আগের পর্ব- পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫, পর্ব ৬, পর্ব ৭, পর্ব ৮, পর্ব ৯
টিয়াপাখিদের ব্যাপার-স্যাপার এমনিতেই সহজ নয়। এক বুড়ো টিয়া চমকপ্রদ এক ঘটনা ঘটিয়েছিল একবার। সেটা ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দ, বিখ্যাত জার্মান প্রকৃতিবিদ আলেকজান্ডার ফন হামবোল্ট তখন দক্ষিণ আমেরিকা পর্যটন করে বেড়াচ্ছেন। ঘুরতে ঘুরতে অধুনা ভেনেজুয়েলার অরিনোকো নদীর অববাহিকায় মাইপুরে জনজাতির গ্রামে তিনি পৌঁছে যান। এখানে একসময় মাইপুরে বা আটুরদের বাস থাকলেও ততদিনে তাদের তাড়িয়ে ক্যারিব জনজাতি সে-জায়গার দখল নিয়েছিল। জনজাতিদের প্রাচীন ভাষার প্রতি হামবোল্টের উৎসাহ দেখে সে-গ্রামের ক্যারিব বাসিন্দারা তাঁকে জানায় যে তাদের গ্রামে এক বুড়ো টিয়া কীসব যেন বলে, তারা সেসব একেবারেই বুঝতে পারে না। হামবোল্ট ব্যাপারটা উড়িয়ে দিতেই পারতেন, কিন্তু তিনি তুখোড় প্রকৃতিবিদ। সুতরাং তিনি টিয়াটাকে দেখলেন এবং তার দুর্বোধ্য বক্তব্যও মন দিয়ে শুনলেন। একটু জিজ্ঞাসাবাদ করতেই রহস্যটা পরিষ্কার হল তাঁর কাছে। এ-টিয়া কোনও আটুরের। সে হয়তো নিজের ভাষার কিছু শব্দ শিখিয়েছিল টিয়াটাকে, কিছু হয়তো বুদ্ধিমান টিয়া নিজেই শুনে শুনে শিখে নিয়েছিল। ততদিনে আটুর গোষ্ঠী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, বলা যায় তারা লুপ্ত জনজাতি। রোমাঞ্চিত হামবোল্ট টের পেলেন, এক হারিয়ে যাওয়া লুপ্ত ভাষার একমাত্র ধারক ও বাহক এই বৃদ্ধ টিয়াপাখি। সময় নষ্ট না করে তিনি কাজে লেগে পড়লেন এবং অনেক চেষ্টার পর টিয়ার কাছ থেকে প্রায় চল্লিশটা শব্দ উদ্ধার করতে পেরেছিলেন। কিন্তু সে কেবল শব্দই। পাখি তো আর তাঁকে সে-সব শব্দের মানে বলে দিতে পারেনি। অর্থ না জানা সেই চল্লিশটা শব্দই থেকে গেছে এখন লুপ্ত ভাষার প্রতীক হয়ে। তবে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ শব্দগুলোকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। কারণটা বলাই বাহুল্য, ‘বুড়ো টিয়া কী বলতে কী বলেছে’ গোত্রের।
হামবোল্ট তাঁর জীবদ্দশায় ফোটোগ্রাফির আবিষ্কার দেখে যেতে পেরেছিলেন বটে, তবে তা এই ঘটনার বহুবছর পরে। দক্ষিণ আমেরিকা পর্যটনের দিনগুলোয় তিনি উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলির স্কেচ করে রাখতেন। দুর্ভাগ্যবশত টিয়াপাখির স্কেচ তিনি করেননি।
এ তো গেল ভাষাবিদ টিয়ার আখ্যান। ফড়িংরা আবার এদের তিন কাঠি ওপরে। তাদের ওই ফোঁটা খানেক মস্তিষ্কে নাকি এমন নিউরোন আছে যার কারসাজিতে ওদের শিকারের পিছনে ধাওয়া করার প্রয়োজন পড়ে না। বরং শিকার এরপর কোনখানে পৌঁছবে, সেটা হিসেব করে দেখে সেখানে আগে পৌঁছে নীচ থেকে খপাৎ করে পাকড়াও করে তাকে। এমনকি শিকার ডাল বা পাতার আড়ালে চলে গেলেও কোথা থেকে আবার বেরিয়ে আসবে তাও নিখুঁতভাবে হিসেব করতে পারে ওরা। সেই সময় আশেপাশের অন্যান্য জিনিসের নড়াচড়াও ওদের মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে না। তবে এর একটা উলটোদিকও আছে। নিবিষ্ট মনে হিসেবনিকেশ করতে গিয়ে তাকেই কেউ শিকার করতে আসছে কি না, সে ব্যাপারেও বেখেয়াল হয়ে পড়ে ফড়িংপ্রবর।
***
কানাডার বিভারকুল খুবই দক্ষ এবং কর্মঠ। বিভাররা যে বাঁধ বানাতে ওস্তাদ তা তো সবাই জানে, কিন্তু অ্যালবার্টার বিভাররা শিরোমণি গোত্রের। উড বাফেলো ন্যাশনাল পার্কের এক অনামি নদীর ওপর বিভার ড্যামের দৈর্ঘ্য পাক্কা ২,৭৯০ ফিট। ১৯৭০ সাল থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিভারের দল এই বাঁধ বাড়িয়ে চলেছে, রক্ষণাবেক্ষণ করেছে, প্রয়োজনে মেরামতির কাজও নিপুণভাবে সেরেছে। এখানেই বিস্ময়ের শেষ নয়, এই বিশাল বাঁধ মহাকাশ থেকেও দৃশ্যমান। এই বাঁধের ফলে ১৭ একর জুড়ে একটা লেক তৈরি হয়েছে। জলাভূমি বলে মানুষের পক্ষে জায়গাটায় পৌঁছানো কিঞ্চিৎ মুশকিল। চারদিকে ঘন বোরিয়াল জঙ্গল আর মাস্কেগ বা পচা জলা। মনে হয় প্রকৃতি নিজেই এই বাঁধ রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়েছে।
গুগল ম্যাপের স্যাটেলাইট ইমেজে বাঁধটা কেমন দেখায় তার নমুনা রইল।niversity for Proceedings of the National Academy of Sciences)

***
মানুষ তো ধারেকাছেই আসে না, পৃথিবীর সহিষ্ণুতম প্রাণী কিন্তু গণ্ডার, হাঙর-টাঙর নয়, এমনকি টি-রেক্সও নয়। এই বিরল সম্মানের অধিকারী আটপেয়ে অণু-প্রাণী টার্ডিগ্রেড বা ওয়াটার বেয়ার। লম্বায় এরা মোটে ০.৫ মিলিমিটার। কিন্তু ক্রিপ্টোবায়োসিস নামক আজব প্রক্রিয়ার কল্যাণে এদের ধ্বংস করা একরকম অসম্ভব। এই প্রক্রিয়ায় টার্ডিগ্রেডরা প্রাণের সমস্ত লক্ষণ একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারে। প্রচণ্ড খরা? কুছ পরোয়া নেই, কুঁকড়ে শুকনো খটখটে একটা বল হয়ে বছরের পর বছর রয়ে গেল। মারাত্মক শৈত্য? হয়তো শরীরের জলীয় পদার্থ সব জমে বরফ, কিন্তু এমন একখানা মোক্ষম প্রোটিন আছে শরীরে যে কোশ নষ্ট হবে না। যে বিকিরণ মানুষের পক্ষে প্রাণঘাতী, তার হাজার গুণ বেশি ক্ষতিকারক বিকিরণ সহ্য করে টিকে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে এরা। খাদ্য-পানীয় ছাড়া বহুবছর টিকে থাকতে পারে। এমনকি মহাকাশেও নিয়ে গিয়ে দেখা হয়েছে, বায়ুশূন্যতাও এর কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনি। মজা হল, পরিবেশ অনুকূল হলেই এরা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসে নিজেদের কাজে মন দেয়। মানুষের যদি এমন ক্ষমতা থাকত! রইল এই বিচিত্র প্রাণীর ছবি। চিত্র ঋণ: NASA/Ames Research Center

এমন গুণ যদি মিং নামের সামুদ্রিক কোহগ (quahog) ঝিনুকটার থাকত তাহলে বেচারাকে ৫০৭ বছর বয়সে অকালে মরতে হত না। গবেষকরা আইসল্যান্ডের সমুদ্রতল থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করতে গিয়ে ওকে খুঁজে পেয়েছিলেন। কোহগ ঝিনুকের বিশেষত্ব হল গাছের যেমন বর্ষবলয় তৈরি হয়, ওদেরও তাই। ঝিনুকের খোলের পিঠে ওদের বেঁচে থাকার প্রত্যেক বছরের জন্য একটা করে বলয় বা রিং জন্মায়। শুধু বয়স নয়, ওই রিং থেকে সেই বছরের সমুদ্রের তাপমাত্রা আর লবণাক্ততারও হদিস পাওয়া যায়। এখানেই একটা বড়ো ভুল হয়ে যায় গবেষকদের। ওঁরা সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ঠান্ডায় জমিয়ে ফেলেন ঝিনুকটিকে, আর তাতেই মৃত্যু হয় প্রাণীটির। পরে খোল পরীক্ষা করে সবার চক্ষুস্থির হয়ে যায়। গুনে গুনে ৫০৭টি রিং রয়েছে সেখানে। এই প্রাচীন জীবটির এমন পরিণতি কাম্য নয় ঠিকই, তবুও সে যে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের পটপরিবর্তনের নথি, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মিং নামটাও পরেই দেওয়া হয়েছিল। প্রশ্ন থেকেই যায়, এই বিপুল তথ্য না মিংয়ের বেঁচে থাকা— কোনটা বেশি জরুরি ছিল?
রইল মিংয়ের দেহাবশেষের ছবি। চিত্র ঋণ: উইকিকমন্স।
