জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- এভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়) অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)
এই ধারাবাহিকের আগের পর্ব- পর্ব ১, পর্ব ২ পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব ৫ পর্ব ৬, পর্ব ৭, পর্ব ৮ পর্ব৯, পর্ব ১০, পর্ব ১১ পর্ব ১২, পর্ব ১৩, পর্ব ১৪, পর্ব ১৫, পর্ব ১৬

স্যার অরেল স্টাইন ছিলেন একজন ব্রিটিশ পুরাতাত্ত্বিক। ১৮৬২ সালের ২৬ নভেম্বর তাঁর জন্ম হাঙ্গেরিতে। তিনি ব্রিটিশ সময়কালে নানা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি মধ্য এশিয়ায় একাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তিনি শুধু একজন প্রত্নতাত্ত্বিকই ছিলেন না, ছিলেন একজন নৃতাত্ত্বিক, ভূগোলবিদ, ভাষাবিদ এবং জরিপকারী। ডানহুয়াং গুহা থেকে উদ্ধারকরা পুথি এবং পাণ্ডুলিপির সংগ্রহ মধ্য এশিয়ার ইতিহাস এবং বৌদ্ধধর্মের শিল্প ও সাহিত্যের অধ্যয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর অভিযান এবং আবিষ্কারের উপর বেশ কিছু বই লিখেছিলেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাচীন খোটান, সেরিন্ডিয়া এবং আভ্যন্তরীণ এশিয়া বিষয়ক বই। সংস্কৃত থেকে রাজতরঙ্গিণীর ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন তিনি। চিরকুমার অরেল স্টাইন ১৯৪৩ সালের ২৬ অক্টোবর কাবুলে দেহত্যাগ করেছিলেন। এই নিবন্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে চলেছে তাঁর তাকলামাকান মরুভূমির প্রত্নতাত্ত্বিক খোটান অভিযানের কথা।
সপ্তদশ পর্ব
হিউয়েন সাঙ বর্নিত পি-মো’র খোঁজে
কারাডাং ছাড়ার পর লক্ষ ছিল দক্ষিণ মরু প্রদেশ। এখানে ঘন জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলের আশেপাশে বেশ কিছু ধ্বংসস্তূপ আছে। আমার প্রথম কাজ ছিল প্রাচীন শহর পি-মোর অনুসন্ধান। হিউয়েন সাঙ খোটান থেকে নিয়ার পথে এই শহরে গিয়েছিলেন। মার্কো পোলোও তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে ‘পেইন’ শহরের কথা উল্লেখ করেছিলেন। সম্ভবত এই দুই শহরই এক। বিশাল মরুর মাঝে এই প্রাচীন শহরের ধ্বংসস্তূপের অবস্থান খুঁজে বের করা সব চাইতে কঠিন। হিউয়েন সাঙ পি-মোর অবস্থান উল্লেখ করেছিলেন খোটানের রাজধানী থেকে ৩০০ ‘লি’ অর্থাৎ প্রায় ৬০ মাইল পূব দিকে। যা কেরিয়ার উত্তর-পশ্চিম দিকে হবার সম্ভাবনা বেশি। শেষবার যখন কেরিয়ার আম্বানের সাথে দেখা হয়েছিল তখন তিনি এক ‘কোন-শহর’এর কথা বলেছিলেন যা কেরিয়া শহর থেকে খোটানের রাস্তায় ৩০ মাইল পশ্চিমে গুলাখমার মরূদ্যান ছাড়িয়ে বালির মাঝে ছড়িয়ে আছে। রাম সিংও এই ধ্বংসাবশেষের কথা শুনেছিল। সময় বাঁচাতে মরুর মাঝ দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে এগোব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
চারদিন ধরে কেরিয়া দারিয়ার ধার ধরে উট আর পোণি বাহিনী নিয়ে যতটা সম্ভব দ্রুত ছুটছিলাম। নদীর পাশের জঙ্গলে বসন্তের আভাষ যদিও এখনও দেখা দেয়নি। কারাডাংএর বালুঝড়ের পরে তাপমাত্রাও খুব একটা বাড়েনি। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-১০০ সেলসিয়াস)। এমনকি ১৯ মার্চ তুষারপাতও হয়েছিল।
বুরহানুদ্দীন মাজারের আগে দলে দু-জন গাইড যোগ দিয়েছিল। আম্বানের নির্দেশে গুলাখমারের বেগ ওদের পাঠিয়েছিল। ওদের সাথে কথা বলে টের পেয়েছিলাম যে পথে যেতে চাইছি সে পথের সম্পর্কে কোন ধারনাই ওদের নেই। নিজেদের অজ্ঞতা লুকোতে ওরা আমাদের ভয়ংকর তাকলামাকানের সংক্ষিপ্ত মরুপথ এড়িয়ে আরও দক্ষিণের সহজ পথ ধরে নিয়ে যাতে চাইছিল। যা অনেক সময়সাপেক্ষ। ২৩ মার্চ নদীর বাম তীর ছেড়ে উঁচু বালিয়াড়ির বলয় পার করে কেরিয়ার দক্ষিণে শিভুল নদীর জলে পুষ্ট জলাভূমিতে পৌঁছেছিলাম। অনেক জায়গা জুড়ে থাকা এই বিশাল জলাভূমি পার হতে গুলাখমারের দুই গাইড-এর স্থানীয় জ্ঞান খুব কাজে লেগেছিল। ওদের সাহায্য ছাড়া জলার নরম বালি কাদার মধ্যে দিয়ে উট, পোনি সহ পার হতে গিয়ে বিপদ হতে পারত। জলা পার হয়ে চারণভূমির মাঝে অসংখ্য ভেড়ার পায়ের ছাপ দেখলেও একটিও ভেড়া বা চারণদারের দেখা পাইনি যাদের কাছ থেকে পথের হদিশ পাওয়া যায়। শীত যে এখনও বিদায় নেয়নি! শক্ত চারণভূমির মাঝ বরাবর শিভুল দারিয়া এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে। নদী চওড়ায় খুব বেশি হলে ফুট পনেরো। এই নদী আমাদের ‘গাইড’দের ‘গাইড’ করে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছিল। এই নদীর কিনারা ঘেঁষে সন্ধের আগে আগে আরিশ-মাজারে পৌঁছেছিলাম। এত বড় দল দেখে নির্জন মাজারের দেখভালকারী শেখ খুব ঘাবড়ে গিয়েও সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। প্রথমেই বড় আগুনের কুন্ড তৈরি করেছিল, যাতে রাতের অন্ধকারে পিছিয়ে থাকা দলের সদস্যদের পথ চিনতে ভুল না হয়। ক্লান্ত পোনি আর উটদের জন্য অল্প হলেও পশুখাদ্যের ব্যবস্থা করেছিল।
গাইডদের ওপর ভরসা না থাকায় মাজারের রক্ষকের সাথে আলোচনা করে নিজের বিচারবুদ্ধিতে মরুর বালিময় জঙ্গল পথ ধরে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে চলতে শুরু করেছিলাম। একটু পরেই কারাকি দারিয়ার জলাভূমি এসেছিল। তামারিস্ক ঝাড়-এ ভরা শঙ্কু আকৃতির বালিয়াড়ির মধ্যে দিয়ে চলছিলাম। এই ধরনের বালিয়াড়ি সাধারণত মরুভূমির সীমান্ত বরাবর দেখা যায়। চলতে চলতে হঠাৎ করেই আবিষ্কার করেছিলাম, যে অঞ্চল দিয়ে যাচ্ছি তা আসলে এক কোন পুরনো বসতির ধ্বংসস্তূপ। ইতিউতি ছড়িয়ে ভাঙা মাটির পাত্র, পেতলের আংটি, কাঁচের টুকরো আর বালির থেকে জেগে থাকা মাটির দেওয়ালের অংশ।
দারোগা ইব্রাহিম জঙ্গলের মধ্যে এক ভীত পশুপালককে দেখতে পেয়ে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করেও এই জায়গাটিকে ‘আতিলিক’ বা পুরনো শেষ হয়ে যাওয়া গ্রাম ছাড়া আর কোন তথ্য জানতে পারেনি। সম্ভব হয়নি কুড়িয়ে পাওয়া মাটির পাত্রের টুকরো বা আংটি থেকে এই পরিত্যক্ত বসতির সময়কাল সম্পর্কে কোন ধারণা পাওয়া।
এই ধ্বংসস্তূপের পেছনে দেবার মতো সময় হাতে ছিল না, দলবল নিয়ে দ্রুত চলা শুরু করেছিলাম জঙ্গলের বালি পথ ধরে। চলতে চলতে পৌঁছে গেছিলাম চাষ জমিতে – এসেছিল মালাকালাগান গ্রাম। প্রায় ১৫ বছর আগে খোটান-কেরিয়া পথের প্রধান মরূদ্যান ডোমোকোর কিছু লোক নদী থেকে খাল খুঁড়ে সেচের ব্যবস্থা করে জমিকে চাষযোগ্য করে এই গ্রাম বানিয়েছিল। মরুর জমিকে কঠোর পরিশ্রম করে এইভাবে চাষের উপযোগী করে তোলা সত্যিই শিক্ষণীয়। তামারিস্ক গাছের ঝোপওয়ালা বালিয়াড়িকে বেড় দিয়ে ছোটো ছোটো নালা কাটা হয়েছে। যদিও পুরো অঞ্চলটা এখনও সমান করা হয়নি। টগরাক গাছের জঙ্গল বালিয়াড়ির কোল ঘেঁষে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। বসতের কাছে এই জঙ্গল আরও ঘন হয়েছে। সেচ নালার ধার ঘেঁষে লাগানো হয়েছে পপলার, জিগদা সহ নানা ফলের গাছ – পরিকল্পনায় কোন খামতি রাখেনি গ্রাম স্থাপনকারীরা।
শুধু এইটুকু জানা ছিল, আমি যে ধ্বংসস্তূপ খুঁজছি তা লাচিন-আতার মাজারের আশেপাশে কোথাও হবে। মালাকালাগান গ্রামের লোকেদের সাথে কথা বলে বুঝতে পেরেছিলাম আমি যে ‘কোন-শহর’ এর খোঁজ করছি তার কথা শুনলেও গ্রামের কেউ ওই প্রাচীন ধ্বংসস্তূপে যায়নি বা তার সঠিক অবস্থান জানে না। আমার দুই ‘গাইড’ও এই ধ্বংসস্তূপে কি করে পৌঁছন যায় তার হদিশ করতে পারেনি। যদিও এই অঞ্চল ওদের অপরিচিত নয়। সময় দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছিল তাই ২৫ মার্চ এই গ্রাম ছেড়ে আন্দাজে ভড় করে রওনা দিয়েছিলাম।
এখানেই ‘মেইল-ডিউটি’তে থাকা ধন-সন্ধানী তুর্দি খোটান থেকে আবার দলে যোগ দিয়েছিল। সাথে নিয়ে এসেছিল খোটানে ছেড়ে আসা দুটো জলের ট্যাঙ্ক। ডোমোকোর লোকেদের সাথে কথা বলে মরুর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তুর্দি পথের দিশা অনেকটাই আন্দাজ করতে পেরেছিল। গ্রাম ছাড়ার আগে ছ’টা ট্যাঙ্কে জল ভরে নেওয়া হয়েছিল ঝুঁকি কমানোর জন্য।
গত তিনদিন অনেকটা দিশেহারা অবস্থায় থাকলেও যা অভিজ্ঞতা লাভ হচ্ছে তাতে শারীরিক আর মানসিক ক্লান্তি কেটে গেছিল। কয়েক মাইল উত্তর-পশ্চিম দিকে চলার পর পৌঁছেছিলাম সদ্য সেচের আওতায় নিয়ে আসা এক অঞ্চলে। অবাক লাগল, নতুন করে সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা শুরু হলেও এখানে পুরনো সেচ ব্যবস্থা ও চাষের চিহ্ন এখনও স্পষ্ট। পুরনো চাষের ক্ষেত ভরে আছে কাঁটাগাছে। কাঁটাগাছের ঝোপের মধ্যে জমির ‘আল’ উঁচু হয়ে। চাষের ক্ষেতের মাঝে জালের মতো ছড়িয়ে ছোটো ছোটো শুকনো নালা। আমাদের গাইড জানিয়েছিল এটা ছিল ‘পোনক’ নামের এক গ্রাম যা ওদের দাদুর আমলে পরিত্যক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগেও এটি একটি গ্রাম ছিল কিন্তু কোন কারণে লোকজন এখানে থাকা বন্ধ করে দিয়েছিল।
এখান থেকে আরও তিন মাইল মতো উত্তরের দিকে এগিয়ে পৌঁছেছিলাম আর একটি প্রায় পরিত্যক্ত গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে। গাইডরা বলেছিল এই গ্রামের নাম ‘পুরনো ডোমোকো।’ এই অঞ্চলের অন্যান্য ‘আধুনিক’ বসতির মতো ভেঙে পড়া গ্রামের মাটির বাড়ির মাঝে পরিকল্পিত রাস্তা, ফলের বাগান। কবরস্থানের বিস্তার প্রায় তিন মাইল জায়গা জুড়ে। বাড়ি ঘিরে চার থেকে পাঁচ ফুট উঁচু মাটির দেওয়াল প্রায় অটুট। অটুট, বাড়ির মধ্যে ডাঁই করে রাখা কুমুশ গাছের শুকনো ডালপালা ও উঁচু অগ্নিকুন্ডগুলো। শুধু বসত বাড়িগুলোর পুনরায় ব্যবহার যোগ্য জিনিস যেমন ঘরের চালের কাঠের বিম, দরজার পাল্লা ও চৌকাঠ ইত্যাদি উধাও। সম্ভবত এই গ্রাম পরিত্যক্ত হবার আগে বাড়ির মালিকেরা এগুলো খুলে নিয়েছিল। বাড়ির উঠোনগুলোতে বালি জমতে শুরু করেছে – একদিন মরু থেকে উড়ে আসা বালির তলায় চাপা পড়ে গিয়ে ‘কোন-শহর’ হয়ে যাবে এই বসতিও।
গ্রামে যে দু-একজন লোক এখনও টিঁকে ছিল তারা জানিয়েছিল এখানে নিয়মিত সেচের জল সরাবরাহ করতে অসুবিধা দেখা দেওয়ায় ডোমোকো ও গুলখমারের বেগের নির্দেশে গ্রামকে বেশ কিছু বছর আগে প্রায় আট মাইল দক্ষিণে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওরা আরও জানিয়েছিল কেরিয়া থেকে চিরার মাঝের ছোটো ছোটো মরূদ্যানগুলো নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও সেচের জল পাওয়ার ওপর নির্ভর করে প্রায়শই স্থান বদলায়। এই রীতি এই অঞ্চলে বহুকাল ধরে চলে আসছে। কোন সন্দেহ নেই বসতি অঞ্চলের স্থানান্তিকরণের দূরদর্শিতা এই অঞ্চলের পরিবর্তনশীলতার সাথে মানানসই। এই বসতি ছেড়ে প্রায় তিন মাইল পথ ছোটো ছোটো বালিয়াড়ির মধ্যে দিয়ে গিয়ে একটি কাঠে তৈরি সমাধি ক্ষেত্রের পাশে পৌঁছেছিলাম। যদিও এখানে একজনও ছিল না যার কাছ থেকে আমাদের গন্তব্যের কোন হদিশ পাওয়া যেতে পারে।
ক্রমবর্ধমান বালির টিলার মধ্যে দিয়ে এগোতে গিয়ে টের পেয়েছিলাম প্রায় পরিত্যক্ত গ্রামের যে ক’জন বাসিন্দা খননের কাজ করবে বলে আমার সাথে চলেছিল তারও ‘পি-মো’ নিয়ে আলোচনা করছে। ধ্বংসস্তূপ কোথায় না জানা থাকলেও সেই ‘কোন-শহর’এর গল্প সবাই জানে। বালির গর্ভে যাবার আগে কি ভাবে ও কি কারণে পরিত্যক্ত হয় তা আগের গ্রাম থেকেই দেখেছি। আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম আজ থেকে প্রায় বারো শতাব্দী আগে ‘পি-মো’ শহরে বসে এক পুণ্যাত্মা আগন্তুককে শহর প্রধানের উপহাস করার ফল স্বরূপ প্রাপ্য অভিশাপে যে হো-লো-লো-কিয়া নামের এক শহর টানা সাত দিন ধরে বালিঝড়ে চাপ পড়ে যাবার উপকথার কথা হিউয়েন সাঙ বলেছিলেন তা এই গ্রামবাসীদের জানা। হো-লো-লো-কিয়া বা কারাডং শহর যে সত্যিই ছিল তা আমার খননে প্রমাণিত।
আর একটি গল্পও এই গ্রামবাসীদের কাছে শুনেছিলাম যা হিউয়েন সাঙ বলেননি। সাতজন ধার্মিক ব্যক্তি যারা এই পুণ্যাত্মা আগন্তুককে শ্রদ্ধা জানিয়েছিল তার ওই আগন্তুকের কথামতো উঁচু খুঁটির মাথায় দড়ি দিয়ে নিজেদের বেঁধে রাখে এবং সাতদিন পর ঝড় থেমে গেলে দড়ি খুলে নেমে আসে বালি পাহাড়ের ওপর। ততক্ষণে পুরো শহর চাপা পড়ে গেছে বালির তলায়। সমস্ত তাকলামাকান মরুভূমি জুড়ে এই ধরনের ধ্বংসস্তূপ জড়ানো নানা গল্প ছড়িয়ে।
অসংখ্য ছোটো ছোটো ধ্বংসস্তূপ মরুর বালির তলায় চাপা পড়ে। তার কয়েকটির সামান্য অংশই বালির উপর জেগে। তারই একটা হঠাৎ করে খুঁজে পেয়েছিলাম দিশাহীন পথে চলতে চলতে। বালির ওপর ছড়িয়ে থাকা ভাঙা মাটির পাত্র জানান দিয়েছিল যে এখানে ‘আমি’ বালির তলায় শুয়ে আছি।
গতকাল সন্ধেতে আমাদের অকর্মণ্য গাইডদের কল্যাণে মরুর অনেক গভীরে চলে গেছিলাম। অন্ধকার ঘনিয়ে আসায় রাত কেটেছিল অজানা মরুর বালিটিলার মাঝে। দুই গাইডের একজন পালিয়ে গেছিল রাতের অন্ধকারে। তুর্দি আর একজনকে চোখে চোখে রেখেছিল বলে সে পালাতে পারেনি। সেই রাতেই তুর্দি দলবল নিয়ে তার দীর্ঘদিনের মরুতে চলার অভিজ্ঞতা দিয়ে তাঁবু থেকে বেশ খানিকটা দক্ষিণ-পশ্চিমে পালিয়ে যাওয়া গাইডকে খুঁজে বগল দাবা করে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিল ভোরের আগে আর সন্ধান পেয়েছিল এই ধ্বংসস্তূপের।
প্রায় আধ বর্গমাইল জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে মাটির পাত্রের টুকরো ও নানা ধরনের রাবিশ। প্রাকৃতিক ‘ক্ষয়’য়ের সাথে সাথে ‘গুপ্তধন শিকারি’রাও যে এখানে হানা দিয়েছে তার ছাপ স্পষ্ট। মাটির বাড়ির যে সামান্য অংশ বালির ওপর মাথা তুলে আছে তার অবস্থা এতই ভঙ্গুর যে অতি সাবধানে খনন করতে হবে। ফলে বহু সময় লেগে যাবে। হাতে সময় নেই, তাই এই ধ্বংসস্তূপ খনন করে কোন তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। যদিও হিউয়েন সাঙ বর্ণিত ‘পি-মো’র সাথে ভাগ্যক্রমে খুঁজে পাওয়া এই ধ্বংসস্তূপের কোন সম্পর্ক ছিল কিনা তা জানা প্রয়োজন ছিল।
প্রাচ্যবিদ (Orientalist) তথা ভূগোলবিদ স্যার হেনরি ইউলের মতে মার্কো পোলো বর্নিত ‘পেইন’ আর ‘পি-মো’ এক। মার্কো পোলো খোটান থেকে পূবের পথে এই শহর ভ্রমণ করেছিলেন বলে উল্লেখে করেছিলেন। যদি তাই হয়, তাহলে ‘পি-মো’ বা ‘পেইন’ শহর ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সচল ছিল। এই ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া ভাঙা মাটির পাত্রের নমুনা, কাচ, পিতল আর ছোটো ছোটো পাথরের জিনিসপত্র দেখে আমার মনে হয়েছে বালির তলায় চাপা পড়ে থাকা এই শহর মধ্যযুগের। আমার এই ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছিল নিজের হাতে কুড়িয়ে পাওয়া দক্ষিণ সুং রাজবংশের (১১২৭-১২৭৮ শতাব্দী) ছাপ দেওয়া এক তামার মূদ্রা দেখে।
আমাদের গাইড বলেছিল এই ধ্বংসাবশেষের কাছে উলুগ-জিয়ারাত (পবিত্র মাজার) আরও একটি ধ্বংসাবশেষ আছে বলে সে শুনেছে, কিন্তু যথারীতি তার অবস্থান সে জানে না। প্রায় দু’দিন ধরে উদভ্রান্তের মতো মরুর বুকে প্রায় ২৫ মাইল চক্রাকারে ঘুরে সেই ধ্বংসস্তূপে পৌঁছেছিলাম। পরে হিসেব কষে বের করেছিলাম আগের ধ্বংসস্তূপ থেকে দক্ষিণ-পূর্বে সোজা মাইল তিনেক গেলেইপৌঁছন যেত উলুগ-জিয়ারাতে। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা উলুগ-জিয়ারাত আগের ধ্বংসাবশেষ থেকে আয়তনে ছোটো। বালির ওপর থেকে কুড়িয়ে পাওয়া ভাঙা নমুনা দেখে দুই ধ্বংসাবশেষ একই সময়কালএর বলে মনে হয়। ৪৮০ ফুট লম্বা ৩৪৮ ফুট চওড়া ১৪ ফুট উঁচু পাঁচিলটার ভিত ১১ফুট চওড়া। এই পাঁচিল ঘেরা অংশের ভেতরে বসতের লক্ষ্মণ বা কোন কিছুর খোঁজ পাওয়া না গেলেও সম্ভবত এটিকে দূর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হত।
গত তিনদিন ধরে টের পাচ্ছিলাম কি রকম ভয়ংকর গরম আসতে চলেছে। ২৭ ও ২৮ মার্চ ছায়াতে তাপমাত্রা ছিল ৮৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩১.১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। যদিও রাতের তাপমাত্রা ছিল ২৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। সঠিক পথপ্রদর্শক ছাড়া এই বালি সমুদ্রে কাঙ্ক্ষিত ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করা জটিল কাজ। সাথে আনা জলও ফুরিয়ে এসেছে প্রায়। তাই পি-মো খোঁজার আশা ছেড়ে দক্ষিণের দিকে চলা শুরু করি বসতি অঞ্চলে পৌঁছতে। আমার সিদ্ধান্তে সঙ্গের লোকেরা খুশিতে ফেটে পড়েছিল।
২৯ মার্চ ‘লাচিন-আতা’ উপাসনালয়ের কাছ ঘেঁষে মরু প্রান্তের ‘নতুন পোনাক’ গ্রাম পার হয়ে পৌঁছেছিলাম গুলখমার মরুদ্যানে। চাষের মাঠ আর সবুজ বাগান দেখে চোখগুলো আরাম পেয়েছিল।
ডোমোকোর বেগের অধীন গুলখমারে প্রায় ন’শো পরিবার বাস করে। আমার দলের বিশ্রাম প্রয়োজন ছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু সময় তাড়া করে বেড়াচ্ছে, তাই ৩০ মার্চ রাম সিংএর নেতৃত্বে মালপত্র সহ দলবল খোটানের পথে রওনা করিয়ে দিয়ে আমি একা সামান্য মালপত্র সাথে একা ছুট লাগিয়েছিলাম কেরিয়ার দিকে আম্বানের কাছ থেকে বিদায় নিতে। ওনার সহায়তা ভোলার নয়। রাস্তার দু’পাশে বসন্তের আগমন বার্তা স্পষ্ট। উইলো আর পপলার গাছে কচি সবুজ পাতা বেরোতে শুরু করেছে। কেরিয়ার পথে ‘ইয়াকা-লাঙ্গারে’ নিয়াজ হাকিম বেগের তৈরি সরাইয়ের পাশে সদ্য পাতা আসা কুলের বাগানের মাঝে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটিয়েছিলাম। সন্ধের হালকা ঠান্ডা বাতাস আর চারপাশের সবজে আভা পাঞ্জাবের কথা মনে পড়িয়ে দিয়েছিল।

কেরিয়াতে পৌঁছে দেখি শহরটা ‘বকরি-ঈদ’এর উৎসবে মজে আছে। একদিকে গাছে গাছে গজানো নতুন সবুজ পাতা আর এক দিকে গান-বাজনা করতে করতে চলছে খানাপিনা। এতদিন মরুর নির্জনতায় কাটিয়ে হঠাৎ করেই যেন চলে গেছিলাম অন্য জগতে। ক্যাম্প করেছিলাম ‘তোপবাশি’র বাগানে। পরদিন ১লা এপ্রিল কেরিয়ার আম্বান হুয়াং-দালোইএর সাথে কিছু স্মারক উপহার নিয়ে শেষ বিদায় জানতে গেছিলাম। অভিযানের কথা বলতে বলতে দারোগা ইব্রাহিমের প্রসঙ্গ উঠেছিল। ওর উদ্যমতা আর কর্তব্যনিষ্ঠা ছাড়া যে এত বড়ো অভিযান মসৃণ ভাবে পরিচালনা করা কঠিন হত বলাতে, সাথে সাথে সবার সামনে দারোগা ইব্রাহিমের পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেছিলেন আম্বান। কেরিয়াতে ইতিমধ্যে রটে গেছিল যে আমি কাজের প্রশংসা করেছিলাম বলেই খোটানের আম্বান প্যান-ডারিন আমার অভিযানে সহকারী হিসেবে যোগ দেওয়া খোটান ইয়ামেনের ঠান্ডা আর উদ্যমী পরিচারক ইসলাম বেগকে কারা-কাশের ‘বেগ’ পদে উন্নীত করেছেন। হুয়াং-দালোই, ঠিক প্যান-ডারিনের পথেই পুরস্কৃত করেছিলেন ইব্রাহিমকে। আমি খুবই খুশি হয়েছিলাম দু’জন এইভাবে পুরস্কৃত হতে দেখে। হুয়াং-দালোইকে বিদায় জানিয়ে ইয়ামেন ছেড়ে আসার সময় বুঝতে পেরেছিলাম আমরা একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে পড়েছিলাম। দু’জনেই জানতাম আর কখনও আমাদের দেখা হবে না।
২ এপ্রিল খোটানের দিকে যাত্রা শুরু করি। প্রথম রাত ছিলাম ডোমোকো মরূদ্যানের রাস্তার ধারের এক বাজার – কারাকির ল্যাঙ্গারে। রাস্তার দু’ধারে চাষের ক্ষেত। শুনলাম মাত্র বছর দশেক আগে পাহাড়ের অতি বর্ষার পর কিছু ঝোরার সৃষ্টি হয় এই অঞ্চলে। ঝোরা বেয়ে হিমবাহ গলা জল নিয়মিত আসা শুরু হতে ঊসর মরু প্রান্তরে ৮০০ মতো পরিবার এখানে বসত গেড়ে চাষা-বাদ শুরু করে। পত্তন হয় আজমা নামের এক গ্রাম।
দ্বিতীয় দিন ছিলাম চিরা নামের এক মরুদ্যানে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার পরিবারের বাস এখানে। উত্তর ও উত্তর-পূর্বের মুজতাগ হিমবাহের জলে পুষ্ট হাসা নদীর উপনদী বেয়ে জল পৌঁছয় এই মরুদ্যানে। যে বাগানের মধ্যে তাঁবু খাটিয়েছিলাম তা তুষারের মতো ছোটো ছোটো সাদা ফুলে ছেয়ে ছিল।
পরের দিন রওনা হবার খানিক পরেই শুরু হয়েছিল ধুলো ঝড়। পশ্চিম থেকে উড়ে আসা বালির মিহি কণা নাজেহাল করে ছেড়েছিল, সাথে দোসর হয়েছিল ঘন কুয়াশা। পথের দু’পাশে সার দিয়ে খুঁটি পুঁতে রাস্তা চিহ্নিত ছিল বলে প্রায় ৪০ মাইল পথ পার হয়ে নিরাপদে কেরিয়ার আম্বানের অধীন সাম্পুলার মরূদ্যানে পৌঁছতে পেরেছিলাম। পথের ধারে খুঁটি পোতা না থাকলে বালুঝড়ে পথ যে হারাতাম তাতে ভুল নেই। ইউরুং-কাশ নদী থেকে খাল কেটে নিয়ে আসা জলে পুষ্ট সাম্পুলার মরূদ্যান। মূলত কার্পেট শিল্পকে ভিত্তি করে সাম্পুলার সমৃদ্ধ গ্রাম হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছিল গ্রামের বৃদ্ধ প্রধান। অ্যানিলিন রঞ্জক ব্যবহার করে তৈরি করা এখানকার রেশম কার্পেট পুরো তুর্কিস্তানে প্রসিদ্ধ।
চতুর্থদিন খোটানের পথে সাম্পুলার উত্তরের একটি বড় গ্রাম হাঙ্গুয়া ছাড়িয়ে মরুর মাঝে এক ধ্বংসস্তূপ দেখতে গেছিলাম। কয়েক বর্গ মাইল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই ধ্বংসস্তূপের কথা আমাকে তুর্দি আগেই জানিয়েছিল। হাঙ্গুয়া গ্রামের লোকেদের কাছে এই ধ্বংসস্তূপ ‘আরকা-কুদুক টিম’ নামে পরিচিত। ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে একটি কুড়ি ফুট উঁচু ইটে তৈরি প্রায় ভেঙে যাওয়া ‘স্তূপ’ দাঁড়িয়েছিল। ধ্বংসস্তূপে খুব উৎসাহ জাগানো কিছু খুঁজে না পেলেও তুর্দির পরিচিত লোকেরা এই ধ্বংসস্তূপ থেকে কুড়িয়ে পাওয়া কিছু প্রাচীন মুদ্রা, সিলমোহর ইত্যাদির নমুনা আমাকে দিয়েছিল। যা এই ধ্বংসস্তূপের প্রাচীনত্বের প্রমাণ।
হলদে ধুলোঝড়কে সাথী করে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে সন্ধে নাগাদ খোটানের প্রান্তে ইউরুং-কাশের ধারে পৌঁছেছিলাম। আমার জন্য নতুন পাওয়া ‘বেগ’এর তকমা পোশাকে লাগিয়ে ইসলাম বেগ নদীর ধারে অপেক্ষা করছিল। তার সাথে হাজির ছিল বদরুদ্দিন খান, আফগান আকসাকাল সহ স্থানীয় বেগ ও বণিকের দল। সবাই মিলে শোভাযাত্রা করে আমাকে নিয়ে তুলেছিল পুরনো বাগানে, যেখানে আমি আগে ক্যাম্প করে ছিলাম। আমাকে আবার দেখতে পাওয়ার আনন্দে চিৎকার করতে করতে ছুটে এসেছিল ‘ইওলচি বেগ।’

আক-সিপিলের পথে যাত্রা
৬ এপ্রিল দ্রুত ছিঁড়ে-ফেটে যাওয়া সরঞ্জাম মেরামত করিয়ে, খাবার দাবার সহ অনান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও শ্রমিক জোগাড়ের কাজ সেরে ফেলতে হয়েছিল। গরম আর বেড়ে চলা ধুলোঝড় বুঝিয়ে দিচ্ছিল আর কিছুদিনের মধ্যেই মরুতে কাজ করা সম্ভব হবে না। বিশ্রামের খুব প্রয়োজন হলেও দলের সবাই এটা বুঝে গেছিল খোটানের উত্তর-পূর্ব মরুর প্রাচীন স্থানগুলোতে দ্রুত অনুসন্ধানের কাজ না শুরু করতে পারলে কাজটা আর করা হয়ে উঠবে না। দারোগা ইব্রাহিম এখান থেকেই বিদায় নিয়েছিল। যাওয়ার সময় ওকে পুরস্কৃত করেছিলাম সোনার রুবেল দিয়ে। সাথে কেরিয়ার আম্বানের জন্য অনেক ওষুধ দিয়ে দিয়েছিলাম।
৭ এপ্রিল ভোরবেলা যাত্রা শুরু করেছিলাম খোটানের উল্টোদিকে ইউরুং-কাশের ডান তীর ধরে ‘আক-সিপিল’এর দিকে। ‘আক-সিপিল’ মানে সাদা দেওয়াল, – এই নামেই খোটান থেকে প্রায় পনেরো মাইল মরুর উঁচু বালিয়াড়ির মাঝে ‘ধন-শিকারি’দের কাছে পরিচিত জায়গাটা। যাওয়ার পথে একটি গ্রামের ধারের চাষের ক্ষেতের প্রান্তে ‘তাম-ওঘিল’ নামের একটি জায়গা ঘুরে দেখেছিলাম। এই জায়গায় অনেক প্রাচীনকালের দ্রব্যাদি, যেমন টেরাকোটার নানা সামগ্রী, মুদ্রা, সোনার কুঁচি এইসব মাটির স্তর থেকে পাওয়া গেছে। ঠিক যেমনটি পাওয়া গেছে ইয়োটকানে। এইখানে জলের জোগান কম থাকায় মাটির স্তরে খুব বেশি খোঁড়াখুঁড়ি হয় না। তবে বছর কুড়ি আগে সেচখাল উপচে বন্যার ফলে একটা ছোটো ‘ইয়ার’ বা জলেরখাত সৃষ্টি হয়। সেই খাতের মাটির স্তরে সোনা পাওয়া যায়। তারপর থেকে প্রতি বছর গরমকালের এক থেকে দু’মাস সময় বেশ কিছু মানুষ সোনা খুঁজে বেড়ায়। লক্ষ করেছি যে খাতের দু’পাশের উঁচু হয়ে জমে থাকা উর্বর পলি কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে – শুনলাম কাছের গ্রামের মানুষেরা এই পলি কেটে নিয়ে চাষের জমিতে ফেলেছে।
চাষের জমির আওতা ছাড়াতেই ছোটো ছোটো বালিয়াড়ির মাঝে ছড়িয়ে পড়ে থাকা অজস্র প্রাচীন ভাঙা মাটির পাত্রের টুকরোর ওপর দিয়ে মাইল চারেক এগোতে শুরু হয়েছিল উঁচু উঁচু বালিয়াড়ির সাম্রাজ্য। প্রাচীনকালে গ্রাম ও চাষের জমি যে আরও উত্তরে প্রসারিত ছিল এই ভাঙা মাটির টুকরোগুলো তার সাক্ষী। ধু ধু মিহি বালির সমুদ্রের মাঝে মোটা বালি আর নুড়ি-পাথরের উপস্থিতি দেখে অনুমান করে নিতে অসুবিধা হয় না যে এখানে একসময় নদী ছিল। এই নুড়ি-পাথর আর মোটা বালি জল বাহিত। প্রায় মাইল পাঁচেক উঁচু বালিয়াড়ির মধ্যে দিয়ে হেঁটে পৌঁছেছিলাম প্রায় সমতলের মতো ‘আক-সিপিল’এ। এখানে, উঁচু বালিয়াড়ি নেই। বালির বুকে জেগে ছোটো ছোটো বাঁধের চিহ্ন।
‘আক-সিপিল’এ এক প্রাচীন দুর্গের ভগ্নাবশেষ সুস্পষ্ট – বিশেষ করে দুর্গের পাঁচিল আর প্যারাপেটের খানিক অংশ। আমার আগে বেশ কিছু ইউরোপিয় ভ্রমণকারী এই ধ্বংসাবশেষ পরিদর্শন করেছেন এবং সে সম্পর্কে বেশ কিছু নির্ভরযোগ্য তথ্য এম. গ্রেনার্ড এম. ডুট্রুইল ডি রিন্সের লেখায় প্রকাশ পেয়েছে।
জরিপ করে দেখেছিলাম দুর্গটির ভাঙা পাঁচিলের একটি অংশ প্রায় ৩৬০ ফুট লম্বা। পুরো পাঁচিলটি ১০০০ ফুট ব্যাসের এলাকা জুড়ে বৃত্তাকারে ছিল। এন্ডারের মতোই এই পাঁচিলের নীচের অংশ পুরু কাদামাটির তৈরি। বালিমুক্ত জায়গায় যেখানে পাঁচিল এখনও অক্ষত তা উচ্চতায় ১১ ফুট এবং তা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল। আট ফুট চওড়া পাঁচিলের মাথার রোদে শুকনো ২০x২০x৪ ইঞ্চি মাপের ইটে তৈরি প্যারাপেট প্রমাণ করে ভীষণ পোক্ত করে এই পাঁচিল বানানো হয়েছিল। পাঁচিলের গায়ে ভিতের থেকে ১৬ ইঞ্চি ও ৫ ফুট উঁচুতে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর একটা করে ফোঁকর, যা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখা যায়। প্যরাপেটের দুটি অংশে তিন ফুট উভয় দিকে বেরিয়ে থাকা শক্ত ইটে তৈরি ধাপ কাটা উঁচু মাচা অক্ষত অবস্থায় টিকে ছিল, সম্ভবত এগুলো ছিল ওয়াচটাওয়ার।
পুরো অঞ্চলটা ঘুরে দেখেছিলাম দুর্গের উত্তরদিকের অল্প অংশ ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। দুর্গের ভেতরে একসময় ঘর-বাড়ি ছিল নিশ্চিত কিন্তু প্রবল হাওয়ায় সব ক্ষইতে ক্ষইতে বালিতে মিশে গেছে। আশপাশের কিছু বালি টিলার মাঝের সমতল অংশে ‘ধন-শিকারি’রা খুঁজে পেয়েছে হান আমলের মুদ্রা, সীলমোহর সহ নানা প্রাচীন সামগ্রী। এই সব নমুনা আগেই আমার হাতে এসেছিল।
রওয়াক স্তূপ আবিষ্কার
তুর্দি এখান থেকে আমাকে নিয়ে গেছিল মাইল দেড়েক দক্ষিণ-পশ্চিমে এক নিচু ঢিবির কাছে। ধন সন্ধানীদের খোঁড়াখুঁড়ির ছাপ স্পষ্ট। একটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া মন্দির। ধন সন্ধানীদের খোঁড়াখুঁড়ির ফলে বালির ওপর ছড়িয়ে ছিল ধ্বংস হয়ে যাওয়া মন্দিরের পলেস্তারা, স্টুকোর টুকরো আর পচা কাঠ। স্টুকোর টুকরোগুলো হাতে নিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম মন্দিরের গায়ের মূর্তির শৈলী আর অলঙ্করণ দান্দান-উইলিক বা এন্ডারের তুলনায় অনেক উচ্চ মানের – গান্ধারার গ্রেকো-বৌদ্ধ ভাস্কর্যের মতো।
স্টুকোর টুকরোগুলো শুধু শক্তই ছিল না এগুলোতে মাকড়সার জালের মতো চিড় ধরেছিল। জায়গায় জায়গায় পোড়া দাগও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল। সম্ভবত এই মন্দির আগুন ধরে পুড়ে যাওয়ার ফলে স্টুকোগুলোর এই হাল হয়েছে। সত্যিই আগুন লাগার ফলে স্টুকোগুলো এই অবস্থা হয়েছে কিনা তা একমাত্র ‘সিরামিক বিশেষজ্ঞ’রাই বলতে পারবে। ‘ধন-শিকারিরা’ এই জায়গাকে বলে ‘কিঘিলিক।’ ধ্বংস হয়ে যাওয়া মন্দিরের কাছে প্রায় ৭০ ফুট বাই ৫০ ফুট জায়গা জুড়ে কোন সময় স্তূপ করে রাখা ঘোড়ার মল শুকিয়ে সার – ‘কিঘিক’ – হয়ে আছে। এই ‘কিঘিক’ থেকেই এই জায়গার নাম ‘কিঘিলিক।’ সারের স্তূপের পাশ ঘেঁষে ‘ধন-শিকারি’দের খোঁড়া সুড়ঙ্গের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে আছে।
১০ এপ্রিল ‘আক-সিপিল’ থেকে সকালবেলা রওনা দিয়ে মোটা ধূসর বালির টিলা আর নুড়ি ভরা ‘সাই’ বা পাথুরে মরু পথ ধরে প্রায় চোদ্দ মাইল পার হয়ে সন্ধেবেলা পৌঁছেছিলাম রওয়াক, যার অর্থ ‘উঁচু প্রাসাদ।’ তখন জানতাম না যে কি ঐশ্বর্য অপেক্ষা করছে আমার জন্য। তুর্দি আগে বলেছিল এখানে একটা পুরনো বাড়ি বালিতে অর্ধেক চাপা পড়ে আছে। কিন্তু আমি ধ্বংসস্তূপে পৌঁছেই বুঝেছিলাম এটি শুধুমাত্র পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটি বিশাল প্রাসাদের অংশই নয় এর মাঝে আছে একটি বড় স্তূপ, – খোটান অঞ্চলে এখনও পর্যন্ত যা দেখেছি এটি তার মধ্যে সবচাইতে ভালো অবস্থায় আছে। ২৫ ফুটেরও বেশি উঁচু বালি টিলা পাঁচিল ঘেরা অংশের উত্তর-পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্ব দিকের দখল নিয়েছে। বালির তলায় চাপা পড়ে স্তূপের ভিত্তির অনেকটা অংশ। স্তূপের দক্ষিণ দিকে বালি কম জমার ফলে স্তূপের ভিত্তির বেশ খানিকটা অংশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। পাঁচিলের দক্ষিণ কোনের কাছে ‘ধন-শিকারি’দের লুণ্ঠনের নিশানা হয়ে একটি বিশাল স্টুকো মুর্তির মাথা বালির ওপর পড়ে ছিল। আমি এই নিশানা দেখেই বুঝে গেছিলাম এখানে খননের পরিসর বড় হবে, সেই মতো সাথেসাথে আরও শ্রমিক জোগাড় করে নিয়ে আসার হুকুম দিয়েছিলাম।
আমার সৌভাগ্য মরূদ্যান শহর ও গ্রাম ধ্বংসস্তূপের কাছাকাছি থাকাতে শ্রমিক পেতে কোন সমস্যা হয়নি। নিকটবর্তী জিয়া গ্রাম থেকেই প্রয়োজনীয় শ্রমিকের দল যোগাড় হয়ে গেছিল। এই বিশাল দলের জন্য জলের ব্যবস্থা করাই আমার চিন্তার কারন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শ্রমিকরাই ধ্বংসস্তূপের দুই মাইল মতো দূরে বালিটিলার মাঝে একটা কুয়ো খুঁড়ে জলের ব্যবস্থা করেছিল। শ্রমিকদের ক্যাম্প করা হয়েছিল ওই কুয়োর পাশে। রওয়াক থেকে ইউরুং-কাশ নদীর দূরত্ব মাত্র সাত মাইল মতো। জলের উৎস খুব বেশি দূরে না থাকায় সহজেই মাটির নীচের জল পাওয়া সম্ভব হয়েছিল বলে মনে হয়।

‘বুরান’ বা মরুঝড়ের সময় শুরু হয়ে গেছিল। প্রতিদিন দুরন্ত গতিতে উড়ে চলা হালকা বালি নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছিল। লক্ষ্য করে দেখেছি প্রতিদিন বাতাস বওয়া শুরু হয় আগের দিনের উল্টো দিকে থেকে। সকাল এবং সন্ধেতে ঝড়ের গতি থাকে সবচাইতে বেশি – যা তাকলামাকানের বৈশিষ্ট্য। স্থানীয় অধিবাসীরা এটা ভালো জানে, ফলে আগামীকাল কোনদিক থেকে হাওয়া বইবে সে সম্পর্কে তারা প্রস্তুত হয়ে যায়। আমার আগে যে সব পর্যটক তাকলামাকান ভ্রমণ করেছেন তারাও এই বিষয়ে একই কথা বলে গেছেন। ক্রমাগত বালির ঝাপটা আর দিনের প্রচণ্ড গরম খননের কাজকে অস্বস্তিকর করে তুলছিল। চকচকে হলদে ধূলিকণায় সূর্যের আলো পড়ে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল। সূর্য অস্ত যেতেই দ্রুত ঠান্ডা নেমে আসছিল। আবহাওয়ার চূড়ান্ত তারতম্যের ফলে দলের সবাই জ্বর – কাশিতে ভুগতে শুরু করেছিল। বস্তুত ইউরুং-কাশ পার হয়ে আসার পর থেকেই শুরু হয়েছিল রোগের উপদ্রব। প্রতিকূল বায়ুমণ্ডলীয় প্রভাব এড়ানো সম্ভব ছিল না কিন্তু কুইনাইনের ডোজে কাজ হচ্ছিল।

১১ এপ্রিল পাঁচিল ঘেরা অংশের দক্ষিণ কোণে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করার পরপরই টের পেয়েছিলাম স্তূপের দেওয়ালের গায়ে বিশাল আকৃতির স্টুকো মূর্তি সারি দিয়ে অনেকটাই অক্ষত অবস্থায় আছে। প্রায় সাত ফুট গভীর বালির তলায় চাপা পড়ে থাকার জন্য মূর্তিগুলোর প্রাকৃতিক সংরক্ষণ ভালোভাবেই হয়েছে। বুঝতে পেরেছিলাম এই ভাস্কর্যগুলোকে অবিকৃত অবস্থায় পেতে খনন চালাতে হবে নিখুঁত পদ্ধতিতে। প্রথমেই দেওয়ালের পাশ থেকে বালি পুরোপুরি সরিয়ে ফেলতে হবে যার জন্য প্রচুর লোকবল দরকার। চেয়ে পাঠানো অতিরিক্ত শ্রমিকরা এসে না পৌছনোয় আমি সাথে থাকা ডজন খানেক লোককে লাগিয়ে দিয়েছিলাম কাঠামোগত জরিপের কাজের জন্য দেওয়ালের ধার ঘেঁষে অল্প করে বালি সরাতে।
পাঁচিল ঘেরা অংশের উত্তর-পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্ব কোণের স্তূপ ঘিরে প্রাথমিক জরিপ করার পর দেখা গেল এটি লম্বায় ১৬৪ ফুট ও ১৪৩ ফুট চওড়া রোদে শুকনো ইটের ৩ ফুট চওড়া ১১ফুট উঁচু পাঁচিলের ভেতর আলাদা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সম্ভবত পাঁচিলের উচ্চতা আরও বেশিই ছিল কোন এক সময়। স্তূপটি ভিত থেকে দুটো সমভুজ ধাপে ওপরে উঠেছে, প্রতিটি ধাপ প্রায় ২০ ফুট করে উঁচু। নীচের ধাপটি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ৫০ ফুট।
বৃত্তাকার ড্রামের আকারের শুকনো ইটে তৈরি স্তূপের গম্বুজটির উচ্চতা ছিল ৩২ ফুটের ওপরে। ৭১ ফুট ব্যাসের এই গম্বুজের ভেতরে সম্ভবত একটি ঘর ছিল। কিন্তু সত্যি ছিল কিনা তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি কারন গম্বুজের পশ্চিম দিকের অর্ধেক অংশ ভাঙা ছিল। ভাঙা ছিল গম্বুজের মাথাটি – সম্ভবত ‘ধন-সন্ধানী’দের খোঁড়াখুঁড়ির শিকার। ঝড়ের ঝাপটাও ধ্বংসের কারন হতে পারে। ফলে গম্বুজের সঠিক উচ্চতা মাপা সম্ভব হয়নি। লক্ষণীয় বিষয় হল গম্বুজের পাদদেশ পর্যন্ত দুটি ধাপ খাড়া উঠে গিয়েছিল।
সময়ের কারণে স্তূপ ঘেরা পাঁচিলের দক্ষিণ-পূর্ব দিকের প্রবেশদ্বারের দিকের অংশটি সম্পুর্ন বালিমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ভিতের পাদদেশ থেকে স্তূপের দেওয়াল সাদা রঙের স্টুকো মূর্তিতে ভর্তি ছিল। সম্ভবত স্তূপের চারদিক একইভাবে নানা ছাঁচের মূর্তিতে সজ্জিত। একটি ছাঁচের মূর্তির পলেস্তারার আস্তরণে আটকে থাকা চারটি হান আমলের তামার মুদ্রা পেয়েছিলাম, যা আমাকে এই কাঠামোগুলোর সময়কালের আভাস পেতে সাহায্য করেছিল।
১২ এপ্রিল ইউরুং-কাশএর বেগ নতুন শ্রমিকের একটি দল পাঠাতেই পদ্ধতি মেনে খননের কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম। জানতাম স্তূপে নয়, মহান ঐশ্বর্য লুকিয়ে আছে স্তূপ ঘেরা দেওয়ালের গায়ে। দেওয়ালের গায়ের অতি প্রাচীন ভাস্কর্য যাতে খোঁড়াখুঁড়ির করতে গিয়ে ভেঙে না যায়, তাই দেওয়াল ঘেঁষা বালি তুলে একটা চওড়া খাল খোঁড়ানো শুরু করেছিলাম। তাছাড়া ছবি তোলার জন্য মূর্তির সামনে অনেকটা খালি জায়গারও প্রয়োজন ছিল। দেওয়াল ঘেঁষা বালি পরিষ্কার করা শুরু হবার খানিক পরপরই বালি থেকে একটু একটু করে জেগে উঠতে শুরু করেছিল দেওয়াল জোড়া বিভিন্ন ভঙ্গিমায় পরিকল্পিত করে গড়া – বুদ্ধ বা বোধিসত্ত্বদের বিশাল স্টুকো মূর্তিগুলো। বড় মূর্তিগুলোর মাঝে নানা দেবতা ও সন্তদের ছোটো ছোটো মূর্তি। অধিকাংশ মূর্তির মাথার পেছনে লোকবলয়। সেই সাথে দেওয়ালের বিভিন্ন অংশে রঙিন ফ্রেস্কো চিত্রাবলী। রিলিভোর পুরো কাজটি রঙিন ছিল, কিন্তু বালির তলায় থাকতে থাকতে অধিকাংশ জায়গার রঙ চটে গিয়েছিল। মূলত টিঁকে ছিল টেরাকোটা রঙ।

প্রথম থেকেই খোঁড়াখুঁড়ির কাজ অতি সাবধানে করতে হচ্ছিল। ৫ ইঞ্চি পুরু বর্গাকার কাঠের বিম দিয়ে মাটি থেকে ৮ ফুট উঁচু সমান মাপের কাঠের খুঁটি দিয়ে তৈরি মূর্তির অভ্যন্তরীণ শক্ত কাঠামো মাটির নীচের আর্দ্রতার কারণে পচে গেছিল সম্পূর্ণরূপে। বালি সরাতেই প্রবল গতিতে বইতে থাকা মরুঝড় বুরানের দাপটে ভেঙে যাওয়া কাঠামো থেকে মূর্তিগুলো উল্টে পড়ে যাচ্ছিল। ফলে ক্ষতি এড়াতে কোনরকমে মূর্তিগুলোর গা থেকে বালি পরিষ্কার করে ছবি তুলেই আবার সেগুলোকে অর্ধেক বালি চাপা দিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। যতক্ষণ ছবি তোলার কাজ শেষ না হয় ততক্ষণ শ্রমিকেরা মূর্তিগুলোকে হয় হাত দিয়ে না হয় বালির ওপর থেকে দড়ি বেঁধে টেনে ধরে রাখছিল।

সন্দেহ নেই অধিকাংশ উঁচু মূর্তিগুলোর ওপরের অংশ ভেঙে গিয়েছিল পচনের ফলে কাঠের কাঠামোগুলো দীর্ঘদিন ভার ধরে রাখতে না পারায়। তাছাড়া বালির ওপরের অংশ সরাসরি বাতাসের সংস্পর্শে ছিল অনেক বেশি সময় ধরে ফলে তা বালি-সংরক্ষণের সুবিধা খুব বেশি সময় ধরে পায়নি। ছোটো মূর্তিগুলো পাওয়া গেছিল প্রায় অক্ষত অবস্থায়। সম্ভবত ‘ধন-সন্ধানী”রা এই ধ্বংসস্তূপে সেরকম ভাবে আঘাত হানেনি, অন্তত তার কোন প্রমাণ আমি পাইনি। খোঁড়াখুঁড়ি তারা যা করেছিল তা পাঁচিলের বাইরে বালির ওপরের অংশ। আমার ধারণা এই অঞ্চলটি খোটানে ইসলাম মতাদর্শ প্রবেশকালীন সময়ের আগে পরিত্যক্ত হয়ে বালিতে ঢাকা পড়ে গেছিল।
সম্ভবত এই মূর্তিগুলোকে রক্ষা করার জন্য দরদালানের ওপর কাঠের আচ্ছাদন ছিল। যদি সত্যিই তা হয়ে থাকে, তবে এই অঞ্চলে বালির আক্রমণ শুরু হবার সাথে সাথে মন্দিরটি পরিত্যাগের আগে তা খুব সুচারুভাবে খুলে নেওয়া হয়েছিল। আমার এই ধারনার কারন খোঁড়ার সময় পাঁচিলের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পাওয়া কাঠের পাটাতনের অংশের কিছু টুকরো। বর্তমান তুর্কিস্থানে বাড়ি তৈরির জন্য কাঠের মূল্য বিবেচনা করলে মন্দিরের দেখভালকারীদের মন্দির ছেড়ে যাওয়ার আগে অন্যতম প্রয়োজনীয় বস্তুটি সাথে নিয়ে যাবার ধারনা অস্বীকার করা যায় না।
দক্ষিণ-পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পূর্ব দেয়ালের পরিষ্কার করা অংশ বরাবর বৃহৎ আকারের মূর্তির সংখ্যা ছিল একানব্বটি। এছাড়াও অনেকগুলো ছোটো ছোটো মূর্তি ও অলংকরণ ছিল বড় বড় মূর্তিগুলোর ফাঁকে। সমস্ত মূর্তির বিশদ মাপ ও বিবরণ নথিভুক্ত করা হয়েছিল যথাযথভাবে। এছাড়াও প্রায় তিনশো ফুট দেওয়াল জোড়া সব মূর্তিগুলোর ছবিও তুলেছিলাম সিরিজ হিসেবে। রাম সিং আর তুর্দির সক্রিয় সহয়তা ছাড়া ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত বালি সরিয়ে খোঁড়া খালের মধ্যে নেমে নিখুঁত ভাবে কাজটা করা সহজ ছিল না। ভ্যাপসা গরমে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। উড়ন্ত মিহি বালি চোখে মুখে ঢুকে নাজেহাল করে ছেড়েছিল। নোটবুকে উড়ে আসা বালি আজও জমে আছে।

যে সব প্রাচীন ভাস্কর্য রাওয়াকে পাওয়া গেছিল তার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। এর বিস্তারিত বিবরণ আমার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে ছবি সহ লিপিবদ্ধ করেছি। প্রায় সব মূর্তিই বুদ্ধের জীবন, ধ্যান ও শিক্ষাদানের উপস্থাপনা সম্পর্কিত। বেশ কয়েকটি বড় মূর্তি বালি সরিয়ে পুরোপুরি বের করা হয়নি ভেঙে যাবার সম্ভাবনা থাকায়। অতি সাবধানতার সাথে এই ধরনের খননের জন্য যে সময় প্রয়োজন তা আমার হাতে ছিল না।স্তূপ প্রাঙ্গনে ঢোকার দরজার দুপাশে দুটো বিশাল আকারের মূর্তি ছিল, যার দেহের ওপরে অংশ ভেঙে গেলেও কয়েকটি টুকরো উদ্ধার করা গেছিল। সন্দেহ নেই মূর্তিদুটো ছিল মন্দিরের দ্বাররক্ষকের, যা ভারতীয় ঘরানার প্রায় অধিকাংশ উপাসনালয়ে দেখা যায়, তা সে মানুষ বা পৌরাণিক কাহিনির চরিত্র যাই হোক না কেন। রওয়াক স্তূপের বৌদ্ধ উপাসনালয়য়ের দুই দ্বাররক্ষকের মূর্তি দুটো সম্ভবত ছিল যক্ষদের – যা এক শ্রেণীর পরিচর্যাকারী দেবতা। মূর্তিদুটোর পোশাক ছিল সম্ভবত যখন এই মন্দির নির্মিত হয় সেই সময়কালের ও স্থানীয় ঘরানার। দ্বাররক্ষকের পায়ের বুটজুতোর সামনের অংশটি ছিল ভোঁতা ও পায়ের গোছের কাছে ঢিলে ও গাঢ় লাল রঙের বর্ডার দেওয়া – যে রঙ বহু যুগ পরেও সমান উজ্জ্বল। বুটের ওপরের অংশে ছিল ফুলে থাকা ট্রাউজার যা কোমরের নীচ পর্যন্ত ঝোলা কোট দিয়ে ঢাকা ছিল। কোটের কিনারাগুলো ছিল সুক্ষ সূচিকর্মের মতো কাজে ভরা। দ্একটি বিশাল মূর্তির বাঁ-হাঁটুতে সোনার পাত লাগানো ছিল। হিউয়েন সাঙ পি-মো প্রসঙ্গে বলেছিলেন ‘এখানকার অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করে যে, ব্যথা কমাতে আন্তরিক চিত্তে প্রার্থনা করে রোগগ্রস্থ অংশ সোনার পাত দিয়ে মুড়ে রাখলে ব্যথার উপশম হয়।’ এই মূর্তিটি হিউয়েন সাঙ বর্ণিত অদ্ভুত রীতির সপক্ষেই কথা বলে।

সবচাইতে আকর্ষণীয় আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল রাওয়াকের মূর্তিগুলোর সঙ্গে পেশোয়ার উপত্যকা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের গ্রেকো-বৌদ্ধ ভাস্কর্যের মিল। এই ভাস্কর্য-কলা যে সিন্ধু উপত্যকা বা ব্যাক্টরিয়া অঞ্চল থেকে খোটানে বিকাশ লাভ করেছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভাস্কর্যের অধ্যয়ন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে। আশা করি আমার তোলা ছবিগুলো এই বিষয়ে গবেষণাকারীদের সহায়ক হবে।
ভারতীয় গ্রেকো-বৌদ্ধ কালানুক্রম নির্ধারণের নিরিখে আমাদের হাতে তথ্য এতই কম যে তা থেকে রাওয়াকের ভাস্কর্যের কাল অনুমান করা কঠিন। ধ্বংসাবশেষ থেকে আমরা এমন কোন এপিগ্রাফিক নমুনাও পাইনি যা থেকে এই স্তপা বা মন্দিরের সময়কাল সম্পর্কে কোন আলোকপাত সম্ভব। যদিও আমি এমন কিছু মুদ্রা পেয়েছিলাম যা থেকে সময়কাল সম্পর্কে খানিক ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়েছিল। স্তূপের নীচে, বিভিন্ন মূর্তির পাদবেদী ও মন্দির প্রবেশদ্বারের কাছের পাঁচিলের গায়ের একটি কাঠের গেট পরিষ্কার করে পরীক্ষা করার সময় কিছু ‘উ-চু’ চিহ্ন দেওয়া তামার মুদ্রা পাওয়া গেছিল যা হান রাজবংশের সময়কালীন। এই মুদ্রাগুলো মূর্তির পায়ের কাছে বা প্লাস্টার ও ইটের ফাঁক-ফোঁকরে পাওয়া গেছিল। সম্ভবত এগুলো অর্ঘ হিসেবে রাখা হয়েছিল। খননের সময় পাঁচিল ঘেরা দক্ষিণ অংশের ভেতরের দিকে কাঠ দিয়ে ঘেরা একটি আট বর্গফুট মূর্তিহীন পাদবেদীর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে একই মুদ্রা পাই।
প্রায় শ’খানেক মুদ্রা সংগৃহীত হয়েছিল। মুদ্রাগুলোতে কোন বিকৃতির চিহ্ন ছিল না, অর্থাৎ মুদ্রাগুলো নতুন অবস্থায় অর্ঘ হিসেবে জমা করা হয়েছিল। হান রাজবংশের (Eastern Han) শাসনকাল ২৫-২২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চালু থাকলেও এই মুদ্রা সচল ছিল প্রায় চতুর্থ খ্রিষ্টাব্দেও। ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া এই প্রত্ন সামগ্রী থেকে তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে এই জনবসতি চতুর্থ খ্রিষ্টাব্দ বা তারও প্রাচীন সময়কালের।
যতই সাবধানতা নেওয়া হোক না কেন, সামান্য নাড়াচাড়াতে মূর্তির হাত, অলংকরণ ইত্যাদি ভেঙে যাচ্ছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম এখান থেকে পাওয়া বড় ভারী মূর্তিগুলো গাধা, পোনি, উট বা মানুষের পিঠে চাপিয়ে হাজার হাজার মাইল পাহাড় – মরু টপকে সে ভারত বা ইউরোপ কোন জায়গাতেই স্থানান্তরকরন অসম্ভব। এছাড়াও এই ধরনের ভাস্কর্য সঠিক ভাবে বয়ে নিয়ে যেতে কফিনের মতো বাক্স লাগে যা যোগাড় করার সময় বা সম্ভাবনা ছিল না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম খনন করে পাওয়া সব মুর্তি ছবি তোলার পর তার বিস্তারিত বিবরণ লিখে সেগুলো পুনরায় বালি সমাধিতে পাঠিয়ে দেবার। যতদিন না খোটানে সংগ্রহশালা গড়ে উঠছে ততদিন এই অমুল্য ভাস্কর্যগুলো এখানে নিরাপদে থাকবে। খুব খুশি হয়েছিলাম যে মুর্তির কিছু ভাঙা অংশ, মাথা ও অলংকরণ যা অতি যত্নে মুড়ে ও প্রচুর পরিশ্রম করে প্রায় ছ’হাজার মাইল পথ উট, পোনি, গাধা, মানুষ, স্টিমার, রেলওয়েতে চাপিয়ে লন্ডনে পাঠানো হয়েছিল তা নিরাপদেই পৌঁছেছিল।

১৮ এপ্রিল স্তূপের আশপাশে বালি টিলার নীচে চাপা না পড়া অংশে অনুসন্ধান চালিয়ে এখানে ওখানে কিছু ভাঙা মাটির পাত্র ছাড়া আর কিছু খুঁজে পাইনি। এই ধ্বংসস্তূপে বসতি সহ অন্য উপস্থিতির খোঁজ চালাতে কয়েক মাস সময়, প্রচুর লোকবল ও অর্থের প্রয়োজন, যার কোনটাই আমার কাছে অবশিষ্ট ছিল না। তা তাপমাত্রা ও বালি ঝড়ের বেড়ে চলা দাপট মরুতে আর কাজ করতে দিচ্ছিল না। ধ্বংসাবশেষ ছেড়ে যাবার আগে বালি খুঁড়ে গড়ে তোলা খাল আবার বালি ফেলে ভরাট করে দেওয়া হচ্ছিল। খনন করে উদ্ধার করা বিশাল মুর্তিগুলো চোখের সামনে সমাহিত হচ্ছিল একে একে। ফিরে যাচ্ছিল যাচ্ছিল বহু শতাব্দী প্রাচীন পূর্বপুরুষদের গড়া শিল্পকলা বালির নিরাপদ আশ্রয়ে।
রওয়াক থেকেই গেছিলাম মাইল চারেক উত্তর-পূর্বের আর এক ধ্বংসস্তূপ ‘জুম্বে-কুম’এ। খোটান মরুর চৌহদ্দির মধ্যে আমার জানা শেষ ধ্বংসাবশেষ। গিয়ে বুঝেছিলাম ‘ধন-শিকারি’রা খোঁড়ার জন্য আর কিছু অবশিষ্ট রাখেনি এই ধ্বংসস্তূপে। ১৯ এপ্রিল খোটানের উদ্দেশ্যে রওনা হবার আগে নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম যে তাকলামাকানের বুকে আমার অনুসন্ধানের কাজ শেষ হয়েছে।
(ক্রমশ)