সাগরিকা রায়ের আগের গল্পগুলোঃ যে কোনও দিন, ওরা ভূত, পুরোহিতমশাই, ছবি তুলতে গিয়ে, নব মন্ডলের গল্প,জিকোর একটি রাত, ভয়ের সন্ধ্যা, বলাইবাবু

তিতুরামকে কি তোমরা চেন? চেন না? আমিও চিনি না। শুধু শুনেছি যে, তিতুরামের নাকি একটা বিরাট বাড়ি আছে! সেই বাড়িতে তিতুরামের, বাবার বাবা, তার বাবা, মা, মায়ের মা, ছোটো পিসি, পিসেমশাই, চার কাকা, চার কাকিমা, তাঁদের এন্তার ছেলেপুলে, রূপাদা, দেওঘরের বাবাজি, জ্যাঠামশাই, জেঠিমা, ত্রিবেণীদা…কে নেই! তিতুরাম ঠাকুমার পুরনো কাঁথাখানা, সর্ষে-বালিশ সব বেশ করে গুছিয়ে রেখেছে। আর ঠাকুর্দার লাঠি, বেতের টুপি, খড়ম…সবই টুকটুক করে রেখে দিয়েছে।
তো কী হল, একদিন তিতুরাম সকাল সকাল রান্না করবে ভেবে রান্নাঘরে ঢুকেছে। দেখে ছোটোমাসির বড়ো ছেলে একটা বাটিতে দুটো শুকনো মুড়ি নিয়ে খাচ্ছে। বাটিতে দুধ নেই, কাঁঠাল নেই, মায় এক টুকরো আম পর্যন্ত নেই! এসব দুঃখ চোখে দেখা যায়?
তিতুরাম বলল, “শোন, বাটি নিয়ে আয় দেখে আমার সঙ্গে বাগানে। নিশ্চয় আম পেকেছে। খুব গন্ধ আসছিল সিঁদুরে আম গাছ থেকে। চল দেখি।”
দুজনে বাগানে গিয়েছে। সেখানে আমলকি তলায় বসে একটা সাধুবাবা ধুনি জ্বালিয়ে ধ্যান করছে দেখে তিতু বড্ড অবাক হয়ে গেল, “এই সাধুবাবা! এই বাগানে ঢুকলে কী করে?”
সাধু বলল, “বাবা তিতু তোমার এত বড়ো বাড়ি আছে শুনেছি। দেখিনি এযাবতকাল। তাই দেখতে আসা। তা বাবা, বাড়িটা কোথায় রেখেছ?”
তিতু একটু লজ্জা পেল। তার বাড়ি আছে, কিন্তু, সাধুর একটা থাকার জায়গা নেই? তাঁকে এই খোলা আকাশের নীচে বসে ধ্যান করতে হচ্ছে? ছি, ছি, তিতুর বড়ো পিসি দেখলে কী বলতো?
তিতু বলল, “বাড়ি দেখাবো। তার আগে দুটো আম খেয়ে নাও।” বলে সিঁদুরে আমগাছ থেকে বাঁশ দিয়ে খুঁচিয়ে বেশ কয়েকটা আম পেড়ে নিল তিতুরাম। সাধুকে দুটো, মাসির ছেলেকে দুটো দিয়ে বাকি আম নিয়ে ঘরে গেল সে।
এদিকে আম খেয়ে সাধুর আনন্দ দেখে কে! সে বলল, “ওঃ তিতু, একটা কথা বলি? আমি গয়েরকাটা দিয়ে আসছিলাম বাসে করে, তখন ধূপগুড়ি থেকে ভূতেশ্বর বাবুর নাতি ভূপতি উঠল বাসে। সে আমাকে দেখে বলল, “সাধুবাবা, ইদানিং হাফপ্যান্ট পরা ছ’টা ছেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা দিনের বেলায় ঘুরে দেখছে, কার বাড়ির গেট কোনদিকে। ক’জন লোক আছে। বাড়িতে, কুকুর আছে কিনা। রাত হলে তারা এসে ঢুকছে বাড়ির ভিতরে। লুটপাট করে চলে যাচ্ছে।”
“এসব আমাকে বলছেন কেন বাবা?” তিতু হাতজোড় করে।
“শোনো শোনো, তোমাকে বলছি, কারণ ওই হাফপেন্টুলরা বলাবলি করছিল, এই বাড়িতে তারা এসে উঠবে। সব চেছেঁপুছে নিয়ে যাবে। তারা তোমার নামই বলছিল বাবা। তুমি তেমন মনে করলে আগে থেকেই সাবধান হতে পারবে, ঠিক কিনা?”
তিতু সন্দেহভরা চোখে বলল, “হুমম, সাধুবাবা, এসব কথা আগে বললে না কেন?”
সাধু হেসে বলেন, “তুমি মানুষ কেমন, সেটা না জেনে কী করে উপকার করি? এখন অসুবিধে নেই অবিশ্যি, তাই সব জানিয়ে দিলাম। তুমি সদর দরজায় একখান তালা লাগিয়ে দাও বেশ করে। আসলে তিতুর বাড়িতে তিতুকে মান্যি করব না, তা কী করে হয়?”
তিতু এইসব কথাতে বেশ খুশি হয়ে গেল। বলল, “সাধুবাবা, দুপুরে দুটো ভাত খেয়ে যেও। আমার মা আর শিবনাথবাবু আজ রান্না করবে। কুমড়োর ছক্কা, তেঁতুলের চাটনি দই হবে শেষ পাতে। পায়েসও।”
সাধু খুশি মনে গুনগুন করে গান গাইতে লাগল আর ভাবতে লাগল, তাহলে তিতুরামের বাড়িতে আজ যাবো। ওর বাড়িও দেখতে পাবো!”
এদিকে দুটো চোর বাগানের কোণের তালগাছের পিছনে লুকিয়ে সব শুনেছে। তারা তো মহা খুশি। তিতুর বাড়ি দেখা যাবে আর বড়ো বাড়িতে না জানি কত ধন রত্ন পাওয়া যাবে।
তিতুর কাকা পাকা দত্ত বসে হারমোনিয়াম বাজাচ্ছিল। কিছুতেই সা আসছে না গলায়। সে রেগে আছে। এমন সময় তিতু গিয়ে সাধুর কথা পাকাকে বলেছে। চোর আসছে! খুব সাবধান কাকা! দেখতে পেলেই চেঁচাবে প্রাণপণে!
পাকা বলে, “কেন চেঁচাব? আমি গান গাইলে কেউ হাততালি দেয়? আমি চোর ধরে দেব কেন? আমি শীতলা পুজোর সময় যখন গান গাইতে মঞ্চে উঠি, সক্কলে চেঁচিয়ে কেন বলে, “ওঠ, ওঠ!”অথচ আমি কেমন সুন্দর করে প্রাইমারি স্কুলে প্রার্থনা সঙ্গীত গাইতাম, “কাকাতুয়া কাকাতুয়া সোনার জাদুমনি!”মনে নেই কারো? তা মনে থাকবে কেন? তাতে যে উপকার হয় আমার!”
পাকাকে অনেক বুঝিয়েও লাভ হল না। পাকা আরও বলল, “আমার জুতো কিনেছিলাম হরিদাসের ‘সু-দাম’ নামের জুতোর দোকান থেকে। দাম কম, জুতো ভালো। তা, কী হল, সেই জুতো কেনার পরের দিনই চুরি হয়ে গেল। মনে হয় এরাই নিয়েছিল। তারাও হাফপ্যান্ট পরা চোর ছিল।”
“কিন্তু, শুনেছিলাম, সেই জুতো তুমি ফের ফেরত পেয়েছিলে? দারোগা নাকি নিজে সেই জুতো বাড়িতে পৌঁছে দে’ছিল? সত্যি নাকি?”
“ছাই দেছে! একদিন আগের জুতো পরের দিন এক সাইজ কম হয়ে গেছিল! আসলে সারারাত চোর দুটো জুতোটা পরে ঘুরে বেড়িয়েছে কিনা! রং-টাও পালটে গেছিল! মীরাদির ক্লাস ফ্রেন্ড ওই দারোগার কি বুদ্ধি আছে? মীরাদি নিজে বলেছে, দারোগা নাকি ক্লাস থ্রিতে ‘আপাদমস্তক’ মানে ‘মরামানুষ’ লিখেছিল! তাহলে?”
তিতু ভারি বিপদে পড়ে পাড়ার হিতুমাস্টারের কাছে গেল, “স্যার, যদি বুদ্ধি দেন!”
স্যারেরা সবসময় বুদ্ধি দিতেই চান। বুদ্ধি জমা রাখলে তো বাড়ে না! হিতু মাস্টার বুদ্ধি দিলেন আর তিতু গিয়ে পাকাকে বলল, “এবার থেকে তোমার নাম ‘গানপাত্র’ রাখা হবে। আর মঞ্চে প্রথমেই তোমাকে ডাকা হবে, দেদার হাততালির ব্যবস্থা আমি নিজে করে দেব পাড়ার ছেলেদের বলে। অবশ্য, যদি চোর ধরতে সাহায্য করো।”
পাকা দত্ত ভারি খুশি। সে তালগাছের পিছনে একটা লালনীল শার্ট দেখেই চেঁচাল, “ক্কে ক্কোত্তায় আচো, চোর এয়েচে!”
ব্যস। হাতেনাতে ধরা পড়ে চোরের সে কি কান্না, “আমরা এখনও চুরিই করিনি। বাড়িটাই তো দেখিনি, কোথায় যাব চুরি কত্তে?”
সাধু বাবা বললেন, “এটা ন্যায্য কথা। তিতু হে, তোমার বাড়িটাই তো দেখিনি গো! খেতে যাব কোথায়?”
তিতুরাম একটা কুঁড়েঘরের দিকে দেখিয়ে বলে, “বাড়ি তো ওই! চলো সব ভিতরে। একটু গরম হবে। তবে চারটে জানালা আছে। বেড়ার ঘর কিনা। মেঝেও মাটির। ঠান্ডাই হবে। চলো চলো। তাছাড়া আমাদের কাপড়ের ঝালর দেওয়া এন্তার হাতপাখা আছে। বেশ আরাম হয় ওতে।”
সকলেই খুব অবাক অবাক চোখে সেই কুঁড়ে ঘরের ভিতরে ঢুকেছে। ভিতরে ছোটো ছোটো দুটো ঘর। একটা রান্নাঘর। সেখানে বসে তিতুর মা রান্না করছেন। কেমন সুন্দর পায়েসের গন্ধ আসছে। নাক টেনে সক্কলে গন্ধ নিচ্ছিল। ওদের বেড়াল মেজকুমার একটা প্লেটে করে পায়েস খাচ্ছিল চুক চুক শব্দ করে। সে নাকি অমাবস্যা-পূর্ণিমায় ভাত ছোঁয় না। পায়েস খায়।
এট্টু পরেই তিতুর মা খাওয়ার জায়গা করে দিল। একটা শতরঞ্জিকে লম্বা করে, সরু ভাঁজ করে পেতে দিয়েছে সে। পাশাপাশি বসেছে সাধুবাবা, পাকা দত্ত, তিতুরাম, হিতুমাস্টার, আর দুটো চোরকে ডেকে পাশেই বসিয়েছে তিতু। পাঁচজন খাবে, আর দুজন খিদের মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে? এ হয় নাকি?
খাওয়া দাওয়া হলে ওদের জন্য বারান্দায় দুটো মাদুর পেতে দিয়েছে তিতুর মা। সক্কলে বসে, শুয়ে আরাম করছে।
এমন সময় সাধুবাবা বললেন, “হ্যাঁ হে তিতুরাম? এই তোমার বাড়ি? তাহলে যে লোকে বলে তোমার নাকি বিরাট বাড়ি? কেন বলে?”
তিতু বসে বসে রামায়ণ পড়ছিল। সে সাধুর কথা শুনে খুব এক চোট হেসে নিল। তারপর বলল, “সে কী কথা সাধু বাবা? তুমি আমার বাড়িটাকে বড়ো দেখলে না?”
সাধুবাবা থতমত খেলেন, “মানে এই বাড়ি তো ছোটোই তিতু!”
তিতু হেসে বলে, “এট্টু দাঁড়ান।” বলে সে ঘরের ভিতরে চলে গেল। ফিরে এল যখন, ওর হাতে একটা বড়ো টিনের বাক্স। সেই বাক্সের গায়ে খরগোশ, টুনটুনি পাখির ছবি। বাক্স দেখে সকলের কৌতূহল বড্ড বেড়ে গেছে। যারা শুয়েছিল, তারাও উঠে বসল, “কী আছে বাক্সে তিতু?”
তিতু বাক্স খুলতেই সকলে দেখল, ওতে আছে তিতুর মায়ের ঠাকুমার লক্ষ্মীর পট, কড়ির ঘট, তিতুর মায়ের ছেলেবেলার সর্ষের বালিশ, ছোটো ছোটো জামা সেই কবেকার ছোটো বাচ্চাদের, । যারা এখন বাবা, মা হয়ে আছে তিতুর চারপাশে। দাদুর লাঠি, জ্যাঠাবাবার চশমা, খুড়োমশাইএর কালিকলম, ত্রিবেণীদার কিশলয় বই। আর আছে গ্রুপ ছবি। তাতে কে নেই? তিতুদের যত্তো আত্মীয়, যতো স্বজন, সকলের ছবি আছে। কেউ কেউ আত্মীয় না হয়েও ভালবাসায় রয়ে গেছে ওদের সঙ্গে ছবির মধ্যে।
“এরাই তো আমার বাড়ি সাধুবাবা! এদের নিয়েই তো থাকি!”তিতু ভারি অবাক, “তোমাদের কি আমাদের বাড়িটা ছোটো মনে হয়?”
সাধুবাবা কান ধরে বললেন, “আমার কান ধরে বলছি, আমি ইট কাঠ দিয়ে বড়ো বড়ো বাড়ির কথা আর ভাবব না। বাড়ি তো এটাই রে, যেখানে সব্বাই একসঙ্গে থাকে!”
তিতু হেসে বাক্স গুছিয়ে রেখে দিয়ে এল। এর মধ্যে হিতু মাস্টার বললেন, “আজ থেকে দায়িত্ব পালনের জন্য পাকা দত্তকে ‘গানপাত্র’ উপাধি দেওয়া হল। সে পাড়ার দেখাশোনা করবে। আর দুই চোর পাকা দত্তকে সাহায্য করবে। তার আগে থানায় গিয়ে দোষ স্বীকার করে আসবে। নাকে খত দিয়ে বলবে”আর কখনও পরের দ্রব্যে হাত দেব না। আমরা চোর হবো না। আমরা মানুষ হবো।” ঠিক বলেছি?”
তিতুর বেড়াল মেজকুমার থাবা চাটতে চাটতে হিতু মাস্টারকে সাপোর্ট করল, “ম্যাঁও!”