ধারাবাহিক উপন্যাস-সিন্ধু নদীর তীরে -পর্ব ১২- পিটার বিশ্বাস-বসন্ত ২০২৪

সিন্ধুনদীর তীরে –প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্বচতুর্থ পর্বপঞ্চম পর্বষষ্ঠ পর্ব , সপ্তম পর্বঅষ্টম পর্বনবম পর্ব , দশম পর্বএকাদশ পর্ব,  দ্বাদশ পর্বত্রয়োদশ পর্বচতুর্দশ পর্বপঞ্চদশ পর্বষোড়শ পর্বসপ্তদশ পর্ব

IMG-20210913-WA0004

দ্বাদশ অধ্যায়-দুর্গম পথ পেরিয়ে

“ওরা ঘুমিয়ে পড়েছে।”

অন্ধকারের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসা মূর্তিটা কথাগুলো বলতে বলতে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছিল। গোটা দলটার মধ্যে একটা চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে গেল এবারে। অপেক্ষার শেষ।

জায়গাটা একটা নীচু টিলা। চারপাশে ছড়িয়ে যাওয়া নিষ্প্রাণ আধামরুর ভেতরে একটা তুচ্ছ কালো ফোঁটার মত দেখায় তাকে। উত্তরে সেই প্রাণহীন জমি ছড়িয়ে গিয়েছে একেবারে ম্‌হিরি অবধি। প্রায় পাঁচদিন ধরে সেই পথ বেয়ে মাণ্ডুপ তার পঞ্চাশজন সিপাহীর দলকে নিয়ে এইখান অবধি এসে পৌঁছেছে। এখান থেকে দক্ষিণে ফের ছড়িয়ে গিয়েছে ধূ ধূ প্রান্তর। ছড়িয়ে গিয়েছে, ইন্দাতীরের উর্বর অঞ্চলের প্রবেশমুখে দাঁড়ানো নবসার শহরের কিনারা অবধি। সেই অভিমুখে, এখান থেকে বেশ খানিক দূরে এই টিলাটার মতই আরও কয়েকটা কালো ফোঁটা। উপস্থিত সেইখান থেকেই আসছে এই সৈনিক। 

“তুমি নিশ্চিত কর্কন?”

চাপা গলায় মাণ্ডুপ প্রশ্ন করল।

“আমি নিশ্চিত।” মাথা নাড়ল নজরদার সৈনিক, “সূর্যাস্তের সামান্যক্ষণ বাদে এদের পুরুষদের দলটা তাদের অভিযান সেরে ফিরে আসে…”

“এবং…?”

সৈনিকটি মাথা নাড়ল, “আপনার অনুমান মিলে গিয়েছে মাণ্ডুপ। কোনো ব্যাপারীর সওদা লুট করে ফিরেছে এরা।” 

“চমৎকার। লুঠের জিনিসপত্র?”

চারটে মহিষে টানা যানে বিপুল পরিমাণ সওদা। তাতে কী কী আছে তা আমি জানি না। তবে একটা যান থেকে এদের লোকজন বেশ কিছু লবণাক্ত মাংসখণ্ড ও চাল নামিয়ে এনে ভোজসভা বসিয়েছিল সেখানে। সম্ভবত সেই যানটা…”  

“ব্যাপারীদের রসদ যান!”

“আর চিন্তা নেই…”

“এইবার…”

“দুরদর্শী মান্ডুপের জয়…”

টুকরো টুকরো কথাগুলো গুঞ্জনের মত ছড়িয়ে যাচ্ছিল তাকে ঘিরে এসে দাঁড়ানো সৈনিকদের মুখে। গত দুটো দিন ধরে কপালে জমে থাকা চিন্তার দাগগুলো এইবারে মদৃণ হয়ে আসছিল মাণ্ডুপের। এই একটামাত্র আশ্বাস দিয়েই, দু’দিন ধরে, প্রায় অভূক্ত একটা সৈন্যদলকে এইখানে বসিয়ে রেখেছিল সে। একটা জুয়াই খেলেছিল বলা যায়। কিন্তু, সে জুয়ায় ভাগ্য তার সহায় হয়েছেন। অনুমানটা তার এতটা নিখুঁতভাবে ফলে যাবে তা মাণ্ডুপ আশা করেনি। না মিললে, সম্ভবত দলটার খুব বেশি সদস্য এই নরক থেকে বেঁচে ফিরত না। 

মঞ্জাদাহির থেকে ম্‌হিরি অভিযানে আসবার পথে রসদের অভাব ছিল না তাদের। রীতিমত প্রস্তুতি নিয়েই পথে নেমেছিল ইন্দাতীরের বাহিনী। এই পথে নিয়মিত চলাচল করা বণিকদের পরামর্শ অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় খাবার আর পানীয়ের সম্ভার নিয়েছিল সঙ্গে। ফলে ভয়াল এই পথ একরকম বিনা কষ্টেই পার হতে পেরেছিল তারা।

কিন্তু ফেরবার পথে মাণ্ডুপ আর তার পঞ্চাশজন সৈনিকের দলটার সে সৌভাগ্য হয়নি। ম্‌হিরির শিল্পগ্রামের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সন্তানগোলক মাণ্ডুপকে সসৈন্যে মঞ্জাদাহিরের দিকে রওয়ানা হবার আদেশ দিয়েছিলেন। গোলকদেবতা দোরাদাবু নাকি অধীর আগ্রহে মাণ্ডুপের অপেক্ষায় রয়েছেন সেখানে।

দেবতার আদেশের বিরুদ্ধে কোনো কথা চলে না। কাজেই, দেরি না করে প্রায় একবস্ত্রেই পথে নেমেছিল মাণ্ডুপ আর তার পঞ্চাশজন সৈন্যের দলটা। ফলে ফিরতি পথের যথেষ্ট রসদ তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসবার সময় পায়নি। অবশ্য সময় পেলেও তাতে লাভ হতো না বিশেষ। সমৃদ্ধ ম্‌হিরি নগরীর পতন হয়েছে। সেই নাম নিয়ে যে তুচ্ছ শিল্পগ্রাম টিকে আছে মহান দোরাদাবুর দয়ায় তার তুচ্ছ ভাঁড়ারে এই যাত্রার রসদ জোগাবার মত ঝাদ্য ছিল না।

যেটুকু খাবার বা পানীয় সঙ্গে নিয়ে আসতে পেরেছিল মাণ্ডুপ, রওয়ানা হবার দিন দুয়েকের মাথায় তা শেষ হয়ে যায়। এ-অবস্থায়, মরুজীবনে অনভিজ্ঞ কোনো মানুষ হলে তার মৃত্যু নিশ্চিত হতে পারত। কিন্তু দলটার সৌভাগ্য, এই আধামরুর বুকে টিকে থাকবার কিছু শিক্ষা মান্ডুপ আগের বন্দিদশাতেই পেয়েছিল। পেয়েছিল এই এলাকার বাসিন্দা দস্যুদের থেকেই। সেই শিক্ষার কল্যানেই গত কয়েকদিন ধরে বালির বুকে সম্ভাব্য জায়গা খুঁড়ে সামান্য বিস্বাদ জল মিলেছে তাদের। খাবার জুটেছে মরুর বুক থেকে খুঁজে নেয়া সাপ, গিরগিটি, বিছার রক্তমাংসে। 

কিন্তু, সে আর কতটুকু! একসঙ্গে পঞ্চাশজন মানুষকে নিয়মিত যথেষ্ট খাদ্য বা পানীয়ের জোগান দেয়া এই বন্ধ্যা জমির পক্ষে সম্ভব নয়। অথচ সামনে আরও অন্তত দশ দিনের যাত্রাপথ বাকি।

এহেন অবস্থায়, ক্ষুৎপিপাসাতুর মানুষগুলোকে নিয়ে কোনোমতে এগিয়ে নিয়ে চলতে চলতে একসময় মান্ডুপ নিজেই হাল ছেড়ে দিতে বসেছিল। আর, ঠিক সেই সময় তারা কাছাকাছি অন্য মানুষের উপস্থিতি টের পায়। রওনা দেবার পাঁচদিনের মাথায় এইখানে পৌঁছে হঠাৎ থেমে গিয়েছিল তারা। থেমেছিল দক্ষিণে দিগন্তের গায়ে ধোঁয়ার হালকা দাগ চোখে পড়ে। দেখে মাণ্ডুপ অনুমান করে, সম্ভবত কোনো যাযাবর পরিবার পথচলতি ঠাঁই নিয়েছে সেখানে। 

কিন্তু, সে অনুমান যদি সত্যিও হয় তা হলেও, পঞ্চাশজন মানুষকে খাওয়াবার মত যথেষ্ট উপকরণ এদের কাছে মিলবে না। তবে, কাছাকাছি কোনো যাযাবরদের গ্রাম বা পথচলতি কোনো ব্যাপারীর দলের খবর এদের কাছে মিলতে পারে। এই আশাতেই মাণ্ডুপ সেদিন রাতে তার সৈন্যদলকে নীচু এই টিলার আড়ালে অপেক্ষা করতে বলে একা এগিয়ে গিয়েছিল ধোঁয়ার সুতোটাকে লক্ষ করে। 

তারপর, প্রায় মাঝরাত্রি পার করে মাণ্ডুপ যখন ফিরে আসে তখন তার শরীরের ভাষা আমূল বদলে গিয়েছে। কারণ, ধোঁয়ার উৎসের কাছাকাছি পৌঁছে সে আবিষ্কার করেছিল, সেখানে অগ্নিকুণ্ড ঘিরে যে গুটিকয়েক মহিলা, শিশু আর বৃদ্ধ বসে আছে, তাদের অধিকাংশের মুখই মাণ্ডুপের পরিচিত!

যাযাবর বুনোদের  এই দলের পুরুষরাই কিছুদিন আগে তাকে বন্দি করেছিল। করেছিল, ম্‌হিরির কাছাকাছি পর্বতের পাদদেশে তাদের আর এক অস্থায়ী ডেরায়। এদের জন্যই নিষ্ঠুরভাবে প্রাণ দিতে হয়েছিল, তার বন্ধু ও শিক্ষক বীর দৈমিত্রিকে! এদের সে ছেড়ে দেবে না।

এই বুনো যাযাবরদের সঙ্গে বেশ কিছুদিন একত্র থাকবার ফলে এদের গতিবিধি মাণ্ডুপের অজানা ছিল না। এরা সাধারণত বিস্তীর্ণ এই আধামরুর বুকে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় আস্তানা বদলে ঘুরে বেড়ায়। কাছাকাছি বিভিন্ন জনপদে এদের চরেরা সক্রিয় থাকে। তাদের মুখে কোনো বড়ো শিকারের খবর পেলে এরা উপযুক্ত কোনো জায়গায় ডেরা বেঁধে দলের  অশক্ত সদস্যদের সেইখানে রেখে নিজেরা শিকারে যায়। তারপর অভিযান শেষে ফিরে এসে ডেরাডান্ডা তুলে ফের পথচলার পালা। 

ঠিক এইভাবেই একদিন এদের এক অস্থায়ী ডেরায় এরা মাণ্ডুপ ও দৈমিত্রিকে এনে বন্দি করেছিল। এবারে, নিতান্ত ভাগ্যক্রমে এদের আর  বর্তমান ডেরার সন্ধান পেয়ে গিয়েছে সে।

কাজেই, অন্ধকারের আড়াল নিয়ে সে এবারে এগিয়ে গিয়েছিল অগ্নিকুণ্ডের কাছাকাছি। সেখানে বসে থাকা বৃদ্ধদের আলোচনা থেকে সে টের পায়, নতুন কোনো শিকারের সন্ধান পেয়ে, এইখানে ঘাঁটি গেড়ে অভিযানে বের হয়েছে বুনোদের দল। আর, এক কি দুটি রাতের মধ্যেই শিকার সেরে তাদের ফিরে আসবার কথা। 

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মাণ্ডুপ সিদ্ধান্ত নেয়, দৈমিত্রির মৃত্যুর দণ্ড দেবে সে এই অপরাধীদের। একদিন তাকে বন্দি করেছিল তারা। তখন সে একা ছিল। কিন্তু, আজ সে পঞ্চাশজন দক্ষ সৈনিকের নায়ক। শুধু দৈমিত্রির বন্ধু হিসেবেই নয়, ইন্দাতীরের মহান সভ্যতার একজন সৈনিক হিসাবেও অপরাধীদের দণ্ড দেয়া তার কর্তব্য।

ফিরে এসে তার সৈনিকদের বিষয়টা নিয়ে লম্বা আলোচনা করেছিল মাণ্ডুপ। এদের হাতে নিজের বন্দিদশা আর এদের কারণে দৈমিত্রির মৃত্যুর কথা বলেছিল সে তাদের। তারপর জানিয়েছিল, দু’দিন এইখানে অপেক্ষা করতে চায় সে। এই দস্যুদল ফিরলে তাদের উপযুক্ত দণ্ড দেয়াই তার লক্ষ্য।

জবাবে প্রশ্ন তুলেছিল তার সৈনিকরা। মাণ্ডুপের উদ্দেশ্য মহৎ। কিন্তু তাদের সামনে আরও দশদিনের পথ বাকি। অথচ খাদ্য বা পানীয়ের সংস্থান নেই কোনো। এ অবস্থায় আরো দুটো অতিরিক্ত দিন এই নরকে অপেক্ষা করা আত্মহত্যারই শামিল নয়কি? 

জবাবে, একটা অন্য আশার আলো দেখিয়েছিল মাণ্ডুপ তার সৈনিকদের। সে বলেছিল, নিশ্চিত মৃত্যু নয়, বরং এই দুটো দিনের অপেক্ষাই তাদের প্রাণে বাঁচবার উপায় হতে পারে। কারণ, বৃদ্ধদের কথাবার্তা থেকে সে শুনেছে মুন্দিগাক নগরীর কোনো ব্যাপারীর সার্থবাহ কাছাকাছি এলাকা দিয়ে দক্ষিণে সমুদ্রের উদ্দেশে চলেছে। বড়ো দল। তাদের কাছে প্রচুর খাদ্যপানীয় থাকবার সম্ভাবনা। বৃদ্ধেরা আশায় রয়েছেন, সার্থবাহ লুট করে তাঁদের জন্য সেই খাদ্যের সম্ভার নিয়ে ফিরে আসবে দস্যুরা। 

এইখানেই জুয়াটা খেলেছিল মাণ্ডুপ। ভরসা রেখেছিল বৃদ্ধদের সেই আশার ওপরে। সে জানত, আশাটা যে পূরণ হবেই তেমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু তবু, খাদ্য পানীয় ছাড়া দশদিনের দুর্গম পথ পেরোনোর চেষ্টা করার অর্থ দলটার অধিকাংশ সদস্যের নিশ্চিত মৃত্যু। দুটো দিন বেশি হলে সে পরিণতির বিশেষ কোনো বদল হবে না। কিন্তু, অন্যদিকে, আশাটুকু সত্যি হলে তাদের সবারই প্রাণ নিয়ে মঞ্জাদাহিরে ফেরবার একটা সম্ভাবনা থাকবে। 

যুক্তিটা মেনে নিয়েছিল তার সৈনিকরা। আস্থা রেখেছিল তাদের নেতা মাণ্ডুপের বিচারে। আর তারপর, এই আশাটুকুকে আঁকড়ে ধরেই গত দুটো দিন, নিজের জীবন বিপন্ন করে আস্তানাটার ওপর নজরদারি চালিয়েছে কর্কন। আর, বাকিরা এই টিলার পাথরের ছায়ায় অপেক্ষায় থেকেছে। অনিঃশেষ খিদে আর তৃষ্ণাকে উপেক্ষা করে নিজেদের তৈরি করেছে আসন্ন লড়াইটার জন্য। এবার, সেই মুহূর্তটা উপস্থিত হয়েছে।

আকাশের শিকারীদেবতা পশ্চিমে ঢলছিলেন। সেদিকে একনজর তাকিয়ে কর্কন অধীরভাবে হাত নাড়ল, সূর্যোদয়ের সময় এগিয়ে আসছে মাণ্ডুপ। আর দেরি করলে…”

হাতের ইঙ্গিতে তাকে থামিয়ে দিল মাণ্ডুপ। তারপর  প্রশ্ন করল, “আগে বলো, এই মুহূর্তে তারা কী অবস্থায় আছে?”

“তারা সকলেই ঘুমিয়ে রয়েছে। ফিরে আসবার পর এই অর্ধপশুর দল লুঠ করে আনা খাদ্য-পানীয়ের কিছু অংশ নিয়ে উল্লাসে মেতেছিল। সে উল্লাস শেষ হবার পর, গোটা বসতিটাই অগ্নিকুণ্ড ঘিরে ঘুমিয়ে পড়ে। আসবার আগে যতটুকু দেখেছি, সেই অগ্নিকুণ্ডও নিভে এসেছে প্রায়।”

“পাহারা?”

“নামমাত্র। তিনজন মানুষ পাহারায় জেগে আছে। তারাও নেশাগ্রস্ত। এরা আজ রাত্রে বিশেষ কোনো বিপদের আশঙ্কা করছে না।”

“বেশ। লুঠ করে আনা জিনিসপত্র?”

“বসতির একপাশে যানগুলো রাখা। তাদের মালপত্র নামায়নি এরা। মহিষগুলোকে যান থেকে খুলে পা বেঁধে ছেড়ে রেখেছে। সম্ভবত কাল সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানকার আস্তানা উঠিয়ে অন্য কোনো দুর্গমতর এলাকায় সরে যাবে।”

“বেশ।” সহর্ষে হাতদুটো একবার ঘষে নিল মাণ্ডুপ। তারপর দলটার দিকে ঘুরে নীচুগলায় বলল, “আক্রমণের পরিকল্পনা এইরকম হবে…”

সেদিন শেষরাত্রির গাঢ় অন্ধকারে বড়ো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল যাযাবর দস্যুদের বসতি। তাদের ঘিরে পায়চারি করে চলে তিনজন পাহারাদার। মাঝে মাঝে বসে ঝিমিয়েও নেয় তারা খানিক। আসলে এই নির্জন এলাকায় আর কোনো মানুষের অস্তিত্ব নেই। ফলে আকস্মিক কোনো হানাদারির ভয় এখানে তাদের ছিল না। বন্যজীব কিছু আছে তা ঠিক।  উত্তরে ঠান্ডা এলাকায় কখন কখনো নেমে আসে তুষার চিতারা। যে এলাকায় তারা এখন রয়েছে, সেখানেও চিতা বা নেকড়ের দেখা মেলে কখনো কখনো। তবে তাদের তরফেও হানাদারির কোনো আশঙ্কা করেনি পাহারাদাররা। কারণ দল বেঁধে থাকা মানুষকে শ্বাপদরাও ভয় পায়।

আর ঠিক সেই কারণেই, শেষরাত্রের দিকে হঠাৎ নেকড়ের গলার চাপা গরগর আর একটা মহিষের ডাক শুনে তারা খানিকটা অবাক হয়েছিল। ভেবেছিল, বুঝি বা দুঃসাহসী শ্বাপদ আগুপিছু না ভবেই মহিষের মাংসের লোভে মানুষের আস্তানায় হানা দিতে এসেছে। তবে অবাক হলেও ভয় তারা পায়নি। বরং উৎসাহই পেয়েছিল। পেয়েছিল তাজা মাংসের আশায়। নেকড়ের মাংস সুস্বাদু নয়। কিন্তু এই যাযাবরেরা সর্বভূক। আধামরুর নিষ্ঠুর প্রকৃতি তাদের শিখিয়েছে, বেঁচে থাকবার জন্য কোনো মাংসই অখাদ্য নয়। তাছাড়া, যদি এই নেকড়ে সন্তানবতী হয় তাহলে উপরি পাওনা হিসেবে মিলে যেতে পারে তার একটি বা দুটি ছানা। পোষ মানিয়ে উপযুক্ত শিক্ষা দিলে এরা বশম্বদ পাহারাদার ও দক্ষ শিকারসঙ্গী হয়ে উঠতে পারে।

কাজেই, শব্দটা পেয়ে তারা তিনজনই তার আস্তানার তিনদিক থেকে তার উৎসের দিকে সন্তর্পণে এগিয়ে আসতে শুরু করেছিল। সবচেয়ে কাছাকাছি পাহারাদারটি ডাকের উৎসের কাছাকাছি পৌঁছে দেখেছিল একটি মহিষ সেখানে দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্তে জাবর কাটছে। এগিয়ে গিয়ে সে তার গায়ে হাত রেখেছিল। কিন্তু পরক্ষণেই নেকড়ের গলার চাপা গরগর শব্দটা শুনে কোমরের ছুরি টেনে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়ানো আর হয়নি তার। তার আগেই মহিষের দুদিক থেকে বের হয়ে আসা দুজন মানুষ তাকে চেপে ধরে। পরমুহূর্তেই, গলা দিয়ে নেকড়ের ডাক বের করতে থাকা তৃতীয় আততায়ীর ছুরি তার কণ্ঠনালীকে দু’টুকরো করে দেয়।

এরপর, রক্তমাখা শরীরটাকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে আততায়ীরা কান খাড়া করে শুনেছিল, দ্বিতীয় একজোড়া পায়ের শব্দ আস্তানার আর একদিক থেকে এগিয়ে আসছে…

এই দ্বিতীয়জন মরবার আগে ক্ষীণ একটা চিৎকার করবার সুযোগ পেয়েছিল। তাতে, এগিয়ে আসতে থাকা তৃতীয় পাহারাদার সাবধান হয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিল। তারপর কিছু একটা সন্দেহ করে, পিছন ফিরে ছুট দিয়েছিল সে। তবে বেশিদূর যাবার সুযোগ তার মেলেনি। হঠাৎ করেই অন্ধকার থেকে একটা মানুষের শরীর উড়ে এসেছিল তাকে লক্ষ্য করে। মাটিতে পা দেবার আগেই সেই আততায়ীর ছুরি তার মাথাটাকে ধড় থেকে প্রায় আলাদা করে দেয়। সামান্য শব্দ করবার ফুরসতও সে পায়নি।

তৃতীয় প্রহরীকে শেষ করবার পর রাতচরা পাখির একটা হালকা ডাক দিয়েছিল মাণ্ডুপ। কয়েক মুহূর্ত বাদে,  ডাক শুনে অন্ধকার থেকে এগিয়ে আসা দশজন সৈনিকের হাতে মহিষ ও পণ্যের যানগুলোর দায়িত্ব দিয়ে সে এগিয়ে গিয়েছিল মূল আস্তানার দিকে। সেখানে তার দলের বাকি সৈনিকেরা তখন ঝাঁপিয়ে পড়েছে ঘুমন্ত মানুষগুলোর ওপরে।

সদ্য জেগে ওঠা মানুষগুলোর অর্ধেকেরও বেশি মানুষ হাতে অস্ত্র তোলবার আগেই শেষ হয় গিয়েছিল। কিন্তু বাকিরা অত সহজে হার মানেনি। লড়াই দিয়েছিল তারা। নিষ্ঠুর এই আধামরুর ভয়াবহ দুনিয়ায় তাদের জন্ম। প্রতিমুহূর্তে প্রাণ হাতে করে, মারো কিংবা মরো নীতিতে ভরসা রেখে তাদের বেঁচে থাকা। যুদ্ধই তাদের জীবন। মৃত্যু তাদের নিত্যসঙ্গী। কোনঠাসা হলে লড়াইটা তারা দিতে জানে তাই।

কিন্তু, ইন্দাতীরের পঞ্চাশজন সুশিক্ষিত যোদ্ধার সামনে বন্য দস্যুদের এই হার-না-মানা প্রতিরোধও যথেষ্ট ছিল না। এই যোদ্ধারা শৈশব থেকে দোরাদাবুর মানসিক নিয়ন্ত্রণে গড়ে উঠেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে তারা মানুষ নয়, একেকজন দানবিক হত্যাযন্ত্র। ফলে সে যুদ্ধ বেশিক্ষণ চলেনি সেই রাতে। পুব আকাশে যখন হালকা আলোর আভাস জেগেছে, তখন থেমে গেল অস্ত্রের শব্দ। ইন্দাতীরের সৈনিকদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে অসম সেই যুদ্ধে। আহত হয়েছে অনেকেই। কিন্তু সেই রক্তটুকুর মূল্য চুকিয়েছে বন্য এই দস্যুদের প্রায় সম্পূর্ণ দলটাই। রক্তাক্ত সেই জমির বুকে তখন তাদের দলের মাত্র দশজন জীবন্ত সদস্যকে দড়ি বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়েছে।

তাদের সামনে এসে চুপ করে দাঁড়াল মাণ্ডুপ। এদের প্রায় প্রত্যেককেই তার চেনা। তাকে চুরি করে আনা, খাঁচায় বন্দি করে রাখা ও অবশেষে পরীক্ষাধীন কোনো পশুর মত তাকে ম্‌হিরিবাসীদের হাতে তুলে দেয়া, এই প্রতিটা ধাপে অংশ নিয়েছিল এরা। নিয়েছিল এদের দলপতি ইলতাসের নির্দেশে। দুরন্ত দস্যু সেই ইলতাসও রয়েছে এই বন্দিদের মধ্যে।

পায়ে পায়ে আহত ইলতাসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল মাণ্ডুপ। তারপর নিজের মুখ থেকে কালো কাপড়ের  টুকরোটাকে সরিয়ে নিয়ে ডাকল, “ইলতাস! এবারে কে কার বন্দি?”

ডাকটা শুনে তার দিকে ঘুরে দেখল মানুষটা। ঘন, এলোমেলো চুলদাড়িতে ভরা মুখ। তার গভীর অক্ষিকোটর থেকে তীব্র চোখদুটো যেন ঝলসে দিতে চাইছিল মাণ্ডুপকে। সে দৃষ্টিতে ঘৃণা আর ব্যাঙ্গ উপচে পড়ছিল।

একটু পরে মুখে একচিলতে হাসি খেলে গেল তার। মাথা নেড়ে নিজের মনেই বলল, “দাসীপুত্রের অহঙ্কার…”      

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পাশে দাঁড়ানো এক সৈনিকের হাতের তলোয়ারের ভোঁতা দিকটা আড়াআড়ি আছড়ে পড়ল ইলতাসের মুখে। রাগী গলাটা গমগম করে উঠেছে তার সেইসঙ্গে, “ইন্দাতীরের মহাযোদ্ধা, সেনাপতি বৈক্লন্যের সন্তান, ম্‌হিরিবিজয়ী মাণ্ডুপকে অপমান করবার ফল পাবি তুই…”

কথাগুলো বলতে বলতেই দড়িতে বাঁধা ইলতাসের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেই সৈনিক। নিজেদের দলপতিকে প্রকাশ্যে অপমান করবার শাস্তি হিসেবে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে তুলছে তাকে।

তাকে ইশারায় থামিয়ে দিল মাণ্ডুপ। এই অর্ধপশুদের আঘাত করে শক্তিক্ষয় করবার কোনো অর্থ নেই। তার নির্দেশে ততক্ষণে মৃত শরীরগুলোকে একপাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। কাঠকুটো জড়ো করে তাতে আগুন জ্বালাবার আয়োজনে ব্যস্ত কয়েকজন সৈনিক। আর একপাশে, জীবিত দশজনের জন্য মৃত্যুবেদী তৈরিতে ব্যস্ত অন্য কয়েকজন। সরল ব্যবস্থা। একটা প্রশস্ত পাথরের চাতাল খুঁজে নিয়েছে তারা। তাদের মধ্যে থেকে বিশালদেহী একজন সৈনিক আজ জহ্লাদের কাজ করবে। সে কাজের জন্য সে খুঁজে এনেছে একটা ভারী পাথরের চাঁই। এইবারে জীবিত দস্যুদের একে একে এইখানে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে, বেলা প্রথম প্রহর শেষ হবার আগেই তাদের রওনা হয়ে যাবার কথা।

dharabahik88

তবে মাণ্ডুপের সেদিকে মন ছিল না সে-মুহূর্তে। মাথায় তার ইলতাসের কথাটা বারবার ঘা দিচ্ছিল এসে। তার যুক্তি বলছিল, সদ্যপরাজিত এই দস্যু সম্ভবত নিষ্ফল রাগে এহেন কুকথা উচ্চারণ করেছে। এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু তবু, অপ্রত্যাশিত ও বিচিত্র এই কুকথা তাকে আশ্চর্য করে তুলছিল। শত্রুকে বিভিন্ন কু-নামে ডাকা যুদ্ধের রীতি বটে। কিন্তু ‘দাসীপুত্র’ বলে সম্বোধন করার কথা সে আগে কখনো শোনেনি।

***

বসতির একপাশে ধূ ধূ করে জ্বলে ওঠা চিতাটার দিকে তাকিয়েছিল ইলতাস। একে একে পাথরের ঘায়ে মাথার খুলি ফেটে শেষ হয়ে যাচ্ছে তার জীবিত সঙ্গীরা। তখনও ছটফট করতে থাকা শরীরগুলোকে এরা ছুঁড়ে ফেলছে সেই চিতায়। অবশেষে, সকলের শেষে তার পালা এল। দড়িতে বাঁধা শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে সেই মৃত্যুবেদিতে তুলে নিয়ে গিয়ে উবু করে বসানো হল প্রথমে। দলপতির প্রাণদণ্ড! তা দেবার অধিকার কেবল আর একজন দলপতিরই থাকে। অতএব মৃত্যুদণ্ড দিতে থাকা সৈনিকটি সসম্ভ্রমে রক্তাক্ত পাথরের চাঁইটা মাণ্ডুপের হাতে তুলে দিল।

শরীরটাকে উবু করে তার মাথাটা পাথরের গায়ে সজোরে চেপে ধরে রেখেছিল দুজন সৈনিক। পাথরের চাঁইটা হাতে নিয়ে তার পাশে এসে দাঁড়াল মাণ্ডুপ। রাগ, দুঃখ কিছুই নয়। নিছক একটা কর্তব্য করতে দাঁড়িয়েছে সে এইখানে। নির্বিকার মুখে পাথরের চাঁইটা মাথার ওপর তুলে ধরল সে…

আর, ঠিক সেই মুহূর্তে ইলতাসের চোখদুটো ঘুরে গেল মাণ্ডুপের দিকে। সে দৃষ্টিতে অপরিমিত ঘৃণা মেশানো ছিল। পাথরটা মাথার ওপর তুলে ধরে রেখেই এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল মাণ্ডুপ সেই দৃষ্টির সামনে। আর সেই সুযোগে তার শেষ ছোবল দিয়ে গেল ইলতাস। তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করে সে বলে উঠল, “ম্‌হিরির সেনাদের হাত থেকে তুই পালাবার পর ফের ওরা তোকে ধরবার বরাত দিয়েছিল আমায়। তারপর থেকে তোর অনেক খোঁজ করেছি আমরা। মঞ্জাদাহির থেকে আমহিরি অবধি আমার চরেরা গিয়েছে তোর খোঁজে। তবে তোকে না পেলেও তোর মা-বাপের খোঁজ পেয়েছে তারা। ফিরে এসে তারা কী সংবাদ দিয়েছে জানিস?  হাঃ।

মহাবীর যোদ্ধা বৈক্লন্যের সন্তান! যোদ্ধা! সে তোর জন্মদাতা নয়। তোকে সে কেবল পালন করেছিল রে! জঙ্গলের এক বুনো, বর্বর মেয়ে তোর মা। আর, তোর বাপ ছিল আমহিরির এক বেনে। সেই দুটোকেই মেরেছিল তোর মন্দিরসেনা আর পুরুতরা মিলে। মেরেছিল তোদের ওই গোলক রাক্ষসের আদেশে। একটা অনাথ বেজম্মা হয়ে তুই আবার নিজেকে সেই রাক্ষসেরই পূজারি বলিস… হা হা হা…”  

প্রাণপণে নিজেকে থামাবার চেষ্টা করেছিল মাণ্ডুপ। অবাধ্য হাতদুটোকে নিরস্ত করে আর কয়েকটা মুহূর্তের প্রাণভিক্ষা একে দিয়ে সে জেনে নিতে চাইছিল, কোথায়, কার কাছে এমন খবর পেল সে? কে সেই মহাশত্রু তার, যে তার অজান্তে তার নামে এহেন বদনামের বিষ ছড়িয়ে চলেছে মঞ্জাদাহিরের বাতাসে? কিন্তু নিজের হাতদুটোকে সে আটকাতে পারেনি। প্রবল রাগে জ্বলে ওঠা মস্তিষ্ক তার, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই শেষ আঘাত হানবার নির্দেশ দিয়েছিল তার হাতকে। আর পরের মুহূর্তেই পাথরের চাঁইয়ের সজোর আঘাতে মানুষটার মাথার খুলি ভেঙে গিয়ে তার সারা গায়ে ছড়িয়ে গিয়েছিল ইলতাসের রক্তমাঘা ঘিলু।

তখনও ঝাঁকুনি দিতে থাকা শরীরটাকে আসুরিক শক্তিতে মাথার ওপরে তুলে ধরেছিল মাণ্ডুপ। তারপর তাকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হনহন করে এগিয়ে গিয়েছিল।

মরবার আগের মুহূর্তে এই নরপশুটার মুখের একগাদা ঘৃণ্য কথা তার সারা শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে যেন।  বারংবার তার মনে হচ্ছিল, তার বিশ্বস্ত সঙ্গীরা আড়চোখে চাইছে তার দিকে। হয়তো মনে মনে সামান্য হলেও তারা বিশ্বাস করেছে ওই শয়তানের প্রলাপে…

অথবা…হয়তো…ওর কথাগুলো…

দ্বিতীয় সন্দেহের এই ফুলকিটা তার মনের ভেতর জ্বলে উঠতেই তাকে সশঙ্কে নিভিয়ে দিতে চেয়েছিল মাণ্ডুপ। বড়ো জ্বালা এই সন্দেহে। বড়ো কষ্ট।

কিন্তু ফুলকিটা নিভল না। এর পর দীর্ঘ যাত্রাপথে মাঝে মাঝেই তা ফিরে এসে তাকে জ্বালিয়ে যেত। জ্বালিয়ে যেত ঘুমের আড়ালে। দস্যুদের রসদ আর মহিষে টানা যানগুলো কবজায় আসবার পর বাকি পথের যাত্রাটা অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল তাদের। এর মধ্যে একটা যানে কেবল খাদ্যেরই বিরাট সম্ভার ছিল। অন্য তিনটেতে বহুমূল্য কাপড়, পুঁতি, শঙ্খবলয় আর ইন্দাতীরের বিখ্যাত খেলনার স্তূপ। তবে তার মধ্যে খানিক জায়গা বের করে নিয়ে চলার পথে মাঝেমাঝেই খানিক বিশ্রামও মিলত সকলের। ফলে পথশ্রম বা বিপদ-আপদ আর বিশেষ কিছু ছিল না।

ভারহীন, চিন্তাহীন পথচলা। তাতে, পায়ে পায়ে স্বদেশ যত এগিয়ে আসছিল ততই আরো উৎফুল্ল হয়ে উঠছিল গোটা দলটা। সে আনন্দের ছোঁয়া মাণ্ডুপের মনেও লাগছিল বইকি। প্রথমে মঞ্জাদাহির। সেখানে দেবতার হাতে তাঁর প্রার্থিত বস্তুটি তুলে দিয়ে তার ছুটি। মহান দোরাদাবু তার সেবার মূল্য অস্বীকার করবেন না নিঃসন্দেহে। কাজেই তাঁর কাছে, আমহিরির মন্দিরদুর্গের সৈনাপত্য যদি ভিক্ষা মেলে… তারপর আমহিরি। সেখানে মা আছেন। ইস্কা আছে… ইস্কা… তার অপেক্ষায়…

কিন্তু এই সুখস্বপ্নদের মধ্যেও একটুকরো জ্বালাধরানো অন্ধকারের মত বারংবার একটা স্বপ্ন ঘুরেফিরে আসতে শুরু করেছিল মাণ্ডুপের। সারা রাত পথ চলবার পর, উত্তপ্ত দিনের বেলাটা কোনো টিলার আড়ালে বা বালির বুকে গর্ত করে ঘুমিয়ে কাটায় তারা। সেই সময়গুলোতে ঘুমের মধ্যে সেই স্বপ্নটা আসে। যেন এক অন্ধকার অরণ্যে মাণ্ডুপ একলা দাঁড়িয়ে আছে। আজকের এই বীর যোদ্ধা মাণ্ডুপ সে নয়। সে যেন ভীত সন্ত্রস্ত কোনো বন্য শিশু। তার সামনে এসে যে দাঁড়িয়েছে… বৈক্লন্য! অথচ যেন বৈক্লন্য নয়। তার বাবার চিরচেনা স্নেহময় মুখটার বদলে সেখানে যেন কোনো বিকৃত পশুর হিংস্র মুখ। হাতে উদ্যত তলোয়ার সে উঁচিয়ে ধরেছে মাণ্ডুপের মাথা লক্ষ করে। আবার তার পরমুহূর্তেই কালো ছায়ার মত একটা অবয়ব… মাণ্ডুপ তার মুখ দেখতে পায় না… বিদ্যুতবেগে ঝাঁপ দিয়ে আসে সে মাণ্ডুপের দিকে…

পরমুহূর্তেই পিতা বৈক্লন্যের তলোয়ারের ঘায়ে কালো সেই অবয়ব থেকে ফিনকি দিয়ে ছুটে আসে রক্তের ধারা। প্রাণপণে আর্তনাদ করতে থাকা মাণ্ডুপকে ধুয়ে দিতে থাকে যেন রক্তের সেই স্রোত! তার জিভে সে রক্তের নোনতা স্বাদ, তার নাকে তার আঁশটে, ধাতব গন্ধ! আর তারপর, তাকে ঘিরে ঝড়তে থাকা সেই রক্তের ধারা ভেদ করে এগিয়ে আসে দুটি সবল, কঠিন হাত… বৈক্লন্যের হাত… হাতদুটো মাণ্ডুপকে কেড়ে নিয়ে যায়… অরণ্য ছাড়িয়ে, কোনো ধূ ধূ প্রান্তর বেয়ে…

“না আ আ…” এহেন তীব্র চিৎকার গলায় নিয়ে একেক দিন ঘুম ভেঙে যায় মাণ্ডুপের। তার সঙ্গী যোদ্ধারা সশঙ্ক মুখে তার দিকে তাকিয়ে দেখে। অভিশপ্ত এই আধামরু তাদের কাছে আতঙ্কের জায়গা। তারা বিশ্বাস করে, দৈত্যনগরী ম্‌হিরির যুদ্ধে নিহত দানবদের অতৃপ্ত আত্মারা ম্‌হিরি থেকে তাড়া খেয়ে এই দুর্গম নরকে এসে বাসা করেছে! হয়তো তাদের কেউ, কোনো অসতর্ক মুহূর্তে আশ্রয় করেছে মাণ্ডুপকে! হয়তো এইভাবেই দিনের পর দিন ধরে তারা সাজা দিয়ে চলেছে তাদের মহাশত্রুকে! দিয়ে চলেছে তার শান্তির ঘুম কেড়ে নিয়ে!

রাত্রে যখন তারা পথ চলে, তখনও কারো সঙ্গে কথাবার্তা বিশেষ বলে না মাণ্ডুপ।

আস্তে… খুব আস্তে তার দুঃস্বপ্নটা আরও বিস্তারিত, আরো খুঁটিনাটিতে ভরপুর একটা দৃশ্য হয়ে উঠছে প্রতিদিন। আজকাল সে অনুমান করে তার ওপর ঝাঁপ দিয়ে আসা ছায়াটার থেকে পিতা বৈক্লন্য তাকে রক্ষা করেননি। বরং সেই ছায়াটাই তাকে বৈক্লণ্যের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে চেয়েছিল!

কিন্তু পরক্ষণেই একটা গভীর অপরাধবোধ এসে ছেয়ে ফেলে তাকে। এ হতে পারে না। প্রথমত জ্ঞান হয়ে অবধি সে আমহিরি নগরে মানুষ। এমন কোনো অরণ্যে কখনো সে পা দিয়েছে বলে তার স্মৃতিতে নেই। আর যদি অতি শৈশবে কখনো বাবার সঙ্গে দেশভ্রমণে গিয়ে এমন কোনো অরণ্যে যাবার স্মৃতিও হয় এটি, সেক্ষেত্রেও পিতা বৈক্লন্য কখনো এমন কোনো অমানুষিক কাজ করতে পারেন বলে সে বিশ্বাস করে না। তিনি বীর যোদ্ধা। কাপুরুষের মত কোনো অসহায়ের গায়ে অস্ত্র তোলা তাঁর কাজ হতে পারে না।

অতএব মাণ্ডুপ ধরে নিয়েছে, এ নিছকই তার উত্তপ্ত মস্তিষ্কের ক্রিয়া। মৃত্যুর আগে ওই বন্য দস্যুসর্দারের বলে যাওয়া মিথ্যারা তাকে এই যন্ত্রণার শাস্তি দিচ্ছে। নিজেকে সে বোঝায়,  এ হল ওই বন্য দস্যুর অন্তিম প্রতিশোধ…

এইসব হাজারো ভাবনায় ডুবে থেকে মঞ্জাদাহিরের পথে, তার ঈশ্বর দোরাদাবুর মন্দিরের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলেছিল মাণ্ডুপ। আর, অলক্ষ্যে তার নিয়তি তখন অন্য ঘুঁটি সাজাচ্ছিলেন। নিজের অজান্তে যে সত্যের বীজ স্মৃতিতে বয়ে বেড়াচ্ছে মাণ্ডুপ, এইবার তার অঙ্কুরোদগমের সময় হয়েছে। একদিন হয়তো এর থেকে গজিয়ে ওঠা মহীরূহটিই মানুষের অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করবে ইন্দাতীরে, প্রতিষ্ঠা করবে ওই গ্রহরূপী মনরাক্ষস দোরাদাবুর শাসনের অবসান ঘটিয়ে। সে-কাহিনি গড়ে ওঠবার পথে অনেক যন্ত্রণা, অনেক মৃত্যু আর বিচ্ছেদের ইতিকথা লিখে যাবে তার পাত্রপাত্রীরা।

তবে এখনও তার দেরি আছে। উপস্থিত আমরা চোখ রাখব মঞ্জাদাহিরের মন্দিরদুর্গের গর্ভগৃহের দিকে। সেখানকার অধিষ্ঠাতা ঈশ্বর দোরাদাবুর মনে তখন বিচিত্র কিছু চিন্তা জন্ম নিচ্ছিল…

***

…সময় হয়েছে নতুন করে ভাববার। কথাটা মনে হতে এবারে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে নিজের মানসিক যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেন দোরাদাবু। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা আশ্চর্য শান্তি নেমে এল তাঁর চেতনায়।

ইন্দাতীর জুড়ে তাঁর সাম্রাজ্য প্রতিদিনই আরও বেড়ে উঠছে। ক্রমশই তা ছড়িয়ে পড়ছে ইন্দা নদীর অববাহিকা ছাড়িয়ে আরও পূর্বে, তার বিভিন্ন উপনদীর কূলে কূলেও। সংখ্যায় ক্রমশই বেড়ে চলা এই শহরদের প্রশাসক সন্তানগোলকদের সঙ্গে সর্বদাই যোগাযোগ রেখে চলতে হয় তাঁকে। পাশাপাশি, দিন ও রাতের প্রতিটি মুহূর্তে এই কেন্দ্রীয় শহর মঞ্জাদাহিরের শাসক পুরোহিতকূলের মনের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, এখানকার প্রজাদের অগণিত চিন্তার শব্দকে গ্রহণ করে চলা, তা থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য বেছে নেয়া ও তার ভিত্তিতে বিভিন্ন নির্দেশ জারি করে চলা খুব সহজ কাজ নয়।

ইদানিং সেই কাজ আরও কঠিনতর হয়ে উঠছে আরো একটা কারণে। সে কারণ হল রাজধানী নগরীর প্রশাসক পুরোহিতকূলে বণিক সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্তি।

মাঝে মাঝে অতীতের দিনগুলির কথা ভেবে সামান্য দুঃখ হয় দোরাদাবুর। বড়ো সরল সময় ছিল তা। অধীনস্থ একদল দ্বিপদ পরজীবী। তাদের মনের ওপর নিরঙ্কুশ দখল তাঁর। তাঁর নেতৃত্বে একদল যন্ত্রের মতই তারা একের পর এক অঞ্চল দখল করে, তার বাসিন্দাদের হত্যা করে সেখানে নতুন নগরী স্থাপন করত। এরপর তাঁরই নির্দেশে ও তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠত সেখানকার জীবনযাত্রা, তার শাসনব্যবস্থা। সেসময় এই পরজীবীদের জন্য প্রশ্নহীন আনুগত্যের পুরস্কার ছিল জীবনে উন্নতি। প্রশ্ন বা অবাধ্যতার শাস্তি ছিল মৃত্যু।

কিন্তু তারপর কখন যে ধীরে ধীরে পরিস্থিতিতে বদল এসে গেল তা তিনি নিজেও টের পাননি। শুরুর দিকে যখন সাম্রাজ্য ছোটো ছিল, তখন যুদ্ধ ও লুটপাটভিত্তিক অর্থনীতি তাঁকে প্রার্থিত ফল দিয়েছে। কিন্তু সাম্রাজ্য যত বিস্তৃত হয়ে চলল, ততই তার রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নতিসাধনের জন্য আরও বিপুল সম্পদের ক্রমাগত সরবরাহের দরকার পড়তে শুরু করল। আর সে কাজে সহায়তা করতে, উত্থান হল ইন্দাতীরের বণিক সম্প্রদায়ের। তাদের সার্থবাহরা পণ্য নিয়ে স্থলপথে চলল ম্‌হিরি, মুন্দিগ্র, ইষক দেশে। অন্যদিকে তাদের বাণিজ্যতরীরা সমুদ্র পার হয়ে উর, মগন বা তেলমুন্দদের দেশে যাতায়াত শুরু করল।

এর ফলে একদিকে যেমন সম্পদের সরবরাহ এসে পৌঁছোতে লাগল, আবার এরই পাশাপাশি ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠতে শুরু করল ইন্দাতীরের বণিক সম্প্রদায়। এদের একটা বড়ো অংশ ইন্দাতীরে দোরাদাবুর প্রভাবক্ষেত্রের বাইরে ছড়িয়ে থাকে। দোরাদাবুর সরল মনোনিয়ন্ত্রণ ও শাস্তির শাসনপদ্ধতি এদের ওপরে ততটা খাটে না আর। প্রভাবক্ষেত্রের একজন বণিককে ইচ্ছামত শাস্তি দিলে, প্রভাবক্ষেত্রের বাইরে থাকা অজস্র বণিক তার প্রতিবাদ করে। এতে সাম্রাজ্যের সরাসরি কোনো ক্ষতি না হলেও প্রতিমুহূর্তেই সম্পদের নিয়ত সরবরাহে ঘাটতি হবার ভয় থেকে যায়।

ফলে, সম্পদের সরবরাহের বিনিময়ে এই বণিক সম্প্রদায় কখন যেন নিজেদের স্বাধীনতা ও স্বাধীন চিন্তার অধিকারকে দাবী করতে শুরু করেছে। দাবি করতে শুরু করেছে সাম্রাজ্যের প্রশাসনে নিজেদের ভূমিকাও। সেই দাবীর ফলস্বরূপ মন্দিরের পুরোহিত মণ্ডলীতে বণিক সমিতির একাধিক সদস্যকে জায়গা দিতে বাধ্যও হয়েছেন দোরাদাবু।

এই বণিকেরা সাম্রাজ্যশাসনের উপায় হিসাবে অস্ত্রের বদলে অর্থের ভূমিকাকে বড়ো করে দেখে। শত্রুকে সমূলে হত্যা করে তার ভূমি দখল করবার বদলে সেখানে শান্তি বজায় রেখে নিজের বাণিজ্যকে প্রসারিত করবার নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সম্প্রতি এহেন এক প্রস্তাব দেবার অপরাধে বণিক-পুরোহিত মার্জকের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন দোরাদাবু। যদিও সরাসরি নিজেকে তাতে জড়াবার সাহস তিনি করেননি। দণ্ডটা দিইয়েছিলেন অন্য পুরোহিতদের দিয়ে। কিন্তু এতে ইন্দাতীরের সমগ্র বণিকসমাজে যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে তার প্রভাব পড়েছিল বাণিজ্য থেকে আসা সম্পদের পরিমাণে। হত্যার খবরটা ছড়িয়ে পড়বার পর দূরস্থ বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকা বহু বণিক তাদের বিপুল সম্পদ নিয়ে সেই দেশগুলোতেই পাকাপাকি আশ্রয় নেয়। তারা ইন্দাতীরে ফিরে আসতে চায়নি।

সে অসন্তোষ ও আতঙ্ককে মুছে দেবার জন্য, নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল দোরাদাবুকে। মার্জকের হত্যায় নিজের ভূমিকাকে অস্বীকার করতে হয় তাঁকে। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া বিশ্বস্ত পুরোহিত আহীনকে সর্বসমক্ষে শাস্তি দিতে হয়। পিতার জায়গায় মঞ্জাদাহিরের পুরোহিতপদে অভিষিক্তও করতে হয় মার্জকপুত্র ঐশিককে। এর পর থেকে বণিককূলের দাবিতে ধীরে ধীরে প্রতিটি শহরের মন্দিরেই পুরোহিতপদে কয়েকজন করে বণিককে স্থান দিতে হয়েছে তাঁকে। এই বণিক পুরোহিতেরা ধীরে ধীরে, সুক্ষ্মভাবে বদলে দিয়ে চলেছে এই সাম্রাজ্যের মূল চরিত্রকেই। সরাসরি দোরাদাবুর কোনো আদেশের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ বা বিদ্রোহ তারা করে না কখনো। তবু আশ্চর্য কোনো কৌশলে তারা নিজেদের ইচ্ছা অনিচ্ছাকে প্রকাশ করতে জানে।

দুটো প্রধান বৈশিষ্ট্য এদের। প্রথমত, বাণিজ্য এদের ঈশ্বর। আর তাই শাসকের রাজদণ্ডের রক্তপাতের বদলে বণিকের মানদণ্ডের বলে সাম্রাজ্যবিস্তারের নীতিকে এরা ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত করে চলেছে। ইদানিং বেশ কিছু নতুন শহর গড়ে উঠেছে এদের এই নীতিতে ভিত্তি করে। আগে নতুন কোনো অঞ্চল জয় করবার পর নির্বিচারে তার বাসিন্দাদের হত্যা করে, তাদের বসতিকে আগুনে নির্মূল করে সেই ভস্মের ওপরে গড়ে উঠত ইন্দাতীরের নগরী। ইদানিং এর বদলে বিজিত অঞ্চলের  বাসিন্দাদের নিজস্ব সম্পদ ও স্বেচ্ছাশ্রমেই গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন প্রদেশের পরিকাঠামো। প্রথমে এতে সম্মত হননি দোরাদাবু। দীর্ঘকালের পরীক্ষিত একটা পদ্ধতিকে বদলে দিতে চাননি তিনি। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে এই পদ্ধতির উপকারিতা তাঁকে মত বদলাতে বাধ্য করেছে। এতে কোনো স্থানকে ধ্বংস করে নতুন শহর গড়বার জন্য যে বিপুল সম্পদ ও লোকবলের স্থানান্তরের প্রয়োজন হত তা বন্ধ হয়েছে।

বণিকদের অবশ্য একটা বিষয়ে আনুগত্য বজায় রয়েছে দোরাদাবুর প্রতি। নতুন জয় করা প্রদেশে পরিকাঠামো গড়ে ওঠবার পর, বাণিজ্যের অধিকার অটুট থাকলে সেখানকার শাসনকর্মে দোরাদাবু বা তাঁর সন্তানগোলকের নিরঙ্কুশ আধিপত্যকেও এরা স্বীকার করে নেয়। তাদের মুখে সর্বদাই দোরাদাবুর স্তুতিগান। নিজেদের তারা মহান দোরাদাবুর সেবক হিসাবেই পরিচয় দেয়। 

তবে এদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটা দোরাদাবুকে আরও অবাক করে। একেবারে শুরু থেকেই তিনি দেখেছেন, এই পরজীবীরা রক্তপিপাসু। তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে স্বজাতির রক্তপাতে তাদের গভীর আনন্দ। স্বজাতির রক্তপিপাসার এই বৈশিষ্ট্যকেই কাজে লাগিয়ে ইন্দাতীরে সাম্রাজ্যস্থাপনের সূচনা করেছিলেন দোরাদাবু। এর বলেই এই বিরাট সাম্রাজ্য এতদিন সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা হয়েছে। অথচ, এই বণিক সম্প্রদায় এক্ষেত্রে অন্য পরজীবীদের চেয়ে সামান্য আলাদা। এদের চোখে সমস্ত পরজীবীই স্বজাতি নয়। একজন বণিক কেবলমাত্র আর একজন বণিককেই স্বজাতি বলে মনে করে। তার বাইরে আর সমস্ত পরজীবীই তার বাণিজ্যের গ্রাহক ও উপভোক্তা সম্প্রদায়। বাণিজ্যে সমস্যা না হলে তাদের জীবন বা মৃত্যুতে এদের কিছু যায় আসে না। কিন্তু  বণিকজাতীয় যেকোনো পরজীবীর প্রাণ এদের কাছে অসীম মূল্যবান। সেখানে কোনো আঘাত এলে এরা তার প্রতিবাদ করে। সে প্রতিবাদের ফল কী হয় তা মার্জকের মৃত্যুর পর দোরাদাবু দেখেছেন। ইন্দাতীরের বিভিন্ন শহরেও এহেন কিছু ঘটনার পর সরাসরি সে শহরের বাণিজ্য ও সম্পদ আহরণে গুরুতর আঘাত এসেছে। ফলে ইদানীং, সরাসরি ঈশ্বরবিরোধী কোনো আচরণের অকাট্য প্রমাণ না মিললে বণিকদের মৃত্যুদণ্ড ইন্দাতীরে প্রায় নিষিদ্ধই হয়েছে বলা যায়।

আর এইখানেই নতুন করে ভাববার প্রয়োজন উপস্থিত হয়েছে দোরাদাবুর। বাইরের জগতের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে, দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত কাজ থেকে খানিকক্ষণের জন্য অব্যহতি নিয়ে নিবিষ্টভাবে চিন্তা করবার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে তাঁর এখন। হয়ে পড়েছে একটা দ্বিধা থেকে। সে দ্বিধা ওই তরুণ যোদ্ধা মাণ্ডুপকে নিয়ে।

এক পক্ষকাল আগে উত্তর সীমান্তে নবসার নগরীর সন্তানগোলক সংবাদ পাঠিয়েছে, ম্‌হিরি ছেড়ে ঊষর অর্ধমরু পার হয়ে নবসার শহরে পৌঁছেছে মাণ্ডুপ। সেখান থেকে মহিষচালিত কয়েকটা যান নিয়ে সে ও তার সঙ্গী সৈনিকেরা মঞ্জাদাহিরের পথে রওয়ানা হয়েছে। এর অর্থ সম্ভবত আগামীকাল সকালে সে এইখানে এসে পৌঁছাবে।

প্রথা অনুযায়ী সাম্রাজ্যসীমার বাইরে থেকে কোনো যাত্রী এসে পৌঁছোবার পর সীমান্তবর্তী শহরে তার সঙ্গে আসা সমস্ত বস্তুর তল্লাশি নেয়া হয় ও তার মূল্যের ভিত্তিতে তার দেয় কর নির্ধারণ করা হয়। এই একটি বিষয়ে দোরাদাবু ও বণিক পুরোহিতেরা একেবারেই সহমত। রাজ্যশাসন ও সম্পদ আহরণ দুয়ের জন্যই এই প্রথার প্রয়োজনীয়তা আছে। অথচ এক্ষেত্রে নবসার নগরীর সন্তানগোলককে তিনি সেই তল্লাশি নেবার বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। তবে, নিয়মের এহেন ব্যাত্যয়ের কোনো কারণ দেখাননি দোরাদাবু। দেখাননি, কারণ, ম্‌হিরি নগরী থেকে যে জ্যোতির্ময় শিলা সে বয়ে নিয়ে আসছে তা স্বয়ং দোরাদাবুর শক্তিকেও খর্ব করতে সক্ষম। এর অস্তিত্বের খবর দ্বিতীয় কোনো পরজীবী বা সন্তানগোলক জানতে পারলে তার ফলাফল বিপজ্জনক হতে পারে।

একসময় তিনি ভেবেছিলেন, সিসার নিরাপদ আবরণে রক্ষিত শিলাটি নিয়ে তাঁর  কাছে এসে পৌঁছোবার পর তার বাহক ঐ মাণ্ডুপকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে এই গোপন তত্ত্বকে একমাত্র নিজের কাছে গচ্ছিত রাখবেন। কিন্তু তারপর, এই নিষেধাজ্ঞার একটা অনাকাঙ্খিত ফলাফল তাঁকে অন্যভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ, নবসার নগরীর পুরোহিতসমাজ, সন্তানগোলক ও বাসিন্দারা সকলেই এই নিষেধাজ্ঞা অন্য অর্থ করেছে। সেখান থেকে আসা শেষতম সংবাদ অনুযায়ী, সেখানকার বাসিন্দারা এর ফলে মাণ্ডুপকে দোরাদাবুর আশীর্বাদধন্য কোনো মহাবীর হিসেবে দেখছে। এমন একজন বীর, যে দোরাদাবুর আদেশে সাধারণ আইনের ঊর্ধ্বে। তাদের ধারণা ম্‌হিরি বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবার ফলেই মাণ্ডুপের এই দুর্লভ সৌভাগ্য ঘটেছে।

খবরটা মঞ্জাদাহিরের শাসক পুরোহিতদের মধ্যকার বণিক সদস্যদের মধ্যে একটা নতুন আবেগের জন্ম দিয়েছে। মাণ্ডুপকে তারা নিজেদের নায়ক হিসাবে দেখতে শুরু করেছে এবং তাদের দেখাদেখি মঞ্জাদাহিরের সমস্ত বণিকই মাতৃকামন্দিরে মাণ্ডুপের জন্য পূজা উৎসর্গ করছে।

এর কারণ দোরাদাবুর অজানা নয়। আসলে, মাণ্ডুপ নিজে না জানলেও, সে যে আসলে একজন বণিকের সন্তান, সে খবর মন্দিরের পুরোহিতসমাজে অজানা নয়। কারণ, আহীন সম্পূর্ণ ঘটনাটাই জানেন। ফলে তাঁর কাছ থেকে সম্পূর্ণ না হলেও এর কিছু আভাস অন্য পুরোহিতরা পেয়েছেন। অবৈধ হলেও আহিন যে একজন বণিক সন্তান, এ খবর তাই মন্দিরপুরোহিতসমাজের বণিক সদস্যদের জানা। ফলে একজন বণিক সন্তানের এহেন সম্মানপ্রাপ্তিতে তাঁরা উল্লসিত হবেন সেটা স্বাভাবিক।

কিন্তু এর ফলে দোরাদাবুর সামনে একটা বিচিত্র সমস্যা উঠে এসেছে। কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ না দেখিয়ে সরাসরি মাণ্ডুপকে হত্যা করলে মঞ্জাদাহিরের বণিকসমাজে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে। এর ছোঁয়াচ ইন্দাতীরের অন্যান্য শহরের বণিকসমাজেও ছড়ীয়ে পড়বার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

একদিকে একটা গোপন তথ্যের নিরাপত্তা, সম্পদের বলে বলীয়ান বণিকসমাজের শত্রুতা অর্জন, এই দ্বিধাটিই তাঁকে অহর্নিশি উত্যক্ত করে চলেছে ইদানীং।

একটা দীর্ঘ সময় পার হবার পর, পুবের আকাশে সবে লালের ছোঁয়া লেগেছে যখন, তখন ফের বহির্জগতের সঙ্গে মানসিক সংযোগ ফিরিয়ে আনলেন দোরাদাবু। প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা শেষ। এইবার তার প্রয়োগের পালা। এইবার, তাঁর চেতনায় ধরা পড়ছিল মাণ্ডুপের চিন্তার সুতোরা। মঞ্জাদাহির শহরের আওতার মধ্যে এসে পৌঁছে গিয়েছে সে।

তাকে দ্রুত এসে পৌঁছোবার আদেশ দিলেন দোরাদাবু। সরাসরি হত্যা একে করা যাবে না। তার জন্য কিছু প্রস্তুতি প্রয়োজন। সময় প্রয়োজন। প্রথমে, এর বিরুদ্ধে ঈশ্বরবিরোধের অভিযোগের একটা ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে তাঁকে… তারপর তার ভিত্তিতে একে মৃত্যুদণ্ড দিলে কারও কোনো আপত্তি হবে না আর।

কথাটা মনে হতে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল দোরাদাবুর। ইন্দাতীরে তাঁর শাসনে চিরকাল একটা সাদাসিধে নীতি নিয়ে চলেছেন তিনি। একজন পরজীবী বাধ্য হলে তাঁর কৃপা পাবে, অবাধ্য হলে মৃত্যু। সামনে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে আড়ালে শত্রুতাসাধন তাঁর ধর্ম নয়। সে এই  অর্ধপশু পরজীবীদের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। আজ প্রথমবার তাঁকে নিজের সরল নীতি ছেড়ে এই পরজীবীদের বিষাক্ত নীতিকে গ্রহণ করতে হচ্ছে। হচ্ছে একরকম বাধ্য হয়েই। এছাড়া আর কোনো পথ তাঁর সামনে খোলা নেই।

অনুভূতিটা একটা অনিয়ন্ত্রিত রাগের জন্ম দিচ্ছিল তাঁর মধ্যে। রাগ ওই তুচ্ছ পরজীবী মাণ্ডুপের ওপরে। কিন্তু সে অনুভূতি প্রকাশের সময় এখন নয়। যথাসময়ে তিনি তাকে তার যোগ্য শাস্তি দেবেন।

“আহীন…”

মানসিক আহ্বানটা পাঠাবার পরমুহূর্তেই তাঁর চেতনায় আহীনের চিন্তাস্রোত এসে স্পর্শ করল, “আদেশ মহান দোরাদাবু।”

“যোদ্ধা মাণ্ডুপ নগরে প্রবেশ করেছে। মন্দিরসেনার একটি ছোটো দল পাঠিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে মন্দিরে নিয়ে আসবে ও তারপর সসম্মানে আমার গর্ভগৃহে পাঠাবে। একলা।”

“আদেশ শিরোধার্য হে ঈশ্বর। এখন তবে…”

“হ্যাঁ। মনে রেখো, আমার সঙ্গে সাক্ষাতের আগে সে যেন দ্বিতীয় কারো সঙ্গে বাক্যালাপ বা যোগাযোগ করবার সুযোগ না পায়। এবং সাক্ষাতের পরে তার বিষয়ে তোমার পরবর্তী কর্মপদ্ধতি এই হবে…”

পরবর্তী কয়েকটি মুহূর্ত দ্রুত দোরাদাবুর আদেশগুলো জেনে নেবার পর আহীন যখন মন্দিরের অলিন্দে এসে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর মুখে বিচিত্র একটা হাসি খেলে যাচ্ছিল। পরস্পরবিরোধী আদেশগুলো মহান দোরাদাবু কেন দিয়েছেন তা বোঝা তার সাধ্য নয়। তবে সেগুলো পালন করতে তাঁর বড়োই তৃপ্তি হবে। অনেক অপমানিত হয়েছেন তিনি ওই মাণ্ডুপের কাছে। ম্‌হিরির যুদ্ধ চলাকালিন তাঁকে অনেক উপেক্ষা সহ্য করতে হয়েছে এর জন্য। সে যুদ্ধে জয়ের প্রধান কৃতিত্ব পেয়েছে ওই মাণ্ডুপ। তুচ্ছ বণিকপুত্র। নিজের আসল পরিচয়টুকুও জানা নেই এর। এইবার… 

***

গর্ভগৃহের দরজা খুলে যাচ্ছিল। সেখানে এসে দাঁড়ানো তরুণটির মুখে বিনীত হাসি। আভূমি নত হয়ে সে প্রণাম করছে দোরাদাবুকে। এইবার তার মাথায় প্রতিধ্বনিত হল ঈশ্বরের ডাক,  “এসো হে যোদ্ধা মাণ্ডুপ। যা এনেছ তা উৎসর্গ করো আমাকে।

সন্তর্পণে সঙ্গে আনা সীসার বাক্সটা বের করে আনল মাণ্ডুপ। নতজানু হয়ে বসে তাকে বন্ধ অবস্থাতেই এগিয়ে দিল দোরাদাবুর সিংহাসনের দিকে।

“এইখানে নয়। আমার সিংহাসনের পেছনে এস। সেইখানে একটা ধাতুনির্মিত কক্ষ পাবে। তাতে পাত্রটা রেখে কক্ষের দরজা বন্ধ করে দাও। ভয় নেই। আমি আমার রক্ষাবলয় সরিয়ে নিয়েছি। এসো তুমি। কাছে এসো…”

ক্রমশ

শীর্ষচিত্র- অতনু দেব।

 জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক

Leave a Reply