
আগের পর্বেরা- পর্ব ১,
৩ নভেম্বর, ২০২৪, কাঠমান্ডু।
সকাল ৭টায় কলকাতা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বিমানবন্দর থেকে উড়ান দিল্লির উদ্দেশে। যেহেতু দু-ঘণ্টা আগে পৌঁছে রিপোর্ট করতে হয়, তাই ভোর ৫টার আগেই পৌঁছে সমস্ত প্রথানুগামিতা সেরে নির্দিষ্ট বিমান নিষ্ক্রমণ দ্বারের কাছে আসনে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ৬:৩০ মিনিটে ডাক পড়ল বিমানে প্রবেশের জন্য। আমাদের বোর্ডিং পাসে সময় দেখানো ছিল ৯:৩০ মিনিট, কিন্তু আমরা সকাল ৯টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম দিল্লি ইন্দিরা গান্ধি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনাল-৩-এ। সেখান থেকেই আবার বিকেল ৫টায় কাঠমান্ডুর উদ্দেশে রয়াল নেপাল এয়ারলাইনসের বিমান। কিন্তু এতক্ষণ বিমানবন্দরে বসে থেকে সময় কাটাব কী করে? তাই আগে থাকতেই দিল্লিতে আমার স্ত্রীর দাদার বাড়িতে জানিয়ে রেখেছিলাম। তাঁরা সাদর আতিথেয়তা জানিয়ে আমাদের স্বাগত জানালেন। কিছুটা সময় ওখানে বসে ব্যয় করা গেল। তারপর দুপুর ২টোর আগেই আবার বিমানবন্দরে উপস্থিত হলাম। আন্তর্জাতিক বিমান যাত্রার ক্ষেত্রে তিন ঘণ্টা আগে রিপোর্ট করার নিয়ম। সুতরাং দুপুর ২টোর মধ্যে আবার বিমানবন্দরে ফিরে আসতে হল সমস্ত দাপ্তরিক নিয়ম পালনের জন্য। ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নেপাল যাত্রার ক্ষেত্রে ভোটার কার্ড অথবা পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র সঙ্গে রাখতে হবে এবং নির্দিষ্ট কর্তব্যরত আধিকারিককে সে প্রমাণ পেশ করতে হবে, তবেই ছাড়পত্র পাওয়া যাবে নেপাল যাত্রার। আমাদের সঙ্গে পাসপোর্ট থাকাতে আর ভোটার কার্ড দেখাইনি। আধিকারিকের কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হল এবং সে উত্তরে পরিতৃপ্ত হলে পাসপোর্টের পাতায় একটা ছাপ দিলেন – ডিপার্টেড (Departed)। এইসব আনুষ্ঠানিক কাজ সারতে দেড় ঘণ্টার মতো সময় লাগল। ছাড়পত্র পাওয়ার পর নির্দিষ্ট গেটের কাছে গিয়ে আরও দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা। কিন্তু বিমানে ওঠার ডাক পড়ল বিকেল ৫টার পর। একেই নভেম্বর মাস, সূর্যাস্ত তাড়াতাড়ি হয়। কলকাতায় এই সময় নভেম্বর মাসে অন্ধকার হয়ে যায়। দিল্লিতে তখনও একটু রোদ দেখা যায়। বিশাল আকারের এক বিমান, প্রায় ৩৫০ যাত্রী হবে আমার আন্দাজে। ঠিক বিকেল ৫:৩০ মিনিটে বিমান উড়ান নিল কাঠমান্ডুর উদ্দেশে। পাইলট জানালেন, আমরা সন্ধে ৭টার মধ্যে কাঠমান্ডু ত্রিভুবন নারায়ণ বিমানবন্দরে অবতরণ করব।
বিমানের জানালা দিয়ে অবতরণের সময় দেখতে পেলাম কাঠমান্ডু শহর তখনও দিওয়ালির আলোয় সজ্জিত। ওপর থেকে পুরো শহর আলোয় ঝলমল করছে। আশা করেছিলাম যদি দিনের আলো থাকতে থাকতে কাঠমান্ডু পৌঁছানো যায়, তাহলে হয়তো বিমান থেকে কিছু হিমালয় পাহাড়ের দৃশ্য দেখা যেতে পারে। কিন্তু সূর্যাস্ত হয়ে যাওয়ার ফলে সেটা আর সম্ভব হল না। বিমানে আমরা পাশাপাশি বসার আসন পেয়েছিলাম। আমার স্ত্রীকে জানালার ধারে বসিয়ে আমি পাশেরটায় বসে ছিলাম। আমাদের সামনের আসনের পেছনে, অর্থাৎ আমার দিকে একটা করে এলসিডি স্ক্রিন লাগানো। তাতে যাত্রী ইচ্ছে করলে কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে সিনেমা দেখতে পারে, কিছু কম্পিউটার খেলা খেলতে পারে আবার গুগল মানচিত্রের ওপরে বিমানের বর্তমান অবস্থান কোথায় আর গন্তব্য কত দূর সেটাও দেখতে পারে। আমি তৃতীয়টার প্রতি বেশি আগ্রহী হলাম। দিল্লি বিমানবন্দর থেকে ওড়ার পর আমাদের বিমান উত্তরপ্রদেশের গোরখপুর হয়ে নেপাল সীমান্তের কাছাকাছি যখন চলে এল, আমি মানচিত্রে দেখতে পেলাম, সীমান্ত পেরিয়েই খুব কাছে দেখা যাচ্ছে বুদ্ধের পবিত্র জন্মভূমি লুম্বিনি। আমি আমার স্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। বিমান যেই মুহূর্তে লুম্বিনির ওপর দেখাচ্ছে, সে হাতজোড় করে একটা প্রণাম জানাল। আমিও তাকে অনুসরণ করে তাই করলাম। ভগবার বুদ্ধের জন্মভূমির ঠিক ওপরে আমরা, অথচ এই যাত্রায় সেই ঠিকানায় যাওয়া হবে না। ভগবান বুদ্ধকে প্রণাম জানিয়ে বললাম যে হে প্রভু, তোমার শরণে যখন এসে পড়েছি, তখন এই যাত্রা সফল না হয়ে যেতে পারে না। আমার মনের মধ্যে তখন একটা প্রবল উত্তেজনা ও আশঙ্কা—দুই-ই কাজ করছে। প্রথম নতুন একটা দেশ ঘুরে দেখার আর আশঙ্কা, যদি বিমানবন্দরের বাইরে আমার গাইডকে খুঁজে না পাই তাহলে এই অচেনা বিদেশি শহরে আমি কোথায় যাব, কী করব। মনে মনে চিন্তা করে রেখেছিলাম, যদি সেরকম বিপদে পড়ি, তাহলে একটা ট্যাক্সি নিয়ে ভারতীয় দূতাবাসে চলে যাব। আমার ভ্রমণ সংস্থা জানিয়ে রেখেছিল যে বিমানবন্দরের বাইরে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে আমাদের নেপালের গাড়ির চালক তথা গাইড বিক্রম। সেইমতো কাঠমান্ডুতে সংস্থার নেপালের প্রতিনিধি শ্রী দীপক কয়রালের সঙ্গে আমার ফোনে কথোপকথন হয়ে গিয়েছিল। সে-ই আমাকে নিশ্চিত করেছিল একবারেই চিন্তা না করতে। যত রাতই হোক, বিক্রম থাকবেই। বিক্রমের ফোন নাম্বার আমার সঙ্গেই ছিল এবং বিমান ছাড়ার আগে দিল্লি বিমানবন্দরে বসে ওর সঙ্গে বাক্যালাপ হয়েছিল। তবুও যেন মন থেকে দ্বিধা যায় না। হাজার হোক, বিদেশ বলে কথা।
বিমান থেকে নীচে নেমে দেখলাম সব ভিজে রয়েছে, অর্থাৎ একটু আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে। আবার মনের ওপর চাপ পড়ল। এই নভেম্বর মাসে বৃষ্টি? দিল্লিতে তো আবহাওয়া বেশ ভালোই ছিল। বিমানের ক্যাপ্টেনও সেরকম কিছু জানালেন না? তাহলে হিমালয়ে মাঝে-মধ্যে যেমন বৃষ্টি হয়ে থাকে, সেরকম কিছু কি? তাই যেন হয়। পশুপতিনাথকে উদ্দেশ করে প্রণাম জানালাম বিমানবন্দরে প্রবেশ করেই। আবার সেই একই নিয়মের মধ্যে দিয়ে যাওয়া। ইমিগ্রেশন আধিকারিকের কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হল। তাঁকে সন্তুষ্ট করেই তবে ছাড় পাওয়া যাবে। সন্তুষ্ট হওয়ার পর পাসপোর্টে আবার একটা ছাপ পড়ল – অ্যারাইভড (Arrived)। অর্থাৎ, আমার নেপাল দেশে আগমন হল। এবার বিমানবন্দর থেকে প্রস্থান নেওয়ার পালা আর বাইরে বিক্রমের খোঁজ করা। বেরোনোর মুখেই রয়েছে সোনালি রঙের বুদ্ধের মূর্তি আর তার নীচে ইংরেজিতে লেখা – ওয়েলকাম টু নেপাল। বুদ্ধের মূর্তিকে প্রণাম করে অগ্রসর হলাম বাহির পথের দিকে। মনে তখনও ত্রাস চলছে বিক্রমকে খুঁজে বের করা নিয়ে।
বাইরে পা রাখতেই চোখে পড়ল, এক যুবক প্ল্যাকার্ড হাতে আর তাতে আমার নয়, আমার স্ত্রীর নাম লেখা—অপর্ণা। তাতেই হবে কাজ। ভ্রমণ সংস্থার কাছে আমাদের দুইজনের নাম ও নথিপত্রের প্রতিলিপি পাঠানো ছিল। কিন্তু আমার নাম ছিল প্রথমে, পরে আমার স্ত্রীর নাম। নেপালে বোধ হয় ওদের আমার নামটা পছন্দ হয়নি। তাই স্ত্রীর নাম দিয়ে আমাদের স্বাগত জানান হল। বেশ হাসিখুশি, খাসা যুবক বিক্রম। কাঠমান্ডুর বাসিন্দা। একটা খুব সুন্দর দেখতে সাদা রঙের গাড়িতে আমাদের মালপত্র রাখল ও। এই গাড়ি এই প্রথম আমার নজরে পড়ল। আগে কখনও দেখিনি। গাড়ির নামে নেটা। এমনিতে দেখলাম নেপালে অধিকাংশ যে গাড়ি চলাচল করছে প্রায় সবই ভারতীয়— টাটা, মাহিন্দ্রা, মারুতি ইত্যাদি। কেবল এই গাড়িটা গুগলে অনুসন্ধান করে দেখলাম চিনে নির্মিত, ব্যাটারিচালিত, বেশ আরামদায়ক গাড়ি। বিক্রম জানাল যে এখান থেকে হোটেল ৩০ মিনিটের মতো লাগবে। শহরের ওই অঞ্চলের নাম থামেল। ওখানেই প্রায় সব হোটেল আর পর্যটকেরা ওখানেই আশেপাশের হোটেলে উঠে থাকে। এমনিতেই বিমানবন্দরেই চোখে পড়ল বহু পর্যটক ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি থাইল্যান্ড, চিন, জাপান থেকেও এসেছে। পিঠে বড়ো রুকস্যাক, উদ্দেশ্য পাহাড়ে ওঠার। এদের মধ্যে অনেকেই হয়তো এভারেস্ট চূড়া অথবা এভারেস্ট বেস ক্যাম্প পর্যন্ত যাবে। অন্যান্যরা কেউ অন্নপূর্ণা, ধৌলাগিরি, মানাসলু অথবা অন্যসব ৮,০০০ মিটার উচ্চতার পর্বতে ওঠার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছে। এদের মধ্যে অনেকেই আমার বয়সি আর বেশ চনমনে। আমার স্ত্রীকে বললাম, আমারও এদের সঙ্গে পাহাড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে। সে মুখে কোনও কথা বলল না, কেবল আমার দিকে এক কড়া দৃষ্টিপাত করল। তাতেই যা বোঝার আমার বোঝা হয়ে গেল— তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছ, ওসব ভুলে যাও এবার।
রাতের কাঠমান্ডু শহর দেখতে দেখতে চললাম হোটেলের উদ্দেশে। তখন সন্ধে ৮টা আর মানুষেরা বেশ চনমনে, দিওয়ালির উৎসবে মাতোয়ারা শহরবাসী। রঙচঙে আলোয় সুসজ্জিত শহর। মাইকে নেপালি আর হিন্দি গান—দুই-ই চলছে এক-এক জায়গায়। পথে দেখলাম প্রচুর শপিং মল। নিশ্চয়ই বিদেশিরা খুব কেনাকাটা করে এখানে এসে। কোনও মলের নাম বুদ্ধ মল, আবার কোনোটা পর্বতের নামে— এভারেস্ট, সাগরমাথা (নেপালে এভারেস্ট পর্বতকে সাগরমাথা বলা হয়) লোটসে, অন্নপূর্ণা ইত্যাদি। শহর দেখতে দেখতে হঠাৎ বিক্রম বড়ো রাস্তা ছেড়ে এক ছোটো সরু গলিমতো পথ ধরল। বলল, আমরা থামেল নামে এক স্থানে এসে পৌঁছে গেছি। থামেল কাঠমান্ডু শহরের সব থেকে ব্যস্ত এলাকা। আমাদের কলকাতা শহরের চৌরঙ্গীর মতো অনেকটা। রাস্তার দু-ধারেই দোকানের সারি। বেশিরভাগ দোকান পাহাড়ে ওঠার সামগ্রী বিক্রয় করছে, আর সেখানেও দেখলাম সব ইউরোপিয়ানদের ভিড়। এই ধরনের কোনও দোকানই প্রায় ফাঁকা চোখে পড়ল না। অর্থাৎ, পাহাড়ে ওঠার ভিড় ভালোই আছে এই মরশুমে। আশপাশ দিয়ে দ্রুত গতিতে বেরিয়ে যাচ্ছে মোটরবাইক সব ছেলে-ছোকরাদের। তাদের এক-একজনের মাথার চুলের কায়দা (হেয়ার স্টাইল) দেখার মতো। খুব কম বাইক আরোহীর মাথায় হেলমেট রয়েছে, তাই হেয়ার স্টাইল চোখে পড়ল। সব রঙচঙে চুলের বাহার। এরাও বোধ হয় হিন্দি ফিল্ম খুব দেখে।
গাড়ি থামল থামেল এলাকার মধ্যে এক ফাটকের সামনে। ভিতর ইমারতের গায়ে লেখা হোটেলের নাম— আমা-লা (ইংরেজিতেও এইভাবে লেখা – Ama-La)। ‘আমা’-র পর ‘লা’ শব্দ পৃথকীকৃত থাকার কারণে আমি মনে করেছিলাম, তিব্বতি ভাষায় যেহেতু ‘লা’ বলতে বোঝায় কোনও গিরিপথ (মাউন্টেন পাস), তাই হয়তো কোনও গিরিপথের নামে এই হোটেল। ভিতরে প্রবেশ করা মাত্র অভ্যর্থনা টেবিলের সামনে বসে থাকা মহিলাটি উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে আমাদের বললেন, ‘নমস্তে’। আমরাও প্রত্যুত্তরে নমস্তে জানালাম। আমরা পরিচয় দিতেই তিনি তাঁর কম্পিউটারে দেখে নিলেন আমাদের নাম। সঙ্গে সঙ্গে বড়ো খাতা বের করে আমাকে দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে সই করিয়ে আমাদের পাসপোর্টের একটা কপি করে নিলেন। তারপর আমাদের মালপত্র সব নির্দিষ্ট ঘরে পাঠিয়ে দিল। আমাদের হোটেলের লাউঞ্জে বসিয়ে এক গ্লাস করে ঠান্ডা পানীয় দিয়ে সেবা করা হল। নভেম্বর মাসের ৩ তারিখ হলেও সন্ধের পরেও তাপমাত্রা প্রায় ২০ ডিগ্রি। পানীয়তে চুমুক দিতে দিতে আমি জানতে চাইলাম হোটেলের নামের অর্থ। তিনি জানালেন যে এই হোটেলের মালিক একজন তিব্বতি মানুষ, তাই এই নাম, যার অর্থ হল ‘মাকে সম্মান’।
আমাদের কলকাতা থেকে নেপাল আসার সরাসরি বিমান বাতিল হয়ে যাওয়াতে ভ্রমণ পরিকল্পনা অনেকটা পরিবর্তন করতে হল। প্রথমে ঠিক ছিল দুপুরে পৌঁছেই আমরা পশুপতিনাথ ও স্বয়ম্ভূনাথ দর্শন করে নেব আর পরের দিন পোখারার উদ্দেশে রওনা হয়ে যাব। সন্ধেবেলা এসে পৌঁছাতে আমাদের সংস্থার নেপালের প্রতিনিধি শ্রী দীপক কয়রাল এসে দেখা করে জানালেন যে পরের দিন সকাল ৭টায় আমরা হোটেল ত্যাগ করে প্রথমে পশুপতিনাথ মন্দির দর্শন করে, পথে বুধনীলকণ্ঠ মন্দির দর্শন সেরে নিয়ে পোখারার উদ্দেশে যাত্রা করব। ফেরার দিন দরবার স্কোয়ার ও স্বয়ম্ভূনাথ বৌদ্ধ মঠ দেখে নেব। তাই আমার ইচ্ছে ছিল নেপালের রাজধানী শহরের এই ব্যস্ত অঞ্চল থামেল ঘুরে দেখার, সেটা আর সেদিন হল না। তাই থামেল দেখার পরিকল্পনাও ফেরার দিন পর্যন্ত মুলতুবি রাখলাম। সেদিন রাত্রে কেবল আহার সেরে নিয়ে একটা গভীর নিদ্রায় চলে গেলাম পরের দিনের সফরের জন্য নিজেদের আবার চনমনে করে তোলার জন্য। এমনিতেও কোথাও ভ্রমণে গেলে একমাত্র রাতটুকু ছাড়া আর বিশ্রাম সম্ভব নয়। সারাদিন তো দর্শনীয় স্থানাদি দর্শন করতেই কেটে যায়, আর তাতে শরীর যথেষ্ট ভারাক্লান্ত হয়ে পড়ে। তবে এর ফলে রাতে নিদ্রা কিন্তু বেশ গভীর হয়। বিক্রম জানিয়ে দিল, সে সকাল সাড়ে ছ’টার মধ্যে হোটেল পৌঁছে যাবে।
৪ নভেম্বর – পোখারা যাত্রা
বিক্রমের গাড়িটা বেশ আরামদায়ক, চড়ে বেশ লাগল। আর বিক্রম গাড়ি চালায়ও চমৎকার। কাঠমান্ডু থেকে আমাদের পোখারা পৌঁছতে প্রায় ১২ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। অবশ্য এর মধ্যে পশুপতিনাথ ও বুধনীলকণ্ঠ এবং দুপুরে গলছি (নেপালিরা গলসি উচ্চারণ করে) নামের এক স্থানে থেমে আহার সেরেছিলাম। এতে প্রায় আমাদের চার ঘণ্টা সময় লেগেছিল। সবকিছু বাদ দিলে তাহলে মোট সময় লেগেছিল ৮ ঘণ্টা। হোটেল থেকে আমরা প্যাকেটে করে সকালের জলখাবার নিয়ে নিয়েছিলাম। প্রথমেই গাড়ি থামল পশুপতিনাথ মন্দিরের ফটকের সামনে। ফটক থেকে ভিতরে প্রবেশ করে সোজা রাস্তা মন্দিরের দিকে। বিক্রম আগেই সাবধান করে দিয়েছিল, অনেকেই অনেক কথা বলবে, কিন্তু আমরা যেন মন্দিরে প্রবেশদ্বারের সামনে দাঁড়ানো দর্শনার্থীদের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ি। একটু সময় লাগলেও নির্বিঘ্নে দর্শন সেরে পুজো দেওয়া যাবে। আর মন্দিরের ভিতরে কোনও প্রকার ছবি তোলা একবারে নিষেধ। কাউকে ছবি তুলতে দেখলে তার ক্যামেরা বা মোবাইল ইত্যাদি বাজেয়াপ্ত হতে পারে, সঙ্গে মোটা অঙ্কের জরিমানা অথবা কারাবাস অথবা দুই-ই। আমার ক্যামেরা গলায় ঝুলছিল আর মোবাইল পকেটে রাখা ছিল। নিরাপত্তা রক্ষীদের বলাতে ওরা জানাল যে ক্যামেরা গলায় রেখে দিয়ে আর ব্যবহার না করতে। মোবাইল ফোন কেবলমাত্র কথা বলার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। আমাদের মাথায় ছিল না যে মন্দির দর্শনের দিন ছিল সোমবার, অর্থাৎ মহাদেবে পুজোর দিন, তাই জনসাধারণের ভিড় অনেক বেশি। তবুও দর্শনার্থীদের সঙ্গে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লেগে গেল, কিন্তু পুজো খুব ভালোমতো দিতে সক্ষম হয়েছিলাম। আরও একটা লক্ষণীয় বিষয় যে এত মানুষ থাকা সত্ত্বেও কোনোরকম ঠেলাঠেলি হয়নি। সকলেই বেশ ধৈর্যের সঙ্গে সারিবদ্ধ হয়ে একে একে পুজো দিয়ে বেরিয়ে গেল। আমরাও পশুপতিনাথ বেশ নির্বিঘ্নে দর্শন করলাম।
ভগবান শিবের মাথার একটি অংশ এখানে পড়েছিল আর এই কারণেও পশুপতিনাথকে ষষ্ঠ কেদার রূপেও পুজো করা হয়। শুধুমাত্র ভগবান শিবের কৃপায় জীব পাশা বা মায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে। তাই পশুপতির নাম ’যিনি পশুকে পাষাণ থেকে মুক্ত করতে পারেন এবং মুক্তি দিতে পারেন’। বাগমতী নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দিরকে ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানে তালিকাভুক্ত করে। মন্দিরের নির্মাণের সঠিক তারিখ অনিশ্চিত, তবে মন্দিরের বর্তমান রূপটি ১৬৯২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল। পশুপতিনাথ মন্দির কাঠমান্ডুর প্রাচীনতম হিন্দু মন্দির। এটি কখন নির্মিত হয়েছিল তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। কিন্তু নেপাল মহাত্মা এবং হিমবতখণ্ডের মতে, এখানে দেবতা পশুপতি নামে প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এই মূল মন্দিরটি নেপালি প্যাগোডা স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। দুই স্তরের ছাদ সোনার আবরণযুক্ত তামার। মন্দিরটি ভিত্তি থেকে চূড়া পর্যন্ত ২৩ মিটার ৭ সেমি উচ্চতা-সহ একটি বর্গাকার ভিত্তি প্ল্যাটফর্মের উপর অবস্থিত। এর চারটি প্রধান দরজা রয়েছে, সবগুলোই রূপার চাদর দিয়ে ঢাকা। এই মন্দিরে একটি সোনার চূড়া রয়েছে। ভিতরে দুটি গর্ভগৃহ রয়েছে: অভ্যন্তরীণ গর্ভগৃহ বা গর্ভগৃহ হল যেখানে প্রতিমা স্থাপন করা হয় এবং বাইরের গর্ভগৃহ হল একটি খোলা করিডোরের মতো স্থান। মন্দির প্রাঙ্গণে মূল দিকগুলিতে চারটি প্রবেশপথ রয়েছে। পশ্চিমদিকের প্রবেশদ্বারটি মন্দিরের প্রাঙ্গণের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং বাকি তিনটি প্রবেশদ্বার শুধুমাত্র উৎসবের সময় খোলা থাকে। মন্দিরের নিরাপত্তা (আর্মড পুলিশ ফোর্স নেপাল) এবং পশুপতিনাথ এরিয়া ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্ট অভ্যন্তরীণ প্রাঙ্গণে কাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নির্বাচনী। দক্ষিণ এশীয় প্রবাসী হিন্দুদের অনুশীলনকারী এবং নেপালি ও তিব্বতি প্রবাসী বৌদ্ধদের শুধুমাত্র মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। পশ্চিমা বংশোদ্ভূত হিন্দুদের মন্দির প্রাঙ্গণ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না। ভিন্ন দেশীয় পর্যটকেরা বাইরে থেকে দর্শন করে চলে যায়। পশুপতিনাথের কাছে তারা তাদের পর্বতারোহণের জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে আসে। মন্দির প্রাঙ্গণ ভক্তদের জন্য ভোর ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে, তবে অভ্যন্তরীণ পশুপতিনাথ মন্দির সকালের অনুষ্ঠান ও দর্শনের জন্য সকাল ৫টা থেকে ১২টা পর্যন্ত এবং সন্ধ্যার আচারের জন্য বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে। অন্যান্য অনেক শিব মন্দিরের মতো ভক্তদের ভিতরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না, তবে গর্ভগৃহের বাইরের প্রাঙ্গণ থেকে দেখার অনুমতি দেওয়া হয়। মন্দির বন্ধের সময় ঋতুর উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়: নভেম্বর মাসে এটি ৬:৩০টায় বন্ধ হয়, গ্রীষ্মকালে এটি ৮টায় বন্ধ হয়।
কাঠমান্ডু উপত্যকার উত্তর প্রান্তে শিবপুরী পাহাড়ের নীচে বুধানীলকণ্ঠ মন্দির অবস্থিত, ভগবান মহাবিষ্ণুর উদ্দেশে নিবেদিত।

এটি কাঠমান্ডু জেলার বুধানীলকণ্ঠ পৌরসভায় অবস্থিত। এর ঠিকানা হল গলফুটার মেইন রোড, বুধানীলকণ্ঠ ৪৪৬০০। বুধানীলকণ্ঠ মন্দিরটি ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার এবং থামেল থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রাথমিকভাবে নাম শুনে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েছি। কিছু আগের থেকে না জেনে আসার সমস্যা হল এই। পশুপতিনাথ সম্বন্ধে জেনে এসেছিলাম, কিন্তু এখানে যে মহাবিষ্ণুর মন্দিরও শিবের নামে, সেটা অজানা ছিল। ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে দেখি এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা। বিষ্ণু দেবতা এখানে শায়িত অবস্থায় রয়েছেন। পৃথিবীর দীর্ঘতম শায়িত বিষ্ণুর মূর্তি এখানে। চতুষ্কোণ জলাশয়ের মধ্যে মহাজাগতিক সর্পদের মধ্যে অনন্তশয়নে রয়েছে বিষ্ণু দেবতার আঠারো ফুটের এই মূর্তি। এই মূর্তিটি এক খণ্ড কালো পাথর (ইংরেজিতে বাসাল্ট রক অর্থাৎ অগ্নিয়গিরিজাত শিলা) থেকে কেটে তৈরি করা। যেহেতু এই ধরনের পাথর বা শিলা নেপালে পাওয়া যায় না, তাই কথিত আছে যে ভক্তরা অন্য কোথাও থেকে পাথর খোদাই করে মূর্তি বানিয়ে এখানে নিয়ে জলাশয়ে শায়িত অবস্থায় রেখেছে। আরও একটি পুরাকথা অনুযায়ী, এক কৃষক ও তার স্ত্রী জমিতে চাষ করার সময় মাটি খুঁড়তে গিয়ে এক জায়গায় থেকে রক্তের সন্ধান পান। সেই জমি খুঁড়ে ওখান থেকে উদ্ধার হয় এই বিষ্ণু দেবতার শায়িত মূর্তি। তারপর থেকে এই মূর্তিটিকে এই চতুষ্কোণ জলাশয় নিয়ে এসে পুজো করা হয়।
প্রথমে নীলকণ্ঠ নামে কিছুটা বিভ্রান্ত বোধ করেছিলাম, ভেবেছিলাম বুঝি শিব মন্দির। বুধা অর্থাৎ বুড়োর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই এই মূর্তির। নীলকণ্ঠ বলতে অবশ্যই আমরা শিবকে বুঝি যার কারণে এই বিভ্রান্তির সূচনা। গল্পকথা হল সমুদ্রমন্থনকালে বাসুকি নাগের মুখ বিষক্রিয়ার ফলে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার অপেক্ষায় চলে আসে। দেবতারা তখন বিষ্ণুর উপদেশে মহাদেবের শরণাপন্ন হন। আমরা সেই গল্প জানি যে শিব সেই বিষ পান করার ফলে তাঁর নাম হয় নীলকণ্ঠ। কিন্তু এখানে বিভ্রান্তিকর বিষয় হল, বিষ্ণুর নামকরণ নীলকণ্ঠ। কথিত আছে, মহাদেব বিষ পান করে কাঠমান্ডুর এক পাহাড়ে তাঁর ত্রিশূল দিয়ে আঘাত করে এক জলাশয়ের সৃষ্টি করেন। সেই জলাশয়ের নাম গোঁসাইকুণ্ড এবং সেই জলাশয় থেকে জলপান করে নিজের কণ্ঠের জ্বালা ও তেষ্টা দুই-ই মেটান। কিন্তু বিষ পানের ফলে তাঁর কণ্ঠের রঙ নীল হয়ে যায়, যার থেকে তাঁকে নীলকণ্ঠ নামেও পুজো করা হয়। এটা বিশ্বাস করা হয় যে এখানকার এই চতুষ্কোণ জলাশয়ের জলের উৎস হল গোঁসাইকুণ্ড জলাশয়। আরও একটি বিশ্বাস থেকে বলা হয় যে বিষ্ণুর শায়িত মূর্তির তলায় একটি শিবেরও মূর্তি রয়েছে যার পুজো প্রতিবছর শ্রাবণ মাসে হয় এখানে, যার থেকে নীলকণ্ঠ নাম বিষ্ণুর মূর্তির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। কার্তিক মাসের ১১ তারিখ এখানে হরিবন্ধনীর একাদশী পড়ে। সেদিন হাজারে হাজারে দর্শনার্থী এখানে এসে বুধানীলকণ্ঠের পুজো করেন। বিশ্বাস করা হয়, সেদিন ভগবান বিষ্ণু তাঁর দীর্ঘ নিদ্রা থেকে জেগে ওঠেন।
নেপালের একটা বৈশিষ্ট্য দেখে খুব ভালো লাগল। প্রায় প্রতিটি মন্দির বৌদ্ধ প্যাগোডা আকারের তৈরি, যেমন কাঠমান্ডুর পশুপতিনাথ এবং প্রতি মন্দিরে, হিন্দু দেবদেবীর মন্দিরে বুদ্ধদেবের মূর্তি দেখা যায়, তেমনই বৌদ্ধ মঠে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি পাওয়া যায়। স্থানীয়রা বলে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের একীকরণ অথবা মিশ্রণ, ইংরেজিতে আমরা বলে থাকি ফিউশন। এই দৃষ্টান্ত আমি প্রায় প্রতিটি হিন্দু মন্দির ও বৌদ্ধ মঠে দেখতে পেয়েছি। বুধানীলকণ্ঠ যে প্রাচীরঘেরা পুকুরে শায়িত রয়েছেন, সেখানে জুতো খুলে প্রবেশ করতে হয়। আমরা প্রাচীরের ফাঁক দিয়েই ঈশ্বরের দর্শন সেরে নিলাম। জলাশয়ের একপাশে মন্দিরের ভবন রয়েছে। আমার মনে হল এখানে কিছু আবাসিকও থাকে। এই অট্টলিকার রঙের সঙ্গে একটা বৌদ্ধ মঠের রঙের খুব মিল পাওয়া যায়। ভারতের পশ্চিমবাংলার কালিম্পং জেলার লাভা শহরের বৌদ্ধ মঠের রঙ অবিকল একইরকম, অনেকটা গাঢ় কালচে লাল ও বেগুনি রঙের মিশ্রণ। অদ্ভুত লাগল, এত ভক্তের সমাগম সত্ত্বেও তেমন কোনও কোলাহল নেই, পরিবেশ ভীষণ শান্ত। যে যার মতো করে পুজো দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। নেপালের মানুষকে দেখলাম, ওরা ভীষণ ধর্মভীরু। প্রায় প্রতিটি মন্দির প্রতিষ্ঠানে নেপালের স্থানীয় ভক্তদের সংখ্যা বাইরের পর্যটকদের চেয়ে অনেক বেশি। জানতে পারলাম, তারা প্রায়ই যে-কোনো অজুহাতে পুজো দিতে চলে আসে মন্দিরে অথবা মঠে।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম বেলা প্রায় ১০টা বাজতে চলল। আর দেরি না করে বিক্রমকে ডেকে নিলাম এবার পোখারার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার জন্য। নেপালের সময় ভারতীয় সময় থেকে মাত্র ১৫ মিনিট এগিয়ে। অর্থাৎ, এখানে যদি সময় সকাল ১০টা হয় তাহলে ভারতের সময় ৯-৪৫ মিনিট। পথে কোনও রেস্তোরাঁয় থেমে আবার অপরাহ্নের আহার সেরে নিতে হবে। বিক্রম বলে রেখেছে, রাস্তা প্রশস্তিকরণের কাজ চলছে কাঠমান্ডু থেকে পোখারা পর্যন্ত। চার লেনের সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে, তাই পথ অত্যন্ত খারাপ। পোখারা পৌঁছতে যথেষ্ট সময় লাগবে, তাই আর বিলম্ব না করে এগিয়ে চললাম। ফেরার দিন কাঠমান্ডুর আর যা দর্শনীয় থাকবে তখন দেখে নেওয়া যাবে। কাঠমান্ডু শহরের ভিতর দিয়ে গাড়ি ছুটে চলল। যথেষ্ট যানবাহন চলছে, কিন্তু যে যার মতো নির্দিষ্ট লেন মেনে চলছে। অযথা অন্য গাড়িকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার দৌড় অর্থাৎ ওভারটেকিং নেই আর গাড়ি গতি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ রয়েছে। আর সবথেকে যেটা ভালো লাগল, এত গাড়ি পথে থাকা সত্ত্বেও অযথা হর্ণ বাজানো নেই। তাই এই রাজধানী শহরকেও বেশ শান্ত ও নিরিবিলি মনে হয়। এই শহরকে ভারতের কোনও শহর থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। আমার তো শিলিগুড়ির সঙ্গে বেশ মিল লাগল, বিশেষ করে এক রাস্তাকে শিলিগুড়ির হিলকার্ট রোডের মতো মনে হল। দূরে সবুজ পাহাড় দেখা যায় আর শহরের রাস্তার দু-ধারে বড়ো বড়ো ইমারত, শপিং মল ইত্যাদি। শপিং মলগুলোর নাম আমার বেশ লাগল— এভারেস্ট, লোটসে, বুদ্ধ, অন্নপূর্ণা। এরকম নাম কেবল মলের নয়, বেশ কিছু আবাসন ও ঘরবাড়ির গায়েও লেখা দেখা যায়।
শহরের সীমা ছাড়িয়ে যখন উপকণ্ঠে পৌঁছলাম, তখন সামনে দেখা পেলাম উঁচু সবুজ পাহাড়ের আর তার গা ঘেঁষে ওপরের দিকে উঠে চলেছে সব গাড়ি। বিক্রম জানাল, আমরাও ওই পাহাড়ি পথ ধরে কিছুটা গিয়ে আবার উলটোদিকে নেমে সমতল রাস্তার গিয়ে পড়ব। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাঠমান্ডুর পাহাড়ের ওপরে উঠে পড়লাম আর নীচে দেখতে পেলাম কাঠমান্ডুর ঘিঞ্জি শহর। এত ঘনবসতি এত ওপর থেকেই বোঝা যায়। কোথাও যেন এক ইঞ্চি জমি ফাঁকা নেই। গাড়ি যত ওপর দিকে উঠছে, পথের চারপাশ ততই যেন আরও সুন্দর হয়ে উঠছে। পাহাড়ের গায়ে খাপছাড়া কিছু ঘরবাড়ি আর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে চলেছে সোপান চাষ। সেই ঢালে বেশি চাষ হয় জোয়ার, যব আবার কোথাও ধানও লাগানো হয়েছে। সেই যাই হোক, এই পাহাড়ি রাস্তা থেকে ওই সোপান চাষের দৃশ্য দেখতে অপূর্ব লাগে। রাস্তার অবস্থা সত্যিই ভীষণ খারাপ, প্রতি ২০০ মিটার অন্তর অন্তত এক কিমি খারাপ রাস্তার মধ্যে দিয়ে এগোতে হচ্ছে। আবার কোথাও হয়তো দেখতে পেলাম বেশ কিছুটা কাজ অগ্রসর হয়েছে। এইভাবেই এগিয়ে যেতে থাকলাম। তবে আমাদের জন্য যে গাড়িটা নেপালের ভ্রমণ সংস্থা থেকে ব্যবস্থা করা হয়েছিল, সেটা চমৎকার ছিল। এত খারাপ রাস্তার ঝাঁকুনি মনেই হয়নি।
একটা বাঁক ঘুরেই একদিক থেকে চোখে পড়ল এক খরস্রোতা নদী। বিক্রম জানাল, এই নদীর নাম ত্রিশূলী। গত বর্যায় ভারতের বিহার থেকে আসা কিছু শ্রমিককে নিয়ে একটি বাস পাহাড়ের খাদ বেয়ে এই ত্রিশূলী নদীতে পড়ে গেলে বহু মানুষের প্রাণনাশ হয়েছিল। বর্ষাকালে এই পাহাড়ি নদী হয়ে ওঠে ভয়ংকর, যেমন আমাদের দেশেও সব পাহাড়ি নদী হয়। প্রত্যেক বর্ষায় তিস্তার বন্যায় বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয় আবার প্রাণহানিরও ঘটনা ঘটে। তবে এই নভেম্বর মাসে ত্রিশূলী নদীর দু-পাশের দৃশ্য একেবারে নৈসর্গিক। দু-পাশে সবুজ পাহাড়ের গা বেয়ে রাস্তা ধরে ছুটে চলেছে গাড়ির ঢল আর মাঝবরাবর খরস্রোতা এই ত্রিশূলী নদী। আবার কোথাও পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসছে সরু ঝরনা। মাঝে-মধ্যে পাহাড়ের দু-পাশের বসতিকে জুড়ে দেওয়ার জন্য রয়েছে লোহার শেকল দিয়ে বানানো ঝুলন্ত সেতু (সাসপেনশন ব্রিজ)।

বিক্রমকে বললাম, এরকম একটা ঝুলন্ত সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে পারাপার করার খুব ইচ্ছে আমার। ও জানাল, এই পথে নয়, বরং চিতওয়ান যাওয়ার সময় ও আমার ইচ্ছে পূর্ণ করবে। তথাস্তু বলে এগিয়ে চললাম। সময় প্রায় বেলা একটা হতে চলল। বিক্রমকে জানালাম যে এবার ভাই পেটে কিছু পড়ার দরকার। ও হেসে বলল, তার খেয়াল আছে সে ব্যাপারে আর ঠিক জায়গায় গাড়ি দাঁড় করাবে সে। কিছুটা এগিয়ে বিক্রম রাস্তার বাঁদিক ঘেঁষে গাড়ি থামিয়ে দিল। আমি মনে করলাম বুঝি খাওয়াদাওয়ার জায়গায় এসে গেলাম। কিন্তু দেখি এখানে তো কিছুই নেই। তাহলে গাড়ি থামাল কেন? বিক্রম অঙ্গুলিনির্দেশ করে দূরে এক পাহাড়ে কী দেখাতে চাইল। আমি ও আমার স্ত্রী দুজনেই গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালাম। ত্রিশূলী নদীর ও-পাড়ের পাহাড়ের ওপর দেখতে পেলাম এক বিশাল মূর্তি বাগদেবীর। আমি সত্যিই এর আগে কোথাও সরস্বতী দেবীর এত বড়ো মূর্তি পথের মাঝে, পাহাড়ের গায়ে দেখিনি। সেই পাহাড়ে বেশ কিছু ঘরবাড়ি আছে দেখতে পেলাম, অর্থাৎ গাড়ি যাওয়ার রাস্তাও রয়েছে তার মানে। বিক্রমকে জিজ্ঞেস করলাম ও কখনও ওই পাহাড়ি গ্রামে গেছে কি না। ও জানাল, ও মাত্র দু-বার গেছে, কিন্তু এটা খোঁজ নেয়নি যে ওই গ্রামের বাসিন্দারা সরস্বতী দেবীর বন্দনা করে কি না। আমার স্ত্রীকে বললাম আর মাত্র তিন মাস পরে ফেব্রুয়ারি মাসে সরস্বতীপুজো। এখানে নিশ্চয়ই খুব ধুমধাম করে বাগদেবীর পূজার্চনা করা হয়। এই দৃশ্য সারাজীবন মনের মধ্যে গেঁথে থাকবে। আমি এই ছবি লেন্সবন্দি করে নিলাম।
আর কিছুটা এগিয়ে রাস্তার বাঁকে ত্রিশূলী নদীর ধারে এক রেস্তোরাঁয় এসে থামলাম। সামনে থেকে বেশ সুসজ্জিত এবং পরিচ্ছন্ন মনে হল। ভিতরে প্রবেশ করে জানলাম আমিষ ও নিরামিষ—দু-প্রকারেরই ভোজন উপলব্ধ। নেপালি মুদ্রায় নিরামিষ ভোজন `৫৫০ ও আমিষ `৬৫০। ভারতীয় মুদ্রার `১০০ এখানে `১৬০। অর্থাৎ, নেপালি মুদ্রাকে ১.৬ দিয়ে ভাগ করলে ভারতীয় মুদ্রার অঙ্ক বেরিয়ে আসবে। নেপালে ভারতীয় মুদ্রাও গ্রহণ করা হয় বড়ো প্রতিষ্ঠানে। তবে ছোটো দোকানদার অনেক সময় ভারতীয় টাকা প্রদান করলে নেপালি মুদ্রায় বাকি ফিরতিটা প্রদান করে। আমি কিছু নেপালি মুদ্রা স্মরণার্থ চিহ্ন হিসাবে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। এই রেস্তোরাঁর নাম হ্যামলেট, কাঠমান্ডু-পোখারা হাইওয়ের ওপর অবস্থিত গলছি নামক এক স্থানে। এই গলছি থেকেই অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেক আরম্ভ হয় জমসন নামের এক জায়গা থেকে যেখানে মুক্তিনাথের মন্দির রয়েছে। এখান থেকে আপার মাস্তাং হয়ে তবেই অন্নপূর্ণা ও ধৌলাগিরি পর্বতারোহণ যেতে হয়। এখানেও পর্বতারোহীদের জন্য অনেক থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা অবশ্য সেদিকে এই সফরে যেতে পারিনি। আমরা আহার সেরে এগিয়ে চললাম পোখারার দিকে।
আনুমানিক আরও ৫০ কিমি চলার পর একটা তেমাথার থেকে ডানদিকে পথ ধরলাম। তেমাথার ওপর একটা ফলকে পথচিহ্ন দেওয়া রয়েছে। সামনে ডানদিকে পোখারা, বাঁদিকে চিতওয়ান আর পেছনে কাঠমান্ডু। এই স্থানটির নাম মুঙ্গলিঙ্গ, একটি তেমাথার সংযোগস্থল। এখানে তিনটি প্রধান নদীর সঙ্গম দেখা যায়। পোখারার দিক দিয়ে মার্সিয়ান্দি নদী, কাঠমান্ডুর দিক থেকে ত্রিশূলী নদী ও দুই নদীর সঙ্গম থেকে প্রবাহিত হয়েছে নারায়ণী নদী চিতওয়ানের দিকে। চিতওয়ান যাত্রার দিন আমরা এই নদী পাশ দিয়ে চলেছিলাম এক চিত্রানুগ পরিবেশের মধ্যে দিয়ে, যার বর্ণনা চিতওয়ান যাত্রায় লিখব। মুঙ্গলিঙ্গ থেকে পোখারার দূরত্ব দেখানো আছে ৯০ কিমি, আনুমানিক সময় তিন ঘণ্টা। আমরা এই সংযোগস্থল যখন পেরোলাম তখন ঘড়িতে সময় দুপুর আড়াইটা, অর্থাৎ খুব দেরি হলেও সন্ধে ৬টার মধ্যে পোখারা পৌঁছে যাওয়া উচিত। কিন্তু আর ১০ কিমি পর থেকেই আরও খারাপ রাস্তায় পড়লাম। মার্সিয়ান্দি নদীর ধার ধরে যতক্ষণ চলেছি, যাত্রা ভীষণ সুন্দর লেগেছে। এক ধারে খরস্রোতা নদী আর দু-পাশে উঁচু সবুজ পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে গাড়ি ঘুরে ঘুরে চলেছে। ততক্ষণে আবার হঠাৎ করে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে উঠল। বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেল। এই পাহাড়ি রাস্তায় বৃষ্টি হলে বেশ ভয়ও করে। এক জায়গায় দেখলাম বেশ কিছু মানুষ ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেখানে ওরা ছিল, তার উলটোদিকে একটা ফটক আর তাতে নেপালি ভাষায় লেখা আইনা পাহাড়া। নেপালি ভাষা দেবনাগরী হরফে লেখা হয়, তাই পড়তে অসুবিধে হয় না। কথাও বোঝা যায় মন দিয়ে শুনলে। বিক্রম জানাল যে পাহাড়া অর্থাৎ জলপ্রপাত। কিন্তু ততক্ষণে বৃষ্টির তীব্রতা আরও বেড়ে গেছে। গাড়ি থেকে নেমে জলপ্রপাতের দিকে যাওয়া খুব কঠিন। বিক্রম বলল যে ফেরার দিন আমরা এই জলপ্রপাত দেখে নেব। তাই সই, এখন আর থেমে কাজ নেই। বাইরে থেকে যতটা দেখা যায় দেখে নিলাম। এখানেও নেপালি মুদ্রার `১০০ টিকিট লাগে। এখানে আবার ওরা ভারতীয় টাকা গ্রহণ করে না।
বৃষ্টির তীব্রতা বেড়েই চলেছে আর আকাশ ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছে। সঙ্গে এই আবহাওয়া দেখে আমারও মন ভারাক্রান্ত। পরের দিন সূর্যোদয়ের পূর্বে আমাদের পৌঁছতে হবে সারংকোট নামের এক জায়গায় পোখারাতে। ওখান থেকে ভোরে সূর্যের প্রথম রশ্মি যখন অন্নপূর্ণা পর্বতমালা-সহ অন্যান্য পাহাড়ের গায়ে এসে পড়ে, সেই নৈসর্গিক দৃশ্য দেখার মতো হয়। আমরা কাঞ্চনজঙ্ঘা-সহ আমাদের দেশের বিভিন্ন পর্বতমালার ওপর প্রথম সূর্যের রশ্মির এই প্রক্রিয়া হয়তো চাক্ষুষ করেছি, আমার কাছে সেই আলোর প্রভাব ক্যামেরাবন্দি হয়েও আছে। কিন্তু এই বিশাল অন্নপূর্ণা পর্বতমালার ওপর তার কীরকম প্রভাব হবে, সেটার সাক্ষী হওয়ার প্রবল ইচ্ছে মনে মধ্যে রয়েছে। অথচ আকাশ যদি মুখ গোমড়া করে থাকে তাহলে সুজ্জিমামা মুখ দেখাবেন কী করে, আর অন্নপূর্ণাদেবীও লুকিয়ে থাকবেন মেঘের আড়ালে। এই সাত-পাঁচ ভেবে এগিয়ে চলেছি পোখারার দিকে পাহাড়ের গা ঘেঁষে। ততক্ষণে অন্ধকার প্রায় নেমে এসেছে। বিক্রম জানাল, আমরা এখনও ২০ কিমি দূরে রয়েছি পোখারা থেকে। রাস্তার অবস্থা অত্যন্ত খারাপ, গাড়ি কোনোরকমে হেলেদুলে এগিয়ে চলেছে। এবার একটা বাঁক ঘুরেই একটা বেশ চওড়া নদী অববাহিকা চোখে পড়ল। দু-পাশে চর আর নদীর অনেকগুলো ধারা সেই চরের ফাঁকফোকর দিয়ে বয়ে চলেছে। একটা বাঁক থেকে নদীর ওপরে একটা সেতু চোখে পড়ল। ওই সেতু পেরোলেই আমরা পোখারার সীমানায় প্রবেশ করব। অন্ধকারে ফলকের ওপর লেখা নদীর নাম পড়া গেল না। বিক্রম জানাল, নদীর নাম মাদিখোলা। এই অন্ধকারেই দৃশ্য এত সুন্দর লাগছে দেখতে, তাহলে দিনের বেলায় আরও কত সুন্দর লাগবে সেটা মনে ধারণা করে নেওয়াই যায়। সেতুর ওপরে পড়তেই নদীর দু-পাশে সবুজ পাহাড় আর সামনের দিকে নদীটি বাঁদিকে এমনভাবে বাঁক নিয়েছে যে ডানদিকের একটা পাহাড় মনে হচ্ছে একবারে নদীর সামনে রয়েছে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। বোধ হয় শব্দে তার বিবরণ কতটা দিতে পেরেছি বলতে পারব না। সেতুর ওপর গাড়ি দাঁড় করানো নিষিদ্ধ, তাই চলন্ত গাড়ি থেকেই আমি ভিডিও করতে থাকলাম এই ভেবে যে পরে এই ভিডিওর দৃশ্য থেকেই সেই সামনের দিকে নদী ও পাহাড়ের সঙ্গমের দৃশ্যটা পেয়ে যাব।
পোখারা মূল শহরে প্রবেশ করা মাত্র বুঝতে পারলাম নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরকে কেন পর্যটন রাজধানী বলা হয়। আলোয় ঝলমল করছে এই নগরী। দু-পাশে বড়ো বড়ো দোকান, শপিং মল আর রয়েছে রকমারি স্ট্রিট ফুড। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, চিন, জাপান, থাইল্যান্ড ও ভারত থেকে বহু পর্যটকের মেলা লেগে রয়েছে এখানে। তবে ভারতীয় পর্যটক আমি একমাত্র পশুপতিনাথ মন্দিরেই যা পেয়েছি। পোখারায় সেই তুলনায় অনেক কম দেখা পেয়েছি। বিক্রম জানাল যে নেপালে প্রায় সাতদিন ধরে দীপাবলি উদযাপন করা হয়। যুবক-যুবতীরা স্পিকারে গান চালিয়ে নাচানাচি করছে। প্রতিটি বাড়ি, হোটেল, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আলোয় সুসজ্জিত। আকাশ থেকে রাতের বেলা কাঠমান্ডুকে এমনই দেখেছিলাম। পোখারাতেও একই দৃশ্য। এমনিতে পোখারা খুব গোছানো, পরিছন্ন, সুপরিকল্পিত এক উপত্যকা। চারদিকে সবুজ পাহাড় আর একদিকে বিস্তৃত অন্নপূর্ণা পর্বতমালা, আর সামনে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে পবিত্র মাছাপুছারে অথবা ফিশটেল পর্বত। এই দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম আমাদের নির্ধারিত হোটেল ‘উৎসব হিমালয়’-এ। তখনও অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়ে চলেছে। হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে দুজন আমাদের হাতজোড় করে অভ্যর্থনা জানালেন। আমরাও তাঁদের পালটা নমস্তে জানালাম হাতজোড় করে। আমাদের এখানে আসার বার্তা তাঁরা আগেই পেয়ে গিয়েছিলেন। তাই দাপ্তরিক রীতি সেরে নিতে বেশি সময় লাগেনি। আমাদের মালপত্র আগেই নির্দিষ্ট ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাজ সারতে সারতে হোটেলের দুই কর্মচারীকে আমার আবহাওয়ার জন্য মনের আশঙ্কা প্রকাশ করলাম। ওরা বলল, আজ এত বৃষ্টি হল যে আগামীকাল দেখবেন আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাবে। তাই যেন হয়, মনে মনে প্রার্থনা করলাম পশুপতিনাথ ও বুধানীলকণ্ঠের কাছে। আমাদের নির্ধারিত ঘরটি আকারে বেশ বড়ো, তিন শয্যা বিশিষ্ট, কিন্তু ঘরে থাকব কেবল দুজন। ঘরের দরজা খুলে অলিন্দে দাঁড়ালেই সামনের রাস্তা, ঘরবাড়িগুলো আলোয় ঝলমল করছে। দূরের পাহাড়ের গা বেয়ে ঝিকমিক করছে আলো, যেন অনেক জোনাকি একসঙ্গে জ্বলে রয়েছে। দূরে কোথাও গানবাজনার শব্দ শোনা যাচ্ছে, সম্ভবত দিওয়ালি উৎসবের জের এখনও চলছে। আমাদের বলা ছিল যে রাত ৯টার মধ্যে রাতের আহার সেরে নিতে। বৃষ্টি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, তাই একটু আশার আলো দেখতে পেলাম। হোটেলের কর্মচারী বলেছিল, আজ সারাদিন বৃষ্টি হয়েছে, কাল পরিষ্কার থাকবে আকাশ। রাতের নিদ্রাও বেশ গভীর হল—এক ঘুমে ভোর। এখানে বলে রাখি, অনেকেই পোখারাকে পোখরা বলে থাকে। আমি নেপালে সব জায়গায় ইংরেজি বানানে উচ্চারণ পোখারা দেখেছি (Pokhara)। পোখরা লিখতে গেলে রাজস্থানে পোখরানের সঙ্গে গুলিয়ে যেতে পারে যেখানে পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা হয়েছিল।
(ক্রমশ)
ক্রমশ
(শীর্ষচিত্র: আকাশ থেকে এভারেস্ট। ছবি: লেখক)