। এইরকম ছয়টি মাছ বছরের বিভিন্ন সময় আকাশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে তাঁরা লক্ষ্য করেছেন, এদের মধ্যে একেকটি মাছ আকাশের একেকটি নির্দিষ্ট জায়গায় এসে উপস্থিত হলে পৃথিবীর বুকে একেক ঋতুর আবির্ভাব ঘটে। এরপর তা ধীরে ধীরে সেই অবস্থান থেকে সরে যেতে শুরু করে। চন্দ্রকলার হ্রাসবৃদ্ধির দুটো সম্পূর্ণ বৃত্ত পার হলে অন্য এক মৎস্যেন্দ্র আকাশের আর এক নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হন। তখন পরবর্তী ঋতুর সূচনা হয়। ঋতুদের তাই এই মাছেদের নামে চিহ্নিত করেন ম্হিরির পণ্ডিতরা।
পোড়ামাটির পাটায় এই গগনচারী ঋতুরাজ মৎস্যেন্দ্রদের সঙ্কেত আঁকা হয় এক বিচিত্র পথে। মৎস্যের রেখাচিত্র ও তার পাশে সে মৎস্য যে ক’টি নক্ষত্রের সংযোগে তৈরি তার সংখ্যাসূচক কয়েকটি রেখা এঁকে রাখা হয়। বিভিন্ন ঋতুর অধীশ্বরদের প্রতীক হন এঁরা। এক একটি ঋতুতে তার অধীশ্বর মৎস্যরাজের ছবি আঁকা পোড়ামাটির পাটা এনে প্রতিষ্ঠা করা হয় বসতির মাঝখানে একটি বেদিতে। ঋতুসূচক এই পাটা ও আকাশের চন্দ্রকলার দৈনিক হ্রাসবৃদ্ধি… এই দুটি মিলিয়ে বছরের প্রতিটি দিনকেই আলাদা আলাদাভাবে নির্দিষ্ট করে গণনা করবার পদ্ধতি অধিগত করেছেন ম্হিরির জ্ঞানতপস্বীরা।
দিনের পর দিন কিরামের সহায়তায় আকাশের গায়ে সেই মৎস্যরাজদের চলাচল দেখতে দেখতেই মাণ্ডুপ অবশেষে উপলব্ধি করেছিল, নক্ষত্রেরা কোনো জাদুকরী পথে ম্হিরির বাসিন্দাদের ঋতু বদলের সংবাদ এনে দেন না। কেবল কোনো অনির্দেশ্য নিয়ম মেনে এই মৎস্যরাজদের একেকজন আকাশ জুড়ে বৃত্তপথে চলতে চলতে প্রতিটি ঋতুর সূচনায় তাঁর নির্দিষ্ট স্থানে এসে হাজির হন। এখানকার পণ্ডিতরা সেই অবস্থানকে লক্ষ্য করে ঋতুর আগমন ও প্রস্থানের সংবাদ সংগ্রহ করেন। এতে কোনো জাদু নেই।
এই নিয়ে একদিন কিরামের একটা উক্তি তার বড়ো মনে ধরেছিল। বিষয়টা মাণ্ডুপ বুঝবার পর তার বিস্ময় লক্ষ করে তিনি বলেছিলেন, “তোমরা ইন্দাতীরবাসীরা যে এই কাজদের জাদু ভাববে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। যাকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারে না, অনুন্নত মস্তিষ্কেরা তাকে জাদু বলেই ধরে নেবে সেটা স্বাভাবিক। তাই ম্হিরির বাসিন্দারা ইন্দাতীরের সাধারণ মানুষের চোখে জাদুকর দানব হিসেবেই থেকে যাবে।”
এরপর, দ্বিতীয় একটা ঘটনায় ম্হিরির উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার প্রয়োগ স্বচক্ষে দেখবার সুযোগও ঘটেছে মাণ্ডুপের। এবং স্বীকার করতে সঙ্কোচ নেই তার, সে কাজটার সম্পূর্ণ পদ্ধতিটা চোখে দেখা ও তাতে অংশ নেবার পরেও তার প্রয়োগ দেখবার সময় বারংবারই তাকে এক আশ্চর্য জাদু বলে মনে হয়েছিল তার।
ঘটনাটা ঘটেছিল এইবারের বর্ষাঋতুর আগমনের মুখমুখ। এ-বছর বর্ষার তীব্রতা বেশি ছিল। বর্ষার অধিষ্ঠাতা মৎস্যদেব ত্রিনক্ষত্র আকাশে তাঁর নির্দিষ্ট স্থানে আসীন হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিপুল বর্ষণে ভেসে যেতে শুরু করে গোটা উপত্যকা। বোলানীর তীরে যথেষ্ট নিরাপদ আর সুরক্ষিত জায়গায় এই গ্রাম স্থাপিত। কিন্তু তবু, বর্ষার তীব্রতা দেখে গ্রামবৃদ্ধরা অনুমান করেন, মধ্য বা শেষ বর্ষায় নদীর জলোচ্ছাসে এ-গ্রামও ডুবে যাবার ভয় আছে।
অথচ অল্প সময়ের মধ্যে পাহাড় থেকে যথেষ্ট পরিমাণ পাথর সংগ্রহ করে এনে গ্রাম ঘিরে সুরক্ষাপ্রাচীর গড়ে তোলবার মত লোকবল এ গ্রামের নেই। এই অবস্থায় গ্রামবৃদ্ধরা একত্র হয়ে একটা পরিকল্পনা করেন। এরপর তাঁদের মধ্যে গণনাকুশলীরা মাটির পট্টে সুনির্দিষ্ট কিছু গণনা সম্পাদন করবার পর, গ্রামের উত্তরে একটা এলাকাকে চিহ্নিত করে বলেন, বোলানীর বন্যার জল গ্রামকে সেই জায়গা দিয়ে আক্রমণ করবে। এরপর চিহ্নিত জায়গাটাতে একটা ত্রিশ হাত চওড়া ও দশ হাত উঁচু পাথরের দেয়াল গড়ে তোলা হয়। দেয়াল গড়া শেষ হলে তার দুপাশ দিয়ে গ্রামকে ঘিরে একটা বলয়াকার খাদ খোঁড়বার কাজ শুরু হয়। নারীপুরুষ নির্বিশেষে গ্রামের প্রতিটি সবল মানুষ সেই কাজে হাত লাগিয়েছিল।
হাত লাগিয়েছিল মাণ্ডুপ আর তার পঞ্চাশজন সৈন্যও। নেতৃত্ব তার সহজাত। কাজটা বুঝে নেবার পর অতি সহজেই কর্মীদলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিল সে। তার নেতৃত্বে মাত্রই পনেরোদিনের চেষ্টায় গড়ে তোলা বলয়াকার খাদ গ্রামের পেছনে এসে পৌঁছোবার পর, সেখান থেকে আরেকটা গভীর খাদ কেটে তাকে ফের বোলানীর স্রোতের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়া হয়।
বর্ষার দ্বিতীয় মাসে গণকদের পূর্বাভাষকে সত্য প্রমাণিত করেছিল বোলানী। ম্হিরি নগরীর ধ্বংসাবশেষকে ডুবিয়ে দিয়ে তার জল সত্যিই ছুটে এসেছিল এই গ্রামের দিকে। আর তখন এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখা গিয়েছিল এইখানে। অরক্ষিত গ্রামের একপাশে সেই পাঁচিলে এসে সশব্দে ধাক্কা দিয়ে অতকায় সাপের মতই সগর্জনে ফনা তুলেছিল সেই ভয়াল স্রোত। তারপর যেন কোনো জাদুমন্ত্রে বশীভূত নাগের মতই মাথা নামিয়ে বলয়াকার খাদ ধরে ছুটে গিয়ে ফের বোলানীর বুকেই ফিরে গিয়েছিল তা। দেখতে দেখতে মাণ্ডুপ অনুভব করেছিল, সম্পূর্ণ পদ্ধতিটা না জানলে যে কেউ একে দানবিক কোনো জাদু বলে ভুল করবে, এমন জাদু যা বর্ষার উন্মত্ত পাহাড়ি নদীকেও অক্লেশে বশীভূত করতে পারে।

“সময় হয়েছে মাণ্ডুপ। এইবার…”
কিরামের শান্ত গলার স্বর এসে মাণ্ডুপের চিন্তার সুতোটাকে ছিঁড়ে দিয়ে গেল হঠাৎ। রাত খানিক গভীর হয়ে এসেছে কখন যেন। দিগন্তকে ছুঁয়ে সামান্য ওপরে স্থির হয়ে আলো ছড়াচ্ছিল রক্তচক্ষু লোহিত মৎস্য। তাকে চেনা কঠিন নয়। কারণ আকাশ জুড়ে আর সমস্ত নক্ষত্রমৎস্যের আলোয় ঝিকিমিকির আভাস থাকলেও বিভিন্ন বর্ণের পাঁচটি মৎস্য সেখানে আছে, যাদের আলো সর্বদাই স্থির থাকে। এই লোহিত মৎস্য তাদের মধ্যে একটি।
একফালি চলমান মেঘ এসে সেই মুহূর্তে মাথার ঠিক ওপরে উপস্থিত হয়েছে। বাকি আকাশে অবশ্য মেঘের চিহ্ন নেই কোনো। উজ্জ্বল নক্ষত্রখচিত একটা অর্ধগোলকাকার পাত্র যেন সে-মুহূর্তে ঢেকে রেখেছে সমস্ত চরাচরকে।
“মেঘখণ্ড শৈত্যমৎস্যের অবস্থানের দিকে এগিয়ে চলেছে। দেরি কোরো না তুমি…”
কথাগুলো শুনতে শুনতেই ফের মাটিতে শুয়ে পড়ে আকাশের দিকে লক্ষ্যস্থির করেছিল মাণ্ডুপ। সেখানে মৃত্যুদেবতা উদিত হয়েছেন। তাঁর স্কন্ধের উজ্জ্বল তারাটির থেকে অঙ্গুলিপরিমাণ নীচে… ওই তো…
হঠাৎ মৃদু হাসি ফুটে উঠল মাণ্ডুপের ঠোঁটে। আতীশ তাকে জানিয়েছিলেন, চতুর্নক্ষত্র শৈত্যমৎস্যের যে অবস্থানে শীতঋতুর সূচনা ঘটে তা রাত্রির এই সময়ে উত্তরের চিরস্থির নক্ষত্রমৎস্যের ঠিক নীচে এক হস্ত পরিমিত দূরে ও মৃত্যুদেবতার স্কন্ধনক্ষত্রের অঙ্গুলিপরিমাণ নীচে থাকা উচিৎ। সেই অনুযায়ী শৈত্যমৎস্য তাঁর অনুমিত স্থানেই দেখা দিয়েছেন।
তবে সিদ্ধান্তটা ঘোষণা করবার আগে আরো একটু পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। অনেক সময়েই অনভিজ্ঞ চোখ সঠিক ঋতুরাজকে চিনে নিতে ভুল করে। অন্য নক্ষত্রমৎস্যদের মধ্যে ঋতুরাজের চেহারা আবিষ্কার করে বেঠিক সিদ্ধান্ত দেয়। কিংবা তাঁর সঠিক অবস্থানকে হিসাব করতে ত্রুটি ঘটায়। সে নিজেও বহুবার সে ভুল করেছে গত কয়েক মাসে।
অতএব আরো কয়েক মুহূর্ত আকাশের দিকে চোখ রেখে স্থির হয়ে রইল মাণ্ডুপ। তারপর, একসময় ভূমিশয্যা থেকে উঠে দাঁড়াল সে। মাথা নেড়ে বলল, “আমি নিশ্চিত। শীতঋতুর সূচনা হয়েছে কিরাম। আগামীকাল আপনারা গ্রামের কেন্দ্রে তার ঘোষণা করতে পারেন।”
হঠাৎ কিরাম হেসে মাথা নাড়লেন, “না মাণ্ডুপ। আমি বা আতীশ কাল এ ঘোষণার দায়িত্ব নিতে পারব না।“ অপ্রত্যাশিত উত্তরটা শুনে একটু থমকে গেল মাণ্ডুপ। তারপর প্রশ্ন করলে, “তাহলে…”
কিরাম স্থির চোখে মাণ্ডুপকে দেখলেন একটুক্ষণ। তারপর মুখে একচিলতে হাসি ছড়িয়ে বললেন, “আতীশ আর আমি আগেই এ নিয়ে আলোচনা করেছি মাণ্ডুপ। আমরা চাই, আগামীকালের ঋতুঘোষণার দায়িত্ব তোমার হাতে থাকুক।”
কথাটা শুনে বড়ো আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল মাণ্ডুপ। কিরামের মুখে হঠাৎ এমন একটা প্রস্তাব যে আসতে পারে সে তার স্বপ্নেরও বাইরে ছিল। খানিক বাদে নিজেকে সামলে নিয়ে কোনোমতে সে বলল, “আ…আমি? আমি তো…ম্হিরির কেউ নই? আমি…”
“বহিরাগত? ইন্দাতীরের আগন্তুক?” কিরাম মাথা নাড়লেন, “না মাণ্ডুপ। হয়তো শুরুতে তাই ভেবেছি আমরা। ভয়ও পেয়েছি তোমাকে। বিজয়ীর প্রতিভূ হিসাবে ঘৃণাও করেছে অনেকে। কিন্তু এখন আর তোমাকে আগন্তুক বলে মনে করছি না আমরা। গত এক বছর ধরে তুমি ম্হিরির শাস্ত্রে নিজেকে ঋদ্ধ করেছ, এই শহরের রক্ষায় ও উন্নতিতে সক্রিয় অংশ নিয়েছ। এ গ্রামের একজন বাসিন্দাও আর তোমাকে বহিরাগত হিসাবে দেখে না। ম্হিরির ঐতিহ্যই তো সকলকে সাদরে কাছে ডেকে নেয়া। তোমার তারুণ্য, বীরত্ব আর ধীশক্তিকেও সাদরে গ্রহণ করতে ম্হিরি এখন প্রস্তুত। তোমাকে নিজের কাজের উত্তরসূরী হিসেবে স্বীকারও করেছেন নক্ষত্রবিদ আতীশ।”
বলতে বলতেই এগিয়ে এসে তার দুই কাঁধে হাত রাখলেন কিরাম, “আগামীকাল তাই ম্হিরির একজন আপনজন হিসাবেই তুমি নতুন ঋতুর আগমন ঘোষণার দায়িত্ব নেবে। তারপর, বসতির প্রশাসকের কাজটির পাশাপাশি, নক্ষত্রবিদ হিসাবে তোমার শিক্ষাপর্ব শুরু হবে আতীশের কাছে। এ এক সারাজীবনের সাধনা মাণ্ডুপ। এখন বলো তুমি কি ম্হিরি-র এই তুচ্ছ উপহার গ্রহণ করতে প্রস্তুত?”
বৃদ্ধের উদগ্রীব মুখ তার দিকে বড়ো আশা নিয়ে তাকিয়েছিল। সেদিকে চোখ রেখে একটা মিশ্র অনুভূতি কাজ করে চলেছিল মাণ্ডুপের মনে। দোরাদাবু তাকে এইখানে যখন ফেরৎ পাঠিয়েছিলেন সেসময় তাঁর নির্দেশ ছিল, যতদিন না নতুন গোলকদেবতা এই জায়গার দায়িত্ব নিতে ফিরে আসেন ততদিন পর্যন্ত তাকে এই মানুষদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে থেকে তাদের জ্ঞানভান্ডারের বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। এবং সে কাজে দোরাদাবু তাকে কোনো সহায়তা করতে পারবেন না সেই মুহূর্তে। শুরুতে সে একটু অসহায়ই বোধ করেছিল তাতে। ইন্দাতীরে বাসিন্দারা তো গোলকদেবতাদের নির্দেশ বিনা কোনো কাজে অংশ নিতে জানে না!
তারপর গত কয়েক মাস ধরে ধীরে ধীরে নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করেছে সে। কিরামের শিক্ষা আর বসতির প্রশাসক হিসেবে একলা সিদ্ধান্ত নেবার দায় এই দুই মিলে কখন যে সে একজন নতুন মানুষ হয়ে উঠেছে তা সে নিজেও ভালো করে লক্ষ করেনি।
কিন্তু মনের গভীরে দোরাদাবুর আদেশ তার এখনও সক্রিয় আছে। এখনও তাঁর প্রতি তার ভক্তি অটল। কিরামের এই প্রস্তাবটা তার সামনে সে আদেশ পরিপূর্ণভাবে পালন করবার একটা অসামান্য সুযোগ হিসেবে দেখা দিচ্ছিল তাই। এদের একজন হিসেবে সমাজের স্বীকৃতি পেলে, হয়তো আরও গভীরভাবে এদের জীবনকে জানতে পারবে সে। মহান দোরাদাবুর দেয়া কাজটা তার পক্ষে তখন সহজ হয়ে যাবে আরও।
আবার এরই পাশাপাশি একটা দ্বিতীয় সম্ভাবনাও উঁকি দিচ্ছিল তার মনে। দীর্ঘ একটা বছর পার হয়ে গেল। এখনও তো নতুন কোনো গোলকদেবতা এসে পৌঁছোলেন না এই বসতির দায়িত্ব নেবার জন্য! তাহলে কি এঁদের মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করবার নিরাপদ কোনো কৌশল খুঁজে পাননি দেবতা? আর তাই কি তিনি পরিত্যাগ করেছেন এই বসতিকে? এবং, হয়তো, তাঁর কৃপা গ্রহণে অক্ষম এই হতভাগাদের প্রতি অসীম করুণায় তাঁর এক দাসকে, এই মাণ্ডুপকেই এইখানে স্থায়ীভাবে রেখে দিয়েছেন এদের মঙ্গলসাধনের লক্ষ্যে!
কথাটা মনে হতেই দোরাদাবুর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা গড়ে উঠছিল মাণ্ডুপের। কিন্তু সেই কৃতজ্ঞতার অনুভূতির পাশাপাশি, একটা আশ্চর্য মুক্তির আনন্দও উঠে আসছিল তার মনে। উঠে আসছিল নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই। ইন্দাতীর থেকে দূরে, নির্জন পর্বতের কোলে একদল প্রতিভাধর মানুষের একটা বসতি। সে, মাণ্ডুপ, তার স্বাধীন একজন শাসক। কারো দাস নয় সে। কাজে ত্রুটি হলে ঈশ্বরের মানসিক চাবুকের আঘাতের ভয় নেই তার এখানে। এই নির্জনে নতুন করে একলার চেষ্টায় একটা সমৃদ্ধ জনপদ গড়ে তোলা…
হঠাৎ সভয়ে এই শেষ চিন্তাটাকে মন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিল মাণ্ডুপ। এমন চিন্তাও মহাপাপ! যে ঈশ্বর তাদের এক মহান সভ্যতা দান করেছেন, আদিম বর্বরতার থেকে তুলে এনে উন্নত জীবনের আশীর্বাদ দিয়েছেন, তাঁর মানসিক নিয়ন্ত্রণের আশীর্বাদকে অভিশাপ বলে ভাবা ঘোর অন্যায়।
অথচ তবু, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েও সম্ভাবনাটা একটা আশ্চর্য মুক্তির অনুভূতি কেন ছড়িয়ে দিচ্ছে তার মনে? এক আশ্চর্য দ্বিধায় দুলতে দুলতেই চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে সে। তাকে ঘিরে রাত গভীর হয়ে আসে…
আর ঠিক তখনই তার সব দ্বিধার সমাধান হয়ে আকাশের সেই মেঘখণ্ডের আড়ালে এসে স্থির হচ্ছিল একটা কালো বিন্দু। দীর্ঘ চেষ্টায় অবশেষে ম্হিরির বাসিন্দাদের মস্তিষ্কের গঠনের বিশেষত্বগুলোকে নিরূপণে সক্ষম হয়েছেন দোরাদাবু। তাঁর সদ্যনির্মিত সন্তান এই নতুন গোলকদেবতার মনোরশ্মি এদের মস্তিষ্কের কোনো ক্ষতি না ঘটিয়েই তার নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম। এই সাফল্যে পৌঁছোবার পথে ম্হিরি থেকে নিয়ে যাওয়া পাঁচটি দানব বড়ো যন্ত্রণায় প্রাণ দিয়েছে তা সত্য। তবে ম্হিরির বাসিন্দাদের মস্তিষ্ককে নিরাপদে নিয়ন্ত্রণ করবার যে মহামূল্য কৌশল তার ফলে আবিষ্কার করেছেন দোরাদাবু, তার কাছে তুচ্ছ কয়েকটা পরজীবীদের প্রাণের মূল্য আর কতটুকু!
***
…হঠাৎ মাথার মধ্যে একটা সুপরিচিত চিন্তাতরঙ্গের আঘাত এসে সব দ্বিধা দূর করে দিল মাণ্ডুপের। কর্তৃত্বব্যঞ্জক সুরে তাকে একটা আদেশ শোনাচ্ছিল সেই চিন্তাস্রোত…
“তোমার কর্তব্য শেষ যুবক। আগামীকাল সকালে তোমাদের সৈনিকদের সশস্ত্র পাহারায় সমস্ত গ্রামকে তুমি আমার মন্দিরের পাশে একত্র করবে। কেউ প্রতিবাদ করলে নির্দ্বিধায় তাকে হত্যা করবে। এরপর আমি এই গ্রামের দায়িত্ব নেব। তবে তার আগে অবধি আমার উপস্থিতির খবর তুমি গোপন রাখবে। মহান দোরাদাবু তোমাকে মঞ্জাদাহিরে আহ্বান করেছেন। তাঁর জন্য যে উপহার তোমার কাছে সঞ্চিত আছে তা সঙ্গে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব তাঁর মন্দিরে উপস্থিত হবে তুমি। সে উপহার তাঁর কাছে উৎসর্গ করে তোমার কর্তব্য শেষ হবে।”
চমকে উঠে আকাশের দিকে ঘুরে দেখল সে একবার। কিন্তু সেখানে তখন কেউ ছিল না। কেবল মেঘের টুকরোটা ঊর্ধ্বাকাশে চলন্ত হাওয়ার ধাক্কায় দ্রুত সরে যাচ্ছিল। তারার আবছা আলোর ম্লান পটভূমিতে সেখানে এক মুহূর্তের জন্য একটা চলমান কালো বিন্দু চোখে পড়েছিল মাণ্ডুপের। কিন্তু পরমুহূর্তেই ছুটন্ত মেঘের গভীরে মিলিয়ে গেল বিন্দুটা।
মুহূর্তে সব দ্বিধা দূর হয়ে গেল মাণ্ডুপের। উপযুক্ত সন্তানগোলকের আবির্ভাব ঘটেছে ম্হিরির আকাশে। তার কর্তব্য প্রায় শেষ। বিশ্বাস ও ভরসা মনকে শান্ত করে। যে মানসিক আদেশ তাদের পুরুষানুক্রমে সঠিক পথের দিশা দেখিয়েছে, ফের একবার তার পরিচিত স্পর্শ তখন মাণ্ডুপের মনে তার পুরোনো ভক্তি ও বিশ্বাসকে ফিরিয়ে এনেছে এক লহমায়।
বৃদ্ধ কিরাম তার হঠাৎ থেমে গিয়ে আকাশের দিকে চোখ ফেলাটকে লক্ষ করেছিলেন। জিজ্ঞাসু চোখে তার দিকে ঘুরেও তাকিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মাণ্ডুপ ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে। গোলকদেবতার আবির্ভাবের খবর এঁকে জানানো নিষেধ। অতএব মুহূর্তে মুখের ভাব বদলে ফেলল সে। একটু হেসে বলল, “চলুন কিরাম। রাত গভীর হয়ছে। এইবার ফেরা দরকার। কাল সকালে গ্রামসভার আগে আমাদের দুজনেরই কিছু বিশ্রাম নেয়া প্রয়োজন।”
ঘুম আসেনি মাণ্ডুপের সেই রাত্রে। পরদিন সকালে সমস্ত গ্রামকে গোলকদেবতার মন্দিরের পাশে একত্র করবার নির্দেশ পেয়েছে সে। সেজন্য অবশ্য কোনো চিন্তা তার ছিল না। কারণ, এই গ্রাম তাকে একান্তই নিজের মানুষ ভেবে কাল আপনিই এসে জড়ো হবে মন্দিরচত্বরে। জড়ো হবে তাদের এক নতুন আত্মীয়ের মুখে ঋতুবদলের ঘোষণা শুনতে। কিন্তু, বুকের ভেতরে ক্রমাগত চলতে থাকা একটা অন্য দ্বন্দ্ব তাকে জাগিয়ে রেখেছিল সেই রাতে। দোরাদাবুর প্রতি আজন্ম যে গভীর বিশ্বাস আর অচলা ভক্তি, তার মধ্যে কোথাও একটা সন্দেহের বীজ বুনে দিয়ছে তার গত এক বছরের জীবন। সে বীজ তখনও মহীরুহ হয়ে উঠতে অনেক দেরি। অবচেতন থেকে সচেতন চিন্তাতেও অঙ্কুরোদ্গমও ঘটেনি তখনও তার। কিন্তু তবু, যাদের দানব বলে রায় দিয়েছিলেন দোরাদাবু, তাঁর আদেশে যে দানবজাতিকে ধ্বংস করতে সে নিজে বিরাট ভূমিকা নিয়েছে ম্হিরির-র যুদ্ধে, গত এক বছরে সেই জাতির অবশিষ্ট মানুষজনকেই একেবারে নতুন আলোয় চিনেছে সে। তারাও মানুষ। আর দশটা মানুষের মতই তারাও হিংসা করে, যুদ্ধ করে, আবার ভালোও বাসতে জানে। পাশাপাশি নিজেদের স্বাধীন বিচারবুদ্ধি আর উদ্ভাবন ক্ষমতায় অটুট ভরসা রেখে, কোনো ঈশ্বরের পরাধীনতা বা শাসন ছাড়াই তারা জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চায় নিজেদের উন্নত করে তুলতে পারে।
নিজের চোখে এই ব্যাপারটাকে ক্রমাগত দেখতে দেখতে তার অবচেতনে কোথাও দোরাদাবুর প্রতি অচলা বিশ্বাসে চির ধরছিল। তবে সে নিজেও তখনও সে বিষয়ে পূর্ণ সচেতন নয়। কেবল, আগামীকাল থেকে এই মানুষগুলোর স্বাধীন জীবনের শেষ হয়ে চিরদাসত্বের দিন শুরু হবার সম্ভাবনাটা তার মনে একটা অব্যক্ত যন্ত্রণার জন্ম দিচ্ছিল। নিজেকে সে বারবার বোঝাতে চায়, এতেই এদের মঙ্গল হবে। মহান দোরাদাবুর অশেষ করুণায় তারাও ইন্দাতীরের মহান সভ্যতার অংশ হয়ে উঠবে। কিন্তু তবু বারংবার সেই একই সম্ভাবনা তার মনে একটা অন্ধকার ছবিকে তুলে আনছিল… জ্ঞানপিপাসু কিরাম, নক্ষত্রবিদ আতীশ… গোলকদেবতার সামনে তাঁদের উঁচু মাথা মাটিতে ঠেকেছে… তাঁর মানসিক চাবুকের আঘাতে কুঁকড়ে উঠছে তাদের স্বাধীনচেতা, সৃষ্টিশীল ধীশক্তি…
***
“প্রিয় ম্হিরিবাসী। আজ আপনাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ নিয়ে আমরা হাজির হয়েছি…”
কিরামের মুখ থেকে কথাগুলো উচ্চারিত হতেই একটা চাপা হর্ষধ্বনি খেলে গেল গোটা জনসভাতেই। খবরটা তারা আগেই অনুমান করেছিল। কিন্তু গতরাত্রে সে অনুমান নিশ্চিত বিশ্বাসে বদলে গিয়েছে তাদের। পরদিন সকালে ঋতুপরিবর্তনের ঘোষণা হবে তা আগে থেকেই জানা ছিল সকলের। কয়েকদিন ধরেই তার প্রস্তুতিও চলেছে গ্রামে। আর, এই ঘোষণার আগে, পাহাড়ের গায়ের নক্ষত্রপরিদর্শনস্থলে পর্যবেক্ষণের জন্য আতীশ নিজে না গিয়ে যখন মাণ্ডুপকে কিরামের সঙ্গে পাঠালেন তখন থেকেই কানাঘুষোটা শুরু হয়ে গিয়েছিল। গত এক বছরে মাণ্ডুপ এই গ্রামের প্রতিটি মানুষের কাছেই প্রিয় হয়ে উঠেছে। উঠেছে তার সুন্দর ও তরুণ চেহারার গুণে, তার মধুর ব্যবহারে। গ্রামের মানুষ যেকোনো সমস্যায় প্রশাসক হিসেবে তার কাছে সুবিচার পেয়েছে। যেকোনো মানুষের বিপদে-আপদে সকলের আগে এগিয়ে গিয়েছে সে নিজে।
আগের দিন রাত্রে পাহাড় থেকে ফেরবার পর কিরাম গ্রামবৃদ্ধদের সভা ডেকেছিলেন একটা। সে সভায় ডেকে আনা হয়েছিল অগ্রীণকে। অগ্রীণ মূর্তিশিল্পী। পুরুষানুক্রমে তাঁর পরিবার এই শিল্পে দক্ষতা অর্জন করেছে। একদিকে কৃষি ও সন্তান উৎপাদনের দেবদেবী, আবার তারই পাশাপাশি ঘর সাজাবার শিল্পিত মূর্তি অথবা শিশুদের খেলবার জন্য অজস্র কৌশলী ক্রীড়ামূর্তির স্রষ্টা এই অগ্রীণের পরিবার। শিল্পী হিসাবে এ পরিবারের সুনাম কেবল এই শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দূর-দূরান্তের দেশেও সেই মূর্তিরা বিখ্যাত ছিল। অগ্রীণকে দুটি নির্দেশ দেন। তার প্রথমটা ছিল, তাঁকে একটি স্বাগত-মাতৃকামূর্তি গড়ে দিতে হবে এক রাত্রির মধ্যে।
ম্হিরি নগরীর পূজ্য মাতৃকার আদলে নির্মিত এই মূর্তি একটা বিশেষ কাজে লাগত। বহিরাগত কোনো অতিথিকে নগরের সাম্মানিক সদস্য হিসাবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেবার জন্য ব্যবহৃত হত তা। অতএব আদেশটা পেয়ে অগ্রীণ তার উদ্দেশ্য অনুমান করতে পেরেছিল মুহূর্তেই।
আর তার পরেই কিরামের দ্বিতীয় নির্দেশ তার অনুমানকে সত্য প্রমাণিত করে ও সেইসঙ্গে একটা অন্য আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে দেয় তা মনে। সে আদেশ ছিল এই, আগামীকাল সকালে এই স্বাগত-মাতৃকা উপহার দেবার মাধ্যমে তরুণ যোদ্ধা মাণ্ডুপকে ম্হিরি-র আপনজন হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হবে, এবং মূর্তিটি তার হাতে তুলে দিয়ে তাকে সেই স্বীকৃতির সংবাদ জানাবে অগ্রীণের কুমারী কন্যা জিত্রান।
নির্দেশটার মধ্যে দিয়ে গ্রামের প্রধান হিসেবে একটা অনুচ্চারিত ইচ্ছাও অগ্রীণকে জানিয়ে দিয়েছিলেন কিরাম। জিত্রান বিবাহযোগ্যা। সুন্দরী। কর্মঠ। মাণ্ডুপকে ম্হিরির সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ করবার জন্য সে হবে সবচেয়ে উপযুক্ত পাত্রী। উপস্থিত গ্রামবৃদ্ধেরাও সহর্ষে তাঁর এই ইচ্ছাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
কিরামের এই নির্দেশের কথা চাপা থাকেনি। কয়েক দণ্ডের মধ্যে গোটা গ্রামেই সেই খবর পৌঁছে যায়। পৌঁছে যায় অগ্রীণের বাড়িতে অপেক্ষায় থাকা জিত্রানের কাছেও।
সখীদের মুখে খবরটা শুনে জিত্রানের গালদুটি নিজের অজান্তেই লাল হয়ে উঠেছিল। বীর মাণ্ডুপ। তরুণ যোদ্ধা মাণ্ডুপ। গত এক বছর ধরে ম্হিরির এই গ্রামের অবশিষ্ট সামান্য সংখ্যক তরুণীর স্বপ্নের পুরুষ মাণ্ডুপ। উদাসী ওই যুবক সকলের সঙ্গেই হেসে কথা বলে। জিত্রানও তার ব্যাতিক্রম ছিল না। কিন্তু তবু, নিজেকে ঘিরে এক ঔদাসীন্যের দেয়াল তোলা যেন তার। অদৃশ্য সেই দেয়াল পেরিয়ে তার একেবারে কাছে পৌঁছোনো যায় না। পৌঁছোবার স্বপ্নও জিত্রান দেখত না। বড়ো লাজুক মানুষ সে। তবু, মাণ্ডুপের এই ঔদাসীন্যই যেন তার টান আরও বাড়িয়ে দেয়।
আর অবশেষে আজ স্বয়ং কিরাম যখন তাকে মাণ্ডুপের সম্ভাব্য স্ত্রী হিসেবে নির্বাচনের ইচ্ছা জানিয়ে দিলেন, বুকের ওপর থেকে একটা পাষাণভার যেন সরে গিয়েছিল তার। জ্ঞানী কিরাম। প্রাজ্ঞ কিরাম। মাণ্ডুপ তাঁর গুণমুগ্ধ। তাঁর পুত্রবত। কিরাম স্বয়ং যখন এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তখন জিত্রানের আর চিন্তা নেই কোনো। তার অদেখা স্বপ্ন এইবার পূরণ হবে।
সেদিন গভীর রাতেও অগ্রীণের শিল্পগৃহে আলো জ্বলে ছিল। সেই আলোয় শিল্পী অগ্রীণ নিবিষ্টচিত্তে মূর্তির জন্য মাটি প্রস্তুত করছিলেন। নদীতীর হতে খুঁড়ে আনা আঠালো মাটির সঙ্গে সামান্য শঙ্খচূর্ণ, উদ্ভিজ্জ তন্তুর কুঁচি মিশিয়ে এই প্রস্তুতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞটা ও দক্ষতা লাগে। সন্ধ্যায় কিরাম এসে তাঁর ইচ্ছা জানিয়ে যাবার পর থেকেই তাই সে কাজে নিজেকে মগ্ন রেখেছিলেন তিনি।
রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরের সূচনায় সে কাজ শেষ হল। সামনে ঈষৎ নরম মাটির পিণ্ডটাকে রেখে চোখ বুঁজে মাতৃকামূর্তির ধ্যান করছিলেন অগ্রীণ। একবার সে মূর্তি মানসচক্ষে ফুটে উঠলে পরে তাঁকে মাটিতে ধরবার কাজ শুরু করবেন তিনি।
অবশ্য এই ধ্যানের কোনো ঐহিক প্রয়োজন ছিল না। এ মূর্তি নির্মাণে তাঁর দক্ষতা প্রশ্নাতীত। তবে অগ্রীণ পুরাতনপন্থী মানুষ। গুরুর কাছে যেভাবে এই বিদ্যা শিখেছেন তাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেই পছন্দ করেন তিনি। আর তাই, স্নান সেরে পবিত্র বস্ত্র পরে অনাহারে মাতৃকামূর্তি নির্মাণে বসেছেন তিনি আজ।
এমন সময় কেউ তাঁর পিঠে হাত রেখেছিল এসে। কোমল ছোঁয়াটা পেয়ে চোখ খুলে ঘুরে দেখেছিলেন অগ্রীণ। মাতৃকামূর্তির নির্মাণ তাঁর কাছে পূজার মতই পবিত্র। সে কথা পরিবারের কারো অজানা নয়। সাধারণত এই সময়ে তাই কেউ তাঁকে বিরক্ত করে না। অথচ…
মুখ ঘুরিয়ে দেখে অবশ্য বিরক্তিটা চলে গেল তার। জিত্রান। তার সুন্দর মুখটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একটা আশ্চর্য ভালো লাগা এসে ধুয়ে দিয়ে গেল তাঁর সব বিরক্তিকে। মাত্রই তো সামান্য কিছু সময় কেটেছে সন্ধ্যায় কিরামের কাছ থেকে নির্দেশটা আসবার পর! অথচ সেই কথাগুলো কানে যাবার পর এইটুকু সময়ের মধ্যেই কোথাও একটা গভীর বদল এসে গিয়েছে জিত্রানের মুখের ভাবে। কিশোরীর চাপল্য সরে গিয়ে হঠাৎ সেখানে এসে যেন ভর করেছে একটা দায়িত্বশীল লাবণ্যময় যুবতীর মুখ! তার হাতে যুবতীর চিহ্নস্বরূপ শঙ্খবলয়, সিঁথায় সিন্দুরবিন্দু। জীবনের আসন্ন পরিবর্তনের জন্য নিজের অজান্তেই যেন প্রস্তুত হয়ে উঠেছে সে। সেদিকে তাকিয়ে হাসিমুখে অগ্রীণ বললেন, “কিছু বলবি?”
“আ…আমি একটা অনুরোধ করি পিতা?”
“বল। তোকে অদেয় আমার কিছু নেই যে মা!”
“এই মাতৃকামূর্তি… আপনি অনুমতি দিলে… আমি নিজে হাতে…আপনি তো ছোটোবেলা থেকেই এই শিল্পের পাঠ দিয়েছেন আমাকে। দেখবেন, আমি আপনাকে লজ্জিত করব না। সংবাদটা পাবার পর আমি স্নান করেছি, শুদ্ধ বস্ত্রও পরেছি। সন্ধ্যা থেকেই অনাহারে রয়েছি…”
ঠোঁটদুটি কেঁপে উঠছিল মেয়ের। চোখের দৃষ্টি অবনত তার। গালদুটোয় লজ্জার রক্তিম আভা এসে জুড়ে বসেছে কখন যেন। সেদিকে তাকিয়ে বুকের কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে উঠেছিল অগ্রীণের। মাণ্ডুপকে প্রথম উপহারটা নিজের হাতে নির্মাণ করে দিতে চায় জিত্রাণ!
চোখদুটি ঝাপসা হয়ে এসেছিল অগ্রীণের। দূরদেশের মানুষ মাণ্ডুপ। দুঃসাহসী যোদ্ধা। ইন্দাতীরের আমহিরি নামের এক বিখ্যাত শহরে তার জন্ম। কিরাম হয়তো তাকে নানা পথে বাঁধতে চাইছেন এইখানে। এ বিবাহ হলে সেই সূত্রে অগ্রীণের ঘর তারও ঘর হবে। কিন্তু একদল পরাজিত মানুষের এক তুচ্ছ গ্রাম কতদিনই বা তাকে বেঁধে রাখতে পারবে? একদিন না একদিন সে এই গ্রাম ছেড়ে ফিরে যাবে হয়তো তার নিজের জীবনে। সেদিন, তাঁর ঘর শূন্য করে সে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে জিত্রাণকে। জিত্রাণ ছাড়া বিপত্নীক অগ্রীণের জীবনে আপন বলতে আর কেউ তো নেই!
কিন্তু তবু… মেয়ের লজ্জারুণ মুখের দিকে চোখ ফেলে তিনি বুঝেছিলেন এতেই তার সুখ। তাই হোক তবে। মাটির দলাটা তার দিকে ঠেলে দিয়ে পাত্রের জলে হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন অগ্রীণ।
তারপর রাত গভীর হয়েছিল। জিত্রাণের নিপুণ আঙুলেরা মাটির দলাকে বড়ো ভালোবেসে একটু একটু করে বদলে দিয়েছিল পূজ্য মাতৃকামূর্তিতে। সুগোল দুটি চোখ, তীক্ষ্ণনাসা, পাতলা ওষ্ঠাধর। উঁচু, প্রশস্ত কপালে সযত্নে গড়া কেশদাম জড়ো করে রাখা। একসময় মূর্তিগড়া শেষ করে আগুনের তাতে তাকে পুড়িয়ে নিয়ে বর্ণচূর্ণে যখন হাত লাগাল সে তখন রাত্রির শেষ প্রহর শুরু হয়েছে। নদী থেকে উঠে আসা শেষরাত্রের হাওয়ায় শিল্পগৃহের অগ্নিহোত্রে নিভন্ত আগুন কেঁপে কেঁপে ওঠে। তার লালচে আভা মেখে বসে সেই মেয়ে লালচে-কমলা মূর্তির শরীরে সুক্ষ্ম কালো রেখার অলঙ্করণ সাজিয়ে তোলে। বেগনি ও সাদা রঙের ছিটেয় বর্ণিল হয়ে ওঠে মূর্তির শরীর। অবশেষে, তার কণ্ঠা থেকে বাহুমূলের দিকে ছড়িয়ে যাওয়া গাঢ় কমলা টানগুলি দিয়ে সে মূর্তি যখন সম্পূর্ণ হয়েছিল, তখন রাত্রির অন্ধকার কেটে গিয়ে সকালের প্রথম আলো ফুটেছে…

***
…আর এখন সকালের প্রথম আলোয়, কিরামের সস্নেহ ডাকে জিত্রান ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে তার দিকে। তার পরনে উজ্জ্বল লোহিতবর্ণ ঘাগরা। খোলা কেশদাম সিঁথির মধ্যভাগ থেকে পরিপাটি করে দুই কাঁধ বেয়ে লুটিয়ে পড়েছে। লজ্জাবনত চোখে কাঁপা কাঁপা দুটি হাতে স্বাগত মাতৃকামূর্তিটি তুলে ধরে সে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছিল মাণ্ডুপের দিকে…
চারপাশে জড়ো হয়ে দাঁড়ানো মানুষগুলির চোখে কত আনন্দ! এগিয়ে আসতে থাকা জিত্রানের দিকে চোখ রেখে একটা তীব্র দুঃখের অনুভূতি ছড়িয়ে যাচ্ছিল মাণ্ডুপের মনে। সে নির্বোধ নয়। গত বেশ কিছু মাস ধরেই তার প্রতি ম্হিরির-র এই তরুণীর নীরব বন্দনা তার চোখ এড়ায়নি। মাণ্ডুপ দুশ্চরিত্র নয়। সুদূর আমহিরি শহরে তার ইস্কা, তার অপেক্ষায় আছে। তার ভালোবাসার সঙ্গে প্রতারণা করবার কোনো প্রবৃত্তি তার হয়নি, কিন্তু তবু, ম্হিরির মেয়ের নীরব বন্দনাটুকু তার ভালো লেগেছিল। আজ, তার হাত দিয়ে তাকে এই স্বাগত মূর্তি উপহার দেয়াবার পেছনে কিরামের উদ্দেশ্যও বুঝতে তার কোনো অসুবিধা হয়নি। অন্য সময় হলে হয়তো সে এতে বাধা দিত। হয়তো এই মুহূর্তটাকে সে আসতেই দিত না তার জীবনে। কিন্তু এখন… কী লাভ!
কিছুক্ষণ আগে, কিরাম যখন তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে মাণ্ডুপকে ম্হিরির একজন সম্মানিত নাগরিকের স্বীকৃতি দিচ্ছিলেন, যখন সস্নেহ দৃষ্টিতে জিত্রানের দিকে তাকিয়ে তাকে ডাক দিচ্ছিলেন স্বীকৃতির প্রমাণস্বরূপ তার নিজে হাতে গড়া স্বাগত-মাতৃকামূর্তি নবীন যোদ্ধার হাতে তুলে দেবার, ঠিক সেই মুহূর্তেই মাথার গভীরে সে সন্তানদেবতার আহ্বান শুনতে পেয়েছিল। তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন তিনি। অভিনন্দন জানিয়েছেন সুকৌশলে সমস্ত গ্রামকে তাঁর মন্দিরের পাশে এভাবে, শান্তিপূর্ণভাবে একত্র করবার সাফল্যের জন্য। জানিয়েছেন, আর সামান্যক্ষণের মধ্যেই এদের মনের দখল গ্রহণ করবেন তিনি, এবং তাঁর প্রথম আক্রমণের প্রভাবক্ষেত্র থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাবার প্রয়োজন নেই ইন্দাতিরের বাসিন্দাদের। মহান দোরাদাবুর গবেষণায় যে মানসিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাঁর জন্ম হয়েছে সে অস্ত্র কেবলমাত্র ম্হিরিবাসীদের মস্তিষ্ককেই প্রভাবিত করবে। ইন্দাতীরের মস্তিষ্ক তাকে অনুভব জরবে না।
তখন, তৃপ্ত উল্লসিত গ্রামবাসীদের আনন্দে ভরা দৃষ্টি তার দিকেই আটকানো ছিল। কাছে এগিয়ে এসে তার চোখে চোখ রেখেছিল লজ্জাবনত ম্হিরিরি মেয়ে। তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ঠোঁটদুটিতে কী মধুর হাসিই না ফুটিয়ে তুলেছে সে। ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে ধরেছে নিজের হাতে গড়া মূর্তিটিকে… ভিনদেশি ভালোবাসার জনের জন্য ম্হিরির মেয়ের প্রথম উপহার…
তাদের সকলের সেই একাগ্র দৃষ্টির আড়ালে, মন্দিরের পেছনের আকাশে তখন নিঃশব্দে ভেসে এসে স্থির হয়েছেন ম্হিরির নতুন অধীশ্বর সন্তানগোলক। চোখে না দেখলেও মাণ্ডুপ তাঁর উপস্থিতি টের পাচ্ছিল… আর কয়েকটা মুহূর্ত…
হঠাৎ, নিজেরই অজান্তে তার হাত চলে গেল পোশাকের গভীরে… সযত্নে লুকিয়ে রাখা সেই ইফ্রাত নদীকূলের জাদুপ্রস্তরের দিকে। সযত্নে সীসার আবরণে মোড়া একটুকরো পাথর… একবার তার সীসার আবরণ সরিয়ে নিলেই তার অদৃশ্য আক্রমণ ওই সন্তানগোলককে নিরস্ত্র করে দেবে… এতগুলো মানুষ…
কিন্তু পরমুহূর্তেই তার বিবেক, মহান দোরাদাবুর প্রতি তার তখনও জেগে থাকা আনুগত্য তার হাত চেপে ধরল। স্বয়ং ঈশ্বর এদের নিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে সামান্য মানুষ হয়ে প্রতিবাদ করবার অধিকার তার নেই! তিনি সর্বজ্ঞ। তিনি এদের মঙ্গলই করবেন! হাত সরিয়ে নিল মাণ্ডুপ। তার সামনে এসে দাঁড়ানো তরুণীর হাতে ধরা মূর্তিটীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল সে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আঘাত হানলেন সন্তান দেবতা। হঠাৎ একটা কাটা গাছের মতই তার সামনে লুটিয়ে পড়ল জিত্রানের শরীরটা। তার হাতে ধরা স্বাগত মাতৃকামূর্তি মাটিতে পড়ে শতখণ্ড হয়ে ভেঙে গিয়েছে। দুটি হাতে নিজের মাথাটা এপে ধরে অকারণ অমানুষিক কোনো আতঙ্কের যন্ত্রণায় তার মুখ দিয়ে গোঙানির শব্দ বের হয়ে আসে… মাণ্ডুপকে ঘিরে চারপাশ থেকেই সেই শব্দ উঠেছে তখন।
পড়ে থাকা শরীরগুলোকে এড়িয়ে সাবধানে সামনের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ বাধা পেয়েছিল মাণ্ডুপ। দুটো হাত, তীব্র মানসিক আঘাতের অনুভূতিকে আসুরিক চেষ্টায় অস্বীকার করে প্রাণপণে তার একটা পা’কে জড়িয়ে ধরেছে। কিরাম… তাঁর বেঁকে ওঠা মুখটায় ঠোঁটদুটো নড়ছিল একটু একটু। আস্তে আস্তে তাঁর সামনে নীচু হয়ে বসে পড়ল মাণ্ডুপ। মুখটা এগিয়ে ধরল সে কিরামের ভুলুণ্ঠিত মুখের দিকে। প্রবল চেষ্টায় মানসিক আক্রমণটার বিরুদ্ধে লড়তে লড়তেই কিরামের ঠোঁটদুটো বলে উঠল, “দোরাদাবু ঈশ্বর নয়… সে আকাশের দানব… একদিন তুমি বুঝবে মাণ্ডুপ… সেদিন…উর নগরীতে… উকালান… তিনি… মনে রেখো…”
তার কথাগুলো বোধ হয় অনুভব করতে পেরেছিলেন সন্তানগোলক। বাক্যটা শেষ করবার আগেই ফের একটা তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল কিরামের শরীর। তারপর একটা ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল মরণাহত শরীরটা।
***
অবিশ্বাস্য, ধর্মদ্রোহী কথা। চিরশত্রু ম্হিরির এক দানবের উপযুক্ত কথা। কিন্তু তবু, তার মনের কোথাও বজ্রাক্ষরে লেখা হয়ে রইল সেই শব্দগুলো। সে তাতে বিশ্বাস রাখেনি সেই মুহূর্তে। ম্হিরি আশ্চর্যরকম শান্ত হয়ে গিয়েছে। তার মানুষেরা যন্ত্রের মতই যার যার কর্মশালায় ফিরে চলেছেন। তার পাশ দিয়ে প্রাণহীন পুতুলের মত হেঁটে যাওয়া জিত্রান ওই… আর সে তাকে চিনতে পারে না… কত স্বচ্ছন্দেই না তার লীলায়িত শরীর মাটিতে পড়ে থাকা কিরামের মৃতদেহকে ডিঙিয়ে ফিরে যায় তার শিল্পগৃহে…
তার পঞ্চাশ সৈনিককে নিয়ে গ্রামের সীমা ছাড়িয়ে যেতে যেতেই পিছু ফিরে শান্ত নিষ্প্রাণ গ্রামটার দিকে বারে বারে দেখছিল মাণ্ডুপ। রা তো দানব ছিল না! এরা তো মানুষ ছিল তারই মত। ভালোবাসতে জানত। স্বাধীন চিন্তায় নিজেদের এগিয়ে নিয়ে এক মহান সভ্যতাও গড়েছিল তারা… তবে কেন…
কিন্তু তারপর, একসময় দিগতবিসারী আধামরুর মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে সেই কথা একরকম ভুলে গেল সে। সামনে মঞ্জাদাহির। সেখানে কাজ সেরে আমহিরি… ইস্কা… পরিপূর্ণ একটা জীবন…অদূর ভবিষ্যতের সুখস্বপ্ন ছেয়ে আসে তার চোখে। কেবল, অবচেতনের গভীরে তার জেগে থাকে কিছু সংশয়, কিছু প্রশ্ন, কিছু সন্দেহ। সে জানত না, একদিন তারা ফের জেগে উঠবে… বদলে দেবে তার জীবনের গতিমুখকে… সে দিনের খুব বেশি দেরি ছিল না…
ক্রমশ
শীর্ষচিত্র- অতনু দেব।