স্মরণীয় যাঁরা-ডক্টর ক্লারা এ. সোয়েইন-কৃষ্ণা রায়-শরৎ ’২৬

কৃষ্ণা রায়ের অন্যান্য লেখা- দেহের কুশল প্রহরীরা(প্রবন্ধ), শতবর্ষের ওপারে(গল্প), কুটুসের স্বপ্ন(গল্প), ভ্রমণ লেখক ফ্যানি পার্কস

ডক্টর ক্লারা এ. সোয়েইন ভারতের আধুনিক নারী-চিকিৎসার ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। ১৮৭০ সালে তিনি যখন ভারতে আসেন তখন এই দেশে প্রাতিষ্ঠানিক নারী স্বাস্থ্যসেবার কোনও অস্তিত্বই ছিল না। উনিশ শতকের ভারতে নারী স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আমেরিকান মিশনারির পক্ষ থেকে প্রথম যে নারী চিকিৎসক ভারতে আসেন ১৮৭০ সালে এবং উত্তরপ্রদেশের বেরিলি অঞ্চলে অবরোধবাসিনীদের জন্য একটি হাসপাতাল গড়ে তোলেন, তিনি ক্লারা এ. সোয়েইন। সেটিই এশিয়ার প্রথম নারী চিকিৎসার হাসপাতাল। অনেকদিন ধরেই মিশনারি চিকিৎসকেরা লক্ষ করেছিলেন, সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারতের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে পর্দানশিন মেয়েদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবনতিতে কোনও প্রতিকার হয়নি। দিল্লি অঞ্চলে বিশেষভাবে সামাজিক প্রথা মেনে তারা পাবলিক ডিসপেনসারির সুযোগ নিত না। তখনই আমেরিকার মিশনারিরা চাইলেন একজন মহিলা চিকিৎসক ভারতে এসে মেয়েদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিক, মেয়েদের জন্য একটি ডিসপেনসারির পরিচালনা করুক, আর দেশীয় মেয়েদের নার্স হবার ট্রেনিং দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে তুলুক। সেই লক্ষ্যেই ক্লারার ভারতে আসা আর প্রায় কুড়ি বছর ধরে ভারতীয় মেয়েদের স্বাস্থ্য সেবা করা। সেই অর্থে মিশনকে ছাপিয়ে ভারতে আরও বৃহত্তর পরিসরে চিকিৎসার কাজে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন।

জন্মেছিলেন নিউ ইয়র্কের আলমিরা (Elmira) অঞ্চলে ১৮৩৪ সালের ১৮ জুলাই। বাবা জন সোয়েইন, মা ক্ল্যারিসা। সোয়েইন দম্পতির দশটির মধ্যে কনিষ্ঠতম সন্তান এই ক্লারা। যখন তাঁর মাত্র দু-বছর বয়স, পরিবারটি চলে আসে কাসিলে (Castile)। ছোটোবেলা থেকেই ক্লারা বয়সের তুলনায় বেশ পরিপক্ব। তাঁর দুষ্টুমিতে মা ক্ল্যারিসা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তেন। কিন্তু ছোট্টখাট্টো চেহারার এই মেয়েটির বেজায় ব্যক্তিত্ব বাড়ির সবার বেশ পছন্দ ছিল। বেশিরভাগ সময় বাড়ির বাইরে তাঁর বোন হাট্টির সঙ্গে সময় কাটাতেন, ভালোবাসতেন পশুদের। আঘাত পাওয়া রাস্তার কুকুর, বেড়াল, খোঁয়াড়ের মুরগি সবই তাঁর কাছে খুব আদরের; তাদের সাধ্যমতো সেবাযত্ন করে সারিয়ে তুলতেন। পড়াশুনোয় অবশ্য বেশ মন ছিল, খুব বই পড়তে ভালোবাসতেন। এরপর স্কুলের পাঠ শুরু হল গ্রামের রেড স্কুল হাউসে, সময়টা ১৮৪০ সাল। সেখানে তাঁর অন্যান্য ভাইবোনেরাও পড়েছেন।

সোয়েইন পরিবার কাসিলের মেথোডিস্ট–এপিস্কোপ্যাল চার্চে নিয়মিত যেত। ক্লারার এক বোন অ্যান, ১৮৪৩ সালে চোদ্দ বছর বয়সেই চার্চে যোগদান করেন। বোনের সুমধুর ব্যবহার আর ক্রিশ্চানদের ধারাবাহিক আদর্শ, মা আর অ্যানের বাড়িতে প্রতিদিনের আচরণ লক্ষ করে নয় বছরের বালিকা ক্লারা নিজের রুক্ষ ব্যবহার সম্পর্কে প্রথম সচেতন হলেন। তিনি তো মোটেই ক্রিশ্চান নন, এমনকি লক্ষ্মী মেয়েও নন। এক বছর পরে চার্চে গিয়ে কোনও এক মন-আলোড়নকারী উপদেশ শুনে দশ বছরের ক্লারা স্থির করলেন, তিনি নিশ্চিতভাবে একজন ক্রিশ্চান হবেন। সেইমতো তিনি নিজের মতাদর্শে স্থির থেকে ক্রিশ্চান হয়ে চার্চে যোগ দিলেন। নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞা করলেন ক্রিশ্চান মিশনারির আদর্শ গ্রহণ করবেন, যদিও ওই বয়সে জানতেন না এর ফলে তাঁর জন্য কী এমন বিশেষ উত্তেজনাপূর্ণ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে আছে।

১৮৪৮ সালে ক্লারার বোন অ্যান মিচিগানের স্কুলে পড়ানোর চাকরি নিয়ে চলে গেলেন। সেখানে তাঁর কাকিমার কাছে থাকবেন। ক্লারাও দিদিকে অনুসরণ করলেন। কিন্তু ক্লারা যাবার ঠিক পরেই কাকিমা পড়ে গিয়ে গোড়ালির হাড় ভাঙলেন। ক্লারা সানন্দে তাঁর সেবার দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নিলেন পরবর্তী কয়েক মাস ধরে। সেই প্রথম তাঁর চিকিৎসা পরিসেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতা। এই সময়ে অ্যানের বিয়ে হয়ে গেল, ক্লারাও কাসিলে ফিরে এসে ছোটো বাচ্চাদের পড়ানোর কাজ নিলেন। তাছাড়া তাঁদের বিরাট গৃহস্থালির কাজে মাকে সাহায্য করা খুব দরকার।

১৮৫৩ সালে কাসিলের প্রেসবাইটেরিয়ান মিনিস্টার রেভারেন্ড হার্লবার্টের পরিবারে বেশ কয়েকজন টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হলে ক্লারার ডাক পড়ল তাঁদের সেবা করার জন্য। পরিবারের কর্তা রেভারেন্ড হার্লবার্ট এবং দুটি সন্তানের মৃত্যু হল। ক্লারা রেভারেন্ডের শোকগ্রস্ত বিধবা স্ত্রী এবং তাঁর বাকি সন্তানদের কয়েক মাস ধরে সাহায্য করে গেলেন। এরপর শারীরিক এবং মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ক্লারা স্থির করলেন আরও পড়াশুনো করা দরকার। ১৮৫৬ সালে স্থানীয় কাসিলের এক পাবলিক স্কুলে ভরতি হলেন। বয়স তখন বাইশ। পরের বছরেই ক্যানান্ডাইগুয়ায় বসবাসকারী ক্লারার বাবার কাকিমা তাঁকে আমন্ত্রণ করলেন সেখানে এসে থেকে পড়াশুনো করার জন্য। সেখানে অন্টারিও ফিমেল সেমিনারি থেকে সেকেন্ডারি এডুকেশনের পাঠ সমাপ্ত করলেন। তারপর ১৮৫৮ সালে শুরু করলেন স্কুলে পড়ানোর কাজ। কিন্তু মনের ভেতরে ভয়ানক অস্থিরতা, এই শিক্ষকতার পেশা তাঁর জন্য নয়, তাঁকে মেডিক্যাল বিষয়ে কেরিয়ার গড়তে হবে। তিনি তো ইতোমধ্যেই মানুষকে সেবা দেওয়ার মতো কঠিন পরীক্ষায় দু-দু’বার সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। নিশ্চয় তাঁর এই বিষয়ে স্বাভাবিক দক্ষতা আছে, এখন শুধু দরকার আর একটু শিক্ষা আর যোগ্য মানুষের কাছে বাস্তবে এই বিষয়ে হাতে-কলমে কাজ করার অভিজ্ঞতা।

চিকিৎসাবিদ্যায় শিক্ষায় সুযোগ পাওয়ার জন্য সংগ্রাম

উনিশ শতকের মাঝামাঝি ভারতের মতো লন্ডনেও নারীদের চিকিৎসাশাস্ত্র পড়া কঠিন এবং সামাজিকভাবে অপ্রচলিত ছিল। তাই ক্লারাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে অনেক। ক্লারা তখন কাসিলের স্যানাটোরিয়ামের ডাক্তার কর্ডেলিয়া গ্রিনের কাছে আবেদন করলেন তাঁর অধীনে মেডিক্যাল ইন্টার্ণশিপ করার জন্য। ১৮৬৫ সালে তাঁর এই আবেদন গ্রহণ করলেন ডক্টর গ্রিন, তাঁর কঠোর এবং উৎসাহব্যঞ্জক নির্দেশনায় ক্লারা প্রশিক্ষিত হলেন। ডক্টর গ্রিন ক্লারাকে পরামর্শ দিলেন ফিলাডেলফিয়াতে অবস্থিত উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ অফ পেন্সিলভ্যানিয়াতে পড়ার জন্য আবেদন করতে। সেখানে ক্লারার আবেদন গৃহীত হল। সব বাধা পেরিয়ে পেন্সিলভ্যানিয়ার ফিলাডেলফিয়াতে উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ অফ পেন্সিলভ্যানিয়াতে ভরতি হন, যেটি ছিল বিশ্বের প্রথম নারীদের চিকিৎসা সংক্রান্ত কলেজ।

একটি বছর ধরে পাঠ নিয়ে (১৮৬৬-৬৭) কাসিলে ফিরে এসে আর এক বছর ডক্টর গ্রিনের অধীনে তাঁর স্যানাটোরিয়ামে কাজ করলেন। আবার ফিরে গেলেন ফিলাডেলফিয়াতে ১৮৬৮ সালে। মেডিক্যাল কোর্সের সমস্ত পাঠ সমাপ্ত করে ১৮৬৯ সালের ১১ মে ক্লারা সফলভাবে লাভ করেন এম.ডি ডিগ্রি।

ভারতে আসার পটভূমি ও মিশনের আহ্বান

ভারতে জেনানা বা পর্দা প্রথার কারণে নারীরা পুরুষ ডাক্তারদের কাছে চিকিৎসা নিতেন না। প্রসবকালীন জটিলতা ও সাধারণ রোগে বিপুল সংখ্যক নারীর মৃত্যু হত। এই সময়ে নবগঠিত ‘উইমেন্স ফরেন মিশনারি সোসাইটি অফ দ্য মেথডিস্ট-এপিস্কোপাল চার্চ’, বোস্টন, ম্যাসাচুসেটস যোগাযোগ করেছিল মেডিক্যাল স্কুলগুলিতে, উপযুক্তভাবে ক্রিশ্চান মনোভাবাপন্ন মহিলা মেডিক্যাল গ্র্যাজুয়েটের খুব প্রয়োজন ভারতে গিয়ে কাজ করার জন্য। সে-বছরেই অন্তত একজন মহিলা চিকিৎসকের প্রয়োজন। তখন উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজের পক্ষ থেকে ক্লারার নাম প্রস্তাবিত হল। মেথডিস্ট এপিস্কোপাল চার্চের সঙ্গে ক্লারার আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল। উইমেন্স মিশন ফরেন সোসাইটির পক্ষ থেকে মিসেস জে. টি. গ্রেসি ডক্টর ক্লারাকে এই ব্যাপারে অনুরোধ করলেন। এমন একটি প্রস্তাবে বিহ্বল ক্লারা পুরো বিষয়টি বিবেচনার করার জন্য তিন মাস সময় প্রার্থনা করলেন। যতদিন ক্লারা পড়াশুনো করেছিলেন চিকিৎসক হয়ে ওঠার তাগিদে, তখন স্বপ্নেও ভাবেননি এশিয়ার এক ঘন জনবসতিপূর্ণ দেশে তাঁকে প্র্যাক্টিস করতে হবে। কিন্তু তাঁর কাছে চিঠি এল জনৈক মিসেস ডি. ডাব্লু. থমাসের কাছ থেকে, যিনি উত্তর-পূর্ব ভারতের বেরিলিতে তাঁর স্বামীর সঙ্গে একটি বালিকাদের জন্য অনাথ আশ্রম পরিচালনা করেন (মেথডিস্ট মিশনস গার্লস অরফানেজ)। ভারতের মতো দেশে মেয়েরা অসুস্থ হলেও ধর্মীয় এবং সামাজিক কারণে পুরুষ চিকিৎসকের সহায়তা নিতে পারে না। এই মিসেস থমাসই ইতোপূর্বে তাঁর আমেরিকার বন্ধুদের কাছে চিঠি লিখেছিলেন একজন নারী চিকিৎসকের ভারতে খুব প্রয়োজন। ক্লারা তখন মনঃস্থির করে বন্ধুদের জানিয়েছিলেন, এ হল ঈশ্বরের আহ্বান। আমি নিশ্চয় যাব। ক্লারা গ্রহণ করলেন অজানা দেশে কাজ করার চ্যালেঞ্জ।

এরপর শুরু হল ভারতের উদ্দেশে যাত্রা। নিউ ইয়র্ক সিটি অবধি ট্রেনে যাত্রা শুরু করে পরে ইংল্যান্ডের লিভারপুল থেকে জাহাজ ধরলেন ১৮৬৯ সালের ৩ নভেম্বর। জাহাজে সঙ্গী হলেন আর এক মিশনারি নারী, মিস ইসাবেলা থবার্ণ; ভারতে মেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য স্কুল খোলা হবে, তিনি হবেন শিক্ষয়িত্রী। এই যাত্রাপথে এক মজার ঘটনা ঘটেছিল। লন্ডনে আসার পর কাস্টমসের অফিসার ক্লারার বাক্স পরীক্ষা করে একটি নরকঙ্কাল দেখে ভয়ে রক্তশূন্য হয়ে গেলেন। ক্লারা হাসিমুখে জানালেন, তিনি একজন চিকিৎসক। মেডিক্যাল ক্লাশে পড়ানোর জন্য তাঁর এটি দরকার হয়। পরবর্তী জাহাজে গেলেন ইজিপ্টে। প্রাচীন ঐতিহ্যের দেশ, ফ্যারাওদের দেশ দেখে মুগ্ধ হলেন ক্লারা। তারপর সুয়েজ খাল অতিক্রম করে ভারতের বোম্বাই প্রদেশে পৌঁছলেন ২৫ ডিসেম্বর।

ভারতে কর্মজীবন এবং এশিয়ার প্রথম মহিলা হাসপাতালের সূচনা

বোম্বাই থেকে একমাস প্রায় পরে, সাধারণ ট্রেনযোগে, বলদে টানা ট্রেনযোগে, বন্য হিংস্র প্রাণী-সঙ্কুল ঘন জঙ্গলের মধ্যে ঘোড়ার পিঠে সওয়ারি হয়ে, শেষে দেশীয় গাড়ি চেপে ভয়ংকর শ্রমসাধ্য যাত্রা পেরিয়ে ক্লারা পৌঁছলেন তাঁর অন্তিম গন্তব্য ভারতের উত্তরপ্রদেশের বেরিলিতে, ১৮৭০ সালের ২০ জানুয়ারি। সেখানেই তাঁর মূল কর্মক্ষেত্র হবে। আসার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রথম রোগী দেখেন। প্রথম বছরই আড়াই হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেন। রোগীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা করা ছিল তাঁর দৈনন্দিন কাজ। ভারতের এই অপরিচিত বিভীষিকাময় পরিবেশে সেদিনের যুবতী ক্লারা কত যে সাহসের সঙ্গে ক্রিশ্চান মিশনারিদের নির্দেশে সমাজসেবার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, সে-কথা আমাদের এখনও বিস্মিত করে। বেরিলিতে পৌঁছনোর পর ক্লারা এবং ইসাবেলা ভয়ানকভাবে সাংস্কৃতিক অস্বাচ্ছন্দ্যে পড়েছিলেন। ভাষার সঙ্গে অপরিচিতি, নতুন ঘরানার খাদ্যসামগ্রী, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু, সেই সঙ্গে হিন্দু ও মুসলমান নারীদের ধর্মকে কেন্দ্র করে বিচিত্র জটিল আচরণ দুই বিদেশিনীকে বিহ্বল করে দেয়। অনেক কিছু এ-দেশে এসে তাঁকে শিখতে হয়েছে। বেরিলিতে পৌঁছনোর পাঁচদিন পরে ক্লারা তাঁর বোনকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘ইতোমধ্যেই জীবন এখানে আমার কাছে ভিন্ন ধরনের এবং আমি সবকিছুর পরে প্রশংসা করি সেই সমস্ত কিছুর, যা ভালো, যা মহৎ। … এখানে ভারতবর্ষে আমি প্রভুর কাজ করতে এসেছি, … আমি যেমন অনুভব করতে শুরু করেছি, আমার সামনে এখন কী আছে এবং আমার কাজ সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশা কী, যদিও আমার বিশ্বাস আর সাহস প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে।’

মিশনের অবস্থা সেদিনে কেমন ছিল, সে-কথাও চিঠিতে বোনকে জানিয়েছিলেন ক্লারা। দুটি বাড়ি, একটি বড়ো মাঠ, রোদে পোড়া ইটের তৈরি একতলা চমৎকার বাড়ি, প্লাস্টার আর চুনকাম করা, বাইরের দিকে কয়েকটা বারান্দা আছে, সবই বেশ সুন্দর।

আর একটি চিঠিতে ভারতবাসের প্রথম দিকে অবিশ্রান্ত সংগ্রামের কথা লিখেছেন।— ‘আসলে বেরিলির মেয়েরা যেই খবর পেয়েছে, চিকিৎসা পাবার আশায় সবাই ছুটে আসছে। চিকিৎসার কাজের জন্য আমার ডাক প্রতিদিন সংখ্যায় বেড়ে চলেছে এবং প্রতিদিন আমি সকাল-সন্ধে শহরে যাই। নিয়মিতভাবে পনেরোটি মহিলাদের বাড়িতে দেখা করতে যেতাম। ভাষার সমস্যার কারণ থাকলেও দোভাষীর সাহায্য না নিয়ে আমি ওইসব মহিলাদের সঙ্গে কথা বলার ব্যর্থ চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয় এইভাবে চলতে থাকলে এই বছরটি আমার ভারতবাসের জন্য কঠিনতম হয়ে উঠবে। এই দেশ এবং আবহাওয়ায় যে অসুখগুলি হয়, সেই ব্যাপারে আমাকে ভালোভাবে জানতে হবে, আর এর চিকিৎসার জন্য আমায় মনে রাখতে হবে এখানকার মানুষের যাপন প্রক্রিয়া, আর এটি সর্বদাই রোগীর আরোগ্যের জন্য সুবিধাজনক হয় না।’

ভারতের প্রথম নার্সিং ও ফার্মাসি শিক্ষার সূচনা

 

ক্লারা বুঝেছিলেন, ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য শুধু বিদেশি ডাক্তারের চিকিৎসা যথেষ্ট হবে না। তাই বেরিলির একটি বালিকা অনাথ আশ্রমের সতেরো জন ভারতীয় তরুণীকে নিয়ে একটি মেডিক্যাল ক্লাস শুরু করেন। তাদের অ্যানাটমি ফিজিওলজি মেটেরিয়া মেডিকা বা ঔষধবিদ্যা এবং নার্সিং শেখাতে আরম্ভ করেন। ১৮৭৩ সালে ব্রিটিশ সিভিল সার্জনদের একটি বোর্ড এই ছাত্রীদের পরীক্ষা নেয় এবং সবাইকে স্বাধীনভাবে প্রসূতি সেবা ও ওষুধ দেওয়ার সার্টিফিকেট প্রদান করে। এটি ছিল উত্তর ভারতের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সঙ্গে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাবর্ষে(১৮৭০) ছাত্রীদের সঙ্গে ক্লারার ছবি রইল। (উৎস -‘আ গ্লিম্‌প্‌স্‌ অব ইন্ডিয়া- ক্লারা সোয়েইনের পত্রাবলীর কিছু নির্বাচিত চিঠি’)

বেরিলিতে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা

প্রথম বছরের শেষে ক্লারা তেরোশোর বেশি রোগীর আরোগ্যের কাজে সফল হয়েছেন। কিন্তু এটি তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়, যেসব মহিলারা রোগের চিকিৎসার জন্য আসেন, তাঁদের যথাযোগ্য যত্ন দেবার জন্য আরও অনেক বৃহৎ পরিসেবা সরবরাহ করার প্রয়োজন আছে। শুধু স্থানীয় মেয়েদের নার্সিং শিখিয়েও হবে না। দরকার মেয়েদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল তৈরি করা। সেই কারণে ১৮৭১ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি স্থির করলেন মিশনের নিকটবর্তী অঞ্চলে রামপুরের মুসলমান নবাবের কাছে আবেদন করবেন। তার জন্য বেরিলির কমিশনারের সাহায্য নিয়ে নবাবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করাই মনঃস্থির করলেন। মনের ইচ্ছে, নবাবের এস্টেট থেকে এক একর জমি পাওয়া গেলে একটি হাসপাতাল আর একটি ডিসপেন্সারি গড়ে তোলা যায়। খুবই অবাস্তব প্রস্তাব। কোনও নবাবই তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি বিক্রয় করবেন না। কিন্তু ক্লারা সোয়েইন এই ব্যাপারে অনড়। তিনি নবাবের সঙ্গে দেখা করবেনই। শেষ পর্যন্ত ষাট কিলোমিটার রাস্তা অতিকষ্টে পেরিয়ে পৌঁছলেন নবাবের প্রাসাদে। নবাবের প্রধানমন্ত্রীর সহায়তায় রাজপ্রাসাদে এক বিশাল শ্রোতা-দর্শক সমাগমের আয়োজন হল, অরফানেজের মিশনারি দম্পতি মিস্টার এবং মিসেস থমাস আর নবাবি পরিবেশের আদব-কায়দা সম্পর্কে অভিজ্ঞ এক দেশীয় ক্রিশ্চান যুবকের সহযোগে ক্লারা নবাবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। এস্টেটের বিশাল এলাকায় সুরম্য উদ্যান, রাজকীয় হস্তী, নবাবের সুন্দর প্রাসাদ দেখে মুগ্ধ হলেন ক্লারা। খুব সম্মানের সঙ্গেই তাঁরা আপ্যায়িত হলেন। মিস্টার থমাস কম্পিত কণ্ঠে হিন্দিতে নবাবের কাছে রাজকীয় সম্পত্তি থেকে এক একর জমি প্রার্থনা করলেন শুধুমাত্র বেরিলির নারী এবং শিশুদের উপকারের জন্য। তাঁর কথা শেষ হবার আগেই নবাব বলেছিলেন, ‘নিয়ে নিন, আমি আনন্দের সঙ্গে এটি এই কাজের জন্য দিয়ে দিতে চাই।’

প্রকৃতপক্ষে নবাব না চাইতেই মিশনের জন্য উদারভাবে চল্লিশ-বিয়াল্লিশ একর জমি দান করেছিলেন। সেই জমিতে আগে থেকেই তৈরি হওয়া একটি বাগানবাড়ি মেরামত করে একজন মিশনারি এবং তাঁর সহকারীদের আবাস গড়ে তোলা হল। সেই সঙ্গে পরিকল্পনা করা হল, শুধুমাত্র পৃথকভাবে নারীদের চিকিৎসার জন্য তৈরি হবে একটি বড়ো বড়ো ছয় কামরার ডিসপেনসারি, আর ষোলো একর জমির ওপরে ভারতীয় ভাবধারা অনুযায়ী একটি হাসপাতাল। ক্লারার সবসময় মনে হয়েছে, মেয়েরা যেন স্বচ্ছন্দে হাসপাতালে সপরিবারে এসে রোগের চিকিৎসা পরিসেবা পেতে পারে, প্রয়োজনে নিজেদের রান্না করে নিতে পারে। তাদের স্বামীর যেন চিন্তা না হয়, এই বুঝি অন্য এক পুরুষ তার স্ত্রীকে দেখে ফেলল। এর জন্য উইমেন্স ফরেন মিশনারি সোসাইটির কাছে দশ হাজার ডলার প্রার্থনা করা হল ১৮৭২ সালের জানুয়ারিতে। প্রার্থনায় সাড়া মিলল।

পরের বছর ১০ মে, ১৮৭৩, ডিসপেনসারির কাজ শুরু হল। সেখানে রোগী দেখা ছাড়াও একটি অপারেশন করার ঘরও তৈরি হল। ১৮৭৪ সালের ১ জানুয়ারি হাসপাতালের দরজা খুলে গেল হিন্দু, মুসলমান, ক্রিশ্চান ধর্মের আর ভিন্ন ভিন্ন ভাষার নারীদের জন্য। সব ধর্মের মানুষের জন্য পৃথকভাবে থাকার ব্যবস্থা হল। গরিব রোগীরা তাদের সন্তান, বিধবা শাশুড়ি বা বোনকেও নিয়ে আসতে পারত। উঁচু জাতের রোগীরা তাদের পরিবার-ভৃত্য সহযোগে হাজির হত। ১৮৭৬ সালের মধ্যে ক্লারা বছরে গড়ে দু-হাজার রোগীর চিকিৎসা করেছেন হাসপাতালে। আর ডিসপেনসারিতে সেই সংখ্যা বছরে পাঁচ হাজারের বেশি। এত কাজের চাপে ক্লারার স্বাস্থ্য খারাপ হতে লাগল, কিন্তু হাসপাতালের কাজে কোনও ছেদ পড়তে দেননি।

হাসপাতালটি গড়ে উঠল ‘ক্লারা সোয়েইন হাসপাতাল’ নামে। ভারতে তথা সমগ্র এশিয়ায় প্রথম নারীদের জন্য নির্দিষ্ট এক হাসপাতাল। কয়েক বছর ধরে ক্লারা হাজার হাজার রোগী দেখেছেন। বিচিত্র সব ব্যাধিতে তাঁরা আক্রান্ত হতেন। ধনী ঘরের স্ত্রীলোকেরা থাকতেন বিশাল প্রাসাদের নিরালা জেনানা মহলে, তাঁরা কদাচিৎ বাড়ি থেকে বেরোতেন। হিন্দু এবং মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের নারীদের পড়ার অধিকার না থাকায় অন্তঃপুরেই সারাদিন কাটানো মেয়েদের শারীরিক আর মানসিক অবস্থায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যেত। সামাজিকতা বঞ্চিত, বাইরের জগৎ সম্পর্কে নিঃস্পৃহ এইসব নারীদের সার্বিক উন্নতির জন্য ক্লারা ধীরে ধীরে আর সসম্ভ্রমে তাঁদের স্বামীদের সঙ্গে এবং তাঁদের সঙ্গেও কথা বলে জানালেন তাঁর ভাবনার কথা। একটু নতুন পদ্ধতিতে পড়তে শেখা, সূচের কাজ, ব্যায়াম, গৃহস্থালির কাজ ইত্যাদি শেখা, যাতে এইসব নিয়ে ব্যস্ত থেকে তাঁদের স্বাস্থ্যের পূর্ণ বিকাশ হয়। এইভাবেই বেশ কিছু মহিলা তাঁদের শক্তি ফিরে পেলেন, নিজের জীবন নিজেই পরিচালনা করতে শিখলেন। নিজের কাজের ভার ভাগ করে নেওয়ার জন্য ক্লারা বুঝলেন, বেশ কিছু সহকারিণী দরকার। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয় মেয়েদের তিনি ফিজিওলজি আর মেটিরিয়া মেডিকার ওপর ক্লাশ নিতে শুরু করলেন। বিশেষভাবে বেছে নিলেন চোদ্দ জন অনাথ আশ্রমের মেয়ে আর তিনজন বিবাহিত তরুণী। তিন বছরের মধ্যেই তাঁরা ভালোমতো বিষয়গুলি আয়ত্ত করেছিলেন। প্রথম অবস্থায় এই সতেরো জনের মধ্যে তেরো জন ভারতের সিভিল সার্ভিসের ফোর্থ গ্রেড ডক্টরস এক্সামিনেশনে সসম্মানে উত্তীর্ণ হলেন। ১৮৭৩ সালে সেইসব মেয়েরা তারপরেই বেরিলির আশেপাশের অঞ্চলে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য-পরিসেবার কাজে, সাধারণ রোগের চিকিৎসার কাজে যুক্ত হয়ে গেলেন। এঁদের মধ্যে একজন গ্র্যাজুয়েট মহিলা আর তাঁর স্বামী সমাজ-বর্জিত কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত কলোনিতে কাজ করতে গেলেন।

কিন্তু বিদেশে প্রতিকূল আবহাওয়ায়, ভিন্ন সংস্কৃতির মাঝখানে এমন শ্রমসাধ্য কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখে ১৮৭৫ সালের শেষ দিক থেকেই বেশ ক্লান্ত বোধ করছিলেন ক্লারা। তাঁর স্বাস্থ্য ক্রমশ ভেঙে পড়ছিল। বিষয়টি জানার পর মিশনের তরফ থেকে তাঁকে কিছুদিন বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হল। অগত্যা নতুন চিকিৎসকের হাতে দায়িত্বভার দিয়ে ১৮৭৬ সালের মে মাসে স্বদেশে পাড়ি দিলেন। সেখানে আলস্যে দিন কাটাতে তাঁর ভালো লাগত না। ভারতের কাজে যেসব চার্চ সহায়তা দিত, তাদের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতেন, মাঝে মাঝে বোস্টন ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ মেডিসিনের বক্তৃতাগুলি শুনতে যেতেন। অবশেষে ১৮৭৯ সালে ভারতে ফেরার জন্য মন ব্যস্ত হল। সেপ্টেম্বরে ভারতের উদ্দেশে পাড়ি দিয়ে পরের বছরের জানুয়ারিতে বেরিলিতে কাজে যোগ দিলেন।

রাজস্থানের খেতড়ি অঞ্চলে রাজকীয় চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ

বেরিলিতে হাসপাতালে দীর্ঘ পরিশ্রমে অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৮৭৬ সালে সাময়িকভাবে আমেরিকায় ফিরে যান এবং ১৮৮০ সালে ভারতে ফিরে আসেন। ফিরে আসার পাঁচ বছর পর রাজস্থানের খেতড়ির মহারাজা খবর পাঠালেন, তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য একজন লেডি ডাক্তারের প্রয়োজন। সময়টা ছিল ১৮৮৫ সালের মে মাস। প্রচণ্ড দাবদাহের সময়। বেরিলি থেকে তিনশো মাইল লম্বা পথ অতিক্রম করতে হবে প্রথমে ট্রেনে, তারপর চারটি উটে টেনে নিয়ে যাওয়া রথে, এরপরে ঘোড়ার পিঠে, কখনো-বা হাতির পিঠে এবং চূড়ান্ত অবস্থায় দুটি গোরুতে টানা রথে। রাজপ্রাসাদে পৌঁছানোর পর প্রাসাদের বৈভব এবং রাজা অজিত সিং এবং রানি চম্পাবতীর উষ্ণ আমন্ত্রণে মুগ্ধ হলেন ক্লারা। তাঁর চিকিৎসায় রানি খুব তাড়াতাড়ি তাঁর ভগ্নস্বাস্থ্য ফিরে পেলেন। কৃতজ্ঞতাবশত রাজা তাঁকে রাজপ্রাসাদের প্রধান চিকিৎসক বা রাজবৈদ্য হিসেবে দুই বছরের জন্য নিয়োগ করতে চাইলেন। ক্লারার অস্বস্তি হচ্ছিল, কারণ তাহলে তাঁকে মিশনের কাজ, বেরিলির হাসপাতালের কাজ ছেড়ে এখানেই থাকতে হবে। সেই সময় আমেরিকায় এক বন্ধুকে চিঠিতে ক্লারা লিখেছিলেন, আমি যতই প্রার্থনা করছি ততই আমি দেখছি প্রভু এর মধ্যেই রয়েছেন। আর তাই আমি এই অবস্থাটি গ্রহণ করলাম একটাই শর্তে যে তরুণী মহিলাটি আমাকে সাহচর্য দিয়ে চলেছেন, তিনি আমার সঙ্গে থাকবেন আর আমরা দুজনে মিলে মানুষের মধ্যে কাজ করার জন্য যেন অনুমতি পাই, ঠিক যেমন খ্রিস্টান নারীরা অধিকার পেয়ে থাকেন। এই ব্যাপারে মহারাজের কোনও আপত্তি ছিল না আর সে কারণেই ক্লারা চাইলেন একটি মেয়েদের জন্য স্কুল খুলবেন। শুনে রাজা শুধু অনুমতি দিলেন না, তাঁরই ভাবনাকে সফল করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন। এমনকি প্রতিদিনই স্কুলে পড়তে আসা মেয়েদের জন্য এক পাউন্ড করে আটা বরাদ্দ করলেন। তাদের নতুন জামাকাপড় অবধি দিলেন। এই স্কুলে ক্লারা এবং তাঁর সচিব ও সঙ্গী মিস প্যান্নেল (Miss Pannell) শুধুমাত্র ছাত্রীদের পড়াতেন না, ইচ্ছুক ছাত্রীদের ক্রিশ্চান ধর্মশাস্ত্রের পাঠ দিতেন আর প্রার্থনা সংগীত শেখাতেন। রাজার দিক থেকে এই ব্যাপারে কোনও বাধা আসেনি বরং তিনি তাঁর সরকারি নথিপত্রে এই কাজের প্রশংসা করেছিলেন, যেহেতু তাঁর রাজত্বে মেয়েরা লেখাপড়া শিখতে পারছে। ক্লারার জন্য একটি ডিসপেনসারি আর একটি হাসপাতাল অবধি তৈরি করে দিলেন। খেতড়িতে থাকাকালীন ১৮৮৫ থেকে ১৮৮৬ সাল অবধি তিনি রাজপ্রাসাদের পর্দানশিন নারীদের আধুনিক ধারায় চিকিৎসা করেন, ওষুধ দেন। মেয়েদের শিক্ষার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্য ছিল তাদের কুসংস্কার মুক্ত করার চেষ্টা। কঠোর পরিশ্রম করে সেই অঞ্চলের নারী এবং শিশুদের রোগের চিকিৎসা করলেন। তিন বছর খেতড়ির রাজার অনুগ্রহে থাকার পর ১৮৮৮ সালের মার্চে ক্লারা আমেরিকায় ফিরে গেলেন। সংবাদ পেয়েছেন, তাঁর বোন হাট্টি গুরুতর অসুস্থ। সেখানকার দায়িত্ব পালন করে পরের বছরের শেষের দিকে আবার খেতড়িতে ফিরে এলেন। আসলে এই সময় আমেরিকায় আঠারো মাস বসবাস কালে আরামে, ধর্মীয় পরিবেশে থেকে তিনি কিছুটা ব্যস্ত হয়ে ছিলেন ভারতে ফিরে আসার জন্য। যদিও সেখানে তিনি একা, অনেক প্রতিকূল অবস্থায় তাঁকে কাজ করতে হয়। তবু প্রায়ই তাঁর মনে হত, ঈশ্বর চাইছেন তিনি যেন ভারতে এসে আরও কিছু সেবার কাজ করতে পারেন। সেই সময় রানির একটি কন্যাসন্তান জন্মেছে। রাজা এবং রানি দুজনই ক্লারার সঙ্গে স্নেহপূর্ণ, সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখতেন। ১৮৯৩ সালে তাঁদের আর একটি পুত্রসন্তান জন্মাল। এর মধ্যে কেটেছে আট বছর। রাজা এবং রানি দুজনেরই প্রিয়পাত্রী ক্লারা ১৮৯৬ সালে যখন ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে আমেরিকায় ফিরে যেতে চাইলেন, রাজা চাইলেন ক্লারা যেন প্রতিজ্ঞা করেন এক বছর বাদেই আবার এ-দেশে ফিরে আসবেন। সেদিন বাষট্টি বছরের ক্লারা উত্তর দিয়েছিলেন, স্বর্গে যাবার জন্য অনেকদিন আগেই আমি যথেষ্ট বয়স্ক হয়ে গেছি। আসলে তিনি খুব ভদ্রভাবেই রাজাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, ভারতে ফিরে আসার পরিকল্পনা আর নেই। কিন্তু রাজা ছাড়লেন না, বললেন, কিন্তু ভারতবর্ষ তো স্বর্গের খুব কাছে, ঠিক যেমন আমেরিকার কাছে। তাই আপনি এখান থেকেই স্বর্গে চলে যেতে পারেন।

রাজার বহু অনুনয় এবং মিনতি সত্ত্বেও ক্লারা স্বদেশে ফিরে গেলেন ১৮৯৬ সালের মার্চ মাসে। তখন ভেবেছিলেন চিরকালের জন্য ভারত ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এই অঞ্চলে প্রায় দশ বছর কাটিয়েছেন। রাজপ্রাসাদের কাছেই নিজের বাড়ি তৈরি করেছেন। গড়ে তুলেছেন ডিসপেনসারি, যেখানে মেয়েদের চিকিৎসা করতেন, বাইবেল থেকে শিক্ষা দিতেন। অনেক দিনের অনেক স্মৃতি গচ্ছিত রেখে ফিরে যাচ্ছেন স্বদেশে।

শেষ জীবন, সাহিত্য ও অবিনশ্বর স্মৃতি

ভারতে দীর্ঘ ২৭ বছর সফলভাবে চিকিৎসা ও সমাজসেবার কাজ করার পর বয়স ও স্বাস্থ্যগত কারণে ১৮৯৬ সালে স্থায়ীভাবে আমেরিকায় ফিরে যান। কাসিলে ফিরে গিয়ে শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবন যাপন করলেন, নতুন করে বন্ধুত্ব করলেন তাঁর একদা শিক্ষয়িত্রী ড. কর্ডেলিয়া গ্রিনের সঙ্গে এবং অন্যান্য আরও অনেকের সঙ্গে। পরিবারের স্বজন, বন্ধু সবার উৎসাহে আজীবন কুমারী, নিঃসন্তান ক্লারা শুরু করলেন তাঁর ভারতে থাকার সময় লেখা চিঠির একটি সংকলন করতে। কিন্তু তাঁর আবার সৌভাগ্য হল ১৯০৬ সালে ভারতে আরও একবার ফিরে আসার। দ্য মেথডিস্ট এপিস্কোপাল মিশন ভারতে তাদের কাজ শুরু করেছিল ১৮৫৬ সালে, বেরিলিতে। এখন তারা তাদের পঞ্চাশ বছরের সেবাকর্মের জন্য উৎসব উদযাপন করতে চায়। যে হাসপাতালটি ১৮৭৪ সালে ক্লারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটি ততদিনে নিশ্চয় আকারে, কর্মধারায় বহু বিস্তৃত হয়েছে; নিযুক্ত হয়েছেন বহু কর্মচারী, মহিলা চিকিৎসক। অতএব এই অনুষ্ঠানে তাঁকে উপস্থিত থাকতেই হবে। খুব আগ্রহের সঙ্গে কিছু মিশনানি সঙ্গীদের সহযোগে ক্লারা আবার ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। সেখানে পৌঁছে হাসপাতালের উন্নতি দেখে ক্লারার বিস্ময় মানে না। এই হাসপাতাল এবং তাঁর কর্মচারীরা ছিলেন। এই হাসপাতাল হয়ে উঠেছে সেখানকার জনসমাজের একটি অবিচ্ছিন্ন অংশ। ততদিনে কয়েক হাজার মানুষ খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছে, চার্চ গড়ে উঠেছে। প্রায় দেড় বছর বাদে ১৯০৮ সালের মার্চ মাসে বোম্বাই থেকে তিনি যখন ফিরে যাচ্ছেন আমেরিকায়, বুঝেছিলেন, এই তাঁর ভারতে শেষ আসা।

কাসিলে ফিরে গিয়ে তিনি তাঁর বান্ধবী কর্ডেলিয়া গ্রিনের বাড়িতে উঠলেন। ততদিনে কর্ডেলিয়ার মৃত্যুর পরে বাড়ির মালিকানা বদলে গেছে। বাড়ির মালিক ডক্টর মেরি গ্রিনে (Dr. Mary Greene), কর্ডেলিয়ার ভাইঝি, বিশিষ্ট চিকিৎসক এবং নারী অধিকার কর্মী।

সেখানেই তিনি তাঁর গ্রন্থ ‘অ্যা গ্লিম্পস অফ ইন্ডিয়া’-র পাণ্ডুলিপির কাজ শেষ করলেন। প্রকৃতপক্ষে এটি তাঁর ভারত থেকে লেখা বিভিন্ন চিঠির সংকলন এবং ভারতবর্ষের অভিজ্ঞতা। বইটি প্রকাশিত হল ১৯০৯ সালে। এই বই সমকালের ভারতীয় সমাজ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

ক্রমে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে লাগল। ১৯১০ সালের ২৫ ডিসেম্বর ছিয়াত্তর বছর বয়সি ক্লারা প্রয়াত হলেন। কিন্তু মৃত্যুর পরেও তাঁর সারা জীবনের দর্শন, তাঁর আদর্শ, বিশ্বাস বহুবছর ধরে মানুষের মনে প্রভাব ফেলেছিল শুধুমাত্র কাসিলে নয়, সমগ্র আমেরিকায় মেথডিস্ট এপিস্কোপাল উইমেন্স ফর্টিন মিশনারি সোসাইটির মাধ্যমে। ক্লারার নামাঙ্কিত হাসপাতাল এখনও উত্তরপ্রদেশের বেরিলিতে রয়ে গেছে। তার বর্তমান নাম ‘ক্লারা সোয়েইন মিশন হাসপাতাল’। তাঁর দেওয়া সেই হাসপাতালের মূলমন্ত্র প্রবেশপথে খোদিত রয়ে গেছে— ‘হিল দ্য সিক অ্যান্ড প্রিচ দ্য গসপেল।’ বর্তমানে সেখানে এখন শুধু নারীদের নয়, শিশুদের নয়, পুরুষেরও চিকিৎসা করা হয়। আজ থেকে দেড়শো বছর আগে ক্লারা যে পথ দেখিয়েছিলেন, তার ওপর ভিত্তি করে ভারতে নারী চিকিৎসকদের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশ হাসপাতালে এখনও সচল আছে।

কাজের অনন্যতা

অন্যান্য সমসাময়িক বিদেশিনী চিকিৎসকদের তুলনায় তাঁর অগ্রগামী ভূমিকা, কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা এবং চিকিৎসা সেবার কাঠামোগত রূপান্তর বিশিষ্টতা দাবি করে। তিনি ভারতে তথা এশিয়ায় সর্বপ্রথম নারী চিকিৎসক যিনি ব্রিটিশ সরকারের সাহায্য পাননি, নিজস্ব উদ্যোগে বেরিলিতে হাসপাতালের পরিকাঠামো গড়ে তুলেছেন। তাঁর পরে ভারতে এসেছেন ডাক্তার এডিথ পেচি। ততদিনে ভারতে নারী চিকিৎসার একটি প্রাথমিক পরিবেশ তৈরি হয়ে গেছে। ক্লারা কিন্তু শূন্য থেকেই পথ তৈরি করেছিলেন। এছাড়াও অন্যান্য চিকিৎসকদের অনেকেই ব্রিটিশ সরকার বা বিভিন্ন ফান্ডের অধীনে হাসপাতাল তৈরি করেছেন, চাকরি বা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, কিন্তু ক্লারা ব্রিটিশ মেডিক্যাল বোর্ড বা মিশনারি সীমানার মধ্যে থেকে কাজ করেননি। ভারতের রক্ষণশীল সমাজের সঙ্গে দূরত্ব রাখেননি। একজন কট্টর মুসলিম শাসক রামপুরের নবাব এবং একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী রাজা, খেতড়ির রাজা অজিত সিং—উভয়ের মন জয় করতে পেরেছিলেন। কোনও ব্রিটিশ রাজনৈতিক ছাপ ছাড়াই নিজের ব্যক্তিত্ব আর সেবার মাধ্যমে কূটনৈতিকভাবে বিয়াল্লিশ একর জমি সংগ্রহ করেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন প্রথম নার্সিং ও ফার্মেসি শিক্ষার প্রবক্তা। ভারতে নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক মেডিক্যাল শিক্ষার প্রসার হয় ১৮৮০ ও ১৮৯০ এর দশকে। কিন্তু ক্লারা ১৮৭০ সালে ভারতে এসেই বুঝতে পেরেছিলেন, স্থানীয় নারীদের স্বাবলম্বী ও প্রশিক্ষিত না করলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি সম্ভব নয়। ভারতের মাটিতে তিনি প্রথম ভারতের নারীদের অ্যানাটমি ও ফার্মেসি শিখিয়ে সার্টিফিকেট দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ১৮৭৩ ছিল ভারতের নার্সিং ও চিকিৎসায় প্রথম নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রবেশের চিহ্ন। ক্লারার কর্মপদ্ধতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি তাঁর ধর্ম বিষয়ে সহনশীলতা ও সাংস্কৃতিক অভিযোজন করার চেষ্টা। অনেক মিশনারি চিকিৎসক চিকিৎসার চেয়ে ধর্ম প্রচারকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। কিন্তু ক্লারা ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন। রোগীরা যাতে তাঁর ছোঁয়া ওষুধ খেতে ভয় না পায় সেজন্য তিনি রোগীদের সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়ম যেমন গঙ্গাজল দিয়ে ওষুধ খাওয়ার মতন ঘটনাকেও মেনে চলার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন।

কাসিলের সেই একদা ছোট্ট মেয়েটি আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে ভারতবর্ষের মাটিতে তাঁর মানবতাবাদী কাজের ঐতিহ্য রেখে গেছেন। ভারতের নারীদের তিনি যে শুধুমাত্র স্বাস্থ্যের সুরক্ষা দিয়েছেন, তাই সব নয়, বরং তাদের সামনে তুলে ধরেছেন শিক্ষার অধিকার, চিকিৎসা পরিসেবার বৃত্তে লগ্ন থেকে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হবার অধিকার। একাধিক হাসপাতাল আর ডিসপেনসারি তৈরি, স্থানীয় মেয়েদের নার্সিং-বিদ্যায় ট্রেনিং দেওয়া ইত্যাদি কাজে ভারতে কাটিয়ে গেছেন কয়েক দশক। ভারতে নারী চিকিৎসার ইতিহাসে তাঁর অবদান কি ভোলার?

তথ্যসূত্র:

  • Hoskins, Robert. Mrs. Clara A. Swain, M.D., First Medical Missionary to the Women of the Orient. Boston, MA: Woman’s Foreign Missionary Society of the Methodist Episcopal Church, 1912
  • Clara A. Swain, A Glimpse of India, Creative Media Partners, LLC, 2016 (লিংকটায় ক্লিক করলে অসামান্য বইটার মূল সংস্করণ পড়তে পাবে। এটি উইকিমিডিয়া কমন্‌স্‌-এ রয়েছে।)

Leave a Reply