ভ্রমণ-পাহাড়ি গ্রামের গল্প-বিউখি-ইন্দ্রনাথ-শরৎ ‘২৬

পাহাড়ি গ্রামের গল্প- আগের পর্বগুলো

bhromonkhati

বছর কয়েক আগে যেবারে কালীমঠ গিয়েছিলাম, উদ্দেশ্য ছিল কালীশিলা দেখে আসার। কালীমঠ থেকে চড়াই ভেঙে সাত-আট কিলোমিটার উঠলেই পাহাড়ের ডগায় কালীশিলা। কালীমঠ বাস স্ট্যান্ড থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে কে একটা পাহাড়ের ডগার দিকে আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়েও ছিল, বলেছিল, ‘ওই যে দেখছ কালো রঙের পাথরটা, ওইটেই কালীশিলা।’ হুঁ হুঁ করে মাথা নাড়লেও সত্যি বলতে কি, আমি দেখতে পাইনি। দেখা যায় নিশ্চয়ই, যিনি দেখিয়েছিলেন তিনি কি আর মিথ্যে বলবেন, তবে আমি আবার যাকে কিনা আমার ঠাকুমা বাঙাল টানে বলতেন ‘ট্যালা’, ফলে নীচ থেকে আমার দেখা হয়ে ওঠেনি। সে যা হোক। সেবারে ভোরবেলা কালীমঠ বাজারের দোকানি রানাজির পরামর্শমতো হেঁটে ওঠাই সাব্যস্ত হয়েছিল। তখন ওপরে যাবার রাস্তার কাজ অনেকটা এগিয়ে গেলেও শেষ হয়নি। রাস্তা তখনও কাঁচা এবং এবড়োখেবড়ো। গাড়ি যাবার অনুমতি না মিললেও, ছুটকো-ছাটকা অনিয়মিত বেআইনি গাড়ি চলা শুরু হয়ে গিয়েছিল তারই মধ্যে।

কালীমঠের মূল গাড়ির রাস্তা থেকে কালীমঠ মন্দিরে যাবার সিঁড়ি যেদিকে নেমেছে, তার ঠিক উলটোদিকে পায়ে চলা পথ উঠে গিয়েছে ওপরের দিকে। দু-পাশে বাড়ি ঘরের পাশ দিয়ে সে-পথ ক্রমে ঘুরে ঘুরে পৌনে কিলোমিটার এগোলেই বাড়িঘর শেষ হয়ে জঙ্গল শুরু হয়ে যায়। ভোরবেলা হাঁপাতে হাঁপাতে পিঠে বোঝা নিয়ে আমরা কিছুটা উঠি, ফের দম নিই, আবার উঠি।

বেশ খানিকটা উঠে এসেছি আমরা, গ্রামের বাড়িঘর তখনও শেষ হয়নি। দাঁড়িয়ে পড়তেই আমার সঙ্গী রাজা বলল, “একটা লাঠি পেলে বেশ হত, ভর দিয়ে লাঠি ঠুকে ঠুকে হাঁটা যেত!”

ঠিক তখুনি রাস্তার বাঁদিকে একটা বাড়ির পাশে একজন লোককে দেখতে পেলাম। ঘরের বাইরে এসে সাদা পাউডার মাজন দিয়ে দাঁত মাজছেন। পাহাড়ের গায়ে বাড়ি, আমরা বাড়ির নীচের রাস্তায়। রাজা হাতজোড় করে ‘নমস্তে’ বলাতে লোকটা মাথা ঝুঁকিয়ে প্রত্যুত্তর দেবার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই রাজা ইতস্তত করে বলেই ফেলল, “ইয়ে, একঠো লাঠি অগর…”

লোকটা রাজাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে পিচিক করে পাশে থুতু ফেলে জিজ্ঞাসা করলেন, “কালীশিলা যা রহে হো? রুকিয়ে থোড়া।” বলেই সাঁ করে বাড়ির পেছন দিকে চলে গেলেন। উত্তর দেবার দরকার ছিল না, আর ভদ্রলোক তার প্রত্যাশাও করেননি, বোঝাই গেল। এই পাকদণ্ডি রাস্তা কালীশিলার দিকেই গেছে আর আমরাই সাহায্য প্রার্থনা করেছি লাঠির বন্দোবস্তের জন্য। সুতরাং দুয়ে দুয়ে চার। অনেকক্ষণ কেটে যাবার পর আমরা দুই মক্কেল এ-ওর মুখের দিকে তাকিয়ে এগোব কি না এই সিদ্ধান্ত নেবার জন্য যখন প্রায় নিঃশব্দে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছি, লোকটা ফিরে এলেন। হাতে একটি চমৎকার লাঠি, গাছের ডাল কেটে সদ্য বানানো। একগাল হেসে সেটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “লিজিয়ে।”

রাজা হাতে নিয়ে যারপরনাই আহ্লাদিত। ভদ্রলোক যাবার আগে আমার হাতের লম্বা ডাঁটির ছাতাটা দেখে গিয়েছিলেন নির্ঘাত, নচেৎ আমি নিশ্চিত, উনি দুটি লাঠি নিয়ে ফিরতেন। ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমরা ওপরে যাবার পথ ধরলাম। ভদ্রলোক নীচে বাড়ির দাওয়ায় দাঁড়িয়ে রইলেন আমাদের পরবর্তী বাঁকে পৌঁছোনো অবধি।

এরপর দু-পাশে পাহাড়ি ঢালে কেবল জঙ্গল। পাইন আর দেওদারের আধিক্যই বেশি। জঙ্গলের ভেতর ঢুকতেই ঠান্ডাটা এক লাফে খানিকটা বেড়ে গেল। সর্বত্র রোদ এসে পড়ে না। গাছের ছায়ায় ছায়ায় পথ। পথের বাঁকে যেখানে গাছের ফাঁক গলে রোদ এসে পড়ে, সেখানে দাঁড়িয়ে বেশ আরাম।

কিছুটা উঠি আর ওপরের দিকে তাকাই; গাছেদের ভিড়, ডালপালা, পাতার ঠাসবুনোটে দৃষ্টি বেশি চলে না। উঠতে উঠতে একসময় জঙ্গল হালকা হয়ে এল; ওপরে তাকালে এবারে গাছের পাতার ফাঁকে-ফোকরে আকাশের নীল দেখা যেতে থাকল, অর্থাৎ সামনেই গিরিশিরা। একটা বিশাল পাইনের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছি, ওপর থেকে একদঙ্গল ছেলেমেয়ের গলা শোনা গেল। ওরা নেমে আসছে। কাছে আসতেই দেখলাম ইস্কুলের ছাত্রছাত্রীর একটা দল। দলে ছাত্রীদের সংখ্যা বেশি দেখে খুব ভালো লাগল। আর কতটা উঠতে হবে জিজ্ঞেস করতে ওরা তো হেসেই কুটিপাটি। তারপর যা বলল, তার মানে হল, ‘ধরে নাও তোমরা গ্রামে এসেই গেছ। তারপর আরও একটুখানি উঠলে কালীশিলা, ব্যস।’

“কোন গ্রাম?”

আবার একপ্রস্থ হাসি ও উত্তর, “বিউখি।”

কলকল করতে করতে ওরা নীচের দিকে নেমে গেল, কালীমঠের হাইস্কুলে পড়ে ওরা। গ্রাম থেকে হেঁটে সকালে নীচে নেমে যায় কালীগঙ্গার পাড়ে ওই নীচের ইস্কুলে। এই ওপর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সে ইস্কুল। আবার বিকেলে উঠে আসে দুদ্দাড় করতে করতে এই পথেই, যে পথে উঠতে আমাদের প্রাণান্ত হচ্ছে।

ওরা বলে গেল বটে, এই তো গ্রামে এসে পড়েছ, কিন্তু আরও পঁয়তাল্লিশ মিনিট চড়াই ঠেলার পর আমরা উঠে এলাম নির্মীয়মাণ গাড়ি-রাস্তার ওপরে। অন্যদিক থেকে ঘুরে ঘুরে এই রাস্তাটা ওপরে উঠে এসেছে। রাস্তার পাশে একটা কংক্রিটের বানানো শেড, যাত্রীদের বিশ্রামের জন্য। এখান থেকেও গ্রাম দেখা যায় না। গাড়ি রাস্তাটা আরও খানিকটা এগিয়ে গেছে পাহাড়ের গা ধরে ওপরের দিকে, জায়গায় জায়গায় ভাঙা পাথর একধারে সরিয়ে ডাঁই করে রাখা। আমরা খানিকক্ষণ সেই শেডে জিরিয়ে জল-টল খেয়ে পাকদণ্ডি ছেড়ে রাস্তা ধরেই এগোলাম। গ্রামের একটা-দুটো বাড়ি যখন দেখা যাচ্ছে, ঠিক সেই অবধি এসেই রাস্তাটা শেষ। ওই রাস্তা ধরেই একজন বুড়িমা আসছিলেন। কাছাকাছি হতে কালীশিলার রাস্তা জিজ্ঞেস করতে পাকদণ্ডি পথের হদিস দিলেন। রাজা মাথা-টাথা নাড়ল বটে, কিন্তু না ও, না আমি একবিন্দুও বুঝতে পারলাম না। হেসে তাঁকে বিদায় দিয়ে গ্রামের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। খানিক দূর এগিয়ে এদিক-ওদিক দেখছি। রাস্তার বাঁপাশে পাহাড়ের ঢাল নীচে নেমেছে, সেই ঢালে একটা বাড়ির ছাদে দুই বয়স্ক ভদ্রলোক গল্প করছিলেন। ছাদটা এই রাস্তার লেভেলে, সমান সমান। চেঁচিয়ে কালীশিলার রাস্তা জিজ্ঞেস করাতে, সে-কথার জবাব না দিয়ে বললেন, “চায় পিয়োগে?”

তারপর ধরেই নিলেন আমাদের উত্তর ‘হ্যাঁ’ এবং হাতের ইশারায় ঘুরে নীচে ওই বাড়ির কাছে আসতে বললেন। ঘুরে রাস্তা দিয়ে নেমে বাড়ির কাছে আসার পর দেখি এ-পাশে একটা দোকান, মূলত বাসনকোসন পাওয়া যায়, এছাড়া টুকিটাকি মুদি-মশলা। আমরা এসে দাঁড়াতে দাঁড়াতে যিনি চায়ের কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি ততক্ষণে স্টোভে চায়ের জল চাপিয়ে এসে আলাপপর্ব শেষ করে ফেলেছেন। অন্য ভদ্রলোকটি এবারে মুখ খুললেন, “আরে কালীশিলা তো যাবেই। বোসো দেখি, খানিক গল্প করা যাক। সবে সকাল হয়েছে, ধীরেসুস্থে ওঠো’খন। অত তাড়ার কী আছে বাপু! রোসো দেখি, চা খাও। তারপর বলো আর কী খবর!”

এই-ই হল জীবন। ধীরস্থির, অযথা দৌড়ে ক্ষয় করে ফেলা নেই, গেল গেল নেই নেই করে চেঁচানো নেই, পড়িমড়ি করে ছুটে চলা তো নেই-ই!

পায়ের ওপর এক পা তুলে বেঞ্চে বসে রামচন্দ্র রানা মৃদু স্বরে কথা বলছিলেন। মাথায় টুপি, গায়ে একটা ভেড়ার লোমের হালকা কোট, মুখে বিড়ি ধরানো। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছিলেন আর কথা বলছিলেন। ফর্সা, লম্বা যে মানুষটা চা করে দিচ্ছিলেন, তাঁর নাম অব্বল সিং রানা। ইনি কথার চেয়ে হাসেন বেশি। চোখে-মুখে একটা অদ্ভুত প্রশান্ত ভাব।

“ইয়ে মেরেসে বারাহ্‌ সাল ছোটোা হ্যায়, ইসকো হমনে পয়দা হোতে দেখা হ্যায়।” রামচন্দ্র অব্বলকে দেখিয়ে বলে ওঠেন।

অব্বল হাসেন, মুখে কিছু বলেন না। রামচন্দ্রও চোখ কুঁচকে নিঃশব্দে হেসে বিড়িতে টান দেন। কোথা থেকে ঘণ্টা দেড়েক সময় কেটে যায় বুঝতেই পারি না। ওঠার আগে ওঁদের দুজনের সঙ্গে একটা ছবি তুলে দিতে বলি রাজাকে। ছবিটা কখনও পাঠিয়ে দেব আপনাদের এ-কথা বলাতে অব্বল হাসলেন। বললেন, “তার চেয়ে এখানে আজ থেকেই যাও না কেন, সেটা অনেক আনন্দের হবে।”

আমাদের কালীশিলা যাওয়াটা মনস্থ করা ছিল বলে উঠেই পড়লাম। রাস্তার হদিস নিয়ে নেওয়া হল ওঁদের কাছ থেকে। সামনের চাষের ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে সোজা উঠে গেলেই ওপরে ইয়াব্বড়ো পাথর একখানা, তার নাম ভীমশিলা, তাকে ছাড়িয়ে এগোলে গ্রামের একেবারে শীর্ষবিন্দুতে মন্দির। মন্দিরের পাশ দিয়ে জঙ্গলের ভেতর পাহাড়ের গা বেয়ে পায়ে চলা সরু পথ। সে-পথে আরও তিন কিলোমিটারই উঠে গেলেই কালীশিলা। বিদায় নেবার সময় দুজনেই আগাম নিমন্ত্রণ জানিয়ে রাখলেন, “যদি কখনও ফের এ-পথে…”

কয়েক বছর বাদে এই সেদিন, ২০২৬ সালের গোড়ায় বিউখি গ্রামে যাব বলেই এক দুপুরে কালীমঠে গিয়ে হাজির হলাম। রামচন্দ্রজি এবং অব্বলজি দুজনেরই ফোন নম্বর থাকা সত্ত্বেও ফোন করে যোগাযোগ করিনি। যদি গিয়ে গ্রামে পৌঁছতে পারি তাহলে একেবারে হাজির হয়ে হাতে হাতে সেই ছবিটা তুলে দেব, এই ভেবে ছবিটির দুটি কপি ফ্রেমে বাঁধিয়ে নিয়ে নিয়েছিলাম সঙ্গে। কালীমঠের পোস্টমাস্টার থাকেন বিউখি গ্রামে। পুরন সিং। কালীমঠের লালাজিকে জিজ্ঞেস করতে উনি বললেন, “ওর তো অপারেশন হয়েছে, ক’দিন নামতে দেখিনি। আপকো রহনা হ্যায় উধর? লেকিন উসকা নম্বর তো নহি হ্যায়!” ফলে কলকাতায় আইভিকে ফোন করে পুরন সিংজিকে কোনোভাবে খবরটা পৌঁছে দিতে বললাম। ওরা এর আগে একবার এসে থেকেছিল ওর বাড়িতে। সেদিন বিকেল নাগাদ একজন মাঝারি উচ্চতার রোগা অথচ শক্তপোক্ত মানুষকে এদিকে আসতে দেখে লালাজি আমাদের বললেন, “লো, আ গয়া শয়তান সিং!”

পুরন এসে আলাপ করলেন। কালীমঠ ছোট্ট জায়গা, আমাদের মতো অপরিচিত বাইরের লোককে খুঁজে নেওয়াটা সহজ কাজ। কথা হয়ে রইল, পরদিন সকাল সকাল আমরা বিউখি গ্রামে যাব।

পরদিন সকালের ঘটনাটা ঠিক যেন অ্যাকশন রিপ্লে হচ্ছে, এমনভাবে ঘটল। প্রথমে গাড়ির ব্যাপারটা রানাজি উড়িয়ে দিলেন, আমরাও পাকদণ্ডি চড়াই পথে জঙ্গলে ঢুকে এলাম। আগেরবার সঙ্গী ছিল রাজা, এবারে সৌরভ। সে আবার পক্ষী বিশারদ। আর জানুয়ারির শেষ থেকে মার্চ অবধি বছরের এ-সময়টা জঙ্গল পাখির ডাকে, ওড়াউড়িতে মুখর থাকে। সুতরাং সে এক পা যায়, দু-পা দাঁড়ায়, মনের সুখে সে পাখি দেখে, তার ঠিকুজি-কুলুজি জানায় আমায়। এমন করে কত কত পাখি যে আমার দেখা হয়ে গেল! রডোডেনড্রনের গাছ লাল, গোলাপি ফুলে ফুলে ভরে আছে; ফুলের মধু সংগ্রহে পাখিদেরও কমতি নেই। পাইনের ডালে গলার কাছটা লাল, গা-টা হলদে একটা কাঠঠোকরা ঠকঠক ঠুকেই চলেছে। দশ হাত দূরে একটা গ্রে-ট্রিপাইয়ের ঝাঁক পায়ের আওয়াজ পেয়ে ফরফর করে উড়ে গেল। পাইনের কাণ্ডে ফাটা ত্বকে হাত বুলিয়ে দিলাম আমরা। এমনি চলতে চলতে একসময় ওপরের রাস্তা বেয়ে ইস্কুলের পোশাক-পরা ছেলেমেয়ের দল হুড়মুড় করে নেমে এল। জঙ্গলের রাস্তাও ফুরিয়ে গেল খানিক বাদে। সেই যে কংক্রিটের যাত্রী বিশ্রামের জায়গা, সেইখানে উঠে এলাম আমরা। এখন রাস্তা পিচঢালা, মসৃণ। পিচ-রাস্তায় পৌঁছোনোর আগেই ঘনঘন পুরনজির ফোন। তাঁকে কালীমঠ পোস্ট অফিসে নামতে হবে। তাড়া আছে। আমরা যেন তাড়াতাড়ি পা চালাই। অগত্যা। পিচ-রাস্তা এখন গ্রামের মধ্য দিয়ে ঘুরে ওপরের দিকে সোজা ভীমশিলার পাশ দিয়ে গ্রামের মন্দির অবধি চলে গেছে। গ্রামের একেবারে প্রান্তে ভীমশিলার উলটোদিক দিয়ে পাহাড়ের ধার বরাবর বাঁধানো রাস্তা ধরে তিরিশ-চল্লিশ মিটার গেলেই পুরনজির বাড়ি।

বাড়ির দাওয়ায় আমাদের ব্যাগপত্তর নামাতে না নামাতে পুরনজি চা নিয়ে এসে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “আমি নীচে চললাম, আপনারা থাকুন, ঘরবাড়ি রইল।”

বেরোনোর আগে কেবল ভাবিজিকে ফোন করে বলে দিলেন, তিনি এসে যেন আমাদের দুটি ভাত ফুটিয়ে দেন। ভাবিজি কয়েক ফার্লং দূরের গোয়ালঘরে, গোরু-মহিষের দেখভাল, চাষের ক্ষেতে টুকিটাকি, ঘাসকাটা এইসব কাজে গিয়েছেন। সারাদিন তাঁর এই-ই কাজ। অর্থাৎ গোটা বাড়ি এখন ফাঁকা। গৃহস্বামী নিশ্চিন্তে দুটি প্রায় অপরিচিত লোকের হাতে বাড়ির জিম্মা ছেড়ে দিয়ে চলে গেলেন কাজে। আমিও বাড়ির বারান্দায় দিব্যি একটা কম্বল পেতে টানটান হয়ে শুয়ে রইলাম। এ-বাড়ির বারান্দা থেকেই সোজা ভীমশিলা দেখা যায়।

ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। বাইরের গেটে আওয়াজ হতে উঠে বসে দেখি এক ভদ্রমহিলা ঢুকছেন। ধারেকাছে সৌরভকে দেখতে পেলাম না। ভদ্রমহিলা ভেতরে এসে হাসিমুখে বললেন, “নমস্তে। চায় পিয়া?”

আমি ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলাতে হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “আর একবার খাবে?”

আমিও হেসে আবার ঘাড় কাত করি।

দুপুরে ডালের সঙ্গে শাকপাতা দিয়ে একটা ঘন স্যুপ দিয়ে আতপচালের ভাত, গরম গরম অমৃতসম। সঙ্গে একটুকরো পেঁয়াজ আর কাঁচা লংকা। খেয়েদেয়ে আমি ফের কম্বলের ওপর গড়িয়ে যেতেই ঘুমে চোখ বুজে এল। ভাবি খাওয়ার সময়ই বলে দিয়েছিলেন, আমাদের খাওয়া হলেই উনি গোয়ালঘরে ফিরে যাবেন বাকি কাজ সেরে আসতে। সন্ধের আগেই ফিরে আসবেন। আমাদের অসুবিধে হবে, যদি কিছু দরকার-টরকার হয়, তাই পাশের বাড়ির একজন মহিলাকে বলে যাচ্ছেন। চা-টা দরকার হলেও তাঁকেই যেন হেঁকে বলি।

দেখলাম ভীমশিলার গায়ে একটা দশাসই মহিষ খুবসে গা ঘষছে আর অত বড়ো তিনতলা সমান পাথরটা অল্প অল্প নড়ছে। আমি আঁতকে উঠে দেখব বলে যেই কাছে গিয়েছি, মহিষবাবা আমায় পশ্চাৎদেশ দিয়ে মারল এক ঠেলা। অমনি আমার ঘুম গেল ভেঙে, আমার পাশে কম্বলের ওপরে বসে সৌরভ আমায় ঠেলছে আর বলছে, “এই ওঠো, গ্রামে কার বাড়িতে যাবে বলছিলে!”

মাথাটা পরিষ্কার হতে উঠে বসি। তারপর ছবির ফ্রেম দুটো নিয়ে বাড়ির পাশ দিয়ে সরু রাস্তা ধরে নীচে গ্রামের দিকে নামি। খাড়া পাহাড়ি ঢালে গায়ে গায়ে বাড়ি যেন একটার ঘাড়ের ওপর আর একটা, ঘেঁষাঘেঁষি করে রয়েছে। একে ওকে রামচন্দ্র সিং রানার নাম জিজ্ঞেস করতে করতে গ্রামের মাঝমধ্যিখানে একজায়গায় এসে থমকে দাঁড়ালাম। তিনদিকে গলিপথ গিয়েছে। সামনেই এক যুবককে দেখে জিজ্ঞেস করায় সে আমাদের আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলল, “কঁহাসে আয়া?”

“কলকত্তা।”

“ক্যায়া কাম?”

“পুরানা জান পহচান।”

ছেলেটা এবারে একটু থমকে কী ভেবে বলল, “আইয়ে।”

তারপর এক বাড়ির উঠোন টপকে, পাশের বাড়ির ছাদে নেমে, সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে, সরু একটা গলি দিয়ে রামচন্দ্র সিং রানার বাড়িতে নিয়ে গেল। ভদ্রলোক ছাতের ওপর রোদে একটা মাদুর পেতে শুয়ে ছিলেন। সেইখানে আমাদের নিয়ে গেল যুবকটি। রামচন্দ্রজি অসুস্থ— পায়ে ব্যথা, কাশি, চোখে কম দেখেন। উঠে বসলেন, কিন্তু বছর কয়েক আগের কয়েক ঘণ্টার আলাপ মনে করতে পারলেন না। পাশে বসে আমি ছবিটা হাতে তুলে দিতে মুখে একটা আলো ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে, ছবিটা নীচে মেঝেয় নামিয়ে রাখলেন।

যুবকটি এবার ঝুঁকে পড়ে ছবিতে দেখে যেন নিশ্চিত হল যে আমরা পূর্বপরিচিত। সে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। এবারে ছাতের ওপর থেবড়ে বসে পড়ে বলল, “অব্বলজি তো খতম হো গয়ে, দো সাল হো গয়া।”

আমি চমকে উঠে ছেলেটির মুখের দিকে তাকাই। আহা, অমন লম্বা, সুন্দর মানুষটা!

রামচন্দ্রজি মাথা নেড়ে নেড়ে অস্ফুটে বলেন, “হমসে বারাহ্‌ সাল ছোটা থা উয়ো। উসকো পয়দা হোতে দেখা হ্যায়।”

ভাসা ভাসা জানা গেল, সুগার ধরা পড়েছিল। অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন কিডনির অসুখে, অন্য কিছুও হয়ে থাকতে পারে। জানা নেই।

রামচন্দ্রজির ছেলে গ্র্যাজুয়েট, কলেজ পাশ করা, তবে চাকরি পায়নি। এটা সেটা ঠেকনা ঠিকে কাজ করে। রামচন্দ্রের স্ত্রী – ভাবিজি, তাঁরও বয়েস হয়েছে, ভারী শরীর নিয়ে ছাতে এসে আলাপ করলেন। একপ্রস্থ চা খাওয়ার ফাঁকে ছবিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকলেন আর বার বার অব্বল সিংজির কথাই উঠে এল।

এ-বাড়ি হয়ে আমরা এবারে অব্বল সিংজির বাড়িতে গেলাম। উনি নেই, ছবিটা ওঁর স্ত্রীর হাতে দিয়ে আসব—এই-ই সান্ত্বনা। ওঁর স্বামীর ছবি দিতে এসেছি শুনে ভদ্রমহিলা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। খুব মনখারাপ হল। মহিলা বার বার ক্ষমা চাইছিলেন ঠিকমতো অতিথিসৎকার করতে পারলেন না বলে। না পারলে ক্ষমা চাওয়াই দস্তুর। কোনও মানে হয়! আমাদেরই লজ্জা পাবার কথা! সুতরাং আমরা হাতজোড় করেই রইলাম।

ফেরার পথে পুরন সিংয়ের বাড়ি প্রায় এসে গেছি, ওপরে একটা বাড়ির বারান্দা থেকে ঘোমটা দেওয়া একজন মাঝবয়েসি মহিলা ডেকে বললেন, “এই যে! চা খেয়ে যাও!”

সম্ভবত এঁকেই চায়ের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন পুরনের স্ত্রী।

“অভি নহি, বাদ মে।” বলে আমরা পুরনের বাড়িতে না ঢুকে মন্দিরের দিকে এগোই। গ্রামে লোকজন বিশেষ নেই। কী একটা পাঠ-উৎসব চলছে কালীশিলায়, গ্রাম ঝেঁটিয়ে লোকজন গেছে সেখানে। সেখানেই তেরাত্তির থাকা হবে, তারপর পূজার শেষে ফেরা। প্রতি বাড়ি থেকে অন্তত একজনকে যেতেই হবে। পুরনের ছেলেও গিয়েছে সেখানে। অঙ্কে স্নাতক এবং বেকার। গত কয়েক বছর উত্তরাখণ্ডের দুটি জেলা, রুদ্রপ্রয়াগ ও চামোলিতে নানান গ্রামে যাবার সুবাদে সেখানে চাকুরিহীন যুবক-যুবতীদের পরিমাণ ও মানুষের অভিযোগ ক্রমাগত বাড়ছে লক্ষ করেছি।

মন্দিরের ঠিক নীচে এসেই গাড়ির রাস্তা খতম। সেখানে বছর তিরিশের প্রেম সিং রানা একটা ঝুপড়ি চায়ের দোকান করেছে। তার কাছে দু-কাপ চা খেয়ে দেড় ঘণ্টা গপ্প সেরে সন্ধের মুখে ডেরায় ফিরে শুনি ভাবিজি খুবসে পুরন সিংজিকে বকছেন। কারণ কী? না, সে কেন সবজিপাতি এনে রাখেনি, দুজন অতিথিকে কেবল ডাল-ভাত খেতে হল দুপুরে। আর এখনই-বা কী রান্নাটা হবে শুনি!

আমরা এসে ঢুকতে পুরন ধরা পড়ে যাবার মতো মুখ করে আমাদের দিকে তাকাল। ভাবিজির আশঙ্কা, লজ্জা, কুণ্ঠা এক লহমায় উড়িয়ে আমি হইহই করে বলে উঠলাম, “আরে ভাবি, দুপুরে দারুণ খেয়েছি! এখনও ওইরকম যা হোক করে ফেলুন, দারুণ হবে!”

ভাবিজি হেসে মুখটা এমনভাবে নাড়লেন যার মানে করলে দাঁড়ায়— ‘আ মোলো যা!’ তারপর বারান্দার কোনায় গিয়ে টবে নানারকম গাছের ভিড় থেকে পেঁয়াজপাতার মতো কিছু তুলে নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলেন। মুসুরির ডালে ওই পাতার ফোড়নেই টের পাওয়া গেল। রাতের মেনু ডাল, বেগুনভাজা, শশা-টমেটো কুচিকরা স্যালাড আর হাতে গড়া আটার রুটি।

খাওয়া যখন শেষ হচ্ছে, প্রেম বাড়ির পাশ দিয়ে নামার পথে দেখা করে গেল। রোজ সকালে ন’টায় যায়, রাত আটটায় দোকান বন্ধ করে ফেরে। সারাটা দিন ওই দোকানে সাকুল্যে হয়তো দশ-পনেরো কাপ চা বিক্রি হয়। তাহলে… তাহলের কিছু নেই। তাহলেও প্রেমের মুখের হাসি মিলায় না। প্রেম বলতে ভোলে না, ‘দাদা, কল সুবহ হমারে ঘর সে রোটি খা কে যাইয়েগা।’ কতক্ষণ আর আলাপ ওর সঙ্গে, এসব ম্যাজিক সম্পর্ক ওরা বানায় কীভাবে? বার-বারই আমি আশ্চর্য হই। কেউ না কেউ ঠিক তার ম্যাজিক জোব্বাটা পরে হাজির হয়ে যায়!

রাতে ছাত থেকে আকাশের গায়ে অজস্র তারার ভিড়ে তাকিয়ে ছিলাম। পুরন এসে ওপরের ঘরগুলো দেখাচ্ছিল। হোমস্টে বানানোর চেষ্টা। ছেলেটার জন্য ধারকর্জ করে কিছু যদি করে রেখে যাওয়া যায়। ইলেকট্রিকের কাজ বাকি, শেষ হলেই ওপরতলাও চালু হয়ে যাবে। আপাতত লোকজন এলে নীচেই থাকে। অথচ ভোরবেলা বিদায়ের আগে পুরনকে যেই জিজ্ঞেস করি, ‘পুরনজি, কিতনা…’ পুরন আমার মুখে হাতচাপা দেয়, চোখ ছলছল করে ওঠে। হাতজোড় করে কেবল বলতে থাকে, ‘মাফ কিজিয়ে।’ এই রহস্যের সমাধান আমি এ-জীবনে করে উঠতে পারব বলে মনে হয় না।

নামার পথে গ্রামের শেষ বাড়িটা ছাড়িয়ে উত্তরদিকে তাকাতেই ঝকঝকে নীল আকাশের গায়ে কেদারনাথ শৃঙ্গ পুরন সিং রানার মুখের মতোই ঝলমল করে উঠল।

ভ্রমণ সব লেখা একত্রে

Leave a Reply