সিন্ধুনদীর তীরে –প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব, পঞ্চম পর্ব, ষষ্ঠ পর্ব , সপ্তম পর্ব, অষ্টম পর্ব, নবম পর্ব , দশম পর্ব, একাদশ পর্ব, দ্বাদশ পর্ব, ত্রয়োদশ পর্ব, চতুর্দশ পর্ব, পঞ্চদশ পর্ব, ষোড়শ পর্ব, সপ্তদশ পর্ব, অষ্টাদশ পর্ব

চাঁঁদ এখন মাঝ আকাশে। পায়ের অনেক নীচে ইন্দাতীরের ঘন অন্ধকার বন ছড়িয়ে আছে। চাঁদের ঠান্ডা ও নরম আলো সে জঙ্গলের অন্ধকারকে ভেদ করতে পারেনি। তাকে চিরে বয়ে গেছে ইন্দার জলধারা। চাঁদের আলো পড়ে তা এই উচ্চতা থেকে, একটা রূপালি ফিতের মত দেখায়। যুবতীর কেশদামে রুপোর সুতোর বাঁধন যেন।
হঠাৎ করেই নদীতীরের সেই বন থেকে শেয়ালের মিলিত ডাকের শব্দ ভেসে এল। পাহাড়ের দেয়ালে হাত ও পায়ের আঙুল দৃঢ়ভাবে আটকে রেখেই মাণ্ডুপ একঝলক তাকিয়ে দেখল সেদিকে। তার মানে রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর পূর্ণ হল। মাথার ওপর দুর্গপ্রাকারের ভিৎ এখনও অন্তত ত্রিশ হাত উঁচুতে। এ-অংশটা তুলনায় অনেকটাই বেশি খাড়াই।
পায়ের অনেক নীচে ইন্দা-র নদীগর্ভ অবধি ছড়িয়ে থাকা পাহাড়ের দেয়ালটার দিকে একনজর ঘুরে দেখে নিল মাণ্ডুপ। তারপর কৃতজ্ঞচিত্তে ফের একবার বন্ধু ও গুরু কিরামকে স্মরণ করল। নদীতীরের সমতলভূমির ছেলে সে। পাহাড়ে চড়বার এই বিদ্যা তার সহজাত ছিল না কখনোই। ম্হিরিতে থাকাকালিন প্রায়শই বৃদ্ধ কিরাম তাকে সঙ্গে নিয়ে সে এলাকার পাহাড়, বন, নদীতট ও গিরিসঙ্কটে ঘুরে বেড়াতেন। চলত প্রকৃতি পাঠ, ও মুখে মুখে হরেক রকমের বিদ্যাশিক্ষা। প্রথম প্রথম সামান্য ভয় পেত মাণ্ডুপ। পাহাড়ি ঢালে আছাড় খেয়ে চোটও কম পায়নি। কিন্তু সেই করতে করতেই কিরামের শিক্ষায় পাহাড়ে চড়বার এই বিদ্যায় আস্তে আস্তে সড়গড় হয়ে উঠেছিল সে। তখন সে স্বপ্নেও ভাবেনি, নিয়তির নির্দেশে সে বিদ্যা একদিন কোন কাজে লাগতে চলেছে তার!
“দেহ পাথরের সংলগ্ন হবে না। যেকোনো মুহূর্তে চারটি হাত ও পায়ের তিনটি পাথরকে আঁকড়ে থাকবে…” গিরগিটির মত প্রায় উল্লম্ব সেই ত্রিশ হাত অংশ উঠে যেতে যেতে বারে বারেই কিরামের নির্দেশগুলো কানে বাজছিল মাণ্ডুপের।
খানিক বাদে একটা কার্নিশের মত জায়গায় নিজেকে টেনে তুলল সে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঢাল এইখানেই শেষে। এরপর বাকিটা মানুষের তৈরি। ইট গেঁথে গড়ে তোলা সেই দুর্গপ্রাকার পেরিয়ে যাওয়া তুলনায় অনেক সহজ। ইন্দাতীরের যেকোনো সাধারণ সেনারও সেই বিদ্যা জানা।
ডাইনে খানিক দূরে একটা প্রাচীন আমগাছ প্রাকারের ওপর থেকে পাহাড়ের দিকে ঝুঁকে এসেছে। সাবধানে কার্নিশ বেয়ে তার নীচে গিয়ে দাঁড়াল সে। তারপর কোমরে পেঁচিয়ে রাখা দড়িটা খুলে এনে, তার মাথায় ছোটো ছুরিটাকে আড়াআড়িভাবে বেঁধে নিয়ে দড়ির মাথাটাকে ওপরদিকে ছুঁড়ে দিল। দড়ির অন্য মাথা তার হাতে ধরা।
প্রথম দুবার ব্যর্থ হবার পর তৃতীয়বার চেষ্টাটা সফল হল তার। ডালটার ওপর দিয়ে ঘুরে দড়িসহ ছুরিটা ফের নীচের দিকে নেমে এসেছে। এবারে ছুরিটা খুলে নিয়ে দড়ির দুই প্রান্ত একত্রে বেঁধে নিল সে। তারপর দড়ি ধরে দেয়ালে পা ঠেকিয়ে সাবধানে প্রাকারের ওপরে উঠে এল।
দরদর করে ঘামছিল মাণ্ডুপ। ঘন ঘন শ্বাসে রাত্রির ঠান্ডা বাতাস বুকে টেনে নেয় সে। এতটা পথ একটানা উঠে আসতে দানবিক পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে।
তবে বিশ্রামের অবকাশ তখন তার কাছে ছিল না। রাত্রি তৃতীয় প্রহর শুরু হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। সব ঠিক থাকলে, এই মুহূর্তে আহুম জৈমিনের বাসগৃহে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন; এবং তাঁর দেয়া খবরের ভিত্তিতে মান্ডুপের অরণ্যের ঘাঁটিতে হানাদারির জন্য তৈরি হচ্ছে জৈমিনের সেনারা। ঠিক হয়েছে, তৃতীয় প্রহর ঘোষণা অবধি জৈমিনের সঙ্গে থাকবেন আহুম। তার মধ্যে এখানকার কাজ মিটিয়ে জৈমিনের বাসগৃহে পৌঁছাতে হবে মান্ডুপকে। তারপর সেখানকার কাজ শেষ করে, ভোর হবার আগেই ফের এইখান দিয়েই দুর্গ ছেড়ে বের হয়ে যাবে সে।
প্রাকারের ভেতরের দিকটায় ঘাসে ছাওয়া একটুকরো নাবাল জমি সামান্য নতিতে উঠে গিয়েছে ওপরের দিকে। তার শেষপ্রান্তে একটা বড়োসড়ো ঘর। ঘরটার দরজা অতি সাধারণ একটা কিলক দিয়ে আটকানো। সন্তানগোলকের ব্যক্তিগত রাজকোষ! গতকাল আহুম তাকে বলেছিলেন বটে, কিন্তু এখন নিজেচোখে দেখে একটু অবিশ্বাস্যই ঠেকছিল মাণ্ডুপের। যুগ যুগ ধরে জমে ওঠা অমিত সম্পদ জমা আছে ওই ঘরে! অথচ তার চতুঃসীমায় কোনো প্রহরী নেই।
অবশ্য এর কারণটা মান্ডুপের অজানা নেই। ঘরটার গা ঘেঁষে উঠে যাওয়া গোলকাকার মন্দিরটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখল সে। ইট গেঁথে গড়ে তোলা ওই গোলক এই নগরীর ঈশ্বরের আবাস। ওইখানে স্বয়ং সন্তানগোলক অধিষ্ঠান করেন। তাঁর ধনভান্ডারের প্রহরী তিনি স্বয়ং! সেখানে প্রধান পুরোহিতের হাজিরা বিনা আর কারো মনের উপস্থিতি টের পেলে সে মনের মালিকের কী পরিণতি ঘটে তার প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ তাকে শুনিয়েছেন আহুম।
কথাটা মনে আসতেই সভয়ে নিজের কোমরে আটকানো চামড়ার ছোট্ট পুঁটুলিটায় একবার হাত ছুঁইয়ে নিল মাণ্ডুপ। জাদুপ্রস্তর! তার অদৃশ্য বর্ম এই মুহূর্তে ঘিরে রেখেছে তাকে! গোলকমন্দিরের অধিষ্ঠাতা ওই মনরাক্ষস এখন তার মনের উপস্থিতিকে টের পাবে না।
শিকারী চিতার মতই একটা নিঃশব্দ লাফে এইবার সে নেমে এল প্রাকার থেকে। তারপর চোখের পলকে ধনাগারের সামনে পৌঁছে তার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গেল।
দ্বিশতাধিক শ্বাসগ্রহণ পরিমাণ সময় অতিক্রান্ত হবার আগেই ধনাগার থেকে ফের বের হয়ে এল মাণ্ডুপ। তার পিঠে লেপ্টে থাকা চামড়ার থলিটা সুপুষ্ট হয়ে উঠেছে এবারে। আহুমের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তির কল্যাণে এক মুহূর্ত সময় অপচয় হয়নি তার সেখানে। ধনাগারের ঠিক কোনখানে প্রদীপ ও চকমকি পাথর থাকে সেই তথ্য থেকে শুরু করে, তার ঠিক কোন জায়গায় মান্ডুপের সম্পত্তি সঞ্চিত রয়েছে তার একটা বিবরণ তিনি মাণ্ডুপকে দিয়েছিলেন। কার্যক্ষেত্রে সে বিবরণে সামান্যতম ত্রুটিও পায়নি মাণ্ডুপ।
নিজের রোজগারের বিপুল সম্পদের ভাঁড়ার থেকে খুব বেশি কিছু নেয়নি সে। কী ও কতটুকু নেবে, সে বিষয়ে অনেক হিসেব তাকে করতে হয়েছে। ম্হিরি-র যুদ্ধের অন্তিম রাতে ঘন বৃষ্টির মধ্যে রণাঙ্গনে শেষশয্যায় শুয়ে থাকা মহামাতৃকা সুব্রাল-এর মাথা থেকে সে খুলে এনেছিল তাঁর সোনার কেশবন্ধনী। রত্নখচিত এই কেশবন্ধনী সে ইস্কাকে উপহার দেবে বিবাহের রাত্রে। ম্হিরির রাজকোষ লুণ্ঠনের প্রাপ্তি রত্নরাজির থেকে বেছে নিয়েছে সে কিছু দুষ্প্রাপ্য রত্ন। এদের বিনিময়ে যেকোনো দেশে স্বচ্ছল জীবন কাটানো সম্ভব হবে তার ও ইস্কার পক্ষে। এছাড়া কিছু দুষ্প্রাপ্য ওষুধের পাত্র সে সঙ্গে নিয়েছে। বৃদ্ধ কিরাম তাকে সযত্নে এই ওষুধদের গুণাগুণ ও ব্যবহারের পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন। আর নিয়েছে চারটি মৃৎপট্ট। তার একটিতে রয়েছে কিরামের শেখানো নক্ষত্রবিদ্যার সারাংশ আর অন্য তিনটিতে রয়েছে উর দেশ, ইফ্রাৎ নদী ও সেই জাদুপ্রস্তরের ইতিবৃত্ত। মৃৎপট্টগুলো হাতে নিয়ে একটা অদ্ভুত শিহরণ খেলে গিয়েছিল মান্ডুপের গায়ে। এরা তার নিজেহাতে বানানো। চৌকো পট্টগুলো বানিয়ে তাদের গায়ে অক্ষরপাতও তার করা। এ ছিল কিরাম-এর শিক্ষাদানের বিভিন্ন পর্বে তাঁর নেয়া পরীক্ষার পট্ট। কতটুকু শিখেছে মান্ডুপ, তার পরীক্ষা নেবার জন্য মাঝে মাঝেই তিনি একেকটা বিষয়ের সংক্ষিপ্তসার তাকে একেকটা পট্টে লিখতে আদেশ দিতেন…
বাইরে বের হয়ে এসে ধনাগারের ইটের পাঁচিলের গা ঘেঁষে দাঁড়াল মান্ডুপ। তারপর তার বের হয়ে থাকা ইটের কোনাগুলো আঁকড়ে ধরে কাঠবিড়ালির মতই তরতর করে উঠে গেল ধনাগারের খোলা ছাদে। সেখান থেকে ছোট্ট একটা লাফে পাশের গোলকাকার ছাদটার গোড়ায় পৌঁছে সাবধানে তাকে বেড় দিয়ে তার বিপরীতদিকে গিয়ে নামল সে।
এদিকটা নির্জন ও অন্ধকার। সাধারণত মন্দিরের আশপাশে কোনো প্রহরী থাকে না। মনরাক্ষস নিজেই নিজের রক্ষক। অতএব নিশ্চিন্তে এইখানে দাঁড়িয়ে সামনে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া জমির দিকে নজর দিল সে। মূল মন্দির থেকে ষাট পদক্ষেপ পরিমিত স্থান ছেড়ে মন্দিরদুর্গের বসতি অঞ্চলের শুরু। এরপর অর্ধসহস্র পদ পার হয়ে মন্দিরদুর্গের সুরক্ষিত প্রাকার। তার অন্যপাশে ছড়িয়ে আছে কট্টাদিজা জনপদ।
মধ্যরাত্রি পার হয়েছে অনেকক্ষণ। মন্দিরদুর্গের ঘুমন্ত বসতি এলাকা অন্ধকারে ঢাকা ছিল। বেশ কিছুক্ষণ সেই অন্ধকার এলাকাটার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকবার পর হঠাৎ সামান্য একটু হাসি ফুটে উঠল মান্ডুপের ঠোঁটে। অন্ধকারের বুকে প্রায় অদৃশ্য আলোর একটা হলদেটে বিন্দু ধরা পড়েছে তার চোখে। আহুম কথা রেখেছেন। নিঃশব্দ আলোকসঙ্কেতে তিনি প্রচার করে চলেছেন জৈমিনের অবস্থান।
পিঠের থলেটা থেকে একটা ছোটো পুঁটুলি বের করে আনল এবারে মাণ্ডুপ। সৈনিকজীবনের শিক্ষা তার। পরিচয় গোপন করে হামলা চালাবার উপকরণ। পুঁটুলি খুলে তার মধ্যে রাখা তৈলাক্ত, অর্ধতরল বস্তুটাকে আঙুলে তুলে শরীর ও মুখে মেখে নিচ্ছিল সে। তিলের তেল দিয়ে গোলা ভুষোকালির সে ছদ্মবেশ তার গায়ের গমরঙা চামড়াকে ঢেকে দিচ্ছিল ধীরে ধীরে। কয়েক মুহূর্ত বাদে সে কাজ শেষ করে যখন সে উঠে দাঁড়াল তখন পাতলা কালো কাপড়ে মাথা ঢাকা, অন্ধকারবর্ণ মানুষটাকে তার অতি ঘনিষ্টজনও মান্ডুপ বলে চিনতে পারবে না। এবারে, নিশাচর শ্বাপদের মতই নিঃশব্দে ধেয়ে গেল সে দূরে দপদপ করতে থাকা আলোর বিন্দুটাকে লক্ষ করে।
***
“এবার?”
সামনে ছড়িয়ে থাকা ভয়াবহ দৃশ্যটার থেকে অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রেখে প্রশ্ন করলেন আহুম। বণিকের পেশায় পথে পথে দীর্ঘকাল কেটেছে তাঁর। পরিচিত পৃথিবীর বহু প্রান্তেই তিনি গিয়েছেন পণ্যবোঝাই সার্থবাহ নিয়ে। অতএব এহেন জীবনে যুদ্ধ ও মৃত্যু তিনি কম দেখেননি। কিন্তু তথাপি, তিনি একজন বণিক মাত্র। তলোয়ারের বদলে দাঁড়িপাল্লায় তিনি অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। হত্যাশিল্প্র বদলে, পণ্যের লেনদেনেই তাঁর আসল দক্ষতা। তাই খানিক আগে তাঁর সামনে ঘটে যাওয়া যুদ্ধ আর হত্যাকান্ডটার নারকীয় ছবি তিনি কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না।
জৈমিন বোঝেননি। মৃত্যুর মুহূর্ত অবধি তিনি বুঝতে পারেননি, তাঁর মৃত্যুর জন্য আহুম দায়ী। বুঝতে পারেননি, দিনের দ্বিপ্রহরে তার সভায় মান্ডুপের অনুপস্থিতি থেকে শুরু করে, রাতের দ্বিপ্রহরে তাঁর বাড়িতে মান্ডুপের খবর নিয়ে আসা, এমনকি কথাবার্তা চলাকালিন ঘরে ধোঁয়া হবার অজুহাতে প্রদীপটাকে জানালার তাকে রেখে দেয়ার মত তুচ্ছ কাজটাও আসলে আহুমের পরিকল্পনার অংশ। আর তাই, খানিক আগে মূর্তিমান মৃত্যুর মতই জানালা দিয়ে ধেয়ে আসা মানুষটাকে দেখে জৈমিন আহুমকে সাবধান করেছিলেন। চোখের পলকে হাতে তলোয়ার তুলে নিতে নিতেই নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁর পেছনে আশ্রয় নিতে। তিনি জানতেন আহুম বণিক। তলোয়ারে তার দক্ষতা কোনো গুপ্তঘাতকের সমতূল্য হতে পারে না।
গুপ্তঘাতক! হ্যাঁ। মান্ডুপকে গুপ্তঘাতক বলেই সন্দেহ করেছিলেন জৈমিন। মন্দিরদুর্গের রাজনীতি বড়ো জটিল। ষড়যন্ত্র বা গুপ্তহত্যা এখানে দুর্লভ নয়। অতএব হাতে তলোয়ার তুলে নিয়ে তিনি প্রথমেই তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “কে তোমায় পাঠিয়েছে? সে কত অর্থ তোমায় দিয়েছে আমায় বলো। আমি তার দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ দেব, যদি তুমি আজ রাত্রে তাকে হত্যা করতে পারো।”
আত্মবিশ্বাসে ভরপুর জৈমিন তাঁর চেষ্টার সাফল্যের বিষয়ে নিঃসন্দেহ ছিলেন। আসলে মন্দিরদুর্গের পুরোহিতসমাজে বণিকদের প্রতিনিধিরা যোগ দিতে শুরু করবার পর গত কিছুকাল ধরে এখানকার ষড়যন্ত্রে অর্থ ও সম্পদ একটা বড়ো ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। কে কত অর্থ দিচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে তাই গুপ্তঘাতকের নিশানা বদলে যাওয়া এখন আর খুব একটা দুর্লভ ব্যাপার নয়।
কিন্তু এক্ষেত্রে তাঁর প্রস্তাবটা শুনে ছদ্মবেশী হত্যাকারীর মুখে কেবল একচিলতে ঠান্ডা হাসি ফুটে উঠেছিল। হাতে তার কোনো অস্ত্র ছিল না। কিন্তু তার সেই শীতল হাসিতে মৃত্যুর ইশারা ছিল। তার অর্থ বুঝতে ভুল করেননি অভিজ্ঞ যোদ্ধা জৈমিন।
এরপর, প্রহরীদের ডাক দিতে গিয়ে এইবারে নিজের বিপন্নতার সঠিক আন্দাজ হয়েছিল তাঁর। আহুমের আনা খবর পেয়ে কিছুক্ষণ আগেই ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের দলটাকেই তিনি রওয়ানা করে দিয়েছেন মাণ্ডুপের গোপন অরণ্য-আবাস লক্ষ করে। দুর্গরক্ষীদের খবর দেননি। দেননি, কারণ আহুম বলেছিল, তার চরের আনা খবর অনুযায়ী মান্ডুপ কিছু একটা বিপজ্জনক পরিকল্পনা করছে। সন্তানগোলকের মন্দিরে কোনো গোপন কৌশলে হামলা চালাতে চায় সে। এবং সে-পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সে-রাত্রেই সে তার গোপন আবাস ছেড়ে অন্যত্র আত্মগোপন করবে। আস্তানা ছাড়বার আগেই তাই তাকে বন্দি করা জরুরি। অতএব দুর্গরক্ষীদের খবর দেবার সময় তখন ছিল না।
তবে এতেও জৈমিন সন্ত্রস্ত হননি। বহু যুদ্ধের পোড়খাওয়া সৈনিক তিনি। বয়স বেড়েছে বটে, কিন্তু এখনও তলোয়ারের দক্ষতা অটুট আছে তাঁর। হঠাৎ চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় মাটি ছেড়ে লাফিয়ে উঠেছিলেন তিনি। তারপর আততায়ীর শরীর লক্ষ করে নেমে আসতে আসতেই তলোয়ার তুলে ধরেছিলেন নিজের বাঁ-কাধের ওপরে। জৈমিনের নিজস্ব আক্রমণ পদ্ধতি। পৃথিবীর টানে নেমে আসতে আসতে নিজের সম্পূর্ণ ওজন ব্যবহার করে আড়াআড়ি একটা কোপ। একসময় কোনো অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেবার সময় তাঁর এই দৃষ্টিনন্দন আক্রমণ দেখবার জন্য দর্শকের ভিড় হত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঐ এক আঘাতে কোনাকুনিভাবে চিরে দুটুকরো হয়ে যায় আক্রান্তের শরীর।
তবে এক্ষেত্রে তা ঘটল না। বাতাসে তিনি ভেসে উঠতেই মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে একপাক গড়িয়ে গিয়েছিল তাঁর আততায়ী। তারপর চোখের পলকে মাটি থেকে ছিটকে উঠল সে-ও। ততক্ষণে তার আগের অবস্থানের ওপর নেমে আসতে আসতে জৈমিনের তলোয়ারের ব্যর্থ আঘাত হাওয়া কেটে মেঝেতে ঘা মেরেছে। মেঝেতে ধাক্কা খেয়ে এক মুহূর্তের জন্য ভারসাম্য হারিয়ে যাওয়া জৈমিন ফের সোজা হয়ে ওঠবার আগেই আততায়ীর শরীর এসে আছড়ে পড়েছিল তাঁর ওপরে। পরমুহূর্তে দুটো পা দিয়ে তাঁর মাথাটাকে চেপে ধরে রেখে বিচিত্র এক কৌশলে তাঁর তলোয়ার ধরা হাতটাকে একপাক ঘুরিয়ে দিয়েছিল সে। মট করে হাড় ভাঙবার মৃদু শব্দ উঠেছিল কেবল। জৈমিনের অবশ হাত থেকে খসে পড়েছিল তার উদ্ধত তলোয়ার। এইবার তাঁকে মাটির ওপর চিৎ করে ফেলে তাঁর বুকে চেপে বসেছিল আততায়ী। তার সুশিক্ষিত নিপুণ হাত যখন জৈমিনের গলা চেপে ধরে তাঁর প্রাণবায়ু একটু একটু করে বের করে দিচ্ছে, তখনও জৈমিন প্রাণপণে বলে চলেছেন, “রক্ষা করো হে মহান দোরাদাবু… রক্ষা করো হে মহান সন্তানগোলক…”
শুনে তাঁর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়া মুখটা বলে উঠেছিল, “যতোই প্রার্থনা করো জৈমিন, কেউ আসবে না। মুরালের পুত্র মাণ্ডুপকে চিনতে পারো তুমি? জেনে রেখো, আজ তোমার মৃত্যু দিয়ে আমার প্রতিশোধের সূচনা। আমার মায়ের স্মৃতিতর্পনের শুরু…”
জৈমিন অবশ্য ততক্ষণে সব ভালোমন্দের ঊর্ধ্বে। মান্ডুপের শরীরের নীচে ধড়ফড় করতে থাকা শরীরটা তার ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছিল…
***
“এই শরীরটাকে নিয়ে কী করবে মান্ডুপ?”
কৌতূহলী চোখে মাণ্ডুপের দিকে দেখতে দেখতেই এবারে প্রশ্ন করলেন আহুম। তিনি বুদ্ধিমান। চোখের সামনে হত্যাকাণ্ডটা দেখবার পর তিনি একটা ধাঁধার মুখোমুখি হয়েছেন। সন্তানগোলক তো তাঁর রাজত্বসীমার প্রতিটি বাসিন্দার মনের খবর জানতে পান। কিন্তু সেক্ষেত্রে তিনি তাঁর প্রধান পুরোহিত তথা সেনাপতির এহেন হত্যাকান্ডটা ঘটতে দিলেন কেন?
এর দুটো সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আসছিল তাঁর মনে। এক- গোলকদেবতার মনোনিয়ন্ত্রণের কোনো প্রতিষেধক মাণ্ডুপের কাছে আছে, যার বলে এ গোলকদেবতার নজর থেকে যেকোনো জায়গাকে অদৃশ্য রাখতে পারে। জৈমিনের হত্যার পরিকল্পনা করবার সময় মাণ্ডুপ তাঁকে এমন একটা ইঙ্গিতও দিয়েছে। কিন্তু সেটা এতই অবাস্তব, যে মাথায় আসবার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে বিদায় করলেন আহুম। কারণ, পুরুষানুক্রমে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, গোলকদেবতারা সর্বশক্তিমান। তাঁদের নজর থেকে কিছুই আড়াল হয় না।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটা তুলনায় সরল ও বিশ্বাসযোগ্য। মহান দোরাদাবু, অথবা কট্টাদিজায় তাঁর প্রতিনিধি সন্তানগোলক- এঁদের কেউ কোনো কারণে জৈমিনকে সরিয়ে দিতে চাইছিলেন; কিন্তু নিজেরা সে হত্যার দায়িত্ব নিতে রাজি হচ্ছিলেন না। তাই ম্হিরিবিজয়ী মান্ডুপের ওপর এই গুপ্তহত্যার দায়িত্ব দেন তাঁরা, ও সে কাজ সম্পূর্ণ করবার জন্য নিম্নশ্রেণীর সেনার ছদ্মবেশে কট্টাদিজায় পাঠান। হয়তো জৈমিন তা জেনে যান। আর জেনে গিয়েই ক্ষিপ্ত হয়ে মান্ডুপের সর্বস্ব অপহরণ করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেবার চক্রান্ত করেছিলেন তিনি। তবে শেষমেষ তার শৌর্য ও বুদ্ধিমত্তার সামনে পরাভূত হয়েছেন কট্টাদিজার প্রধান সেনাপতি তথা মহাপুরোহিত! নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি তিনি।
কথাটা মনে হতে সপ্রশংস দৃষ্টতে মাণ্ডুপের দিকে তাকিয়ে দেখলেন আহুম। হোক বন্যনারীর গর্ভজাত, কিন্তু বণিকের রক্ত বইছে এর শরীরে। ইন্দাতীরের সমগ্র বণিককূলের উচিত একে নিয়ে গর্ব করা। এর অনুগত থাকলে গোলকদেবতার কৃপা আরও বেশি করে বর্ষিত হতে পারে তাঁর ওপরেও…
জৈমিনের নিথর শরীরটার অন্যপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে মাণ্ডুপও তখন গভীর চিন্তায় ডুবে আছে। জন্মসূত্রে বণিক-সন্তান হলেও, কর্মসূত্রে সে একজন পেশাদার যোদ্ধা ও সেনাপতি। তার হিসাব বলছিল, যে যুদ্ধ সে আজ শুরু করল, এর পরবর্তী বলি হতে চলেছেন এই আহুম। না। সে মৃত্যু তার হাতে হবে না। কারণ আহুমের কাছে সে কৃতজ্ঞ। তিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে তাকে সাহায্য করেছেন।
কিন্তু তবু, আহুমের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কারণ, সন্তানগোলক অন্তর্যামী। এই মুহূর্তে তিনি জৈমিনের মৃত্যুর খবর পাননি। এই মুহূর্তে এখানে মান্ডুপ বা আহুমের উপস্থিতির কথাও তাঁর অজানা। মান্ডুপের কোমরে বাঁধা চামড়ার থলেতে রাখা জাদু প্রস্তরের অদৃশ্য বর্ম এ ঘরকে ছেয়ে আছে। কিন্তু যে মুহূর্তে সে এখান থেকে সরে যাবে…
…একজন সাধারণ মানুষের চিন্তাপদ্ধতির সঙ্গে একজন পেশাদার যোদ্ধার চিন্তাপদ্ধতির ফারাক থাকে অনেক। বেঁচে থাকাটা যেখানে প্রাত্যহিক দায়, সেখানে বাঁচবার কৌশল খুঁজতে গিয়ে একজন সৈনিক অনেক বেশি আবেগমুক্ত ও যুক্তিবান থাকেন। মাণ্ডুপ জানে আহুমকে সে বাঁচাতে পারবে না। নিজের সঙ্গে তাঁকে রাখতে পারলে, জাদু প্রস্তরের অদৃশ্য বর্ম হয়তো তাঁকেও রক্ষা করতে পারত। কিন্তু এবারে যে পলাতকের জীবন তার শুরু হবে, সে জীবনে বয়স্ক এই বৃদ্ধকে নিয়ে বেশিদিন চলা সম্ভব হবে না।
আগামীকাল সকালে জৈমিনের হত্যাকাণ্ডের খবর চাউর হবার পর সন্তানগোলক সহজেই জানতে পারবেন, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে আহুম এসেছিলেন জৈমিনের কাছে, এবং তাঁর আসবার অব্যবহিত পরেই জৈমিন তাঁর সমস্ত ব্যক্তিগত দেহরক্ষীকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেন। সেক্ষেত্রে আহুমকে বন্দি করিয়ে এনে তার স্মৃতি থেকে তিনি সহজেই হত্যাকারী হিসেবে মাণ্ডুপকে চিহ্নিত করতে পারবেন।
আহুমকে অবশ্য মাণ্ডুপ জাদুপ্রস্তরের কথা বলেনি। শুধু বলেছে, তার কিছু বিশেষ শক্তি আছে যার বলে সে গোলকদেবতাদের চোখে অদৃশ্য থাকতে পারে। কট্টাদিজার সন্তানদেবতা এর অর্থ বুঝবেন না। কোনো সন্তানগোলকই বুঝবেন না তা। কারণ মাণ্ডুপের জাদুপ্রস্তর সঙ্গে করে আনবার খবর একমাত্র দোরাদাবু জানেন, এবং তিনি নিজেই তার কথা বাইরের জগতে প্রচার করতে নিষেধ করেছেন মান্ডুপকে।
কিন্তু বিষয়টা দোরাদাবুর কাছে পৌঁছোলে তিনি তা ঠিকই বুঝবেন। সেক্ষেত্রে, তাঁর বা যেকোনো সন্তানগোলকের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা একজন বিদ্রোহী… যে কিনা প্রয়োজনে অক্লেশে একটা শহরের মহাপুরোহিতকে খুন করে অক্ষতদেহে বেরিয়ে যেতে পারে, সে দোরাদাবুর দৃষ্টিতে একজন বিপজ্জনক শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হবে। এক কথায় ইন্দাতীরে গোলকদেবতার সম্পূর্ণ সাম্রাজ্য এরপর তাকে খুঁজতে শুরু করবে একসঙ্গে। এতে প্রথমেই আক্রান্ত হবে তার পরিবার।
পরিবার! হাঃ! বৈক্লন্য! সন্তানের চোখের সামনে তার মায়ের মুণ্ডচ্ছেদ করা এক নরপিশাচ। এক সৈনিক আরেক সৈনিককে যুদ্ধে পরাস্ত করে তার ধনসম্পদ লুণ্ঠন করে। সেটা ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু একজন অসহায় মহিলাকে খুন করে তাঁর সন্তানকে লুণ্ঠন করা? সেই সন্তানকে নিজের আসল পরিচয় ভুলিয়ে দিয়ে নকল পরিচয়ে বড়ো করে তোলা? এ অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত তাকে করতে হবে। না। মান্ডুপ নয়, মাণ্ডুপের পিতা সাজবার অপরাধে এবার গোলকদেবতার অভিশাপের আগুন নেমে আসবে বৈক্লন্যের ও তার পরিবারের ওপরে। আসুক। বুকের মধ্যে জ্বলতে থাকা আগুনটায় বৈক্লন্যের সেই আসন্ন সর্বনাশের ছবি যেন ঘৃতাহুতি দিচ্ছিল তার।
আর তারপর, একসময় সে আগুন নিভে এল। সেখানে তখন আরো একটা মুখ ভেসে উঠেছে। একটা নিষ্পাপ মুখ। ইস্কা… তার ইস্কা…
নাঃ। এখনও তাদের সম্পর্কের কথা বাইরের জগত জানে না। ফলে এখনও ইস্কা নিরাপদেই থাকবে। কিন্তু কতদিন? কতদিন সে খবর গোপন রাখা যাবে মনরাক্ষসের কবল থেকে?
কথাটা মনে আসতেই হঠাৎ, মনস্থির করে নিল মান্ডুপ। এরপর সে কোন পথে কোনদিকে যাবে তা আহুম জানেন না। কেউই তা জানে না। কারণ মান্ডুপ নিজেও সে নিয়ে খানিক আগে পর্যন্ত কোনো স্থির সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছোতে পারেনি। তবে এইবার সে মনস্থির করে নিয়েছে।
ঘেরাউন! পশুপালকদলের নেতা ঘেরাউন। হঠাৎ, যেন সুদূর অতীতের আবছায়া থেকে বের হয়ে আসা একটা আধাবন্য মুখ তার দিকে তাকিয়ে ফের একবার বলে ওঠে, “তোমরা, নগরবাসীরা ঐ মনরাক্ষসের দাস হতে পারো। কিন্তু আমরা স্বাধীনচেতা পশুপালকরা তাঁর কৃপায় বাঁচি না সেনানী মাণ্ডুপ। আমাদের মাথায় ছাদ দেয় ওই তারাভরা আকাশ, আমাদের খাদ্য দেয় এই মাটি, আমাদের তৃষ্ণার জল দেয় মহান ইন্দা।”
আমহিরির উত্তর-পশ্চিমে দু’দিনের পথ পার হলে যে বিস্তীর্ণ বন ও পশুচারণক্ষেত্র, সেইখানে তাদের বাস। মনরাক্ষসের অদৃশ্য হাত সেখানে পৌঁছোয় না। হ্যাঁ। সেইখানেই যাবে মাণডুপ। সেইখানে,মুক্ত আকাশের নীচে, মনরাক্ষসের নাগাল থেকে দূরে আশ্রয় নিয়ে কিছুদিন কাটিয়ে তারপর দুজন মিলে লুথিলা বন্দর হয়ে উর দেশ… সেখানে…পণ্ডিত উকালানের বাড়ি। মনরাক্ষসের মরণকাঠির খোঁজ নেবে সে তাঁর কাছে। তারপর একদিন…
তবে উপস্থিত এসব কথা আহুমকে বলা যাবে না। খানিক চুপ করে থেকে সে ফের যখন কথা বলল, ততক্ষণে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো তার মাথায় সেজে উঠেছে।
“উপস্থিত এই মৃতদেহ এখানেই পড়ে থাকবে। আর, আপনি আমার সঙ্গে চলুন আহুম। এখানে আপনি নিরাপদ নন।”
“তোমার সঙ্গে… এই শহর, আমার পরিবার, কাজ, এই সবকিছু ফেলে…”
মাণ্ডুপ মৃদু হাসল, “মনরাক্ষসের নজর এড়িয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটাবার ক্ষমতা আমার আছে। আমার সঙ্গে থাকবার ফলে আপনিও উপস্থিত তার আওতার বাইরে। আমার সঙ্গে গেলে এখান থেকে নিরাপদে বের হয়ে যেতে পারবেন আপনি আহুম। কিন্তু, আমার সঙ্গে না থাকলে…”
বাকি কথাগুলো আর তার বলবার দরকার ছিল না। আহুম নিজেই তা বুঝতে পারছিলেন। আজ রাত্রে তিনি যে জৈমিনের কক্ষে এসেছিলেন এ খবর সকলেই জানে। কাজেই কাল সকালে প্রথম সন্দেহটা তাঁর ওপরেই আসবে। এরপর দোরাদাবু তার মনে একঝলক দৃষ্টি ফেললেইকোনোকিছুই আর গোপন থাকবে না তাঁর কাছে। তখন…
“তবে তাই হোক।” বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন আহুম। পা দুটো সামান্য কাঁপছিল তাঁর। এই একটি রাতের অভিজ্ঞতা হঠাৎ করেই যেন তাঁর বয়স অন্তত দশ বছর বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাতের অন্ধকার তাঁদের আড়াল দিয়েছিল। নির্জন বাড়ির সেই কক্ষ ছেড়ে দুটি ছায়ার মত দুজন মানুষ বের হয়ে এলেন বাড়ির বাইরে। তারপর নিঃশব্দ পায়ে মিশে গেলেন শহরের পথে। পাহাড় ঘিরে পাকদণ্ডি পথ। সেই পথ ধরে ধীরে ধীরে তাঁরা নেমে চলেন ইন্দা নদীর তীর লক্ষ করে।
অবশেষে একসময় পাহাড় শেষ হল। এইবার নদীতীর ধরে যাত্রা। আগে আগে হেঁটে চলে মাণ্ডুপ। রাত্রির অন্ধকারে শ্বাপদের মতই নির্ভয় ও নিশ্চিত পদক্ষেপ তার। তাকে অনুসরণ করে হেঁটে চলেন বৃদ্ধ আহুম। কোন পথে চলেছেন, কোথায় চলেছেন তা তাঁর জানা নেই। আজকের একটি রাত তাঁর জীবনকে বদলে দিয়েছে অনেকটাই।
পুবের আকাশে যখন প্রথম আলোর ইশারা জেগেছে তখন মাণ্ডুপ থামল। এ চত্বরের নদীতীর ও সেখানকার অরণ্য নিয়ে অনেক পুরোনো স্মৃতিই তার ফিরে এসেছে এখন। শৈশবের ঘুমিয়ে পড়া স্মৃতিরা! বন্ধুদের সঙ্গে ইন্দার বুকে ঝাঁপাই, তার জলে ভেসে শহর ছেড়ে দূরদূরান্তে চলে যাওয়া। তার পাড়ে, নির্জন অরণ্যের বুক দিয়ে কত না ছোটো ছোটো জলধারা এসে ইন্দায় মেশে। এমনই একটা ধারা, তার তীরে একসময় তাদের বিশ্রামস্থল ছিল। সেইখানে ফাঁদ পেতে ধরা ছোটো ছোটো শিকার পুড়িয়ে বনভোজন, পাশ দিয়ে ভেসে চলা বাণিজ্যের বহিত্রদের হাওয়ায় ফুলে ওঠা পাল… কত না দূরদেশে চলে যায় তারা…
“ও মাঝি কোথা যাও?” কিশোর গলায় সেই ডাক ভেসে যেত ইন্দা-র বাতাসে। কখনো বা জবাব ভেসে আসত অদেখা মাঝিদের গলা থেকে… “চলেছি লুথিলা, চলেছি আমরাহি নগরে, কিম্বা সুদূর উর, তেলমুন্দ বা এমন কত না অজানা নাম…
বাল্যলীলার দিনগুলোর সেই কুঞ্জবনে অবশেষে ফের একবার এসে পৌঁছেছে সে। ছোট্ট জলধারাটি। নামহীন। তার পাশে লতাঝোপের নিবিড় আস্তরণে লুকোনো ছায়াময় জমি। নরম ঘাসের গালিচা বিছানো আছে সেখানে।
বৃদ্ধ আহুম বড়ো ক্লান্ত। লতাবিতানের গভীরে এসে ঘাসের বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়েছেন তিনি। তাঁর পাশে বসে চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখে মাণ্ডুপ। তার শৈশবের খেলাঘর। তবে এযাত্রা সেখানে ফিরে আসায় শৈশবের সে আনন্দ নেই। আছে গভীর উৎকণ্ঠা, আছে পরিণতবুদ্ধি এক যোদ্ধার নীরব পরিকল্পনা।
আহুমের চোখদুটো জুড়ে আসছিল। তাঁর পাশে এসে নীচুগলায় তাঁকে একবার ডাকল মাণ্ডুপ। তিনি চোখ মেলে তাকালে বলল, “এখানে আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদ। উপস্থিত বিশ্রাম করুন। আমি খাবার ও জল সংগ্রহে বের হচ্ছি।”
কথাগুলো আহুম কতটা শুনেছেন তা বোঝা গেল না, কারণ কথা শেষ করে মাণ্ডুপ যখন বাইরে যাবার জন্য রওয়ানা হয়েছে ততক্ষণে নিশ্চিন্ত ঘুমের গভীরে তলিয়ে গিয়েছেন তিনি…
***
তিনটি দিন ও রাত! নির্জন ইন্দাতীর ধরে ক্রমাগত পথ চলেছে তারা দুজন এই সময়টা। গতরাত্রে, ঐতসী নামে এক ছোটো শস্যবন্দরের কাছাকাছি পৌঁছে তারা এই লতাবিতানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল।
ভোর হয়ে আসছিল। লতাবিতান ছেড়ে ইন্দার জলধারার পাশে এসে বসল মাণ্ডুপ। আহুম এখনও নিদ্রিত। বড়ো ক্লান্ত তিনি। সেইসঙ্গে অসুস্থও। এ বয়সে গত তিনদিন ধরে এত পরিশ্রম সহ্য করতে পারেনি তাঁর শরীর। তবু, সেই অসুস্থ শরীর নিয়েও কাল সম্পূর্ণ প্রায় শেষরাত অবধি তিনি জেগেছিলেন মাণ্ডুপের সঙ্গে। এবং, অবশেষে তাঁর পরামর্শে মাণ্ডুপকে সম্মত করিয়ে তবে ঘুমোতে গিয়েছেন তিনি।
আগের দিন রাতে এইখানে পৌঁছে প্রথম যখন মাণ্ডুপকে তিনি কথাগুলো বলেছিলেন তখন মাণ্ডুপ চমকে উঠে বলেছিল, “এ তো সাক্ষাত আত্মহত্যা আহুম। আপনি আমার জন্য…” তারপর আহুমের জ্বরতপ্ত কপালে হাত রেখে বলেছিল, “আপনি অসুস্থ। আপনার মস্তিষ্ক উত্তেজিত। এখন বিশ্রাম করুন। কাল সকালে স্থিরমস্তিষ্কে…”
জবাবে আহুম মাথা নেড়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন, “গত তিনদিন ধরে আমি বিষয়টা নিয়ে ভেবেছি মাণ্ডুপ। ইন্দাতীরে দোরাদাবু ও তার সন্তানগোলকদের যে স্বৈরাচার চলেছে দীর্ঘকাল ধরে, তাকে আমরা বণিকরা মেনে নিয়েছিলাম, এমনকি তার শরিকও হয়েছিলাম, কারণ আমরা জানতাম, এর শক্তিকে প্রতিরোধের কোনো উপায় আমাদের নেই। কিন্তু, তুমি… বণিকপুত্র মাণ্ডুপ, তুমি মাত্রই কয়েকটি দিনের সাহচর্যে এক নতুন আশার আলো দেখিয়েছ আমাকে। কী শক্তি তোমার আছে আমি জানি না। কিন্তু তার বলে স্বয়ং দোরাদাবু ও তার সন্তানের উপস্থিতিকেও অগ্রাহ্য করে কট্টাদিজার প্রধান পুরোহিতকে হত্যা করতে পেরেছ তুমি, লুন্ঠন করতে পেরেছ স্বয়ং ঈশ্বরের ধনাগার। তাই আমার বিশ্বাস, পারলে তুমিই পারবে, ওই মনরাক্ষসের কবল থেকে ইন্দাতীরকে মুক্তি দিতে। এবং, সে কাজে তুমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞও হয়েছ। আমি বৃদ্ধ। অসুস্থ। কতদিনই বা আর বাঁচব! তোমার এই প্রতিজ্ঞাপূরণে আমার তুচ্ছ, অপ্রয়োজনীয় জীবনটা যদি উৎসর্গ করতে পারি তবে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব…”
সূর্য উঠছিল। দূরে ঐতসীর শস্যবন্দরে বহিত্রগুলোকে কুয়াশার মধ্যে থেকে একটু একটু করে চোখে পড়ে এখন। হাতে সময় নেই বেশি। মাণ্ডুপ তাড়াতাড়ি নদীতীর থেকে নরম মাটি জোগাড় করে দ্রুতহাতে একটি মৃৎপট্ট গড়ে নিল। তাদের গায়ে একটুকরো কাঠি দিয়ে দ্রুতহাতে একটা পত্র তৈরি করে নিয়ে, লেখাগুলোর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল সে। পড়তে পড়তে বড়ো অপরাধবোধ হচ্ছিল মাণ্ডুপের। একটা বিষণ্ণতা এসে গ্রাস করছিল তাকে…
প্রিয় পিতা,
আপনার নির্দেশ পালিত হয়েছে। আমি আপনার শত্রু জৈমিনকে হত্যা করেছি। জাদুপ্রস্তরের কল্যাণে এই নগরীর সন্তানগোলককে প্রতারণা করা আমার পক্ষে কঠিন হয়নি। উপস্থিত মঞ্জাদাহির নগরীতে যাব আমি। সেইখানে গোপনে বিদ্রোহের পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকব কয়েকদিন। আপনি নিশ্চিত থাকুন, সন্তানগোলক দূরস্থান স্বয়ং দোরাদাবুর পক্ষেও আমার উপস্থিতি টের পাওয়া সম্ভব নয়। সেখানকার কাজ শেষ হলে আমি উত্তরে মুন্দিগ্র নগরীতে যাব। সেখানকার সেনাবাহিনীতে যোগ দেব। গোলকদেবতার দুর্বলতার যে খবর আমার কাছে আছে তা তাদের জানাব আমি। তারপর একদিন… সেই বাহিনী সঙ্গে নিয়ে…
উপস্থিত আমার বিশ্বস্ত বন্ধু আহুম এই পত্র আপনার কাছে আমহিরিতে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার বন্দোবস্ত আপনার দায়িত্ব থাকল। বিদ্রোহ সফল হলে তিনি উপযুক্ত পুরস্কার পাবেন…
আপনার একান্ত অনুগত
মাণ্ডুপ।
এ পট্টটা আহুম বয়ে নিয়ে যাবেন। তার হিসাব ভুল না হলে এতক্ষণে ইন্দা তীরের প্রত্যেক সন্তানগোলক ও মন্দির কর্তৃপক্ষ জৈমিনের হত্যাকারী হিসাবে তার ও আহুমের সন্ধান শুরু করেছে। মাণ্ডুপের সঙ্গে থাকা জাদুপ্রস্তরের প্রভাব থেকে দূরে যাবার পর, পরবর্তী নগরসীমায় আসবার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর চিন্তাতরঙ্গ সেখানকার সন্তানগোলকের চেতনায় ধরা পড়বে। ফলে ধরা পড়বেন আহুম। আর তারপর গোলকদেবতার বিচারে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত।
কাল রাত্রে যখন আহুম তাকে এই পরামর্শটা প্রথম বললেন, তখন এইখানটায় এসে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল মাণ্ডুপ। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে আহুম তাকে এর সুবিধাগুলো বুঝিয়েছেন। প্রথমত, পট্টে তার গন্তব্য ও পরবর্তী কর্মপদ্ধতি কী লিখবে মাণ্ডুপ, তা সে আহুমকে জানাবে না। আহুমও পট্ট খুলে দেখবেন না। সেইসঙ্গে, তিনি চলে যাবার পর মাণ্ডুপ প্রকৃতপক্ষে কোনদিকে যাবে সে কথাও সে আহুমকে জানাবে না। ফলে, পরিকল্পনাটা সফল হলে মাণ্ডুপের সন্ধানে দোরাদাবু সমস্ত শক্তি নিয়োগ করবেন ভুল দিকে। সেই অবসরে মাণ্ডুপ তার নিজস্ব পথে এগিয়ে যাবে তার অভিষ্টসিদ্ধির উদ্দেশে। এবং সেইসঙ্গে আরো একটি উদ্দেশ্য সাধিত হবে। বৈক্লন্য! তার মায়ের হত্যাকারী, যাকে সে একদিন পিতার সম্মান দিয়েছিল, সেই বৈক্লন্যের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করবে আহুমের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ওই পট্ট!
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে নিজের বিষণ্ণতা ও অপরাধবোধকে দ্রুত কাটিয়ে উঠছিল মাণ্ডুপ। জৈমিনকে হত্যার মাধ্যমে শয়তান গোলকদেবতার বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছে সে, সেই যুদ্ধের প্রথম শহীদ হতে চলেছেন আহুম। নিজের প্রাণ দিয়ে এ যুদ্ধে মাণ্ডুপের সহায়তা করবেন তিনি। বৃহত্তর মঙ্গলের স্বার্থে সৈনিকদের মৃত্যুর পথে যাবার আদেশ দেয়া তো একজন সেনাপতির কাজের অঙ্গ! এতে কোনো পাপ নেই।
খানিক বাদে বনের গভীরে গিয়ে, মাটিতে ছোটো একটা গর্ত খুঁড়ল মাণ্ডুপ। সেখানে কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বেলে তার মধ্যে পট্টটা গুঁজে দিল সে। তারপর গর্তের মাথায় মাটির আবরণ ও হাওয়া চলাচলের ছিদ্রগুলো তৈরি করে দিয়ে সে জায়গা ছেড়ে বনের মধ্যে চলল সে খাদ্যের খোঁজে। ফিরে আসতে আসতে এরা পুড়ে তৈরি হয়ে যাবে। তখন সঙ্গে করে নিয়ে গেলেই হবে’খন।
***
“এইখান থেকে আমাদের পথ ভিন্ন হয়ে যাবে পিতা।”
কথাগুলো বলতে বলতে নীচু হয়ে বৃদ্ধকে অভিবাদন জানাল তরুণটি। তারপর বহিত্রের গায়ে লাগানো কাঠের সিঁড়ি বেয়ে সংলগ্ন জেটিতে নেমে গিয়ে দাঁড়াল।
বহিত্রের নায়ক যেন এই মুহূর্তটির জন্যই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিলেন। তাঁর ইশারায় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সেই শস্যবাহী বিরাটকায় জলযানের মাস্তুলে পাল খাটাবার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। পাশাপাশি ঘাটে বাঁধা আরও পাঁচটি বহিত্রের মাস্তুলেও তখন একে একে ফুলে উঠছে শুভ্রবর্ণ পালগুলি। তাদের টানে নোঙরের বাঁধন ছিঁড়ে জলযানগুলি যেন উড়ে যেতে চায় যেন ইন্দার স্রোত বেয়ে।
রওনা দেবার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সারতে সারতেই জেটিতে দাঁড়ানো তরুণটির দিকে বারে বারে চোখ পড়ে যায় বহিত্রের নায়কের। বণিকের সন্তান বলে নিজের পরিচয় দিয়েছে সে। বলেছে, তার পিতা আমহিরি নগরীতে চলেছেন কোনো ব্যক্তিগত কাজে। শস্যবাহী বহিত্রের এই বহরটি এই ঐতসী শস্যবন্দর থেকে লুথিলা বন্দরে যাবে। সেই যাত্রাপথে আমহিরি নগরী পড়ে। পিতাকে সে অবধি পৌঁছে দেবার অনুরোধ নিয়ে ঐ তরুণ খানিক আগে এসেছিল তাঁর কাছে।
বহিত্রের নায়ক অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী। নৌযাত্রার জন্য ঐতসীর মতো তুচ্ছ এক বন্দরে এসে, ধীরগামী ও স্বাচ্ছন্দ্যবিহীন শস্যবাহী বহিত্রে সওয়ার হতে চাওয়াটা কোনো বণিকের পক্ষে অবাস্তব কাজ। বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন করায় এর কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাও এরা দিতে পারেনি। ছেলেটি নির্লিপ্ত মুখে কেবল বলেছিল, যাত্রী নিতে বহিত্রের নায়ক রাজি থাকলে মূল্য বলুন, নতুবা তারা অন্য কোনো বহিত্রে খোঁজ করবে। অত ব্যাখ্যা দেবার ইচ্ছা তাদের নেই।
অতএব নায়ক অনুমান করেছিলেন এই যাত্রার পেছনে অন্য কোনো রহস্য আছে। কোনো গোপন কারণে বাধ্য হয়ে এই অনামা বন্দরে এসে হাজির হয়েছে এরা। অতএব তিনি মূল্য হিসাবে যে অর্থের দাবি রেখেছিলেন, তা দশজন যাত্রীর আরাপা থেকে লুথিলা অবধি পরিবহন-মূল্যের সমান। কিন্তু এরপর ওই তরুণ বণিকপুত্রের আচরণ তাঁকে স্তম্ভিত করেছিল। এহেন অস্বাভাবিক মূল্যের কথা শুনেও কোনো দরদস্তুর সে করেনি। তার বদলে নিজের পোশাকের ভেতরে রাখা একটা থলি থেকে নীলবর্ণ একটা রত্নখণ্ড বের করে এনে তাঁর হাতে দিয়েছিল সে। অভিজ্ঞ বেণে সে রত্ন হাতে নিয়ে বুঝেছিলেন, একজন যাত্রীর পরিবহনমূল্য তো তুচ্ছ, এই রত্নের মূল্যে তাঁর বহরের কমপক্ষে দুটি বহিত্রকে কিনে নেয়া যায়।
এহেন প্রাপ্তি এরপর তাঁর সমস্ত সন্দেহ ও কৌতূহলকে মুছে দিয়েছিল। তিনি বুঝেছিলেন, এই মানুষদুজন কোনো সাধারণ বেণে নন। ছদ্মবেশে কোনো বড়োমাপের মানুষই হবেন। আর সেইজন্যই নদীতে ভাটা শুরু হয়ে যাবার পর প্রায় কয়েক দণ্ড সময় পেরিয়ে গেলেও, তরুণ ও তার পিতার কথাবার্তা শেষ হবার জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছেন তিনি। একজন মানুষের যাত্রাশুল্ক হিসাবে যারা দুটি শস্যপূর্ণ বহিত্রের সমান মূল্য দিতে পারে, তাদের ইচ্ছাকে সম্মান দেয়া কেবল উচিতই নয়, নিরাপদও বটে। কে জানে, পিতাপুত্রের ছদ্মবেশে এঁরা আদতে দুজন পুরোহিতও হতে পারেন। দোরাদাবু কিংবা তাঁর সন্তানগোলকদের নির্দেশে বিভিন্ন মন্দিরদুর্গের পুরোহিতরা যে পরিচয় গোপন করে ইন্দাতীরের বিভিন্ন স্থানে পর্যটন করে থাকেন সে কথা বেণেমহলে অনেকেরই জানা।
পরিপূর্ণ ভাটা শুরু হয়ে গিয়েছে এবারে। ইন্দার বিপুল জলরাশি কলকল শব্দে ছুটেছে সমুদ্রের উদ্দেশে। অনুকূল হাওয়ায় পাল তুলে তার বুকে মরালগতিতে ভেসে যায় ছটি বহিত্র। তাদের মধ্যে সবচেয়ে সামনের যানটির গলুইয়ের কাছে দাঁড়ানো আহুমকে এখনও চোখে পড়ে। তীরের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছেন তিনি।
কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে রইল মাণ্ডুপ। তারপর জেটি ছেড়ে পথে বের হয়ে এল। শহরের নাম ঐতসী। অবশ্য তাকে শহর বললে প্রকৃত শহরের অবমাননা হয়। কট্টাদিজা থেকে পদব্রজে দুইদিনের পথ দূরে অবস্থিত এই জনপদ আসলে একটা ছোটো বন্দর। বন্দর ছাড়ালে শস্য লেনদেনের বাজার, কর সংগ্রাহকের ইটবাঁধানো ঘর ও শস্য জমা রাখবার কয়েকটি বড়োসড়ো আগার। তার পেছনে আদিগন্ত ছড়িয়ে আছে শস্যক্ষেত্র ও পশুচারণভূমি। সেখানে উৎপাদিত ফসল, পশুমাংস, চামড়া ও পশুলোমের বাণিজ্যের প্রয়োজনে ইন্দা-র কোলে গড়ে উঠেছে এই ছোটো বন্দর। এখানে কোনো সন্তানগোলক বা পুরোহিতের অধিষ্ঠান নেই।
ঐতসীর বাজারে স্থানীয় উৎপাদনের কেনাবেচা চলে চাষী ও বেণেদের মধ্যে। বাজারের একপ্রান্তে করসংগ্রাহকের দফতর। দিনের শেষে ক্রেতা ও বিক্রেতা সকলেই সেখানে এসে, সোনা রূপা ও তামার খণ্ড দিয়ে ক্রয় ও বিক্রয়কর মিটিয়ে দিয়ে যান। প্রতি পূর্ণিমায় নিকটবর্তী কট্টাদিজা নগরী থেকে একজন পুরোহিতের নেতৃত্বে মন্দিরসেনার একটা ছোটো দল এইখানে এসে কর সংগ্রাহকের থেকে সন্তানগোলকের প্রাপ্য কর বুঝে নেয়। তারপর পরবর্তী শস্যবন্দরের দিকে রওয়ানা হয়ে যায় তারা।
ইন্দাতীর ধরে এক নগরী থেকে পরের নগরীর দিকে যেতে গেলে যাত্রাপথে খানিক দূরে দূরেই এহেন একেকটি শস্যবন্দর চোখে পড়বে যাত্রীর। গত বেশ কিছুকাল ধরে এদের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলেছে।
এদের প্রথম সূচনা ঘটেছিল দক্ষিণে চন্দাহীর নগরের থেকে দু’দিনের দূরত্বে থাকা সাইকিরা নামের একটা এলাকায়। সেখানকার চাষিরা ইন্দাতীরে কাঠের বড়ো বড়ো মাচা ও পাটাতন নির্মাণ করেছিল নিজেদের উদ্যোগে। সেখানে তারা ফসল স্তূপাকারে সাজিয়ে রাখত। কয়েকদিন এভাবে চলবার পর বেনেদের নৌবহর একে একে সেখানে এসে ভিড়তে থাকে এবং সেই ফসল কিনে নিয়ে যেতে শুরু করে।
এই ব্যবস্থায় দুর্গম পথ পেরিয়ে শহরে নিয়ে যাবার খরচ বেঁচে যাওয়ায় বাজারদরের চেয়ে অনেক কম দামে চাষিরা তাদের ফসল বিক্রি করতে পারছিল। ফলে দেখতে দেখতে সেখানকার ব্যাবসা ফুলেফেঁপে ওঠে। কিছুদিন বাদে, সাইকিরার অস্থায়ী বন্দরের খবর চন্দাহীরের মন্দিরদুর্গে এসে পৌঁছালে সেখানকার সন্তানগোলকের আদেশে সাইকিরার ফসলব্যবসায়ীদের এবং তাদের সঙ্গে বাণিজ্য করা কিছু বণিককে বন্দি করে চন্দাহীরে নিয়ে আসা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, মন্দিরনগরের এলাকার বাইরে লেনদেন করে তারা গোলকদেবতার প্রাপ্য খাজনা থেকে তাঁকে বঞ্চিত করেছে।
ঈশ্বরবিরোধী কাজের অপরাধে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়াই বিধেয় ছিল বটে। চন্দাহীরের পুরোহিত সংসদের যোদ্ধা পুরোহিতরা সোচ্চারে সে দাবি তুলেও ছিলেন সেখানকার সন্তানগোলকের কাছে; কিন্তু সংসদের বণিক সদস্যরা সে দাবির তীব্র বিরোধিতা করে। বিষয়টা নিয়ে পুরোহিত সংসদ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাওয়ায় বিষয়টা এরপর মঞ্জাদাহিরে খোদ দোরাদাবুর দরবারে পেশ করা হয়। সেখানে আলোচনা চলাকালীন বণিক সদস্যরা তাঁকে হিসেব করে দেখিয়েছিলেন, শুধুমাত্র মন্দিরনগরগুলোর বাজারে বাণিজ্যকে সীমাবদ্ধ রাখবার বদলে উপযুক্ত করের বিনিময়ে এ ধরণের আঞ্চলিক লেনদেনকেন্দ্র গড়ে তুললে তাতে রাজস্বের পরিমাণ অনেকগুণ বাড়বে। ছোটো ছোটো এই শস্যবন্দরগুলোতে কোনো গোলকদেবতার উপস্থিতির দরকারও হবে না। তার বদলে, কাছাকাছি মন্দিরনগর থেকে জায়গাগুলোতে একজন করে কর সংগ্রাহককে পাঠিয়ে দেয়া হোক ও মাসের একদিন মন্দিরনগরের কোনো পুরোহিত সেখানে সসৈন্যে হাজির হয়ে সেই করের অর্থ সংগ্রহ করে আনুক।
পরিকল্পনাটা শেষ অবধি দোরাদাবুর পূর্ণ সম্মতি পায়। এতে মন্দিরসেনার প্রধান তথা দোরাদাবুর প্রধান পুরোহিত বণিকদের ওপরে কূপিত হয়েছিলেন বটে, কিন্তু আগেকার দিনের মতো এই অবাধ্য বণিকদের শাস্তি দেবার কোনো উপায় এখন আর তাঁর হাতে ছিল না। ইদানীং পুরোহিত সংসদে বণিকদের শক্তি বেড়েই চলেছে। খোদ দোরাদাবু অবধি বহুক্ষেত্রেই তাঁদের পরামর্শ মেনে নিচ্ছেন যোদ্ধা পুরোহিতদের বিরুদ্ধে গিয়ে। পুরোনোপন্থীরা আজকাল মাঝেমধ্যেই আক্ষেপ করেন যে শক্তিমান তরবারির জায়গায় নিরীহ দাঁড়িপাল্লা ক্রমশই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ইন্দা নদীর অববাহিকায়। তাঁদের আশঙ্কা, বাহুবলের এহেন অধঃপতন একদিন ইন্দাতীরে ঈশ্বর দোরাদাবুর সাম্রাজ্যের পতনের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
যাই হোক, দোরাদাবুর সম্মতি মেলবার পর, অল্প সময়ের মধ্যেই ইন্দাতীরে এই ধরনের শস্যবন্দর সংখ্যায় বহুগুণ বেড়ে উঠেছে। সুদূর উত্তরে ম্হিরি কিংবা আরাপা নগরী থেকে শুরু করে দক্ষিণে লুথিলা, পশ্চিমে সুতকাগেন্দ্র হতে সুদূর পূর্বে রাখিগ্র সর্বত্রই এদের দেখা মেলে। বিশ তিরিশটা গ্রাম পরপর একটা করে ছোটো বন্দর। বন্দর বলতে নদীর ধার ঘেঁষে নৌকা ভেড়াবার জন্য পাশাপাশি রাখা কয়েকটা চওড়া পাটাতন ও তার কাছ ঘেঁষে একটা ছোটো বাজার। নেহাতই একটি ব্যাবসাকেন্দ্র। সকলেই সেখানে ক্ষণিকের অতিথি; ফলে বন্দরে কে এল, কে গেল তার খোঁজখবর কেউ বিশেষ রাখে না। বন্দরের কর সংগ্রাহক তো রাখেই না, কারণ দিনের শেষে কর বুঝে নেবার সময়টুকু বাদে বাকি দিন ও রাত তার নেশাগ্রস্ত ঝিমুনিতেই কেটে যায়। নেশা করে ঝিমুনো ছাড়া ছাড়া এই জনমানবহীন এলাকায় আর কীই বা করবার থাকে মানুষের!
ঐতসী-র ছোট্ট বাজারের এক কোণে একটি খাবারের দোকান। বন্দর ছেড়ে বের হয়ে সেইখানে সামান্য কিছু খেয়ে নিল মাণ্ডুপ। দোকানের মালকিন তরুণী, রসিকা ও যত্নশীলা। তার নাম আত্রেন। রান্নার হাতটি তার চমৎকার। মাণ্ডুপ তাকে নিজের পরিচয় দিয়েছিল পূর্বদেশের রাখিগ্র দেশের বণিকসন্তান বলে। এখনও সে অবিবাহিত শুনে আত্রেন তার যত্ন-আত্তি বহুগুণ বাড়িয়ে তুলল। সেইসঙ্গে ঐতসীর গুণগানে সে পঞ্চমুখ। বলে, ঐতসীর জমি নাকি গোলকদেবতার আশীর্বাদধন্য। সামান্য কর্ষণেই সে মাটিতে বিপুল ফসল ফলে। মাণ্ডুপ চাইলেই এখানে সে তার জন্য অনেকটা জমির বন্দোবস্ত করে দিতে পারে। মন দিয়ে কৃষিকর্ম করলে অচিরেই সে যে এইখানকার একজন সম্পন্ন কৃষক হয়ে উঠবে তাতে আত্রেনের কোনো সন্দেহ নেই।
তবে ঐতসীর চাষী হয়ে জীবন কাটাবার কোনো ইচ্ছা মাণ্ডুপের ছিল না। অতএব মৃদু হেসে, কোমরবন্ধ থেকে একখণ্ড রৌপ্য বের করে তরুণীর হাতে গুঁজে দিয়ে সে বলল, “এই তোমার ভোজ্যের মূল্য আত্রেন। আমাকে যেতে হবে।”
“তার মানে, ঐতসীতে থাকবে না তুমি বিদেশী?” ভারী হতাশ মুখে মাথা নাড়ল যুবতী, “অন্তত আজকের দিনটা… আমার কাছে…”
মাণ্ডুপ মাথা নাড়ল, “আজ নয় আত্রেন। আজ আমার অন্যত্র কাজ আছে। তবে হ্যাঁ, তোমার নিমন্ত্রণ আমার স্মরণে থাকবে। কখনও প্রয়োজন হলে…”
বলতে বলতেই মনে মনে সামান্য দুঃখ পাচ্ছিল সে। বড়ো আন্তরিক এই নিমন্ত্রণ। বড়ো সরল। তার মুখের দিকে তাকিয়ে কেন যেন আর এক কিশোরীর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল তার। দুখিনী জিত্রান! তাকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিল ম্হিরি নগরীর সেই মেয়ে। আত্রেনের মতোই সে-ও তাকে বাঁধতে চেয়েছিল। আজ সুদূর ম্হিরিতে, গোলকরাক্ষসের দাসী হয়ে কেমন আছে সে দুর্ভাগিনী কে জানে!
তাকে দেখে মুগ্ধ হবার দায়ে আত্রেনেরও সেই একই পরিণতি হোক তা মাণ্ডুপ চায় না। আজ সে একজন পলাতক সৈনিক। এই মুহূর্তে তার অবস্থান জানেন না গোলকদেবতা। কিন্তু আজ হোক কাল হোক সে খবর তাঁর কাছে পৌঁছোবেই। তখন, তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবার অপরাধে আত্রেনকেও যদি তিনি…
বাইরে রোদ ঝাঁ ঝাঁ করছিল। সেদিকে তাকিয়ে সামান্য ইতস্তত করেও হঠাৎ উঠে পড়ল মাণ্ডুপ। তারপর দৃঢ়পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তার ওপর গিয়ে দাঁড়াল। তার পিছু পিছু আত্রেনও বের হয়ে এসেছিল বাইরে। তার হাতদুটো ধরে বলেছিল, “অন্তত তীব্র রোদের সময়টা বাইরে না-ই বা গেলে বিদেশী! রোদের তেজ কমা অবধি আমার কাছে থাকলে নাহয়। আমি তোমার ঘুমোবার জন্য বিছানা পেতে দিই! মাটির পাত্রে তরমুজের রস আছে…”
তার কথাগুলো শেষ হওয়া অবধি অপেক্ষা করল না মাণ্ডুপ। মাথা নীচু করে ঘন রৌদ্রের মধ্যে বড়ো বড়ো পায়ে সে এগিয়ে গেল ইন্দানদীর দিকে। মেয়েটা দুঃখ পাবে এহেন রূঢ় ব্যবহারে। কিন্তু তার থেকে দূরে থাকলে প্রাণে তো বাঁচবে! অভিশপ্ত মানুষ সে। তার সঙ্গ বিষাক্ত। তা মানুষের মৃত্যু ডেকে আনে। দূরে থাকুক আত্রেন। সুখে থাকুক সে।
ইন্দার জলে উত্তপ্ত রুপোর মতো সূর্যের আলো ঝলকায়। খর রৌদ্র মাথায় নিয়ে তার কূলে কুলে হেঁটে যায় মাণ্ডুপ। ইতিমধ্যে, ইন্দাতীরে এক নির্জন এলাকায় পৌঁছে নিজের পোশাক বদলেছে সে। কাঁধ অবধি ছড়ানো চুলে বৃক্ষরস মাখিয়ে তাকে জটায় বদলে নিয়েছে। চলনের ভঙ্গীতেও বদল এনেছে। এই মুহূর্তে তাকে দেখলে এক মাঝবয়সী ভবঘুরে বলে মনে হবে। এর প্রয়োজন ছিল। হাতে তার সময় নেই বেশি। এখান থেকে ভাটার দিকে পরবর্তী মন্দিরনগর হল লোমজাদাহির। আহুমকে নিয়ে যে বাণিজ্যবহর খানিক আগে রওয়ানা হয়েছে তা তিনদিনের মাথায় সেখানে পৌঁছাবে। পৌঁছোনোমাত্র সেখানকার সন্তানগোলকের চেতনায় পলাতক আহুমের অস্তিত্ব ধরা পড়বে। মন্দিরসেনার হাতে বন্দি হবে সে। তার সঙ্গে থাকা চিঠি থেকে মাণ্ডুপের অপরাধের প্রমাণ উদ্ধার করতে দেরি হবে না সেখানকার সন্তানগোলকের।
কথাটা মনে আসতে হঠাৎ সেই রৌদ্রদগ্ধ পথের মাঝখানেই থমকে দাঁড়াল মাণ্ডুপ। তার মানে, আর ঠিক তিনদিনের মাথায় আহুম শহিদ হবেন, বৈক্লন্যকে হত্যা করা হবে এবং মঞ্জাদাহিরে ও সেখান থেকে উত্তরে মুন্দিগ্র নগরীতে যাবার পথের প্রতিটি নগরের সন্তানগোলক একযোগে তার খোঁজ শুরু করবে। আর তখন সে… সকলের অজান্তে…
তবু, বড়ো অস্থির লাগে তার। হয়তো সে এই মুহূর্তে নিরাপদ। তবু, এতবড়ো শক্তিশালী একটা সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একলা… মাত্রই একজন মানুষ সে…
আবার পরমুহূর্তে সে হতাশাকে ছাপিয়ে ওঠে তার বয়সোচিত আশাবাদ ও অহঙ্কার, সে মাণ্ডুপ। যোদ্ধাশ্রেষ্ঠ ম্হিরিবিজয়ী মাণ্ডুপ। তাকে ধরা ততো সহজ হবে না। এমনকি দোর্দোবুরুর পক্ষেও নয়…
বড়ো বড়ো পায়ে সামনে এগিয়ে চলে সে। একদিনের দূরত্বে আরো একটি ছোটো শস্যবন্দর রয়েছে। তার নাম কারিন্তা। সেইখান থেকে নদীপথে ভাটার দিকে যাত্রা শুরু হবে তার। ধীরে ধীরে সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ে। তার সোনালি আলো মেখে নদীতীর ধরে হেঁটে যায় একলা পথিক…
***
“আর একবার আমাকে বলো মুস্তক। আমহিরি নগরীতে নেমে তুমি কী কী করবে?”
মুস্তক সামান্য ভীত চোখে সামনে বসা মানুষটার দিকে দেখল একনজর। মুখ হালকা হাসি, কিন্তু তার চোখের ছুরির মতো ধারালো দৃষ্টি তাকে বিঁধছিল এসে। শস্যবন্দর কারিন্তা-র বাজারটি খানিক বড়ো। সেখানে কৃষিজ ও প্রাণীজ পণ্য ছাড়াও ছোটো ছোটো মনোহারি দ্রব্যের দোকানও রয়েছে। গালা ও ধাতুর কাঁকন, কুন্ডল, কণ্ঠহার, কিংবা পোড়ামাটির বিভিন্ন খেলনা বিক্রি হয় সেখানে। শস্যবন্দরে এসে ভেড়া বহিত্রদের নাবিকরা অনেকেই সেখান থেকে তাদের প্রিয়জনদের জন্য সেইসব উপহার কিনে নিয়ে যায়। তেমনই একটি দোকানের সামনে এই যুবকের সঙ্গে আলাপ হয় মুস্তকের। যুবকটিই নিজে থেকে তার সঙ্গে এসে আলাপ করেছিল। সে-সময় মুস্তক দোকানের একপাশে দাঁড়িয়ে মনোহারী বস্তুগুলোর প্রতি লুব্ধ অথচ অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তার অসহায়ত্বের একটা কারণ ছিল। সেটা সংক্ষেপে এই-
কারিন্তার বাজারে ইদানীং একটা নতুন খেলা চালু হয়েছে। এই খেলায় আরেদিঘে কয়েকটা খোপ খোদাই করা হয় প্রস্তরপট্টের গায়ে। তারপর সেই খোপগুলিতে পোড়ামাটিতে তৈরি দুই সৈন্যদল সাজিয়ে নিয়ে দু’জন প্রতিদ্বন্দ্বী যুদ্ধ করে। সে যুদ্ধের হাজারো কৌশল। আকর্ষণীয় এই যুদ্ধ চলাকালিন যুযুধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর ওপরে বাজি ধরে তাদের ঘিরে দাঁড়ানো দর্শকের দল। খেলা শেষে বিজিতের পক্ষে বাজি ধরা দর্শকরা বিজয়ীর পক্ষে বাজি ধরা দর্শকদের হাতে বাজির মূল্য তুলে দেয়। দুর্ভাগা মুস্তক করিন্তা বন্দরে নেমেই এই সর্বনাশা ক্রীড়ার ফাঁদে ধরা পড়েছিল। উত্তেজিত হয়ে পরপর তিনটি দ্বৈরথে বাজি ধরেছিল সে। এবং সেইসব দ্বৈরথ শেষ হবার পরে খেয়াল করেছিল, দীর্ঘ বাণিজ্যযাত্রায় নৌকার দাঁড়ির কাজ করে যেটুকু রোজগার সে করেছিল তার সবটাই গিয়েছে হারা বাজির দায় মেটাতে।
এরপর মনোহারী দ্রব্যের দোকানের পাশে যখন সে এসে দাঁড়ায় তখন স্ত্রীর জন্য সামান্য একটি গহনা বা পাঁচ বছরের শিশুকন্যার জন্য একটা খেলনা কেনবার সামর্থ্যও আর তার বাকি নেই।
আর এই সময়েই মানুষটা এসে কথা বলেছিল তার সঙ্গে। মুস্তক তাকে এর আগেই একাধিকবার লক্ষ করেছে। পাকানো চেহারা। উলোঝুলো চুলদাড়ি। গায়ে একটা ধুলিধূসরিত আলখাল্লা। তাদের বহিত্র এসে কারিন্তা শস্যবন্দরের ঘাটে যখন লাগল, সেই সময় তার সওদাগরের সঙ্গে কথা বলছিল সে। তারপর তার পিছু পিছু সেই সর্বনেশে খেলার আসরে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল চুপ করে। এবারে সে এসে যেচে তার সঙ্গে আলাপ করায় স্বাভাবিকভাবেই খানিক ভয় পেয়ে গিয়েছিল মুস্তক। সফর চলাকালিন কোনো বন্দরে নেমে জুয়া, নেশা করা বা কোনো অশান্তিতে জড়িয়ে পড়াকে বড়ো কঠোর দৃষ্টিতে দেখেন তার সওদাগর। এই অপরাধে এর আগেও দলের একাধিক কর্মী তাঁর চাবুকের স্বাদ পেয়েছে। নদীর কোনো অরণ্যময় ও জনহীন কূলে নির্বাসনও দেয়া হয়েছে দু’একজনকে। এবারে এই লোকটা তার বাজি হারবার বিষয়টা যদি তাঁর কানে তোলে…
অতএব এরপর ভয়ে ভয়ে লোকটার করা প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়ে গিয়েছে সে। সর্বোতভাবে চেষ্টা করেছে যাতে কোনোমতে সে রুষ্ট না হয় তার প্রতি। কোথায় তার বাড়ি, তার সওদাগর এরপর কোন কোন নগরে বাণিজ্যে চলেছেন এই সমস্ত প্রশ্নেরই সঠিক জবাব দিয়েছে সে। জানিয়েছে, এর পর লোমজাদারো, ইন্দুস, আমহিরি ও চন্দাহীর নগরীতে বাণিজ্য সেরে সওদাগর অহল্লোদিন নগরীতে ফিরবেন। সেইখানেই তাঁর প্রাসাদ। রওনা দেবার পথে বিভিন্ন নগরী থেকে তাঁর বহরের কর্মীদের নিয়োগ করেছিলেন তিনি। ফিরতি পথে একে একে তাদের যার যার বসতিতে নামিয়ে দিতে দিতে যাবেন। তার নিজের যাত্রা শেষ হবে চন্দাহীর নগরীতে। সে শহর থেকে তার নিবাস চির্মাক গ্রাম একবেলার হাঁটাপথ।
প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হতে ভবঘুরে লোকটা মুস্তকের হাতে একটুকরো রূপো তুলে দিলেন। সে রূপোর গায়ে সুদূর ম্হিরির দৈত্যনগরীর সঙ্কেতচিহ্ন খোদাই করা ছিল। তারপর মৃদু হেসে বললেন, “তোমার সুব্যবহারের পুরস্কার। এখন এই দিয়ে স্ত্রী-সন্তানের জন্য কিছু উপহার কিনে নিয়ে যাও।”
এতক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকবার পর এহেন সদয় ব্যবহার পেয়ে চোখে জল এসেছিল নাবিকের। কাঁপা কাঁপা গলায় বলেছিল, জুয়ায় সমস্ত রোজগার খুইয়ে আর উপহার কেনবার অবস্থা তার নেই। যদিও সামান্য, তবু, এই রৌপ্যখণ্ডটুকুকেই সে সফরের রোজগার হিসেবে স্ত্রীর হাতে তুলে দিতে চায়।
এই কথা শুনে যুবক তার কোমরবন্ধ থেকে কয়েকখণ্ড সোনা ও ঘোর লালবর্ণের তিনটি রত্নখণ্ড বের করে এনে হাতের তেলোয় রেখে প্রশ্ন করেছিল, এদের মূল্য তার রোজগারের সমান হবে কি না। জিনিসগুলো দেখে স্তম্ভিত নাবিক বলেছিল, তার সারাজীবনের রোজগার একত্র করলেও এই সম্পদের সমান মূল্য হবে না। শুনে যুবক মৃদু হেসে তাকে বলে, এগুলি সবই তার হতে পারে, তবে সেজন্য নাবিককে একটা কাজ করতে হবে…
“কী হল? বলো?”
অধৈর্য গলায় ফের প্রশ্ন করল লকটা। নাবিক মাথা নাড়ল, “আমার মনে আছে। সওদাগরের অনুমতি নিয়ে চন্দাহীরের বদলে আমহিরি নগরীতে নেমে যাব আমি।”
“কেন নামবে সেই প্রশ্ন করলে কী জবাব দেবে?”
“জবাব দেব, ওইখানে উমারি মহল্লায় আমার মায়ের পৈত্রিক বাড়ি। তাঁদের সঙ্গে দেখা করে তারপর বাড়ি ফিরব আমি।”
“বেশ। তারপর?”
“তারপর আমহিরির প্রধান বাজার অঞ্চলে গিয়ে পুঁতিওয়ালি ইস্কাকে খুঁজে বের করব।”
“তাকে দেখতে কেমন?”
“দীর্ঘাঙ্গী, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা, মাথায় কুঞ্চিত কেশদাম। বামগণ্ডে একটি বাদামি তিল আছে।”
“যদি তাকে খুঁজে না পাও?”
“তাহলে যতক্ষণ তার দেখা না পাই ততক্ষণ সেখানেই অপেক্ষা করব।”
“তারপর তার দেখা পেলে?”
“হাতে ধরা ছোটো ধাতব পেটিকাটি দেখিয়ে নাবিক বলল, “এই পেটিকা তার হাতে দিয়ে বলব, ‘তোমার পাঠানো পুঁতি বিক্রয় করে যা আয় হয়েছে তা, হিরাম নগরীর সৈনিক পদুন্মা আমার হাতে পাঠিয়েছেন।’
“আর?”
“আর বলব, ‘তিনি তোমায় এই মন্ত্রটি প্রত্যহ পাঠ করতে বলেছেন-’
উত্তরে পর্বতমালা আদি-অন্তহীন
পশ্চিমে সাগরে সূর্য প্রত্যহ বিলীন
তার মাঝে পথ বেয়ে…
খানিক বাদে সম্পূর্ণ কবিতাটা পাঠ শেষ হলে মাথা নাড়িয়ে মৃদু হাসল মানুষটা। তারপর বলল, “বেশ। এইবার তোমার পারিশ্রমিক নাও।” বলতে বলতে হাতের মুঠোয় ধরে রাখা মূল্যবান বস্তুগুলো নাবিকের হাতে ঢেলে দিল যুবক। আর তারপর একেবারে হঠাৎ করেই তার গলার স্বর বদলে গেল, “আরো একটা কথা। যে কাজে চলেছ তার গুরুত্ব অপরিসীম। মনে রাখবে, মঞ্জাদাহিরের প্রধান পুরোহিতের আদেশবলে মহান দোরাদাবুর প্রতিনিধি হিসাবে তুমি এ কাজ সম্পন্ন করতে চলেছ।”
বলতে বলতেই এক মুহূর্তের জন্য আলখাল্লার আবরণ খানিক সরিয়ে নিল যুবক। নাবিক সভয়ে লক্ষ করল আলখাল্লার নীচে তার শরীরে মন্দিরসেনার পোশাক ঝলমল করছে।
“ঈশ্বর দোরাদাবুর ইচ্ছায়, সম্পূর্ণ গোপনীয়তায় এই কাজ সম্পন্ন করতে হবে তোমাকে। কাজ শেষ হলে তিলমাত্র সময় সেখানে অপচয় না করে তুমি তোমার বাড়ির দিকে রওয়ানা হবে। যাত্রীবাহী কোনো নৌকায় করে যাবে তুমি। যাত্রাপথে দ্বিতীয় কারো সঙ্গে আমহিরির বিষয়ে কোনো শব্দ উচ্চারণ করবে না। জানবে ঈশ্বর দোরাদাবু সর্বত্রগামী। তাঁর প্রতিটি প্রজার মনকে তিনি পড়তে পারেন। এ আদেশের সামান্যতম লঙ্ঘন হলে…”
“আমি কথা দিলাম। প্রয়োজনে প্রাণ দেব, কিন্তু এ কাজের গোপনীয়তা ভঙ্গ হবে না প্রভু।”
এইবার মৃদু হাসি ছড়িয়ে গেল যুবকের মুখে। মাথা নেড়ে সে বলল, “ধন্য তুমি হে নাবিক। স্বয়ং ঈশ্বরের কাজের অংশ হতে পেরেছ তুমি। এ কাজে সফল হলে ইহলোকে তুমি পাবে অনন্ত সুখ। পরলোকে অনন্ত স্বর্গ। আর ব্যর্থ হলে, কিংবা গোপনীয়তা বজায় রাখতে না পারলে…”
কথাটা শেষ করতে হল না যুবককে। তার আগেই ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তার পায়ের কাছে বসে পড়েছে নাবিক। তার চোখে জল। কাঁদে ও বলে, “আপনি নিশ্চিত থাকুন। ঈশ্বর দোরাদাবুর ইচ্ছা পূর্ণ হবে হে মহান সৈনিক…”
***
ছোট্ট শালতিটি ইন্দার জলে ভাসে। নদীর খরস্রোত তাকে ভাটার দিকে ক্রমাগত ঠেলে নিয়ে যেতে চায়, কিন্তু যুবকের দক্ষ হাত সুকৌশলে তার গলুইয়ের অভিমুখ ধরে রাখে নদীর বিপরীত পাড়ের দিকে। ওইদিকে, আদিগন্ত কৃষিক্ষেত্র ভেদ করে সে এগিয়ে যাবে সটান পশ্চিমমুখে। তারপর, একসময় ইন্দা-র অববাহিকার উর্বর এলাকা শেষ হয়ে নির্জন, ফসলবিহীন আধামরু অঞ্চল শুরু হবে। যখন তাকে খুঁজতে মন্দিরসেনা মঞ্জাদাহির নগরী তোলপাড় করবে, তার সন্ধানে মুন্দিগ্র নগরীতে ছেয়ে যাবে গোলকদেবতার গুপ্তচরের দল, তখন নির্জন মরুপথে নিজের গন্তব্যের দিকে একলা এগিয়ে চলবে সে। তারপর, আমহিরির উত্তরপশ্চিমে ছড়িয়ে থাকা বন্য তৃণভূমির বুকে…
সব ঠিক থাকলে ততদিনে সেখানে পৌঁছে যাবে ইস্কা… তার ইস্কা… প্রিয়তমা…

ওই যে দূরে ভাটির দিকে পাল তুলে এগিয়ে চলেছে বহিত্রের দল, তাদের একটিতে, নিরীহ, প্রায় অদৃশ্য এক তুচ্ছ নাবিকের স্মৃতিতে সওয়ার হয়ে, সবার অলক্ষ্যে ইস্কার পরবর্তী পদক্ষেপের নির্দেশ চলেছে। তাকে পাঠানো মাণ্ডুপের প্রথম চিঠি!
ইস্কা বেণের মেয়ে। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিধর। এই নাবিক যখন তার কাছে পৌঁছোবে, ততদিনে মঞ্জাদাহিরে জৈমিনের হত্যাকাণ্ড ও মাণ্ডুপের পলায়নের খবর তার কাছে পৌঁছে যাবে আশা করা যায়। কাজেই নাবিকের বার্তার অর্থভেদ করতে তার সমস্যা হবে না কোনো। তারপর বাকিটা ঈশ্বরের…”
শব্দটা উচ্চারণ করেই থেমে গেল মাণ্ডুপ। কোন ঈশ্বর? চেতনা হবার থেকে যে দানবকে ঈশ্বর বলে শেখানো হয়েছে তাকে, মনরাক্ষস সেই গোলকদেবতাকে আর ঈশ্বর বলে স্বীকার করে না সে। আজ আর তার কোনো ঈশ্বর নেই। সে একা। যা সে করেছে, যা সে করতে চলেছে তার জন্য সে একা দায়ী। সেই সব কাজের অপরাধ ও কৃতিত্ব তার একার!
কথাগুলো মনে আসতে একটা আশ্চর্য অনুভূতি ছেয়ে যাচ্ছিল সেই যুবকের মনে…
শালতি ইন্দার অন্যপাড়ে এসে ভিড়েছে। নির্জন নদীতীরে জঙ্গলের হালকা আবরণ। তার মধ্যে দিয়ে একা একা চলতে চলতেই একেকবার আকাশের দিকে মাথা তুলে তাকিয়ে দেখে সে। সেখানে রাশি রাশি তারা। সেখানে ঈশ্বর… নেই!
হঠাৎ করেই সেই নির্জন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে হেসে উঠল সেই যুবক। বাপ মা নেই তার। ভরসাস্থল বলতে এক ঈশ্বর ছিলেন। মহান দোরাদাবু। তাঁর কাজে নিজের প্রাণ অবধি দিতে পারত সে একদিন। কিন্তু আজ সেই ঈশ্বরও আর ঈশ্বর নেই, হত্যাকারী এক দানবদেবতা হয়ে গিয়েছেন তিনি মাণ্ডুপের চোখে। ফলে, আর কারো কাছে সাহায্য চাইবার নেই তার। আর কারো কছে সে প্রার্থনা করে বলতে পারবে না, “আমার ইস্কাকে দেখো। তাকে রক্ষা কোরো…”
সে একা!
ক্রমশ