ভারত ভ্রমণ-দীন মহম্মদ-আগের পর্বগুলো

পত্র ২৫
ব্যাবসা কেন্দ্র হিসেবে কোন জায়গার সমৃদ্ধি কী পরিমাণে হয়,এবারে সে কথাই জানাব আপনাকে। জায়গাটা লন্ডনের সাপেক্ষে ২১ডিগ্রি ৩০মিনিট উত্তর অক্ষাংশ আর ৭২ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। গত শতকের মাঝামাঝি হাতে গোনা ব্যবসায়ীদের কর্মস্থল ছিল। তাদেরই কর্মক্ষমতায় ব্যবসার সুবাদে বহু মানুষকে এখানে এসে থাকতে উৎসাহিত করলেন। ফলে শিল্পকলার উন্নতির
সাথে সাথে ব্যাবসা ও জনসংখ্যা দুইই বেড়ে উঠল। কয়েক বছরের মধ্যেই সুরাত সারা পৃথিবীতে অন্যতম বিশিষ্ট শহর হিসেবে গণ্য হয়ে উঠল।
প্রতিরক্ষার কারণে শহরের চারপাশে গড়ে উঠল দেওয়াল ও মিনার। দক্ষিণ পশ্চিমদিকে একখানা দুর্গ যার চার কোণাতে চারটে মিনার ছিল জলপথ ও স্থলপথে শহরে ঢোকার রাস্তাগুলিতে নজরদারি চালানোর জন্য। যদ্দুর জানা আছে শহরে দু লাখ লোক বসবাস করেন। মুঘল দরবার যখন শক্তিশালী ছিল, ছোটো বড়ো যে কোন ধর্মের ব্যবসায়ীরাই ঠাঁই পেতেন এখানে। আর ব্যবসায়ীদের সততাও ছিল তেমনি। টাকার থলেতে মার্কা করে পরিমাণ বলে দেওয়াই যথেষ্ট ছিল, কেউ তা খুলে গুণেগেঁথে নিত না। হিন্দু দেশীয়দের সংখ্যাই বেশি, বিশেষত বানিয়াদের মধ্যে। সারা পৃথিবীতে সকলের মধ্যে সুব্যবসাদার এরা। সততা, নিষ্ঠা, ব্যবহার এবং ব্যবসায়িক আদান প্রদানে এদের জুড়ি মেলা ভার। এদের মধ্যে অত্যধিক আবেগ জাগিয়ে তোলা অসম্ভব, এবং যখন অন্যরা আবেগে জর্জর, এরা চুপটি করে অপেক্ষায় থাকবেন, ততক্ষণ, যতক্ষণ সামনের লোকের ওপর এর প্রভাব কেটে যায়। ফলে বাকিদের তুলনায় যে একটু বাড়তি সুবিধের দিকেই থাকেন এঁরা তা বলাই বাহুল্য।
সুরাতের লাটসাহেব দরবারেই তার প্রশাসনিক কাজকর্ম চালান। ফৌজদারি হোক কিংবা দেওয়ানি, তার দরবারে আনা হলে তৎক্ষণাৎ তার চালান হয়। হিন্দু ও মুসলমান দুই রীতিতেই এখানকার বাড়িগুলি তৈরি। বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উচ্চবর্গীয়দের বাড়িগুলির দরজা। সেগুলো ইচ্ছে করেই এমনভাবে বানানো হয় যেন একদল আক্রমণকারী হামলা করলেো চট করে ঢুকতে না পারে। রোখা যায়। থাকার ঘরগুলো পেছনের দিকে, মহিলাদের একটু বাড়তি সুরক্ষার জন্য। মুর সম্প্রদায়ের লোকেরা, বলতে গেলে বেশ পরশ্রীকাতর, হিংসুটে। তাদের আবার অন্তত একখানা ঘর চাইই চাই, যার মাঝমধ্যিখানে থাকবে একটা ফোয়ারা, যাতে ঘরে বেশ একটা ঠান্ডা ভাব থাকে আর জল পড়ার শব্দে বেশ ভাল ঘুমও হয়। দিওয়ানখানার একদিকে উন্মুক্ত বাগান, সেখানে ঝরনা, ফোয়ারা, আঁকাবাঁকা জলধারা, রঙবেরঙের ফুলের বাগিচা সব মিলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনুপম রচনা। গ্রীষ্মে, শহরের বাইরে বাগানবাড়িতে দলবেঁধে গিয়ে আনন্দ-ফুর্তি – প্রায়শই হয়ে থাকে। জলাশয়ের পাশে, ঠান্ডা ছায়াঘন এলাকায় সেসব বাবুদের বাগানবাড়ি। ইংরেজদেরও বাগানবাড়ি আছে এখানে। কলকারখানার সাহেবদের আরাম করার জন্য।
সুরাতের রাস্তাঘাটগুলি অপরিকল্পিত, আর বাড়ির একতলার ওপর দোতলা, তারপর তিনতলা এমনভাবে বানানো যে একটার ওপর আরেকটা প্রায় হুমড়ি খেয়ে আছে যেন। পাশাপাশি দুটি বাড়ির একেবারে ওপরের তলা দুটো প্রায় গায়ে গায়ে লেগে থাকে। ফলে নিচের রাস্তা প্রায়ান্ধকার, হাওয়াবাতাস চলার অবধি জায়গা নেই। অথচ সুযোগসুবিধের কথা বললে কিন্তু এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সুরাতের চেয়ে ভালো জায়গার কথা আমি ভাবতেই পারি না। সমস্ত জিনিসপত্রের অঢেল জোগান বাজারে, খাদ্যদ্রব্য অত্যন্ত সস্তা, বনমুরগি বা ওই জাতীয় শিকার বেশ ন্যায্য দামেই বাজারে মিলবে। ফলমূল-সবজির কথা তো ছেড়েই দিলাম। প্রাচ্যের অন্যান্য জায়গার মতো, শৌখিন জিনিসও মেলে এখানে। গণস্নানাগারও রয়েছে যাকে বলে গোসলখানা। যেখানে হাত পা ঘসে দেবার মতো নানারকম পরিষেবা পাওয়ার সুযোগও আছে। আগে মালিশ টালিশের রেওয়াজ থাকলেও এখন সেসব নেই। পুরোনো লেখাজোখায় তার উল্লেখ পাওয়া যায় মাত্র।
দাস বা চাকরবাকরদের দিয়ে এমন ম্যাসাজের ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে লিখেছিলেন সেনেকা ( গ্রিক দার্শনিকঃ অনুবাদক) তার চিঠির ছত্রে। “ আমরা কি টানটান হয়ে এলিয়ে শুয়ে থাকব আর আমাদের দাসেরা এসে খালি মালিশ টালিশ করে দেবে, হাত পায়ের আঙুল মটকে দেবে, এই কি বাসনা আমাদের?”
বাস্তবিক যাকে দলাই মলাই করা হয়, তিনি টানটান হয়ে সোফায় বা কৌচে শুয়ে থাকেন, আর তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঘসে দেয়া হয়, হাত পায়ের আঙুল টেনে, মটকে, ঝরঝরে করে তোলা হয়। এতে করে জোড়গুলো নমনীয় হয় শুধু তাইই না, দেহের সংবহনতন্ত্রটাকে আরো সচল করে তোলা হয়। নইলেই গাঁটে গাঁটে তরল জমে যাবার সম্ভাবনা। এই গরমের দেশে, দলাই মলাই করবার সপক্ষে এটাই সবচেয়ে জোরালো যুক্তি।
পত্র ২৬

সুরাতের কাছেই বোম্বাই, দ্বীপশহরই বলা যায় তাকে। সারা পৃথিবীতে এমন চওড়া সমুদ্র-খাড়ির উদাহরণ দুটি নেই। পর্তুগিজ শব্দের অপভ্রংশ বুয়ন বাহিয়া (বুয়ন বাহিয়া মানে ভাল বন্দর অথবা ভালো সমুদ্রঃ অনুবাদক) থেকেই বোম্বে শহরের নাম।* বন্দরটা এত বড়ো যে অসংখ্য জাহাজ নোঙর করে থাকতে পারে। চমৎকার নোঙরের সুবিধে, আর অর্ধবৃত্তাকার আকারের ফলে খোলামুখের দিকে সমুদ্র-বাতাসের ঝাপটা থেকেও ডাঙার আড়াল পাওয়া যায়। দুর্গগুলিও যথারিতী চতুষ্কোন, শক্ত পাথরে তৈরি এবং প্রকৃতপক্ষে সারাটা দ্বীপভূমি জুড়েই ছোটোখাটো এমন দুর্গ দেখা যায়। বোম্বের ইংলিশ চার্চ বেশ পরিচ্ছন্ন ও খোলামেলা; বিশাল জমির ওপর সবুজের মাঝে দাঁড়িয়ে চার্চটি, ভেতরে পায়ে চলার রাস্তা, তার ধার দিয়ে সারিবাঁধা গাছ আর চারপাশে মূলত ইংরেজ অধিবাসীদেরই বাড়িঘর। একতলা বাড়ি সব, রোমান ধাঁচের, বাড়ির সামনে পেছনে একখন্ড করে উঠোন, অফিসঘর আর আউটহাউস। চুন আর পাথর দিয়ে মজবুত করে বানানো, বাইরেটা চুনকাম করা; দেখতে শালীন, কিন্তু সূর্যের আলোয় চোখ ঝলসে যায়। কয়েকজনের বাড়িতে কাচের জানালা লাগানো, শার্সি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বচ্ছ চৌকো করে কাটা ঝিনুকের খোলা দিয়ে বানানো হত যাতে আলোও ঢোকে আবার চোখ ঝলসানো রোদ্দুরের থেকে বাঁচা যায়। সমুদ্রতীর থেকে বেশ খানিকটা ভেতরকার প্রদেশে বেশ কদিনের জন্য হাট বসে, এই নয় কি দশদিন। এখানেই ছোট ছোট চালাঘরে বানিয়ারা
তাদের পসরা নিয়ে বসেন, কিন্তু মাঝে মধ্যে কম্পানির লোকেরা বা দালালেরা অগ্রিম টাকা দিয়ে সেসব জিনিসের বন্দোবস্ত ঢের আগেই করে নেয়। এখানকার মাটির জন্য উপযুক্ত নারকেল, পাম প্রভৃতি গাছই বেশি পরিমাণে চাষ হয়। ধরুন নারকেল গাছ, এর সম্পর্কে অত খুঁটিনাটি তথ্য জানা নেই, কিন্তু যা আমি দেখেছি বা বুঝেছি এর গুণাবলী আর ব্যবহারের জন্য এককথায় অনবদ্য। এই গাছের গুণাগুণ দেখে এর অসাধারণত্বের কথাই মনে জাগে। অর্থকরীভাবেও যথেষ্ট ফলদায়ী আর মানুষের খুবই উপকারী ফল এটা। অনেকটা পাম গাছের মতোই, হতে পারে একই গোত্রের উদ্ভিদ। নারকেলের পাতা ঘর ছাইতে লাগে, ছোবড়া দিয়ে মজবুত, জাহাজ বাঁধার মতো অবধি দড়ি বানানো হয়। শাঁস শুকিয়ে নিয়ে তেল বার করা হয়, যা আবার নানান ব্যবহারে লাগে। শুকনো শাঁসও চালান যায় এদিক সেদিক। এ ছাড়াও আরক, গুড় ইত্যাদি আরও নানানরকম জিনিস নারকেলের শাঁস থেকে তৈরি হয়, সব মনে করে করে লেখাও দুষ্কর। নারকেলচাষ অত্যন্ত সহজ। খাঁড়ি কেটে জল এনে ফেল গাছের গোড়ায়, আর চারধারে সার ছড়িয়ে দাও। সার বলতে মাছের দেহাবশেষ, লোকেরা সাধারণভাবে বাক-শ সার বলে। এখানে ওখানে ছড়ানো ছেটানো আরো পাম গাছের মতো গাছ, বুনো পাম গাছই ধরুন। চলতি কথায় বলে ব্রাব, (পর্তুগীজ শব্দ ব্রাবো থেকে এসেছে, যার মানে বুনো।) বিস্বাদ একধরনের ফল জন্মায় এতে, আকারে ন্যাশপাতির মতো, গাছের একেবারে ডগায় হয়। আর এ থেকে বা বলা ভালো এর রস থেকে যে আরক তৈরি হয়, নারকেল থেকে প্রস্তুত আরকের তুলনায় তা ঢের ভালো। সমুদ্রের পাড়েই সাধারণত এর চাষাবাদ হয়ে থাকে, কেননা বেলেমাটি এর জন্য আদর্শ। এই গাছই বাবুই পাখিরা বেশ পছন্দ করে, আর এর ডালেই বাসা বাঁধে। বাসাগুলি অভিনব, ডালের সরু আঁশ ও ঘাস থেকে তৈরি করা সে সব বাসা অননুকরণীয় সৃষ্টি। পাখিগুলি তিতিরের মতো, তবে না পালকের জন্য, না ভালো শিস দেবার জন্য, বা নিদেন খাবার টেবিলের জন্যও এদের হিসেবে আনা হয় না।
এখানে খুব দেখতে পাবেন, বটগাছ। বিশাল বিশাল, খুব লম্বা, ডুমুরের আরেকটা প্রজাতিই ধরুন। গাছের মূল কান্ড থেকে কিছু কিছু ডাল সোজা জমির সমান্তরালেই বেরোয়, আর তা থেকে বহু ঝুরি নামে। সেগুলি মাটিতে পৌছে শেকড় চারিয়ে দেয়, যেন একেকটা স্তম্ভ, মোটা মোটা ডালগুলির ভার এরাই বহন করে। এর ফলে একটা গাছ থেকে কুড়ি তিরিশটা এরকম ঝুরি নেমে বিস্তীর্ণ এলাকা ছেয়ে ফেলে। বেশ বড়সড়ো এলাকা জুড়েই বিছিয়ে থাকে। প্রায় জনা পাঁচশ লোক তার তলায় অক্লেশেই আশ্রয় নিতে পারে। শুধু বটই নয়, কোনো ভারতীয় গাছই কোনসময়েই একেবারে পাতা ঝরিয়ে ফেলে না। এরা চিরহরিত। বটগাছের তলায় হিন্দুরা যেমন প্রায়শই দেখা যায়, দেবতার মূর্তি স্থাপন করে উৎসব পালন করেন, ফকিরেরাও নানান কেরামতি করেন, নিজেদের স্ব স্ব ধর্ম পালন করে। বিখ্যাত কবি মিলটন তার প্যারাডাইস লস্ট কাব্যে এর একটা সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন-
বটের ফলের নেই তো পরিচিতি
কিন্তু যেমন ভারতবাসী জানি
মালাবার কি দাক্ষিণাত্য ভূমি
হাত বাড়িয়ে থাকাটাই তো রীতি।
লম্বা চওড়া শাখায় ভরা গাছে,
জমির দিকে নামিয়ে দেয়া ঝুরি
সেখান থেকেই ফুটছে দেদার কুঁড়ি
মায়ের মতোই পাখ ছড়িয়ে আছে।
ঝুরিনামা জমির পরে ছায়া
বিছিয়ে দেয়া আকাশতলের মায়া।
——————————————————–
*এ শহরের এখনকার নাম হয়েছে মুম্বই। নতুন নামকরণের উৎস স্থানীয় মুম্বা (মহা অম্বা) দেবীর মন্দির। প্রাচীনতম যে নাম পাওয়া যায় তা হল কাকামুচি এবং গালাজুংকজা। ১৫০৭ সালে সালে লেখা মিরাট ই আহ্মেদি নামের বইতে আলি মহম্মদ একে “মানবাই” নামে ডেকেছেন। আবার ১৫০৮ সালে পোর্তুগিজ লেখক গ্যাসপার করেয়া তাঁর লেনডাস ডা ইন্ডিয়া বইতে একে ডেকেছেন “বোম্বাইম” নামে। (বম বাইম=ভালো ছোটো উপসাগর) ১৫১৬ সালে পোর্তুগিজ পরিব্রাজক দুয়ার্তে বারবোসা থানে আর মুম্বইকে একত্রে টানা-মায়াম্বু নামে অভিহিত করেছিলেন। বোম্বাই আর মুবই এই দুই নামেরই খবর একই সময়ের ইতিহাসে এইভাবে পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘকাল বোম্বে নামটা চালু ছিল। এখন নতুন করে মুম্বই নামটা চালু হয়েছে—সম্পাদক